Home মাটির পিঞ্জর মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৬

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৬

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৬
নূরায়েশা মাহনূর

– উজান ভাই… এই উজান ভাই… কই তুমি?
গলায় অধৈর্যের ঝাঁজ মিশিয়ে হাঁকডাক করতে করতে হঠাৎ ফট করে উজানের ঘরে ঢুকে পড়ল ইশিতা। দরজা ঠেলে ভেতরে এসে থমকে দাঁড়াল মুহূর্তের জন্য। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঝাড়ছিল উজান, ভেজা চুল থেকে টুপটাপ পানি ঝরে পড়ছে মেঝেতে। আকস্মিক উপস্থিতিতে ইশিতার ডাক কানে গিয়ে লাগতেই উজান চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। ঘরে ঢুকে আরও এক ধাপ বিস্মিত হলো ইশিতা। পরের মুহূর্তেই চোখ বড় বড় করে চিৎকার দিয়ে নিজের মুখ দু’হাতে ঢেকে ফেলল।

– আআআআআ… আয়ায়ায়া! এসব কী করছো তুমি, উজান ভাই?
উজানও এক মুহূর্তের জন্য ভড়কে গেল। হঠাৎ চিৎকারের তীব্রতায় বুকের ভেতর হালকা ধাক্কা খেল। তারপর কপাল কুঁচকে, কোমরে দুই হাত রেখে গজরিয়ে উঠল,
– কি করলাম আমি? চিৎকার করছিস কেন? মাথা খারাপ নাকি তোর?
ইশিতা হাতের ফাঁক দিয়ে সতর্কভাবে একচোখ বের করে উঁকি দিল। ভেজা চুলের ফাঁক গলে চোখে পড়ল অর্ধনগ্ন উজানকে । গায়ে কেবল একটা তোয়ালে জড়ানো, বুক থেকে কোমর পর্যন্ত পেশিবহুল দেহের গড়ন ভেজা পানিতে চকচক করছে। পানির কণাগুলো বেয়ে গলা থেকে বুক অবধি গড়িয়ে নামছে ধীরগতিতে।
অজান্তেই গলা শুকিয়ে এলো ইশিতার, একটা শুকনো ঢোক গিলল সে। অপ্রস্তুত শরীর, কিশোরসুলভ অন্তর, হঠাৎই কোথা থেকে একঝাঁক অপরিচিত আবেগের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল তার ভেতরে । উজান এখনো ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে, চোখে ঝলসে ওঠা বিরক্তির রেখা।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

– সমস্যা কি তোর? বলবি কিছু, না দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাটকই চালাবি?
ইশিতা ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলে উঠল,
– শুধু একটা টাওয়াল পরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? লজ্জা নেই তোমার?
উজান একবার নিজের দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে এক টুকরো তাচ্ছিল্যের রেখা ভেসে উঠল। এ আর এমন কী ব্যাপার? এভাবেই তো থাকে সে প্রায়ই। কোনো উত্তর না দিয়ে ধপাধপ করে কয়েক পা এগিয়ে এলো ইশিতার দিকে।

ইশিতা কিছু বোঝে উঠার আগেই উজান শক্তভাবে তাকে চেপে ধরল কাঠের আলমারির সাথে। কাঠের স্পর্শ পিঠে লাগতেই ইশিতার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। কি করছে উজান সে কিছুই ধরতে পারছে না। চোখদুটো গোল গোল হয়ে স্থির হয়ে আছে উজানের মুখে। গলা শুকিয়ে কাঠ, বুকের ভেতর অজানা স্রোত বয়ে চলেছে। শুকনো ঢোক গিলতে গিয়ে জিভ দিয়ে অসহায়ভাবে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল সে।
সেই সামান্য দৃশ্যটাও এড়াল না উজানের চোখ। মুহূর্তেই তার চাহনি থমকে গেল। চোখের গহীনে অদ্ভুত আবেশ জমাট বাঁধল, তীক্ষ্ণ চাহনি স্থির হয়ে রইল ইশিতার চোখে। ঝুঁকে এসে মৃদু ফিসফিসে কণ্ঠে বললো,

– এমন ভাব ধরছিস কেন? তোর এই চাহনিটা দেখে তো মনে হচ্ছে তুই ১৯০০ সালের মানুষ… জীবনে এমন কিছু কোনোদিন চোখে দেখিস নি, তাই না?
ইশিতার কান লাল হয়ে উঠল। উজানের গলার স্বর… ভিন্নরকম লাগছে তার কাছে। কণ্ঠের ভারী সুরে এক অজানা আবেশ লুকিয়ে আছে যা আগে কখনও টের পায়নি সে। পিঠ ঠেকানো আলমারিটায় দু’হাত ছড়িয়ে, চোখ নিচের দিকে নামিয়ে মৃদু স্বরে বলে উঠল ইশিতা,
– এটা জার্মানি না উজান ভাই… এটা বাংলাদেশ। সেখানে থাকতে থাকতে তোমার মাথা পুরো উল্টে গেছে।
কথাটা শুনে উজানের ধ্যান ভেঙে ফিরে এলো বাস্তবে। তার চাহনি বদলে গেল এক নিমিষে। দ্রুত সরে এল ইশিতার কাছ থেকে। বিছানার ওপরে রাখা একটি টিশার্ট তুলে নিয়ে ঝটপট গায়ে জড়িয়ে ফেলল। তারপর ওয়াশরুমে ঢুকে প্যান্ট পরে বেরিয়ে এল।
ইশিতা এখনও একই ভঙ্গিতে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।উজান হাতে টাওয়াল নিয়ে চুল মুছতে মুছতে একবার ইশিতার দিকে তাকাল। গলার স্বর এবার আগের চেয়ে টানটান করে বললো,

– কেন এসেছিস? কোনো দরকার ছিল?
নিজেকে কষ্টে সামলে নিয়ে ইশিতা স্বাভাবিক স্বরে বলার চেষ্টা করল,
– আমাকে কলেজে দিয়ে এসো। একা যেতে আমার ভয় লাগছে।
উজানের হাতের টাওয়াল মাঝপথে থেমে গেল। ভ্রু সামান্য কুঁচকে তাকাল ইশিতার দিকে, গভীর সুরে বলল,
– ভয় লাগবে কেন? সবসময় তো একাই যাওয়া-আসা করিস, তাই না?
– কলেজে একটা মেয়ে মারা গেছে… এর আগেও এরকম একটা ঘটনা ঘটেছে। তাই ভয় লাগছে আমার। যদি আমিও…
কথাটা থেমে গেল অর্ধেকেই। বাকিটা উচ্চারণ না করলেও উজান বুঝে ফেলল। মেয়েটা মারা যাওয়ার খবর তার কানে পৌঁছেছিল। একটা রেপ কেস, এখনো ইনভেস্টিগেশন চলছে। তবু অভিজ্ঞ চোখে বোঝা যায়, এই ধরনের মামলা কতদূরই বা গড়ায়। প্রথম ক’দিন চারপাশে গুঞ্জন, হৈচৈ, আলোড়ন থাকে… তারপর সময়ের সাথে সব চাপা পড়ে যায়। উজান এক মুহূর্ত থেমে থেকে মৃদু স্বরে উচ্চারণ করল,
– ঠিক আছে… নিয়ে যাব। রেডি হয়ে নে।

– মিস্টার সাইফ, লাশটা আপনাদের বিলেই কেন পাওয়া গেল?
পুলিশ কর্মকর্তার কণ্ঠে কৌতূহলের সাথে তীক্ষ্ণ সন্দেহ। কথাটা শেষ হতেই সাইফ ধীরে চোখ তুলে তাকাল, স্থির স্বরে বলল,
– এটা একটা বিল, অফিসার। এখানে লাশ ফেলা হতে পারে, যেকোনো সময়, যেকোনো কারো। সেটা কার বিল, সেটা নিশ্চয়ই মূল প্রসঙ্গ নয়… তাই না?
অফিসার ভ্রু কুঁচকে সামনে ঝুঁকল, কণ্ঠে এবার চাপা আগ্রাসন,
– আমারও একই প্রশ্ন। এত বিল থাকতে আপনাদের এখানেই কেন? এর পাশেও তো আরও অনেক বিল আছে…
– আপনি আসলে কি বলতে চাইছেন, সেটা স্পষ্ট করে বলুন।
অফিসারের ঠোঁটে অল্প হাসি, কণ্ঠে তীক্ষ্ণতা,
– এই খুনের সাথে… আপনার কোনো কানেকশন নেই তো?

পরের মুহূর্তেই সাইফ হো হো করে হেসে উঠল।অপ্রত্যাশিত হাসিতে পুরো ঘরটা থমকে গেল। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন ছেলেপুলে, সবার চোখ সাইফের মুখে স্থির। ইমন পাশের দেয়ালে হেলান দিয়ে গম্ভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সব। হাসি থেমে গেলে সাইফ আঙুল দিয়ে গলার চাদরটা আলগা করে ঠিক করল। তারপর শান্ত কণ্ঠে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল,
– অফিসার, আপনি কি বোঝাতে চাইছেন? আমি মেয়েটাকে খুন করেছি… তারপর আবার আমাদের বিলেই ফেলে দিয়েছি, যাতে নিশ্চিতভাবে আপনারা বুঝতে পারেন আমি খুন করেছি? আমার কপালে বুঝি এত বড় করে বলদ লেখা আছে?
শেষ কথাটায় কণ্ঠের তীক্ষ্ণ বিদ্রূপে অফিসারের মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বোকার মতো প্রশ্নটা যে করে ফেলেছে, সেটা তার মুখের অভিব্যক্তিতেই স্পষ্ট। সাইফ এক মুহূর্ত থেমে মুচকি হেসে আবার বলল,

– যদি সত্যিই মনে হয় আমার সাথে কোনো কানেকশন আছে… তাহলে ধরে নিতে পারেন কেউ আমাকে ফাঁসাতে চাইছে। আর এটাই একমাত্র কানেকশন।
– কেউ আপনাকে কেন ফাঁসাতে চাইবে? আপনি কার সাথে কী করেছেন?
মাপা স্বরে জবাব দিল সাইফ,
– আমার জানা মতে… আমি কারও সাথে কিছুই করিনি। বাকিটা খুঁজে বের করা আপনাদের কাজ। এখন আপনি যেতে পারেন। আশা করি আমার সাথে আর কোনো দরকার নেই। থাকলেও জানাবেন আমি যথাসম্ভব সহযোগিতা করব।
অফিসার কয়েক সেকেন্ড থেমে স্থিরভাবে সাইফকে দেখল। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে জানিয়ে দিল,
– আমরা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবার আসব। ততদিন আপনি দূরে কোথাও যাবেন না।
কথাটা শেষ করেই অফিসার সোজা বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। সাইফ এবার হেলান দিল চেয়ারের পিঠে, ধীরে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর চোখ খুলে ইমনের দিকে তাকিয়ে খুব সূক্ষ্ম এক ইশারা করল। ইমন মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো।

কেটে গেছে আরও এগারোটি দীর্ঘ দিন। সময় ও স্রোত কারো জন্য থেমে থাকে না, তারা নিজের স্বকীয় ছন্দে অনবরত গড়িয়ে চলে। বারান্দার রেলিংয়ে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টি। বিকেলের রঙিন প্রলেপে ঢাকা আকাশে তুলোর মতো নরম মেঘেরা ভেসে বেড়াচ্ছে। সূর্যের তেজ আজ কিছুটা ম্রিয়মাণ, তবু আলোয় ভরপুর চারপাশ। মেঘেরা সোনালি কিরণকে নীরব পর্দায় ঢেকে রেখেছে, তবুও প্রকৃতি তার দীপ্তি লুকোতে পারেনি।
দৃষ্টির মনটা তলিয়ে আছে সাইফের ভাবনায়। তাদের মধ্যকার দূরত্ব যে অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল এখন তা অনেকটাই ক্ষয় হয়ে গেছে। সাইফের ভালোবাসা ধীরে ধীরে তাকে স্বাভাবিক করে তুলেছে, ক্লান্ত হৃদয়ের সমস্ত দ্বিধা গলিয়ে দিচ্ছে। এখন আর সাইফের পাশে বসতে তার ভেতরে অস্বস্তি কাজ করে না। বরং লোকটাকে না দেখলে অদ্ভুত এক অস্থিরতা এসে জড়িয়ে ধরে তাকে। মনটা খচখচ করে, যেন কিছু একটা অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে।
আজ দৃষ্টি নিজের কাছে একটা কঠিন অঙ্গীকার বেঁধে নিয়েছে। এবার আর সাইফকে দূরে সরিয়ে দেবে না। লোকটা সত্যিই ভালোবাসার যোগ্য। এতদিন যে অবহেলার প্রাচীর গড়ে রেখেছিল, সেটি আজ নিজ হাতেই ভেঙে ফেলতে চাইছে সে। সাইফের প্রতি অন্যায়টা আর কোনোভাবেই টিকিয়ে রাখতে পারবে না। যতই কষ্ট আসুক, যতই আবেগের ঢেউ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাক সাইফকে এবার বুকের কাছে টেনে নিতেই হবে। হাজার হলেও লোকটা তার স্বামী, তার জীবনের অর্ধেক। এত অগাধ ভালোবাসার বিনিময়ে সামান্য কিছু উষ্ণতা ফেরত দেওয়াটা যে তার দায়। এই উপলব্ধিটুকু মনে হতেই লাজে দৃষ্টির গাল দুটি অনলকান্ত লালিমায় রঙিন হয়ে উঠল।

রাত এগারোটার কাঁটা পেরিয়ে গেছে । সাইফ আগেই জানিয়ে গিয়েছিল যে আজ রাতে দেরি হবে তার ফেরা। তাই ব্যস্ততার কোনো ছাপ নেই দৃষ্টির মধ্যে; ধীর লয়ে, সময় নিয়ে, এক অদ্ভুত মনোযোগে তৈরি হচ্ছে সে। সবাই যার যার ঘরে আগেই চলে গেছে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দৃষ্টি নিজেকেই নতুন চোখে দেখছে। মাথা কিঞ্চিৎ একপাশে হেলিয়ে ঘুরে ঘুরে প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি রেখা পরখ করছে। আজ তার পরনে গাঢ় মেরুন রঙের এক পিনপিনে পাতলা শাড়ি। ভারী নজর কাড়ার মতো। শাড়িটা পেয়েছিল সাইফের ড্রয়ারে। অনুমান করে নিয়েছে, কোনো এক সময় হয়তো তার জন্যই কিনে রেখেছিল সাইফ। তাই আজ সাইফকে চমকে দিতে এই শাড়িটাকেই বেছে নিয়েছে দৃষ্টি।

আজকের রাতটাও বিশেষ। সাইফের জন্মদিন। দিন কয়েক আগে তার জিনিসপত্র গুছানোর সময় হঠাৎই চোখে পড়েছিল সাইফের আইডি কার্ড। তাতেই জেনেছিল আজ সাইফের ঊনত্রিশতম জন্মদিন। হঠাৎই ভ্রু কুঁচকে গুনে গুনে হিসাব কষে দেখল, সাইফ তার চেয়ে পুরো আট বছরের বড়। এই ছোট্ট ফারাকটা মনে পড়তেই প্রথমে একরাশ বিরক্তি এসে জমল তার ভেতর। ঠোঁট বাঁকিয়ে একবার ভেবে নিল, তার ভাগ্যেই নাকি এমন বুড়ো স্বামী লেখা ছিল! কিন্তু মুহূর্ত পরেই নিজেরই ভাবনায় হেসে উঠল।

আয়নার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে চোখে-মুখে ধরা দিল লাজুক দীপ্তি। নিপুণ আঙুলে তুলে নিলো ছোট্ট কাজলের কৌটা। আয়নার সামনে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে ডাগর চোখের ভাঁজে টেনে দিলো এক নিঁখুত কালো রেখা। চকচকে চোখগুলো মুহূর্তেই অন্য এক গভীরতা পেলো। এরপর তুলে নিলো মেরুন রঙের লিপস্টিক খুব হালকা, মৃদু স্পর্শে ঠোঁটের উপর ছড়িয়ে দিলো তার স্নিগ্ধ আভা। সাজগোজ এতটুকুই। দীর্ঘ কত বছর পর এই সজ্জার ছোঁয়া তার মুখে লেগেছে সে নিজেই ঠিক মনে করতে পারছে না।

শাড়ির আচল কোমরে গুঁজে ঘরের চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো। প্রতিটি কোণে, প্রতিটি টেবিলের ধার ঘেঁষে সাজিয়ে রেখেছে মোমবাতি। এখন কেবল সেগুলো জ্বালানোর অপেক্ষা। পাশে রাখা আছে কিছু লাল বেলুনও, নীলিমার কাছ থেকে ধার নিয়েছে। মেয়েটা বারবার জানতে চেয়েছিলো, কী করতে যাচ্ছে সে এগুলো দিয়ে, কিন্তু দৃষ্টি কিছুই বলেনি, শুধু এক চিলতে রহস্যময় হাসি দিয়ে এড়িয়ে গেছে।

টেবিলের মাঝখানে রাখা আছে ছোট্ট এক কেক। নিজের হাতে বানানো। কেমন হয়েছে, সেটি নিয়ে কোনো ধারণাই নেই তার। মনে পড়ে গেল অনেক বছর আগের সেই স্মৃতি, বাবার জন্মদিনে প্রথমবার কেক বানিয়েছিলো সে। অথচ তাতে চিনি দিতে ভুলে লবণ ঢেলে ফেলেছিল। তারপর কারও পক্ষে সেটি মুখে তোলা সম্ভব হয়নি। সেই তিক্ত ভুলের কথা মনে করে এবার নিজের ভেতরেই হালকা অস্বস্তি খেলে গেল। তবু এবার কোনো ভুল হয়নি, নিশ্চিত দৃষ্টি। সাইফের কেমন লাগবে এই আশঙ্কা আর প্রত্যাশার দোলাচলে বুকের ভেতর কেমন একটা কাঁপুনি জমে উঠলো।

দরজায় হঠাৎ খটখট শব্দ হতেই দৃষ্টির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশটা একবার ভালো করে দেখে নিলো। সবকিছু ঠিকঠাক, পরিকল্পনামতোই। তার পক্ষে যতটা সম্ভব কাউকে কিছু না জানিয়ে, যতটুকু নিখুঁতভাবে সাজানো যায়, সেটুকুই করেছে। তবু অজানা উত্তেজনায় বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত টান লাগছে। আয়নার দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে নিলো। শাড়ির পল্লবটা ঠিক করে চুলগুলো আলতো করে ছড়িয়ে দিলো কাঁধে। গভীর নিশ্বাস নিয়ে পা বাড়ালো দরজার দিকে, তারপর এক টানেই হাতল ঘুরিয়ে খুলে দিলো দরজা।
ঝমঝমে বৃষ্টিতে ভিজে দাঁড়িয়ে আছে সাইফ। তার কাঁধ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে, চুলের ডগা থেকে টুপটাপ ফোঁটা মেঝেতে পড়ছে। ঋতুর আবহাওয়া এখন অনিশ্চিত। মুহূর্তে পরিষ্কার আকাশ, আবার হঠাৎ ঘন কালো মেঘের জটলা, এক নিমিষেই বৃষ্টি নেমে আসে আবার মিলিয়ে যায়। সাইফ ভিজে চুলের ফোঁটা ঝাড়তে ঝাড়তে চোখ তুলে তাকালো।

বাড়ির অন্য পাশ থেকে বিদ্যুতের তীক্ষ্ণ আলো আসছে , অথচ তার ঘরে ম্লান, নরম মোমের আলোয় এক অদ্ভুত আবহ তৈরি হয়েছে। সাইফের ভ্রু কুঁচকে উঠলো। ধীর, পরিমিত পায়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখ থেমে গেল বিস্ময়ে। চারপাশের দেয়ালে নাচছে মোমবাতির আলোছায়া, পুরো ঘরটা টইটম্বুর আলোয় জ্বলজ্বল করছে। ঘরের মাঝখানে পাতানো ম্যাটের উপর ছোট্ট এক টুলে রাখা মাঝারি আকারের কেক। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অসংখ্য লাল বেলুন।
হঠাৎই সাইফ অনুভব করলো তার একেবারে কানের পাশে উষ্ণ শ্বাসের ছোঁয়া। ঝড়ে দুলে থাকা পাতার মতো ভিজে শরীর কেঁপে উঠলো হালকা । দৃষ্টি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো, মুখটা সাইফের কাছে ঝুঁকিয়ে আনলো। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে নিখুঁত মৃদু স্বরে ফিসফিসিয়ে বললো,

– শুভ জন্মদিন, শেখ সাহেব!
দৃষ্টি সরে যেতেই সাইফ মাথা ঘুরিয়ে তাকালো তার দিকে। মুহূর্তে বুকের ভেতরটা কেমন হঠাৎ শূন্য হয়ে এলো, কয়েকটা হৃদস্পন্দন থেমে গেলো এক নিমেষে। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক মায়াময়ী অপ্সরা, মেরুন রঙের পিনপিনে শাড়িতে মোড়ানো পরী। ঝরে পড়া মোমবাতির আলো তার গাত্রবর্ণে ছায়া-আলো খেলা করছে, তাতে দৃষ্টির রূপটাকে আরও অলৌকিক করে তুলেছে।

সাইফের ঠোঁট কেঁপে উঠলো বিস্ময়ে। কাজলমাখা লম্বাটে চোখের গভীরতা অব্যক্ত ভাষায় কিছু বলছে। দৃষ্টি ড্যাবড্যাব চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেই চাহনির তীব্রতা সাইফের বুকের ভেতর অদ্ভুত কাঁপন তুলছে। ধীরে ধীরে সাইফ এগিয়ে গেলো। পাশের টেবিল থেকে একটা মোমবাতি তুলে নিয়ে আলোটা দৃষ্টির মুখের কাছে ধরলো। আরও একটু কাছে থেকে দেখতে চাইলো তার সোনাবউকে। মোমের ক্ষীণ আলোয় ফুটে উঠলো দৃষ্টির গালের লালিমা, নরম ঠোঁটের প্রান্তে জমে থাকা স্নিগ্ধ কাঁপুনি। দৃষ্টি আস্তে ফিসফিস করে বলে উঠলো,

– কি হলো… পছন্দ হয়নি আপনার?
কথাগুলো কানে আসতেই সাইফের শরীরের ভেতর দিয়ে বিদ্যুতের শিরশিরে স্রোত বয়ে গেল। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। ভেতরে ভেতরে নিজেকে উন্মাদ মনে হচ্ছে তার। বাইরে এখনও ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে, সেই শব্দের সাথে মিশে আছে সাইফের বুকের ভেতরের তীব্র স্পন্দন। ভিজে শরীর থেকে টুপটুপ করে জল গড়িয়ে মেঝেতে জমছে কিন্তু সাইফের মন এখন অন্য এক উন্মাদনায় দুলছে। আরও এক কদম এগিয়ে যেতেই দৃষ্টি হাত বাড়িয়ে থামিয়ে দিলো তাকে। চোখে-মুখে লাজুক গাম্ভীর্যের ছাপ, কণ্ঠে অদ্ভুত দৃঢ়তা,
– ভিজে জামাকাপড় পালটে আসুন… তারপর আমরা কেক কাটবো।
শব্দগুলো বলেই সাইফের হাতে থাকা মোমবাতিটা নিভিয়ে দিয়ে জোর করেই তাকে ওয়াশরুমের দিকে ঠেলে পাঠিয়ে দিলো। সাইফ কোনো প্রতিবাদ করলো না শুধু দৃষ্টির চোখের সেই অদ্ভুত আলোটা বুকের গভীরে জমিয়ে রেখে ভিজে পায়ের ছাপ ফেলতে ফেলতে এগিয়ে গেল ধীরে।

কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে ধূসর টিশার্ট আর কালো ট্রাউজার পরে বেরিয়ে এলো সাইফ। ভেজা চুলের ফোঁটাগুলো এখনো কপালে গড়িয়ে পড়ছে। দরজা ঠেলে বেরিয়ে এসেই থমকে গেলো। ঘরের মাঝখানে, ছোট্ট টুলে রাখা কেকের সামনে বসে মোমবাতি জ্বালাচ্ছে দৃষ্টি। ক্ষুদ্র শিখার আলোতে তার মুখের অর্ধেক আলোকিত, অর্ধেক গোপন।
সাইফকে দেখতে পেয়েই রমনী একবার তাকিয়ে হেসে ইশারায় তাড়াতাড়ি আসতে বললো। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো, প্রতিটা পদক্ষেপে মনে হচ্ছে, সে হয়তো স্বপ্নে হাঁটছে। তার কাছে এখন সবকিছু অবিশ্বাস্য লাগছে, অপ্রত্যাশিত, অথচ অবিরাম মোহময়। মনে হচ্ছে, ঘুম ভেঙে গেলেই সব হয়তো আবার আগের মতো নিস্তরঙ্গ হয়ে যাবে। দৃষ্টির এই হঠাৎ পরিবর্তনের রহস্যটাও তার মাথায় ধরছে না।
দৃষ্টি কেকের পাশ থেকে একটা ছুরি তুলে সাইফের হাতে ধরিয়ে দিলো। মোমবাতির দপদপে আলোয় সাইফের চোখে প্রতিফলিত হলো। দৃষ্টি ধীরে স্বরে বললো,

– কেকটা কাটুন।
সাইফ কোনো কথা বললো না, শুধু মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো। এক নিঃশ্বাসে মোমবাতিগুলো নিভিয়ে দিলো সে, তারপর সাবধানে ছুরিটা চালিয়ে কেকটা কেটে ফেললো। দৃষ্টি মৃদুস্বরে বলে উঠলো,
– হ্যাপি বার্থডে, শেখ সাহেব।
শব্দগুলো বাতাসে ভেসে সাইফের বুকের ভেতর সরাসরি আঘাত করলো। তার চাহনি এখনো আটকে আছে দৃষ্টির মুখে। কতটা অপলক তাকিয়ে আছে সে কেউ না দেখলে বিশ্বাস করবে না। এক বিন্দু পলকও ফেলার শক্তি নেই যেন তার। অথচ মেয়েটার মুখে কোনো লাজুক কাঁপন নেই, নেই কোনো দ্বিধা। অদ্ভুত দৃঢ়তা খেলা করছে তার চোখে। দৃষ্টি হাত বাড়িয়ে ছোট্ট এক টুকরো কেক তুলে নিলো হাতে। সাইফের দিকে বাড়িয়ে দিলো তা,

– খেয়ে দেখুন কেমন হয়েছে। দ্বিতীয়বার বানিয়েছি। প্রথমবার তো এমন বাজে হয়েছিল… কেউ খেতেই পারেনি জানেন?
সাইফ চোখ না সরিয়েই কেকটা মুখে তুলে নিলো। স্বাদটা সে বুঝলো কিনা, সেটা তার নিজেরও জানা নেই। তার সমস্ত মনোযোগ আটকে আছে কেবল তার সোনাবউয়ের গাল, চোখ, ঠোঁটের সূক্ষ্ম কাঁপনে। দৃষ্টি এবার হা করে তাকিয়ে আছে তার উত্তরের অপেক্ষায়।
– বলুন না… কেমন হয়েছে? ভালো হয়নি তাই না?
সাইফের কণ্ঠস্বর এলো অত্যন্ত নীচু, প্রায় ফিসফিসের মতো,

– মনে হলো… অমৃত খেলাম।
সেই কথাটুকু বলতে গিয়েও বোঝা যাচ্ছিল, সাইফ পুরোপুরি হুশে নেই। দৃষ্টি নিজের হাতে সাইফকে খাইয়ে দেওয়া কেকের বাকি টুকরোটা এবার নিজের মুখে তুলে নিলো । চোখ উল্টিয়ে স্বাদটা বোঝার চেষ্টা করলো। না, খারাপ হয়নি। আবার সাইফের বলা মতো অমৃত ও নয়।
দৃষ্টি কেকটা সরিয়ে একপাশে রাখলো। মাঝঘরে বিছানো ছোট্ট ম্যাটের উপর বসেছে তারা দুজন। চারপাশে দপদপে মোমের আলোয় ঘরটা এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। ধোঁয়ার হালকা গন্ধ মিশে আছে মিষ্টি সুগন্ধির সাথে। সাইফ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ, তারপর হঠাৎ নীচু স্বরে বলে উঠলো,

– আপনার শরীর ঠিক আছে তো, বউ? আপনি এমন করছেন কেনো? এগুলো তো আপনার স্বভাবের সাথে যায় না।
প্রশ্নটা শুনে দৃষ্টি মৃদু হেসে ফেললো। আজকের রাতে লজ্জা তাকে যেন ছুঁয়েই দেখছে না। নিজের ভেতর এক সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে আছে সে। হয়তো এই প্রথমবারের মতো, নিজের ভেতরের সব দ্বিধা সরিয়ে রাখতে চাচ্ছে।সাইফের দিকে আরও একচুল এগিয়ে এলো দৃষ্টি। চোখের কোণে জমে থাকা স্নিগ্ধতা এবার এক অদ্ভুত দৃঢ়তায় রূপ নিলো। তার স্বভাবে না থাকলেও আজ ইচ্ছে করছে এই মানুষটার প্রতি নিজের অনুভূতিটুকু উজাড় করে দিতে। হয়তো কারণটা খুব সোজা, আজ সাইফের দিন। তার জীবনের একটা বিশেষ দিন। আর বিশেষ দিনে লোকটারও প্রাপ্য কিছু বিশেষ অনুভব। সাইফের গা ঘেঁষে বসল সে। স্নিগ্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

– বলুন তো, উপহার হিসেবে কি চাই আপনার?
– আপনার ভালোবাসা।
সাইফের উত্তর আসলো বিন্দুমাত্র দেরি না করে। কথাটা শুনেই দৃষ্টি হালকা হাসলো। ধীর লয়ে মাথা দুলিয়ে মৃদুস্বরে বললো,
– উমম… তা তো দিবোই। এটা ছাড়া আর কি চাই?
এই এক মুহূর্তে, মোমের আলোয় তাদের দুজনের চোখের গভীরে হাজার অপ্রকাশিত অনুভূতি একসাথে খেলে গেলো। ঘরের বাইরে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ, আর ভেতরে জমাট বাঁধা এক নীরব স্রোত। কথার চেয়ে অনেক বেশি কিছুই বলে যাচ্ছিল বোধহয়। সাইফ এবার দৃষ্টির আরও কাছে এলো। তাদের মাঝে কেবল এক নিঃশ্বাসের ফাঁক। সাইফের ভেজা শরীর থেকে বের হওয়া কাঁচা গরম নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে দৃষ্টির চোখে-মুখে।
– ভালোবাসা দিলেই হবে… আর কিছু চাই না আপনার থেকে।
নিমগ্ন স্বরে বলে উঠলো সাইফ। দৃষ্টি ঠোঁটের কোণে একটুখানি রহস্যময় হাসি টেনে নিলো। খুব নরম কণ্ঠে ফিসফিস করে উত্তর দিলো,

– কিছু তো চাইতেই হবে।
এবার নীরবতা ভেঙে এলো সাইফের আকুল স্বর,
– তাহলে… একটা পুতুল চাই। ছোট্ট পুতুল।রক্তে-মাংসে গড়া। ক্ষুদ্র হাত-পা, গোলাপি ঠোঁট… আপনার মতোই নরম ফুলকো ফুলকো গাল। ডাগর ডাগর চোখের সেই পুতুলটা চাই আমার। দেবেন?
কথাগুলো শোনার পর দৃষ্টির বুকের ভেতর ধকধক শব্দ তীব্র হয়ে উঠলো। রাজ্যের সব লজ্জা একসাথে এসে ভিড় করলো তার মুখে। চোখ নামিয়ে ফেললো, গালজোড়া লালচে হয়ে উঠলো অনায়াসেই। অস্থির হাতে আঁচল মুঠো করে বসে রইলো। সাইফ এবার আর ধৈর্য ধরতে পারলো না। দৃষ্টির কোমর জড়িয়ে নিজের আরও কাছে টেনে নিলো। গলা নামিয়ে, দৃষ্টির কানের পাশে গরম নিশ্বাস ছুঁইয়ে বললো,

– দিবেন না?
দৃষ্টি প্রথমে কেঁপে উঠলো। তারপর ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকালো সাইফের দিকে। সাইফের চোখে যে আকুলতা, তা পৃথিবীর কোনো ভাষায় মাপা যাবে না। সাইফের সেই চাওয়ায় এক আশ্চর্য মরিয়া আবেগ লুকিয়ে আছে। দৃষ্টির চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দু’ফোঁটা অশ্রু। ঠোঁট কাঁপছে, বুকের ভেতর অস্থিরতা জমে আছে, কণ্ঠস্বরটা খুবই মৃদু, প্রায় ফিসফিস,
– দিবো…
শব্দটা শোনামাত্র সাইফের মুখে এক রাজ্যের হাসি ফুটে উঠলো । দু’হাতে দৃষ্টির হাত শক্ত করে ধরলো, তারপর বেপরোয়া পাগলামিতে তার হাতের উপর, আঙুলের উপর একের পর এক চুমু এঁকে যেতে লাগলো। চোখ বেয়ে নেমে এলো অশ্রুবিন্দু। এত বছরের সাধনা, এত বছরের প্রার্থনা আজ তার পরিণতি!
দৃষ্টি স্থির তাকিয়ে আছে সাইফের দিকে। সাইফও মুখ তুলে তাকালো দৃষ্টির দিকে। তার চোখ এখন টকটকে লাল। প্রবল, অপ্রতিরোধ্য, আর সম্পূর্ণভাবে দৃষ্টি-মগ্ন।সাইফ দৃষ্টির একেবারে সামনে এসে থমকালো । চোখদুটি লালচে, দম নিতে কষ্ট হচ্ছে যেন, বুকের ভেতর এক দাউদাউ জ্বালা। ব্যাকুল কণ্ঠে, ভাঙা নিশ্বাসে সে ফিসফিস করে বলে উঠলো,

– আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, বউ… বুকের ভিতর দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। আপনাকে চাই। পুরোপুরি আমার করে চাই। অনুমতি দেবেন…?
একটা দীর্ঘ নীরবতা। তারপর দৃষ্টি বুকের ভেতর জমে থাকা সব দ্বিধা একপাশে সরিয়ে নিলো । ধীরে, খুব ধীরে দু’হাত মেলে ধরলো সাইফের দিকে, এক ভালোবাসা-পূর্ণ আলিঙ্গনের আহ্বান জানালো। এবার আর সাইফ নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না। উন্মাদ প্রেমিকের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো প্রেয়সীর বুকে।
তার ঠোঁটজোড়া দৃষ্টির ঠোঁট আঁকড়ে নিলো । ধীরে ধীরে সেই স্পর্শ নামতে লাগলো কণ্ঠমণি থেকে গ্রীবার বাঁক বেয়ে আরও নিচে । সাইফের দু’হাত অবাধ্য হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে দৃষ্টির শরীরের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি স্পর্শে জমা হচ্ছে অজানা এক বিদ্যুৎপ্রবাহ।

দৃষ্টির শরীর থরথর করে কেঁপে উঠছে। বুকের ভেতর দ্রুত ওঠানামা করছে নিশ্বাস। হাত শক্ত করে চেপে ধরেছে সাইফের জামা, এই অনিশ্চিত আবেগের স্রোতে নিজেকে সামলাতে চাইছে। দৃষ্টি হঠাৎ করেই ডুকরে কেঁদে উঠলো। বুকের গভীর থেকে জমে থাকা এক চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। সাইফ থমকে গেলো। তার দু’হাত মাঝপথে থেমে গেলো। হতবাক হয়ে তাকালো দৃষ্টির দিকে।
– কি হলো বউ? কাঁদছেন কেন? …আপনি… আপনি কি এখনো প্রস্তুত নন?
ব্যাকুল কণ্ঠে, কাঁপা শ্বাসে জিজ্ঞেস করলো সাইফ।

কিন্তু দৃষ্টি তার দিকে তাকিয়েই আরও জোরে কেঁদে উঠলো। চোখের জল ঝরে পড়ছে অবিরাম, বৃষ্টির স্রোতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। নিজেকে আর সামলাতে না পেরে দৌড়ে চলে এলো বারান্দায়।
আকাশজোড়া বজ্রধ্বনি, গর্জে নামছে অঝোর বৃষ্টি।
দৃষ্টি দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ, তারপর নিজের শরীর ছেড়ে দিলো বৃষ্টির উন্মত্ত ঝরে। মুহূর্তের মধ্যেই পাতলা, পিনপিনে মেরুন শাড়িটা ভিজে গিয়ে আঁকড়ে ধরলো তার দেহের প্রতিটি বাঁক। হঠাৎই ধপ করে বসে পড়লো বারান্দার ঠান্ডা মেঝেতে। কোলের ভেতর মুখ লুকিয়ে জোরে জোরে কাঁদতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর সাইফ এসে দাঁড়ালো তার পেছনে। বৃষ্টিতে ভেজা দৃষ্টিকে দেখে আলতো করে পাশে বসলো। কণ্ঠে একরাশ কোমলতা মিশিয়ে বললো,

– ঘরে চলুন বউ। আপনার ঠান্ডা লেগে যাবে।
কিন্তু দৃষ্টি শুনলো না। ঝড়ের বেগে হাত বাড়িয়ে সাইফের গলার কাছে আঁকড়ে ধরলো তার টিশার্ট। ভাঙা কণ্ঠে, কাঁদতে কাঁদতেই বলে উঠলো,
– আমার শরীরের এমন কোনো জায়গা নেই, শেখ সাহেব… যেখানে সেই জানোয়ারগুলো হাত দেয়নি! এই দেখুন… আমার হাত… আমার গলা… আমার পেট… কোনো জায়গা বাদ নেই। শরীরের প্রতিটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জায়গায় তাদের অভিশপ্ত ছোঁয়া লেগে আছে। একটা লোম পরিমাণ পবিত্র জায়গা… একটা টুকরো দাগহীন অংশও… আমি আপনার জন্য রাখতে পারিনি…
দৃষ্টির করুণ আর্তনাদে সাইফের চোখ বেয়ে নামলো অশ্রুর ধারা। বৃষ্টির অবিরাম ঝরে সেই চোখের জলের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেলো। সাইফ হাত বাড়িয়ে টেনে নিলো দৃষ্টিকে নিজের বুকে। বৃষ্টিতে কাঁপা, শীতল দেহটা জড়িয়ে নিলো এক অব্যক্ত আশ্রয়ে। কপালে কপাল ঠেকিয়ে সান্ত্বনা দিতে চাইলো। বুকের ভিতর থেকেই হাহাকার করে উঠলো দৃষ্টি।

– আমি… আমি অপবিত্র, শেখ সাহেব। আপনার স্পর্শ আমার জন্য নয়। আপনাকে আপনার প্রাপ্য ভালোবাসা… কখনোই দিতে পারবো না আমি। এই অভিশপ্ত অপরাধবোধ আমায় সারা জীবন… পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। আমি পারবো না, শেখ সাহেব… আমি পারবো না…
সাইফ স্থির। চোখে তীব্র যন্ত্রণা, অব্যক্ত ক্ষোভ, অসীম ভালোবাসা। পরের মুহূর্তেই শক্ত হাতে দৃষ্টির মুখ নিজের দিকে ফিরিয়ে নিলো। কোনো পূর্বাভাস, কোনো অনুমতি ছাড়াই আকড়ে ধরলো তার ঠোঁটজোড়া।গভীর, তীব্র, অশ্রুভেজা চুমুতে ভরিয়ে দিলো। দীর্ঘ কয়েক মুহূর্ত পর সাইফ ঠোঁট সরিয়ে কপালে কপাল ঠেকালো।

– এই যে দেখুন… এই বৃষ্টির পানিতে,আপনার উপর লেগে থাকা সব অপবিত্র ছোঁয়া ধুয়ে গেছে, বউ। আমার চোখে আপনি এখনো নিষ্পাপ, সেই প্রথম দিনের মতোই পবিত্র। আমার কাছে… আপনি একটা শুভ্র, সুগন্ধিযুক্ত গোলাপ, যাকে প্রথম স্পর্শ কেবল আমিই করেছি… আমিই করবো… আমিই করে যাবো…!!
দৃষ্টি ভেজা চোখে তাকিয়ে রইল সাইফের দিকে। অশ্রুসিক্ত পাপড়ির আড়াল ভেদ করে চাহনি অস্পষ্ট হয়ে আসছে, তবুও সাইফের দৃঢ় চোখদুটো অনড়। সাইফ এগিয়ে এসে পাজাকোলে তুলে নিল তাকে, তার মৃদু কাঁপুনি বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখে পা বাড়ালো ঘরের অভ্যন্তরে। বিছানার প্রান্তে পৌঁছেই সাইফ দৃষ্টিকে সাবধানে শুইয়ে দিল।
এক হেচকা টানে দৃষ্টির পরনের শাড়ি সরিয়ে দিলো শরীর থেকে। মোমের আলোয় উদ্ভাসিত ফর্সা ত্বক রুপালি দীপ্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে চারপাশে । নিজের গায়ের টিশার্টটা ধীরে খুলে ফেলল সাইফ। দৃষ্টির কান্না ক্রমশ থেমে আসছে, বিভ্রান্ত চোখদুটো সাইফের মুখে নিবদ্ধ হয়ে আছে। কী ঘটছে সে বুঝতে পারছে না, কিন্তু সাইফের প্রতিটি স্পর্শে শরীরের প্রতিটি স্নায়ু সাড়া দিয়ে উঠছে ।

সাইফের ঠোঁট এলো একে একে দৃষ্টির দেহের প্রতিটি অনাবৃত প্রান্তে। হাত, মুখ, গলা, কাঁধ, পেট কোনওখানেই বিরাম নেই। প্রত্যেকটা ছোঁয়ায় এক অদ্ভুত দাবদাহ । দৃষ্টির গলার কাছে মুখ এনে সাইফ থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য। গলার কাছে তার উষ্ণ নিঃশ্বাস দোল খেয়ে ফিরল। মৃদু ফিসফিসে কণ্ঠে সাইফ বলল,
– আপনার শরীরের প্রতিটি লোমকূপে কেবল আমার ছোঁয়া থাকবে, সোনাবউ। এমন মমতা, এমন আদর, এমন ভালবাসা দেব আপনাকে… যে বিভীষিকাময় রাতটা আপনি ভুলে যাবেন একেবারে। যেখানে হাত বুলাবেন, সেখানেই শুধু আমার স্পর্শ অনুভব হবে।

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৫

দৃষ্টির চোখের কোণ বেয়ে অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে নামল বালিশে। সাইফ তার সেই অশ্রু ঠোঁট দিয়ে শুষে নিল স্নিগ্ধ কোমলতায়। তারপর চোখের ভেতর চোখ রেখে ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করল,
– এই কান্না… আজ থেকে কেবল সুখের হওয়া চাই…

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৭