বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৫
রানী আমিনা
মীর পোশাক পরিবর্তন করে মাত্রই একটি সিগারেট ধরালো। বাহিরের প্যান্টটি পরণে এখনো, খোলার সময় বা ইচ্ছা কোনোটাই এই মুহুর্তে নেই তার। দরজা খোলার জোরালো শব্দে প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে তাকালো সে একবার। আনাবিয়াকে দেখামাত্রই তীব্র ক্ষোভে ফিরিয়ে নিলো চোখ, ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত হয়ে উঠলো মুহুর্তেই। সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে ড্রয়ার খুলে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস গুলো বের করতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো, যেন আনাবিয়াকে দেখেইনি!
শরীর পাতলা হয়েছে তার বেশ, চোয়ালদ্বয় ক্ষুরধার দেখাচ্ছে। চোখ জোড়া কিঞ্চিৎ দেবে গেছে ভেতরে। বিগত সপ্তাহটির অনাহার, অনিয়ম, অযত্ন প্রকট হয়ে উঠেছে তার দেহে। ঠোঁটের সিগারেটটি চোখে পড়লো আনাবিয়ার, এই অভ্যাস কবে থেকে হলো তার আবার? এ অভ্যাস তো তার কখনোই ছিলো না! নেশাদ্রব্যের প্রতি যা ঝোঁক ছিলো তা অনেক আগেই, আনাবিয়ার জন্মের পর সকল খারাপ অভ্যাসই সে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছিলো প্রায়! তবে আবার কেন?
কয়েক কদম এগিয়ে এলো আনাবিয়া, দরজার পাল্লা জোড়া বন্ধ হলো আপনিই। গলা খাকারি দিয়ে কিঞ্চিৎ শক্ত গলায় প্রশ্ন করলো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“এ অভ্যাস কবে থেকে হয়েছে আপনার?”
মীরের ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত হলো আরও, কিন্তু দৃষ্টি গেলোনা আনাবিয়ার দিকে, ভাটাও পড়লো না তার কাজে। নির্বিকার চিত্তে চেয়ার টেনে বসে পড়লো টেবিলের সামনে। মনোযোগী চোখে কাগজ পত্রের দিকে তাকিয়ে রইলো। আনাবিয়ার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না তিল পরিমাণ!
অপমানিত বোধ করলো আনাবিয়া, কিন্তু দমে গেলো না। ক্ষণিক উত্তরের অপেক্ষায় চুপ থেকে এগিয়ে এলো আরও, এগোতে এগোতেই প্রশ্ন করলো,
“এতগুলো দিন কোথায় ছিলেন?”
এবারও উত্তর এলোনা কোনো, মীরের সামান্যতম ভ্রুক্ষেপও হলোনা যেন! আনাবিয়া অধৈর্য হয়ে উঠলো, আরেকটু এগিয়ে প্রায় টেবিলের কাছাকাছি এসে জিজ্ঞেস করলো,
“ওদেরকে বাদ দিচ্ছেন কেন? কোনো অপরাধ করে থাকলে আমি করেছি, বা ওরা ভুল করলেও আমার ইনফ্লুয়েন্সে করেছে। তবে আপনি ওদেরকে কেন শাস্তি দিতে চান?”
মীর দ্রুত হাতে লিখছিলো কিছু, আনাবিয়ার প্রশ্নে হাত থামলো তার। সংবাদ তবে এই পর্যন্ত পৌঁছে গেছে!
চোয়াল শক্ত হলো তার, আবারও হাত চালিয়ে লেখা শুরু করে চোখ না উঠিয়েই কঠিন, গমগমে স্বরে বলে উঠলো,
“দ্যাটস নান অব ইয়োর বিজনেস৷”
এমন দায়সারা জবাবে ক্ষুব্ধ হলো আনাবিয়া, একটু জোর গলাতেই সে প্রশ্ন করলো,
“ওহ আচ্ছা! আপনার এমন সিদ্ধান্তের কারণটা জানান দয়া করে! এতদিন যাদের ওপর চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস রেখেছেন সেই বিশ্বস্ত দেহরক্ষীদের অব্যহতি দিয়ে আপনি কোন বিশ্বাসযোগ্য মহাপুরুষকে আপনার পাশে রাখতে চান?”
মীরের হাত থামলো আবারও, সরাসরি চোখ তুলে তাকালো সে এবার৷ তার প্রখর, ক্রোধিত চাহনি দেখে ভড়কালো আনাবিয়া, এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেলো তার শিরদাঁড়া বেয়ে! তবুও মুখের ওপর সাহসের মুখোশটুকু ধরে রইলো, ঢোক গিললো সন্তর্পণে। সেই মুহুর্তেই তীব্র বেগে ভেসে এলো মীরের কড়া স্বর,
“আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে পালটা প্রশ্ন তোলার স্পর্ধা কবে থেকে হয়েছে তোমার?”
বিরতিহীন কঠোর চোখে চেয়ে থেকে এবার পূর্বের চেয়েও গুরুগম্ভীর, আক্রোশ পূর্ণ গলায় বলে উঠলো,
“মাত্রাতিরিক্ত সাহস দেখিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনবেনা, স্ট্যে ইন ইয়োর লিমিট! এবং অনুমতি ব্যাতিত আমার কামরায় প্রবেশের দুঃসাহস দেখাবেনা আর কখনো, বেরিয়ে যাও!”
মীর আবারও দৃষ্টি দিলো সম্মুখের কাগজপত্রের দিকে, মাত্রাতিরিক্ত বিক্ষিপ্ত মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলো প্রাণপণে! আনাবিয়া ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো, মীরের কঠোর স্বর রোধ করতে চাইলো তার কন্ঠ! ক্ষোভ মেশানো অস্থির গলায় সে শুধোলো,
“বেরিয়ে কোথায় যাবো আমি? আমাকে কোথাও যেতে দেন আপনি?”
“এখন দিচ্ছি৷
ইউ আর ফ্রি টু গো হয়ারেভার ইউ লাইক, উইদ হুয়েভার ইউ চ্যুজ! যেখানে গেলে, যার কাছে গেলে তুমি হ্যাপি থাকবে, যে তোমাকে খুশি রাখতে পারবে তুমি তার কাছে যাও, দেয়ার ইজ নো রেস্ট্রিকশন!
জাস্ট এখানে এসোনা!”
তীব্র আক্রোশের সাথে বলল মীর। আনাবিয়া স্থির হয়ে রইলো, মীরের কথা গুলোকে বোঝার চেষ্টা করলো সম্পুর্ন মস্তিষ্ক দিয়ে। মীর নিজের ক্রোধ দমনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে দাঁতে দাঁত চেপে কাগজ পত্রের দিকে দৃষ্টি দিলো আবারও, নিজের ওপর জোর খাটিয়ে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করলো লেখা গুলোয়।
আনাবিয়া চোখ বন্ধ করে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে সশব্দে ছাড়লো আবার, যেন ভেতরের ক্ষোভের বহরকে শ্বাসের সাথে মুক্ত করে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা! ক্ষণিক চুপ থেকে নিজের জোরালো কন্ঠকে যথাসম্ভব স্তিমিত করে নরম সরে জিজ্ঞেস করলো,
“ক্ষিদে পেয়েছে আপনার? মহসিনকে খাবার দিতে বলবো?”
মীরের ঠোঁটের কোণ বড়ই তুচ্ছতার সাথে বাঁকালো, যেন বিরাট উপহাস করলো তাকে কেউ! আনাবিয়ার প্রশ্ন তার কাছে কৌতুকের মতো শোনালো। নির্বিকার, অনুভূতিহীন স্বরে উত্তর দিলো,
“ক্ষিদে নেই। প্রয়োজন পড়লে নিজেই ব্যাবস্থা করে নিবো। তুমি আমাকে নিয়ে মাথা না ঘামালে খুশি হবো। নিজেকে নিয়ে ভাবো; কি করলে, কার সঙ্গ পেলে খুশি হবে সেগুলো নিয়ে মাথা ঘামাও। আমাকে বিরক্ত কোরোনা।”
মীরের এমন অবহেলাপূর্ণ নির্লিপ্ত উত্তর একদমই ভালো লাগলোনা আনাবিয়ার, বারবার চেপে রাখা রাগটা উঠে আসতে চাইলো কুন্ডুলি পাকিয়ে। এই ক’দিন মীরের অনুপস্থিতিতে তার ওপর দিয়ে ঠিক কি গেছে সেটা কি মীর কখনো বুঝতে পারবে নাকি চেষ্টা করবে বোঝার? এমন আজগুবি ব্যাবহারের কি হেতু সেটা জানতে চাওয়া কি তার অপরাধ? এমন ব্যাবহার কি তার প্রাপ্য?
“আপনি এমন আচরণ কেন করছেন আমার সাথে? এসব আজেবাজে কথা কেন বলছেন? কার সঙ্গ পেলে খুশি হবো, কার কাছে গেলে হ্যাপি থাকবো— এসব কুৎসিত প্রশ্ন তোলার মানে কি? আমি কি অপরাধ করেছি?”
ক্ষোভের সাথে প্রশ্ন গুলো করে উত্তরের অপেক্ষায় রইলো আনাবিয়া। কিন্তু মীর কাজে পূর্ণ মনোযোগী, আনাবিয়া নামক মানবীটির উপস্থিতি যেন সে অনুভব করতে চাইছে না কোনো ভাবেই! কপালে ভাজ ফেলে টেবিলের অপর পাশ থেকে ল্যাপটপ নিয়ে মেলে ধরলো সামনে। সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে একমনে তাকিয়ে রইলো স্ক্রিনের দিকে।
সীমা ছাড়ালো আনাবিয়ার ক্রোধ! দাঁতে দাঁত পিষে বলে উঠলো,
“সিগারেট ফেলুন।”
বাক্যটি সম্পুর্ন অগ্রাহ্য করলো মীর। অর্থহীন কোলাহলের মতো যেন কর্ণগোচরই হয়নি কিছু এমন ভাবে দ্বিতীয় বার সিগারেট টেনে ধোঁয়া ছাড়লো সে।
এই নিরব উপেক্ষা যেন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিলো আনাবিয়ার! ঝড়ের বেগে এগিয়ে গিয়ে ক্ষিপ্র বেগে সিগারেটটি মীরের অধর হতে ছিনিয়ে নিয়ে ছুড়ে ফেললো মেঝেতে। প্রচন্ড অপমানে, ভীষণ ক্রোধে রক্ত বর্ণ ধারণ করলো তার শুভ্র মুখশ্রী!
মীরের মেজাজ সপ্তমে চড়লো মুহুর্তেই, বিদ্যুৎ বেগে বসা থেকে উঠে আনাবিয়ার গলা চেপে মুহুর্তেই ঠেলে নিয়ে গেলো দেয়ালের ওপর, শক্ত দেয়ালে সজোরে ধাক্কা খেয়ে অস্ফুটে আর্তনাদ করে উঠলো আনাবিয়া! মীর তখনো গলা চেপে ধরে রইলো ওর! মুখের ওপর মুখ নিয়ে হিংস্র, শকুনি চোখে চেয়ে দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে বলল,
“আমাকে খারাপ হতে বাধ্য কোরোনা! ইউ হ্যাভ নো রাইট টু স্যে হোয়াট আই শ্যুড ডু অর নট! ডিভোর্স চাইতে না? দিবো তোমাকে ডিভোর্স। আমাকে ডিভোর্স দিয়ে কাকে বিয়ে করতে চাও? ফারিশকে? নাকি ব্রায়ানকে?
ব্রায়ানের বয়স কত হলো? থার্টি ফাইভ? বিয়ে শাদি করেনিতো এখনো! তোমার বিরহে, তাইনা? ওকেই করো বিয়ে, এখনো তোমাকে ইনাফ প্লেজার দিতে পারবে। ওটা অকেজো হলে ফারিশকে বিয়ে কোরো, জোয়ান থাকবে সে তখনো। তারপর সে মরলে তোমার জন্য নতুন কারো ব্যাবস্থা করবো, চিন্তা কোরোনা।”
আনাবিয়া স্তব্ধ হয়ে গেলো, মীরের কথা গুলো মস্তিষ্কে ভালোভাবেই পৌছোতেই বিস্ময়ে, ঘৃণায় কেঁপে উঠলো সে। ক্রোধে, লজ্জায়, অপমানে চোখের কোণা বেয়ে টুপটুপিয়ে পড়লো লোনা জল। কিয়ৎক্ষণ মুখ কোনো কথা জোগালো না ওর, মীর যে সবই জেনেছে, সবই স্মরণে এসেছে তার, বুঝতে বাকি রইলো না আর!
মীরের দৃষ্টিতে তখন হিংস্রতা, যন্ত্রণার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ! অপলক, ব্যাকুল চোখে সে চেয়ে রইলো আনাবিয়ার রক্তলাল ঠোঁটের দিকে। তেরো বছরের দীর্ঘ প্রতিক্ষা, চুম্বনের প্রচন্ড আকাঙ্খা, প্রবল তৃষ্ণা মিটিয়ে নিতে ছটফটিয়ে উঠলো সে, হাহাকার শুরু হলো তার বক্ষপিঞ্জরে! কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারালো না সে, চরম আত্মসংযমে চোয়াল দ্বয় শক্ত করে নিজের অদম্য কামনা, বাসনা, তৃষ্ণাকে পাথর চাপা দিলো মুহুর্তেই!
আনাবিয়ার ঠোঁট জোড়া নড়ে উঠলো তখুনি, অবিশ্বাস্য গলায় সে ক্রোধভরে বলে উঠলো,
“স্ত্রী হই আমি তোমার! কিভাবে বলতে পারলে তুমি আমাকে ওসব কথা? তোমার কি এতটুকু বাধলো না? সবাইকে কি তুমি নিজের মতোন বিশ্বাসঘাতক মনে করো? যে মন চাইলো আর শরীরের জ্বালা মেটাতে যার তার সাথে শুয়ে পড়লাম!”
আনাবিয়ার বাক্যবাণে শক্ত হলো মীরের হাতের মুঠি, আনাবিয়ার মোলায়েম গলায় চাপ পড়লো আরও জোর! গর্জানো স্বরে সে বলল,
“খবরদার মিথ্যা অপবাদ দিবে না আমাকে, নইলে তোমার জিভ টেনে ছিড়ে ফেলবো আমি! বেরিয়ে যাও কামরা থেকে! আর কখনো আমার সামনে আসবে না! ভুলেও আর কখনো আমার ওপর কোনো ধরণের অধিকারবোধ ফলাতে আসবে না, ইটস ইয়োর লাস্ট ওয়ার্নিং! নাও গেট লস্ট!”
বলেই আনাবিয়াকে ঝটিতি ছেড়ে দিলো সে, ক্রোধে শ্বাস পড়তে রইলো তার ভীষণ জোরে! আনাবিয়ার দিকে শকুনি চোখে কিয়ৎক্ষণ চেয়ে থেকে বড় বড় ভারী পা ফেলে সশব্দে ব্যালকনির দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো কামরা থেকে।
আনাবিয়া ক্ষণিক স্থীর, হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে অতঃপর চোখ মুছে জোরালো পায়ে বেরিয়ে এলো বাইরে।
ট্রলি ব্যাগে দ্রুত হাতে এলোমেলো পোশাক ভরতে ভরতে থমথমে মুখে বিড়বিড়িয়ে আনাবিয়া বলতে রইলো,
“গেট লস্ট! আমাকে বলে গেট লস্ট! হবো আমি গেট লস্ট! তারপর খুঁজতে আসিস আমাকে, খুন করে ফেলবো একদম! তখন তোর গেট লস্ট কোথা দিয়ে বের হয় আমিও দেখবো। আমাকে গেট লস্ট বলার শাস্তি তুই পাবি এবার! সারাজীবনে যা করিনি এবার তাই করবো দেখিস তুই, পারলে ঠেকাস আমাকে…!”
ফিলোমেলা অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে দরজায়, মাত্রই মহসিনকে জানিয়ে এলো সে যে শেহজাদী ব্যাগপত্র গুছিয়ে চলে যেতে চাইছেন। মহসিন ছুটেছে লিও কাঞ্জিকে সংবাদ দিতে। গত রাতেই ওদেরকে দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দিয়েছেন হিজ ম্যাজেস্টি, তারপর দুজনের কেউই আর ফেরেনি রয়্যাল ফ্লোরে, আরমানের ফ্লোরে কাটিয়েছে রাত। কপাল ভালো থাকলে সেখানেই তাদের পাওয়া যাবে।
হিজ ম্যাজেস্টি সকালেই বেরিয়ে গেছেন তার নবনিযুক্ত দুই দেহরক্ষীকে নিয়ে। কিন্তু সকাল বেলা তার শান্ত মুখশ্রী দেখে মহসিন একটুও টের পায়নি যে তাদের দুজনের ভেতর আবারও এক বিরাট ঝামেলা তৈরি হয়েছে! ঝামেলার আর শেষ নেই, শেষ কবে দুজন একটু হাসিমুখে কাটিয়েছে মনে পড়েনা মহসিনের!
ব্যাগ গোছানো শেষ হওয়া মাত্রই দ্রুত হাতে পোশাক পরে তৈরি হয়ে নিলো আনাবিয়া। সকালের খাবার একফোটাও মুখে দেয়নি সে, এই প্রাসাদের খাবার স্পর্শ করবে না আর! রাতের ক্রোধ এখনো স্পষ্ট বিদ্যমান তার মুখাবয়বে। ব্যাস্ত, ক্ষুব্ধ হাতে এলোমেলো চুল গুলো চিরুনি ছাড়াই বেঁধে নিতে গেলো ক্লাচার দিয়ে। তখুনি কি মনে করে থেমে গেলো আবার। এগিয়ে গেলো ড্রেসিং টেবিলের দিকে।
সারা রাতের শোক বিলাসের কারণে লাল হয়ে আছে নাকের ডগা, কালো পাপড়ির মধ্যিখানের সফেদ চোখ জোড়াতেও লেগে আছে লালিমা। নাক টেনে হাতের উলটো পিঠ দিয়ে একবার নাক মুছে ড্রয়ার খুলে বের করলো কাঁচি। এলোমেলো চুল গুলোকে মুঠো বন্দি করে নিয়ে এলো সামনে, তারপর ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে মুহুর্তেই কেটে ফেললো দীঘল সফেদ চুল!
ফিলোমেলা ছুটে এলো হায় হায় করে, কিন্তু তার পৌছোনোর পূর্বেই সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গেলো! মুঠো ভর্তি ঘন শুভ্র রেশমসম কেশগুচ্ছ জানালা দিয়ে তুচ্ছতাভরে ছুড়ে ফেলে দিলো আনাবিয়া! যেন ছুড়ে ফেলে দিয়ে দিয়ে গেলো তার সকল দুঃখ, কষ্ট ওই জঙ্গলের ভারী বাতাসে!
এলোমেলো কর্তিত, ঘাড় সমান চুলগুলোকে মুক্ত করে দিয়ে কাঁধে ব্যাকপ্যাক তুলে, ট্রলিটা হাতে নিয়ে বড় বড় পা ফেলে ফিলোমেলাকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে এলো সে৷ ফিলোমেলাও কাতর হয়ে ছুটলো তার পিছে। আনুগত্যের সাথে ব্যাকুল অনুরোধের স্বরে বলল,
“শেহজাদী, দয়া করে আপনি যাবেননা! হিজ ম্যাজেস্টি ফিরে আসুক একবার, তারপর না হয় যাবেন। মহসিন লিও আর কাঞ্জি সাহেব কে ডাকতে গেছেন, এখুনি ফিরে আসবেন, আপনি দয়া করে কামরায় ফিরে চলুন শেহজাদী! হিজ ম্যাজেস্টি জানতে পারলে রেগে যাবেন অনেক!”
আনাবিয়া শুনলোনা ওর আর্জি। এগোতে রইলো রয়্যাল ফ্লোর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্দ্যেশ্যে। লিও কাঞ্জিকে নিয়ে সেই মুহুর্তেই ফ্লোরে ঢুকলো মহসিন। আনাবিয়াকে এভাবে এত দ্রুত তৈরি হয়ে বেরিয়ে যেতে দেখে প্রমাদ গুণলো সে, লিও কাঞ্জি দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে আনাবিয়াকে জিজ্ঞেস করতে চাইলো সে কেন হঠাৎ চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো, কিন্তু আনাবিয়ার চুলের বেহাল দশা দেখে আঁতকে উঠলো ওরা!
কাঞ্জি ছুটে এসে আনাবিয়ার পথে আগলে দাঁড়িয়ে অনুরোধের সুরে বলল,
“শেহজাদী, শেহজাদী আমাদের কথা শুনুন! সিচুয়েশন এমনিতেই অনেক বিগড়ে গেছে, দয়া করে আপনি হিজ ম্যাজেস্টিকে রাগাবেন না! দয়া করুন আম্মা, তিনি ভয়ানক রেগে আছেন, একটু আগেও অকারণে দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, প্লিজ শেহজাদী! একটু দয়া করুন, আপনি এভাবে এই অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন শুনলে তিনি আরো রেগে যাবেন! যাবেননা শেহজাদী, অনুরোধ করছি আপনাকে!”
আনাবিয়া দাঁড়ালো না পর্যন্ত, দাঁতে দাঁত চেপে ওদেরকে সম্পুর্ন উপেক্ষা করে প্রায় ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে গেলো ফ্লোর থেকে। লিও কাঞ্জি মরিয়া হয়ে ছুটলো পেছন পেছন, কিন্তু নাগাল পেলোনা আনাবিয়ার, তার আগেই উধাও হয়ে গেলো সে প্রাসাদ থেকে।
প্রায় সন্ধ্যা, ইলহান মাত্রই ফিরলো জিম থেকে। এই বাসাতে জিমের মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই, শীঘ্রই বাড়িটা বদলাবে সে। আজকাল সে খুবই ব্যাস্ত, নতুন করে জীবন শুরু করতে জায়ান সাদীর এক পরিচিত বিজনেস ম্যানের সাথে পার্টনারশিপে গেছে। কোম্পানির থার্টি পার্সেন্ট শেয়ার ইতোমধ্যেই কিনে নিয়েছে, আরও কিছু ছোট খাটো বিজনেসের পার্টনারশিপ নিয়ে মোটামুটি টাকা কামানোর কিছু রাস্তা উন্মোচন করে ফেলেছে। বর্তমানে হাতে মোটা অংকের লাভ থাকায় বেশ খোশমেজাজে আছে।
শিষ বাজাতে বাজাতে ঢুকতে গেলো সে গোসলখানায়। গোসল শেষে বের হতেই আচমকা পেছন থেকে ছোট ছোট পায়ে দাপিয়ে ছুটে এসে তার পা দুখানা জড়িয়ে ধরলো লুসি, উচ্ছ্বসিত হেসে বলল,
“ধরে ফেলেছি!”
ইলহান সহাস্যে এক হাতে ওর কোমর আকড়ে ধরে হ্যাচকা টান তুলে নিলো কাঁধের ওপর, দুষ্টুমি পূর্ণ গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“আমার কামরায় লুসি নামক ডাকাত সর্দারনী কি করছে?”
“লুসি কিদনাপ করবে তোমাকে।”
দু’হাতে ইলহানের মাথা আকড়ে ধরে পা নাচিয়ে বলল লুসি। ইলহান ওকে নিয়ে নিচ তলার দিকে এগোতে এগোতে বলল,
“আচ্ছা! কিডন্যাপ করে লুসি ডাকাতিনী কোথায় রাখবে আমাকে?”
“আমার দল হাউজের ভেতর লুকিয়ে রাকবো, তখন বাহার সারায়ায়ায়ায়ায়া বাড়ি কুজেও পাবেনা তোমাকে।”
হেসে উঠলো ইলহান, বলল,
“তোমার ডল হাউজের ভেতর ধরবে আমাকে?”
লুসি নীরিক্ষার চোখে পরখ করলো ওকে কিছুক্ষণ, এই শরীর যে কোনোভাবেই তার ওই ছোট্ট ডল হাউজের ভেতর ঢুকবেনা সেটা ঠাহর করে হতাশার শ্বাস ফেলে বলল,
“তাহলে আমাকে একটা বিশায়ায়ায়ায়ায়াল দল হাউজ কিনে দাও, সিকানে তোমাকে লুকিয়ে রাকবো। বাহারকে একদমই সিকানে যেতে দিবোনা, আর আমি মাঝে মাঝে লুকিয়ে লুকিয়ে গিয়ে তোমার কাদে উটে বসে তাকবো।”
হো হো করে হেসে উঠলো ইলহান। বাড়ির ভেতর গম গম করে উঠলো তার হাসির শব্দ। নিচে তার সন্ধ্যার জলখাবারের ব্যাবস্থায় ব্যাস্ত বাহার, তার হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দিচ্ছে অন্য একটি মেয়ে। ইলহান নিচে নেমে মেঝেতে নামিয়ে দিলো লুসিকে, ঝুঁকে তুলতুলে গাল দুটো টিপে দিয়ে বলল,
“তুমি বাহারের সাথে থাকো, আমি কিছু কাজ সেরে এখনি আসছি, একসাথে খাবো, ঠিক আছে?”
লুসি সোৎসাহে মাথা নাড়ালো। ইলহান বাহারকে ইশারায় লুসিকে সামলাতে বলে যেতে নিলো নিচ তলার কোনো এক কামরায়, তখুনি বেজে উঠলো কলিং বেল।
এ বাড়িতে তেমন কেউ আসেনা বললেই চলে! কালেভদ্রে জাভেদরা বেড়াতে আসে দল বেঁধে, সেটাও হয়তো ছ’মাসে একবার। লুসি বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়লো, “কুতুম এসেচে” বলে নাচতে নাচতে ছুটে গেলো সে দরজার দিকে। বাহারের সাথে হাতে কাজ করা মেয়েটিও এগোলো ওর পেছনে।
লুসি পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে উঁচু হয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে খোলার চেষ্টা করলো দরজা। মেয়েটি এগিয়ে এসে লুসিকে আলতো হাতে সরিয়ে দিয়ে খুললো দরজা, সাথে সাথেই দুম দাম পা ফেলে ভেতরে ঢুকে পড়লো আনাবিয়া।
ইলহান ওকে দেখা মাত্রই চমকালো, তার চাইতেও বেশি চমকালো ওর চুলের সর্বনাশ দেখে!
“আনাবিয়া! তোমার চুল কোথায় গেলো? কেটে ফেলেছো কেন? আর এই অসময়ে এখানে কি করছো তুমি? তুমি না শিরো মিদোরিতে ছিলে?”
রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করতে করতে চিন্তিত মুখে এগিয়ে এলো ইলহান। লুসি আনাবিয়াকে দেখে খুশি হলো প্রচন্ড, হাসি মুখে আনাবিয়ার কাছে ছুটে যেতে নিলো সে। ইলহান দ্রুত হাতে আঁটকালো ওকে, ঠেলে দিলো বাহারের দিকে। ইশারায় চলে যেতে বলল অন্য কামরায়। আনাবিয়ার মুখভঙ্গি স্বাভাবিক নয়। সে যদি চুল কেটে ফেলতে পারে তবে রাগের মাথায় সে এই মুহুর্তে যা কিছু করে ফেলতে পারে, আঘাত করার সময়ে কে লুসি কে ইলহান দেখবেনা সে।
“চলে এসেছি আমি।”
থমথমে স্বরে বলল আনাবিয়া, ইলহান অন্য মেয়েটিকে ইশারা দিতেই সে দ্রুত হাতে আনুগত্যের সাথে আনাবিয়ার ব্যাকপ্যাক আর ট্রলি ব্যাগ সরিয়ে নিয়ে গেলো।
ইলহান ওর হাত ধরে এনে বসালো চেয়ারে, টেবিল থেকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে মোলায়েম স্বরে বলল,
“পানি খাও।”
আনাবিয়া পানি খেলো, ইলহান আবার বলল,
“কিছু খাওনি মনে হচ্ছে, মুখখানা শুকিয়ে গেছে। খাবার দিতে বলি?”
“না।”
বলে চুপ করে রইলো আনাবিয়া। ইলহান ক্ষণিক ওর মুখের দিকে চেয়ে বোঝার চেষ্টা করলো অবস্থা ঠিক কতখানি গুরুতর। জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে? হঠাৎ এখানে এভাবে চলে এসেছো কেন?”
“আমি আসায় কি খুব অসুবিধা হয়ে গেছে? অসুবিধা হলে আমি চলে যাবো এখুনি।”
ঝাঝিয়ে বলে উঠলো আনাবিয়া। ইলহান নিজের কন্ঠস্বর যথাসম্ভব নরম করে বলল,
“এ কথা কখন বললাম? এভাবে এমন অগোছালো অবস্থায়, এমন পোশাকে প্রাসাদ ছেড়েছো, চুল কেটে ফেলেছো, তবে আমি কি জিজ্ঞেস করতে পারিনা?”
বিরতি দিয়ে আবার শুধোলো,
“আসওয়াদের সাথে আবার কোনো ঝামেলা বাঁধিয়েছো?”
চুপ করে রইলো আনাবিয়া, কুচকানো চোখে তাকিয়ে রইলো মেঝের দিকে। তার মেজাজ যে মারাত্মক খারাপ তা বলে দিতে হলোনা ইলহানকে৷
“আসওয়াদ জানে তুমি—?”
“বার বার ওর নাম নিবেন না আপনি আমার সামনে!”
ইলহানের প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই গর্জানো স্বরে বলে উঠলো আনাবিয়া। ইলহান চুপ হয়ে গেলো। আনাবিয়া ফুঁসতে রইলো, রাগে গায়ের ভেতর আগুন ধরতে রইলো যেন তার!
“আমাকে বলেছে ডিভোর্স দিবে! তাকে ডিভোর্স দিয়ে আমি ফারিশকে নয়তো ব্রায়ানকে বিয়ে করতে চাই এসব জঘন্য কথা বলেছে সে আমাকে! আরও যা বলেছে তা আমি বলতে পারবোনা আপনাকে! আমাকে কি ওর এতটাই সস্তা মনে হয়? নাকি মনে হয় সবাই ওর মতো?
আমাকে বলেছে গেট লস্ট! তো গেট লস্ট হয়েছি আমি! বলেছে যা ইচ্ছা করতে পারি, যেখানে খুশি যার সাথে খুশি যেতে পারি! তো কেটে ফেলেছি আমি চুল, চলে এসেছি আমি!”
ক্রোধে চেচিয়ে চেচিয়ে বলল আনাবিয়া। ইলহান হতভম্ব চোখে দেখতে রইলো ওর তেজস্বী চেহারা, ভয়ানক ক্রুদ্ধ চাহনি! গলার তীক্ষ্ণ স্বর যেন কানের পর্দা ছেদ করে পৌঁছে গেলো মস্তিষ্কে! চেচানো থামতেই ফোস করে স্বস্তির শ্বাস ছাড়লো ইলহান।
আনাবিয়া দু’হাতের মুঠি শক্ত করে ধরে বসে রইলো চেয়ারে, যেন আসন্ন ভাঙচুরের প্রবল ইচ্ছা থেকে নিজেকে সংবরণের চেষ্টা করতে রইলো প্রাণপণে! ইলহান ক্ষণিক নিরব থেকে গলা খাকারি দিয়ে নরম স্বরে বলল,
“তবে সব মেমোরি ফিরেছে ওর, নইলে ব্রায়ানের ব্যাপারটা সে জানতো না।”
আনাবিয়া চুপ রইলো, ইলহান একটু ঝুঁকে এসে মৃদুস্বরে বলল,
“আমি বুঝতে পারছি সে তোমাকে রাগের মাথায় বাজে কথা বলেছে কিন্তু…… তবুও… এভাবে চলে আসা তোমার ঠিক হয়নি আনাবিয়া। তুমি ভালোভাবেই জানো তোমার ব্যাপারে আসওয়াদ কতটা ধৈর্যশীল। শুনলে হয়তো রাগ করবে কিন্তু ওর স্থানে আমি থাকলে তোমার প্রতি এতটা শিথিল কখনোই হতাম না। ও তোমার প্রতি মাত্রাতিরিক্ত শিথিল।
ও যদি রেগে তোমাকে এমন কথা বলতে পারে তবে নিশ্চয় তার যথাযথ কারণ আছে, এমনি এমনি এমন কথা ও কখনোই বলবেনা। হয়তো তুমি জেনে বা না জেনে কোনো অপরাধ করেছো, স্মরণ করার চেষ্টা করো কি করেছো।”
বিরতি দিলো ইলহান। আনাবিয়ার নাকের পাটা ফুলে উঠছে, শুভ্র মুখখানা রাগের আঁচে লালচে হয়ে উঠেছে। আনাবিয়ার এমন নির্বুদ্ধিতায় ইলহান হতাশ হলো, বলল,
“তোমার বোঝা উচিত, সে একজন পুরুষ মানুষ। আমি তোমার বাবার মতো, তাই সব কথা আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলতে পারবোনা। তুমি যথেষ্ট বড় হয়েছো, তোমাকে হাতে কলমে বুঝিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি আর নেই।
এভাবে সামান্য কারণে প্রাসাদ ছেড়ে চলে এসে তুমি একজন অধৈর্য স্ত্রীর পরিচয় দিয়েছো। সবসময় জেদ দেখাতে গেলে চলেনা আনাবিয়া। একটি সম্পর্কে দুজনকেই এফোর্ট দিতে হয়, স্যাক্রিফাইস করতে হয়। একজনের এফোর্টে কিছুই হয়না৷ তুমিই বলো, আজ তুমি ওর সাথে রুড বিহেভ করলে আসওয়াদ কখনো তোমার থেকে দূরে যেতো? নাকি তোমাকে কখনো যেতে দিতো?”
প্রশ্ন করে থামলো ইলহান। আনাবিয়ার ক্রোধ যেন কমলো কিছুটা। ইলহান সাহস পেলো, জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“তুমি প্রাসাদে এখনো বর্তমান থাকলে হয়তো তোমাকে এসব কথা বলার জন্য অনুশোচনা করতো সে, ফিরে এসে হয়তো ক্ষমাও চাইতো, ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নিতে চাইতো। কিন্তু তুমি সে সুযোগ দাওনি ওকে, তোমার এমন অ্যাকশনে এখন পরিস্থিতি বিগড়াবে বৈ শুধরাবে না৷
ওকে তুমি ভালোভাবেই চেনো, অন্তত আমাদের সবার থেকে বেশি। যে যখন নরম তখন নরম, যখন শক্ত তখন ইস্পাত-দৃঢ়। তুমি ওকে নরম হওয়ার সুযোগ না দিলে এভাবে শক্ত হতে হতে একসময় আর কখনো নমনীয় হতে চাইবেনা, তখন তুমিই অসুবিধায় পড়বে আনাবিয়া। তোমার উচিত ফিরে যাওয়া।”
“কখনোই না!”
প্রতিবাদের স্বরে ঝাঝিয়ে বলল আনাবিয়া, নাক টেনে ক্রোধিত স্বরে বলে উঠলো,
“ও আমাকে গেট লস্ট বললো কোন সাহসে? ওর বাপের প্রাসাদ? আমার কোনো অধিকার নেই সেখানে? বলে নাকি ওর ওপর যেন অধিকার না ফলাই, তো কে ফলাবে? ওই প্রাসাদের বেশ্যা গুলো?”
ইলহান মনে মনে কপাল চাপড়ালো, আনাবিয়া আবারও দ্বিগুণ তেজে বলল,
“আমি কি এতই ফেলনা যে চাইলেই আমাকে গেট লস্ট বলে দেওয়া যায়? দিয়েছেই যখন তখন আমি আর ফিরবোনা, অনেক হয়েছে আর নয়! ওর যা মন চায় ও করুক এখন, যার সাথে ইচ্ছা থাকুক। আমি ফিরবোনা ব্যাস ফিরবোনা, আর আপনি যদি আমাকে আর একবারও জোরাজোরি করেন তবে আমি এখান থেকেও চলে যাবো!”
বলতে বলতে কান্না চলে এলো তার, জোরে জোরে শ্বাস ফেলে কান্না টুকু রোহিত করার চেষ্টা করলো সে। ইলহান ফোস করে শ্বাস ছেড়ে চেয়ার টেনে আরেকটু এগিয়ে এসে বলল,
“শান্ত হও আনাবিয়া, এভাবে রাগারাগি করে কি কোনো লাভ হবে? তুমি যে চুল গুলো কেটে ফেলেছো, মীর জানতে পারলে কি করবে ভাবো একবার! রাগের মাথায় মানুষ অনেক কিছুই বলে, অন্তত ভালো ব্যাপার যে রাগের মাথায় ওর খুন চাপেনি।”
“গলা টিপে ধরেছিলো যে আমার!”
কান্না জড়ানো ক্রুদ্ধ স্বরে বলে উঠলো আনাবিয়া। ইলহান দীর্ঘশ্বাস ফেললো, এদের দুজনকে নিয়ে ও কি করবে, কোথায় যাবে বুঝতে পারলোনা। কিছুটা কঠিন হয়েই এবার সে বলল,
“ও তোমার গায়ে কখনো হাত তুলেছে বলে আমি মনে করতে পারিনা আনাবিয়া, ও তোমাকে কতটা ভালোবাসে কতটা যত্নে রাখে সেটা তোমার আশেপাশের যে কারো কাছে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবে। সবারই চোখে বাঁধে৷ তুমি এমন কি করেছো যার কারণে ও এতটা রেগে গেছে? আর ওর এই রাগে ঘী ঢেলে তুমি চলে এসেছো!
চুল গুলো কেটে কি অবস্থা করেছো দেখেছো একবার? ও দেখলে তোমাকে আস্ত রাখবে? নিজের বিপদ নিজে কেন ডেকে আনো বলোতো! তুমি কি পারতেনা তাকে একটু শান্ত করতে? কথা দিয়ে না পারো অন্য কোনো ভাবে? তুমি তো তার স্ত্রী! তোমার তো উচিত তার চাহিদার খেয়াল রাখা? আর এসব আমি তোমাকে বলবোই বা কেন? তুমি তো বাচ্চা নও আনাবিয়া!”
“আমি এখানে এসে এখনো বসে পারিনি, আর আপনি তার কোনো দোষ না দেখে আমাকে দোষারোপ করা শুরু করেছেন! কি এমন করেছি আমি? সে আমাকে কেন অতগুলো বাজে কথা শোনালো? আমি তো তার সাথে ভালো ভাবেই কথা বলতে চেয়েছিলাম, সে কেন সুযোগ দিলোনা আমাকে? কেন আমাকে বলল গেট লস্ট?”
“সমস্যা এখানেই আনাবিয়া, সম্পর্কে এমন অনেক কথাই একে অন্যকে বলা হয়, কিন্তু সেগুলো ইগোর কারণে ধরে রাখা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়! তুমি পারতে এই কথাটি উপেক্ষা করে তাকে মানাতে। অন্তত প্রাসাদে থাকতে পারতে, তার আশেপাশে থাকতে পারতে!
তারও মানসিক শান্তির প্রয়োজন আছে আনাবিয়া, কিন্তু আমি তো তোমাকে চিনি! তুমি তোমার জেদের কাছে হার মানবেনা, তোমরা দুজনেই একই রকম! কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নও, তুমি তো একদমই নও!
তুমি যেহেতু তার স্ত্রী, সম্পর্কে সে যেহেতু লিডিংয়ে থাকে তোমার উচিত ছিলো নমনীয় হওয়া, তাকে অনুশোচনা করার, অপরাধবোধ অনুভবের সময় দেওয়া।
কিন্তু তুমি তা দিতে নারাজ! সবসময় নিজের দিকটা ভাবলে হয়না আনাবিয়া! অন্যকেও সুযোগ দিতে হয়, এগুলো এখনো কেন তোমাকে বোঝানো লাগবে? তুমি তো অবুঝ নও, বাচ্চা নও!”
শেষোক্ত কথা গুলো বেশ জোরালো ভাবেই বলল ইলহান। আনাবিয়া উঠে দাঁড়ালো তৎক্ষনাৎ, যে মেয়েটি তার ব্যাগ গুলো নিয়ে ভেতরে রেখেছিলো তাকে আদেশ করলো ব্যাগ গুলো আবারও নিয়ে আসতে। মেয়েটি ইলহানের দিকে তাকালো চকিতে। ইলহান উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“আমার ওপর রাগ দেখিয়ে কোনো লাভ নেই আনাবিয়া, আমি হিসেবে তোমার কেউই নই। তবে যদি আমাকে সত্যিই তোমার কিছু ভেবে থাকো তবে তোমার উচিত আমার কথা গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া৷ এভাবে সমস্যা থেকে পালিয়ে কখনো সমাধানে পৌছোনো যায়না! এখন তুমি তেজ দেখিয়ে কোথাও যাবেনা, আমার বাড়িতে এসেছো, তোমাকে আমি এভাবে চলে যেতে দেবোনা।”
আনাবিয়া মেয়েটিকে স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজেই এগোলো ভেতরে। ইলহান এগোলো ওর পেছনে, শাসনের স্বরে বলল,
“আনাবিয়া, তোমাকে মানা করছি আমি। এভাবে তুমি চলে যেতে পারোনা! আমি যা বলেছি তোমার খারাপের জন্য বলিনি, অবশ্যই ভালোর জন্য বলেছি। তুমি এখন কোথাও যাবে না, রাত হতে চলেছে, খেয়ে দেয়ে বিশ্রাম নিয়ে কাল সকালে যেখানে খুশি যাবে। ”
আনাবিয়া শুনলোনা ওর কথা। কামরা থেকে ব্যাগ গুলো উঠিয়ে নিয়ে জোর কদমে বেরিয়ে এলো বাইরে, মেইনডোর দিয়ে বেরোনোর সময়ে ভেজা চোখে ইলহানের দিকে চেয়ে বলল,
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৪
“আসলে কি জানেন তো! আপনারা দুজনেই সমান, কোনো তফাত নেই! একই গর্ভের কিনা! আপনাদের সামান্যতম হারও আপনারা মেনে নিতে পারেননা, অন্যের ওপর জুলুম করে পায়ের তলায় পিষে রাখলেই আপনাদের বেশি আনন্দ হয়!”
আর এক মুহুর্তও দাঁড়ালোনা আনাবিয়া, আর না ফিরে চাইলো ইলহানের দিকে। ক্ষিপ্র বেগে চলে গেলো দৃষ্টি সীমানার বাইরে। ইলহান ওর যাওয়ার পানে স্থির চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড়িয়ে বলে উঠলো,
“সেইম গোজ ফ’ ইউ, মিসেস আসওয়াদ দেমিয়ান।”
