Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪৫

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪৫

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪৫
জান্নাতি আক্তার জারা

গ্রামের চিকন রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলছে আপন গতিতে, তাকবীরের নজর সামনে রাস্তায়, আরাত পিছনে ঘুরে একবার মিম কে দেখে নিলো, মিম গাড়ির ব্যাক সিটে গাড়ির জানালার সঙ্গে মাথা ঠেকিয়ে বাহিরের ওয়েদার দেখতে মগ্ন, আরাত পুনরায় একবার তাকবীরের দিকে তাকালো, তাকবীর সামনে থেকে চোখ ফিরিয়ে আরাতের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় জানতে চাইলো, কী হয়েছে, আরাত মলিন হেঁসে মাথা ঝাকিয়ে, কিছু না, বুঝায়া মাথা ঘুরিয়ে মিম কে বলে উঠলো,

___” এভাবে বাড়ি থেকে চলে আসাটা কী তো ঠিক হলো?
মিম আরাতের কথায় বাহিরে থেকে চোখ ফিরিয়ে একনজর আরাতের পাশে তাকবীর কে দেখে নিয়ে মাথা নিচু করে বলল,
___” জানি না।
তাকবীরের নজর সামনে, আরাত সিট দু’হাতে ধরে মিমের দিকে চেয়ে, মিম কে বুঝানোর ন্যায় বলে উঠলো,
___” মামা-মামী তোর চলে আসাতে কষ্ট পেয়েছে, মা-বাবা কখনো ছেলেমেয়ের খারাপ চাইবে না, তুই মামা-মামি কে বুঝিয়ে বলতি তাহলে নিশ্চয়ই….
মিম আরাতের কথা শেষ হওয়ার আগেই নিচু স্বরে বলে উঠলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

___”আমি বলছি না মা-বাবা ভুল,বা ছেলেমেয়ের খারাপ চায়, কিন্তু কখনো বাবা-মা এটা ভাবে না তাঁদের ভালো করাতে ছেলেমেয়ে হাসতে ভুলে যায়।
তাকবীর নজর সামনে রাস্তায় রেখেই মিমের কথার বিপরীত কথা বলে উঠলো,
___”বাবা-মা হাঁটতে শিখায়, পৃথিবীতে বাঁচতে শিখায়, তাড়া কিভাবে তোমার হাসি বন্ধ করবে?
মিম তাকবীরের কথায় বিপরীতে উওর করতে পারলো না, তাকবীরের জায়গায় যদি অন্য কেউ থাকতো তাহলে হয়তো প্রশ্নের বদলে প্রশ্ন করলো, বাবা-মা ছেলেমেয়ে খুশিতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় কেনো, বাবা-মা এটা বুঝতে চাইনা কেন তাঁদের সিদ্ধান্ততে ছেলেমেয়ে কষ্ট পাচ্ছে, মিম তাকবীর কে প্রশ্ন করতে পারলো না, না তাঁর উত্তর জানতে পারলো, মিম যদি প্রশ্ন গুলো মুখ ফুটে করতো তাহলে তাকবীর উওরে হয়তো বলতো,বাবা-মা তোমার বর্তমান না ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে, তাঁদের সিদ্ধান্ত তোমার উপরে চাপিয়ে দিচ্ছে না, তাঁদের ভাবনাতে তোমার আগাম সুখ দেখতে পাচ্ছে, উনারা তোমাকে ভালো না বাসলে তুমি অভিমান করে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসতে পারতে না। তাঁর থেকে বড় কথা আমাদের রব আমাদের যার জন্য সৃষ্টি করছে, যাকে আমাদের ভাগ্যই রেখেছে, সে পুরো পৃথিবী ঘুরে হলেও তোমার কাছেই আসবে,তোমার ভাগ্যই এটাই হবে।

দেখতে দেখতে প্রায় আধাঘন্টা সময় নিয়ে তালুকদার বাড়িতে এসে থামলো গাড়ি, কোথাও যাওয়ার পথ এত দৈর্ঘ্য লাগে অথচ ফিরের পথ ছোট লাগে। আরাত মিম গাড়ি থেকে নেমে নিজেদের কাপড়ের লাগেজ বের করে নিয়ে বাড়ির ভিতরে পা বাড়ালো, তাকবীর গাড়ি পার্কিন করছে, আরাত বাড়ির ভিতরে এসে লাগেজ ড্রয়িং রুমে রেখেই সোফাতে মাথা এলিয়ে দিয়ে চিৎকার দিয়ে আদিবা তালুকদার কে ডাকলো,

___” মা, ও মা দেখো তোমার ভাতিজি এসেছে!
মিম আরাতের চিৎকারে কানে এক হাত গুঁজে লাগেজ দিয়ে আরাতের দিকে তাকিয়ে আছে, আদিবা তালুকদার মেয়ের কন্ঠ শুনতে পেয়ে রুম থেকে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এলেন, আজকে আরাত তাকবীর বাড়িতে ফিরবে আদিবা তালুকদার আগে থেকেই জানতেন, কিন্তু সঙ্গে করে মিম কে নিয়ে ফিরবে এটা যানা ছিলো না, আদিবা তালুকদার বিরক্ত মুখে রুম থেকে বের হয়ে আরাতের কাছে এসে রাগী গলায় বললেন,

___” বলছি না ভদ্রভাবে ধীরে ধীরে কথা বলতে, এতো চিৎকার দিচ্ছেন কেনো মা জননী?
মায়ের কথা আরাত পাওা না দিয়ে সোফায় আগের ন্যায় মাথা এলিয়ে বসে রইলো, দেখে মনে হবে কতটা ক্লান্ত শরীর সোফাতে এলিয়ে দিয়েছে, আদিবা তালুকদার মিমের দিকে তাকালো, মিম চুপচাপ একপাশে দাড়িয়ে আছে, মিম কে দেখে হাসি মুখে মিমের কাছে এসে মাথায় হাত রেখে আরাত কে উদ্দেশ্য করে বলল,
___” মিম কে নিয়ে এসে একটা কাজের কাজ করেছো,মেয়েটা এখন আর আগের মতো এসে থাকতে চায়না,ছোট থাকতে ভালো ছিলো তোমার নানুমনীর সঙ্গে এসে এসে থেকেছে,বড় হয়ে আর থাকতে চায় না, ভালো হয়েছে কয়েকদিন আমাদের সঙ্গে থাকবে এবার।

আদিবা তালুকদারের কথায় মিম মুখে মলিন হাসি দিলো, ছোট থাকতে মিম দাদিমার সঙ্গে এসে অনেক থেকেছিল, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের গ্রাম ছাড়া আর কোথাও যেতে বা থাকতে ইচ্ছা করে না, বলে না নিজের গ্রাম যতই খারাপ হোক না কেনো সবার আগে নিজের বাড়ি নিজের গ্রাম আগে, আরাত মায়ের কথায় আগের ন্যায় বলে উঠলো,
___” তোমার ভাইয়ের মেয়ে এখানেই থাকবে, এখান থেকে কলেজে ট্রান্সফার হবে, ম্যাডাম রাগ করে বাড়ি থেকে চলে এসেছে!
আরাতের কথায় আদিবা তালুকদার অবাক হয়ে মিমের দিকে তাকালো, মিম চুপচাপ মাথা নিচু করে আছে, আদিবা তালুকদার হাতে হাত ভাজ করে তীক্ষ্ণচোখে চেয়ে বললেন,

___” রাগ কেনো করেছো?
মিম তৎক্ষণিক মুখ তুলে বিরক্তমাখা কন্ঠে বলে উঠলো,
___”ফুপি আব্বু আম্মু আমার জন্য ছেলে ঠিক করছে, আমি এখন বিয়ে করতে চাইনা তাই চলে এসেছি!
আদিবা তালুকদারের কাছে এখন সবটা পরিস্কার হয়ে গেলো। এতক্ষণে আরাতের চিৎকারে রুম থেকে রাবেয়া তালুকদার বেরিয়ে এসেছেন। আদিবা তালুকদার মিমের গালে আদুরে হাত রেখে জানতে চাইলেন,
___”বিয়ে কেনো করতে চাইছো না ?
মিম নিজের ফুপি কে নরম কাটতে দেখে সব অভিযোগ ঢেলে দিতে চাইলো,আহ্লাদী সুরে বলে উঠলো,

___”ফুপি আমার বিয়ে না করার তিনটা কারণ আছে, এক আমি পড়াশোনা করবো, দুই বিয়ে করলে শশুর বাড়ির কথা শুনে চলতে হবে, শান্তিতে ঘুমাতে পারবো না, কাজ করতে হবে, আর তিন নাম্বার হলো ওই আরশের বাচ্চা, ওর ভাইকে বিয়ে করলে সারাদিন ওই অহংকারীর সামনে থাকতে হবে যা আমার দ্বারা পসিবল না।
মিম মনের মধ্যে লুকানো কথাগুলো তিরতির মেজাজে বলে দিলো, আদিবা তালুকদার আর রাবেয়া তালুকদার একিউপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন, আরাত সোফায় মাথা রেখে আগেপিছে না ভেবে মিমের কথায় মুখ ফসকে বলে ফেললো,

___” বরের কথা বললি না কেনো, সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু বর কে ভালো লাগে বুঝি?
আরাতের কথায় আদিবা তালুকদার রাগী গলায় ধমকে উঠলেন,
___” আরাত… দিনদিনে বোধবুদ্ধি লাতে উঠে যাচ্ছে তোমার, কোথাও কী বলতে হয় জানো না?
আরাত মায়ের ধমকে হুঁশে ফিরলো, দ্রুত সোফাতে সোজা হয়ে বসতে নিয়ে সামনে সদর দরজায় তাকবীর কে নিজের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে থাকতে দেখে থতমত খেয়ে গেলো, পুনরায় থতমত মুখে তাকবীর থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মায়ের দিকে তাকালো, আদিবা তালুকদার রাগী চোখে আরাতের দিকে তাকিয়ে আছে, আরাত লজ্জা পেয়ে মায়ের থেকে চোখ অন্য পাশে ফিরাতেই রাবেয়া তালুকদার কে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখলো। আরাত কাচুমাচু করে মুখে মেকি হাসি টেনে মাথা নিচু করে নিলো, তাকবীর গটগট পা ফেলে সিড়ি বেয়ে রুমে চলে গেলো, আরাত বিরবির করল,( এমন রিয়েক্ট করার কী আছে আমি ভুল কী বলেছি আজব ) আরাত মাথা নিচু করে লাগেজে হাতে নিয়ে আদিবা তালুকদার কে পাশ কেটে মিমের কানের কাছে ফিসফিস করলো,

___” বিয়ে না করে এই শীতে বরের বুকের উষ্ণ পরশ মিস করলি,তাছাড়া সবকিছু বেকার চিস!
আরাত দুষ্টু হেঁসে ফিসফিস করে কথাটা বলে জায়গা ত্যাগ করলো,মিম আদিবা তালুকদারের দিকে চেয়ে কাচুমাচু করলো,রাবেয়া তালুকদার মিম কে বললেন,
___” মিম তুমি বরং আরিশার রুমে যাও, আরিশার রুম ফাঁকা আছে ,ক্লান্ত নিশ্চয় যাও ফ্রেশ হও!
___” থ্যাঙ্ক আন্টি।
মিম হাসি মুখে লাগেজ নিয়ে যেতে নিলে আদিবা তালুকদার পুনরায় মিম কে বলে উঠলো,
___” এভাবে রাগ করে চলে এলে, গ্রামের মানুষ বাজে বলবে ,তোমার নামে আজেবাজে কথা বের করবে, তুমি তো গ্রাম সম্পর্কে জানো সবকিছু!

___”আমাকে কে ভুল বুঝলো ,আর কে খারাপ ভাবলো তাতে আমার কিছু যায় আসে না ফুপি,আমি তো জানি আমি কেমন। কারো মন্তব্য আমার গন্তব্য আটকাবে না।
মিম পিছু না ঘুরে আদিবা তালুকদারের কথার উত্তর দিয়ে জায়গা ত্যাগ করলো,আদিবা তালুকদারের নজর মিমের যাওয়ার পথে, রাবেয়া তালুকদার সেদিকে তাকিয়ে আদিবা তালুকদার কে বলে উঠলেন,
___” যাক আর কিছু বলিস না, ছোট মানুষ মাথায় যা এসেছে তাই করছে, কিছু দিন যেতে দে দেখবি একা একা রাগ কমে যাবে।
___” কিন্তু ভাবি, মিমের জেদ সম্পর্কে আপনার ধারণা নেই, মেয়েটা একটু বেশিই জেদি, একবার যেহেতু বলছে গ্রামে থাকবে না, মানে থাকবে না!
আদিবা তালুকদারের কথায় রাবেয়া তালুকদার হাসি মুখে বলে উঠলেন,

___” বাবা-মার একমাত্র মেয়ে তো এজন্য একটু জেদি হয়ে গেছে, সমস্যা নেই রাগ কমে আসলে ঠিক হয়ে যাবে, চল আমরা বরং ওদের খাবারের ব্যবস্থা করি।
আদিবা তালুকদার আর রাবেয়া তালুকদার কিচেন রুমে চলে গেলো, আরাত তাকবীরের রুমে ঢুকে ওয়াশরুমে পানির শব্দ পেয়ে বুঝলো তাকবীর ওয়াশরুমে, আরাত লাগেজ থেকে নিজের আর তাকবীরের জামাকাপড় গুলো বের করে আলমারিতে গুছাতে লাগলো, তাকবীর ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আরাত কে জামাকাপড় গোছাতে দেখে আরাতের পাশে দাঁড়িয়ে আলমারি থেকে কোট প্যান্ট বের করে আয়নার সামনে রেডি হতে লাগলো , আরাত অবাক হয়ে তাকবীর কে অসময়ে রেডি হতে দেখছে, তাকবীর পরিপাটি হয়ে বেড সাইট থেকে ফোন নিয়ে ব্যস্ত পায়ে বের হওয়ার উদ্দেশ্য দরজার কাছে এসে, পুনরায় কিছু মনে পড়তেই পিছনে ঘুরে তাকালো, আরাত কে কাপড় হাতে নিয়ে নিজের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে দ্রুত পায়ে আরাতের সামনে এসে দাঁড়ালো, আরাত পিটপিট করে শুধু তাকবীরের কান্ড দেখছে, তাকবীর অনুভূতিহীন মুখে আরাতের কপালে চুমু রেখে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

___” কেমন বউ তুমি বর চুমু না দিয়ে বাহিরে যাচ্ছে আর তুমি আটকানোর চেষ্টা করছো না, কমনসেন্স একটা।
আরাত ভেবাচেকা খেয়ে তাকবীরের দিকে চেয়ে আছে, তাকবীর কথাটা বলে কোনোদিকে না তাকিয়ে রুম থেকে বের হওয়ার উদ্দেশ্য পা বাড়াতে পুনরায় আরাতের কথায় থেকে যায়,
___” কই যায়, লাঞ্চ করবেন না?
আরাতের ছোট ছোট খেয়াল রাখা ঘিরে তাকবীরের মনে মুগ্ধতা ছেয়ে গেলো, গম্ভীর মুখে আচমকা এক টুকরো সুখের হাসি ফুটে উঠলো, আরাত প্রশ্নমাখা চাহনিতে চেয়ে আছে, তাকবীর নিজের গম্ভীর্য বজায় রেখে পিছনে ফিরে হাত ঘড়িতে টাইম দেখতে দেখতে আরাত কে উদ্দেশ্য করে বলল,
___” অফিসে ক্লাইন্ট ওয়েট করছে, অলরেডি অনেকটা লেট হয়ে গেছে,তুমি খেয়ে নিও….
তাকবীর কথাটা বলে আরাতের দিকে তাকাতেই দেখলো, আরাত ছোট্ট ছোট্ট চোখে চেয়ে আছে , তাকবীর না চাইতেও মুখে মুচকি হাসি ফুটে উঠলো, আরাত তাকবীরের মুচকি হাসি দেখে স্বাভাবিক মুখে অন্য দিকে মুখ ফিরে পুনরায় বলল,

___” ভাইয়া, বড়আব্বু, বাবা, সবাই তো অফিসে, আপনি বাসায় আসতে না আসতে কাজ পড়ে গেলো?
তাকবীর আরাতের মলিন মুখের কথা শুনে বলল,
___” আমার জন্য অলরেডি মিটিং পিছানো হয়েছে , ওকে তুমি যখন চাইছো না তোমাকে ছেড়ে অফিসে যাই, ওয়েট মিটিং ক্যানসেল করছি!
তাকবীর কথাটা বলে ফোন হাতে নিলো,আরাত তাড়াহুড়ায় ব্যস্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
___” না, না, আমি এটা বলতে চাইনি, আপনি যান অফিসে যান!
তাকবীর মুচকি হেঁসে ফোন রেখে দিলো, তাকবীর তো শুধু আরাত কে বাজিয়ে দেখছিলো, অফিসে এখন যেতেই হবে বাধ্যতামূলক, অফিসের মিটিং আছে বিধায় গ্রাম থেকে সকালে খাবার খেয়ে দশটার দিকে বের হয়েছিলো, বাড়িতে পৌছাতে প্রায় দুঘন্টার মতো সময় লেগেছে, বাড়িতে ফিরে ফ্রেশ হয়ে নরমাল ড্রেসআপ চেঞ্জ করে অফিসের জন্য কোট প্যান্ট পড়ে বের হচ্ছে, তাকবীর আরাত কে লজ্জায় ফেলতে আরাতের কাছাকাছি আসতে আসতে বলল,

___” বউ আরেকটা চুমু প্লিজ, রসকষ চুমুতে আমার তৃপ্তি মিটে নাই!
___” নাহহহ…
আরাত নিজের হাতে কাপড় গুলো মুখে গুঁজে ধরলো, তাকবীর আরাতের কান্ড দেখে এবার শব্দ করে হেঁসে উঠলো,তাকবীরের হাসির শব্দে আরাত চুপিচুপি তাকবীর কে দেখতে লাগলো, তাকবীর হেঁসে উঠে আরাতের মাথায় গাট্টা মেরে রুম থেকে বের হতে হতে বলল,
___” পাগল একটা।
আরাত মুখ থেকে কাপড় নিচে নেমে, তাকবীরের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে বিরবির করলো,
___” আপনি জানেন যখন আপনি মুচকি হাসেন, আমার মনে হয় আপনার হাসি এই পৃথিবীর বেস্ট হাসি, মন চায় শুধু দেখতেই থাকি, মাশাআল্লাহ কত কিউট।

রশ্মি কলেজ ব্রেঞ্চে মাথা ঠেকিয়ে পেন হাতে নিয়ে খেলছিল, মাথায় চলছে জীবনের টানাপোড়েনের হিসাব,রশ্মির পিছনে মিরা আর সন্ধ্যা একি অপরের সঙ্গে গল্পে মগ্ন, সময়টাতে অফ পিরিয়ড বিদ্যমান, মুহূর্ত কয়েকের মাঝে ছুটি হবে। কয়েক সেকেন্ড পরপর সন্ধ্যা আর মিমের হাসির শব্দ শুনা যাচ্ছে, রশ্মি ব্রেঞ্চ থেকে মাথা উঠিয়ে পুরো ক্লাস রুম চোখ বোলালো, অনেকেই সন্ধ্যা মিরাদের মতো গল্পে মগ্ন হয়ে আছে, কিছুটা হইচইপূর্ণ আসর হয়ে আছে, কয়েক জোরা পায়ের আওয়াজে সবার হইচই বন্ধ হয়ে গেলো, সবার নজর দরজায়, মাহির আরশ রুপা তাসিন চারজন ক্লাসের মধ্যে ঢুকলো, ক্লাসে সবার নজর মাহির এর দিকে, আর মাহিরের নজর মিরা আর সন্ধ্যার উপর, সবার ধারণা মাহির পুনরায় রশ্মির সঙ্গে কথা বলতে এসেছে, সবাই বেশ আগ্রহ নিয়ে দেখতে লাগলো, মাহির সবার ধারণা ভুল প্রমাণ করে রশ্মি কে পাশ কেটে এসে সন্ধ্যার সামনে দাঁড়ালো, সবাই অবিশ্বাস্য হয়ে দেখতে লাগলো, সবার তালিকায় রশ্মিও পড়লো,মাহির সন্ধ্যার সামনে কোনো ভনিতা ছাড়া বলে উঠলো,

___” আরাত কে কলেজে দেখা যায় না কেনো?
মাহির কে আরাতের কথা জিজ্ঞেস করতে দেখে ক্লাসে আরেক দফা অবাকের বন্যা বয়ে গেল, রশ্মির বুক ধুকপুক করছে মাহিরের আরাত কে ঘিরে আগ্রহ দেখে, রশ্মি ফাঁকা মস্তিষ্কে মলিন মুখে মাহির কে পরক করছে, মাহির রশ্মি কে ইগনোর করে আরাত এর খোঁজ নিতে এসেছে, রশ্মি যেন বিশ্বাস করতে পারছে না, সন্ধ্যা কপালে সূক্ষ্মভাজ ফেলে তীক্ষ্ণ কন্ঠে মাহির কে উত্তর করলো,
___” আসে না এজন্য দেখা যায় না।
মাহির সন্ধ্যার উত্তরে তব্দা খেয়ে গেলো,পর মুহূর্তে গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
___” কলেজে আসবে কবে?
___” যেইদিন ওর ইচ্ছা করবে সেইদিন!
মাহির রাগী চোখে আরশের দিকে তাকালো, আরশ প্রথম থেকেই সন্ধ্যার দিকে বিরক্ত মুখে চেয়ে ছিলো, পুনরায় মাহিরের দিকে তাকাতেই দেখলো মাহির রাগী চোখে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে, আরশ মাহিরের কাছে এসে বিরবির করে বলে উঠলো,

___”সবগুলো এক কোম্পানির প্রোডাক্ট,এদের কথা বলবে একদিকে এরা নিয়ে যাবে অন্যদিকে, এদের বলে লাভ হবে না, চল এখান থেকে!
আরশের কথা শেষ না হতেই মাহির ব্যস্ত পায়ে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলো, আরশ সন্ধ্যা কে বিরক্ত মুখে বলল,
___” ইচ্ছাটা কবে করবে?
সন্ধ্যা আরশের দিকে ইনোসেন্ট ফেস করে মিষ্টি হেঁসে বলল,
___” যেইদিন আরাত কলেজে আসবে !
___” কথা বলায় বেকার।

আরশ সন্ধ্যার কথায় বিরক্ত হয়ে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলো,আরশের পিছনে রুপা তাসিন বের হয়ে গেলো, রশ্মি চুপচাপ মলিন মুখে তাঁদের যাওয়া দেখলো, সন্ধ্যা মিরা নিজেদের ব্যাগ নিয়ে উঠে পরলো, রশ্মি কে পাশ কেটে যেতে নিয়ে সন্ধ্যা পুনরায় রশ্মির দিকে তাকালো, রশ্মি কে অন্যমনস্ক দেখে সন্ধ্যা রশ্মি কে ডেকে উঠলো,
___ রশ্মি আপু, এই রশ্মি আপু, শুনতে পাচ্ছো, উঠো বাসায় যাবে না?
রশ্মি কে আগের ন্যায় চুপচাপ বসে থাকতে দেখে, সন্ধ্যা আর মিরা দুজন দুজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো, সন্ধ্যা পুনরায় উচ্চ স্বরে রশ্মি কে ঝাঁকে ডেকে উঠলো,

___” ওই আপু, শুনতে পাচ্ছো আমাকে?
রশ্মি এবার নিজের হুঁশে ফিরে এলো, সন্ধ্যার দিকে তাকাতেই সন্ধ্যা চোখের ইশারায় জানতে চাইলো,
___” কী হয়েছে তোমার?
রশ্মি আরাতের চোখের ইশারা বুঝতে পেয়ে বসা থেকে উঠে ব্যাগ নিয়ে কিছু না বলে ক্লাস থেকে আগে আগে বের হয়ে গেলো, সন্ধ্যা মিম দু’জনেই দ্রুত পায়ে রশ্মির সঙ্গে হাঁটতে লাগলো, সন্ধ্যা হাঁটতে হাঁটতে মিরা কে বলে উঠলো,

___” মিরা তোমার ক্রাশ নেই বা কাউকে ভালোলাগা ভালোবাসা?
মিরা হকচকিয়ে উঠলো, পর মুহূর্তে আমতা আমতা করে ছোট করে বলল,
___” না নেই।
সন্ধ্যা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মিরার দিকে তাকিয়ে বলল,
___” তুমি মিথ্যা বলছো কেনো?
মিরা সন্ধ্যা কে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে দেখে বিব্রতকর হলো,মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে তৎক্ষণিক আশেপাশে দেখতে লাগলো, সন্ধ্যার দৃষ্টি মিরার উপর আরো গারো এলো এতে,মিরার দৃষ্টিতে পষ্ট ভেসে উঠছে মিরা মিথ্যা বলছে,রশ্মির মনযোগ মিরার দিকে, সন্ধ্যা চঞ্চল কন্ঠে বলে উঠলো,
___” তুমি মেবি আদিল ভাইয়া কে লাইক করতে?
মিরা সন্ধ্যা আর রশ্মির দিকে তাকালো, দুজনের নজর তাঁর উপর, মিরা গলা খাঁকারি দিয়ে কিছু বলতে নিবে ঠিক তখনই তিন জনের পাশে মাহির বাইক নিয়ে দাঁড়ালো, তিনজনের কথার ব্যাঘাট ঘটতেই তিনজনে মাহিরের দিকে তাকালো,মাহিরের দৃষ্টি সামনে কলেজ গেট বরাবর, মুখে কোনো কথা নেই, মিরা সন্ধ্যা রশ্মির দিকে তাকিয়ে ছোট করে বলল

___”আগামীকাল গল্প করবো আল্লাহ হাফেজ!
মিরা বাইকে উঠার সঙ্গে সঙ্গে মাহির কোনোদিকে না তাকিয়ে বাইক নিয়ে টান দিলো, রশ্মি শুধু মাহির কে লক্ষ করছে,মাহির কে সবার সামনে রাগের মাথায় থাপ্পড় দেওয়ার পর থেকে মাহির আর রশ্মির দিকে তাকায় না পর্যন্ত, এক প্রকার রশ্মি কে ইগনোর করে চলছে, ক্লাসে একবারো রশ্মির দিকে তাকায়নি, এতে রশ্মির মন খারাপ হয়ে এলো,মন খারাপ নিয়ে রশ্মি বাড়ি ফিরলো, রশ্মি কলেজ থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে কিচেনে এসে নিজের জন্য নুডুলস আর মাহিরের জন্য কফি বানে নিয়ে মাহিরের রুমে এলো, মাহির কে রুমে না পেয়ে বেলকনিতে পা বাড়ালো,মাহির বেলকনিতে বসে আছে, দৃষ্টি তাঁর গার্ডেনে, মিরা মাহিরের সামনে কফি ধরল, মাহির একপলক কফির দিকে তাকিয়ে কফি নিয়ে পুনরায় ফাঁকা দৃষ্টি গার্ডেনে রেখে ছোট করে বলল,

___” থ্যাংকস!
মিরা হাসি মুখে ওয়েলকাম বলে মাহিরের পাশে সোফাতে বসে পরলো, লুডুলস মুখে পুড়ে নিতে নিতে বলল,
___” ফ্রেশ হও নাই কেনো?
মাহির কফিতে চুমুক বসাতে বাসাতে গার্ডেনে চোখ রেখেই বলল,
___” ইচ্ছা করছে না।
মিরা পুনরায় নুডুলস মুখে পুড়ে নিয়ে, কিছুপলক চুপচাপ মাহির কে দেখতে লাগলো, মাহিরের মন মেজাজ কোনোটাই ঠিক নেই মিরা খুব ভালো করেই জানে, তবুও সময় নিয়ে মাহির কে বলে উঠলো,
___” ভাইয়া তুমি আরাত কে কেনো খুঁজতে গেয়েছিলে ?
মাহির গার্ডেন থেকে চোখ সরিয়ে মিরার উপর রাখলো,সোফাতে সোজা হয়ে বসতে বসতে ছোট করে বলল,

___” কথা ছিলো।
___” আরাত এর সঙ্গে তোমার কী কথা থাকতে পারে, আর তোমার কী মনে হয় তুমি আরাত এর সঙ্গে কথা বলতে যাবে আর আরাত তোমার সঙ্গে কথা বলবে?
মাহির কফি টি টেবিলে রেখে দিলো,মাথা নিচু করে মলিন মুখে বলল,
___” কথা না বললে আমি বলবো, সবকিছুর জন্য ভুল শিখার করবো, ওর কাছে ভুল শিকার করে যদি আমার শান্তি মেলে।
___” তুমি শিকার করছো, তুমি ভুল করেছো?
মাহমুদ ইসলাম এর কথায় মিরা মাহির দুজনেই পিছনে ঘুরে তাকালো,মাহমুদ ইসলাম প্রশ্নভরা চাহনি নিয়ে মিরার পাশে এসে বসলো, মিরা আগেই মাহমুদ ইসলাম কে সবকিছু খুলে বলছিলো,মাহির বাবা-র প্রশ্নে মাথা নিচু করে নিলো, মাহমুদ ইসলাম পুনরায় বললেন,

___” ভুল থেকেই মানুষ শিক্ষা নেয়, তুমি যখন বুঝে ফেলছো ভুল করেছো,আরাতের প্রতি অন্যায় করেছো অনুতপ্ত হও, সরি বলো আরাত কে!
মাহির মাথা নিচু করে গম্ভীর গলায় ছোট করে বলল,
___” হুম।
মাহির পুনরায় মাথা তুলে গার্ডেনে চোখ রাখলো, মিরা আর মাহমুদ ইসলাম কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে মাহির কে একা ছেড়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো, মাহির গার্ডেন থেকে চোখ ফিরিয়ে ফোন হাতে নিলো, আরাত মাহির কে ব্লক করে দিয়েছে, গতকাল রাতে ফোন দিতে দেখে নাম্বার ব্লক, মেসেঞ্জার হোয়াটসঅ্যাপ সব জায়গা থেকে ব্লক করে রেখেছে, মাহির বসা থেকে রুমে এলো,নতুন একটা সিম বের করে ফোনে তুলে নিলো, আরাতের নাম্বার টাইপিং করে পুনরায় বেলকনিতে এসে দাঁড়ালো, প্রথমবার ফোন বেজে কেটে গেলো,মাহির পকেটে হাত গুঁজে বেলকনির এমাথা ওমাথা হাঁটতে লাগলো, দ্বিতীয় বার ফোন বেজে কেটে গেলো তৃতীয় বারের মাথায় ফোন রিসিভ হলো,আরাত ফোনের রিংটোনে ওয়াশরুম থেকে বের হতে হতে ফোন কেটে গেলো, দ্বিতীয়বার ফোন বাজতেই অচেনা নাম্বার দেখে ফোন রিসিভ করলো না, তৃতীয়বার এক নাম্বার থেকে বারবার ফোন আসাতে গুরুত্বপূর্ণ ফোন ভেবে, ফোন রিসিভ করে সালাম দিয়ে উঠলো,

___” আ
মাহির মনে মনে সালাম নিয়ে কথা সাজাতে লাগলো, কোথায় থেকে কী বলবে ভেবে পেলো না, আরাত বিপরীত পাশে কথা শুনতে না পেয়ে বিরক্ত মুখে পুনরায় বলে উঠলো,
___” হ্যালো কথা বলছেন না কেনো?
এবারও মাহির কথা বলল না,আরাত বিরক্ত হয়ে বলে ফেললো,
___” কথা না বললে ফোন দিয়েছেন কেনো, আজব পাবলিক কোথাকার।
আরাত ফোন কান থেকে নামিয়ে কাটতে যাবে, মাহিরের কথায় থমকে গেলো, কাঁপা কাঁপা হাতে পুনরায় ফোন কানে তুলে নিলো,

___” আরাত রিকুয়েস্ট করছি ফোন কাটবেন না প্লিজ!
আরাতের মধ্যে নিমেষেই বিরক্ত গুলো এসে জমা হয়ে গেলো, রাগী গলায় মাহির কে শাসিয়ে বলে উঠলো,
___” আপনার সাহস কী করে হলো আমাকে ফোন করার,ফারদার যদি ফোন করেন,আমি আপনাকে…
আরাতের কথা কেড়ে নিয়ে মাহির বলে উঠলো,
___” যা ইচ্ছা করেন, প্লিজ আমাকে জাস্ট একটা সুযোগ দেন?
___” আপনি পরপুরুষ, নেক্সট টাইম অন্যর
বউকে ফোন করে ডিস্টার্ব করবেন না মাইন্ড ইট!
___” আমরা আগে দিনরাত কথা বলতাম ভুলে গেলেন?
আরাত রাগী গলায় তিরতির মেজাজে বলে উঠলো,
___ ” পাপ করেছি পাপ, একটা ক্যারেক্টার লেঞ্জ চরিত্রহীন কাপুরুষের সঙ্গে কথা বলে ভুল করেছি!
___” আরাত…
___” কী আরাত, তোর প্রবলেম টা কী, ফোন করেছিস কেনো?
মাহির আরাতের ব্যাবহারে হতবিম্বল হয়ে গেলো, পর মুহূর্ত নিজেকে সামলে নিয়ে নিচু স্বরে অসহায় কন্ঠে বলে উঠলো ,

___” আরাত আই এম সরি, আমি ভুল করেছি, তোমার সঙ্গে অন্যায় করেছি, আমার ভিতরে অন্যায় গুলো ধীকে ধীকে মারছে, আমি কাউকে বলতে পারছি না, শান্তি পাচ্ছি না, নিজের উপর ঘিন্না হয়, কেনো তোমাকে চিট করলাম, কেনো তোমার সঙ্গে টাইম পাস করলাম!
আরাত মাহিরের কথায় তাচ্ছিল্য হেঁসে ব্যঙ্গ করে বলে বলল,

___” কাপুরুষ টাইম পাস করে, আর বীর পুরুষ বউ বানিয়ে ছাড়ে,আল্লাহর কাছে সবকিছুর জন্য হাজার কোটি শুকরিয়া, তোর মতো জঙ্গল কে না হারালে আমার জীবনে বীর পুরুষের আগমন হতো না গুডবাই।
আরাত ফোন কেটে দিয়ে শান্তির একটা নিঃশ্বাস ফেললো, আজকে যেন মনটা কিছুটা হালকা হয়ে এলো,ফুরফুরে মনে গ্যালারিতে তাকবীর আর নিজের ব্যাডমিন্টার খেলার ভিডিও টা বের করলো,ভিডিও আটকে তাকবীরের ছবি জুম করে ফোনের স্কিনে চুমু রেখে দিলো, হাসি মুখে জুম করা ছবিটা দেখতে দেখতে বলল,

___” আফসোস করবো, প্রশ্নেই আসে না, আপনি আমার জীবনে রহমত হয়ে এসেছেন, বিনা স্বার্থে আমাকে ভালোবাসেন,আপনার মতো জীবনসঙ্গী পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার, নিঃসন্দেহে আমি একজন ভাগ্যবতী।
আরাত ফোন কাটতেই মাহির অসহায় মুখে ফোন কান থেকে নিচে নেমে নিলো,ফাঁকা চোখে নিস্তব্ধ চোখে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলো, আরাত এর কথাটা বুকে গিয়ে লেগেছে, কাপুরুষ টাইম পাস করে, সত্যি কী কাপুরুষ, কাপুরুষের কী হৃদয় থাকে, কই মাহিরের তো আছে, সে তো একজন কে ভালোবাসে, তাঁকে ভালোবাতে গিয়ে তো আজকে মাহির কাপুুরুষ হয়ে গেলো, নিজের উপর তাচ্ছিল্য হাসা ছাড়া কিছুই এলো না,

গভীর রাত, সবকিছু নিস্তব্ধ, সন্ধ্যারাতে ঘুমানোর কারণে আরাতের ঘুম ভেঙ্গে গেল, নড়াচড়া করে বালিশের নিচে থেকে ফোন বের করে সময় দেখে নিলো,সময়টা রাত তিনটা বেজে এগারো মিনিট, আরাত ফোন রেখে দিয়ে মাথার নিচে হাত রেখে তাকবীরের দিকে তাকালো, ডিম লাইটে তাকবীরের মুখটা আকর্ষণীয় লাগছে,তাকবীর কতরাতে বাড়ি ফিরেছে আরাত বলতে পারলো না। তাকবীর রাতে বাড়ি ফিরে দেখতে পায় আরাত ঘুমে, আরাত কে না ডেকে ফ্রেশ হয়ে রাতের ডিনারের জন্য নিচে নেমে রাবেয়া তালুকদারের কাছে খাবারের প্লেট সাজিয়ে চাইলে। রাবেয়া তালুকদার জানায় আরাত সন্ধ্যার দিকে খাবার খেয়েছে,তাকবীর পরমুহুর্তে নিজের খাবার খেয়ে রুমে আসে,কিছুমুহূর্ত আরাত কে পর্যবেক্ষণ করে বিছানায় আরাতের পাশে ল্যাপটপ নিয়ে কাজে মগ্ন হয়ে যায়, আরাত ঘুমের মধ্যে এপাশ ওপাশ হয়ে নড়াচড়া করছিলো কিছুক্ষণ পরপর, তাকবীর কাজের ফাঁকে ফাঁকে আরাত কে লক্ষ করছিলো এবং আরাতের শরীরের উপর কম্বলটা যত্ন করে ঠিক করে দিচ্ছিল, রাত যখন বারোটা থেকে একটার ঘরে, তাকবীর ল্যাপটপ বেড সাইটের উপর রাখে, আরাতের পাশে শুয়ে আরাত কে দেখতে দেখতে ঘুমের দেশে পারি জমায়।

আরাত তাকবীরের দিকে কিছু মুহূর্ত চেয়ে থেকে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে চলে গেলো,কিছুক্ষণ সময় নিয়ে ফ্রেশ হয়ে তাহাজ্জুদের জন্য ওজু করে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলো,আজকে তাকবীরের সঙ্গে নামাজ আদায় করবে, কিন্তু বিপত্তি বেধে গেল তাকবীর কে ঘুম থেকে উঠাবে কীভাবে, আরাত তাকবীরের পাশে বসল,মুখের সামনে ঝুঁকে তাকবীর কে দেখতে লাগলো, কী ভাবে ডাকা যায় ভাবতে ভাবতে আরাত গলা খাঁকারি দিলো, তাকবীর গভীর ঘুমে শুনতে পেলো না, আরাত ঠোঁট উল্টে ভাবতে লাগলো, কী করা যায়, বীর ভাইয়া বলে ডাকবো, না না স্বামী কে ভাইয়া ডাক কেমন দেখায়, আরাত অনেক ভেবেও খুঁজে পেলো না কিভাবে জেগে তুলবে তাকবীর কে, আরাত ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে দুষ্টু হেঁসে উঠলো,পর মুহূর্তে মনে সাহস জুটে তাকবীরের কাঁপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো,
তাকবীর ঘুমের মধ্যে কাঁপালে ঠান্ডা ঠোঁটের ছোঁয়া পেয়ে কপাল কুঁচকালো, খানিকটা নড়েচড়ে উঠলো,তাকবীর কে ঘুমের মধ্যে কপাল কুঁচকাতে দেখে আরাত মুচকি হেঁসে শীতল কন্ঠে ডেকে উঠলো,

___” শুনছেন, নামাজ পরবেন না?
আরাত এর শীতল কন্ঠে তাকবীর ভ্রু কুঁচকে নিভু নিভু চোখ মেলে তাকালো, নিজের মুখের সামনে আরাত এর মুখ দেখতে পেয়ে কুঁচকানো ভ্রু আরো কুঁচকে এলো,আরাত আগের ন্যায় পুনরায় বলে উঠলো,
___” নামাজ আদায় করবেন না?
তাকবীর এর কুঁচকানো ভ্রু সোজা হয়ে এলো, পুরো মুখে মুগ্ধতা ছেয়ে গেলো, নীরবতা ভেঙ্গে গম্ভীর মুখে এক টুকরো হাসি ফুটে বলে উঠলো,

___” মাশাআল্লাহ।
___” উঠুন লেট হয়ে যাচ্ছে!
আরাত বসা থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো, তাকবীর কম্বল শরীর থেকে সরিয়ে বিছানায় বসে পরলো, ঘুম না হওয়ায় চোখ জ্বালা করছে,আরাত কে নামাজের জন্য নিজে থেকে ডাক দিতে দেখে তাকবীরের মনে প্রশান্তি বয়ে গেল,পরমুহুর্তে কিছু মনে পড়তেই তাকবীর ভ্রু কুঁচকে, কপালে হাত রেখে আরাত এর দিকে তাকালো, আরাত দুজনের জন্য জায়নামাজ বিছিয়ে দিচ্ছে, তাকবীরের মস্তিষ্ক জানান দিচ্ছে অন্য কিছু, কিন্তু তাকবীর সিওর না,

___” রাত?
___” হ্যাঁ বলেন?
আরাত তাকবীরের ডাকে পিছু ফিরে তাকালো, তাকবীর কে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরাত হকচকিয়ে উঠলো, মনের মধ্যে জানান দিচ্ছে, তাকবীর কী বুঝতে পারলো, লুকিয়ে চুমু দেওয়ার ব্যাপারটা, আরাত নিজে নিজে কথাটা ভেবে একা একাই লজ্জায় বিব্রতকর অনুভব করলো,আরাত কে লজ্জা পেতে দেখে তাকবীর তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে উঠলো,
___”বাই এনি চান্স তুমি কী ….
___” উঠুন লেট হয়ে যাচ্ছে!

আরাত তাকবীরের মুখ থেকে কথা কেরে নিয়ে দ্রত লজ্জামাখা কন্ঠে কথাটা বলে ওয়াশরুমে দৌড় দিলো, আরাতের কান্ডে তৎক্ষণিক তাকবীরের কপালের তীক্ষভাজ সূক্ষ্মভজে উপত্যারিত হলো,তাকবীরের আর বুঝতে বাকি রইলো না তাঁর সঙ্গে ঠিক, তাকবীর দু’হাতে হাঁটু জড়ে বিছানায় বসে পরলো,মুখে তৃপ্তির হাসি, মাথা নিচু করে মনে মনে আরাতের পরিবর্তনে শুকরিয়া আদায় করতে ভুললো না,আরাত ওয়াশরুমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের লজ্জামাখা মুখটা দেখে পুনরায় লজ্জা পেলো, এখন তাকবীরের সামনে যাবে কী ভাবে ভাবতেই লজ্জা লাগছে, কেটে গেলো দু থেকে তিন মিনিট তবুও আরাত ওয়াশরুমের দরজা খুললো না, তাকবীর অপেক্ষা করতে করতে দরজার সামনে এসে আরাত কে ডেকে উঠলো,

___” রাত ওপেন দ্যা ডোর!
তাকবীরের কন্ঠ শুনতে পেয়ে আরাত নিজেকে সামলে পুনরায় ওজু করে ওয়াশরুমের দরজা খুলে দিলো, তাকবীর আরাতের দিকে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে, আরাত মাথা নিচু করে তাকবীর কে পাশ কেটে বেরিয়ে এলো, তাকবীর আরাত কে একপলক দেখে ওয়াশরুমে চলে গেলো,
দুজনে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করছে, স্বামী স্ত্রী একসঙ্গে গভীর রাতে রবের কাছে তাঁদের মর্জি জানাচ্ছে, মুহূর্তটা পৃথিবীর সৃষ্ট এক মুহূর্ত, দৃশ্যটা অপরুপ সুন্দর, তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করার পর তাকবীর তাঁর অর্ধাঙ্গীর কোলে মাথা রাখে, হাতে তসবিহ, আরাত কে আর আজকে বলতে হলো না মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে, আরাত নিজে থেকে তাঁর নরম নরম হাতে তাকবীরের মাথা বুলিয়ে দিচ্ছে, তাকবীরের চোখ বন্ধ, এভাবেই কেটে গেলো, কিছু মুহূর্ত,দূর মসজিদ থেকে ভেসে এলো ফজরের মধুময় সুর, দুজন একি সঙ্গে পুনরায় ফজরের নামাজ আদায় করল, রাত ফুরিয়ে ভোরের আলো ফুটে উঠছে, তবুও সূর্যর দেখা নেই, চারপাশ শুধু ধু ধু কুয়াশায় ভরা,আরাত নামাজ আদায় করে বিছানায় কম্বল টেনে শুয়ে পড়ে, তাকবীর আয়নার মধ্যে আরাত কে দেখতে দেখতে মাথায় ক্যাপ পড়ে নেয়, আরাত শুয়ে থেকে তাকবীরের দিকে দেখতে দেখতে হটাৎ বিছানায় বসে পরলো,

___” আমি যাবো!
তাকবীর ভ্রু কুঁচকে পিছনে ঘুরলো, আরাত কে একনজর দেখে কিছু না বলে বেড সাইট থেকে ঘড়ি নিয়ে হাতে পরতে লাগলো,তাকবীর কে কিছু বলতে না দেখে আরাত তাকবীরের দিকে তাকিয়ে বাহানা ধরে পুনরায় বলে উঠলো,
___”আমিও আপনার সঙ্গে মর্নিং ওয়ার্কে যাবো!
তাকবীর গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
___” নো, ঠান্ডা লেগে যাবে।
তাকবীরের কথায় আরাত মন খারাপ করল,পর মুহূর্তে বিছানা থেকে নামতে নামতে পুনরায় বাহানা ধরে বলে উঠলো,

___” ঠান্ডা লেগে যাবে ওষুধ খেয়ে নিবো,তবুও আমি আপনার সঙ্গে কুয়াশা ভরা শিশির বিন্দু কণায় পা ভেজাবো।
তাকবীর কপাল কুঁচকে আরাত কে দেখতে লাগলো, আরাত যেন দিনকে দিন সাহসি হয়ে উঠছে, তাকবীর কে অনায়াসে আবদার করে বসে, মুখে মুখে কথা বলছে,তাকবীর গলা খাঁকারি দিয়ে উপর হয়ে কেচের ফিতা বাধতে বাধতে বলে উঠলো,
___” তুমি ইদানিং হুটহাট আবদার করে বসো রাত!
আরাত বিছানা থেকে নেমে দৌড়ে আলমারির কাছে এলো, হাসি মুখে আলমারি থেকে বোরকা বের করতে করতে তাকবীর কে উওর করে উঠলো,

___” কারণ আপনি পূরণ করেন এজন্য।
তাকবীর গম্ভীর মুখে চুপচাপ তাকাল আরাত এর দিকে, আরাত খুশি মনে আয়নার সামনে দাড়িয়ে বোরকা পড়ে স্কাপ করতে লাগলো, তাকবীর আরাত কে দেখে ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেললো,বেড সাইট থেকে মানিব্যাগ নিয়ে টাউজারের পকেটে রাখলো, আরাত রেডি হয়ে তাকবীরের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” চলেন আমি রেডি!
আরাত কথাটা বলে আগে আগে রুম থেকে বের হতে লাগলো, তাকবীর আরাত কে পিছু ডেকে উঠলো,
___” টু সেকেন্ড!
আরাত অবাক হয়ে পিছনে তাকালো, তাকবীর আরাত কে পা থেকে মাথা অবধি পরক করল, পরমুহুর্তে আলমারির দিকে যেতে যেতে ছোট করে বলল,

___” ওয়েট।
আরাত কিছুই বুঝলো না তাকবীরের আটকানোর কারণ, তাকবীর আলমারি থেকে নিকাব আর কেচ বের করলো,আরাত নিজের পায়ের দিকে তাকালো, খালি পা আর স্কাপ করলেও নিকাব পড়েনি, কারণ এত সকাল বেলা বাহিরে মানুষজন খুব একটা বের হবে বলে মনে হয়না, আর খালি পায়ে বের হতে চেয়েছিল, যেন কুয়াশার মধ্যে খালি পায়ে হাঁটবে বলে, কিন্তু তাকবীর কে নিকাব আর কেচ বের করতে দেখে আরাত মন খারাপ করল, তাকবীর আরাতের মন খারাপ কে অগ্রহ করে প্রথমে মেঝেয় এক হাঁটু মুড়ে বসে পরলো, আরাত অবাক হয়ে দেখছে শুধু, তাকবীর কথা না বলে গম্ভীর মুখে আরাতের পা উঁচু করে কেচ পড়িয়ে দিতে লাগলো, আরাত কিছু বলতে নেবে তাকবীর ছোট করে বলল,

___” ডোন্ট টক।
আরাত আর কিছু বলল না, তাকবীর আরাত কে কেচ পড়িয়ে দিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো, পুনরায় নিকাব নিয়ে আরাতের মুখে বেঁধে দিতে লাগলো, আরাতের মুখ মলিন হয়ে আছে, তাকবীর মাথার পিছনে নিকাব বেধে দিতে আরাত এর মাথা নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো, তাকবীরের বুক অস্বাভাবিক ভাবে ধুকপুক করছে, আরাত বুকে মাথা রেখে ধুকপুকের শব্দ পেয়ে পুনরায় মুখ তুলে তাকবীরের মুখের দিকে তাকালো চাইলো, কিন্তু পারলো না তাঁর আগেই তাকবীর নেকাবের ফিতা বেধে আরাতের থেকে দূরে সরে দাঁড়ালো, মুখ দেখে বুঝা দায় বুকের খবর, আরাত তাকবীরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, তাকবীর গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর গলায় রুম থেকে বের হয়ে যেতে যেতে বলল,

___” লেটস গো।
আরাত তাকবীরের যাওয়ার পানে কিছুক্ষণ নীরবতা চোখে চেয়ে থাকলো,তাকবীর আরাত কে নিজের সঙ্গে আসতে না দেখে পিছনে ফিরে কপাল কুঁচকে তাকালো, আরাত তাকবীর কে তাকাতে দেখে জিব্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে দ্রুত তাকবীরের সঙ্গে হাঁটা ধরলো, এত সকালে ড্রয়িং রুম ফাঁকা সবাই জেগে গেলেও নিচে কেউ নামে নাই এখনো, আরাত তাকবীর বাড়ি থেকে হাঁটতে লাগলো, তাকবীরের হাঁটার সঙ্গে আরাত পেয়ে উঠলো না,না পেয়ে দৌড়াতে লাগলো, আরাত কে দৌড়াতে দেখে তাকবীর কপাল কুঁচকে জায়গায় দাঁড়িয়ে পরলো, আরাত কিছুদূর দৌড়ে নিজের পাশে তাকবীর কে না দেখতে পেয়ে পিছনে ফিরে তাকালো,তাকবীর কে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরাত লজ্জা পেলো বেশ দৌড়েনের কারণে, তাকবীর কিছু বলল না বড়বড় পা ফেলে আরাতের কাছে এসে দাঁড়ালো, আরাত কে লজ্জা পেতে দেখে বলল,

___” চলো একটা গেম খেলা হয়ে যাক!
আরাত অবাক হয়ে বলল,
___”গেম ?
___”হ্যাঁ গেম, সামনে স্কুল মাঠ অবধি দৌড় দিতে হবে, তুমি জিতে গেলে তুমি আমার ফেভারিট ডিশ রেঁধে খাওয়াবে,বাই এনি চান্স আমি জিতে যাই, তাহলে আমি যা চাইবো তোমাকে তাই দিতে হবে গট ইট?
আরাত তাকবীরের কথা বুঝার চেষ্টা করছে, জিতে গেলে রেঁধে খাওয়াতে হবে, আবার হেরে গেলে তাকবীর যা চাইবে তাই দিতে হবে, আরাত কিছু বলতে নিতে তাকবীর আরাত কে বলার সুযোগ না দিয়ে নিজেই আরাত কে তাড়া দিয়ে বলে উঠলো,

__বাই দ্যা ওয়ে লেট হয়ে যাচ্ছে, টেক কেয়ার! আর হ্যাঁ অল দ্যা বেস্ট!
আরাত কিছু বলতে পারলো না, তাকবীর 123 বলে দৌড় দিতে গিয়ে থেমে গেল, আরাত তাকবীর কে দৌড় দিতে দেখে আগেই দৌড় ধরলো, আরাত যখন মাঝামাঝি পথে, তাকবীর আরাতের দৌড়ের দিকে চেয়ে দৌড় দিলো,ছেলেদের দৌড়ের সঙ্গে মেয়েরা কখনো পেয়ে উঠে না, তাকবীর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আরাতের কাছে পৌঁছল, আরাত স্কুল মাঠের কাছাকাছি আসতেই তাকবীর দৌড়ে এসে এক হাত দিয়ে আরাত কে উঁচু করে ধরে দৌড় লাগলো, আরাত এর সবকিছু মাথার উপর দিয়ে চলে গেলো, তাকবীর মাঠে এসে আরাত কে এক টানে কোলে তুলে নিয়ে মাঠের মধ্যে ঘুড়তে লাগলো, দৃশ্যটা অপরুপ, দূর থেকে কেউ দেখলে বলবে, এখানে হয়তো মুভির শুটিং হচ্ছে, চারপাশ কুয়াশায় ভরা এত সকালে আশেপাশে মানুষ দেখা গেলো না, তাকবীর আরাত কে কোলে নিয়ে কয়েক বার ঘুড়িয়ে জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো, দুজনেই হাপাচ্ছে তাকবীর মুখে হাসি টেনে আরাতের কাঁপালে নিজের কপাল ঠেকালো,নেকাবের আড়ালে আরাতের মুখে হাসি লেগে আছে, তাকবীর আরাতের কপালে কপাল ঠেকে শীতল কণ্ঠে বলে উঠলো,
___”তুমি আমার ভালোবাসা নও,তুমি আমার কবুল হওয়া দু’আ। যা আমি খুব নীরবে আমার রবের কাছে চেয়ে এসেছি।
আরাত তাকবীরের গালে হাত রাখলো,তাকবীর আরাতের চোখের দিকে তাকাতে আরাত মিষ্টি হাসি টেনে বলল,
___” আমি সত্যিই ভাগ্যবতী, কারণ আপনার মোনাজাতে আমি ছিলাম।

বিয়ে হয়ে গেলে মানুষের মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন আসে, যেমন নতুন সংসার নতুন জীবন নতুন ঘর, সবকিছু মেনে নিতে গিয়ে বিয়ের আগের জীবন টা হারিয়ে ফেলে, ভাইবোন মা-বাবা ফ্রেন্ডসার্কেল সবার সঙ্গে আর আগের মতো ইচ্ছা হইলেই দেখা করা যায় না, আরাত তো ভাগ্যবতী, নিজের বাবা-র বাড়ি শশুর বাড়ি হয়ে গেছে, মা-বাবা ভাই বোন ফ্রেন্ড সবার সঙ্গে আগের মতো কথা বলতে পারছে, শুধু পরিবর্তন ঘটেছে আগের মতো রশ্মির সঙ্গে সময় কাটানো, আগে তো এক বেডে দুজন ঘুমিয়ে ছিলো, কতশত খুনশুতি জরিয়ে ছিলো, আরাত তাকবীরের রুমে থাকার পর থেকে রশ্মি আর আগের মতো হুটহাট তালুকদার বাড়িতে আসে না, আসবে কী করে এলে তো আর আরাতের সঙ্গে আগের মতো সময় কাটাতে পারে না, সকালের খাবার খেয়ে মিম কে সঙ্গে নিয়ে
রশ্মিরাত, তাকবীরের গাড়িতে কলেজ এলো, কলেজের সামনে গাড়ি দাঁড়াতেই রশ্মি নামতে নিলো, মিম রশ্মির সঙ্গে নেমে পরলো,মিম আরাত কে নামতে না দেখে রশ্মির দিকে তাকালো, রশ্মি মিমের তাকানো দেখে মুচকি হাসলো,মিম বুঝলো না রশ্মির হাসির কারণ, রশ্মি কে প্রশ্ন করতে করতে গাড়ির দিকে ঝুঁকে আরাত ডাকতে নিলো,

___” বুঝলাম না আরাত আপু নামছে না কেনো, আরাত আপু তুমি….
___” এই কী করছো, দেখছো না তাকবীর ভাইয়া ভিতরে!
রশ্মি মিমের হাত টেনে মিম কে আটকে বলল কথাটা, মিম অবুঝের মতো রশ্মি কে পুনরায় বলে উঠলো,
___”ভাইয়া আছে তো কী হয়েছে, আপু নামছে না কেনো?

___” জানি না আমি,তুমি আমার সঙ্গে চলো আরাত চলে আসবে,আমি তোমাকে পুরো কলেজ ঘুরিয়ে দেখায়।
রশ্মি মিম কে টেনে নিয়ে কলেজের ভিতরে চলে গেলো, আরাত তাকবীরের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে, ওই হাতের মধ্যে তো আরাতের নরম সুন্দর হাতটা বন্দী হয়ে আছে, আরাত হাত থেকে চোখ তুলে তাকবীরের দিকে তাকালো, তাকবীর অফিসের গেটাপে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে উপর অন্য হাত রেখে সামনে দেখছে, রশ্মি মিম কলেজে ভিতরে যাওয়ার পরপর তাকবীর ভ্রু কুঁচকে আরাতের দিকে তাকালো, তাঁর তাকানোতে মনে হচ্ছে আরাত গাড়ি থেকে না নেমে মহাভারত ভুল করে ফেলছে,

___” হোয়াট হ্যাপেন্ড, নামছো না কেনো, আমার লেট হয়ে যাচ্ছে?
আরাত ভেবাচেকা খেয়ে গেলো, প্রথমত নিজের হাতের মধ্যে আরাতের হাত বন্দী করে রেখেছে, আর এমন ভাবে বলছে মনে হয় আরাত নিজে থেকে গাড়ি থেকে নামতে চাইছে না, আরাত তাকবীরের কথায় কাচুমাচু করতে করতে বলে উঠলো,
___” আমার হাতটা!
তাকবীর ঠোঁট কামড়ে দুষ্টু হেঁসে ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
___” কই?
আরাত মন ভার করে বলল,
___” আপনি ধরে রেখেছেন!
___” আমি কেনো তোমার হাত ধরে রাখতে যাবো, এটা আমার বউয়ের হাত।
কথাটা বলতে বলতে তাকবীর আরাতের হাতে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো, আরাত সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠলো, কাঁপা কাঁপা গলায় নিচু স্বরে বলে উঠলো,

___” হাতটা ছাড়েন আমি গাড়ি থেকে নামবো!
তাকবীর আরাত কে এক ঝটকায় নিয়ে কাছে নিয়ে এসে, আরাতের চোখে চোখ বলল,
___” ছাড়তে পারি একটা শর্তে!
___” জ্বি?
___” আমার চাওয়া পূরণ করবে না?
আরাত মুখ ভার করে উওর করলো,
___” আপনি আমি কেউ জিতে নাই, তাহলে আপনার চাওয়া পূরণ করবো কেনো?
___” হাসবেন্ড যা বলে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হয়,হাজবেন্ডের চাওয়া পূরণ করতে হয়,আমি যদি বলি তোমাকে এখানে…

___” চুপপপপ আপনি যা চাইবেন আমি পূরণ করবো, আমার হাতটা ছাড়েন প্লিজ!
আরাত আরেক হাত দিয়ে নিজের চোখ চেপে ধরে কথাটা বলল,তাকবীর আরাতের কান্ডে দুষ্টু হেঁসে আরাত কে লজ্জায় ফেলতে পুনরায় বলল,
___”ভেবে বলছো তো, যা চাইবো তাই দিবে?
আরাত ঢোক গিললো, না বুঝে বলে তো ফেললো যা চাইবে তাই দিয়ে দিবে, তাকবীর কী চেয়ে বসবে, আরাত আমতা করে বল উঠলো,

___”কী চাই আপনার?
তাকবীর আরাতের হাত চেপে রেখেই সিটি মাথা এলিয়ে দিলো, চোখ বন্ধ করে নিয়ে বলল,
___” রাতে চেয়ে নিবো, এখন জাস্ট নিকাব খুলে চুমু রেখে দেও।
আরাত চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে বলল,
___” অসম্ভব….
তাকবীর আগের ন্যায় সিটে মাথা এলিয়ে বলল,
___” সবই সম্ভব।
আরাত উপায় না পেয়ে চুপচাপ বসে রইলো, তাকবীর চোখ বন্ধ রেখেই বলল,
___” ফার্স্ট।

আরাত কাচুমাচু করে গাড়ির কাচ ভেদ করে বাহিরে চারপাশ দেখে নিলো,পুনরায় তাকবীরের দিকে তাকিয়ে মন ভার করে নেকাব উপরে তুলে তাকবীরের কাঁপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো, তাকবীরের ঠোঁটে মুচকি হাসি, আরাতের হাতটা নিমেষেই তাকবীরের হাত থেকে আলগা হয়ে এলো,তাকবীরের হাত থেকে আরাত নিজের হাত ছাড়া পেতেই লজ্জায় গাড়ি থেকে দ্রুত পায়ে নামতে লাগলো, তাকবীর চোখ বন্ধ রেখেই বলল,
___” রাতের চেয়ে বেটার ছিলো।

আরাত তাকবীরের কথা শুনে পুনরায় পেছনে ফিরে তাকবীরের দিকে তাকালো,সঙ্গে সঙ্গে তাকবীর চোখ মেলে আরাতের দিকে তাকালো, আরাত লজ্জা পেয়ে কোনোদিকে না তাকিয়ে গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে কলেজের ভিতরে চলে গেলো, তাকবীর আরাতের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে গাড়ি টান দিলো, আরাত কলেজে ঢুকে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে রশ্মি মিমের খোঁজে, হটাৎ কোথা থেকে মাহির সামনে এসে দাঁড়ালো, আরাত কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে নিজেকে সামলে নিলো, মাহির প্রথম থেকেই দূরে দাঁড়িয়ে আরাত আর তাকবীর কে দেখছিল, রশ্মি আর মিম কে কলেজে ঢুকতে দেখে মাহির থায় দাঁড়িয়ে যায়, গাড়ির দিকে খেয়াল করতেই তাকবীর কে দেখেই চেনে ফেলে,তাকবীরের সঙ্গে বোরকা পরিহিত মেয়েটা যে আরাত এটাও খুব সহজে বুঝতে পেয়ে যায়, তাকবীর আরাত কে এতটা কাছাকাছি দেখে মাহিরের মধ্যে খারাপ ছেড়ে গেলো, একটা কথায় মাথায় এলো আরাত তো সুখী আছে তাহলে আমার বেলায় এতটা শাস্তি কেনো,আরাত গাড়ি থেকে নেমে কলেজে ঢুকা মাত্রই মাহির আরাতের সামনে এসে দাঁড়ালো,আরাত মাহির কে পাশ কেটে যেতে নিলে মাহির পুনরায় আরাতের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আসহায় মুখে বলে উঠলো,

___” প্লিজ আরাত বেশি না দু মিনিট কথা বলবো!
আরাত তিরতির মেজাজে হিসহিসিয়ে বলল,
___” পথ আটকাবেন না,সাইট হন।
___” প্লিজ আরাত দু মিনিট!
আরাত রাগী গলায় বলে উঠলো,
___” ভালো আছি ভালো থাকতে দেন বেশি খোঁচাবেন না, নহলে আমিও বেয়াদব কম না।
এতক্ষণে কলেজ মাঠে ভীড় জমে গেছে, মাহির আশেপাশে তাকালো, সবাই তাকিয়ে মজা নিচ্ছে, এজন্য মাহির আরাত এর কাছে সময় চাচ্ছে কলেজের বাহিরে কথা বলার জন্য,মাঠের মধ্যে ভীড় দেখে সবার মতো রশ্মি মিম মিরা সন্ধ্যা, চারজন এসে দাঁড়ালো, আরাত কথাটা বলে আশেপাশে তাকিয়ে পুনরায় মাহির কে পাশ কেটে যেতে নিলো, মাহির আগের ন্যায় পথ আটকে আরাতের এক হাত ধরে বলতে লাগলো,

___” কিছু তো বলো,আমার উপর চিৎকার করো,আমাকে অপমান করো, গালি দেও,কিছু একটা করো, আমাকে মাপ চাওয়ার সুযোগ দেও প্লিজ।
আরাত মাহির এর হাতের মধ্যে থেকে নিজের হাত ঝারা মেরে বের করল,পুনরায় কোনোদিকে না তাকিয়ে সবার সামনে মাহিরের গালে থাপ্পড় লাগলো, পুরো কলেজ হা হয়ে দেখতে লাগলো, রশ্মি মুখে হাত দিয়ে করুণ চোখে মাহির কে দেখছে, মিরা দৌড়ে মাহিরের কাছে এসে অসহায় মুখে দাঁড়ালো, হ্যাঁ মানছে তাঁর ভাই ভুল করেছে, আর কত শাস্তি তাঁর জন্য, একদিন রশ্মি তো আরেকদিন আরাত, তাঁদের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে তাঁর ভাই পুরো ভার্সিটির ক্রাশ এন্ড বড় ভাই বলে মানছে বা শ্রদ্ধা করছে, যবে থেকে মাহিরের জীবনে রশ্মিরাতের আগমন ঘটে, তখন থেকে সবার সামনে হাসির খোরাক হয়ে গেছে, অন্য মেয়েদের ইগনোর করা ছেলেটা আজকাল সবার সামনে ছোট হচ্ছে বারবার, মাহির গালে হাত দিয়ে আরাতের দিকে তাকালো, তখনই আরশ আর রাফি কে দৌড়ে তাঁদের দিকে আসতে দেখা গেলো, আরাত রাগের মাথায় মাহিরের দিকে আঙ্গুল ত্যাক করে হিসহিসিয়ে বলতে লাগলো,

___” আমাকে যদি নেক্সটাইম স্পর্শ করার চেষ্টা করেছিস, খোদার কসম তোকে আমি জেলের ভাত খাওয়াবো, আমাকে স্পর্শ করার রাইট শুধু আমার হাজবেন্ডের, তোর মতো মুনাফিকের না বুঝতে পারছিস।
মিম আর সন্ধ্যা আরাতের পাশে এসে দাঁড়ালো, আরাত কে শান্ত করতে মিম আরাতের এক হাত ধরে রাখলো,মিরা নিজের ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কান্নাভেজা কন্ঠে আরাত কে বলে উঠলো,
___” প্লিজ আরাত অনেক হয়েছে, মানছি ভাইয়া ভুল করেছে, তাঁর জন্য সরি বলতে চাইছে, আর তোমরা দুজন সবার সামনে আমার ভাই কে দিন কে দিন অপমান করে যাচ্ছো, আমার ভাইয়ের দোষ কই, যাকে ভালোবেসে তাঁকে চাওয়াটা কী দোষের, ভাইয়া অপরাধ করেছে বাট দোষ না, তুমি তো ভাইয়ার জন্য আর কষ্ট পাচ্ছো না, সংসার করছো সুখে আছো তাহলে?
মিরার কথায় আরাতের রাগটা যেন বেড়ে গেলো, রাগের মাথায় তাচ্ছিল্য হেঁসে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,

___”সরি, সরি বললে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে,ওকে? এক মিনিট!
আরাত মাহিরের কাছে এসে নির্দ্বিধায় মাহিরের উপর গালে আরেকটা থাপ্পড় বসালো,
___” সরি।
আরাত মাহির কে থাপ্পড় দিয়ে মিরার দিকে তাকালো, ইনোসেন্ট ফেস করে বলল,
___” সরি বললাম প্রবলেম সলভ!
আরাতের কান্ডে সবাই হতভম্ব হয়ে গেলো, মাহির দাঁতে দাঁত চেপে জায়গায় দাঁড়িয়ে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে সবকিছু হজম করতে লাগলো,সন্ধ্যা মিম আরাতের দুপাশে এসে আরাত এর দুহাত ধরলো,রশ্মি সবার মতো নিস্তব্ধ হয়ে দেখছে সবকিছু, আরাত নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে না পেয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলল,

___” আমার চলাফেরা সাধারণ হতে পারে কিন্তু আমি মানুষটা দুর্বল না,শান্ত ছিলাম বলে ভেবে নিবেন না সবকিছু মেনে নিয়েছি।
আরাত মাহিরের থেকে চোখ ফিরিয়ে মিরার দিকে রাখলো, মিরার দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গ করে হেঁসে পুনরায় বলে উঠলো,
___” ক্ষমা তো তাঁর পাওয়া উচিত যে নিজের অজান্তে ভুল করে, যে কিনা জেনে বুঝে বিশ্বাস ভাঙ্গে তাকে কী করে ক্ষমা করবো,কারো মনে ভালোবাসা জাগিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া তাকে হত্যা করার সমতুল্য জানো তো?
আরাতের কথা শেষ না হতে মাহির সবার সামনে থেকে গটগট পায়ে জায়গা ত্যাগ করতে পা বাড়ালো, সবার সঙ্গে ভীড়ের মধ্যে রশ্মি কে করুণ চোখে নিজের দিকে তাকাতে দেখে মাহির রশ্মি কে পাশ কেটে সোজা বড়বড় পা ফেলে জায়গা ত্যাগ করলো, আরাত মাহিরের যাওয়ার পানে তাকিয়ে হাত দিয়ে চোখের পানি টুকু মুছে নিলো,আরাতের চোখের পানি তে নেকাব ভেজে একাকার, আরাত ছোট করে নিঃশ্বাস ফেলে মিরা কে পুনরায় বলল,

___” কী যেন বললে আমি সুখী, আলহামদুলিল্লাহ আমি সুখী, কী জানো তো ঝড়ে যাওয়া ডাল থেকে কিন্তু নতুন পাতা গজায়!
রাফি মিরার পাশে এসে দাঁড়ালো, মিরা কে কান্না করতে দেখে রাফি গম্ভীর গলায় বলল,
___” ক্লাসে যাও!
___” কিন্তু রাফি ভাইয়া…?
রাফি মিরার কথায় ধমকে উঠলো,
___” কী হলো, যেতে বলছি না!
মিরা আরাত আর সন্ধ্যা কে একপলক দেখে মলিন মুখে ক্লাস রুমে চলে গেলো,রাফি মিরার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আরাত এর সামনে এসে দাঁড়ালো, রাফির সঙ্গে আরশ এসে দাঁড়ালো,মিম কে কলেজে আসতে দেখে আরশের মাথায় চলছে অন্য ভাবনা, আরশ বাঁকা চোখে আরাতের পাশে দাড়ানো মিম কে দেখতে লাগলো, মিম আরশ কে নিজের দিকে বাঁকা চোখে তাকাতে দেখে ইগনোর করছে,রাফি আরাতের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝনোর ন্যায় বলে উঠলো,

___” সবকিছু মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো, যাও ক্লাসে যাও লেট হয়ে যাচ্ছে।
আরাত রাফি কে ছোট করে হুম বলে রশ্মির কাছে এলো,রশ্মি কে চুপচাপ মলিন মুখে থাকতে দেখে আরাত রশ্মির হাত ধরে ক্লাসের দিকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
___” রশ্মি তোর ভিতরে স্বার্থপরের গন্ধ পাচ্ছি!
আরাতের কথায় রশ্মি উত্তর করলো না,মলিন মুখে আরাতের পিছু হাঁটতে লাগলো, তাঁদের পিছনে মিম সন্ধ্যা হাঁটতে লাগলো, মাঠটা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেলো, রাফি আরশ নিজেদের ক্লাসের দিকে পা বাড়ালো, মাহির বাড়ি ফিরে কোনোদিকে না তাকিয়ে নিজের রুমে ঢুকে গেলো, ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে রাগের মাথায় পুরো রুম তছনছ করছে নিমেষেই, বিছানার চাদর কম্বল মেঝেতে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে, দামী দামী ফুলদানি মেঝেতে ভেঙ্গে পড়ে আছে, মাহির রাগ কন্ট্রোল করতে না পেয়ে মাথার চুলগুলো টেনে ধরে চিৎকার দিয়ে উঠলো,

___” আহহহহহ,
মাহির চিৎকার দিয়ে মাথার চুল টানতে টানতে মেঝেতে বসে পরলো,পাগল পাগল লাগছে সবকিছু, যতবার রশ্মিরাতের থাপ্পড়ের কথা মনে পড়ছে, ততবার নিজেকে শেষ করে দিতে মন চাচ্ছে, পুরো কলেজের সামনে থাপ্পড়, একে একে দুইদিন, এর চেয়ে অপমান বোধহয় এই পৃথিবীতে আর নেই, মাহির চোখ বন্ধ রেখে রাগের মাথার চিৎকার দিতে দিতে বলল,
___” ভুলটা না হয় আমার ছিলো বাট তুমি তো আমাকে ভালোবাসতে, তাহলে ক্ষমা করতে পারলে না কেনো….কেনো কেনোহহহ।
মাহির হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পাগলের মতো পুরো রুম পুনরায় তছনছ করতে লাগলো, মাহিরে মা নিচে থেকে ছেলের রুমে আসবাবপত্র ভাঙ্গার শব্দে পেয়ে দ্রুত উপরে উঠে এলো,ভুতু গলায় মাহিরের রুমের দরজায় সামনে দাঁড়িয়ে মাহির কে ডাকতে লাগলো,

___” মাহির দরজাটা খুলো, কী হয়েছে তুমি নিজের রাগ আসবাবপত্রের উপর তুলছো কেনো বাবা দরজাটা খুলো!
মাহির রুমের ভিতর থেকে তাচ্ছিল্য হাসি দিয়ে ব্যঙ্গ করে বলে উঠলো,
___” আপনার ছেলে একজন কাপুরুষ আম্মু, আপনার ছেলে শুধু মেয়েদের আবেগ নিয়ে খেলতে জানে,আপনার ছেলে তাঁর ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য না, কারণ আপনার ছেলে প্রতারক, আপনার ছেলে তাঁর ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য না বিকজ আই এম ব্যাড বয়…
মাহির চিৎকার দিয়ে নানারকম অদ্ভুত বাক্য বকতে থাকলো,মাহির কে দরজা খুলতে না দেখে মাহিরের মা চিন্তিত মুখে মাহমুদ ইসলাম কে ফোন লাগালেন,

হাবীব রাতের ডিনার শেষ করে নিজের রুমে ঢুকলো, বিছানায় ফোনের রিংটোন শুনতে পেয়ে বিছানা থেকে ফোন হাতে তুলে নিয়ে দেখলো সন্ধ্যার ফোন, সন্ধ্যা নিজে থেকে ফোন করেছে দেখে হাবীবের কপালে সূক্ষ্মভাজ পরলো, অবাক হয়ে ফোন কেটে দিয়ে ফোন ব্যাক করতে নিবে, দেখলো সন্ধ্যা নয়বার ফোন করেছে,হাবীব অবিশ্বাস্য হয়ে দ্রুত সন্ধ্যা কে ফোন ব্যাক করল, সন্ধ্যা ফোন রিসিভ করে ব্যস্ত গলায় বলল,
___” আসসালামু আলাইকুম!
হাবীব সন্ধ্যার সালামের উত্তর নিতেই সন্ধ্যা পুনরায় বলে উঠলো,
___” কই থাকেন ফোন উঠান না কেনো?
হাবীব সন্ধ্যার কথায় বলে উঠলো,
___” ম্যাডাম আজকে নিজে থেকে ফোন করেছে তাও এতবার, আগে বলো আজকে চাঁদ কোনদিকে উঠেছে?
সন্ধ্যা হাবীবের কথায় বিরক্ত মুখে বলল,

___” আমি বলতে পারবো না, আপনি বাইরে গিয়ে দেখেন!
___” হোয়াট হ্যাপেন্ড এভাবে কথা বলছো কেনো?
___” এতবার ফোন দিলাম ফোন রিসিভ করলেন না কেন?
___” ওকে বাবা এজন্য ম্যাডাম রাগ করেছে, সরি বাহিরে ছিলাম!
হাবীবের কথায় সন্ধ্যা হাসি মুখে বলে উঠলো,
___” নো প্রবলেম!
হাবীব সন্ধ্যার হাসির শব্দ শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলো, কয়েক সেকেন্ড আগে রাগ নিয়ে কথা বলল,আর একটা মাএ সরি তে রাগ গায়েব হয়ে গেলো, এটা কেমন মেয়ে রে বাবা, এজন্য বলে মেয়েদের মন বুঝা আর মহাকাশ গবেষণা করা দুটোই একই ব্যাপার, হাবীব মনে মনে কথাগুলো ভেবে সন্ধ্যা কে ব্যঙ্গ করে বলে উঠলো,

___”মাবুদ কী মাটি দিয়ে বানাইছে তোমাদের একটু বলবে?
___” বাকি সবার কথা জানি না বাট আমাকে বানাইছে ময়দা দিয়ে।
হাবীব বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো,
___” আরে ইয়ার, আরে তুমি বলো তো কেনো এতবার ফোন করেছো?
সন্ধ্যা পুনরায় রাগী গলায় বলল,
___” আপনি আমার উপর রাগ দেখাচ্ছে, যান আর বলবো না।
হাবীবের মুখ দেখার মতো, না পরছে রাগ করতে না পারছে কান্না করতে, নরম গলায় সন্ধ্যা কে বলে উঠলো,
___” মেরি জানেমন, তুই কোন অপরাধের শাস্তি দিচ্ছেন বলবি একটু ?
___” কীহহ আমি আপনাকে শাস্তি দিচ্ছি, আমার কথা আপনার শাস্তি মনে হচ্ছে, যান আপনার সঙ্গে আমার কথা নেই!
সন্ধ্যার কথায় হাবীব দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

___” সন্ধ্যা আমি যদি এই মুহূর্তে তোর বাসায় যাই , তোর কী হাল করবো বুঝতে পারছিস?
সন্ধ্যা হাবীবের হুমকিতে কাচুমাচু করে উঠলো, এতক্ষণ হাবীব কে জ্বালাতে ভালোই লাগছিল, কিন্তু এ বেডার বিশ্বাস নেই রাগের মাথায় আসতেও পারে, সন্ধ্যা গলা খাঁকারি দিয়ে হাবীব কে বলে উঠলো,
___” হয়েছে হয়েছে আপনার আর গুন্ডাগিরি করতে হবে না, শুনেন আমি যে জন্য ফোন করেছিলাম!
হাবীব গম্ভীর গলায় বলল,
___” হুম বল?
সন্ধ্যা ফোনের ওপাশে মুখ বাঁকা করে একটু সময় নিয়ে নরম সুরে বলে উঠলো,

___” আপনি তো সবসময় আমাকে বলতেন, চলো বিয়ে করে ফেলি, বিয়ে করে ফেলি, আজকে আমি আপনাকে বলছি,চলেন আমরা বিয়ে করে ফেলি?
হাবীব বিষম খেয়ে গেলো সন্ধ্যার কথায়, এই মেয়ে আজকে হাবীব কে একটার পর একটা অবাক করে দিচ্ছে, প্রথমে নিজে থেকে ফোন, এখন আবার নিজে থেকে বিয়ের কথা বলছে, যাকে কী না বিয়ের কথা বলতে বলতে হাবীব ব্যর্থ হয়ে চুপ হয়ে গেছে, হাবীব নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
___” সন্ধ্যা আন্টি কই?

সন্ধ্যা হাবীবের কথায় বোকা সেজে গেলো, যেখানে নিজে থেকে বিয়ের কথা বলছে, হাবীব বিয়ের কথায় পাওা না দিয়ে সন্ধ্যার আম্মুর খোঁজ করছে, সন্ধ্যা বিরক্ত গলায় হাবীব কে বলল,
___” আম্মু কে কেনো খুঁজতেছেন?
___” তোমার মাথায় একটু পানি ঢালতে বলবো,মনে হচ্ছে তোমার মাথা ঠিক নেই!
হাবীবের কথার মানে সন্ধ্যা বুঝতে পারলো, রাগী গলায় পুনরায় বলল,
___” আমার মাথা একদম ঠিক আছে ,
আমি সজ্ঞানে বলছি বিয়ে করবেন আমাকে?
হাবীব সন্ধ্যার কথায় সিরিয়াস হয়ে গেলো, সিরিয়াস মুখে বলে উঠলো,

___” তুমি তো এখন বিয়ে করতে চাইতে না, আজকে হটাৎ নিজে থেকে বিয়ের কথা বলছো?
___” আপনি আমাকে বিয়ে করবেন নাকি এটা বলেন?
___” অবশ্যই, যো হুকুম মহারানী, আপনি যাহা বলিবেন, এবার বলুন তো কাহিনী কী?
সন্ধ্যা একটু সময় নিয়ে মলিন মুখে বলল,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪৪

___”চারদিকে এত বিচ্ছেদের গন্ধ নাকে বাজে, আমি তো খুব সহজে আমার ভালোবাসা পেয়ে যাচ্ছি।
সন্ধ্যার কথায় হাবীবের মনে পড়ে গেলো, আরাত তাকবীর, কিছুদিন আগে আনাস আইরা, আশিক মায়া, কারো এক হওয়া এত সহজ ছিলো না, এদিকে রাফি, আদিল, মিরা নিজের বোন হানিয়া, তাঁদের এক তরফা ভালোবাসা গুলো নিজের চোখের সামনে দেখে যাচ্ছে, জানা নেই তাঁদের পরিনীতি কী হবে, অন্য দিকে রশ্মি মাহির, হাবীব মলিন মুখে বলে উঠলো,
___” আগামীকাল মা বাবা কে নিয়ে আসবো, আন্টি কে বলে দিও!

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪৬