Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৩

মহামায়া পর্ব ৩

মহামায়া পর্ব ৩
তুশকন্যা

রাত ক্রমশই গভীর হতে চলেছে। আনায়া চুপচাপ রুমের কোণায় বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। যদিও তার কান্নার দরূন কোনো শব্দ হচ্ছে না, তবুও চোখের পানি অনর্গল গড়িয়ে পড়ছে।
রুমের চারপাশের জানালাগুলো খোলা। দরজটা শক্ত করে বদ্ধ করে রাখা। গভীর রাতের শীতল বাতাসে জানালার সাদা পর্দা গুলো এলোমেলো ভাবে উড়ছে। অথচ সেসবের কোনো দিকেই আনায়ার খেয়াল নেই।
আনায়া অন্ধকারকে ভীষণ ভয় পায়। এমনকি ঘুমানোর সময় মাঝেমধ্যে তার পাশে—তার মা অনিমা কিংবা ইনায়াও থাকে।পূর্ববর্তী কিছু ঘটনার জেরেই তার নানান রকমের শারীরিক কিংবা মানসিক সমস্যা রয়েছে। যথারীতি এই নিশীথে, একলা একা ঘরে সে রুমের সবগুলো লাইট জ্বালিয়ে চুপটি করে কেঁদে চলেছে। কারো সম্মূখে কাঁদার বিষয়টা তার বেশ অপছন্দ। কিন্তু খুব কম সময়ই নিজেকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

আনায়া একে একে নানান রকমের হিসেব-নিকেশ মেলানোর চেষ্টা করছে। অংকের নানান মারপ্যাচের সমাধান করতে, তার ভীষণই ভালো লাগে। কিন্তু বরাবরের মতোই সে এই জীবনের হিসেবে বড্ড কাঁচা। বিশেষ করে সে আদৌও বুঝতে পারেনি,তার বাবা সবসময় কেনো তার সাথে সবার চেয়ে ভিন্ন বিহেভিয়ার করে। কেনো তার প্রতিই তার বাবার এতোসব বৈষম্য? নিজের মধ্যে ঠিক কি কি কমতি রয়েছে,তাও সে বুঝে উঠতে পারেনি কখনো।
এরইমাঝে আচমকা দরজায় শব্দ হলো। সাধারণত তার রুমের দরজা লাগানোতেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এরকম প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি নিয়ম-কানুন এখনও তাকে মেনে চলতে হয়। কিন্তু আজ সে সেসব নিয়মের অমান্য করে, দরজা লাগিয়েছে।এবং দরজা খোলারও বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার নেই।
দরজায় আবারও শব্দ হয়। আনায়া তার কান্না থামিয়ে, চুপ করে বসে থাকে। আনায়ার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে, দরজার ওপাশ হতে তার মা বলে,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“আনু!…মা তুই ঘুমিয়ে পড়েছিস?”
মায়ের কন্ঠে আনায়া খানিকটা স্থির হয়। সে ঠোঁট ভিজিয়ে, কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে,
“কেনো এসেছো এখানে?”
—“দরজা কেনো লাগিয়েছিস? জানিসই তোর বাবা জানলে…”
অনিমার নমনীয় কন্ঠস্বরেও, আনায়া যেন ক্ষিপ্ত হলো। সে তার মায়ের কথা শেষ হবার পূর্বেই, জোর গলায় বলে উঠল,
“আমি কোনো বাচ্চা নই মা! সবসময় আমাকে বাচ্চার মতো ট্রিট করা বন্ধ করো তোমরা।”
আনায়ার ক্ষিপ্ততায়, অনিমা ভারী শ্বাস ফেলে আওড়ায়,
“আচ্ছা ঠিক আছে। দরজা খোল এখন।”

এবার আনায়া কি যেন ভেবে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজা খোলা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে থাকলেও,শেষমেশ সে দরজাটা খুলে দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
আনায়া তাকিয়ে দেখে,তার মা হাতে করে রাতের খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে। এবং তার দিকে নিস্প্রভ চাহনিতে তাকিয়ে। কিছুটা সময় চুপ থাকার পর, অনিমা আনায়ার উদ্দেশ্যে বলে,
“কেঁদেছিস?”
আনায়া কাঁদতে কাঁদতে চেহেরার বেহাল দশা বানিয়ে ছেড়েছে। চোখমুখ ফুলে রক্তিম হয়ে উঠেছে। সম্পূর্ণ মুখশ্রী কান্নার জলে সিক্ত। সে ওড়না দিয়ে, শুরুতেই চোখের জল মুছে নিলেও—তার তীব্র ক্রন্দনের ছাপ স্পষ্ট।
আনায়া তার মায়ের কথায়,উত্তর না দিয়ে উল্টো তার মতামত জানিয়ে দিতে বলে,
“খাব না আমি কিছু,নিয়ে যাও এসব।”

—“রাগ না হয় আমাদের উপর করেছিস, কিন্তু খাবার কি দোষ করল?”
আনায়া আর একটি কথাও না বলে,উল্টো ঘুরে সোজা তার বেডের কাছে এগিয়ে যায়। বিছানার একপাশে চুপ করে বসে, বিধ্বস্ত স্বরে আওড়ায়,
“চলে যাও এখান থেকে। কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই আমার।”
অনিমা ভারী শ্বাস ফেলে,
“সত্যি চলে যাব?”
অনিমা তার কাছে এসে এ কথা বলতেই, আনায়া তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। এবং কিছুক্ষণের মাঝেই ঠোঁট চেপে অঝরে কেঁদে ফেলে।
কান্নায় কোনোপ্রকার শব্দ না হলেও, অনিমা তার কান্না সহ্য করতে পারল না। আলতোভাবে আনায়াকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“কেঁদে কি হবে মা? তোর বাবা তোর ভালোর জন্যই…”

—“বাবা সবসময় আমার সাথেই কেনো এমন করে? আমি কখনো এ নিয়ে কাউকে কিছু বলিনি। কিন্তু আমারও জানতে ইচ্ছে করে, আদতে আমার মাঝে ঠিক কি কমতি রয়েছে যার জন্য বাবা হরহামেশাই আমার সাথে…”
আনায়ার কথা সম্পূর্ণ হয়না। বরং তার পূর্বেই সে পুনরায় কেঁদে ওঠে। ওদিকে অনিমা ভারী শ্বাস ফেলে আওড়ায়,
“কাঁদিস না মা। তোর বাবা তোর ভালোর জন্যই নিষেধ করেছে। একবার ভেবে দেখেছিস, কতদূরে ঐ বান্দরবান। তোর বাবা তো তোকে কখনো একা একা এতদূর পাঠায়নি। এইজন্যই সে হয়তো ওভাবে রিয়েক্ট করেছে।”
আনায়ার তার মায়ের কথায় তাচ্ছিল্যের সহিত মৃদু হাসল। সে খুব ভালো করেই জানে,তার মা এসব বলে তাকে মিথ্যে শান্তনা দিচ্ছে। তার বাবা কখনো তাকে স্বাভাবিক নজরে দেখে না। নয়তো ইনায়া আর তার মাঝে সে এতো বেশি বৈষম্য রাখত না৷ তবে আনায়াও এ-ও চায় না,এসব বিষয়ে ভাবতে গিয়ে তার মনে তার বাবা কিংবা বোনের প্রতি কোনো বিদ্বেষ জন্মুক। যে কারণে সে সব বুঝেও, বরাবরের মতো মিথ্যে শান্তনায় দমিয়ে রাখে।
আনায়াকে আচমকা মৃদু পরিসরে হাসতে দেখে, অনিমা কিঞ্চিৎ কপাল কুঁচকে আওড়ায়,

“কি হলো?”
আনায়া নিজের কান্না থামিয়েছে। অযথা কেঁদে লাভ নেই। তার সাথে সেটাই হবে যেটা তার পরিবার চাইবে। কেননা বুঝ হবার পর থেকে সে কখনো নিজেকে মানুষ হিসেবে উপলব্ধি করার মতো সুযোগ পায়নি—সর্বদা নিজেকে অন্যদের হাতের পুতুল ভেবেই তাকে বাঁচতে হয়েছে। আর এখন তার মতো এক র’ক্তে মাংসে গড়া পুতুলের কান্নার মূল্য কারো কাছেই নেই—এটাই স্বাভাবিক।
—“মা, আমার ঘুম পেয়েছে। আমি ঘুমাতে চাই।”
আচমকা আনায়ার দৃঢ় কন্ঠে, অনিমা খানিকটা দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে যায়। সে কিছুটা ইতস্তত স্বরেই আওড়ায়,
“খাবারটা তো খেয়ে নে…”
—“না এখন খাব না। অনেক রাত হয়েছে। এতো রাতে খাবার খাওয়াটা ঠিক হবে না। তুমি ওসব নিয়ে যেতে পারো।”

আনায়ার কথায় তার মা আর বেশি জোর করে না। সে তার মাথায় আলতোভাবে হাত বুলিয়ে দিয়ে, খাবার গুলো নিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে পড়ে। একইসাথে যাওয়ার পূর্বে আনায়ার উদ্দেশ্যে বলে,
“দরজা খোলাই রাখিস। কখন কি হয়, কে জানে? দরজা লাগাতে যাস না, তোর বাবা জানলে রাগ করবে।”
এমন মূহুর্তেও মায়ের এহেন শাসনে, আনায়া তাচ্ছিল্যের সহিতেই মৃদু হাসে। এতোক্ষণ কাঁদলেও তার এখন যেন বেশ হাসতে ইচ্ছে করছে। নিজের প্রতি তাচ্ছিল্য করেই যেন,তার এই ইচ্ছের উৎপত্তি।
তবে আনায়া শুধু মাথা নাড়িয়ে বোঝায়, সে তার মায়ের কথা শুনবে। কিন্তু বাস্তবে হয় তা সম্পূর্ণই ভিন্ন। অনিমা চলে যেতেই, আনায়া তৎক্ষনাৎ দরজাটা শক্ত করে লাগিয়ে দেয়। তার চোয়াল শক্ত,চোখে-মুখে অদ্ভুত এক ক্ষোভ। অবশ্য এই ক্ষোভ তার নিজের প্রতিই।এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটাই তার কাছে সবচেয়ে বেশি তিক্ততার।

মিউনিখ শহরের কোলাহল থেকে খানিকটা দূরে, পাহাড়ের ঢালের ওপরে অবস্থিত, এক অদ্ভুত অথচ আভিজাত্যপূর্ণ বাড়ি—❝ব্লাডেন হেল❞(Blooden Hell)।বাড়িটার নামও যেমন অদ্ভুত, তেমন দেখতেও এটি অদ্ভুত। বাইরে থেকে দেখলেই বোঝা যায়—এ বাড়ি বাকিসবের চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন।আধুনিক স্থাপত্য আর গথিক ডিজাইনের এক অনন্য মিশ্রণে গড়া…তিন তলা এই বিশাল ট্রিপলেক্স।
পুরো বাড়ি লাল আর কালো রঙের কম্বিনেশনে তৈরি, যা প্রথম দর্শনেই ভুতুরে অথচ রাজকীয় একটা অনুভূতি জাগিয়ে তুলবে যে কারো মাঝে। দিনের বেলায় সূর্যের আলোয় ঝলমল করলে এটি রিসোর্টের মতো লাগে। কিন্তু রাত নামতেই বাড়িটা যেন রহস্যে ঢাকা প্রাসাদে পরিণত হয়।
চারপাশে গভীর সবুজ বন আর দূরে পাহাড়ঘেরা অঞ্চল। মানুষের সমাগম হতে দূরে সরতেই যেন, তাদের তিনজনের এমন জায়গায় এসে আস্তানা গড়া।

ট্রিপলেক্স বাড়ির সামনের দিকটায়, সুন্দর করে সাজানো বিস্তর পাথরের ঢালু রাস্তা। এবং পাশেই বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে তাদের নিজস্ব গ্যারেজ। সেই গ্যারেজে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য লাক্সারিয়াস গাড়ি।মার্সেডেস বেনজ, বিএমডব্লিউ,অওডি, পোরশে কিংবা মার্সিডিজের আলট্রা লাক্সারি সাব-ব্রান্ড মাইবাখের সকল SUV কিংবা কেনীথের V-Kore,ভ্যাম্পেয়ার সিরিজ— সবকিছুরই কালেকশন রয়েছে।তবে মার্সিডিজের কারগুলোই যেন এই গ্যারেজে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। এছাড়া গ্যারেজের আরেকপাশে রয়েছে সকল স্পোর্টস বাইক। যার মাঝে লাল-কালো ডুকাডি মনস্টার, প্যানিগান কিংবা কে.টি.ম সবই রয়েছে।

প্রতিটি গাড়িই ঝকঝকে, যেন কোনো বিশেষ রেস কিংবা গন্তব্যের জন্য এগুলো সবসময় প্রস্তুত।তবে তাদের বিশেষত্ব অনুযায়ী, সবগুলো গাড়িই লাল-কালো কিংবা এই দুটোর কম্বিনেশন।
এখানকার চারপাশের পরিবেশে এক বিস্তর চাপা প্রভাবশালী ক্ষমতার ন্যায় আভাস বিরাজ করে। যেন এই বাড়ি এবং এর ভেতরে থাকা তিনজন বিশেষ ব্যক্তি—কেনীথ, নায়রা আর পাভেলেরই এই সমস্ত জায়গাজুড়ে রাজত্ব…।
ভিতরে ঢুকলেই আরও স্পষ্ট হয় সেই ভুতুরে আভিজাত্য। দেয়াল থেকে ফার্নিচার—সবই লাল আর কালোর সমন্বয়ে সাজানো।আলোও তেমন উজ্জ্বল নয়; বরং কোথাও লালচে, কোথাও গাঢ় কালচে ছায়া। যা পুরো বাড়িটাকে ভুতুড়ে আবহে সাজালেও, জীবন্ত করে তুলেছে। এছাড়া প্রত্যেকের ব্যক্তিত্ব মোতাবেক, প্রতিটি রুমের সাজসজ্জাই আলাদা।
কেনীথের রুম যেন একেবারেই তার ব্যক্ত্বিতের মতো। লালচে-কালো সিল্কে মোড়ানো বিশাল বেড, দেয়ালে নানান সব অদ্ভুত পেইন্টিং, এছাড়া লাল-কালো আলোয় ভুতুরে পরিবেশের আবহ তো রয়েছেই। তবে এসবের মাঝেও, সবচেয়ে আকর্ষণীয় দুটো জিনিস এই ঘরের বিশেষত্বকে জাগ্রত করেছে। একটি হলো বেডের পেছনে সম্পূর্ণ দেওয়ার জুড়ে এক বড়সড় আকারের ভ্যাম্পায়ার উইং রয়েছে। আর রুমের ঠিক বাম পাশের দেওয়ালেই রয়েছে, একটি বাচ্চা মেয়ের আঁখিযুগলের অসমাপ্ত চিত্রকর্ম।

এই বাড়িতে অসংখ্য পেইন্টিং রয়েছে, যার বেশিভাগই কেনীথের আঁকা। মাঝেমধ্যে তার দেখাদেখি শখের বসে নায়রা আর পাভেল যা একটু কাঁচাহাতে টুকটাক এঁকেছিল—সেসবও ফ্রেমবন্দী করে বাড়ির বিভিন্ন অংশের সাজানো রয়েছে। তবে আঁখিযুগলের রহস্য কারোরই জানা নেই—স্রেফ কেনীথ ব্যতীত৷
কালচে লালের মাঝে নানান রকমের ভঙ্গিতে এই অসমাপ্ত আঁখি যুগলের পেইন্টিং দেখে—পাভেল কিংবা নায়রার মনেও প্রশ্ন জেগেছিল। তবে তার যথাযথ উত্তর তারা পায়নি। কেনীথকে একবার জিজ্ঞেস করায়, সে বলেছিল—এটা হুট করেই এঁকেছে। এবং মাঝপর্যায়ের পর তার আর আঁকতে ইচ্ছে হয়নি। কিন্তু কেনীথের এই বিষয়টাই তাদের কাছে বেশ খটকা লেগেছিল। কেননা, সে আর যাই হোক, কখনো কোনো অসম্পূর্ণ জিনিসকে এভাবে এতো যত্নসহকারে নিজের রুমে সাজাবে না।

এছাড়া তার রুমের একপাশে,কালচে কাঠের শেলফ জুড়ে রয়েছে নানান রকমের বই-পুস্তকের ছড়াছড়ি। যদিও নিচ তার বিশাল এক লাইব্রেরীও রয়েছে। কিন্তু বাড়ি ভর্তি সর্বত্র তার বইয়ে ছড়াছড়ি।যেমন সোফার একপাশে সর্বদা কালচে লাল রঙের একটি গিটারের পাশাপাশি, দু’একটা বইও পড়ে থাকে।
কেনীথের রুমের আরেকটি বিশেষ দিক হলো,তার বারান্দা।অর্ধকক্ষের ন্যায় বিশাল এক বারান্দা জুড়ে রয়েছে অনেক রকমের গাছ-গাছালী । বেশিরভাগই ইনডোর প্লান্টস্,তবে অনেকগুলো কালচে গোলাপ আর বেলীফুলের একটিমাত্র গাছই যেন, একটু বেশিই আকর্ষণীয়। শুধু তার বারান্দা নয়, কেনীথের এই গার্ডেনিং এর শখ থেকেই পুরো বাড়ি জুড়েই গাছগাছালীর ছড়াছড়ি। কিন্তু সবকিছুর মাঝেই বিশেষত্বই—তার রুমের বারান্দায় থাকা সেই একটিমাত্র বেলী ফুলের গাছ। এতো বড় এরিয়া, হরেক রকমের গাছ-গাছালীর মাঝেও শুধুমাত্র একটি বেলীফুলের গাছের বিষয়টাও যেন একপ্রকার রহস্যের।

অন্যদিকে নায়রার রুম পুরো অন্যরকম। তার এতো বেশি ডার্ক ভাইব তেমন ভালো লাগে না। যথারীতি তার রুমটা সাজানো সাদা ও কালচে লালের মিশালে। খুবই সিম্পল তার রুমের সবকিছু। তবুও সকল সাধারণ জিনিসওগুলো প্রচন্ড আভিজাত্যপূর্ণ। এছাড়া তার রুমের বিশেষত্ব হলো, দেওয়ালের একপাশে ঝুলানো
কেনীথ,পাভেল ও তার একত্রের একটি বড়সড় ছবি। ছবিটা বেশ পুরোনো—যখন তাদের সর্বপ্রথম দেখা হয়েছিল,ঠিক তখনকারই ছবি এটি।

ওদিকে পাভেলের রুম দেখে মনে হবে,সে যেন এক ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা। ডার্ক গ্রে দেয়ালে সারি সারি মনিটর, মাল্টি-স্ক্রিন সেটআপ, গেমিং চেয়ার—সব মিলিয়ে তার এই বেডরুমকে কোনো গ্যাজেটের দুনিয়া বললে ভুল হবে না। কিংবা নীল-সাদা এল.ই.ডি আলোয় রুমটা একেবারে সাইবারপাঙ্ক হতেও কম কিছু নয়।
রুমের একপাশে রাখা ছোট ফ্রিজে সবসময় এনার্জি ড্রিংক আর স্ন্যাকস মজুত থাকে। যখন সবাই বিশ্রামে যায়, পাভেলের রুম তখনও আলোয় ভরে থাকে। সে রাত জেগে টেকনোলজি আর কোম্পানির কাজে ডুবে থাকে,এবং অনেকটা বেলা অব্দি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাঁটায়।
সারা রাত-দিন বাহিরে কাটিয়ে কাটিয়ে, বাড়ির ছাঁদে দিকে মনোযোগী হবার সময়-সুযোগ তাদের হয়না। তবে এই বাড়ির সবচেয়ে বিশেষ জায়গা হলো পেছনের দিকটা। সবুজ ঘাসে মোড়ানো উঁচু ঢালুর ন্যায় জায়গায় বসে, চারপাশের মনোরম দৃশ্য বেশ উপভোগ করা যায়।দিন হলে দূরের পাহাড় আর বনভূমি, রাত হলে আকাশভরা চাঁদ-তারা…।

কেনীথ, নায়রা আর পাভেল প্রায়ই রাতে এখানে বসে থাকে। নীরবে আকাশ দেখে, আবার কখনো নিজেদের পরিকল্পনা আর স্বপ্ন নিয়ে কথা বলে। কিংবা চুপটি করে বসে থেকে, প্রত্যেকে তার নিজেদের অতীত নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে।এখানেই তারা সবচেয়ে বেশি মুক্ত মনে শ্বাস নেয়।একই সাথে দূরের শহরের কোলাহলও তাদের কাছে পৌঁছায়ই না।
এ বাড়ির প্রতিটি ইট-পাথর, প্রতিটি দেয়াল শুধু অভিজাত্য নয়—বরং রহস্য আর প্রভাবশালী ক্ষমতার প্রতীক। যেন ভেতরের প্রতিটি মানুষ আলাদা এক দুনিয়া নিয়ে বাঁচে,
আর তাদের জীবনধারার সাথে বাড়িটাও নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। মিউনিখের পাহাড়ি ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়ি শুধু একটা আবাস নয়, বরং অদ্ভুত সব কিংবদন্তিদের জীবনরহস্য।

কেনীথ ও পাভেল নিস্পৃহে নিজেদের রুমের বিছানায় পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় ভোর হয়ে গিয়েছে। আর তারা এসেই সোজা ঘুমিয়ে পড়েছে।
এখন সবেমাত্র সকাল সাতটার মতো বাজে। যে যার ঘুমের দুনিয়ায় মগ্ন। কেনীথ উন্মুক্ত গায়ে, বিছানায় উপর হয়ে—পায়ের কাছে একটুকরো কম্ফোর্টার জড়িয়ে শুয়ে রয়েছে। তীব্র ঘুমের তালে,কাঁধ পর্যন্ত চুলগুলো এলোমেলো বিধ্বস্ত আকারে রূপ নিয়েছে। অথচ সে ঘুমে এতোই মগ্ন যে, দুনিয়ায় কোথায় কি হচ্ছে তা দেখার বিষয় তার নয়।
অন্যদিকে পাভেলও কম নয়। ঘুমের ঘোরে তার শোয়ার ধরনও বদলে গিয়েছে। এক পা বিছানায়, তো এক ফ্লোরে এসে ঠেকেছে। হাতের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। মাথাটা বিছানা ও শূন্যের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। একটু তালবেতাল হলেই,ধুম করে বিছানা হতে নিচে পড়তে খুব একটা সময় লাগবে না।
কিন্তু তাদের এতো শান্তির ঘুম আর বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। আচমকা কেনীথ আর পাভেলের দরজাটায় জোরে জোরে ধাক্কানোর শব্দ হতে লাগল। আচমকা এতো জোড়ে জোড়ে শব্দে হওয়ায়, কেনীথের ঘুম ভেঙে যায়। সে কপাল কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করে—এখানে আদতে হচ্ছেটা দিকে।

ওদিকে পাভেলের সাথে যা হওয়ায় কথা ছিল, তাই হয়েছে। আচমকা এহেন আওয়াজে সে নড়েচড়ে উঠতেই ধপাৎ করে ফ্লোরে পড়ে যায়। সকাল সকাল এমন একটা ঘটনায় তার মেজাজও নিমিষেই বিগড়ে যায়।
সে দ্রুত দাঁড়িয়ে মাথার পেছনে আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে হাত বুলানো অবস্থাতেই দরজার দিকে এগিয়ে আসে।একইসাথে দরজা খুলতে খুলতে কড়া স্বরে আওড়ায়,
“কোন শালায় রে সকাল সকাল ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিল…”
তার কথা শেষ হতে না হতেই, আচমকা দরজা খোলামাত্রই নায়রায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সম্মূখীন হলো। রণমুর্তির ন্যায় রূপ ধারণ করে, কিছু ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। চোখেমুখে তীব্র গম্ভীর্যের ছাপ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি-শক্ত চোয়াল। নায়রাকে এই রূপে দেখে, পাভেল জোরপূর্বক কিঞ্চিৎ ঢোক গিয়ে ইতস্ততস্বরে আওড়ায়,

“বেপ্পি তুমি এতো….”
পাভেলের অহেতুক কথাবার্তার স্বরে নায়রার মেজাজ আরো বিগড়ে গেল। চোয়াল আরো বেশি শক্ত করে, দাঁত চেপে সরাসরি পাভেলের হাঁটু বরাবর সজোরে লাথি মেরে বলে,
“শাট আপ, ইউ ইডিয়ট! আমি তোর কোন কালের বেপ্পি? খবরদার, শেষ বারের মতো বলে দিচ্ছি। আবার যদি কখনো… ”
নায়রার কথা শেষ হয়না। বরং তার পূর্বেই পাভেল ব্যাথায় চোখমুখ কুঁচকে, নায়রার দিকে এগিয়ে এসে বলে,
“সরি, সরি, আর কখনো এসব বলব না। তুই তো আমার একমাত্র মাননীয় জানের জিগার ওরফে বড় বোন। আর বড় বোনের সাথে এসব মশকরা করা তো ভারী অন্যায়।”

এই বলেই সে, নায়রার কাঁধের উপর নিজের কুনুই ঠেকিয়ে হেলান দেয়। মুখে এক কথা বললেও,আড় চোখে নায়রার দিকে তাকিয়ে মনে মনে তীব্র বিরক্তির স্বরে আওড়ায়,
“শালী হতচ্ছাড়ি! নিকুচি করেছে আমার বড় বোন হয়ে।”
এদিকে নায়রা তার হাতটা আচমকা ঠেলে সরিয়ে দিতেই, সে বেখেয়ালিতে পড়তে পড়তে বেঁচে যায়। কিন্তু পাভেল কিছু বলার পূর্বেই নায়রা কপাল কুঁচকে বলে ওঠে,
“ঐ হতচ্ছাড়া কোথায়?”
নায়রায় কথায় পাভেল কিঞ্চিৎ কেশে উঠে বলে,
“এ তুই কাকে হতচ্ছাড়া বলছিস? সকাল সকাল না ঘুমিয়ে তোর হয়েছেটা কি?”

পাভেলের কথা শেষ হতে না হতেই, পাভেলের রুম হতে খানিকটা দূরে—বাড়ির ঠিক মাঝবরাবর রুম হতে দরজা খুলে বেড়িয়ে এলো কেনীথ। পরনে কালো রঙের টাউজার আর টিশার্ট। চুলগুলো এখনো এলোমেলো অগোছালো পাখির বাসার ন্যায়৷ চোখে-মুখে খানিকটা বিরক্তি ও একইসাথে ঠিকঠাক ঘুম না হওয়ায় গম্ভীর্যের তীক্ষ্ণ ছাপ।
তাকে দেখে নায়রার অভিব্যক্তির বিশেষ কোনো পরিবর্তন হলো না। সে গম্ভীর্যের সাথে ভিকের দিকে এগিয়ে গেল। ওদিকে তার পাশাপাশি পাভেলও এগিয়ে যায়। কাহিনি কি ঘটেছে তাই বুঝতে পারছে না। আর যাই হোক,ছোট খাটো ব্যাপার নিয়ে নায়রা সকাল সকাল অন্তত এতো রিয়েক্ট করবে না।
নায়রা কেনীথের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, কেনীথের দিকে চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে রইল। ওদিকে কেনীথও তার দিকে নির্বিকারে তাকিয়ে। ভাবটা এমন যেন,কিছুই হয়নি।
কেনীথের এহেন ছন্নছাড়া ভাব দেখে, নায়রা ভারী শ্বাস ফেলে তার দিকে হাতে থাকা ফাইটা এগিয়ে দিয়ে বলে,

“তোর সমস্যা কি?এসব কেনো করেছিস?”
কেনীথ বেশি কিছু বলে, ফাইলটা হাতে নিয়ে উলোটপালোট করে একবার দেখে নেয়। পরক্ষণেই আবার নায়রাকে ফাইটা দিয়ে, নির্বিকার এলোমেলো চুলগুলো দু’হাতে পেছনের দিকে ঠেলে—ব্র্যাকব্রাশ করতে করতে হাই তুলে নিস্পৃহে আওড়ায়,
“কি করেছি?”
এই ছোট্ট একটা কথায় নায়রার মেজাজ সোজা তুঙ্গে উঠে গেল। সে পারল না শুধু, কেনীথকে ধরে আস্ত চিবিয়ে খেতে। মুখের ভঙ্গিমা একই রেখে, নায়রা দাঁত চেপে কিড়মিড়িয়ে আওড়ায়,

“ভি! সবকিছুর একটা লিমিট থাকে। আমি কালকেই বুঝেছিলাম, তুই আমাকে না বলে কিছু একটা উল্টোপাল্টা করেছিস। কিন্তু তাই বলে…কোন সেন্সে তুই এই গর্ধবের মতো কাজ করলি? এতো বড় একটা ডিল কাউকে না বলেই কান্সেল করে দিয়েছিস? অথচ আমাদের একবার জানানোও প্রয়োজন মনে করলি না? তুই জানিস, আমি কতদিনের পরিশ্রমের পর এই ডিলটা ফাইনাল করেছিলাম। ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া হাউ মাচ আই’ভ ওয়ার্কড জাস্ট টু সাকসেসফুলি কমপ্লিট দিস ওয়ান ডিল?…অথচ তুই কি একবার আমাকেও বলার প্রয়োজন মনে করিসনি?”
নায়রায় মেজাজ বেজায় গরম। একটা ইন্টারন্যাশনাল ডিল অ্যারেঞ্জ করতে তার কয়েকমাস সময় লেগে গিয়েছে। অথচ সেটাই কেনীথ তাকে না জানিয়েই ক্যান্সেল করে বসে রয়েছে। গতকাল গাড়িতে কেনীথ আচমকা তাকে ডাক দিয়েও, কিছু না বলার পর হতেই নায়রার সন্দেহ হচ্ছিল। তবে আজ ভোর বেলায় অফিস হতে ফোন আসার পর সে যখন সব ঘেঁটে দেখে—ঘটনা আসলেই সত্যি। তখন হতেই তার মেজাজ পুরো তুঙ্গে উঠে রয়েছে।
এদিকে নায়রার এতোকিছুর বলার পরও, কেনীথ নির্বিকারে নিজের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে বাম পাশের ভ্রু-কপাল চুলকে আওড়ায়,

“না।”
এই একটিমাত্র শব্দই যথেষ্ট ছিল নায়রার জন্য। সে শান্ত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ কেনীথের দিকে তাকিয়ে থাকার পর, ভারী শ্বাস ফেলে। পরক্ষণেই চোয়াল শক্ত করে, হাতে থাকা ফাইলগুলো একপ্রকার কেনীথের মুখের উপর ছুঁড়ে দিয়ে, আশেপাশে তাকানোর বিন্দুমাত্র প্রয়োজন বোধ না করেই, নিজের রুমের দিকে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যায়।
এদিকে এসব কাহিনি দেখে পাভেল হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে। কেনীথ এটা কেনো করেছে,তা সে-ও জানে না। ওদিকে নায়রার এমন বিহেভিয়ার—নিশ্চিত আবার কোনো ঝামেলা লেগে যাবে। এই ভাবনায় পাভেল মনে মনে আওড়ায়,

“বাহিরের শত্রুর সাথে পাঙ্গা…ইট’স ওকে! কিন্তু ঘরের এই সতীন দুটোর কি করা যায়?”
এই বলেই সে ভারী শ্বাস ফেলে কেনীথের গা ঘেঁষে ফিসফিসিয়ে বলে,
“ব্রো! আফু তো পুরো হেব্বি ডেঞ্জার মুডে আছে। এটাকে পরে সামলাবো কিভাবে?”
পাভেলের কথায়, কেনীথ তাচ্ছিল্যের সহিত কিঞ্চিৎ বাঁকা হাসে। পরক্ষণেই পাভেলের দিকে তাকিয়ে বলে,
“যা,তোর রুমে যা। আমার ঘুম পেয়েছে,আমি ঘুমাতে চললাম।”
এই বলে কেনীথ তার নিজের রুমে চলে যায়। অন্যদিকে পাভেল দীর্ঘ শ্বাস ফেলে , নিজের রুমের দিকে যেতে যেতে আওড়ায়,
“খোদা, এই দুই সতীনের কপালে একটা করে বান্দা-বান্দী জুটিয়ে দাও। আর সাথে আমায় একটু মুক্তি দাও।”

পাভেল আর কেনীথ ড্রইং রুমে বসে বসে নিজেদের মতো টাইমপাস করছে। দুজনে ঘুম থেকে উঠেছে দুপুরের পর। অতঃপর ফ্রেশ হয়ে, খেয়ে-দেয়ে…বাড়ির এদিক সেদিক খানিকটা ঘুরাঘুরির পর দুজনে এই বিকেল বেলায় ড্রইং রুমে এসে গেঁড়ে বসেছে।
আজ তাদের অফ-ডে। কাজকর্ম থাকলেও, কোনোকিছুই করবে না। সোফার একপাশে কেনেলকে নিয়ে বসে রয়েছে কেনীথ। কেনেল হলো তার সাদা-কালো রঙের এক বিশাল দেহীর অজস্র লোমযুক্ত এক কুকুর। স্বভাবজাতে এটি অনেক বেশি হিং’স্র হলেও,কেনীথের সামনে সে হাতের পুতুল।
কেনীথ সোফার একপাশে আধশোয়া হয়ে,কালো রঙের এক বিশেষ বই পড়ছে। অন্যদিকে কেনেল তার পাশেই এক সোফায় চুপটি করে, পেছন হতে কেনীথ মাথার কাছে গুটিয়ে বসে রয়েছে। কেনীথ মনে মনে পড়লেও, সে শান্তশিষ্ট হয়ে একবার তার বইকে দেখছে, তো একবার দেখছে গম্ভীর কেনীথকে।

ওদিকে পাভেলের দৃশ্যপট পুরোপুরি ভিন্ন। টিভির সম্মূখে মাঝবরাবর সোফায় বসে, প্রচন্ড মনোযোগী হয়ে ভিডিও গেইম খেলছে সে। পাশেই পড়ে রয়েছে, ছয়-সাতটা চিপসের প্যাকেট,কোল্ড ড্রিংকস।
দুজনের সময় বেশ কাটছিল। তবে কোথাও নায়রায় দেখা নেই। নায়রা সে সকাল হতেই তাদের নজরের অগোচরে। সকালের ঘটনার পর শুধু স্বাভাবিকভাবেই দুপুরের খাবারটা বানিয়ে, কেনীথ আর পাভেলের সাথে বসে লাঞ্চ করেছে। তবে পুরো সময়টায় একটি কথাও সে কারো সাথে বলেনি। এবং এরপর হতে তার ছায়াও কারো সামনে আসেনি।
তবে সে তার ঘরের মাঝেই ছিল। অর্ধেকটা সময় বাড়ির কনফারেন্স রুমে কাটিয়েছে,আর বাকি অর্ধেক সময় বিভিন্ন কাগজপত্র ঘাটাঘাটি করে।

কেনীথ আর পাভেলের, এভাবেই আরো কিছুটা সময় পেরিয়ে গেল। এরইমধ্যে মধ্যে আবার আচমকা নায়রার আগমন। সে কোথাও যাওয়ার জন্য বের হচ্ছে। পরনে ক্লাসিক ফরমাল ড্রেস।কালো রঙের ওভার কোটের সাথে, ডার্ক রেড কালারে ফিটেড টপ,হাই-ওয়েস্ট প্যান্ট। কোমড়ে কালো ও সোনালী রঙের চিকন বেল্ট৷ চুলগুলো মেসিবান করে বাঁধা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে খানিকটা তাড়াহুড়ো করেই বেড়িয়েছে। তবে ঠোঁটে বরাবরের মতো কড়া কালচে লাল রঙের লিপস্টিক দিতে একটুও ভুল করেনি।

তার সবকিছুই ঠিক ছিল। আচমকা নায়কাকে আসতে দেখে,পাভেল রিমোটটা হাত থেকে ফেলে তার দিকে তাকায়। একপলক কেনীথের দিকে তাকিয়ে দেখে, সে এখনো বইয়ের দিকে মনোযোগী। তাই পাভেল একটা চিপস মুখে পুরে দিয়ে, দূর হতে নায়রাকে পর্যবেক্ষণ করে। কিন্তু হঠাৎ তার নজর পড়ে, নায়রার জুতোর দিকে। গাঢ় লাল রঙের ছয় ইঞ্চির হাই হিলে অকপটে হেঁটে চলেছে।পাভেল এটা দেখমাত্রই চোখ পিটপিট করে আওড়ায়,
“এরেহ্,কাম তো সেরেছে্। না জানি আজ কোন হুলুস্থুল কান্ড ঘটিয়ে আসে।”
বিড়বিড় করে এইটুকু বলেই,সে কেনীথের দিকে তাকিয়ে বলে,
“ব্রো! আবহাওয়া বিপদসীমার ওপরে…কিছু করবে না?”

পাভেলের কথায়, কেনীথ বইয়ের পাতা হতে নজর সরিয়ে একবার তার দিকে তাকায়। পরক্ষণেই বাড়ি হতে প্রায় বেড়িয়ে যাওয়া নায়রাকে পেছন হতে একপলক দেখে নেয়।
নায়রা তাদের এমনভাবে পাশ কাটিয়ে চলে গিয়েছে যেন,আশেপাশে সে ব্যতীত আর কেউই নেই। এবার কেনীথও এতে কোনোপ্রকার মন্তব্য না করে, পাভেলের উদ্দেশ্যে গম্ভীর স্বরে বলে,
“নাহ, আমি কিছুই করব না।”
এই বলে সে পুনরায় নিজের বই পড়ায় মনোযোগী হয়। এদিকে ততক্ষণে নায়রাও বাড়ি হতে বেড়িয়ে গিয়েছে। আর সবকিছু দেখার পর, পাভেলও ভারী শ্বাস ফেলে পুনরায় ভিডিও গেইমে নজর দেয়।

রাতের গভীরতা যেন নীরবতার আবরণে মুড়েছে পুরো বিস্তর জায়গাটিকে। নায়রা বসে রয়েছে বাড়ির পেছনের উঁচু ঢালু স্থানে। যেখানে সবুজ ঘাস ছড়িয়ে আছে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত। চারপাশে নিস্তব্ধতা, শীতল বাতাস আর পাহাড়ের গভীর ছায়া যেন তাকে আলাদা এক জগতে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে।
বাতাসে গাছের পাতাগুলো মৃদু ছন্দে দুলছে। সম্মূখে দৃশ্যামন অন্ধকারে ঢাকা দূরের পাহাড়গুলো।
আকাশ জুড়ে চাঁদ-তারার মেলা। চাঁদ তার উজ্জ্বল রূপে, আজ সবকিছুকে সোনালী আলোয় মুড়িয়ে দিয়েছে। চাঁদের আলো নড়েচড়ে থাকা বিস্তীর্ণ ঘাসের ওপর সোনার স্পর্শের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ছে। শীতল বাতাসে নায়রার চুলগুলো আলতোভাবে উড়ছে। চুলের আলগা খোপাটাও হেলে পড়ছে মাটির দিকে। অথচ এসবের কোনোকিছুতেই তার নজর নেই। তার দৃষ্টি শুধুই আকাশের দিকে—যেন আজ সে চাঁদের সঙ্গে কোনো অদৃশ্য সংলাপে নিমগ্ন।

নিশীথের এই নিঃশব্দ পরিবেশে, নায়রার মলিন মুখ যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে। পাহাড়ের অন্ধকার, চাঁদের আলোকিত ছায়া আর শীতল বাতাস—সব মিলিয়ে এক ধরনের শান্তি এবং গভীরতাময় রহস্যে ডুবে রয়েছে সে। মন মস্তিষ্কে চলছে নানান চিন্তাভাবনা।এই মুহূর্তে সে পৃথিবীর সব ব্যস্ততা ভুলে শুধুই স্বপ্নময় নিস্তব্ধতায় হারিয়ে গিয়েছে।
আর ঠিক এমন আবহের মাঝেই,আচমকা তার পেছন হতে কারো হেঁটে আসার শব্দে নায়রার ধ্যান ভাঙল। তবে সে পেছনে ফিরে একবারেরও জন্য, সেই ব্যক্তিটির দিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করে না। যেন খুব ভালো করেই বুঝে গিয়েছে, নিঃশব্দে হেঁটে আসা ব্যক্তিটি মূলত কে।
কেনীথের উপস্থিততেও নায়রার কোনো হেলদোল হলো না দেখে, কেনীথ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে নায়রার পাশে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ সময় অতিবাহিত হতেই,নায়রা টের পেল কিছু আজব শব্দ। তবে এই উদ্ভট আওয়াজটা কিসের, তা বুঝতেও তার বেশিক্ষণ লাগল না।

সে পাশে না তাকিয়েই বুঝে যায়, কেনীথ চেরি খাচ্ছে। একইসাথে ইচ্ছে করেই জোরে জোরে চিবিয়ে উদ্ভট আওয়াজ করছে। নিমিষেই নায়রার চোখমুখ কুঁচকে যায়।
ওদিকে কেনীথ সত্যি সত্যিই নির্বিকারে আকাশের পানে চেয়ে রয়ে—বসে বসে চেরি খাচ্ছে আর মিটমিট করে হাসছে। মাঝেমধ্যে প্রতিটা চেরি খাওয়া শেষে তার মুখ হতেই দূরে ছুঁড়ে ফেলছে।
এভাবে আরো কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর, কেনীথ দুটো চেরি নিয়ে নায়রার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
“খাবি?”
নায়রা আকাশের পানে হতে নজর সরিয়ে, তার সম্মূখে থাকা কেনীথের হাতের দিকে তাকায়। পরক্ষণেই নিরেট কন্ঠে বলে ওঠে,

“না!”
এই বলেই সে স্থান ত্যাগ করতে উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু উল্টো ঘুরে, বাসায় যেতে উদ্বিগ্ন হতেই,কেনীথ বাঁধা সাধে। নিজের বাম হাত দিয়ে, নায়রার একহাত টেনে ধরে। নায়রা নজর সরিয়ে তার দিকে তাকাতেই—কেনীথও বিস্তৃত আকাশ হতে নজর সরিয়ে তার দিকে তাকিয়ে খানিকটা রুক্ষ গম্ভীর স্বরে বলে,
“খাবি না, ভালো কথা। চলে যাচ্ছিস কেনো?”
—“হাত ছাড়!”
—“চুপচাপ এখানে এসে বোস।”
দুজনের কথার মাঝে নিস্তব্ধ সংঘর্ষ চলছিল। এরইমাঝে নায়রা খানিকটা ক্ষিপ্ত স্বরে চোয়াল শক্ত করে বলল,
“আমি তোর সব কথা শুনতে বাঁধ্য নই।”
এই বলেই সে তার হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইলে, কেনীথ আরো শক্ত নায়রার হাত চেপে ধরল। কেনীথের নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে, নায়রা আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে চাপা স্বরে আওড়ায়,
“ভি! ছেড়ে দে বলছি। নয়তো মেরে একদম খতম করে ছাড়ব।”
নায়রায় কথায় কেনীথ কিঞ্চিৎ মৃদু হাসে। পরক্ষণেই সে নির্বিকারে আরো একটা চেরি মুখে দিয়ে নায়রার উদ্দেশ্যে আওড়ায়,
“শুনলাম, মারামারি করে এসেছিস।”

—“আমি তোর মতো রাস্কেল নই যে, যেখানেই যাব, সেখানেই মা’রামারি করে আসব।”
কেনীথ আবারও মৃদু হেসে আওড়ায়,
“হুম, সেটাই। আপনি তো শুধু মা’রতে জানেন, মা’র খেতে নয়।”
কেনীথের কথায় নায়রা এবার থমকায়। কি যেন ভেবে নিয়ে ভারী শ্বাস ফেলে। এদিকে কেনীথও তার হাত ছেড়ে দিয়ে নিজের কাজে মনোযোগী হয়েছে।
নায়রা খানিকক্ষণ কিছু একটা ভেবে নিয়ে, বিরক্তি নিয়েই সোজা কেনীথের পাশে বসে পরে। কেনীথের হাত থেকে থাবা দিয়ে দুটো চেরি নিয়ে, একটা মুখে পুরে দেয়। অতঃপর নিরেট স্বরে কেনীথের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল,
“ঐ হু-রেন-জনের(বে*শ্যার সন্তান) বাচ্চাগুলো আমার সাথে মজা নিতে এসেছিল। এন্ড আই কুডেন্ট কনট্রোল মাই-সেলফ। দ্যাটস্ ওয়াই…আমি দুটোর মাথা আর নাক ফাটিয়ে দিয়ে এসেছি।”

[হু-রেন-জন একটি জার্মান শব্দ]
নায়রায় কথায় কেনীথ কিঞ্চিৎ হেসে ফেলল। নায়রা স্বভাবগত ভাবেই যথেষ্ট রাগী স্বভাবের। ও রাগের মাথায় যে কোনো কিছু করে ফেলতে পারে তবে সম্পূর্ণ হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে নয়। আজ বিকেলে সেই ডিলটা নিয়েই কিছু ইন্টারন্যাশনাল ক্লাইন্টের সাথে মিটিং করতে গিয়েছিল সে। তবে তাদের মিটিং জোনে গিয়ে, নায়রার অদ্ভুত পরিস্থিতিতে পড়ে যায়।
একে তো মাথা গরম, দ্বিতীয়ত লোকগুলোর অদ্ভুত ব্যবহার। নায়রাকে একা পেয়েই, তাদের ওমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহার প্রদর্শিত হয়েছে কিনা তা নায়রা জানে না। আর জানার প্রয়োজনও মনে করেনি। দুজন ব্যক্তির অদ্ভুত ইঙ্গিত আর কথাবার্তার অভিব্যক্তিতেই সে যা বোঝার বুঝে যায়। কিছুক্ষণ নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলেও, শেষ অব্দি আর নিজেকে সামলাতে পারে না।

শেষমেশ দুজনকে একাই ঘুষিয়ে মে’রে নাম-মাথা ফাটিয়ে দিয়ে এসেছে। সঙ্গে এও বলে শাসিয়েছে যেন—এইসব ঘটনাটা যদি মিডিয়া কিংবা পুলিশ অব্দি পৌঁছায় তবে তাদের লাইফ-ক্যারিয়ার সব বরবাদ করে ছাড়বে।
নায়রায় মুখে একে একে সব ঘটনা শোনার পর, কেনীথ যেন বেশ খুশিই হলো। সে নায়রার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে,
“উফ! ব্রাভো সুইঠি!”
কেনীথের অভিব্যক্তিতে নায়রা কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকায়। পরক্ষণেই ভারী শ্বাস ফেলে নিরেট স্বরে বলে,
“ঢং করবি না। আমি জানি, তুই আমাকে না বলেই এতোবড় ডিসিশনটা এমনি এমনি নিস নি। তবে তোর বলতে কি সমস্যা?”

—“না, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তুই আগেই সিনক্রিয়েট করবি বিধায়, কিছুই বলিনি। এই ডিলটার নিয়ে আমি মোটেও ইন্টারেস্টেড ছিলাম না। তোর এতো আগ্রহ দেখে, শেষমেশ নিজেই ওদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিই। এন্ড আই রিয়েলি ডিডেন্ট লাইক দেম। ওদের সাথে আমাদের ব্লাডেনের ডিল কনফার্ম হলে,আমাদেরই লস হতো।”
কেনীথের কথা শুনে নায়রা ভারী শ্বাস ফেলে আওড়ায়,
“এটা আগে বললেও পারতি।”
—“আমার মতে না বলেই ভালো হয়েছে। তোর কল্যাণে দু’টোর মাথা তো ফে’টেছে।”
কেনীথের কথা শুনে নায়রা এই পর্যায়ে হেসে ফেলল। পরক্ষণেই আবার দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল,
“সরি।”
কেনীথ নিস্পৃহে উত্তর দেয়,
“কিসের জন্য?”
নায়রা কেনীথের দিকে একপলক তাকিয়ে, কিছুটা ইতস্তত স্বরে আওড়ায়,
“আমার আগেই এতো বেশি রাগ করা উচিত হয়নি। কিন্তু এতে তোরও যথেষ্ট দোষ আছে। তুই আগেই আমাকে বলে দিলে,এতো কিছু হতো না। কিন্তু… ”

—“আচ্ছা, ওকে! ওকে! তোর যে রাগ কমেছে এটাই অনেক।”
কেনীথ এইটুকু বলে থেমে,কিছুক্ষণ পর আবারও বলে,
“আমার বয়সে এতো ছোট হবার পরও তোকে বড় বোন বানিয়েছি। কোথায় আমরা কোনো দোষ করলে তুই এসে শাসন করবি। অথচ উল্টো নিজেই রাগারাগি করে, এখানে এসে বসে আছিস। অ্যান্ড,ইন দ্য এন্ড, আমাকেই এসে আবার তোকেই সামলাতে হয়।”
কেনীথের কথা শুনে নায়রা, খানিক চুপসে যায়।পরক্ষণেই আবার স্বাভাবিক হয়ে, কঢ়া স্বরে আওড়ায়,
“তোদের যে বেলায় বেলায় রেঁধে খাওয়াচ্ছি,এটাই তো অনেক।”
—“জ্বী! মহামান্য নায়রা ইমানি আফু আমাদের রেঁধে না খাওয়ালে তো, আমরা অনাহারে মরে যেতাম।”
আচমকা পেছন হতে পাভেলের কন্ঠস্বরে নায়রার কপাল কুঁচকে যায়। পাভেল এসে নায়রার আরেকপাশে বসে পড়তেই,সে রুক্ষ স্বরে বলে,

“তুই আবার কোথায় থেকে এলি? এতক্ষণ কোথায় ছিলি?”
পাভেল চিপস খেতে খেতে, ইতস্ততস্বরে আওড়ায়,
“এই তো কাছেই ছিলাম। তোদের কথাবার্তায় ডিস্টার্ব হবে,তাই আর এদিকে আসিনি।”
পাভেলের কথায় নায়রা কপাল কুঁচকে ফেলে। ওদিক হতে কেনীথ আবার নির্বিকারে বলে ওঠে,
“মিথ্যে বলছে। আমাদের মাঝে কোনো ঝামেলা হলে, ওর যেন কিছু না হয়—এই ভয়ে গাছের পেছনে লুকিয়ে ছিল।”
কেনীথের কথায় পাভেল খানিকটা কেশে ওঠে। কেনীথের দিকে করুন চাহনিতে তাকিয়ে আওড়ায়,
“ব্রো!”
কেনীথ তার ডাকে, একপলক তাকিয়ে পুনরায় আকাশের পানে চেয়ে থাকে। এদিকে নায়রাও আর এই বিষয়ে কথা না বাড়িয়ে, পাভেলের কাছ থেকে চিপসটা টেনে নিয়ে খেতে শুরু করে। একে একে তাদের সাথে কেনীথও যোগ দেয়। তিনজনে মিলে চুপচাপ বিস্তীর্ণ ঘাসের উপর বসে থেকে,চিপস খাচ্ছে আর আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চাঁদ-তারা দেখছে।
এরইমাঝে পাভেলের কি যেন মনে হতেই, সে কেনীথের উদ্দেশ্যে বলে,

“বিগ ব্রো! আঙ্কেল আজ ফোন করেছিল।”
কেনীথ না তাকিয়েই, নিস্পৃহে আওড়ায়,
“যেতে বলেছে?”
—“এছাড়া আর কি বলবে…যাবে?”
—“না।”
কেনীথ সোজাসাপটা উত্তরে পাভেল ভারী শ্বাস ফেলে। নায়রা দুজনের কথোপকথন ঠিকই বুঝতে পারে। সে কেনীথের দিকে তাকিয়ে বলে,
“এক যুগ পেরিয়ে গিয়েছে…আঙ্কেলও এতো করে বলছে…আমার মনে হয়, তোর এবার যাওয়া উচিত। অল্প সময়ের জন্য হলেও…”
নায়রার কথা শেষ হবার আগেই, কেনীথ অকপটে বলে,
“না, আমি যাব না।”
এবার নায়রাও আর কিছু বলে না। পুনরায় সকলের মাঝে পিনপতন নীরবতা। খানিকটা সময় পর, পাভেল হাই তুলতে শুরু করে। এবং ঘুমানোর উদ্দেশ্যে বলে,
“আমি ঘরে যাচ্ছি। সেই ঘুম পেয়েছে আমার।”
এই বলেই, পাভেল স্থান ত্যাগ করে চলে যায়৷ এদিকে নায়রা আর কেনীথ এখনো চুপচাপ বসে রয়েছে। কিছুক্ষণ সময় অতিবাহিত হতে না হতেই, আবারও তাদের পুরোনো আলাপ শুরু হয়।

—“তোর একটা সাজানো-গোছানো পরিবার রয়েছে। অনেকটা বছর তো সবার থেকে দূরে দূরে থেকেই কাটিয়ে দিলি। একবারও কি ইচ্ছে হয় না…নিজের দেশ,নিজের পরিবারের কাছে ফিরতে?”
নায়রায় কথায় কেনীথ মৃদু হেসে আওড়ায়,
“ওখানে আমার জায়গা সীমিত। আমি এখানেই ঠিক আছি।”
নায়রাও আর এবার বেশি কিছু বলে না। কেনীথও যেন ধীরে ধীরে স্তব্ধ হতে শুরু করেছে। পুরোনো স্মৃতিতে ডুবে থাকার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার নেই। সেসব অতীতের স্মৃতি শুধুই বি’ষাক্ত। দেশ,পরিবার ছেড়ে এখানে বছরের পর বছর পড়ে থাকলেও, এখানে সে শান্তিতে রয়েছে। যা হয়তো দেশে গিয়ে পাবে না।

নায়রা এবার প্রসঙ্গ পরিবর্তনের জন্য, ভারী শ্বাস ফেলে মুচকি হেসে ওঠে। কেনীথও তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। পরক্ষণেই আবার দুজনে স্তব্ধ,শান্ত বিমূঢ়। তাদের কারোরই অতীত সুখকর নয়—সবই যেন বি’ষাক্ত।
কেনীথই এবার কি যেন ভেবে, প্যান্টের পকেটে হাত দেয়। আসার সময় যে এক প্যাকেট সিগারেট আর লাইটার এনেছিল—তা তো প্রায় সে ভুলেই গিয়েছিল। কেনীথ সিগারেটের প্যাকেটটা বের করতেই নায়রা কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকায়৷ এদিকে ততক্ষণে কেনীথ একটা সিগারেট ঠোঁটের আগায় রেখে, লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। তবে সে তাতে টান দেওয়ার পূর্বেই,নায়রা অকস্মাৎ তার ঠোঁট থেকে সিগারেটটা টেনে নিয়ে ফেলে দেয়। একইসাথে হাত থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটারটাও কেঁড়ে নেয়।
কেনীথ খানিকটা রাগ ও বিস্ময়ের চাহনিতে তার দিকে তাকাতেই—নায়রা উল্টো তার দিকে চোখ রাঙিয়ে বলে,
“সেন্টি খাচ্ছিস ভালো কথা, সিগারেট খেতে কে বলেছে তোকে?”

—“এবার কিন্তু বেশি বেশি হচ্ছে।”
—“হোক বেশি, একটু আগেই না বললি—আমার উচিত সবসময় তোদের সাথে বড় বোনের মতো আচরণ করা। তাহলে বড় হয়ে কিভাবে তোকে এসব ছাইপাঁশ খেতে দেই, বলতো?”
কেনীথ কিছুই না বলে, চোয়াল শক্ত করে নায়রার দিকে তাকায়। সে ক্ষিপ্ত হয়ে কিছু করবে তার পূর্বেই নায়রা নিরেট ভঙ্গিতে বলল,
“অনেক রাত হয়ে যা গিয়ে ঘুমিয়ে পর। নয়তো…”

—” হ, বড় হয়ে এখন মা’র আমায়।”
কেনীথের তাচ্ছিল্যের কন্ঠস্বরে নায়রা মৃদু হেসে বলে,
“না,না, এটা আমি করব না। তোকে মে’রে তোর বউয়ের হক নষ্ট করতে চাই না আমি।”
নায়রার কথায় কেনীথের কপাল কুঁচকে যায়। সে সন্দিহান স্বরে আওড়ায়,
“হোয়াট…?”
নায়রা আবারও মৃদু হেসে বলে,
“তোকে মারধর করে ঠিক করার দায়িত্ব না হয়, তোর বউকেই দিলাম। আই হোপ, শি হ্যান্ডলস হার ডিউটিজ ওয়েল।”
এবার কেনীথও যেন তার কথা শুনে হেসে ফেলল। সে তাচ্ছিল্যের সহিতেই নায়রার উদ্দেশ্যে বলল,
“দ্যাট ওয়াজ হিলেরিয়াস। কোনো মেয়ে কিনা আমার বউ হয়ে, আমাকেই মারধর করবে? এই ভি এর এতোও দুর্দিন আসেনি, সুইঠি!”

—“ওহ্ আচ্ছা? এতোও ভাব নিও না ব্রো। একবার যখন বউয়ের চিপায়…আই মিন, মাইনকার চিপায় পরবা,তখন ঠিকই বুঝবা বউ কি জিনিস।”
নায়রা এইটুকু বলতে না বলতেই হেসে ফেলল। ওদিকে তার পাশাপাশি কেনীথ মুচকি হাসল। পরক্ষণেই আবার দুজনে ভারী শ্বাস ফেলে আকাশের পানে চেয়ে থাকে। আজ পুরো আকাশ জুড়ে যেন তারার মেলা জমেছে। দেখতেও বেশ সুন্দর লাগছে। চাঁদের পাশে একটা তারা একটু বেশিই জ্বলজ্বল করছে। অনেকক্ষণ আগে থেকেই নায়রা সেই তারাটিকে লক্ষ করছিল।

সে কি যেন ভেবেই একবার পাশে ফিরে কেনীথকে দেখে—কেনীথও নিস্পৃহে তাকিয়ে আকাশের দিকে। নায়রা এবার মুখ ঘুরিয়ে পুনোরায় সেই তারাটার দিকে তাকাতেই দেখে, পাশ হতেই একটা তারা ছুটেছে।যা দেখামাত্রই সে দ্রুত চোখ বুঁজে ফেলে। হাত দুটো একমুঠো করে মনে মনে কিছু একটা আওড়িয়ে, চোখ খুলতেই কেনীথ পাশ থেকে বলল,
“তুমি আবার এসব কবে থেকে বিশ্বাস করিস?”
কেনীথের কথায় নায়রা কিছুটা ইতস্তত স্বরে বলল,
“আ…করি না তবে…কখনো এভাবে তারা ছুটতে দেখলে, নিজের উইশটা জানিয়ে দেই।”
কেনীথের কিঞ্চিৎ মৃদু বাঁকা হেসে বলল,
“তো আজ কি চাইলি?”

নায়রা স্তব্ধ চাহনিতে তার দিকে তাকায়। পরক্ষণেই আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আকাশের এতোগুলা তারার মাঝে, অনেক বেশি স্পেশাল একটি তারা তোর জীবনে আসুক। যে এসে তোর জীবনের সকল খারাপ কিছুকে,দূর করে দেবে।”
নায়রা এইটুকু বলে থামে।পরক্ষণেই আবারও মুচকি হেসে, সেই চাঁদের পাশে জ্বলজ্বল করতে থাকা তারাটার দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে ইশারা করে বলে,
“ঠিক ঐ তারাটার মতো। দেখ কি সুন্দর চাঁদের সাথে মানিয়েছি! ওমনই একটা নক্ষত্র আসুক তোর জীবনে। যে সবার চেয়ে অনন্য হবে। বিকজ, ইউ ডিজার্ভ ইট।”
কেনীথ নায়রায় কথায় মলিনভাবে মুচকি হাসে। সে স্তব্ধ হয়ে, চাঁদের পাশে জ্বলজ্বল করতে থাকা তারাটার দিকে তাকিয়ে। খানিকটা সময় পর, সে নিস্পৃহে বলে ওঠে,
“হয়তো এমন কিছুই আর সম্ভব নয়।”

কেনীথের কথায়, নায়রা কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকায়। কেনীথ মৃদু হেসে আওড়ায়,
“লোকে তো বলে চাঁদের গায়ে ওসব দাগ নাকি তার কলঙ্ক। সেক্ষেত্রে…ওই নক্ষত্রের কাছে আমি হলাম তুচ্ছ।চাঁদ হয়ে কঙ্কলের দাগ নিয়ে—ওই জ্বলজ্বলে তারাকে পাওয়াটা কি আমার অন্যায় হবে না?”
কেনীথের এহেন কথার উদ্দেশ্য নায়রা ঠিক বুঝতে পারল না।কেনীথকে সচারাচর সে এমন ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখে না। সে খানিকটা সন্দিহান স্বরে কিছু বলার পূর্বেই, কেনীথ দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
“তুই কি এখানে আরো থাকবি? ঘুম পায়নি?”
নায়রাও এবার ভারী শ্বাস ফেলে বলে,
“পেয়েছে, তবে তুই যা। আমি কিছুক্ষণ পর আসছি।”

—“আচ্ছা ঠিক আছে, আমি না হয় আরো কিছুক্ষণ… ”
কেনীথের কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই নায়রা দ্রুতস্বরে বলে,
“এই না! তুই যা। আমি কিছুক্ষণ একা থাকব।”
নায়রার কথায় কেনীথ খানিকটা কপাল কুঁচকে তাকাতেই, নায়রা যেন নিজেকে স্বাভাবিক করে নেয়। কেনীথের কাছে বিষয়টা খানিক অদ্ভুত লাগলেও,সে আর কিছুই না বলে চলে যাওয়ার ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায়,
“ঠিক আছে,বেশি দেরি করিস না। আমি চললাম।”
এই বলেই কেনীথ তার জায়গা ত্যাগ করে চলে যায়,এবং তারপরের কিছুক্ষণ সময় অব্দি নায়রা একই ভঙ্গিতে চুপচাপ বসে থাকে। কিন্তু আরো বেশ খানিকটা সময় পেরিয়ে যেতেই, নায়রা আচমকা পেছনে ঘুরে আশেপাশে ফিরে তাকায়। চারপাশে গাছপালা ব্যতীত আর কাউকেই দেখতে না পেয়ে সে বিস্তৃত মুচকি হাসে।

পরক্ষণেই নিজের পাশেই জামার নিচে সরিয়ে রাখা সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে। অত্যধিক উচ্ছ্বাসে একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে,লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তবে খুব বেশি হলে, পুরোপুরি এক টান দেওয়ার পূর্বেই আচমকা মাথার পেছনে সজোড়ে থাপ্পড় খেতেই, তার সম্পূর্ণ মস্তিষ্ক ঝিমঝিম করে ওঠে।
পেছনে ঠিকমতো তাকানোর পূর্বেই, এক বলিষ্ঠ হাতের থাবায়, তার হাত থেকে সিগারেট আর লাইটারটা ছোঁ মে’রে নিয়ে যায়৷ একইসাথে শুনতে পায় কেনীথের তাচ্ছিল্যপূর্ণ রাগান্বিত সকল কথাবার্তা,
“ইশ! নিজের ভালো হওয়ার কোনো নাম-নিশান নেই,অথচ বড় বোনের শাসন ফলাতে এসেছে। নেক্সট টাইম, আবারও এমন কিছু দেখলে,সোজা কানের নিচে মা’রব।”
কেনীথের এহেন কার্যক্রমে নায়রা নিমিষেই অনুনয়ের স্বরে আওড়ায়,
“ভাই প্লিজ একবার দে,ঠিকমতো এক টানও দিতে…”

—“নায়রা..!”
কেনীথের নিরেট কন্ঠ ও কঠোর দৃষ্টিতে নায়রা থেমে যায়। তবুও নিজেকে সামলাতে না পেরে দ্রুত কেনীথের হাত থেকে সিগারেটের প্যাকেকটা টেনে নিতে ধরলেই—কেনীথ দ্রুত হাত সরিয়ে ফেলতে চায়।নায়রাও থেমে থাকার মতো ব্যক্তি না। সে জোরপূর্বক কেনীথের এক-পা টেনে ধরে, হাত দিয়ে প্যাকেটটা নিয়ে টানাটানি শুরু করে।
—“সুইঠি, এবার কিন্তু সত্যিই বেশি বেশি হচ্ছে।”
—“রাখ তোর বেশি বেশি, আমার থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে যে তোরা সারাদিনই এসব ছাইপাঁশ খাস—তা কি আমি জানি না? তাহলে আমি খেলে সমস্যা কি? এমনিতেও এবছর আমি এসব ছুঁয়েও দেখিনি। শুধু আজকের জন্য দিয়ে দে,প্লিজ।”
—“না, কখনোই না।”
এভাবেই দুজনের হাতাহাতির এক পর্যায়ে কেনীথ আর উপায় না পেয়ে, লাইটার আর সিগারেটের প্যাকেট—দুটোই পাশেই ফেলে দেয়। একইসাথে নায়রার হাত দুটো পেছন থেকে শক্ত করে চেপে। নায়রা কেনীথের এহেন কাজে হতভম্ব হয়ে বলে,

“ওই কি করছিস?”
নায়রা যেন বুঝতে পারে কেনীথ এই মূহুর্তে কি করবে। যথারীতি সে-ও তার হাত থেকে ছাড়া পেতে কেনীথের হাঁটু বরাবর লাথি মেরে, পাশ থেকে পুনরায় সিগারেটের প্যাকেরটা তুলে নিতে গেলেই—কেনীথ এবার সোজা তার পা টেনে ধরে।
নায়রা আধশোয়া হয়ে সিগারেটের প্যাকেটটা ছোঁয়ার পূর্বেই, কেনীথ তার পা ধরে উল্টো দিক হতেই টেনে বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হলো। এদিকে ঘাসের উপর টানাহ্যাঁচড়ায় নায়রার অবস্থা বেহাল। তার চেয়েও হতভম্ব কেনীথের কাজে। কেনীথ একটাও কথা না বলে, সেই যে তাকে টেনে নিয়ে চলেছে তো চলেছেই৷ পেছনে নায়রার হাত-পা,মাথা কোথায় কোনটা কোনদিকে চলে যাচ্ছে, তা দেখার প্রয়োজনীতা তার নেই। এরইমাঝে নায়রা চাপা স্বরে চিল্লিয়ে হিসহিসিয়ে বলে উঠল,

“ছেড়ে দে বলছি,ছাড় আমায়। নয়তো এমন অভিশাপ দেব যে…বিয়ে হবে না তোর। আর হলেও তোর বউ তোকে ধরে ধরে মা’রবে। বউদের জ্বালায় তুই নিজেই একদিন…”
নায়রার কথা শেষ হতে না হতেই, আচমকা সজোড়ে কেনীথ পা ধরে টান দিতেই—নায়রার মাথা গিয়ে মাটির সাথে বারি খায়। এবং তৎক্ষনাৎ তার জবান বন্ধ হয়ে যায়। ওদিকে কেনীথ তাকে টানতে টানতে শেষ পর্যন্ত বাড়ির সীমানা অব্দিই টেনে নিয়ে আসে।

নায়রাকে বাড়িতে পাঠিয়েছে বহুক্ষণ পূর্বেই৷অথচ কেনীথ নিজে আবারও এসে বসেছে সেই একই জায়গায়৷ রাত যত গভীর হচ্ছে, নিস্তব্ধতা যেন ততই বাড়ছে। অথচ কেনীথ আজ একে একে নিকোটিনের ধোঁয়ায় নিজের অন্তস্থলকে পূর্ণ করতে মগ্ন।
একহাতে গিটার, অন্যহাতে সিগারেট। কখনো টুংটাং শব্দ করছে,তো কখনো সিগারেটে ঠোঁট ছুঁইয়ে টান দিচ্ছে। অথচ তার নজর সেই দূর আকাশের পানে। বিশেষ করে সেই চাঁদের পাশে জ্বলজ্বল করতে থাকা তারার দিকে। কি যেন সব ভাবছে,আর মাঝেমধ্যেই তাচ্ছিল্যের সহিত মৃদু হাসছে।
এরইমাঝে আরো একটা সিগারেট ফুরিয়ে যেতেই, সে এবার থামে। বিস্তৃত ঘাসের বুকে শুইয়েই, গিটারটা ঠিক পজিশন অনুযায়ী গুছিয়ে নিয়েই বিষন্ন কন্ঠে গাইতে শুরু করে,

❝Sari raat aahein bharta…Pal pal yaadon me marta
Mane na meri mann mera…
Thode thode hosh madhoshi si hai,
Nind behoshi si hai Jane kuch bhi na
mann mera…
Kabhi mera tha par ab baigana hai ye
Diwana diwana samjhe na…❞

❝….Kabhi chup chup rahe…Kabhi gaya ye kare Bin puchhe teri tarifein
Sunaya ye kare Hai Koi haqiqat
Tu ya koi fasana hai Kuch jane agar to itna Ki ye tera
deewana hai re Mann mera mane na…❞

মহামায়া পর্ব ২

ভোর হতে চলল অথচ আনায়ার চোখে ঘুম নেই। সে আকাশের পানে চেয়ে, গুনগুনিয়ে গান গাইতে ব্যস্ত। মাকে শেষ রাতে ঘুমের কথা বলে, দরজা বন্ধ করে নিলেও—সারারাতে একটুও ঘুমাতে পারেনি সে। আজ কোনমতেই ঘুম আসছে না। সর্বস্বে এক অদ্ভুত ছটফটানি অনূভুত হচ্ছে। হঠাৎ এই অস্থিরতার কারণ সে জানে না।
তাই সেই মাঝরাত থেকেই আনায়া তার রুমের বারান্দায় চুপচাপ বসে রয়েছে। বারান্দার এক কোণায় থাকা বেলীফুল গাছে ফুটে থাকা, বেলীফুলের সুগন্ধিতে চারপাশে মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। অথচ আনায়ার মন ভালো করা—তার এই প্রিয় বেলীফুলগুলোও তাকে শান্ত করতে পারছে না। মনের ভেতরে চলতে থাকা নানান প্রশ্ন তাকে বিষন্ন,অস্থির করে তুলছে। এরইমাঝে আনায়া আকাশের পানে তাকিয়ে, চাঁদের উদ্দেশ্যে আওড়ায়,
“অপার্থিব চাঁদ তুমি, ক্ষুদ্র এক নক্ষত্র আমি।তবু তোমার অতল প্রভায় দ্যুতিত হব; নীরব হলেও অমোঘ আলোকে অঙ্গীকার করিব।”

মহামায়া পর্ব ৪