Home প্রেমের নীলকাব্য প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫১

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫১

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫১
নওরিন কবির তিশা

দীর্ঘদিনের আঁধার কাটিয়ে আজ যেন এক নতুন ভোরের সূর্য উদয় হয়েছে হক ম্যানশনের আঙিনায়। নওফেল হক আর পরিবারের উত্তরাধিকারী গুলোর দীর্ঘকালীন ভুল বোঝাবুঝি ছাপিয়ে প্রত্যাবর্তনে বাড়ির প্রতিটি ধূলিকণা পর্যন্ত আজ আনন্দে ঝলমল করছে।অনেকদিন পর বাবা আর ছেলে মাঝখানের সেই বরফ জমা পাহাড়টা গলে গিয়ে এক পরম শান্তির ধারা নেমে এসেছে পরিবারে।

সকালবেলার কাঁচা রোদটা বাগানের শিশিরভেজা ঘাসের ওপর মুক্তোর মতো ঝিলিক দিচ্ছে। হক ম্যানশন এর বিশাল আঙ্গিনার প্রশস্ত বাগানের একপাশে বড় কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়ায় বনভোজনের আসর বসেছে। ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে বকুল ফুলের হালকা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। নীল আকাশটা আজ যেন একটু বেশিই পরিষ্কার।
বাগানের মাঝখানে বড় শতরঞ্জি বিছানো হয়েছে। একপাশে মাটির উনুনে জ্বলছে আগুন,সেখান থেকে ধোঁয়া উঠছে কুণ্ডলী পাকিয়ে। ম্যানশন এর সুবিশাল কড়াইয়ে ফুটছে সবার প্রিয় কাচ্চি। সেই ঝাল-মসলার সুঘ্রাণে পুরো বাগানটা আমোদিত। সমগ্র ম্যানশন যেন মেতেছে এক আনন্দ উৎসবে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

বড় বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে নুরুজ্জামান হক সাহেব নির্নিমেষ চোখে চেয়ে আছেন বাগানের দিকে। মনের কোনের তৃপ্ততার প্রকাশ পাচ্ছে ঠোঁটের প্রসরিত হাসিতে। নওফেল হক, নিহাল হক আর নওশাদ হক পাশে বসে বাবার সাথে নিচু স্বরে কথা বলছেন, বাবা ছেলেদের সেই হাসির রোল ছড়িয়ে পড়ছে গাছের ডালে বসে থাকা পাখিদের মাঝেও। দীর্ঘদিনের সেই গুমোট ভাবটা কেটে গিয়ে বাগানটা আজ যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। চারদিকে শুধু খুশির গুঞ্জন আর পুনর্মিলনের এক আবহ।

বাগানের অন্যপ্রান্ত তখন বাড়ির নবকুঁড়িদের কলকাকলিতে মুখরিত। হক পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম যেন আজ ডানা মেলা প্রজাপতির দল। দীর্ঘদিনের জড়তা কাটিয়ে তারা মেতেছে প্রাণের উৎসবে।সারা,তানহা ঘাসের ওপর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আর তিহু চপলতায় সেও যেন আজ এক দুরন্ত কিশোরী। পরনে হালকা বাসন্তী রঙের সুতি থ্রি পিস, চুলে আলগা করে গোঁজা একটা রক্ত লাল কৃষ্ণচূড়া। সে পিহু আর রাফা মিলে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কৃষ্ণচূড়ার ঝরা ফুল দিয়ে মালা গাঁথতে। তাদের হাসির শব্দে বাগানের কাঠবিড়ালিগুলোও যেন থমকে দাঁড়াচ্ছে।
একটু দূরে বড় একটা আমগাছের নিচে বসেছে তরুণদের আড্ডা। তাজহীর আর তিহুর বড় ফুফুর ছোট ছেলে তাওহীদ মিলে হাড়িতে আলতো করে কাঠি নাড়ছে আর বড়দের মতো গম্ভীর ভঙ্গিতে রান্নার তদারকি করছে, যদিও তাদের মূল লক্ষ্য হলো কখন পাশ থেকে মাংস সবার অগোচরে মুখে পুড়তে পারে।

হঠাৎই সব হট্টগোল ছাপিয়ে ভেসে এল গিটারের তারের ঝঙ্কার। ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বসেছে রাওফিন। পাশে বসা তিহুর বড় ফুফুর বড় ছেলে সাজ্জাদ। রাওফিনের তার কোলের ওপর রাখা গিটারটা সকালের রোদে চিকচিক করছে। রাওফিনের আঙুলের ডগায় গিটারের তারগুলো যেন কথা বলে উঠল—একটা চেনা সুরের টুংটাং প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল পুরো হক ম্যানশনে।
সকলে নিজ কাজ বাদ দিয়ে তাকিয়ে আছে রাওফিনের দিকে। গিটারের সুরেলা রেশ ধরে ইজিচেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন নুরুজ্জামান হক। নাতি নাতনিদের উদ্দেশ্যে তাকালেন দুহাত বাড়িয়ে হঠাৎ মৃদু আর পৌঢ়ত্বের ভারে প্রকম্পিত কন্ঠে গেয়ে উঠলেন,,

🎶 আজকে পেলাম দুহাত ভরে যা ছিল স্বপ্ন আমার….
খুশির খামে এই দিনটাকে জীবন দিল উপহার…🎶
বাবার গলার আওয়াজ পেয়ে নওফেল হক, নিহাল আর নওশাদ—তিন ভাই এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। বাগানের কোণে কোণে ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় সবাই একে একে এসে জড়ো হতে লাগল শতরঞ্জির চারপাশে।
তিহু হাতের মালাটা রেখে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ছুটে এলো প্রিয় দাদু ভাইয়ের সান্নিধ্যে।রাওফিনের গিটারের রিদমটা তখন একটু বেড়ে গেছে।সাজ্জাদ, তাজহীর, তাওহীদ, রাফা,সারা,পিহু সকলের ছুটে আসলো নুরুজ্জামান হকের কাছে। তাকে ঘিরে ধরে সাজ্জাদ,তাজহীর,তাওহীদ আর রাওফিন মিলে ফের সুর তুললো,,

🎶কিছু কিছু সুখের লগন…
চোখে ঝরায় খুশির শ্রাবণ….
ছুয়ে যায় আজ এ মন….
ভরে যায় এই জীবন…🎶
তাদের কলি শেষ হতে নওশাদ হক তিহু,রাফা,পিহু,তানহা আর সারাকে বুকে জড়িয়ে গাইলেন,
🎶যায় বয়ে যায় হৃদয় জুড়ে…
আজ কত সুখের হাওয়া….🎶
নিহাল হক পিছন থেকে গাইলেন,,
🎶 নদীর জলে মিটলো কখন….
এই মনের যত পাও….🎶
নওফেল হক মেয়ে গুলোকে একপ্রকার কেড়ে নিজের বুকে টেনে জড়িয়ে গাইলেন,,
🎶 ধীরে ধীরে সবার মাঝে….
নিজেকে আজ পেলাম খুঁজে…
ছুয়ে যায় আজ এ মন…
ভরে যায় এ জীবন….🎶

বাড়ির কর্ত্রী গুলো আজ অবাক বৃষ্টিতে চেয়ে দেখছে বাড়ির কর্তাদের এরূপ। যে বাড়িতে প্রায়শই খু*ন খা*রাবি সাধারণ ঘটনা সে বাড়িতেই এমন দৃষ্টান্ত অত্যন্ত বিরল। আফরোজা আনম শাড়ির আঁচলে চোখ মুছলেন। তৈয়্যু জামান রওশনারা খান আর নিশাত মজুমদার এসে দাঁড়ালেনের শাশুড়ি মায়ের পিছনে। নাসরিন হক আইরিন হক আর সাজরিন হক ও মনোমুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে বাবার দিকে। সকলে প্রান ভরে দেখলেন পারিবারিক এমন প্রেম পূর্ণ মেলবন্ধন। নুরুজ্জামান সাহেব ঝাপসা চোখে দেখলেন, তার সাজানো বাগানটা আজ সত্যিই পূর্ণ।

—’উনি শেহতাজ চৌধুরী। বাবা, ভীষণ বড় ব্যবসায়ী আর উনি তো বর্তমানে আমাদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতা তুমি জানো না?
আফরিনের কথায় রীতিমতো আকাশ থেকে পড়ল মুন্নি। ওই হাড়ে বজ্জাত ছেলে যে কিনা সারাদিন মুন্নির পিছনে লেগে বেড়ায় তার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড এত ভালো! ব্যাপারটা অবিশ্বাস্যকর মুন্নির জন্য। মুখ কুঁচকে সে শুধালো,,

—’আর ইউ শিওর? তুমি সত্যি জানো ওনার সম্পর্কে?
—’ডেফিনেটলি। ইভেন শুধু আমি কেন এই ভার্সিটির প্রত্যেকটা স্টুডেন্ট ওনার সম্পর্কে অবগত।
মুন্নি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।যে ছেলেটাকে সে এতদিন নিছক এক বখাটে বাউণ্ডুলে ভেবে এসেছে, তার আড়ালে এমন এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব লুকিয়ে আছে—তা ভাবতেই মুন্নির মনের ভেতরটা কেমন ওলটপালট হয়ে আসছে। যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না সে। তবে তার বিস্ময় কাটবার আগেই দূর থেকে আফরিনের এক বান্ধবী উচ্চস্বরে তাকে ডাকল,,,

—’আফরিন, জলদি আয়! তোর ভাইয়া এসেছে।
আফরিন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মুন্নির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,—’ছুটি তো অনেক আগেই হয়ে গিছে, আর ভাইয়াও এসে গিয়েছে আজ আসি।—এই বলেই আফরিন ভিড়ের মাঝে মিলিয়ে গেল।
বিশাল চত্বরে মুন্নি এখন একা এখন। তার গাড়িটা আসতে আজও বেশ দেরি করছে। সে ধীর পায়ে গেটের দিকে এগিয়ে চলল। নির্জন পথটুকুতে হাঁটতে হাঁটতে মনের ভেতরের রণক্ষেত্রটাকে সামাল দিতে দিতে আনমনেই সে বলে উঠলো,,

—’আসলেও ওই ব্যাডার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো? কিন্তু আমি চিনলাম না!
ঠিক তখনই পেছন থেকে বাতাসের সাথে ভেসে এল সেই চেনা কণ্ঠস্বর। এক অদ্ভুত শ্লেষ আর বিষণ্ণতা মেশানো স্বরে পিছন থেকে কেউ বলে উঠল,,
—’সারা দুনিয়া আমাকে চিনল ম্যাডাম, কেবল আপনিই চিনলেন না, আর নাতো একবার ফিরে তাকাবার প্রয়োজন বোধ করলেন।
মুন্নি চমকে ফিরে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিগত হল দীর্ঘদেহী সুদর্শন শেহতাজ! রোদেলা দুপুরে শেহতাজের অবয়বটা আজ যেন একটু বেশিই প্রখর দেখাচ্ছে। মুন্নি তার প্রশংসা করতে গিয়েও থমকালো। মুখ বাঁকিয়ে বলল,,

—’শুধু ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো হলেই তো মানুষ ভালো হয় না। আপনি হলেন আপনার পরিবারের বাউন্ডুলে আর বখাটে সন্তান। সো,আপনাকে চেনার মতো নষ্ট করার সময় আমার হাতে নেই।
শেহেতাজ এতক্ষণ সামান্য সিরিয়াস থাকলেও মুন্নির বলা কথাটাতে মুহূর্তেই গতানুগতিক পরিচিত ভঙ্গিমায় ফিরে এসে বলল,,
—’তা সময় নষ্ট করবে কেন? এসবে সময় নষ্ট করলে বাংলা সিরিয়ালের কুটনি নায়িকার মত কেমন করে হবে? যাও যাও বাংলা সিরিয়াল দেখো যাও!

“ইউ্যইইইই”——তার কথাই মুন্নি রেগে গিয়ে তার দিকে তেড়ে যেতে গিয়েও থামলো, একটা তপ্ত নিশ্বাস ফেলে দ্রুত পা চালাল। হনহনিয়ে হাঁটা দিল ‌সামনের দিকে। রাগে মাথার ভেতরটা তখন ঝনঝন করছে।তবে শেহতাজও নাছোড়বান্দা, সে খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে মুন্নির পিছু পিছু হাঁটতে লাগল।
বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর দেখে কিছুটা দূরের এই দিকটা নির্জন। রোদের তেজ কমে এসে চারদিকে কেমন একটা গুমোট স্তব্ধতা।মুন্নি দ্রুত পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা তিন-চারটে বখাটে যুবক তার পথ আগলে দাঁড়াল; বিচ্ছির গড়নের ছেলেগুলোর চোখে মুখে এক অদ্ভুত ঘৃণ্য লালসতা।
তাদের মধ্য থেকে একজন নোংরা হাসি হেসে বলল,,

—’কী গো সুন্দরী, এত তাড়া কিসের? আমাদের সাথে একটু সময় কাটালে হয় না?
এতক্ষণ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত এর উত্তপ্ত লাভা বিদ্যমান মুন্নির বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই হিমশীতল বরফের ছোঁয়ায় ঠান্ডায় জমাটবদ্ধ হলো যেন।সে কাঁপাকাঁপা স্বরে বলল,,
—’পথ ছাড়ুন বলছি, ভালো হবে না কিন্তু!

অন্যজন আরও একধাপ এগিয়ে এসে মুন্নির ওড়নার খুঁট ধরার চেষ্টা করল। মুন্নি আর্তনাদ করে পেছাতে গিয়ে হোঁচট খেল।জনশূন্য রাস্তাটাতে নিজের বিপন্নতা দেখে তার চোখের কোণে জল জমে উঠল। ঠিক যখন বখাটেদের একজন তার হাত ধরার জন্য উদ্ধত হলো, তখনই যেন তীব্র ঘূর্ণির বেগে সেথায় এক রুদ্রমূর্তির আবির্ভাব ঘটল।
বখাটের হাত মুন্নির অবয়ব ছোঁয়ার আগেই শেহতাজের সুঠাম হাতের এক প্রচণ্ড থাবড়া আছড়ে পড়ল তার গালে। পরক্ষণেই শেহতাজ বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের ওপর। তার প্রতিটি আঘাত ছিল নির্ভুল আর তীব্র। কয়েক মুহূর্তের ধস্তাধস্তিতে বখাটেরা নাস্তানাবুদ।শেহতাজের ক্ষিপ্ত বাঘের ন্যায় হিংস্রতায় তারা প্রাণভয়ে যে যেদিকে পারল চম্পট দিল।
ধুলোবালি ঝেড়ে শেহতাজ ঘুরে দাঁড়াল। তার উদ্ধত চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে, নিঃশ্বাস বইছে দ্রুত। মুন্নি তখনও পাথরের মতো দাঁড়িয়ে কাঁপছে। শেহতাজ তার খুব কাছে এসে শান্ত কিন্তু গম্ভীর স্বরে বলল,

—’বললাম না মিস অ্যারোগ্যান্ট, সবাইকে চেনা যায়, কিন্তু আমাকে চেনা অত সহজ নয়। এখন ভয় না পেয়ে গাড়িতে গিয়ে বসুন,যান।
মুন্নি কথা বলতে পারল না। তার অভিমানী মনের সমস্ত দেয়াল যেন এক নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। এই বখাটে, বাউণ্ডুলে ছেলেটার বুকের ভেতর যে এমন এক অতন্দ্র প্রহরী লুকিয়ে আছে, তা সে কল্পনাও করেনি। এক অজানা ভালোলাগার আবেশে তার হৃদস্পন্দন থমকে গেল। শেহতাজের এই বীরত্বের দিকে চেয়ে মুন্নির মনের মণিকোঠায় এক নতুন অনুভূতির অঙ্কুরোদ্গম হলো বোধহয়, যার নাম সে দিতে পারছে না, কিন্তু সেই মুগ্ধতা তাকে ইতিমধ্যেই আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।
এদিকে মুন্নির এমন দৃষ্টিতে তার চোখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে শেহেতাজ বলল,,

—’হোয়াট হ্যাপেন,মিস?ক্রাশ খেলেন নাকি?
মুন্নির ধ্যান ভাঙতেই দৃষ্টি সরিয়ে অন্য দিকে তাকালো সে।তাকে এমন অস্বস্তিতে দেখে মুচকি হাসলো শেহেতাজ।কেটে যাওয়া হাতটায় চেয়ে বলল ,,
—’যান গিয়ে ভেতরে বসুন।এভাবে তাকানোর কিছু নাই। আফটার অল আমি তো পরিবারের বখাটে ছেলে।
মুন্নি কিছু বলতে গিয়েও থামলো।অগ্রসর হলো গাড়ির দিকে। এদিকে সে দু পা বাড়াতেই পেছন থেকে শেহেতাজ নিজের কেঁটে যাওয়া হাতের দিকে তাকিয়ে আনমনে বলল,,

—’তোর আর কি? হাম….! বিভিন্ন সিনেমা দেখতাম নায়িকাকে বাঁচানোর সময় নায়কের হাত কেটে গেলে নায়িকা ওড়না ছিঁড়ে নায়কের হাতে বেধে দিত।আহ কি দারুন ছিল মোমেন্টগুলো।আমি তো বারবার টেনে টেনে দেখতাম। তোর কপালে তা নেই রে শেহেতাজ।
চলতে চলতেই থেমে গেল মুন্নির পা জোড়া।সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারল শেহেতাজ তাকে খোটা দিতেই কথাগুলো বলেছে। সে মুখ কুঁচকে শেহেতাজের দিকে ফিরতেই শেহেতাজ বোকা হেসে বলল,,
—’ওভাবে তাকাবেন না ম্যাডাম আমার কিডনিতে জ্বর আসে!

শেহতাজের ঠাট্টা শুনে মুন্নি একবার আড়চোখে তার র”ক্তা’ক্ত হাতের দিকে তাকাল। বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল তার, কিন্তু বাইরের কঠিন আবরণটা ভাঙল না। শেহতাজের বিড়বিড় করা আফসোসগুলো কানে গেলেও সে কোনো উত্তর না দিয়ে ধীর পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। শেহতাজও একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল।
সারাটা পথ নিস্তব্ধতা। শেহতাজ ড্রাইভ করছে ঠিকই, কিন্তু আড়চোখে সম্মুখের লুকিং গ্লাসে মুন্নির ভাবলেশহীন মুখটা দেখে চলছে বারংবার । মুন্নি জানালার বাইরে তাকিয়ে তার মনে তখন শেহতাজের সেই রুদ্রমূর্তি আর তার পরের অসংলগ্ন কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে।
গাড়িটা এসে থামল, খান মহল থেকে কিছুটা দূরত্বে। মুন্নি কিছুক্ষণ আগেই বলে রেখেছিল এইখানটায় থামানোর কথা তাই গন্তব্যে পৌঁছাতেই সে নিঃশব্দে নেমে পড়ল। একবার ফিরেও তাকাল না সে। শেহতাজ স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে খানিকটা হতাশ হয়ে নিজের মনেই গজগজ করে উঠল,,

—’বাপরে! মেয়ে তো নয় যেন বোম্বাই মরিচ। এত বড় বিপদ থেকে বাঁচালাম, একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত দিল না? কী অকৃতজ্ঞ রে বাবা!
শেহতাজ যখন গাড়ি স্টার্ট দিতে যাবে, ঠিক তখনই দেখল মুন্নি ফিরে আসছে তার জানালার কাছে। শেহতাজ হকচকিয়ে গেল। মনে মনে ভাবল,,
—’সর্বনাশ! অস্ফুট স্বরে বলা কথাগুলো আবার শুনে ফেলল নাকি? এবার নির্ঘাত ঝাড়ু পেটা করবে! হাঁতাম, শেহেতাজ টাটা বাই বাই!
মুন্নি জানালার কাছে এসে স্থির হয়ে দাঁড়াল। শেহতাজ থতমত খেয়ে বলল,,—’ক-কি হলো? কিছু ফেলে গিয়েছেন নাকি?
মুন্নি কিছুক্ষণ শেহতাজের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে হুট করেই নিচু স্বরে বলল, ,

—’ধন্যবাদ।
শেহতাজ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। সে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতেই মুন্নি আবার বলল,
—’আর, সিনেমার নায়িকাদের মতো ওড়নার আঁচল ছিঁড়ে হাতে বেঁধে দেওয়া ওটা শুধু সিনেমাতেই মানায়। বরং বাস্তবে ওতে ইনফ্রাকশন পরিমাণ বেড়ে যায়। আর তথাকথিত ওড়নার আচল ছিঁড়ে লাগিয়ে দিলেই যদি সেরে যেত তাহলে মানুষ কষ্ট করে অ্যান্টিসেপ্টিক ইউজ করত না। সে যাই হোক বাড়ি গিয়ে ফার্স্ট এইড করবেন দ্রুত।
কথাগুলো এক নাগাড়ে বলেই মুন্নি দ্রুত বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। শেহতাজ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। তার ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে চওড়া হাসি। নিজের ব্যান্ডেজহীন হাতটার দিকে তাকিয়ে সে হাসল সে, হুটহাট বলল,,
—’ওড়নার আঁচল না হোক, এই ইনডাইরেক্ট যত্নটুকুও কি কোনো ওষুধের চেয়ে কম?

নিস্তব্ধ নিশির মাঝে ভেসে আসা রজনীগন্ধার ঘ্রান বড্ড মোহনীয়। সেই সঙ্গে গোলাপের তোড়া‌গুলো বেশ সতেজ লাগছে নীলের হাতে। এক বদ অভ্যেস তৈরি হয়েছে তার;প্রতি রাতে তিহুর পছন্দের আইসক্রিম চকলেট আর গোলাপের তোড়া আনা। আজকেও গতানুগতিক অভ্যাসবশত সেই একই ভুলটা করে বসেছে সে।
যদিও আজ ফিরেছে বেশি রাত করে। ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে বারোটা বিদ্যমান। অগোছালো কক্ষে অগোছালো নীল। যে মানুষটা সারাক্ষণ পরিপাটি থাকতে পছন্দ করে এমনকি তিহুর বেশিরভাগ জিনিসগুলোও সেই গুছিয়ে রাখে সেই আজ বড্ড অগোছালো। ফাঁকা কক্ষে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসছে তার যেন। বিরক্তিতে কপাল দলা পাকানো।
হাতের মধ্যমা আর তর্জনী আঙুল দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে কপালে স্লাইড করতে করতে সে এক ঝলক মুঠোফোনটার দিকে তাকালো। পরক্ষণেই কিছু একটা কল লাগালো ‘আমার এলোকেশী’নামে সেভ করা নাম্বারটাতে। নিস্তব্ধ রজনী ঘুমন্ত চারিধার। হঠাৎই রিসিভ হলো কলটা।

“মিস্টার পলিটিশিয়ান?”——ভেসে আসা ঘুম জড়ানো মেয়েলী রিনরিনে প্রশ্নবোধক কন্ঠটায় হৃদয়ে অদ্ভুত উচাটন শুরু হলো নীলের। সম্বধনী কন্ঠে চিরপরিচিত ‌ভরাট স্বরে সে ডেকে বলল,,
—’নুর?
তিহু ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসলো বিছানায়।টেবিল ল্যাম্পের নিয়ন আলোয় বিশাল কক্ষটা মোহনীয় দেখাচ্ছে।তিহু সরু কন্ঠে বলল,,
—’হু?
—’ঘুমিয়ে ছিলে।
—’হু।
—’খেয়েছো রাতে?
—’হু।
—’ডিস্টার্ব করছি?
—’হু।
বারংবার হু’ বলতে বলতে না চাইতেও এবার হু’ বলে ফেলেছে তিহু। তৎক্ষণাৎ মাথা ঝাঁকিয়ে সে বলল,,

—’এই, না না।
তিহুর এমন কান্ডে মৃদু হাসলো নীল।
—’মিস করছেন? ম্যাডাম।
—’হুমমম….! তা একটু করছি।
—’একটু?
—’না অনেকটাই।
—’চলে আসবো?
—’উম…..!পারলে আসুন।
—’চ্যালেঞ্জ করছেন?
—’না তো।
নীল মুচকি হেসে বলল,,
—’আই মিস ইউ্য আ লট অর্কিড।
নীলের কন্ঠটায় যেন এক অজানা আকুলতা। তিহুর হৃদয়ে অজানা শিহরণ বয়ে গেল মুহূর্তেই আনমনে সে বলল,,,

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫০

—’আমি এমন কে মিস্টার?যার জন্য ‌আপনার এতটা অস্থিরতা?
নীল ভরাট কণ্ঠে বলল,,—’জানতে চাও,কে তুমি?
—’হুম!
নীল আনমনে মুচকি হাসলো। নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে হঠাৎ গেয়ে উঠলো,,
🎶 Aankhon Ki nami hai Tu…
Sab hai per Kami hai Tu….
Meri Zindagi hai Tu…..🎶

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫২