Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৩+৬৪

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৩+৬৪

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৩+৬৪
সাজিয়া জাহান সুবহা

প্রি-টেস্টের রুটিন পাবলিশড করা হয়েছে। আরম্ভ হবে সামনের সপ্তাহ হতে। মধ্যে গ্যাপ রয়েছে মাত্র তিন দিন। সায়েরী বেজায় চিন্তিত এবারে। গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানো ভাবটা এবার একদমই নেই। অত্যন্ত মনযোগী হয়েছে। কোনো তাল-বাহানা করে না। ফাঁকিবাজ ট্যাগ-টা সরেছে তার উপর হতে। সাফওয়ানের সব আদেশ সে পালন করে অক্ষরে অক্ষরে। এ নিয়ে সাফওয়ানের আশ্চর্যের শেষ নেই। যে মেয়েটার কানের কাছে সারাক্ষণ ‘পড়ো পড়ো’ বলে ঘ্যানঘ্যান না করা অবধি বইয়ের ধারে কাছেও নিয়ে যেতে পারতো না। সেই মেয়েটাকে এখন একবার বললেই হয়ে যায়। ধমক দেওয়ার কোন কারণ রাখে না। সাফওয়ান যেন খুশি হতে গিয়েও থমকায়। চিন্তিত ভঙ্গিতে সায়েরীর গালে, কপালে হাত ছুঁয়ে প্রশ্ন করে,

‘ এক বলাতেই মেনে নিল? তা-ও তুমি? ‘
‘ শরীর ঠিক আছে তো? ‘
এসব শুনে সায়েরী এমন এক দৃষ্টিতে তাকায় যে সাফওয়ান বিষম খেয়ে যায়। থতমত খেয়ে মাথা নেড়ে হন্তদন্ত গলায় শুধায়,
‘ আচ্ছা, আচ্ছা পড়ো। বলছি না কিছু। ‘
এটুকু বলে সে নজর ঘুরিয়ে নেয়। মেয়েটাকে তার হাড়েহাড়ে চেনা আছে। দেখা গেল সাফওয়ানের কথার রেশ টেনে মুহুর্তেই শান্ত, ভদ্র ফর্ম থেকে চঞ্চল রূপে ফিরে এসে, বই ঠেলে উঠে চলে যাবে। না বাবা। এটা হতে দেওয়া যাবে না। এই মনোভাব নিয়ে সাফওয়ান নিজের কৌতুহল টুকু দমিয়ে রাখে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আজও গ্রীণ ভ্যালি’র লিভিংরুম জুড়ে নিস্তব্ধতা। সায়েরীর গুণগুন কন্ঠের অভিযোগ শুনা যাচ্ছে না। সাফওয়ানের গম্ভীর কন্ঠের আদেশ নির্দেশ-ও কর্ণগোচর হচ্ছে না। শান্ত পরিবেশ। আইপ্যাডের স্ক্রিনে ভাসমান ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইংরেজি বর্ণমালা গুলো দেখতে দেখতে একটা সময় বিরক্তি ছেয়ে গেল সাফওয়ানের চোখে মুখে। ফাইনাল সেমিস্টারের সিলেবাস এখনো অনেকটাই বাকি। এদিকে হাতে আছে মাত্র কয়েকটা মাস। বিরক্ত হয়ে বৃদ্ধ আঙ্গুল এবং তর্জনী দ্বারা দুই চোখ কচলে নিল সে।

নিভিয়ে দিল জ্বলজ্বল করতে থাকা আইপ্যাডের স্ক্রিন। আজ কেমন যেন একঘেয়েমি লাগছে ভীষণ। কিছুতেই মন বসছে না। সবেতে বিরক্ত লাগছে। চেয়ারে দেহ এলিয়ে দিলো সে। বাঁ হাত দ্বারা ম্যাসাজ করলো ঘাড়। সেই অবস্থাতেই ফিরে তাকালো ডান দিকে। তার চেয়ে মাত্র একহাত দূরত্বে বসে রয়েছে সায়েরী। চেয়ারের উপর ভাঁজ করা তার দুই পা৷ বামহাতে ক্যালকুলেটর। ডানহাতে কলম। যা ঠেসে রয়েছে থুতনির সঙ্গে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রেখেছে। ফলস্বরূপ দৃশ্যমান হয়ে আছে বাম গালের আবসা-ঝাপসা গর্তটা। ছোট্ট কপালের চিকন ভ্রুঁ দ্বয়ের মাঝে লক্ষনীয় সুক্ষ্ম ভাঁজ ৷ যেন সে বেজায় চিন্তিত। পূর্ণ মনযোগ ক্যালকুলেটর এবং খাতার দিকে। সাফওয়ান স্থির চোখে তাকিয়ে রইল প্রায় মিনিট খানিক। আচমকা তার শয়তানি মস্তিষ্ক কিলবিল করে উঠলো। যেন তার কানের কাছে মীরজাফরি বুদ্ধি দিচ্ছে,
‘ এমন এক জ্যান্ত পুতুল থাকতে বোরিং লাগবে কেনো? এটাকে বাজিয়ে দে। এরপর দেখবি বিনোদন-ই বিনোদন।

সাফওয়ান মন দিয়ে শুনল সেই কু-বুদ্ধি। অতঃপর পুণরায় পরখ করলো সায়েরীকে। দেখল, এলোকেশী-র দীঘল এলোকেশ সব আটকে রয়েছে কালো পেন্সিলের বন্ধনে। পাঞ্চ ক্লিপ- টা আবার কোথায় হারিয়েছে কে জানে! সাফওয়ান ভাবলো না সেসব ব্যাপারে। নিজের শয়তানি মস্তিষ্কের ভাবনা টুকু বাস্তবায়ন করলো সে। হুট করে হাত বাড়িয়ে খুলে ফেললো চুলের খোঁপায় আটকে রাখা পেন্সিল-টা। মুহুর্তেই ঝপাৎ করে গুচ্ছ সহ এলোকেশ সব ঠাঁই জমাল সায়েরীর খাতার উপর। ঢেকে গেল মুখশ্রীর একপাশ। আকস্মিক এই কান্ডে সায়েরী হকচকিয়ে গেল৷ থেমে গেল বিড়বিড় করে নড়তে থাকা ঠোঁট। মস্তিষ্কের হিসেব-নিকেশ সব গন্ডগোল পাকিয়ে গেল। তার মেজাজ তুঙ্গে উঠল এমন হওয়ায়। ধরাম শব্দ তুলে সে ক্যালকুলেটর রাখল টেবিলে। বাম হাত তুলে কাঁধের ডান পাশ হতে চুলসব সরিয়ে বাম কাঁধে রাখল সে। ফিরে তাকালো সাফওয়ানের দিকে। চোখ পাকিয়ে, ক্ষুব্ধ গলায় চেঁচিয়ে উঠলো,

‘ এটা কি করলেন? দেখননি আমি ক্যালকুলেসন করছিলাম? ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্টে এমনিতেই আমার হাজার-টা সমস্যা। কত কষ্ট করে শেষ অবধি এসেছিলাম আর আপনি…আপনি সবটা ভেস্তে দিলেন! ‘
‘ অসহ্য! আবার আগে থেকে করতে হবে এখন..ধ্যাৎ! ‘
মুখ ফুলিয়ে একনাগাড়ে আরও অনেক অভিযোগ করে যাচ্ছে সায়েরী। নিস্তব্ধ লিভিং রুমে প্রতিধ্বনি হচ্ছে তার রিনরিনে কন্ঠস্বর। সাফওয়ান ঘাড় কাত করে তাকিয়ে রইলো। মনে হচ্ছে যেন রিমোট কন্ট্রোল বার্বিডলের সুইট অন করে দিয়েছে। বেজে চলেছে অবিরত। কিন্তু বন্ধ করবে কি করে! ভাবতে ভাবতে পা দিয়ে সায়েরীর চেয়ারের পায়ায় টান দিল সে। চোখের পলকে ঘুচে গেল দুজনের মধ্যকার একহাত সমান দুরত্ব। খোঁপা করার উদ্দেশ্যে দুইহাতে এলোকেশ সব মুঠ করে ধরেছিল সায়েরী। আচমকা টান পড়তেই দোলে উঠল সে। এক কথা থেকে স্থানান্তর হলো অন্য কথায়। অসন্তুষ্ট গলায় শুধালো,

‘ আশ্চর্য! আপনি এমন কেনো করছেন আজকে? কি হয়ে… ‘
কথাটুকু অসম্পূর্ণ থেকে গেল তার। থমকে গেল কন্ঠস্বর। সম্মুখে অবস্থিত লম্বাটে গড়নের মানবটার মাথা নুইয়ে এসেছে তার দিকে। মুখ ডুবিয়েছে তার গ্রীবাদেশে। বাম ঘাড়ের লাল,কালো তিলকে শীতল অধরের স্পর্শ পেয়ে সায়েরী পুরোপুরি চুপসে গেল। নেতিয়ে পড়লো পুরুষালী দেহ টার উপর৷ একনাগাড়ে বাজতে থাকা পুতুল-টার মেইন সুইচ যে বন্ধ হয়েছে। তা উপলব্ধি করতে পেরে সায়েরীর ঘাড়ে মুখ গুঁজে রাখা সাফওয়ান হেসে উঠলো শব্দ করে। দুইহাতে মেয়েলি সরু কোমর-টা জড়িয়ে কাছে টেনে নিল সে। তার শয়তানি মস্তিষ্ক তবে ঠিকই ধারণা করেছিল। তার কাছে এমন এক জ্যান্ত পুতুল থাকতে সে কখনো বোরিং ফিল করতেই পারে না। মন, মেজাজ চাঙ্গা করে দেওয়ার জন্য এই মেয়েটাই যথেষ্ট। মাথা তুললো সাফওয়ান। সায়েরী তখনই নিজ মাথা রাখল ইস্পাত কঠিন বুকটাতে। ডাগরডোগর আঁখিদুটি অবুঝ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সাফওয়ানের হাসি হাসি মুখখানার দিকে। যেন সাফওয়ান কে বুঝার চেষ্টায় বিভোর সে। কিন্তু তার ছোট্ট মস্তিষ্ক ধারণ করতে পারল না কিছু। অগত্যা ঠোঁট উল্টে শুধালো,

‘ এতো হাসছেন কেনো? ‘
অবুঝ কন্ঠ, ভোলা ভালা চেহারা এবং ঠোঁট উল্টানো দেখে সাফওয়ান ফের হাসলো ঠোঁটে ঠোঁট চেপে। সায়েরীর পিঠের নিচে হাত জড়িয়ে মাথা নামাল সে। তুলতুলে, ফুলোফুলো ডান গালে ঠোঁট ছোঁয়াল বেশ শক্ত ভাবে। পরপরই আবার নাকে নাক ঘষে হাস্যজ্বল কন্ঠে আওড়াল, ‘ হোয়াই সো কিউট? ‘
সায়েরী ভড়কে গেল এই কথায়, এমন অস্বাভাবিক আচরণে। হলো কি আজ এই ছেলের! এমন অস্বাভাবিক আচরণ করছে কেনো? সে পুণরায় কিছু বলতে নিবে, ঠিক তখনই কানে আসলো অন্য এক মেয়েলি কন্ঠের আর্তনাদ,

‘ আল্লাহ্‌ গো!!! লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা। আমি কিচ্ছু দেখি নাই ভাইজান। ‘
আকস্মিক শিউলির কন্ঠ শুনে সাফওয়ান চট করে ছেড়ে দিল সায়েরীকে। বেচারি টাল সামলাতে না পেরে চেয়ার উল্টে পরেই যাচ্ছিল। এমন মুহুর্তে সাফওয়ান অপ্রস্তুত হয়ে ফের আগলে নিল তাকে৷ সায়েরী ছিটকে সরে গেল। তীব্র অসন্তুষ্ট, অপ্রস্তুত নজরে তাকাল সাফওয়ানের দিকে৷ শিউলি উল্টো পায়ে ছুটে বেরিয়ে গিয়েছে পুণরায়। সাফওয়ানের হাবভাব দেখে সায়েরী বিড়বিড় করে বকলো,
‘ ধান্দাবাজ! ভাব দেখো, যেন ভাজা ইলিশ উল্টে খেতে পারে না। ‘

নিজ বেডরুমের ডিভানে দুই পা ভাঁজ করে বসে রয়েছে ইরা। গায়ে সুতি কাপড়ের ঢিলেঢালা, আরামদায়ক গোল জামা। খোলা চুল ছড়িয়ে আছে পিঠ জুড়ে। মাঝে সিঁথি। এবং তাতে তেল মালিশ করছেন মরিয়ম বেগম। মিহাদের মা। ঘন্টা খানিক পূর্বে এসেছেন তিনি। আজ সহ তৃতীয় বারের মতো এসেছেন। প্রথমে ভীষণ দ্বিধা দ্বন্দে ভুগেছেন৷ কেবল মোবাইলে যোগাযোগ করেই খোঁজখবর নিতেন ইরা’র। কিন্তু তাতে স্বস্তি পেতেন না মাতৃ হৃদয়। ইরা হয়তো বুঝতে পেরেছিল সেটা। তাই তো জোর গলায় আবদার জানালো যেন এসে দেখা দিয়ে যায়। মরিয়ম বেগম এসেছিলেন সংকোচ নিয়ে। ইরা’র সঙ্গে তার সম্পর্ক যেমনই হোক, এখন সে অন্য কারো স্ত্রী। চাইলেই তো আর অধিকার খাটানো যাবে না। পাছে যদি তার স্বামী খারাপ ভাবে! স্ত্রীর প্রাক্তনের পরিবার কে কে-ই বা সহজভাবে মেনে নিতে চাইবে? বাচ্চা টাকে যে মেনে নিয়েছে এটাই অনেক।

কিন্তু উনার দ্বিধা দ্বন্দ নিমেষেই মিলিয়ে গেল জাদিদ নামক শান্ত,ভদ্র পুরুষ টার অমায়িক ব্যবহার দেখে। কতটা অবলীলায় সে স্বাগতম করেছিল মিহাদের পরিবারকে! তার ব্যবহার দেখে কেউ-ই বলতে পারবে না যে সে তার প্রিয়তম স্ত্রীর প্রাক্তনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলছে। তার আচরণে বাকিরা স্বস্তি পেয়েছিল সেদিন। ইরা যে এমন এক সুপুরুষ-কে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছে তা দেখেই বক্ষ শীতল হলো সকলের। অন্তত মেয়েটা সুখে থাকুক, বাচ্চাটা একটা সুন্দর পরিচয় পাক৷ এর চেয়ে বড় কোনো চাওয়া নেই তাদের৷ বড়সড় সুন্দর আপার্টমেন্ট টা দেখে, ইরার চোখে মুখের জ্যোতি দেখে চোখ জুড়িয়ে গিয়েছিল সকলের।

‘ আহ..হা আম্মা! থামো প্লিজ। কপাল গড়িয়ে পড়ছে তেল। গা ঘিনঘিন করছে আমার। আর কতো…. ‘
‘ চুপ কর। কতটুকু দিয়েছি সেটা দেখতে পারছি আমি। এমন শুকনো, কাকের বাসা বাধিয়ে রেখেছিস কেনো? কি অবস্থা করেছে! তোর মাথা ব্যথা করবে না তো কি আমার করবে? ‘
ইরা চুপসে গেল। গা গুলাচ্ছে ছুপছুপ তেল কান বেয়ে পড়ছে তা অনুভব করে। মরিয়ম বেগম উচ্চ কন্ঠে ডাকলেন মিতু কে। ভেজা হাতে ছুটে আসলো মিতু। মরিয়ম বেগম তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
‘ এই মেয়ে? শুধু বাড়ির কাজ করলে হবে? কেনো রাখা হয়েছে তোমাকে হ্যাঁ? দেখো না মেয়েটা মাথা ব্যথায় কেমন হয়ে ছিল? ওকে প্রতিদিন চুলে তেল মালিশ করে দিবে। পা ফুলবে হয়তো কিছুদিন পর থেকে। গরম তেল নিয়ে পা-ও মালিশ করে দিবে৷ খেয়াল রাখবে ভালো করে। বুঝেছ? ‘

‘ জ..জ্বি। জ্বি খালাম্মা, বুঝছি। ‘ দ্রুত গলায় প্রতিউত্তর করলো মিতু।
মরিয়ম বেগম আর-ও অনেক কিছুই শিখিয়ে পড়িয়ে দিলেন মিতুকে। কথা শেষ হওয়া মাত্র মিতু জান নিয়ে ছুটে পালালো। বাপরে বাপ! এত এত কথা! মরিয়ম বেগমের কথা শেষ হয়নি তখনো। চিন্তিত ভঙ্গিতে তিনি আবারও বলে উঠলেন,
‘ এই যা…তাবিজের কথাটা তো ভুলেই গেলাম। ‘
বলতে বলতে তিনি নিজের পার্স হাতড়ে দুটো তাবিজ বের করলেন। ইরা আৎকে উঠলো সেসব দেখে। মরিয়ম বেগম সেদিকে খেয়াল না করে বলতেই থাকলেন..

‘ এগুলো রাখ। খারাপ নজর থেকে দূরে থাকার জন্য খাঁজ করে আনিয়েছি। এসব খুলবি না শরীর থেকে। রাত-বিরেতে বারান্দায়, ছাদে যাবি না ভুলেও। আর… ‘
‘ আম্মা! মা.. থামো। এসব লাগবে না। আমি সব মেনে চলছি। এসবের প্রয়োজন নেই। আর জাদিদও পছন্দ না। সে সব কিছু মেইনটেইন করিয়ে চলাচ্ছে আমাকে। দোয়া দরূদ আর আল্লাহর রহমত-ই সব। এসব লাগবে না। ‘
জাদিদের কথা শুনে মরিয়ম বেগম কথা বাড়ালেন না। গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷ বিষন্ন গলায় বললেন,
‘ জাদিদ! ও তোকে খুব যত্নে রেখেছে তাইনা? ‘
ইরা চোখ তুলে তাকাল। স্পষ্ট টের পেলো মরিয়ম বেগমের কন্ঠের বিষাদ-টুকু। জোরপূর্বক হাসলো সে। উত্তর দিল ক্ষীণ স্বরে,

‘ হ্যাঁ। খুব যত্নে রেখেছে। ‘
মরিয়ম বেগমের চোখের কোণে অশ্রু বিড় জমাল। মনে পড়ে গেল মিহাদের মুখশ্রী। ইরা নামক রমনীতে যার প্রাণ জুড়ে ছিল। চার বছর পূর্বে যেদিন সে উপলব্ধি করতে পেরেছিল ইরা’কে ভালবাসে সেদিন সে এসে মরিয়ম বেগম কে সোজাসাপ্টা বলেছিল,
‘ তোমার বড় ছেলের বউয়ের খোঁজ পেয়ে গিয়েছি মা। এবার ঝটপট দোয়া করে দাও, যেন শীঘ্রই তোমাকে শাশুড়ী বানিয়ে দিতে পারি। ‘

ছেলের লাগামহীন কথায় সেদিন হতভম্ব হয়েছিলেন মরিয়ম বেগম। মেয়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে মিহাদ জবাব দিয়েছিল, যেদিন মেয়েটা তার প্রস্তাবে সায় জানাবে। সেদিন সোজা নিয়ে এসে দুজনের সাক্ষাৎ করিয়ে রাখবে৷ হয়েছিলও সেটা। প্রেমের প্রস্তাবে রাজি হওয়া নব প্রেমিকা ইরাকে সে ডেটে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে তুলে এনেছিল নিজ বাড়ি। মিষ্টি আদলের, নম্র মেয়েটাকে প্রথম দর্শনেই পছন্দ করে ফেলেছিলেন মরিয়ম বেগম। সেদিন থেকেই মনে মনে আশা পুষেছেন এই মিষ্টি মেয়েটাকে টুকটুকে লাল বউ সাজিয়ে নিজ ঘরের লক্ষী করবেন বলে৷ চার বছরে সহস্রবার সাক্ষাৎ হয়েছে দুজনের। আন্টি থেকে সরাসরি আম্মা সম্বোধনে নেমেছিল ইরা৷ মিহাদকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাত দুই মা-মেয়ে মিলে। কতটা সুখকর ছিল দিনগুলো। কানায় কানায় পরিপূর্ণ ছিল সুখ। কিন্তু আজ! ভাগ্যের লীলাখেলায় জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছে এক পলকে৷ সেসব ভাবতে নিলেই আপনা আপনি ভিজে আসে চক্ষুদ্বয়। ভারী হয় হৃদয়। গলায় দলা পাকানো কান্নাটুকু গিলে ফেললেন মরিয়ম বেগম। ইরার গাল ছুঁয়ে ধরা গলায় আওড়ালেন,

‘ অনেক সুখে থাক, মা। আমার ছেলের প্রাণ জুড়ে ছিল তোর মধ্যে। তুই ভালো থাকলেই ওর আত্মা তৃপ্তি পাবে। ‘
ইরা’র চোখেও জল জমল। সে দুইহাতে জড়িয়ে ধরলো মরিয়ম বেগমের কোমর। বুকে মাথা রাখল। ধরা গলায় আওড়াল,
‘ আমাকে তো ভালো থাকতেই হবে, আম্মা। নাহলে তোমার ছেলের শেষ স্মৃতি-টুকু আগলে রাখব কি করে? আমি ভালো থাকবো। ভীষণ ভালো থাকবো৷ আমার মিহাদের অসম্পূর্ণ স্বপ্ন সব পূরণ করার জন্য হলেও ভালো থাকবো। ‘
ইরা’র মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন মরিয়ম বেগম। চুলের ভাঁজে চুমু খেয়ে বললেন,
‘ ইন-শা-আল্লাহ্‌! ‘
‘ হয়েছে। কাঁদে না। এই অবস্থায় একদম মন খারাপ করে থাকবি না। খেয়াল রাখবি নিজের৷ অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমাকে যেতে হবে। ‘

‘ যেতে হবে মানে? এক ঘন্টা-ও হলো না বোধহয়। কিছু খাওনি এখনো। এত তাড়াতাড়ি.. ‘
‘ না না। অন্য একদিন আসব। মাহাদীর ফিরার সময় হয়ে গেছে। তোর শরীর খারাপ শুনে দেখতে এসেছিলাম শুধু। দেরি করা যাবে না মা। আবার আসবো। মন খারাপ করিস না। ‘
ইরা প্রতিউত্তর করার ভাষা পেল না। কেমন সব অগোছালো সম্পর্ক তার জীবনে। না কাছে আছে নিজের মা, না শাশুড়ী। যিনি যত্ন করে প্রতি মুহুর্তে খোঁজ নেন, মায়ের মতো আগলে রাখেন। তাকে কাছে রাখার সাধ্য নেই। মন খারাপ হয়ে গেল ইরা’র। অথচ সে নিরূপায়। চেয়েও এই মানুষ টাকে কাছে রাখতে পারবে না সে।
জাদিদ বসে ছিল লিভিং রুমে। মরিয়ম বেগমকে দেখে উঠে আসলো সে। আশ্চর্য কন্ঠে শুধালো,

‘ সে কি আন্টি! এত তাড়াতাড়ি ফিরে যাচ্ছেন কেনো? মাত্রই তো আসলেন.. ‘
বিব্রত কন্ঠে মরিয়ম বেগম প্রতিউত্তর করলেন,
‘ না বাবা বসবো না আর। আসলে ইরা’র খারাপ লাগছে শুনে নিজেকে আটকাতে পারিনি তাই… ‘
‘ ছি! ছি! আন্টি, এভাবে বলে আমাকে লজ্জা দিবেন না প্লিজ। আপনার যখন খুশি আসতে পারেন। আমার কোনো আপত্তি নেই। এই অবস্থায় গুরুজনের প্রয়োজন তো থাকেই। আমার কিংবা ইরা’র মা তো থেকেও নেই। আপনি ইরা’কে সব কিছু শিখিয়ে পড়িয়ে দিলে আমারই স্বস্তি। তাছাড়া.. ওদের ওপর তো আপনারও অধিকার আছে কোথাও না কোথাও। ‘
মরিয়ম বেগম মুগ্ধ হলেন। হাত বাড়িয়ে জাদিদের বাহুতে হাত বুলিয়ে শুধালেন,

‘ অনেক সুখী হও বাবা। তোমার এই অবদান আমি আজীবন মনে রাখব। ‘
জাদিদ বিব্রত হলো। জোরপূর্বক হাসল। মরিয়ম বেগম বেরিয়ে গেলেন ব্যস্ত পায়ে। জাদিদ ভদ্রতার পরিচয়ে উনাকে এগিয়ে দিল গেইট অবধি। ফিরে আসতে আসতে মনের ভিতরটা ভোঁতা অনুভূতি তে ছেয়ে গেল তার। লিভিংরুমের সোফায় মাথা এলিয়ে, চোখ বুজে বসে রইল অনেক্ষণ। হঠাৎ অনুভব করলো অন্য কারো উপস্থিতি। চোখ মেলে তাকালো সে। ইরা বসে রয়েছে পাশে। জাদিদের দিকে তাকিয়ে আছে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই সে কোমল কন্ঠে শুধালো,

‘ আপনার মন খারাপ? এমন হয়ে আছেন কেনো? ‘
সামান্য প্রশ্নটাতে কি যেন ছিল। জাদিদের শক্তপোক্ত খোলস কোমল হয়ে এলো। এতগুলো মাসে যা কখনো ইরা দেখেনি, সেই ভঙ্গুর হৃদয়ের পুরুষটাকে আজ দেখল সে৷ শুনতে পেল জাদিদের বিষন্ন স্বর,
‘ আমি এটুকু বয়সে অনেক এচিভমেন্ট কুড়িয়েছি, ইরা। আমার হাসপাতালের ইন্টার্ন-দের আইডল হিসেবে আমার নামও রয়েছে। অনেকেই বলে, আমার লাইফটা ভীষণ পারফেক্ট। কিছুর কমতি নেই। দাদার হাসপাতাল। বলতে গেলে সেটা এখন আমাদেরই। বাবা,ভাই, ভাবী সবাই এম বি বি এস। মা প্রফেসর ছিলেন। এর চেয়ে ওয়েল স্টবলিশড ফ্যামিলি না-কি হতেই পারে না। তাদের ভাষ্যমতে আমার জীবনে কোনো অপূর্ণতা নেই। কিন্তু..কিন্তু এটা সত্যি নয়। বুঝ হওয়ার পর থেকে মা-কে আমি কাছে পাইনি। শৈশবে তার ভালোবাসার, যত্নের অপূর্ণতা ছিল। বাবার টা তো ছিলই। কিন্তু আশা করতাম মা-কে।

অথচ, নিজেদের ব্যস্ততার ফাঁকে কখনো আমার জন্য তাদের সময় হয়নি। শুনেছিলাম ফার্স্ট প্রেগ্ন্যাসিতে মা, বাবা ভীষণ হ্যাপি ছিলেন। মা জব ছেড়ে দিয়েছিলেন। ভাইয়ের বয়স যখন আড়াই বছর। তখন থেকে পুণরায় জবে ঢুকেছেন মা। কিন্তু আমার বেলায় তেমন কিছুই হলো না। সম্পূর্ণ ন্যানির দ্বায়িত্বে ছিলাম। তিনিও আমাকে ভীষণ আদর করতেন। কিন্তু মা তো মা-ই হয়। মায়ের মতো করে কাউকে আপন করা যায়না। আমিও পারিনি তাকে মায়ের জায়গা দিতে। মনে মনে শুধু মায়ের এটেনশন খুঁজে গিয়েছিলাম। উনার অপিনিয়ন ছিল ইংলিশ মিডিয়াম। আমিও মেনে নিয়েছি। ভেবেছিলাম মা খুশি হবে। আমাকে কাছে টানবে। কিন্তু এমন কিছু হলো না। এইট’থ ক্লাসের পর বাবা বলেছিলেন আমাকেও ডক্টর হতে হবে।

সায়েন্স ছিল আমার কাছে একটামাত্র অপশন। মেনে নিয়েছিলাম। ইচ্ছে ছিল পাইলট হবো। ভেবেছিলাম মা-কে জানাব এই ব্যপারে। কিন্তু তিনিও সায় দিয়েছেন বাবার কথায়। একটামাত্র লক্ষ্য ছুড়ে ফেললেন আমার দিকে। ডক্টর। মনের বিরুদ্ধে নিজের ধ্যান জ্ঞান পড়াশোনায় ডোবালাম। এইস এস সি তে গোল্টেন পেয়েছিলাম। টপ করেছিলাম জেলায়। কিন্তু আমার এচিভমেন্ট ফিকে পড়ে গিয়েছিল ভাইয়ার এম বি বি এস রেজাল্টের চিন্তায় চিন্তায়। উনারা বলেছিলেন, ‘তোমার এই রেজাল্ট আর এমন কি? এম বি বি এস এর রেজাল্ট আসুক তোমার ভাইয়ের। তারপর দেখো রিয়েল এচিভমেন্ট কেমন হয়। ‘

মন ভেঙ্গেছিল সেদিন। অন্তত মাথায় মায়ের হাতের ছোঁয়া আশা করেছিলাম। পাইনি। আবারও মনে আশা পুষেছিলাম এম বি বি এস নিয়ে। ভাইয়ের মতো ডিগ্রি পেলে মা হয়তো এমন করেই জড়িয়ে ধরবে। কপালে চুমু দিয়ে দোয়া পড়ে ফুঁ দিবে। কিন্তু হলো না সেটা। এক ছেলের টা পেয়ে তারা এক্সপেরিয়েন্সড তখন। নতুন কোনো আমেজ ছিল না। কোনো উৎসাহ ছিলনা। তবুও আমার আশা শেষ হয়নি। বাবার সাথে তো কখনোই ভালো সম্পর্ক ছিল না আমার। চোখের দেখা ও পেতাম না তাকে। কিন্তু মা’কে নিয়ে অনেক শখ ছিল। অনেক। একমাত্র তার ভালোবাসার পাওয়ার লোভে আমি গুড বয় হয়ে ছিলাম সেই ছোট বেলা থেকে। কখনো কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করিনি। খারাপ সঙ্গ কুড়ায়নি। মারপিট করিনি। সিগারেট ছুঁয়ে দেখিনি। ছেলে হওয়া স্বত্বেও এসব আমাকে আকর্ষণ করতে ব্যর্থ ছিল। সেই বাচ্চা বয়স হতে মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার কাছে নিজের চাওয়া পাওয়া সব ফিকে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু এতগুলো বছরেও আমি সেই ভালোবাসা টুকু পেলাম না ইরা।

জীবনে প্রথম বার সাহস করে মায়ের দেওয়া অপশনের বিপরীতে আমি আমার পছন্দ তুলে ধরেছিলাম। সেই পছন্দ ছিলে তুমি। মা সেদিন অবাক হয়েছিল। হয়তো ভেবেছিলেন আমার পক্ষে কাউকে পছন্দ করা সম্ভব না। উনাদের পছন্দ মেনে নিব সবসময়ের মতো। কিন্তু সেটা পারিনি তখন। আমার জীবনের প্রথম এবং অন্যতম জেদ ছিলে তুমি। যা আমি হাসিল করতে পেরেছি। কিন্তু পরিবর্তে যে মা-কে হারাতে হবে তা আমি ভাবিনি কখনো। বুঝ হওয়ার পর এই প্রথম একটামাত্র আবদার করেছিলাম মায়ের কাছে। যেন তোমাকে, বেবিকে মেনে নেয়। কিন্তু আমার এই আবদার টা মেনে নিল না মা। আমার ঘর ছাড়া নিয়েও বিশেষ প্রভাব পড়লো না উনার উপর। এতগুলো মাসে কখনো ইচ্ছে করলো না ফোন করে খোঁজ নিতে, দেখতে চাইতে। আমি কল করলেও তুলে না। চার বার গেলাম বাড়িতে। তোমার নামে হাজারটা কথা শোনাল। বাধ্য করল ফিরে আসতে। ‘

‘ এসব তো আমি কখনোই আশা করিনি, ইরা। সামান্য মনযোগ, যত্ন, ভালোবাসা চেয়েছিলাম শুধু। যদি প্রথম সন্তান নিয়েই সব শখ আহ্লাদ পুরণ করার ইচ্ছে ছিল তাদের। তাহলে আমাকে জন্ম দিল-ই বা কেনো? এই এক জীবনে আমি কারোরই ভালোবাসা পেলাম না। না বাবা-মায়ের, ভাইকে আমার বিশেষ পছন্দ ছিল না বলে আমি নিজেই দূরে ছিলাম। আর তুমি.. তোমাকে ঘিরে আমার অনুভূতি সব অতুলনীয়, ইরা। কিন্তু দেখো, তোমার ভালোবাসা পাওয়ার ভাগ্য-ও হলো না আমার। হবে কি-না তাও জানি না। তোমাকে পেয়েও যেন পাইনি আমি। এখনো অতৃপ্ত আমার হৃদয়। জানি এই মুহুর্তে এসব বলে তোমাকে গিল্ট দিচ্ছি। কিন্তু..আজ থামতেও ইচ্ছে করছে না। তোমার জীবনটাও অপ্রাপ্তি তে ঘিরে আছে তা আমি জানি। একটা ভুলের কারণে বাবা মায়ের সঙ্গ তুমিও হারিয়েছ। নিজেকেও হারিয়েছ। এসব চাইলে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব না। তবে অন্যভাবে হলেও নিজেদের জন্য সুখ কুড়াতে তো পারবো। ‘

‘ একটা হ্যাপি, সিম্পল ফ্যামিলির ভীষণ শখ আমার। যেখানে আমার মতো করে কখনো আমার বাচ্চা অবহেলিত হবে না। তোমার – আমার মতো বাবা মায়ের ভালোবাসার জন্য কাতর হবে না আমাদের বাচ্চারা। এটা আমার শেষ ইচ্ছা বলতে পারো। এর চেয়ে বড় স্বপ্ন আর নেই জীবনে। যেটা ছিল, সেটা মা’কে ছেড়ে আসার সময়-ই কবর দিয়ে ফেলেছি। এখন একমাত্র তোমাকে ঘিরেই আমার সব ইচ্ছে, স্বপ্ন জুড়ে রয়েছে। তুমি পাশে থাকলে সব পূরণ হবে। নয়তো…নয়তো এভাবেই, অপূর্ণতায় কেটে যাবে আমার বাকিটা জীবন। ‘

মনের সব গোপন কথা বলে থামলো জাদিদ৷ শ্বাস ফেলল বড় করে। তার চোখদুটো রক্ত বর্ণের মতো রক্তিম হয়ে আছে। টলমল করছে। কেবল গাল গড়িয়ে পড়া বাকি। গড়াতে চাওয়া অশ্রুটুকু বৃদ্ধ আঙ্গুল দ্বারা মুছে ফেললো সে। এতক্ষণে তাকাল পাশ ফিরে। এবং চমকে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে। তার কথাগুলো-ই প্রভাবিত হয়ে কেঁদেকেটে গাল ভাসিয়ে ফেলেছে ইরা। জাদিদ আশ্চর্য হলো। ইরা’র গালে হাত রেখে হন্তদন্ত গলায় বলে উঠলো,
‘ আরে..কি হয়েছে কি? আপনি এমন কাঁদছেন কেনো, ইরা? আশ্চর্য! এখানে এমন কাঁদার কি আছে? ‘

জবাব দিতে পারলো না ইরা। ফুঁপিয়ে উঠে আচমকা জড়িয়ে ধরলো জাদিদ -কে। কেঁদেকেটে বুক ভাসালো। জাদিদ হতভম্ব হয়ে গেল এমন প্রতিক্রিয়ায়। বার কয়েক স্বান্তনা দিয়ে-ও ইরা’কে সরাতে ব্যর্থ হলো সে। ইরা কেন কাঁদছে তা সে নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না। শুধু জানে তার খারাপ লাগছে জাদিদের কথাগুলো শুনে। ভীষণ ভাবে পুড়ছে মন। সে নিজেও বাকিদের মতো ভেবেছিল জাদিদের জীবন-টা পূর্ণতায় ঘেরা। সব দিকে দিয়ে পারফেক্ট। কোনো অপূর্ণতা, দুঃখ নেই তার। কিন্তু পেছনে যে এমন এক গল্প লুকিয়ে ছিল সেটা সে বুঝতেই পারেনি কখনো।

কিংবা বলা যায়, বুঝতে চাই-ও নি। নিঃসঙ্গ, ভালোবাসা বিহীন বেড়ে উঠেছে বলেই হয়তো জাদিদ অবলীলায় আগলে নিয়েছে ইরাকে। কারণ সে বুঝে একাকিত্ব ঠিক কতটা কষ্টের। ভালোবাসা বিহীন বাঁচা কতটা দুঃখের। নিজে বাবা মায়ের আদর পাইনি বলেই হয়তো সে মিহাদ-ইরার বাচ্চাটাকে আপন করেছে। অবহেলায় বেড়ে উঠার যন্ত্রণা সম্পর্কে সে অবগত বলেই হয়তো এই বাচ্চাটাকে আগলে রাখতে চাইছে।
‘ ইরা! প্লিজ, শান্ত হোন। কতবার বলেছি এই কন্ডিশনে কান্নাকাটি ভালো নয়। ‘
ইরা মাথা তুললো। কান্না থেমেছে তার। জাদিদের দিকে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকাল সে। দুই হাত ধরে স্বগোতক্তি করলো,

‘ আ’ম স্যরি, জাদিদ। আমি কখনো বুঝতে চাইনি আপনার অনুভুতি। জানতে চাইনি আপনার চাওয়া পাওয়ার ব্যাপারে। আমি জানিনা আদৌও আমি আপনাকে কখনো ভালোবাসতে পারবো কি-না। কিন্তু.. কিন্তু আমি আপনাকে মেনে নিতে চাই। আপনার মতো হাসবেন্ড পাওয়া সব মেয়ের স্বপ্ন। আমি পেয়েও সেটা হারাতে চাইনা। শুধু একটু সময় লাগবে সব কিছু স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে। আই প্রমিস, আমি আপনার সব কষ্ট গুছিয়ে দেবো। আপনার মায়ের কাছ থেকে আশা করে নিরাশ হয়েছিলেন আপনি। কিন্তু আমি আপনাকে নিরাশ করবো না কখনো। আমার অতীতকে কখনো আমাদের ভবিষ্যতের উপর ভারী হতে দিব না। আপনার স্বপ্নের মতোই ভবিষ্যৎ গড়বো। শুধু একটু সময় দিন। আমাকে একটু সামলে উঠতে দিন। ‘

প্রতিশ্রুতি! সম্পর্কে বিশ্বাসের পর প্রতিশ্রুতি-ই প্রভাব বিস্তার করে সব চেয়ে বেশি। জাদিদ – ইরা’র সম্পর্কটা কেবল সুন্দর একটি বন্ধুত্ব বয় আর কিছু না। দুজনের প্রতি দুজনের বিশ্বাসের মাত্রা অনেক। কেবল ইরার দিক থেকে কমতি ছিল এমনই এক প্রতিশ্রুতি-র। আজ তা পেয়ে গেল জাদিদ। মরুভূমির ন্যায় শুকনো হৃদয় একপশলা বৃষ্টি রূপে এসে সিক্ত করে তুললো হৃদয়। জাদিদ আবেগে আপ্লূত হয়ে বুকে টেনে নিল ইরা’কে। আবেগ মাখা গলায় বলে উঠলো,
‘ আপনার যত ইচ্ছে সময় নিন,ইরা। তবে দিনশেষে আমাকে মেনে নিবেন, প্লিজ! মিহাদের জায়গা আমি ছিনিয়ে নিতে চাইনা। নিজের জন্য আরেকটা জায়গা গড়ে তুলতে চাই শুধু। এই সুযোগটা ছিনিয়ে নিবেন না দয়া করে। আপনার সঙ্গ হারালে এবার আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো। পুরোপুরি নিঃস্ব। ‘

ইরা মনস্থির করলো। জীবনের মোড় ঘুরেছে তার। সেই কবে সঙ্গ হারিয়েছে মিহাদের। যার স্মৃতি ভুলানো বোধহয় এই জীবনে অসম্ভব। কিন্তু তাই বলে কি ইরা’র জীবন থমকে যাবে? মিহাদ যে চাইনি থমকে থাকুক তার ইরাবতী। তাই তো এমন এক সুপুরুষ রেখে গেল ইরা’র জন্য। যাকে মূল্যায়ন করাটা ইরা’র কর্তব্য। এবং সে করবে মূল্যায়ন। এক না এক সময় ঠিকই সবটুকু অধিকার দিয়ে গ্রহণ করবে ইরাকে। হয়তো সেই সময়টার জন্য আরও অনেকগুলো মাস প্রয়োজন। বিশেষত, নিজের ভঙ্গুর মনকে সামলে নেওয়ার জন্য অন্তত আরও কয়েকটা মাস দরকার তার। সবটা যে সময়ের উপর।

পরীক্ষার সময়টা কেটেছে অত্যাধিক ব্যস্ততায়। কিন্তু ছুটি মিলল না বিশেষ। ফের নতুন উদ্যমে শুরু হলো ক্লাসের ব্যস্ততা। অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেও কিছু করার নেই। মেনে নিতে হচ্ছে এই অত্যাচার। খুব সম্ভবত আগামীকাল রেজাল্ট পাবলিসড করা হবে। এই নিয়ে ভীষণ উদগ্রীব সকলে। বিশেষ করে সায়েরী এবার অত্যন্ত চিন্তিত৷ রেজাল্ট যদি সাফওয়ান ভাইয়ের আশানুরূপ না হয়। তবে! তবে নিশ্চয়ই মাথায় তুলে আছাড় মারবে তাকে। তাছাড়া সায়েরী নিজেও মন কে বুঝ দিতে পারবে না। সাফওয়ান ভাই তো কম কসরত করেনি তার পেছনে৷ এসবের মূল্য আদৌ দিতে পারবে তো সে? ফাইনালের জন্য এখনো প্রায় অনেক মাস বাকি। কিন্তু প্রি-টেস্টে খারাপ করলে তার উপর ভীষণ বাজে ইম্প্রেশন পরবে সাফওয়ান ভাইয়ের। সেই সাথে ভীষণ হতাশ ও হবে। যা সায়েরী চায়না। একেবারে চায়না।

সময় এখন সকাল সাতটা। অন্যদিন নামাজ আদায় করে লম্বা ঘুম দিলেও আজ সায়েরীর চোখের পাতায় ঘুম নামেনি। কেবল শুয়ে আছে চোখ বুজে। এমন সময় ফোন বেজে উঠলো তার। সে জানে এটা সাফওয়ানের কল। এই কল-কে এলার্ম কল বলে নামকরণ করেছে সে। কারণ এই সময় সাফওয়ানের কল আসে সায়েরীর ঘুম ভাঙানোর উদ্দেশ্যে। অন্যদিন রিং বাজতে বাজতে কেটে গিয়ে দ্বিতীয় বারে গিয়ে কল রিসিভ করে সায়েরী। কিন্তু আজ প্রথম বারে, প্রথম রিং হওয়ার সঙ্গেই কল ধরলো সে। সাফওয়ান আশ্চর্য হলো৷ তবে মনে মনে ধারণা করলো সায়েরীর জেগে থাকার কারণ।

গ্রীণ ভ্যালি তে যাওয়ার সময়সীমা সকাল ৮টা হলেও আজ সাফওয়ানের নির্দেশ অনুসারে সায়েরী বের হলো সাড়ে সাতটার মধ্যেই। পরণে তার হোয়াইট জিন্স,ফ্লোরাল লং লেডিস টি-শার্ট এবং গলায় পেছানো স্কার্ফ। পায়ে পিঙ্ক স্ন্যাকার্স। পোনিটেল করা চুলগুলো কাঁধের ডানপাশে এনে রেখেছে। তার চুলগুলো স্ট্রেইট নয়। নিচের দিক হালকা ঢেউ খেলানো। তবে বেশ কুচকুচে কালো। লম্বায় নিতম্ব ছড়িয়ে প্রায় দুই ইঞ্চি নিচে নেমেছে৷ এবং এই চুলগুলোতেই লুকিয়ে আছে সাফওয়ানের এক বিশেষ দুর্বলতা। মেয়েটাকে খোলা চুলে দেখলে সে কেমন যেন এলোমেলো হয়ে পড়ে।

রাস্তার ধারে অপেক্ষারত সাফওয়ান দূর হতে সায়েরীকে দেখছিল। কিন্তু সায়েরীর নজর সাফওয়ানের উপর পড়তেই তার কপালে ভাঁজ পড়ল। দেখল, কালো টি-শার্ট, জিন্স পরনে বাইকের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছে সাফওয়ান। টি-শার্টের উপর জড়িয়েছে একটি কালো লেদার জ্যাকেট। হাতে সেই অ্যাপল ওয়াচ-টি৷ কালো মাস্কের আড়ালে ঢেকে আছে মুখশ্রী। কপালে ছড়িয়ে পড়া চুলগুলোর আড়ালে কেবল বাদামি চোখজোড়া দেখা যাচ্ছে তার। অন্য কেউ হলে চিনতে অসুবিধা হতো৷ কিন্তু সায়েরী চিনে ফেলল একনজর দেখে। কাছাকাছি এসে দাঁড়াল সে। বাইকের দিকে নজর গেঁথে খানিকটা দুষ্টুমির ছলে বলে উঠলো,

‘ বাইক নিয়ে এসেছেন, আমাকে ইউনিফর্ম পরতে নিষেধ করেছেন। কারণ কি? সাত সকালে মনে রঙ লেগেছে বুজি আপনার? ‘
মাস্কের আড়ালে সাফওয়ানের চোখদুটোতে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠলো বোধহয়। এমনই এক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিল সে মাস কয়েক পূর্বে। কিন্তু আজ জবাব দিল ভিন্ন রূপে৷ বাইকের উপর রাখা কালো হেলমেট টা সায়েরীকে পরিয়ে দিতে দিতে সে ক্ষীণ স্বরে প্রতিউত্তর করলো,
‘ আপনি সাথে থাকলে আমার মনে প্রতিদিনই রঙ লাগে, ম্যাডাম। ‘
সায়েরীর ওষ্ঠদ্বয়ের মাঝে মৃদু হা হয়ে গেল এহেন জবাব শুনে। সে চোখ তুলে ফের তাকাল সাফওয়ানের দিকে। যেন বিশ্বাস করতে চাইছে, এই উত্তর আদৌও সাফওয়ান ভাই দিয়েছে কি!

‘ উঠো! ‘
সাফওয়ানের ব্যস্ত স্বর। সায়েরী বাইকে উঠে বসলো বিনা সংকোচে, দুই পা দুই দিকে ছড়িয়ে৷ দুই হাত রাখল সাফওয়ানের দুই কাঁধে৷ মুহুর্তেই ধূলো উড়িয়ে বাইকটি ছুটে গেল অদূরে।
আজকের আবহাওয়া রৌদ্রজ্বল নয়। সূর্যের দেখা নেই বললেই চলে। আবার কালো মেঘও নেই আকাশে। তবে কিঞ্চিৎ গুমোট ভাব রয়েছে। শীতল পরিবেশ। সাফওয়ানের বাইক ছুটে চলছে অজানা গন্তব্যে। শহর পেরিয়ে গ্রামীণ পথে উঠে এসেছে ইতোমধ্যে। শোঁ শোঁ হাওয়া বইছে৷ ভোর বেলা হওয়ায় এবং সূর্য মেঘের আড়ালে ঢেকে থাকার কারণে এই হাওয়ায় শীত শীত লাগছে। চলন্ত বাইকের হ্যান্ডেল হতে একহাত তুলে নিল সাফওয়ান। তার পেট জড়িয়ে রাখা সায়েরীর হাতদুটো ছুঁয়ে দেখল সে। বেশ ঠান্ডা হয়ে আছে। চিন্তিত গলায় সে সায়েরীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ল, ‘ শীত লাগছে? ‘
বিপরীতে সাফওয়ানের পিঠে মাথা এলিয়ে রাখা সায়েরী প্রতিউত্তর করলো দ্রুত গলায়,

‘ একদম না। ‘
সাফওয়ান সেটা শুনল ঠিকই। কিন্তু সন্তুষ্ট হলোনা এই উত্তরে। সে সায়েরীর দুইহাত ঢুকিয়ে দিল নিজের জ্যাকেটের পকেটে৷ সায়েরী হাসলো। আপত্তি করলো না কোনো। সেই অবস্থাতেই দেখতে লাগলো অপরিচিত গ্রামীণ রাস্তাগুলো। সে জানেনা সাফওয়ান ভাই কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তাকে। জানার কৌতুহল আছে। কিন্তু আপত্তি নেই কোনো। নেই কোনো দ্বিধা। এই মানুষটার উপর তার বিশ্বাসের মাত্রা আকাশ-সম।
গাড়ি থেমেছে একটি শুনশান নদীর পাড়ে। নেমে দাঁড়াল দুজন। সাফওয়ান খুলে নিল সায়েরীর হেলমেট টা। দুজন গিয়ে দাঁড়ালো পাড়ে৷ ঢেউ নেই নদীতে। আজ যেন সবকিছুতেই নিস্তব্ধতা বিরাজমান। কিন্তু এই পরিবেশ ভীষণ স্নিগ্ধ। জায়গাটাও অন্যরকম সৌন্দর্যে ঘেরা। নদীর ধারে সারিবদ্ধ রেইনট্রি গাছ। যার ছায়াতলে দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান-সায়েরী। নিজ বাহুদ্বয় জড়িয়ে মুগ্ধ নয়নে আশপাশ দেখছে সায়েরী৷ শীত শীত লাগছে খানিকটা। তালু দিয়ে নিজের দুই বাহু ঘষছে সে৷ সাফওয়ান ঠিক তার পেছনে দাঁড়িয়ে। সায়েরীর শীত লাগছে দেখে সে তাকে ঘুরিয়ে নিল নিজের দিকে। টেনে নিল বুকে। জ্যাকেটের ভেতর দিয়েই দুই হাত গলিয়ে সাফওয়ানের পিঠ জড়িয়ে ধরলো সায়েরী৷ নিরবে মাথা রাখল বুকে। ওভারসাইজ জ্যাকেটের মধ্যে অনাসয়ে ঢেকে গেল তার ছোটখাটো দেহখানা। সাফওয়ানের একহাত সায়েরীর পিঠ জড়িয়ে। অন্যটা চুলের ভাঁজে। মেয়েটার আঁধার মুখশ্রী পরখ করে সে টোকা দিল কপালের মধ্যভাগে। বললো,

‘ এই ছোট্ট মাথায় এত চিন্তা কিসের? ‘
সায়েরী চোখ তুলে। থুতনি ঠেকিয়ে রাখে প্রসস্থ বুকটাতে। ইতস্তত গলায় প্রশ্ন ছুড়ে,
‘ রেজাল্ট খারাপ হলে কি আপনি খুব বেশি ডিসাপয়েন্ট হবেন? অনেক বকবেন? ‘
সাফওয়ানের ঠোঁটের কোণায় সুক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটল একথা শুনে। সায়েরীর গাল টেনে দিয়ে প্রতিউত্তর করলো,
‘ বকা দেওয়ার চান্স তো দিলেই না তুমি। ‘
‘ হুহ! মানে? ‘ সায়েরী বুঝে উঠতে পারলো না কথাটার অর্থ।

সাফওয়ান জবাব দিল না কোনো। পকেট হাতড়ে বের করলো মোবাইল। ঘাটাঘাটি করে কি যেন বের করল। অতঃপর স্ক্রিন তুলে ধরলো সায়েরীর সম্মুখে। অনাগ্রহী চোখে একপলক তাকালো সায়েরী। এবং সঙ্গে সঙ্গে চোখগুলো ডিম্বাকৃতির ন্যায় বড়বড় হয়ে গেল তার। চট করে ছেড়ে দিল সাফওয়ানকে। কেড়ে নিল মোবাইলটা। স্ক্রিনে ভাসমান রেজাল্ট শীট দেখল একবার, দইবার, তিনবার…। অবিশ্বাস্য! এসব তার পাশ মার্ক! এ তো এভারেজ মার্কের চেয়েও অনেক ঊর্ধ্বে! উত্তেজিত, অবিশ্বাস্য নয়নে সে তাকাল সাফওয়ানের দিকে। সাফওয়ান চোখের ইশারায় ‘হ্যাঁ’ বুঝাতেই চিৎকার করে লাফিয়ে উঠল সে৷ দুই হাতে গলা জড়িয়ে ধরলো সাফওয়ানের। তার কান্ড দেখে সাফওয়ান হেসে ফেললো। নিজেও জড়িয়ে ধরলো সায়েরীর কোমর,পিঠ। সেকেন্ড কয়েকের মাঝে ছটফট করে উঠে। তখনই সাফওয়ান কোমর ছাড়ল তার। নামিয়ে দিল জমিনে। সায়েরী উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে সাফওয়ানের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ল,

‘ মার্ক শিট দেখেছেন ভালো করে? আপনি..না মানে আপনার মন মতো হয়েছে তো? ‘
প্রশ্নটা করেই সে কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে থাকে৷ মন উদগ্রীব হয়ে আছে সাফওয়ান ভাই সন্তুষ্ট কি-না শোনার জন্য। সাফওয়ান বুঝল সায়েরীর মনোভাব। সে সত্যিই সন্তুষ্ট। কিন্তু একথা চেপে গেল সে। মোবাইল লক করে পুণরায় পকেটে ঢুকিয়ে জবাব দিল,
‘ এটা তো সামান্য প্রি-টেস্ট। টেস্ট আর ফাইনালে আমার আশানুরূপ মার্ক নিয়ে এসো৷ তারপর বলবো। ‘
গাল ফোলাল সায়েরী। মিনমিন কন্ঠে অভিযোগ ছুড়ল,
‘ একটু এপ্রিসিয়েট করলে কি হয়? ‘
সাফওয়ান গিলে নিল নিজের অধর কোণের হাসি টুকু। তবে ঠান্ডা স্বরে প্রতিউত্তর করলো,
‘ এপ্রিসিয়েট করতেই তো এনেছি। আজকের পুরোটা দিন তোমার। নো কোচিং, নো কলেজ। যা খুশি করতে পারো। আজ কোনো বাঁধা নেই। ‘

পলকের মধ্যে পুণরায় ঝলমলিয়ে উঠলো সায়েরীর মুখশ্রী। তার আবদারের পুটলি খুলল মুহুর্তেই। সাফওয়ান পূর্ণ মনযোগ দিয়ে শুনল সব৷ সেট করলো মস্তিষ্কে।
‘ রেজাল্ট তো কাল পাবলিশড করার কথা। আপনি আজ পেয়ে গেলেন কি করে? ‘
কৌতুহলী কন্ঠ সায়েরীর। বাইকে চাবি ঘুরাল সাফওয়ান। গম্ভীর কন্ঠে জবাব দিল,
‘ তোমার এসব জেনে লাভ নেই। কাউকে জানানোরও প্রয়োজন নেই। একটা দিন ছাড় দিয়েছি। এনজয় ইট। ‘
সায়েরী আর কথা বাড়ালো না। তার আবদারে দুজন গিয়ে নামল একটা ছোট্ট টং দোকানে। প্রায় ষাটোর্ধ একজন বৃদ্ধ চা-পানি বিক্রি করছেন৷ তারা গিয়ে চায়ের অর্ডার দিল। ঠিক সেই মুহুর্তে কানে আসল টিনের চালে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি জলের ধ্বনি। অতঃপর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামল। চিন্তিত দেখাল সাফওয়ান কে। কিন্তু সায়েরী ভীষণ প্রফুল্ল।

শীতে কাঁপছে তার ছোট্ট তনু। সাফওয়ান নিজের জ্যাকেট-টা পরিয়ে দিল তাকে৷ ওভার সাইজ জ্যাকেট টাতে সায়েরী যেন ডুবে গিয়েছে৷ নিজের কাছে নিজেকে কাকতাড়ুয়া বলে মনে হচ্ছে। বড়সড় হাতার আড়ালে ঢাকা পরা তার ছোট ছোট হাতদুটো বের করলো সাফওয়ান। সুন্দর ভাবে গুটিয়ে দিল জ্যাকেটের হাতা। অতঃপর নিজের রুমাল পেচিয়ে গরম চায়ের মাটির কাপটা ধরিয়ে দিল হাতে। শীতল আবহাওয়ায় সকালবেলা গরম চা-টুকু বেশ আয়েস করে, ছোট ছোট চুমুক দিয়ে দিয়ে পান করছে সায়েরী। চা-কফি কোনো টাতেই বিশেষ টান নেই সাফওয়ানের। মাঝেমধ্যে মাথা ধরলে তখন কেবল কড়া কফি খায় সে৷ কিন্তু আজ সায়েরীর খাওয়া দেখে তার মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে অমৃত সুধা পান করছে বোধহয় মেয়েটা। ভাবতেই নিঃশব্দে হাসলো সে। মেয়েরা বোধহয় সবকিছু তেই মুগ্ধতা খুঁজে নেয়। তন্মধ্যে সায়েরী নামক রমনী অন্যতম।

বৃষ্টি থামেনি। কিন্তু এমন দাঁড়িয়ে থাকলে সময় অপচয় হবে। বাধ্য হয়ে বৃষ্টি মাথায় ফিরে যাওয়ার জন্য বাইকের কাছে এগোল তারা। শূন্য কাপ জোড়ার সঙ্গে রেখে গেল দুইটি চকচকে হাজার টাকার নোট। বৃদ্ধার চোখ সিক্ত হয়ে উঠলো তা দেখে। মনে হলো যেন উপর ওয়ালার ইচ্ছায় মানুষ রূপি কোনো ফেরেশতা এসেছিল এই সাত সকালে। আবসা-ঝাপসা নজরে দূর থেকে ছেলে-মেয়ে দুটোকে দেখলেন তিনি। দোয়া দিলেন মন উজাড় করে।

‘ জেদ করছো কেনো? বৃষ্টি বাড়বে। দ্রুত হেলমেট মাথায় দাও। দেরি হচ্ছে আমাদের। ‘
‘ বললাম তো লাগবেনা। আমি আপনার মতো এত দুর্বল না বুঝেছেন? এই বৃষ্টিতে ভিজলে আমার সর্দিও আসবে না। এটা আপনিই মাথায় দিন। নাহলে মাঝরাস্তা- তেই বেহুশ হয়ে পড়ে থাকবেন। ‘
ভেংচি কেটে বলা কথাটুকু শুনে সাফওয়ান ছোট ছোট চোখ করে তাকালো। সায়েরী খানিকটা ভয় পেয়ে গেল তা দেখে। বেশি বেশি বলে ফেলেনি তো আবার? কিন্তু সাফওয়ান বললো না কিছু। হেলমেট মাথায় দিয়ে চেপে বসলো বাইকে। পরপর উঠে বসলো সায়েরী। দ্রুত গতিতে ছুটে চললো বাইকটি। নিরিবিলি রাস্তায় বাইক উঠতেই পূর্বের মতো সাফওয়ানের পিঠে মাথা এলিয়ে দিল সায়েরী। পেট জড়িয়ে ধরলো দুই হাতে। মুখ চলছে অবিরাম। কতশত গল্প, প্রশ্ন, কৌতুহল তার। সাফওয়ান ব্যস্ত সড়কে দৃষ্টি রেখে মন দিয়ে শুনছে সেসব। প্রতিটা কথার জবাব দিচ্ছে ধৈর্য নিয়ে।

বিগত কয়েক মাসে অনেক কিছুই বদলে গিয়েছে। প্রথমত বদলেছে সায়েরী নামক ছটফটে রমনীর আচরণ, চিন্তাভাবনা, অভ্যাস। আগের মতো হুটহাট যাকে তাকে ভরসা করে না এখন। যার তার কথায় প্রভাবিত হয়না বোকা রমনী। বাচ্চামো -ও কমেছে অনেকাংশে। সাফওয়ানের বলা সব কথা মেয়েটা মন দিয়ে শুনে। মেনে চলার চেষ্টা করে। স্বার্থপর এই পৃথিবীতে গুটিকয়েক আপনজন ব্যতীত কাউকে পরোয়া, ভরসা করার জন্য নিষেধ করেছে সাফওয়ান ভাই। সায়েরী সেকথা বেশ মনে রেখেছে।

কিন্তু সেসব কেবল অপরিচিত, অতি নগন্য মানুষদের জন্য। একদিকে যেমন অন্যদের কাছ থেকে অন্ধভক্তির, সরলতার স্বভাব পালটে ফেলেছে। তেমনি তার সব বাচ্চামো আবদার, কথার ঝুলি, বিশ্বাস, ভালোবাসা এসে ঠাঁই জমিয়েছে সাফওয়ানের নিকট। সাফওয়ানের আহ্লাদ, আশকারার জন্যই হয়তো এই প্রাপ্তি। অন্যদের জন্য ধীরে ধীরে ম্যাচিউর, বুদ্ধিমতী হয়ে উঠা সায়েরী, সাফওয়ানের কাছে রয়ে গিয়েছে সেই পূর্বের মতোই ইম্যাচিউর। সাফওয়ানের সঙ্গে সে এখন ভীষণ সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কথা বলতে, আবদার তুলে ধরতে বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ হয়না। ঘনিষ্ঠতা ছাড়াই দুজনের সম্পর্ক টা ভীষণ গভীর। ‘কম্ফোর্ট জোন’ শব্দটা বলতে তারা যেন একে অপরকেই বুঝে।

রেজাল্ট পেয়ে একেক একেক জনের এক এক প্রতিক্রিয়া। র‍্যাঙ্কিং-এ তৃতীয় স্থান দখল করতে পেরেছে বলে সাফ্রিন আশাহত। ফার্স্ট টার্মের সময়ও প্রথম স্থানে ছিল সে। কিন্তু এভাবে কেনো তৃতীয় হয়ে গেল? তার ভাই এই মার্ক দেখলে তো রক্ষা থাকবে না। প্রথম থেকে সোজা তৃতীয়! রাগে, দুঃখে কান্না পাচ্ছে তার। অন্যদিকে সাফ্রিনের এমন হা হুতাশ দেখে নুহাশের গালাগালির শেষ নেই। সে কোনো রকমে পাশ করেছে বলা চলে। পাশ মার্ক সব ৩৩-৪৫ এর মধ্যে। এতেই যেন সে সন্তুষ্ট। কিন্তু সাফ্রিনের এমন হা হুতাশ দেখে সে বিরক্ত হয়ে ধমকে উঠলো,

‘ তোদের মতো বড়লোক ব্রেনি মাইয়াদের দেখি ঢংয়ের-ও শেষ নাই বা*ল। ওই তুই কি বোর্ড এক্সাম দিছস নাকি? এমনে মরা কান্না জুড়ে দিছস ক্যান? রেজাল্টের শোকে জামাই মরছে তোর? ‘
‘ বাজে বকবি না, নুহাশ। তোর আর আমার এক্সপেকটেশন সেইম না। না বুঝে উল্টা পাল্টা কথা শুনাবি না একদম। ‘
মুখ ঝামটি মারল নুহাশ,

‘ আমি সাদা সিদে পোলা তোর মতো বড়লোকি আশা ভরসা রাখতে চাইও না। বা*লের এক্সপেকটেশন’স! এমনে আশা ধরে রাখলে মন দিয়ে পড়োস নাই ক্যান? এখন আসছোস ন্যাকা কান্দন দেখাতে। আজাইরা বেডি মানুষ। ‘
সাফ্রিন তর্কে গেল না। এমনিতেই মন খারাপ তার। নুহাশের পাশে বসে আছে সায়েরী। লেইস চিপসের প্যাকেট হাতে। নিশ্চিন্তে বসে বসে চিপস খাচ্ছে সে। নুহাশ ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। এরপর আচমকা বাহু দিয়ে ঘাড় চেপে ধরলো সায়েরীর। মেয়েটা চাপা স্বরে চিৎকার করে করলো এই আক্রমণে। উচ্চ কন্ঠে চেঁচাল,
‘ আহ! নুহাশ! ঘাড় ছাড়। লাগছে আমার। ‘
‘ তোরে তো জুস মেশিনে ছুড়ে মাইরা ব্লেন্ড কইরা ফেলতে মন চাচ্ছে আমার। বেয়াদব, লেডি মীরজাফর! কেমনে পারলি আমারে পিছে ফেলে এত গুলো মার্ক তুললে? মায়া দয়া হয়নাই এই ভোলা ভালা বন্ধুটার জন্য? ‘
‘ উফ!! আগে ছাড় তো। ‘

‘ না ছাড়ছি না। সত্যি কইরা ক দেখি এমন কি স্পেশাল ট্রেনিং দিছে তোরে সাফওয়ান ভাই? মানুষ প্রেমে পড়ে আণ্ডা নিয়ে আসে। আর তুই ভালো রেজাল্ট করে ফেললি? কেমনে ভাই কেমনে? ‘
সায়েরী হাসল বত্রিশ পাটি দাঁত দেখিয়ে। চোখ টিপ মেরে বললো,
‘ তোমার জীবনের প্রেমের অভাব ব্রো। একটা প্রেম করো। দেখবে সব সর্ট-আউট হয়ে গেছে। ‘
‘ ধুল বা*ল। তোরা জানোস খালি কাঁটা গায়ে বিট লবণ মাখতে। সবকটা বদের হাড্ডি তোরা। ‘
সায়েরী শব্দ করে হেসে ফেললো। পরপর নজর গেল নাজরাতের দিকে। মোবাইল হাতে নিয়ে মুখ গোমড়া করে বসে থাকতে দেখে বলে উঠলো,

‘ তোর আবার কি হলো? পাশ তো করেছিস। ‘
‘ ধ্যাৎ! এই পাশ দিয়ে হবে টা কি? মার্কস দেখ। তোর চেয়েও দুই গুণ কম। সাদিফ বলেছে এমন গাধা বউ ঘরে তুলবে না সে। কত বড় অপমান দেখেছিস? ‘
পাশে গম্ভীরমুখে বসে থাকা আয়ান জবাব দিল হুট করে,
‘ অপমান না করে আর কি বা করবে? এসব কি ছাতার মাতা মার্কস তোদের? তোহা আর তোর হয়েছে কি এবার, হ্যাঁ? কোন যুদ্ধে শামিল হয়েছিলি বলে পড়ালেখা চাঙ্গে তুলেছিলি? ‘
নাজরাত নিশ্চুপ। তোহা সুযোগ পেয়ে পালিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু আয়ানও দাঁড়িয়ে পড়লো তার দেখাদেখি। টেবিলের অন্য প্রান্ত হতে আদেশ ছুড়ল,

‘ চুপচাপ বোস, তোহা। পালাবি তো খবর আছে। ‘
তোহা চুপসে গেল ভয়ে। আমতা আমতা করে বলে উঠলো,
‘ প..পালাচ্ছি কে বললো? আমি তো..আমি..মানে পানি.. হ্যাঁ পানি আনতে যাচ্ছিলাম আমি। ‘
বলতে না বলতেই নুহাশ টেবিলের উপর হতে পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে দাঁত কেলিয়ে জবাব দিল,
‘ আরে আনা কানা.. বসে যা বইন। এই যে পানি। কেন কষ্ট করে নিজে গিয়ে আনবি বলতো? পায়ে ধুলো লাগানোর কোনো প্রয়োজন নেই। আমি আছি তো। কি লাগবে বসে বসে বল শুধু। ‘
উপস্থিত অন্য তিন মানবী ফিক করে হেসে ফিল একথা শুনে। তোহা দাঁত কিড়মিড়িয়ে তাকিয়ে রইল নুহাশের দিকে। ছিনিয়ে নিল বোতল। আয়ান ফের বলে উঠলো,

‘ তোকে আমি সব কিছুতে এতটা হেল্প করেছিলাম। আর তুই.. এসব পাশ মার্ক? দিন রাত জ্বালিয়ে এই রেজাল্ট এনেছিস? ‘
তোহা নিশ্চুপ। সায়েরী হেসে উঠে নাটকিয় ভঙ্গিতে আয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
‘ দেখেছিস? আগেই বলেছিলাম যে আমাকে মেনে নে। তোকে একমাত্র আমার সাথেই মানায় দোস্ত। কিন্তু মেনে নিলি না। জুটিয়েছিস এই শর্ট টেম্পার কে৷ এবার বুঝ ঠ্যালা। ‘
আয়ান হেসে ফেললো একথা শুনে। সায়েরীর পেছন থেকে তোহা ধুম করে এক থাপ্পড় মারল সায়েরীর মাথায়।

‘ ঢং! নিজে এবারে ভালো করেছিস বলে ভাব দেখাচ্ছিস? থাক, থাক। আমারও সময় আসবে। ‘
‘ আর হ্যাঁ। পারলে এটাকে নিয়েই নে। আমার পক্ষে এই নিরামিষ কে সামলানো আর সম্ভব না বইন। ‘
হতাশ কন্ঠে একথা বলামাত্র অন্যদিক থেকে তেড়ে আসলো আয়ান,
‘এ্যাঁই এ্যাঁই! কি বললি তুই? কে কাকে সামলাচ্ছে হ্যাঁ? অতিষ্ঠ হওয়ার কথা তো আমার। নেহাৎ আমি ভদ্র ছেলে বলে মেনে নিচ্ছি তোকে। বারো দিনে চব্বিশ বার ব্রেকাপ করিস তুই। তোর চেয়ে তো প্রভা বেটার ছিল। অন্তত এমন বিরক্ত করত ন… ‘

বলতে বলতে আচমকা তোহার রণচণ্ডী রূপ দেখে থমকে গেল আয়ান। বুঝতে পারল যে কত বড় ভুল করে ফেলেছে সে। ‘ এই সেরেছে! ‘ বলেই কপাল চাপড়াল বাকি চার বন্ধু বান্ধব।। তোহা ব্যাগ তুলে গটগট পায়ে স্থান ত্যাগ করলো। আয়ান হতাশ হয়ে বন্ধুদের দিকে ফিরে তাকাতেই নুহাশ দুই হাত শূন্যে তুলে মোনাজাত ধরলো,
‘ ইন্না-লিল্লাহি ওয়িন্না ইলাইহির রাজিউন! ‘
‘ আমার নিরামিষ বন্ধুর আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি আল্লাহ্‌! সবাই জোরে কও আমিন.. ‘
সত্যি সত্যিই বাকি তিন রমনী মুখ টিপে হেসে মাথা দুলিয়ে বলে উঠলো,
‘ আমিইইইইন!!! ‘

ভোর সকাল। খান বাড়ির দোতলার উত্তর দিকের বিশাল রুমটার সফেদ বিছানায় তন্দ্রাঘোরে আচ্ছন্ন সাফওয়ান। কালো ম্যাগি হাতা টি-শার্ট পরিধানের কারণে উন্মুক্ত হয়ে আছে তার দুধ ফর্সা পেশিবহুল দুই বাহু। বালিশে মুখ গুঁজে, উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে সে। সফেদ কম্ফোর্টার টা কোমর অবধি ঢেকে রেখেছে। দরজার টক টক কড়া নাড়ানোর শব্দ তার গভীর ঘুমের ঘোর ভাঙ্গাতে পারল না।। অগত্যা বাধ্য হয়ে ভেতরে ঢোকল একটি নারীমূর্তি। হিমশীতল রুমটাতে পা রাখা মাত্র গায়ে কাঁটা দিল উঠলো তার। এত্ত লো টেম্পারেচার! তড়িঘড়ি করে সে বেড সাইড টেবিল থেকে এসি-র রিমোর্ট তুলে নিল। বন্ধ করলো এ সি। পরপরই ঘুমন্ত সাফওয়ানের উদ্দেশ্যে ক্ষীণ স্বরে ডাকল, ‘ ভাইইই? ‘

পরপর চারবার ঢাকার পরেও বিন্দুমাত্র নড়চড় দেখা গেল না সাফওয়ানের মধ্যে। সাফ্রিনের কপালে ভাঁজ পড়ল। তার ভাইয়ের ঘুম তো এমন গভীর নয়। তাছাড়া রোজ ভোরে উঠে হাঁটতে বের হয় সে। আজ তবে হলো কি? চিন্তিত ভঙ্গিতে আশেপাশে নজর দিল সে। দেখল, বিছানায় এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে আছে সাফওয়ানের মোবাইল, আইপ্যাড, নোটস, পেন। সে বুঝল, রাত জেগে পড়াশোনা করেছে বলে এখনো ঘুম পূর্ণ হয়নি সাফওয়ানের। সে একবার ভাবলো পরে এসে ডেকে যাবে। কিন্তু তা-ও সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে সাড়ে সাতটা বাজে। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী সব করতে গেলে অনেক সময় প্রয়োজন। এখন না উঠলে পরবর্তীতে দেরি হয়ে যাবে। আজকের এই বিশেষ দিনে অন্তত কোনো কিছুতে কমতি রাখতে চায়না সে। তাই বাধ্য হয়ে ফের উচ্চ কন্ঠে ডাকল সাফওয়ান-কে। কপাল কুঁচকে পিটপিট চোখ মেলে তাকালো সাফওয়ান। বিরক্ত কন্ঠে শুধালো, ‘ কি সমস্যা? ‘
জোরপূর্বক হাসল সাফ্রিন। থমথমে গলায় বলে উঠলো,

‘ গুড মর্নিং ভাইই! হ্যাপি বার্থডে টু মি? ‘
সাফ্রিন যেন কিছু মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টায়। সাফওয়ান কম্ফোর্টার-টা মাথা অবধি টেনে নিয়ে পুণরায় উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে দিল। প্রতিউত্তর করলো ঘুমঘুম কন্ঠে,
‘ ইয়াহ, ওয়ালকাম। কাবার্ডের লেফট সাইডে গিফট রাখা আছে। নিয়ে বের হও। ‘
সাফ্রিনের চেহারা ঝলমলিয়ে উঠলো। সে জানত, দুনিয়ে উল্টে গেলেও তার ভাই কখনো তার জন্মদিন ভুলবে না। উৎফুল্ল চিত্তে কাবার্ডের লেফট সাইডের স্লাইডিং ডোর খুললো সে। সম্পূর্ণ খোলা যাবেনা। নয়তো তার ভাই গর্জে ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের ন্যায়। মাঝামাঝি তাকে ডিওর,হোদা বিউটি এবং আরোং-য়ের তিন তিনটা শপিং ব্যাগ দেখে সাফ্রিনের চোখদুটো ডিম্বাকৃতির ন্যায় বড় বড় হয়ে গেল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে সে চেঁচিয়ে উঠলো। লুফে নিল ব্যাগ তিনটি। চঞ্চল হাতে দেখল কি কি রয়েছে সব। তিনটি আলাদা সেইডের Huda Beauty Demi Matte Cream Liquid Lipstick. এবং একটি Huda Beauty Resting Boss Face Waterproof Setting Spray.

সাফ্রিনের চোখ চকচক করে উঠলো সেসব দেখে। বিশেষ করে সেটিং স্প্রে দুটো সে বুকের সঙ্গে লাগিয়ে নিল। সেই কবে থেকে কিনার শখ ছিল তার। কিন্তু এত বেশি দাম দেখে নজরে রেখেও কিনা হয়নি। তাছাড়া মেক-আপ প্রোডাক্ট পাওয়া মানে মেয়েদের কাছে স্বর্গ পাওয়ার মতো আনন্দ। ডিওর ব্রান্ড হতে একটি Miss Dior পারফিউম এবং Arong এর একটি পার্স। সেসব দেখে সাফ্রিন খুশিতে আটকানা। এবারের মতো এমন চমৎকার গিফট সে পূর্বে কখনো পায়নি তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে। সে উচ্ছ্বসিত স্বরে ফের চেঁচিয়ে উঠলো, ‘ থ্যাঙ্কিউ সো মাচ ভাই। এসবের চেয়ে বেস্ট গিফট তো আর হতেই পারে না। আই লাভ’ড ইট। ‘
সাফওয়ান বিরক্ত হয়ে বালিশ চাপা দিল কানে। তবুও শোনা গেল সাফ্রিনের কন্ঠ,

‘ হোদা বিউটির প্রোডাক্ট! তুমি এসব কীভাবে চিনলে? লিপস্টিক সেইড গুলো কি দারুণ দেখতে। ‘
‘ নীতি প্রেফার করেছে। নিজের রুমে দেখো গিয়ে, গো! ‘
সাফওয়ানের বিরক্ত গলায় স্বর কানে যেতেই সাফ্রিন আর কথা বাড়ালো না। কিন্তু বের-ও হলো না রুম থেকে। অভয় কন্ঠে ফের বলে উঠলো,
‘ তোমার গ্রীণ ভ্যালি তে আজ পার্টি অরগানাইজ করবো, ভাই। তুমি গিয়ে একটু রহিম আঙ্কেল কে বলে দাও যেন সব ক্লিন করে রাখে। লাঞ্চের ব্যবস্থা তুমি করে দিবে। ‘
‘ গ্রীণ ভ্যালি ‘ নামটা শুনেই সাফওয়ানের ঘুম উবে গেল। উপায়ান্তর না পেয়ে উঠে বসল সে। গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
‘ বাবা আগেই পার্টি প্লান করে রেখেছে বাসায়। তাহলে গ্রীণ ভ্যালি-তে কি? ‘
প্রতিউত্তরে শুনা গেল সাফ্রিনের উদাসীন কন্ঠ,

‘ বাবাইকে আমি নিষেধ করে দিয়েছি। বাসায় কোনো হাই-ফাই পার্টি লাগবে না আমার। প্রত্যেক বার আমার বার্থডে-র নাম করে আসে সব বাবাইয়ের বিজনেস পার্টনার। ফ্যামিলি মেম্বার আসলেও ওসব লোকজন দের জন্য কখনো মন মতো কিছু করতে পারিনি। আর.. তুমি জানো বাবাই আমার ফ্রেন্ডস দের পছন্দ করে না। এজন্য ওরা কেউ আসতেও চাইনা আমার বাসায়৷ এবারে সেসব রিপিট করবো না আমি। আমি সিম্পল পার্টি চাই। কোনো পার্টি প্লেনার লাগবে না। আমার ফ্রেন্ডরা মিলে সব অরগানাইজ করবো। নীতি আপুরা, আমার কাজিনরা আর ফ্রেন্ডস’রা থাকবে শুধু। আর কেউ না। তুমি না করবে না, ভাই। প্রত্যেক বার তোমাদের মতো সেলিব্রেশন করেছি। এবার আমাকে আমার মতো করে এনজয় করতে দাও, প্লিজ! ‘
গাল ফুলিয়ে শ্বাস ফেলল সাফওয়ান। কেবল ছোট্ট করে সম্মতি জানাল,

‘ ঠিক আছে। আমি দেখছি। ‘
সাফ্রিন খুশি হলো বেশ। বেরিয়ে গেল রুম থেকে। সাফওয়ান বলেছে মানে ঠিকই সে সামলে নিবে সব কিছু। সাফ্রিন যেতেই বিছানা ছাড়লো সাফওয়ান। ভাবলো, সাফ্রিনের এই চাওয়াটুকু ভুল নয়। তাদের বাবা নওশাদ খান বরাবরই সবকিছুতে চাকচিক্য পছন্দ করেন। যেমন তেমন মানুষদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে চাননা তিনি। ছেলে মেয়েদের কে-ও নিজেদের স্ট্যাটাসের লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা করার উপদেশ দেন সর্বদা। কিন্তু ছেলে-মেয়ে দুজন সেসব কথার ধার ধারেইনি কখনো। দুজন-ই হয়েছে একেবারে মা তাহুরা খানের মতো। সাদামাটা হৃদয়ের।
পার্টির সরঞ্জামের ব্যাবস্থা করাটা আহামরি কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু সাফওয়ানের চিন্তা হচ্ছে অন্য কিছু নিয়ে। সায়েরীর সঙ্গে তার সম্পর্ক-টা ঠিক কেমন তা সে কখনো কারো সম্মুখে প্রকাশ করে নি।

প্রকাশ করার ইচ্ছে ও নেই। ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে তৃতীয় পক্ষের কোনো মতামত, ঠাট্টা বা সামান্য নাক গলানো কিছুই পছন্দ নয় তার। কিন্তু সায়েরী! সেই মাথামোটা মেয়েটা তো কিছুই চেপে যেতে পারে না। সাফওয়ানের বন্ধুদের সম্মুখে যদি সে প্রকাশ করে ফেলে রোজ সকালে গ্রীণ আসার ব্যাপারটা। তবে সবাই মিলে পিঞ্চ করার কোনো চান্স মিস দিবে না। কিন্তু সাফওয়ান চাইনা সেসব হোক। এজন্য প্রথমে সায়েরী কে বোঝাতে হবে ব্যাপারটা। আবার আছে শিউলি। ওই মেয়েটাও চরম গর্দভ। এক কথা হাজারবার বোঝানোর পরেও ভুল করে বসে। আজ যদি তার প্রয়োজন না হতো সাফওয়ান বলে দিতো যেন সে আজ মেহমান দের সামনে না আসে। কিন্তু তা-ও করা যাবে না। বিরক্ত হয়ে কপালে আঙ্গুল ঘষল সাফওয়ান। যত প্যারা সব তার ঘাড়ে এসে জুটেছে।

‘ কন কি ভাইজান? সায়েরী আপারে আমি চিনব না ক্যান? আমার তো মাথায় সমস্যা নাই। একদম গম (ভালো) আছি। ‘
সাফওয়ান অতিষ্ঠ, বিরক্ত, হতাশ। আর বোঝানোর সাধ্য নেই তার। তার মুখের দিকে তাকিয়ে রহিম চাচার স্ত্রী মেয়েকে টেনে নিলেন নিজের দিকে৷ কি যেন বুঝালেন কানে কানে৷ শিউলি কেবল মাথা নাড়লো। ফের উদ্যত হলো ঘর পরিষ্কারের কাজে। সাফওয়ান নজর দিল আশেপাশে। দেখল, ডাইনিং টেবিলের নিচে একজোড়া পিঙ্ক স্লিপার। গ্রীন ভ্যালি’তে অবস্থান করার সময় কালীনে স্নিকার্স খুলে খালি পায়ে হাঁটত বলে সায়েরী জন্য এই স্লিপার জোড়া কিনে এনেছিল সাফওয়ান। যা এখন এলোমেলো ভাবে দু’দিকে দুটো ছড়িয়ে রয়েছে। সোফায় ভাঙ্গা পাঞ্চ ক্লিপের দুটো অংশ পড়ে রয়েছে। টেবিলের উপর নোটস, ইরেজার এবং একটি ব্ল্যাক রাবার ব্যান্ড। যেদিকে তাকায় সেদিকেই সায়েরীর অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে৷ সেসব দেখে দুই আঙুলের সহিত কপাল ঘষল সাফওয়ান। আপনমনে স্বগোতক্তি করলো,
‘ এই ঝামেলার বস্তা আমাকে জ্বালিয়ে মারবে। ‘

বেলা সাড়ে ন’টা বাজতে না বাজতেই সাফ্রিনের বন্ধুমহলের আগমন ঘটলো গ্রীণ ভ্যালি তে। সকলের হাতেই নানান সরঞ্জাম। গেইট পার হওয়া মাত্র বাগানের সাদা গোলাপ এবং রজনীগন্ধার সমারোহ দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল সকলের। তোহা নিজের হাতের জিনিস সব আয়ানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে চট করে একটি গোলাপ ছিড়ে ফেললো। গুঁজে নিল কানের পিঠে। আয়ানের দিকে তাকিয়ে মিহি স্বরে শুধালো, ‘ কেমন লাগছে? ‘
আয়ান জবাব দেওয়ার সুযোগ টুকু পেল না। পেছন থেকে ভেসে আসল সায়েরীর কঠোর কন্ঠস্বর,

‘ তোহা! তুই…তোকে কে বলেছে ফুল ছিড়তে? কেনো ছিড়েছিস? ‘
তোহা ভড়কে গেল। বাকিরাও তাকিয়ে রইলো অবাক চোখে। সায়েরীর এমন অধিকারবোধের মর্মার্থ বুঝতে অক্ষম তারা। তোহা কপাল কুঁচকে প্রতিউত্তর করলো,
‘ আজব! তুই এমন খেপে যাচ্ছিস কেনো? ‘
থতমত খেয়ে গেল সায়েরী। কি জবাব দিবে তা ভেবে পেল না। সে খেপবে না তো কে খেপবে? এসব তো অলিখিত ভাবে তারই৷ তাছাড়া সাফওয়ান ভাই সেদিন কতটা আবেগ মেশানো চিরকুট লিখে, তার মান ভাঙানোর জন্য উপহার দিয়েছিল এই গাছগুলো। প্রতিটা পাতা জুড়ে তার অনুভূতি ঘিরে আছে। এতটা তাচ্ছিল্য ভাবে তোহা ফুল ছিড়েছে দেখে তার খারাপ লেগেছে। কতটা যত্নের ফুল তার। কিন্তু চেয়েও কিছু বলতে না পেরে সে মিনমিন কন্ঠে শুধালো,
‘ খেপে যাচ্ছি না। এমনিই বলেছি। এভাবে না বলে কারো বাগানের ফুল ছিড়ে নেওয়া ভালো না। ব্যাড ম্যানার্স। ‘
তোহা ফিক করে হেসে দিল। নিজের কান হতে ফুলটা নিয়ে সায়েরী’র কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বললো,
‘ আজকাল বেশ বড়দের মতো ডায়লগ মারছিস দেখি। সো মাচ ইম্প্রেসিভ, সায়ু! কিন্তু এসব কথা না বাইরের মানুষদের জন্য। এটা তো একপ্রকার আমার বান্ধবীর বাগান বলতে গেলে৷ এটা থেকে ছিড়ে নিয়ে কি এমন অপরাধ করেছি, হুহ? ‘

এই পর্যায়ে মাথা নেড়ে সায় জানাল সায়েরী। কথাটা ভুল নয়। বান্ধবী হিসেবে তোহা একটা ফুল নিতেই পারে।
‘ তা ঠিক আছে। কিন্তু এমন দজ্জালের মতো করে ছিড়বি না বলে দিলাম। দেখ কত বাজে ভাবে ডাল ভেঙেছিস তুই৷ ‘
‘ ঠিকাছে ঠিকাছে। এবার ভেতরে চল। সবাই চলে গিয়েছে আমাদের ফেলে। দ্রুত চল। ‘
লিভিং রুমে শিউলিকে নানান কাজের ইন্ট্রাকশন’স দিচ্ছিলো সাফ্রিন। আকস্মিক কানের কাছে পে পু করে বেজে উঠলো কিছু একটা। হকচকিয়ে গেল সে। ঘাড় ফিরাতেই দেখল বাচ্চাদের খেলনার একটি হাঁস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নুহাশ। সাফ্রিন তাকাতেই ফের হাঁসের পেট চেপে ধরে পে পু পে পু করে সুর তুললো সে। সঙ্গে নিজেও সুর মিলালো,
‘ হ্যাপি থু ইউ থু ইউ! ‘
কানের কাছে এমন শব্দ শুনে অতিষ্ঠ হয়ে হাঁসটা ছিনিয়ে নিল সাফ্রিন। না চাইতেও বিরক্ত কন্ঠে শুধালো,
‘ অন্তত আজকের দিনে আমাকে রাগানো বন্ধ কর। এসব কি হ্যাঁ? এই তোর সময় হলো উইশ করার? রাতে কি চুরি করতে বের হয়েছিলি? ‘

‘ চুরি করতে বের হবো ক্যান? আমি তো নাকে সরিষার তেল মেখে ঘুমাচ্ছিলাম। পয়দা হইতে না হইতেই টেক্সট দিয়ে উইশ করলে সেসব পড়তে তোর দাঁত ভেঙ্গে যেতো। একদিনের বাচ্চার উপর এমন জুলুম আমি করতে পারি বল? এজন্য সামনা সামনি শুভেচ্ছা জানাচ্ছি দেখ…
বলতে বলতে পুণরায় পে পু শব্দ হলো৷ সেই সঙ্গে নুহাশের কন্ঠ, ‘ হ্যাপি থু ইউ থু ইউ। ‘
‘ ফার্মের মুরগী বহুত খুঁজছি বুঝছস? কিন্তু এমন পু পু মুরগী পাইনাই। এজন্য এটা নিয়ে আসলাম। দেখ দেখ, এক্কেরে তোর মতন ফকফকা ধলা দেখতে। মাশা আল্লাহ!!!! ‘
রাগে, দুঃখে সাফ্রিনের মেজাজ তুঙ্গে উঠল। কুশন ছুড়ে মারল নুহাশের দিকে। দুজনের অযাচিত ঝগড়া দেখে আয়ান ধমকে উঠলো। যা শুনে দমে গেল দুজন। শিউলি নাশতা নিয়ে এসেছে সবার জন্য। পেট পূজা করামাত্র সাফ্রিনের তাড়া দেখে সকলে লেগে পড়ল ডেকুরেশনের কাজে। নুহাশ শুনিয়ে শুনিয়ে বললো,

‘ ইহজীবনে এমন জন্মদিন দেখি নাই বাপ। বড়লোকদের এত রঙ ঢং। কিন্তু ডেকুরেশনের জন্য কামের লোক নাই। এগুলা কোনো কথা! আমরা আসবো, খাবো, নাচবো আর মাইয়া দেখব। কিন্তু বা*লের নসিব আমার। রোজ রোজ দেখা পেত্নীগুলো ছাড়া নতুন কোনো মুখ নাই দেখার জন্য। আমার বেঁচে থাকাটাই শালা লস প্রজেক্ট। ‘
শুরুর কথাগুলো শুনে কেবল সাফ্রিনের রাগ হচ্ছিল। কিন্তু শেষে এসে তিন রমনী একত্রে রেগে গেল। কথা শেষ হতে দেরি, কিন্তু নুহাশের পিঠে তবলা বাজতে দেরি নাই। হকচকিয়ে উঠে বাপ বাপ করে চিল্লিয়ে উঠলো সে৷ আয়ান হাসছে তাকে এমন জব্দ হতে দেখে।

লাঞ্চের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে দিয়ে গ্রীণ ভ্যালি-তে ফিরল সাফওয়ান। সঙ্গে নিয়ে এসেছে সামান্তা এবং সাম্য কে। ফুফাতো ভাইদের আমন্ত্রণ করেছিল। কিন্তু কেউ-ই ফ্রি নেই এই সকাল বেলা৷ সাদিফ-ইফাজ কাজে ব্যস্ত। সাহিল এবং ইভান ভার্সিটিতে। নিশি ব্যস্ত সংসারে। রাতে হলে যেকোনো প্রকারে আসতো সকলে মিলে। কিন্তু সকালবেলা হওয়ায় কারোর পক্ষেই সম্ভব হলো না আসা। এদিকে সাফওয়ানের বন্ধুরা একবার বলাতেই চার পায়ে খাড়া। জিমন আর রায়ান মিলে নিজেদের মধ্যে অন্য এক প্ল্যান সাজিয়ে বসে আছে রাতের জন্য। বহুদিন বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেওয়া হয়না। শেষ বার নাইট স্টে করেছিল মিহাদের সঙ্গে। তা-ও মিহাদের আবদারে। ছেলেটা বোধহয় ঠের পেয়েছিল সেদিনের পর আর সময় পাবে না বন্ধুদের সঙ্গ দেওয়ার জন্য। আবরারও ছিল সেদিন। আজ আছে কেবল সাফওয়ান, জিমন এবং রায়ান। আমেজ হয়তো কম হবে। কিন্তু তবুও আজ রাতে ছোট খাটো আড্ডা জমাতে প্রস্তুত তারা।

সাফওয়ান ঘরে প্রবেশ করে দেখল সাফ্রিন সহ সব বন্ধু বান্ধব মিলে লিভিং রুম সাজাচ্ছে। আয়ানের হাতে পাম্প মেশিন। বেলুন ফুলাচ্ছে সে। গেইট আকারে করে রেড এবং গোল্ডেন বেলুন ছোট বড় আকারে লাগাচ্ছে তারা। ফাঁকে ফাঁকে কিছু আর্টিফিশিয়াল ফুল। মিউজিক বক্সে গান বাজছে অল্প আওয়াজে। সেই তালে তালে গা দুলাচ্ছে, গুনগুন করছে তারা। সাম্য এবং সামান্তা ছুটে গেল সেদিকে। সাফওয়ান উঠে গেল সিড়ি বেয়ে৷ আপাতত এখানে তার কাজ নেই৷ সাফ্রিনের বন্ধুরা মিলে সামলে কিবে এসব।

‘ সামান্য একটা বার্থডে পার্টি-ই তো। এই অবস্থাতে না যাওয়াটা-ই ভালো। আপনি শুধু শুধু জেদ করছেন, ইরা। ‘
জাদিদের শান্ত, বুঝদার কন্ঠ। কিন্তু ইরা তা বুঝার চেষ্টায় নেই। শুনতেও চাচ্ছে না কিছু। নিজ জেদ অব্যহত রেখে সে ফের বলে উঠলো,
‘ জেদ করবো না কেনো? আজ কতগুলো মাস যাবত আমি ঘরে বন্ধি। চেক-আপ ছাড়া অন্য কোনো কারণে গিয়েছি বাসায় বাহিরে? আপনি আর আপনার সব বেহুদা রুলস-রেগুলেশনস। অসহ্য! ‘
‘ গত মাসেই তো বাহিরে’র আনহেলদি খাবার খেয়ে আসলেন জেদ করে। পুরোপুরি একমাস হয়নি এখনো। এখন আবার… ‘

‘ আনহেলদি? বাহিরে নিয়ে যেতে বলেছি বলে রেস্টুরেন্টে নিয়ে বসিয়ে রেখেছেন। আবার বেচে বেচে খাইয়েছেন কীসব ঘাস পাতা। এখন বলছেন সেসবও আনহেলদি ছিল? ‘
ইরা’র উঁচু স্বর কানে বাজতেই জাদিদ বলতে চাওয়া কথাটুকু গিলে ফেললো। সাড়ে সাত মাসের প্রেগ্ন্যাসি অবস্থায় বন্ধুর বোনের জন্মদিনের ছোট খাট অনুষ্ঠানে যাওয়াটা অহেতুক জেদ ছাড়া আর কিছুই না। শুধু শুধু বাড়তি কষ্ট। কিন্তু ইরা কেন যে বুঝতে চাইছে না একথা!
জাদিদ কে চুপ থাকতে দেখে ইরা আরও বেশি বিরক্ত হলো। শুকনো মুখে বসে পড়লো বিছানার উপর। স্বর নামিয়ে বলে উঠলো,

‘ আজ কতদিন মাস ধরে বাসার কারো সাথে যোগাযোগ নেই আমার। আপনি আর আমার বন্ধুরা ছাড়া আমার আর কে আছে যাওয়ার জন্য? বাহিরে যাওয়াটা আমার জন্য সেফ না সেটা আমি জানি। কিন্তু.. এভাবে কতদিন বন্ধী থাকা যায়? আর ওরা তো কোনো বড় পার্টি রাখছে না। সবাই আপন মানুষ। বাসার মধ্যে হবে যা হওয়ার। ওরা থাকতে আমার কোন অসুবিধা হবে না। আপনি প্লিজ এই বেহুদা লজিক শুনাবেন না আর। আমি যখন বলেছি যাব, মানে যাবই৷ আপনি না নিয়ে গেলে সাফওয়ান নাহলে রায়ান, জিমন কেউ এসে নিয়ে যাবে৷ আমি এক্ষুনি ফোন দিচ্ছি। ‘
বলতে না বলতেই সে ডায়াল করলো একজনের নাম্বারে। জাদিদ নিরবে কেবল দেখতে লাগলো। এতগুলো মাসে এই প্রথম এত বেশি জেদ চেপে বসেছে ইরা। জাদিদ দেখার অপেক্ষায় যে তার এই জেদ কতক্ষন টিকে। ভাবনার মাঝেই কল রিসিভ হলো। শুনা গেল সাফওয়ানের কন্ঠস্বর৷ ইরা কোনো রূপ ভনিতা ছাড়াই বলে উঠলো,

‘ এক ঘন্টা পর আমাকে নিয়ে আসতে পারবি? গ্রীণ ভ্যালি যাব, তোদের কাছে। ‘
‘ আমি কেন? জাদিদ ভাই নেই? আজ তো ফ্রি থাকার কথা। ইমারজেন্সি ছিল না-কি? ‘
‘ নাহ। ফ্রি আছে। কিন্তু সে চাচ্ছে না আমি বাসার বাহিরে যায়। ‘
‘ ভাইয়া চাইছে না যখন আসার দরকার কি? ঘরেই থাক। ‘
ইরা আশাহত হলো এহেন জবাবে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল সে। দেখল, দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে জাদিদ। ইরা’র চোখে চোখ পড়তেই নাকের ডগার চশমাটা তর্জনী দ্বারা ঠেলে দিল সে। ঠোঁটের আগায় বাঁকা হাসি। ইরা’র গা জ্বলে উঠলো এই হাসি দেখে। রাগ গিয়ে পড়লো সাফওয়ানের উপর। অসন্তুষ্ট গলায় চেঁচিয়ে উঠলো সে,
‘ আমার বন্ধু হয়ে উনার সাইড টানছিস কেনো তুই? আমি যখন বলেছি যাব মানে যাবই। তুই না পারলে জিমন অথবা রায়ান নিয়ে যাবে আমাকে। ‘

‘ আশ্চর্য, ইরা! এমন হাইপার হওয়ার কি আছে এখানে? আর ভাইয়া তোর ভালোর জন্য…. ‘
‘ চুপ থাক। এই ভালোর লেকচার শুনতে শুনতে কান পঁচে গিয়েছে আমার। নিয়ে যেতে হবে না আমাকে। কোত্থাও যাচ্ছি না আমি। তোদের যখন এতই বিরক্ত লাগছে আমাকে নিয়ে যেতে, তাহলে আমি ঘরেই পড়ে থাকব। ‘
সাফওয়ান কে প্রতিউত্তর করার সুযোগ টুকু দিলনা সে। কল কাটল চট করে। জাদিদ গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। প্রেগন্যান্সির মুড সুয়িং যে কত রকমের হয় তা প্রতিনিয়ত দেখতে পারছে সে৷ পকেটে থাকা মোবাইল বেজে উঠলো তার। নাম টা দেখে রিসিভ করলো সে। ইরা কান পেতে রইল৷ উপাশের ব্যক্তির কথা শুনা না গেলেও জাদিদের কথার ধরনে সে বুঝে ফেললো যে সাফওয়ান কল দিয়েছে। ইরা’র কানে বাজলো জাদিদেদ শেষের কথাটুকু,
‘ না না, সমস্যা নেই কোনো। তোমরা থাকতে চিন্তা করবো কেনো? আমি জানাচ্ছি। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে পৌঁছে যাব। হ্যাঁ, ঠিক আছে। মনে থাকবে। ‘

ইরা’র মন পুলকিত হয়ে উঠলো। যা বুঝার বুঝে ফেলেছে সে। তবে মনের উচ্ছ্বসিত ভাবটুকু প্রকাশ করলো না সে। থম মেরে রইল আগের মতো। জাদিদ আলগোছে হেসে এগিয়ে আসলো। বেড সাইড টেবিল হতে মেডিসিন বক্স তুলে নিয়ে প্রয়োজনীয় মেডিসিন দুটো বের করে ইরা’র দিকে বলল,
‘ এগুলো ব্যাগে নিয়ে নিন। পরে ভুলে গেলে একদিনের জন্য মিস পড়ে যাবে। ‘
ইরা বিনাবাক্যে নিয়ে নিল মেডিসিন দুটো। উৎফুল্ল চিত্তে প্রশ্ন করলো,
‘ তারমানে আমরা যাচ্ছি গ্রীণ ভ্যালি? ‘
জাদিদ মাথা দুলিয়ে সায় জানাল। প্রতিউত্তর করলো নিম্ন কন্ঠে,
‘ না গিয়ে উপায় আছে? বউয়ের জেদের আমি নিরীহ প্রাণী-টা হেরে গেলাম। ‘
ইরা হেসে ফেললো। উঠে গিয়ে কাবার্ড খুলতে খুলতে জবাব দিল,
‘ অভ্যাস করে নিন। গোটা জীবন পড়ে আছে এখনো। ‘

‘ তুই ডায়েট করছিস? ‘
আয়ানের ভরাট কন্ঠস্বর। তোহা চমকে উঠলো এই প্রশ্নে। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে চোখের চশমা ঠেলল। জোরপূর্বক হেসে জবাব দিল,
‘ ডায়েট করতে যাব কেনো? আমি তো ঠিকঠাক-ই আছি। আচ্ছা, এসব ছাড়। কীসব ফালতু কথাবার্তা নিয়ে বসলি৷ চল ভেতরে, অপেক্ষা করছে সবাই। ‘
একপ্রকার তাড়াহুড়ো করে ছাদ হতে নিচে নামার জন্য উদ্যত হলো তোহা। কিন্তু সফল হলো না। এক কদম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আয়ান হাত টেনে ধরল তার। টেনে নিল নিজের দিকে। একেবারে কাছাকাছি, মুখোমুখি। আয়ানের গম্ভীর মুখাবয়ব দেখে তোহার বুক ঢিপঢিপ করে উঠলো। কিচ্ছুটি বলার ফুসরত পেল না সে। শুনা গেল আয়ানের রাশভারি কন্ঠ,

‘ অন্তত আমার সামনে মিথ্যে বলার চেষ্টা করিস না তোহা। কয়েক দিন ধরেই দেখছি তোকে। এই যে নিচে সবাই মিলে এত কিছু খেলাম, তুই সেসবের অর্ধেক-ও ছুঁয়ে দেখলি না। কেনো? ডায়েটে না থাকলে না খেয়ে থাকার কি কারণ? ‘
‘ আয়ান! আমি.. মানে আমার খিদে.. ‘
‘ খিদে ছিলনা, ইচ্ছে নেই এসব লেইম এক্সকিউজ আজকে দিবি না। সকালে লেইট হয়েছিল বলে না খেয়ে এসেছিস তুই। তাহলে খিদে লাগবে না কেনো? দুই সপ্তাহ ধরে খেয়াল করছি তোকে। এমন না খেয়ে থাকার মানে টা কি? মরার শখ জেগেছে?

তোহা নিশ্চুপ। স্থির দাঁড়িয়ে আছে নত মস্তকে। তার চুপসানো মুখখানা দুই হাতের আদলে তুলে নিল আয়ান। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই দেখল রাউন্ড ফ্রেমের চশমার আড়ালে তোহার ছোট ছোট, হরিনী টানা চোখ দুটো টলমল করছে। আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল তা দেখে। না শুনেও যেন অনেক কিছু বুঝে ফেলেছে সে। একহাত বাড়িয়ে বিনাবাক্যে সে খুলে নিল চশমাটা। ঝুলিয়ে নিল টি-শার্টের ফাঁকে। পুণরায় কাছে টেনে নিল তোহাকে। একহাতে গাল ছুঁয়ে শীতল গলায় জানতে চাইল,
‘ তোকে কি কেউ কিছু বলেছে? ‘
তোহা এবারেও জবাব দিল না কোনো। আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তোহাকে টেনে নিল বুকে। চুলে হাত বুলিয়ে বলতে লাগলো,

‘ তোর আর আমার রিলেশনশিপ এমনিতেই অনেক কমপ্লিকেটেড, তোহা। প্লিজ, নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করে আমাকে রুড হতে বাধ্য করিস না। তুই যেমন আছিস, আমার জন্য তেমনই পারফেক্ট। ‘
‘ আমার প্রথম রিলেশনশিপ-টা নিছকই একটা আবেগ ছিল শুধু। যেটা থেকে সরে আসার পর অনেক কিছুই শিখেছি, বুঝেছি। পুরোপুরি এডাল্ট না হওয়া অবধি অন্য কারো সঙ্গে কমিটেড হওয়ার ইচ্ছে ছিল না আমার৷ কিন্তু তুই! তুই আমার সব ভাবনা, কল্পনা ছাপিয়ে আমাকে জিতে নিয়েছিস, তোহা। আমি হেরে গিয়েছি তোর অনুভূতির সম্মুখে। হেরে গিয়েও জিতে নিয়েছি তোর ভালোবাসা৷ তোর অনুভূতির গভীরতা আমি জানি না। জানতেও চাইনা। কিন্তু আমি টের পাচ্ছি আমার বুকের সবটুকু অংশ ঘিরে আছিস তুই। অনেক বেশি ভালোবাসি তোকে।

আমাকে নিয়ে তোর অনেক অভিযোগ আছে সেটা আমি জানি। রিলেশনশিপে থাকা স্বত্তেও এখনো বন্ধুর মতোই আচরণ করি বেশি। অন্য সব বয়ফ্রেন্ডের মতো তোকে স্পেশাল ফিল করানোর কখনোই কিছু করিনি। কোনো গভীর স্পর্শ-ও করিনি। এজন্য তুই নিজেকে আমার অপছন্দের ভাবছিস নিশ্চয়ই। তোর মনে হতে পারে তুই আমার মন মতো না বলে আমি এসব করছি না৷ কিন্তু এটা সত্যি নয়। আমি আসলে চাচ্ছি-ই না এই সমবয়সী প্রেমে আমরা গভীর ভাবে জড়িয়ে পড়ি। কেন যেন মনে হচ্ছে আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ-ই নেই। যা আছে তা আলাদা। তুই, আমি একসঙ্গে কোথাও নেই। ‘
তোহার বুক কাঁপল এই কথায়। বিষ্ময় দৃষ্টি মেলে তাকালো সে। কাঁপল কন্ঠস্বর,

‘ ক..কী বলছিস এসব? ‘
আয়ানের দৃষ্টি মলিন হয়ে এলো তোহার চেহারা দেখে। তোহার গালে হাত রাখল সে। শান্ত স্বরে বললো,
‘ ভুল কি বলছি? সমবয়সী সম্পর্ক গুলো তো এমনই হয়। এইটি পার্সেন্ট ফেইল। ‘
‘ পজেটিভলি ও তো ভাবতে পারিস৷ বাকি টোয়েন্টি পার্সেন্টে থাকতে পারি আমরা। ‘
‘ থাকতে পারি৷ থাকবো, সেটার কি গ্যারান্টি? নাজরাত আর সায়েরীর সঙ্গে নিজেকে গুলিয়ে ফেলিস না তোহা। ওদের আর তোর ফিউচার এক না। নাজরাত অলরেডি ম্যারিড। আর কয়েক পরেই পুরোপুরি সংসারী হয়ে যাবে। সায়ুকে নিয়েও ভাবার কিছু নেই। সাফওয়ান ভাইয়ের গ্রেজুয়েশন কমপ্লিট হতে আর কয়েকটা মাস মাত্র। উনার বাবা চাচার কত বড় বিজনেস। সবটা তো তারই হবে। আর সাফওয়ান ভাইকে চিনিস না তুই? দুনিয়া উল্টে গেলেও সায়ুর সঙ্গে উনার এক হওয়াটা লিখিত। কিন্তু নিজেকে আর আমাকে দেখ। এখনো কোথায় পড়ে আছি আমরা। আমাদের ফ্যামিলি স্ট্যাটাস হলেও এক হওয়ার গ্যারান্টি কি? তুই ফ্যামিলির একটামাত্র মেয়ে। তুহিন ভাইয়া এতগুলো বছর ধৈর্য ধরবে আমার জন্য? কিংবা বলা যায়, আমাকে তার পছন্দ-ই হলো না। তখন? ‘

তোহার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গল এবারে। আয়ানের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল সে। চেঁচিয়ে উঠলো ক্রন্দনরত গলায়,
‘ এতো বেশি বুঝদার হলে কমিটেড হয়েছিস কেনো? আমি তো সরে এসেছিলাম। যেচে এসে স্বপ্ন দেখিয়ে এখন রিয়েলিটি চেক দিচ্ছিস তুই আমাকে? তখন কোথায় ছিল তোর এসব চিন্তা ভাবনা হ্যাঁ?
আয়ান সচকিত হলো। কেউ শুনে ফেললে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। সে দ্রুত হাত টেনে ধরলো তোহার। ছুটাছুটি করেও বিশেষ লাভ করতে পারলো না তোহা। ডুকরে কেঁদে উঠল সে। অসহায় কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ এসব বলিস না আয়ান। বিশ্বাস কর, আমি কখনোই ভাবতে চাইনি এমন কিছু। যে ভবিষ্যতে আমার পাশে তোকে পাবো না সেই ভবিষ্যৎ আমার চাই না। আমার ভাইয়া কিংবা পরিস্থিতির চাপে কখনো আমাকে ছেড়ে দিস না প্লিজ। তোকে ছাডা আমি মরেই যাব। ‘
তোহার চুলের ভাঁজে ঠোঁট ছোঁয়াল আয়ান। ক্ষীণ স্বরে বলে উঠলো,

‘ এমনটা হোক আমিও চাইনা। হতে দিবও না। আর কয়েকটা মাস পরেই তো ফাইনাল আমাদের। আমি ভেবে রেখেছি, ফাইনালের পর এডমিশন নিয়ে পার্ট টাইম হিসেবে ভাইয়ার অফিসে জব করবো। গ্রেজুয়েশন অবধি অপেক্ষা করিস শুধু। তোকে পাওয়ার জন্য যা যা করা দরকার সব করবো আমি। শেষ সময়ে এসে ‘এটা আগে ভাবিনি কেনো?’ এমন কোনো আফসোস যেন না থাকে সেজন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাবো। পাওয়া না পাওয়াটা ভাগ্যের উপর। কিন্তু আমরা মন থেকে চাইলে সব কিছু হাসিল করা সম্ভব। দরকার হলে তোকে পাওয়ার জন্য ভাগ্যের সঙ্গেও লড়ে যাব। কথা দিলাম। ‘

তোহা পুলকিত হলো। বক্ষ শীতল হয়ে উঠল এই প্রতিশ্রুতি শুনে। অশ্রুসিক্ত নয়নে মাথা তুলে তাকাল সে। আয়ানের প্রেমিক হৃদয়ে নিষিদ্ধ কিছু ভাসনা টগবগিয়ে উঠল তোহার সুশ্রী মুখশ্রী এতটা কাছ থেকে দেখে। সিক্ত, গোলাপি অধর জোড়া এমন কাছাকাছি পেয়ে নিশপিশ শুরু হলো সর্বত্রে। আজ অবধি ওই লোভাতুর ওষ্ঠদ্বয়ের ছোঁয়া পায়নি সে। নিজেকে দমিয়ে রেখেছিল বুকে পাথর চেপে। কিন্তু আজ কি যেন হলো। এত এত ভাষণ দেওয়ার পরমুহূর্তেই যেন ভুলে গেল নিজের বানানো সকল নির্দেশনামা। আশকারা দিল আবেগ-কে। চোখের পলকে মাথা নুইয়ে গভীর ভাবে তার পুরু ওষ্ঠদ্বয় ডুব দিল তোহার কোমল ওষ্ঠে। আকস্মিক এই আক্রমণে দৃশ্যমান রূপে কেঁপে উঠল তোহা। খিচে ফেললো চক্ষুদ্বয়। সর্বশক্তি দিয়ে খামচে ধরল আয়ানের কলার দুটো। দশ কিংবা পনেরো সেকেন্ড সময় অতিবাহিত হয়েছে মাত্র। তাতেই নিজেকে টেনেটুনে সরিয়ে নিল আয়ান। একত্রে জোড়ালো শ্বাস ফেলল দুজন। তোহার হতভম্ব মুখশ্রী দেখে অগোচরে ঢোক গিলল আয়ান। হন্তদন্ত গলায় বলে উঠলো,

‘ স্যরি, সো স্যরি তোহা। এই প্রথম, এই শেষ। তোর অনুমতি ছাড়া আর কক্ষনো এমন হবে না। ‘
তোহা লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে আছে। সে ঘূর্ণাক্ষরেও ভাবেনি এই মুহুর্তে এমন কিছু ঘটবে। কিন্তু আয়ানের সম্মুখে নিজের লজ্জাটুকু ঢেকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালালো সে৷ এদিক সেদিক দৃষ্টি ফেলে গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
‘ বড় বড় কথা বলে এখন পারমিশন ছাড়া চুমু খাচ্ছিস! আরেকবার এমন করলে খবর করে ছাড়ব একদম। পারমিশনের কথা তো ভুলেই যা। যতদিন না বিয়ে করে ঘরে তুলতে পারছিস ততদিন অবধি কোনো কিছুর পারমিশন পাবি না। ‘

আয়ান নিজ অধর কামড়ে বাঁকা হাসল। তোহার কোমর জড়িয়ে গালে ঠোঁট ছুয়ে রেখে প্রতিউত্তর করলো,
‘ সে তো কথার কথা বলেছি। এত পারমিশনের ধার ধারছে কে? অবাধ্য প্রেমিক হওয়ার প্রসেসিং-ও জানা আছে আমার। ‘
বিষ্ময়ে বিমূঢ় হয়ে থাকা তোহা প্রতিউত্তর করার সুযোগ টুকু পেল না। এমন এক অসময়ে আচানক ছাদে পা পড়ল দুই চঞ্চল সত্তার। তাদের পদচারণের শব্দে ছিটকে সরে গেল আয়ান-তোহা। হাঁসফাঁস করে উঠলো বিব্রত হয়ে। অন্যদিকে সায়েরী এবং নুহাশ এমন এক বিব্রতকর মুহুর্তের স্বাক্ষী হয়ে নিজেরা-ও বিষ্ময়ে হতভম্ব। একপলক তাকিয়েই উল্টো ঘুরে গেল দুজন। নুহাশ মাথা চুলকে ধুপধাপ পা ফেললো সিড়ি পথে। শুনা গেল তার বিদ্রুপ কন্ঠ,
‘ জ্বালারে জ্বালা! বা*লের পিরিতি। চিপকা চিপকি করার আর জায়গা পাইল না? ঘুরাইয়া ফিরাইয়া আমি বা*লের সামনেই পড়তেই হলো। ফুটা নসিব! ‘

লিভিং রুমের উচ্ছ্বাসিত কোলাহল এক পলকে নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেল। নীতি,রায়ান এবং জিমন মাত্রই প্রবেশ করেছে। ঘরে পা ফেলতে না ফেলতেই সাফওয়ানের এক গর্জনে কেঁপে উঠল তারা। দেখল, সাফওয়ানের সম্মুখে জুবুথুবু হয়ে থাকা সায়েরীকে। নীতি দ্রুত পায়ে এগোল। বাহু জড়িয়ে ধরল সায়েরীর। উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
‘ কি হয়েছে? বকছিস কেনো এভাবে? ‘

সাফওয়ানের সুডৌল বক্ষপট উঠানামা করছে এক একটা শ্বাস প্রশ্বাসে। চোয়াল কঠোর হয়ে আছে। নীতির প্রশ্ন-টা কানে গেলেও তার কঠোর দৃষ্টি সায়েরীতে নিবদ্ধ। চোখ দুটোতে উপচে পড়া ক্রোধের অগোচরে একছত্র ভয় লুকিয়ে রয়েছে। যার দরুন শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত চলছে তার। দাঁতে দাঁত পিষল সে। নীতির পাশে দন্ডায়মান স্টিলের মই-টা বা হাতে ধরে এক আছাড় মারল ফ্লোরে। ভারী আওয়াজে কেঁপে উঠল সকলে। সায়েরীর বন্ধুমহলের অবস্থা নাজেহাল। ভয়ে কপালে ঘাম দিয়ে গেল তাদের। সাফওয়ান ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল তাদের দিকে। বাদামি চোখজোড়ার কঠোরতা টের পেয়ে দৃষ্টি নামিয়ে ফেললো তারা। সাফ্রিন মুখ খুলল ভয় ভয় কন্ঠে,

‘ স..স্যরি ভাই! আমরা খেয়াল করিনি সায়ু… ‘
‘ খেয়াল করার জন্য সেই ধ্যানে ছিলে তোমরা? জানো না ফ্লোরের উপর মই-টা স্লিপ করে? তাহলে কেউ সেটা ধরো নি কেন? [আয়ান-নুহাশের দিকে তাকিয়ে] আর তোমরা দুজন থাকতে ওকে কেন এসব করতে হচ্ছে? এত উঁচু যায়গায় নাগাল পাওয়ার মতো মেয়ে ও? ‘
আয়ান এবং নুহাশ প্রতিউত্তর করার ভাষা পেল না কোনো। তাদের বকছে দেখে সায়েরী ঢিপঢিপ বুকে ক্ষীণ স্বরে বলে উঠলো,

‘ ওদের কোনো দোষ নেই। আমি-ই বলেছিলা… ‘
সাফওয়ান তাকাতেই কন্ঠ মিলিয়ে গেল সায়েরীর। সাহস হলো না বাকি কথাটুকু বলার। দৃষ্টি নামিয়ে রাখল সে। তার কপালের ডান পাশের লালছে ফুলো স্থানটা পরখ করে সাফওয়ানের হাত মুষ্টিবদ্ধ হলো। সে উঁচু গলায় শিউলিকে আদেশ দিল আইস ব্যাগ নিয়ে আসার জন্য। বলতে না বলতেই আইস ব্যাগ নিয়ে হাজির হলো শিউলি। নীতি নিয়ে নিল সেটা। সায়েরীকে বসতে বললো সোফায়। কিন্তু সে বসলো না। কারো ধার ধারল না। সোজা উঠে গেল সিড়ি বেয়ে। তার স্পর্ধা দেখে বন্ধুমহলের আক্কেলগুড়ুম অবস্থা। সাফওয়ানের এই মাত্রাতিরিক্ত রাগের মুখেও সায়েরী কি করে পারল তাকে উপেক্ষা করতে? হতভম্ব নাজরাত নিজেকে সামলে দ্রুত উঠে দাঁড়ালো। নীতির হাত থেকে আইস ব্যাগটা নিয়ে ‘আমি দেখছি’ বলেই সায়েরীর পিছু নিল সে। পরপর একই পথ অনুসরণ করল তোহা, সাফ্রিন। সাফওয়ান চুপচাপ। একই ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে সে। সায়েরীর এই উপেক্ষা তাকে বিশেষ আশ্চর্য করতে পারেনি। কারণ অন্য কেউ না জানলেও তার বেশ ভালো করে জানা আছে যে সায়েরী নামক রমনীর ঢের সাহস আছে সাফওয়ান তেহজিব খান’কে উপেক্ষা করার। যেখানে সাফওয়ানের রাগের বিপরীতে সায়েরীকে হওয়া দরকার ছিল শান্ত দীঘির জলের মতো। সেখানে মেয়েটা হলো একই রকমের জেদি। সাফওয়ানকে নাকানিচুবানি না খাওয়ানো অবধি যেই জেদের অন্ত হয়না।

সাফওয়ানের বরাদ্দকৃত রুমটাতে এসে ঠাঁই জমিয়েছে সায়েরী। দুই পা তুলে বসেছে বিছানার মধ্যিখানে। তীব্র অভিমানী দুই চোখ ছাপিয়ে অশ্রু ঝরছে তার। যখনই ভাবে সব ঠিকঠাক চলছে। ঠিক সেই মুহুর্তে তার ছোট্ট হৃদয়ে আঘাত করে বসে সাফওয়ান ভাই। ছোট্ট একটা এক্সিডেন্ট-ই তো হওয়ার ছিল। সে তো বেঁচে গিয়েছে। তবুও কেনো সবার সামনে অমন রাগ ঝেরেছে সাফওয়ান? সকলের সামনে সায়েরীর উপর এমন আগ্রাসী হওয়াটা কি খুব প্রয়োজন ছিল!

‘ সায়ু? আশ্চর্য মেয়ে তুই! এভাবে চলে আসলি কেনো? ‘
উদ্বিগ্ন কন্ঠে কথাগুলো বলতে বলতে কাছে এগিয়ে আসলো নাজরাত। সায়েরীর মুখ ঘুরাল নিজের দিকে।
‘ দেখি এদিকে তাকা। কতটা ফুলে গিয়েছে! বরফ লাগালে ব্যথা কমবে। এদিকে আয়, আমি লাগিয়ে দিচ্ছি। ‘
সায়েরী অনাগ্রহী ভাবে হাত সরিয়ে দিল তার।
‘ লাগবে না। ঠিক আছি আমি। ‘
সায়েরীর পেছনে আসন পেতে বসা তোহা ফুঁসে উঠলো,
‘ লাগবে না কেনো? তোর জন্য বেহুদা আমরা ধমক শুনলাম বেয়াদব। এখন যদি ভাইয়া দেখে এখনো এভাবেই আছিস তাহলে আমাদের আর প্রাণ নিয়ে ফিরতে হবে না। এখানেই শেষ হয়ে যাব। ‘
‘ আমার দোষ টা কোথায়? আমি জানতাম নাকি যে মই-টা স্লিপ করবে? আর নুহাশকে তো বলেছিলাম ধরার জন্য। কোন ফাঁকে ছেড়ে দিয়েছে টেরই পাইনি। সামান্য একটা ইন্সিডেন্ট কে চিল্লাপাল্লা করে এত বড় করল। কি এমন হয়েছিল? ‘

উপস্থিত তিন রমনী আশ্চর্য হলো সায়েরীর কথা শুনে। নাজরাত চাটি মারল সায়েরীর মাথায়। কপালে আইস ব্যাগ চেপে ধরে বলে উঠলো,
‘ সামান্য ইন্সিডেন্ট? তুই দেখেছিলি নিজের অবস্থান? প্রায় তিন ফুট উপরে দাঁড়ি ছিলি তুই। আর নিচেই কাঁচের টি-টেবিল টা ছিল। যেই মুহুর্তে স্লিপ করলো তোর চিৎকার শুনে কোনো রকমে তোকে ধরেছি আমি। নাহলে মাথাটা চার ভাগ হয়ে যেত নিশ্চিত। তবুও শেষ রক্ষা হলো কই? ঠিকই মইয়ের উপর মুখ থুবড়ে পড়লি। আর এদিকে সাফওয়ান ভাই-ও দেখে ফেললো। কি একটা ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেলি। ভাইয়ার রাগ হওয়াটা তো স্বাভাবিক। আমাদের-ই বুক কেঁপে উঠেছিল তোকে পড়ে যেতে দেখে। ‘

সায়েরী চুপ মেরে গেল এবারে। তোহা ঘুরে ঘুরে দেখছে রুমটা। খাট, কাবার্ড এবং ছোট্ট একটি ড্রেসিং ব্যতিত অন্য কিছু নেই রুমটাতে। ড্রেসিং টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখা গুটিকয়েক জিনিসগুলো ছুঁয়ে দেখল তোহা। বিশেষ কিছু ভাবনায় আসলো না তার। কিন্তু অনাগ্রহী ভঙ্গিতে ড্রয়ার খুলে ভেতরে দৃষ্টি পড়া মাত্র থমকাল সে। সায়েরীর নাম খচিত নোট খাতা ভেতরে। সঙ্গে কলম, রাবার ব্যান্ড, ইরেজার। এবং পাশেই এক প্যাকেট ভর্তি একাধিক পাঞ্চ ক্লিপ। তোহা ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। একই ডিজাইনের পাঞ্চ ক্লিপ বর্তমানে সায়েরীর মাথায়। তোহার মস্তিষ্কে সন্দেহ জমে উঠল। সে তুলে নিল জিনিসগুলো। একত্রে নিয়ে বিছানায়, সায়েরীর সম্মুখে গিয়ে শব্দ করে ছুড়ে ফেললো। কোমরে হাত ঠেকিয়ে, চোখ পাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
‘ এসব কি সায়ু? তোর জিনিসপত্র এখানে
কেনো? ‘

সায়েরী চমকে উঠলো সেসব দেখে। বাকি দুজন কৌতুহলী নজরে তাকিয়ে। সায়েরীর ইচ্ছে করলো শিউলির মাথা ফাটাতে। মেয়েটা তাকে বলেছিল সে সব জিনিসপত্র লুকিয়ে ফেলেছে। এই তার লুকানোর নমুনা? এবার সে কি জবাব দিবে নিজের যাসুস বান্ধবীদের কে?
নোটস টা হাতে তুলে নিল সাফ্রিন৷ পাতা উল্টে পাল্টে দেখে আশ্চর্য কন্ঠে শুধালো,
‘ এসব তো ভাইয়ের হ্যান্ড রাইটিং। এগুলো তোর খাতায় কেনো? ‘
সায়েরী ঢোক গিলে একের পর এক। কি জবাব দিবে তা ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে উঠলো সে। কিন্তু এমন চালাক চতুর বান্ধবীদের কাছ থেকে কতক্ষণ-ই বা লুকিয়ে রাখা যায়? তোহা সন্দিহান কন্ঠে ফের প্রশ্ন ছুড়ল,
‘ তুই আগেও এখানে এসেছিলি? ‘
খাতাটা আগাগোড়া চেক করে সাফ্রিন বলে উঠলো,
‘ ভুল প্রশ্ন। জিজ্ঞেস করে এখানে নিয়মিত আসে কি-না? ‘
‘ আশ্চর্য কথাবার্তা। ও এখানে এসে করবে টা কি? ‘ নাজরাত বলে উঠলো অবুঝ সুরে।
কিন্তু বাকি দুজন গম্ভীর চোখে তাকিয়ে আছে। সায়েরী কাঁদো কাঁদো মুখে দৃষ্টি মিলাল তাদের সঙ্গে। মিনমিন কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ তোরা এমন করে তাকাস না প্লিজ। আমি বলছি। আসলে… ‘
তোহা মেকি রাগ দেখিয়ে সায়েরীকে এক ধাক্কায় বিছানায় শুইয়ে দিল। নিজে তার উপর চড়াও হয়ে বলে উঠলো,
‘ এবার যদি মিথ্যা বলিস তাহলে কপালের আরেক পাশেও সুপারি তুলে দিব সায়ুর বাচ্চা। সত্যি করে বল কাহিনি কি? ‘

তোহার দুই পাশে সাফ্রিন এবং নাজরাত। আত্মরক্ষার জন্য আড়াআড়ি ভাবে হাত দিয়ে নিজেকে ঢেকে ফেললো সায়েরী। ভেবেছিল কোনো রকমে চেপে যাবে কথাগুলো। কিন্তু তিন বান্ধবীর মুখ দেখে সুবিধাজনক বলে মনে হলো না তার। অগত্যা সে বলে দিল রোজ সকালে গ্রীণ ভ্যালি আসার সত্যিটা। তিন বান্ধবী চরম আশ্চর্য হলো। তোহা চট করে বলে উঠলো,
‘ মানে রোজ রোজ তোরা এখানে.. একসঙ্গে.. ‘
তোহার আটকানো কন্ঠের অর্থটুকু যেন বুঝে ফেললো সায়েরী। সে ধুম করে এক কিল বসালো তোহার বাহুতে।
‘ এখানে একসঙ্গে কি অসভ্য? এখানে ওখানে কিচ্ছু না। লিভিংরুমে চেয়ারে বসে পড়াশোনা ছাড়া অন্য কিছুই না। শিউলি থাকে ঘরে। উল্টো পাল্টা চিন্তা বাদ দে। ‘

‘ কিছু না? ‘
‘ একদম না। ‘
‘ কিন্তু আমার মন তো বলছে অনেএএক কিছু। ‘
‘ অসভ্য! মনটাকে বের করে গঙ্গা জল দিয়ে ধুয়ে নে। ‘
তোহা কানে নিল না সেকথা। সায়েরী উঠে বসতে চাইল। কিন্তু পারলো না। পূর্বেই তোহা বখাটে ছেলেদের মতো বাকা হাসি ঝুলিয়ে সায়েরীর পাশে শুয়ে তার উপর ঝুঁকে আসলো। কন্ঠে খাদ নামিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
‘ সত্যি করে বলোতো জান, টোটাল কতটা চুমু খেয়েছে? ‘
‘ তোহা!! ‘ লজ্জায় কান গরম হয়ে উঠলো সায়েরীর।

সাফ্রিন নিজেও লজ্জা পেল খানিকটা। তার যে আপন বড় ভাই হয়। এদিকে নাজরাত না চাইতেও ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হেসে ফেললো। তোহা নির্বিকার। একই ভঙ্গিতে সে ফের বলে উঠলো,
‘ আমার নামে চেঁচিয়ে উঠলে সত্য মিথ্যে হয়ে যাবে নাকি? ফটাফট জবাব দে। নাকি কাউন্ট করতে কষ্ট হচ্ছে? ‘
‘ থাপ্পড় খাবি আবার? বলেছি না এমন কিছুই হয়নি? ‘
‘ কি বলিস? আসলেই… ‘ তোহা চরম আশ্চর্য।
সায়েরী মাথা দোলাল লজ্জা মুখে। তোহা আশাহত হলো। বিরক্ত সূচক শব্দ তুলে উঠে বসল শোয়া থেকে। সাফ্রিনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,

‘ তোর ভাই গুলা কি রে? একজন হানিমুন সেরে ফেলেও বাসর সারতে পারলো না। আরেকজন এতগুলো মাসেও একটা চুমু খেতে পারলো না। এদের বোধহয় কোন গোপন সমস্যা টমস্যা আছে। কলিকাতা হারবাল অর্ডার দে বুঝছস? নাহলে আমার এই মাসুম দুই বান্ধবীর ভবিষ্যৎ অন্ধকার.. ‘
উপস্থিত তিন রমনীর কান গরম হয়ে উঠলো তোহার বেফাঁস কথায়। তিন জন একই সঙ্গে ধুমধাম চড় লাগালো তোহার বাহুতে,পিঠে। নাজরাত ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ তোর আয়ান বোধহয় মহাপুরুষ? তাহলে তুই-ই বলে দে কতবার চুমু খেয়েছে। ‘
আচমকা এই প্রশ্নে তোহার মনে পড়ে গেল ঘন্টা খানিক আগের মুহুর্ত টা। সঙ্গে সঙ্গে লাজে রাঙ্গা হয়ে উঠলো সে। যা স্পষ্ট চোখে পড়ল বাকি তিন বান্ধবীর। সাফ্রিন অবাক কন্ঠে শুধালো,
‘ ও মাই গড! মানে সত্যি সত্যিই আয়ান এই কাজ করেছে? ‘
একই সঙ্গে তাল মিলাল নাজরাত। বললো,
‘ আমাদের ভদ্র, সভ্য বন্ধু-টা তবে তলে তলে এতদূর? ‘
তোহা বাঁকা চোখে তাকালো। নিজের লজ্জাটুকু গিলে নিয়ে নাজরাতকে খোচা মেরে বলে উঠলো,
‘ তাতে কি? তুই যে ঘাড়ে, গলায় লাভ বাইট নিয়ে ঘুরে বেড়াস। আমি কি কিছু বলেছি? ‘
মুহুর্তেই নাজরাতের চেহারার রঙ উবে গেল। সে অপ্রস্তুত হয়ে দ্রুত হাতে কামিজের গলা টানল। ওড়না টেনেটুনে নিজেকে আরও ভালো ভাবে ঢেকে ফেললো। তার এই প্রতিক্রিয়ায় হঠাৎ-ই উচ্চ স্বরে হেসে উঠল সায়েরী, তোহা এবং সাফ্রিন।

জাদিদ এবং ইরা এসেছে অল্প কিছুক্ষণ হলো। থমথমে পরিবেশ পুণরায় জমে উঠেছে। আড্ডা অব্যাহত রেখেই নীতি সহ তিন বান্ধবী মিলে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দিল সাফ্রিনকে। পার্টির থিমের সঙ্গে মিল রেখে একটি গোল্ডেন এবং রেড কম্বিনেশনের ড্রেস পরেছে সাফ্রিন। তার ফর্সা ত্বক জ্বলজ্বল করছে ড্রেসের মধ্যে। হাফ কার্ল করানো চুলগুলো মাঝে সিথি করে ছড়িয়ে রেখেছে পিঠময়। মাঝে খুবই ছোট্ট একটা ক্রাউন। হাফ নেক ডিজাইনের ড্রেসটার মধ্যিখানে দুধ ফর্সা গলায় জ্বলজ্বল করছে একটি রেড স্টোন খচিত পেন্ডেন্ট। একই ডিজাইনের ছোট্ট একজোড়া টপ কানে। আহামরি কোনো সাজসজ্জা নেই। কেবল মাশকারার ঘন প্রলেপ লেপ্টানো দুই চোখ, কৃত্রিম লালছে আভা ছড়ানো গাল এবং ওয়াইন কালারের ম্যাট লিপস্টিক লাগানো ঠোঁট।

এটুকুতেই চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের অধিকারী হয়ে উঠেছে মেয়েটা। সিড়ি বেয়ে যখন নামছিল তখন নিচে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি কিছু মুহুর্তের জন্য থমকাল তাকে দেখে। সাফওয়ানের কাছাকাছি এসে দাঁড়াতেই সাফওয়ান মৃদু হেসে মাথায় হাত রাখল তার। শব্দ না হলেও সাফ্রিন স্পষ্ট বুঝলো ভাইয়ের মুখে প্রশংসা সরূপ ‘ মাশা আল্লাহ ‘ শব্দটি। এতেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলো সে। সবার আগে সাফওয়ানকে নিজের সঙ্গে টেনে নিয়ে ফটোশুট করলো বেশ কয়েকটা। জিমন নিজের ক্যামেরায় তুলছে সব। সাফওয়ানের পালা শেষ হওয়া মাত্র সে এগিয়ে এসে জিমনের কাছ থেকে ক্যামেরা নিয়ে নিল। দেখ গেল পরবর্তী প্রায় দীর্ঘ তিন ঘন্টা সে দাঁড়িয়ে বোনের আবদার মতো ক্যামেরা বন্ধি করেছে মুহুর্ত গুলো। সাফ্রিনের একার ছবিগুলো তুলেছে সবচেয়ে বেশি যত্ন করে, সময় নিয়ে। এতঘন্টা একটানা দাঁড়িয়ে থেকেও কিঞ্চিৎ বিরক্ত ভাব দেখা গেল না তার মাঝে।

সোফায় বসে এক ধ্যানে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে ছিল সায়েরী। সাফওয়ান তখন সামান্তার ছবি তুলছে, হাসছে। সায়েরী মুগ্ধ হয়ে দেখছিল সেই দৃশ্য। আচমকা ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল সাফওয়ান। সরাসরি দৃষ্টি তাক করলো সায়েরীর চোখে। যেন সে জানত, সায়েরী তার দিকেই তাকিয়ে। আচানক এই দৃষ্টি মিলনে হকচকিয়ে গেল সায়েরী। দৃষ্টি সরিয়ে নিল সে। উঠে চলে গেল কিচেনের দিকে। সাফওয়ান ভ্রঁ চুলকে পুণরায় ক্যামেরায় তাকাল। কিন্তু মন পড়ে আছে অন্য দিকে। বিগত কয়েক ঘন্টা যাবত সে ছুতো খুঁজছে সায়েরীর জন্য কথা বলার জন্য। অথচ মেয়েটা ফিরেও তাকাচ্ছে না। সাফওয়ানের ইঙ্গিত বুঝেও এড়িয়ে যাচ্ছে। এসবের আদৌও কোনো মানে আছে?

ছাদের রিলিংয়ের দিকে জুলুজুলু নজরে তাকিয়ে আছে সায়েরী। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। যা দেখছে সব জোড়া জোড়া। মস্তিষ্ক কেমন খেই হারাচ্ছে। শরীর দুলছে তার। হেলেদুলে গিয়ে সে রেলিঙের সম্মুখে রাখা বড়সড় লোহার দোলনাটার উপর দাঁড়িয়ে পড়লো। পাশেই রেলিং। অনাসয়ে দাঁড়িয়ে পড়া যাবে। সায়েরী এক পা উটিয়েছে কি উঠাইনি। এমন মুহুর্তে হন্তদন্ত পায়ে ছুটে আসলো সাফওয়ান। হাঁটুতে ভর দিয়ে বেশ কয়েকবার বড় বড় শ্বাস ফেললো সে। অতঃপর সম্মুখে দৃষ্টি পড়তেই থমকাল। উচ্চ কন্ঠে চেঁচাল,
‘ সুবহা! নো, নো। ডোন্ট ডু দিস… ‘

সায়েরী কপাল কুঁচকে তাকায়। উচ্চ কন্ঠের ডাকটি তার কানে বাজে। কয়েক ঘন্টা আগেও এমন করেই চেঁচিয়েছিল সাফওয়ান। ব্যাপারটা মনে পড়তেই ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে দিল সায়েরী। সাফওয়ান ভড়কে গেল। কান্নার কোনো হেতু খুঁজে পেল না সে। তাকে এগিয়ে আসতে দেখে সায়েরী আরও শব্দ বাড়ালো। ক্রন্দনরত অবস্থায় হাতে ধরে রাখা ক্যানের খালি বোতলটা সে ছুড়ে মারল সাফওয়ানের দিকে। কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ আবারও বকতে এসেছেন? আপনি এত খারাপ কেনো? সবসময় শুধু চেঁচান কেনো? একটুও আদর করেন না কেনো? ‘
খালি ক্যানের বোতলটার দিকে তাকিয়ে রাগে, দুঃখে সাফওয়ানের ইচ্ছে করলো নিজের চুল নিজেই ছিড়তে। সায়েরীর দিকে তাকিয়ে সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো,

‘ দিনরাত আমার মাথা খেয়েও সাধ মিটেনি যে এখন বিয়ার খাওয়া শুরু করেছ? ‘
সায়েরী বুঝল না সেকথার অর্থ। বুঝার মতো অবস্থাতে নেই সে। সাফওয়ান কথা বাড়াতে চাইল না। নিজেকে সামলে সে শান্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ সুবহা! নেমে আসো। দোলনাটা নড়লেই কিন্তু পরে যাবে তু.. ‘
সাফওয়ানকে এগিয়ে আসতে দেখে সায়েরী দূরে সরার তাগিদে রেলিংয়ের দিকে উঠে যেতে চাইল। চেঁচাল বেশ শব্দ করে,

‘ একদম কাছে আসবেন না। কাছে এসে আবার ধমক দিবেন। আমি সব জানি। ‘
তাকে এমন হাইপার হতে দেখে সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল সাফওয়ান। দুই হাত উঁচু করলো স্যারেন্ডার করার ভঙ্গিতে। দ্রুত গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ আসছি না, আসছি না কাছে। কোথাও যেতে হবে না তোমাকে। ওখানেই থাকো। আমি এগোচ্ছি না। তুমি নেমে এসো। আমি বকবো না। নেমে এসো তুমি.. ‘
সায়েরী সেসব বিশ্বাস করতে নারাজ। কাঁদো কাঁদো মুখে সে ফের বলে উঠলো,
‘ মিথ্যে কথা। আগেও অনেক বার বলেছেন এসব। আর আজকে আবারও ধমক দিয়েছেন সবার সামনে। স্যরিও বলেন নি। আপনাকে আমি বিশ্বাস করি না। ‘
সায়েরীর এমন মনোভাবের সম্মুখে সাফওয়ান কে দেখাল অসহায়। মেয়েটা এমন ভাবে দাঁড়িয়েছে সে একটু এদিক সেদিক হলেই বাজেভাবে কোমর ভাঙ্গবে। সাফওয়ান সেই ভয়ে এগোচ্ছে না। উপায়ান্তর না পেয়ে প্রেয়সীর সম্মুখে পরাজিত সৈনিকের ন্যায় হার মেনে নিল সে। অসহায় কন্ঠে শুধালো,
‘ স্যরি,সুবহা! ভুল হয়ে গেছে। বকবো না আর। এবার তো নামো। এখান থেকে পড়লে খুব ব্যথা পাবে জান। কেনো বুঝতে চাইছ না? ‘

সায়েরী জুলুজুলু নজরে তাকিয়ে ছিল। ‘জান’ সম্বোধন টা কর্ণধার হতেই মাথা নুইয়ে ফেলল সে। সাফওয়ান কপাল চাপড়াল এই অযাচিত লজ্জা দেখে। মানে জাতে মাতাল কিন্তু তালে ঠিক। এদিকে পুল সাইডে আসর পেতে আড্ডায় মশগুল ছিল বাকিরা। আচমকা জাদিদের নজর গেল ছাদের দিকে। দূর থেকে সায়েরীকে চিনতে ভুল হলো না তার। সে আশ্চর্য কন্ঠে শুধালো,

‘ সায়েরী রেলিঙের উপর এমন হয়ে বসে আছে কেনো? পড়লে তো কোমর শেষ। ‘
সকলে মাথা তুলে তাকাল। অন্য এক পাশ হতে নুহাশ চেঁচিয়ে ডাকল সায়েরীকে। যা শুনতে পেয়ে উৎসুক নজরে তাকাল সায়েরী। এই সুযোগ টুকু কাজে লাগিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে চট করে সায়েরীর হাত টেনে তাকিয়ে নামিয়ে আনল সাফওয়ান। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ধমকে উঠলো,
‘ আমাকে অশান্তিতে না রাখলে তোমার দিন শেষ হয়না? রাগের মাথায় যা তা খেয়ে ফেলেছ গর্দভ মেয়ে। এত বাজে টেস্ট পেয়েও কীভাবে খেলে? ইচ্ছে তো করছে মাথায় তুলে আছাড় মারতে। ইডিয়ট! ‘
আবার! আবারও বকবে না বলে কাছে টেনে নিয়ে বকে যাচ্ছে। সায়েরী পুণরায় ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে উঠল। সাফওয়ান এবারে কানে নিলনা সেসব।
দোলনার উপর হতে সায়েরীর স্লিপার জোড়া একহাতে তুলে নিয়ে চট করে করে কাঁধে তুলে নিল সায়েরীকে। উল্টো ঝুলে গেল সায়েরী। ভড়কে গেল এক মুহুর্তের জন্য। কি হয়েছে বুঝতে পেরে সে নাজুক হাতে ধুমধাম কিল বসালো সাফওয়ানের পিঠ জুড়ে। জড়িয়ে আসা কন্ঠে অভিযোগ তুলল,
‘ আপনি এত আন-রোমান্টিক কেনো? কীভাবে গার্লফ্রেন্ড কে কোলে নিতে হয় সেটাও জানেন না কেনো? এমন গুন্ডাদের মতো করে কাঁধে তুলেছেন কেনো… ‘

কন্ঠ জড়িয়ে আসলো সায়েরীর। সাফওয়ান তার কথাগুলো শুনেও বিশেষ মনযোগ দিলনা। প্রবেশ করলো সায়েরীর কামরায়। পূর্বেই নজরে আসল ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা লেবু পানির গ্লাসটা। ছাদে উঠার পূর্বে সে শিউলি কে বলেছিল যেন কড়া করে লেবু পানি বানিয়ে সায়েরীর রুমে রাখে। সায়েরীকে বিছানায় বসিয়ে গ্লাসটা তুলে নিল সাফওয়ান। জোরপূর্বক সায়েরীর মুখে তুলে দিল। অতিমাত্রায় টক লাগতেই মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইল সায়েরী। কিন্তু সাফওয়ান জোরপূর্বক গ্লাসের সবটুকু তরল পেটে চালান করে দিল তার। সঙ্গে সঙ্গে গা গুলিয়ে আসল সায়েরীর। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সাফওয়ান চট করে কোলে তুলে নিল তাকে। ওয়াশ রুমের সিংকে পরপরই দুইবার বমি করে যা খেয়েছে সবটা উগলে দিল সায়েরী। শরীর টা একেবারে নেতিয়ে গেল তার। সাফওয়ান তার চোখে মুখে পানি ঢেলে দিল। কুলকুচি করাল একাধিক বার। সায়েরীকে এমন শরীর ছেড়ে দিতে দেখে নিজের বুকের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখল তাকে। রুমে আসার জন্য পুণরায় সায়েরীকে কোলে তুলে মাত্র দুই হাতে সাফওয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল সায়েরী। ক্লান্ত গলায় বলে উঠলো,

‘ আপনি এসব কি খাইয়েছেন আমাকে? ‘
সাফওয়ান প্রতিউত্তর করলো না। সায়েরী ফের বলে উঠলো,
‘ আমিও খাওয়াব আপনাকে। কলিকাতা হারবাল। ‘
বিছানার সম্মুখে এসে আচমকা পদযুগল থমকে গেল সাফওয়ানের। কি বলল এইমাত্র মেয়টা? কেনো বললো একথা?
‘ কি? কি খাওয়াবে? ‘
‘ কলিকাতা হারবাল। ‘
‘ কেনো? ‘
‘ তোহা বলেছে তাই। ‘
সাফওয়ানের চোয়াল শক্ত হলো। গম্ভীর কন্ঠে শুধালো, ‘ কেনো বলেছে? ‘
‘ আমাকে চুমু দেননি তাই। ‘ সায়েরীর অকপট স্বীকারোক্তি।

সাফওয়ানের কান গরম হয়ে উঠল এই উত্তরে৷ সেই সঙ্গে কপালের রগ ফুলে উঠলো। সায়েরীর পিঠ জড়িয়ে রাখা হাতের বাঁধন কঠোর করলো সে। রাশভারি কন্ঠে শুধালো,
‘ আমাদের পারসোনাল ম্যাটার তুমি কোন আক্কেলে ফ্রেন্ডদের সঙ্গে শেয়ার করেছ? আর কি কি বলেছ হ্যাঁ? তাকাও এদিকে। আন্সার মি সুবহা! কি কি বলেছ ওদেরকে? ‘
সায়েরী বাধ্য হয়ে মাথা তুলল। ঠোঁট উল্টে জবাব দিল,
‘ আর কি করেছেন যে বলবো? কিছুই তো করেননি। এত নিরামিষ কেনো আপনি? ‘
সাফওয়ান নিরব চোখে তাকিয়ে থাকে। অন্য সময় লাজে রাঙ্গা হয়ে থাকা মেয়েটা কি সাবলীলভাবে একের পর এক বেফাঁস কথাবার্তা বলে চলেছে!

‘ একটাবার হুশে আসো শুধু। তারপর বুঝাপড়া হবে এসব নিয়ে। ‘
কথার তালে উঠানামা করা সাফওয়ানের পুরুষালী অ্যাডমস অ্যাপল-টা নজর কাড়ল সায়েরীর। সে বেহুশে মুখ বাড়াল সেদিকে। চোখ বুজে আচমকা নিজের কোমল ওষ্ঠদ্বয় ডুবিয়ে আবেশে চুমু খেল উঁচু হাড়টাতে। আকস্মিক এই অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে সাফওয়ানের দেহ ঝংকার দিয়ে গেল। সায়েরীকে আগলে রাখা হাত জোড়া জোর হারাতে চাইল। আবেশে বুঝে আসলো চক্ষুদ্বয়। শ্বাস আটকে গেল প্রেয়সীর পরবর্তী পদক্ষেপে। মেয়েটা দুইহাতে তার গলা জড়িয়ে সম্পূর্ণ নাক,মুখ,ঠোঁট ডুবিয়ে রেখেছে কন্ঠনালীর মাঝে। পূর্বে যেমন করে সাফওয়ান নাক ঘষে সায়েরীর দেহের সবটুকু সুভাস নিজের মাঝে টেনে নেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। ঠিক একই রকম ভাবে আজ সায়েরী, সাফওয়ানের কণ্ঠনালীতে নাক ঘষল। জেন্টস পারফিউমের কড়া সুঘ্রাণ টুকু টেনে নিতে চাইল নিজের মধ্যে। তুলতুলে অধর জোড়া কন্ঠনালীতে ছুঁয়ে রাখা অবস্থাতেই সে স্বগতোক্তি করলো,

‘ উমমহ!! আপনার ঘ্রাণ! এটা..এটা খেয়ে ফেলা যায় না কেনো? ‘
কোমল অধরের স্পর্শ, উষ্ণ নিশ্বাস, মেয়েলী দেহের সংস্পর্শ সব কিছু মিলিয়ে সাফওয়ানের অবস্থা তখন নাজেহাল প্রায়। বারে বারে উঠানামা করছে গলার অ্যাডমস অ্যাপলটি। সেই সঙ্গে সায়েরী বিমোহিত হচ্ছে । সে একাধিকবার উক্ত হাড়ে অধর ডোবাতেই সাফওয়ানের হাতের জোর বৃদ্ধি পেল। প্রায় খামচে ধরে আছে সায়েরীকে। শক্তপোক্ত দেহটি ভেঙ্গে আসতে চাইছে তার। সে মুখ নামাল সায়েরীর সম্মুখে। কন্ঠে আকাশসম অসহায়ত্ব ঢেলে নিভু নিভু কন্ঠে আকুতি জানাল,
‘ ডোন্ট..ডোন্ট ডু দিস, সুইটহার্ট। প্লিজ! ‘

এই মুহুর্তটার চেয়ে চরম অসহায়ত্ব আর কক্ষনো বোধহয় উপলব্ধি করতে পারেনি সাফওয়ান। তার বিবেক শক্তি লোপ পেতে চাচ্ছে। দেহের প্রতিটি রন্ধ্র আন্দোলন জানাচ্ছে যেন অল্প খানি হলেও ছুঁয়ে দেয় প্রেয়সীর মাখনের মতো দেহের কোমল গ্রীবাদেশ। কিংবা সকল সংযম ভেঙ্গে একটুখানি ডুব দেয় তুলতুলে অধর যুগলে। কিন্তু সাফওয়ানের বেসামাল হৃদয় জানে। ঠিক এই মুহুর্তে কোনো কিছুই অল্প খানি, একটু খানিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না তার। সামান্যতম আগ বাড়ানো পদক্ষেপ গভীরে গিয়ে থামতে চাইবে। তাইতো, বাড়াতে চাওয়া অধর জোড়া আর পৌঁছাল না প্রেয়সীর অধরের নিকট। টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে নিল নিজেকে। নেশার ঘোরে ঢুলুঢুলু সায়েরীকে বিছানার শুইয়ে দিল আলগোছে। অতঃপর কোনো রকমে ব্যাঙ্কেট টা টেনে দিয়ে ঝড়ের গতিতে সেই কামরা থেকে বের হয়ে ঢুকে গেল নিজ কামরায়। সোজা গিয়ে থামল ওয়াশরুমের সম্মুখে। গম্ভীর পদচারণ পড়লো ওয়াশরুমের সাদাটে টাইলসের উপর। গায়ের লেমন কালারের শার্টের দুটো বোতাম খোলা ছিল পূর্ব হতেই।

ওয়াশরুমের দরজাটা বিকট শব্দ তুলে বন্ধ করতে করতে সে ব্যস্ত হাতে খুলল আরও একটি বোতাম। অতঃপর অধৈর্য হয়ে একটান মারল। টুংটাং ধ্বনি তোলে ফ্লোরে ছিটকে পড়লো কালো রঙের বোতাম গুলো। পরপরই পেশিবহুল, উষ্ণ দেহটি হতে শার্ট-টা সরে গেল। ছুড়ে ফেললো অদূরে। ঝিরিঝিরি পানির ফোয়ারা এসে সিক্ত করে তুলল ধবধবে ফর্সা দেহটি। ললাটে নেতিয়ে পড়লো সিল্কি চুলগুলো। পুরুষালী বক্ষপটের উঠানামা দ্রুত। ফুলেফেঁপে উঠছে হাতের পেশি। গলদেশের অ্যাডম’স এ্যাপল-টি ঘনঘন উঠানামা করছে। দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিহরণ জাগাচ্ছে অগ্নিগিরি-র ন্যায় উত্তপ্ত এক অনুভূতি।

পুরুষ চিত্তের চাহিদা টুকু আজ যেন অধিক হারে টগবগিয়ে উঠছে। হারতে চাইছে বিবেক। কেবল আশকারা খুঁজছে বেসামাল হৃদয়। চোখ বুজে দুই হাতে ভেজা চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করলো সে। শক্তপোক্ত, ভাঁজ জনিত পৃষ্ঠদেশ গলিয়ে শীতল পানি গড়িয়ে পড়ছে শিরদাঁড়া বেয়ে। এই শীতল জলের সঙ্গে দেহ,মনের সবটুকু উত্তপ্ত, অশালীন অনুভূতি ভাসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে যেন। মুখ দিয়ে অস্বাভাবিক ভাবে বেশ কয়েকবার শ্বাস ফেললো সে। বন্ধ চোখের দৃশ্যপটে ভেসে উঠলো কিছু মুহুর্ত পূর্বে দেহের সঙ্গে লেপ্টে থাকা তুলতুলে দেহশ্রীর অধিকারী মেয়েটির সুশ্রী মুখশ্রী। মেয়েলী ওষ্ঠপুটের উষ্ণ স্পর্শ গুলো যেন এখনো লেগে রয়েছে তার পুরুষালী গ্রীবাদেশে। মুহুর্ত গুলো মনে পড়তেই অস্থির, উত্তেজিত, বেসামাল হৃদয় জুড়ে হাহাকারে ভরে উঠলো। ধপ করে বারি মারলো কাঁচের দেয়ালে। ফের অস্থির ভঙ্গিতে ম্যাসাজ করলো ঘাড়। দাঁত কিড়মিড়িয়ে হাস্কি স্বরে আওড়াল,
‘ ইউ হ্যাভ টু রিগ্রেট ফর দিস, সুইটহার্ট! ‘

ঠিক কতক্ষণ যাবত ঘুমিয়েছে তা জানে না সায়েরী। নাজরাতের অনবরত ডাকে বাধ্য হয়ে বিছানা ছাড়লো সে। তীব্র মাথা যন্ত্রনায় কান্না পেয়ে গেল তার। আচমকা এমন মাথা ব্যথা হওয়ার কারণ খুঁজে পেল না সে। শিউলি জোরপূর্বক কড়া লিকারের কফি বানিয়ে খাওয়াল তাকে। বাড়ি ফিরার আগ মুহুর্ত অবধি সায়েরী অপেক্ষা করলো সাফওয়ানের। অথচ মানুষ টার দেখা পেল না সে। ক্ষুন্ন মনে ফিরে গেল বাসায়। কতটা নির্দয় প্রেমিক তার। সে ব্যথা পেয়েছে সেটারও খুঁজ নিলনা। ধমক দিয়েও নির্বিকার। এই যে তীব্র মাথা যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে সায়েরী। কই! সেসবের খেয়াল-ও তো নেই সাফওয়ানের। এই তার ভালোবাসা!

সকলে ফিরে যাওয়ার পর যখন ঘরে শুধু মাত্র সাফওয়ান, জিমন এবং রায়ান আসর জমিয়েছে। ঠিক সেই মুহুর্তে আচমকা দুই বন্ধুর উপর চড়াও হলো সাফওয়ান। ইচ্ছে মতো ধুলায় করলো দুটোকে। লিভিং রুমের চারপাশে দৌঁড়ঝাপের দরুণ হাঁপিয়ে উঠে একপর্যায়ে সাফওয়ান চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ ক্যানের বোতলে বিয়ার ঢুকানোর আইডিয়া কার ছিল বল? আমাকে না বলে তোরা দুপুর বেলা ওসব এনেছিস কেনো? ‘
‘ আমি না, আমি না। এই রায়ান্না করেছে সব। নীতি জানতে পারলে এই শালার না হওয়া সংসার গুড়িয়ে যাবে। সেই ভয়ে ক্যানে ঢুকাতে বলেছিল। আমার দোষ নেই এতে। ‘
জিমনের স্বীকারোক্তি এবং সাফওয়ানের চাহুনি দেখে রায়ান পড়লো বিপাকে। বেচারা কাঁদো কাঁদো মুখে জবাব দিল,

‘ দোস্ত রাগ করিস না। তুই জানিস না নীতি কেমন? আমাকে জিন্দা গেরে ফেলত যদি এসব দেখত তাহলে। এজন্যই… ‘
‘ ন্যাকা কান্না বন্ধ কর। শালা তোদের চক্করে আজ আমার জান গলায় আটকে গেছিল। যত চাচ্ছি সামলে থাকতে তত সবাই মিলে… ‘
দাঁত কিড়মিড়িয়ে উঠে কথা গিলে ফেললো সাফওয়ান। বিয়ার ভর্তি ক্যান তুলে নিয়ে এক বারেই অর্ধেকেরও বেশি গলাধঃকরণ করে নিল। জিমন তাকিয়ে রইল ছোট ছোট চোখ করে৷ বললো,
‘ কি করেছে সায়েরী? এসব তো আর বেশি পাওয়ার ফুল না। ফার্স্ট টাইম বলে ওভার ডোজ হলে আউট অফ সেন্স হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তুই এতটা হাইপার হচ্ছিস কেনো? ও কে তো ঠিকঠাকই দেখলাম। ‘
সাফওয়ান জবাব দিলনা। কিন্তু মনে ঠিকই বিড়বিড় করলো,
‘ এদিকে যে জ্বালিয়ে, পুড়িয়ে দিয়ে গেছে, তাই তো ঠিকঠাক আছে। আমাকে অশান্তিতে রাখার জন্যই তো জন্মেছে এই মাথামোটা। ‘

এক দিন পরের কথা। অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনায় বিগত ছয় মাসের সকল পরিকল্পনা জল্পনা ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সিলেট হতে নওশাদ খান’র কাছে আসছিলেন তার মা জাহুরা খান। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর আচমকা ভীষণ রকমের শরীর খারাপ হয়ে গেল উনার। সঙ্গে সঙ্গে ভর্তি করানো হলো হাসপাতালে। তিন ছেলের পরিবার এবং এক মেয়ের পরিবারের লোকজন নিয়ে ভরে উঠলো ভি আই পি হাসপাতালের থার্ড ফ্লোরের করিডর। দুপুর নাগাদ ভর্তি করানো হয়েছিল জাহুরা খান-কে। বিকেলের দিকে কন্ডিশন স্টেবল হয়েছে তা জানানোর পর স্বস্তি পেয়েছিলেন সকলে। আত্মীয় হওয়ার দরুণ নাজরাত এবং তার পরিবারের লোকজনও এসেছিল দেখার জন্য। সকলের উপস্থিতিতে জাহুরা এক অনাকাঙ্ক্ষিত আবদার করে বসলেন।

বয়সের ভাড়ে নুইয়ে পড়েছেন বিধায় জীবন মরণের কোন ঠিক নির্দেশনা নেই উনার। ছেলে, মেয়ের উত্তরাধিকারের মধ্যে সর্বপ্রথম কোলে তুলেছিলেন একমাত্র মেয়ের পুত্র সন্তান সাদিফকে। তাই তো, মনে মৃত্যু ভয় উঁকি দিতেই তিনি আবদার করে বসলেন নাতির বৈবাহিক জীবন, ধুমধাম করে নাত-বউ ঘরে তোলার দৃশ্য টুকু যেন স্ব-চক্ষে দেখে যেতে পারেন তিনি। উনার এহেন আবদারে সকলে চিন্তায় পড়ে গেল। আবেগী হয়ে সাদিফের মা বিনতি করলেন নাজরাতের মায়ের সম্মুখে। নাজরাতের বাবা চিন্তায় পড়ে গেলেন এক মুহুর্তের জন্য। মেয়ের শর্তানুসারে বিয়ে ঠিক করেছিলেন তিনি। মাঝ পথে এমন বিপত্তি ঘটবে তা কে জানত! এখন মেয়ে যা বলবে তা-ই সয়। কিন্তু এদিকে নাজরাতের মা বিনা কোনো কথায় মেনে নিলেন জাহুরা খান’র আবদার। নাজরাতের বাবা অগোচরে অসন্তুষ্ট গলায় বলে উঠলেন,

‘ মেয়ে কি চায় সেটা না জেনে মেনে নিলে কেন? একটাবার জিজ্ঞেস করতে পার নি? ‘
‘ আমার মেয়ে, আর আমি বুঝব না ও কি চায় সেটা? এতগুলো মাসেও যখন আপনি বুঝেননি আপনার মেয়ে কি চায় তাহলে এখন আর নাক গলাবেন না। আমি যা করেছি ওর মন মতো কাজই করেছি। ‘
মায়ের এই প্রতিউত্তর টুকু কানে আসা মাত্র লজ্জায় গুটিয়ে গেল নাজরাত। এদিকে হাসপাতাল চত্তরে ভরে উঠলো বিয়ের আগাম আমেজ। সকলে যখন একে অপরকে অভিনন্দন জানাতে ব্যস্ত। ঠিক সেই মুহুর্তে নাজরাতের হাত টেনে কোলাহলের মাঝে মিলিয়ে গেল সাদিফ। সোজা গিয়ে থামল ফিফথ ফ্লোরের খোলা বারান্দায়। আশেপাশে কেউ নেই দেখে এবারে একে অপরের দিকে তাকালো তারা। চোখে চোখ মিলতেই সাদিফ বুকে টেনে নিল নাজরাতকে। ধীর কন্ঠে বলে উঠলো,

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬১+৬২

‘ তুমি যা চেয়েছিলে তা তো হচ্ছে না। আপত্তি করলে না কেনো? ‘
‘ চাওয়া পাওয়া সবসময় একই থাকে কে বললো? আমার চাওয়া পাওয়া বদলেছে অনেক আগেই। এখন যা হচ্ছে তাতে বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই আমার। ‘
সাদিফ প্রসন্ন হাসল। বউয়ের চুলের ভাঁজে চুমু খেয়ে ফের বলে উঠলো,
‘ বর, সংসার, পড়াশোনা সব একসাথে সামলাতে পারবে তো? ‘
সাদিফের বুকে মাথা রেখে আবেশে চোখ বুজে আরও গভীর ভাবে ডুবে গেল নাজরাত। মিহি স্বরে আওড়াল,
‘ তুমি পাশে থাকলে আমি পুরো দুনিয়া সামলে নিতে পারবো। ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৫+৬৬