অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৫+৬৬
সাজিয়া জাহান সুবহা
“উপেক্ষা” শব্দটা যেমন কঠিন৷ তেমনি কঠিন, ব্যথাতুর হলো উপেক্ষা পাওয়াটা। বিশেষ করে আপনজনদের কাছ থেকে উপেক্ষা পাওয়া-টা বড্ড বেশি পীড়াদায়ক। সেই সঙ্গে মানুষটা যদি মনের মানুষ, ভালোবাসার মানুষ। তবে তো ক্ষণে ক্ষণে মন ভেঙ্গেচুরে গুড়িয়ে যায়৷ ক্ষতবিক্ষত হয় বক্ষপিঞ্জর। সদ্য প্রেম সাগরে পা ভিজানো সায়েরী বর্তমানে হাবুডুবু খাচ্ছিলো প্রেমের জোয়ারে। কিন্তু এই জোয়ারে ভাটা পড়ল আচমকা। বিনা কোনো দোষে, বিনা কোনো ঝামেলা পাকানো ছাড়া হুট করে তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সাফওয়ান ভাই। এইতো, গত পরশু সাফ্রিনের জন্মদিন অবধি সবটা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। দুপুর হতে বিকাল অবধি কি ঘটেছিল সায়েরীর স্মরণে নেই। হয়তো-বা ঘুমের তাড়নায় নিজের রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়েছিল৷
এর পর আর দেখা পায়নি সাফওয়ানের। পরের দিনটা ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। অতঃপর দেখা মিলেছে আজ ভোরে। সাফওয়ান প্রথম বিপত্তি ঘটিয়েছে রোজকার নিয়ম অনুযায়ী সায়েরীকে কল না করে। কিন্তু নিতে এসেছে ঠিকই। গাড়িতে বসেও টু শব্দ টুকু বের করেনি মুখ দিয়ে। অথচ দায়িত্ববোধ থেকে নিয়ম মতো আনাড়ি ঠিকই সায়েরীর সিটবেল্ট লাগিয়ে দিয়েছে। সায়েরীর কথার ঝুলিতে-ও আজ সাফওয়ানের পক্ষ হতে বিশেষ প্রতিউত্তর আসলো না। প্রথমে খানিকটা খটকা লাগলেও সায়েরী বিশেষ পাত্তা দেয়নি ব্যাপারটাতে। মানুষটা এমনিতেই মেপে মেপে কথা বলে। অন্যদের বেলায় যতটা গম্ভীর থাকে, সায়েরীর কাছে কোমল হয়ে আসে অনেকটাই। কিন্তু পুরোপুরি গম্ভীর সত্তা মিলিয়ে যায় না। এজন্য বেশি মাথা ঘামাল না সে। পড়াশোনায় ডুবে থাকা দীর্ঘ দুই ঘন্টা-ও কাটলো বেশ রসকষ হীন ভাবে। এক ঘন্টা অতিক্রম হতে না হতেই যখন সায়েরী টের হলো সাফওয়ান ভাই আজ তাকাচ্ছে না তার দিকে। কন্ঠস্বর নমনীয় নয় তার। তখন থেকেই হাঁসফাঁস লাগা শুরু হলো সায়েরীর। চিন্তিত মস্তিষ্কে দুই দুই বার একই ম্যাথ ভুল করে বসল৷ কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে সাফওয়ানের ধমকাল না তাকে। বেশ গুরুগম্ভীর ভঙ্গিমায় ফের একবার দেখিয়ে দিল ম্যাথ টা। এতেই সায়েরীর দম বন্ধকর অবস্থা। হয়েছে কি হঠাৎ করে সাফওয়ান ভাইয়ের? এমন অস্বাভাবিক ব্যবহার করছে কেনো? যেন সায়েরীকে চিনেই না সে৷
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
আকাশ পথে আজ মেঘেরঘটা। বাতাস বইছে তুমুল বেগে। ধূসর মেঘের একছত্র মন খারাপ এসে ঠাঁই জমাল সায়েরীর হৃদয়ে-ও৷ প্রকৃতির মতোই অন্ধকার তলিয়ে আসলো তার উজ্জ্বল মুখশ্রী-তে। সে কিছু বলতে চাইল। কিন্তু কেন যেন গুরুগম্ভীর মুখশ্রী-টা দেখে তার কোমল মন সাহস সঞ্চয় করতে পারলো না। অগত্যা সে অন্য পন্তা অবলম্বন করলো। এবার ইচ্ছেকৃত ভাবে ম্যাথের মাঝামাঝি এসে পূর্বের ভুলটা ফের করে বসলো। সলভ করতে পারছে না এমন ভান করে খাতা ঠেলে দিল সাফওয়ানের দিকে। আশা পুষল মনে, এই বুঝি নিত্যদিনের ন্যায় সাফওয়ান ভাই পায়ের সহিত সায়েরীর চেয়ার টেনে দুজনের মধ্যকার দুরত্ব গুছিয়ে নিবে। সায়েরীর ছোট্ট ললাটে টোকা মেরে ‘মাথামোটা’ বলে ডাকবে। দুই চারটা জ্ঞান ঝেড়ে ঠিকই নমনীয় স্বরে বুঝিয়ে দিবে ম্যাথ-টা। কিন্তু কল্পনানুযায়ী কিছুই ঘটলো না৷ সাফওয়ান কেবল খাতাটাকে কাছে টেনে নিল, সায়েরীকে নয়। ভারী স্বরে, খসখসে আওয়াজে খাতায় কলম চালিয়ে বুঝিয়ে দিল ম্যাথ-টা। সায়েরীর ছোট্ট মন গুড়িয়ে গেল এই উপেক্ষায়। সিক্ত হতে চাইল আঁখিদ্বয়। কিন্তু বহু কষ্টে তা আটকে রাখল সে। পরবর্তী সময়টুকু কাটিয়ে দিল নিরব অভিমান বুকে পুষে রেখে।
ন’টা বেজে চল্লিশ মিনিট। কলেজ টাইম দশটায়। এদিকে বৃষ্টি নেমেছে বিনা নিমন্ত্রণে। জানালার কাঁচে আঁচড়ে পড়ছে বৃষ্টিকণা। উদাস চোখে একপলক সেদিকে তাকিয়ে নিজের বই, খাতা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল সায়েরী। সাফওয়ান উঠে গিয়েছে অল্প কিছুক্ষণ হলো৷ শিউলি-ও বৃষ্টি দেখে জলদি জলদি ফিরে গিয়েছে নিজেদের ছোট্ট ঘরটায়। গুমোট এই পরিবেশে সায়েরীর মন খারাপের রেশ আরও গাঢ় হয়ে উঠল। প্রকৃতি আঁধারে তলিয়ে। মনে হচ্ছে যেন দিনের শেষ প্রহর এখন। বৃষ্টির বেগ বাড়ার পূর্বেই আচমকা বিদ্যুৎ চলে গেল৷ মুহুর্তেই অন্ধকারে তলিয়ে গেল গ্রীণ ভ্যালি। সায়েরীর বক্ষ কেঁপে উঠল অজানা আতংকে। অন্ধকার জিনিসটা ব্যাপকভাবে ভয় পায় সে। আজও ব্যতিক্রম হলো না। আবছা আলোয় আশাপাশে কাউকে না পেয়ে তনু, মন কেঁপে উঠল তার। সঙ্গে সঙ্গে ক্ষীণ স্বরে ডেকে উঠল ভরসা যোগ্য মানবটাকে, ‘ স..সাফওয়ান ভাই!! ‘
খুবই ক্ষীণ, কম্পিত কন্ঠস্বর। বৃষ্টির ঝুমঝুম শব্দের ঊর্ধ্বে গিয়ে সাফওয়ানের কর্ণধার হতে পারল না এই ডাক। সায়েরী বুঝল সেটা। আবসা-ঝাপসা আলোয় সে সিড়িপথ বেয়ে একপ্রকার ছুটে গেল করিডর দিয়ে। করিডরের শেষ মাথার রুমটা সাফওয়ানের। যার পাশে চওড়া ভাবে রয়েছে একটি খোলা বারান্দা। সেই বারান্দার থাই গ্লাস দুটো আজ খোলা। বৃষ্টির ছটা এসে ভিজিয়ে তুলেছে সফেদ ফ্লোর। তুমুল হাওয়ার দরুন দুটো ক্যাকটাসের টব এলোমেলো ভাবে পড়ে রয়েছে। বারান্দার একছত্র আলো এসে অন্ধকার করিডর কিঞ্চিৎ আলোকিত করল।
সেই আলোয় সায়েরী চঞ্চল কদমে এগিয়ে গেল সাফওয়ানের কামরার দিকে। দরজার সম্মুখে গিয়ে হাত তোলার পূর্বেই খট করে খুলে গেল দরজাটা। সায়েরীর কপাল গিয়ে বারি খেল চওড়া বুকটাতে। মাত্র একদিন পূর্বে বারি খেয়ে কপালের একপাশে ফুলে যাওয়ার ব্যথাটা এখনো কমেনি। ফলস্বরূপ আজ ফের ব্যথা পাওয়া মাত্র সেথায় হাত চেপে অস্পষ্ট স্বরে আর্তনাদ করে উঠলো সে। খিচে ফেললো চোখ,মুখ। সাফওয়ান বিচলিত হলো এক মুহুর্তের জন্য। হাত বাড়ালো। পূর্বেই চোখ তুলে মায়া মায়া মুখে তাকাল সায়েরী৷ যা দেখামাত্র বাড়ন্ত হাতখানা গুটিয়ে নিল সাফওয়ান। পূর্বের মতোই কঠোর তার মুখাবয়ব। নিজ হাতের কালো লেদারের অ্যাপল ওয়াচে চোখ বুলিয়ে সে রাশভারি কন্ঠে শুধালো,
‘ বৃষ্টি হচ্ছে। দ্রুত নিচে আসো৷ ট্রাফিকে পড়লে লেট হয়ে যাবে। ‘
বলামাত্র পাশ কেটে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো সে। ঠিক তখনই টান পড়ল হাতে। ফুল হাতা টি-শার্টটার ডান হাতা টেনে ধরেছে সায়েরী। সাফওয়ান তাকাতেই শুনা গেল মেয়েটার মিহি, ভঙ্গুর কন্ঠস্বর,
‘ আপনি আমার সাথে কথা বলছেন না কেনো? ‘
সাফওয়ান ছোট ছোট চোখে তাকায়। নিজ গাম্ভীর্য অটুট রেখে প্রতিউত্তর করে,
‘ এইমাত্র কার সাথে কথা বলেছি তাহলে? সকাল থেকে কি তোমার ভুত নিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছি? ‘
থতমত খেয়ে গেল সায়েরী। গাল ফুলিয়ে আমতাআমতা করে জবাব দিল,
‘ এ..এভাবে না। সবসময়ের মতো, সুন্দর করে কথা বলছেন না। তাকিয়ে-ও দেখছেন না। কেনো? আমি কি করেছি? ‘
গম্ভীর নজরে তাকিয়ে সাফওয়ান। একথায় বুকে দুইহাত বেঁধে টানটান হয়ে দাঁড়ালো সে। রাশভারি স্বরে প্রশ্ন ছুড়ল,
‘ কিছু করোনি? তোমার আমার পার্সোনাল ম্যাটার শেয়ার করো নি ফ্রেন্ডদের সাথে? ‘
কঠোরতায় মোড়ানো কন্ঠটা কর্ণধার হওয়া মাত্র শ্বাস আটকে আসলো সায়েরীর। মনে ভীতি সৃষ্টি হলো বাদামি চোখজোড়ার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির কবলে পড়ে। আড়ষ্টতায় গুটিয়ে গেল সে। নিজ চোখে ধরা দিল নিজস্ব ভুলটুকু। কিন্তু একথা সাফওয়ান ভাই জানল কি করে? কীভাবে খোঁজ পেলো তিন বান্ধবীর এমন গোপন আলাপের কথা!
সায়েরীর মুখশ্রী দেখেই যেন সাফওয়ান পড়ে ফেলল তার মনোভাব। কদম এগিয়ে ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে সে পূর্বের ন্যায় গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
‘ তোমার কি মনে হয়? আ’ম অ্যা কাওয়ার্ড? তোমাকে চুমু খাওয়ার এবিলিটি-টুকু ও নেই আমার মধ্যে? ‘
অনাকাঙ্ক্ষিত এই বাক্যে সায়েরীর চোখ ডিম্বাকৃতির ন্যায় হয়ে গেল। সে দ্রুত ডায়ে বায়ে মাথা নেড়ে ‘না’ বুঝালো। সাফওয়ানের এগিয়ে আসা দেখে চট জলদি পিছিয়ে গেল কয়েক কদম। হন্তদন্ত গলায় শুধালো,
‘ ন.নাহ না! এ..মন কি..ছু না… ‘
তার কম্পিত কণ্ঠের বিপরীতে সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠলো সাফওয়ান,
‘ না হলে বলেছিলে কেনো? কি বলেছো তোমার ফ্রেন্ডদের কে? ওদের কে রাইট দিয়েছে তোমার আমার পার্সোনাল ম্যাটার নিয়ে কথা বলার? কি যেন প্রেফার করেছিলে.. কলিকাতা হারবাল? হুহ? ‘
‘ খুব আফসোস না চুমু দেইনি বলে? কাম দ্যান! আই’ল শো ইউ হাও মাচ ওয়াইল্ড আই অ্যাম। রাইট নাও, আই’ল কিস ইউ সো হার্ড। আনটিল ইউর লিপস বিকেম ব্লাডি। কাম.. ‘
হাড় হীম করা কন্ঠের এমন লজ্জাহীন বাক্যগুলো কানে পৌঁছানো মাত্র কান,গাল জ্বলে উঠলো সায়েরীর। ধুকপুক শুরু হলো বক্ষ জুড়ে। গলা শুকিয়ে কাঠকাঠ হয়ে আসলো। পিছিয়ে নেওয়া কদম আটকে গেল থাই গ্লাসের সঙ্গে পিঠ ঠেকা মাত্র। আটকে গিয়ে ভীতিকর ছাপ পড়ল মুখশ্রীতে। সম্মুখেই আগ্রাসী রূপি সাফওয়ান। যার চোখদুটোতে আজ উপচে পড়া ক্রোধ। থাই গ্লাসের সঙ্গে লেপ্টে থাকা সায়েরীর দেহ ছুঁই ছুঁই হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। বৃষ্টির ছোটায় সিক্ত হতে শুরু করল দুজনের দেহের একাংশ। ঝুমঝুম বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে সায়েরী নিজ কানে শুনতে পেল নিজের হৃদযন্ত্রের ধুকপুক ধ্বনি। তার মুখ হতে রক্ত সরে গেল যখন সাফওয়ানের পোক্ত একহাত রুক্ষ ভাবে ছুঁয়ে দিল তার কোমল কটিদেশ। এই ছোঁয়ায় কোমলতা নেই। ভালোবাসা নেই। বরং প্রচন্ড আগ্রাসী, অশালীন। যা অনুভব করামাত্র চোখ খিচে ফেললো সায়েরী। মুহুর্তেই দুই ফোঁটা তপ্তাশ্রু গড়িয়ে সিক্ত হলো তার মসৃণ গালদ্বয়। সে ভঙ্গুর গলায় আকুতি জানাল,
‘ এ..এমন-টা ক..করবেন না। আম..আমি.. আমার ভয় ল..লাগছে.. ‘
সাফওয়ান স্পষ্ট টের পেল ভয়টুকু। সায়েরীর চোখে মুখে-ই ফুটে উঠেছে ভয়ের আভাস। কিন্তু তবুও সে স্থায়ী রাখল নিজের কঠোর রূপ। অন্য হাতে ভীতু রমণীর গালদ্বয় চেপে উঁচু করলো মুখশ্রী-টি। হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
‘ এখন ভয় পাচ্ছো কেনো? উল্টাপাল্টা কথা বলার আগে মনে ছিল না আমি কি প্রতিক্রিয়া দেখাব? এ্যাইঁ তোমার নিজের কোনো ব্রেইন নেই? যে যা বলে তা কেন মাথায় নিয়ে নাও সবসময়? বারবার বলেছি কারোর কথায় কান না দিতে৷ তবুও তুমি এই গাধামি টা করেছ। কি মনে হচ্ছিল তোমার? ফিজিক্যালি ইনভলভ হয়নি বলে তোমার প্রতি আমার কোনো অনুভূতি নেই? এটাই মনে হচ্ছিলো তো? ‘
সায়েরী, সাফওয়ানের চোখে চোখ মিলাতে পারল না। বলিষ্ঠ হাতের চাপে ফুলে থাকা তার গালজোড়া অবিরাম অশ্রুজলে ভিজে একাকার হয়ে আছে৷ থুতনি কাঁপছে কান্না আটকানোর প্রচেষ্টায়। মেয়েটা বুঝতে পারল নিজের ভুলটুকু। সত্যিই তো। সে বহুবার ভেবেছে, সাফওয়ান ভাইয়ের কোনো অনুভূতি-ই নেই তার প্রতি। নয়তো আর পাঁচটা স্বাভাবিক প্রেমিক যুগলের মতো আবেগে মাখোমাখো সম্পর্ক নয় কেন তাদের? কিন্তু সাফওয়ানের দুই চোখের মুগ্ধ চাহনি, যত্নশীল আচরণ দেখে এই সব মনোভাব মিথ্যে বলে মনে হতো তার। তবে আশেপাশের অন্য প্রেমিক প্রেমিকাদের দেখলে ফের মনে উদ্যত হতো পূর্বের প্রশ্নগুলো। কিন্তু কখনো তো মুখ ফুটে বলেনি এমন কিছু। তবে সাফওয়ান ভাই জানল কি করে? না-কি বলেছে অজান্তেই। কিন্তু কবে? কখন? তার কেন মনে পড়ছে না!
ভাবুক সায়েরীর গালজোড়া চেপে দুজনের মুখশ্রী আরও কাছাকাছি নিয়ে আসলো সাফওয়ান। কন্ঠের গাম্ভীর্য খানিকটা কমিয়ে এনে ফের বলে উঠলো,
‘ লিসেন সুবহা! আমার পারসোনাল ব্যাপারে কোনো থার্ড পারসনের ইন্টারফেয়ারেন্স আমি পছন্দ করিনা। আর না আমি কাউকে কৈফিয়ত দিতে পছন্দ করি। নাও ইউ আর মাই পারসোনাল প্রপার্টি টু। আমি চাইনা কেউ তোমার আমার মধ্যকার ব্যাপারে নূন্যতম আভাস পাক। অযাচিত জ্ঞান ঝাড়ুক বা তোমাকে কানসার্ন দেখাক। তোমার আমার জন্য আমি একাই যথেষ্ট। আমি বুঝব আমাদের জন্য কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ। আমাদের মধ্যে ঝগড়া হোক, মান অভিমান হোক সব আমরা আমরা মিটমিট করবো। এর জন্য কোনো বাইরের লোকের ইউজলেস টিপসের প্রয়োজন নেই। আর না তুমি আমাদের পারসোনাল ব্যাপার নিয়ে কারো সঙ্গে কোন ডিসকাশন করবে। না ফ্রেন্ডস, না ফ্যামিলি। নো ওয়ান মিনস নো ওয়ান! গট ইট? ‘
সায়েরী দ্রুত ভঙ্গিতে মাথা উপর নিচ করে সায় জানাল। সঙ্গে সঙ্গে তাকে শাসাল সাফওয়ান,
‘ ইউজ ইউর ওয়ার্ডস! ‘
‘ হ..হ্যাঁ। মনে থাকবে। ‘
সাফওয়ান গাল ছাড়ল এবারে। কিন্তু দুরত্ব বাড়াল না। পূর্বের মতোই ছুঁই ছুঁই হয়ে থেকে সায়েরীর ভেজা গালে হাতের উল্টো পিঠ স্পর্শ করে মুছে নিল অশ্রু সব। লক্ষ্য করলো, সায়েরীর নাজুক তনু তখনো কাঁপছে মৃদুমন্দ। চেহারা হতে সরেনি ভয়ের রেশ। শ্বাস ফেলছে অস্বাভাবিক ভাবে। সাফওয়ান যেন বুঝে ফেললো এর কারণ টুকু। এবারে স্বভাবগত ভাবে সায়েরীর পিঠ জড়িয়ে তাকে বুকে টেনে নিল সে৷ পিঠে, মাথায় বারকয়েক হাত বুলিয়ে আশ্বস্ত গলায় শুধালো,
‘ কাম ডাউন, সুবহা! শান্ত হও। শ্বাস নাও। কিছু করছি না আমি। রিল্যাক্স! ‘
বলতে বলতে সে দৃঢ় করলো হাতের বাঁধন। সায়েরী দুইহাতে খামচে ধরেছে সাফওয়ানের কোমরের দুইপাশের জ্যাকেটের অংশ। মেয়েটা তখনও কাঁপছে। শ্বাস প্রশ্বাসের গতি পূর্বের মতোই অস্বাভাবিক। সাফওয়ান অস্থির হলো এবারে। উত্তেজিত চিত্তে সায়েরীর চুলে হাত বুলালো। মাথা নুইয়ে মেয়েলি কপালের মধ্যিখানে অধর ছুঁইয়ে উদগ্রীব কন্ঠে শুধালো,
‘ কাম ডাউন না জান। ভয় পাচ্ছো কেনো? দেখো, আমিই তো। কিছু করছি না। শান্ত হও। ‘
ভীতু রমণী ফুঁপিয়ে উঠলো এবারে৷ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল বিশ্বস্ত, ব্যক্তিগত পুরুষটাকে৷ শুনা গেল তার ক্রন্দনরত কন্ঠস্বর,
‘ আর কখনো এভাবে ছুঁয়ে ভয় দেখাবেন না। অ..আমি আপনাকে ভয় পেতে চাইনা। ‘
সাফওয়ানের বুক ছিড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হলো। মনে পড়ে গেল বান্দরবানের সেই কলঙ্কিত রাতটার কথা। যা সায়েরীর মন, মস্তিষ্কে তীব্র প্রভাব ফেলেছে। তাই তো, আজ সাফওয়ানের এমন আগ্রাসী রূপ দেখে ভয়ে গুটিয়ে গেছে মেয়েটা। সাফওয়ান শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে। আপনমনে স্বগোতক্তি করলো,
‘ আর কখনো এমন ভয় দেখাব না। ভয় পেতে হবে না আমাকে। শান্ত হও। ‘
সায়েরী শান্ত হতে সময় নিল কিয়ৎ ক্ষণ। স্বাভাবিক হতেই সাফওয়ানের বাহুডোর হতে সরে আসতে চাইল সে। সাফওয়ান ছাড় দিল ঠিক, তবে ছেড়ে দিল না পুরোপুরি। একহাতে কোমর বেষ্টনী জড়িয়ে অন্যহাত ডুবিয়ে দিল সায়েরীর কানের নিচে। গালে বৃদ্ধ আঙ্গুল ছোঁয়াতেই ডাগরডোগর চোখ তুলে চাইল সায়েরী। দৃষ্টি মিলন ঘটা মাত্র ওষ্ঠে তির্যক হাসি ফুটাল সাফওয়ান। ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠে শুধালো,
‘ ছুঁয়ে দিতেই মুর্ছা যাও। আবার কান্নাকাটি করছো চুমুর জন্য! কোন আবদার টা রাখবো আমি?হুহ?’
সায়েরী চমকাল,থমকাল। তীব্র লজ্জায় আরক্তিম হলো মুখশ্রী। প্রতিবাদ জানাল দ্রুত গলায়,
‘ মিথ্যে কথা। সেই কখন থেকে এসব বলে যাচ্ছেন। আমি এসব কথা কখন বলেছি আপনাকে? ‘
সাফওয়ানের নিজের অধর কোণের হাসিটুকু গিলে নিল। কন্ঠে নাটকিয় গাম্ভীর্য টেনে আড়াআড়ি ভাবে ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে উঠলো,
‘ আমি কি তবে মিথ্যে বলছি? ‘
সায়েরী নিভে গেল। গুটিয়ে গেল অস্বস্তি তে। মিনমিন কন্ঠে বললো,
‘ এসব কখন বলেছি? ‘
সাফওয়ানের বলতে ইচ্ছে করলো,
‘ শুধু বলোনি। আমার জান হাতের মুঠোয় নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছ। নিজে নেশা করে আমাকে মাতাল বানিয়েছ। ভাগ্য ভালো পুরোপুরি মাতাল হইনি। নয়তো আজ এখানে, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার মতো পরিস্থিতি, শক্তি অবশিষ্ট থাকতো তোমার? ‘
কিন্তু এই অশালীন বাক্যগুলো নিজের মাঝেই চেপে রাখল সে। প্রকাশ করলো না কিছু। তবে সায়েরীর আড়ষ্টভাব দেখে রাগ রাগল তার। এই মেয়ে কেন তাকে ভয় পাচ্ছে এখনো! হাতের বাঁধন দৃঢ় করল সে। চোখের পলকে মেয়েলি দেহখানা জমিন হতে ইঞ্চিখানেক উপরে তুলে নিল। হকচকিয়ে গিয়ে সাফওয়ানের দুই কাঁধ চেপে ধরলো সায়েরী। দুজন সামনাসামনি, মুখোমুখি। একই উচ্চতায় দাঁড়িয়ে। দমকা হাওয়ায় এলোমেলো হওয়া সায়েরীর ছোট ছোট চুলগুলো ফু দিয়ে মুখ হতে সরিয়ে দিল সাফওয়ান। মসৃণ গালে অধরের স্পর্শ লাগিয়ে রেখে বলে উঠলো,
‘ বি ইজি,সুবহা! ভয় পাচ্ছো কেনো? আমার সামনে ভয়ে, অস্বস্তিতে গুটিয়ে থাকার মতো করে তো গড়ে তুলিনি আমি তোমাকে। ‘
মোলায়েম, ভালোবাসা এবং যত্নে টইটম্বুর এই স্পর্শে সায়েরী গলে গেল। ভুলে গেল ক্ষণিক পূর্বের রুক্ষ, আগ্রাসী, অশালীন রূপি আচরণ টুকু। কোমল হাতে সে প্রেমিক পুরুষটার গলা জড়িয়ে ধরল। ঝুম বৃষ্টি, খোলা বারান্দার সম্মুখে আধভেজা অবস্থায় প্রেয়সীর দেহের সংস্পর্শ যেন অন্য এক আমেজ তুললো সাফওয়ানের প্রেমিক হৃদয়ে। সে হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ঢেলে একখানা উষ্ণ চুম্বন আঁকতে উদ্যত প্রেয়সীর কানের পিঠে। কিন্তু বিধিবাম! তার উত্তপ্ত শ্বাস কানের নিচে আঁচড়ে পড়ামাত্র, অধরের কিঞ্চিৎ ছোঁয়া পড়তে না পড়তেই আকস্মিক তাড়াক করে লাফিয়ে উঠল সায়েরী। ঘুরিয়ে নিল ঘাড়। সাফওয়ানের ঘাড়ের চুল খামচে ধরল সে। খিলখিল শব্দের হাসিতে মিশে গেল তার অপ্রস্তুত কন্ঠ,
‘ উঁউহহু!!! সুরসুরি লাগে.. ‘
এহেন প্রতিক্রিয়ায় সাফওয়ানের আবেগী মনে ভাটা পড়ল। সে নিভে গেল ধপ করে৷ বিগড়ে গেল মেজাজ। দাঁতে দাঁত চেপে কিছু বলতে উদ্যত হয়েও হাস্যজ্বল, লাজুক মুখখানা দেখে দমে গেল বরাবরের মতো৷ আজও পারল না এই মেয়েটার খুশির ঊর্ধ্বে গিয়ে নিজেকে প্রাধান্য দিতে। কিন্তু এই বজ্জাত সুরসুরি কে মনে মনে শাসাল বেশ। বিরক্ত হয়ে অস্পষ্ট স্বরে আওড়াল, ‘ ধ্যাৎ! ‘ এবং সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিল সায়েরীকে। মেয়েটা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসছে সাফওয়ানের প্রতিক্রিয়া দেখে।
সাদিফ-নাজরাতের বিয়ের তোরজোড় চলছে বেশ তাড়াহুড়ায়। দুই পক্ষের কেউ-ই শ্বাসটুকু ফেলার ফুসরত অবধি পাচ্ছে না৷ এই তো আর মাত্র সপ্তাহ খানিক সময় হাতে। বিয়ের কথা তুলতে না তুলতেই চোখের পলকে কেটে গেল বারোটা দিন। আর মাত্র পাঁচদিন বাকি রয়েছে৷ ষষ্ঠ তম দিন হতে শুরু হবে হলুদ,মেহেন্দি, বিয়ে অতঃপর বউ ভাত। নিজ ব্যস্ততায় বিভোর সাদিফ বউয়ের জন্য একটি ডায়মন্ড রিং অর্ডার করেছিল অনুষ্ঠানের ডেট ফিক্সড হওয়ার পরপরই। কিন্তু পরবর্তীতে নিজে গিয়ে পেমেন্ট টুকু করার সময় পায়নি সে৷ বাধ্য হয়ে সাফওয়ান কে দিল এই দায়িত্ব৷ কলেজ থেকে ফেরার পথে সাদিফের দেওয়া কাজটুকু মিটাতে গন্তব্যে পৌঁছল সাফওয়ান। সঙ্গে ছিল সায়েরী। কাজ শেষে দুজন যখন পুণরায় গাড়ির কাছে ফিরছিল, এমন মুহুর্তে ব্যস্ত সড়কে আচমকা থমকাল সায়েরী। মনে হল যেন খুব পরিচিত একটি মুখ এইমাত্র দেখেছে ভীড়ের মাঝে। সে উৎসুক হয়ে সেদিকে নজর দিল সে। তার থমকে দাঁড়ানো দেখে ধরে রাখা হাতখানা টেনে নিল সাফওয়ান। কিনারে পৌঁছাতেই প্রশ্ন ছুড়ল,
‘ মাঝ রাস্তায় এভাবে কেউ দাঁড়ায়? গাড়ি চলছে দেখছ না? ‘
সায়েরীর ধ্যান নেই সেকথায়। তাকে দেখাল বড্ড উদগ্রীব, উত্তেজিত। সাফওয়ানের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে চট করে টেনে খুলল সায়েরীর মাস্ক। চিন্তিত গলায় শুধালো,
‘ কি হয়েছে? খারাপ লাগছে? ‘
ব্যস্ত সড়কে দৃষ্টি রেখে সায়েরী উদগ্রীব কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ ফ..ফায়াজ! আমি ফায়াজকে দেখেছি। এখানেই বোধহয়। কোথায় গেল এখন? ‘
সাফওয়ান তাকাল ভ্রুঁ কুঁচকে। গম্ভীর দৃষ্টি ফেললো ব্যস্ত সড়কে। বিশেষ কাউকে নজরে আসল না তার৷ সায়েরীকে এমন উদগ্রীব হতে দেখে সে হাত টেনে গাড়ির দিকে এগিয়ে বলে উঠলো,
‘ ভুল দেখেছ। ফায়াজ নেই এখানে। ‘
‘ আপনি কীভাবে জানেন যে ও এখানে নেই? ‘
প্রশ্নটুকু সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেল সাফওয়ান,
‘ লেট হচ্ছে সুবহা। গাড়িতে উঠো৷ ‘
‘ বিশ্বাস করুন। আমি দেখেছি ওকে। এখানেই.. ‘
সাফওয়ানের মেজাজ বিগড়ে গেল। কন্ঠ নিচু হলেও গম্ভীর শোনাল তার,
‘ করলাম বিশ্বাস। তারপর? কি করবে ওকে খোঁজে? তুমি এত তাড়াতাড়ি সবটা ভুললেও আমি ভুলিনি সুবহা। মলেস্ট করেছে ও তোমাকে। কি হাল হয়েছিল তোমার সেটা তুমি ভুললেও আমি ভুলতে পারিনি। তাই আমার সামনে ওর প্রসঙ্গে কথা বলা বাদ দাও। ‘
সায়েরী চুপসে গেল। মনে পড়ে গেল বিভীষিকা ময় দিনটির কথা। মাত্র একটি ঘটনা কীভাবে গুড়িয়ে দিয়েছিল সায়েরীকে, ফায়াজের প্রতি তার বিশ্বাস কে। কতগুলো দিন গুটিয়ে ছিল মেয়েটা। সদ্য প্রেম জগতের ধার খুলতে না খুলতেই বাধ্য হয়েছিল প্রেমিক পুরুষ হতে নিজেকে লুকিয়ে নিতে। ফায়াজ ভুল করেছে। অবশ্যই তার দোষ রয়েছে। হোক তা ক্ষমার যোগ্য। কিন্তু যে মেয়েটা স্বাক্ষী ছিল মুহুর্ত টার। তার পক্ষে এখনো সম্ভব নয় ঘটনাটা ভুলে যাওয়া। মন থেকে পুরোপুরি ফায়াজকে ক্ষমা করে দেওয়া-ও আপাতত সম্ভব নয়। সায়েরী পারেনি ক্ষমা করতে। বিশ্বাস ভেঙ্গেছে তার। পুণরায় তা অর্জন করতে সময় তো লাগবেই।
গাড়িতে বসে উদাস মুখে এসবই ভাবছিলো সে৷ খোলা জানালার বাহিরে ফের কয়েকবার দৃষ্টি ফেলে খোঁজল ফায়াজকে। কোমল মনে একছত্র আবেগ তখনো বিরাজমান বলেই এতগুলো মাস পর বন্ধুর অবয়ব দেখে অস্থির হয়ে উঠেছে তার মেয়েলী সত্তা৷ কিন্তু দ্বিতীয় বারের মতো নজরে আসলো না চেহারাটা।
তাদের গাড়ি স্থান ত্যাগ করামাত্র একটি দোকানের আড়াল হতে বেরিয়ে আসলো ফায়াজ। শূন্য দৃষ্টি মেলে দেখতে থাকলো গাড়িটাকে। আজ কতগুলো দিন, কতগুলো মাস পর প্রিয় মুখখানা দেখল সে। মেয়েটার চেহারার উজ্জ্বলতা, লাবণ্য আরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে চেয়ে খানিকটা স্বাস্থ্য হয়েছে। আদুরে লাগছে দেখতে। ফায়াজ মলিন মুখে হাসে। সঠিক পুরুষের সঙ্গে থাকলে যে প্রতিটি নারীর লাবণ্য নতুন রূপ পায় তা আজ নিজে প্রমাণ পেল সে। দূর থেকেই দেখল তার প্রিয় মানুষটাকে অন্য এক পুরুষ যত্ন করছে।
স্পষ্ট দেখল, ঘামে জবজবে মেয়েলী মুখখানা নিজেই রুমালের সহিত মুছে দিচ্ছিল গম্ভীর পুরুষটা। জোর করে পানির বোতল খুলে দিয়ে পানি খাইয়েছিল। নিজেই আটকে দিয়েছিল সিটবেল্ট৷ উদাসী রমনীর গাল ছুঁয়ে কিছু কথাও বললো। অতঃপর উঠে গেল গাড়ির কাঁচ। দৃষ্টি সীমা হতে মিলিয়ে গেল গাড়িটা। পুণরায় সেসব ভেবে ফায়াজের বুক ছিড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হলো। একবুক হাহাকার জমে ছিল এতদিন। আজ কেন যেন তার ভার কমে এলো। মনে হচ্ছে তার পছন্দের মানুষটি সঠিক পুরুষের সঙ্গ পেয়েছে। এটাই যেন হওয়ার ছিল। ফায়াজ কষ্ট চেপে রেখেও আজ নিজেকে বোঝাল। ভালোবাসা পাওয়ার চেয়েও ভালোবাসার মানুষটাকে সুখী দেখাটা বেশি প্রাপ্তির।
কোলাহল বিহীন লেকের পাড়। নাজরাত অপেক্ষারত কেউ একজনের। সে এসেছে মিনিট দশেক হলো। যার জন্য অপেক্ষারত, সেই মানুষটার দেখা আদৌও পাবে কি-না তা কিনা সন্দেহজনক সে। কিন্তু মনে প্রাণে চাইল, মানুষটা আসুক। অন্তত এই সময়টাতে তার দেখা পাওয়াটা বড্ড প্রয়োজন। এই মুহুর্তে কোনোরূপ অপ্রাপ্তি নিয়ে দাম্পত্য জীবনে পা রাখতে চায়না সে। সকলের দোয়া, সকলের সঙ্গ নিয়ে এগিয়ে যেতে চায় নতুন জীবনে। লেকের সচ্ছ্ব পানির দিকে শূন্য দৃষ্টি ফেলে এসবই ভাবছিলো সে। এমন সময় অনুভব করলো দ্বিতীয় কারোর উপস্থিতি। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল সে। রিকশা হতে নেমে তার দিকে এগিয়ে আসছে একটি চিরপরিচিত মুখ। এতগুলো মাস পর মানুষটাকে দেখে নাজরাত চমকাল! এ কি হাল করেছে ছেলেটা নিজের? এ কোন ফায়াজ সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার? শুকিয়ে গায়ের উজ্জ্বল রঙ-টা চাপা পড়ে গেছে। কালি পড়েছে চোখের নিচে। উষ্কখুষ্ক, এলোমেলো চুলে ভর্তি মাথা। অবহেলায় হালকা দাড়ির আভাস দেখা যাচ্ছে চোয়ালে। আগে তো ছিলনা এসব। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ গড়নের হাস্যজ্বল ছেলে ছিল সে। যার চমৎকার হাসিতে মুগ্ধ হতে বাধ্য ছিল সকলে। কিন্তু এটা কে? এই ফায়াজকে এতটা অপরিচিত লাগছে কেন?
নাজরাতের আঁখি ভারী হয়ে গেল আচমকা। এতগুলো বছরের বন্ধুত্ব তাদের। এতকিছুর পরেও মায়া যে কাটাতে পারেনি। অনবরত ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নিল সে। ফায়াজ সেই কবে এসে দাঁড়িয়েছে। নাজরাতকে এমন উদাসীন হতে দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ফেললো ছেলেটা। নিজে হেসে নিজেই অবাক হলো। কতগুলো দিন পর হেসেছে! সে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় শুধালো,
‘ বিদায়ের তো আর-ও সপ্তাখানেক সময় বাকি। এখন থেকেই কান্নাকাটি চালু করে দিলি কেনো? ‘
নাজরাত চমকাল। অবাক কন্ঠে শুধালো,
‘ তুই কি করে জানলি? ‘
ফায়াজ ফের হাসে। নাজরাত কে ইশারা করে নিজেও বসে পড়ে লেকের পাড়ে৷ শান্ত কন্ঠে প্রতিউত্তর করে,
‘ জানার ইচ্ছে হলো বলেই জেনেছি। দূরে আছি বলে কি খোঁজ রাখতেও পারবো না? ‘
নাজরাত বসে রইল মুখ আঁধার করে। মিনিট খানিক নিরবতা কাটিয়ে ধীর কন্ঠে জানতে চাইল,
‘ কেমন আছিস? ‘
ফায়াজের বুকে গিয়ে লাগল এই প্রশ্ন-টা। কতগুলো মাস হলো কেউ জানতে চাইল না সে কেমন আছে! কীভাবে আছে আপনজন দের ছেড়ে? শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নিল সে৷ প্রতিউত্তর করলো ফিচেল হেসে,
‘ যেমন থাকব বলে কখনো কল্পনা-ও করিনি। ‘
এটুকু বাক্যে নাজরাতের মন ভাড় হলো আরও বেশি। দোটানায় ডুবে সে ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ কেনো এমন করলি বলতো? তোকে এভাবে দেখতে ভালো লাগছে আমাদের? কখনো ভাবিনি এভাবে ফাটল ধরবে আমাদের বন্ধুত্বে৷ কিন্তু তুই সবকিছু তছনছ করে দিলি ফায়াজ। ‘
ফায়াজ হাঁসফাঁস করে উঠে। দুই হাতে নিজের চুল খামচে হাঁটুতে ভর দিয়ে নিচে দিকে ঝুঁকে যায়। ধরা গলায় বলে,
‘ আমিও চাইনি এমন কিছু হোক। কিন্তু.. কীভাবে যেন…বিশ্বাস কর, ওই মুহুর্তে আমি আমার মধ্যে ছিলাম না। সায়ুকে সাফওয়ান ভাইয়ের সাথে এত ঘনিষ্ঠ হতে দেখে অ..আমি মানতে পারিনি। আমার মনে হচ্ছিলো আমার সঙ্গে অনুচিত হচ্ছে। মন বলছিল সাফওয়ান ভাই আমার কাছে থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে সায়ুকে। শুরু থেকেই ভেবে এসেছিলাম যে সায়ু আমার। আমারই হতে হবে ওকে। কারণ আমি আগে ভালোবেসেছি। তিন বছর..তিন তিনটা বছর ধরে ভালোবেসে আসছি। হুট করে ওকে অন্য কারো সঙ্গে আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। ‘
‘ জেদ চেপেছিল মনে। ভেবেছি, সায়ু এতগুলো বছরেও আমার ভালোবাসা গুলো কেন দেখতে পারলো না৷ বান্দরবানের সামান্য তিনটা রাত যে আমার তিন বছরের অনুভূতির সম্মুখে এতটা ভারী পড়বে তা আমি কখনো কল্পনা করিনি। রাগ লাগছিলো সায়ুর উপর। তবুও শান্ত ভাবে বোঝার চেষ্টা করেছিলাম। অনেক বুঝিয়েছিলাম। কিন্তু.. কিন্তু মেয়েটা বুঝতেই চাইছিল না। আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছিল। অ..আমি মেনে নিতে পারছিলাম না ওই প্রত্যাখ্যান। বিবেক হারিয়ে ফেলেছিলাম। না জানি কত কি করে বসেছি জেদের বশে৷ আঘাত করেছি সায়ুকে৷ হারিয়ে ফেলেছি ওকে। সারাজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলেছি.. সবাইকে হারিয়ে ফেলেছি। ‘
শেষে কথাটুকু বলতে গিয়ে অস্বাভাবিক ভাবে কেঁপে উঠল ফায়াজের কন্ঠস্বর। নাজরাতের চোখ জল গড়াল গাল বেয়ে৷ হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছল সে। ক্রোধ, জিদ এই দুটো বড্ড ভয়ংকর। এই দুই অবস্থায় বলা কথা কিংবা নেওয়া কোনো পদক্ষেপ মানুষকে সারাজীবন ভোগায়। নাজরাত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ফায়াজকে সময় দিল নিজেকে সামলে নেওয়ার জন্য। মিনিট পাঁচেক পর স্বাভাবিক হল ফায়াজ। দুই হাতে মুখ ঘষে নাজরাতের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ল,
‘ আমার খোঁজ কি করে পেলি তুই? নাম্বার কে দিল? ‘
‘ আয়ান ম্যানেজ করে দিয়েছে। ‘ নাজরাতের নির্লিপ্ত কণ্ঠ।
ফায়াজ চমকাল। অস্পষ্ট স্বরে আওড়াল, ‘আয়ান!’
নামটার সঙ্গে কতশত অনুভূতি জড়িয়ে তার। ভাইয়ের চেয়েও বেশি প্রিয় এই ছেলেটা। সায়েরীকে হারানোর চেয়েও বেশি দুঃখ আয়ানকে হারানো। দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি এই প্রিয় বন্ধুর চোখে কখনো নিজের জন্য ঘৃণা দেখবে সে। আয়ানের নাম শুনেই ফের একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। জানতে চাইল,
‘ কেমন আছে ও? ‘
নাজরাত আলতো হেসে জবাব দিল,
‘ ভালোই আছে, তোহার সাথে। ‘
‘ তোহা!! ‘ ফায়জের অবাক কন্ঠ।
নাজরাত হেসে ফেললো। বললো,
‘ হ্যাঁ রে। কয়েক মাস হলো ওরা রিলেশনশিপে আছে। আমাদের বলেইনি জানিস! সে তো আমাদের দুই জাসুসের কাছে ধরা পরেছে বলে জানতে পারলাম। নয়তো দেখা যেত বিয়ে শাদি করে বাচ্চা হাতে ধরিয়ে তারপর জানাচ্ছে। ‘
ফায়াজ আশ্চর্য হলো বেশ। নাজরাত খুলে বললো সম্পূর্ণ ঘটনা। শুনতে শুনতে ফায়াজ নিজেও হেসে ফেললো। সে কখনো ভাবেনি তোহার মতো ঝগড়ুটে মেয়ে জুটবে আয়ানের কপালে। অবশ্য এই ছেলের কপাল টাই এমন। প্রথম প্রেমিকা ছিল এক টম বয়। এখন জুটেছে এক ঝগড়ুটে। সভ্য ছেলেদের কপাল বুজি এমনই খারাপ হয়!
কথার এক পর্যায়ে নাজরাত নিজের হ্যান্ড ব্যাগ হতে বের করলো ইনভাইটেশন কার্ড। এগিয়ে দিল ফায়াজের দিকে। ফায়াজ সেটা হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখল। সে যখন কার্ডের অক্ষরগুলো-তে চোখ বুলাতে ব্যস্ত ঠিক সেই মুহুর্তে নাজরাত ধীর কন্ঠে জানতে চাইল,
‘ তুই আসবি তো? ‘
ফায়াজ থামে। কার্ড-টা পুণরায় প্যাকেটে ভরে রাখে। মলিন হেসে বলে,
‘ তোর বিয়ে। খুশির দিন। আমি গেলে শুধু শুধু কতগুলো মানুষের সমস্যা হবে। খুশির মহলটা নষ্ট হয়ে যাবে। না গেলেই বরং সবার জন্য ভালো। ‘
‘ বিয়ে তো আমার। আমি বলছি তোকে আসার জন্য। ‘
‘ সম্ভব না রে। সায়ু, ওর ফ্যামিলি, আমাদের বন্ধুরা সবাই থাকবে সেখানে৷ কাউকে ফেস করার মতো সাহস আমার নেই দোস্ত। আমার সময় দরকার। আমি খুব অনুতপ্ত। কিন্তু এখনো কারো সামনে দাঁড়ানোর মতো সাহস কুড়াতে পারিনি। ‘
নাজরাত বুঝতে পারল ওর অবস্থা। তাই বিশেষ জোর করলো না। দুই বন্ধু মিলে সময় কাটাল আরও কিছুক্ষণ। বিদায় বেলায় ফায়াজের মুখ মলিন হয়ে এলো। নাজরাতের মাথায় হাত রেখে ধরা গলায় আওড়াল,
‘ দোয়া করি, অনেক সুখী হ। ‘
সাথে আবার সঙ্গে করে নিয়ে আসা র্যাপিং পেপারে মোড়ানো চার কোণা বস্তুটি সে এগিয়ে দিল নাজরাতের দিকে। চলে গেল বিদায় নিয়ে। ফায়াজ যাওয়ার পরপরই সড়কে দেখে মিলল সাদা রাঙা পরিচিত একটি গাড়ির। নাজরাত একপলক তাকাতেই গাডির জানালা দিকে সাদিফের চোখে চোখ পড়ল তার। মলিন মুখে সে গিয়ে বসলো গাড়িতে। সাদিফ মৃদু হেসে জানতে চাইল,
‘ কথা বলেছ? মিটমাট হলো কিছু? ‘
‘ উঁহু। ‘
নাজরাত আগ্রহ পেল না কথা বাড়ানোর। দৃষ্টি তার হাতে থাকা গিফটির দিকে। একপর্যায়ে অধৈর্য হয়ে গাড়িতেই খুলে ফেলল সেটা। পেপার সরাতেই নজর আটকে গেল চমৎকার এক ফটো ফ্রেমে। বান্দরবানের লামা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে তোলা সাত বন্ধু-বান্ধবের আকর্ষণীয় একটি ছবি। কি সচ্ছ, প্রাণোচ্ছল হাসি সকলের মুখজুড়ে। একে অপরের কাঁধ জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে সকলে। ছেলে তিনজন পেছনে এবং মেয়ে চারজন সামনে। হাস্যজ্বল চিত্তে তাকিয়ে আছে ক্যামেরায়। ছবির মুহুর্ত টা চোখে ভাসতেই আবেগে আপ্লূত হয়ে আচমকা কেঁদে ফেলল নাজরাত। সাদিফ দ্রুত বুকে টেনে নিল তাকে। আশ্চর্য কন্ঠে শুধালো,
‘ কাঁদছ কেনো? তোমার তো খুশি হওয়ার কথা গিফট পেয়ে। ‘
‘ কয়েক দিন ধরেই এমন উদাস উদাস হয়ে আছো, নাজরাত! তোমাকে এভাবে দেখতে ভালো লাগছে আমার? এতগুলো মাসের অপেক্ষা ফুরাচ্ছে, কোথায় খুশি হবে তা না। তুমি মন খারাপ করে থেকে আমার খুশি টুকু ও ছিনিয়ে নিচ্ছ। এটা কি ঠিক? ‘
নাজরাত কান্না থামায়। ভাঙ্গা স্বরে বলে,
‘ সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে হবে ভাবতেই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমি কি করবো! ‘
‘ ভালোবাসবে। তোমার কাজই হলো একমাত্র আমাকে বেশি বেশি ভালোবাসা। বাদ বাকি দুনিয়াদারি আমি দেখছি। তুমি আমার দিকে ধ্যান দাও। দেখবে ভালোবাসার চাপে মন খারাপ করার সুযোগ পাচ্ছো না।
রসিকতায় ভরা কন্ঠ-টা শুনামাত্র নাজরাত ধুম করে কিল মারল সাদিফের বাহুতে। সাদিফ উচ্চ স্বরে হাসল। পূণরায় নাজরাতকে কাছে টেনে ওষ্ঠে গভীর চুমু এঁকে বলে উঠলো,
‘ ভুল কি বলেছি? আমার এতগুলো বছরের অপেক্ষা অবশেষে ফুরাচ্ছে। আর তুমি বেঁকে বসেছ। যদি মনে হয়ে থাকে তোমার এসব কান্নাকাটি দেখে আমি গলে যাব, তবে ভুল ভাবছ। আমি এবারে গলছি না। যত কান্নাকাটি সব শুনবো আমার বেডরুমে, আমার বেডে। এর আগে না.. ‘
শেষ বাক্যগুলো শুনে লজ্জায় কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো নাজরাতের। সে আশ্চর্য কন্ঠে শুধালো,
‘ আপনাকে আমি ভদ্র ভেবেছিলাম। কিন্তু আপনি দেখছি মহা অসভ্য! ‘
‘ এখনো ঠিকঠাক অসভ্যতামি করলাম কোথায়? করার পর রেটিং করবে যে, কতটুকু অসভ্য। ফুল মার্ক দিতে পারো চাইলে। আমি একটুও মাইন্ড করবো না। ‘
চোখ টিপ মেরে প্রতিউত্তরে বলা কথাগুলো শুনে নাজরাতের চোয়াল ঝুলে গেল৷ এ কি শুনছে সে! এ কোন রূপ তার ভদ্র সভ্য বরটার!
‘জাহুরা খান’ খান পরিবারের খুটি হিসেবে গণ্য করা হয় যাকে। উনার স্বামীর ভিটেমাটি সিলেট বলে, সেই স্থান ছেড়ে সহজে কোথাও যান না তিনি। সিলেটে তাদের অর্থবিত্তের কমতি নেই। উনার পছন্দের, ভালোবাসার স্থানটি হলো সিলেট। তাইতো প্রথম নাতবউ ঘরে তোলার সকল রীতি-অনুষ্ঠান তিনি সিলেটেই করতে চান। উনার এই আদেশে দুই দিন যাবত বেশ মন কষাকষি চললো দুই পরিবারের মধ্যে। নাজরাত দের সকল আত্মীয় সজন ঢাকাতেই। সাদিফের ক্ষেত্রেও তাই। তাছাড়া সিলেটে গিয়ে কোথায় উঠবে নাজরাতের পরিবার? কতশত প্রস্তুতির ব্যাপার রয়েছে। কিন্তু এসব যুক্তি ফিকে পড়ল জাহুরা খান’র জেদের সম্মুখে। সিলেটে মেইন খান বাংলোর পাশাপাশি আরও একটি বাংলো রয়েছে। আয়তনের দিকে এবং উচ্চতায় কিঞ্চিৎ পার্থক্য থাকলেও নাজরাতের পরিবারের বিশেষ সমস্যা হবে না বলেই ধারণা।
তাছাড়া শতজন আত্মীয় আরামছে দিন কাটাতে পারবে সেখানে। তাই তিনি চান পাশাপাশি দুটো বাংলো থেকেই দুই পক্ষের আনুষ্ঠানিক কার্যের আয়োজন করা হোক। দুই পক্ষের সকল কিছু যেন নিজ চোখে দেখতে পারেব তিনি। প্রথমে দ্বিমত পোষণ করলেও একপর্যায়ে গিয়ে কনে পক্ষ-কে নত হতেই হলো। সিদ্ধান্ত হলো, সিলেটেই হবে সকল আনুষ্ঠানিকতা। যার কারণে গিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের দুই তিন দিন পূর্বেই নাজরাতের পরিবারকে হাজির হতে হবে সিলেটে। জাহুরা খানের বদৌলতে বিশেষ কিছু নিয়ে চিন্তা হতে হলো না৷ তবুও বিয়ে যেহেতু, কাজ তো আর একটা নয়। সাদিফ-রা পৌঁছে গিয়েছে হলুদের চার দিন পূর্বেই। সকল কেনাকাটা সেরে নিয়েছে ঢাকা থাকা অবস্থাতে। পরের দিন নাজরাতদের রওনা দেওয়ার কথা।
এদিকে নাজরাত জেদ ধরলো সঙ্গে করে সায়েরীকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বিয়ে যেহেতু। একজন সঙ্গী তো প্রয়োজন হবে তার। সাদিফের ঘর থেকে সাফ্রিন কিংবা নিশি এসে তো কোনো রূপ সাহায্য করতে পারবে না তাকে। তাছাড়া বছর দেড়েকের ছোট সায়েরী ছাড়া অন্য কোনো কাজিন নেই তার। যে সঙ্গে যাবে৷ এজন্য সায়েরী-ই শেষ ভরসা। এদিকে আবরারের কানে একথা উঠামাত্র ছেলেটা বাঁধ সাধল৷ কিছুতেই এতগুলো দিন পূর্বে সায়েরীকে যেতে দিতে রাজি নয় সে। তার এক কথা, হলুদের দিন আমাদের সঙ্গে গিয়ে সঙ্গে ফিরে আসবে। দুই ভাই বোনের চাপে সায়েরীর দমবন্ধকর অবস্থা তখন। বড় ভাইয়ের সম্মুখে গলা উঁচিয়ে যেতে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছেটুকু প্রকাশ করার সাহস হলো না তার।
এদিকে আবরারের বাঁধা শুনে নাজরাত কেঁদেকেটে এককার। তার হাল দেখে আবরারের বাঁধা স্বত্তেও তার বাবা অনুমতি দিয়ে দিলেন যাওয়ার জন্য। দুই বোন একত্রে থাকবে এতে এত নাটক করার কি আছে? ঘরের মেয়ে ঘরের মানুষের সঙ্গেই তো যাচ্ছে। আবরার চুপচাপ শুনল, এবারে আর বললো না কিছু৷ অনুমতি পাওয়া মাত্র সায়েরীর খুশি দেখে কে। নাজরাতের বিছানায় গড়াগড়ি খেয়ে উৎফুল্ল চিত্তে মিনিট কয়েক লাফাল সে। সিলেটে যাবে! সিলেট! তা-ও আবার থাকবে গোটা একটা সপ্তাহ। বোনের বিয়ে! নাচ, গান, আড্ডা, ঘুরাঘুরি আরও কত কি! ইশ ভাবতেই তার পেট গুড়গুড় করছে খুশিতে। সে নিজের সঙ্গে নাজরাতকে ও টেনে নিল। বিয়ের জন্য রেডি করে রাখা স্টেপগুলো আগাম চর্চা চালালো বিছানায় দাঁড়িয়ে, ভীষণ এলোমেলো ভাবে।
সিলেট! প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যের অন্যতম এক উদাহরণের সন্ধান মিলে যেখানে। রৌদ্রজ্বল দুপুরে জ্বলজ্বল লাল রশ্মি আলোকিত করে তোলা সবুজের সমারোহ এই জায়গাটা মুগ্ধ নয়নে দেখছে সায়েরী। এই প্রথম সিলেটের পথে আগমন ঘটেছে তার। প্রতিটি রাস্তা,প্রতিটি সরু, মোটা গাছ, পাতা, নদী তাকে বিমোহিত করছে ক্ষণে ক্ষণে। তার ডাগরডোগর চোখজোড়ায় ভরপুর অনুরক্তি। হৃদয় জুড়ে প্রদীপ্তি৷ উচ্ছ্বাসিত তনু,মন। চঞ্চল সত্ত্বা মিশে যেতে চাইছে এই বিচিত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অতল গহ্বরে। গাড়ি যখন খান বাংলোর সরু পথে বাক ফেরালো, সায়েরী বিমোহিত হয়ে দেখল দুই ধারে লম্বাকৃতির সারি সারি নারিকেল গাছ দাঁড়ানো। মাঝে পিচঢালা রাস্তায় এগিয়ে চলছে তাদের গাড়ি। রাস্তাটাতে উঠতেই পাশ থেকে নাজরাত ধীর কন্ঠে সায়েরীর উদ্দেশ্য বলে উঠলো,
‘ চলে এসেছি। এই রাস্তার শেষ মাথায় বাংলো বাড়ি। ‘
সায়েরী সোজা হয়ে বসলো এবারে। যাত্রা ফুরিয়েছে উপলব্ধি করতে পেরে দীর্ঘ কয়েক ঘন্টার উৎসুক নয়ন জোড়ায় ক্লান্তি নেমে এলো। এতক্ষণ উপলব্ধি করতে না পারলেও এখন বুঝল, তার চোখ দুটো জ্বালা করছে ঘুমের তাড়নায়। তবুও নিজেকে স্থির রাখল সে৷ কালো এবং সোনালী রঙের কারুকার্য শোভিত লোহার বিশাল গেইটের সম্মুখে হর্ন বাজাতেই দুই ধার খুলে গেল ভেতর হতে৷ নজরে আসলো পুরনো আমলের বিশাল এক বাংলো বাড়ি। পুরনো হলেও অধিকাংশ দিকে আধুনিকতার ছোঁয়া রয়েছে। উচ্চতায় ৪০ ফিট উঁচু, এবং অনেক চওড়া বাংলো বাড়িটার পাশে তার চেয়ে খানিকটা ছোট আকৃতির আরও একটি বাংলো রয়েছে। মূলত এখানেই অবস্থান করবে কনে পক্ষ-রা। সেই বাংলো-টাও কোনো অংশে কম নয়।
বড় সাবলীল ভাবেই স্থান পেয়ে যাবে অতিথি গণ। গাড়িতে বসেই কৌতুহলী নজরে সব কিছু পরখ করছিল সায়েরী। এদিকে নাজরাতের পরিবার অনেক আগেই নেমে গেছে। অন্য দিকে বাংলো বাড়ির ভেতর হতে সাদিফ – সহ তার বাবা,ভাই-রা এগিয়ে এসেছে অতিথিদের স্বাগতমে। ভাবনায় বিভোর সায়েরীর নাম ধরে একাধিক কন্ঠের ডান শুনে হুশ ফিরল তার। ‘আসছি’ বলেই তড়িঘড়ি করে কিঞ্চিৎ জোর প্রকাশ করে খুলল গাড়ির দরজাটা। সঙ্গে সঙ্গে ‘ধরাম’ করে ধাক্কা লাগলো কিছু একটার সাথে। ভেসে আসলো পুরুষালী কন্ঠের ক্ষীণ আর্তনাদ, ‘আহ!!’
নিচের দিকে ঝুঁকে লাগেজ তুলতে উদ্যত হওয়া সাহিল কপাল চেপে ধরল। এক পলকের জন্য কুঁচকে গেল তার চোখ,মুখ। সে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল ব্যথা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। তার কন্ঠস্বর শুনামাত্র গাড়ির জানালা দিয়ে হুট করে বেরিয়ে আসলো একটি চেনা পরিচিত মেয়েলী মুখশ্রী। যার চোখ দুটোতে উদ্বেগ, কিঞ্চিৎ অপরাধবোধ। দুজনের দৃষ্টি মিলন হওয়া মাত্র দাঁত দিয়ে জিহ্ব কাটলো সে। দ্রুত গলায় আওড়াল,
‘ স্যরি, স্যরি! খুব স্যরি ভাইয়া। অ..আমি আসলে খেয়াল করিনি আপনি এখানে..স্যরি..! ‘
কন্ঠ-টা শুনামাত্র সাহিলের ঘোর কাটলো। এতগুলো মাস পর আজ ফের সায়েরীকে সামনে থেকে দেখে এক মুহুর্তের জন্য বিমোহিত হয়ে পড়েছিল সে। সায়েরীর কন্ঠ শুনে সে নিজেকে ধাতস্থ করলো। জোরপূর্বক হেসে জবাব দিল,
‘ ইট’স ওকে। আমি ঠিক আছি। ‘
বিনিময়ে সায়েরী-ও একটু খানি হাসলো অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে। পরপরই নেমে গিয়ে দাঁড়ালো নাজরাতের পাশে। সাদিফের মা-বাবার সঙ্গে এই প্রথম দেখা হলো তার। সে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করলো সকলের সঙ্গে। নাজরাত নিজের নতুন পরিবারের সঙ্গে কথা বলায় মশগুল। সাহিল, ইভান, রূপম সঙ্গে দুজন কর্মচারী নিয়ে সকল ব্যাগপত্র কনে পক্ষের জন্য বরাদ্দকৃত বাংলো তে স্থানান্তর করতে লাগলো। এদিকে নাজরাতের পরিবারের সকলে প্রথমেই গেল খান বাংলোর দিকে। উদ্দেশ্য, সকলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। প্রবেশপথে অপেক্ষারত জাহুরা খান। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন খান বাড়ির বড় কর্ত্রী নওশাদ খান’র স্ত্রী, মিসেস তাহুরা খান। হালকা নীল রঙের শাড়ি গায়ে, হালকা কুঁচকানো চামড়ার বৃদ্ধা-টাকে দেখে সায়েরী ভ্রুঁ কুঁচকে তাকাল। বয়স অনুযায়ী এখনো অনেক খানি স্ট্রং দেখাচ্ছে জাহুরা খান’কে। চুলের অধিকাংশ অংশ-ই কালো। উনাকে আগাগোড়া পরখ করে নাজরাতের বাহু ঘেঁষল সে। ফিসফিস কন্ঠে শুধালো,
‘ তুই তো বলেছিলি তোর নানী শ্বাশুড়ি মরে হাড্ডি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উনি তো হিরোইনদের মতো স্টাইল মেরে দাঁড়িয়ে আছে। কি স্ট্রং দেখতে! এত সহজে মরবে বলে তো মনে হচ্ছে না। ‘
নাজরাত ভড়কে গেল এহেন কথায়৷ সে চোখ পাকিয়ে তাকাল সায়েরীর দিকে। ইশারায় বললো যেন মুখ বন্ধ রাখে। সায়েরী অনাগ্রহী দৃষ্টিতে দেখল তা। বাধ্য হলো মুখ বন্ধ রাখতে।
নাজরাতের পরিবারের সকলকে অমায়িকভাবে স্বাগতম জানালো খান পরিবারের সকলে। সকলের মধ্যমনি নাজরাতকে তারা ঘিরে রেখেছে। সাফ্রিন উচ্ছ্বসিত বদনে সায়েরীকে ঝাপটে ধরে। এতজনের মাঝে ডাইনিং স্পেসে সামান্তার সঙ্গে দন্ডায়মান মানবটা নজর কাড়লো সায়েরীর। কালো টি-শার্ট, ট্রাউজার পরে দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। দুজনের নিরব দৃষ্টি মিলন ঘটলো সেকেন্ড দুয়েকের জন্য। ভিড়ের মাঝে সায়েরীকে দেখাল ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। ঠিক তখনই তার কাঁধ স্পর্শ করলো কেউ। ঘাড় ফিরাতেই নজরে আসলো তাহুরা খান’র হাসিমুখ। সায়েরী মিষ্টি কন্ঠে সালাম জানাতেই তিনি প্রতিউত্তর করে শুধালেন,
‘ সায়েরী! কত বছর পর দেখছি তোমাকে। কেমন আছো মা? ‘
সায়েরীর বুক কাঁপে দুরুদুরু। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রমহিলা কেবল তার বান্ধবীর মা হলে এতটা অস্বস্তি লাগতো না। কিন্তু এখন তো শুধু বান্ধবীর মা ভাবতে পারে না। সম্পর্কের সমীকরণে যে অন্য কিছু-ও যোগ হতে যাচ্ছে৷ তাই তার অস্বস্তি লাগছে, কিঞ্চিৎ ভয়-ও লাগছে। তবুও নিজেকে সংযত রাখল সে। প্রতিউত্তর করলো ধীর কন্ঠে। তাহুরা খান হাসি মুখেই সোফায় বসালো তাকে। নিজেও বড্ড আগ্রহী হয়ে বসলেন পাশে। পুণরায় প্রশ্ন করলেন একের পর এক। সায়েরী নিজেকে শান্ত, ভদ্র রমণীর মতো দেখানোর প্রয়াস চালিয়ে সব কথার জবাব দিতে লাগলো নম্র কন্ঠে। তার নম্র ব্যবহার দেখে একপর্যায়ে তাহুরা খান বলেই ফেললেন,
‘ ছোট বেলায় কত দুষ্টু ছিলে তুমি। তিন বছর আগে দেখা হয়েছিল৷ তখন-ও অনেক চঞ্চল ছিলে। এখন কত নম্র হয়ে গিয়েছ! মাশা আল্লাহ! ‘
উনার কথাটুকু কর্ণধার হওয়া মাত্র বিষম খেয়ে গেল সাফওয়ান। সাফ্রিন ফিক করে হেসে দিল।নাজরাত বহু কষ্টে ঠোঁট ঠোঁট চেপে রাখল। তিনজনের এমন কৌতুকপূর্ণ হাসি অন্য কেউ বুঝতে না পারলেও সায়েরী স্পষ্ট বুঝল। সে চোখ পাকিয়ে তাকাল সাফওয়ানের দিকে। যা দেখামাত্র নাকের নিচে তর্জনী ঘষে অধর কোণে ফুটতে চাওয়া হাসিটুকু গিলে ফেললো সাফওয়ান।
রূপসাকে পূর্ব হতে চেনা হলেও আজই প্রথম দেখা পেল সায়েরীর সাথে। বড় সাচ্ছন্দ্যে কথাবার্তা বললো দুজন। সকলের সঙ্গে কথাবার্তায় কেটে গেল প্রায় ঘন্টাখানেক সময়। এক পর্যায়ে ভেতর ঘর হতে ফিরে এসে সাফ্রিন সকলের উদ্দেশ্যে বললো যেনো অতিথিদের খাবার খাইয়ে রেস্ট করার সুযোগ দেওয়া হয়। লম্বা সফর করে এসেছে কি-না। সকলের টনক নড়ে একথায়। তাড়া দেয় যেন ফ্রেশ হয়ে এসে খাবার খেয়ে যায়। সায়েরী স্বস্তির শ্বাস ফেললো৷ খিদের জ্বালায় পেট চুকচুক করছে তার। ঘুমে ভেঙ্গে আসতে চাইছে চোখদুটো। সে সাফ্রিনের বাহুতে মাথা স্পর্শ করে মৃদু কন্ঠে শুধালো,
‘ উফ!! একমাত্র তুই-ই বুঝলি আমার দুঃখ। ক্ষুধায় মরে যাচ্ছি আমি। ‘
‘ আমি না। তোমার তিনি বুঝেছে। আমাকে হুকুম দিয়েছে যেন সবাইকে একথা জানিয়ে দিই। দূর থেকেও তোর অবস্থা বুঝে ফেলল। দেখেছিস কত ভালোবাসা আমার ভাইয়ের! আরেকবার উল্টাপাল্টা বদনাম করলে তোর খবর আছে। ‘
সাফ্রিনের দৃঢ় কন্ঠের কথাটুকু শুনে সায়েরীর অধর কোণে হাসি ফুটে। সে চোখ তুলে খুঁজে বেড়ায় নির্দিষ্ট মানবটাকে। কিন্তু নজরে আসে না। বোধহয় এত কোলাহলের মাঝে বিরক্ত হয়ে ফিরে গিয়েছে নিজের রুমে। সায়েরী-ও বিশেষ মাথা ঘামাল না। বাকিদের সঙ্গে রওনা হলো নিজেদের জন্য বরাদ্দকৃত বাংলো বাড়িটার দিকে। পেছনে তখনো একজোড়া মুগ্ধ দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে তার দিকে। সফট পিঙ্ক গোল জামা পরিহিতা সায়েরীকে যতক্ষণ দেখা গেল ততক্ষণ তাক করে রাখল দৃষ্টি। মেয়েটার লম্বা বিনুনি দোল খাচ্ছিলো কোমরের নিচ অবধি৷ কাঁধের একপাশে ছড়িয়ে রাখা সিল্কের দোপাট্টা-টা জমিন ছুঁয়ে যাচ্ছিলো। দৃষ্টি সীমা হতে সায়েরীর বদন খানা মিলিয়ে যেতেই চোখ বুজে ফেলল সে। ভাবল, মেয়েটার প্রতি পুণরায় এমন আকৃষ্ট হওয়ার কারণ কি?
দুপুরের পর খাওয়া দাওয়া করে বিশ্রাম নিতেই পার হয়ে গেল দিনটা। আগামী কাল এবং তার পরের দুই দিন গ্যাপ রয়েছে৷ চতুর্থ দিন হতেই তোরজোর শুরু হবে বিয়ের। আজকের দিনটা কেটে গেল যেনতেন ভাবে। বিকেলের দিকে দীর্ঘ ক্ষণ বৃষ্টি ঝড়ল। থেমেছে সন্ধ্যার শেষ প্রহরে। এদিকে সাদিফের ভাইয়েরা মিলে আচানক বার বি কিউ পার্টির প্ল্যান করে বসলো। বাড়ির সম্মুখে বিশাল বড় খোলা যায়গা। দক্ষিণে একটি পুকুর-ও রয়েছে। বাধাই করা ঘাট। বসার জন্য জায়গা-ও রয়েছে বড়সড়। পরিকল্পনা করা হলো সেই স্থানেই দুই বাংলো বাড়ির সকল ইয়াং স্টার-রা মিলে পার্টি করবে। পরিকল্পনা মতো সব কিছু প্রস্তুত করে ফেললো তারা। আলো হিসেবে কাঠ জ্বালিয়েছে। যেন পুরোদমে পিকনিকের ফিল আসে। নিশি একাই সামলে নিল অধিকাংশ কাজ। তিনটে ম্যাট বিছিয়ে সেথায় গোল হয়ে বসেছে সকলে। অপেক্ষা সায়েরী এবং নাজরাতের।
সামান্তা-সাম্য উল্লাসের সহিত গিয়ে ডেকে নিয়ে আসলো দুজনকে। ফুল স্লিভ নেভি ব্লু কামিজ নাজরাতের গায়ে। দোপাট্টা ছড়িয়ে রাখা দুই কাঁধে। অন্যদিকে সায়েরীর পরণে জিন্সের সঙ্গে লেভেন্ডার কালারের ক্রপ টপ। হাই পোনিটেল করে বাধা চুল। জিন্স কালারের সঙ্গে ম্যাচিং স্কার্ফ গলায় পেছানো। বাড়ির বাহিরে পা রাখতেই শীতল আবহাওয়ায় গা শিরশির করে উঠলো তার। ম্যাট-এর উপর বসে থাকা সকলের গায়ে হালকা ভারী কাপড়৷ নাজরাত গিয়ে বসলো তার জন্য নির্দিষ্ট জায়গাটাতে। সাদিফের পাশে। অবশিষ্ট খালি জায়গা রয়েছে আরও চারটি। সাম্য-সামান্তা গিয়ে বসতেই অবশিষ্ট রইলো দুটো। একটি নিশির পাশে। সে সায়েরীকে দেখে নিজের বর ইফাজের দিকে আরও খানিকটা চেপে বসে জায়গা করে দিল। হাসিমুখে সায়েরীকে ডাকতেই নিচ্ছিল এমন মুহুর্তে তাকে অবাক করে দিয়ে সায়েরী আগপিছ না দেখে, না ভেবে সাফওয়ান এবং রূপসার মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানটাতে বসে পড়লো বিনাবাক্যে। অন্যরা নিজ কাজে মশগুল থাকলেও নিশি এবং সায়েরীর পার্শ্ববর্তী রূপসা বেশ অবাক হলো এই কান্ডে। কারণ টা নিঃসন্দেহে সাফওয়ান।
সায়েরী যে বিশেষ কিছু না ভেবেই বসে পড়েছে এটা তারা বুঝেছে। কিন্তু এক পলকের দুজন স্থির হয়ে গেল সাফওয়ানের প্রতিক্রিয়া কি হবে সেটা ভেবে। নিজের পরিবার এবং নির্দিষ্ট কিছু আপনজন ব্যতীত অন্য কারো সঙ্গেই যে সাফওয়ান বিশেষ সখ্যতা গড়ে তুলতে পছন্দ করে না, এটা তাদের বেশ জানা আছে। এতগুলো বছরে নিশির সঙ্গে-ও বিশেষ কোনো আলাপ কখনো হয়নি তার। সেখানে সাদিফের বউয়ের কাজিন তার পাশ ঘেঁষে বসেছে। এই বিষয়ে তার মেজাজ তুঙ্গে উঠার কথা। নিশি,রূপসা শ্বাস আটকে বসে। যেন আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে এই বুঝি সায়েরীর উপর গর্জে উঠবে সাফওয়ান। কিন্তু দুজনের মনোভাব সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে সাফওয়ান খানিকটা নড়েচড়ে বসে আরও খানিকটা জায়গা ছেড়ে দিল সায়েরীর জন্য। সায়েরী বেশ আরাম করে বসল। তার ছোট্ট দেহের কোমল বাহু লেপ্টে রয়েছে সাফওয়ানের বলিষ্ঠ বাহুর সঙ্গে। বিন্দুমাত্র জায়গা ফাঁকা নেই দুজনের মাঝে। নিশি এবং রূপসা হতবিহ্বল। নিজেদের চোখ-কে যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। বিশ্বাস হচ্ছে না যে সাফওয়ান চুপচাপ সায়েরীর পাশ ঘেঁষে বসে রয়েছে। তার ভাবভঙ্গি ভীষণ স্বাভাবিক। দুইহাতের মাঝে মোবাইল চেপে স্ক্রল করছে তা। সকলের অগোচরে বার কয়েক তাকিয়েছে পাশে বসা সায়েরীর দিকে। যে নিশির ছেলে নাহিয়ানের সঙ্গে হাসি তামাশায় মশগুল।
নিশি এবং রূপসা এক মুহুর্তের জন্য অবাক হলেও পরবর্তীতে নিজেদের সামাল দিল। ভাবল, নতুন আত্মীয় আবার সাফ্রিনের বান্ধবী বলেই হয়তো কিছু বলছে না। এজন্য তারা-ও বিশেষ মাথা খাটালো না। সাহিল, ইভান এবং রূপসা মিলে প্লেটে চিকেন, গার্লিক বাটার নান, ক্যাচাপ এবং সালাদ সার্ভ করে একে একে সবার দিকে বাড়িয়ে দিল। সঙ্গে রয়েছে ছোট সাইজের একটি করে কোল্ড ড্রিংক্স। বাচ্চা তিনজন হইহই করে উঠলো খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে। একপ্রকার হইহট্টগোল নিয়েই খাওয়া আরম্ভ করলো সকলে। খাওয়ার চেয়েও আড্ডা চলছে বেশি। সাহিল, ইভান, রূপম, রূপসা এবং সাফ্রিনের কথা কাটাকাটি, ঝগড়া দেখে বাকিরা হাসছে, উল্লাস করছে। কোল্ড ড্রিংক্স-এর বোতলে ঠোঁট চেপে চুমুক বসিয়ে সায়েরী উপভোগ করছিলো সাফ্রিনের কাজিন সমাবেশের ঝগড়াঝাটি। চুমুক দিয়ে সবে মাত্র হাত নামিয়েছে, এমন সময় তার হাত হতে ছিনিয়ে গেল বোতলটি৷ চকিতে ফিরে তাকালো সে। আধখাওয়া কোকের বোতল-টি ততক্ষণে স্থান পেয়েছে সাফওয়ানের পুরু ওষ্ঠদ্বয়ের মাঝে। এক ঢোকেই অর্ধেকের বেশি কোক চালান হয়ে গেল পেটে। সায়েরী হতভম্ব হয়ে গেল আকস্মিক এই কান্ডে। তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ জানাল মিহি স্বরে,
‘ এটা আমার এঁটো কোক… ‘
তার কন্ঠস্বর ক্ষীণ। বাকিদের উচ্চ কন্ঠের ঝগড়াঝাটি ছাপিয়ে এই স্বর অন্য কারো কানে যেতে অক্ষম। কিন্তু সাফওয়ানের অন্যপাশে আরামে বসে খাওয়ায় মশগুল সাদিফের কানে আচমকা ঝংকার তুললো এই কন্ঠস্বর। চিকেনে কামড় বসানো অবস্থা-তেই সে ফ্যালফ্যাল নজরে তাকাল সাফওয়ান-সায়েরীর দিকে৷ সায়েরীর হতভম্ব কন্ঠের বিপরীতে সাফওয়ান নির্বিকার দৃষ্টিতে থাকিয়ে শুধালো,
‘ ওহ! আমি খেয়াল করিনি। এই নাও.. ‘
আধখাওয়া বোতলটি সে বাড়িয়ে দিল পুণরায়। সায়েরী চোখ ছোট ছোট তাকায়। হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বলছে খেয়াল করেনি! বাড়ন্ত বোতলটি না ছুঁয়ে সে ঝুঁকে এসে প্লেটের পাশ হতে সাফওয়ানের জন্য বরাদ্দকৃত কোক-টি হাতিয়ে নিল। নাক, মুখ কুঁচকে বোতলটাতে চুমুক দিতে দিতে শুধালো,
‘ আপনার এঁটো আপনি-ই খান। ‘
সাফওয়ান ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসে। পুণরায় চুমুক দিয়ে কৌতুক পূর্ণ কন্ঠে প্রতিউত্তর করে,
‘ যেটা খেয়েছ সেটাও আমার এঁটো করা। ‘
সায়েরী বিষম খেয়ে গেল একথা শুনে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি হতভম্ব দেখাল সাদিফ কে। সেই যে চিকেন মুখে তুলেছে এখনো কামড় দেওয়ার বুদ্ধিটুকু হয়নি তার। মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে। পার্শ্ববর্তী দুই মানব-মানবীর কন্ঠস্বর যদিও কানে এসেছে ভীষণ ক্ষীণ ভাবে। কিন্তু দুজনের এই বোতল অদল বদলের দৃশ্য বুঝিয়ে দিচ্ছে অনেক কিছু। সাদিফ হতবিহ্বল চিত্তে চিকেনের অংশটুকু নামিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল নাজরাতের দিকে। আশ্চর্য কন্ঠে শুধালো,
‘ ওখানে কি হচ্ছে? ‘
‘ যেটা এখানে হচ্ছে না। ‘ নাজরাতের থমথমে কন্ঠ।
সাদিফ আরেকদফা ভড়কাল। নাজরাত সেই দুপুর থেকেই অজ্ঞাত কোনো কারণে রেগে আছে সাদিফের উপর। সাফওয়ান – সায়েরীর দৃশ্যটুকু সে দেখেছে। বিশেষ প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়নি তার মাঝে। সাদিফের হতভম্ব ভাব দেখে তার হাসি পেল। কিন্তু হাসলো না। গম্ভীর হয়ে রইলো। সাদিফ আপাতত বউয়ের রাগ, ক্ষোভ উদঘাটনের চিন্তায় নেই। তার ধ্যান, জ্ঞান সব সাফওয়ান – সায়েরীকে ঘিরে। দুজন কি প্রেম করছে? এই সুক্ষ্ম চিন্তাটুকু মস্তিষ্কে খেলে যেতেই তার ব্রেন স্ট্রোক করার মতো অবস্থা হলো। তার রগচটা ভাইটা কি-না প্রেম করছে? তা-ও এতটা লুতুপুতু প্রেম? হেসে হেসে গোপন আলাপ, বোতল আদান – প্রদান। মাই গড! এই দিন-ও কি দেখার ছিল তার? অতিরিক্ত চিন্তায় আচমকা তার কাশি উঠে গেল। নাজরাত দ্রুত পানি এগিয়ে দিল তাকে। সাদিফ এক ঢোকে অনেকখানি পানি পান করলো। নাজরাতের হাসি পেয়ে গেল তার অবস্থা দেখে। সে সাদিফের বাহুতে হাত বুলিয়ে কৌতুক মাখা গলায় আওড়াল,
‘ এত অবাক হওয়ার কিছু নেই। শুরুতে আমিও এক রাত অজ্ঞান ছিলাম। তোমার-ও সয়ে যাবে। নাও, পানি খাও। ‘
সাদিফের কপালদ্বয়ের মাঝে সুক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। আশ্চর্য কন্ঠে শুধালো,
‘ তুমি জানতে? ‘
‘ অবশ্যই। এতে না জানার কি আছে? আমার বোন আর আমি জানবো না? ‘
‘ তুমি জানতে অথচ আমাকে বলোনি? এটা কেমন কথা? ‘
‘ যখন জানতে পেরেছি তখন আমারও ঠিক এমনই ব্রেন ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। তোমাকে এত সহজে জানিয়ে দিলে আজ দেখে এত আশ্চর্য হতে? এজন্যই বলিনি। আমিও গোটা এক রাত চিন্তায় চিন্তায় অস্থির ছিলাম। তুমিও হও। আমার বর বলে কথা। সব কিছুতে সমান সমান না হলে চলে? ‘
সাদিফ বিষ্ময়ে বিমূঢ়। এই দিন আদৌও দেখার ছিল তার! আর কত আশ্চর্য হবে সে? এ কেমন বউ জুটেছে কপালে? এ কেমন ভাই জুটেছে? সাফওয়ান স্বাভাবিকভাবে কতটা ক্লোজ তার সঙ্গে। কিন্তু এত বড় একটা কথা কীভাবে চেপে যেতে পারলো? আর তার বউ! পেটে পেটে এত শয়তানি! বিয়ের তিন দিন আগে কিনা শোধবোধ নেওয়ার জন্য ব্রেক স্ট্রোক করানোর মতো খবর শুনালো তাকে! এ দিন-ও ছিলো তার ভাগ্যে?
খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষে সকলে ফিরে গিয়েছে যার যার স্থানে। খান বাংলোতে বড়রা সকলে তন্দ্রাঘোরে আচ্ছন্ন। ছোটরা ফিরেছে অল্প কিছুক্ষণ হলো। রূপসা নিজ রুমে পানির অভাববোধ করায় নিচে এসেছিল পানি পান করার জন্য। এসেই দেখল তার বড় ভাই রূপম চেয়ারে বসা। হাতে পানির গ্লাস। রূপসা তার পাশ হতে অন্য গ্লাসে পানি ডালতে ডালতে বলে উঠলো,
‘ না ঘুমিয়ে এখানে কি করছো ভাইয়া? কি ভাবছো এতো? ‘
রূপম গলা খাকাড়ি দিল। সন্দিহান কন্ঠে শুধালো,
‘ সায়েরী মেয়েটাকে আগে থেকে চিনিস না তুই? ও কি সাফার পুরনো ফ্রেন্ড? ‘
‘ হ্যাঁ। অনেক পুরনো ফ্রেন্ড ওরা। তুমি হঠাৎ ওর কথা জানতে চাইছ কেনো? ‘
‘ আজ বাইরে মেয়েটার সাথে সাফওয়ান ভাইয়ের বিহেভিয়ার খেয়াল করেছিলি? ‘
‘ উঁহু। কি হয়েছে? ‘ রূপদা ভ্রুঁ কুঁচকালো।
‘ দুই তিন বার খেয়াল করেছি। ভাই কতটা সফট বিহেভ করছিলো মেয়েটার সাথে। মেয়েটা কেমন অতিরিক্ত ছটফটে। নাহিয়ানের সঙ্গে খেলতে গিয়ে ক্যাচাপ ফেলেছিল ভাইয়ের জিন্সে। নাহিয়ানের ধাক্কাধাক্কি তে যে কোক উল্টে ফেলেছিল, সেটার অর্ধেক-ও ভিজিয়ে দিয়েছিল ভাইয়াকে। কিন্তু ভাই কিছু বললোই না। ভাবতে পারছিস কতটা ছাড় দিয়েছে? আর এমন ছটফটে মেয়েটা ভাইয়ের পাশে বসে ছিল অথচ ভাই কোনো রিয়েক্ট-ই করেনি। এটা তো ভারী চিন্তার বিষয়। ‘
রূপসা এবারে সত্যিই চিন্তায় বিভোর হলো। আসলেই তো। তাদের চেনাজানা সাফওয়ান ভাই তো এমন না। এতটা ছাড় দেওয়ার পাত্র তো সে নয়। তবে কেনো হঠাৎ এই মেয়েটার জন্য এমন নমনীয় ব্যবহার?
‘ ভাইয়া? তোমার ও মনে হচ্ছে সাফওয়ান ভাই সায়েরীকে পছন্দ… ‘
রূপসার কন্ঠস্বর থামে অর্ধেকে৷ দুই ভাই বোন চোখাচোখি হয়। রূপমের বুদ্ধিদীপ্ত মস্তিষ্ক এই কথায় ভাবছিলো। কিন্তু কেন যেন আবার দ্বিধায় ভুগছিল। কারণ সাফওয়ান ঠিক কেমন প্রকৃতির ছেলে সেটা তার হাড়ে হাড়ে জানা আছে। তাই যে দ্বিধান্বিত কন্ঠে শুধালো,
‘ কিন্তু মেয়েটা অতিরিক্ত ছটফটে। ‘
রূপসা আনমনে বলে উঠলো,
‘ আর অতিরিক্ত আদুরে-ও। ‘
একথা বলে সে নিজেও চিন্তায় বিভোর হলো। অনেক ভেবে ফের বলে উঠলো,
‘ আমার তো বিশ্বাস হচ্ছে না ভাই। কিন্তু.. কিন্তু আমিও অল্প সল্প খেয়াল করেছি। ভাই কতটা পারফেকশন মেইনটেইন করে কিছুতে। সেখানে সায়েরীর এমন অগোছালো ব্যবহার দেখেও কিছু বলেনি। এটা তো মানা যায় না। রিলেটিভ হয় বলে কোন বিষয়ে ছাড় দেওয়ার ছেলে তো নয় সে। ‘
‘ সেসব বাদ। মেয়েটা ভাইয়ের পাশে বসে ছিল, রূপ! ভাইয়ের মরজি না থাকলে কারো সাধ্য আছে ওর পাশ ঘেঁষার? এটা দেখেই তো মনে হচ্ছে.. ‘
পরবর্তী কথাটুকু বলতে গিয়ে রূপম নিজেও আটকে গেল। রূপসা বিড়বিড় করে আওড়াল,
‘ অসম্ভব! ‘
কিন্তু দুজনের মস্তিষ্কে তখনো চেপে বসেছে এই ব্যাপারটা। যা দেখেছে তা তো ফেলে দেওয়ার মতো না। অন্য কেউ হলে ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভাবে নেওয়া যেত। কিন্তু তাদের চেনাজানা ভাইটা টা যে কোনো এক মেয়েকে এত বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, অপছন্দের বিষয়গুলো-ও চুপচাপ মেনে নিচ্ছে এসব তো অবিশ্বাস্য ব্যাপার। এসব যে বিশেষ কিছু ইঙ্গিত করছে তা কি করে হালকা ভাবে নিবে?
পরের দিন বিয়ের কাজেই মশগুল হয়ে পড়লো সকলে। বড়দের যেন শ্বাস টুকু ফেলবার ফুসরত অবধি নেই। সব কিছুতে মাথা দিতে হচ্ছে। এদিকে সায়েরী আশায় ছিল বিয়ের আগে যেহেতু দুই তিন দিন গ্যাপ রয়েছে, কোনো একদিন সিলেট শহর ঘুরবে। কিন্তু তার সকল আশা ধূলিসাৎ হয়ে গেল সকলকে এমন কাজে মশগুল দেখে। তার সকল সমস্যার একমাত্র সমাধান, সব আবদারের ঝুলি যার কাছে বিলিয়ে দেওয়া যায় সেই মানুষটাকে পাওয়া যাচ্ছে না সকাল থেকে। কতবার ফোন দিল সায়েরী। অথচ সাফওয়ান কোথায় যেন নিরুদ্দেশ। সায়েরী অতিষ্ঠ হয়ে এবারে ফোন করলো সাফ্রিন কে। কল রিসিভ করে সাফ্রিন ‘হ্যালো’ বলা মাত্র শুনা গেল সায়েরীর অধৈর্য কন্ঠস্বর,
‘ এ্যাঁই? তোর ভাই কি প্রাইম মিনিস্টারের রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে আসন পেতেছে নাকি, হ্যাঁ? কতবার ফোন দিলাম, তুলছেই না। এত কিসের কাজ তার? ‘
সাফ্রিনের মোবাইল ছিল স্পিকারে। রুমে অবস্থানরত রূপসার চোখ ড্যাবড্যাব হয়ে উঠলো সায়েরীর কথাগুলো শুনে। এত ত্যাজ! এত অধিকার বোধ! গতরাত হতে মস্তিষ্কে বিধে থাকা সন্দেহ টা যেন সঠিক, এমনই ইঙ্গিত পাচ্ছে সে বারে বারে। এদিকে সাফ্রিন দ্রুত স্পিকার অফ করে মোবাইল কানে নিয়ে জবাব দিল,
‘ ভাই তো বাসায় নেই সায়ু। কোথায় গিয়েছে তা-ও জানি না। ‘
‘ আচ্ছা আচ্ছা। শান্ত হ তুই। আমি বলেছিলাম না আমার শহর তোকে ঘুরে দেখানোর দ্বায়িত্ব আমার? বলেছি যখন অবশ্যই ঘুরাব। ভাই আসুক। ‘
কথা শেষ করে সাফ্রিন ঘুরে তাকাল রূপসার দিকে। ভাবনায় বিভোর তার চেহারা দেখে আচনকা ফিক করে হেসে দিলো সে। মাথায় আলতো চাপড় মেরে বলে উঠলো,
‘ এত বেশি চাপ নিওনা রূপসা আপি। তুমি যা ভাবছ তা শতভাগ সত্য। ‘
রূপসার হতভাগ দৃষ্টি মিলিয়ে গেল না তখনো। সে কৌতুহলী কন্ঠে শুধালো,
‘ এটা কীভাবে সম্ভব সাফা? না মানে তুই ও জানিস। বড় মা জানে? এত সহজে মেনে নিলি? সায়েরী আর ভাইয়া তো দুই মেরুর দুজন। কোথাও ভুল হচ্ছে না তো? ‘
সাফ্রিন আরাম করে বসলো বিছানায়। দৃঢ় স্বরে বলে উঠলো,
‘ আমিও জানার পর কয়েক ঘন্টা যাবত অনেক ভেবেছি বুঝলে? ছোট থেকেই ভেবে এসেছি আমাদের মতো সেইম স্ট্যাটাসের, হাই প্রোফাইল কোনো রূপবতী মেয়ে আমার ভাবী হবে। কয়েক মাস আগ অবধিও এটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু যেদিন প্রথম সায়ুকে ভাইয়ার সঙ্গে দেখলাম। সায়ুর উদ্বিগ্ন চেহারা, ওর কান্না সব কিছু যে আমার ভাইয়ের জন্য ছিল এটা দেখে আমি থমকে গিয়েছিলাম। তুমি তো জানো কতশত মেয়ে ভাইয়ের জন্য পাগল ছিল। আবেগে ভেসে কত কি করেছিল। সেখানে আমার সায়ু ছিল একদম সাদা মনের। এই বছরের শুরুতেও ভাইয়া ওর লাইফের সব চেয়ে অপছন্দের মানুষটা ছিল। কিন্তু এখন, ওর সবটুকু সুখ, দুঃখ ভাইয়াকে ঘিরে। ওর ভালোবাসায় কোনো খাদ নেই আপি৷ এতগুলো বছর যাবত চিনি ওকে। অন্য মেয়েদের মতো ভাইয়ার রূপে ও আকৃষ্ট হয়েছিল ঠিক।
কিন্তু সেটা অনেক আগে। আমার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড, ব্যাংক-ব্যালেন্স কোনো কিছুর জন্য ভাইয়াকে হাত করার মতো মেয়ে নয় সে। আর ভাইয়াকে তুমি চিনো না? তার বাচাই করা মেয়েটা ভুল হবে বলে মনে হয় তোমার? প্রথম দিন আমার মনেও সংশয় ছিল। কিন্তু ভাইয়ার উপর আমার আস্তা ছিল বলে আর মেয়েটা সায়েরী বলেই এখন কিছু ভাবতে হয়না। সায়ু এখনো একটা মাটির পুতুলের মতোই। যাকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে সময় লাগবে না ভাইয়ার। অনেকটা গড়েও ফেলেছে। আমরা সায়ুকে শুরু থেকে জানি বলে ফিল করতে পারছি ওর পরিবর্তন টুকু। ভাইয়া আর সায়ুকে নিয়ে কথা বলতে গেলে সবাই যে সায়ুকে-ই নিচু দেখাবে৷ ওর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে এটা তোমার আমার চেয়েও ভাইয়া ভালো করে জানে।
জানে বলেই তো, সায়ুর সব ব্যাপারে ভাইয়া অনেক বেশি স্ট্রিক্ট, অনেক পজেসিভ। আর বাকি রইলো সৌন্দর্যের কথা, তবে তুমি নিজেই ভালো করে তাকিয়ে দেখিও সায়ুকে৷ ঠিক কোন মায়াজালে সাফওয়ান খান ফেঁসেছে তার জবাব নিজেই পেয়ে যাবে। সি ইজ অ্যা পিউর সোল আপি। সাফওয়ান তেহজিব খান’র জন্য সায়েরী সুবহা’র চেয়ে বেটার সোলমেট আর কেউ হতেই পারে না৷ কয়েক দিন শুধু সায়ুর সঙ্গে মিশে দেখো, আমার মতো তোমার-ও সব সংশয় দূর হয়ে যাবে। ‘
রূপসা বিভোর হয়ে শুনে গেল কথাগুলো। সাফওয়ানের বোন হিসেবে সাফ্রিন অনেকটা একই মেন্টালিটির, একই রকমের ম্যাচিউর। আজ সাফ্রিনের দৃঢ় কন্ঠের কথাগুলো শুনে রূপসা সত্যিই নিশ্চিত হয়ে গেল অনেক খানি। বাকিটুকু নিজ চোখে দেখার অপেক্ষা মাত্র।
সাফওয়ান ভোর বেলা বের হয়েছিল ঘর থেকে। ফিরেছে দশটা নাগাদ। একা আসেনি। সঙ্গে নিয়ে এসেছে একটি সফেদ রাঙা হায়েস। এই অসময়ে হায়েস ভাড়া করে আনার কোনো মানে খুঁজে পেল না কেউ। কিন্তু যখনই সাফওয়ান বললো, সকলকে নিয়ে ঘুরতে যাবে৷ তখনই হইচইপূর্ণ হয়ে উঠল সারা বাড়ি। এদিকে বাড়ির ছেলেরা কাজে মশগুল। মেয়েরা শুরুতেই প্রস্তুত যাওয়ার জন্য। সাদিফের ঘাড়ে-ও অনেক কাজ ছিল। কিন্তু বউ নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর লোভে সে নিজের ভাগের দ্বায়িত্ব টুকু সাহিলের কাঁধে তুলে দিয়ে বলে উঠলো,
‘ আমার বিয়ে। আমি কাজ করে নিজেকে হয়রান করার কোন মানে আছে? আমি ঘুরব,ফিরব, বিয়ে করবো। কাজ তো তোদের করার কথা। করে ফেল। তোদের বিয়েতে আমি পুষিয়ে দিব নে চিন্তা করিস না। ‘
সাহিল এবং ইভান হতাশ হয়ে তাকিয়ে থাকে। রূপমের-ও কাজের চাপ ছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কোনো কারণে সে ছোট ভাই রাহাতকে ঠেলে দিয়ে নিজে গিয়ে শুরুতেই আসন পেতে বসলো গাড়িতে। সঙ্গে সামান্তা-সাম্য। পরবর্তীতে উঠে আসলো রূপসা এবং সাফ্রিন। সাদিফ, সাফওয়ান অপেক্ষায় রইলো নির্দিষ্ট দুই রমনীর। অবশেষে দীর্ঘ আধ ঘন্টা পর গিয়ে দেখা মিললো দুজনের। নাজরাত এবং সাদিফ উঠে বসলো নিজেদের জন্য বরাদ্দকৃত সিটে। বাকি রইলো ড্রাইভিং সিট এবং ফ্রন্ট ফিট। গাড়ির মধ্য হতে তিন জোড়া কৌতুহলী দৃষ্টি স্থির হয়ে রইলো সাফওয়ান এবং সায়েরীর দিকে। সাফ্রিনের কথামতো রূপসা ভালো করে তাকিয়ে দেখল সায়েরীকে। অফ হোয়াইট টপ এবং ইয়েলো রঙের ফ্লোরাল লং স্কার্ট পড়েছে মেয়েটা। পায়ে একজোড়া হোয়াইট স্নিকার্স। লম্বা চুলগুলোতে খুব সুন্দর ফ্রেন্স বেনী করেছে৷ ফেলে রেখেছে কাঁধের ডানপাশে।
উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ গড়নের হাস্যজ্বল মুখশ্রী জ্বলজ্বল করছে সূর্য চুম্বনে। ডাগরডোগর চোখজোড়ায় কাজল লেপ্টেছে বোধহয়। তাইতো বিশেষ আকর্ষণ করছে চোখদুটো। ফুলোফুলো গাল, কিঞ্চিৎ বোঁচা নাক এবং সরু, পাতলা অধর যুগল যেন এই মুখের জন্যই বানানো। খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠা চেহারা-টার দিকে তাকিয়ে রূপবতী রূপসা নিজে-ও মুগ্ধ হতে বাধ্য হলো৷ এইটুকুনি মুখটাতে যেন রাজ্যের মায়া ঢেলে দিয়েছে সৃষ্টি কর্তা। রূপসা হেসে ফেললো সায়েরীর ছটফটে, চঞ্চল ভাব দেখে। এই মেয়ে একেবারে তার ভাইয়ের উল্টো স্বভাবের। দৃষ্টি সরাতেই দেখল তাদের গুরুগম্ভীর ভাইটা কেমন জুলুজুলু নজরে তাকিয়ে রয়েছে নিজের ছোট্ট প্রেয়সীর দিকে। সাফ্রিন ঠিকই বলেছিল৷ এই মায়াবী চেহারার দিকে কিয়ৎ ক্ষণ তাকিয়ে যে কেউ মায়ায় আটকাতে বাধ্য হবে।
সাফওয়ান গাড়ির দরজা খুলে দেওয়া মাত্র সায়েরী চট করে উঠে বসলো। পরপর ড্রাইভিং সিটে আসন পেতে বসলো সাফওয়ান। গাড়ি চলতে আরম্ভ হতেই ভাই বোনদের আবদারে বেজে উঠলো মিউজিক। তালে তালে লাফাচ্ছে সাম্য এবং সামান্তা। জানালার কাঁচ নামিয়ে রাখা। সেথায় কনুই ঠেকিয়ে বাহিরে দৃষ্টি ফেলেছে সায়েরী। গাড়ি মূল সড়কে উঠার পর পরই মুখ ছুটলো তার। কৌতুহলের যেন শেষ নেই। প্রতিটি বড় ছোট স্থান নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করছে সে সাফওয়ান কে। সাফওয়ান প্রত্যেকটার জবাব দিচ্ছে ধৈর্য নিয়ে, শান্ত সুরে। সাদিফ এবং রূপম আশ্চর্য হয়ে দেখে সাফওয়ানের এই নতুন রূপ। এই একটা মেয়েটা কেন্দ্র করে সাফওয়ান নামক ছেলেটা যেন পুরোপুরি বদলে ফেলেছে নিজেকে। তাদের চেনাজানা সাফওয়ান এবং সায়েরীর ব্যক্তিগত সাফওয়ান দুজনের মাঝে আকাশ পাতাল তফাৎ রয়েছে যেন।
ইকো পার্কের লাল গেইটের সম্মুখে গিয়ে থামল গাড়ি। একে একে সকলে নেমে ঢুকতে লাগলো ভেতরে। রূপম বলেছিল সঙ্গে যেন ব্যাগে করে জামাকাপড় নিয়ে আসে। কিন্তু সাফওয়ান নিষেধ করেছে। তার এক কথা, দূর থেকেই দেখবে যা দেখার। বেশি লাফালাফি করে গা ভেজানোর কোনো প্রয়োজন নেই। অগত্যা সকলে মেনে নিল সেকথা। তারা প্রথমেই আসলো সিলেটের অন্যতম সুন্দর স্থান মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত দেখার জন্য। মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত বাংলাদেশের বৃহত্তম জলপ্রপাতগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলায় অবস্থিত। জলপ্রপাতটি মাধবকুণ্ড ইকোপার্কের অংশ, যা প্রকৃতিপ্রেমী এবং পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান।
সায়েরী,নাজরাত বিমোহিত হয়ে দেখে পাহাড় হতে পানি গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য। ঝপঝপ শব্দে মুখরিত চারপাশ। চতুর্দিকে সবুজ পাহাড়, পাথুরে ভূমি এবং বয়ে চলা স্বচ্ছ জলধারা একে আরও মনোমুগ্ধকর করে তোলেছে। কত উঁচু থেকে যে পানি পড়ছে কে জানে! সাফওয়ানের বাহু জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সায়েরী মাথা উঁচু করে মোহিত নয়নে হা করে তাকিয়ে রইলো। সাফওয়ান একপলক তাকিয়ে দেখল ওর হা মুখ। মনের প্রশ্নটুকু যেন পড়ে ফেলেছে এমন করেই জবাব দিল,
‘ ১৬২ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে পানি পড়ছে। ‘
‘ হু! এত উঁচু? ‘ সায়েরীর বিবশ কন্ঠ।
সাফওয়ান ছোট্ট করে সায় জানাল ‘হুম’। সায়েরী আরও অনেক কিছুই জানতে চাইল। এবং সাফওয়ান শান্ত সুরে সবকয়টি প্রশ্নের জবাব দিল। জানালো, এই স্থানে দর্শনার্থীদের জন্য পিকনিক স্পট ও বসার জায়গা রয়েছে। এছাড়াও বর্ষাকালে সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়, কারণ বর্ষাকালে জলপ্রপাতের পানি প্রবাহ সবচেয়ে বেশি থাকে। উত্তর পেয়ে সায়েরী উতলা হয়ে উঠল বাকিদের সঙ্গে পানিতে নামার জন্য। ইতোমধ্যে সাফ্রিন, রূপসা, সামান্তা সাম্য পা ডুবিয়েছে পানিতে। সাদিফ একটি পাথরের উপর দাঁড়িয়ে নাজরাতের হাত ধরে তাকে উঠতে সাহায্য করছে। সেকেন্ডে ব্যবধানে নাজরাত নিজেও সঙ্গ দিলো বাকিদের সাথে। তাদের পানি ছুড়াছুড়ি দেখে সায়েরী ছুটে যেতে চাইল। পূর্বেই তার হাত টেনে থামিয়ে দিল সাফওয়ান। বললো,
‘ এভাবে কোথায় যাচ্ছো? জুতো খুলে যাও। স্কার্ট উপরে তুলো। কাপড় নিয়ে আসোনি। এই জামা যেন ভিজে না যায়। ‘
কথাটুকু শোনামাত্র সায়েরী চঞ্চল ভঙ্গিতে বসে পড়লো পাথরের উপর। দ্রুত হাতে স্নিকার্স খুলতে গিয়ে উল্টো প্যাচ বাঁধিয়ে ফেললো। তার অবস্থা দেখে সাফওয়ান নিজে হাটু গেড়ে বসলো সম্মুখে। প্রথমেই খুলে নিল জুতা জোড়া। অতঃপর স্কার্টের নিচে পড়া কালো লেগিংস টি গোড়ালি হতে খানিকটা উপর অবধি বটে দিল। তার ধৈর্যের সম্মুখে সায়েরী বরাবরই উতলা। এখনও সে অধৈর্য কন্ঠে তাড়া দিল,
‘ হয়েছে? সবাই আমাকে ফেলে আনন্দ করছে। তাড়াতাড়ি করুন না! ‘
বলতে না বলতেই সাফওয়ান হাত থামল। পরপর আবার সায়েরীর বাম হাতের লেডিস ওয়াস টাও খুলে নিল সে। কোনো কিছুতেই বাধ সাধল না সায়েরী। নিজের মোবাইলটা-ও সাফওয়ান কে সপে দিয়ে তৎক্ষণাৎ ছোট লাগাল সে। সাফওয়ান নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পূর্বে সম্মুখ হতে নাজরাত চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ সায়ু! আস্তে। পাথর গুলো খুব পিচ্ছিল। পড়ে যাবি। ‘
সায়েরী থামে। স্কার্ট উঁচু করে তুলে ধীরে সুস্থে এগোয়। ঠান্ডা পানিতে পা ছোঁয়াতেই শিরশির করে উঠে দেহ। পরপরই তার দিকে ছিটকে আসে বিন্দু বিন্দু জলকণা। সাম্য পানি ছুড়েছে। হাসছে খিলখিল করে। সাফওয়ানের নিষেধ থাকা স্বত্তেও সায়েরী উল্লাসে মেতে উঠে। নিচু হয়ে নিজেও সাম্য’র দিকে পানি ছুড়ে মারে। জলপ্রপাতের কলকল পানির শব্দের সঙ্গে মুখরিত হয় তাদের সকলের হাসির শব্দ।
একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোন কলে মগ্ন ছিল সাফওয়ান। কথার মাঝে আচমকা কানে আসল পিকচার ক্লিক করার ক্ষীণ শব্দ। সাফওয়ান কপালে ভাঁজ ফেলে পাশ ফিরে তাকালো। দেখল, তার চেয়ে কয়েক হাত দূরত্বে মোবাইল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাদিফ। ক্যামেরা ধরে আছে। সাফওয়ান সেটা দেখে পুণরায় নিজের দিকে তাকাল। সব তো ঠিকই আছে। এমন ঘটা করে ছবি তোলার মানে কি তাহলে? তার মনোভাব বুঝতে পেরে সাদিফ হেসে জবাব দিল,
‘ প্রেমিকার জুতো হাতে নিয়ে এমপি সাহেবের একমাত্র সু-পুত্র জুনিয়র খান সাহেব। ‘
ছবি আর হ্যাশট্যাগ দুটোই দারুণ তাইনা? ‘
সাফওয়ান মাথা নুইয়ে হেসে ফেললো। অতি সংক্ষেপে কথা শেষ করে মোবাইল পকেটে ঢুকালো। তার বাম হাতের আঙ্গুলের মাঝে সায়েরীর জুতা জোড়া ধরে রাখা। সাদিফের কথা শুনে সে একটি পাথরের উপর বসে জুতো জোড়া রাখল পাশে। সাদিফ নিজেও পাশে এসে বসল৷ থমথমে গলায় বললো,
‘ প্রেম করছিস অথচ আমাকে জানালিও না? ‘
‘ এখন জানলে কি করে? ‘
‘ জানবো না আবার! আমাদের সামনে এত তর্জন গর্জন যে করিস। সেসব কেউ একজনের সামনে ফিকে পড়ে গেছে এটা তো নজরে আসার-ই কথা। সাফওয়ান খান কি-না এমন এক পুচকে মেয়েকে মাথায় তুলে রেখেছে, তার সব কিছু চুপচাপ মেনে নিচ্ছে। এসব দেখে তো যে কেউ বুঝে ফেলবে যে গ তে গন্ডগোল ঘটেছে। ‘
সামান্তা এবং সাম্য’র সঙ্গে খুনসুটি তে মগ্ন সায়েরীর দিকে তাকিয়ে সাফওয়ান পুণরায় হাসলো। গভীর স্বরে আওড়াল,
‘ স্ব-ইচ্ছায় তো গন্ডগোল ঘটাইনি। আপনা আপ ঘটে গিয়েছে। সমাধান চাইছি না আর৷ এখন এই ঝামেলাটুকু বেশ লাগছে। ‘
সাদিফ খুকখুক করে কেশে উঠলো। সাফওয়ানের পিঠ চাপড়ে বলে উঠলো,
‘ আগে বলিস নি মেনে নিলাম। কিন্তু বড়সড় ঝামেলা পাকানোর আগে অন্তত জানিয়ে দিস। যদি সাহায্য করতে পারি। ‘
সাফওয়ান মাথা নাড়ায়। অবচেতনে বলে উঠে,
‘ জানাতে তো হবেই। তোমার হেল্প ছাড়া পূর্ণতা মিলবে বলে মনে হচ্ছে না। ‘
দুপুরে রেস্টুরেন্টে গিয়ে লান্স করলো সকলে মিলে। এরপর গেলো সিলেটের বিখ্যাত সূর্যমুখী বাগানে। তখন গোধূলি বিকেল। সূর্যের কমলা কিরণে বাগান টা অন্যরকম সুন্দর লাগছিল৷ তার মাঝে ঘুরঘুর করা সায়েরীকে দেখে সাফওয়ানের মনে পড়ে গেল বান্দরবানের ভোর সকালটির কথা। যেদিন তারা নীলাচল গিয়েছিল। সেদিন ভোরে হোটেলের বাগানে বেড়ে উঠা সূর্যমুখী গাছের মাঝে এভাবেক মিশে ছিল সায়েরী। এমনই এক শুভ্র শার্ট ছিল তার পরণে। মুগ্ধতা বোধহয় তখন থেকেই ছিল। যা তখন টের পাইনি গুরুগম্ভীর সাফওয়ান। কিন্তু আজ, তার হৃদয়ের সবটুকু মুগ্ধতা এই মেয়েকে ঘিরে।
সন্ধ্যা নামার আগ মুহুর্তে সকলে গাড়িতে গিয়ে বসলো। সায়েরী তখনো বাগানে দাঁড়িয়ে। ফুল ছিড়ছে। সাফওয়ান বাগানের মালিককে টাকা পরিশোধ করতে গিয়েছে। এসেই ডাক দিল মেয়েটাকে। সায়েরী বিরক্ত মুখে সময় চাইলো আরও মিনিট খানিক। সাফওয়ান কদম বাড়িয়ে আদেশ ছুড়ল,
‘ এক্ষুনি বেড়িয়ে আসো, সুবহা! সন্ধ্যা হয়েছে। আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে। ‘
বিনিময়ে সায়েরী বিরক্ত মুখে বলে উঠলো,
‘ আশ্চর্য! এমন খাটাশ গিরি করছেন কেনো? বলেছি না আরেকটু সময়..এইতো আরেকটা চারা নিব শুধু। ‘
‘ খাটাশ গিরি! কি বলেছো?আমি খাটাশ গিরি করছি? ‘
রাশভারি কন্ঠ-টা শুনামাত্র চট করে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল সায়েরী। সাফওয়ান জোর কদমে তার দিকেই এগিয়ে আসছিল। তা দেখামাত্র সে ছুট লাগালো বাগানের মাঝেই। ভেবেছিল সাফওয়ান থেমে যাবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে সাফওয়ান-ও একই তালে ছুটে এলো। মুহুর্তেই হাওয়ার বেগে পাজা কোলে তুলে ঘুরিয়ে ফেললো মেয়েলী, কোমল দেহখানা। সায়েরী ভয়ের ছুটে চিৎকার করে উঠলো। তার হকচকিয়ে উঠা মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে সাফওয়ান গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
‘ এবার দেখাব খাটাশ গিরি ঠিক কাকে বলে? ‘
সায়েরী ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসে। দুইহাতে সাফওয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে আমোদিত গলায় বলে,
‘ আপনার শহরটা আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। ইচ্ছে করছে এখানেই থেকে যায়। সারাজীবন! ‘
সাফওয়ান তার চোখে চোখ রেখে গভীর স্বরে প্রতিউত্তর করলো,
‘ রেখে দিব তবে, সারাজীবন। ‘
সায়েরী যেন এমনই প্রতিউত্তর আশা করেছিল। সে আরও নিবিড় করলো আলিঙ্গন। কন্ঠে আহ্লাদ ঢেলে বললো,
‘ এই চারা গুলো আপনার রুমে রাখবেন৷ ঢাকা ফিরে গিয়ে এসব আমাদের সুখ নীড়’র বাগানে লাগাবো। ঠিক আছে? ‘
“আমাদের সুখ নীড়” কথাটা হৃদয়ে গিয়ে গাঁথল যেন। মায়াময়ী মুখশ্রী দিকে গভীর চোখে তাকিয়ে ললাটে চুমু এঁকে দিল সাফওয়ান। প্রেয়সীর আবদারের সম্মুখে সে যেন জাদুর চেরাগের দৈত্য, এমন করেই মাথা ঝাঁকিয়ে জবাব দিল, ‘ঠিকাছে।’
সূর্য ডুবে যাওয়ার পর সকলে মিলে গেল আগুন পাহাড়ে। এই পাহাড়ের বিশেষত্য দেখে সায়েরী,নাজরাত, সাম্য এবং সামান্তা হতভম্ব। ভয়ও পেলো অনেকটা। দুজন লোক মিলে যখন মাটিতে আগুন জ্বালিয়ে তা ছড়িয়ে দিলো চারিদিকে। নাজরাত তখন ভয়ে ঝাপটে ধরলো সাদিফকে। মনে হয়েছিল এই বুঝি তার পায়ে আগুন লেগে গেল। সাম্য-সামান্তা চিৎকার করে রূপম এবং সাফ্রিনের পেছনে লোকাল। সায়েরী-ও নড়তে চেয়েছিল। পূর্বেই পেছন হতে তার উদর চেপে তাকে বাধা দিল সাফওয়ান। তার ভরসায় সায়েরী স্থির হয়ে রইল। কথামতো পা নাড়াতেই তালে তলে বেগুনি রশ্মির আগুন গুলো ঝিলমিলিয়ে উঠল। এ যেন এক অন্যরকম সুন্দর দৃশ্য। শুরুতে ভয় পেলেও পরবর্তীতে সকলে দারুণ উপভোগ করলো এই দৃশ্য টুকু।
ফেরার পথে বাজারে নামল তারা। খাওয়া দাওয়া করে পুণরায় গাড়িতে ফিরার সময় সাফওয়ানের শার্ট টেনে তাকে মাঝ পথেই থামিয়ে দিল সায়েরী। সাফওয়ান ফিরে তাকালো। শান্ত সুরে জানতে চাইল, ‘ কি চাই? ‘
প্রতিউত্তরে শুনা গেল তিনটি কন্ঠের একটি আবদার,
‘ ঝিলমিলি বেলুন!! ‘
সাফওয়ান একমুহূর্তের জন্য ভড়কে গেল সাম্য-সামান্তার উচ্চ কন্ঠে। সে চোখ পাকিয়ে তাকাল সায়েরীর দিকে। মেয়েটা তর্জনী দিয়ে ইশারা করছে রাস্তার কিনারায় একঝাঁক বেলুন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকে। সাফওয়ান কপাল কুঁচকে তাকাল। বলল,
‘ ইউজলেস! এসব নিয়ে কোন লাভ নেই। কিছু খেতে চাইলে বলো। ‘
চুপসে গেল তিনজনের মুখ। বাচ্চা দুটো ঠোঁট উল্টে তাকাল সায়েরীর দিকে। সায়েরী আশাহত গলায় বলে উঠলো,
‘ আমাকে দেখে কি লাভ? বলেছিলাম না এই কিপটে লোক কখনোই কিনে দিবে না! মিলে গেল তো? ‘
সাফওয়ান অতিষ্ঠ হয়ে দাঁত দিয়ে নিজের অধর পিষে। সায়েরীর দিকে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে এগিয়ে যায় বেলুন ওয়ালার কাছে। যা দেখা মাত্র সায়েরী, সামান্তা এবং সাম্য হেসে দিলো ফিক করে। পরপরই এগিয়ে গেল সাফওয়ানের পিছু পিছু৷ এদিকে গাড়িতে বসে বাকিদের লেট হচ্ছে দেখে জানালার বাহিরে মাথা বের করেছিল সাফ্রিন এবং রূপসা। সাফওয়ান কে ঝিলিমিলি বেলুন কিনতে দেখে দুজনেই চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ ভাইয়া!! আমার জন্য একটা! ‘
সাফওয়ান বিষ্ময়ে হতভম্ব। এই বেলুনে কি এমন রত্ন লুকিয়ে আছে যে মেয়েরা এত আহ্লাদ দেখাচ্ছে? উপায়ান্তর না পেয়ে সে একত্রে সবার জন্যই সবকটা বেলুন কিনে ফেললো। ধরিয়ে দিল সায়েরীর হাতে। আঁধারের মাঝে ঝিলমিল আলোয় সায়েরীর হাস্যজ্বল মুখ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে একে একে সাম্য, সামান্তা, সাফ্রিন, রূপসা, নাজরাত সবাইকে একটা করে বেলুন বাড়িয়ে দিল। বাকি রইলো তিনটা। একটা তার। এবং বাকি দুটো নিশি, নাহিয়ানের৷
মাঝে কেটে গেছে দুটো দিন। এই দুই দিন ছিল চরম ব্যস্ততার। কোন ঘুরাঘুরি হয়নি। কনে পক্ষ,বর পক্ষ দুই পক্ষের সকলেই আয়োজনে ডোবে ছিল। জাহুরা খান বলেছেন অনুষ্ঠানের আগ অবধি যেন বর,কনের কোনো রূপ সাক্ষাৎ না হয়৷ এই কথা রেশ ধরে নিশি সত্যি সত্যিই সাদিফকে কোনো প্রকার সুযোগ দিল না নাজরাতের সঙ্গে দেখা করার। সাফ্রিন এবং রূপসা -ও পদে পদে নজরে রাখছে তাকে৷ সাদিফ পড়েছে মহা জ্বালায়৷ এতটা কাছাকাছি থেকেও কি-না বউয়ের সাক্ষাৎ পাচ্ছে না। এই দুঃখ সহ্য করা যায়! অন্তত নিয়ম করে দুই দন্ড কথা বললে, ভিডিও কলে চেহারা টা দেখলেও স্বস্তি পেত সে৷ কিন্তু মরার উপর ক্ষরা হয়ে দুদিন যাবত খোঁজ-ই পাওয়া যাচ্ছে না নাজরাতের।
না জানে কোথায় তুলে রেখেছে মোবাইল টা? রাগে, ক্ষোভে সাদিফ পারছে না এক্ষুনি ছুটে গিয়ে মেয়েটাকে শাসিয়ে আসতে। কিন্তু চক্ষুলজ্জা আছে বলেই চেপে যেতে হচ্ছে। এখন রাত সাড়ে বারোটা। আগামীকাল সকাল হতে মেহমান আসা শুরু করবে। সকালে হলুদের ছোটখাটো প্রোগ্রাম রয়েছে। সন্ধ্যায় মেহেন্দি। অনুষ্ঠানের আগে বোধহয় বউয়ের দেখা সাক্ষাৎ পাবে না সে। সাদিফ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ফের কল করলো নাজরাতকে। নাহ! এবারেও সংযোগ পেল না। বিরক্ত হয়ে সে ফোন ছুড়ে ফেললো বিছানায়। এরপর বেরিয়ে গেল রুম থেকে। সিড়ি বেয়ে উঠে গেল ছাদে। কিন্তু সেখানে গিয়ে চোখে পড়লো সাফওয়ানকে। সাদিফ থমথমে মুখে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। আঁধারের মাঝে জ্বলজ্বল করতে থাকা আধখাওয়া সিগারেট -টা টেনে নিল সাফওয়ানের আঙ্গুলের মধ্যিখান হতে। দুটো টান মেরে ঠোঁট গোল করে ধোঁয়া ছাড়ল৷ তার দিকে ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল সাফওয়ান,
‘ কি সমস্যা? দুদিন পর বিয়ে আর তুমি দেবদাস হয়ে সিগারেট টানছ কেনো? ‘
সাদিফ হতাশায় ভারাক্রান্ত গলায় ব্যক্ত করলো নিজের দুঃখ টুকু। সাফওয়ান ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেললো। সাদিফ দেখার আগেই নিজেকে সংযত করে নিল পুণরায়। বললো,
‘ দুই দিন সহ্য করতে পেরেছ। আর মাত্র কয়েক ঘন্টা সহ্য করতে পারছ না? ‘
‘ আমার জায়গায় থাকলে বুঝবি কেন সহ্য করতে পারছি না। এই মুহুর্ত গুলো কতটা ইম্পর্ট্যান্ট আমাদের জন্য। কাল থেকে গেস্ট আসা শুরু করবে। তিন দিনের আগে ঠিকটাক কথা বলার সুযোগ পাবো? ‘
‘ দেখা করতে চাও এখন? ‘
‘ এখন? কীভাবে? ‘ সাদিফের আশ্চর্য কন্ঠ।
সাফওয়ান জবাব দিল না। ঠোঁটের সঙ্গে হেসে উঠলো তার বুদ্ধিদীপ্ত চোখদুটো-ও।
রাত একটা। সকল কাজ কর্ম মিটিয়ে সবে মাত্র বিছানা গুছিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিয়েছে সায়েরী,নাজরাত৷ এমন সময় বেজে উঠলো সায়েরীর মোবাইল। রিসিভ করে মোবাইল কানে চেপে কিছু বলার সুযোগ টুকু পেলনা বোধহয় সে। উপাশের কথাটুকু শুনে আচমকা বেরিয়ে গেল কামরা থেকে। নাজরাত অবাক হলো। কিন্তু ঘুমের তাড়নায় বিশেষ কিছু ভাবতে পারল না সে। শুয়ে পড়লো চোখ বুজে।
সায়েরী কামরা হতে বের হয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল সিড়ি পথে। আধারের মাঝে দন্ডায়মান দুটো ছায়ামূর্তি দেখে আচমকা ভয় পেয়ে গেল সে। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে চিৎকার দিতে উদ্যত হওয়া মাত্র তার মুখ চেপে ধরলো একটি শক্তপোক্ত হাত। দেহটি ঝাপটে নিল নিজের সঙ্গে। সায়েরী যখন ঠের পেল মানুষটা কে, তখনই সে শান্ত হয়ে গেল৷ মুখে চেপে রাখা হাতখানা সরিয়ে দিয়ে বিরক্ত গলায় বলে উঠলো,
‘ এভাবে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে? আমি কতটা ভয় পেয়েছি জানেন? ‘
সাফওয়ান সে কথা এড়িয়ে গিয়ে প্রশ্ন করলো,
‘ রুমে আর কে আছে? ‘
‘ নাজরাত আছে শুধু। আর কে থাকবে? ‘
এই উত্তরের আশাতেই যেন ছিল সাদিফ। যা শুনামাত্র সে কদম বাড়ালো রুমের দিকে। সায়েরী হকচকিয়ে গেল। হন্তদন্ত গলায় বলে উঠলো,
‘ আরে! ভাইয়া কোথায় যাচ্ছে? নিশি ভাবি নিষেধ করেছি…. ‘
সাফওয়ান পুণরায় মুখ চেপে ধরলো তার। বললো,
‘ গোল্লায় যাক তোমার নিশি ভাবি। ওদের কে কিছুক্ষণ একা থাকতে দাও৷ চলো আমার সাথে। ‘
সায়েরী বাঁধা মানে না। বন্ধ মুখেই ‘উমম’ জাতীয় শব্দ তুলে অনেক কথা বলে। ছটফট করে ছাড় পাওয়ার জন্য। সেই সঙ্গে সাফওয়ান আরও বেশি শক্তি প্রয়োগ করে চেপে ধরে তাকে। চোখ গরম করে তাকিয়ে শাসায়,
‘ চুপ! আরেকটা কথা বলেছ তো কামড়ে খেয়ে ফেলব। ‘
সায়েরীর কান জ্বলে উঠলো এহেন কথায়। গাল উষ্ণ হয়ে উঠল। ছিহ! কামড়ে খেয়ে ফেলবে! এ কেমন কথা!
স্তব্ধ তাকে আরেকদফা চমকে দিয়ে সাফওয়ান হুট করেই তাকে কাঁধে তুলে নিল। সায়েরী হকচকিয়ে গেল। সাফওয়ান ছাদের সিড়িতে পা রাখতেই সে বিরক্ত হয়ে ধুমধাম কিল বসালো পোক্ত পৃষ্ঠদেশে। কন্ঠে রাজ্যের বিরক্তি ঢেলে বলে উঠলো,
‘ আশ্চর্য! সুন্দর, সভ্য ভাবে প্রেমিকাকে কোলে নেওয়া কবে শিখবেন আপনি? ‘
রুমের দরজা বন্ধ করার শব্দ কানে আসতেই অর্ধচেতন নাজরাত নিম্ন কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ ফ্যানের স্পিড আরেকটু কমিয়ে দে, সায়ু। আমার ঠান্ডা লাগছে। ‘
একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে ফ্যানের স্পিড যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেল। নাজরাত আশ্চর্য হলো। মুখের উপর হতে চাদর সরিয়ে বলে উঠলো,
‘ পাগল হয়ে গেলি নাকি? স্পিড কমাতে বলে… ‘
সম্মুখে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সাদিফকে দেখে আচমকা কন্ঠ থেমে গেল তার। চট করে উঠে বসলো শোয়া থেকে। অবাক স্বরে শুধালো,
‘ তুমি এইসময় এখানে কি করছো? কীভাবে এসেছো? ‘
সাদিফ গম্ভীর মুখে এগিয়ে যায়। রাশভারি কন্ঠে বলে,
‘ আমার ঘুম হারাম করে নিজে শান্তিতে ঘুমাচ্ছ? ‘
‘ সত্যি করে বলোতো, আদৌও আমাকে ভালো টালো বাসো তুমি? বাসলে এমন নির্দয়ের মতো দূরে দূরে থাকছ কি করে? কোন টান, কোনো অনুভূতি নেই আমার জন্য? ‘
নাজরাতের মুখ মলিন হয়ে আসে। চোখে ভীড় করে অশ্রুজল। তার টলমল দৃষ্টি দেখে সাদিফ হকচকিয়ে উঠে। মজা ছলে বলা কথার রেশ ধরে মেয়েটা কেঁদে ফেলবে তা সে ভাবেনি। নাজরাত তো এমন ছিঁদকাঁদুনে মেয়ে নয়। তবে আজ কেনো!
নাজরাত হঠাৎ দুই হাত বাড়িয়ে দিল সাদিফের দিকে৷ জড়িয়ে ধরার আহ্বান। সাদিফ তা দেখা মাত্র কছে গিয়ে বুকে টেনে নিল নাজরাতকে। নরম কন্ঠে শুধালো,
‘ কি হয়েছে? মন খারাপ? ‘
নাজরাতের চোখের জলে সাদিফের বুক ভিজে উঠে। শুনা যায় মেয়েটার মলিন কন্ঠ,
‘ আমার কিছু ভালো লাগছে না, সাদিফ। বিয়েও করতে ইচ্ছে করছে না। ‘
সাদিফ বুক কেঁপে উঠল এই কথা শুনে। বলে কি এই মেয়ে! বিয়ে করতে চাইছে না মানে কি!
‘ পাগল হলে নাকি? বিয়ে করবে না মানে কি? দুই দিন আগ আগ অবধি তো আমার চেয়েও বেশি এক্সাইটেড ছিলে তুমি। এখন কি হয়েছে? ‘
নাজরাত ফের নাক টানে। ধরা গলায় প্রতিউত্তর করে,
‘ জানি না। কিন্তু আমার ভীষণ মন খারাপ লাগছে। কাউকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। ‘
সাদিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নাজরাতের চুলের ভাঁজে ঠোঁট ছুঁয়ে বলে উঠলো,
‘ আমি বুঝতে পারছি তোমার অবস্থা। কিন্তু আর কি করার আছে? সবাইকে ছেড়ে যেতে তো হবেই। যা হচ্ছে মেনে নাও। যেমন এক্সাইটেড ছিলে তেমন করে উপভোগ করো সব৷ তোমাকে এভাবে দেখলে আমার-ও ভালো লাগবে না। সবার-ই মন খারাপ হবে৷ ‘
নাজরাত চুপ করে শুনে গেল। প্রতিউত্তর করলো না কিছু। সাদিফ পিঠে হাত বুলিয়ে দিল তার। সময় দিল সামলে নেওয়ার। এই সময়টা একটা মেয়ের জন্য ঠিক কতোটা যন্ত্রণার তা বোঝার সাধ্য কোন ছেলের-ই নেই। আপনজন দের ছেড়ে যাওয়ার বেদনা, নতুন পরিবেশে কীভাবে মানিয়ে নিবে সেই চিন্তা, নিজেকে সব কিছুর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে কি-না সেই দ্বিধা। এত চিন্তার মাঝে বিয়ের আমেজ টুকু ফিকে পড়ার-ই কথা।
নাজরাতের গালে হাত রেখে মুখ উঁচু করে ধরলো সাদিফ। মন খারাপের রেশ কমানোর চেষ্টা চালিয়ে নিজেই মলিন সুরে বলে উঠলো,
‘ ফ্যামিলি কে ভালোবাসো বলে তাদের ছেড়ে যেতে চাইছ না। আর আমি? আমি কি? ফ্রি পেয়েছ বলে আমার কোন মূল্য নেই? কতবার ফোন দিয়েছি। রিসিভ করোনি কেনো? ‘
নাজরাত কান্না চোখেই ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হেসে জবাব দিল,
‘ ইচ্ছে করেনি তাই। ‘
সাদিফের চোয়াল শক্ত হয়। শক্তি প্রয়োগ করে চেপে ধরে নাজরাতের পৃষ্ঠদেশ। গম্ভীর কন্ঠে বলে,
‘ ইচ্ছে করেনি? আমি দহনে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছিলাম৷ আর তুমি বলছো ইচ্ছে করেনি? ‘
নাজরাত ব্যথাতুর কন্ঠে ক্ষীণ আর্তনাদ করে,
‘ উঁউহ! ব্যথা পায়.. ‘
সাদিফ পাত্তা দিলনা। নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো,
‘ আমিও তো দুদিন যাবত বুকে ব্যথা নিয়ে ঘুরছি। কিন্তু তোমার তো পাত্তাই নেই। ‘
বলতে না বলতে ঘনিষ্ঠ হলো সে। নাজরাত চোখ বড় বড় করে তাকাল। তর্জনী চাপলো সাদিফের ওষ্ঠদ্বয়ের মধ্যিখানে। বিরোধ কন্ঠে বললো,
‘ একদম কাছে আসবে না। নানু নিষেধ করেছে যেন অনুষ্ঠানের আগে… ‘
‘ রাখো তোমার নানুর নিষেধাজ্ঞা। ওরা কি বুঝবে আমার কষ্ট? আজ সুযোগ হাতছাড়া করলে আগামী দুই দিন তোমাকে কাছে পাওয়া-ও যাবে না। মোট মিলিয়ে চারদিন বউ হীনতায় ভুগবো? অসম্ভব! ‘
নাজরাত ফের প্রতিবাদ জানাতে চাইল। কিন্তু কন্ঠস্বর বের হওয়ার পূর্বেই তার কিঞ্চিৎ ফাঁক হওয়া ওষ্ঠধর নিজ আয়ত্তে নিয়ে নিল সাদিফ। একহাতে জোর প্রকাশ করে মধ্যকার সবটুকু দুরত্ব মিটিয়ে নিল সে। নাজরাতের চোখ, মুখ কুঁচকে গেল। সাদিফের আজকের ছোঁয়া গুলো ভীষণ আগ্রাসী। নরম,কোমল ওষ্ঠ যুগলে রীতিমতো ধংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। যেন শাস্তি দিচ্ছে দুটো দিন লাপাত্তা থাকার। কোমল তনুতে পোক্ত হাতের কঠোর স্পর্শে মেয়েটা আরও বেশি মুষড়ে পড়লো। শক্তি হারিয়ে দেহের সবটুকু ভার ঢেলে দিল প্রসস্থ বক্ষস্থলে।
নিস্তব্ধ, তিমিরাচ্ছন্ন প্রহরী। ছাদের চওড়া রেলিংয়ের উপর দুই পা দুদিকে ছড়িয়ে বসে আছে সাফওয়ান। পিঠ ঠেকিয়েছে দেয়ালের সঙ্গে। তার বুকের মধ্যিখানে লেপ্টে আছে সায়েরীর কোমল পৃষ্ঠদেশ। নগ্ন দুই পা রেলিংয়ের বাহিরে ঝুলিয়ে রেখেছে মেয়েটা। কালো আকাশে এক টুকরো অর্ধচন্দ্র। আলো বিশেষ নেই। সেদিক তাকিয়ে সাফওয়ানের উষ্ণ বুকে আরও নিবিড় ভাবে গুটিয়ে গেল সায়েরী। বিপরীতে উদরের উপর জড়িয়ে থাকা পুরুষালী হাতদুটোর বন্ধন-ও দৃঢ় হলো। মেয়েলী ছোট্ট কাঁধটাতে এসে ঠেকল পোক্ত চোয়াল,থুতনি ওয়ালা মুখখানা। দাড়ি বিহীন গালটা স্পর্শ করলো সায়েরীর তুলতুলে নরম গাল। মেয়েটা নিজেই নিজ গাল চেপে রাখল খসখসে গালটার সঙ্গে। তার কন্ঠ শোনাল তীব্র উচ্ছ্বাসিত,
‘ আপনার দাদু মণির আইডিয়া টা কি চমৎকার! একই সাথে বর, কনে দুই দিকের প্রোগ্রাম এনজয় করা যাবে। সাদিফ ভাই আর নাজরাত-ও কি সুন্দর একসঙ্গে থাকবে সব প্রোগ্রামে! আমার তো ভাবতেই খুশি খুশি লাগছে। অনেক মজা হবে তাইনা? ‘
মেয়েলী দেহের মিষ্টি সুঘ্রাণ টুকু বুক ভরে টেনে নিয়ে সাফওয়ান প্রতিউত্তর করলো নির্লিপ্ত ভাবে, ‘হুমম!’
তার এমন বেখেয়ালি জবাব শুনে এবারে ভ্রুঁ কুঁচকালো সায়েরী। অসন্তুষ্ট গলায় বললো,
‘ আপনি আমার কোন কথাতেই মনযোগ দিচ্ছেন না। এমন হলে বসিয়ে রেখেছেন কেনো? আমি চলে যাব.. ‘
বলতে না বলতেই সে রেলিংয়ের বাহির হতে দুই পা তুলে নেওয়ার প্রয়াস চালালো। ঠিক সেই মুহুর্তে সাফওয়ান হাত ছেড়ে দিল তার। ব্যালেন্স হারিয়ে পড়েই যাচ্ছিল সায়েরী। ভয়ে, হকচকিয়ে উঠে সে দুই হাতে ঝাপটে ধরে সাফওয়ান কে। বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রয় কয়েক সেকেন্ড। এক্ষুণি কি হতে যাচ্ছিলো! আরেকটু হলেই তো তার মাসুম জানটা অক্ষা পেত। সে কিড়মিড়িয়ে উঠে সাফওয়ানের হাত খামচে ধরে,
‘ কি করেছেন এখন? হাত ছেড়ে দিলেন কেনো? আমি পড়ে গেলে কি হতো? ‘
‘ তুমি-ই বলেছিলে চলে যাবে, তাই ছেড়েছি। কি এমন হতো পড়ে গেলে? ‘
সাফওয়ানের নির্লিপ্ত কণ্ঠ। সায়েরী আশ্চর্য হলো একথা শুনে। এই ত্রিশ – পয়ত্রিশ ফিট উপর হতে পড়ে গেলে কি হতো এটাও কি জানে না এই ছেলে? মলিন মুখে একপলক নিচে তাকিয়ে সে বলে উঠলো,
‘ এখান থেকে পড়লে বাকি জীবন হয় হুইলচেয়ারে কাটাতে হতো নাহয় কবরে। এখনো বিয়েও করতে পারিনি। আমার গোটা সংসার চেয়ে আছে আমার দিকে। ‘
বিজ্ঞদের মতো করে বলা কথাগুলো শুনে সাফওয়ান নিঃশব্দে হেসে ফেললো। অন্ধকারে সেই হাসি সায়েরীর চোখে পড়ল না। সাফওয়ান পুণরায় কাছে টেনে নিল মেয়েটাকে। কাঁধে থুতনি রেখে, গালে গাল ছুঁয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
‘ বিয়ে করার এতো শখ? ‘
প্রতিউত্তরে শুনা যায় সায়েরীর উৎফুল্ল কন্ঠ,
‘ অবশ্যই! আমার অনেক ইচ্ছে বউ সাজার। বউ সেজে হাজার খানিক ছবি তুলবো। খোলা আকাশের নিচে বাসর হবে। হানিমুনে দার্জিলিং যাবো। কয়েক ডজন বাচ্চা নিব আর… ‘
আচানক কন্ঠ থামলো তার। বলে ফেলা কথাগুলো নিজ কানে প্রতিধ্বনি হলো পুণরায়। সঙ্গে সঙ্গে দাঁত দিয়ে জিহ্ব কাটলো সে। ঠোঁট কাঁটা বান্ধবী গুলোর সঙ্গে থাকতে থাকতে সে-ও পুরোদমে নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছে। খেয়াল-ই করেনি কার সামনে কি বলছে সেটা। ফাঁকা ঢোক গিলে সে চোখ তুলে তাকাল সাফওয়ানের দিকে। দেখল, সাফওয়ান হা মুখ করে ড্যাবড্যাব নয়নে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সায়েরী অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসল৷ থেমে থেমে সাফাই গাইল,
‘ ও..ওসব আমার কথা না। আমি বলিনি। না মানে বলেছি আমি কথাগুলো আমার ন..না। ভুলে বের হয়ে গিয়েছে। গালতি সে মিসটেক! ‘
সাফওয়ান সেকথা শুনলো কি-না কে জানে। কিন্তু পূর্বে বলা কথাগুলোর মধ্যে একটামাত্র কথা-ই চেপে গেল তার মস্তিষ্কে। সে ঘাড় কাত করে চোখে মুখে নিদারুণ এক দুষ্টুমি ভাব ফুটিয়ে বলে উঠলো,
‘ খোলা আকাশের নিচে বাসর? ইন্টারেস্টিং! ‘
তীব্র লজ্জায় কান,গাল জ্বলে উঠলো সায়েরী’র। সাফওয়ান ফের বলতে উদ্যত হলো,
‘ কয়েক ডজনের মধ্যে কাউন্ট করলে কত হ… ‘
কথাটুকু শেষ হওয়ার পূর্বেই সায়েরী তার মুখ চেপে ধরলো। লজ্জায় তার গাল ফুলে উঠেছে। থুতনি কাঁপছে তিরতির। কিন্তু কন্ঠে গাম্ভীর্য টেনে সে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে শাসাল সাফওয়ানকে,
‘ চুপ করুন! ‘
‘করলাম। ‘ সাফওয়ানের অস্পষ্ট স্বর।
অধরের উপর চেপে বসা হাতের তালুতে চুমু স্পর্শ পাওয়া মাত্র হাত সরিয়ে নিল সায়েরী। সাফওয়ানের চোখে মুখে তখনো মিটিমিটি হাসি। সায়েরী কাছ থেকে সেটা লক্ষ্য করে দ্বিগুণ লজ্জা পেল। পুণরায় ফিরে বসলো। নিরবতায় কাটিয়ে দিল মিনিট দুয়েক। অতঃপর গম্ভীর কন্ঠে আদেশ ছুড়ল,
‘ কাল থেকে কোনো প্রোগ্রামে আপনি আমাকে কোন কিছু কিছুর জন্য বকতে পারবেন না। কোনো বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারবেন না। আমি আমার মতো এনজয় করবো। ঠিক আছে? ‘
‘ দেখা যাবে। ‘ সাফওয়ানের শান্ত জবাব।
সায়েরী সন্তুষ্ট হলো না এই জবাবে। বুকে মাথা রাখা অবস্থাতেই সে মুখ তুলে চাইল। মলিন গলায় বলে উঠলো,
‘ এর আগের বার আপনার জন্য গেইটে দাঁড়িয়ে ঝগড়া করতে পারিনি। টাকা দিয়েছেন এত কম। এবার যেন একটা কথাও না বলেন। ‘
‘ আচ্ছা। ‘
‘ আমি নাচব, গাইব অনেক অনেক মজা করবো আপনি একদম চোখ গরম করে তাকাবেন না। ‘
সাফওয়ান হেসে ফেললো এবারে। মাথা নুইয়ে সায়েরীর নাকে নাক ঘষে বাধ্য প্রেমিকের মতো সায় জানাল,
‘ ঠিক আছে। তাকাব না। ‘
সায়েরী সন্তুষ্ট হলো। পুণরায় দৃষ্টি ফেললো দূর আকাশের অর্ধচন্দ্র-টার দিকে। তার কন্ঠ তখনো থেমে নেই। একের পর এক কথা বলেই যাচ্ছে। সাফওয়ান তার মাথার উপর থুতনি রেখে নিরবে কেবল শুনে গেল। একটা সময় লক্ষ্য করলো মেয়েটার কন্ঠ ম্লান হয়ে এসেছে। জড়িয়ে যাচ্ছে বাক্য। সে মাথা নিচু করে তাকাল। দেখল, বুকের মধ্যিখানে গুটিশুটি মেরে আছে সায়েরী। চোখ দুটো বন্ধ। অর্ধ জাগ্রত অবস্থায় বিড়বিড় করে ঠোঁট নাড়ছে। সাফওয়ান প্রলুব্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। পরপরই ঠোঁট চেপে ধরে সায়েরীর ফুলো গালে। নিভু নিভু স্বরে ডাকে, ‘ বোকাপাখি! ‘
‘ উমম? ‘ ঘুমের ঘোরে-ই আদুরে প্রতিউত্তর করলো সায়েরী।
সাফওয়ানের মাথা ঝিমঝিমিয়ে উঠে এই কন্ঠে। সে মুখ নামিয়ে ফের অধর ডোবাল মাখনের ন্যায় কোমল গালটাতে। চুমু খেলো একবার, দুইবার, অগণিত বার৷ নিদ্রাচ্ছন্ন অবস্থাতেই কপাল কুঁচকে গেল সায়েরীর। সে নড়তে চেয়েও বাধাঁ পেল। ঘুম ঘুম, জড়িয়ে আসা কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ উঁউহু! সবসময় আমার ঘুমে ডিস্টার্ব করেন। আপনি এতো খারাপ কেনো? ‘
‘ তুমি এত আদুরে যে, তাই। ‘
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৩+৬৪
সাফওয়ান ফের চুমু খেল। বেশ রুক্ষ ভাবে, শক্তি প্রয়োগ করে। প্রতিউত্তর করলো গালে গাল ছুঁয়ে, আদর মাখা গলায় । সায়েরী শুনেও শুনলো না সেই প্রতিউত্তর। নিজের সবচেয়ে নিরাপদ স্থান, সাফওয়ানের সুডৌল বক্ষপটে চোখ বুজে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল সে।
