Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৯

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৯

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৯
সাজিয়া জাহান সুবহা

উদীয়মান সূর্যের কিরণ ছড়িয়েছে ধরনীতে। জানান দিচ্ছে নতুন দিনের সূচনা। দূর হতে কর্ণগোচর হচ্ছে পাখিদের কিচিরমিচির গুঞ্জন। স্নিগ্ধ, শান্ত ভোর। থাই গ্লাসের ফিনফিনে পাতলা, নীলাভ-সাদা পর্দা উড়ছে ফ্যানের হাওয়ায়। ফাঁকফোকরে রৌদ্রের ক্ষীণ রশ্মি এসে আলোকিত করছে আবছা অন্ধকার কক্ষ-টি। সফেদ টাইলসের উপর আঁচড়ে পড়া সূর্যের কিরণের প্রতিফলন এসে নাজরাতের চোখে লাগল। সহসা ডান হাতে চোখ ঢাকল সে। নাজুক তনু এলিয়ে দিল ডিভানের হেড বোর্ডের সঙ্গে। দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ব্যথা অনুভব হচ্ছে। বড্ড বেশি ক্লান্ত লাগছে, ঘুমে জ্বালা করছে নির্ঘুম চোখ দুটো। একটু খানি স্বস্তি নিয়ে ডিভানে যেই না, শরীর মেলে বসেছে। অমনি বাহুতে আলতো টান পড়লো৷ বড়সড় আধ ভেজা তোয়ালে এসে ছুঁল তার জবজবে ভেজা চুলগুলো। কর্ণধার হলো সাদিফের শীতল কণ্ঠ,

‘ ভেজা চুলে শুয়ে যাচ্ছ কেনো? ঠান্ডা লেগে যাবে তো। ‘
নাজরাত প্রতিউত্তর করলো না কোন। তার ঝিমিয়ে পড়া মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে আচমকা ঠোঁট চেপে হাসলো সাদিফ। তোয়ালে সঠিক স্থানে রেখে অয়েন্টমেন্ট হাতে ফিরে আসলো। বসলো ঠিক ঠিক বউয়ের সম্মুখে,গা ঘেঁষে। হাত বাড়িয়ে বউয়ের ভেজা চুল সরাল ঘাড় হতে। গতরাতে যে স্থানে অয়েন্টমেন্ট লাগিয়েছিল, সেসব তো তখনই মুছে গিয়েছে। উল্টো আরও কয়েক স্থানে মলম লাগানোর প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। গভীর কোন ক্ষত না হলেও, লালচে ছাপ পড়া স্থান গুলোতে যত্নশীল হাতে অয়েন্টমেন্ট লাগিয়ে দিল সে। নাজরাতের ক্লান্ত মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ বেশি খারাপ লাগছে? ‘
প্রতিউত্তরে বা-হাতে কপাল চেপে ধরলো নাজরাত। দেহের সঙ্গে সঙ্গে মাথা-ও ব্যথা করছে। সবই নির্ঘুম রাত কাটানোর ফলাফল। তার অবস্থা দেখে উঠে দাঁড়ালো সাদিফ। ঘাড় ফিরিয়ে দৃষ্টি রাখল দেয়াল ঘড়ির দিকে। ভোর সাড়ে পাঁচটা বাজে মাত্র। অন্তত ঘন্টা দুয়েক আরামে ঘুমানো যাবে। ভেবেই সে বলে উঠলো,
‘ নতুন চাদর বিছিয়েছি। আসো, ঘুমালে ভালো লাগবে। ব্রেকফাস্টের পর মেডিসিন নিয়ে নিলে আর খারাপ লাগবে না। ‘

নাজরাত উঠলো। ধীর কদম ফেলে বসলো বিছানায়। সাদিফ তখন কাবার্ড হতে কিছু একটা বের করতে ব্যস্ত। নাজরাত বালিশ ঠিক করে শোয়ার পূর্বে, একটি জুয়েলারি বক্স হাতে নিয়ে ফিরল সে। নাজরাত প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তাকাতেই সে এসে বসলো পাশে। ছোট্ট বক্সটি হতে বের করলো একটি গোল্ড ব্রেসলেট। অসম্ভব সুন্দর ডিজাইন সেটির। মেয়েটা বেশ অবাক হলো দেখে। জানতে চাইল,
‘ এটা কার? ‘
বক্স হতে ব্রেসলেট টা তুলে নিতে নিতে প্রতিউত্তর করলো সাদিফ,
‘ কার আবার! আমার একমাত্র বউয়ের। ফার্স্ট নাইট গিফট। ‘
‘ ফার্স্ট নাইট গিফট? তো এই ভোর সকালে দিচ্ছ কেনো? রাতে দেওয়া উচিত ছিলো। ‘
এই কথায় সাদিফ একটুখানি থমকাল বোধহয়। নাজরাতের হাতে ব্রেসলেট টা পরিয়ে দিয়ে, গাঢ় চোখে তাকিয়ে জবাব দিল,

‘ সে তো রাতে দিব বলেই এনেছিলাম। কিন্তু তোমার আবেদনময়ী রূপ দেখে আউট অফ ব্রেন,আউট অফ কন্ট্রোল, আউট অফ সেন্স হয়ে গিয়েছিলাম। এতে আমার কি দোষ? ‘
এহেন ঠেঁটা জবাবে আরক্তিম হলো নাজরাতের মুখশ্রী। তৎক্ষনাৎ দৃষ্টি নামিয়ে নিল সে। তাকে এমন লজ্জাবতী লতিকার মতো নুইয়ে যেতে দেখে ভারী আশ্চর্য হলো সাদিফ। বিস্মিত কন্ঠে শুধাল,
‘ কি আশ্চর্য! আমার আদরে কি ঘাটতি রয়ে গেছে নাকি? এখনো এত লজ্জা পাচ্ছ কেনো? ‘

এবারে লজ্জায় হাঁসফাঁস করে উঠলো নাজরাত। দ্রুত ছাড়িয়ে নিল হাত। অগনিত ঢোক গিলে, ডানে বামে দৃষ্টি ফেলল অস্থির ভঙ্গিতে। সাদিফ প্রগাঢ় চোখে দেখল অর্ধাঙ্গিনীর এই লাজুক মুখশ্রী। বক্ষ জুড়ে নিশপিশ করে উঠলো অবাধ্য কিছু অনুভূতি। সে মোটেও দমন করলো না তা। বরং তাদের আশকারা দিল বেশ। বলিষ্ঠ দু’হাতে বিনাবাক্যে মেয়েটার কোমর ছুঁয়ে কাছে টেনে নিল তাকে। অসংযত ভঙ্গিতে একহাত পৌঁছে গেল মেয়েলি কাপড়ের ভাঁজে, উন্মুক্ত উদরে। অপ্রস্তুত নাজরাত প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ টুকু পেলো না। পূর্বেই তার মসৃণ পৃষ্ঠদেশ মিশে গেল নরম গদির বিছানায়। জবজবে ভেজা চুল লেপ্টে গেল পিঠের সঙ্গে। মেয়েলি দেহের উপরিভাগে অধিপত্য জমাল হালাল পুরুষটি। নির্বিঘ্নে মুখ ডোবাল অর্ধাঙ্গিনীর শীতল গ্রীবাদেশে। তার চোয়ালের চাপ দাঁড়ির খসখসে স্পর্শ লাগতেই চোখ কুঁচকালো রমনী। তপ্ত শ্বাস এবং ওষ্ঠপুটের উষ্ণ স্পর্শ অনুভব করে শ্বাস থমকাল তার। অবচেতনে হাত পৌঁছাল পুরুষালি ঘাড়ে। আটকানো কন্ঠে ডাকল একটাবার। যেন মানটিকে হুশে আনতে চাইছে, ‘ স-সাদিফ!!

বুক ফুলিয়ে শ্বাস টানল সাদিফ। দেহের অবস্থান আগের মতোই রেখে, কেবল কিঞ্চিৎ মাথা উঁচিয়ে তাকালো। নাজরাত নিজেও তাকিয়ে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই বউয়ের আরক্তিম মুখশ্রী-তে প্রগাঢ় দৃষ্টি ফেলে, গাঢ় গলায় আবদার জানাল সাদিফ,
‘ মাত্র সাড়ে পাঁচটা বাজে। ঘন্টাখানেক সময় স্কিপ করলে আরও একঘন্টা ঘুমুতে পারবে। ‘
এটুকু বলে পূর্বের চেয়েও কাছাকাছি নামাল মুখশ্রী। নিভু নিভু কন্ঠে শুধাল,
‘ এই এক ঘন্টা তোমার স্বামীর নামে উৎসর্গ করলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যাবে? ‘
স্বচ্ছ কন্ঠের, দ্বিধা বিহীন আবদার। চোখদুটো স্থির হয়ে আছে অনুমতি পাওয়ার প্রতীক্ষায়। নাজরাতের বুক ঢিপঢিপ করে এই চাহনিতে, এই কন্ঠে, এই আবদারে। অনুমতি দিতে হীনমন্যতায় ভুগছে সে। আবার আপত্তি দেখাতেও দ্বিধা লাগছে। এই এক পুরুষকে ঘিরে তার সর্বত্র জড়িয়ে। কিভাবে তাকে ফিরিয়ে দিবে তবে? শুকনো ঢোক গিলে নজর ফিরিয়ে নিল সে। অজুহাত দেখানোর ভঙ্গিতে বলে উঠলো,

‘ সাত সকালে কিসব বলছ! আজ আমাদের রিসেপশন। সাতটা বাজতেই না বাজতেই ভাবি আসবে ডাকতে। ঘুমুতে দাও। আমি খুব ক্লা.. ‘
বাক্যটুকু কেড়ে নিয়ে নাছোড়বান্দা গলায় প্রতিউত্তর করলো সাদিফ,
‘ রিসেপশন তো রাতে। সন্ধ্যার আগ অবধি অনেক সময় পাবে রেস্ট নেওয়ার। ‘
প্রতিউত্তর টুকু শুনামাত্র নাজরাত চোখ পাকিয়ে তাকাল তার দিকে। বুকে দুহাত রেখে, ঠেলে সরানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে বলে উঠলো,

‘ কাল রাতেও একই কথা বলেছ। রেস্ট করার জন্য অনেক সময় দিবে, ব্লা ব্লা! এই তোমার সময় দেওয়ার নমুনা? ‘
সাদিফ হাসে। উঠে বসে চট করে। নাজরাত ভাবে, এই বুঝি বেঁচে গেল সে! কিন্তু না..তার ভাবনাকে সম্পূর্ণ মিথ্যে প্রমাণ করে শার্টের বোতামে হাত রাখল সাদিফ। একটা-দুইটা করে বোতাম খুলতে খুলতে হাত বাড়িয়ে নিভিয়ে দিল ল্যাম্পশেড। সূর্যের ক্ষীণ আলোয় বরের মুখের ওই ধূর্ত হাসিটুকু দেখে নাজরাত জমে বরফ হয়ে রইলো। এই শান্ত মানবটির অশান্ত দৃষ্টি জোড়া তাকে সংকেত প্রদান করছে যে, এই মুহুর্তে তার নিস্তার নেই। একটুও নেই।

জন্মসূত্রে সাদিফের পরিবারের অধিকাংশ আত্মীয় স্বজনের বসতী ঢাকাতেই। একমাত্র নানা ভাইয়ের বংশ ব্যতীত অন্য কোনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয় নেই, ভিন্ন কোনো জেলায়। সাদিফের বন্ধুবান্ধব, অফিস কলিগ সকলে এই শহরেই। একমাত্র তাদের সকলের কথা বিবেচনা করে, বিয়ের সকল আনুষ্ঠানিকতা ঢাকাতে করতে চেয়েছিলো সে এবং তার পরিবার। কিন্তু বাঁধ সেধেছেন জাহুরা খান। নাত বংশের প্রথম নাতির বিয়েটা নিজ ভিটেমাটি-তে সারবেন বলে জেদ ধরেছিলেন তিনি। জাহুরা খান বড্ড একরোখা স্বভাবের মহিলা। বয়স পচাত্তরের কোঠায় পৌঁছালেও উনার চলন-বলনে এখনো তেজস্বী ভাব পরিলক্ষিত। ছেলে সন্তান হতে মেয়ের জামাই অবধি, সকলে এখনো যথেষ্ট সমীহ করে চলেন তাকে। সকল আবদার, আদেশ মাথা পেতে নেন সকলে।

তাই-তো, নিজেদের অসুবিধে স্বত্তেও বড় ছেলের বিয়ের সকল কার্য নিজ গৃহ হতে সুদূর সিলেটে সম্পাদন করতে বাধ্য হয়েছেন তারা। ফলস্বরূপ, নিকট আত্মীয় ব্যতীত অধিকাংশ আত্মীয়-রা অনুপস্থিত ছিলেন বিয়েতে। সাদিফের অধিকাংশ বন্ধুবান্ধব, অফিস কলিগ-রাও উপস্থিত হতে পারেনি। তাদের সকলের কথা বিবেচনা করেই বিয়ের দিন লম্বা সফর করে ঢাকাতে ফিরেছে সকলে। পরদিন রাত্রিতে রিসেপশনের আয়োজন-ও করা হয়েছে। প্রায় সকলেই উপস্থিত হবে বলে প্রবল আগ্রহী। এজন্য, বাড়িতে আয়োজন না করে হল ভাড়া করা হয়েছে। বাড়ির কর্ত্রীগণ ভোর হতেই নানান কাজে ব্যস্ত। বেলা ন’টার পর ব্রেকফাস্ট করে সাহিল-ইভান’কে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গেছে সাদিফ। সাফ্রিন দশটার দিকে নিজ বাড়িতে ফিরে গিয়েছে। সরাসরি আসবে কনভেনশন হলে৷ তার মা,ভাই কেউ-ই এবাড়ি আসেনি কাল। সে এসেছিলো শুধুমাত্র বান্ধবীর জন্য। কিন্তু কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে আসেনি বলে ফিরে যেতে হয়েছে।

নাজরাত আছে নিশির সঙ্গে৷ আজ প্রথম দিন বলে, নতুন বউয়ের কোন কাজ নেই। তবুও দুই ঘন্টা পুতুলের মতো বসে থাকতে হয়েছে তাকে। পাড়া-পড়শীর অনেক মহিলা দেখতে এসেছে কিনা! দীর্ঘক্ষণ পর নিশি এসে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিল তাকে। মেয়েটা বুঝেছে, যে নাজরাতের বিশ্রাম দরকার। চোখ,মুখ দেখেই আন্দাজ করা যাচ্ছে তা। নিশি তাকে জোরপূর্বক রুমে পাঠাতেই স্বস্তি পেলো মেয়েটা। ঘুমালো প্রায় অনেক্ক্ষণ। কেউ বিরক্ত করলো না তাকে। সন্ধ্যার পর হতে এমনিতেই বসে বসে রাত কাটবে, গত কালকেও কত দখল গেল৷ সব মিলিয়ে মেয়েটার যে বিশ্রাম দরকার তা সকলে বুঝেছে৷ তাই কেউ আর খাটালো না তাকে।

সন্ধ্যা সাতটা। সাদিফ-নাজরাতের জন্য বরাদ্দকৃত কনভেনশন হল-টির চতুর্দিকে রমরমা ভাব। ফেইরি লাইটের ঝিকিমিকি আলোয়, আলোকিত চারপাশ। আর্টিফিশিয়াল অর্কিট দ্বারা সজ্জিত সবদিক। সাতটা নাগাদ হলে আগমন ঘটলো বর-কনের। ধূসর বর্ণের গাউন নাজরাতের পরনে। লাইট মেক-আপ, টুকটাক অর্নামেন্টস গায়ে৷ পাশেই একই রঙের স্যুট-বুট পরিহিত সাদিফ৷ ধবধবে সাদা শার্টের উপর ধূসর বর্ণের কোট জড়িয়েছে সে। ম্যাচিং প্যান্ট, পলিশড সু। সম্পূর্ণ ফরমাল লুক তার। দেখতে দুর্দান্ত লাগছে। তারা হলে পৌঁছানোর পূর্বেই অনেক গেস্ট এসে হাজির হয়েছে। অধিকাংশ-রা বিয়েতে অনুপস্থিত ছিলেন। সাদিফ হাসিমুখে এগিয়ে গেল সেদিক। তার হাতের ভাঁজে নাজরাতের হাত। হাসিমুখে সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল বউকে। ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো কোলাহল। বর-কনের জন্য নির্দিষ্ট আসনে বসে রয়েছে নাজরাত। সে অপেক্ষারত নিজ পরিবারের, বন্ধুবান্ধবদের। মাত্র চব্বিশ ঘন্টা পার হয়েছে, এতেই ব্যাকুল হয়ে আছে হৃদয়। মনে হচ্ছে যেন কত কাল ধরে মা’কে দেখেনি!

পার্কিং এরিয়ায় গাড়ির লাইন লেগেছে। ক্রমাগত বাড়ছে মেহমান-দের আনাগোনা। হলের সম্মুখে এসে থেমেছে একটি হায়েস। যেটাতে নাজরাতের কাজিন,বন্ধুবান্ধব-গণ বসে আছে৷ জানলার কিনারের সিটে অবস্থানরত সায়েরীর নজর গাঁথল ঠিক তাদের গাড়ির মুখোমুখি স্থানে দন্ডায়মান ব্ল্যাক টয়োটা গাড়িটির উপর। যেটা মাত্র-ই এসে থেমেছে, অপজিট রোড হতে। গাড়িটি তার পরিচিত। উঁহু! শুধু পরিচিত নয়। ওই গাড়ির নাড়িভুঁড়ি সম্পর্কেও অবগত সে। মেয়েটা সচকিত নয়নে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। কাঙ্ক্ষিত মানবের দর্শন পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে দুই নয়ন। তাকে বিশেষ অপেক্ষা করতে হলো না। ব্রেক কষার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গাড়ির ধার খুলে বের হলো সাফওয়ান।

চির-পরিচিত মানবটির অপরিচিত বেশভূষা দেখে ক্ষণিকের জন্য বিমূঢ় হলো সায়েরী। থমকাল দৃষ্টি। বাড়লো হৃদ স্পন্দন। অবচেতন মনে প্রশ্ন জাগল, এই মানব আদৌ সাফওয়ান ভাই তো! ডান হাতে কানের সঙ্গে মোবাইল চেপে রাখা মানবটির বলিষ্ঠ দেহে জড়িয়ে আছে ধবধবে সাদা শার্ট। যা আজ কনুই অবধি গুটিয়ে রাখেনি। বরং কব্জিতে বোতাম লাগিয়ে সম্পূর্ণ হাত ঢেকে ফেলেছে। শার্টের উপর হাফ হাতা কালো কটি। যার তিনটে বোতাম-ই লাগানো। কুচকুচে কালো কোট জড়িয়েছে কটির উপর। গলায় আটকানো কালো টাই। ব্ল্যাক প্যান্টের সঙ্গে পলিশড ব্ল্যাক সু পরেছে। সবসময়ের মতো সিল্কি চুলগুলো আজ কপাল জুড়ে ছড়িয়ে রাখেনি। অল্পখানি জেল মাখিয়ে সেট করেছে নিপুণ হাতে। ডান হাতে আজও ব্ল্যাক মোবাইল ওয়াচ-টি জড়িয়ে আছে৷ এছাড়া বাকি সব ভিন্ন।

এই বেশভূষা ভিন্ন। এমন জেন্টালম্যান লুকের সাফওয়ান ভাইকে পূর্বে কখনোই দেখেনি সায়েরী। কক্ষনও না। বিষ্ময়ে সে নজর সরাতেই ভুলে গেল। তবে মুগ্ধ দুই দৃষ্টি বিরতি নিল তখন। যখন দেখল, গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে চোয়াল শক্ত করে ব্যাক সিটের কেউ একজনকে শাসাচ্ছে সাফওয়ান। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাক সিটের ধার খুলে বের হয়ে এলো সাফ্রিন, রূপসা, সাম্য এবং সামান্তা। পরিশেষে সায়েরীকে চরম আশ্চর্য করে দিয়ে ফ্রন্ট সিট হতে নামল এক অপরিচিত রমনী। বেশ আধুনিক ওয়েসটার্ন গাউন পরেছে মেয়েটা। খুব বেশি অশালীন নয়, আবার শালীন ও বলা যাচ্ছে না। এতোটা টাইট গাউনে মেয়েলি দেহের প্রতিটা খাঁজ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

দূর হতে এর চেয়ে বেশি কিছু লক্ষ্য করতে পারলো না সায়েরী। কিন্তু মেয়েটা সাফওয়ান ভাইয়ের পাশে বসে এতদূর এসেছে। তা বুঝতে পেরে মুখশ্রী থমথমে হয়ে গেল। তবে তার চেয়েও অত্যাধিক ক্রোধ মিশ্রিত মুখাবয়ব সাফওয়ানের। সাফ্রিন-রা বের হওয়া মাত্র গাড়ি লক করে গটগট পায়ে ভেতরে ঢুকে গেল সে। অন্যসময়ে যে, আগে বোনদের পাঠিয়ে নিজে পেছনে থাকে। সেই আচরণ-টুকু আজ দেখা গেল না মোটেও। কিন্তু কেনো? কি হয়েছে! কেনো এতটা গুমসুম হয়ে আছে সাফওয়ান ভাই?
ভাবনার মাঝে পিউ’র ধাক্কায় হুশ ফিরল সায়েরীর। চকিতে ফিরে তাকালো সে। দেখল, সকলে নেমে পড়েছে ইতোমধ্যে। কেবল সে বসে। সকলের দিকে তাকিয়ে বিব্রত মুখে দ্রুত নেমে দাঁড়ালো সে। মুখশ্রীতে হাসি লেপ্টে নিল। কিন্তু মন খচখচ করছে প্রেমিক পুরুষটার চিন্তায়। কাল অবধি তো সব ঠিকঠাক ছিলো। এই চব্বিশ মাঝে কি এমন ঘটেছে! যার কারণে রগচটা মানবটা বোনদের উপরেও রাগ ঝাড়তে বাধ্য হয়েছে!

হলরুমে প্রবেশ করেও সাফওয়ানের কঠোর চোয়াল স্বাভাবিক রূপ নিল না। মোটা ভ্রুঁ যুগলের মাঝে ভাঁজ ফেলে, নিচ অধর দাঁতে পিষছে সে। গম্ভীর দৃষ্টি হাতের মোবাইলটার দিকে স্থির। থেমে থেমে দাঁত কিড়মিড়িয়ে উঠছে। সে এসে দাড়িয়েছে সদর দরজার সোজাসুজি স্থানে। পাশেই গোলাকৃতির টেবিলে রূপম এবং সাহিল বসে আছে। দূর হতে ছেলের এই কঠোর অবয়ব লক্ষ্য করে ফাঁকা ঢোক গিলছেন তাহুরা খান। স্পষ্ট দেখতে পারছেন, ফর্সা ছেলেটার কপাল এবং ঘাড়ের রগ ফুলে ফুলে উঠছে। অসম্ভব রকমের শক্ত চোয়াল। উনার তাকানোর মাঝে আচমকা মাথা তুলে তাকাল সাফওয়ান। ছেলের এই কঠোর দৃষ্টির কবলে পড়ে হকচকিয়ে উঠলেন ভদ্রমহিলা।

মায়ের ওই চিন্তিত, ভীতু মুখশ্রী দেখেও ক্রোধ কমলো না তার। বরং ক্রোধ বৃদ্ধি পেল। যখন দেখল, মায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ক্ষণিক পূর্বে তার গাড়িতে করে চড়ে আসা তিন রমনী। নির্দিষ্ট রমনীটির একটুখানি অবয়ব দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া মাত্র ঘৃণিত ভঙ্গিতে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল সে। অসম্ভব রাগে ভাংচুর করতে মন চাইল৷ কিন্তু এই কোলাহল পূর্ণ স্থানে মোটেও তা সম্ভব নয়। অন্তত মায়ের জন্য তো আরও অসম্ভব। তাহুরা খানের কথা বিবেচনা করে সে শান্ত করতে চাইল নিজেকে। নজর দিল ভাইদের দিকে। রূপম সবে মাত্র নিজের জন্য এক গ্লাস কোল্ড ড্রিংকস এনে বসেছে, পূর্বের স্থানে। কিন্তু বেচারার কপালে জুটলো না তা। চোখের পলকে ছুঁ মেরে সেটা হাতে তুলে নিল সাফওয়ান। রূপম থতমত খেয়ে গেল এহেন কান্ডে। কিন্তু সাফওয়ানের এই গাম্ভীর্য দেখে কিচ্ছুটি বলার সাহস হলো না তার। পাশে এসে বসা ইভান, রাহাত এবং সাহিল মিটিমিটি হাসছে রূপমের মুখ দেখে।

ঠান্ডা কোমল পানীয় টুকু সবেমাত্র দুই চুমুক পান করেছে। এমন মুহুর্তে আনমনে সাফওয়ানের বেখেয়ালি নজর ঘুরলো সদর দরজার দিকে। একপলক তাকিয়ে নজর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিল সে। সঙ্গে সঙ্গে বিষম খেয়ে নামিয়ে নিল গ্লাস। মুষ্টিবদ্ধ বাম হাত ঠোঁটের উপর চেপে চকিতে ফিরে তাকাল সে। হাস্যকর হলেও, সিনেমার মতো তার দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হলরুম ঝাপসা হয়ে এলো। একমাত্র স্পষ্ট রূপে, স্বচ্ছ দৃষ্টি স্থির হলো তার ছোট্ট, মিষ্টি আদলের, মায়াবিনী প্রেয়সীর উপর। দুদিন আগে, হলুদ প্রোগ্রামের দিন যে উপহার টা দিয়েছিল সে। সেই শাড়িটি পরেছে মেয়েটা। হলদেটে দেহটি মুড়িয়ে নিয়েছে গোল্ডেন শাড়িতে। জরজেট শাড়িটির মাঝে সর্বত্রে স্টোনের কারুকাজ। একই ধরনের জরজেট এবং কারুকাজ খচিত ফুল স্লিভ গোল্ডেন ব্লাউজ। ঢেকে আছে কব্জি অবধি। গলাও বেশ ছোট। দেখতে কি শালীন, মার্জিত লাগছে! আঁচল ফেলেছে ডান হাতের ভাঁজে।

দীঘল চুলগুলো আজ-ও পিঠময় ছড়িয়ে। গলায় বিউটি বোন নামক হাড় দুটোর মধ্যবর্তী স্থানে ছোট্ট লকেটযুক্ত সরু একটি চেইন। কানেও মাঝারি স্টোনের দুল। বাম হাতে চেইনের লেডিস ওয়াচ। চুড়ি পড়েনি আজ। হলদেটে মুখশ্রীটি একাধিক লাইটের আলোয় বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। কেউ বলতেও পারবে না মেয়েটা ফর্সা নয়, উজ্জ্বল শ্যামলা। কিন্তু আজ তা বুঝা গেলে তবেই তো! হলদে তনু চকমকাচ্ছে যেন। ফুলোফুলো দুই গালে কৃত্রিম লাল আভা৷ নিউড লিপস্টিক লাগিয়েছে পাতলা অধর যুগলে।

আর চোখ! বড় বড় নেত্রপল্লব বিশিষ্ট ওই চোখদুটো মাশকারা, এবং সরু কাজলের প্রভাবে কি যে আকর্ষনীয় লাগছে তা বর্ণনার অযোগ্য। দুই ইঞ্চি উঁচু হিল পায়ে গলিয়ে বেশ সতর্ক কদমে এগিয়ে আসছে রমনী। দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে ফ্লোরে। বাম হাতে কুচি সামলে নিয়ে, কানের পিঠে চুল গুঁজে মুখ তুলে চাইল সে। প্রথম দর্শনেই প্রেমিক পুরুষটার বাদামি চোখজোড়ায় গিয়ে আটকালো দৃষ্টি। সাফওয়ান আরও একটিবার আশ্চর্য হলো সায়েরীর নাকে হোয়াইট স্টোনের একটি ক্ষুদ্র নোসপিস লক্ষ্য করে। এই ছোট্ট অলংকার-টির কারণে কেমন যুবতী রূপ নিয়েছে মেয়েটা! এক দিনেই যেন যুবতী হয়ে উঠেছে সে। একসঙ্গে এত এত ধাক্কা সামলাতে পারলো সাফওয়ান। বুকের বাম পাশটায় আজ ফের উদিত হয়েছে সেই চিনচিনে ব্যথা। মেয়েটা বোধহয় এই ব্যথায় একদিন হার্ট ফেইল করিয়ে ছাড়বে তাকে। এ কেমন যন্ত্রণা!

সায়েরী পিটপিট নজরে তাকিয়ে। বোকা মেয়েটা আজ কোনভাবেই বুঝে উঠতে পারছে না প্রেমিক পুরুষটার হাবভাব। এই দৃষ্টিতে কি মিশে আছে? রাগ! না মুগ্ধতা? ঢিপঢিপ বুকে আরও একটা বার মানবটাকে পরখ করে সে ব্যস্ত কদম ফেললো বোনের দিকে৷ আপাতত বোনের কাছে যাওয়াটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অন্যসব পরেও দেখা যাবে।
অস্থির চিত্তে, শব্দ করে হাতের গ্লাসটা টেবিলে রাখল সাফওয়ান। চোখ বুজে একাধিক শ্বাস ফেলে, ডান হাত ঘষলো বুকের বাম পাশটায়। ব্যস্ত হাতে টানলো গলায় টাই। দম বন্ধ লাগছে কেন এমন! সে ফের চোরা দৃষ্টিতে তাকাল প্রেয়সীর দিকে। মেয়েটা হাসছে। ফলে বাম গালের ওই আবসা ঝাপসা টোলের দেখা মিলছে। এই আলোক সজ্জায় এদিক ওদিক ছুটে বেড়ানো মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন কোন মায়াপরী। মায়াপরী! হুম তা তো বটেই। সাফওয়ান তেহজিব খান’র তেজস্বী মায়াপরী সে। যার এক ঝলকে রগচটা মানবটার বুক ব্যথা হয়ে উঠেছে। মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। বোধশক্তি লুপ পেয়েছে ক্ষণিকের জন্য। যার মায়াজালে ডুবে আস্ত সাফওয়ান খান নামক মানবটি নিজ সত্ত্বা ভুলে বসেছে, সেই রমনী-টি মায়াপরী নয়, তো আর কি!
সায়েরীর দিক হতে দৃষ্টি সরিয়ে আশেপাশে লক্ষ্য করে কপাল কুঁচকে ফেললো সাফওয়ান। দাঁত কিড়মিড়িয়ে উঠে তাকাল ভাইদের দিকে। চাপা স্বরে গর্জে উঠলো রীতিমতো,

‘ এখানে এতজন অপরিচিত ছেলেপেলে কেনো? এদের কে কে ইনভাইট করেছে? ‘
চমকে উঠলো উপস্থিত চার ভাই। রাহাত দ্রু উঠে দাঁড়ালো। কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বললো,
‘ ও-ওরা আমার বন্ধু ভাইয়া। আমি ইনভা… ‘
‘ বন্ধু হোক আর যা-ই হোক। ওরা মেইন হলে করছে টা কি? আমার ফ্যামিলির মেয়েদের আশেপাশে বাইরের ছেলে যেন না থাকে, এটা আগে বলেছি না? তিন দিন ধরে একই কথা বলছি। তাও কানে যায় না কেনো? সব কটাকে বের কর এখান থেকে। ওদের জন্য যেদিকে আয়োজন করা হয়েছে সেদিকে যেতে বল। আরেকবার এখানে দেখলে খবর করে ছাড়বো। ‘

রাহাত ‘যাচ্ছি ভাইয়া’ বলেই এক দৌড়ে গিয়ে থামলো বন্ধুদের নিকট। সব ইয়াং ছেলে বেরিয়ে গেছে দেখেই স্বস্তি পেল সাফওয়ান। বড় করে দম নিয়ে বসলো রূপমের পাশের সিটে। ভাইয়েরা সবাই একই ধরনের স্যুট পরেছে আজকে। ইফাজ থেকে শুরু করে সাম্য অবধি কেউ বাধ যায়নি। ইফাজের ছেলে নাহিয়ানের গায়েও একই রঙের সাদা-কালো স্যুট। কেবল মাত্র সাদিফের স্যুটের রঙ ভিন্ন। ভাইদের সঙ্গে বসে জোরপূর্বক মোবাইলে নজর গাঁথল সাফওয়ান। আচমকা কানে আসলো ইভানের ফিচেল কন্ঠ,
‘ আরে! ওটা সায়েরী না? ‘
‘ সাহিল! যা না.. এসেছে তোর বেয়াইন। ওর জন্যই তো অপেক্ষা করছিলি নাকি? ‘

বেখেয়ালি-তে কথাটুকু বলে ইভান নিজেই হকচকিয়ে উঠলো। রূপম এবং সাফওয়ানের উপস্থিতি টুকু খেয়াল ছিল না তার। বড় ভাইয়ের সম্মুখে এই ধরনের মশকরা কোনো কালেই করে না তারা। এজন্য থতমত খেয়ে গেল দুই ভাই। অন্যদিকে রূপম চোরা দৃষ্টিতে দেখছে সাফওয়ান কে। যে ধারালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সাহিলের দিকে। শান্ত মেজাজ ফের বিগড়ে গেছে তার। ভাই না হলে এই মুহুর্তে চড়িয়ে গাল লাল করে দিত দুজনের। কিন্তু তা অনুচিত হবে। এজন্য গম্ভীরমুখে ঘাড় ম্যাসাজ করে মেজাজ টুকু নিয়ন্ত্রণে আনল সে। রাশভারি কন্ঠে ডাকল,
‘ সাহিল? ‘
হকচকিয়ে উঠলো সাহিল। রাশভারি কন্ঠটির বিপরীতে প্রতিউত্তর করতে গিয়ে তোতলা হয়ে এলো স্বর, ‘ জ-জ্বি ভাই? ‘

‘ আগেও বলেছিলাম, কনে পক্ষের কোনো মেয়ের সঙ্গে কোন বাড়তি হাসিতামাশা করতে যেন না দেখি। রূপসাদের সঙ্গ নিয়ে যতটুকু যা করেছিলি, সেসব যথেষ্ট। বেয়াই – বেয়াইন সম্পর্ক টেনে আগ বাড়িয়ে কারো সঙ্গে কথা আগাতে দেখলে আমি বরদাস্ত করবো না। শেষ বারের মতো বলছি। ফের যেন ওয়ার্নিং দেওয়ার প্রয়োজন না পড়ে। ‘
ইভান এবং সাহিল দ্রুত ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে সায় জানালো। কাজের অযুহাত দেখিয়ে সাফওয়ানের তোপের মুখ হতে পালিয়ে গেল দ্রুত। সাফওয়ানের এমন পজেসিভনেস বিগত দিনগুলোতে দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে রূপম। সাফওয়ানের কথামতো সাহিল,ইভান এবং রাহাত সহ বর পক্ষের সব ইয়াং ছেলেদের সে-ই তো দূরে সরিয়ে রেখেছিলো। বিয়ে বাড়িতে তার অন্যতম কাজ-ই ছিল এইটা। সায়েরী জানে যে, সে খুব এনজয় করেছে। কিন্তু তার অগোচরে কত কি যে সামাল দিয়ে গেছে সাফওয়ান, সেসব ব্যাপারে মেয়েটা কখনো জানতেও পারবে না বোধহয়।

স্টেজে নাজরাতের পাশে বসে আছে তার তিন গুনধর বান্ধবী। ক্যামেরাম্যান ছবি তুলছে তাদের। কিন্তু চার রমনীর মুখ স্থির থাকলে তবেই না ছবি ভালো আসবে! এইতো, নাজরাত জমের মতো বসে ছিল তিনজনের মাঝে। ক্যানডিড ছবি তুলবে নাম করে তিন বজ্জাত নাজরাতের দিকে এমন ভাবে নজর গেঁথে রেখেছিলো যে, বেচারি পারেনি নিজ আসর ছেড়ে পালিয়ে যেতে। সেই অবস্থাতেই তোহা চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে বলেছে,
‘ তুই কি বলবি? না আমরা তোকে আনবক্সিং করে উত্তর টুকু বুঝে নিব? ‘
সাফ্রিন-সায়েরী মিটিমিটি হাসছে। তোহা এবং সাফ্রিনের সঙ্গে আজ সায়েরীকে ও তাল মিলাতে দেখে বড় আশ্চর্য হলো নাজরাত। বললো,

‘ সায়ু! শেষমেশ তুই-ও এসব কথায় কান দেওয়া শুরু করেছিস? ‘
সায়েরী লজ্জা পেলো বটে। জবাব দেওয়ার পূর্বে তোহা ফট করে বলে উঠলো,
‘ আরে! কান দিবে না কেনো? মেয়ে যে এখন বড় হয়েছে সেটা জানিস না তুই? পোকামাকড়ের কামড় থুক্কু পোকা বাইট নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সে আজকাল। অন্তত পোকাকে সামাল দেওয়ার জন্য হলেও তার জানাটা অত্যন্ত জরুরি। ‘
এই পর্যায়ে নাজরাত নিজেও হেসে ফেললো। হাসলো সাফ্রিন-ও। সায়েরী লজ্জায় লাল বেগুনি। ঠাশ করে এক চড় বসালো তোহার পিঠে। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে তাকালো তোহা। বললো,

‘ ঢং! এত লজ্জা দেখিয়ে, আর আমাকে মেরে কি হবে? তোর গলার পোকা বাইট গায়েব হয়ে যাবে? ‘
‘ ওহহো! তোহা, আস্তে বল.. ‘ সায়েরী সংকুচিত।
তোহা সেদিকে পাত্তা দিলনা। আগের মতোই চাপা স্বরে নাজরাতকে বিরক্ত করবে, পূর্বেই ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক হাসলো নাজরাত। দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো,
‘ তোরা কি সসম্মানে ধুর হবি? না আমি লাত্থি মেরে মেরে ধুর করব? ‘
নাজরাতের বলার ভঙ্গিমা দেখে মুখ চেপে হেসে গড়াগড়ি খেলো তিন বান্ধবী। তাদের এমন আচরণে ক্যামেরাম্যান বেজায় বিরক্ত। অতিষ্ঠ কন্ঠে সে বললো,

‘ আপনারা কি ছবি তুলবেন? তুললে একটু স্বাভাবিক হয়ে বসুন না। এত নাড়াচাড়া করছেন কেন? ‘
চার বান্ধবী সচেতন হলো। কিন্তু অন্যদিকে ক্যামেরাম্যানের পাশে হয়ে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিউত্তর করলো নুহাশ,
‘ আরে ভাই! কাদের বলতেছেন স্বাভাবিক হতে? এরা সবাই জন্মসূত্রেই অস্বাভাবিক। স্বাভাবিক কিছুই ওদের মধ্যে নাই। আপনি করুণা করে হলেও দুই চারটা ছবি তুলে ফেলেন। স্বাভাবিকভাবে তুলতে চাইলে সাত জনম লেগে যাবে, তবুও তোলা হবে না। ‘

সাদিফ-নাজরাত কে ঘিরে স্টেজে আসর জমিয়েছে দুই পক্ষের সকল কাজিন,বন্ধুবান্ধব। সবাইকে নিয়ে গ্রুপ ছবি তুলা হবে কি-না। স্টেজে রীতিমতো হৈচৈ লেগে গিয়েছে। কে কোথায় দাঁড়াবে? কার পাশে কে বসবে, কারা দাঁড়িয়ে থাকবে এসব ব্যাপারে কেউ-ই সচেতন নয়। যায়গা পেলেই হলো শুধু। গাদাগাদি করে এদিকে সেদিক দাঁড়াচ্ছে সকলে। শেষে সাফওয়ান আসলো সাদিফের ডাকে। সে আশপাশ না দেখে দাঁড়িয়ে পড়লো একদিকে। একনজর সবার দিকে তাকিয়ে কাঙ্ক্ষিত রমনীর খোঁজ অবশ্য করেছিল৷ কিন্তু এতজনের ভিড়ে মেয়েটা কোথায় চ্যাপ্টা হয়ে আছে তা আর দেখল না সে। অতিষ্ঠ, বিরক্ত ক্যামেরাম্যান তার দিকে তাকাতে বললো সকলকে। ঠিক সেই মুহুর্তে সাফওয়ানের বাহু ঘেঁষে দাঁড়ালো কেউ। তার রুক্ষ হাতের ভাঁজে গলিয়ে দিল নিজের ছোট্ট, কোমল হাতখানা।

চিরপরিচিত এই স্পর্শে, জেসমিন ফুলের সুভাস পেয়ে চকিতে ফিরে তাকালো সাফওয়ান। দেখল, বড় অবলীলায় তার পাশে স্থান দখল করেছে সায়েরী। সকলের দৃষ্টির আড়ালে, শাড়ির ফাঁকে হাত ধরেছে প্রেমিক পুরুষটার। দৃষ্টি তার সম্মুখে, হাসি হাসি মুখ। যেন কিছুই করেনি সে। সাফওয়ানকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বিব্রত হয়ে ধরে রাখা হাত খানায় চিমটি কাটলো সে। ইঙ্গিত টুকু বুঝতে পেরে দ্রুত নজর ফিরিয়ে নিল সাফওয়ান। কিন্তু এবারে সম্পূর্ণ রূপে বদলে গেল তার প্রতিক্রিয়া। ক্ষনিক পূর্বে যেই মুখে রাগ,বিরক্তি মিশে ছিল। এখন তাতে মিশে আছে প্রশান্তি। অধর কোণে মৃদু হাসির আভাস। এই মেয়েটাকে নিয়ে ইনসিকিউর হচ্ছিলো সে? তার আশেপাশে হতে সব ছেলেমানুষ কে দূরে রাখছিল। যেন মেয়েটা কারো কথায়,কাজে আকৃষ্ট না হয়! অথচ মেয়েটা এতজনের ভীড়েও তাকে খুঁজে নিয়েছে। ভীতু রমনীটি আজ কারো তোয়াক্কা না করে তার পাশে স্থান দখল করে নিয়েছে। তাকে বেঁচে নিয়েছে! সাফওয়ানের সুডৌল বক্ষপট ফুলে উঠলো প্রশান্তিতে,গর্বে। নিজ রুক্ষ হাতের ভাঁজে থাকা ওই মোলায়েম হাতখানা সে শক্ত করে চেপে ধরলো। মিলিয়ে নিল আঙ্গুলের ভাঁজে আঙ্গুল।

কোলাহলপূর্ণ হলরুমের বেশ অনেকটা দূরে, মোটামুটি নিরিবিলি স্থানটাতে দাঁড়িয়ে তোহা। দাঁড়িয়ে বললে ভুল হবে, জোর করে তাকে নিয়ে আসা হয়েছে উক্ত স্থানে। পিচ রঙের শাড়ি পড়েছে মেয়েটা। হলদে ফর্সা তনুই রঙটা মিলেমিশে একাকার। নাদুসনুদুস দেহশ্রীর অধিকারীনি রমনী-টিকে অদ্ভুত রকমের সুন্দর লাগছে এই শাড়িতে। বিগত দুয়েক ঘন্টা হাস্যজ্বল চিত্তে পার করলেও, ঠিক এই মুহুর্তে চুপসে আছে মেয়েটা। রাউন্ড ফ্রেমের চশমার আড়ালে ঢাকা চোখদুটো একপলক তাকালো দূরে৷ যেন পর্যবেক্ষণ করছে মেহমানদের গতিবিধি। পরক্ষণেই কিঞ্চিৎ ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল পেছনে। ঠিক তার পিঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বাটে দেহের মানবটার দিকে চোখ তুলে, ফিসফিস কন্ঠে শুধাল,

‘ এখানে এভাবে টেনে এনেছিস কেনো? কেউ দেখলে কি ভাববে? কত মানুষ আশেপাশে! ‘
তার কন্ঠে কিঞ্চিৎ কৌতুহল, অত্যাধিক ভীতি। বান্ধবীদের সম্মুখে ঠোঁট কাঁটা স্বভাবের হলেও অন্যসবার সম্মুখে তার চরিত্র ভিন্ন। এই মুহুর্তেও মেয়েটা চিন্তিত। এত মানুষের ভীড়ে তার বড় ভাইয়ের পরিচিত কেউ যদি থাকে! কেউ যদি খারাপ কোন কথা ভাইয়ের কানে ঢুকাই, তবে তার রক্ষা থাকবে না। ভেবেই পুণরায় সতর্ক নজরে আশেপাশে তাকালো সে৷ পূর্বের মতো একই সুরে আওড়াল,
‘ ডেকে এনে সঙ সেজে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? কথা বল.. ‘
ঘাড় উঁচিয়ে আয়ানের উদ্দেশ্যে কথাটা বললো সে। সঙ্গে সঙ্গে ভেসে আসলো শান্তশিষ্ট ছেলেটার গম্ভীরমুখো কন্ঠের ধমক,

‘ সুন্দর করে শাড়ি পরতে না জানলে পরেছিস কেনো? কেউ জোর করেছিলো তোকে? ‘
কন্ঠের গাম্ভীর্য উপলব্ধি করতে পেরে ভড়কে গেল রমনী। সে নিজে সহস্যবার ঝগড়া বাঁধাক না কেন, নির্দিষ্ট কোন সময়ে এই শান্ত মেজাজের ছেলেটার রাগত্ব মেজাজের কবলে পড়লে সে ভাষা হারিয়ে ফেলে। বাচ্চা হরিণীর ন্যায় চুপসে যায়। আজও ব্যতিক্রম হলো না। এটুকু ধমক শুনে কথা হারিয়ে ফেলল সে। আমতাআমতা করে শুধাল,
‘ সামলাতে পারবো না কেনো? আজ কি প্রথম পরেছি নাকি? ঠিকঠাক ভাবেই তো আছে। ‘
আয়ানের দৃষ্টি পূর্বের চেয়েও গম্ভীর হলো। আড়চোখে চারপাশে নজর বুলিয়ে, আর-ও ঘনিষ্ঠ হলো তোহার সঙ্গে। মাথা নুইয়ে গমগমে গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ কতটা ঠিকঠাক আছে সেটা তোর বার্থ মার্ক দেখেই আন্দাজ করতে পারছি৷ দেখানোর জন্যই খোলা ছেড়েছিস, নাকি? ‘

এহেন প্রতিউত্তরে তোহার টানা টানা আঁখিদুটি ডিম্বাকৃতির ন্যায় হয়ে গেল। বার্থ মার্ক! তার নাভিমূলের ডান পাশে যে ত্রিভুজাকৃতির জন্ম দাগ রয়েছে, সেকথা আয়ান জানে না। সে কখনো বলেনি। দেখার তো প্রশ্নই উঠে না। তবে কি আজ শাড়ির ফাঁকে নজরে এসেছে! সহসা তার হাত পৌছাল কোমরের দিকে। শীতল হাতের ছোঁয়া লাগল সরাসরি মসৃণ ত্বকে। চমকে উঠলো মেয়েটা। মৃদু স্বরে প্রতিক্রিয়া দেখাল,
‘ হায় আল্লাহ! প-পিন! পিন ছুটে গেছে? ‘
আয়ান নিরবে দাঁড়িয়। চুপচাপ দেখছে তোহার ছটফটানি। মেয়েটা চিন্তিত মুখে ফিরে চাইল। দেখল, মোবাইলে কিছু একটা টাইপ করছে আয়ান। দুশ্চিন্তায় ভরা কন্ঠে সে বলে উঠলো,

‘ একথা আগে বললি না কেনো? না জানি কতক্ষণ যাবত এমন হয়ে আছে! এখন কি হবে! আমার কাছে বাড়তি পিন-ও নেই। ‘
‘ আজব মেয়েমানুষ তুই! শাড়ি পড়ে বের হয়েছিস, কিন্তু বেকআপ কোনো প্রিপারেশন নিসনি। কি করার! এখানে দাঁড়িয়ে থাক এভাবে। শিক্ষা হোক৷ ‘
আয়ানের বিরক্তি ভরা কন্ঠস্বর৷ বিপরীতে কাঁদোকাঁদো মুখশ্রীতে তাকিয়ে আছে তোহা। আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল তা দেখে। বললো,
‘ সাফাকে মেসেজ দিয়েছি। সে ব্যস্ত থাকলে সায়ুকে হলেও পাঠাতে বলেছি। কারো না কারো কাছে পেয়ে যাবি পিন। শান্ত হ৷ ‘
তোহা শান্ত হলো নিমেষেই৷ আয়ান পুণরায় বললো,

‘ নাজরাতের দেবরের সাথে কিসের এত হাসাহাসি করছিলি? ‘
কপালে ভাঁজ ফেলে তাকালো তোহা। বললো,
‘ হাসাহাসি করলাম কখন? অল্প কিছু কথা বলেছি। সাহিল ভাইয়া তো সায়ুর খোঁজ করছিলেন শুধু। আর কিছু না। ‘
আয়ান কানে তুলল না সেকথা। এই সাহিল ছেলেটাকে অসহ্য লাগছে তার। মেহেন্দির রাতে সায়েরীর করা ফাজলামির রেশ ধরে, আয়ান ভেবেই নিয়েছে যে সাহিল তোহাকে পছন্দ করে। এজন্য ছেলেটাকে তোহার আশেপাশে দেখলেই তার মেজাজ খিচে যায়। নিজের এই হিংসাত্মক ব্যক্তিত্ব দেখে সে নিজেই আশ্চর্য হয়৷ ভালোবাসবে না বলে বলে এখন এই মেয়েকে ঘিরে শত অনুভূতি বাঁধা পড়েছে হৃদ মাঝারে। মাঝে মাঝে নিজের এই পরিবর্তন দেখে হাসি পায় তার। ভালো-ও লাগে। ভালোবাসা যে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে হয় না৷ ব্যাস হয়ে যায়..মনের সঙ্গে মনের মিলনে৷ খুব গোপনে, সংগোপনে।

‘ বাড়ি ফিরবি কার সঙ্গে? সায়ুর সাথে যাবি? ‘
আয়ানের প্রশ্নে চোখ তুলে তাকাল তোহা৷ বললো,
‘ ভাইয়া বলেছিল নিতে আসবে। ঠিক জানি না আসবে কি-না। ‘
‘ সায়ুর সাথে ওর বাড়ি চলে যা নাহয়। ‘
‘ নাহ। ভাইয়া ওসব পছন্দ করে না জানিস তো। দেখি কি করা যায়। ‘
‘ পাকনামি করে একা একা বেরুবি না। সায়ুর সঙ্গে না গেলে আমাকে জানাবি। এই রাত-বিরেতে একা বেরুনোর কোনো মানেই হয়না। আমি হলের বাইরে থাকলে ফোন দিবি আমাকে। আমি পৌঁছে দিব৷ ফোনে ব্যালেন্স আছে? ‘
আয়ানের এমন সিরিয়াস মুখাবয়ব দেখে আচমকা হেসে ফেললো তোহা। সকলের দৃষ্টির আড়ালে আয়ানের বাহু জড়িয়ে ধরে মাথা রাখল কাঁধে। মৃদু হেসে বলে উঠলো,

‘ এতটা পজেসিভ কবে থেকে হলি বলতো? আমি তো ভেবেছিলাম তোকে গলাতে বহুত কাঠখড় পোড়াতে হবে৷ মাত্র কয়েক মাসে এমন বদলে যাবি জানলে শুরুতে আফসোসের সাগরে ডুবে মরতাম না। ‘
‘ আফসোস? কি নিয়ে এত আফসোস করেছিলি? ‘ ভ্রুঁ কুঁচকালো আয়ান।
বিপরীতে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরলো তোহা।ভোঁতা মুখে জবাব দিলো,
‘ নিরামিষ প্রেমিক জুটিয়েছি বলে ধারণা করেছিলাম, সেই আফসোস। না রোমান্টিক কথাবার্তা, না আদর করে তুমি-তামি সম্বোধন, না ডেইট,না ফুল কিছুই তো করলি না। জেগে জেগে স্বপ্ন দেখেছি, এমন করেই এক শুকনো চুমু খেলি। কিছু অনুভব করার আগেই, চোখের পলকে চুমু শেষ। আমার তো এখনো সন্দেহ হয়, সেদিন আদৌও চুমু খেয়েছিলি? নাকি সব আমার ভ্রম ছিলো? ‘

ভদ্রতার খোলসে মোড়ানো ছেলেটা বিষম খেয়ে গেল আচমকা। কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠেছে তার। এই মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলার আগ অবধি সুন্দর, পবিত্র একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে ছিল তাদের। যেখানে ছিল, ছেলে-মেয়ে নামক লিমিটেশনে ভর্তি। কোন মেয়ে বন্ধুরা ছেলে বন্ধুদের সম্মুখে এই ধরনের কথা কক্ষনো বলেনি। এতগুলো বছরের বন্ধুত্ব থাকা স্বত্তেও, আয়ান জানেই না তার প্রেমিকা নিজ বান্ধবীদের কাছে ঠিক কোন স্তরের ঠোঁট কাঁটা মেয়ে। তাইতো, আজ এমন ঠেঁটা জবাব শুনে তার বিষ্ময় আকাশ ছুঁল। সরাসরি তার কাছে চুমু নিয়ে কৈফিয়ত চাচ্ছে মেয়েটা! এর চেয়ে বিষ্ময়কর ব্যাপার যেন দ্বিতীয়টি হওয়ার নয়। সে বড্ড চিন্তিত হলো আসন্ন ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। তোহা যে এমন মুখ পাতলা স্বভাবের, তা সে জানতো না। নিজের বিষ্ময় ভাবটুকু সুনিপুণ ভাবে চেপে গেল সে। তোহার মুখের কাছটায় ঝুঁকে এসে ফিসফিস কন্ঠে শুধাল,

‘ আরেকবার চুমু খেতে চাচ্ছিস, সেটা বললেই তো হতো। এতো অযুহাত দেখানোর কি দরকার? আমি এতটাও পাষণ্ড প্রেমিক না, যে তোর এটুকু ইচ্ছে অপূর্ণ রাখব। ‘
এক লাগামহীনের বিপরীতে অন্য এক লাগামহীন প্রতিউত্তর। যা শোনামাত্র চমকে উঠলো তোহা। ভড়কে গিয়ে ছিটকে সরে গেল আয়ানের কাছ থেকে। এই স্বল্পভাষী ছেলেটার পক্ষ হতে এমন জবাব নেহাৎ কল্পনাতীত ছিল তার কাছে। ছেলেটার এই মাদক চাহনিতে গলা শুকিয়ে এলো। সে দ্রুত এদিকে সেদিক দৃষ্টি ফেরালো। আটকে আসা কন্ঠে বললো,
‘ আ-আমাকে বোধহয় সাফা ডাকছে.. ‘
তৎক্ষনাৎ চঞ্চল পায়ে স্থান ত্যাগ করলো রমনী। আয়ানের সম্মুখ হতে অদৃশ্য হতে পারলেই যেন সে বেঁচে যায়। তার এমন ভড়কানো প্রতিক্রিয়া দেখে মৃদু শব্দে হেসে ফেললো আয়ান।

চতুর্দিকে মেহমানে ভরপুর। চেনা-অচেনা মানুষের সমাগমের মাঝে, এই আলোকসজ্জায় সাম্য দৌঁড়ঝাপ করেছে দীর্ঘক্ষণ। সঙ্গে ছিল বোন সামান্তা সহ আরও গুটিকয়েক বাচ্চা সদস্য। হলে ফিরে এসে সে দেখল ‘ নতুন বর ‘ নামক সাদি ভাইকে। তার এই ভাইটি সদ্য বিয়ে করেছে। যার বউ নিয়ে মেতে আছে সকলে। অন্যদিকে ইভান ভাইয়ার সহস্র প্রেমিকা রয়েছে। যাদের সবকটাকেই সে বউ বলে আখ্যায়িত করে। সাম্য বহুবার শুনেছে ইভান ভাইয়ার বউয়ের কথা। কোন বউ, তা সে জনে না। তাছাড়া কিছু মুহূর্ত পূর্বে ইভান ভাই সাহিল ভাইকে বলছিল,

‘ দ্রুত শুভ প্রেম নিবেদন টা সেরে ফেল, সাহিল৷ সাদিফ ভাইয়ের পর যেন তোর বউ-ও ঘরে তুলতে পারি। রূপ ভাই আর সাফওয়ান ভাইয়ের চিন্তা বাদ দে। তাদের আশা ধরলে এই জীবনে বিয়ে করতে পারবি না। ‘
অর্থাৎ সাহিল ভাইয়েরও বউ আছে। রূপম ভাইকে সবাই ভদ্র বলে ঠিকই। কিন্তু সাম্য দেখেছে, কোন এক সুন্দরী রমনীর সঙ্গে মোবাইলে ঘন্টা ধরে কথা বলে সে। যার মানে রূপম ভাইয়ারও বউ ঠিক করা আছে! বাকি রইলো সে এবং সাফওয়ান ভাই। এই সুদর্শন বড় ভাইয়ার জন্য সহস্র রমনী উন্মাদ। এই বিয়ে বাড়িতে কতশত তামাশা দেখল সে। তার সামনেই বড় মা’কে (তাহুরা খান) কত মেয়ের মা এসে প্রস্তাব দিল সরাসরি। সোজা কথায় বড় ভাইয়ের জন্য বউ খুঁজতে বিশেষ বেগ পেতে হবে না। ছোট্ট মস্তিষ্কে বেশ গভীর চিন্তা খসল সে। এরপর আচমকা বলে উঠলো,

‘ কি আশ্চর্য! ভাইয়াদের সবার বউ আছে। সবার তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে যাবে! আমি বাদ কেন? আমার বিয়ে কবে হবে? আমার বউ নেই কেন? ‘
জনসম্মুখে বলা কথাটা কর্ণধার হলো অনেকেরই৷ সাম্যর চাচাতো বোনেরা সহ নাজরাতের বন্ধুমহলের সকলে বসে ছিল উক্ত স্থানে। এহেন কথায় হাসির রোল পড়লো। পাশ হতে সাম্য’র কাঁধ জড়িয়ে ধরল একজোড়া মেয়েলি হাত। শোনা গেল হাসিমাখা, রিনরিনে কন্ঠ,
‘ আহ! বউ নেই বলে এত আহাজারি করতে হচ্ছে কেনো মি. সাম্য ? আমাকে বউ করে নাও। তাকিয়ে দেখ তো পছন্দ হচ্ছে কি-না? ‘

সাম্য ফিরে তাকায়। গোলগাল মুখশ্রীর অধিকারীনি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আচমকা সে লজ্জা পেয়ে গেল। নাহ! মেয়েটা তার পছন্দ হয়েছে। শুধু পছন্দ নয়, অনেক দিনের চেনাজানা বলে বেশ পছন্দ। মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো, বিয়ে করতে চাওয়া মাত্র বউ পেয়ে গেল! কি সৌভাগ্য তার! সকলে ঠিকই বলে, খান বংশের ছোট্ট লাট সাহেব সে। যার ভাগ্য সোনায় মোড়ানো। ভেবেই গর্বের সহিত হাসলো সে। বাকিদের সঙ্গে খোশগল্পে মগ্ন মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আবার লজ্জা পেয়ে গেল। বাম হাতে চুলে হাত বুলিয়ে নেচে-কুঁদে আবারও খেলায় মগ্ন হলো।

বন্ধুরা মশগুল নিজেদের আড্ডায়। দূর থেকে তাদের দিকে তাকিয়ে হাঁসফাঁস করছে নববধূ নাজরাত। সে স্থির বসে রয়েছে নিজ স্থানে। কতশত অচেনা মুখের সঙ্গে আলাপ সারতে হচ্ছে তার হিসেব নেই। এদিকে বন্ধুরা কি সুন্দর আড্ডায় মশগুল। তার ভেতরটা জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে দেখে। তাকে এমন তাকিয়ে থাকতে দেখে সায়েরী, তোহা এবং নুহাশ হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ইচ্ছে করেই জ্বালাচ্ছে দ্বিগুণ। নুহাশের চঞ্চল দৃষ্টি স্থির নেই। ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে হলরুমের সুন্দরী মুখগুলোর দিকে। নীল জামা পরিহিতা এক কিশোরীর দিকে দৃষ্টি পড়তেই সে কনুই দ্বারা খোচাল আয়ানকে। চঞ্চল কন্ঠে শুধাল,

‘ দেখত, মেয়েটা সুন্দর না? ‘
আয়ানের দৃষ্টি মোবাইল স্ক্রিনে সীমাবদ্ধ ছিল। বন্ধুর উস্কানিতে সে মাথা তুলল। কোনদিকে, কোন মেয়েকে ইঙ্গিত করে উক্ত কথাটি বলেছে তা সে জানে না। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে এক সেকেন্ডের জন্য মাথা তুলে সে প্রতিউত্তর করলো, ‘ হুম,সুন্দর। ‘
তৎক্ষনাৎ আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিল। কিন্তু বিধিবাম! পার্শ্ববর্তী চেয়ারে অবস্থানরত তোহা চ্যাতে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে। চাপা স্বরে চেঁচাল,
‘ সুন্দর মানে? কোন মেয়ে? কোথায়? প্রেমিকা পাশে বসিয়ে রেখে তুই অন্য মেয়ের রূপের প্রশংসা করছিস! তোরা ছেলেরা এমন নির্লজ্জ কেন? ‘
কানের কাছে এমন চেঁচামেচি শুনে আয়ান ভড়কে গেল। বেচারা বুঝে উঠতে পারেনি অবচেতনে কি করে বসেছে। তোহাকে জবাব না দিয়ে সে চোখ গরম করে চাইল নুহাশের দিকে। নুহাশ দ্রুত নজর ফিরিয়ে নিল। কথা ঘোরানোর প্রচেষ্টায় মাথা উঁচু করে বলে উঠলো,

‘ আজকের আকাশটা সুন্দর না? ‘
আয়ন দাঁতে দাঁত চেপে তাকায়। হিসহিসিয়ে বলে,
‘ সেটা সিলিং, আকাশ না। এদিকে আয় তুই। সিলিংয়েই তারা দেখিয়ে দিচ্ছি। দেখতে আরও সুন্দর লাগবে। ‘
নুহাশের হয়ে তোহা প্রতিউত্তর করলো,
‘ নিজে দোষ করে ওকে বকছিস কেন? ‘
‘ আশ্চর্য কথা বলিস তুই, তোহা! আমি কি করেছি? মেয়েটার দিকে তাকিয়েও দেখিনি। জানিই না কেমন দেখতে। ‘
‘ দেখিসনি! আমি স্পষ্ট দেখেছি তুই মাথা তুলে তাকিয়েছিলি। অমনি মিথ্যে বলছিস! তোকে আমি কি ভেবেছিলাম আর তুই! ছিহ! ‘
আয়ান ভীষণ হতাশ। সে কীভাবে বুঝাবে যে সে তাকায়নি মেয়েটার দিকে! আনমনেই জবাব দিয়েছিল কেবল। তার এমন চুপসানো মুখ দেখে সাফ্রিন এবং সায়েরী হেসে ফেললো। সায়েরী হাস্যজ্বল চিত্তে বলে উঠলো,

‘ আয়ান! মাই ডিয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড! তোকে এমন কষ্টে জর্জরিত হতে দেখে আমার মন পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। এখনো সময় আছে, পিছিয়ে যা৷ বেটার অপশন হিসেবে কিন্তু আমিও আছি। ভেবে দেখ.. ‘
রসিকতার সুরে বলা কথা শুনে আয়ান নিজেও হাসে। তোহা থমথমে মুখে বসে। একথা শুনে সে মুখ কুঁচকায়। প্রতিউত্তর করে না কোন। তবে নুহাশ নিজের ঝাকড়া চুলে হাত বুলিয়ে বলে,

‘ বা*লের কপাল! ব্যাটার একটা আছেই পাশে৷ তবুও তুই ওরেই লাই দিচ্ছস। কেন রে? চোখ আসমানে রেখে ঘুরস? আমারে দেখা যায়না? জন্ম থেকে সিঙ্গেল আমি, জন্ম থেকে। ভাবছিলাম এই বিয়েতে অন্তত কপাল খুলবে। কিন্তু বা*লের নসিব। তোদেরই পাত্তা পাই না। অন্য মেয়েরা ঘাস দিবে সেটা ভাবাও বিলাসিতা। ধ্যাৎ! ‘
কি দুঃখজনক স্বীকারোক্তি! কিন্তু তার দুঃখে প্রাণপ্রিয় বন্ধু গুলো মোটেও শোকাহত হলো না। বরং মুখ চেপে হাসলো। সায়েরী ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাত বাড়াল নুহাশের দিকে। চুলে হাত বুলিয়ে বললো,
‘ আহ! কাঁদে না। মেয়েগুলোর চোখে সমস্যা। ওরা হীরের পরখ করতে পারছে না। নয়তো এমন সুদর্শন ছেলে দেখেও কেউ চোখ ফিরায় নাকি? তোর এই ফর্মাল লুক দেখে তো আমি-ই ক্রাশ খেয়ে গিয়েছি। ‘
‘ আসলেই! ‘ নুহাশের কন্ঠে গদগদ ভাব। পুনরায় চুলে ব্যাকব্রাশ করলো সে। সায়েরী মাথা দুলিয়ে বুঝালো, হ্যাঁ। যা দেখে ছেলেটা বুক ফুলিয়ে বসলো। ভাব নিয়ে বললো,

‘ তবে অন্য মেয়ে লাগছে কেন? তুই পটে যা। আমি সাফওয়ান ভাইয়ের চেয়ে কম কিসে? শুধু একটু বডিশডি বানাতে হবে। কথাবার্তা কমিয়ে ইন্ট্রোভার্ট হতে হবে। দ্বায়িত্বশীল ভাই,প্রেমিক,ছেলে হতে হবে৷ কলেজের পপুলার বয় হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার জন্য টপার আর সব সমস্যার চট করে সমাধান বের করার মতো ব্রেন বানাতে হবে। আর টাকা! সে নাহয় ভেবে দেখা যাবে। পরের বার ইলেকশনে আমার বাবাকে দাঁড় করিয়ে দিব নে। সামান্য এটুকু কমতি। এ ছাড়া বাকি সবই তো আছে। ভেবে দেখ.. ‘
সায়েরী প্রতিউত্তর করার সুযোগ টুকু পেলো না। পূর্বেই শোনা গেল সাফ্রিনের কন্ঠস্বর,

‘ ভাই! কিছু বলবে? ‘
সায়েরী এবং নুহাশ থতমত খেয়ে পেছন ফিরে তাকালো। সাফওয়ান দাঁড়িয়ে। চিরচেনা সেই গম্ভীর মুখাবয়ব তার। গাঢ় বাদামী মণির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নুহাশের দিকেই নিবদ্ধ। চোখে চোখ মিলতেই বেচারা নুহাশের চেহারার রঙ উবে গেল। দৃষ্টি স্থির রেখেই সাফওয়ান ভরাট কন্ঠে ডাকল, ‘ নুহাশ! ‘
এক ডাকেই যেন পরাণ পাখি উড়াল দিবে দিবে ভাব। ধরফরিয়ে উঠল নুহাশের বুকের ভেতরটা। তৎক্ষনাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো সে। ডাকের সঙ্গে সঙ্গে ঢোক গিলে প্রতিউত্তর করলো,
‘ জ-জ্বি ভাইয়া? ‘
সাফওয়ান আগের মতোই তাকিয়ে। তার মুখ দেখে বুঝার উপায় নেই সে রেগে আছে, না স্বাভাবিক। পূর্বের ন্যায় একই সুরে আওড়াল,

‘ চেয়ার.. ‘
নুহাশ তড়িৎ পিছু ফিরে। তার চেয়ারের পেছন দিকে শূন্য চেয়ার-টিকে ইশারা করেছে দেখে সে ব্যস্ত হয়ে উঠে। সময় বাঁচাতে নিজের চেয়ারটাই হাতে তুলে নেয়। ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে শুধায়,
‘ চেয়ার কার জন্য লাগবে, ভাইয়া? আম-আমি রেখে আসছি। ‘
সাফওয়ান হাতে উঁচিয়ে ইশারা করে। কয়েক হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছেন জাহুরা খান। সেদিক তাকিয়ে নুহাশ চেয়ার তুলে চঞ্চল কদমে এগিয়ে যায়। জাহুরা খানের দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক হেসে চেয়ার পেতে দেয়। ভদ্রমহিলা হাসলেন না। কপাল কুঁচকে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। বসে পড়লেন ভাব নিয়ে। নুহাশ নিজেও মুখ কুঁচকে ফেললো জাহুরা খানের ভাব দেখে। ফিরে এসে দেখল সাফওয়ান নেই। তা দেখে বড়সড় স্বস্তির শ্বাস ফেললো সে। বুকে হাত চেপে বলে উঠলো,

‘ এই পালোয়ান লোকটাকে তুই কিভাবে সামাল দিস রে পিচ্ছি? তার এক চাহনিতেই আমার আত্মা উড়ে গেল। ‘
চেয়ার টেনে বসে ফের বলে উঠলো,
‘ মাফ চাই বইন। তোর লগে জীবনেও ফ্লার্টিং করতে আসব না। সাফওয়ান ভাইরে বলে দিস একথা। এই সিঙ্গেল চেহারায় অমন পালোয়ান হাতের থাপ্পড় পড়লে ইহজীবনে বউ পাবো না নয়তো। এত বড় শাস্তি আমারে দিস না। ‘
বাকিরা হাসলেও সায়েরীকে দেখাল নির্বিকার। কিছুটা চিন্তিত। সাফওয়ান ভাই যেতে যেতে যেই এক চাহনিতে তাকিয়েছিল তার দিকে! মেয়েটা সেই থেকে জমে আছে। আজ সাফওয়ান ভাইয়ের হয়েছে কি? কেন এত বেশি গুমসুম হয়ে আছে সে? বন্ধুদের সঙ্গে করা সায়েরীর রসিকতায় সে কি রেগে গেল? ভাবতে ভাবতে চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো সায়েরী। মনের মাঝে খচখচ করছে। সাফওয়ান ভাইয়ের সঙ্গে কথা না বলা অবধি এই খচখচানি কমবে না মোটেও।

‘ তুমি কেনো গিয়েছিলে সেখানে? দেখনি ওখানে ছেলেমানুষ বেশি? ‘
সাফওয়ানের রাশভারি স্বর। সায়েরী সিটিয়ে গেল তা শুনে। নত মস্তকে দাঁড়িয়ে রইলো অপরাধীর ন্যায়। সাফওয়ান কে খোঁজার জন্য হলের বাহিরে গিয়ে কয়েক জন যুবকের সম্মুখে আটকে পড়েছিল সে। পাশ কাটাতে গিয়ে একজন ছেলে ইচ্ছাকৃত ভাবে, বেশ অসংযত ভঙ্গিতে তার বাহুতে ধাক্কা মেরেছিলো। ঠিক সেই মুহুর্তেই উপস্থিত হয়েছিলো সাফওয়ান। দৃশ্যটুকু দেখে তার মাথায় রক্ত ছলকে উঠেছিলো রীতিমতো। তেড়ে যেতে নিলে সায়েরী অগোচরে হাত চেপে ধরে তার। চোখের ইশারায় আকুতি জানায়, যেনো হাঙ্গামা না করে। সাফওয়ান নিজেও বুঝে, এখন জনসম্মুখে হাঙ্গামা করলে পরিস্থিতি বিগড়ে যাবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি তখন সায়েরীর-ই হবে।

আর যা-ই হোক, সাফওয়ান কখনোই রাগের বশে সায়েরীকে ক্ষতি করার মতো ভুল করবে না। এজন্যই সে রাগ নিয়ে সায়েরীর হাত চেপে প্রস্থান করে। মেয়েটা ভীতু মুখে আশপাশ দেখে। কেউ দেখলে হাজারটা প্রশ্নে জর্জরিত করে তুলবে যে! কিন্তু সাফওয়ান সেসবের ধার ধারলে তো! হাত টেনে সোজা প্রবেশ করেছে হলরুমে। সায়েরীর টানাটানি তে অবশ্য হাত ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলো। কিন্তু কড়া গলায় নির্দেশ দিয়েছিলো, যেন তার পিছু আসে। কোলাহল বিহীন স্থানে এসে থামার পরপরই উক্ত প্রশ্নে মেয়েটা সিটিয়ে গেছে। ফাঁকা ঢোক গিলে সে মিনমিন কন্ঠে জবাব দিল,

‘ আপনাকে খুঁজতে গিয়েছিলাম। আমি জানতাম না ওখানে এতগুলো ছেলে.. ‘
সায়েরী কথাটুকু শেষ করতে পারলো না। পূর্বেই খানিকটা দূর থেকে ভেসে আসলো নারী কন্ঠের আহ্লাদী ডাক, ‘ সাফওয়ান!! ‘
সাফওয়ান-সায়েরী দুজনেই ফিরে তাকালো। ঘন্টা দুয়েক পূর্বে সাফওয়ানের গাড়িতে চড়ে আসা রমনী-টিকে দেখে কপালে ভাঁজ পড়লো সায়েরীর। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে আগাগোড়া দেখল মেয়েটাকে। একই ভঙ্গিতে সায়েরীকেও পরখ করছে অজ্ঞাত রমনী। ডান হাতে ধরে রাখা গোলাকৃতির ড্রিংকসের গ্লাসটি মৃদু তালে নাড়তে নাড়তে সে কদম বাড়াচ্ছে। সায়েরীর দিকে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সে মুখ হাসি টানলো। নজর গাঁথল সাফওয়ানের উপর। কন্ঠে পূর্বের মতোই লাজুকতা ঢেলে বললো,

‘ তুমি এখানে? ফুপি সেই কখন থেকে খুঁজছে তোমাকে? আসার পর থেকে তো কিছুই খাওনি। আমাদের সাথে জয়েন হও, আসো। ‘
সায়েরীর কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হচ্ছে এই কন্ঠে, এমন আহ্লাদ দেখে। সে সরাসরি মাথা তুলে চোখ পাকিয়ে তাকায় সাফওয়ানের দিকে। মাত্র কয়েক সেকেন্ড পূর্বের সেই ভীতি যেন কই উবে গিয়েছে তার। সাফওয়ান ভ্রুঁ কুঁচকে ফেলে আকস্মিক সায়েরীর নজরের এই পরিবর্তন লক্ষ্য করে। বুঝে উঠতে পারে না এমন প্রতিক্রিয়ার অর্থটুকু। এদিকে অজ্ঞাত রমনী হেলেদুলে অনেকটাই কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। এইতো, মাত্র তিন কদম বাড়ালেই সাফওয়ানের সম্মুখে এসে হাজির হবে। সায়েরী ভাবতে পারে না এই দৃশ্য। তার রাগ লাগে, অদ্ভুত এক জ্বলন অনুভব করে বুকের মাঝে। মেয়েটা কাছ ঘেঁষার পূর্বেই সে নিজের এক পা বাড়িয়ে দিল পথে। সেই পায়ের সঙ্গে পা লেগে হুট করে হোচট খেয়ে বসে মেয়েটা। হুমড়ি খেয়ে পড়তে উদ্যত হয় সাফওয়ানের বুকে।

তবে সফল হয়না। সাফওয়ান ছিটকে সরে যায়, যেন কোন আবর্জনা থেকে নিজের শরীর বাঁচিয়েছে। দুই প্রেমিক-প্রেমিকার এহেন কীর্তিতে অঘটন যা ঘটার তা ঘটেই গেল। ফ্লোরে মুখ থুবড়ে পড়লো মেয়েটা। তাও ভীষণ বাজে ভাবে। হাতের গ্লাস ভেঙে চুরচুর হয়েছে। সেই কাঁচের টুকরো’র উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে বলে হাতে, গালে কেটে গিয়েছে। আর্তনাদ করে উঠেছে সর্বোচ্চ স্বরে৷ সায়েরী আশা করেনি এমন নির্মম দৃশ্য। রক্ত দেখেই মেয়েটা ঘাবড়ে গেল। চেপে ধরলো সাফওয়ানের কোট। এ কি করে বসলো জেলাসির চক্করে! জানাজানি হলে কি হবে? চিন্তিত হয়ে সে ডাকল, ‘ সাফওয়ান ভাইইই ‘
যাকে এতটা করুন স্বরে ডেকেছে, সে মানুষটা বড্ড নির্বিকার। মেয়েটাকে হুমড়ি খেয়ে পড়তে দেখে সে ঠোঁট গোল করে চোখ উল্টায়। আশ্চর্য কন্ঠে বলে,

‘ ওওওহহোও! হোয়াট অ্যা শট! ‘
সায়েরী থতমত খেয়ে যায় একথা শুনে। ড্যাবড্যাব চোখে তাকাতেই আলতো হেসে তার গাল টানে সাফওয়ান। বেশ গর্বের সহিত আওড়ায়,
‘ দ্যাটস লাইক মাই গার্ল! ‘
‘ কোয়াইট ইম্প্রেসিভ! ‘
সায়েরী বিষ্ময়ে হতবিহ্বল। এমন একটা মুহুর্তে, সায়েরীর ঘটানো এই বিশ্রী অঘটনে কিনা সাফওয়ান ভাই তাকে এপ্রিশিয়েট করছে! এ কেমন ছেলে! ভয়ে, চিন্তায় মেয়েটা ঘেমে উঠেছে রীতিমতো। তার অবস্থা দেখে সাফওয়ান পুণরায় তার হাত ধরে। ‘ চলো ‘ বলতে না বলতেই কদম বাড়ায় অন্যদিকে। সায়েরী আরও একদফা আশ্চর্য হয়। হন্তদন্ত গলায় শুধায়,

‘ কোথায় যাব? উনাকে এ-এভাবে..এখানে ফেলে..’
সাফওয়ান বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফেলল। বেশ তিক্ততার নিয়ে প্রতিউত্তর করলো,
‘ জাহান্নামে যাক। ব্লাডি গার্বেজ! ‘
সায়েরী পুণরায় তাকে আটকাতে চাইল। কিন্তু ততক্ষণে উক্ত স্থানে আগমন ঘটলো সাফওয়ানের পরিবারের একাধিক সদস্যের। চিৎকার শুনে ছুটে এসেছে সকলে। তাহুরা খান, সাফ্রিন-সহ অনেকেই এসেছেন। তাদের দেখে সায়েরী দ্রুত নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল সাফওয়ানের হাতের ভাঁজ হতে। লম্বা,চওড়া পুরুষটার পেছনে লুকিয়ে ফেললো নিজেকে। অবশ্য তার দিকে কেউ বিশেষ ধ্যান দিলো না। দেখেও কোন প্রতিক্রিয়া দেখাল না। সকলের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হলো ফ্লোরে ব্যথায় কাতরানো মেয়েটার দিকে। ‘ রিদি ‘ নামে সম্বোধন করছে তাকে। সম্পর্কে সাফওয়ানের মামাতো বোন হয় সে। যা সকলের কথোপকথন শুনেই বুঝতে পারলো সায়েরী। রিদিতার মা বিলাপ জুড়েছেন৷ সাফওয়ানের দিকে নজর পড়ামাত্র তিনি আহাজারি করে উঠলেন,

‘ সাফওয়ান! তুমি থাকতে রিদি কীভাবে আঘাত পেলো? ‘
দুইহাত পকেটে ঢুকিয়ে, বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে ছিল সাফওয়ান। একথা শুনে সে ছোট ছোট চোখ করে তাকায়। চট করে জবাব দেয়,
‘ অন্যের জিনিসে চোখ রেখে লাফালে আঘাত তো পাবেই, মামী। আপনার মেয়েকে সাবধান করেও লাভ হলো না। এবারে যদি সুবুদ্ধি হয়! ‘

কেউ ভাবেনি সাফওয়ান প্রতিউত্তর করবে৷ তা-ও এমন, ত্যাড়া প্রতিউত্তর। কেউ সঠিক বুঝল-ও না কথাটার অর্থ। তবুও বলার ধরণ দেখে সাফ্রিন এবং রূপসা মুখ চেপে হেসে ফেললো। তাহুরা খান চোখ গরম করে তাকালের ছেলের দিকে। সাফওয়ান অগ্রাহ্য করেও যেন করলো না তা। রিদিতাকে হাসপাতালে নেওয়ার তোরজোড় সব বিরক্ত মুখে দেখে সে গটগট পায়ে স্থান ত্যাগ করলো। তাহুরা খান নিজেও গম্ভীরমুখে ছুটলেন ছেলের পিছুপিছু। সায়েরীকে এক কোণায় দাঁড়িয়ে হাঁসফাঁস করতে দেখে এগিয়ে গেল সাফ্রিন। ভীড় থেকে বের করে আনলো তাকে। সায়েরী তখন রিদিতা’র চিন্তা বাদ দিয়ে সাফওয়ান কে নিয়ে চিন্তায় বিভোর। এই ছেলে আজ কেন এতটা রেগে যাচ্ছে হুটহাট? ছোট, বড় কোন লেহাজ মানছে না। কার প্রতি জন্মেছে এই রাগ?
সাফওয়ান সেদিকে গিয়েছে, সেই একই পথ অনুসরণ করে এগিয়ে গেলো সায়েরী। পুরোপুরি জনমানবহীন, মোটামুটি বড়সড় একটি কক্ষের কাছাকাছি পৌঁছাতেই কর্ণধার হলো সাফওয়ানের গমগমে স্বর,

‘ পাগল হলে নাকি? আমি কেনো রিদিকে আঘাত করতে যাবো? আমাকে তুমি এই চিনলে, আম্মু? ‘
সমান তালে প্রতিউত্তর করলেন তাহুরা খান,
‘ তুমি-ই আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছ। সন্ধ্যা থেকে রেগে আছো মেয়েটার উপর। তোমার রাগ সম্পর্কে কি ধারণা নেই আমার? তোমরা বাপ, ছেলে রাগের মাথায় দুনিয়া জ্বালিয়ে দিতে পারবে। ‘
অস্থির চিত্তে দুই আঙ্গুল দ্বারা কপাল ঘষল সাফওয়ান। গম্ভীর, তবে যথাসম্ভব ঠান্ডা স্বরে বললো,
‘ আমার রাগ সম্পর্কে তোমার কোন পরিপূর্ণ ধারণা নেই, আম্মু। আর রাগের মাথায় কোন মেয়েকে আঘাত করার মতো শিক্ষা আমাকে দাওনি। তাই এটা ভাবা বন্ধ করো। ‘

‘ তোমার ভাতিজির উপর আমার রাগ সন্ধ্যা থেকে নয়, বরং বহু বছর ধরে। তুমি জানো ওর চালচলন, ওর চরিত্র কিছুই আমার পছন্দ না। তোমাদের সামনেই একথা জানিয়েছিলাম। তবুও মেয়েটা শুধরায়নি। তোমার গুণধর ভাই-ভাবী লাই দিয়েছে ওকে। তুমি জানতে এসব এক্সট্রা মডার্ন চালচলন আমি পছন্দ করি না। তাও তুমি সন্ধ্যায় আমাকে ফোর্স করেছ, যেনো ওকে সঙ্গে নিয়ে আসি। সবার সামনে না থাকলে আমি ডিনাই করতে পারতাম। কিন্তু তোমাকে অবাধ্যতা দেখিয়ে, কারো সামনে তোমাকে ছোট করতে চাইনি বলেই মেনে নিয়েছিলাম। তবে তোমার কাছ থেকে অন্তত এই আবদার আশা করিনি, আম্মু। অন্যসময় হলে এতটা রাগ লাগতো না। কিন্তু এখন আমি একজনের সঙ্গে কমিটেড। তুমি সবটা জেনেও কীভাবে পারলে তোমার ভাতিজি কে আমার পেছনে লাই দিতে? তুমি নিজেও মেয়েটাকে বিশেষ পছন্দ করো না। তাও কেনো এমন করছো, আম্মু?

তাহুরা খান’র উজ্জ্বল মুখশ্রী চুপসে গেল এবারে। আঁধার ছেয়ে গেল মুখজুড়ে। শোনা গেল উনার ভঙ্গুর কন্ঠস্বর,
‘ তুমি জানো কতগুলো বছর ধরে ভাইজানের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ ছিলনা। তোমার বাবার জেদ,অহংকারে আমি গুমরে মরেছি। তেরোটা বছর পর গিয়ে সব স্বাভাবিক হয়েছে। আমি চাচ্ছি না আবারও ভাইজানের সঙ্গে আমার দুরত্ব বাড়ুক। এজন্যই সন্ধ্যায় তার কথা মেনে তোমাকে জোর করেছিলাম। ‘
মায়ের ভঙ্গুর কন্ঠে সাফওয়ান নরম হয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে, গিলে নিলো নিজের সকল ক্রোধ। কি অদ্ভুত ভাগ্য তার! যে দুই নারীর মাঝে তার দুর্বলতা লুকিয়ে আছে। সেই দুজন একই রকমের। কোমল হৃদয়, অতি আবেগী, অল্পতেই ভেঙ্গে পড়ার স্বভাব। রক্ত গুণে একমাত্র বোনটা তার মতোই হয়েছে। কিন্তু এই সহজ-সরল মা’য়ের কাছে সাফওয়ান বরাবরই বেশ দুর্বল। তাই তো, কয়েক ঘন্টা যাবত জমানো রাগের ভাণ্ডারে ভাটা পড়লো তার। তবে তা প্রকাশ করলো না সে। ভরাট কন্ঠে প্রতিউত্তর করলো,

‘ মামার সঙ্গে বাবার সমস্যা কি সেটা আমি কখনো জানতে চাইনি, আম্মু । তবে মামা যদি আত্মীয়’র মাঝে আত্মীয়তা টেনে এই দুরত্ব পুরোপুরি মিটিয়ে নিতে চায়। তাহলে তোমার কোনো প্রয়োজন নেই, সেই ভাইয়ের বোন হয়ে থাকার। তোমার সব কথা মেনে নিই বলে, আমাকে এতটাও বাধ্য ছেলে ভাববে না, আম্মু। এমন কোন আবদার যেনো কক্ষনো করতে না শুনি। ভালো হয় যদি কালকের করা আমার আবদার টুকু তুমি মেনে নাও। ‘
‘ শান্ত আছি, থাকতে দাও। আমাকে বিগড়ে যেতে বাধ্য করলে আমি পুরো পরিবার-টাকে বিগড়ে দিব। ছেলের সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা অন্তত আছে তোমার। হয় আমার পছন্দ মেনে নিবে, নয়তো সেই পছন্দের সঙ্গে নিজেদের মানিতে নিতে শিখে যাবে। ‘

তাহুরা খান স্তব্ধ হয়ে পড়লেন ক্ষণিকের জন্য। সাফওয়ান কখনো মায়ের সঙ্গে এমন গম্ভীরমুখে কথা বলে না। এমন আদেশ দেওয়ার তো প্রশ্নেই উঠে না। মায়ের নিকট সদা শান্ত,সুশীল থাকা ছেলেটার অকস্মাৎ এই রূপ দেখে, এই কন্ঠ শুনে বিমূঢ় হয়ে রইলেন তাহুরা খান। গতকাল দেখে বুঝতে না পারলেও, এমন দৃঢ় কন্ঠের বাণী শুনে তিনি বুঝতে পারলেন, সায়েরী নামক রমনীটি উনার ঘাড়ত্যাড়া ছেলের সর্বত্রে জড়িয়ে। নয়তো সাফওয়ান কক্ষনো মায়ের সঙ্গে এমন কঠোর আচরণ করতো না, কক্ষনো না।

নিস্তব্ধ কক্ষটিতে সাফওয়ানের দৃঢ়,রাশভারী কন্ঠের এক একটি বাণী প্রতিধ্বনিত হলো বেশ জোড়ালো ভাবে। কক্ষের ভেতরে, এবং বাহিরে উপস্থিত দুই নারীর কানে ঝংকার তুললো তা৷ ছেলের এমন গাম্ভীর্য রূপ দেখে তাহুরা খানের আশ্চর্যের শেষ নেই যেনো। তবে অল্প সময়ের মাঝেই তিনি সামলে নিলেন নিজেকে। ব্যাপারটা উনাকে কষ্ট দেয়নি ঠিক, তবে বিশেষ ভালো ও লাগেনি। তিনি প্রতিউত্তর করতে চাইলেন। ঠিক সেই মুহুর্তে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা সায়েরীর অস্পষ্ট অবয়ব লক্ষ্য করে থেমে গেলেন পুণরায়। মায়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে সাফওয়ান নিজেও ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো। দুজনের তাকানো দেখে হকচকিয়ে গেলো সায়েরী। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাত কচলাতে লাগলো সে। তাহুরা খান একপলক ছেলের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে আসলেন সায়েরীর কাছে। মেয়েটার বুক ঢিপঢিপ করে উঠলো তা দেখে। অন্তস্থল জুড়ে অস্থিরতা ছেয়ে গেল।

ঘন পাপড়ির ওই ডাগরডোগর চোখদুটোতে ভীতি ভাব। তাহুরা খান বিগত দুই ঘন্টা যাবত খেয়াল করেন নি মেয়েটাকে। কিন্তু এখন দেখে আশ্চর্য হলেন বেশ। আলোকসজ্জার মাঝে সোনালী রঙের জরজেট শাড়ি পরিহিতা রমনীটিকে দেখে উনার দুই চোখে মুগ্ধতা ছেয়ে গেল। হলদেটে ত্বকের গোলগাল মুখশ্রীর অধিকারিণী মেয়েটার সর্বত্র যেনো মায়ায় জড়ানো। কি মায়াবী চেহারা! শালীনতায় মোড়ানো এই রূপ দেখে তাহুরা খান নিজেও বিমোহিত হলেন। শাড়িতে মেয়েটাকে যুবতী বলে মনে হচ্ছে। দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। ছেলে যে কোন মায়াজালে ফেঁসেছে তা উপলব্ধি করতে পেরে এবারে ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসির রেখা ফোটালেন তিনি। সায়েরীর ভীতু মুখাবয়ব দেখে সেই হাসি আরও খানিকটা প্রসারিত হলো। দুই পক্ষের উদগ্রীব দুই সত্ত্বাকে আশ্চর্য করে দিয়ে আচমকা তিনি হাত বাড়ালেন সায়েরীর দিকে। গাল হতে হাত ছুঁয়ে স্পর্শ করলেন থুতনি। সেই হাত নিজের ঠোঁটের উপর রেখে চুমু খেয়ে শুধালেন,

‘ মাশা আল্লাহ! আমার ছেলের পছন্দ যে এতো মায়াময়ী, তা তো আগে জানা ছিলো না। ‘
অপ্রত্যাশিত এই বাক্যে সায়েরীর শ্বাস আটকে গেল যেন। ডিম্বাকৃতির ন্যায় বড়সড় চোখ তুলে তাকালো তাহুরা খান’র দিকে। ভুল শুনেছে কি! না স্বপ্ন দেখছে? সাফওয়ান ভাই তার মা’কে জানিয়ে দিয়েছে সব? কবে? কখন? আর তাহুরা খান-ও এতো সহজে তাকে মেনে নিলেন? একাধিক প্রশ্নে সায়েরীর মস্তিষ্কে জট পাকিয়ে গেল। অতি বিষ্ময়ে প্রতিক্রিয়া দেখাতেও ভুলে গেল মেয়েটা। অবুঝ নেত্রে চাইল সাফওয়ানের দিকে। তৎক্ষনাৎ দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিললো দুজনার। গাঢ় বাদামী বর্ণের সুগভীর দৃষ্টি জোড়ায় কেমন এক কৌতুক ভাব। যেন সায়েরীকে এমন আশ্চর্য করতে পেরে দারুণ মজা পেয়েছে মানবটা।

পিলারের সঙ্গে হেলান দিয়ে, দুই হাত বুকে বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে সে। পাতলা অধর জোড়ায় মৃদু হাসির আভাস। এই হাসিতেই যেন মিশে ছিলো সায়েরীর সকল প্রশ্নের প্রতিউত্তর। তাইতো এমন কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টির কবলে পড়ে, তাহুরা খান’র কথার সারমর্ম বুঝে তৎক্ষনাৎ লজ্জায় গুটিয়ে গেল মেয়েটা। তীব্র লজ্জায় আরক্তিম হলো ফুলোফুলো দু-গাল। থুতনি মিশে গেল বুকের সঙ্গে। তাহুরা খান নিজেও হেসে ফেললেন তার এই প্রতিক্রিয়া দেখে। আর দাঁড়ালেন না সেখানে,প্রস্থান করলেন দ্রুত। সায়েরী যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ছেলে, মা, বোন সকলে মিলে তাকে লজ্জা দেওয়ার পণ করেছে বোধহয়। সে আড়চোখে তাকালো কয়েক হাত দূরে দন্ডায়মান মানবটার দিকে। সেই একই ভঙ্গিতে তাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হকচকিয়ে উঠলো সায়েরী। লজ্জা মুখে প্রস্থান করতে উদ্যত হলে, তৎক্ষনাৎ টান পড়ে বাহুতে। হেঁচকা টানে তার দেহশ্রী আঁচড়ে পড়লো নিজস্ব প্রেমিক পুরুষের সুডৌল বক্ষপটে৷ পরপরই মৃদু আওয়াজ তুলে বন্ধ হয়ে গেল দরজাটা। লক হয়নি, কেবল ভিড়িয়ে আছে। সায়েরী ভয় পেয়ে গেল সাফওয়ানের এই কান্ডে৷ ছটফটিয়ে উঠলো তৎক্ষনাৎ,

‘ কি করছেন! কেউ এসে যাবে। কত মানুষ এখানে.. ‘
পেছন হতে বলিষ্ঠ একহাতে মসৃণ উদর চেপে রাখা হাতটার বাঁধন আরও দৃঢ় হলো। সম্পূর্ণভাবে মেয়েলি দেহটি লেপ্টে নিলো বুকের সঙ্গে৷ কানের কাছে উত্তপ্ত শ্বাস ফেলে, শীতল গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ মেইন হল থেকে অনেক দূরে আছি। ইট’স অ্যা কনফারেন্স রুম। সো, ডোন্ট প্যানিক। ‘
শান্ত হতে বললেও সায়েরী শান্ত হতে পারলো না। এমন হাড় হীম করা শীতল কন্ঠে বরং তার দেহশ্রী জমে রইলো। চোখের পাতা কাঁপল তিরতির করে। উদরে চেপে থাকা হাতটার উপর তার কম্পিত হাত কবে যে খামচে ধরেছে সেই ব্যাপারে মেয়েটা অজ্ঞাত। প্রসস্থ বুকটাতে লেপ্টে আছে তার মাথা,পৃষ্ঠদেশ। সেই অবস্থাতেই একটুখানি চোখ তুলে তাকালো সে। নিজের ভেতরের অস্থিরতা, লজ্জা ভাব কাটাতে প্রশ্ন ছুড়ল,

‘ আ-আপনি রেগে আছেন আমার উপর? ‘
হলদেটে মুখশ্রীর কিঞ্চিৎ বোচা নাকটাতে জ্বলজ্বল করতে থাকা ক্ষুদ্র নোসপিন টার দিকে প্রলুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো সাফওয়ান। এই প্রশ্নে তার মনযোগে ব্যাঘাত ঘটলো। দৃষ্টি ঘুরল নাক হতে ঠোঁটে, কম্পিত চোখের পাতায়। একহাতের পরিবর্তে এবার দুই হাতেই জড়িয়ে নিল প্রেয়সীর কোমল উদর। মুখখানা সম্পূর্ণভাবে সায়েরীর মুখশ্রীর কাছাকাছি নামিয়ে গভীর স্বরে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল,

‘ রেগে থাকলে কি করবে? হ্যাভ এনি স্পেশাল ট্রিটমেন্ট টু মেইক মি ফিল বেটার? ‘
সায়েরীকে ভাবনায় বিভোর করে তুললো এই প্রশ্ন৷ মেয়েটা বুঝল, স্পষ্ট কন্ঠে রেগে নেই জানাইনি মানে সাফওয়ান ভাই রেগে আছে। এখন এই রাগ ভাঙ্গানোর জন্য করবে কি সে? স্পেশাল ট্রিটমেন্ট বলতে কি বুঝিয়েছে সাফওয়ান ভাই?
সায়েরীর প্রতিউত্তর না পেয়ে সাফওয়ান নিরব রইলো দুয়েক সেকেন্ড। সুগভীর নেত্রে মেয়েটাকে আগাগোড়া পরখ করে গাঢ় স্বরে জানতে চাইল,

‘ শাড়ি কে পরিয়েছে? ‘
কানের কাছে তপ্ত শ্বাস ফেলে গাঢ় স্বরের এই সামান্য প্রশ্নে সায়েরীর শ্বাস আটকায়। ছোট্ট করে প্রতিউত্তর করে, ‘ পিউ দি পরিয়েছে। ‘
উত্তর দিয়ে মেয়েটা চোখ তুলে তাকায়। কান দুটো উদগ্রীব হয়ে আছে অল্প কিছু প্রশংসা শোনার তাগিদে। শাড়ি পড়ানোর পর পিউ কতশত কথা বলে লজ্জা দিয়েছিল তাকে। সে নিজেও আশায় ছিলো অনেক কিছুর। কিন্তু তেমন কিছুই হলোনা। গুরুগম্ভীর মানবটা একটা বাক্য-ও উচ্চারণ করলো না প্রসংশার। কেবল তার সমুদ্রের ন্যায় গভীর দৃষ্টি স্থির হয়ে রইলো প্রেয়সীর দিকে। সেই দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলাতে পারলো না সায়েরী। কিঞ্চিৎ ভাড় হলো মন। ছটফটিয়ে উঠলো ছাড় পাওয়ার তাগিদে। ঠিক সেই মুহুর্তে হুলস্থুল বাঁধিয়ে ঠাশ করে খুলে গেল বদ্ধ দরজাটা। আওয়াজ শুনে সায়েরী ছিটকে সরে আসলো সাফওয়ানের বাহুবন্ধন হতে। নিস্তব্ধ কক্ষে আগমন ঘটলো একাধিক বাচ্চা সদস্যের। সাম্য-সামান্তা এবং তাদের দলবল। বাচ্চাগুলো সাফওয়ান এবং সায়েরীকে দেখে ভড়কে গেছে, অপরদিকে তাদের আগমনে ভড়কেছে সায়েরী। তবে সাফওয়ানের মুখজুড়ে বিরক্তি ভাব। বাচ্চারা তাকিয়ে রইল ফ্যালফ্যাল করে। সকলের মাধ্যে হতে সাম্য ভ্রুঁ কুঁচকে বলে উঠলো,

‘ তুমি আমার বউকে নিয়ে এখানে কি করছো, ভাইয়া? ‘
সাফওয়ান চট করে ফিরে তাকায়। পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য বাণী শুনেছে যেন। বউ? কার বউ? সে কেনো অন্যের বউ নিয়ে..! এক মিনিট! সাম্য’র বউ? হতবিহ্বল চোখে সাফওয়ান তাকালো সায়েরীর দিকে। মেয়েটা মুখ হাত চেপে হেসে ফেলেছিলো। সাফওয়ান তাকাতেই হাত নামিয়ে হাসিটুকু গিলে ফেললো। ঘটনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত সাফওয়ান কপালে ভাঁজ ফেলে তাকালো সাম্য’র দিকে। গমগমে সুরে প্রশ্ন ছুড়ল,
‘ কোন বউ? কার কথা বলছো তুমি? ‘
নিজের কালো কোটের কলার টেনে মিটিমিটি হেসে সাম্য ইশারা করলো সায়েরীর দিকে। বড় গর্বের সহিত প্রতিউত্তর করলো,

‘ এইযে আমার বউ। সবাই তো জানে। তুমি জানো না?
সাফওয়ান ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে দেখে এই হাঁটুর বয়সী ভাইটাকে। দাঁত দিয়ে ঠোঁট পিষে চুপ মেরে থাকে কিয়ৎ ক্ষণ। এদিকে বাচ্চা সদস্যরা সাম্য’র কথায় হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে, টিটকারি মারছে। সামান্তা লাফিয়ে এসে সায়েরীর হাত ধরে। উচ্ছ্বসিত কন্ঠে শুধায়,

‘ তুমি এখানে ছিলে? আমি সেই কখন থেকে তোমাকে খুঁজছি। আমার সাথে এসো, তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে। ‘
কিসের সারপ্রাইজ সেটা জিজ্ঞেস করার ফুরসত পেলো না সায়েরী। পূর্বেই তাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো সামান্তা। তার দেখাদেখি বাকিরাও প্রস্থান করলো। সকলের শেষে থাকা সাম্য আটকে গেল সাফওয়ানের রাশভারি কন্ঠের ডাক শুনে। ফিরে দাঁড়ানো মাত্র আচমকা এক দানবীয় হাতের থাবা পড়লো তার বুকের কাছে, কোটের উপর। এক ঝটকায় বাচ্চা দেহটা জমিন থেকে কয়েক ফুট উপরে উঠে গেল। ঠিকঠিক সাফওয়ানের মুখোমুখি। বড় ভাইয়ের এহেন আক্রমণে সাম্য’র প্রাণ যায় যায় অবস্থা। সে হাত পা নেড়ে হন্তদন্ত গলায় বলে উঠলো,

‘ ছাড়ো, ভাইয়া!! আমি কি করেছি? আজ তোমার রুমেও যায়নি। তোমার রুমের কোন ইম্পর্ট্যান্ট জিনিসে হাত দেইনি, সত্যিইই। ‘
সাফওয়ান একহাতেই তুলে নিয়েছে সাম্যকে। কথাটা শুনে সে আরও গম্ভীর হলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে গমগমে গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ যার দিকে চোখ দিয়েছ সে সবচেয়ে বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। অ্যা পার্ট অফ মাই হার্ট। আবার যদি তাকে বউ বলতে শুনি, তবে মাথায় তুলে আছাড় মারবো। ভাবি ডাকবে, ভাবিমা৷ মনে থাকবে? ‘
সাম্য ভয় পেয়েছিলো ঠিক। কিন্তু একথা শুনে বেশ অবাক ও হলো। ছটফটে গলায় জবাব দিলো,
‘ আমার বউ আমাকে বলেছে ওকে বউ ডাকতে। তাহলে আমি কেনো বউকে ভাবি ডাকবো? ‘
বাচ্চা ছেলেটার এহেন ছটফটে জবাবে সাফওয়ান গম্ভীর চোখে তাকিয়ে রইলো। রাশভারী কন্ঠে শাসাল,

‘ সাম্য!! ‘
মুহুর্তেই মিইয়ে গেল বাচ্চাটা। মাথা নেড়ে, মিনমিন কন্ঠে সায় জানালো,
‘ ঠিক আছে। বউকে ভাবি ডাকবো। ‘
‘ আবার! ‘
‘ ন-না মানে সায়েরী আপুকে ভাবিমা ডাকবো। ‘
সাফওয়ান সন্তুষ্ট হলো এতে। সাম্যকে নামিয়ে দিয়ে কোট ঠিক করে দিতে দিতে বললো,
‘ গুড। আবার যেন বউ ডাকতে না শুনি। ‘
সাম্য গাল ফোলাল। মিনমিন করে বললো,
‘ কিন্তু আমাকে আমার বউ বলেছিলো ওকে ব.. ‘
সাফওয়ান তাকাতেই চুপ মেরে গেল সে। ঠোঁটে আঙ্গুল চাপল। তার কথার বিপরীতে দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিউত্তর করলো সাফওয়ান,

‘ তোমার বউয়ের ক্লাস আমি নিব। দেখব কতখানি বউ হওয়ার শখ জেগেছে তার। যাও তুমি, খেলো। ‘
বলার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত পায়ে রুম ত্যাগ করলো সাম্য। স্বস্তির শ্বাস ফেলে ফের বিড়বিড় করে আওড়াল,
‘ আমার বউ আমাকে বলেছে তাকে বউ ডাকতে। তবে ভাবি ডাকবো কেন? বউকে তো আমি বউ-ই ডাকবো। ‘
সাম্য রুম ত্যাগ করামাত্র পকেট হাতড়ে মোবাইল বের করলো সাফওয়ান। নির্দিষ্ট নাম্বারে ডায়াল করে ফোন কানে চাপল। অল্প সময়ের মাঝেই শোনা গেল রূপমের কন্ঠ। বিপরীতে সাফওয়ান গম্ভীরমুখে আদেশ ছুড়ল,
‘ মেইন হলে আয়। সাদিফ ভাইয়ার মেইল কলিগদের মাঝে শ্যামলা দেখতে একটা ছেলে আছে। গ্রে কোট, হাইট পাইভ নাইন। কপালের বাম পাশে কাটা দাগ আছে। তাকে তুলে নে। সোজা পার্কিং-এ নিয়ে আসবি। ‘
সাফওয়ানের কন্ঠের উপচে পড়া ক্রোধ উপলব্ধি করতে পেরে হকচকিয়ে গেলো রূপম। বেচারা মাত্রই ভালোমন্দ খেতে বসেছিলো। কিন্তু এমন আদেশ শুনে উত্তেজনায় তার খিদে মিটে গেছে। নিশ্চয়ই সায়েরীকে নিয়ে জড়িত কোন কেস। মেয়েটাকে নিয়ে তার এই ভাই যে উন্মাদ প্রেমিক, তা মাত্র দুয়েক দিনে হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে গেছে সে। তাই কারণ টুকু জানতে চাইলো না আর। কেবল ইতস্তত কন্ঠে শুধাল,

‘ ফ্যামিলি প্রোগ্রাম চলছে, ভাই। পরে করলে হয়না? কত রিলেটিভ এখা.. ‘
‘ রিলেটিভ আছে সো হোয়াট? রূপ, ডু ইউ স্টিল থিংক আই ফাকিং কেয়ার এবাউট দ্যাম? ফ্যামিলি প্রোগ্রাম মাই ফুট! ওই ছেলের বাম হাত লাইফটাইমের জন্য অকেজো না করা অবধি আমার শান্তি মিলবে না। বাস্টার্ড টার বডিতে কত কারেন্ট জমে আছে আজই দেখব। জাস্ট গ্র‍্যাব হিম, নাও! ‘ [grab]
সাফওয়ানের এক গর্জনে বিষম খেয়ে গেলো রূপম। গলা ভিজিয়ে দ্রুত গলায় সায় জানালো,
‘ রিল্যাক্স, ভাই! আমি দেখছি কি করা যায়। তুমি শান্ত হও। ‘
রূপম অপেক্ষা করলো সাফওয়ানের প্রতিউত্তর শোনার। কিন্তু দুয়েক সেকেন্ড অপেক্ষার পরেও প্রতিউত্তর পেলো না কোন। টুট টুট শব্দে ডিসকানেকটেড হলো কল। মোবাইল হাতে নিয়েই চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে রইলো বেচারা।

রাত সাড়ে ন’টা। নেমন্তন্ন পাওয়া মেহমান-গণ খাওয়া দাওয়ায় ব্যস্ত। ফলস্বরূপ কনভেনশন হলের বাহিরের দিকটা জনমানবহীন প্রায়। সায়েরীর হাত টেনে তাকে সোজা বের করে নিয়ে এসেছে সামান্তা। মেয়েটা সায়েরীর কোন কথা কানেই তুলছে না। পার্কিং এরিয়ার ডান পাশে বিশাল লন। দিনের আলোয় তা ফকফকা হয়ে থাকলেও, বর্তমানে ছেয়ে আছে আবছা অন্ধকারে৷ কনভেনশন হলের সম্মুখের রঙবেরঙের লাইটের ক্ষীণ আলোয় আলোকিত কেবল। সেই স্থানে এসে থামলো সামান্তা। তার দেখাদেখি সায়েরীর পদচারণ ও থেমে গেল। সে আশেপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা চালালো, সামান্তা তাকে এখানে কেনো এনেছে? প্রশ্নটা করামাত্র সামান্তা নিজেও চিন্তায় ডুবে গেল। আশেপাশে উঁকিঝুঁকি মেরে জবাব দিল,

‘ আমাকে সাহিল ভাইয়া বলেছিলো যেন তোমাকে ডেকে নিয়ে আসি। আমার জন্য টফি রেখেছিলো। কিন্তু ভাইয়া এখানে নেই কেনো? ‘
সায়েরী ভ্রুঁ কুঁচকালো। সাহিলের তাকে কেনো প্রয়োজন! তা-ও আবার এমন নিরিবিলি স্থানে!
‘ ওইতো ভাইয়া এসে গেছে.. ‘
সামান্তা’র চিৎকার শোনামাত্র সায়েরী তাকালো সম্মুখে। সাহিল-ইভান দুজনে এগিয়ে আসছে। সাহিলের একহাত পিঠের পেছনে লুকিয়ে রাখা। ইভানের হাতে টফি বক্স। যা দেখে দৌড়ে গেল সামান্তা। ইভান তার হাতে বক্সটা ধরিয়ে দিয়ে বললো,

‘ চলো, লিটল পাই। এই লাভ বার্ড’স-দের মাঝে আমাদের থেকে লাভ নেই। ‘
অবুঝ বাচ্চাটি নেচে-কুঁদে চলে গেল ইভানের হাত ধরে। কিন্তু শেষ কথাটা বেশ কানে লাগলো সায়েরীর। সে অবুঝ নেত্রে চাইল সাহিলের দিকে। ছেলেটা তার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি। সায়েরীর বুক ঢিপঢিপ করে অজানা কোন আশংকায়। আশেপাশে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে বলে,
‘ আমাকে এখানে কেনো ডেকেছেন, সাহিল ভাইয়া? কিছু বলার থাকলে হলরুমে বলতে পারতেন। ‘
সাহিল হাসে। বেশ রয়েসয়ে প্রতিউত্তর করে,

‘ তুমি এখনো বুঝতে পারছো না কেনো ডেকেছি? সব কথা কি জনসম্মুখে বলা যায় নাকি? আমি অবশ্য আরও স্পেশাল ভাবে বলতে চেয়েছি কিন্তু, পরে যদি সুযোগ না পাই। এজন্য আজকেই.. ‘
মাঝপথে কথা থামিয়ে দিল সে। দেখে মনে হলো যেন জড়তায় কথা আগাতে পারছে না। কিন্তু তার অসমাপ্ত কথাগুলো শুনে অনেক কিছু আন্দাজ করে ফেললো সায়েরী। এবং তাতেই মেয়েটা সিটিয়ে গেল ভয়ে। সাফওয়ান ভাই এই খবর পেলে যে তার আস্ত রাখবে না। ভয়ে সে কদম পিছিয়ে নিল। দ্রুত গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ আ-আপনার হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে ভাইয়া। অনেক বড় ভুল করতে যাচ্ছেন। প্লিজ আর কিছু বলবেন না। আম-আমি শুনতে চাইছি না। ‘

সাহিল বেশ অবাক হলো হঠাৎ সায়েরীর এমন পরিবর্তন দেখে। মেয়েটাকে সরে যেতে দেখে সে চট করে হাত টেনে ধরলো। অবচেতনে পিঠের পেছনে লুকিয়ে রাখা এক গুচ্ছ লাল গোলাপের বুকে-টাও বেরিয়ে এলো। সায়েরী যরাপণাই অবাক। তার থমকে যাওয়া দেখে হুট করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো সাহিল। ডান হাতে সায়েরীর কব্জি ধরে রেখেছে বলে বা হাতে তুলে ধরলো বুকেটা। হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ঢেলে বলতে আরম্ভ করলো,
‘ একটু সুযোগ দাও আমাকে মনের কথাগুলো বলার জন্য। অনেক দিন ধরে অপেক্ষা করছিলাম এই মুহুর্ত-টার। আমি জানি তুমিও আমাকে পছন্দ করো। হয়তো লজ্জায় বলতে পারছো না। ইট’স অলরাইট। আমি বুঝে নিয়েছি। তোমার সঙ্গে প্রথম যেদিন আলাপ হয়েছিলো, ভালোলাগা টা সেদিন থেকেই ছিলো। আর এই তিন চার দিনে ভালোলাগা থেকে তোমাকে ভালোবে.. ‘
‘ সুবহা!! ‘

সাহিলের আবেগ মাখানো অনুভূতি কথনে ব্যাঘাত ঘটলো। ওই মিনমিনে কন্ঠ চাপা পড়লো হাড় হীম করা কন্ঠের রাশভারী ডাকে। যা কর্ণধার হওয়া মাত্র সায়েরীর হৃদস্পন্দন থমকে গেল ক্ষণিকের জন্য। ভয়ে শরীর যেন জমে গিয়েছে। সাহিলের কথা থেমে গেল। উৎসুক দৃষ্টিতে তাকালো সায়েরীর পেছনে। সায়েরী নিজেও চট করে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো। লম্বা লম্বা কদমে এগিয়ে আসছে সাফওয়ান। তীব্র রাগে রক্তিম হয়ে উঠা চোখদুটো সায়েরীর দিকে স্থির। সেই দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই মেয়েটার দেহ ঝংকার দিয়ে গেল। সাহিল উঠে দাঁড়ালো অবচেতনে। দেখল, সাফওয়ানের চেয়ে দুই কদম পেছনে রূপম। এবং খানিকটা দূর হতে দৌড়ে আসছে ইভান। সাফওয়ান কাছাকাছি আসার পূর্বেই রূপম লাফিয়ে এসে তার সম্মুখে দাঁড়ালো। তৎক্ষনাৎ শোনা গেল তার উত্তেজিত কন্ঠ,

‘ ভাই, ভাই প্লিজ চিল্লাচিল্লি করো না। ওর জানা ছিলো না। ভাই হয় তোমার। শান্ত হও, প্লিজ৷ ‘
পরপরই আবার পেছন ফিরে সাহিলকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘ আহাম্মকের মতো দেখছিস কি? হাত ছাড় ভাবির। ‘
সাহিল কিছু না বুঝেও অজ্ঞাত কোন আতংকে চটজলদি সায়েরীর হাত ছেড়ে দিল। মেয়েটা যেন হুশে নেই কিছুর। সাফওয়ান চোয়াল শক্ত করে তাকালো সায়েরীর দিকে। ভাইদের সম্মুখে ধমক দিতে না চেয়েও দাঁতে দাঁত চেপে ধমকে উঠলো,

‘ এখনো দাঁড়িয়ে আছো কেনো? ভেতরে যাও! ‘
কেঁপে উঠলো সায়েরী। ভীতু কন্ঠে সাফাই গাইতে চাইলো,
‘ আ-আমি জানতাম ন.. ‘
‘ তোমাকে আমি ভেতরে যেতে বলেছি, সুবহা! ‘

পূর্বের চেয়েও অত্যাধিক কঠোর কন্ঠের এই ধমকে সায়েরীর আঁখি যুগল টলমলিয়ে উঠলো। একপা, দুই পা পিছিয়ে উল্টো পথে পা বাড়ালো সে। তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে চোখ বুজে শ্বাস ফেললো সাফওয়ান। ধীর ভঙ্গিতে ঘাড় ম্যাসাজ করলো। রাগ চেপে রাখার প্রয়াসে তার কপালের দুই পাশের নীল রগ ফুলেফেঁপে উঠছে। ঘাড়ের মোটা রগ স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়ে আছে। শক্ত হয়ে আছে চোয়াল। সাহিল এবং ইভান বুঝে উঠতে পারলো না কেনো এমন রেগে গিয়েছে সে। বারকয়েক ঘাড়ে হাত বুলিয়ে বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেললো সাফওয়ান। কদম বাড়িয়ে মুখোমুখি হলো সাহিলের। লাল গোলাপের বুকেটা নিজ হাতে নিয়ে অদ্ভুত দৃষ্টি ফেললো তাতে। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ফের গম্ভীর মুখে তাকালো সাহিলের দিকে। রাশভারী কন্ঠে হিসহিসিয়ে উঠলো,

‘ ভাই হোস, ফার্স্ট মিস্টেক বলে মাফ করে দিয়েছি। তোর যায়গায় অন্য কেউ থাকলে নিশ্চিত এতক্ষণে হসপিটালাইজড হতো। লাকি ইউ! ‘
এটুকু বলে হুট করে সাহিলের কাঁধে হাত রাখলো সে। সাহিলের মনে হলো যেন কাঁধের হাড়ে হাতুড়ি পেটানো হয়েছে, এমন শক্ত ভাবে ধরেছে কাঁধ। সে কিছু বলার ফুরসত পেলো না। পূর্বেই মুখোমুখি ঝুঁকল সাফওয়ান। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে, সেই একই গম্ভীর সুরে হিসহিসিয়ে উঠলো পুণরায়,
‘ বাট লেট মি ক্লিয়ার ওয়ান থিং..যার দিকে নজর দিয়েছিস, সে সম্পূর্ণ রূপে আমার ৷ আমার সুবহা’র দিকে দ্বিতীয়বার নজর দেওয়ার পূর্বে প্রাণের মায়া ত্যাগ করিস। কারণ তোর জানা আছে, আমি সহ্য করতে শিখিনি—শাস্তি দিতে শিখেছি। ‘

শেষ কথাটুকু বলতে গিয়ে গোলাপের তোড়া-টি জমিনে ফেলে পায়ের তলে পিষে ফেলল সে। তার ঐ রক্তিম চাহনি,কঠোর মুখাবয়ব দেখে সাহিলের মনে হলো যেন, সাফওয়ান স্বয়ং সাহিলকেই পিষে ফেলছে। ভাবতেই ঢোক গিলল সে। সাফওয়ানের রাগ সম্পর্কে কমবেশি ধারণা সকলেরই আছে৷ যার কারণে দ্বিতীয় বার মুখ খুলতে পারলো না সাহিল। কেবল তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল ওই সুঠাম দেহী মানবটা অতিষ্ঠ ভঙ্গিতে কালো কোট-টি খুলে নিতে নিতে লম্বা কদমে এগুচ্ছে কনভেনশন হলের দিকে। রূপম হতাশায় ভরা শ্বাস ফেলে তাকালো সাহিলের দিকে। কাঁধে হাত রেখে বললো,
‘ দুনিয়াতে কি মেয়ের অভাব পড়েছিলো? এই উন্মাদ প্রেমিকের প্রেয়সীকেই পেলি প্রপোজ করার জন্য? ‘
সাফওয়ানের দিক থেকে নজর সরিয়ে নিল সাহিল। বুক ছিড়ে বেরুলো এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস। জমিনের সঙ্গে মিশে যাওয়া ফুল গুলোর দিকে তাকিয়ে রইল বোবা দৃষ্টিতে।

সাফওয়ানের ধমক শোনার পরপরই সায়েরী চঞ্চল কদমে হলরুমে ফিরে এসেছিলো। কান্না চেপে রাখার দরুন লাল হয়ে উঠেছিলো মুখশ্রী, টলমলে দৃষ্টি। পথিমধ্যে দেখা মিললো আবরারের৷ সায়েরীকে দেখা মাত্র সে প্রশ্ন ছুড়ল,
‘ থাকিস কোথায় তুই? কখন থেকে খুঁজে চলেছি। ‘
সায়েরী জবাব দিল না। তার চোখে মুখের হাল দেখে আবরার উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো। চিন্তিত গলায় শুধাল,
‘ কি হয়েছে? কাঁদছিস কেন? ‘
কান্না চেপে রাখা অবস্থায় ‘কাঁদছিস কেন?’ শুনে সায়েরী’র ফের কান্না পেয়ে গেল। বহু কষ্টে সে সামাল দিল নিজেকে। ভাঙ্গা স্বরে জবাব দিল,

‘ আ-আমি বাড়ি যাব, ভাইয়া। গাড়ি ডেকে দাও। ‘
‘ কি হয়েছে বলবি তো! ‘
‘ শরীর খারাপ লাগছে। আর কিছু না। গাড়ি ডেকে দাও তুমি। ‘
‘ আমাদের যেতে আরও এক ঘন্টা লাগবে। কার সাথে যাবি তুই? খাওয়া দাওয়া ও করলি না। ‘
সায়েরী বেজায় বিরক্ত হলো৷ অধৈর্য কন্ঠে ফের বলে উঠলো,
‘ খাব না কিছু। পিউ দি কোথায়? তাকে ডেকে দাও। কাকিমা আসেনি তাই দি তাড়াতাড়ি ফিরতে চেয়েছিলো। আমরা দুজন একসঙ্গে যেতে পারবো। ওদের বাসাতেই থাকবো। গাড়ি ডাকো তুমি। ‘

সায়েরীর জেদ দেখে আর কোন আপত্তি দেখাতে পারলো না আবরার। গাড়ি ডাকতে বেরিয়ে গেলো সে। সায়েরী গেল পিউকে ডেকে, মেহরিন বেগমকে বলে আসার জন্য৷ ফিরে আসতে গিয়ে আবার কি যেন ভেবে থমকাল। ভীড় ঠেলে এগিয়ে গেল নাজরাতের কাছে। মেয়েটা কিছু বলার পূর্বেই সায়েরী আগ বাড়িয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে। চেয়ারে বসে থাকা নাজরাত চমকে উঠলো। সায়েরীর পিঠে হাত রেখে নিম্ন কন্ঠে জানতে চাইল,
‘ কি হয়েছে? ‘
সায়েরী মুখোমুখি হলো তার। কান্না চোখে মিষ্টি করে হাসলো। নিজের ছোট্ট দুহাতের আদলে নাজরাতের গাল চেপে বললো,

‘ একটু শরীর খারাপ লাগছে। তাই তাড়াতাড়ি ফিরে যাচ্ছি। তোকে বিদায় দিতে আসলাম। ‘
নাজরাতের হাস্যজ্বল মুখশ্রীতে আঁধার নামে একথা শুনে। নিভু নিভু কন্ঠে আবদার জানায়,
‘ আরেকটু থাক! ‘
সায়েরী’র-ও মন ভাড় হয়। কিন্তু সে যে নিরুপায়। সচকিত নয়নে সে আশেপাশে চোখ বুলায়৷ সাফওয়ান ভাই ফিরার আগেই পালাতে হবে তাকে। ধরা পড়লে আজ আর রক্ষা থাকবে না। অগত্যা সে সাদিফ-নাজরাত দুজনের কাছ থেকে জোরজবরদস্তি বিদায় নিয়ে বেরিয়ে যায় হল থেকে। আবরার পূর্বেই গাড়ি ঠিক করে রেখেছিলো। দুজন উক্ত স্থানে পৌঁছানোর পর ভাড়া মিটিয়ে, সাবধানে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিল সে। গাড়ি রওনা হতেই আটকে থাকা শ্বাস টুকু ছাড়লো সায়েরী।

বাম হাতের ভাঁজে কালো রঙের কোট-টা তুলে রেখেছে সাফওয়ান। অন্যসব বেশভূষা পূর্বের মতোই আছে। ডান হাতে নিজের নামি-দামি আইফোন-টিতে ডায়াল করছে নির্দিষ্ট একটি নাম্বার। কঠোর মুখাবয়ব নিয়ে ফোন কানে তুললো সে। কপালে ছড়িয়ে পড়া সিল্কি চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে ঠোঁটে ঠোঁট চাপল৷ বেশ অনেকক্ষণ যাবত নিয়ন্ত্রণে রাখা মেজাজ ফের বিগড়ে গেল ফোনের অপর প্রান্ত হতে ভেসে আসা নারী কন্ঠের বাণী শুনে,
‘ আপনার কাঙ্ক্ষিত নাম্বারে এই মুহুর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনুগ্র.. ‘
চোয়াল দ্বয় শক্ত করে কল কাটলো সে। মোবাইল স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করা মেরুন আনারকলি পরিহিতা রমনীর ছবিটির দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষল ৷ বৃদ্ধ আঙ্গুলের সহিত স্পর্শ করলো গোলগাল মুখশ্রী-টি। গম্ভীর চোখে তাকিয়ে, হাস্কি স্বরে আওড়াল,
‘ আমাকে ফাঁকি দেওয়া-ও শিখে গিয়েছ? গ্রেট! বাট আই নো হাউ টু কাট ইউর উইংস, সুইটহার্ট। জাস্ট ওয়েট ফর ইট। ‘

হলরুমের কিচিরমিচির কোলাহল ভেদ করে আকস্মিক ভেসে আসলো এক পুরুষ কন্ঠের আর্তচিৎকার। এক মুহুর্তের জন্য স্তব্ধ হলো সকলে। উৎসুক নজরে ফিরে তাকালো চিৎকার ভেসে আসা পথের দিকে৷ দুজন ক্যাটারিং স্টাফের সম্মুখে দাঁড়িয়ে ছটফট করছে সাহিল। ডান হাত ঝাঁকাচ্ছে বারে বারে৷ স্টাফদের হাতে গরম খাবারের ট্রে। সেখানেরই একটি টগবগে গরম পেয়ালা উল্টে পড়েছে সাহিলের হাতের উপর। সীমাতিরিক্ত গরম ঝুল ত্বক স্পর্শ করামাত্র হাতের চামড়া জ্বলে উঠেছে তার। এত গরম! মনে হচ্ছে দীর্ঘক্ষণ আগুনে রেখে মাত্রই তুলে নিয়েছে৷ ঝলসে যাওয়া হাত নিয়ে ছটফট করছে সাহিল। তাকে ঘিরে ব্যতিব্যস্ত পরিবারবর্গ। আজকের দিনটা এতো অশুভ কেনো? একের পর এক অঘটন ঘটছে কেবল।
আকস্মিক ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় হতভম্ব রূপম। সে দৌড়ে যেতে উদ্যত হয়েও হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। চতুর মস্তিষ্ক প্রশ্ন তুললো,

‘ ক্যাটারিং স্টাফ-রা মেইন হলের এই স্থান পেরিয়ে যাচ্ছিলো কেনো? তাদের আসা যাওয়ার সুবিধা স্বরূপ আলাদা স্থান ফাঁকা রাখা হয়েছে। তবে ভিন্ন পথে গিয়ে এমন অঘটন ঘটানোর মানে টা কি? ‘
একাধিক প্রশ্নে জট পাকিয়ে গেল মস্তিষ্ক। এবং উত্তরটা- ও বড় সহজে ধরা পড়লো। তৎক্ষনাৎ পেছন ঘুরলো সে। মাত্র কয়েক হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে গম্ভীরমুখে সাহিলের ছটফটানি উপভোগ করতে থাকা মানবটার দিকে তাকিয়ে সে অসন্তুষ্ট গলায় বলে উঠলো,

‘ ভাই! তুমি কথা দিয়েছিলে কোন হাঙ্গামা করবে না। দ্যান হোয়াই অল দিস? ‘
অভিযোগ-টুকু শোনে তৎক্ষনাৎ সাফওয়ানের দৃষ্টি ঘুরে আসলো রূপমের দিকে। পাশের টেবিল হতে আধখাওয়া ড্রিংক্সের গ্লাসটা তুলে নিয়ে দায়সারা ভাবে জবাব দিল,
‘ ডোন্ট টেক মাই ওয়ার্ড’স লাইটলি, রূপ। হি ডিজার্ভ’স ইট। ‘
এই দৃঢ়,গম্ভীর কন্ঠের বিপরীতে প্রতিউত্তর করার কোন ভাষা খুঁজে পেলো না রূপম। হতাশায় ভরা শ্বাস ফেললো ফের একবার। একটু স্বস্তি নিয়ে যেই না বসতে নিবে, তৎক্ষনাৎ শোনা গেল সাফওয়ানের রাশভারী কন্ঠ,
‘ এই বাস্টার্ড টা এখনো এখানে ঘুরঘুর করছে কেনো? বলেছিলাম না পার্কিং-এ নিয়ে আসতে? দ্রুত আন। একে দেখে আমার হাত নিশপিশ করছে। ‘

রাত প্রায় এগারোটা। পিউদের বাসায় কেবলমাত্র তিনজন নারীর অস্তিত্ব বিরাজমান। তার বাবা পরলোক গমন করেছেন বহু পূর্বে। একমাত্র বড় ভাই পিয়াস সহ মা এবং পিউয়ের বাস এই ছোট্ট নীড়ে। পিয়াস বর্তমানে আবরারের সঙ্গে আছে রিসেপশনে। সায়েরী এবং পিউ ফিরে এসেছে আধ ঘন্টার-ও বেশি সময় হলো। রিসেপশনে যাওয়ার সময় সায়েরী নিজের প্রয়োজনীয় সকল সরঞ্জাম নিয়ে পিউ’র কাছে চলে এসেছিলো। তার কাছে শাড়ি পরে তৈরি হয়ে দুজন একত্রে বেরিয়েছিলো। ফলস্বরূপ সায়েরীর জামাকাপড় এখানেই রয়ে গেছে। যা এখন স্নান সেরে পুণরায়
গায়ে জড়িয়েছে সে। ভেজা চুল হতে তোয়ালে সরিয়ে বারান্দায় মেলে দিয়ে আসলো সে। বেডরুমে প্রবেশ করামাত্র বিছানা গোছাতে থাকা পিউ প্রশ্ন ছুড়ল,

‘ তুই এতবড় গর্দভ সেটা আগে জানতাম না, সায়ু। একটা ছেলে তিনদিন যাবত আশেপাশে বিনবিন করছিলো। আজ সোজা প্রপোজ করতে চলে এলো, অথচ তুই বুঝলিও না সে তোকে পছন্দ করে? তোর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কি ঘরে ফেলে সিলেট গিয়েছিলি? ‘
সায়েরী গাল ফোলায় একথা শুনে। ধুপ করে বসে বিছানায়। মিনমিন কন্ঠে জবাব দেয়,
‘ আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি পিউ ‘দি। আগে জানলে কি আজ এমন বেকায়দায় পড়তে হতো, বলো? ‘
তার চিন্তিত মুখ দেখে পাশে এসে বসলো পিউ৷ বললো,

‘ সাফওয়ান ভাই তো খুবই রগচটা। যতটুকু জিমনের কাছে শুনলাম, তোর ব্যাপারে খুব পজেসিভ-ও। এখন তুই ঘটিয়েছিস আরেক কান্ড। ভাইয়া বেশি রেগে আছে, তাইনা? এ্যাঁই! তোকে চড়,থাপ্পড় মারবে না তো আবার? ‘
সায়েরী চমকে উঠলো এই কথায়। বিরক্ত মুখে জবাব দিল,
‘ পাগল হলে নাকি? তোমার কি মনে হয়, ভালোবাসার নামে উঠতে বসতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আর রাগের মাথায় গায়ে হাত তোলা টক্সিক প্রেমিক গুলোর মতো সে? ‘
‘ ন-না। কিন্তু ভাইয়া তো খুব রাগী। তাই বলছি.. ‘
‘ হতে পারে রাগী। কিন্তু রাগের মাথায় কোন মেয়ের গায়ে হাত তোলার মতো ছেলে নন। আমাকে মারার তো প্রশ্ন-ই উঠে না। ‘

আনমনে জবাব দিতে গিয়ে আচমকা সায়েরী’র মনে পড়ে বছর দুয়েক আগের কথা। শিক্ষা সফরে গিয়ে যেই এক চড় খেয়েছিলো সাফওয়ানের। উফফ! ভাবতেও গাল জ্বলে উঠে। সহসা গালে বুলায় সে। অভিমান হয়। এই চড়ের তো শোধ তোলা হলো না। এখন এমন ভদ্র ছেলে সেজে লাভ টা কি? চড় তো ঠিকই মেরেছিলো সায়েরীকে।
‘ আচ্ছা, মারবে না বুঝলাম। তাহলে কি ভুল বুঝেছে তোকে? ‘ পুণরায় প্রশ্ন করলো পিউ।
‘ মানে? ‘ ভ্রুঁ কুঁচকালো সায়েরী।
‘ মানে ভাইয়ার মনে হতে পারে নাজরাতের দেবরকে তুই সুযোগ দিয়েছিস বলেই সে সাহস করেছে প্রপোজ করার। এমন কোন মিস-আন্ডাসট্যান্ডিং? ‘
সায়েরী হেসে ফেললো এবারে। উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমাখা গলায় প্রতিউত্তর করলো,

‘ ওহহো দি! তোমার কি মনে হচ্ছে কোন টিনেজারের সঙ্গে রিলেশনশিপে আছি আমি? যেটা ঘটেছে সেটাতে আমার দোষ অবশ্য একটু আধটু আছে। কিন্তু তাই বলে সাফওয়ান ভাই আমাকে ভুল বুঝবে? প্রশ্নই উঠে না। ‘
এবারে বেজায় বিরক্ত হলো পিউ৷ বললো,
‘ এটাও না, সেটাও না। সাফওয়ান ভাই এতো সবুজ পতাকা হলে ভয়ে পালিয়ে এসেছিস কেনো? ফোনটাও ফ্লাইট মুডে রেখেছিস। এসবের মানে কি তাহলে? ‘
সায়েরী চুপসে গেল একথায়। আসলেই তো! সে কেনো এমন ভয় পাচ্ছে? সাফওয়ান তাকে কাছে পেলে শক্ত করে হাত,গাল চেপে ধরবে। বড়জোর কয়েকটা রাম ধমক দিবে৷ এইতো, আর কিছুই না। এসবে এতো ভয়! ধমক গুলো কেমন হতে পারে তা কল্পনা করে কান চেপে ধরলো সে৷ ওমন গর্জনে তার ছোট্ট প্রাণ -টা অক্ষা পাওয়ার জোগাড় হয়। ভয় পাওয়াটা তো স্বাভাবিক।
বিছানা গুছিয়ে দুজন শোয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে কেবল। এমন মুহুর্তে আচমকা বিদুৎ চলে গেল। সম্পূর্ণ ঘর তলিয়ে গেল আবছা অন্ধকারে। দুই রমনী চমকে উঠলো। পিউ অবাক কন্ঠে বললো,
‘ কি আশ্চর্য! এই অসময়ে কারেন্ট চলে গেল কেনো? বিগত দিনগুলোতে কখনো তো এমন হয়নি। তবে আজ হঠাৎ কি হলো? ‘

সায়েরী আনমনে শুনল সে কথা। জবাব দিল না কোনো। ঘুম পাচ্ছে তার। বিছানার কাছে এগুতে নিলে নিস্তব্ধতা ভেদ করে রিংটোন বেজে উঠলো পিউ’র ফোনের। সায়েরী আপন মনে অন্ধকার বারান্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আকস্মিক কিছু একটা মনে পড়তেই চমকে উঠলো। চট জলদি পেছন ফিরে বলে উঠলো,
‘ কল রিসিভ করো না দিইইইই!! ‘
কিন্তু বিধিবাম। পিউ ইতোমধ্যে ফোন কানে চেপেছে। সায়েরীর মৃদু চিৎকারে চমকে উঠলো সে। ড্যাবড্যাব চোখে চেয়ে বোঝার চেষ্টা করলো ঘটনা। সায়েরী দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেললো নিজের। অস্পষ্ট স্বরে আওড়াল,
‘ সায়ু!! তুই শেষ আজকে। একদম শেষ। ‘
তার অবচেতন মন যা ধারণা করছে, ঠিক তা-ই ঘটলো। শোনা গেল পিউ’র অবুঝ কন্ঠ,
‘ এ্যাই সায়ু! এটা..এটা তো সাফওয়ান ভাই। ধর, কথা বল.. ‘

সায়েরী কাঁদোকাঁদো মুখে চেয়ে রইল। তার হাতে জোর করে মোবাইলটা ধরিয়ে দিল পিউ। কম্পিত হাতে তা কানে চেপে কিয়ৎ ক্ষণ চুপ মেরে রইলো সায়েরী। কেবল শোনা গেল নিজের অস্বাভাবিক শ্বাস প্রশ্বাস। দুই পক্ষের নিস্তব্ধতা ভেদ করে ভেসে আসলো সাফওয়ানের হাস্কি কন্ঠের ডাক, ‘ সুবহা! ‘
সহসা কেঁপে উঠলো সায়েরী। অবচেতনে তৎক্ষনাৎ প্রতিউত্তর করলো, ‘ হ-হুম? ‘
‘ ছাদে আসো, এক্ষুনি। আগের বারের মতো জোর করতে যেন না হয়। ‘ সাফওয়ানের গমগমে কন্ঠের আদেশ।
সায়েরী মৃদুমন্দ কাঁপছে। ফাঁকা ঢোক গিলে সে কাঁদোকাঁদো স্বরে বললো,
‘ আ-আমরা এসব নিয়ে পরে কথা বললে হয়না? ‘
‘ তুমি কি চাচ্ছো আমি পিউ’র বাসায় এসে সিন ক্রিয়েট করি? ‘ সাফওয়ান ত্যাড়া প্রতিউত্তর।
সায়েরী দ্রুত গলায় বলে উঠলো,

‘ ন-না নাহ। এমন কিছু করবেন না,প্লিজ৷ ‘
‘ ফাইন। ছাদে আসো তবে, এক্ষুনি। ‘
‘ আ-আপনি রেগে আছেন খুব। পরে কথা বল.. ‘
‘ পরে বলতে কোন ওয়ার্ড আমি আমার ডিকশনারিতে রাখিনি, সুবহা। প্রবলেম যখন আজকের, তবে আজকেই মিটমাট করবো সব। তুমি আসবে না তো? ওকে দ্যান, আমিই আস.. ‘
‘ নাআআ!! আম-আমি.. আমি আসছি তো। ‘

সায়েরী চিৎকার করে উঠলো প্রায়। পরপরই মোবাইল ছুড়ে ফেলল বিছানায়। পিউ বেকুবের মতো তাকিয়ে রইল। সাফওয়ান ভাই সোজা তাদের বাড়ির ছাদে চলে এসেছে? এতো সাহস! এতগুলো বছরে জিমন করলো না এমন পাগলামি। অবাক হয়ে বুকে হাত চাপলো সে৷ সায়েরীকে ছুটতে দেখে উঁচু গলায় সাবধান করলো,
‘ আস্তে, সায়ু। পড়ে যাবি তো। ‘

বলতে না বলতে ধুম করে শব্দ হলো। স্কার্টের সঙ্গে পা বেঁধে হুমড়ি খেয়েছে মেয়েটা। পিউ কপাল চাপড়াল দেখে। ডাইনিং রুমের আই পি এস লাইট অন করে দিল। সেই আলোয় সায়েরী হাঁটু ঘষে উঠে দাঁড়ালো। ছুটে গেল সিড়ি পথে। নিঃশব্দে দরজা খুলতে গিয়ে ভেতরটা ঢিপঢিপ করে কাঁপলো তার। তবুও নিরুপায় হয়ে দরজা খুলে কদম ফেলল ছাদে। পশ্চিম দিকে ছাদের রেলিংয়ের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। নিশ্চয়ই সায়েরীদের বাসার ছাদ থেকে এখানে পৌঁছেছে। নয়তো সরাসরি পিউদের ছাদে উঠার কোন পন্থা নেই। আবছা অন্ধকারে দূর হতে সাফওয়ানের কঠোর দৃষ্টি আন্দাজ করে সায়েরীর গা শিউরে উঠে। নড়তে পারে না নিজ স্থান হতে। তাকে থমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাত উঠাল সাফওয়ান। গম্ভীরমুখে আদেশ ছুড়ল,

‘ এখানে আসো। ‘
ভীতু রমনী চমকালো ভীষণ। কেঁপে উঠলো আকস্মিক এই কন্ঠে। কিন্তু নড়ল না নিজ স্থান হতে। অগত্যা সাফওয়ান নিজেই এক কদম বাড়ালো। তৎক্ষনাৎ পিছু হাঁটল সায়েরী। কান্না মিশ্রিত, চঞ্চল গলায় শুধাল,
‘ আ-আমার কথাটা আগে শুনোন.. ‘
‘ তোমাকে এখানে আসতে বলেছি, সুবহা! ‘
ফের সেই গর্জন। সাফওয়ানকে কাছাকাছি পৌঁছাতে দেখে এবারে শব্দ করে ফুঁপিয়ে উঠলো মেয়েটা। অবিলম্বে তার কচি হাতের কব্জি টেনে ধরলো সাফওয়ান। টেনে নিল নিজের কাছে। স্বভাবগতভাবে সায়েরীর ডান হাত মুচড়ে ধরল পিঠের পেছনে। অন্যহাতে ফুলোফুলো দুগাল চেপে টেনে নিল নিজের মুখোমুখি। উপচে পড়া কান্নায় ভাসিয়ে তোলা দুই গাল দেখে ধমকে উঠলো সে,

‘ কিছু বলার আগেই ফ্যাঁচফ্যাঁচ করছো কেনো? কান্না থামাও! ‘
সায়েরী কান্না থামাতে পারলো না মোটেও। বরং ধমক শুনে আরও খানিকটা বৃদ্ধি পেলো কান্না। যা দেখে যরাপনাই বিরক্ত হলো সাফওয়ান। চোয়াল শক্ত করে আবারও ধমকালো,
‘ কান্না থামাতে বলেছি তোমাকে। জাস্ট স্টপ ইট! ‘
সাফওয়ানের গম্ভীর মুখখানার অতি সন্নিকটে সায়েরীর কান্নারত মুখশ্রী। মেয়েটার থুতনি কাঁপছে তিরতির। চোখের ভেজা পাপড়ি ছুঁইয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুকণা। নাকের পাটা ফুলে উঠছে বারেবারে। সাফওয়ানের একাধিক ধমকে কান্না থামাতে চেয়েও পারলো না সে। বরং তা বাড়তেই লাগলো। অগত্যা মেয়েটা নিচ অধর পুরে নিলো মুখে। দাঁত দিয়ে শক্ত করে চেপে রাখল তা। যেন কান্না থামানো যায়। এই দৃশ্যে সাফওয়ানের কঠোর দৃষ্টি অসংযত হয়ে এলো। কুঁচকে গেল ভ্রুঁ দ্বয়। গলার কাছে আটকে যাওয়া তপ্ত শ্বাসটুকু ছেড়ে সে হিসহিসিয়ে উঠলো,

‘ তোমাকে কান্না থামাতে বলেছি, মাথামোটা। আমার জিনিসে এমন অত্যাচার চালাতে বলিনি। ঠোঁট ছাড়ো! ‘
অপ্রত্যাশিত এই বাক্যে কান গরম হয়ে উঠলো সায়েরীর। নত দৃষ্টি তুললো তৎক্ষনাৎ। ঢ্যাবঢ্যাব চোখে চেয়ে বুঝার চেষ্টা করলো, এই বাক্য আদৌও সাফওয়ান ভাই বলেছেন কি-না! অবচেতনে ঠিকই ঠোঁট ছেড়ে দিল নিজের। বিষ্ময়ে মৃদু ফাঁক হয়ে এলো দুই ঠোঁটের মাঝে। সাফওয়ান নিরব চোখে অবলোকন করলো তার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া। রাগের পারদ কমে এলো অনেকাংশে। পিঠে চেপে রাখা হাতটা ছেড়ে এবারে মেয়েটার পিঠ জড়িয়ে ধরল সে। পুরোপুরি টেনে নিল নিজের কাছাকাছি। গাল চেপে মুখখানা আরও উঁচু করে ধরে,তাকে বাধ্য করলো চোখে চোখ রাখতে৷ অতঃপর গমগমে গলায় পুণরায় ধমকাল,

‘ আমার চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে এসেছো কোন সাহসে? আবার ফোন টাও অফ করে রেখেছ। কি মনে হয়েছে? তোমার ইগনোরেন্স ঠ্যালার লোক আমি? ‘
সায়েরীর আঁখিদুটি পুণরায় টলমলিয়ে উঠে৷ কম্পিত থুতনি নেড়ে মেয়েটা অভিমানী কন্ঠে বলে,
‘ আ-আপনি সবার সামনে আমাকে ধমক দিয়েছেন কেনো? ‘
‘ তো কি চুমু খাওয়া উচিত ছিলো? চুমু দেওয়ার মতো কাজ করেছিলে তুমি? ‘
কেমন ঠেঁটা প্রতিউত্তর! লজ্জায় চোখ খিচল মেয়েটা। গাল,কান উষ্ণ হয়ে উঠেছে রীতিমতো। আর কথায় বলবে না সে এই লোকের সাথে। তীব্র অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইল সে। কিন্তু সফল হলোনা। অমন দানবীয় হাতের কাছে সে যে নিতান্তই এক চুনোপুঁটি। সাফওয়ান গম্ভীর চোখে দেখল এই জেদ। পুণরায় গাল চেপে তাকে ঘুরাল নিজের দিকে। রাশভারী কন্ঠে শুধাল,

‘ কনভেনশন হল থেকে বের হতে কে বলেছিল তোমাকে? কত বড় স্পর্ধা! একাকী সেখানে যাওয়ার সাহস হলো কি করে তোমার? ‘
সায়েরী ঠোঁট উল্টায় একথা শুনে। তীব্র অভিমানে সাফওয়ানের বুকে মৃদু ধাক্কা দেয়। ভাঙ্গা স্বরে প্রতিউত্তর করে,
‘ আমি কি ইচ্ছে করে গিয়েছিলাম ওখানে? সামান্তা নিয়ে গিয়েছিল, তাও আপনার সামনে থেকেই। আগে থেকে সাহিল ভাইয়ার ব্যাপারে জানা থাকলে কি যেতাম সেখানে? ‘
এটুকু বলে একটুখানি থামলো সে। নাক টেনে পুণরায় বলে উঠলো,
‘ আপনি শুনতেই চান না আমার কোনো কথা। না জেনে শুধু শুধু আমাকে ধমকান। এজন্যই চলে এসেছি। বেশ করেছি। ‘
শেষের কথাটুকু বাঁকা চোখে তাকালো সাফওয়ান।
দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

‘ শুধু শুধু ধমকাই? বন্ধুদের সঙ্গে বসে ফ্ল্যার্টিং করেছ তুমি। হলরুম থেকে বেরিয়ে এক বাস্টার্ড কে গায়ে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছ তুমি। সাহিলের সামনে দাঁড়িয়ে ওর কনফেশন গিলছিলে তুমি। আর বলছো আমি শুধু শুধু ধমকাই? এত কিছুর পরেও আমাকে শান্ত থাকতে বলছো? ‘
সায়েরী বেশ লজ্জিত হলো এত এত অভিযোগ শুনে। মাথা নত করে ফেলল অপরাধীর ন্যায়। কয়েক সেকেন্ড হাঁসফাঁস করার পর, সাফওয়ানের কোমরের দুই দিকের শার্ট আকড়ে ধরে একটুখানি কাছ ঘেষল সে। ডাগরডোগর চোখদুটো স্থির করলো সাফওয়ানের দিকে। মিনমিন কন্ঠে শুধাল,
‘ স্যরি! এই শেষ বার। এমন ভুল আর কক্ষনো হবে না। সত্যিই.. ‘
সাফওয়ান প্রগাঢ় নয়নে দেখল তাকে। ডান গালের নিচে এক হাত গলিয়ে ঝুঁকে এলো মুখোমুখি। গম্ভীরমুখে প্রতিউত্তর করলো,

‘ এমন ভুল আর কক্ষনো করার বিন্দুমাত্র সুযোগ আমি রাখবো-ও না। ‘
সায়েরীর দেহ হীম হয়ে আসে এই কন্ঠে, এমন বাক্যে। এলোমেলো বেশভূষার সাফওয়ান ভাইকে এবারে পূর্ণ নজরে অবলোকন করে সে। কয়েক ঘন্টা পূর্বে দেখা সেই পরিপাটি, জেন্টালমেন লুক যেন ভুমিকম্পে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে, এমন হাল তার। কোট এবং ছোট কটির অস্তিত্ব নেই দেহে। আছে কেবল সফেদ শার্ট-টি। যার তিনটে বোতাম এলোমেলো ভাবে খোলা। ঢিলে টাই ঝুলছে মাঝে। কনুই অবধি এলোমেলো ভাবে ফোল্ট করা হাতা। সেট করে রাখা চুলগুলোর হাল বড়ই বেহাল। ছড়িয়ে আছে কপাল জুড়ে। তার অগোছালো রূপ দেখে মেয়েটার কপালে ভাঁজ পড়ে। সন্দিহান কন্ঠে বলে,

‘ আপনি কোথা থেকে আসছেন? শার্টের এই অবস্থা কেন? ‘
বলতে না বলতে আচমকা তার চোখ আটকায় সাফওয়ানের ডান হাতার দিকে। সফেদ শার্টে ওসব কিসের দাগ? চঞ্চল হাতে ফোল্ড করে রাখা হাতা খুলতে চাইল সে। কিন্তু সফল হলো না। বাঁধ সাধলো সাফওয়ান। সায়েরীর সন্দেহ গাঢ় হলো এতে। উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধাল,
‘ এসব কিসের দাগ? মনে হচ্ছে রক্ত! আ-আপ.. আপনি কি করে এসেছেন, সাফওয়ান ভাই? ‘
উদগ্রীব প্রেয়সীর একাধিক প্রশ্নে মৃদু হাসে সাফওয়ান। একহাতে মেয়েটার কোমর জড়িয়ে হুট করে কয়েক ইঞ্চি উপর তুলে ফেলে। বসিয়ে দেয় রেলিঙে। হকচকিয়ে উঠা সায়েরী অবিলম্বে জড়িয়ে ধরে সাফওয়ানের গলা। পেছন ফিরে অবলোকন করে উচ্চতা। কিঞ্চিৎ ভয়ে ধরফরিয়ে উঠে বুকের মধ্যিখান। ভীতু কন্ঠে বলে,

‘ প-পড়ে যাব তো! ‘
সহসা তার উন্মুক্ত কণ্ঠনালীতে স্পর্শ করে একজোড়া উষ্ণ অধর। গভীর স্বরে আশ্বস্ত করে,
‘ পড়তে দিব না তো। ‘
মেয়েলি দেহখানা দৃশ্যমান রূপে কম্পিত হয় এতে। নিঃশ্বাস আটকায় এক পলকের জন্য। দেহের সঙ্গে ছুঁই ছুঁই হয়ে থাকা পুরুষোত্তম দেহটি ঠেলে সরাতে চাইল সে। পুণরায় বলে উঠলো,
‘ আপনি কার সঙ্গে মারামারি করে এসেছেন? জবাব দিচ্ছেন না কেনো? ‘
সায়েরীর দুইপাশের রেলিঙের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। একহাত তুলে সায়েরীর বাম ঘাড় হতে চুল সরাল সে। নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিল,

‘ মারামারি না। শুধু মেরেছি। সামান্য হাত ভেঙ্গেছি। নাথিং এ্যালস। ‘
এহেন প্রতিউত্তর শুনে আৎকে উঠে সায়েরী। না জানে কাকে মেরে এসেছে! তাছাড়া সামান্য হাত ভাঙ্গা আবার কি জিনিস? ভেঙ্গেছে মানে সম্পূর্ণ রূপে ভেঙ্গে গিয়েছে। এটা আবার সামান্য হয় কিভাবে? ভ্রুঁ কুঁচকে আরও কিছু প্রশ্ন করতে উদ্যত হলো সে। তৎক্ষনাৎ শোনা গেল সাফওয়ানের কন্ঠ,
‘ নোজ পিন কোথায়? খুলেছ কেনো? ‘
সায়েরী কিঞ্চিৎ চমকাল এই প্রশ্নে। ভোঁতা মুখে জবাব দিল,
‘ নুহাশ বলছিল নোজ পিন পরেছি বলে আমাকে বিবাহিতা লাগছে। তাই খুলে ফেলেছি। ‘
‘ কেনো? সুন্দর লাগছিলো বুজি? ‘
শেষের প্রশ্নটি বেশ প্রফুল্ল বদনে করলো সে। উৎসুক নজরে তাকিয়ে রইল সুন্দর কোন প্রতিউত্তর শোনার আশায়। উত্তরে সাফওয়ান বললো,

‘ হুম। এই বোচা নাকে দেখতে ভালো লাগছিলো। ‘
ধপ করে নিভে গেল সায়েরীর মুখের জ্যোতি। গাল ফুলিয়ে নিজের নাকে হাত বুলালো সে। ঠোঁট উল্টে, মিনমিন কন্ঠ আওড়াল,
‘ একটুই তো বোচা। এটাকে এভাবে বলার কি আছে? ‘
তার প্রতিক্রিয়া দেখে মৃদু ছন্দে হেসে ফেললো সাফওয়ান। কাছ ঘেষে টুপ করে চুমু খেল প্রেয়সীর নাকের ডগায়। হাসিমাখা গলায় প্রতিউত্তর করতে চাইলে আকস্মিক একধরনের শব্দ কর্ণধার হতেই থমকাল সে। কুঁচকে ফেলল ভ্রুঁ যুগল। সায়েরী নিজেও চমকায়। একহাতে চেপে ধরে নিজ উদর। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে সাফওয়ানের দিকে তাকাতেই শোনা যায় তার গম্ভীর কন্ঠ,

‘ না খেয়েই চলে এসেছ? ‘
সায়েরী চুপ মেরে থাকে। জবাব দেয় না কোন। তার নিরবতায় উত্তর পেয়ে গেল সাফওয়ান। ফের ধমক দিতে চাইলে তৎক্ষনাৎ তার কথা কেড়ে নিল সায়েরী। চঞ্চল গলায় শুধাল,
‘ আপনার জন্যই তো না খেয়ে চলে আসতে হয়েছে। তাছাড়া, তিন চার দিন ধরে এই কোরমা, পোলাও খেয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি। আর খেতে ইচ্ছে করছে না। ‘
কথাটুকু বলে সে পিটপিট নজরে তাকিয়ে রইল। সাফওয়ান ভাই কনভিন্স হলো কি? কে জানে! সাফওয়ানের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখে কিচ্ছুটি ঠাহর করতে পারলো না মেয়েটা। অগত্যা চুপসে রইল সে। সাফওয়ান সরে দাঁড়ালো তার নিকট হতে। পকেট হাতড়ে মোবাইল বের করে জানতে চাইল,

‘ কি খাবে বলো? ‘
মুহুর্তেই সায়েরী চঞ্চল হয়ে উঠে। উজ্জ্বল মুখে লাফিয়ে নামে রেলিঙ হতে। তৎক্ষনাৎ বিচলিত ভঙ্গিতে তার বাহু চেপে ধরে সাফওয়ান। সাবধান কন্ঠে শুধায়, ‘ আস্তে.. ‘
চঞ্চল রমনী কানে তুললো না সেকথা। বরং পূর্বের কথার রেশ টেনে ঝটপট জবাব দিল,
‘ পাস্তা খাবো, হোয়াইট সস্‌ পাস্তা। আপনার ফেভারিট রেস্টুরেন্টের-টা। সাথে ডাবল চিজ বার্গার। আর…হ্যাঁ কোল্ড ড্রিংকস। ‘

সাফওয়ান এক মুহুর্তের জন্য অবাক হলো এমন চাঞ্চল্য দেখে। পরক্ষণেই হাসলো নিঃশব্দে। মেয়েটা হাবিজাবি খেতে ভালোবাসে তা জানে সে। কিন্তু কখনোই খাওয়া সম্পন্ন পারে না এটা বড় দুঃখের বিষয়। অতশত না ভেবে সায়েরীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল সে। সঙ্গে সঙ্গে তার কোমর জড়িয়ে বুকের সঙ্গে মিশে গেল সায়েরী। উৎসুক নজরে তাকিয়ে রইল কানে চেপে রাখা সাফওয়ানের মোবাইল-টার দিকে। চোখ দুটো দেখেই বুঝা যাচ্ছে, ভেতরটা কেমন উতলা হয়ে তার। এমন শিশুসুলভ আচরণ দেখে সাফওয়ান অধর কোণে ঈষৎ হাসির রেখা ফুটে ওঠে। বাম হাতে ফুলো গাল টেনে দেয় মেয়েটার।
কলের অপর প্রান্তের ব্যক্তি রিসিভ করলে সাফওয়ান তার কাছে খাবার অর্ডার করলো সায়েরীর কথামতো। শান্ত কন্ঠে আদেশ দিল,

‘ *** রেস্টুরেন্টে থেকেই নিবে সব। আমার নাম বলবে তাদের। ফ্রেশ ফুড চাই। অ্যান্ড অলসো, ফাস্ট ডেলিভারি। ‘
………….
‘ হ্যাঁ। বার্গার দুটো, কোল্ড ড্রিংকস দুটো। ড্রিংকস বেশি ঠান্ডা যেন না হয়। ‘
…………
‘ আর? আর কি? ‘ সায়েরীর দিকে প্রশ্ন ছুড়ল সাফওয়ান।
সায়েরী ঝটপট জবাব দিল, ‘ চিপস, অনেকগুলো। ‘
সাফওয়ান কপালে ভাঁজ ফেলে তা শুনে। ব্যক্তিটিকে গম্ভীরমুখে আদেশ দেয়,
‘ চিপস নিবে চারটা। এর চেয়ে আর একটাও বেশি না। ‘

একথা শুনে চমকে উঠলো সায়েরী। কিছু বলতে চাইলে তড়িৎ গতিতে তার মুখ চেপে ধরে মেয়েলী পৃষ্ঠদেশ নিজ বক্ষের সঙ্গের মিশিয়ে নিল সাফওয়ান। চোখ গরম করে বুঝাল,যেন শব্দ না করে। কিন্তু মেয়েটা সেকথার গুরুত্ব দিল না। ছটফটিয়ে উঠলো ছাড় পাওয়ার তাগিদে। উপায় না পেয়ে তৎক্ষনাৎ মাথা নুইয়ে ফেললো সাফওয়ান। তার পুরু ওষ্ঠদ্বয় গভীর ভাবে ছুঁয়ে দিল মেয়েলী গ্রীবাদেশ। সহসা থমকে গেল রমনী। থেমে গেল তার ছটফটানি। যা দেখে অধর ছুঁইয়ে রাখা অবস্থাতেই বাঁকা হাসলো সাফওয়ান। পূর্বের চেয়েও গভীর ভাবে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তির উদ্দেশ্যে গম্ভীরমুখে বললো,

‘ হ্যাঁ এটুকু। আবরারের পাশের বাড়িতে আসলেই হবে৷ ‘
‘ হুম,রাখো। ‘
কল কেটে ঝটপট মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে নিল সে। মুখ ছাড়লো সায়েরীর৷ সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো মেয়েটা। আশ্চর্য কন্ঠে বললো,
‘ চিপসের কথা বললে এমন কিপ্টেমি করেন কেনো আপনি? আর কয়েকটা কিনলে কি এমন হতো? ‘
মসৃণ উদরে মৃদু চাপ দিয়ে সায়েরীকে আরও কাছাকাছি টেনে নিল সাফওয়ান। কানের পিঠে চুল গুঁজে দিয়ে জবাব দিল,

‘ খুবই খারাপ হতো। কারণ তোমাকে আমার ভালো করে চেনা আছে৷ চিপস স্টকে রাখার মতো মেয়ে তো তুমি নও। সব আজ একত্রে সাবাড় করে ফেলবে। পরে শরীর খারাপ হলে আরও কয়েক দিন কলেজ,কোচিং মিস যাবে। এই রিস্ক আমি কোনকালেই নিব না। পরীক্ষার আর কয়মাস বাকি? হিসেব আছে কোনো? ‘
সায়েরীর উৎফুল্ল মেজাজে ভাটা পড়লো এই প্রশ্নে। বিরক্তিতে চোখ,মুখ কুঁচকে ঘাড় ফিরিয়ে নিল সে। সাফওয়ান জানে, এই প্রসঙ্গে কথা বাড়ালে জীবনেও কোনো সাড়া দিবেনা মেয়েটা। তাই সে নিজেও চুপ মেরে গেল। বলিষ্ঠ দুই হাতে দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরল ছোট্ট দেহটি। কাঁধে থুতনি রেখে, কোমল গালের সঙ্গে মিশিয়ে নিল নিজের খসখসে গাল। ফিসফিস কন্ঠে শুধাল,

‘ আজ চুপিচুপি কারো ছবি তোলা হচ্ছিল বোধহয়? কারণ কি? ‘
সায়েরী চমকে উঠলো এই প্রশ্নে। সাফওয়ান ভাই কিভাবে জানলেন সে লুকিয়ে তার ছবি তুলেছে? ছবি তোলার সময় সে তো তাকিয়ে ছিল না। তবে!
ধরা পড়ে গিয়ে লজ্জা পেল মেয়েটা। গাল ফুলে উঠলো লজ্জায়। কিন্তু দমে গেল না সে। দাড়ি বিহীন, খসখসে গালটার সঙ্গে নিজের তুলতুলে গাল ঘষে বেশ দাম্ভিক গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ ইচ্ছে হয়েছিলো, তাই। আমি না তুললে আর কে তুলবে? আপনার সুন্দরী মামাতো বোন? ‘
সাফওয়ান হেসে ফেললো একথা শুনে। নিঃশব্দের হাসি। কিন্তু তার বুক কাঁপলো এই হাসিতে। বুকের সঙ্গে লেপ্টে থাকা মেয়েটা স্পষ্ট অনুভব করলো তা। পরপরই কানের লতিতে উষ্ণ স্পর্শ পেলো৷ শোনা গেল সাফওয়ানের কৌতুকপূর্ণ কন্ঠ,

‘ এতো জেলাসি কবে থেকে পুষে রেখেছ? ‘
সায়েরী জবাব দিল না একথার। রিদিতা নামক মেয়েটার মুখশ্রী স্মরণে আসতেই মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে তার। তখন অনুশোচনা হলেও, এখন মনে হচ্ছে যা করেছে বেশ করেছে। ভাবনার মাঝে আকস্মিক কানের পিঠে উষ্ণ শ্বাস আঁচড়ে পড়তেই ঘোর কাটলো তার৷ ছটফটিয়ে উঠলো ছাড় পাওয়ার তাগিদে। কিন্তু এমন বলিষ্ঠ হাতের বাধন হতে বিন্দুমাত্র নড়তে পারলো না সে৷ অনুভব করলো কানের নিচে, তার স্পর্শকাতর স্থানে এক গভীর চুমু এঁকেছে সাফওয়ান। সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় সংকুচিত করে ফেলল মেয়েটা। হাসিমাখা গলায় আওড়াল,
‘ উঁহহু! সুরসুরি লাগে তো.. ‘

এই বাক্যটি সাফওয়ানের কাছে অত্যাধিক বিরক্তের। যখনই যে গভীর আবেশে মেয়েটাকে চুমু খেতে উদ্যত হয়, ঠিক তখনই এই বজ্জাত সুরসুরির কারণে বেঁকে বসে মেয়েটা। আজও বিরক্তিতে মুখ বিকৃতি করে ফেলল সাফওয়ান। জেদ ধরে সেই স্পর্শকাতর স্থানে একাধিক চুমু খেলো সে। ছটফটিয়ে উঠে খিলখিল করে হাসলো সায়েরী। শক্ত করে জড়িয়ে রাখার কারণে সরে যেতে পারলো না৷ শেষে গিয়ে গ্রীবাদেশের তিল দুটোর উপর এক শক্তপোক্ত কামড় বসাতেই, ব্যথায় চোখ খিচল মেয়েটা। অস্পষ্ট স্বরে আর্তনাদ করে উঠলো। সাফওয়ান ছাড় দেওয়া মাত্র সে ভাড় মুখে সরে আসলো তার কাছ হতে। ঘাড়ে হাত চেপে গাল ফুলিয়ে তাকালো৷ সাফওয়ান যেন দেখেও দেখল না তার মিষ্টি অভিমানী মুখশ্রী। হাত ঘড়িতে সময় দেখে বললো,
‘ কিছুক্ষণের মধ্যেই পার্সেল আসবে। পিউকে বলবে রিসিভ করার জন্য৷ তোমার যাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। আমি যাচ্ছি। নিচে যাও তুমি। ‘

সায়েরী কদম পিছিয়ে নেয় প্রথমবারে। পরক্ষণে কি যেন ভেবে ফের কাছে এগিয়ে আসে। সাফওয়ান প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে। ভ্রুঁ উঁচিয়ে জানতে চায়,
‘ কি হয়েছে? আর কিছু বলবে? ‘
হ্যাঁ বোধক সম্মতিতে মাথা ঝাঁকাল সায়েরী। সাফওয়ানের শার্ট টেনে কাছে আসার ইশারা দেওয়া মাত্র তার মুখোমুখি ঝুঁকল সাফওয়ান। তৎক্ষনাৎ তার খসখসে দুই গাল নিজের কোমল দুই হাতের আদলে তুলে নিল সায়েরী। পায়ের পাতা উঁচু করে এক গভীর চুমু খেলো প্রেমিক পুরুষটার কপালের মধ্যিখানে। লজ্জা মিশ্রিত, মিহি স্বরে বললো,
‘ সাবধানে যাবেন। আর..প্লিজ কারো সঙ্গে মারামারি করবেন না। আপনার কিছু হলে আমি সহ্য করতে পারবো না। ‘
মাত্র এক ইঞ্চি দুরত্বে দুজনে মধ্যিখানে। সাফওয়ানের দুইগালে তখনো সায়েরীর দুই হাত লেপ্টে। দুজনের তপ্ত শ্বাস মিলেমিশে একাকার। সাফওয়ানের গাঢ় বাদামী চোখের দৃষ্টিতে বিষ্ময়, ভালোলাগা এবং মুগ্ধতা মিশে রয়েছে। সে চোখ সরাতে পারছে না যেন। ওমন প্রগাঢ় চাহনির কবলে পড়ে লজ্জায় চোখ, হাত নামিয়ে নিল সায়েরী। ফিরে যাওয়ার জন্য এক কদম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তার কোমল ঘাড়ে চেপে বসলো একটি বলিষ্ঠ হাত। টেনে নিল নিজের দিকে। পরক্ষণেই তার ফুলোফুলো দুই গালে শক্ত করে, গাঢ় চুমু খেলো সাফওয়ান। কপালে কপাল ঠেকিয়ে, অস্বাভাবিক শ্বাস ফেলে বললো,
‘ এতো মিষ্টি করে কথা বলবে না, বোকাপাখি। আমার বুক ব্যথা হয়। তীক্ষ্ণ ব্যথা। এই ব্যথার পরিত্রাণ সরূপ কিছু করে বসলে সহ্য করতে পারবে না তুমি। তাই, সাবধানে। ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৮

সায়েরীর বক্ষপিঞ্জরে ধুকপুক অনুভূতি হয়৷ কথাটার মর্মার্থ সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা করে উৎকন্ঠায় শুকিয়ে আসে গলা। দুই গাল যেন উষ্ণতা ছড়াচ্ছে। নিজের অনুভূতি টুকু প্রকাশ করে এক সেকেন্ড ও বিলম্ব করলো না সাফওয়ান। উল্টো পথে পা বাড়ালো। সায়েরী তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল, কীভাবে একের পর এক ধাপ পেরিয়ে সাফওয়ান বেরিয়ে যাচ্ছে বাউন্ডারির বাহিরে। দেয়াল টপকে রাস্তায় নেমে নিজের বাইকে চেপে বসলো সে। পুণরায় ফিরে তাকালো ছাদের দিকে। আবছা আলোয় সাফওয়ানের মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তবুও তাকিয়ে রইল সায়েরী। এই পর্যায়ে মোবাইল বের করতে দেখা গেল সাফওয়ান কে। কয়েক সেকেন্ড তা ঘাটাঘাটি করে পকেটে ঢুকিয়ে নেওয়া মাত্র চতুর্দিকে লাইট জ্বলে উঠলো৷ অর্থাৎ বিদ্যুৎ এসেছে। সায়েরী আচমকা হেসে ফেললো এই কান্ড দেখে৷ রেলিঙে ভর দিয়ে সে তাকিয়ে রইলো নিজের উন্মাদ প্রেমিকের গমন পথের দিকে ।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭০+৭১