Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭০+৭১

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭০+৭১

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭০+৭১
সাজিয়া জাহান সুবহা

ইরাবতী,
জীবনের অন্তিম মুহুর্তে এসে তোমার ছোট্ট, মিষ্টি একটি আবদার পূরণ করতে বসেছি আজ। বিগত চারটি বছরে কতশত বার আমার কাছে চিঠি চেয়েছিলে তুমি, তা গণনাতীত। আজ তোমার মিহাদ সেই আবদার টিও পূরণ দিয়ে যাচ্ছে ইরা৷ তবে এই চিঠি তোমার প্রতীক্ষিত ভালোবাসাময়, মিষ্টি চিঠি হবে না। একটু বিষাদ, সীমাহীন পীড়ায় জর্জরিত করবে তোমাকে। তুমি বেশি কেঁদো না কেমন? এই ছয় মাসে কম তো কাঁদায় নি। আমি চির বিদায় নেওয়ার পরেও নিশ্চয়ই খুব কেঁদেছিলে? এবার অন্তত সামলে নাও নিজেকে। আমার জন্য, আমাদের ছোট্ট প্রাণটার জন্য। চিঠি পড়ে কেঁদো না বেশি। এটুকু আবদার রাখো অন্তত..

ইরা, আমার উপর জন্মানো তোমার সকল অভিমান,অভিযোগের জবাব দিতে বসেছি আজ৷ নতুন করে আমাকে হয়তো বলতে হবে না কিছু। জাদিদ ভাই নিশ্চয়ই জানিয়ে দিয়েছে সত্যটা,তাইনা? আর তুমি বিশ্বাস করতে চাওনি। মানতে পারোনি তোমার মিহাদের এমন কঠিন রোগ ছিল,তাইতো? আমিও মানতে পারিনি জানো? যেদিন প্রথম রিপোর্ট হাতে পেয়েছিলাম। আমার পৃথিবী থমকে গিয়েছিলো। বিশ্বাস হয়নি যে আমার নিয়তি এত নিষ্ঠুর। হাসপাতাল চত্তরে চারটে ঘন্টা স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম। তোমাকে ছেড়ে, মা’কে ছেড়ে দূরে হারিয়ে যাব ভাবতেও দম বন্ধ লাগছিলো ভীষণ। আমার আত্মার মৃত্যু বোধহয় সেদিনই ঘটেছিলো। তোমাকে নিয়ে দেখা সব রঙিন স্বপ্ন ধ্বংসস্তুপের মতো ধসে পড়ছিলো চোখের সামনে৷ আমার ইরাবতী কে আমি হারিয়ে ফেলবো, তার সঙ্গে আমার সংসার সাজানো হবে না, স্বপ্নের মতো ফুটফুটে দুটো মিহাদ-ইরা নিয়ে জীবন পার করা যাবেনা। ভেবেই আমি ক্ষণে ক্ষণে মরছিলাম৷ এই এক জীবনে তোমাকে নিজের করতে না পারার আক্ষেপ সেদিনই আমাকে মেরে ফেলেছিলো, ইরা।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

দুটো দিন আমি ঘরবন্দী ছিলাম। বুঝে উঠতে পারিনি কাকে কি বলবো,কীভাবে নিজেকে সামলাবো। সকলের অগোচরে কত ডক্টরের শরণাপন্ন যে হয়েছি৷ একটু বাঁচার আশায় আমার ভেতরটা খা খা করছিলো। কিন্তু উপর ওয়ালা আমার উপর বিন্দুমাত্র দয়া দেখাইনি৷ আমার কোন আকুতি,কোন অশ্রুজলের বিনিময়ে সে আমাকে তোমার সঙ্গে ঘর বাঁধার তৌফিক দেইনি। অপারেশন করার কথা কতশত বার যে ভেবেছি। কিন্তু চান্স ছিল না বললেই চলে৷ মনে হচ্ছিলো, অপারেশন করালেই তো সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাব সবার মাঝে থেকে। তোমাদের আরেকটু মন ভরে দেখার, ভালোবাসার সুযোগ আর পাবোই না৷ তাই সেই দুঃসাহস দেখাইনি। আমি আরেকটু বাঁচতে চেয়েছিলাম শুধু। আগের মতো হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল মিহাদ হয়ে আরও খানিকটা স্মৃতি জমাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি বিহীন আমার প্রতিটা দিন আমাকে নরক যন্ত্রণা দিয়েছে, দিচ্ছে।

সম্পর্ক ছিন্ন করে সেই যে তোমাকে পায়ে ঠেলেছি, আমার মৃত্যু তো সেখানেই ঘটে গিয়েছে৷ দাফন হয়ে গিয়েছে অনুভূতির। এই শেষ সময়ে এসে আমার আক্ষেপ লাগছে, কেনো এমন উন্মাদের মতো ভালোবাসলাম তোমাকে? কেনো তোমাকে বাধ্য করলাম আমাতে মত্ত হতে! আমি না চাইলে কখনোই তুমি ভালোবাসতে না৷ আর না এমন বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় কাতর থাকতে। তোমাকে এমন দুমড়েমুচড়ে যেতে দেখে আমি রোজ একটু একটু করে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি, জান। এই দম বন্ধকর অনুভূতি আমাকে এক দন্ড স্বস্তি দিচ্ছে না। তোমার কাতর চোখদুটো দেখলে সব ছেড়ে ছুড়ে ছুটে যেতে ইচ্ছা করে৷ কতো বার ছুটে গিয়েও থমকে গিয়েছি। এই অনিশ্চিত জীবনে তোমাকে জড়িয়ে ফুলের মতো জীবন টাকে নরক বানিয়ে দিতে চাইনি আমি। এজন্যই জানাইনি কিছু।

মুখ বুজে তোমার সকল অভিযোগ,অভিমান আমি মাথা পেতে নিয়েছিলাম। বান্দরবানের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত রাতের জন্য কতবার যে ধিক্কার দিয়েছি নিজেকে! আমি তোমাকে এভাবে কলঙ্কিনী করতে চাইনি, ইরাবতী। একটুও চাইনি৷ ভালোবেসেছিলাম তো৷ কীভাবে তবে আমার ভালোবাসাকে কলঙ্কিত করতাম, বলো? একমাত্র তোমার সুখের আশায় নিজের কাছ থেকে তোমাকে দূরে সরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু শেষে গিয়ে কিসব ঘটে গেলো! যদি জানতাম আমার একটু অনিয়ন্ত্রনে তোমার গোটা জীবন কলঙ্কিত হয়ে যাবে। তবে ঘূর্ণাক্ষরেও সেদিন ড্রিংক করতাম না, যেতাম না তোমার কাছে। আমাদের সেই একটা ভুল যে আজ তোমার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়াবে,আমি তা কল্পনা ও করিনি। আজ যখন জাদিদ ভাই জানালো, তুমি প্রেগন্যান্ট!

সেই মুহুর্তে নিজের এই বেঁচে থাকার উপরেই আফসোস লাগছিলো। এই অঘটনের জন্যই কি উপর ওয়ালা বাড়তি আয়ু দিয়েছেন আমাকে? আগেভাগে মরে গেলে তোমার জীবনটা বরবাদ হতো না। মরলাম না কেনো? কেনো আমার বেঁচে থাকা তোমার জীবনের কাল হলো!

ইরাবতী, আমি অনেক ভেবেছি জানো! যেই পাগলাটে মিহাদ তোমার সঙ্গে সাফওয়ানের সখ্যতা ও সহ্য করতো না, সে তোমাকে অন্য কারো সঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখতে বাধ্য হয়েছে। আমার এক বুক ভালোবাসায় পাথর চেপে আমি তোমাকে অন্য কারো হাতে সপে দেওয়ার যুদ্ধে নেমেছি। এই শেষ সময় গুলো আমি কেবল তোমার জন্য,তোমার সুখের জন্য লড়ছি। আমার রোগের সঙ্গে নয়। জাদিদ ভাইয়ের পূর্বে যত প্রপোজাল তুমি ফিরিয়ে দিয়েছ, সবাইকে আমি যাচাই করেছিলাম। খুব সুক্ষ্মভাবে সবটুকু খোঁজ চালিয়েছিলাম। শেষ অবধি জাদিদ ভাইয়ের খোঁজ নিয়েই একটুখানি স্বস্তিতে ডুবেছিল মন। তুমি তাকেও ফিরিয়ে দেওয়ার পর আমার ভরসাতেই সে অটুট ছিল তোমাকে নিজের করার জন্য। মানুষটা ভীষণ ভালো,ইরা।

তার মতোন সুপুরুষ আমি এই জীবনে দ্বিতীয়টি দেখিনি। তোমাকে এই পাগলাটে মিহাদের চেয়ে ভালো কেউ বাসতে পারবে না জানি। কিন্তু ভালো রাখার প্রশ্ন আসলে নিঃসন্দেহে আমাকে ছাড়িয়ে যাবে জাদিদ ভাই। তার চোখে তোমার জন্য যে সম্মান, সে যত্ন আমি দেখেছি। তা প্রেমিক হয়েও আমি বোধহয় কখনো দিতে পারিনি। ভাইয়ের মতো বন্ধু হয়ে সাফওয়ান-ও দিতে পারেনি। বিনা কোন প্রতিযোগিতায় জাদিদ ভাই সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। মানুষটা নিঃস্বার্থভাবে তোমাকে ভালোবেসেছে, ইরা৷ তুমি তাকে অবজ্ঞা করো না। আমার জীবনের শেষ মুহুর্ত গুলোতে সে আমাকে বড় ভাইয়ের মতো করে আগলে রেখেছিলো। আমার হাহাকার গুলো আমি সাফওয়ান কেও দেখাতে পারিনি। কিন্তু জাদিদ ভাই দেখেছে, ধৈর্য নিয়ে আমাকে সামলে নিয়েছে। তার নিউরোলজিস্ট বন্ধুকে ব্যক্তিগত ভাবে অনুরোধ করেছে আমার ট্রিটমেন্ট করার জন্য।

এই কয়েকটা মাস যাবত আমি তাদের অবজারভেশনেই আছি। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, মনের কথাগুলো আপন কাউকে জানাতে না পেরে আমি আরও বেশি গুমড়ে মরছিলাম। আমার জন্যই বোধহয় ফেরেশতার মতো আগমন হয়েছে জাদিদ ভাইয়ের। সে না থাকলে আমি কবেই মানসিক চাপে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতাম। এই কয়েকটা মাস তার মেন্টাল সাপোর্ট, ট্রিটমেন্ট এবং উপর ওয়ালার ইচ্ছায় বেঁচে আছি। জাদিদ ভাইয়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আকাশ সম, ইরা।

আমার প্রাক্তন জেনেও সে তোমাকে বিন্দুমাত্র জাজ করেনি। ফিকে পড়েনি তোমাকে ঘিরে তার অনুভূতির। কিন্তু যেদিন জানতে পারলো, তোমার আমার অন্য এক অংশের আগমনী বার্তা, সেদিন সে পিছু হেঁটেছিল। তাকে আমি ভুল বলবো না। এই যায়গায় অন্য কেউ থাকলেও এমন কাজই করতো। আমি তাকে বুঝিয়েছি, শেষ বারের মতো অনুরোধ করেছি যেন সে আমার বাচ্চাটাকে মেনে নেয়। আমার জন্য না হলেও, তোমাকে নিজের করে পাওয়ার লোভেই হয়তো সে রাজি হয়েছে। মেনে নিয়েছে আমার অনুরোধ। তার এত এত ঋণ শোধ না করেই বিদায় নিতে হবে আমাকে। কিন্তু তুমি তাকে অবজ্ঞা করে আমাকে তার কাছে আর অপরাধী করো না, প্লিজ। সে তোমাকে তোমার জন্যই বিয়ে করতে চাচ্ছে৷ ভালোবাসে বলেই নিজের চাওয়া পাওয়া বাদ দিয়ে তোমার আমার অংশটাকে আপন করতে চাচ্ছে। তবে আমার বিশ্বাস, সে কখনো আমার বাচ্চাটাকে অবজ্ঞা করবে না।

কখনো বুঝতে দিবে না, যে সে তার রক্তর নয়। আর কেউ না জানুক, তুমি তো জানো আমার কতো স্বপ্ন ছিলো একটা ছোট্ট বাচ্চার। তোমার আমার ছোট্ট এক অংশকে ঘিরে সহস্র অনুভূতি জমিয়েছিলাম আমি। কিন্তু ভাগ্যের এই নির্মম পরিহাসে আজ আমিই বলছি, তুমি কখনো আমার বাচ্চার সামনে আমার কথা উল্লেখ করবে না। তাকে জানতে দিও না যে মিহাদ নামের হতভাগ্য এক বাবার সন্তান সে। আমি চাইনা আমার বাচ্চাকে কেউ নাজায়েজ বলুক। তার জন্মপরিচয় নিয়ে সে যেন কখনো প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, ইরা। আমার অস্তিত্ব পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে গেলেও আমার বাচ্চার জন্য এক সমুদ্র আদর, ভালোবাসা আমি রেখে গেলাম। আমার হয়ে তুমি তাকে ভালোবাসায় মুড়িয়ে রেখো। আমার বাচ্চা না জানুক তার বাবার নাম, না চিনোক বাবার অবয়ব। তবুও তাকে জানিয়ে দিও, বাবা তাকে ভীষণ, ভীষণ ভালবাসে।

ইরাবতী, আমি জানি তুমি আমাকে কতোটা ভালোবাসো। আমার স্থানটা অন্য কোন পুরুষকে দিতে পারবে না জানি। কিন্তু আমি চাইনা এমনটা হোক। আমায় ভালোবাসার পরিণাম সরূপ একাকিত্ব নিয়ে যেন তোমাকে জীবন পার করতে না হয়, এজন্যই আমি জাদিদ ভাইকে বেঁচে নিয়েছি তোমার জন্য। আমার মৃত্যুর পর কখনোই তুমি মুভ অন করবে না, সেটা আমার বেশ জানা। এজন্যই আমি এতো অভিনয় করেছি। জেদ করে হলেও যেন তুমি বিয়ে করে ফেলো, এজন্য অন্য এক মেয়েকে নিজের প্রেমিকা বলে পরিচয় দিয়েছি। তুমি সেসব মনে পুষে রেখো না, জান। তোমার মিহাদ শেষ নিঃশ্বাস অবধি তোমারই থাকবে। আমার জীবনে তুমি বিহীন দ্বিতীয় কোন নারীর অস্তিত্ব কখনো ছিলো না, হবেও না। সেদিনের ঘটনার জন্য আমি স্যরি। মেয়েটাকে আমি ঠিকঠাক তাকিয়েও দেখিনি, তোমার কসম। তুমি রেগে থেকো না। আমার বলা প্রতিটা কথা, প্রত্যেকটা আঘাতের ক্ষমা দিয়ে দিও। তুমি ক্ষমা না দিলে যে ওপারে গিয়েও ক্ষমা পাবো না। এতবড় শাস্তি আমাকে দিও না ইরাবতী।

আবারও বলছি, দেরিতে হলেও জাদিদ ভাইকে মেনে নিও। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সে বড় সহজেই তোমাকে জিতে নিবে। তোমরা দুজন আমাদের বাচ্চাকে পৃথিবীর সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখো। আমার মা তোমাকে ভীষণ ভালোবাসে, জানো তো! আমি যাওয়ার পর তুমি মাঝে মাঝে তার খোঁজ নিও, প্লিজ। আমার ভালোবাসা থেকে আমার বাচ্চা বঞ্চিত হলেও, কখনো তাকে তার দাদা-দাদু ‘র ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হতে দিওনা। ওকে পেলে আমার মা’টা একটু স্বস্তি পাবে। নয়তো তাকে সামলে রাখা মুশকিল হয়ে যাবে ইরা। আমি স্বার্থপরের মতো তোমাদের কাছে শুধু দ্বায়িত্বের বোঝা দিয়ে যাচ্ছি। কি করবো বলো! এছাড়া যে আর উপায় দেখছি না। তুমি আমার স্ট্রং ইরাবতী হয়ে উঠো। আমার আপনজন গুলোকে আগলে রেখো। আর আমার ছোট্ট প্রাণটা..ওকে না দেখেই চলে যেতে হবে। একথা মানতে কষ্ট হয় ভীষণ। ওর জন্য একটা লকেট রেখেছি। বাইক বেঁচে কিনেছিলাম।
আমার স্মৃতি সরূপ তুমি তাকে দিও সেটা। দূরে থেকেও এতে করে সবসময় তার বুকের কাছটায় থাকবে তার বাবা। ধরা ছোঁয়ার বাইরে হয়েও মিশে থাকবে তার অনুভূতি-তে।

অল্প লিখতে চেয়েও বিশাল চিঠি লিখে ফেলেছি। চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে বলে অশ্রুতে কিছু শব্দ মিলিয়ে গিয়েছে। তুমি বুঝে নিও কষ্ট করে। আজকের দিনে একের পর এক ধাক্কার দখল সামলে উঠতে পারিনি বলে ধৈর্য কুলাচ্ছে না আর। সুযোগ পেলে অন্য একটা চিঠিতে বাকি কথা লিখে দিব। আর শুনো, সাফওয়ানের সঙ্গে বাজে দ্বন্দ্ব লেগেছে আজ৷ জানি না সে আর কখনো আমার ডাকে ছুটে আসবে কিনা। এই শেষ সময়ে সবার সঙ্গে হেসেখেলে বিদায় নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সবাই আমার কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। তুমি তো জানো সাফওয়ান কেমন অন্তর্মুখী। আজকের পর যদি দ্বন্দ্ব মিটমাট করার সুযোগ না দিয়েই আমি চিরবিদায় নিয়ে নিই। তবে এই গ্লানিবোধটুকু সারাজীবন মনে পুষে রাখবে সে। কাউকে বুঝতে না দিলেও ভেতরে ভেতরে নিজেকেই কষ্ট দিবে। তুমি ওকে জানিয়ে দিও, আমি ওর কথায় একটুকু-ও কষ্ট পাইনি। ওর রাগটুকু আমার প্রাপ্য ছিলো। এই ঘটনার রেশ ধরে সে যেন নিজেকে শাস্তি না দেয়।

এই চিঠির শেষ টানতে ইচ্ছে করছেই না। শেষ টানলেই তোমার সঙ্গে মনের আলাপের সুযোগ টুকু মিঠে যাবে কি-না। কিন্তু শেষ টানছি। পড়ার পর এটা জ্বালিয়ে দিও। রেখো না নিজের কাছে। কাছে রাখলেই বারেবারে এটা পড়ে তুমি কাঁদবে।
সবার শেষে আবারও তোমাকে জানিয়ে রাখছি, তোমার মিহাদ খুব আশা নিয়ে জাদিদ ভাইয়ের হাতে নিজের প্রাণভোমরা সঁপেছে। আমার আশা যেন পূরণ হয়। আমার ভালোবাসা যেনো ভীষণ ভালো থাকে। আমার ভাগ্যের সবটুকু সুখ আমি তোমার খাতায় লিখে দিয়ে যাচ্ছি। ভালো থেকো আমার ভালোবাসা, অন্যের অর্ধাঙ্গিনী হয়ে।
তোমায় নিয়ে ঘর বাঁধার অপূর্ণ ইচ্ছে নিয়ে বিদায় নিচ্ছি। এই আক্ষেপ আমাকে মরেও শান্তি দিবে না। পুণর্জন্ম বলে যদি কিছু হয়, তবে সেই জনমে আমি লম্বা আয়ু নিয়ে জন্ম নিতে চাই। এই জনমে ভালোবেসেছি, পরের জনমে পূর্ণতা পেতে চাই। তুমি আক্ষেপ করো না, ইরাবতী। তোমার মিহাদ কোনো এক জনমের জন্য হলেও উপর ওয়ালার কাছ থেকে তোমাকে চেয়ে নিবে। সেই জনমে আমাদের সব স্বপ্নের পূর্ণতা মিলবে। এই জনমের জন্য খোদা হাফেজ, ইরাবতী।
_তোমার মিহাদ
__০৯ অক্টোবর, ২০২১

সফেদ রাঙা সাড়ে পাঁচ পৃষ্ঠার বৃহৎ এক চিঠি। যার প্রতিটি বাক্যে, প্রতিটি শব্দে বিষাদের ছোঁয়া। যে মানবটি এই লেখাগুলো লিখেছে, তার কেমন অনুভূতি হয়েছিলো লেখার সময়? বুকের সঙ্গে হাত-ও কেঁপেছিলো কি? কেঁপেছিলো বোধহয়। তাই তো বেশ কয়েক স্থানে এলোমেলো হয়েছে শব্দ ভাণ্ডার। কিছু কিছুতে অশ্রুজলের ছোঁয়ায় কালি ছড়িয়ে গিয়েছে। আবছা হয়ে গিয়েছে শব্দ। এই আবছা শব্দ গুলো সাক্ষী মানবটার বুকের দহনের। চিঠি লিখতে বসে সে যে দুমড়েমুচড়ে পড়েছিলো, তার প্রমাণ এই ছড়িয়ে যাওয়া কালি। সফেদ কাগজ গুলো বর্তমানে হলদেটে রঙ ধারণ করেছে। ভাঁজের মাঝে থাকতে থাকতে খানিকটা নরম হয়ে এসেছে। ছিড়ে যাবে কি? অত্যন্ত মোলায়েম হাতে নরম হয়ে আসা কাগজ গুলোতে হাত ছোঁয়াল ইরা। নিরব অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো গাল বেয়ে গলায়। টলমলে দৃষ্টি বুজে কাগজগুলোতে ঠোঁট ছোঁয়াল সে। নাকে এসে ঠেকল প্রিয়তমের গায়ের প্রিয় মিষ্টি সুগন্ধির সুভাস। না জানে কত সুগন্ধি মাখিয়েছে এই পাঁচ টুকরো কাগজে৷ এই ছয়-সাত মাসেও মিলিয়ে যাচ্ছে না তা। যাবেও না হয়তো। বুক ভরে শ্বাস টেনে দীর্ঘক্ষণ চোখ বুজে রইলো ইরা। গা এলিয়ে দিল খোলা বারান্দার বড়সড় বেতের চেয়ারটাতে। কানের কাছে যেনো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে মিহাদের লেখা এক একটা বাক্য। এই চিঠির প্রতিটি শব্দ মুখস্থ হয়ে গেছে ইরার। বিগত সাত মাসে অগণিত বার পড়েছে চিঠিটা। মিহাদ বলেছিল একবার পড়া শেষে এটা জ্বালিয়ে ফেলতে। কিন্তু মেয়েটা পারেনি এমন নির্দয় হতে। এই কাগজের টুকরো গুলো তার কাছে সোনার চেয়েও দামী। এসব কখনো নিজের কাছ থেকে হারিয়ে যেতে দিতে পারবে না সে। কক্ষনো না।

ইরার স্মরণ হয় সাত মাস পূর্বের কথা। যেদিন প্রথম সে পড়েছিলো চিঠিগুলো। এক একটা বাক্যের ওজন এতো ভারী ছিলো, যে ইরার প্রায় ঘন্টা খানিক সময় লাগলো তা পড়তে। মিহাদের মৃত্যু তাকে যতটা না কাঁদিয়েছে, তার চেয়ে তিনগুণ সে কেঁদেছে এই চিঠি পড়ে। এতো এতো বিষাদ, আক্ষেপ, উপেক্ষা নিয়ে পৃথিবী ছেড়েছিলো তার মিহাদ? সৃষ্টিকর্তা কেন এমন নির্দয় হলেন ছেলেটার বেলায়? একসঙ্গে এত কষ্ট
সহ্য করে আদৌও কি বেঁচে থাকা যায়? তার মিহাদকেই কেনো ভুগতে হলো এত কষ্ট? কি দোষ ছিলো তার? কোন পাপের শাস্তি তাকে ইহ- জনমেই দিয়ে দিয়েছেন আল্লাহ্‌?
কলিং বেলের শব্দে ধ্যান ভাঙ্গলো ইরা’র। চট জলদি চোখ মুছে নিল সে। জাদিদের ফিরার কথা সন্ধ্যায়। তবে এই অসময়ে কে এলো?

‘ মিতু? দেখো কে এসেছে? ‘
বড় গলায় হাঁক ছাড়লো ইরা। বিপরীতে ব্যস্ত সুরে সম্মতি জানালো মিতু। ইরা উঠলো ধীরে সুস্থে। বারান্দা হতে নিজ কক্ষে প্রবেশ করে ধীর কদমে এগোল কাবার্ডের দিকে। উঁচু উদরে একহাতে রেখে বড় সাবধানে সে চিঠি-টা তুলে রাখলো নিজের ব্যক্তিগত ডায়েরির ভাঁজে। ডায়েরিটার পাশেই রয়েছে রূপোর লকেট যুক্ত চেইনটি। তার মিহাদের অন্য এক স্মৃতি। আজ মনের ভেতরটা ভীষণ পুড়ছে। অজানা অস্থিরতায় ডুবে যাচ্ছে সে ক্ষণে ক্ষণে। মিহাদকে অনুভব করার স্বাদ জেগেছে বলে চেইনটা সে পেছিয়ে নিল কব্জিতে। অতঃপর পুণরায় ড্রয়ার লক করে দিল। কক্ষ থেকে বেরুতে উদ্যত হতেই কক্ষে প্রবেশ ঘটলো মরিয়ম বেগমের। ইরা চমকে উঠলো উনাকে দেখে। মিহাদের চিঠি পড়ার থেকেই ভদ্রমহিলার জন্য মন পুড়ছিলো তার। তাইতো, মেয়েটা আবেগে আপ্লুত হলো উনাকে দেখে। আবেগপ্রবণ কন্ঠে ডাকলো, ‘ আম্মা! ‘

মরিয়ম বেগম গায়ের বোরকা টুকু অবদি খোলেননি। জাদিদ ঘরে নেই জেনে চঞ্চল পেয়ে চলে এসেছেন কক্ষে৷ ইরার ডাক শুনে মাতৃ হৃদয়ে শীতলতা বয়ে গেলো। কাছে এসে বড় আদরে মেয়েটাকে জড়িয়ে নিলেন তিনি। আজ প্রায় আড়াই মাস পর গিয়ে দেখছেন তিনি ইরাকে। ভদ্রমহিলার দৃষ্টি ছলছল। ইরা বুঝতে পারে উনার অনুভূতি। কান্না মিশ্রিত চোখে মিষ্টি করে হাসলো সে।

মরিয়ম বেগম অন্য এক কাজে বেরিয়েছিলেন। পথে নেমে ইরাকে দেখতে এসেছেন উতলা হয়ে। উনাকে শত বলেও বসানো গেলো না। ইরার জন্য নিয়ে আসা শুকনো পিঠা,আচার সহ আরও কিছু জিনিস দিয়ে মাত্রই বেরিয়ে গিয়েছেন তিনি। সঙ্গে ছিলো মাহাদী। ভাড় মনে ডাইনিং টেবিল হতে জিনিস গুলো তুলে কিচেনে নেওয়ার প্রয়াস চালালো ইরা। কিন্তু এতো হালকা দুটো বৈয়াম একত্রে তুলতে গিয়ে আকস্মিক টান লাগলো পেটে। হুশ জ্ঞান হারিয়ে মেয়েটা বৈয়াম দুটো ফেলে দিলো ফ্লোরে। ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো পেট চেপে। কিচেনে কর্মরত মিতুর বুক ধরফরিয়ে উঠলো এই চিৎকার শুনে। মেয়েটা দিকবিদিকশুন্য হয়ে ছুটে আসলো ইরার কাছে। ইরা তখনও ডাইনিং টেবিলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে। এক হাতে পেট চেপে ধরেছে। মিতু আহাজারি করে আগলে নিল তাকে। চেয়ার টেনে বসিয়ে দিল সেথায়। ইরার মুখশ্রী রক্তিম হয়ে উঠেছে যন্ত্রণায়। তীব্র ব্যথায় দাঁত চেপে সে ক্ষীণ স্বরে আওড়াল,

‘ জ-জাদিদ! জাদিদ’কে ফোন দাও, মিতু। ‘
মিতুর যেনো হুশ হলো একথা শুনে। চট জলদি নিজের বাটন ফোন খুঁজে নিয়ে সে ডায়াল করলো জাদিদের নাম্বারে। পাশাপাশি মেইন ডোর খুলে বের হলো। পাশের ফ্ল্যাটের দম্পতির সঙ্গে ইরা’র সম্পর্ক বেশ ভালো। এই বিপদে তারা অন্তত সাহায্য করতে পারবে কিছু। জাদিদ আসতে যে অনেক দেরি। ভাগ্যক্রমে সেই ফ্ল্যাটের মালিকের ছোট ভাই ঘরেই ছিলো। মিতুর আকুতি শোনা মাত্র যুবকটা চট জলদি বের হলো বাসা থেকে। সে গাড়ি ঠিক করছে, ইরাকে যেন নিচে নামানো হয় এই নির্দেশ দিয়ে গেল। পাশের ফ্ল্যাটের দুজন ভদ্রমহিলার সাহায্যে ইরা’কে নিচে নামাতে সক্ষম হলো তারা।

ইমার্জেন্সি-তে আসা একজনের ট্রিটমেন্ট করছিলো বলে জাদিদ নিজের মোবাইল দেখার সুযোগ পায়নি। নিজ কার্য সম্পাদন করে কেবিনে এসে মোবাইল হাতে নেওয়া মাত্র চমকে উঠলো সে। মিতুর এতগুলো ফোনকল! ১৫ মিনিট আগে থেকে এক মিনিট আগ অবধি ১৭বার কল করেছে সে। জাদিদের বুকে মুচড় দিয়ে উঠলো অজানা কোনো আতংকে। ইরা’র চিন্তায় ঘেমে উঠলো মুখশ্রী। মিতুকে ফোন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করলো সে। ইরাকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়ার কথা শুনে জাদিদের অস্থিরতা বেড়ে দ্বিগুণ হলো। মেয়েটার ডেলিভারি টাইম আজ থেকে আরও পনেরো দিন পর। এইতো, সামনের সপ্তাহে এডমিট হওয়ার কথা ছিলো। সব কিছু গোছগাছ করেও রেখেছে মিতু। কিন্তু আজকেই কিনা..। আর ভাবতে পারলো না জাদিদ। মিতু জানালো তারা মাত্রই নিকটবর্তী হাসপাতালে এসে পৌঁছেছে। হাসপাতালের নাম জানতে চেয়ে গাড়ির চাবি তুলে নিজ কেবিন হতে বেরিয়ে গেল জাদিদ। কিন্তু যখনই মিতু প্রতিউত্তর স্বরূপ হাসপাতালের নাম উচ্চারণ করলো, তৎক্ষনাৎ কদম থমকে গেল তার। যেই হাসপাতালের সূত্র ধরে ইরা তার জীবনে এসেছিলো, সম্পর্ক গড়িয়েছিলো বিয়ে অবধি। যার সম্মান রক্ষার্তে জাদিদ নিজ পিতৃপুরুষেদের হাসপাতাল ত্যাগ করেছে। আজ ভাগ্য তাকে ফের সেখানেই নিয়ে যেতে চাইছে! এ কেমন নিয়তি?

সর্বোচ্চ গতিতে আধ ঘন্টার পূর্বেই চির পরিচিত হাসপাতাল চত্তরে কদম রাখলো জাদিদ। তাকে দেখে হাসপাতালের অধিকাংশ স্টাফ-রাই অবাক হলো। কিন্তু সেদিকে বিন্দুমাত্র ধ্যান দিলো না সে। সরাসরি ইমার্জেন্সি রুমের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে আচমকা সে থমকে গেল সম্মুখের দৃশ্য দেখে। ইরাকে বসিয়ে রাখা হয়েছে আছে হুইল চেয়ারে। তাকে ঘিরে মিতু সহ প্রতিবেশী দুজন নর-নারী। পুরুষটা ঝগড়া বাঁধিয়েছে সম্মুখের এক বয়ষ্ক ডক্টরের সঙ্গে। জাদিদের চিনতে ভুল হলো না। এই পুরুষটা তার বাবা। কিন্তু হয়েছে কি? ইরাকে কেনো এখনো ট্রিটমেন্টের জন্য নেওয়া হয়নি? চঞ্চল কদমে ইরা’র কাছাকাছি পৌঁছাতেই কানে তীব্র ভাবে ঝংকার তুললো তার বাবার তাচ্ছিল্য কন্ঠ,

‘ এই মেয়ের বাচ্চার বাবা, ফ্যামিলি মেম্বার কেউ তো আসেনি। যেখানে বাচ্চার বাবার উপস্থিতি নেই, সেখানে কিসের ভরসায় আমরা তাকে ট্রিটমেন্ট দিবো? বন্ড সাইন করবে কে? ‘
জাদিদের চোয়াল শক্ত হয় বাবার কথা শুনে। গম্ভীর পদচারণ ফেলে মুহুর্তেই সে মুখোমুখি হলো ভদ্রলোকের। গমগমে গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ ওর হাসবেন্ড আছে কি নেই সেটা আপনি বেশ ভালো করেই জানেন ড. এহসান। তাছাড়া লেভার পেইনের রোগীকে এতো সময় এখানে বসিয়ে রেখেছেন কোন যুক্তিতে? কোথায় বন্ড পেপার? আমার ওয়াইফের আশেপাশে কোন নার্স,ডক্টর নেই কেনো? ‘

অপ্রত্যাশিত ভাবে ছেলের মুখোমুখি হয়ে কিঞ্চিৎ ভড়কে গেলেন ড.এহসান। বিশেষ আশ্চর্য হলেন ছেলে তাকে বাবা না বলে নাম ধরে সম্বোধন করছে দেখে। অহংকার মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো উনার। ক্ষোভে ফেটে পড়লেন তিনি,
‘ এই নষ্টা মেয়েটার জন্য তুমি আমার সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলছো, জাদিদ? এই মেয়েকে আমার হাসপাতালে কে এনেছে? ওর ট্রিটমেন্ট এই হাসপাতালে হতে দিবো না আমি। ওই নাজায়ে.. ‘
‘ বাবা!!! ‘ চাপা স্বরে গর্জে উঠলো জাদিদ।

বাবার অসম্পূর্ণ কথাটার মর্মার্থ ধরতে পেরে শান্ত স্বভাবের পুরুষটা বেজায় রেগে গেল। কিড়মিড়িয়ে শক্ত করলো চোয়াল। যদি সম্ভব হতো তবে এই মুহুর্তেই ইরাকে শিফট করতো অন্য হাসপাতালে। কিন্তু এখন তা সম্ভব নয়। অন্যদিকে তার বাবা যে ব্যক্তিগত ক্রোধ ভিন্নভাবে উপড়ে দিচ্ছে তা বুঝতে অসুবিধা হলো না তার। সে নিরব চোখে আশপাশে লক্ষ করে কদম এগিয়ে মুখোমুখি হলো ড. এহসানের। নিজের একত্রিশ বছরের জীবনে যা করার স্পর্ধা কখনো দেখাইনি, সেই কাজটাই করলো আজ। গম্ভীরমুখে, বেশ রুষ্ট গলায় হুমকি ছুড়ল নিজের পিতার দিকে,
‘ হাসপাতালের এম ডি হওয়ার সুযোগ তুলে আপনি যে প্রতিশোধ টা নিচ্ছেন, তার জন্য আমি আপনার উপর কেস টুকতে বাধ্য হবো, বাবা। আজ যদি আমার ওয়াইফ আর বেবির মধ্যে কারো কোন ক্ষতি হয়, তবে এই হাসপাতালের নাম আমি ধুলোয় মিশিয়ে দিবো। আই মিন ইট, বাবা। ডক্টর ডাকুন, এক্ষুনি। ‘

বুঝ হওয়ার পর হতে যেই ছেলে কেবল বাবা-মায়ের সব কথায় হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলিয়েছে। সেই সভ্য,ভদ্র ছেলে হতে এমন রুষ্ট আচরণ, এই হুমকি ইহকালে কল্পনা করেননি ড.এহসান। ফলস্বরুপ ইরা’র প্রতি ক্রোধের মাত্র বেড়ে দ্বিগুণ হলো উনার। ছেলের হুমকিতে তাচ্ছিল্য করে তিনি বললেন,
‘ ভুলে যেও না এই হাসপাতালের সঙ্গে তোমার নাম-ও জড়িয়ে আছে। আমার বংশের নাম ছাড়া তুমি কিচ্ছু নও। তোমার কোন যোগ্যতা নেই আমার নাম ডুবানোর। ‘

ইরা’র দিক নজর রেখে জাদিদ নিজেই উঁচু কন্ঠে এক স্টাফ কে হুকুম দিলো ড. নাজিফা এহমাদ কে ডেকে আনার জন্য। গাইনোলজিস্ট নাজিফা এহমাদ তার একমাত্র বড় ভাইয়ের বউ। তার সঙ্গে জাদিদের বিশেষ সখ্যতা নেই, আবার বিশেষ ভাবও নেই। কিন্তু গাইনি চিকিৎসক হিসেবে তিনি অত্যন্ত অভিজ্ঞ। জাদিদের দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি একজন রোগী হিসেবেই ইরা’র চিকিৎসা করবেন। ব্যক্তিগত কোন প্রতিহিংসা দেখাবেন না। বাবার কথায় পুণরায় ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো জাদিদ৷ হাতের বন্ড পেপারে সাইন করার পূর্বে প্রতিউত্তর করতে গিয়ে আচমকা কথা গিলে ফেললো। নজর তার সুদূর হাসপাতালের দরজার দিকে। উপস্থিত চার মানব এবং এক মানবীকে লক্ষ্য করে ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসির রেখা ফুটে উঠলো তার। বেশ দাম্ভিক চোখে বাবার দিকে চেয়ে শীতল গলায় ঠান্ডা হুমকি ছুড়ল,

‘ আমার যোগ্যতা না থাকলেও, আমার ওয়াইফের ঢের যোগ্যতা আছে আপনাদের এই অহংকারে মূল হেতু ধ্বংস করে দেওয়ার। ওর ফ্যামিলি ওকে ত্যাজ্য করেছে বলে আপনারা ওকে এতো তাচ্ছিল্য করছেন, তাইনা? কিন্তু দুঃজনক ভাবে ইরা’র কাছে তার ফ্যামিলির চেয়েও বড় অস্ত্র, তার চার চারটা ভাই আছে। পেছনে তাকিয়ে দেখুন, আপনার যম আসছে। ‘

ড.এহসানের কপালের মধ্যিখানে ভাঁজ পড়ে। না চাইতেও কিঞ্চিৎ ভয় বাসা বাঁধে মনে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই নজরে আসে চারজন লম্বা চওড়া যুবক একসঙ্গে এগিয়ে আসছে। তাদের মধ্যখানে লেডিস টি-শার্ট এবং জিন্স পরিহিতা এক রমনী। ঠিক তার বাম দিকে ধূসর বর্ণের ফুল হাতা টি-শার্ট গায়ে দেওয়া ফর্সা দেখতে সুদর্শন এক যুবক। লম্বা কদমে এগিয়ে আসতে আসতে সে বাম হাতে টান মেরে খুললো মুখ ঢেকে রাখা ব্ল্যাক মাস্ক-টা। তৎক্ষনাৎ তার মুখশ্রী লক্ষ্য করে আকস্মিক ড. এহসানের চোখে বিষ্ময় ভাব ধরা দিলো। বাদামি রাঙা চোখের অধিকারী এই ছেলেকে চিনতে বিন্দুমাত্র সময় লাগলো না উনার। ফেসবুক জুড়ে এই ছেলের ফ্যানবেজের ছড়াছড়ি। এইটুকু বয়সে সে কি নামডাক তার!
বাবার দৃষ্টি লক্ষ্য হেসে ফেললো জাদিদ। আড়চোখে দেখলো ইরাকে। চাপা স্বরে ফের বলে উঠলো,

‘ চিনেছেন তো কে সে? সাফওয়ান, সাফওয়ান তেহজিব খান। সান অব এমপি নওশাদ খান। ইরা’র বেস্ট.. উঁহু! ইরা’র বড় ভাই বলা চলে। ইরা’র ব্যাপারে সে বরাবরই ভীষণ প্রোটেক্টিভ। আজ এখানে যদি ওর বোনের মতো বান্ধবীর বিন্দুমাত্র সমস্যায় ভুগতে হয়, তবে আপনাদের হাসপাতালে তালা লাগতে বেশি সময় লাগবে না। ‘
‘ আর ওর ডান পাশের ছেলেটাকে দেখুন। পুলিশ কমিশনার জয়নুল আবেদীন এর ছেলে। জিমন আবেদীন। তার কাজ কি সেটা নিশ্চয়ই বলে দেওয়া লাগবে না! পড়ালেখা তো আমার চেয়ে বেশি করেছেন। আপনিই বুঝে নিন। ‘
ড.এহসান আশ্চর্য চোখে দেখে নিজের ছেলেকে। কীভাবে এই ছেলে বাবাকে এতো এতো হুমকি ছুড়ছে? এই হাসপাতাল কি তার নয়? সে নিজেও এই হাসপাতালের উত্তরাধিকারী। তবে এই হাসপাতাল ধ্বংস করার কথা বলতে বুক কাঁপলো না তার? এই একরত্তি মেয়েটা নিজের পরিবারের গর্ব,তিলে তিলে গড়ে তোলা হাসপাতাল টার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার কাছে?
ড.নাজিফা এহমাদ এগিয়ে এসেছেন ইমারজেন্সি কেইসের খবর পেয়ে। ইরাকে দেখে তিনি বেজায় আশ্চর্য হলেন। তবে প্রফেশনাল ভঙ্গিতে দ্রুত নার্সদের তাগাদা দিলেন ওটি রেডি করানোর জন্য। চার বন্ধু এগিয়ে এসে ইরা’কে যন্ত্রণায় কাতরাতে দেখে বেশ আশ্চর্য হলো। সকলের পূর্বে শোনা গেল সাফওয়ানের রাশভারী কন্ঠ,

‘ ওকে এখনো এখানে বসিয়ে রেখেছে কেনো? হাসপাতালে কি ডক্টরের অভাব পড়েছে? ‘
সুদর্শন মানবটার এমন দানবীয় গর্জনে জাদিদের বাবা, ভাবি দুজনেই কেঁপে উঠলো। ড.নাজিফা স্ট্রেচার নিয়ে আসার আর্দেশ দিলে তৎক্ষনাৎ ইরাকে পাজা কোলে তুলে নিলো জাদিদ। অস্থির চিত্তে শুধালো,
‘ আমি নিয়ে যাচ্ছি। প্লিজ তাড়াতাড়ি ওটি রেডি করুন, ভাবি। ইরা অনেক্ষণ যাবত পেইন সামলাচ্ছে। ‘
ড.নাজিফা মাথা দুলিয়ে সায় জানায়। চঞ্চল পায়ে ছুটে অপারেশন থিয়েটারের দিকে। তিনি নার্সের কাছে শুনেছেন শ্বশুরের কারসাজি। স্টাফদের ধমক দিয়ে আটকে রেখেছিলেন যেনো ইরা’কে স্ট্রেচারে না শোয়ানো হয়, কোনো ডক্টরকে ইনফর্ম না করা হয়। মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো নাজিফা। অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করলো জাদিদের পূর্বে। পেশেন্ট সিটে ইরা’কে শুইয়ে দেওয়া মাত্র ফের একবার যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলো মেয়েটা। মুখশ্রী রক্তিম , অশ্রুসিক্ত হয়ে সে কি বাজে অবস্থা। জাদিদের বুকের ভিতরটা ক্ষণে ক্ষণে বিষাক্ত যন্ত্রণায় ছেয়ে যাচ্ছে এই দৃশ্যে। সে সরতে পারেনা। মেয়েটা খামচে ধরে আছে তার এক বাহু। অন্য হাতে ইরা’র ভেজা গাল মুছে দিল জাদিদ। আশ্বস্ত করার তাগিদে কিছু বলতে চেয়েও কন্ঠ দিয়ে একটা শব্দ ও বের হলো না তার। ড.নাজিফা নিজেকে চট জলদি অপারেশনের জন্য প্রস্তুত করে ফিরে আসা মাত্র জাদিদ মিনতি করলো তার কাছে,

‘ ভাবি! আমি একটু থাকি এখানে? ইরা ভয় পাচ্ছে ভীষণ। ‘
ড. নাজিফা এখনো জাদিদ কে যেতে না দেখে অবাক হলেন। গম্ভীরমুখে জবাব দিলেন,
‘ জাদিদ, তুমি রুলসের ব্যাপারে অজ্ঞাত নও। এখানে থাকার হলে পারমিটের প্রয়োজন। অ্যান্ড বাবা কখনো তোমাকে পারমিশন দিবে না। তুমি যদি তর্ক বিতর্কে জড়াতে চাও দ্যান গো অ্যাহেড। তবে আমি টাইম ওয়েস্ট করতে চাচ্ছি না। নাও, লিভ.. ‘
জাদিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। চোখ নামিয়ে দেখে ইরা’কে। মেয়েটা ঝাপসা চোখে তাকিয়ে। শক্ত করে চেপে ধরে আছে তাকে। জাদিদের বুক কাঁপে তাকে এভাবে একা রেখে যেতে। কিন্তু সে নিরুপায়। বুকে পাথর চেপে ইরা’র হাত ছাড়িয়ে নিল সে। যেতে নিয়েও হুট করে নিজের সকল সংকোচ ভুলে মাথা নুইয়ে ঠোঁট ছোঁয়াল অর্ধাঙ্গিনীর কপালে। চোখ মুছে দিয়ে ফিসফিস কন্ঠে শুধালো,

‘ কিছু হবে না,ইরা। ভয় পাবেন না। অল্প কিছুক্ষণ কষ্ট করতে হবে শুধু। আমাদের চ্যাম্পিয়ন আসতে চলেছে তো। একটু সাহস রাখুন। আমি এখানেই আছি। এইতো, দরজার উপারেই। ‘
যন্ত্রণায় কাতর মেয়েটা ফের ডুকরে উঠে। তার হাত ছাড়তে গিয়ে চিকন কব্জি হতে জাদিদের হাতে গড়িয়ে পড়ে একটি লকেট। সেটি মুষ্টিতে চেপে দ্রুত পায়ে ওটি থেকে বেরিয়ে গেলো জাদিদ। তৎক্ষনাৎ বন্ধ হলো ওটির দরজা। জ্বলে উঠলো দরজার উপরের লাল বাতি। করিডরে উপস্থিত ইরা’র বন্ধুবান্ধব সকলে। ইতোমধ্যে উপস্থিত হয়েছে মিহাদের মা,বাবা এবং ছোট ভাই। সকলের মুখে চিন্তার ছাপ। আবরার এবং জিমন বার কয়েক জাদিদ কে বললো বেঞ্চে এসে বসার জন্য। কিন্তু সে নড়লো না। দরজার সম্মুখেই স্থির হয়ে রইলো। কখনো পায়চারি করতে লাগলো ডান হতে বামে।

অতিক্রম হলো দশ কি বারো মিনিট। এরইমধ্যে নিভে গেল ওটি’র লাল বাতি। সকলের উৎকন্ঠা বেড়ে দ্বিগুণ হলো এতে। বদ্ধ দরজার ওপার হতে নবজাতকের চিকন কান্নার সুর কর্ণধার হওয়া মাত্র ডুকরে উঠলেন মরিয়ম বেগম। একই সঙ্গে দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠলো নীতি। সহসা পাশ হতে তাকে বুকে টেনে নিলো রায়ান। বন্ধুদের বুকের মাঝে দ্রিমদ্রিম শব্দ হচ্ছে। জ্বলছে চোখ। এই কান্নার সুরের মাঝে তাদের কানে বাজছে প্রিয় বন্ধুর হাসির ছন্দ। সাফওয়ান শক্ত করে ঠোঁট কামড়ে ধরে আছে। কানে বাজছে মিহাদের লেখা শেষ আবদার টুকু, ‘ আমার বাচ্চাটাকে বাঁচতে দিস,ভাই। ‘

অপারেশন থিয়েটারের দরজা খোলার শব্দে সচকিত হলো সকলে। চঞ্চল পায়ে উঠে এসে ভীড় জমালো জাদিদের আশে পাশে। একজন নার্স বেরিয়ে এসেছেন। কোলের নীলচে তোয়ালে-তে মোড়ানো নবজাতক শিশু। সকলের এমন উদ্বিগ্ন চেহারা দেখে মৃদু হাসলেন তিনি। সুমিষ্ট কন্ঠে জানালেন,
‘ কংগ্রেচুলেশন’স! ছেলে বাবু হয়েছে। ‘
কি মধুর বাণী যেনো শুনেছে সকলে। বুক ছিড়ে বিরাট এক শ্বাস বের হলো তাদের। এ যেনো হারিয়ে যাওয়া মানবটার নতুন আগমনী বার্তা কানে এসেছে তাদের। বাচ্চার খবর শোনার সঙ্গে একই সুরে, একই কন্ঠে সকলে প্রশ্ন ছুড়ল,

‘ ইরা কেমন আছে? ‘
নার্স ভড়কে উঠলেন এমন কান্ডে। সচরাচর পেশেন্টের বর অথবা মা একথা জিজ্ঞেস করে থাকে। বাকিরা মেতে থাকে নবজাতক-কে নিয়ে। কিন্তু এই প্রথম ভিন্ন এক পরিবারের সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। আদৌও পরিবার কিনা কে জানে! অতশত না ভেবে তিনি সেই একই সুরে জানালেন,
‘ মা এবং বাচ্চা দুজনেই সুস্থ আছে। নরমাল ডেলিভারি হয়েছে। একটু পরেই কেবিনে শিফট করবো। আজ অথবা আগামীকাল-কেই বাচ্চা নিয়ে বাসায় ফিরতে পারবেন আপনারা। ‘
কাঙ্ক্ষিত উত্তর গুলো পেয়ে এবারে সকলে উদগ্রীব হলো ওই হীরের টুকরো বাচ্চাটাকে কোলে নেওয়ার জন্য। তাদের ‘আমাকে দিন’ আবদারে নার্স চিন্তায় ডুবে গেলেন। সকলের দিকে তাকিয়ে ফের বললেন,
‘ পেশেন্ট জানিয়েছে বাচ্চা কে যেনো সবার আগে উনার হাসবেন্ডের কোলে দেওয়া হয়। ‘
এটুকু বলে তিনি নিজেই জাদিদের দিকে এগিয়ে দিলেন কোলের নবজাতক-কে। হাসিমুখে বললেন,
‘ নিন,আপনার ছেলে। ‘

জাদিদের কানে তীব্রভাবে ঝংকার তুললো নার্সের কথাগুলো। তার দৃষ্টিতে বিষ্ময়,বুকে উত্তাল ঢেউ। ইরা বলেছে একথা! এই ছোট্ট প্রাণটার প্রতি সর্বপ্রথম অধিকারটুকু তার ঝুলিয়ে ঢেলেছে সে! অবিশ্বাস্য! নার্সের বলা ‘আপনার ছেলে’ কথাটা আরও বেশি কাঁপিয়ে দিয়েছে তার স্বত্তা। অদ্ভুত এক উত্তেজনায় সর্বাঙ্গ ঝিমঝিম করছে তার। বহু প্রয়াসে নিজেকে সামলে আকম্পিত দু-হাত বাড়িয়ে দিল জাদিদ। সেই ছোট্ট, কোমল দেহটি নিজের বলিষ্ঠ দুইহাতের মাঝে অধিপত্য জমাতেই থমকাল সে। বক্ষ জুড়ে বয়ে গেল শীতল এক অনুভূতি। কি ছিল সেটা? কীসের এই ধুকপুক অনুভূতি? কেনো এতটা কাঁপছে বলিষ্ঠ হাত জোড়া? চিকন ফ্রেমের চশমার আড়ালে বুদ্ধিদীপ্ত চোখদুটো স্থির হয়েছে নবজাতকের দিকে। সে কি রক্তিম, সফেদ ত্বক! রক্তজবার ন্যায় টকটকে লাল ঠোঁট নেড়ে যখনই সে কেঁদে উঠলো, সেই চিকন সুরে হকচকিয়ে গেলো জাদিদ। ব্যাকুল হলো কান্না থামানোর চিন্তায়। বাহু হতে খানিকটা উপরে তুলে বড় যত্নে, আবেশে কোমল গালে ঠোঁট ছোঁয়াল সে। ছুঁইয়ে-ই রাখল, যতক্ষণ না একটু একটু করে শান্ত হলো ছোট্ট প্রাণ-টি। জাদিদ বিমূঢ় হলো এই দৃশ্যে। তার এটুকু আদর পেয়ে কেমন শান্ত হয়ে গিয়েছে বাচ্চাটি! আচমকা জাদিদের চোখ টলমলিয়ে উঠলো। চিনচিনে ব্যথায় জর্জরিত হলো অন্তস্থল। মনে প্রশ্ন জাগলো,

‘ তার জন্মের পর বাবা কি এভাবে আগলে নিয়েছিলেন তাকে? তার অবুঝ কান্নায় কি একটুও ব্যাকুল হয়েছিলেন কঠোর মানুষ-টি? ‘
কে জানে! হয়তো-বা প্রয়োজন মনে করেন-নি এতটা আহ্লাদ দেখানোর। প্রথম সন্তান নিয়েই তো বড্ড সন্তুষ্ট ছিলেন তারা দুজনে।

গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল জাদিদ। সেই গভীর শ্বাস আঁচড়ে পড়লো নবজাতকের মুখ জুড়ে। তৎক্ষনাৎ চোখের পাতা কাঁপল তার। নড়ে উঠলো কিঞ্চিৎ। জাদিদ মুগ্ধ হয়ে দেখল সেই দৃশ্য। একহাতে ছোট্ট দেহটি আগলে রেখে, অন্য হাত দ্বারা ছুঁয়ে দিল বাচ্চাটির তুলতুলে একটি হাত। অবিলম্বে তার তর্জনী-তে চেপে গেল পাঁচ পাঁচটি সরু আঙ্গুল। জাদিদ আশ্চর্য হলো, বিবশ হলো। পরমুহূর্তেই হেসে ফেললো নিঃশব্দে। বিরক্তিতে চোখ কুঁচকে রাখা রক্তিম মুখখানার দিকে তাকিয়ে আপন মনে আওড়াল, রক্তের কোন সম্পর্ক নেই তাদের মাঝে। তবুও কীসের এতো টান এই প্রাণ টার প্রতি? যার নাড়ি ছিড়ে এসেছে, তাকে সে ভালোবাসে বলেই কি? কে জানে! কিছু সম্পর্ক, কিছু অনুভূতি এমনই হয়। কোন পরিচয়ের প্রয়োজন পড়ে না। শত বাঁধা স্বত্তেও হৃদয় নামক হৃদযন্ত্র-টিকে ঘিরে বেড়ে উঠে অনুভূতি’র সর্গ।
বাচ্চার দিক থেকে চোখ তোলার পরপরই জাদিদের দৃষ্টি মিললো করিডরের শেষ মাথায়, গম্ভীরমুখে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের বাবা এবং বড় ভাইয়ের দিকে। দুজনের চোখে মুখে ঘৃণার আভাস স্পষ্ট। যেনো বিদ্রুপ করছে অন্য এক ছেলের রক্তকে এভাবে আগলে নিয়েছে বলে। জাদিদের বুক ছিড়ে এক বিরাট দীর্ঘ নিঃশ্বাস নির্গত হলো। নিজের পিতৃপুরুষ হতে দৃষ্টি সরিয়ে পুণরায় তাকালো কোলের থাকা বাচ্চাটির দিকে। ধরে রাখা হাতটাতে স্নেহের সহিত আদর দিলো সে। আপনমনে স্বগোতক্তি করলো,

‘ তোমাকে আপন করে আমি তাদের দেখিয়ে দিব, কেবল জন্ম দিলেই কেউ বাবা হয়ে যায় না। ‘
মরিয়ম বেগমের দিকে লক্ষ্য করে নিজের অনুভূতি তে লাগাম টানলো জাদিদ। উনার কাছাকাছি গিয়ে বাচ্চাটিকে বাড়িয়ে দিলে বললো,
‘ দেখুন। আপনার মিহাদ ফিরে এসেছে, আন্টি। ‘
সহসা ডুকরে কেঁদে উঠলেন মরিয়ম বেগম। বলার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কোলে টেনে নিলেন ছেলের শেষ চিহ্নকে। মুখের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ভাদালেন বুক। স্বামীর দিকে চাইলেন কান্না মিশ্রিত মুখে। একহাতে স্ত্রীকে জড়িয়ে নাতির মুখ ছুঁয়ে দিলেন মিহাদের বাবা। এ যেনো বাস্তবেই তাদের মিহাদের প্রতিচ্ছবি।
দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বন্ধুদের সুযোগ মিললো বাচ্চাকে কাছ থেকে দেখার। নীতি নিজেই কোলে তুলে নিল তাকে। হাতের তালুতে চুমু খেলো শব্দ করে। পরপরই ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললো মেয়েটা। তার চার ধারে ঘিরে থাকা চার যুবক আগলে নিল তাকে। একটু একটু করে ছোঁয়ে দেখল প্রিয় বন্ধুর এই ছোট্ট অংশটাকে।

ইরাকে কেবিনে দেওয়ার পরপরই সকলে এসে ভীড় জমিয়েছে সেথায়। বাচ্চা তখনো নীতির কোলে। কেবিনে সর্বপ্রথম ঢুকলো মরিয়ম বেগম এবং সাফওয়ান। মরিয়ম বেগমের সঙ্গে আলাপ শেষে সাফওয়ান এসে দাঁড়ালো ইরা’র পাশে। স্নেহের সহিত হাত বুলিয়ে দিল মাথায়। ছেলেটার দৃষ্টি বেশ রক্তিম। ইরা ঝাপসা চোখে তা অবলোকন করলো শুধু। কন্ঠ দিয়ে কারোরই কোন কথা বেরুতে চাইলো না যেনো। ঠিক সেই মুহুর্তে বাকিদের সঙ্গে নীতি এলো বাচ্চা কোলে নিয়ে। নিজ সন্তানকে দুর্বল দুই হাতে তুলে নেওয়া মাত্র ইরার বুক মুচড় দিয়ে উঠলো তীব্র যন্ত্রণায়। বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো মেয়েটা। মায়ের কান্না সুরে বাচ্চাটি নিজেও কেঁদে ফেললো। মরিয়ম বেগম এবং নীতি বড় কষ্টে সামলে নিল তাকে। বন্ধুরা সকলে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালো সদ্য মা হওয়া মেয়েটাকে সবটুকু খুশি উপহার দিতে। জিমন এবং আবরার বেলুন,মিষ্টি, কেক এনে হইচইপূর্ণ কোলাহল বানিয়ে ফেলল মুহুর্তেই। ইরার কান্নাটাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ছবি তুলে, হাসি তামাশায় মাতিয়ে রাখলো তাকে। মাত্র কয়েক মিনিট পূর্ব অবধি জীবনের এমন বিশেষ দিনে নিজের পরিবারের সঙ্গ না পাওয়ার দুঃখে অন্তরস্থল কাতর হয়ে ছিলো ইরার। কিন্তু বন্ধুদের এই প্রচেষ্টা গুলো দেখে নিমেষেই তার সকল দুঃখ ঘুচে গেলো। এই তো তার পরিবার। মিহাদের মা, বাবা এবং মিহাদের সূত্রে পরিচয় হওয়া এই বন্ধুগুলো তার জন্য আশীর্বাদ সরূপ। আর জাদিদ.. ভাবতে ভাবতে হাতের উপর স্পর্শ পেলো পুরুষটার। সকলে যেখানে বাচ্চা নিয়ে মেতে আছে, সেখানে জাদিদ দাঁড়িয়ে আছে বউয়ের বেডের কাছে। ইরা’র দুর্বল হাত ছুঁয়ে সে নরম কন্ঠে শুধায়,

‘ ঠিক আছেন তো,ইরা? ‘
ইরা প্রসন্ন হাসে। জাদিদের আঙ্গুলে আঙ্গুল মিশিয়ে একই সুরে প্রতি উত্তর করে,
‘ আপনি থাকতে আমার ঠিক না থাকার প্রশ্ন-ই উঠে না, জাদিদ। একদম ঠিক আছি। ‘
জাদিদের বক্ষজুড়ে শীতলতা বয়ে চলে। ইরা’র ক্লান্ত মুখশ্রীর পানে তাকিয়ে থাকে নিরব চোখে। দুজনের দিকে লক্ষ্য করে সাফওয়ান বন্ধুদের ঠেলে বের করে রুম থেকে। বাচ্চাকে ইরা’র পাশে দিয়ে সকলেই একে একে বেরিয়ে যায়। তখন গিয়ে জাদিদ বসে বেডের একপাশে। ইরা’র বাহুতে ঘুমন্ত শিশুটির গালে নরম ভাবে স্পর্শ করে সে। তার চোখে মুগ্ধতা, খানিকটা খুশির আভাস। ইরা মুগ্ধ চোখে দেখে এই দৃশ্য। শিশুর পানে চেয়ে জাদিদ শীতল কন্ঠে বলে,
‘ ওকে পেয়ে অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে, ইরা। মনে হচ্ছে আমি আমাকে খুঁজে পেয়েছি। আমার শৈশবের সব অভিযোগ, অভিমান মিটিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। ‘
এটুকু বলে সে ঝাপসা চোখে তাকালো ইরা’র দিকে। ধরা গলায় বললো,

‘ আমি যে শৈশব কাটিয়েছি, সেটা কখনো ওকে কাটাতে দিতে চাইনা। ওর মাধ্যমে আমি আমার অপূর্ণ ইচ্ছেগুলো পূরণ করে নিতে চাই। আমি সারাজীবন বাবার আদর,ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত থেকে যে কষ্ট বুকে পুষেছি, সেটা কখনো ওকে উপলব্ধি করাতে চাই না। আ-আমি ওর বেস্ট বাবা হতে চাই, ইরা। ‘
ইরা’র চোখের কোণ ঘেঁষে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। তবে নিজেকে সামলে নিয়ে সে হাত বাড়িয়ে মুছে দেয় জাদিদের চোখের কোণে জমা থাকা অশ্রুবিন্দু টুকু। গালে হাত ছুঁয়ে রেখেই সে প্রতিউত্তর করে,
‘ আপনি অনেক আগে থেকেই ওর বেস্ট বাবা হয়ে উঠেছেন, জাদিদ। এবার এই ছোট্ট বাবাটার ভালোবাসা দেখুন। সে নিজেই ভালোবেসে আপনার সব দুঃখ ভুলিয়ে দেবে৷ এক বাবাকে কাছে পাননি তো কি হয়েছে? ওকে দেখুন। এটাও তো আপনার বাবা-ই হয়, তাইনা? ‘

জাদিদ ঝাপসা চোখে হাসে। পুরুষ মানুষ যে এতো আবেগী হতে পারে তা ইরা পূর্বে কখনো দেখেনি। সে হাসিমুখে দেখতে থাকে জাদিদের দুই চোখের মাঝে জমিয়ে থাকা শতশত স্বপ্ন। এমন এক পুরুষকে মিহাদ বেঁচে নিয়েছে তার জন্য, বাচ্চার জন্য। এটা ভেবে ফের একবার মনে মনে শুকরিয়া জানায় সে। অতঃপর কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলে,
‘ আমার হাতে একটা লকেট ছিলো। কেউ পেয়েছেন সেটা? ‘
জাদিদ মাথা দোলায়। পকেট হতে বের করে লকেটটি। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলে,
‘ এটা হাতে পরে ছিলেন কেনো? দেখে তো দামী মনে হচ্ছে। ‘
‘ হুম। খুব দামী। পরিয়ে দিন আপনার ছেলেকে। ‘
জাদিদ বেশ খুশি মনে মেনে নেয় এই আদেশ। বাচ্চার গলায় বেশ যত্ন সহকারে চেইনটি পরিয়ে দিতে দিতে প্রশ্ন করে,

‘ ছেলের নাম কি ঠিক করেছেন? কিছুই তো জানান নি আমাকে। ‘
ইরা নিরব চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে স্বামী-সন্তানকে। তার জবাব না পেয়ে ফিরে তাকালো জাদিদ। তার সেই কৌতুহলী দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে মিষ্টি হেসে ইরা জবাব দিলো,
‘ আপনার ছেলের নাম মাহবীর। মাহবীর এহমাদ শেখ। ‘

নভেম্বরের অন্তিম প্রহর। কলেজ প্রাঙ্গণে আজ রমরমা ভাব। কোলাহলে ভরপুর চতুর্দিক। অডিটোরিয়ামে ভীড় জমিয়েছে প্রায় সকল ছাত্র-ছাত্রী। অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ফেয়ালওয়েল ডে আজ। আয়োজিত হয়েছে ছোট খাটো অনুষ্ঠানের। গণনা হিসেবে চার বছরের কলেজ জীবনের সমাপ্তি আজ। নিয়মিত, অনিয়মিত যেমনই হোক। বিদায় শব্দটির মর্মার্থ বুঝে সকলেরই মন ভাড় হলো৷ তবে সেই মন খারাপ টুকু অব্যক্ত রেখে অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী শেষ দিনের মুহুর্ত টুকু স্মৃতি বদ্ধ করছে। উপভোগ করছে এই বিদায় বেলায় বন্ধুদের সঙ্গ। ক্লাসের পপুলার বয় হিসেবে দ্বিতীয় স্থানে পরিচিতি লাভ করা আহাদ নামক ছেলেটাকে ঘিরে আছে তার বন্ধু বান্ধব। মোটে পাঁচজন তারা। তন্মধ্যে “কারাণ-অর্জুন” জুটির মতো আহাদ-রনি দুজনে বেশ পরিচিত মুখ। একে অপরের বেস্ট ফ্রেন্ড নামে পরিচিত তারা। দুজনে এই মুহুর্তে মেতে আছে খুনসুটিতে। সফেদ রাঙা একটি টি-শার্ট নিয়ে বেশ যুদ্ধ চলছে দুজনের মধ্যে ৷

হাতাহাতি, মৃদু শব্দে গালাগাল আবার হাসাহাসি। দামড়া দুই ছেলের সুন্দর একটি দৃশ্য। অডিটোরিয়ামে সদ্য কদম ফেলা অন্য এক যুবক নিরব দৃষ্টিতে অবলোকন করলো এই দুই বন্ধুর খুনসুটি মুহুর্ত। তার চঞ্চল কদম আনমনেই ধীর গতিতে রূপান্তরিত হলো। স্বচ্ছ, বাদামি মণির নিগুঢ় দৃষ্টি থমকে রইলো বেশ অনেক্ষন। গত রাত হতে বক্ষপটে যে বদ্ধ অনুভূতি সুনিপুণ ভাবে দমন করে রেখেছিলো, এই দৃশ্যে তা ফের নতুন রূপে টগবগিয়ে উঠলো। চিনচিনে ব্যথায় জর্জরিত হলো অন্তরস্থল। প্রিয়’র চেয়েও প্রিয় বন্ধুটার স্মৃতি হানা দিলো মস্তিষ্কে।কঠোরতায় ডুবে থাকা সুন্দর চোখদুটো ঝাপসা হতে চাইলো বুঝি! সহসা পলক ঝাপটাল সে। গলার কাছে পাথরের মতো আটকে থাকা বিষাক্ত যন্ত্রণা টুকু গিলে নিলো সন্তর্পণে। তৎক্ষনাৎ কাঁধে হাত রাখলো কেউ। শক্ত এক চাপড় মেরেছে। এসে দাঁড়িয়েছে পাশে৷ সহসা দৃষ্টি ঘোরালো সাফওয়ান। দেখলো, জিমনের হাসিমুখ। একই সঙ্গে অন্য পাশে এসে দাঁড়িয়েছে রায়ান। তার ঠোঁট জুড়েও বিস্তৃত হাসি দৃশ্যমান। দুজনের দিকে তাকিয়ে সাফওয়ান ফুঁস করে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। তার কন্ঠ শোনাল আঁধারের মতো আবছা,

‘ এতো হাসি দেখানোর কোন প্রয়োজন দেখছি না৷ আমি বাচ্চা নই৷ ‘
তৎক্ষনাৎ দুই বন্ধুর মুখশ্রীতে আঁধার নামে৷ আশেপাশে এতো কোলাহল, এতো হাসি তামাশা, এতো এতো বন্ধুবান্ধব। কিন্তু তাদের ভেতরটা কেনো এমন পুড়ছে! এই দিনটা কি একটু ভিন্ন হতে পারতো না? বাকিদের মতো তাদের প্রিয় বন্ধু দুজন কি আজ তাদের সঙ্গে সামিল হতে পারতো না? ইরা’র ওয়ান ইয়ার ড্রপ যাচ্ছে। সে যেনো থেকেও নেই। গোটা একটা বছর যাবত মেয়েটা নামমাত্র বেঁচে রয়েছে। পৃথিবীতে তার অস্তিত্ব ছিলো কেবল। সে নই৷ এবার গিয়ে হয়তো বাঁচার মতন বাঁচবে। কারণ স্বরুপ যে প্রেমিক পুরুষটার শেষ সম্বল টুকু আছে তার কাছে। মাহবীর! মিহাদের শেষ চিহ্ন। আর মিহাদ..! এই বন্ধুটার কথা ভুলতে পারে না তারা। ভাবতে গেলেই ছোট্ট বাচ্চার ন্যায় গুড়িয়ে যায় পুরুষ স্বত্তা। হু হু করে অন্তরস্থল। সময়ের সাথে নাকি সব দুঃখ সয়ে যায়। কিন্তু কই! তারা কেনো পারছে না ভুলতে? এতগুলো মাস গেলো। বন্ধুর অনুপস্থিতি এখনো এতটা পুড়াচ্ছে কেনো তাদের?

‘ নীতি কোথায়? ‘
সাফওয়ানের গম্ভীর কন্ঠস্বর কর্ণধার হতেই ঝটপট জবাব দিলো রায়ান,
‘ ক্লাসরুমে। ওর ফিমেল ফ্রেন্ডদের সঙ্গে আছে৷ ‘
উত্তর টুকু পেয়ে ফের চুপ মেরে রইলো সাফওয়ান। আশেপাশের এতো এতো কোলাহলে রীতিমতো মাথা ধরে গিয়েছে তার। বিতৃষ্ণায় ভরে উঠেছে মন। সারিবদ্ধ চেয়ার গুলোর মধ্য হতে একটি চেয়ার টেনে সে পায়ের উপর পা তুলে বসলো। বিরক্ত কন্ঠে ধমকে উঠলো দুই বন্ধুকে,
‘ বলেছিলাম আসবো না। তা-ও জোরজবরদস্তি করেছিস কেনো? এই মাছের বাজার দেখবো এখন বসে বসে? ‘
রায়ান ঢোক গিলে। সাফওয়ানের ধমকা ধমকির সম্মুখে কখনোই তার কন্ঠ দিয়ে কথা বেরুতে চায় না। আজও বেচারা সাফওয়ানের কঠোর চোয়াল অবলোকন করেই চুপ মেরে গেলো। তার পরিবর্তে জবাব দিলো জিমন। সাফওয়ানের পাশে বসে বেশ রয়েসয়ে বললো,

‘ এখানে বসে থাকতে তো বলছিনা তোকে। ঘুরেফিরে আয়। প্রিন্সিপাল স্যার ডাকলে তখন উপস্থিত থাকলেই হলো। ‘
‘ আমাকে দিয়ে ওই মাইক্রোফোন মন্ডলের কি কাজ? ‘
মোবাইলে দৃষ্টি রেখে নির্বিকারে প্রশ্ন ছুড়লো সাফওয়ান। বলার ধরণ দেখে দুই বন্ধু ফিক করে হেসে দিলো। প্রিন্সিপালের নাম মঈনুল মাহমুদ। ভীষণ রুক্ষ,ভারী কন্ঠস্বর তার। একরুমে কথা বললে পাশের রুমের দেয়াল অবধি প্রতিধ্বনিত হয়। ফলস্বরূপ সাফওয়ানের বন্ধুমহল হতে উনার বিশেষ নাম রাখা হয়েছে “মাইক্রোফোন মন্ডল”। নামটা অবশ্য মিহাদ রেখেছিলো। যা এখন সে ব্যাতীত সকলের মুখে মুখে। জিমন হাসি চেপে প্রতিউত্তর করলো,
‘ সম্ভবত মেয়ে জামাই করবে৷ তোকে যা চোখে হারায়! অফার দিলে অবাক হবো না। ‘
সাফওয়ান নৈঃশব্দে হাসে। মোবাইলে দৃষ্টি রেখেই প্রতিউত্তর করে,
‘ অফার দিলে জানিয়ে দিস তেহজিব খান অলরেডি টেকেন, ফর লাইফটাইম। ‘
একটু থেমে ফের বলে,

‘ আমার বাচ্চা প্রেমিকা-টা আমার সঙ্গে থাকতে থাকতে ভীষণ পজেসিভ হয়ে গিয়েছে, জিমন। এসব খবর তার কানে গেলে প্রিন্সিপালের মেয়ের আস্ত থাকবে না। তাই সাবধানে.. ‘
রায়ন এবং জিমন বড় কৌতুহলী হলো সাফওয়ান প্রতিউত্তর শুনে। সচরাচর বন্ধুদের আড্ডায় ঘূর্ণাক্ষরেও সায়েরীকে নিয়ে আলাপ করে না সাফওয়ান। তাদের মধ্যকার তুচ্ছ হতে তুচ্ছ কোন বিষয় নিয়েও কথা বলতে আগ্রহী নয় সে৷ অন্যরা কথা তুললেও এক ধমকে কথা ভুলিয়ে দেয়। সেখানে আজ এমন কিছু নিজ থেকে বলেছে দেখে দুই বন্ধু ভারী আশ্চর্য হলো। জিমন ফিচেল হেসে জানতে চাইলো,
‘ সুপার পজেসিভ! তা-ও আবার তোর মতো? ইন্টারেস্টিং তো। করেছে কি আমার পিচ্ছি শালিকা? তোর মতো কারো হাত ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয় নি তো? ‘
মোবাইল থেকে দৃষ্টি সরালো সাফওয়ান। চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে দুই হাত মাথার উপর তুলে আড়মোড়া ভাঙ্গলো। একই সঙ্গে প্রতিউত্তর স্বরূপ চমৎকার করে হাসলো জিমনের দিকে তাকিয়ে। ঘাড় কাত করে বললো,

” অ্যাবসোলিউটলি.. রাইট! ”
বিষ্ময়ে হতবিহ্বল হলো জিমন। সে তো কথার কথা বলেছিলো মাত্র। ভাবেনি কথাটা একেবারে নিশানায় লেগে যাবে। তা-ও কিনা সায়েরী! ওই ছিঁদকাঁদুনে মেয়েটা! রায়ানের চোয়াল ঝুলে গেলো বিষ্ময়ে। পিটপিট নজরে তাকিয়ে দুজনে মৃদু ছন্দে চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ কার হাত ভেঙ্গেছে? কবে? কীভাবে? ‘
সাফওয়ান বুক ফুলিয়ে বসে। অন্যসময় হলে বন্ধুদের সম্মুখে সায়েরীকে নিয়ে এক বাক্যও কথা না বলা ছেলেটা আজ বড় গর্বের সঙ্গে বর্ণনা করলো সপ্তাহ তিনেক পূর্বের ঘটনা। জিমন এবং রায়ান হা করে শুনে যাচ্ছে। সাফওয়ানের কন্ঠের উৎফুল্লতা, মুখশ্রীর জ্বলজ্বলে ভাব দেখে মনে হচ্ছে যেনো কোন মেডেল জিতেছে তার বাচ্চা প্রেমিকা। কিন্তু বাস্তবে করেছেটা কি! এক যুবতী মেয়ের হাত ভেঙ্গে দিয়েছে। শুধু কি তাই? কাঁচের টুকরো বিঁধে গিয়ে গালে, হাতে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে রিদিতার। হাত ভাঙ্গার কথা অবশ্য বেশ অনেকদিন পরে জেনেছে সাফওয়ান। রিদিতার হোচট খাওয়া দেখে সে আন্দাজ করেছিলো ব্যাপারটা। পরবর্তীতে সকলের কাছে শুনে মনে মনে বেশ তৃপ্তি পেয়েছে।
একপ্রকার ঘোরের মাঝেই সায়েরীর কীর্তি শুনলো রায়ান এবং জিমন। সাফওয়ান থামতেই রায়ান অসন্তুষ্ট গলায় বলে উঠলো,

‘ আনবিলিভেবল! কি সুইট একটা মেয়ে ছিলো সায়েরী। তুই ওকেও নিজের মতো বানিয়ে ফেলেছিস! ‘
সাফওয়ানের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির আভাস। ডান পায়ের উপর তুলে রাখা বাম পা-টা নাড়াচ্ছে সে। দৃষ্টি নিবদ্ধ মোবাইল স্ক্রিনে। ক্যান্ডি ক্রাশ গেইম খেলছে। স্ক্রিনে দৃষ্টি রেখেই সে ক্ষীণ আওয়াজে প্রতিউত্তর করলো,
‘ আমার কাছে সুইট হয়ে থাকলেই হলো। বাকি দুনিয়ার জন্য সায়েরী সুবহা — সাফওয়ান তেহজিব খানের প্রতিচ্ছবি হোক, এমন করেই তো গড়তে চেয়েছিলাম। ‘
দুই বন্ধুর কপালে ভাঁজ পড়ে৷ সাফওয়ানের কথার মর্মার্থ বুঝতে অক্ষম তারা। জিমন শব্দ করে তালি বাজিয়ে বলে,

‘ মাশা আল্লাহ! সুবহান আল্লাহ! রাব নে বানা দি জোড়ি। এমনই হাত ভাঙ্গা ভাঙ্গি করে জীবন কাটিয়ে দে তোরা। কারো নজর না লাগুক। মারহাবা জোড়ি তোদের। মাইন্ড ব্লোয়িং! ‘
রায়ান হেসে ফেললো জিমনের কথায়। দুজন ভেবেছিলো এহেন তুচ্ছ কথার কোনো প্রতিউত্তর করবে না সাফওয়ান। কিন্তু ফের একবার দুজনকে আশ্চর্য করে দিয়ে ঘাত কাত করে সম্মতি জানালো ছেলেটা। ক্ষীণ স্বরে প্রতিউত্তর করলো,
‘ আই হোপ সো। থ্যাঙ্কিউ! ‘

বেলা এগারোটা নাগাদ অডিটোরিয়মের কোলাহল বেড়ে দ্বিগুণ হলো। শিক্ষক দের নানান বক্তব্য শেষে প্রিন্সিপাল মঈনুল মাহমুদ এক লম্বা স্পিচ দিলেন। শুরুটা সকল স্টুডেন্ট দের জন্য হলেও শেষে গিয়ে নির্দিষ্ট এক ছাত্রের প্রসংশায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলেন তিনি। দীর্ঘ চার বছর যাবত র‍্যাংকিং- এ প্রথম স্থান দখল করে রাখা, স্বভাবে, ব্যাবহারে সকলের চোখের মণি হয়ে উঠা ছাত্রটির নাম নিলেন বড় আদরে, বেশ গর্বের সঙ্গে। সাফওয়ান! সাফওয়ান তেহজিব খান। উচ্চারিত নামটি কর্ণধার হওয়া মাত্র অডিটোরিয়ামে ঝড় উঠলো যেনো। বলা বাহুল্য, মেয়েরা নয়। বরং ছাত্রদল হতেই ভেসে আসলো তুমুল হইহই কলরব। প্রথম এবং দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রদের পছন্দের বড় ভাই কিনা! ছাত্রদের এহেন কলরবে শিক্ষক গণ দারুণ আশ্চর্য হলেন। প্রিন্সিপাল মঈনুল মাহমুদ উৎসুক নজরে ভীড়ের মাঝে খুঁজতে লাগলেন কাঙ্ক্ষিত যুবকটিকে। সারি সারি স্টুডেন্টের ভীড়ে, মাঝামাঝি এক সারিতে বসে মোবাইলে মগ্ন সাফওয়ানের ডান কান হতে নেকব্যান্ড হেডফোনের একাংশ টেনে খুলল রায়ান। সঙ্গে সঙ্গে সাফওয়ানের কানে আসলো ছাত্রদলের করতালির শব্দের সঙ্গে জিমনের কন্ঠস্বর,

‘ আবে শালা! ডাকছে তোকে। তাড়াতাড়ি যা.. ‘
ঘাড় হতে পাতলা বস্তুটুকু নামিয়ে, কোলের উপর অবহেলায় পড়ে থাকা ধূসর বর্ণের লেদার জ্যাকেট -টা রায়ানের হাতে ধরিয়ে দিলো সাফওয়ান। স্টুডেন্ট’রা দুই ধারে সরে তাকে জায়গা দিলো যাওয়ার জন্য। কপালে ছড়িয়ে থাকা ঝরঝরে চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে লম্বা কদমে এগোলো সে। গ্রে রঙের ফুল হাতা টি-শার্টের হাতা টেনে উপরে তুললো খানিকটা। মাত্র কয়েক কদমেই পৌঁছে গেল প্রিন্সিপালের সম্মুখে। কন্ঠে খাদ নামিয়ে সালাম জানাতেই নিজ হাত বাড়িয়ে দিলেন মঈনুল মাহমুদ। হ্যান্ডশেক করে পিঠ চাপড়ালেন সাফওয়ানের। বেশ হাস্যজ্বল চিত্তে বাড়িয়ে দিলেন নির্দিষ্ট, সম্মাননা পুরষ্কার টুকু। সেটা গ্রহণ করেই ফিরে আসতে চেয়েছিলো সাফওয়ান। পরবর্তীতে থমকালো প্রিন্সিপালের কথায়,

‘ তোমার ছোট ভাই-বোনদের উদ্দেশ্যে কিছু বলে যাও। ‘
সাফওয়ান মনে মনে বেশ অসন্তুষ্ট হলো। বিরক্ত লাগলো কথাটা। এড়িয়ে যেতে চাইলে আনমনে তার দৃষ্টি স্থির হলো অদুরে। অডিটোরিয়ামের দরজার পাশেই, বেশ কসরত পুহিয়ে একটুখানি জায়গা দখল করে দাঁড়িয়েছে দুই কিশোরী। একজন এসেছে ভাইয়ের উদ্দেশ্যে,অন্যজন এসেছে প্রেমিক পুরুষকে দেখতে। দুই রমনীর হাতে মোবাইল। ক্যামেরা তাক করে রেখেছে ঠিক ঠিক সাফওয়ানের দিকে। ইন্টারমিডিয়েট স্টুডেন্টদের কে আজকের প্রোগ্রামে উপস্থিত হওয়ার বিন্দুমাত্র অনুমতি দেওয়া হয়নি। তা-ও কিনা এই দুজন এখানে! সাফওয়ানের ঠোঁটের কোণ প্রসারিত হলো দুই কিশোরীর কান্ডে। মাথা নুইয়ে, ভ্রুঁ চুলকে কিঞ্চিৎ হাসলো সে। দুয়েক সেকেন্ড পূর্বে যে বক্তব্য দিবে না বলে মনস্থির করেছিলো। তা নিমেষেই বদলে গেল। সে এগোলো স্পিকারের দিকে। প্রথমেই হাত উঁচিয়ে জিমন এবং রায়ানকে ইশারায় দেখালো অদূরে, কোন এক অবহেলিত টুলের উপর দাঁড়িয়ে ঠ্যালাঠেলি করতে থাকা দুই রমনীকে। তার হাতের ইশারায় সকলেই ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো। অপ্রত্যাশিত ভাবে ধরা পড়ে গিয়ে থতমত খেয়ে গেল সাফ্রিন এবং সায়েরী। অনুমতি না থাকা স্বত্তেও ক্লাস বাঙ্ক মেরে এখানে আসার দায়ে নিশ্চিত বকা শুনবে, সেই ভয়ে রক্তশূণ্য হলো মুখশ্রী। হুড়মুড়িয়ে নামলো বেঞ্চ হতে। সাফ্রিনকে এক দেখায় চিনতে পারলো সকলে। ভাই যে সম্মাননা পুরষ্কার গ্রহণ করছে, তা দেখার জন্যই সাফ্রিন এসেছে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখালো না কেউ। পুণরায় মনযোগ দিলো সাফওয়ানের দিকে।
নীতি সাফওয়ানের ইশারা টুকু বুঝতে পেরে উঁচু গলায় ডাকলো,

‘ সাফা! এদিকে এসো.. ‘
সাফ্রিন-সায়েরী নীতির পাশে এসে দাঁড়াতেই সেদিক হতে দৃষ্টি সরালো সাফওয়ান। উৎসুক ছাত্রসমাজের দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় সালাম জানালো। সঙ্গে সঙ্গে ফের একবার ভেসে আসলো ছাত্রদের উচ্চ কন্ঠ। একই সুরে, গলা উঁচিয়ে সালামের উত্তর দিলো সকলে। এমন পাগলামিতে সাফওয়ান-সহ তার বন্ধুরা, শিক্ষকেরা সকলেই হেসে উঠলেন। শীতল সুরে, স্বল্প কিছু বাক্য আওড়াল সাফওয়ান। তার একনিষ্ঠ ভক্তের মতো কি ভীষণ মনযোগে সকলে শুনল সেসব! পিনপতন নীরবতার মাঝে কেবল শোনা গেলো সাফওয়ানের শীতল কন্ঠটুকু। শিক্ষকগণ ভীষণ আশ্চর্য হলেন ক্লাস রুমের বাহিরে অবধি স্টুডেন্ট দের ভীড় দেখে। এতো এতো স্টুডেন্ট, কিন্তু বিন্দুমাত্র শব্দ নেই! এইটুকুন, চব্বিশ-পঁচিশ বছরের এক যুবককে এতোটা মনে পুষে রেখেছে এরা!

মাত্র আড়াই মিনিটের ছোট্ট একটি স্পিচ। যেখানে অন্য সকলে বিভোর হয়ে শুনছে তা, ঠিক সেই মুহুর্তে তাক করে রাখা মোবাইলের ক্যামেরা নামিয়ে নিলো সায়েরী। “আমি থাকি বা না থাকি” এই ছোট্ট একটি বাক্য প্রবল প্রভাব ফেললো অষ্টাদশীর অন্তঃস্থলে। অসহ্যকর, দমবন্ধকর এক অনুভূতি যেনো গলা চেপে ধরেছে তার। সে এক পা, দুই পা পিছিয়ে গেলো। অতঃপর পুরোপুরি ঘুরে ত্যাগ করলো কক্ষ। কেউ দেখলো না, কারো নজর গেলো না তার দিকে। লক্ষ্য করলো কেবল সেই একজোড়া বাদামি মণির গাঢ় দৃষ্টি। প্রেয়সীর অমন আঁধার মুখশ্রীর কারণ জানে বলেই বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখালো না সে। আড়াই মিনিটের ছোট্ট স্পিচ টুকুর সমাপ্তি টানতেই ভেসে আসলো জোরালো করতালির শব্দ। সকলে ফের মত্ত হলো নিজ নিজ কার্যে। সাফওয়ান নামলো ধীর কদমে। দেখলো, বন্ধুদের রক্তিম আঁখি। নীতির সিক্ত গাল।

প্রিয় বন্ধুটার অনুপস্থিতির যন্ত্রণা টুকু তীব্র হলো পুণরায়। কলিজা টেনে ছিড়ে ফেলার মতো ব্যথা হচ্ছে অন্তরে। গলায় আটকে দম বন্ধকর কিছু অনুভূতি। কাছাকাছি এসেও একে অপরের সঙ্গে দৃষ্টি মিলাতে অক্ষম তারা। টমবয় স্বভাবের, উড়নচণ্ডী মেয়েটা ভাঙ্গলো সকলের পূর্বে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ডুকরে উঠলো আচমকা। দুইহাতে মুখ ঢাকল নিজের। সেই ক্রন্দনরত সুরে উপস্থিত তিন মানব রুদ্ধশ্বাস ফেলে। ঢোক গিলে নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের। নীতির কাঁধ জড়িয়ে, তাকে বুকে টেনে নিল সাফওয়ান। মেয়েটার কাঁধ ছুঁই ছুঁই চুল গুলোতে হাত বুলিয়ে দিল সান্ত্বনা স্বরূপ। কিছু বলতে চাইলো,কিন্তু সফল হলোনা। কন্ঠস্বর রোধ হয়ে আছে। তার কঠোর চোয়াল,আরক্তিম আঁখি দেখে অন্য দুই পাশ হতে ঝাঁপিয়ে পড়লো জিমন, রায়ান। কোন কথা নেই,কোন কান্নার সুর নেই। কিন্তু এই নিরবতা, নিরব আলিঙ্গন যেনো বুক ফাটা আর্তনাদের বহিঃপ্রকাশ। তিন বন্ধুর মাঝে ফুলের কলির মতো যত্নে, আশকারায় বেড়ে উঠা মেয়েটা এই যাত্রায় ক্ষীণ স্বরে আওড়াল,

‘ এই শেষ বছরটা কেনো সব কেড়ে নিলো? ‘
সাতটি শব্দ মাত্র। কিন্তু কত ভারী যে শোনালো তা। চারিদিকের ছাত্র-ছাত্রীদের ভীড়ের মাঝে চার বন্ধুর এমন ভেঙ্গে পড়া দৃশ্য খুব বেশি জনের নজরে পড়লো না। পড়লেও তারা ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পেরে চুপ রইলো। বিরক্ত করলো না তাদের। চার জনের ভাবনায় ছেদ পড়লো মোবাইলের রিংটোন শুনে। সাফওয়ানের মোবাইল বাজছে। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে আবরারের নাম। ভিডিও কল করেছে দেখে চার বন্ধু বেরিয়ে এলো অডিটোরিয়াম হতে। পথিমধ্যে কল রিসিভ করলো নীতি। করিডরের এক কোণায় দাঁড়িয়েছে তারা। নীতির ফুলোফুলো চোখ,মুখ দেখে আবরার সঙ্গে সঙ্গে বুঝে নিলো পরিস্থিতি। স্ক্রিনে নীতির পেছনে বাকি তিনজনকেও দেখা যাচ্ছে। নীতি ভাড় মুখে চেয়ে প্রশ্ন ছুড়ে,

‘ তোর না আজ আসার কথা ছিলো? আসলি না কেনো? ‘
বুক ফুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল আবরার। ক্ষীণ স্বরে আওড়াল, ‘ মন চাইনি,তাই। ‘
একই সঙ্গে কপাল কুঁচকে ফের বলে উঠলো,
‘ তোরা এমন অফ হয়ে আছিস কেনো? এমন দামড়ি ছেলে – মেয়ে কাঁদলে ভালো দেখায়? প্রোগ্রাম চলছে না! এনজয় কর.. ‘
ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে নীতি-সহ তিন বন্ধু। আবরারের কথা শেষ হওয়ামাত্র জিমন ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠে বললো,

‘ অভিনয়ে এখনো কাঁচা থেকে গেলি তুই। নিজে যে চোখ লাল করে রেখেছিস তা যেনো আমরা দেখছি না! তোর কলেজের প্রোগ্রামে নিজে তো উপস্থিত ছিলিই না। আবার আমাদের লেকচার দিচ্ছিস,শালা! ‘
অপ্রস্তুত হলো আবরার। সে নিজেও মন এবং ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কঠোর যুদ্ধে লিপ্ত ছিলো দীর্ঘক্ষণ। সময় কেটে গেছে ঠিক। কিন্তু ঐ যে মায়া। প্রিয় বন্ধুটার মায়া কাটিয়ে উঠা যে সম্ভব হচ্ছেনা। সম্ভব হবে কবে তাও তারা জানে না। মা, বাবা, ভাই, বোন, প্রিয় মানুষকে হারানোর কতশত গল্প লিপিবদ্ধ হয় চতুর্দিকে। কিন্তু বন্ধু হারানোর গল্প কেনো নেই? এই সম্পর্ক কি এতটাই ঠুনকো? এক লাহমায় ভুলে যাওয়ার মতো? তবে এই বন্ধুগুলো কেনো পারছে না ভুলতে? কবে কাটিয়ে উঠবে তারা মিহাদ নামক ছেলেটার শোক?

প্রোগ্রামের চলছে বিধায় অনার্স ভবনের দ্বিতীয়, তৃতীয় তলা প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে। চতুর্দিকের কোলাহল অবলোকন করে,জিমনকে সঙ্গে নিয়ে সাফওয়ান এগোলো লাইব্রেরি রুমের দিকে৷ ধারণা অনুযায়ী এই সময়টাতে লাইব্রেরি রুমে একটা কাকপক্ষী ও থাকবে না৷ থাকবে কেবল নির্দিষ্ট এক মানবী। যার মন খারাপের রেশ দূর করার উদ্দেশ্য এগিয়ে এসেছে সাফওয়ান। করিডরেই দাঁড়িয়ে পড়লো জিমন। কেউ আসবে না জেনেও সাবধানতার জন্য সাফওয়ান তাকে পাহারাদার হিসেবে রেখেছে। সাবধানের মার নেই।

গুমোট নিস্তব্ধতায় ঘেরা লাইব্রেরি রুম। বিশাল বিশাল বুকসেল্ফ গুলোর জন্য কাঙ্ক্ষিত রমনীর দেখা পাওয়া মুশকিল। সাফওয়ান এগোলো নিঃশব্দে। কয়েকটি বই ভর্তি সেল্ফ অতিক্রম করতেই দেখা মিললো প্রেয়সীর। উত্তর দিকের খোলা জানালার প্রান্ত ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। দেখা যাচ্ছে মুখের একাংশ। সফেদ ইউনিফর্মের উপর ডান কাঁধে ঝুলছে লম্বা বিনুনি। ভার মুখশ্রীটি অবলোকন করে সাফওয়ান এগিয়ে গেলো তার কাছাকাছি। দাঁড়ালো ঠিক ঠিক মেয়েটার পিঠ ঘেঁষে। জেন্টস পারফিউমের সু-পরিচিত সুঘ্রাণ টুকু নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করতেই বুক ভরে শ্বাস টানল সায়েরী। অনুভব করলো পিঠের সঙ্গে ইস্পাত কঠিন বক্ষটির উপস্থিতি। তার কোমল উদরে বেশ আবলীলায় চেপে বসলো মানবটির পোক্ত হাত৷ নিরবতা ছেদ করে শোনা গেল তার শীতল কন্ঠ, ‘ মন খারাপ? ‘

সায়েরীর মন আসলেই ভীষণ খারাপ। পরপর দুই রাতে বেশ উদ্ভট, অশুভ এক স্বপ্ন দেখেছে সে। স্বপ্নের শুরুটা অবশ্য বেশ রোমাঞ্চকর ছিলো। সবুজ পাহাড়ি অঞ্চলে, এক কুয়াশাজড়ানো ভোরে নগ্ন পায়ে সাফওয়ানের হাত ধরে হাঁটছিল সে। গায়ে জড়ানো সাফওয়ানের দেওয়া সেই গোল্ডেন শাড়িটি। অন্যদিকে সাফওয়ান পরেছিল সফেদ শার্ট। ভোরের নির্মল কুয়াশার সঙ্গে সাফওয়ানের এমন সফেদ অবয়ব কেমন মিলেমিশে যাচ্ছিলো। এবং একটা সময় ঠিকই মিলিয়ে গেল। সায়েরীর হাত ধরে রাখা ঐ পোক্ত হাত ছুটে গেল। বলিষ্ঠ, লম্বাটে দেহটা চোখের পলকে হাওয়া হয়ে গেল ধোঁয়ার সঙ্গে। সায়েরী কতো করে ডাকল তাকে! নির্জন সেই অঞ্চলে একাকী দাঁড়িয়ে কতো আহাজারি করছিলো মেয়েটা! কিন্তু সাফওয়ান ভাই ফিরেনি। কেমন নিষ্ঠুরের মতো হাসতে হাসতে তাকে একা রেখে গায়েব হয়ে গেল! কীভাবে পারলো সায়েরীকে একা রেখে যেতে? মেয়েটার এতো এতো আহাজারিতে-ও কেনো ফিরলো না সে! কেনো-ই বা দেখলো এই স্বপ্ন! কি তার মর্মার্থ?

বলবে ভেবেও উক্ত স্বপ্নের কথাটা সে চেপে গিয়েছে। এমন অশুভ স্বপ্নের বিবরণ মুখেও আনতে চাচ্ছে না সে। স্বপ্নে দেখা নিজের আহাজারি সব এখনো কানে বাজে যেন। ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠে তখন! আজ সাফওয়ানের দেওয়া বক্তব্যে “আমি থাকি বা না থাকি” কথাটা শুনে স্বপটা আবারো মস্তিষ্কে হামলা দিয়েছে তার। এজন্যই এমন নিভে গিয়েছে মেয়েটা। অদ্ভুত অশান্তি লাগছে বুকে। এক সাফওয়ান ভাইয়ের উপস্থিতি ব্যতীত অন্য কিছুতেই মন গলছে না আজকাল। কি যে হচ্ছে কে জানে!
সায়েরীকে এমন ভাবনায় ডুবে থাকতে দেখে ভ্রুঁ কুঁচকালো সাফওয়ান। উদরে রাখা হাতখানায় জোর ঢেলে মেয়েটাকে জড়িয়ে নিল নিজের সঙ্গে। নরম সুরে ডাকলো, ‘ সুবহা! ‘
সায়েরীর ঘোর কাটে তৎক্ষনাৎ। প্রসস্থ, বলিষ্ঠ বক্ষপটে নিজ তনুর সবটুকু ভর ঢেলে কিঞ্চিৎ মাথা উঁচিয়ে তাকালো সে। উল্টো ভাবে দেখা যাচ্ছে সাফওয়ানের স্নিগ্ধ, সুদর্শন মুখশ্রী। স্বচ্ছ বাদামী চোখজোড়ায় দৃষ্টি মিলতেই স্বভাবগতভাবে আড়াআড়ি ভ্রুঁ নাচালো সাফওয়ান। ডান হাত বাড়িয়ে শক্ত করে গাল টানলো সায়েরীর। শীতল সুরে আওড়াল,

‘ এগুলোর সমস্যা কি? কথায় কথায় ফুলে যায় কেনো? ‘
কথাটার প্রতিউত্তর মিলে না কোনো। বরং মেয়েটা ঘুরে দাঁড়ায়। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অবলোকন করে প্রেমিক পুরুষের উষ্ণ বেশভূষা। সাফওয়ানের গায়ে জড়ানো ধূসর বর্ণের জ্যাকেটের আধখোলা চেইনটা পুরোপুরি খুলে ফেললো সে। অতঃপর, বড় সাচ্ছন্দ্যে দুহাত গলিয়ে দিলো জ্যাকেটের মাঝে। উষ্ণ বুকটাতে মিশে গেলো তার কোমল তনু। প্রেয়সীর এমন নিরবতায় বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেললো সাফওয়ান। জ্যাকেটের দুই ধার দিয়ে সায়েরীর ছোট খাটো দেহশ্রী সম্পূর্ণ ঢেকে নিলো সে। মেয়েটা পুরোপুরি গুটিয়ে গেলো তার বক্ষ ভাঁজে। গোলগাল, আঁধার মুখশ্রীটির পানে তাকিয়ে সায়েরীর মাথায় থুতনি ঠেকাল সাফওয়ান। বললো,

‘ ভাব দেখে মনে হচ্ছে আমি দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি! সত্যি সত্যি চলে গেলে তোমাকে তো খুঁজেও পাওয়া যাবে না। ‘
অকস্মাৎ বুকের ভিতরটা কেমন ধ্ব্‌ক করে উঠলো সায়েরীর। তৎক্ষনাৎ মাথা উঁচু করলো সে। সাফওয়ানের এই রসিকতা কেন জানি বিন্দুমাত্র পছন্দ হলো না মেয়েটার। রাগ লাগলো,অভিমান হলো,কষ্ট ও পেলো কিঞ্চিৎ। ফলস্বরূপ, স্বভাব অনুযায়ী শক্ত এক খামচি বসালো সাফওয়ানের চওড়া পিঠে। তেজস্বী স্বরে বললো,
‘ আপনি সাহস করে তো দেখুন। একেবারে জানে মেরে ফেলবো। ‘

পাতলা টি-শার্ট ভেদ করে চামড়ায় লেগেছে নখের আঁচড়। তুচ্ছ ব্যথায় কপাল কুঁচকালো সাফওয়ান। পরমুহূর্তেই তার বুক কাঁপলো শব্দহীন হাসির তালে। চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে থাকা মায়াবী চেহারার অধিকারীনি মেয়েটার দিকে ঝুঁকে আসলো সে। একহাতে পিঠ জড়িয়ে, অন্য হাতে পুণরায় সায়েরীর মাথাটা চেপে ধরলো বুকের বাম পাশটায়। সায়েরী ডুবে গেলো উষ্ণ বুকটাতে। কর্ণগোচর হলো প্রেমিক পুরুষটার বক্ষস্পন্দনের ধুকপুক ধুকপুক নিস্বন। এক গভীর আবেশে চোখ বুজলো মেয়েটা। পরপরই কানে আসলো সাফওয়ানের শীতল কন্ঠ,
‘ যাবো না। কোথাও যাবো না। এখনো যে আমাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। এভাবেই থাকবো। তোমার কাছে, তোমার সংস্পর্শে, তোমাকে বুকে মিশিয়ে। ‘

সায়েরী চোখ বুজে রয়েছে। প্রেমিক পুরুষটার এই সাধারণ স্বীকারোক্তিতে গত কয়েকদিনের অস্থির হৃদয়ে এক টুকরো শীতলতা বয়ে গেলো বোধহয়। নিমেষেই চিত্ত চনমনে হয়ে উঠলো মেয়েটার। জড়িয়ে রাখা অবস্থাতেই সে মুখ তুললো। থুতনি টুকু সাফওয়ানের বুকে ঢুবিয়ে রেখে মায়াময়ী দৃষ্টি তুলে তাকালো সাফওয়ানের দিকে। এহেন দৃষ্টিতে সাফওয়ানের কপালে ভাঁজ পড়লো। সন্দিহান কন্ঠে শুধালো,
‘ এখন আবার কোন দুষ্টুমি মাথায় ঘুরছে? ‘
সায়েরীর হাসি পেলো একথায়। এই ছেলে তাকে হাড়ে হাড়ে মুখস্থ করে ফেলেছে একদম! ফন্দি এঁটেও লাভ নেই,ধুর! হাসিটুকু বহু কষ্টে চেপে রেখে সে বেশ আহ্লাদী কন্ঠে বললো,

‘ আপনি সেদিন বলেছিলেন “শেয়ার ইস্যু” চ্যাপ্টারের সব বোর্ড কুয়েশ্চন সলভ করতে পারলে ঘুরতে নিয়ে যাবেন। এগারো দিন হয়ে গেলো, এখনো কোথাও নিয়ে যান নি। ‘
একথা শোনামাত্র বাঁধন আগলা করলো সাফওয়ান। চোরচোর ভাব স্পষ্ট ফুটে উঠেছে চেহারায়। এড়িয়ে যেতে চাইলে, তার জ্যাকেট খামচে ধরে সায়েরী। নাছোড়বান্দা কন্ঠে বলে,
‘ আবার পালাই পালাই করছেন! আপনার সঙ্গে থাকতে থাকতে আমাকেও রোবট বানিয়ে ফেলছেন একদম। শুধু পড়ো,পড়ো আর পড়ো। প্রেম করছি, না কি ছাতার মাথা করছি খোদা জানে। আমি কালকেই ঘুরতে যাবো। আগামীকাল ভোরে। এক ঘন্টা হোক বা আধ ঘন্টা৷ কালকে মানে কালকেই। ‘
সাফওয়ানের দৃষ্টি ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে সিলিংয়ের ডানে বামে। ভাবখানা এমন যেনো সায়েরী নামক কোন রমনীর অস্তিত্ব নেই আশেপাশে। শুনেইনি তার কথা। এমন ভাব দেখে অতিষ্ঠ হয়ে দাঁতে দাঁত পিষল মেয়েটা। জ্যাকেট খামচে কাছে টানলো তাকে। অসন্তুষ্ট গলায় চেঁচিয়ে উঠলো,

‘ সাফওয়ান ভাই!!! শুনছেন না কেনো আমার কথা? ‘
সাফওয়ান নিজের চোখ খিচে৷ বাম কানে তর্জনী ঢুকিয়ে নেড়ছেড়ে বলে,
‘ চেয়ারে দাঁড়িয়ে বলো। তোমার শব্দ আমার কান অবধি পৌঁছাচ্ছে না তো! ‘
আবার অপমান! তা-ও কিনা সায়েরীর হাইট নিয়ে! মেয়েটা রেগেমেগে বোম হলো এবারে। অপটো হাতে এক ধাক্কা দিলো সাফওয়ানের বুকে। কিন্তু অটল দেহটি বিন্দুমাত্র টললো না৷ তা দেখে আরও রাগলো রমনী। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

‘ কথা দিয়ে কথা রাখতে না পারলে বলেছিলেন কেনো? আবারও আমার নাজুক মনটা ভেঙ্গে দিলেন। আপনার টাও এভাবে ভাঙ্গলে তখন বুঝবেন কেমন লাগে। ‘
প্রতিউত্তর টুকু শুনে অধর কোণ প্রসারিত হলো সাফওয়ানের। ঘাড় কাত করে তাকাল সে। ভ্রুঁ নাচিয়ে শুধালো,
‘ আমার মন ভাঙ্গবে? আদৌ সেটার নাগাল পাও তুমি? ‘
আবার! আবারো হাইট নিয়ে অপমান করছে! তীব্র রাগে কিড়মিড়িয়ে উঠলো মেয়েটা। সাফওয়ান দেখলো ঐ বোচা নাকের পাটা কেমন ফুলেফেঁপে উঠছে। স্লিভ গুটিয়ে রাখা পুরুষালি হাতের পিঠে এক শক্ত খামচি বসালো মেয়েটা। সাপের মতো হিসহিসিয়ে উঠে বললো,

‘ আপনার সঙ্গে আর কোন কথা নেই৷ চিকন মাথা ওয়ালা, লম্বা হাইটের কোন একটা শাকচুন্নি খুঁজে নিন গিয়ে। একদম আমার পিছে আসবেন না। ‘
ছোট খাটো দেহশ্রীর অধিকারী রমনী ধুপধাপ পায়ে টেবিলের কাছে এগিয়েছে। ছটফটে স্বাভাব অনুসারে ব্যাগ তুলে নিচ্ছে। ঠোঁটের কোণে দুর্লভ হাসি চেপে সেদিকে এগিয়ে গেলো সাফওয়ান। মেয়েটা তা দেখেও অগ্রাহ্য করলো। ব্যাগ কাঁধে তুলে প্রস্থান করতে চাইলো দ্রুত। কিন্তু পারলো কই? তার নাজুক দেহশ্রী বিনা আবেদনে বাঁধা পডলো বলিষ্ঠ, পেশিবহুল দুই বাহুর মাঝে। পৃষ্ঠদেশ মিলিয়ে গেল সুডৌল বক্ষপটে। তীক্ষ্ণ থুতনি এসে ঠেকেছে মেয়েলি কাঁধে। সায়েরী ছটফট করে, গাল ফুলিয়ে রাখে। তীব্র অভিমানী কন্ঠে বলতে চাইলো কিছু৷ কিন্তু পূর্বেই কানে বাজল সাফওয়ানের শীতল স্বর,

‘ আগামী পরশু নিয়ে যাবো। বড় জোর দুই ঘন্টা। কলেজ টাইমে ফিরে আসতে হবে। মঞ্জুর? ‘
সায়েরী যেনো জানতো, এমনই হবে। কিন্তু তা-ও নারাজি ধরে রাখল সে। কোনো জবাব দিল না। নড়লো ও না। সাফওয়ান কয়েক সেকেন্ড নিরবে অপেক্ষা করলো তার প্রতিউত্তর শোনার জন্য৷ কিন্তু শুনতে না পেয়ে ওই অভিমানী, ফুলো গালে নিজ গাল মিলিয়ে নিল সে। বললো,
‘ অফার কিন্তু সীমিত সময়ের জন্য। এক্ষুনি জবাব না দিলে পরে আর বলে লাভ হবে না। ‘
ফুঁস করে শ্বাস ফেললো সায়েরী৷ অসন্তুষ্ট গলায় বললো,
‘ আপনি সব সময় এমন করেন কেনো? ‘
‘ কেমন করি? ‘
‘ শুধু শুধু রাগিয়ে দেন কেনো? ‘
‘ তুমি শুধু শুধু রেগে যাও কেনো? ‘
‘ রাগবো না কেনো! আমার হাইট,ওয়েট,নাক, গাল সব নিয়েই মজা করেন কেনো? ‘
‘ মিথ্যে তো বলিনি। ‘

‘ হ্যাঁ তো এতো সত্যবাদী হতে কে বলেছে? আপনি..আপ..না মানে আপনার এই সুপার শার্প নাকটা দেখতে যে স্নো হোয়াইট মুভির এ্যাভিল কুইনের মতো, তা কি আমি বলেছি? বলিনি তো! তাহলে আপনি বলবেন কেনো? ‘
সাফওয়ানের মুখের মিটিমিটি হাসিটুকু ধপ করে নিভে গেল। দারুণ আশ্চর্য হয়ে মুহুর্তেই সোজা হয়ে গেল ছেলেটা। সায়েরীকে ছেড়ে আনমনে হাত চাপলো নাকে। এ্যাভিল কুইন! ওই ভয়ংকর পেত্নীর সরু নাকটার মতো তার নাক! একথা আদৌ মানা যায়! কই, এত গুলো বছরে কেউ তো কখনো বললো না। তার সুদর্শন মুখশ্রীর প্রতিটি অংশ বেশ নিখুঁত। বিন্দুমাত্র অসুন্দর্য নেই কিছুতে। তাহলে মেয়েটা এসব কি বললো! চরম আশ্চর্য হয়ে মাথা নিচু করলো সাফওয়ান। তার বুকে মাথা রেখে বজ্জাত মেয়েটা মিটিমিটি হেসে তাকিয়ে আছে। সাফওয়ান’কে এমন ভাবতে দেখে সায়েরী বেশ মজা পেলো। আপনমনে বিড়বিড় করলো,

‘ খুব না আমাকে নিয়ে মজা নেওয়া? এই তো একটু বাজিয়ে দিলাম। এবার দেখো কেমন লাগে খান সাহেব। ‘
এ্যাভিল কুইনের কথাটা নিতান্তই অযৌক্তিক। সায়েরী নিজেও জানে সাফওয়ানের কোন কমতি সে বের করতে পারবে না। এই সুদর্শন মুখখানার তো নয়-ই। কিন্তু তবুও এই মুহুর্তে মাথায় যা এসেছে তা উগলে দিয়েছে সে। এবং সাফওয়ানকে আশ্চর্য করতে পেরে দারুণ পুলকিত অনুভব করছে। দুই কাঁধে ব্যাগ তুলে নিয়ে সে দাঁত কেলিয়ে হাসলো। বললো,

‘ আগামী পরশু তাহলে ঘুরতে নিয়ে যাবেন। আমি এখন আসি হ্যাঁ, টাটাহ! ‘
বেশ উৎফুল্ল চিত্তে, হেলেদুলে দরজার দিকে কদম বাড়ালো সে৷ সাফওয়ান সেদিকে ধ্যান না দিয়ে পাশ হতে চেয়ার টেনে বসলো। এ্যাভিল কুইনকে চেনা আছে তার। তাও এই মুহুর্তে একটু দেখা প্রয়োজন। সে ব্যস্ত হাতে মোবাইল বের করলো। ঠিক সেই মুহুর্তে পুণরায় হুড়মুড়িয়ে ফিরে আসলো সায়েরী। সাফওয়ান বসে থাকা স্বত্তেও বেশ লম্বা দেখাচ্ছে তাকে। চেয়ারের পেছন হতে মুখখানা দেখতে না পেয়ে সাফওয়ানের চেয়ারের দুই দিকে ভর দিয়ে, পায়ের পাতা উঁচু করে, নিজের উচ্চতা বাড়ানোর চেষ্টা করলো সায়েরী। তার কান্ড দেখে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল সাফওয়ান৷ মাথাটা চেয়ারের সঙ্গে মিলিয়ে, চোখ তুলে তাকিয়ে বললো,
‘ আবার কি চাই? আমার চোখ দেখতে স্লিপিং বিউটি মুভির মি.বিস্টের মতো, এটা বলতে এসেছো? ‘
সায়েরী সোজা হয়ে দাঁড়াল এবারে। সাফওয়ানের কথাটা শুনে পেট ফেটে হাসি আসতে চাইলো। কত কষ্টে যে তা চেপে রাখলো সে! কোমল দুই হাতে পেছন থেকেই সাফওয়ানের গলা জড়িয়ে ধরলো। খানিকটা আশ্চর্য হওয়ার ভান করে বললো,

‘ এটাই তো বলতে এসেছিলাম। আপনি কীভাবে জানলেন? ‘
সাফওয়ান গম্ভীর চোখে তাকায়। অসন্তুষ্ট গলায় শাসায়, ‘ সুবহা!! ‘
ফিক করে হেসে ফেললো সায়েরী। নিজের মুখশ্রী নামিয়ে আনলো সাফওয়ানের উল্টো মুখখানার কাছাকাছি। চোখে চোখ রেখে বললো,
‘ মি. বিস্ট কিন্তু আমার মোস্ট ফেভারিট ক্যারেক্টর। আর তার চোখগুলো! ওই বাদামি চোখের গাঢ় চাহনিতে আমার বুকে ভূমিকম্প হয়, তোলপাড় ঘটে। ‘
একটু থেমে ফের থেমে থেমে বলে,
‘ আ-আই লাভ দোস ব্রাউন আইস.. ‘

সাফওয়ানের ঠোঁটের কোণ ঘেঁষে চমৎকার এক হাসি ফুটে। এই মিষ্টি স্বীকারোক্তি টুকু মি.বিস্টের নাম দিয়ে চালিয়ে দেওয়ার পন্থাটা বেশ মনে ধরেছে তার। সে নিরব চোখে তাকিয়ে রইল অনেক্ষন। এমন প্রগাঢ় চাহনির কবলে পড়ে সবসময়ের মতো হাঁসফাঁস করে উঠলো সায়েরী। চট করে হাত দিয়ে ঢেকে দিল সাফওয়ানের দুই চোখ। লজ্জা মিশ্রিত, মিহি স্বরে আওড়াল,
‘ উঁহ-হু! এভাবে তাকাতে নিষেধ করেছি না? ‘
সাফওয়ান এবারে ক্ষীণ শব্দে হাসলো। চোখ থেকে সায়েরীর হাত সরিয়ে বুকে চেপে ধরলো তা। পূর্বের মতো তাকিয়েই জানতে চাইল,
‘ কি বলতে এসেছিলে? ‘

সায়েরী লজ্জা ফেলে নিমেষেই আবার চঞ্চল হয়ে উঠলো। প্রফুল্ল চিত্তে শুধালো,
‘ ইরাপু মাহবীরের আকিকাতে ইনভাইট করেছে৷ আপনি..না মানে আপনি যাবেন তো? ‘
‘ না গেলে কি তুমি যাবে না? ‘ ভ্রুঁ নাচালো সাফওয়ান।
‘ খুব যাবো। বীর কে সেদিনের পর আর দেখিইনি। কোলেও নিতে পারিনি। আপনি না গেলেও যাবো। ‘
সায়েরীর উচ্ছ্বসিত মুখশ্রী দেখে মনে মনে হাসলো সাফওয়ান। বললো, ‘ যাবো। সাফাও যাবে। ‘
‘ জানি তো। কিন্তু গিফট নিবো কখন? ভাইয়ার টা আলাদা। আমি আমার তরফ থেকে ওর জন্য গিফট নিবো। শপিংয়ে নিয়ে যাবেন? ‘
মাথা দুলিয়ে সায় জানালো সাফওয়ান। সায়েরী বেশ সন্তুষ্ট হলো উত্তর পেয়ে। ফিরার উদ্দেশ্যে সাফওয়ানের কাছ থেকে সরে আসতে উদ্যত হলে, পুণরায় বাঁধা পেলো। ডান গাল শক্ত করে টেনে ধরেছে সাফওয়ান। ব্যথায় অস্পষ্ট শব্দ করলো সায়েরী।

‘ উমম..ব্যথা পাই! ‘
সাফওয়ান হাতের জোর কমালো,কিন্তু গাল ছাড়লো না। গম্ভীর চোখে চেয়ে পুণরায় কাছে টেনে আনলো মেয়েটাকে। গালে আদুরে স্পর্শ বুলিয়ে আদেশ দিলো,
‘ নেভি ড্রেস টা পড়বে। ‘
‘ ওয়ানা সি ইউ ইন দিস ব্লু ড্রেস, সুইট চিকস! ‘

এই আদুরে, নতুন সম্বোধন টুকু শুনে গাল জোড়া উষ্ণ হয়ে উঠলো সায়েরীর। অবশ্য পূর্বেও দুইবার শুনেছিলো এই ডাক। প্রথমবার ডেকেছিলো এক ভোর সকালে। সায়েরীর ঘুম ভাঙ্গছে না দেখে ফোনের অপর প্রান্ত হতে ভেসে এসেছিলো আদুরে কন্ঠের এই ডাকটুকু। তৎক্ষনাৎ সায়েরীর ঘুম জানলা দিয়ে পালিয়েছিলো। এই যে তৃতীয় বার শুনলো, এবারেও ভারী লজ্জা পেলো মেয়েটা। ডানে বামে তাকিয়ে চট করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। নিজের লজ্জা টুকু লুকিয়ে আচমকা এলোমেলো করে দিলো সাফওয়ানের ঝরঝরে চুলগুলো। পালিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে বলে গেল,
‘ আপনিও তবে নেভি টি-শার্ট টা পড়বেন, এ্যাভিল কিং। টুইনিং করবো, কেমন? ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৯

চুল এলোমেলো হওয়ামাত্র চট করে সোজা হয়ে বসলো সাফওয়ান। চুলে ঘেটে দেওয়ার ব্যাপারটা তার একেবারে অপছন্দ। এবং এই অপছন্দের কাজ গুলোই করে বজ্জাত মেয়েটা। এইমাত্র সায়েরীর দুষ্টুমিতে তৎক্ষনাৎ সোজা হওয়ামাত্র গমগমে গলায় চেঁচিয়ে উঠলো সাফওয়ান, ‘ সুবহা!!! ‘
দরজার অপর পাশ হতে খিলখিল শব্দের হাসি ভেসে এলো। এবং মিলিয়েও গেলো অতি দ্রুত। সাফওয়ান বিরক্ত মুখে নিজের চুলে হাত চালায়। কানে বাজে সায়েরীর শেষ কথাটা। সহসা নাকে আঙ্গুল ছুঁয়ে দিল সে। বিড়বিড় করে আওড়াল,
‘ এ্যাভিল কুইন! সিরিয়াসলি? ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭২