কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ৯
মুনমুন বুড়ি
মিহির কথায় অভ্র হো হো করে হেসে ওঠে। অভ্রর হাসি শুনে মিহি অভ্রর দিকে চোখ তুলে চায়। বিরক্তিকর কণ্ঠে বলে—
— আপনি হাসছেন কেন, আমি হাসির কী বলেছি।
অভ্র নিজের হাসি থামিয়ে মিহির সামনে হাটু গেড়ে বসে। মিহির থুতনিটা দুই আঙুলের সাহায্যে তুলে বলে—
— তুই খুব বোকা মিহি। এত ঢিলা কিভাবে হলি তুই। তোকে দেখে আমার মাঝে মাঝে মায়া হয় জানিস?
মিহি অভ্রর কথা কিছু বুঝতে পারছে না। অভ্রর দিকে তাকিয়ে প্রশ্নাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। অভ্র মিহির দৃষ্টি বুঝতে পেরে বলে—
— তুই কৌশিকের ওয়াইফ?
মিহি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়।
অভ্র পুনরায় কুটিল হেসে ওঠে। গাঢ় কাত করে জিজ্ঞেস করে—
— তুই শিউর তো?
মিহি এবার তেতে উঠে বলে—
— আপনি সবসময় একই প্রশ্ন কেন করেন। আমি বলছি তো আমার সাথে কৌশিকের বিয়ে হয়েছে ৪ মাস আগে।
অভ্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করে—
— তোদের বিয়ের কোনো প্রুভ আছে?
মিহি উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বলে—
— হ্যাঁ। আমাদের বিয়ের কাবিন নামা কৌশিকের কাছে আছে।
অভ্র ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে—
— ওগুলো রিয়েল তো?
মিহি অবাক হয়ে বলে—
— মানে?
অভ্র উঠে দাঁড়িয়ে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বলে—
— চল তোকে একটু ফ্ল্যাশব্যাকে নিয়ে যাই।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ফ্ল্যাশব্যাক
মিহি এবার ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছে। কলেজ শেষ করে এখন বাড়ি ফিরছে। মিহি সাথে প্রতিদিন মিহির ফ্রেন্ড স্নেহা থাকলেও আজ স্নেহা কলেজে আসেনি, তাই মিহিকে একাই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। এখন দুপুর ২টা বাজে। এই সময় এই দিকের রাস্তাটা শুনশান জনমানবহীন থাকে। অন্যদিন স্নেহার সাথে থাকায় মিহির ভয় লাগেনি। আজ একা হওয়ায় মিহির ভয় করছে। ফলস্বরূপ মিহি পা চালিয়ে হাঁটছে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মিহির মনে হলো মিহির পিছনে কেউ আছে। মিহি পিছনে ফিরে দেখে কেউ নেই। মনের ভুল ভেবে সামনে দিকে হাঁটা দেয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার মনে হয় মিহির পিছনে কেউ আছে। মিহি এবারও পিছনে ঘুরে কাউকে দেখতে পায় না। কিছুক্ষণ পর আবার মনে হয় কেউ পিছনে আছে। এবার মিহি শিওর হয় কেউ মিহিকে ফলো করছে।
মিহি কোনো উপায় না পেয়ে দিকবিদিক শূন্য হয়ে দৌড়াতে থাকে। পিছন থেকে কিছু কালো পোশাকধারী লোকও মিহির পিছনে পিছনে দৌড়াতে থাকে। মিহি দৌড়াতে দৌড়াতে একটা কালো গাড়ি দেখতে পায়। একটু আশার আলো দেখে সে গাড়ির দিকে ছুটে যায় মিহি। গাড়ির সামনে এসে দেখে গাড়ির কাচ নামানো আর ভিতরে ড্রাইভিং সিটে একজন লোক বসে আছে। মিহি জানালার কাছে গিয়ে অনুরোধ এর সুরে বলে
— ভাইয়া ভাইয়া প্লিজ আমাকে বাঁচান। আমাকে কিছু লোক তারা করেছে। ওই তো ওরা আসছে।
কথাটা বলে মিহি পিছনে তাকালে দেখে পিছনে এতক্ষণ ধরে দৌড়াতে থাকা লোকগুলো নেই। মিহি অবাক হয়। অবাকতার সুরে বলে—
— লোকগুলো কোথায় গেল?
মিহি আশ্চর্য হয়ে সামনে তাকিয়ে গাড়িতে থাকা লোকটাকে কিছু বলতে যাবে, তখনই দেখে গাড়িতে থাকা লোকটা বিচ্ছিরি ভাবে হাসছে। মিহির বুঝতে বাকি রইল না এই লোকটাও ওদেরই দলভুক্ত। মিহি পুনরায় পালাতে যাবে, তখনই ৩–৪টা লোক ওকে টেনে ধরে আর মিহিকে টেনে হিচড়ে গাড়িতে তুলতে চায়। মিহি বাঁচার জন্য প্রাণপণে চিৎকার করতে থাকে। কিন্তু কেউ আসে না। শেষমেশ যখন ওরা প্রায় মিহিকে গাড়িতে তুলে ফেলছিল, তখনই দূর থেকে ভেসে আসে একটা পুরুষালী কণ্ঠ—
— কুত্তার বাচ্ছা ছাড় ওকে।
মিহি শুধু ওই লোকগুলোর সামনে তাকিয়ে দেখে কৌশিক রক্তচোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে। মিহি কান্নারত কণ্ঠে বলে—
— কৌশিক আমাকে বাঁচাও প্লিজ।
কৌশিক তেড়ে আসে লোকগুলোর দিকে। কৌশিক লোকগুলোর কাছে আসার আগেই সেখানে আরও কিছু লোক চলে আসে আর মিহির উপর হামলা করা লোকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুই পক্ষের ধস্তাধস্তির মাঝেই কৌশিক মিহির কাছে আসে। মিহির আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করতে করতে বলে—
— মনি তোমার কোথাও লাগেনি তো? ওরা তোমাকে কিছু করেছে?
মিহি কৌশিকের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কৌশিকের হাত ধরে টানতে থাকে। কৌশিক মিহির মতিগতি বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করে—
— মনি কী করছো? টানছো কেন আমাকে এইভাবে।
মিহি দেরি না করে বলে ওঠে—
— এখান থেকে তাড়াতাড়ি চলুন। ওরা না হলে আবার আমাদের অ্যাটাক করবে। আপনি আসুন তাড়াতাড়ি প্লিজ।
কৌশিক মিহিকে শান্ত করতে চেয়ে বলে ওঠে—
— তুমি একটু শান্ত হও মনি। কিছু হবে না, আমি আছি না কিছু হবে না, তুমি আমার সাথে আসো।
কৌশিক মিহিকে নিয়ে কৌশিকের গাড়ির সামনে নিয়ে আসে যেখানে প্রত্যুষ আগে থেকে ছিল। কৌশিককে আসতে দেখে প্রত্যুষ গাড়ি থেকে নেমে জিজ্ঞেস করে—
— স্যার আপনি ঠিক আছেন?
কৌশিক হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানিয়ে বলে—
— হ্যাঁ ঠিক আছি আমি। আর তুমি চলে যাও। মনির উপর কারা অ্যাটাক করেছে আমাকে সব ডিটেইলস এনে পাঠাও।
প্রত্যুষ আমতা আমতা করে বলে—
— কিন্তু স্যার আপন…
প্রত্যুষকে শেষ করতে না দিয়ে কৌশিক বলে
— আমার একটা কাজ আছে খুব ইম্পর্ট্যান্ট। তুমি যাও এখন।
কৌশিকের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে কৌশিক কতটা সিরিয়াস, তাই প্রত্যুষ আর ঘাঁটালো না। কৌশিকের কথায় সায় জানিয়ে ওখান থেকে চলে গেল।
কৌশিক মিহিকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। পাশ থেকে জলের বোতল মিহিকে দিল। মিহি এখনো ভয় পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ও আগে কখনো পড়েনি, তাই এখনো আতঙ্কে আছে। কৌশিক মিহির অবস্থা বুঝতে পেরে শান্ত সুরে মিহিকে বললো—
— মনি জলটা খাও।
মিহি কৌশিকের কথা শুনে জলটা খেয়ে নিল।
কৌশিক পুনরায় জিজ্ঞেস করলো—
— মনি ঠিক আছো তুমি?
মিহি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো।
কৌশিক কিছুক্ষণ মিহির দিকে তাকিয়ে বললো—
— মনি তোমাকে একটা প্রশ্ন করবো?
মিহি কৌশিকের দিকে তাকিয়ে গাঢ় কাত করে সম্মতি দেয়।
কৌশিক জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস নিয়ে বলে—
— বিয়ে করবে আমায় মনি।
কৌশিকের কথায় মিহি ভ্রু কুঁচকে তাকায়। মিহির কাছে এটা নতুন কিছু লাগল না, এর আগেও দু’জনের মধ্যে এই বিষয় নিয়ে অনেক কথা দেওয়া–নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন হঠাৎ কৌশিক এই প্রশ্ন কেন করলো, বুঝতে পারছে না মিহি।
মিহি কৌশিককে জিজ্ঞেস করে—
— তুমি হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন করছো?
— মনি, তুমি বলো আমাকে বিয়ে করবে কিনা?
— আমাদের বিয়ে তো এমনিতেই ঠিক হয়ে আছে কৌশিক। ইন্টার-এর পরে আমাদের তো বিয়ে হচ্ছেই, তাহলে তুমি হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন করছো?
— ইন্টার-এর পরে নয়, এখনই, এই মুহূর্তে বিয়ে করতে পারবে আমাকে?
মিহি কৌশিকের কথায় অবাক হয়ে যায়। কোনো উত্তর দিতে পারছে না মিহি।
কৌশিক মিহিকে চুপ থাকতে দেখে বলে—
— কী হলো মনি, চুপ করে আছো কেন? উত্তর দাও।
— এখনই কেন বিয়ে করবো কৌশিক? আমাদের পরিবার তো সবকিছু মেনে নিয়েছে, তাহলে এইভাবে পরিবারের অগোচরে কেন বিয়ে করবো?
— কারণ আমি তোমাকে নিয়ে কোনো রিস্ক নিতে চাই না। তুমি দেখেছো তোমার উপর কীভাবে অ্যাটাক হলো আজ। আজ যদি আমি ঠিক সময়ে না আসতাম, তাহলে তোমার কী হতো মনি? আমি তোমাকে হারাতে পারবো না মনি। আমি মরে যাবো। প্লিজ তুমি আমার কথায় রাজি হয়ে যাও।
মিহি কৌশিকের কথায় বিরোধ করে বললো—
— কৌশিক তুমি শান্ত হও। অ্যাটাক হলে এমনিতেই হবে। এর সাথে বিয়ের কী সম্পর্ক আছে?
— আমার মনে হচ্ছে তোমার উপর কোনো খারাপ মানুষের নজর পড়েছে। ও তোমাকে আমার থেকে কেড়ে নিতে চায়। তোমাকে আমার কসম মনি, এখন এই মুহূর্তে আমাদের বিয়ে হবে। এর পরে যদি তুমি না করো, তাহলে আমার কিছু বলার নেই।
কৌশিকের কথায় মিহি চুপ করে যায়। বুঝতে পারছে না কৌশিক এমন কেন করছে। শেষমেশ মিহি কৌশিকের সাথে না পেরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
কৌশিক মিহির নিরবতাকে সম্মতি ধরে গাড়ি স্টার্ট দেয়।
ঠিক তখনই, কেউ একজন দূর থেকে কাউকে কল করলো।
ফোন রিসিভ হওয়া মাত্র লোকটি গড়গড় করে বললো—
— স্যার, ওরা কোথাও যাচ্ছে।
বিপরীত পাশ থেকে জবাব এলো—
— ফলো দেম।
কথাটা বলা মাত্রই ফোন কেটে গেল।
কৌশিকের গাড়ি কাজী অফিসের সামনে এসে থামে। কৌশিক মিহির দিকে তাকিয়ে দেখে মিহি বাইরে তাকিয়ে আছে। কৌশিক মিহিকে বলে—
— মনি, এসে গেছি।
কৌশিকের কথায় মিহির ধ্যান ভাঙে। বাইরে তাকিয়ে একবার কাজী অফিসের বোর্ডটা চোখে পড়ে। কৌশিক মিহির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে—
— মনি, তুমি কি আমার ডিসিশনে খুশি নও? আমাকে নিয়ে এখনও সন্দেহ আছে তোমার মনে?
— তোমার এক কথায় পরিবার এর কারো কথা না ভেবে এতদূর চলে এলাম, তারপরও সন্দেহের কথা বলছো?
মিহির কথায় কৌশিক হেসে ওঠে। মিহিকে নিয়ে কাজী অফিসের ভিতরে চলে যায়।
ওদের থেকে কিছু দূরে গাড়িতে বসে একটা লোক কাউকে ফোন করে। ফোন রিসিভ হওয়ার সাথে সাথে লোকটা বলে ওঠে—
— স্যার, ওরা কাজী অফিসে এসেছে।
ওপাশ থেকে আর কোনো উত্তর আসে না, শুধু ফোন কেটে যাওয়ার টুট টুট শব্দ হয়।
অভ্র ফোনটা ভেঙে কয়েক অংশে ভাগ করে। তারপরও রাগ কমছে না তার। রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলে—
— এতদূর চলে গেছিস তুই। এত সাহস বেড়ে গেছে তোর। কোথা থেকে এসেছে এত সাহস। আহহহহহহহহ।
রাগে হুংকার দিয়ে ওঠে অভ্র। নিজেকে শান্ত করতে পারছে না। নিজেকে শান্ত করতে নিজের চুল খামছে ধরে জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে থাকে অভ্র। পরমুহূর্তেই কিছু ভেবে কুটিল হেসে ওঠে অভ্র। বিড়বিড় করে বলে—
— তোকে আমি সময় দিতে চেয়েছিলাম জানেমান, কিন্তু তুই নিজেই নিজের স্বাধীনতা হারালি বেবি। এখন থেকে তোর ভাগ্যের বিধাতা আমি হব। আমি অভ্র আহমেদ।
অভ্র কাউকে ফোন করে কোনো রকম বাক্যে ব্যয় না করে সরাসরি বলতে থাকে—
— ওই কাজীকে যত টাকা লাগে তত টাকা দিয়ে কিনে ফেলো। আর যদি না মানে, তাহলে জানের ভয় দেখাও। একটা ফেক কাবিননামা বানাতে বলো। আর আমি না আসা পর্যন্ত যেন বিয়ে শুরু না হয়।
কথাগুলো বলেই অভ্র ফোন কেটে দেয়। বাঁকা হেসে বলে—
— ইউ হ্যাভ টু পে ফর ইট, বেবি।
কাজী অফিসে এসেছে অনেকক্ষণ। মিহি আর কৌশিক আর কৌশিকের দুইজন ফ্রেন্ড ওরা সাক্ষী হিসেবে এসেছে। কিন্তু এখনো ওদের বিয়ে কাজ শুরু করেনি কাজী। উনি নাকি বিয়ের কাগজপত্র রেডি করছেন। অথচ কৌশিক এখনা আসার আগে কাজীকে এইসব রেডি করতে বলেছিল। এতকিছু পরও কৌশিক শান্ত আছে। আজকে ওদের জীবনে একটা বিশেষ দিন। এই দিনে কোনো ঝামেলা করতে চাই না কৌশিক।
অন্যদিকে কাজীর সামনে বসে আছে অভ্রের লোকজন। কাজীর সামনে অনেকগুলো টাকার বান্ডিল। লোভে চোখ চকচক করছে কাজীর। কাজী জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে জিজ্ঞেস করে—
— এগুলো কি আসল?
অভ্রের লোকগুলোর মধ্যে তিহাম নামক ছেলেটা বলে ওঠে—
— ওই কাজী সাহেব, দেখেন না, আসল টাকা সব ।আপনার লগে কি আমরা মস্কারি করতে আসছি?
কাজী হাসি হাসি মুখ করে বলে—
— এখানে ২ লাখ পুরো আছে তো?
— মাত্র ২ লাখ, কাজীকে আরও ৩ লাখ বাড়িয়ে দাও।
পু্রুষালি কন্ঠটা শুনে সবাই সামনে তাকায়। তখনই দেখা যায় অভ্র দাঁড়িয়ে আছে। অভ্রকে দেখেই সবাই দাড়িয়ে গিয়ে সালাম ঠুকতে থাকে।
অভ্র কাজী সাহেবের সামনে গিয়ে মুখোমুখি সোফাই বসে পড়ে। কাজী খুশিতে গদগদ হয়ে জিজ্ঞেস করে—
— আরো তিন লাখ?
কাজীর অবস্থা দেখে অভ্র কুটিল হেসে বলে—
— পুরো ৫ লাখ দেবো আপনাকে। শুধু একটা ছোট নাটক করতে হবে আপনার পারবেন তো?
কাজী এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে বলে—
— পারবো, পারবো স্যার। সব করতে পারব। বলুন কি করতে হবে?
অভ্র পায়ের উপর পা তুলে আয়েশ করে বসে বলে—
— বাইরে যে মেয়েটা আছে, ওর বিয়ে আমার সঙ্গে দেওয়া হবে, কিন্তু যেন মেয়েটা না জানে। আপনাকে নাটক করতে হবে যে আপনি ওই মেয়েটার বিয়ে বাইরে যে লোক এসেছে ওর সঙ্গে দিচ্ছেন, কিন্তু কাবিন নামায় আমার নাম থাকবে। বিয়ে পরাবেন আমার নামে আর সেটার সাক্ষী থাকবে আমার লোকজন। আর ওই ছেলেটার জন্য একটা ফেক কাবিন নামা বানাবেন এবং একটা নাটক করবেন যে ওর বিয়ে মেয়েটার সঙ্গে হয়েছে। কি কাজী সাহেব, পারবেন?
অভ্রের ক্রিমিনালি বুদ্ধি দেখে কাজী হতভম্ভ হয়ে যান। এতো ধূর্ত পরিকল্পনা—এই ছেলে তো ঠান্ডা মাথায় মানুষ খুন করাতেও পারবে।
কাজী ঢোক গিলে বলে—
— পারব, স্যার। কিন্তু আমি পুরো টাকা পাবো তো?
— আরে, কাজী সাহেব, নো টেনশন। অভ্র আহমেদ এক কথার মানুষ । যদি আমাকে খুশি করতে পারেন, তাহলে আরও টাকা পেতে পারেন।
কাজী সাহেব আর কোনো কিছু না ভেবে বলে—
— আমি পারব স্যার।
অভ্র কুটিল হেসে ওঠে।
মিহি বসে আছে মাথায় কাপড় দিয়ে। সামনে কাজী বিয়ের কাবিন লিখছেন। পাশে কৌশিক নেই। এখানের নাকি নিয়ম স্বামী স্ত্রীর বিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে করানো হয়। বিয়ের পরেই একজন আরেকজনকে দেখতে পারে । ফলে কৌশিক কেউ পাশের ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আগে মিহির বিয়ে পড়ানো হবে, তারপর কৌশিকের।
মিহির ভাবনার মাঝেই কাজী গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠেন—
— “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন…” মোহাম্মদ কৌশিক সরকারের পক্ষ থেকে আপনি কাজী মিহি শেখ-এর কাছে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী বিবাহের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে। আপনি যদি এই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে থাকেন তাহলে বলুন— আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।
কাবুল বলার মুহূর্তেই মিহি কান্না করে উঠে। বারবার বাড়ির সবার কথা মনে পড়ছে।
কাজী এই ফাঁকে কালেমা পড়ে পুনরায় বলে
— বলো মা, মোহাম্মদ অভ্র আহমেদ-এর পক্ষে থেকে আপনি কাজী মিহি শেখ-এর কাছে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী বিবাহের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে। আপনি যদি এই প্রস্তাবে সম্মতি দেন, তাহলে বলুন—
আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।
এবার কাজী বর আর নাম আস্তে করে বলে, যাতে কেউ শুনতে না পায়। কাজীর শার্টের পকেটে ফোন এর ওপাশে অভ্র লাইনে রয়েছে । অভ্রের লোকদের এখানে পাঠাতে পারেনি, কারণ কৌশিকের বন্ধুরা রয়েছে। ওরা সন্দেহ করতে পারে। কিন্তু অভ্র দুইজন মহিলাকে কাজীর সঙ্গে করে পাঠিয়েছে, যাতে ওরা সাক্ষী হিসেবে থাকতে পারে। আর মহিলাদের দেখে কৌশিকের বন্ধুরাও সন্দেহ করবে না।
অন্যদিকে মিহির কান্না করতে করতে অবস্থা খারাপ। ওর বারবার মা–বাবার কথা মনে পড়ছে। কাজী বলতে থাকে—
— বলো মা, কবুল।
মিহি সময় নিয়ে নিজেকে সামলে কান্নারত কণ্ঠে বলে—
— আলহামদুলিল্লাহ কবুল।
কাজী ও কৌশিকের বন্ধুরা সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলে ওঠে। অপর পাশে অভ্রও আলহামদুলিল্লাহ বলে ওঠে।
কাজী অভ্রর সামনে বসে আছে। ভয়েই তার কলিজা কাঁপছে, কারণ অভ্রর হাতে বন্দুক আছে।
কাজী কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে—
— স্যার, দেনমোহর কত লিখবো?
অভ্র কাজীর কথায় মনে মনে একটা হিসেব করে বলে—
— ১০০ টাকা লিখুন।
— অ্যা
— অ্যা না, হ্যাঁ। লিখুন ১০০ টাকা।
— ১০০ টাকা কাবিন লেখা যায় না স্যার।
— কেন যায় না? কোন হাদিসে লেখা আছে ১০০ টাকা কাবিন লেখা যাবে না?
— কিন্তু—
— আর একটা কথা মুখ থেকে বের করলে গুলি মেরে খুলি উড়িয়ে দেবো। আমাকে বিয়ে করতে এসেছে ওই মেয়ে? নিজের নাগর নিয়ে এসেছে ওই মেয়ে বিয়ে করতে। দেনমোহরে যে ওর জান লিখতে বলিনি, ওটাই শুকিয়ে করুন। আর ওর জন্য আপনার পিছনে যে এত মাল খসালাম, তারপর আবার দেনমোহরও ২০–৩০ লাখ টাকা লিখবো নাকি? ১০০ টাকা দিচ্ছি, এটাই অনেক আমার আবার দয়ার শরীর কিনা। আর যদি আপনার বেশি খারাপ লাগে, তাহলে আপনার টাকা থেকে কিছু কেটে ওর দেনমোহর বাড়িয়ে দিতে পারি। আপনি রাজি?
কাজী অভ্রর কথা শুনে আতকে ওঠেন। দ্রুত বলেন—
— না না স্যার, আমার টাকা কাটবেন না। আমি দেনমোহর ১০০ টাকাই লিখছি।
কাজী কাবিননামার কাগজপত্র রেডি করে বিয়ের কালেমা পড়তে থাকে। অভ্রর কবুল বলার সময় আসলে অভ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনবার কবুল বলে দেয়। বিয়ে শেষ হতেই অভ্র উঠে দাঁড়ায়। কুটিল হেসে বিড়বিড় করে বলে—
— এখন কী করবি জান? আমি আসছি তোর জীবন নরক বানাতে।
কাজী কৌশিকের কাছে এসে কালেমা পড়ানো শুরু করে। কালেমা পড়ানো শেষ করে কবুল বলার সময় এলে কাজী কৌশিককে কবুল বলতে বলে। কৌশিক সময় ব্যয় না করে ফটাফট কবুল বলে দেয়। বিয়ে পড়ানো শেষ হলে কৌশিক মিহিকে দেখার জন্য পাশের ঘরে চলে যায়। কাজী কৌশিকের অবস্থা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মনে মনে ভাবে—যে বিয়ের জন্য এত খুশি হচ্ছে, সেই পুরো বিয়েটাই তো নকল। বিয়ের কাগজ নকল, কাবিননামা নকল, সবই তো নকল। বিয়ের কালেমাও ঠিকভাবে পড়েনি কাজী। আর সবচেয়ে বড় কথা, মেয়েটার বিয়ে তো অন্য কারো সাথে হয়ে গেছে। সে তো এখন অন্যের বউ।
বিয়ের কাজ শেষ হতেই কৌশিক মিহিকে নিয়ে কাজী অফিস থেকে বেরিয়ে আসে। যখন ওরা গাড়িতে উঠতে যাবে, তখন দেখা যায় গাড়ির সাথে অভ্র হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
অভ্রকে দেখে কৌশিক মিহি ঘাবড়ে যায়। একজন আরেকজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে।
অভ্র বাঁকা হেসে বলে ওঠে—
— কী কৌশিক ব্রো, আমার হবু শালি নিয়ে কাজী অফিসের সামনে কী করছেন?
কৌশিক ঢোক গিলে বলে—
— কিছু না ভাইয়া, আমার একটা ফ্রেন্ডের বিয়ে ছিল, ওইখানেই এসেছি।
— গোপন বিয়ে নাকি?
— মানে?
— মানে তোমার বন্ধু গোপনে বিয়ে করছে নাকি প্রেমিকাকে?
— হ্যাঁ।
— গুড গুড, ভেরি গুড।
অভ্র মিহির দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে—
কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ৮
— মিহি, তোকে দেখতে বউ বউ কেন লাগছে বলতো?
মিহি অভ্রর কথায় কৌশিকের হাত চেপে ধরে। যেটা অভ্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করে।
অভ্র দাঁতে দাঁত চেপে বলে—
— চল।
অভ্রর কথায় মিহি আর কৌশিক চমকে ওঠে।
— ভাইয়া, আমরা যেতে পারবো। আমি মনি কে বাড়ি দিয়ে আসতেই যাচ্ছি।
— তুমি বাড়ি চলে যাও কৌশিক। আমি মিহিকে বাড়ি দিয়ে আসবো। আর আমি এই নিয়ে কোনো তর্ক–বিতর্ক চাই না।
কৌশিক অভ্রর কথায় চুপ করে যায়। অভ্রর সাথে যাওয়ার কথা শুনে মিহি কৌশিকের দিকে তাকায়। কৌশিক চোখ দিয়ে সম্মতি দেয় মিহিকে। কৌশিকের সম্মতি পেয়ে মিহি অভ্রর গাড়িতে উঠে পড়ে। অভ্র কোনো দিকে না তাকিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে যায়। আর একা দাড়িয়ে থাকে কৌশিক।
