Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ১৭

সায়রে গর্জন পর্ব ১৭

সায়রে গর্জন পর্ব ১৭
নীতি জাহিদ

রক্তে নীল কালশিটে পড়েছে নাকের পাশটাতে, চোখ মুখ অনেকটাই ফোলা। এত ঘটনা ঘটে গেলো অথচ বিশ্বাস আসছেনা। বিশ্বাস বড্ড ভয়ংকর জিনিস। যেখানে বিশ্বাস দৃঢ় সেখানে কোনো যুক্তি ঠেকে আর, দূর্বল বিশ্বাস স্থানে কখনো স্থায়িত্ব আসেনা। নোমানকে অনেকটা নিরাপত্তা দিয়েই পাভেলসহ নিজের উত্তরার ফ্ল্যাটে পাঠিয়েছে শাহাদ। পাভেলের মনে অজস্র প্রশ্ন। করবে কি করবে না ভেবে নোমানের দিকে লক্ষ্য করতেই দেখলো নোমান টেবিলে রাখা কেকটার একটু একটু করে খাচ্ছে। খেতেও কত সংকোচ। প্রথমে নোমানই বলে উঠলো,

– জানিস পাভেল, বস আমারে নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস করতো। আমি বসের বিশ্বাস রাখতে পারিনাই। সবাই আমারে দোষ দেয় অথচ কেউ শেফালীর দোষ টা দেখলো না। এই মেয়েটা আমারে যে কেমনে ঠকাইলো…
– এত প্রশ্ন করি নাই, সুরাইয়ারে কেমনে পটাইলি?
– পটানো শব্দটা বাজে শুনায়।সুরাইয়া অনেক পবিত্র। ওর সাথে আমার সম্পর্ক হয় চার বছর আগে। কলেজ থেকে আসার সময় শেফালীকে একটা ক্যাফেতে দেখতে পায় অন্য পুরুষ নিয়ে ঢুকতে। রাস্তায় দেখা হওয়ার পর আমাকে জানিয়েছিলো। সেদিনের পর সুরাইয়া প্রায় নজর রেখেছিলো সেই ক্যাফেতে।শেফালী প্রায় যেত। বিশ্বাস কর আমি সুরাইয়াকে ধমকেছি,বকেছি, অপমানও করেছি শেফালীকে নিয়ে এসব বলাতে। যেদিন নিজের চোখে দেখলাম সেদিন নিজের উপরই আস্থা উঠে গেলো।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সুরাইয়ার চোখের ভাষা বুঝতাম। বসকে বলার সাহস হয়নি। সময় গড়ায়। অপেক্ষা করি শেফালীকে হাতে নাতে ধরার কিন্তু তার আগেই আমাকে সুরাইয়ার সাথে কথা বলতে দেখে বাজে কথা শুরু করলো। ব্ল্যাকমেইল করতে থাকলো। কত টাকা যে সরিয়েছি ভাইজানের কাছ থেকে শেফালীর জন্য। ওর কথাতেই সেদিন ভাবীমার সাথে নিজেকে জড়িয়েছে। সুরাইয়ার ক্যারিয়ার টা ধ্বংস করে দিতো। যা অন্ধ হয়েছিল আবিরকে আঘাত করতেও ভাবতোনা। কিডন্যাপ করা হলে পালিয়ে আসি। পালিয়ে এসে বড্ড ভুল করেছি। অনুশোচনাতে জীবন আমার অতিষ্ঠ। দু দু বার সু*ইসা/ইড কমিট করতে গিয়েছিলাম।প্রথম বার আমাকে সুরাইয়া বাঁচিয়েছিলো, দ্বিতীয় বার ওর মুখটা ভেসে উঠে চোখের সামনে। বসের একাউন্ট থেকে এত টাকা আত্নসাৎ করার পর আর সাহস হয়নি মানুষটার মুখোমুখি হয়ে সাফাই দেয়ার। তবুও চেয়েছিলাম কিন্তু চারদিকে শেফালী শত্রু দিয়ে ঘিরে রেখেছে। আমাকে পেলেই যেন শ্যুট করে।
পাভেল নিরব প্রশ্ন করলো,

– সুরাইয়াকে চাইলেই তো বিয়ে করতে পারতি করলি না কেনো?
– তোকে আর বসকে কে লাগবে ভরসাযোগ্য স্থান হিসেবে। সুরাইয়া তোকে ছাড়া বিয়ে করবে ভাবলি কি করে?
পাভেল নিরুত্তর। আরেকবার বিশ্বাস করতে মন টানছে। প্রতিটি মানুষই দ্বিতীয়বার সুযোগ আশা করে, নোমান কেকের দিকে দৃষ্টি ফেলে বসে আছে। শাহাদ আজ সবাইকে কেক কিনে দিয়েছে।পাভেল কিছুটা অবাক হয়ে ভাবে, বস কেক ও খাওয়ায় তাও আবার সকলের পছন্দের ফ্লেভার। কাঁধে পাভেলের হাত পড়াতে সেদিকে তাকালো। পাভেল মুখোমুখি চেয়ার টেনে বসে বললো,

– শেফালীকে আগে ডিভোর্স দিতে হবে সেটার কি করবি? ও তো দিবেনা।
– তালাক দিয়েছি।
নিরুত্তর দুজনই। কথা না বাড়িয়ে বাইরে থেকে আনা খাবার দুজনই খেয়ে নেয়। রাত একটা পঞ্চাশ, শাহাদের ফোন পেয়ে ঘাবড়ে গেলো দুজনই। নোমান তো থতমত খেয়ে বলেই ফেললো,
– দোস্ত আবার কি হইছে?
– চুপ থাক,আগে দেখি রিসিভ করে।
– হ্যালো বস আসসালামু আলাইকুম।
ও পাশ থেকে প্রতিউত্তর আসলো। কথা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। পাভেলের মুখ ভঙ্গি গম্ভীর। খুব মনোযোগপূর্ণ কোনো আদেশ পালন করার নির্দেশ এসেছে। নোমান ঘনঘন ঢোক গিলছে। পাভেল ফোনটা রেখে নোমানের দিকে তাকিয়ে বলে,
– বস বলছে আগামীকাল এখানে বিয়ে পড়াতে।
– কিভাবে সম্ভব?
– আমিও অবাক। আচ্ছা দেখা যাক। বস এমন কোনো ডিসিশন নিবেনা যাতে আমাদের ক্ষতি আছে।
– আল্লাহ ভরসা।

রুমের পরিবেশ থমথমে। দিয়া বসে আছে শাহাদের বিছানায়। শেহজা ঘুমাচ্ছে। রুমে আসার পর থেকে চারপাশ নিস্তব্ধ। শাহাদ বারান্দায়। একবারের জন্য ও রুমমুখী হয়নি। দিয়া নিজেও বুঝতে পারছেনা আজ কি হয়েছে। সকালের ব্যাপারের পর শাহীন বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। মাকে ফোন দিয়ে জানিয়েছে প্রয়োজন হলে বাসায় আসবে। লজ্জ্বায় দিয়ার মুখোমুখি হতে চাইছেনা। ভাইয়ের মত একজন শ্রদ্ধাভাজন মানুষের চরিত্রকে কিভাবে দূষিত করতে পারলো শেফালী। যেই মেয়েকে পছন্দ করে সেই মেয়ে যদি শুনে এমন কথা পরিবারে কি আসবে তবে?
ঘন্টার কাঁ/টা পেরিয়ে তিনটে। রুমের মাঝে নিভু নিভু করে ঝাঁড়বাতিটা জ্ব/লছে। এসির কনকনে বাতাস গায়ে লাগছে। রিমোট টা পেয়ে টেম্পারেচার বাইশ করে দিলো।

কোথায় শোয়া উচিত বুঝতে পারছেনা। ফোস করে দম ফেলে উঠে দাঁড়ায়, ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে একটা টিস্যু নিয়ে মুখটা মুছে নিলো। রেড ভেলভেট কেকটা টেবিলের উপর। অনেক দিন পর দেখে লোভ সামলাতে পারলো না। এছাড়া মানুষটা তো বলেই গেলে খেয়ে নিতে। সেই যে গেলো আর রুমে আসলো না। কি বলে ডাকবে তাও বুঝতে পারছেনা। সোফায় বসে প্লেট টা হাতে নিলো। খাওয়া শেষ করতেই মানুষটা বারান্দার দরজা আটকে ভেতরে আসলো। এসে সরাসরি মেঝেতে বসে পড়লো দিয়ার পায়ের কাছে। এমতাবস্থায় বিহবল হয়ে দিয়া দাঁড়াতে চাইলে হাত ধরে বসিয়ে দেয়। দিয়া হাতের প্লেট টা টেবিলে রেখে শুকনো ঢোক গিলছে। যদি জানতে চায় সকালে শাহীনের সাথে কি কথা হয়েছে! তবে কি উত্তর দিবে? শাহীন তো এভাবে কথাটা বলতে বলেনি শাহাদকে। উনি কি বিশ্বাস করবে সত্যি টা বললে। দিয়া ভীতসন্ত্রস্ত নেত্রে অপলক তাকিয়ে আছে। শাহাদ জোরে জোরে দুবার শ্বাস টেনে দিয়ার দুহাত ধরে দিয়ার চোখের দিকে তাকালো। এভাবে মানুষটা মেঝেতে বসে আছে দেখতে কেমন দৃষ্টিকটু লাগছে। দিয়ার দুহাত নিজের মুষ্টি বদ্ধ করে বললো,

– অপরাধবিহীন সাজা গত দু বছর ভোগ করার জন্য এই অযোগ্য,অসহিষ্ণু স্বামীকে কেমন শাস্তি দেয়া উচিত?
দিয়া বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। হৃদকম্পন বেড়ে গিয়েছে। উনি কি বলছে আবোলতাবোল। তোতলানো স্বরে বললো,
– মা আ আ নে…
– যেভাবে,যে উপায়ে,যে নিয়মে ক্ষমা চাইলে মঞ্জুর হবে, ঠিক সেই নিয়মে চাইবো। আদেশ করো।
ভুল শুনলো কি? শাহাদ ইমরোজ বলেছে তাকে আদেশ করতে!পূর্বের মত বাক্যহীনভাবে বসে আছে দিয়ার পায়ের কাছে।ঘটনা এতটুকু আঁচ করা যাচ্ছে হয়তো শাহাদ কিছু জানতে পেরেছে। দিয়ার দু হাত কাছে নিয়ে নিজের অধর ছোঁয়ালো। ভাষা হারিয়ে দিয়া স্তব্ধ। শব্দহীন দিয়া যুদ্ধ করছে শব্দের সাথে, অনুনয়-বিনয় জানাচ্ছে ভোকাল কর্ডকে যেন শব্দ উচ্চারনে সহযোগিতা করে। ধীর গলায় বললো,

– সময় হারিয়েছি আমি, বাবাজান-আম্মিজানকে হারিয়েছি,দাদাজানকে হারিয়েছি, আর কিছু হারানোর শক্তি সামর্থ্য কোনোটাই নেই। যেভাবে বসে আছেন আমার পায়ের সামনে আমার গুনাহের খাতা ভারী করছেন তো। উঠুন। বাকি জীবনে মানসিক যন্ত্রণাটা না হয় পুষিয়ে দেয়ার মতো শাস্তি আপনার জন্য আরোপ করা হলো।
দিয়ার হাত ছেড়ে দিলো শাহাদ। মাথা তুলছেনা দেখে দিয়া আঁই ঢাঁই করে সাহস নিয়ে শাহাদের মুখটা ধরলো।নরম হস্তযুগলের স্পর্শ পেয়ে মাথা তুললো মানুষটা। আঁৎকে উঠলো দিয়া। দু চোখের বর্ন রক্তিম।
প্রস্তর কঠিন মানব উঠে দাঁড়ায় বিনা বাক্য ব্যয়ে। অনুসরন করে দিয়াও দাঁড়িয়ে পড়ে। সবটুকু দূরত্ব কমিয়ে এগিয়ে এলো শাহাদ। সবচেয়ে সুন্দর, মনোমুগ্ধকর, আবেগপ্রবণ ঘটনাটি আজ ঘটে গিয়েছে। যার মাঝে ছিলো অশেষ রহমতে পূর্ণ ভালোবাসা। শাহাদ ইমরোজ তার একমাত্র সহধর্মিণী ফারহানা মেহতাব দিয়াকে জড়িয়ে ধরে বুকে আগলে নিলেন। উষ্ণ অধর ছোঁয়ালেন প্রণয়িনীর ললাটে। কখনো কাঁপে নি ওষ্ঠ।অথচ আজ নিজের নারীকে ছুঁতেই অধর কম্পিত হলো। গভীর ভাবে জড়িয়ে ধরেছে নিজস্ব তনয়াকে। প্রশান্ত হলো ভেতরে তোলপাড় করা করা হৃদয়স্রোট। এই মাত্র কিছু কাট কাট শব্দ উচ্চারিত হলো মানুষটার মুখ থেকে,

– শাহাদই শুরু শাহাদই শেষ। রসকষহীন মানবের প্রশস্ত বক্ষ যেন বিদেশীনির শেষ আশ্রয়স্থল হয়।
দিয়া মিষ্টি হাসি দিলো। অনেকটাই স্পষ্ট হলো, এই মানুষটার কাছে কোনো তথ্যই লুকানো রইলোনা। দিয়া দুটো দেশের নাগরিক এই কথা তিনজন মানুষ ছাড়া বাকিদের অজানা ছিলো। ইরানী মায়ের ইরানী কন্যা ফারহানা মেহতাব দিয়া। মুরাদ বরাবর চেয়েছিলো মেয়েকে লুকিয়ে রাখতে। মুরাদের মৃত্যুতে সেই ভার পড়ে হামিদ মজুমদারের উপর। মুরাদ,আমিরা এবং হামিদ মজুমদার ব্যতিত এই তথ্য সকলের অজানা।কোলে তুলে নিলো দিয়াকে। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বুকে জড়িয়ে নিলো। শক্ত,পোক্ত,হাট্টা কাট্টা মানুষটা এতটা ভালোবাসার ধরনও অন্যদের চেয়ে ভিন্ন।আকস্মিক এতদিনের দূরত্ব এভাবে ঘুঁচবে কল্পনাতীত ছিলো। দিয়া ভাবে বাবাজানের সেই কথা,

– তুমি যদি পাপহীন,বিনয়ী এবং স্বচ্ছ হও তবে মহান রব তোমার ঝুলিতে থাকা তোমার প্রাপ্য অংশ টুকু বুঝিয়ে দিবেন। ধৈর্য্য ধরবে। আল্লাহ পছন্দ করেন ধৈর্য্যশীলদের।
মনে মনে আওড়ায়,
– বাবাজান তুমি সত্য ছিলে। মহান রব আমার প্রাপ্য সম্মান টুকু আমাকে ফিরিয়ে দিতে শুরু করেছেন তোমাদের দোয়ায়।
শাহাদ দু চোখ বুঁজে আছে। হৃদনন্দিনীকে করা প্রতিটি আঘাত ভাসছে চোখের সামনে। মানুষ ভুলের উর্ধ্বে নয়। তবে যে ভুল করেছে এই মেয়ে এত সহজে মাফ করে দিলো! এত ভালোবাসে! নাকি পারিবারিক শিক্ষার জেরে স্বামীকে অসম্মান করতে চায়নি তাই ফিরিয়ে দেয় নি। দিয়া শাহাদকে নিজের দুহাতে আকড়ে ধরেছে আজ। ছোট্ট দেহটা কেমন গুটিশুটি মে*রে আছে। কতটা যত্ন দরকার, ভালোবাসা দরকার সেকথার খেয়াল কি রেখেছিলো এই রসকষহীন কঠিন মানব। শাহাদ ধীর গলায় বললো যেন শেহজা উঠে যায়,

– ফারাহ সোনা!
ফারাহ চমকিত।এত আদুরে ডাক। জবাব না দিয়ে পারলো না,
-জ্বি…
– ক্ষমা করে দিলে?
– হুম
– কেনো?
– কাছে টেনে নিলেন কেনো?
– অগোচরে থাকা সত্য উন্মোচিত হল বলে
– আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো আপনি আমার চরিত্র নিয়ে সন্দেহ করেন নি,তবে কেনো এত অবিশ্বাস ছিলো আমার প্রতি? কেনো আমাকে বেঈমান বলতেন?
– ভালোবাসার বেঈমান ভাবতাম। আমার কঠিন সময়টা পাশে ছিলে। আমার বড্ড বেমানান বয়সটাকে নিজের ভবিতব্য মেনে নিলে। মনে ঘোর সন্দেহ ছিলো কেউ এত ভালোবাসে কি করে? ভেবেছিলাম নিয়তিকে মেনে অভিনয় করেছিলে…
থেমে গেলো শাহাদ। ফ্যাল ফ্যাল নেত্রে চেয়ে আছে দিয়া। অভিনয়! কোনটা। তবে কি শাহাদ দিয়ার নিখুঁত ভালোবাসাকে অভিনয় বলছে।দিয়া প্রশ্ন করলো,

– কোনটা অভিনয়!
– ওটা আমার ভ্রম ছিলো।বাদ দাও সেসব। শেষ বারের মতো বলো, ভালোবাসো??
– হুম, তবে শেষবার কেনো?
– আর বলতে দিবনা।
– কেনো?
– সারপ্রাইজ।
দিয়া ফিরতি প্রশ্ন করেনি। তবে মুখ তুলে শাহাদের দিকে তাকাতেই দেখে দিয়ার দিকে তাকিয়ে মিট মিট করে হাসছে। এই হাসি যেন আকাশের চাঁদ। দিয়া উত্তর পেয়ে গিয়েছে।পুনরায় মুখ লুকায় শাহাদের বুকে। ধীর হস্তে প্রেয়সীর কালো কেশে বিলি কাটে শাহাদ ইমরোজ।

ফযরের আজান হয়েছে। শাহীন নামাজ পড়ে জায়নামাযে বসে আছে। অপরাধবোধে মাথা হেট হয়ে আছে। ভাবীমার মুখোমুখি হওয়ার সাহস নেই। বন্ধুর বাসায় অবস্থান করছে। ভোরে কর্কশ শব্দ করে যন্ত্রটা বেজে উঠলো। সারা রাত মেয়েটা মেসেজ করেছে।প্রতিউত্তর দিতে পারেনি। ফোন রিসিভ করতেই ও পাশ থেকে ক্রন্দনের আওয়াজ কর্ণকূহতে বাজলো। নিজেকে শান্ত করে প্রতিউত্তর করলো,
– নিরা জান কাঁদে না। জানো তো মাথা ব্যাথা অনেক বেশি। বলতে পারবোনা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
– একটা মেসেজ করা যেত না?
– আচ্ছা বের হও। মিষ্টি সকালটা না হয় মিষ্টি পরীর সাথে কা/টাবো।
অল্প আলাপনে কথা শেষ হতেই দুজন রেডি হয়ে গেলো বের হওয়ার জন্য। নিরাকে মাঝে মাঝে হুমায়ুন আহমেদের অকর্মক নায়কের নায়িকা মনে হয়। নিজেকে মনে হয় হিমু আর নিরা হলো রূপা। আজব চিন্তা ভাবনা বাদ দিয়ে প্ল্যান করলো আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা শুধু নিরাময় দিন কা/টাবে। সব দুশ্চিন্তা বাদ।

সকাল দশটা। শাহাদের ফ্ল্যাটে সকলে হাজির। সুরাইয়াকে নিয়ে এসেছে পাভেল। নোমান, সুরাইয়া, হামজা, কাজী, শাহীন, দিয়া এবং শেহজা। শাহীন অত্যাশ্চর্য হয়ে থম মেরে বসে আছে। নওরীনকে নিয়ে প্রাতঃ নাস্তা সেরে দুজনই লেকের দিকে বসলো।তৎক্ষনাৎ ফোন গেলো শাহাদের। এই বাসায় নোমানকে দেখে বিস্মিত। তাও আবার এখন ভাইজান বলছে সুরাইয়ার মত নিষ্পাপের সাথে নাকি বিয়ে দিবে। বোনকে কি করে সতীনের সংসার করতে দিবে এটাই মাথায় খেলছেনা শাহীনের৷ প্রশ্ন করছেনা আজ। দিয়া হতবাক হয়ে নোমানকে দেখছে। মুখে কোনো বুলি নেই শাহাদের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে নিশব্দ হয়ে বসে আছে। শেহজাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে পাশের কামরায়। সকাল সকাল বউ বাচ্চা নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখে সুলতানা কবির জানতে চেয়েছিলো। উত্তরে শাহাদ বলেছে ওদের নিয়ে ঘুরতে মন চেয়েছে। সুলতানা আর বাঁধা দেয়নি। শাহাদ কাজীর দিকে তাকিয়ে বলে,

– কাজী সাহেব বিয়ে পড়ান।
মানব- মানবী প্রত্যেকে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আছে। অত্যন্ত চমকপ্রদ ভাবে কিছুক্ষনের মাঝে সম্পন্ন হয়ে গেলো বিয়ে। সুরাইয়া নোমান জুটি একদম অস্বাভাবিক। কেউ যেন মেনে নিতেই পারছেনা ব্যাপারটা সুরাইয়া এগিয়ে এসে শাহাদকে সালাম করতে চাইলে শাহাদ ইশারায় বারণ করে দেয়। কাজী সাহেব মিষ্টি মুখ করে চলে যেতেই এবার আলোচনায় বসে সবাইকে নিয়ে। নোমানের দিকে তাকিয়ে বলে,
– বলো এবার কি করতে চাও?
ছলছল চোখে নোমান প্রতিউত্তর করে,

– ভালো থাকতেই চাই নিরাপদভাবে।
– কিভাবে?
– আগের মত।
– শাহাদের সর্বোচ্চ সাহায্যকারী যোদ্ধা নোমান সিদ্দিকী বেঈমানী করেছে তার বসের সাথে। আগের মত অবাধে কি করে ফিরবে?
– কম শা/স্তি তো পাইনি বস। নারী শক্তি,নারী ধ্বং/স। আপনার নারী আপনার শক্তি।আমার সাবেক আমার ধ্বং/স।
– মন থেকেই সাবেক মেনে নিলে?
– সে তো অনেক আগে।
শাহাদ একপেশে হেসে বললো,
– তোমরা সাবেক দম্পতি মিলে যে চাল চেলেছো এতে আমার নারী আমাকে ধ্বং/স করার আগে নিজেই
ধ্বং/স হতে গিয়েছিলো। পাপের শাস্তি ভোগ করেছো। আগে থেকে জানালে এমন হতোনা। তুমি মুক্ত,সমাজে লড়াই করে বাঁচো। প্রয়োজনে আমাকে পাবে তবে বড় ভাই হিসেবে আর পাবেনা।
মাথা নত নোমানের। পাভেলের দিকে একটা চেক এগিয়ে দিয়ে শাহাদ জানালো,

– এখানে কিছু এমাউন্ট আছে এটা সুরাইয়ার একাউন্টে রেখে দিস। ওর বিপদে বড় ভাইজানের সাহায্য ওর জন্য সব সময় থাকবে।
শাহীন উৎসুকভাবে বললো,
– ভাইজান শেফালী?
শাহাদ উচ্চবাচ্যে বললো,
– ডিভোর্স পাবেনা নোমান। আমার বোন তো, আমি চিনি। ভাঙবে মচকাবে না। ইসলামে চিরতরে বিচ্ছেদের একটা নিয়ম আছে যা হালাল। সরাসরি তালাক দিবে। নোমান কি কাপুরষ?
নোমানের মাথা নত। বলে উঠলো,
– ভাইজান একটা কাজ তো করে ফেলেছি। ভয়ে বলিনি।
– কি কাজ?
– তালাক অনেক আগেই দিয়েছি।
শাহাদের মন চাইলো ঠাটিয়ে একটি চড় মা*রতে। সব কিছুই নিজের ভেতর রাখে। সব কিছুতেই মিনমিনে স্বভাব। রেগে বললো,
– কাজ করেছো এটা মিনমিনে বলার কি আছে। ভালো কাছ করেছো। তবে কাপুরষই তুমি। সত্যি টা দেরিতে স্বীকার করেছো।
আজ অবাকের পর অবাক হওয়ার দিন। শাহীন প্রশ্ন ছুড়লো,

– ভাইজান কি বলেন এসব? শেফালী আমাদের বোন? এটা কি করে ঠিক হলো?
– শেফালীর সাথে রক্তের টান। বেঈমানী করেছে রক্তের সাথে। রীতিমত আব্বুর কানে ও নওরীনকে ছোট করে ফেলেছে। যে ন*ষ্ট,জঘন্য উপাধি ফারাহকে দিয়েছিলো গতকাল, দু লাইন বাড়িয়ে আব্বুকে বলেছে নওরীন সম্পর্কে। অথচ সে আজ অবধি নওরীনকে দেখেনি। আব্বু ফোনে জানিয়েছে সেই কথা।এবার আমার সাথে গেম খেলুক। দেখি কতদূর আগায়।
– এতটা নিচে নেমেছে?
– প্রমাণ দেখাবো তোমাকে পরে।
পুনরায় দিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,
– সবার সব টুকু শাস্তি আমার ঝুলিতে না হয় রেখো।নোমানকে মাফ করে দাও।
দিয়া সকলের সামনে থেকে উঠে চলে গেলো রুমের দিকে। পিছু নিলো শাহাদ। কিছুতেই ভুলতে পারছেনা সেদিনের কষ্ট। এত সহজে প্রত্যেকে মাফ করে দিবে? এও কি সম্ভব। শাহাদ পাশে দাঁড়িয়ে বললো,

সায়রে গর্জন পর্ব ১৬

– এই অযোগ্য মানুষকে ক্ষমা করেও লাভ নেই ফারাহ। তোমার রূহ কষ্ট পেয়েছে। সেই শাস্তি খুব শীঘ্রই পেতে হবে। হয়তো সর্বোচ্চ অপমানিত করবে আল্লাহ তা আলা। আল্লাহ ছাড় দেন,ছেড়ে দেন না। ঝড় উঠবে ফারাহ। থামাতে পারবেনা সেই ঝড়। কষ্ট দিয়েছি সহধর্মিণীকে,সেই ভুলের ক্ষমা হয়না। আমি কখনোই উত্তম পুরুষ হতে পারবোনা।

সায়রে গর্জন পর্ব ১৮