Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ২৮

সায়রে গর্জন পর্ব ২৮

সায়রে গর্জন পর্ব ২৮
নীতি জাহিদ

দুবার দরজার কড়া নড়ার শব্দ কানে আসলো। দিয়া শোয়া থেকে উঠে বসলো। বেড সাইড ল্যাম্পটা জ্বালালো। পুনরায় আওয়াজ হলে গায়ে ওড়না জড়ালো। এত রাতে আবার কে এলো? উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই দেখে শেফালী। বুকটা ধ্বক করে উঠলো। শাহাদ যাওয়ার পর থেকে শেফালীর বন্দি দশা কাটলেও স্বেচ্ছায় নিজেকে বন্দি করে রেখেছে। খাওয়ার সময় ছাড়া বের হয় না। স্বাভাবিক গলায় বললো,
– আপা আপনি! কিছু বলবেন?
– ভেতরে আসবো?
দিয়া শেহজাকে দেখলো। মেয়েটা ঘুমাচ্ছে। দরজা থেকে সরে, মনে মনে আল্লাহর কাছে রক্ষা পাওয়ার দোয়া পড়লো। শেফালী ঢুকলো রুমে। দিয়া ঘড়ির দিয়ে তাকিয়ে দেখে রাত তিনটা। সারা রাত ঘুমাতে পারেনি দুশ্চিন্তায়। কেবল চোখ লেগেছিলো, দরজায় কড়ার আঘাতে ভেঙে গেলো সেই ঘুম। শেফালী সিংগেল সোফায় বসলো। দিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,

– বসেন ভাবীজান।
দিয়া বিস্মিত নয়নে দেখছে। শেফালী তাকে ভাবীজান সম্বোধন করলো! বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে বসলো। শেফালী নিরব। দিয়া লক্ষ্য করলো ওর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। শেফালীর কাছে এসে পাশের সোফায় বসে বললো,
– আপু কি হয়েছে কাঁদছেন কেনো?
ক্রন্দনরত গলায় বলে উঠলো,
– ভাইজান কেমন আছে ভাবীজান?
প্রশ্ন করেই তাকালো দিয়ার দিকে। মেয়েটার চোখ মুখ ফোলা। স্বাভাবিক থাকার প্রশ্নই যে আসেনা। তবুও এই প্রশ্ন জানতে চাওয়ার ইচ্ছা! দিয়া ছন্দহীন নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে বললো,
– ভালো নেই আপু। একবার দেখেছিলাম হুঁশ নেই।
– সবাই দেখেছে?
– হামজা ভাই ফোন দিয়েছিলো তখন দেখেছে।
– দেখেছেন কত বড় হতভাগী আমি একবার দেখতেও পারলাম না। আমার ভাইজান রাগ করেই আমাকে ফেলে চলে গেলো। কত রাগ জমেছে! আমার মুখটা ও দেখলো না যাওয়ার আগে।
দিয়া হেসে দিলো ঝাপসা চোখে। বলে উঠলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

– তাহলে তো আপু আমি আর আমার নিষ্পাপ মেয়েটা আরো হতভাগী। আমাদের ও দেখা দিলোনা।
শেফালী দুহাতে চোখ মুছলো। নাক টেনে সোজা হয়ে বসে বললো,
– ভুল বললেন ভাবীজান। আপনি আর শেহজা ভাইজানের শরীরের সবচেয়ে দূর্বল জায়গা কাবু করে বসে আছেন। আপনাদের দেখা দিলে যে আর যাওয়া হতনা। আর আমাকে দেখা দেয়নি কারণ শুভ কাজে যাচ্ছে, আমার পাপী চেহারা দেখে অশুভ কিছু ঘটতে পারে। পবিত্রতার ও তো ব্যাপার আছে।
নিরুত্তর দিয়া নিষ্পলক চেয়ে আছে। কি উত্তর দিবে! উত্তর নেই। শেফালীর দিকে তাকিয়ে জড়িয়ে ধরে বললো,
– কাঁদবেন না তো আপু আল্লাহ ভরসা। আপনাদের ভাইজানের জন্য দোয়া করবেন। বোনের দোয়া অনেক কাজে লাগে।
– পাপী বোনের!
– কে পাপী কে নিষ্পাপ সে তো উপর ওয়ালাই বিচার করবেন। আপনি আমাদের কাছে সবসময় সম্মানের। বাড়ির সম্পদ তো আপনারা।
ক্ষীণ হাসলো শেফালী। চোখে মুখে এক রাশ মুগ্ধতা জমিয়ে তাকালো দিয়ার পানে। উঠে দাঁড়িয়ে যাওয়ার সময় বললো,

– মনে প্রশ্ন ছিলো কি আছে এই দিয়ার মাঝে যাকে ভাইজান সযতনে হৃদয়ে আগলে রেখেছে! আজ সেই ধারণা সুস্পষ্টভাবে ধরা দিলো, শাহাদ ইমরোজের সুযোগ্যা সহধর্মিণীই তার ফারাহ।
বেরিয়ে গেলো শেফালী। রেখে গেলো নিষ্প্রাণ মেয়েটাকে। পুনরায় মনের মধ্যে ঝড় তুলে দিলো। দু লাইন ভালো বাক্য হয়তো শেফালী আওড়েছে কিন্তু কোথায় শাহাদ! দরজা লাগিয়ে মুঠোফোনের গ্যালারীতে গেলো। শাহাদের সাথে সেই ছবিটা পেলো। শাহীনের হলুদ সন্ধ্যায় গান শেষ করে যখন মুচকি হাসিতে দিয়ার দিকে তাকালো সেই সময়টা ক্যামেরা বন্দি করেছিলো লিমন। বুকটা জ্বলছে। মুগ্ধ চাহনীতে চেয়ে আছে দিয়ার দিকে। ভেতরে তোলপাড় করা ঝড়। কি করে থামবে সেই ঝড়! চিৎকার দিয়ে কাঁদলে মেয়েটা জেগে যাবে। ওড়নাতে মুখ চেপে ধরলো। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা। মেসেঞ্জারে ঢুকে কল দিলো হামজাকে। সময় টা অনুচিত। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি। ও পাশ থেকে ফোন রিসিভ হলো। হামজা হাসপাতালের ক্যান্টিনে। দিয়াকে সালাম দিলো, শাহাদের অবস্থা কিছুক্ষনের মধ্যে জানাচ্ছে। দশ মিনিট পর ফোন আসতেই রিসিভ করলো,

– ভাইয়া আপনার স্যার কেমন আছে?
– ম্যাডাম আগের মতো।
– আচ্ছা। ভালো থাকবেন।
– জ্বি ম্যাডাম
দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে ফোন কেটে দিলো। হামজার উপর ও অনেক ধকল যাচ্ছে। বেচারা না ঘুমিয়ে পড়ে আছে। চেহারা দুদিনেই ভেঙে গিয়েছে। নিরাশ হয়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলো একটু খানি ঘুমের আশায়। নিজে অসুস্থ হয়ে গেলে মেয়ের সুস্থ থাকাটা দুষ্কর হয়ে পড়বে।

হাসপাতাল থেকে বের হতে হতেই সাড়ে তিনটা। সকালের ডিউটি টা প্রক্সি দিয়েছে মেহেদীকে। মেহেদী ডিউটি পেয়ে খুশিতে গদগদ। হাসপাতাল থেকে রওয়ানা হয়েছে সি এম এইচের উদ্দেশ্যে৷ রাশেদের পোস্ট মর্টেম এর সাথে এই হাসপাতালের একটা গুরুতর কানেকশন আছে। রাতের বেলা সন্দেহের তীর কম যাবে। সি এন জি ক্যান্টনমেন্টের সামনেই ছেড়ে দিলো। মনে হলো কেউ ফলো করছে। মনিকা পেছন ফিরে দেখলো না তেমন সন্দেহ জনক কাউকে চোখে পড়ছেনা। পুনরায় হাঁটা ধরলো সরাসরি হাসপাতালে ঢুকে গেলো।
– বস ঢুকে গিয়েছে।
– ফলো করো।
– কোনো তথ্য যেন না পায়।
– ওকে বস।

আগন্তুকের সাথে কথা শেষ করে ছেলেটা হাসপাতালে ঢুকে পড়লো। মনিকার সাথে কথা বলতে দেখলো আরেকজন এপ্রোন পরা ডাক্তারকে। ভ্রু কুচকে ভাবলো এই ডাক্তারকে চেনা লাগছে। ভালোভাবে তাকিয়ে দেখলো এটা তো ডাক্তার অনিরুদ্ধ। আচ্ছা! ইনফরমেশন এখান থেকেই সংগ্রহ করতে এসেছে। ছোট ভিডিও চিত্র ক্যামেরা বদ্ধ করে নিলো। মনিকা বের হয়েই পুনরায় সি এন জি তে উঠলো। মনিকাকে ফলো করছে আগন্তুকের নিয়োজিত ব্যক্তি। সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের সামনে এসে গাড়ি থামলো চারটায়। মনিকা সরাসরি মর্গের দিকে পা বাড়ালো। মর্গের দায়িত্বে নিয়োজিত ডোম খসরু মিয়া এগিয়ে এলো।

– সালাম ডাক্তার আপা।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম।
– অনিরুদ্ধ স্যার পাডাইছে?
– জ্বি। কাজের কথায় আসুন। এই ফাইলটা আর মানুষটাকে চিনতে পারছেন? এমন লা*শ কি পোস্টমর্টেম করেছেন?
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো খসরু। মাথা নেড়ে বললো,
– মনে পড়তাছে না। কহনের এই লা*শ*ডা?
– এই ধরুন তিন বছর আগের? আ/ত্ন/হ/ত্যা/র কেইস ছিলো।
– আইজকা কাটলে কাইলকোই ভুইলা যাই আর এইডা তো তিন বছর আগের। মনে নাইক্কা…
বিশ্রী একটা গালি বের হলো মনির মুখে। মুখে পানের পিক লেগে আছে এই খসরুর।দেখলেই বমি আসছে। মনে হচ্ছে শরীর থেকে লা/শে/র গন্ধ বের হচ্ছে। মনি ব্যাগ থেকে এক হাজার টাকার একটা নোট বের করে সামনে বাড়িয়ে দিতেই ওই লাল হওয়া দাঁত দেখিয়ে খসরু বিশ্রী হাসি দিলো। বলে উঠলো,
– আগে কামডা করলে আমার সময়ডা নষ্ট হইতো না। আহেন আমার লগে।
মনি গালি দিলো মনে মনে, মা****দ। পিছু পিছু যেতেই একটা নির্জন রুমের পাশে নিয়ে আসলো। এবার থেমে বললো,

– বলেন কি জানবার চান?
– আর কয়বার একই প্রশ্ন করবো?
– এই লা*শডা কাডি নাই। উপর থেইকা নির্দেশ আছিলো। দুইজন হুজুর ডাইকা গোছল দিয়া ঠিকানা মত পাডায় দিছিলাম। আরেক কাডা লাশের রিপোর্ট চালায় দিছিলাম এর নামে।
– এত বড় ধোঁকা।
খসরু ভ্রু কুঞ্চিত করে বললো,
– কেডায় দিছে ধোঁকা।
– আপনি না জানলেও চলবে।

রাগে গজগজ করতে করতে মনি বেরিয়ে আসলো। নিজের চুল নিজের ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। সব কিছু হাতছাড়া হচ্ছে। শাহাদ চলে গেলো। ভেবেছিলো শাহাদের অপারেশনের আগে নিজের ভিসাটা ঠিক করে ফেলবে। একসাথে যাবে বাইরে। শাহাদের রিপোর্ট টাও হাতে পেলোনা। লাস্ট চেকাপের সময় মনি গিয়েছিলো সেই হাসপাতালে। চাইলে ট্রিটমেন্টটা বাংলাদেশে করাতে পারতো শাহাদ, তাহলে মনির অবজারভেশনে থাকতো। কেনো করায় নি তার উত্তর ও মনির জানা! গত মাসেই শাহাদের ডাক্তারের কাছ থেকে নিউরোমেডিসিনের কোর্স এসিস্টের পারমিশন নিয়েছে। আর কিভাবে চেষ্টা করলে শাহাদকে নিজের করে পাবে! শাহাদ সিঙ্গাপুরের হাসপাতালের নাম অজ্ঞাত রেখেছে সকলের কাছে। মনি খোঁজ নিয়ে জেনে নিয়েছে বাংলাদেশ থেকে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে একজন পেশেন্ট আছে শাহাদ ইমরোজ নামে। খুব তাড়াতাড়ি চলে যাবে। এত তাড়াতাড়ি শাহাদের ট্রিটমেন্ট শেষ হবে না। বেঁচে গেলেই হয়। শেফালীর সাথে যোগাযোগ করা প্রয়োজন। কিন্তু এই মেয়ের তো ফোন বন্ধ। শাহাদ চলে যাবার পর শাহীন ও সেই কঠোরতা ধরে রেখেছে? হাতে এখন সেই লা*শের রিপোর্ট, রাশেদের ফেক রিপোর্ট এবং ডি এন এ রিপোর্ট। বাকি আছে অহনার রিপোর্ট। দুয়ে দুয়ে চার করে আগামীকাল তাও উদ্ধার করে ফেলবে। হাসপাতালের বাইরে আলতাফের গাড়ি চলে এসেছে মনিকাকে নিতে।

কুঠি বাড়ি আজ নিরব। মেহেরজান আম্মা সকাল থেকে রুমের দরজা আটকে বসে আছে। চোখ দুটো লাল। এইদিন আম্মাকে কেউ বিরক্ত করে না। বুকে একটা ছবি জড়িয়ে বসে আছে। ছবির মানুষটা তার নাড়িছেঁড়া ধন। কত আদরে আগলে রেখেছিলো সন্তানকে। সমাজের চোখে নিজেকে অসৎ বানিয়ে সন্তানকে মানুষ করেছে আঁড়ালে। অথচ সেই সন্তান আজ নেই। শোক পালন করেনি আর পাঁচটা মানুষের মত। সন্তানের উৎসবে শামিল হতে পারেনি, পারেনি সন্তানকে জড়িয়ে ধরে বলতে, তুই আমার সন্তান,আমার সাত রাজার ধন। পারেনি শামিল হতে সন্তানের শেষকৃত্যে। একেক মায়ের প্র/তি/শো/ধ একেক রকম। মেহেরজান আম্মার
প্র/তি/শো?ধ সবার চেয়ে ভিন্ন। ঠিক যতটা কষ্টে তার সন্তান ম*রে*ছে তার চেয়ে ঢের কষ্টে ম/র/বে অপরাধীরা। ছবিটা নিজের আলমারির গোপন কুঠুরিতে রেখে চোখে কালো চশমা লাগিয়ে দরজা খুললো। হাতে মখমলের পার্স। পরনে চকমকে জরির শাড়ি। হাঁক ছাড়লো।

– মকবুল গাড়ি বাইর কর।
আম্মাকে বের হতে দেখে কুঠির সবার মাঝে প্রাণ ফিরে এলো। সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে বললো,
– জোনাকি আর আসমারে ক আমার লগে আইতে। খালেদ পারভেজ খবর পাঠাইছে ইশকুলে যাইতে হইবো।
জোনাকি এবার এস এস সি দিবে, আসমা এইচ এস সি। দুজনের রেজিষ্ট্রেশন প্রক্রিয়া চলছে। মেহেরজান আম্মার মেয়েগুলোর এই কাজটা খালেদ পারভেজ করে দেয়। তার বিনিময়ে আম্মার মেয়ে গুলোকে অবশ্য মাশুল গুনতে হয়। আসমা,জোনাকি কুঠি বাড়ির সবচেয়ে আদরের কন্যাদ্বয়। এরা দুজনই খালেদ পারভেজ এবং ফরিদের কেনা। আম্মার শর্ত অনুযায়ী এই দুজনকে কাছে পাবে এদের পরীক্ষার পর। তাই এদের সব কিছুর দায়িত্ব আপাতত ফরিদ এবং পারভেজের। সবাই আতঙ্কে থাকে আম্মা মেয়েদের নিয়ে বের হলে। বের হওয়ার সময় শক্ত গলায় কুঠি বাড়ির দারোয়ানকে সকলের সামনে বললো,

– তমজিদ কুঠির দুয়ার খুলবিনা আমি আসা অবধি। যদি কথার হেরফের হয় তোর গর্দান আর আমার ছোরা।
মাথা ঝুঁকে সম্মতি জানালো,
– জ্বি আম্মা।
– মাইয়ারা সব ভিত্রে যাও।
সবাই ভেতরে যেতেই তমজিদকে পুনরায় বলে,
– তুই কুঠিতে পা বাড়াবিনা।
– জ্বি আম্মা।
গাড়ি চলছে ঢাকার উদ্দেশ্যে। একটু একটু করে উদ্দেশ্য সফল হতে যাচ্ছে।

‘ এবার তো ফেঁসে গেছে শাহাদ, বেঁচে আসলে মান সম্মান শেষ আর ম*রে গেলে তার পরিবার শেষ। যে ভাইটা আছে ওটা আহাম্মক।’
পারভেজ কথাটা বলেই খ্যাক খ্যাক করে হাসছে। সেই সাথে হাসছে ফরিদ। মনিকার সংগ্রহ করা রিপোর্ট এখন ফরিদের হাতে। শাহাদের চাল বুঝতে পারেনি তো কি হয়েছে,শাহাদকে ফাঁ/সা/তে এই রিপোর্টই যথেষ্ট। অহনার রিপোর্ট উদ্ধার হলে আর কোনো বাঁধাই থাকবেনা।
পকেটে বেজে উঠলো ফরিদের ফোন। ফোন রিসিভ করতেই ও পাশ থেকে সালাম ভেসে আসলো,

– আসসালামু আলাইকুম ফরিদ সাহেব।
– কে?
– গেম খেলা শেষ?
– মানে! কে বলছেন?
– আপনার যম। রিপোর্ট টা সুন্দর করে হামার লোক আছে আপনার সামনে তাকে দিয়ে দিন।
ফরিদ সামনে তাকিয়ে দেখে রিসোর্টের দরজার সামনে একজন পোস্টম্যান দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা খাম। ক্ষেপে গিয়ে ফরিদ ফোনে বলল,
– এই তুই কে রে? কিসের রিপোর্ট দিব।
– বললাম না আপনার যম। রাশেদের রিপোর্ট টা দেন।
– দিবনা কি করবি? এ্যাই কে কোথায় আছিস। এই ছেলেকে ধর।
কেউ এলো না। খালেদ পারভেজ ভয় পেয়ে গেলো। সামনে দাঁড়ানো পোস্টম্যান হাসছে। ফরিদ ডাকাডাকি করেও লাভ হয়নি। পোস্টম্যান পকেট থেকে আয়রনের যন্ত্রটা বের করে বললো,
– চুপ থেকে দিয়ে দিন। আমি কিন্তু আপনার আত্নীয় না যে দয়া দেখাবো।
খালেদ পারভেজ রিপোর্ট টা কেড়ে নিলো ফরিদের হাত থেকে। সে কিছুতেই দিবেনা। ঠিক তখনই সজোরে এক ঘুষি পড়লো নাক বরাবর। ছিটকে গেলো দূরে। ফরিদ নিজেকে শান্ত রেখে রিপোর্ট হাতে দিয়ে দিলো। পোস্টম্যান বের হবার আগে বললো,

– মন্ত্রীত্ব নিজের আস্তানায় ভালো। আস্তানা থেকে তিনশ ছয় কিলোমিটার দূরত্বে কুকুর বেড়াল তো দূরের কথা মানুষ ও পাত্তা দিবেনা আর এটাতো পাহাড়।
ততক্ষনে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন। ফরিদ চেঁচিয়ে উঠলো,
– এই শাহাদ কাঁচা মাল না! কিছুতেই কেনো ওকে ধরতে পারছিনা ওর চাল? ম*র*ন দশা চলছে শা*লা*র। বিদেশ থেকে ও নাজেহাল করে তুলছে আমাদের। এত সোর্স আর পাওয়ার আসে কি করে ওর!

নিজের চুল নিজে টানছে। তবে ফোনের ওইপাশে থাকা গলা টা সম্পূর্ণ অপরিচিত। টোন বলছে বিদেশী ভাষাভাষীর লোক। মস্তিষ্কে আর প্রেশার দিলোনা। খালেদ পারভেজকে উঠিয়ে সোজা দরজার বাইরে আসলো। এসে যা দেখেছে তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলোনা। গার্ড সহ দলের প্রতিটি ছেলে কেমন অচেতন হয়ে পড়ে আছে। তাদের নাকের কাছে হাত দিতেই দেখলো শ্বাস চলছে। পুলিশকে খবর দিলোনা কেইস খেয়ে যাবে। নিজের দলের আরেকটা ছেলেকে খবর পাঠালো যার আস্তানা এই পাহাড়েই। ছেলেটা আদিবাসী, নাম মগাই। আসতেই বাকিদের নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। ডাক্তার এসে খালেদ পারভেজকে দেখে গেলো। ঔষধ দিলো।
কিছুক্ষন পর মগাই ফোন দিলো ফরিদকে,
– স্যার ওদের কে ডেভিল’স ব্রেথ দিয়েছে। অতিরিক্ত পাওয়ারফুল হওয়াতে ওরা চেতনা হারিয়েছে। কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। বাঁচবে কিনা সন্দিহান।
– ঠিক আছে থাকো ওখানে, যা খরচ লাগে দিব।

লেফটেন্যান্ট তানভীর, লিমন, পাভেল এবং শাহীন আজ মুখোমুখি। চাপা সত্য আজ বের করেই ছাড়বে। শাহাদ ব্যতীত আরো একজন রাশেদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী যাকে শাহাদ আড়ালে রেখেছিলো এত বছর। আজ তানভীর নিজ থেকে মুখ খুলবে বলেছে। দেশের পরিস্থিতি খুব খারাপের দিকে। যে কোনো সময় যা তা ঘটে যেতে পারে।
সকলের অনুরোধে তানভীর বলা শুরু করলো,

– তিনবছর আগে গেট টুগেদার ছিলো শিপে আপনারা তো জানেন। সেদিন রাতে স্যার নতুন সাবমেরিনের সন্ধান দিয়েছিলো আমাদের যা আমাদের জন্য বিপজ্জনক ছিলো। সমুদ্রসীমার বিপজ্জনক কিছু দেখলেই স্যারের সেন্স খুব দ্রুত কাজ করে। সকাল বেলা সবাই নাস্তার পর ঘুরাঘুরি করছিলো। ক্যাপ্টেন আলতাফের বোনের নজর ছিলো স্যারের দিকে। স্যার ব্যাপারটা বুঝতে পারে। হঠাৎ করে অহনা সকলের সামনে এসে রাশেদ ভাইয়ের সাথে রসিয়ে রসিয়ে কথা বলছিলো। আমি আর রাহাত তো হতবাক।এই মেয়ে কি পল্টিবাজ! রাতে স্যারের সাথে ঘেষছিলো আর এখন রাশেদ স্যার! রাশেদ স্যার ব্যাপারটা নজরে নেয় নি। স্যার বলেছিলো শাহাদ স্যারের ইনফরমেশন জানতেই এসেছে। বাকিদের নজরে এলো ব্যাপারটা। কিছুক্ষন পর স্যার কন্ট্রোল রুমে সবাইকে নিয়ে বসলো সাবমেরিনের ব্যাপারে ডিসকাস করতে। আলোচনা শেষ করে সকলকে জানালো আজ রাতে সতর্ক থাকতে কারণ বি এন এস সমুদ্র জয় আজ বঙ্গোপসাগরে একটা ইম্পোরটেন্ট মিশনে আছে। স্যার রাতেই রওয়ানা হবে। রাশেদ স্যারের গায়ে জ্বর চলে এসেছে সন্ধ্যায়। স্যার বাধ্য হয়ে আমাকে আর রাহাতকে রেখে গেলো স্যারের দিকে খেয়াল রাখতে। উনি আরো দুজন লেফটেন্যান্ট নিয়ে রওয়ানা দিলেন। কালকের মধ্যেই চলে আসবেন। এই দূর্ঘটনার সূত্রপাত এখানেই…
দম ফেললো তানভীর। ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে।
লিমন কাঁপা গলায় বললো,

– এরপর…
– এরপর রাত একটা বারো তে অহনা স্যারের কেবিনে ঢুকলো। আমি ওকে ঢুকতে দেখেছি। ভাবলাম রাশেদ স্যারকে দেখে বেরিয়ে যাবে। শাহাদ স্যার এবং রাশেদ স্যার একই কেবিন নিয়েছেন। কিন্তু বের হলো কাঁদতে কাঁদতে। ওকে বের হতে দেখে আমি রাশেদ স্যারের কেবিনে গিয়ে দেখি স্যার শুয়ে আছে জিজ্ঞেস করলাম, স্যার অহনা কাঁদছিলো কেনো। রাশেদ স্যার বিরক্ত নিয়ে বলে, মেয়েটা জাতের খাটাশ। দেখবেনা আমি কে? মানলাম তুই শাহাদকে ভালোবেসেছিস একদিনে, তাই বলে আমি শুয়ে আছি পেছন দিক থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরে এলোপাতাড়ি চু*মো খাচ্ছে। হা**মি একটা। একে তো জ্বরের শরীর তাল সামলাতে না পেরে এক চ/ড় দিয়েছি। আমাকে আমার তাহি ছাড়া কেউ ছুঁয়েও দেখেনি আর এই মেয়ে কিনা। ঘে*ন্না লাগছে।

সায়রে গর্জন পর্ব ২৭

এরপর আমাকে দেখে বিব্রত হয়ে গিয়েছে। একবার ভাবো শাহাদ থাকলে কি হত! ওকে তুলে শিপ থেকে ফেলে দিত। বাদ দাও, এসব কাউকে বলো না। শাহাদ আসলে বুঝিয়ে বলবো।’ এরপর আমি স্যারের পাশের বেডে শুয়ে পড়লাম তার অনুরোধে। তখন জ্বর কিছুটা কমেছে। ভোর ছয়টা সাতচল্লিশে শুনি অহনা রেপড,সুইসাইড করেছে। স্যার বিশ্বাস করবেন না তখন এতজোরে ঝটকা খেয়েছি, মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠেছিলো। রাশেদ স্যার সহ ছুটে গিয়েছি। ওই মেয়ের একটা ভুলের জন্য ফেঁসে গিয়েছে রাশেদ স্যার।
– এখানে রাশেদ ভাই কিভাবে ফাঁসলো। তুমিও ফাঁসতে পারতে?
– কারণ অহনার ফোনের ছবি আর রাশেদ স্যারের পরনে শাহাদ স্যারের শার্ট।

সায়রে গর্জন পর্ব ২৯