শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৬
সুরভী আক্তার
এদিকে সকালের আলো ফুটেছে। বেলা গড়িয়েছে অনেকটা। অনেক বেলা অবধি ঘুমিয়ে সবে উঠেছে সংগ্রাম। সকালের নাস্তা খাওয়া শেষ সবার। শ্যামা কে ঘরে না পেয়ে সোজা নিচে নেমেছে সংগ্রাম। অন্দরে লতিফা আর সালেহা বসে। সুপারি কেটে টুকরো টুকরো করে কৌটায় ভরে রাখছে লতিফা। হাতের সাথে মুখ চালিয়ে সালেহার সাথে গল্পে ব্যাস্ত। ছোট্ট একটা কাঁথা ফেলেছেন সালেহা, সোফায় পা তুলে বসে সেটাতেই একে একে সেলাই বসাচ্ছেন তিনি। সংগ্রাম সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে এদিক ওদিক তাকালো। শ্যামা কে দেখতে না পেয়ে হাই তুলতে তুলতে একেবারে নিচে নামলো। সালেহা, লতিফা চোখ তুলে সংগ্রাম কে এক পলক দেখে চোখ সরিয়েছে অবলিলায়। সংগ্রামের চোখ শ্যামা কে না পেয়ে শবনম কে খুঁজলো। কাউকেই পেলো না। অবশেষে ওর দাঁড়িয়ে থাকার মাঝেই হেঁশেল থেকে বেরিয়ে আসলো শ্যামা। মুখে হাসি। সংগ্রাম কে দেখেনি ও। শ্যামা সোজা এগোলো সালেহা আর লতিফার দিকে। দুজনের সামনে দাঁড়াতেই চোখ তুললেন তারা। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না মুখায়বে। শ্যামা হাতের ট্রে থেকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে বলল…
” আপনাদের চা.. আম্মা।
সালেহার তপ্ত আওয়াজ….
” রেখে যাও। সংগ্রাম উঠেছে, ওর খাবারের ব্যবস্থা করো গিয়ে।
শ্যামা এবার তাকালো সিঁড়ির দিকে। সংগ্রামের সাথে চোখাচোখি হতেই লাজুক মুচকি হাসলো। সংগ্রাম কপাল কুঁচকে চেয়ে আছে। সামনের দৃশ্যটা ঠিক হজম হলো না ওর। ও বলল না কিছু, চোখে শ্যামা কে ইশারায় বোঝালো কিছু। অতঃপর ফের উপরে উঠে গেল গটগট পায়ে। সালেহা একবার আড়চোখে ছেলে কে পর্যবেক্ষণ করে নিলেন।
শ্যামা চা নিয়ে ঘরে এসে দেখে সংগ্রাম ঘরে নেই। বারান্দায় দাঁড়িয়েছে ও। দুহাত বুকে গুটিয়ে সামনের দিকে চেয়ে আছে। ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে শ্যামা ডাকলো শ্রুতি মধুর মিষ্টি স্বরে…
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” ছোট জমিদার সাহেব…?
সংগ্রাম ফিরলো চকিতে। শ্যামা কে দেখে মুচকি হাসলো। শ্যামার ঠোঁট থেকে হাসি সরছেই না আজ। ও এগিয়ে যেতে যেতে হাসি ভরা সুপ্ত স্বরে বলল…
” আম্মা বোধহয় আমাকে মেনে নিতে শুরু করেছে ,, জানেন? আজ আম্মা নিজে থেকে আমার সাথে কথা বলেছে। আমাকে হেঁশেলে যেতে বলেছে নিজেই। আমাকে চা’ও বানাতে বলেছে। আমার হাতের চা খেয়েছেও….
সংগ্রামের ভাবভঙ্গি দূর্বোধ্য। ও বোধহয় অন্যমনস্ক। শ্যামার কথা গুলো শুনেছে ঠিক, তবে কথার উত্তরে কোনো কথা বললো না। শ্যামা চেয়ে আছে নীরবে। অপেক্ষায় আছে সংগ্রামের কিছু বলার। দীর্ঘ সময় বাদ সংগ্রাম কথা ঘুরিয়ে বললো….
” চোখ লাল হয়ে আছে তোমার, ঠান্ডা লেগেছে বোধহয়। যাও, গিয়ে গায়ে চাদর জড়িয়ে এসো।
শ্যামার মুখখানা সূক্ষ্ম হলো। সংগ্রামের দ্বিমুখতা দেখে কথা টেনে খানিক টা ইতস্তত করেই বললো…
” আপনি আজকাল আম্মার সাথে তেমন কথা বলেন না, কেনো? আগেও এমন ছিলেন?
সংগ্রাম শ্যামার হাত থেকে চায়ের কাপ নিলো। এক চুমুক বসিয়ে বারান্দার কর্নিশ ঘেঁষে দাঁড়ালো। অদূরে তাকিয়ে বললো…
” আগে কেমন ছিলাম সেটা জানতে হবে না তোমায়, এখন কেমন আছি সেটাই দেখো, এভাবেই চিনে রাখো আমায়। তোমার কাছে তোমার ছোট জমিদার সাহেব এমনই…আর এমনই থাকবে..
যদি চিনতে ত্রুটি রেখে থাকো, তাহলে ত্রুটি মুক্ত করে নাও। এটাই আমি…
” আগে কেমন ছিলেন একটু একটু জানি আমি !
শ্যামা ধীর কন্ঠে বলল। সংগ্রাম কপাল কুঁচকে চেয়ে শুধালো….
” তাই? তা, কেমন ছিলাম? শুনি আমার বেগমের মুখে? সে কি আগে থেকেই চেনে আমায়?
শ্যামা মাথা নোয়ালো, বললো…
” আপনার অনেক অভ্যাসেই পরিবর্তন এসেছে। ভাবি বলেছে আমায়..
” যেমন ?
শ্যামা ভাবলো খানিক। এগিয়ে সংগ্রামের পাশাপাশি দাঁড়ালো। সহজ ভঙ্গিতে পাল্টা শুধালো…
” আপনি আগে রাতে বাড়িতে ফিরতেন না, এখন ফেরেন। আচ্ছা, তখন কোথায় থাকতেন আপনি?
” মুকুন্দপুরে আমাদের ছোট্ট একটা ‘সুখের নীড়’ আছে,, সেখানেই থাকতাম ।
” সুখের নীড়?
” হুম, দাদুর আমলে বানানো। দাদি জান সখ করে নাম রেখেছিল – সুখের নীড়’। কেউ থাকে না ওখানে, আমি থাকতাম মাঝে মাঝে। তবে এখন তো আর তেমন যাওয়া হয় না। তোমায় ছেড়ে কোথায় যাবো আমি? তবে ভাবছি, পরের সপ্তাহে তোমায় নিয়ে যাবো ওখানে। যাবে?
শ্যামা উত্তর করলো না। আবার শুধালো….
” ওখানে কি খেতেন?
সংগ্রামের চাহনি সূক্ষ্ম হলো। সে দ্বিরুক্তিহীন বললো….
” রান্না করার লোক আছে, বাড়ির দেখা শুনায় আছেন তারা। ওরাই রান্না করে দিতো।
” কে আছে?
” একটা পরিবার!
” কার পরিবার?
সংগ্রাম মুখোমুখি হলো শ্যামার। শ্যামার কন্ঠ খানিক শক্ত ঠেকছে। চোখের চাহনি ও নিরেট। অদ্ভুত লাগলো সংগ্রামের কাছে। ও প্রশ্ন করলো….
” কি হয়েছে বলোতো, বেগম? হঠাৎ এসব জিজ্ঞেস করছো যে?
চোখ সরালো শ্যামা। অধর ভিজিয়ে বললো…
” এমনি, জানতে ইচ্ছে হলো। আপনি তো এসব বলেন নি কখনো।
” তুমি তো জানতে চাওনি!
” আপনিও বলেন নি!
” জানতে চাও আমার বিষয়ে?
শ্যামা ধীরে নিঃশব্দে শ্বাস ফেললো। বললো না কিছু। এতক্ষণ মুখে হাসি থাকলেও এখন মুখায়ব মলিন। শ্যামার মুখ পানে তাকিয়ে থাকার মাঝেই কিছু একটা মনে পড়লো সংগ্রামের। তৎক্ষণাৎ শ্যামার সম্মুখ থেকে চটজলদি ঘরে ঢুকলো ও। শ্যামা ওকে এভাবে যেতে দেখে তাকালো চকিতে। কালকে রাতের টেবিলের উপর রাখা প্যাকেট টা নিয়ে এক মুহুর্তেই ফিরে আসলো সংগ্রাম। চোখের ইশারায় শ্যামা কে প্যাকেট টা দেখিয়ে ভ্রু নাচালো। শ্যামা সন্দিহান হয়ে তাকিয়ে আছে। একবার সংগ্রামের দিকে তো আর একবার ওর হাতের দিকে। শ্যামার চাহনি দেখে স্বভাব সুলভ আলতো ঠোঁট কামড়ে হাসলো সংগ্রাম। শ্যামার এক হাত টেনে পাশের বেতের চেয়ারে বসাতে বসাতে বললো…
” বসো…
অতঃপর প্যাকেট টা খুলতে আড়ম্ভ করলো সংগ্রাম। শ্যামা প্রশ্ন করলো হালকা কন্ঠে…
” কি আছে এতে?
” নিজের চোখেই দেখে নাও!
প্যাকেট থেকে সোনালী রঙের চিকন দুটো নুপুর বের করলো সংগ্রাম। দুই আঙ্গুলে নুপুরের এক মাথা ধরে তা ধরলো শ্যামার সম্মুখে। অক্ষি যুগল বড় বড় করে চাইলো শ্যামা। সংগ্রাম স্মিথ হেসে নুপুর দুটো দুদিকে ঝাঁকিয়ে আলতো ক্ষিন শব্দ তুলে বললো…
” আমার বেগমের জন্য ছোট্ট উপহার !
” আমার?
শ্যামার সন্দিহান কন্ঠস্বর। সংগ্রামের প্রতি উত্তর…
” আমার বেগম আর কে?
ফের বললো…
” আমাদের বিয়ের পর আজ অবধি তোমাকে কিছু দিতে পারি নি। দেই নি কিছু। এটা আমার পক্ষ থেকে আমার বেগমের জন্য প্রথম এবং সামান্য একটা উপহার। এটা কি গ্রহণ করবে আমার বেগম?
শ্যামা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ঝুলিয়ে নরম নেত্রে চেয়ে দেখলো। নুপুর জোড়া সোনার। একদম চিকচিক করছে। বারান্দায় এক ফালি মিঠে রোদের সোনালী আলোর ঝিলিক এসে নুপুর জোড়ার জ্বৌলুস আরো বাড়িয়ে দিয়েছে যেন। অতি সূক্ষ্ম কারুকার্য খচিত সুন্দর এক জোড়া শিঞ্জিনী।
শ্যামা বললো…
” বর্জন করার ক্ষমতা নেই আপনার বেগমের!
চোখ নামিয়ে হাসলো সংগ্রাম। খানিক রসিক স্বরে অভিবাদনের ভঙ্গিতে বললো…
” ধন্যবাদ বেগম…
আপনার এই ছোট জমিদার সাহেব ধন্য হলো এতে।
হেসে ফেললো শ্যামা। সংগ্রাম তাল মিলিয়ে হেসে শ্যামার পায়ের দিকে হাত বাড়াতেই তৎক্ষণাৎ পা সরালো শ্যামা।
” কি করছেন?
” পড়িয়ে দেই পায়ে!!
” না , না , ছিঃ ছিঃ ..
আপনি আমার পায়ে হাত দিতে যাবেন কেনো? আমায় দিন, আমি পড়ে নেবো!
” তোমার পায়ে হাত দিলে কি হবে?
শ্যামা কিছু না বলে সিটিয়ে গেলো ইতস্ততায়। সংগ্রাম বুঝলো ওর ভাবগতিক। তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো গুরুগম্ভীর স্বরে…
” বাঁধা দিও না…
বলেই হাত বাড়াতে গেলে এবার এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালো শ্যামা।
” না…এমনটা করবেন না দয়া করে। আমায় দিন, আমি পড়ে নেবো। আপনি আমার স্বামী, আর আমি আপনার অনেক ছোট। আমার পায়ে আপনার হাত দেওয়া টা খারাপ দেখায়। আপনি আমার পায়ে হাত দিলে অস্বস্তি হবে আমার।
” আমি তোমার স্বামী, আর তুমি আমার স্ত্রী। আমার থেকে ছোট হওয়ার দোহাই দিচ্ছো? অথচ,,আমার স্পর্শে এর থেকেও হাজার গুণ বেশি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছো তুমি। এটা এমন আর কি!
শ্যামা মাথা নোয়ালো। ঠোঁট টিপে কথা গুলো বলে থামলো সংগ্রাম। ফের বললো… এবার মোলায়েম কন্ঠস্বর..
” কুসংস্কারে আচ্ছন্ন থেকো না। আমি জানি তুমি কি ভাবছো। যা ভাবছো, আর যার জন্য ইতস্তত বোধ করছো, সেসব অহেতুক ধারনা। তোমার পায়ে হাত দিলে কিচ্ছু হবে না।
” না তবুও। আপনি আমার পায়ে হাত দেবেন না। সরুন,, উঠুন আপনি। আপনি আমার জন্য এটা নিয়ে এসেছেন এটাই অনেক।
সংগ্রাম এবার বিরক্ত হলো। শ্যামার হাত টেনে বসালো ওকে। এবার রাশভারী কন্ঠে বললো…
” স্বামীর অবাধ্য হতে নেই। যদি আর একটা কথা বলো, তাহলে ভালো হবে না বলে দিলাম..
চুপ চাপ বসে থাকো। যদি বেশি অসুবিধাই হয়, তাহলে চোখ বন্ধ করে রাখো। আমাকে বাঁধা দিয়ে লাভ নেই, শুনবো না আমি।
বলতে বলতে শ্যামা পায়ে হাত রাখলো। শ্যামা ঠোঁট উল্টে আহত চোখে তাকালো। সংগ্রামের কথা অনুযায়ী পরক্ষনে চোখ বন্ধ করলো। সংগ্রাম এক পলক চোখ উঁচিয়ে শ্যামা কে দেখে বাঁকা হাসলো। হাঁটু মুড়ে বসা অবস্থায় শ্যামার এক পা নিজের হাঁটুর উপর রেখে অতি যত্নে নুপুর পড়িয়ে দিলো। অন্য পায়েও একই ভাবে। শ্যামার পা সংগ্রামের ঊরুর উপর। সংগ্রাম শ্যামার দুই পায়ের দিকে চেয়ে থাকল কয়েক পলক। চিকন নুপুরের ছোট্ট ঘুঙুরে আলতো টোকা দিয়ে শব্দ তুললো ক্ষিন। উক্ত ক্ষিন শব্দে ধীরে ধীরে চোখ খুললো শ্যামা। সাথে সাথে চোখাচোখি হলো সংগ্রামের সাথে।
সংগ্রাম ভ্রু নাচাতেই শ্যামা চোখ নিচু করে পায়ের দিকে তাকালো। ওর তাকানোর ফুরসৎ পেরোতে না পেরোতেই সংগ্রাম মাথা ঝুকিয়ে ঠোঁট ছোঁয়ালো তার বেগমের পায়ের উপরি পিঠে। তৎক্ষণাৎ বিদ্যুৎ বেগে এক ঝটকায় পা সরালো শ্যামা… হন্তদন্ত হয়ে বললো..
” কি করছেন আপনি?
সংগ্রাম তৎক্ষণাৎ উত্তর করলো না। শ্যামা কোলের উপর নিজের দুহাত আড়াআড়ি ভাবে রেখে থুতনি ঠেকালো হাতের উপর। স্নিগ্ধ চোখে চেয়ে হিমশীতল কন্ঠে বলল…
” ভালোবাসছি আমার বেগম কে!
” আপনি অদ্ভুত ছোট জমিদার সাহেব,, আপনার ব্যাক্তিত্বের সাথে এসব মানায় না। আমার মতো মেয়ের জন্য নিজের ব্যক্তিত্ব কে হীন করছেন না তো আপনি?
” তোমার মতো মেয়ে নয়, তোমার জন্য। তবে ব্যাক্তিত্ব কে হীন করছি না, তোমার জন্য নতুন করে জাগ্রত করছি নিজের প্রেমিক পুরুষালি সত্ত্বা কে। আমার কঠোর ব্যাক্তিত্ব অন্যদের সামনে তুলে ধরার জন্য। তোমার জন্য নয়। তোমার জন্য শুধু আমার প্রেমিক সত্ত্বা। আমি আমার বেগমের প্রেমিক পুরুষ।
তা বলুন বেগম,, উপহার পছন্দ হয়েছে আপনার?
” ভীষণ..
উঠে দাঁড়ালো সংগ্রাম। চায়ের কাপ আবার হাতে তুলে বারান্দার কোণার দিকে দাঁড়ালো। চুমুক বসানোর জন্য চায়ের কাপটা ঠোঁটের সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতেই থমকালো সেখানে। দৃষ্টি নিচে পড়তেই কপাল কুঁচকালো সংগ্রাম। শ্যামা উঠে দাঁড়িয়ে বলতে বলতে এগোলো…
” আপনি তো আমায় উপহার দিলেন ছোট জমিদার সাহেব,, আমি তো এখনো কিছুই দিতে পারলাম না আ….
আর কিছু বলতে পারলো না শ্যামা। সংগ্রাম এক মুহুর্তের মধ্যেই শ্যামার বাহু ধরে ওকে এক ঝটকায় পিছনের দিকে দেয়ালের সাথে ঠেসে ধরল। সংগ্রামের হাতের চায়ের কাপ টা মেঝেতে পড়ে ঝড়ঝড়িয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে মুহূর্তেই।
আকস্মিক এমন এক প্রকার জোর আক্রমণে খেই হারিয়ে বড় বড় চোখে চাইলো শ্যামা। সংগ্রাম শ্যামার পিঠের পিছনে দেয়ালে হাত দিয়ে শ্যামা কে ব্যাথা পাওয়া থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছে। শ্যামার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠেছে মুহূর্তেই। ঝটকা পেয়ে গলা শুকিয়ে এসেছে। সংগ্রামের চোয়াল শক্ত। শ্যামা কম্পিত দৃষ্টিতে তাকিয়েই শুকনো ঢোক গিলে মিনমিন করলো…
” ক..কি হলো ছোট জমিদার সাহেব?
শ্যামার বাহুতে নিজের শক্তিশালী হাতের বাঁধন আলগা করলো সংগ্রাম। মুহুর্তেই শক্ত চোয়াল নরম করে বললো…
” কিছু না। ঘরে যাও..
শ্যামার অদ্ভুত ঠেকলো। পুনরায় ঢোক গিললো ও। চোখের চাহনি ভীত। জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে শ্যামা আবার শুধালো…
” কি হয়েছে, ছোট জমিদার সাহেব?
” বললাম কিছু না। ঘরে যেতে বলেছি আমি। চলো ঘরে….
শ্যামার হাত ধরে টেনে হিড়হিড়য়ে ঘরের ভেতর ঢুকলো সংগ্রাম। শ্যামা আহাম্মকের ন্যায় বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে সংগ্রামের পানে। ঘরে এসে শ্যামার হাত ছাড়লো সংগ্রাম। শ্যামার দিকে ফিরে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল…
” আমি বাইরে যাচ্ছি।
শ্যামা অবাক লোচনে চেয়ে আছে। ওর এমন চাহনি দেখে সংগ্রাম বললো…
” কি হলো,, বেগম? কি দেখছো?
চেয়ে থেকেই দুদিকে মাথা নাড়ালো শ্যামা। সংগ্রাম হাসলো। বোধহয় জোর পূর্বক। শ্যামার মুখখানি দুহাতের আজলে নিয়ে বরাবরের ন্যায় শব্দ করে চুমু খেলো কপালে। শ্যামার নড়লো না একটুও। অন্যদিনের মতো লাজুকতায় মুখ নামালো না আজ। অনূভুতিতে আবেশিত হয়ে চোখ দুটোও বুজলো না। ও মূক বনে চেয়ে আছে। সংগ্রাম ওর ভাবভঙ্গি দেখে বললো মোলায়েম কন্ঠে…
” নিচে, অন্দরের বাইরে গ্রামের কিছু লোক এসেছে। ওরা উপরে চোখ তুলে দেখেছে আমায়। যদি তোমায় দেখে ফেলতো? তাই তোমায় ঘরে নিয়ে আসলাম।
এখন আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত ঘরেই থাকবে তুমি। বাইরে বেরোবে না একদম। ঘরের বাইরে যেনো পা না পড়ে তোমার। ভাবি খাবার দিয়ে যাবে, সেটাই খাবে। আমি বালা কে বলে যাচ্ছি , ও থাকবে তোমার সাথে।
কথা গুলো বলে থামলো সংগ্রাম।
হাত বাড়িয়ে খাটের একপাশ থেকে কালকের শালটা হাতে তুলে নিলো। সেটাই জড়ালো গায়ে। আড়াআড়ি ভাবে শালটা গায়ে জড়িয়ে গটগট পায়ে বের হলো ঘর থেকে।
শ্যামার চাহনি এখনো আগের ন্যায়। সংগ্রাম চৌকাঠ পেরিয়ে ফের পিছন ফিরেছে। শ্যামার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখায় নি আর। বরং নিজ হাতে দরজাটা টেনে চাপিয়ে দিয়েছে সে।
অতঃপর চোয়াল শক্ত করেছে পুনরায়। হাত মুঠো করে চোখ বুজে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে এনে সিঁড়ি বেয়ে নেমে বেরিয়ে গেছে একেবারে। আর তাকায় নি কোনো দিকে।
অন্দরের বাইরে বেরিয়ে সর্বপ্রথম সংগ্রামের সামনে পড়েছে তহুরা। তহুরা’র সাথে রিক্তা আর জবাও আছে। ওরা বোধহয় অন্দরের দিকে ঢুকছিলো। সংগ্রাম কে দেখে থেমেছে। সংগ্রাম চলমান অবস্থায় এক ঝলক দেখে নিয়েছে ওদের। পাশ কাটাতে গেলে তহুরা কন্ঠ খাদে নামিয়ে ডাকলো…
” ছোট জমিদার..
দাঁড়ালো সংগ্রাম। চরম বিরক্তি নিয়ে কটমট করে তাকালো পিছনে। কপালের শিরা উপশিরা দৃশ্যমান সংগ্রামের। চোখ রক্তিম। দেখেই বোঝা যাচ্ছে রেগে আছে প্রচুর। সংগ্রামের অমন তিক্ত কটমটে চাহনি দেখে শুল্ক ঢোক গিললো তহুরা। পাশ থেকে রিক্তা বললো….
” আমরা আপনার স্ত্রীর সাথে একবার দেখা করতে পারি ছোট জমিদার? আসলে, কাল সুরবালার মুখে শুনেছি ওনার কথা। দেখিনি তো, তাই আর কি। যদি আপনার সমস্যা না থাকে….
” যাও ভেতরে….
গম্ভীর গলায় এই টুকু নি বলেই ফের গটগটিয়ে স্থান ত্যাগ করলো সংগ্রাম। প্রধান ফটকের বাইরে একজন দাঁড়িয়ে। পুরো শরীর কালো চাদরে মোড়ানো তার। পড়নের সাদা লুঙ্গি টার নিচের অংশ আর চোখ দুটো দৃশ্যমান। গেটের বাইরে দেয়াল ঘেঁষে একপাশে গুটিসুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। সংগ্রাম কে দেখে একটু এগোলো। সংগ্রামের সামনে এসে মাথা ঝাঁকিয়ে ইঙ্গিতে বোঝালো কিছু। অতঃপর দুজনে চললো একই পথে।
অন্দর পুরো ফাঁকা। এদিক ওদিক তাকিয়েও কাউকেই নজরে ঠেকলো না। হেঁশেল থেকে ঝাঁজালো গন্ধ নাকে লাগছে। রান্না চলছে। জবা আশে পাশে চোখ ঘুরিয়ে বললো…
” কেউ তো নেই এখানে…
উপরে যাবি? এভাবে আমাদের যাওয়া টা কি ঠিক হবে?
” সুরবালা আছে তো। চল ,,, ওর কাছে যাই আগে। ওর ঘরটা তো দেখেছিলাম সেইদিন।
তহুরা’র কথায় বিরক্ত হলো জবা। চোখ মুখ কুঁচকে খিটখিটে তপ্ত স্বরে বলল…
” আবার ঐ মেয়েটা কে টানছিস কেনো এখানে?
” ঐ মেয়েটা নয়,, ওর একটা সুন্দর নাম আছে। আর এটা ওরো বাড়ি। ওর কাছেই চল ,, ওই আমাদের ছোট জমিদারের ঘরে নিয়ে যাবে।
রিক্তা মেয়েটার উপর কথা বলে না কেউই। এবারও বললো না। ও ওদের সহপাঠী হলেও সবাই বেশ মেনে চলে ওকে। এই দিক দিয়ে অংকুর ও সবার মতোই। আর কাউকে পাত্তা না দিলেও রিক্তা কে বেশ ভালো মতোই মেনে চলে। মেনে চলে বলতে গেলে, বাকিদের তুলনায় রিক্তার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করে অংকুর।
রিক্তার কথা মতো সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে বালার ঘরের দিকে এগোলো ওরা। এগোতে এগোতে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে তহুরা। সামনের ঘরটাই সংগ্রামের। বাইরে থেকে চাপানো। উঁকি দিলে ভেতরটা দেখা যাবে। তহুরা একটু থেমে টিপে টিপে কয়েক পা এগোলো দরজার দিকে। অমনি চাপা স্বরে খেকিয়ে উঠলো রিক্তা….
” এই,, কি করছিস? আসবি এদিকে?
চমকে উঠে মিনমিন করলো তহুরা…
” না মানে, যাচ্ছি তো। চল না….
পা চালাতে চালাতে জবা বলে উঠলো….
” কি অদ্ভুত না? এতো বড় জমিদার বাড়ি, অথচ মানুষ নেই! দূরবীন দিয়ে খুঁজলেও একটা মানুষ ও পাওয়া যাবে না ঘরের বাইরে। এরা সারাদিন এতো ঘরে বসে বসে কি করে বলতো? বিরক্তি আসে না এদের। নাকি জমিদার বংশের মানুষদের বিরক্তি নেই?
বালার ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে বাইরে থেকে ঘরের দরজায় দুবার টোকা মারলো রিক্তা। তিন বারের বেলায় দরজা খুলল বালা। সামনে রিক্তা, তহুরা আর জবা কে দেখে মুচকি হাসলো স্বভাব সুলভ। বললো উৎসুক হয়ে…
” আপনারা এখানে?
” হুম ,,, আবার আসলাম আজ। তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল ভীষণ। ভেতরে আসতে বলবে না আমাদের?
” এমা, এভাবে বলছেন কেনো? আসুন ভেতরে।
ভেতরে ঢুকলো সবাই। জবা এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে দেখলো, সাথে তহুরাও। মেয়েটার ঘরে বেশ দামী দামী আসবাব পত্র। ছোট্ট একটা ঘর, তবে বেশ গোছানো পরিপাটি। জবা চোখ ঘুরিয়ে বোধহয় খুঁজলো কিছু। তবে কাঙ্ক্ষিত কিছু না দেখে রুক্ষ স্বরে বলল….
” কি করছিলে ঘরে?
” কিছু না তো! এমনি বসে ছিলাম। বসুন আপনারা…
” একা একা বসে ছিলে?
” তো আর কে থাকবে আমার সাথে? আমি তো একাই !
রিক্তা বললো এবার…
” সবসময় একা থাকতে খারাপ লাগে না? এভাবে সারাদিন ঘরে একা একা থাকো, বন্দি লাগে না নিজেকে?
” বন্দি পাখি কখনো বন্দিত্বের স্বাদ বোঝে না আপা। সে তো অভ্যস্ত এসবে। বরং বন্দি পাখি যখন মুক্ত হয়, তখন সে তার বন্দি জীবন সম্পর্কে অবগত হয়। মুক্ত জীবনের স্বাদ পেয়ে, বন্দিত্বকে গরলের ন্যায় অনুভূত হয়। আমি তো বন্দি সেই ছোট বেলা থেকেই। তবে এই বন্দি জীবনের স্বাদ কিন্তু অমৃতের ন্যায় ছিল আমার কাছে। এখন ও আছে। শুধু সে নেই, যে আমাকে এই বন্দি জীবনে অভ্যস্ত করেছে। এই চার দেয়ালের মাঝে নিজেকে মানিয়ে নেয়া শিখে গেছি আমি। এখন মুক্ত জীবন পেলেও সেই জীবন যাপনের ইচ্ছে হয় না আর। এভাবেই ভালো আছি আমি।
রিক্তা বিমূঢ় হয়ে শুনলো কথা গুলো। বাকিদের মনযোগ নেই ওর কথায়। জবা তো কান দিয়ে শুনলেও মন দিয়ে শোনে নি। মুখ বাঁকালো সে। বালা নরম হেসে বলল…
” দাঁড়িয়ে আছেন কেনো আপা ,, বসুন…
” বসতে আসি নি আমরা।
জবার তিক্ত স্বর। তিক্ততার পরিবর্তে শান্ত কন্ঠ বালার….
” তাহলে আমার ঘরে আসার কারণ?
” আসলে, আমরা ছোট জমিদার সাহেবের স্ত্রী, মানে শ্যামা কে দেখতে এসেছিলাম আজ। ঐ যে কাল বললে না? শোনার পর থেকেই না দেখা অবধি শান্তি পাচ্ছি না। কে এই শ্যামা?
বালা এক গাল হাসলো তহুরার কথায়।
” তাই? তো চলুন ,, সংগ্রাম জোয়ার্দার ঘরেই আছে বোধহয়!
” উনি ঘরে নেই। বেরিয়েছেন বাইরে। ওনার থেকে অনুমতি নিয়েছি। তুমি আমাদের নিয়ে চলো…
দুদিন পর তো চলেই যাবো, শ্যামা কে না দেখলে মনটা খচখচ করবে।
” চলুন আমার সাথে…
বালা কে অনুসরণ করে পিছু পিছু এগোলো সবাই। সংগ্রামের ঘরের সামনে এসে বাইরে থেকে কড়া নাড়লো বালা। চাপানো দরজা ভেতর থেকে খুললো শ্যামা। বালার সাথে চোখাচোখি হতেই মুচকি হাসলো দু’জনেই। শ্যামা চোখ এপাশ ওপাশ করে সবাইকেই দেখে নিলো। নরম সুরে বললো…
” ভেতরে আসুন…
ভেতরে ঢুকেই তহুরা এদিক ওদিক চঞ্চল চোখে তাকিয়ে উত্তেজিত হয়ে ধড়ফড়িয়ে বললো….
” ছোট জমিদারের স্ত্রী, মানে ওনার বেগম কোথায় ?
বালা শ্যামার কাঁধ জড়িয়ে আলতো স্বরে বলল…
” এইতো আমাদের ছোট জমিদার গিন্নি। সংগ্রাম জোয়ার্দারের বেগম। আমাদের শ্যামা বতী, শ্যামা সুন্দরী সংগ্রাম জোয়ার্দারের।
শ্যামা চোখ নামিয়ে মৃদু হাসলো। বালার কথা যেন বিশ্বাস হলো না কারোর। জবা, তহুরা চোখ গোল গোল করে চেয়ে সমস্বরে উঁচু সন্দিহান গলায় আওয়াজ তুললো…
” এ্যাঁহহ..
ইনি সংগ্রাম জোয়ার্দারের বেগম?
” সন্দেহ আছে? আপনাদের মিথ্যে বলবো না নিশ্চয়ই!
তহুরা নাক কুঁচকে ব্যাঙ্গ করে নোয়ানো গলায় বলল…
” না মানে, আমি তো ভেবেছিলাম বাড়ির কোনো কাজের লোক হয়তো! তাই তো ভাবি,, কাজের লোকের শরীরে এতো দামি শাড়ি……
আর কিছু বলতে পারলো না। রিক্তা ধমকে উঠলো….
” তহুরা…..
চমকে উঠে পিছিয়ে আসলো তহুরা। শ্যামার হাসি হাসি মুখটা চুপসে গেছে। আহত দৃষ্টিতে চাইলো ও তহুরার দিকে। রিক্তা এগিয়ে গিয়ে বললো..
” মাশাআল্লাহ…
আসলেই শ্যামা সুন্দরী তুমি! ভালো লাগলো তোমায় দেখে।
তুমি ও আমার ছোট হবে, তাই তুমি বলেই সম্বোধন করলাম। কিছু মনে করো না…
শ্যামা হাসলো জোর পূর্বক। ক্ষয়িত কন্ঠে বললো…
” সমস্যা নেই। কিছু মনে করার অভ্যাস নেই আমার। যা খুশি বলতে পারেন,,, কিছু মনে করবো না।
দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? বসুন….
” এখন আর বসবো না। তোমাকে দেখতেই এসেছিলাম। দেখলাম তো,, এখন আসি?
শ্যামা মুখে উত্তর করলো না। ঘাড় কাত করলো আলতো। রিক্তা তহুরার দিকে ফিরে এতক্ষণের নরম চোখ মুখ শক্ত করে শক্ত কন্ঠে বলল…
” চল নিচে….
অলকা ঘরের দরজার কাছে বসে হাঁটু জড়িয়ে পিছনের দিকে মাথা হেলিয়ে অতিব অবহেলিতের ন্যায় বসে আছেন। চোখ দুটো অল্প ভেজা তার। কিছুক্ষণ আগে জাভেদ রুপা কে নিয়ে গেছে। এই নিয়ে চোখ ভেজেনি তার। বরং ভিজেছে ময়নার কথা শুনে। আওয়াল পুর থেকে খবর এসেছে, ময়না কে তালাক দিয়েছে মানিক। শুধু তালাক নয়, মারধোর ও করেছে ময়না কে। এতো দিন ও মারধোর করে এসেছে। যা সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিলো অলকা। এমনকি কোনোরূপ আবহ ও পৌঁছায় নি তার কানে। মোখলেছ জানতো সবটা। তিনি পরিষ্কার ভাবেই জানতেন। কিন্তু প্রকাশ করতে পারেন নি কখনো। মেয়ের সুখের কথা এক মুহূর্তেই চিন্তা করে ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন তিনি। শ্যামার জায়গায় ময়না কে বসিয়ে শ্যামার ভাগ্য,, খারাপ ভবিতব্য ময়নার নামে লিখে দিয়েছেন নিজ হাতে। যৌতুকের দাবিতে যখন শ্যামার বিয়ে ভেঙে যায়, তখন মানিকের মামা আশ্বাস দিয়েছিলেন — ময়নার সাথে বিয়ে দিলে মোখলেছ কে আর কোনো টাকা কড়ি বা যৌতুক দিতে হবে না। মোখলেছ ও টাকা বাঁচানোর তাগিদে কোনোরূপ চিন্তা ভাবনা না করেই রাজি হয়েছিল মুহূর্তেই। তার রাজি হওয়ার পেছনে শ্যামা কে তাচ্ছিল্য করা ছিল অন্যতম অন্তরায়। এদিকে মানিক আর ওর মামার মনে যে অন্যকিছু চলছিল, এ ব্যাপারে একটুও ধারনা জাগে নি মোখলেছের মনে। মানিকের মামা প্রথম প্রথম শ্যামার সাথে বিয়ে দিয়ে ধাপে ধাপে হুমকি স্বরূপ মোখলেছের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে চেয়েছিলেন। শ্যামার গায়ের রং চাপা, এই নিয়ে অবমাননা করলে, মেয়ের সংসার বাঁচাতে নিশ্চয়ই টাকা দেবে মোখলেছ। এটাই ভেবেছিলেন মানিকের মামা।
কিন্তু পরমূহূর্তে শ্যামার প্রতি মোখলেছের বিমুখতা দেখে সিদ্ধান্ত পাল্টেছেন তিনি। ময়না মোখলেছের আদরের মেয়ে। এটা বুঝতে অসুবিধা হয় নি তার। তাই আদরের মেয়েকেই খুঁটি বানিয়ে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। বিয়ের পাঁচ দিন পর থেকেই ময়নার উপর অত্যাচার শুরু করেছেন ধীরে ধীরে। মানিক, মানিকের আম্মা , মামা , সবার উদ্দেশ্যই এক। সবাই যুক্ত একই সাথে। এক পর্যায়ে ময়নার প্রতি অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে গেলে মোখলেছের কানে আসে সবকিছু। উপস্থিত মুহুর্তে টাকা দেওয়ার জন্য জাফর ব্যাপারির কাছ থেকে টাকা কর্জ নিয়েছিলেন তিনি। এভাবে বেশ কয়েকবার টাকা কর্জ নিয়ে মানিকের কাছে টাকা পাঠাতে হয়েছে তাকে।
এদিকে জাফর ব্যাপারি কে টাকা শোধের জন্য শ্যামা কে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন তিনি। শর্ত ছিল, শ্যামার সাথে ব্যাপারির বিয়ে দিলে ব্যাপারিকে আর টাকা শোধ করতে হবে না। টাকা শোধের তাগিদে শ্যামা কে নিয়ে এক মুহুর্ত ও ভাবে নি মোখলেছ।
এই সবটাই ছিলো ময়নার জন্য। তার সব চিন্তা ভাবনা ময়না কে ঘিরে ছিল। তার আদরের মেয়ের গায়ে একটা ফুলের টোকা না পড়ার বিনিময়ে টাকা দিতে হতো তাকে। ময়নার বিয়ের পর থেকে অলকার অগোচরে এভাবেই চলে আসছিলো সবকিছু। এমনকি কাকড়ি বুড়ি নিজেও এসব সম্পর্কে কিছুই জানেন না ।
আজ সবটা সবার কাছে পরিষ্কার। বারান্দার একপাশে থম মেরে বসে আছে কাকড়ি বুড়ি। মোখলেছ একপাশে দাঁড়িয়ে। নীরবতা তিনটি মানুষের মাঝেই। অলকার চোখ বেয়ে আরো কয়েক ফোঁটা পানি গড়ালো। এই মুহূর্তেও একটা চিন্তা মাথায় আসছে ,, কি আজব! ময়নার বিষয়ে এতো কিছু ভাবলো মোখলেছ! অথচ শ্যামা? ময়নার সুখের তাগিদে শ্যামা কে বিসর্জন দিতেও এক বারের জন্যেও ভাবলেন না তিনি? অলকা ডান হাতের উল্টো পিঠে ভেজা চোখ মুছলো। হাসলো তাচ্ছিল্য। বললো মোখলেছের উদ্দেশ্যে….
” আপনার মতো বাপ খালি ময়নার মতো মাইয়ার জীবনেই আসুক। আমার শ্যামার মতো মাইয়ার জীবনে না আসুক।
এতো কিছুর পরও মোখলেছ দাঁত পিষে উত্তর করতে ছাড়লেন না। কটাক্ষ করে বললেন তিনি…
” আমার মতো বাপ ঐ মাইয়ার ছিল দেইখাই তোর ঐ মাইয়া কোনো একদিন তোর কোলে আইছিলো। খালি দুর্ভাগ্য ,,, ঐ মাইয়ার আম্মা টাও বোধহয় বাপের মতোই …..
আর কিছু বলতে পারলো না মোখলেছ। ঝাঁজিয়ে উঠলো অলকা।
” চুপ করুন। একটা কথাও কইবেন না আপনি। এতো কিছুর পরেও একটুও লজ্জা নাই আপনার? নিজের হাতে নিজের মাইয়ার জীবনটা নষ্ট করলেন, একটুও অনুশোচনা নাই আপনার মনে? কেমন বাপ আপনি?
শ্যামার জীবন নিয়া কোনো দিন ভাবতে কোই নাই আপনারে,, কিন্তু ময়না? ও তো আপনার মাইয়া, আদরের মাইয়া আপনার! ওর জীবনটা এমনে নষ্ট করলেন ক্যান?
শুরুতেই ক্যান আমার মাইয়ারে ফিরাইয়া আনলেন না? এতো কিছু ক্যান ঘটাইলেন আপনি? কেমন বাপ আপনি?
” চেহারা দেইখা যদি মানুষ চেনা যাইতো, তাইলে আমার ময়নার ভাগ্য এমন হইতো না আইজ।
সব দোষ তোর ঐ মাইয়ার। ঐ মাইয়ার বদ নজর পড়ছে আমার ময়নার জীবনে। ঐ মাইয়ার বদ ভাগ্য আমার ময়নার জীবনে জুইড়া গেছে। এখন তোর ঐ মাইয়া সুখে সংসার করবো জমিদারের লগে? ভাগ্য খুইলা যাইবো তোর মাইয়ার? দেখমু ক্যামনে সংসার করে ওয়। আম্মা তো কইছিলো অনেক আগেই ঐ মাইয়ারে বিদায় করতে, করি নাই আমি। এখন নিজে থাইকা বিদায় হইয়াও শান্তি দিতাছে না আমারে। অপয়া, অলক্ষি মাইয়া। মাথায় চইড়া আছে আমার,,, কোন কুক্ষনে যে ঐ মাইয়ারে ঘরে তুলেছিলাম। আইজ নিজের উপর নিজের আফসোস হইতাছে…
অলকা উঠে দাঁড়ালো। এই লোকটার সাথে কথা বলার কোনোরূপ রুচি নেই তার। বিতৃষ্ণা জন্মেছে মনে। মন মস্তিষ্ক পচে গেছে অলকার। গত ঊনিশ টা বছর ধরে এই সবই শুনে আসছেন তিনি। এখন তো শ্যামা নেই, তবুও? ঐ মেয়েটা কে তাচ্ছিল্য করে কি পায় এরা?
অলকা শ্বাস ফেললেন। শান্ত কন্ঠে বললেন….
” নিজের উপর আফসোস হওয়াই উচিত আপনার। ঐ মাইয়া, ঐ মাইয়া কইরা এক মাইয়ার জীবন নষ্ট করতে গেছিলেন না? এখন দেখেন, আল্লাহ আপনার কর্মের ফল আপনারই মাইয়ারে দিলো। পাপ বাপরেও ছাড়ে না,, আর এইদিকে – আপনার পাপ আপনার মাইয়ারে ছাড়লো না। বাপের পাপের সাজা মাইয়া পাইলো। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ঐ মাইয়াটা আপনার একলার না। আমারো। আপনার হিতাহিত জ্ঞান শূন্য কর্মের ফল আমার মাইয়াটা সহ্য করলো এতো দিন। না জানি, ওরা ওরে কত অত্যাচার করতো?
আমার মাইয়াটা এই লাইগা এতোটা বদলাইয়া গেছিলো, আমি বুঝি নাই। বুঝি নাই আমি….
বলতে বলতে অলকা মুখে আঁচল চেপে ফুঁপিয়ে উঠলেন। ময়নার মলিন মুখ খানা চোখের সামনে ভাসছে তার। ময়নার বলা কথাগুলো কানে বাজছে। ময়না তো কখনো ওভাবে কথা বলতো না। হঠাৎ মেয়ের এমন পরিবর্তন দেখেও কিছু ঠাহর করতে পারেন নি অলকা। আজ নিজেই নিজেকে ধিক্কার জানাতে ইচ্ছে হচ্ছে। কেমন মা তিনি?
কাকড়ি বুড়ি এতক্ষণে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ালেন। চোখের পাপড়ি ভেজা তার। ময়না যে তার অতি আদরের। তিনি কোনো রকমে কাঁপা কাঁপা তিন পায়ে মোখলেছের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ছেলের দিকে মাথা তুলে চেয়ে জড়ানো ভঙ্গুর গলায় বললেন থেমে থেমে…..
” আ..আমার ময়নারে আইনা দে তুই। ওরে আমার কাছে ফিরাইয়া আইনা দে। ওরা ওরে মারতো খুব। আমার ময়নার দেহে দাগ ফেলাইয়া দিছে মনে হয়,, ওর ধলা চামড়ায় মাইরের দাগ পড়ছে। আমি দেখি নাই কোনো দিন। ওরে ফিরাইয়া আন তুই, আমি দেখমু আমার নাতনিরে…
দুপুর গড়িয়েছে। উত্তাপ হীন সূর্য মাথার ঠিক উপর। গরম পড়ছে ধীরে ধীরে। দুপুরের ভ্যাপসানো রোদের তাপে গরম লাগে একটু আধটু। সংগ্রামের কথা মতো শ্যামা ঘর থেকে বেরোয়নি। শবনম একবার এসেছিল, শ্যামার খাবার নিয়ে। প্রায় অনেকক্ষণ গল্প করে গেছে ও। বালা ও অনেকক্ষন সময় কাটিয়েছে শ্যামার সাথে। এখন যে যার ঘরে। শ্যামা খায়নি। খাবার ঢাকনা দেওয়া অবস্থায় পড়ে আছে। ঢাকনা তুলেও দেখেনি শ্যামা। সংগ্রাম আসলো একটু পর। কালো শালটা আড়াআড়ি নেই এখন। পুরো শরীর ঢেকে রাখা শালটা দিয়ে। সাদা পাঞ্জাবির নিচের অংশ ভেজা। দরজায় খট করে শব্দ হতেই হুড়মুড়িয়ে উঠে বসলো শ্যামা।
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৫
সংগ্রাম কে দেখে স্বস্তি পেলো। অন্যদিনের মতো সংগ্রাম সবার আগে তাকালো না খাটের দিকে। শ্যামার দিকে ফিরলো না। তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো দিয়ে দেখলো না শ্যামা কে। সে সোজা এগোলো গোসল খানার দিকে। শ্যামা তাকিয়ে আছে। সংগ্রামের চোখ মুখে তীব্রতা। চোয়াল শক্ত বিভৎস। শ্যামা অবাক অবিশ্বাস্য নয়নে চেয়ে দেখলো সংগ্রাম কে। এই সংগ্রাম কে কেমন অচেনা লাগছে। সকাল থেকেই একে মনটা খচখচ করছে শ্যামার। তার উপর সেই সকালের পর থেকেই সংগ্রামের এমন অদ্ভুত ব্যবহার। ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না শ্যামা ।
