শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৭
সুরভী আক্তার
প্রায় মিনিট বিশেক পর গোসল খানা থেকে বেরিয়েছে সংগ্রাম । এতক্ষণ শ্যামা বিচলিতের ন্যায় পায়চারি করছিল ঘরে । এদিক ওদিক হেঁটে হেঁটে বারবার তাকাচ্ছিলো গোসল খানার দিকে । তবে সংগ্রামের বেরিয়ে আসার নাম নেই । দরজার খট শব্দে শ্যামা চকিতে তাকালো গোসল খানার দিকে । সংগ্রাম বেরিয়েছে । ফর্সা উদ্দাম শরীর উন্মুক্ত । পড়নে আধো ভেজা লুঙ্গি । ফর্সা শরীর স্যাকস্যাকে দেখাচ্ছে খানিক । অনেকক্ষণ ভেজার পরে হয়েছে এমনটা । সংগ্রামের চোখ মুখ পাথরের ন্যায় নিরেট এখনো । শ্যামা এগিয়ে গেলো ঝট পট করে । সংগ্রামের হাত ধরে উল্টে পাল্টে দেখলো । ঠান্ডা পানিতে অনেকক্ষণ ভেজার ফলে হাতের চামড়া কুঁচকে গেছে কেমন । চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল ।
তা দেখে আফসোসের সুরে বিচলিত কন্ঠে বলল শ্যামা….
” ইশশ্ কি অবস্থা হয়েছে দেখুন তো ৎ। এতোক্ষণ ভিজতে গেলেন কেনো আপনি ?
সংগ্রাম মৃদু হাসলো । শ্যামার উষ্ণ গরম হাত দুটো নিজের দুহাতের মুঠোয় পুরে শান্ত কন্ঠে বললো….
” কিচ্ছু হবে না এতে ।
” কোথায় ছিলেন এতোক্ষণ ?
” গ্রামে গেছিলাম !
” তা তো জানি ,, কিন্তু এভাবে এসেই এমন সময় এভাবে এতক্ষণ ভিজলেন কেনো । ঠান্ডা লেগে যাবে তো ?
” এভাবে ভেজা শরীরে আরো কিছুক্ষণ তোমার সামনে থাকলে এমনিতেই ঠান্ডা লেগে যাবে । পোশাক পড়তে দেবে, নাকি এভাবেই আটকে রাখবে আমায় ?
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” আমি আপনাকে আটকে রেখেছি ? নাকি আপনি ?
সংগ্রামের হাতে ইশারা করে কথাটা বললো শ্যামা । সংগ্রাম নিজের হাতের দিকে তাকালো ,, ও তো নিজেই শ্যামা কে ধরে আছে । হেসে ফেললো সংগ্রাম । সাথে শ্যামাও । এতক্ষণে বুকটা হালকা হলো শ্যামার । সংগ্রাম হাসলে ওর ঠোঁটের উপরের কোণের ঠিক উপরের কালো আঁচিল টা চিকচিক করে ওঠে । ওটাও যেন হেসে ওঠে সংগ্রামের ওষ্ঠাধরের সাথে তাল মিলিয়ে । হাসলে সংগ্রামের ঠোঁট একেবারে অধিক প্রসারিত হয় না । আলতো প্রসারিত হয় । এটাই যেন সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় সংগ্রামের । যা চোখে লাগে ভীষণ । কোনো পুরুষ এতটা সুন্দর হতে যাবে কেনো ? সুন্দর হওয়ার সাথে সাথে তার হাসিটাও কেনো এতো সুন্দর হবে ? শ্যামা বিমূঢ় নেত্রে চেয়ে আছে এক দৃষ্টে । চেয়ে থেকেই আনমনে বললো….
” আপনার হাসিটা অনেক সুন্দর, ছোট জমিদার সাহেব ?
সংগ্রাম ভ্রু যুগল জড়ো করলো । দুহাত শ্যামার দু কাঁধে রেখে একটু ঝুঁকে বললো….
” শুধু হাসি ,, আর আমি ?
” আপনার সৌন্দর্য্যের বর্ননা হাজার বার করেছি । আরো কোটি বার করলেও সেই সৌন্দর্যের বর্ণনা শেষ হবার নয় ।
” ঠিক তেমনি — তোমাকে ভালোবাসার কথা হাজার বার স্বীকার করেছি আমি , আরো কোটি বার করলেও আমি তোমাকে ঠিক কতটা ভালোবাসি তা প্রকাশ করতে পারবো না । তোমাকে বোঝাতে পারবো না আমি তোমাকে কতটা ভালবাসি ! আমার ভালোবাসায় কখনো খাদ খুঁজতে এসো না, বেগম । সন্দেহ করো না আমার ভালোবাসা নিয়ে । আমি সত্যিই তোমায় অনেক ভালোবাসি । অনেক অনেক বেশি । এভাবেই আমার ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে, আমার হয়ে থেকো সারাজীবন । আমায় কখনো ভুল বুঝোনা….
কথা গুলো কাতর শোনালো । শ্যামা অবাক হলো । অবাক স্বরেই বলল…
” এভাবে বলছেন কেনো ? আপনার ভালোবাসায় কোনো দিনও খাদ খুঁজতে যাবো না আমি । আপনার মতো পুরুষ যে আমার মতো একটা সাধারন মেয়ের প্রতি ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেছে , এটাই অনেক আমার জন্য । তার উপর প্রকাশের সাথে সাথে আপনি ভালোবাসেন আমায় । এটা তো অধিকের থেকেও অধিক আমার কাছে । আমি তো সবথেকে সৌভাগ্য বান নারী । আমি কি কখনো ভেবেছিলাম , আমার মতো মেয়ের জীবনে আপনার মতো এতো সুন্দর কেউ আসবে ? যে আমাকে এতো বেশি ভালোবাসবে ? যার ভালোবাসার প্রকাশ ভঙ্গিতেই ভালোবাসা প্রকাশ পায় , তার ভালোবাসায় সন্দেহ করি কি করে বলুন তো ? আর বাকি রইলো ভুল বোঝার কথা…! সেটা তো কখনোই জন্মাবে না আপনাকে নিয়ে ! ভুল তাকেই বোঝা যায় , তার প্রতিই ভুল ধারণা করা যায় যে ভুল করে । আমার ছোট জমিদার সাহেব কখনো কোনো ভুল করতেই পারে না । তাকে ভুল বোঝা তো দূরের কথা ।
সংগ্রাম শ্যামার নরম হাত দুটো নিজের গালে রাখলো । ঠোঁট ছোঁয়ালো হাতের তালুতে । বললো…
” যদি কখনো ভুল করেও ভুল হয়ে যায় তোমার ছোট জমিদার সাহেবের..? তখন ?
” ভুলের তো ক্ষমা হয় । শুধরে নেওয়া যায় ভুল । আপনি পারবেন না শুধরে নিতে ?
সংগ্রাম নিশ্চুপ । উত্তর করলো না এই প্রশ্নের । শ্যামা তাকিয়ে থেকে মুহূর্ত কয়েক বাদ বললো…
” ঠান্ডা লাগছে তো ,, কাপড় পড়ে নিন ।
সংগ্রাম হাত ছাড়লো শ্যামার । শ্যামা খাটের উপর থেকে আগে থেকেই বের করে রাখা সংগ্রামের ফতুয়া নিয়ে আসলো । সংগ্রাম পড়ে নিলো সেটা । উপরের কলারের বোতাম নিজে না লাগিয়ে শ্যামার কাছে আবদার করলো নিদারুণ কন্ঠে…
” তুমি লাগিয়ে দাও বেগম !
শ্যামা মুচকি হাসলো । অতি যত্নে নিজের দায়িত্ব পালন করলো । সংগ্রাম ততক্ষণ এক ধ্যানে চেয়ে দেখলো শ্যামার শ্যামলা মুখশ্রী । মেয়েটা তো আহামরি সুন্দর নয় , তবুও কেনো এতো সুন্দর লাগে সংগ্রামের কাছে ? শ্যামার এই শ্যামলা সৌন্দর্য এতো কেনো প্রলুব্ধ করে তাকে ? কি আছে এই সৌন্দর্যে ? এতো কেনো সুন্দর শ্যামা ? সংগ্রামের মন থেকে উত্তর আসলো…
” শ্যামা সুন্দর ,কারন সংগ্রাম জোয়ার্দার ভালোবাসে তাকে । সৌন্দর্যের দৃষ্টিতে দৃষ্টির সম্মুখ হয় শ্যামা , তাই শ্যামা সুন্দর ! সুন্দর চোখ সৌন্দর্য কে খুঁজতে ভুল করে না , এক্ষেত্রে শ্যামার সৌন্দর্যের তুলনায় সংগ্রামের চোখের সৌন্দর্য অত্যাধিক । নিঃশব্দে মৃদু হাসলো সংগ্রাম । বললো শীতল কন্ঠে….
” মাঝে মাঝে এভাবেই আমার একটু যত্ন নেবে বেগম ? খুব ভালো লাগে তোমার কাছ থেকে এভাবে যত্ন পেতে !!
নিচে অতিথি শালায় গোল বৈঠক বসেছে । তহুরা এক পাশে চুপসে আছে । তখন ঘরে আসার পর রিক্তার কাছে বেশ ঝাড়ি খেয়েছে ও । রিক্তা বরাবরই বাস্তববাদী ।
এখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কালকেই শহরে ফিরবে ওরা । ফিরতে দেরি ছিল আরো দুদিন । তবে এখন আর দেরি করবে না । নিজেদের জিনিস পত্র গোছানো হয়ে গেছে সবার । জমিদার লতিফ জোয়ার্দারের কাছে জানানো হয় নি ওদের হঠাৎ এভাবে চলে যাওয়ার বিষয়টা । জানানো প্রয়োজন আগে থেকেই ।
খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়েছে সংগ্রাম । সন্ধ্যার আগে উঠবে না আর । শ্যামা খানিক ক্ষণ বসে ছিলো ওর শিয়রে । অনেকটা সময় বসে থাকার ফলে টান ধরেছে কোমরে । অবশেষে বসা ছেড়ে খাট থেকে নামলো শ্যামা । এই মুহূর্তে বালার কাছে গেলে মন্দ হয় না । ঘরে এভাবে বসে বসেই বা কি করবে আর ? বালাও ঘরে একা !
শ্যামা ধীরে ধীরে পা ফেলে ঘর থেকে বেরোলো । বালার ঘরের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো । চাপানো দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলো । মেঝেতে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখে বৃহৎ নয়নে চাইলো শ্যামা । সাদা চকচকে মেঝেতে পড়ে আছে বালা । সম্পুর্ন মুখ রক্তে ভেজা । একহাতে মুখ চেপে রাখা ওর । হাতটাও লাল টকটকে রক্তে রঞ্জিত । অন্য হাত পেটে চেপে রাখা বালার । কুঁকড়ে হাত পা জড়ো করে মেঝেতে অমন রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে মেয়েটা । সামনের এমন রক্তাক্ত বিভৎস দৃশ্য দেখে এক মুহুর্তের জন্য জড়বুদ্ধি হয়ে গেল শ্যামা । জ্ঞান শূন্য হয়ে থম মেরে রইলো সেকেন্ড কয়েক । অতঃপর চিৎকার করে উঠলো বালা সম্বোধনে…
” বালা…?
চিৎকারের সাথে সাথে শ্যামা হুড়মুড়িয়ে বসলো বালার কাছে । বালার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিলো । বালার মুখের ভেজা তরল রক্ত কোনো রুপ পরাকরণ ব্যতীত মুছিয়ে দিলো নিজের দুহাতে । ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ডাকলো…
” বালা ? কি হয়েছে তোমার ? বালা ? চোখ খোলো ! এতো রক্ত ,,, কি হয়েছে তোমার বালা ?
বালা কে ডেকে কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া মূলক সাড়া না পেয়ে এবার শ্যামা চিৎকার করে ডাকলো….
” ছোট জমিদার সাহেব ,, ভাবি ,, আম্মা… কে কোথায় আছেন ? তাড়াতাড়ি আসুন…
বালা , এই বালা ? কি হয়েছে তোমার ?
উত্তেজিত ভড়কানো গলায় চেঁচিয়েই যাচ্ছে শ্যামা । গলা জড়িয়ে আসছে ওর । মেঝে ভিজে জবজবে লাল রক্ত বমিতে । বালা রক্ত বমি করেছে ? শ্যামা কেঁপে উঠলো ! ছলকে উঠলো নারী সত্ত্বা । ওর চিৎকারে প্রথমে শবনম আর লতিফা ছুটে এসেছে । লতিফা এসেই আশপাশ না দেখে বাজখাঁই গলায় ঝাইঝাই করে উঠলো….
” এই মেয়ে ,, চেঁচাচ্ছিস কেনো এভাবে ? জমিদার বাড়িতে মেয়েদের গলার আওয়াজ বাইরে যায় না , জানা নেই তোর ?
বলতে বলতে নজর পড়লো বালার দিকে । চোখ মুখ কুঁচকালেন লতিফা । রক্তের তরলে মাখামাখি তার আপন গর্ভের সন্তান । নিজের মেয়ে । হুশ জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে মেয়েটা শ্যামার কোলে । এই দৃশ্য যেন লতিফার মাঝে কোনো প্রকার উদ্বিগ্নতা বা প্রতিক্রিয়া জাগাতে পারলো না । বরং রক্ত দেখে চক্ষু ঘেন্নায় অবিলম্বে চোখ সরালেন তিনি । শবনম হুড়মুড়িয়ে বসলো । উত্তেজিত হয়ে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ডাকতে লাগলো বালা কে । দুজনের সমস্বরের চেঁচামেচিতে আতিয়া বেগম , লতিফ জোয়ার্দার , সালেহা উভয়েই ছুটে আসলেন । পিছু পিছু উদ্বিগ্নতা হীন ধীর পায়ে আসলো জুনাইদ । লতিফার পাশে পিছনে হাত গুটিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়ালো সে । সালেহা, আতিয়া বেগম, শবনম, শ্যামা, সবাই দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে শুধু ডেকেই যাচ্ছে বালা কে । ঝাঁকানোর সাথে সাথে মেয়েটা নড়ে উঠছে শরীরে । সবার এতোসব খেই হারানো রোলের মাঝেই চোখ ডলতে ডলতে সংগ্রাম উঠে আসলো । ও দরজা মারানোর আগেই লতিফার চোখে পড়েছে । অমনি লতিফা এক ঝটকায় নিজেকে এগোলেন । শ্যামার হাত ধরে টেনে ঝটকা মেরে তুলে দাঁড় করালেন শ্যামা কে । শ্যামার কোলে থাকা সুরবালার মাথাটা শক্ত পাথরের মেঝেতে পড়তে গিয়েও পড়লো না , শবনম বালাকে টেনে নিলো নিজের কাছে ।
লতিফা খেইখেই করে উঠলেন কটাক্ষ করে….
” এই মেয়ে ,, কি করেছিস আমার মেয়ের সাথে ? বল কি করেছিস ?
শ্যামা কেঁপে উঠলো । কাঁপতে কাঁপতে ওষ্ঠাধর ভেজালো । গলায় কথা আসছে না ওর । এতো সব রক্ত নিজের শরীরেও মাখামাখি ওর । তার উপর বালার এই অবস্থা ।
সংগ্রাম পেছনে দাঁড়াতেই সর্বপ্রথম বালা কে ওভাবে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখলো । অকস্মাৎ ঘুম জড়ানো আধো চোখ বৃহৎ আকার ধারণ করলো ওর । জোরালো গলায় ছলকে উঠলো…
” বালা ?
শ্যামাসহ সবাই মাথা তুলে তাকালো ওর দিকে । ছলছল করে উঠলো শ্যামার অক্ষি যুগল । ও লতিফার হাত থেকে নিজেকে ছাড়ালো ঝটকা মেরে । সংগ্রাম অকস্মাৎ বসে বালার গালে আলতো চাপড় মেরে ডাকলো উত্তেজিত হয়ে….
” এই বালা , কি হয়েছে তোর ? চোখ খোল …
বালা ?
সালেহা ভীত ভেজা কন্ঠে বলল…
” সংগ্রাম ,, বাবা, বালাকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে চল… রক্ত বমি করেছে ও । ডাকছি, সাঁড়া দিচ্ছে না । কি হয়েছে ওর ? দেরি করিস না সংগ্রাম । যা করার তাড়াতাড়ি কর…
লতিফ জোয়ার্দার ও তার মেলালেন…
” হ্যাঁ সংগ্রাম,, দেরি করো না । তাড়াতাড়ি করো যা করার….
সংগ্রাম অপেক্ষা করলো না । বালার ছোট্ট নারী দেহটা নিজের দুহাতের আগলে তুলে নিয়ে এলোমেলো পায়ে এগোলো ঝট করে । দরজার সামনে জুনাইদ কে এই অবস্থাতেও কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চোয়াল শক্ত করলো সংগ্রাম । এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে দাঁত পিষে নিরেট কন্ঠে বললো….
” সরে যা আমার চোখের সামনে থেকে…
জুনাইদ সরলো বাধ্যের ন্যায় । সংগ্রাম দ্রুত পা চালিয়ে বালা কে কোলে করে ঘর থেকে বেরোলো । পিছু পিছু সবাই ছুটলো । শ্যামা ফিকড়ে উঠে পা বাড়াতে গেলে লতিফা খপ করে ধরলো ওর হাত । আটকা পেয়ে থেমে গেল শ্যামা । পিছু ফিরে ভরাট চোখে চেয়ে মৃদু স্বরে বলল….
” ছেড়ে দিন ফুফু আম্মা !
” ছাড়বো মানে ? তোকে ছাড়বো ? কি করেছিস আমার মেয়ের সাথে ?
” আমি তো কিছু করি নি…
যেতে দিন আমায় । আমি যাবো ওদের সাথে..!
” ছেড়ে দেবো তোকে ? যাবি তুই বাইরে ? জানিস না, জমিদার বাড়ির মেয়ে বউরা বাইরে পা রাখে না । অবশ্য তোকে এই বাড়ির বউ ভাবেই বা কে ? এই মুখ নিয়ে বাইরে যাবি তুই ? হুহহ… আজ বাগে পেয়েছি তোকে । ছাড়ি কি করে বলতো ? চল আমার সাথে…
বলেই টেনে হিড়হিড়য়ে নিয়ে যেতে লাগলো শ্যামা কে । শ্যামা তাজ্জব বনে চেয়ে রইল । লতিফার মুখো ভঙ্গিমা অদ্ভুত । রহস্যময় এক চিলতে হাসি ঠোঁটের কোণে । অথচ তার মেয়ের অবস্থা করুণ । মেয়েকে নিয়ে একটুও উদ্বিগ্নতা নেই তার মাঝে । শ্যামা কয়েক পা এগিয়ে নিজের জোর খাটিয়ে থমকে দাঁড়ালো । লতিফার উদ্দেশ্যে বললো…
” কি করছেন আপনি ? ছেড়ে দিন আমার হাত । কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায় ? আমি বালার সাথে যাবো…
লতিফা বাঁধা পেয়ে চোখ মুখ শক্ত করে শ্যামার দিকে ফিরলো । শ্যামার চোয়াল শক্ত করে ধরলো এক ঝটকায় এগিয়ে এসে । দাঁত পিষে ঘ্যাসঘ্যাসে গলায় বলল…
” আমায় বাঁধা দিবি ? কোথায় নিয়ে যাচ্ছি , চল গেলেই দেখতে পাবি …
ফের শ্যামার হাত ধরলো লতিফা । এবার খামচি মেরে ধরেছে । লতিফার খড়খড়ে শক্ত নখের দাবা পেতেই ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলো শ্যামা । জুনাইদ এখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে । এবার বুকে হাত গুটিয়ে দরজায় হেলান দিলো ও । যেন সামনে উপভোগ্য কিছু দর্শন করছে সে । চোখের দৃপ্তি অদ্ভুত ওর । শ্যামা এক পলক তাকালো জুনাইদের দিকে । পরের পলক সালেহার দিকে । এদের মা ছেলের মুখো ভঙ্গিমা এক । অদ্ভুত পৈশাচিক আনন্দ দুজনের চোখেই । শ্যামা শুকনো ঢোক গিললো । জুনাইদ কে ও খুব কম দেখেছে । যতবার দেখেছে ততবার মাথা নত অবস্থায় । শ্যামার দিকে কোনো দিন চোখ তুলেও তাকায় নি বোধহয় সে । আজ প্রথম শ্যামার সাথে চোখাচোখি হলো ওর । ওর অদ্ভুত দৃষ্টি দেখে আর সালেহার এমন কড়া ব্যবহারে শুকনো ঢোক গিললো শ্যামা ।
সালেহা আবারো টেনে হিড়হিড়য়ে নিতে গেলে শ্যামা উঁচু গলায় বলে উঠলো…
” লাগছে আমার । ছেড়ে দিন আমায় । আমি বালার সাথে যাবো । ওর অবস্থা ভালো নয় । আপনি তো ওর আম্মা , কি করছেন আপনি ? ছেড়ে দিন আমায় ? কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায় ..?
লতিফা শুনলো না । শ্যামা কে সংগ্রামের ঘরের সামনে নিয়ে গিয়ে এক প্রকার ছুড়ে মারলো ঘরের ভেতর । টাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে মেঝের উপর গড়িয়ে পড়লো শ্যামা । লতিফা মুহূর্ত ব্যায় না করে খট করে বাইরে থেকে লাগিয়ে দিলো ঘরের দরজা ।
শ্যামা উঠে গিয়ে দরজা ধাক্কাতে লাগলো…
” ফুফু আম্মা..
দরজা বন্ধ করলেন কেনো ? খুলে দিন দরজা ! বাইরে যাবো আমি ,, বালার সাথে যাবো । এমনটা করবেন না দয়া করে । দরজাটা খুলে দিন । শুনছেন ফুফু আম্মা… ছেড়ে দিন আমায় । বের করুন এখান থেকে । দয়া করে দরজা টা খুলে দিন একবার….
শ্যামার আহাজারি করে বলা কথা গুলো বাইরে দাঁড়িয়ে উপভোগ করলো লতিফা । বেশ আনন্দ অনুভূত হচ্ছে তার । এ সময় বাড়িতে কেউ নেই । শ্যামার গলা উপর থেকে নিচ অবধি পৌঁছাচ্ছে অতি ক্ষিন আওয়াজে । জুনাইদ হেলে দুলে লতিফার সামনে আসতেই মা ছেলে দু’জনে দু’জনের দিকে তাকিয়ে ফিচেল হাসলো । এদিকে সংগ্রামের পিছু পিছু বাড়ির সবাই বেড়িয়েছে বাইরে । সংগ্রাম ধ্যান জ্ঞান হারিয়ে বালা কে কোলে করে অন্দর ছেড়ে বাগানের দিকে এগোলো । চিৎকার করে ডাকলো….
” আহাদ ,, গাড়ি বের করো তাড়াতাড়ি….
সংগ্রামের চিৎকারে বাগানের এক পাশ থেকে সবাই দৃষ্টি ঘোরালো এদিকে । সংগ্রাম কে ওভাবে হন্তদন্ত অবস্থায় বালা কে কোলে তুলে গাড়িতে উঠতে দেখে রিক্তা’রা সবাই বৃহৎ নয়নে তাকালো । বালা কে ওভাবে রক্ত মাখা অবস্থায় দেখে এগিয়ে আসলো সবাই । গাড়ি ছেড়েছে ইতিমধ্যে । সংগ্রাম এখনো সাঁড়া শব্দ হীন বালা কে এক স্বরে ডেকেই যাচ্ছে । মেয়েটা অনড় , নেতিয়ে পড়া । দুটো গাড়ি করে বাড়ির সবাই বেরোলো হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ।
রিক্তা কিছুক্ষণ অদূরে যাওয়া গাড়ির দিকে বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে থেকে নিজের মাঝেই বিড়বিড় করলো ….
” সুরবালা না ওটা ? কি হয়েছে ওর ? সকালেই তো ঠিক ছিল মেয়েটা ! এখন,অমন, রক্তাক্ত অবস্থায় … কি হয়েছে ওর ?
সবাই এখনো ধুলো উড়ানো গাড়ির পথের দিকে চেয়ে আছে । রিক্তা শুল্ক ঢোক গিললো । অংকুরের দিকে তাকালো এবার । বরাবরের মতোই ছেলেটার ভাবভঙ্গি দূর্বোধ্য । তবে চোখের চাহনি ক্ষিন সূক্ষ্ম । আলামিন বললো এবার…
” আরে ভাই ,, কি হলো বলতো ? কি হলো মেয়েটার ? মনে তো হয় গুরুতর কিছু ! ওরা বোধহয় হাসপাতালে গেলো , একবার যাবি তোরা ?
অংকুর তৎক্ষণাৎ নিরেট ভরাট কন্ঠে বাঁধ সাধলো….
” ওদের ব্যাপার ওদের কেই বুঝতে দে । নাক গলাতে হবে না তোকে ওদের বিষয়ে । দুদিনের অতিথি , কাল চলে যাবি । নতুন করে আর উটকো ঝামেলায় জড়াতে হবে না তোকে ।
অংকুরের গম্ভীর কথাটা বোধহয় পছন্দ হলো না রিক্তা আর আরশের । রিক্তা বললো…
” অংকুর ,, এভাবে বলছিস কেনো ? দেখলি তো মেয়েটার অবস্থা । একবার গেলে কি হবে ? উটকো ঝামেলা মনে হচ্ছে তোর কাছে এটা ?সুরবালা কে উটকো মনে হচ্ছে?
অংকুর জবাব করলো না । জবাব করার সামান্য প্রয়োজন বোধ টুকুও করলো না । সে গটগটিয়ে স্থান ত্যাগ করলো । এগোলো অতিথি শালার দিকে । ওকে যেতে দেখে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রিক্তা ।
গ্রামে হাসপাতাল নেই । প্রাথমিক চিকিৎসালয় । ডাক্তারের দক্ষতা যৎসামান্য । তড়িঘড়ি করে বালা কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেখানেই । জমিদার বাড়ির সবাইকে একসাথে ওভাবে অমন অবস্থায় দেখে গ্রামের সবাই ছুটে এসে ভিড় জমিয়েছে বাইরে । হুটোপুটি চলছে সবার । সংগ্রাম উত্তেজিত উদ্বিগ্ন । হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছে সে । সাথে বাড়ির সবাই । অথচ যার গর্ভের ধন, তার দেখা নেই । নাড়ি জোড়া আপন ভাইয়ের ও দেখা নেই । শবনম, আতিয়া বেগম, সালেহা উভয়ের অক্ষি যুগল ভিজে জবজবে । আতিয়া বেগম তো কাঁদছেন আহাজারি করে । লতিফ জোয়ার্দার ফ্যাকাশে চিন্তিত মুখে পায়চারি করছেন দরজার বাইরে । সংগ্রাম আছে ভেতরে । বালার শরীরের রক্ত মুছিয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে ওকে । কোনো একটা ইনজেকশন ও পুশ করা হয়েছে ওকে । সংগ্রামের সামনে ডাক্তার ইতস্তত । হাত কাঁপছে তার । পর পর ঢোক গিলছে সংগ্রাম । বালার সাঁড়া নেই , নাড়ি চলাচল স্বাভাবিক নয় । ডাক্তারের কম্পিত হাবভাব দেখে সংগ্রাম এবার পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো তার কাজের দিকে । তিনি বার বার আড়চোখে তাকাচ্ছেন সংগ্রামের দিকে । সংগ্রাম বাজখাঁই গলায় খেকিয়ে উঠলো….
” এই ডাক্তার ,, কি করছিস তখন থেকে ? কি হয়েছে বালার , বল ? এতো রক্ত এলো কোথা থেকে ? রক্ত বমি কেনো করেছে ও ? সাঁড়া দিচ্ছে না কেনো এখনো বালা , বল ?
ডাক্তার ঢোক গিললো । চমকে উঠে পিছিয়ে গেলো জড়তায় । আতঙ্কিত ভীত স্বরে মিনমিন করলো….
” ওনাকে নিয়ে শহর গেলে ভালো হয় , ছোট জমিদার ! এখানে এসবের চিকিৎসা নেই !
” এসবের চিকিৎসা নেই মানে ? কিসবের চিকিৎসা নেই ? কি হয়েছে বালার ?
” আ.. আমি বলতে পারবো না ছোট জমিদার ।
সংগ্রাম ক্ষেপে উঠলো দ্বিগুণ । তেড়ে গিয়ে কলার চেপে ধরলো ডাক্তারের । দাঁত পিষে বললো….
” পারবি না মানে ? কি হয়েছে ওর ? কি বা*লের ডাক্তার তুই ? রোগির অসুখ ধরতে পারিস না ! রক্ত বমির কারন কি , বল ? তাড়াতাড়ি বল , চিকিৎসা করা ওর । ওর যদি কিছু হয় , তাহলেই এখানেই জিন্দা পুঁতে ফেলবো তোকে ।
ডাক্তার ঢোক গিললো পুনরায় । কলার ছাড়ানোর চেষ্টা তো দূর , চোখ তুলে তাকানোও বিপদজনক তার জন্য । তিনি মিনমিন করলেন…
” দেরি করবেন না ছোট জমিদার । যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওনাকে শহরের কোনো ভালো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন । সেখানে ভালো চিকিৎসা পাবেন উনি । দেরি করা মঙ্গল জনক হবে না ।
সংগ্রাম এক ঝটকায় কলার ছাড়লো । এই মুহূর্তে আর ভাবা যাচ্ছে না কিছু । মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে আসছে । ও আগেই জানতো এখানে এসে কাজ হবে না । তবুও খেই হারিয়ে প্রচেষ্টার তাগিদে ছুটে এসেছে অল্প সময়ে । কিন্তু লাভ হলো না । যা আগে করার দরকার ছিলো তা করতে হবে এখন । এই অল্প ঠান্ডার মৌসুমেও ঘেমে একাকার সংগ্রাম । ও একহাত কোমরে রেখে অন্য হাতে মুখের ঘাম মুছলো । দ্রুত পায়ে বেরিয়ে আসলো উক্ত চার দেয়ালের ঘর থেকে । বাইরে বাড়ির সবাই ওকে ঘিরে ধরতেই কারো তোয়াক্কা করলো না সংগ্রাম । আহাদ কে ডাকলো উচ্চ স্বরে । আহাদ এক মুহুর্তেই উপস্থিত । সংগ্রাম আদেশ ছুঁড়লো…
” দ্রুত গাড়ি বের করো , শহর যাওয়ার প্রস্তুতি নাও । বালা কে নিয়ে শহরে যেতে হবে আমাদের !
আদেশ তামিল করলো আহাদ । লতিফ জোয়ার্দার উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করল এবার….
” সংগ্রাম , কি হয়েছে বালার । ওকে শহরে নিয়ে যেতে হবে কেনো ?
সালেহাও একই প্রশ্ন করলেন ভেজা কন্ঠে…
” সংগ্রাম ,, বল না কি হয়েছে বালার ।
সংগ্রাম ফিরলো আম্মার দিকে । অনেক দিন পর তাকালো ভালোভাবে । চোখের দৃষ্টি শীতল । সংগ্রাম ভেজা ঠান্ডা কন্ঠে বলল…
” জানি না আম্মা । তবে ওকে শহরে নিয়ে যেতে হবে । এখানে এই অধমের দ্বারা চিকিৎসা হবে না ওর । তোমরা বাড়িতে যাও , আমি যাচ্ছি বালা কে নিয়ে । তোমাদের কারোর প্রয়োজন হবে না ।
কথা শেষ করে সংগ্রাম আশেপাশে তাকালো । ওর তৃষ্ণার্ত চক্ষু দ্বয় খুঁজলো ওর বেগম কে । কিন্তু পেলো না । সংগ্রাম চকিতে আশেপাশে চাইলো । এতক্ষণে সম্বিত ফিরেছে শ্যামা কে ঘিরে । উপস্থিত সকলের মাঝে শ্যামা কে না পেয়ে শবনমের দিকে ফিরলো সংগ্রাম । ঠান্ডা কন্ঠে উদ্বিগ্নতা ভর করলো ফের….
” ভাবি , শ্যামা ? শ্যামা কোথায় ?
এতক্ষণে শবনম ও তাকালো আশেপাশে । চোখ মুছে ভেজা কন্ঠে বলল….
” শ্যামা তো আসে নি আমাদের সাথে । ও বোধহয় বাড়িতেই আছে….
সংগ্রাম বৃহৎ করলো চাহনি । মস্তিষ্কে অন্য কিছু হানা দিতেই তরপে উঠলো ও । শ্যামা বাড়িতে একা ? এতক্ষণ কেনো খেয়ালে আসে নি ওর ? সংগ্রাম চ সূচক শব্দ করলো মুখে ।
বাড়িতে যাওয়া প্রয়োজন আগে । এমনিতেও বালা কে নদীপথে শহরে নিয়ে যাওয়া যাবে না । এতে শহরে তাড়াতাড়ি পৌঁছানো গেলেও হাসপাতাল উল্টো দিকে হওয়াতে একই সময় লাগবে স্থলপথে যাওয়ার মতো ।
স্ট্রেচারে করে গাড়িতে তোলা হয়েছে বালা কে । সালেহা সাথে যেতে চেয়েছে , সংগ্রাম বাঁধা দেয়নি । বাঁধা দিলেও শুনতো না সালেহা । এই গাড়ি সোজা রওনা দেবে শহরের দিকে । তবে একবার বাঁক নিয়ে জমিদার বাড়িতেও যেতে হবে শ্যামার জন্য । বালার এই অবস্থার প্রায় আধা ঘন্টা পেরোলো । এখনো কোনো হুঁশ জ্ঞান নেই মেয়েটার । আর না তড়িতে কিছু করা সম্ভব হচ্ছে সংগ্রামের দ্বারা ।
জমিদার বাড়ির সামনে গাড়ি থামিয়ে তড়িঘড়ি করে নামলো সংগ্রাম । গাড়ি থামতেই বালার দিক থেকে ভেজা চোখ তুললো সালেহা । জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সংগ্রাম কে বললো…
” বাড়িতে এলি কেনো আবার ?
” আমার বেগমের সাথে প্রয়োজন আছে আমার । আমি আসছি….
এই অবস্থায় সংগ্রামের সোজা জবাবে ক্ষিপ্ত হলো সালেহা । দাঁত পিষে বললেন তিনি….
” বালার এই অবস্থাতেও ঐ মেয়েটার কথা ভাবতে হবে তোকে ? ও মরছে না এখন । কিন্তু বালা , ও ভালো নেই । ওর কথা ভাববি না একবারও ?
” ওদের দুজনের চিন্তাই মাথায় আছে আমার । আমি আসছি এক্ষুনি…
সংগ্রাম বাড়িতে ঢুকলো গটগট পায়ে । বাকিরা ফেরে নি এখনো । ওরা ফিরছে পেছনের গাড়িতে ।
জমিদার বাড়ি আজ অন্ধকার । কালো অন্ধকার জুড়ে পুরো মহল । বাইরের আলো বাতাস ভেতরে আসার উপক্রম নেই কোনো । সংগ্রাম বিভ্রান্ত হলো অন্দরে ঢুকে । পুরো অন্দর , সিঁড়ির উপর নিচ ,সব জায়গাতেই কুঁচকুচে কালো অন্ধকার দেখে এক মুহুর্তেই ছ্যাঁত করে উঠলো ও । অন্ধকারে চারদিক একেবারেই অস্পষ্ট । কারোর উপস্থিতির কোনো রেশ টুকুও নেই । সংগ্রাম পকেট হাতড়ে লাইটার বের করলো । হলদে অগ্নির আলো জ্বালালো ধক্ করে । সিঁড়ি হাতড়ে দ্রুত উঠলো ঘরের দিকে । নিজের ঘরের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো সংগ্রাম । বাইরে থেকে দরজা আটকে দেওয়া । সংগ্রাম দ্রুত খুললো দরজা । দরজার পাশের বৈদ্যুতিক বোর্ড হাতড়ে লাইট জ্বালানোর চেষ্টা করলো । লাইট জ্বললো না সুইচ টিপেও । লাইটারের হলদে আলোয় সংগ্রাম দেখার চেষ্টা করলো পুরো ঘর । ডাকলো সঙ্কিত স্বরে….
” শ্যামা ? বেগম ? কোথায় তুমি ?
সাঁড়া এলো না এক ডাকেই । সেকেন্ড কয়েক বাদ শ্যামার ক্ষিণ আওয়াজ ভেসে আসলো সংগ্রামের কানে..
” ছোট জমিদার সাহেব…
চকিতে তাকালো সংগ্রাম । গলা অনুসরণ করে দ্রুত এগোলো বারান্দার দিকে । সন্ধ্যা নেমেছে । বাইরেও অন্ধকার । চার দেয়ালে বন্দী ঘরে বাইরের তুলনায় দ্বিগুণ । তবে বাইরে স্পষ্ট খানিক । লাইটারের হলদে আলো আর বাইরের ক্ষিণ উজ্জ্বলতায় বারান্দার এক কোণে গুটিয়ে থাকা শ্যামা কে দেখতে পেলো সংগ্রাম । হুড়মুড়িয়ে শ্যামার কাছে বসলো সে । এক হাতে লাইটার টা শ্যামার মুখোমুখি ধরে ওর ভয়ার্ত কম্পিত চেহারা খানা দেখে আঁতকে উঠলো সংগ্রাম । চুল এলোমেলো শ্যামার । চোখের পাপড়ি , ওষ্ঠ যুগল কাঁপছে তিরতির করে । চোখে মুখে স্পষ্ট ভয় । সংগ্রাম আতঙ্কিত স্বরে বলে উঠলো….
” বেগম,, কি হয়েছে ? এখানে কেনো তুমি ? আলো নেই কেনো বাড়িতে…..
আর কিছু বলার আগেই সংগ্রামের বুকে সেপ্টে ওকে দুহাতে জাপটে ধরলো শ্যামা । ফিকড়ে উঠে হাতের বাঁধন শক্ত করলো আরো । গুটিয়ে গেলো সংগ্রামের প্রশস্ত বুকের মধ্যিখানে । নিজেকে যেন লুকাতে চাইলো সে । ফুঁপিয়ে উঠলো আবার । সংগ্রামের ভারী হৃৎস্পন্দন তীব্র হয়ে জোরালো হয়ে আসছে অত্যাধিক । হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে তীব্র গতিতে । শ্যামা শক্ত করে জড়ালো ওকে । কেঁপে কেঁপে সংগ্রামের হাত উঠলো শ্যামার চুলের ভাঁজে । গলা ভিজিয়ে ডাকলো সংগ্রাম…
” বেগম…
ঠিক আছো তুমি ? কি হয়েছে ?
শ্যামা ফোপালো । থেমে থেমে ক্ষিন স্বরে আওয়াজ তুললো চোখ বুজে…
” আমার ভয় করছে ছোট জমিদার সাহেব । কোথাও আলো নেই , অন্ধকার সবখানে । আমায় ছেড়ে যাবেন না আপনি । ফিরে আসুন আমার কাছে..
” এইতো আমি ফিরে এসেছি । তোমার কাছে এসেছি । তাকাও আমার দিকে , দেখো ফিরে এসেছি আমি তোমার কাছে । তোমার ছোট জমিদার সাহেব এখানেই আছে বেগম…
শ্যামা চোখ খুললো । মাথা তুললো সংগ্রামের বুক থেকে । আধো আধো চোখে ঝাপসা আলোয় তাকালো সংগ্রামের মুখ পানে । তার ছোট জমিদার সাহেব তার সামনেই । আলিঙ্গনে জড়িয়ে রেখেছে তাকে । তার মানে এটা ভ্রম নয় । সত্যি এসেছে সংগ্রাম ? শ্যামা সন্দেহ কাটানোর জন্য হাত বাড়িয়ে সংগ্রামের গালে রাখলো । খোঁচা খোঁচা দাড়ি হাতের তালুতে বিদ্ধ হতেই সম্বিত ফিরল ওর । ও হুমড়ি খেয়ে আবারো আঁচড়ে পড়লো সংগ্রামের বুকে, ফুঁপিয়ে উঠলো সাথে সাথে । টাল হারিয়ে পেছনের দিকে হেলে পড়লো সংগ্রাম । ডাকলো সে …
” বেগম ? অন্ধকার কেনো পুরো বাড়িতে । তুমি, তুমি বাড়িতে কি করছো ? তখন আমাদের সাথে আসোনি কেনো তুমি ?
” আমি যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ফুফু আম্মা যেতে দেয় নি আমায় । উনি আমাকে ঘরে রেখে বাইরে থেকে দরজা আটকে দিয়ে চলে গেছেন । আমি ডেকেছিলাম , শোনে নি । অনেক ডেকেছি আমি । কেউ আসে নি আমার কাছে । আমি ভয় পেয়েছিলাম , আলো ছিলো না ঘরে । কেউ একটু আলোও দেয় নি আমায় । কেউ আসে নি আমার কাছে , আপনিও আসেন নি…
নালিশের স্বরে কথা গুলো বলে থামলো শ্যামা । সংগ্রাম সবটা শুনলো, শীতল চোখ মুখ শক্ত হয়ে উঠলো ওর । মস্তিষ্কে ক্ষিপ্ততা জেঁকে উঠলো , শ্যামার কথার উহ্য অর্থ বোধগম্য হতে সময় লাগলো না । সময় লাগলো না এসব কিছুর উদ্দেশ্যে সম্পর্কে ধারনা করতে । অমনি টগবগিয়ে উঠলো পুরুষালি গরম রক্ত । হাত মুঠো করে চোখ বুজে সংযত করলো নিজেকে । এখন এসবের সময় নেই । সংগ্রাম শান্ত হলো ,, স্বাভাবিক কন্ঠে বলল…
” এইতো আমি এসেছি ,, এখন হাতে সময় নেই বেগম । ওঠো , যেতে হবে আমাদের ।
শ্যামা কে তুলে দাঁড় করালো সংগ্রাম । হাত টেনে ঘরে নিয়ে আসলো । ঘরে আসতেই আচমকা জ্বলে উঠলো পুরো মহলের সব আলো । মুহুর্তেই উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হলো পুরো বাড়ি । আকস্মিক আলো জ্বলতেই এতক্ষণের অন্ধকারের রেশ কাটতে ছলকে উঠলো শ্যামা । চোখ মুখ খিচে শক্ত করে ধরলো সংগ্রাম কে । আলো জ্বলায় আশপাশ টা ভালো ভাবে দেখলো সংগ্রাম । চেয়ারের উপর থেকে কালো চাদরটা হাতে তুলে নিলো । জড়িয়ে দিলো সেটা তার বেগমের শরীরে । শ্যামা কে চাদরে মুড়িয়ে উষ্ণ আলিঙ্গন করলো । পরশ আকলো কপালে । মুখখানা দুহাতে মুছিয়ে এলোমেলো চুল ঠিক করে গুজে দিল কানের পাশে । অতঃপর কাঁধ জড়িয়ে হাত খানা আরো শক্ত করে ধরে বললো ধীর কন্ঠে…
” সময় নেই বেগম , চলো…
বাইরে বেরোতেই মুখোমুখি হলো জুনাইদের । পিছনে হন্তদন্ত লতিফা । জুনাইদ কে দেখে পুনরায় চোয়াল শক্ত হলো সংগ্রামের । জুনাইদের চাহনি শীতল । তবে কম্পিত অক্ষি পল্লব । ও বোধহয় ঢোক গিললো । কন্ঠ মনিতে দৃশ্যমান হলো তা । পেছনে লতিফা সংগ্রাম কে দেখে ভড়কালো । ঢোক গিলে জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করলো । এগোতে এগোতে সাফাই গেয়ে বললো….
” সংগ্রাম ,, বাবা এসেছিস তুই ? এই দেখনা, পুরো বাড়ি এতোক্ষণ অন্ধকার ছিলো কেমন । বিদ্যুৎ ছিলো না….
সংগ্রাম হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিল লতিফা কে । দৃষ্টি অত্যাধিক নিরেট ওর । যা জুনাইদের পানে । জুনাইদ চোখ ঘোরাচ্ছে এদিক ওদিক । সংগ্রাম আঙ্গুল তুলে দাঁত পিষে ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল….
” হিসেবের খাতায় তুলে রাখলাম সবটা । ফিরে এসে হিসেবে বসবো । অনেক কিছু সহ্য করেছি, আর না । ছাড় দিয়েছি অনেক , এবার আর না । অনেক হিসেব বাকি আছে তোর সাথে , ফিরে এসে না হয় সবটা খুলে বসবো । তৈরি থাকিস নিজের প্রাপ্য টুকু বুঝে নেওয়ার জন্য । আমি ফিরবো খুব শীঘ্রই ।
এবার লতিফার দিকে ফিরলো । লতিফা কে এক পলক দেখে শ্যামার দিকে তাকালো । মেয়েটার চোখ নামানো । শরীর নেতিয়ে । সংগ্রামের উপর অর্ধ ভার । সংগ্রাম চোখ সরিয়ে লতিফার দিকে তাকালো । বললো কটাক্ষ করে…
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৬
” আমার বেগম আম্মা ডাকটাও যোগ করেছে তোমার নামের সম্বোধনের পাশে । ফুফু আম্মা ? যার অর্থ বোঝার সামান্য জ্ঞান টুকুও নেই তোমার । তা ফুফু আম্মা, তৈরি থাকবেন । আমি ফিরবো আপনার মেয়েকে নিয়ে । পারলে একটু দোয়া করবেন নিজের মেয়ের জন্য । শুনেছি মায়ের দোয়া কাজে লাগে , সে যতই নিকৃষ্ট হোক না কেন । দোয়া করবেন একটু বালার জন্য । আর নিজের ছেলে আর নিজের জন্যও একটু মানত করে রাখবেন আল্লাহর কাছে । আমি কিন্তু ছাড় দেবো না এবার । সবকিছুর হিসেব তুলবো…
আসলাম ….
