Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৫ (২)

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৫ (২)

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৫ (২)
ইশরাত জাহান জেরিন

রাত নামতেই তৈরি হলো চিত্রা। আজ সে সেজেছে ফারাজের প্রিয় রঙে—মেরুনে। অথচ এই রঙটাই একসময় তার কাছে হয়ে উঠেছিল ভয়ংকর স্মৃতির নাম। শেষবার মেরুন পরেছিল যেদিন, সেদিনই ফারাজের শরীরে গুলি লেগেছিল । তারপর আর কোনোদিন সাহস করে এই রঙ ছোঁয়নি সে। তার কাছে মেরুন মানেই রক্ত, কখনো টকটকে লাল, কখনো কালো-লালের মিশেলে ঘন হয়ে ওঠা এক অশুভ সংমিশ্রণ। চুলগুলো আজ খোলা রাখল সে। শরীরটা আগের চেয়ে কিছুটা সুস্থ দেখালেও ভেতরটা একদম ফাঁকা। প্রচণ্ড ক্ষুধা লাগে, অথচ মুখে তুললেই বমি চলে আসে।

যেন শরীর নিজেই জীবনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। নিচে নামার আগে একবার মোহনার ঘরে গেল চিত্রা। মোহনা বারান্দায় বসে, আনমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে। খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছে মেয়েটা। চিত্রা ওর সঙ্গে দু-চারটা কথা বলার চেষ্টা করল, তারপর আয়েশাকে বলে গেল যেন মোহনার দিকে বিশেষ নজর রাখে। মোহনা কোনো উত্তর দিল না। শুধু তাকিয়ে রইল। এক অদ্ভুত, ভাঙা নয় বরং অস্বাভাবিক শান্ত দৃষ্টিতে। এই তাকিয়ে থাকাটার মানে কী চিত্রা বুঝতে পারল না। তবে আজ মোহনাকে আগের মতো ভেঙে পড়া লাগছে না। বরং ভয়ংকরভাবে স্বাভাবিক। বাইরে বজ্র গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়িতে ওঠার আগে চিত্রা একবার পেছনে তাকাল। বিশাল জমিদার বাড়ি। এলাহী মেনশন। গেটের সামনে জমেলা আর আয়েশা দাঁড়িয়ে, দু’জনেই হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাচ্ছে। সে গাড়িতে বসেই প্রশ্ন করল, “ড্রাইভার যাবে না?”বজ্র তখন সিগারেট ধরানো অবস্থায় ড্রাইভিং সিটে বসে। গায়ে সাদা ফর্মাল শার্ট, কালো প্যান্ট। শেষ টান দিয়ে ধোঁয়া বাইরে ছুড়ে দিয়ে হালকা হাসল সে। “না। আজ তোমাকে তোমার গন্তব্যে আমিই পৌঁছে দেব।”

শীত প্রায় বিদায়ের পথে। সামনে রোজা, তার পরেই দাবদাহের গ্রীষ্ম। প্রকৃতি যেন আগেভাগেই ইঙ্গিত দিচ্ছে এবার সে নিজেকে নতুন রূপে সাজাবে। বাতাসে এক অদ্ভুত পরিবর্তনের গন্ধ, যেন পুরোনো সবকিছু ঝরে পড়ে নতুন কোনো অধ্যায় শুরু হতে চলেছে। চলন্ত গাড়িটা হঠাৎ থামিয়ে দিল অভ্র। আজ অভ্র ড্রাইভ করছে। ফারাজের একটুখানি ইশারাতেই সে ব্রেক চেপে ধরল। চারদিকে নির্জনতা। বুনো ঝোপঝাড়ে ঘেরা রাস্তা। বাতাসা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে, গাছের পাতায় পাতায় মৃদু কাঁপন। প্রকৃতি অপার সুন্দর। এমন রাস্তায় গাড়ি চালানো যে কতটা নিরাপদ, কে জানে! ফারাজ দরজা খুলে নেমে পড়ল। অনুমতির তোয়াক্কা না করে আবার একটি মদের বোতল খুলল। গটগট করে সেই আগুনের মতো জ্বালানো বিষ গলাধঃকরণ করল সে।অভ্র আর বসে রইল না। দ্রুত নেমে এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,

“ভাই, ঠিক আছেন তো? একটু শক্ত হন। আপনার মতো মানুষ এভাবে ভেঙে পড়ে?”
ফারাজ তিক্ত হেসে মাথা নাড়ল। “রোজ ঠিকই বলেছিল… আমার নিজেকে বদলানো উচিত হয়নি। মনে হচ্ছে যার জন্য সব ছেড়েছি, সেই-ই আজ আমায় ছেড়ে দিয়েছে।”
“কেউ আপনাকে ছেড়ে যায়নি ভাই…” ফারাজের চোখ জ্বালা করে উঠল। কণ্ঠ ভারী হয়ে এল। “শুধু চলে যাওয়াকেই কি ছেড়ে দেওয়া বলে, অভ্র?
আমি কার সঙ্গে লড়ব বল? ওই খোদার সঙ্গে যে এমন ভাগ্য লিখে দিয়েছে? নাকি খোদার বানানো সেই মাখলুকাতের সঙ্গে যার সঙ্গে এই ভাগ্য জুড়েছে?” সে থেমে গেল এক মুহূর্ত। চোখে জমে উঠল জল। “এই ভালোবাসা আমায় কোথায় এনে… একা ফেলে চলে গেল?” আরেক চুমুক মদ গিলে সে গাড়ির সামনেই বসে পড়ল। চারপাশে কেবল অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা। কোনো মানুষ নেই, কোনো শব্দ নেই। শুধু ভাঙা এক হৃদয়ের ভারী নিঃশ্বাস। কষ্ট ঢাকতে ফারাজ হঠাৎ হাসতে হাসতে গান ধরল। যার ভেতরে লুকিয়ে আছে অগণিত ভাঙনের শব্দ…

~Milne hai mujhse aayi
Phir jaane kyun tanhaai
Kis mod pe hai laayi aashiqui
O, khudse hai ya Khuda se, iss pal meri ladaai
Kis mod pe hai laayi aashiqui~

রাত তখন ভালোই হয়েছে। বজ্র জঙ্গলের ধারের একটা বাড়ির সামনে গাড়ি থামালো। চিত্রা চারিদিকে একবার তাকিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল, “এখানে সারপ্রাইজ?”
বজ্র ইশারা করে গাড়ির থেকে তার ফোন আনার বাহানায় ভেতরে প্রবেশ করে একটা কল করল। মুহূর্তেই কলটা রিসিভ হলো। বজ্র জিজ্ঞেস করল, “সিফাত তুমি প্রস্তুত তো? চিত্রাকে আমি নিয়ে এসেছি।”
“হুম, আসেন জলদি।”
বজ্র গাড়ি থেকে তার পিস্তলটা পকেটে ঢুকিয়ে গাড়ি লক করে বলল, “ওইযে ওইদিকে। চলুন ভাবিজান।”
চিত্রা আরো একবার চারপাশ পর্যবেক্ষণ করল। কিছু তো ঠিক লাগছে না তার। তবুও জঙ্গলের ভেতরের ওইবাড়িটার দিকে পথ ধরল।

ফারাজ তখনও গাড়ির সামনেই পড়ে ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে অভ্রর ফোনে একটা কল এলো। রিসিভ করতেই সে থমকে গেল। ” লোকেশন পেয়ে গিয়েছি ভাই। কিন্তু…”
বাকিটুকু শোনার আগেই ফারাজ উঠে দাঁড়াল।
” বজ্রকে আমার শুরু থেকেই সন্দেহজনক মনে হয়েছিল। কাল রাতে ঘুম আসেনি বলে ছাদে উঠেছিলাম। ঠিক তখনই ওকে ফোনে কথা বলতে শুনি। শেষ সিঁড়িতে পা রেখেই বুঝে যাই কণ্ঠটা বজ্রের। থেমে যাই। কারণ কলের ওপাশে ছিল সোহান পালোয়ান।”
অভ্রর কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল। আপনি নিশ্চিত?”

” একদম। স্পষ্ট শুনেছি ওর মুখে সোহান পালোয়ানের নাম। শুধু এটুকুই বুঝতে পেরেছি আজ ওরা দেখা করবে।”
“তারপর?”
” তারপর আর কি? বজ্র তো ফোন রেখে দিলো।”
” তাহলে বিষয়টা গুরুতরই। এমনিতেই পরিস্থিতি ভালো না। তার ওপর বজ্র আলাদা করে সোহানের সঙ্গে দেখা করবে, আমাদের না জানিয়ে? এটা ভাবতেই অস্বস্তি লাগছে।”
” লোকেশন ঠিকঠাক?”
“জি ভাই। খবরটা দিয়েছে আমাদেরই লোক। সেই ইতালিয়ান হ্যাকার। যার তথ্যের নির্ভুলতার কোনো তুলনা নেই।”
ফারাজ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। রাস্তায় মদের বোতল ছুড়ে ফেলে গাড়িতে উঠে পড়ল।” দে, আমি চালাই।”
” না ভাই, আপনার অবস্থা ভালো না।”
ফারাজ বিরক্ত হাসি হেসে বলল” আরে শালা সর তো! এই দুটো বোতল ফারাজের কিছু করতে পারবে না। বরং আয়েশাকে ফোন কর। জিজ্ঞেস কর তো চিত্রা রাতের খাবার খেয়েছে কি না।”

” আপনার বউ, আপনি নিজেই জিজ্ঞেস করলে হয়।”
” তোর ভাবি লাগে, তুই খেয়াল রাখবি না শালা?”
অভ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।” শালা শালা করতে করতে আপনার মেয়ের শ্বশুর যেন না হয়ে যাই!”
ফারাজ চোখ বড় করে তাকাল। “ফারাজ এলাহীর মেয়ে কোনো কুদ্দুস-ফুদ্দুসের গলায় ঝোলার জন্য জন্মাবে না। আর কে বলেছে আমি আমার মেয়েকে বিয়ে দেব? আমার মেয়ে হবে ইতালির সবচেয়ে বড় মাফিয়া। মাফিয়া প্রিন্সেস!
অভ্র মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জীবনে প্রথম বাপ দেখলাম, যে মেয়েকে গুন্ডা বানানোর স্বপ্ন দেখে। হায় খোদা! মনে হয় ভবিষ্যৎ বউমা আমাদের ভাত না খাইয়ে বুলেট আর মদের বোতল ধরাবে।”

” আগে নিজের বাচ্চা হোক, তারপর সম্বন্ধী হওয়ার স্বপ্ন দেখিস।”
কিছুক্ষণ আগেও ফারাজের বুক জুড়ে জমে ছিল ভারী অন্ধকার। অথচ অভ্রর এই ছেলেমানুষি কথাগুলো মুহূর্তেই মনটা হালকা করে দিল। সে পারেও। সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তেও হাসি টেনে আনতে। অভ্র কাঁধে হাত রেখে বলল, “ভাই, সবসময় এমন হাসিখুশি থাকবেন। হাসলে আপনাকে চরম মাত্রায় গরম লাগে। তখন তো আমার নিজেরই মন চায় ঠেসে আপনার গালে একটা কড়াক চুম্মা দেই।”
ফারাজ চোখ কুঁচকে বলল, নাউজুবিল্লাহ!”

ঘরটা অদ্ভুতভাবে ছিল। বাইরের পৃথিবী এই ঘরের থেকে বহু দূরে সরে গেছে। মোহনা আয়নার সামনে দাঁড়ায়। গোসল করে এসেছে সে। দুই রাকাত নফল নামাজও পড়েছে৷ লাল বিয়ের শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে আছে তার। ঠিক যেদিন রোশানের হাত ধরে নতুন জীবনে পা রেখেছিল সেদিনের মতোই। বাগান থেকে একটা লাল গোলাপ এনে কানেও গুঁজেছে। চোখে সুন্দর করে কাজল দিয়েছে। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। বিয়ের গহনা গুলোও পড়া। চোখ দুটো ফুলে আছে, কিন্তু জল আর নামে না। কান্না অনেক আগেই ক্লান্ত হয়ে গেছে।
সে ধীরে ধীরে নিজের পেটের ওপর হাত রাখে।
” আমার সোনা…তুই কি জানিস, তোর বাবা কত সুন্দর মানুষ ছিল? কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। ” সে আমায় কখনো কাঁদতে দেয়নি। বলতো, “এই দুনিয়া খারাপ হতে পারে, কিন্তু আমি তো আছি। আজ সে নেই…. এখন আর এই দুনিয়াটাও তোর বাবাহীন আর সহ্য হয় না আমার।” মোহনা পাশের ছোট টেবিলের দিকে তাকায়। সেখানে স্বামীর ছবি। ধুলো জমেছে, তবু তার হাসিটা অক্ষত।

সে ছবিটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। ” তুমি বলেছিলে, আমাকে কখনো একা ছেড়ে যাবে না।
তাহলে আজ এত দূরে কেন চলে গেলে?”
তার গলা ভেঙে আসে। ” জানো… আমি খুব লড়েছি। আমাদের বাচ্চাটার জন্য, তোমার স্মৃতির জন্য, বেঁচে থাকার জন্য। কিন্তু স্মৃতির যুদ্ধে আমি এক পরাজিত সৈনিক। এই পৃথিবীটা খুব নিষ্ঠুর, খুব শক্ত… আমার মতো দুর্বল মেয়ের জন্য নয়। ”
সে চোখ বুজে নিঃশ্বাস নেয়। ” আমি পারছি না আর।
তোমাকে ছাড়া প্রতিটা সকাল মৃত্যু হয়ে আসে। প্রতিটা রাত কবরের আজাবের মতো কঠিন লাগে, ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক।”
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় মোহনা। দড়িটা আগে থেকেই ঝুলছে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে। মোহনা শেষবার আয়নার দিকে তাকায়। লাল বধূর সাজে আজ সে আবার বউ হয়েছে। কিন্তু এবার জীবনের জন্য নয়, মৃত্যুর জন্য।
“অপেক্ষা করো আসছি।”

সে পেটের ওপর হাত রাখে। ” আমরা দু’জনই যাচ্ছি বাবার কাছে। আর কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না।” এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর ধীরে ধীরে দড়ির ফাঁস নিজের গলায় তোলে। চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে,” ভালোবাসি… আজীবন… মৃত্যুর পরেও।
এক ঝাঁক বাতাস জানালার পর্দা উড়িয়ে নেয়।
আর সেই নীরবতার মাঝেই মোহনার দুনিয়ার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিঁড়ে যায়। লাল শাড়ির বধূ আজ চলে যায় ভালোবাসার দেশে। যেখানে আর কোনো কষ্ট নেই, কোনো নিষ্ঠুর পৃথিবী নেই… শুধু অপেক্ষায় থাকা মানুষটা আছে। এই বাড়িতে যেমন ভাবে এসেছিল, এই বাড়ি থেকে তেমন ভাবেই বিদায় নিচ্ছে সে৷ শেষবার চোখের সামনে রোশানের মুখটা ভেসে উঠল তার। চোখের কোণে জল। তবে এই জল পুনরায় ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সাক্ষাতের। গলার ফাঁস দীর্ঘ হলো। জানালার পর্দা ভেদ করে খোলা বাতাসেরা তার হয়ে গাইল,

~পথ হারানো পথিক হলাম
সব হারিয়ে নিঃস্ব
তোর আমার এই প্রেমের
কি দাম দেবে বিশ্ব
প্রেমের নামে কিনলাম আমি
নিঠুর অভিশাপ
তোর আমার প্রেমে ছিল রে বন্ধু,
ছিল পুরোটাই পাপ~
ঘরের মধ্যে একটা আতরের সুগন্ধি ছড়াল। রহু তখন যাই যাই। মোহনা তবুও বুঝল কেউ একজন এসেছে। সে ঝাপসা দেখতে পারছে। একটা সাদা পাঞ্জাবি পড়া সুশোভিত পুরুষ। সে মৃদু হাসল। বলল,”তুমি এলে অবশেষে।”
ওপাশ থেকে একটা কণ্ঠ ভাসল হয়তো,”এলাম মোহনা, তোমায় ছাড়া থাকা যায় বলো সোনা বউ?”

জঙ্গলের মাঝের বাড়িটার সামনে এসে থমকে গেল ফারাজ। মৃদু কণ্ঠে অভ্রকে জিজ্ঞেস করল,”এই হাতুড়ি ডাক্তার এইখানে কেন? রাতের অন্ধকারে সোহান পালোয়ানের সঙ্গে এখানে দেখা করতে এসেছে?”
“ভাই তাই তো বলি আমরা সবাই বিয়ে করে ফেললাম বজ্র কেন করছে না৷ শেষে সোহান পালোয়ানের সঙ্গে লুতুপুতু? ছিহ ভাই ছিহ।”
“সেটা পরের বিষয়, এখানে বাল যেই অন্ধকার। তার ওপর সোহান তো কাইল্লা অন্ধকারে এটারে এখানে দেখবে কেমনে? কিছু করা তো দূরের বিষয়।”
হঠাৎ বিকট একটা শব্দ হলো। সেই সঙ্গে মানুষের গোঙানির শব্দ। ফারাজ আর অভ্র মুহূর্তেই সর্তক হয়ে গেল। ফারাজ তার পিস্তলে নতুন ম্যাগাজিন ভরল। তাতে গুলি লোড করা। অভ্রর পিস্তল আগে থেকেই হাতে। ফারাজ অভ্রকে বলল,”এখানে কোনো কিছু তো ঠিক নেই। তুই আমার পিছনে থাক।”
“কিন্তু ভাই, এখানে অস্বাভাবিক লাগছে সব। আপনার আগে যাওয়া ঠিক হবে না।”
“কোনটা ঠিক কোনটা ভুল তা তোর থেকে জানতে হবে না।”

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফারাজ একটা শ্বাস ছাড়ল। অভ্র তার পেছনেই আছে। ভেতরে গুলির শব্দ হয়েছে। ফারাজ যদি এমন সময় প্রবেশ করে ওপর পক্ষের লোক যে তাকেও গুলি করবে না সেটা হাস্যকর। তাই ট্রিগার তাকেও টানতে হবে। দরজাটা আচমকা খুলেই সরাসরি পিস্তল ধরল ফারাজ৷ তবে ভেতরে প্রবেশ করেই এক মুহূর্তেই জন্য থমকে গেল সে। তার পেছন পেছন অভ্রও প্রবেশ করেছে। সে নিজের মাথাতেও আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম। ঘরের মেঝেতে রক্তের বন্যা বইছে। তবে এটা কোনো বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে সামনে থাকা মানুষগুলো। ফারাজ কাঁপা দৃষ্টিতে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকালো। কালো রঙের একটা হুডি পড়া সেই ব্যক্তি। হঠাৎ পেছন ফিরল সে। ফারাজের তখন হৃদয় যেন ক্ষতবিক্ষত। দু’জনের দৃষ্টি এক হলো। একজনের দৃষ্টি আহত, অন্যজনের দৃষ্টিতে রহস্য। লোকটি হুডি নামালো। ঠিক তখনই ফারাজ কম্পিত গলায় আওরালো, “চিত্রাঙ্গনা?”

হুম তার সামনের ব্যক্তিটি তারই সহধর্মিণী, তারই আগুন সুন্দরী। আজ সেই নিষ্পাপ বিবিজানের দৃষ্টি কি কঠোর। ফারাজ কিছু বলার চেষ্টা করছে। তবে গলায় আঁটকে যাচ্ছে। যেমন মাছের কাটা গলায় ফুটলে যেমন যন্ত্রণা হয়, ঠিক তেমন অনুভূতি হচ্ছে। সঙ্গে মনে হচ্ছে সেই সুই দিতে ইচ্ছে মতো বুকের ভেতরটায় আঘাত করছে।
” নিষিদ্ধ জিনিস দেখতে হয় না। জানেন না? নিষিদ্ধ জিনিস দেখলে যে ভয়ংকর শাস্তি হয় ফারাজ এলাহী।”
ফারাজ চিত্রার মুখের দিকে তাকালো। কি ভয়ংকর দেখা যাচ্ছে তাকে। সারা মুখে রক্ত লেগে আছে। হাতে রক্ত। সে আস্তে করে হাতের পিস্তলটা ফারাজের দিকে তাক করে। ফারাজের সবকিছু কল্পনা মনে হচ্ছে। সে এই কল্পনা থেকে বের হতে যায়। তার আগুন সুন্দরী তার দিকে পিস্তল তাক করছে? চিত্রা পুনরায় বলল,” রাশিয়ান রোলেট খেলবেন? এই মুহূর্তে আমার রিভালভারে একটি মাত্র বুলেট আছে। বাকি চেম্বারগুলো খালি। আমি একবারই সিলিন্ডার ঘুরিয়ে ট্রিগার প্রেস করব। দেখি ভাগ্য ইতালিয়ান স্মাগলারের প্রতি কতখানি সহনশীলত।”

হঠাৎ অভ্র পেছন থেকে এগিয়ে এসে চিত্রার দিকে রিভলভার ধরতে গেলেই তার কপালের বা পাশ বরাবর একটা রিভলভারে ব্যারেল এসে ঠেকল। আঁটকে দিলো তাকে। তার কপালে পিস্তল ঠেকানো? অভ্র আস্তে করে বা পাশ ফিরতেই যেন সর্বোচ্ছ ভেঙে পড়ল। “ঘরনী?” আয়েশা তার দিকে ফিরেও তাকালো না। ফারাজের চোখে তখন জল। সে আঘত গলায় বলে উঠল,”আমায় গুলি করলে যদি তোমার শান্তি হয়, তবে প্রেস করো ট্রিগার। বুক পেতে দিলাম। আমি মরলে পৃথিবী কেবল
হারাবে এক পাপিষ্ঠ পুরুষকে,যে স্ত্রীর জন্য নিজের সকল পাপ ছাড়া কিছুই করে যেতে পারেনি। আফসোস।” ফারাজের হাতের রিভলভারটা তো সে কখনই ফেলে দিয়েছে। চিত্রাঙ্গনার গায়ে ওটা ধরার বিন্দুমাত্র সাহস নেই, এমন সাহস তার কভু না হোক। চোখের জল নিয়ে তার অন্তর আত্মা চিৎকার করে বলতে চাইছে,

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৫

~প্রেমের নামে কিনলাম আমি
নিঠুর অভিশাপ
তোর আমার প্রেমে ছিল রে বন্ধু,
ছিল পুরোটাই পাপ~
ফারাজ মৃদু হাসল। বুক পেতে দিলো নিজের। তার কোনো কিছুর উত্তর লাগবে না। চিত্রা নিষ্পলক দৃষ্টিতে তার পানে তাকিয়ে আছে। চিত্রা ট্রিগারটায় আরো শক্ত করে হাত রাখল। মুহূর্তেই গুলির একটা বিকট আওয়াজ হলো। একই সঙ্গে ছিটকে আসা গরম শক্ত আর গুঙিয়ে ওঠা দেহের আহত চিৎকার।

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৬

1 COMMENT

  1. তারা তারি দেন পরের এপিসোড 😤😩🥺😢😭🥰😊🌚🌚🌚🥀🥀🥀🥀🥀🥀🥀

Comments are closed.