Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ৩৩

সায়রে গর্জন পর্ব ৩৩

সায়রে গর্জন পর্ব ৩৩
নীতি জাহিদ

বাতাসে মাটির সোদা গন্ধ। বাগানের বেলী,রজনীগন্ধা সুগন্ধ ছড়াচ্ছে। শেহজা অনেকটাই সুস্থ। দুদিনের মাঝে অনেক পরিবর্তন এসেছে সুলতানা মঞ্জিলে। হাসিতে আনন্দে মুখরিত। অপেক্ষা বাড়ির ছেলে বাড়ি ফেরার। শেহজাকে ঘুম পাড়িয়ে সুলতানা কবিরের রুমে দিয়ে আসলো দিয়া। শিফাকে বললো,
– ছাদে চলো, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।
– ভাবীজান এখন যাবেন? যে পরিমান বৃষ্টি আপনার ঠান্ডা লাগলে তো শেহজার ও লাগবে।
– শেহজার বাবা সুস্থ আলহামদুলিল্লাহ, ওর বাবার সাথে ওর আত্মার টান। বাপ সুস্থ তো বেটি ও সুস্থ। তুমি প্লিজ চলো।
দিয়া গায়ে ওড়না জড়িয়ে শিফার হাত ধরে ছুটলো ছাদের দিকে। ডাইনিং এ দাঁড়িয়ে দুজনের আলাপ শুনছিলো আড়াল থেকে রায়হান সাহেব এবং সুলতান। সুলতানা হেসে বলে,

– দেখলা বাবুর বাবা, কেমন ছটফটিয়ে উঠলো মেয়েটা। এতখানি মেয়ে স্বামী সন্তান কি বুঝে! অথচ সব সামলে যাচ্ছে। আমি ওর মাকে যদি একবার দেখার সুযোগ পেতাম তাহলে কুর্নিশ জানাতাম। পারিবারিক শিক্ষা অনেক বড় ব্যাপার বুঝলে।
রায়হান সাহেব হেসে বললেন,
– বুঝলে গিন্নী, বাবুর চোখ জহুরির চোখ, নিজের যোগ্য সহধর্মিণী নিজেই বেছে নিয়েছে, আমরা মাঝে মাঝে বয়স দিয়ে সব মাপি। কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা,অভিজ্ঞতা বুঝিনা। গত তিন বছরে মেয়েটা অনেক কিছুই শিখেছে স্বামীর কাছ থেকে। আমি যতটুকু বুঝেছি ওর কোনো কিছু শেখার মারাত্মক একটা ইচ্ছাশক্তি আছে। ওর কাছ থেকে নওরীন ও শিখবে,লিমনের বউ ও শিখবে। মূলত এই বাড়ির বউগুলোর পথনির্দেশক দিয়াই হবে ভবিষ্যতে দেখে নিও। তবে আমি খুশি যে আমাদের শিফার সময়টা ভালো যাচ্ছে দিয়ার সাহচর্যে থেকে।
– আমিন। আল্লাহ এভাবে যেন সব ঠিকঠাক রাখে। এখন তো ইনশাআল্লাহ আমাদের বাবু ও ফিরে আসবে।

শাহীনের পারসোনাল সিক্রেট রুম। মূলত ইয়াজের বাসাকে ওরা নিজেদের অফিস হিসেবে ব্যবহার করছে বেশ কিছু বছর।
– মনি কোথায়?
– আমাদের ডেরায়।
– ভাইজান যেন ঘুনাক্ষরে ও কিছু টের না পায়। তোর আর আমার দুজনেরই গর্দান যাবে।
– জ্বি চিফ। চিফ আরেকটা কথা?
– কি?
– খালেদ পারভেজ তো পালিয়েছে?
শাহীন একপেশে হাসি দিয়ে বলে,
– তোর কি সত্যি ক্ষমতা ছিলোনা ওকে ধরার?
কিছুটা ভ্রু কুচকে আসলেও শাহীনের তাচ্ছিল্য থেকে ধরে নিলো বিদ্রুপ করছে সে। ইচ্ছে করেই ও তো ছেড়ে দিয়েছে খালেদ পারভেজকে। দরজা দিয়ে পাভেল হাসতে হাসতে ঢুকলো। একটা চেয়ার টেনে বসলো। গ্লাসে পানি ঢেকে এক ঢোক খেয়ে বলে,

– ডানা টা না কা/টা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছিনারে। ছেড়ে দিয়ে কি ভুল করলাম?
– ওকে কেনো ছাড়ছি জানিস?
– কেনো?
– ভাইজানের জন্য। ভাইজান চেয়েছিলো নিজ হাতে ওকে শাস্তি দিবে। ওর পাপের পরিমান ফরিদের থেকেও অনেক বেশি।
হঠাৎ করে ইয়াজ বলে উঠলো,
– চিফ, ফরিদের উপর পুলিশের থার্ড ডিগ্রি চলতেছে। ওর কেস কে নিয়েছে জানেন?
পাভেল সিগারেট বের করে আয়েশী ভঙ্গিতে লাইটার জ্বালিয়ে বললো,
– অফিসার মাশরুফ ফারুক।
শাহীন বাঁকা হেসে বলে,

– ওরে আর কি বা শাস্তি দিবে। এমনিতেই ম/রার সময় হয়ে আসছে। কি খেলটাই না দেখালো মেহনাজ পাঠান।
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তিনজনের মুখ দিয়ে। অন্যমনস্ক হয়ে শাহীন পুনরায় বললো,
– রাশেদ ভাইয়ের মত মানুষটাকে আমরা কিছুতেই ভুলতে পারিনা উনিতো মা। একদম ঠিক হয়েছে ওর সাথে।
টেবিলের উপর ফোনটা ভাইব্রেশনের জন্য কেঁপে উঠলো। অপরিচিত নাম্বার দেখে প্রথমে উপেক্ষা করলো। কে*টে গেলো। পুনরায় কল বেজে উঠলো। পাভেল ও বললো ধরতে। শাহীন ফোন রিসিভ করতেই ও পাশ সালাম ভেসে এলো। উত্তর দিতেই অপর পাশ থেকে মোটা গম্ভীর স্বর ভেসে এলো। শাহীনের অক্ষি বৃহদাকৃতি ধারণ করেছে। শাহীন সালাম দিলো বড় করে। ওপাশ থেকে উত্তর ভেসে এলো,

– ওয়ালাইকুমুস সালাম। শাহীন কেমন আছো?
– জ্বি ভাইয়া ভালো। আপনি ভালো আছেন?
– আলহামদুলিল্লাহ। শাহাদের কি অবস্থা?
– ভাইজান আগের চেয়ে বেটার। থেরাপি চলছে।
– কবে আসতে পারে দেশে?
– মিনিমাম এক মাস লাগবে।
– সিঙ্গাপুর ন্যাশনালে আছে তাই তো?
– জ্বি ভাইয়া।
– ঠিক আছে, আমি যাবো। বাই দ্যা ওয়ে, কাজ ফেলে রেখোনা। খালেদকে ধরো। নরেশ মিত্রকে প্রথমে ছাড় দিয়েছিলাম বলে মাথা চড়া দিয়ে উঠেছিলো মনে আছে তোমার।

– জ্বি ভাইয়া।
– খালেদকে ধরে নিজের কবজায় আটকাও। শাহাদকে রেস্ট দাও। এসে যেন স্ত্রী সন্তান নিয়ে ভালো থাকে। সবাইকে নিয়ে বাসায় আসো তুমি।
– ভাইজান আসলে একদিন আসবো ইনশাআল্লাহ।
– অপেক্ষায় রইলাম। আচ্ছা শুনো রাশেদের সব কিছু আমার কাছে সহিহ সালামতে তানভীর পৌঁছে দিয়েছে। হাম্মাদের সাথে দেখা হয়েছিলো সে জানালো শাহাদের অনুপস্থিতিতে এখানে আছে বেশ কিছুদিন। একটু চোখ কান খোলা রাখবে।
– জ্বি ভাইয়া।
– আল্লাহ হাফেজ।
– আল্লাহ হাফেজ।
ফোনটা রেখে দম ফেললো। পাভেল কপালে ভাজ ফেলে বলে,

– বসের পুরা গ্যাংটাকেই আমার ভয় লাগে জানিস। একটা আতঙ্কে থাকি। সব খবর এদের নখদর্পনে।
– আমি তার চেয়ে বেশি থাকি। মিশনে গেলে চিফ মেজর খন্দকার এখানে আসলে আমাদের এক্স লে.কমান্ডার আর এখন তো নাফিস ভাইয়া।
ইয়াজ বলে উঠলো,
– তবে যাই বলেন চিফ, উনারা একেকজন জেম। দেশের সম্পদ। উনারা আছেন বলে আমরা সেফ। ভয় হয় এতকিছুর পর ও অপরাধ বেড়েই যাচ্ছে। যখন দেশে উনাদের মতো কেউ থাকবেনা তখন কি হবে?
– রসাতলে যাবে। আপাতত অনেক ভেবেছি। যা খালেদ পারভেজকে ধরে আটকা। নতুবা এই ভদ্রলোক ঠান্ডা মাথায় খালেদ পারভেজকে বহাল তবিয়তে নিজের পিঞ্জরায় ঢুকাবে আর ভাইজান এসে আমাদের পিন্ডি চটকাবে কেনো উনার হাতে কাজ তুলে দিয়েছি। ভাইজান বরাবরই উনাকে নিট এন্ড ক্লিন রাখেন। তাই জন্য রাজনীতি থেকেও উনাকে দূরে রেখেছে। বন্ধুত্ব তো এমন হওয়া উচিত।
এ কথা বলতে বলতে শাহীন পাভেলের কাঁধে মুচকি হেসে হাত রাখলো।পাভেল মুচকি হেসে উঠে দাঁড়ায়। জানায় আজ সুরাইয়াকে দেখতে যাবে। কাল ওদের ফ্লাইট।

সারা স্কুল ড্রেসে কাদা মাখানো। মাঠের মাঝখানে হাটুগেড়ে ভিড় জমিয়েছে অন্য শিক্ষার্থীরা। মাইশা বুঝাচ্ছে, উঠ শিফা আর কাঁদিস না লোকে কি বলবে। কে শোনে কার কথা। শিফার একটাই কথা, সে আগে ওই উর্মিলার চুল ছিঁড়বে এরপর বাসায় যাবে। এর মাঝে ব্যাগ থেকে আস্তে করে ডায়রিটা বের করে নিলো সদ্য। ডায়েরী নিয়ে ছুটলো ক্যান্টিনে। জামিল মামার ফোন থেকে শিফার বাসায় ফোন দিতে হবে। ডায়েরীতে বাসার নাম্বার আছে। প্রথমেই পেল ভাইজান, এরপর ছোট ভাইয়া। পরে পাভেল ভাই। সদ্য উনাকে জানে শাহাদ দেশে নেই আর শাহীন হয়তো কাজে ব্যস্ত থাকবে। পাভেলকে প্রায় সময় দেখেছে শিফাকে স্কুল থেকে নিয়ে যেতে। ফোন দিলো পাভেলের ফোনে। সব খুলে বললো। এরপর আবার ছুটে এলো শিফার কাছে। ওয়াশ রুমেই এই অকান্ডটি ঘটিয়েছে দুই বালিকা। শিফা ছুটির পর চুল আঁচড়াতে ওয়াশরুমে যায়। উর্মিলা ওর অন্য বান্ধবীকে শুনিয়ে শিফাকে খোঁচা দিয়ে বললো,
– আজ কাল দেখি সেজে গুজে স্কুলে আসে আবার বাইরে যায়। টিচারদের এই রূপ দিয়ে দমায় রাখে। ভালো রেজাল্টের খুশিতে বান্ধবীদের খাওয়ায়। বাপের টাকায় এমন ভালো রেজাল্ট সবাই করতে পারে। আসল খেল এস এস সি তে দেখবো।
শিফা ক্ষেপে গিয়ে বললো,

– তোর মতো তো রাস্তায় রাস্তায় বুক পেট দেখায় হাঁটি না। শরীরে একটা ক্রস বেল্ট পরেছে এমন ভাবে মনে হচ্ছে পরা আর না পরা একই কথা। আমার রূপের তো বাহার ঝড়ে পড়ছে তাই টিচাররা খুশী হয়ে নাম্বার দেয়। তুই তো সব খোলা রাখলেও কেউ ঘুরে তাকায় না।
এই শুরু হলো থা/প্প/ড় আর মা/রা/মা/রি। শিফার হাত ছিলে গিয়েছে, পায়ে ব্যাথা পেয়েছে। উর্মিলার মাথা কে*টে গিয়েছে। এখন দুজন মাঠের দু পাশে বসে আছে। ভাগ্য ভালো ছুটি হয়ে গিয়েছে৷ নতুবস লংকা কান্ড হত। মাঠে এসে ধপ করে কাদার মধ্যে বসে আছে। বান্ধবীদের ও কাছে ঘেষতে দিচ্ছেনা শিফা। এমন সময় বাইক নিয়ে সোজা পাভেল ঢুকে পড়লো স্কুল গ্রাউন্ডে। শিফাকে এমন অবস্থায় দেখে চক্ষু চড়কগাছ। সামনে হতবিহ্বল হয়ে এগিয়ে এলো। পাভেলকে দেখে সদ্য ছুটে এসে বললো,
– ভাই দেখেন এই কাদার মধ্যে বাচ্চা পোলাপানের মত গড়াগড়ি খাচ্ছে। সবাই কেমন তাকিয়ে আছে। হাত টা ছিলে…
পাভেল হাত দিয়ে থামিয়ে দিল সদ্যকে। শিফার দিকে তাকিয়ে বললো,

– কি শুনছি এসব? এখানে এভাবে বসে আছো কেনো?
ভারী মোটা স্বরটা শুনে শিফা তড়াক করে তাকালো। নিজের আপাদমস্তক দেখে পাভেলকে দেখছে। এই অবস্থায় পাভেল তাকে দেখলো! এই জিনিসটা ভেবেই কেমন অস্বস্তিতে ভরে উঠলো ভেতরটা। আচমকা বাচ্চাদের মত কান্না জুড়ে দিল। ওর এই পরিবর্তনে বন্ধুরা সব আঁৎকে উঠলো। এই তো বাঘিনীর মত গজ গজ করছিলো। এখন এমন ভেবলীর মতো কাঁদছে কেনো? পাভেল নিজেও ভয় পেলো। হাঁটু গেড়ে বসলো ওর সামনে। নিজের প্যান্টেও কাদা লাগলো। শিফার হাত ধরে উঠিয়ে বললো,

– ঠিক আছে, কিছু বলতে হবে না বাসায় চলো।
শিফাও বাধ্য বাচ্চার মতো দাঁড়িয়ে পড়লো। তৎক্ষনাৎ ঘটে গেলো এক অদ্ভুত কান্ড। কোথা থেকে একটা মেয়ে এসে পাভেলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে শিফার গালে চটাস করে এক চ/ড় লাগিয়ে দিলো। পাভেল অকস্মাৎ ধাক্কায় সামনে ঝুঁকে গেলো। শিফা কাদার মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়লো। উর্মিলা গজ গজ করে বললো,
– এবার শান্তি পেয়েছি৷ বেশি দেমাগ না তোর। একদম কাদায় কাদায় হয়েছে দেমাগ।
পাভেল ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো একটা মেয়ে সাথে কিছু পাতি মাস্তান নিয়ে এসেছে। আন্দাজ করেছে এই সেই মেয়ে। একবার শিফার দিকে তাকিয়ে পুনরায় উর্মিলার দিকে তাকালো। উর্মিলা খেয়ালই করলোনা সে কাকে ধাক্কা দিয়েছে। পাভেল নিজেকে আর সংযত করতে না পেরে কষে এক চড় লাগালো উর্মিলার গালে। এই প্রথম কোনো মেয়ের গালে হাত তুললো। এমন পুরুষালী চ*ড় খেয়ে উর্মিলার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। আঙ্গুল তুলে পাভেল একটাই কথা বললো,

– কার কলিজায় হাত দিয়েছিস তুই জানিস?
তোর সেই হাতই আমি ভে/ঙে ফেলবো।
পাভেল সামনে উদ্ধত হলে খেয়াল করলো সামনে আগাতে পারছেনা। ওদের মধ্যেই এক পাতি গুন্ডা পাভেলের পা জড়িয়ে বসেছে। নিচের দিকে তাকাতেই ছেলেটা বলে উঠলো,
– ভাই, স্যরি মাফ কইরা দেন। আমার ছোট বোন। বুঝেনাই। এই মেয়েটা এ আপনাদের পরিবারের এই কথা জানলে ওরে সাবধান কইরা দিতাম।
ছেলেটা পাভেলকে দেখেই চিনে ফেললো, সাবেক এম পি রায়হান সাহেবের পরিবারের লোক। এর মাঝে পাভেল শাহাদ ইমরোজের হয়ে কাজ করে এই ব্যাপারটা সকলের জানা। শিফার সাথে শাহাদের কোনো কানেকশন আছে কিনা কে জানে? পাভেল একটা লাথি মে/রে সরিয়ে বললো,

– আমাদের পরিবারের না হলে কি তুইসহ ওই মেয়েকে মা*রতি?
– না ভাই ওটা বলিনি।
পাভেল শিফার দিকে তাকিয়ে দেখে মাইশা,সদ্য ওর মুখ ধুইয়ে দিয়েছে ততক্ষনে। ঠোঁটের পাশটা কে*টে গিয়েছে। মাইশা ওই জায়গায় টিস্যু দিয়ে চেপে ধরে রেখেছে। পাভেল চোখ বুজে নিজেকে সামলে বললো,
– ঝামেলার কান্ডারি কে?
মাইশা বলে উঠলো,
– ভাইয়া উর্মিলা।
পাভেল গর্জে উঠলো,
– ভাই-বোন মাফ চা শিফার কাছে… কুইক।
উর্মিলা ভাইয়ের ধমকে শিফার দিকে তাকিয়া মাফ চাইলো। শিফা কিছু বললো না। পাভেল শিফার হাত ধরে টেনে নিয়ে আসলো। মাইশা আর সদ্যকে বললো,

– বাসায় যাও, চিন্তা করবে বাবা মা।
ছেলেটাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
– আর হ্যাঁ পাতি মাস্তান, আজকের ঘটনা যেন এখানে শেষ হয়। ওর বাবা বা ভাইদের কানে উঠলে তোকে আমি আস্ত পুঁতে দিব। বাকি রইলো তোর বোন। সামলে রাখ। রাজনীতির ময়দান এত সুবিধার নয়। মেয়েদের নিরাপত্তা দেয়া এখন অনেক কঠিন। যেভাবে উড়তেছে কোনো রাঘব বোয়ালের চোখে পড়লে একদম গিলে নিবে। তোর বাপের খেমতা থাকবেনা রক্ষা করার,মাথায় রাখিস।
– জ্বি ভাই।
বাইকে উঠেই শিফাকে পেছনে বসার নির্দেশ দিলো। বাধ্য বাচ্চার মত শিফা উঠে বসলো। বাইক থামলো একটা রেস্টুরেন্টে। হাতের ইশারায় অনুসরণ করতে বললো পাভেল। উপরে রুফটপে বসেই শিফাকে ফ্রেশ হতে যেতে বললো। নিজেও ফ্রেশ হয়ে নিলো। যতখানি পেরেছে কাদা ধুয়ে মুছে এসে বসলো। ততক্ষনে পাভেলের খাবার অর্ডার শেষ৷

– শুরু করো।
শিফা চুপচাপ খাচ্ছে। পাভেল ফোনে কি যেন করছে। শব্দহীন খাবার খাচ্ছে। পাভেল হাতের ফোনটা রেখে বললো,
– ভদ্র মেয়ের মতো ব্যাপারটা এড়িয়ে আসা যেত না?
নিরুত্তর শিফা। পাভেল ফোস করে দম ফেলে বললো,
– বাসায় কি জবাব দেবে?
তবুও নিরুত্তর। এবার পাভেল ক্ষেপে উঠলো। এতক্ষন প্রশ্ন করছে। কোনো উত্তর দিচ্ছেনা। কিসের এত অভিমান।এখন পর্যন্ত কথা বলছেনা। অনেক উচ্চস্বরেই বললো,
– এ্যাই ষ্টুপিড তোমার সমস্যা কি? কথা কানে যায়না। কথা বলছো না কেনো?
টুপ টুপ করে চোখের জল বেয়ে পড়ছে। চোখের পানিতেই পাভেলের মন গলে গেলো। আর কথা বাড়ালোনা। রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার থেকে একটু স্যাভলন আর তুলা নিয়ে শিফাকে পাশের চেয়ারে বসতে বলে শিফার পাশে বসলো। হাত দিয়ে থুতনী তুলে ঠোঁটের কোণায় স্যাভলন লাগানো তুলাটা চেপে ধরলো। শিনশিন করে উঠলো কা*টা। চোখ মুখ খিচে ফেললো হাল্কা আওয়াজ করে। পাভেলের ক্ষীন স্বর কানে আসলো,

– আস্তে আরেকটু। ভালো হয়ে যাবে। বাসায় যেয়ে মেডিসিন নিবে ঠিক আছে।
শিফা লক্ষ্মীমন্ত মেয়ের মত মাথা কাত করে নাড়ালো। বিলটা মিটিয়ে উঠে দাঁড়ায়। লিফটে উঠেই শিফা পাভেলের দিকে তাকিয়ে বলে,
– আপনার করে নিলেই তো পারেন। তখন তো কেউ মা/র/তে আসবেনা।
এ যেন সরাসরি কেউ মাথায় বাঁশ দিয়ে সজোরে আঘাত করলো। নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করলো। লিফট থামলো। কোনো শব্দ উচ্চারণ না করেই বাইকে উঠে বসলো। শিফা বুঝে গেলো আর হয়তো কোনো কথা আসবেনা এই মানুষটার পক্ষ থেকে। শান্ত মেয়ের মত বসে পড়লো বাইকে। তখন শিফা বাইকের পেছনের হ্যান্ডেল ধরে বসলেও এখন পাভেলের কোমড় জড়িয়ে বসলো। ছোট্ট পাতলা হাত দুটো দিয়ে নিজের পেটের কাছে উপস্থিতি পেয়েও শুকনো ঢোক গিলে বাইক স্টার্ট দিলো। মনোযোগ দিলো পিচ ঢালা রাস্তায়। বাড়ির সামনে এসেই শিফা নেমে পড়লো। দারোয়ান গেট খুলে দিলো। শাহীনের গাড়িও তখন গেটের সামনে। শাহীন নেমে পড়লো। শিফার দিকে তাকিয়ে বললো,

– কি হয়েছে রে? ব্যান্ডেজ কেনো?
শিফা মুখ খোলার আগেই বললো,
– পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছে। চিন্তা করিস না। ওয়ান টাইম লাগিয়ে দিয়েছি। বাসায় নিয়ে একটা প্যারাসিটেমল খাইয়ে দিস।
শাহীনের দৃষ্টি পড়তেই শিফা কাচুমাচু করে উঠলো। পাভেলের দিকে তাকিয়ে ভাবলো মিথ্যা বললো কেনো এই লোক! শাহীন ফোন হাতে নিয়ে শিফাকে ইশারা করলো আসতে। ততক্ষনের বাইক পার্ক করে ফেলেছে পাভেল। শাহীন বাসায় ঢুকে পড়লো। শিফা দরজায় অপেক্ষা করছে পাভেলের জন্য। পাভেল নিজের চিলেকোঠায় উঠার জন্য প্রস্তুতি নিতেই পেছন দিকে থেকে শিফা ডাক দিলো,

সায়রে গর্জন পর্ব ৩২

– পাভেল ভাই?
পাভেল থেমে শিফার দিকে ফিরে বললো,
– পাভেল ভাই রাইট? ভাই ডেকেছো না এটার মর্যাদা দিও। তখন যা বলেছো এই কথা যেন আর কখনো না শুনি।
শিফাকে ওভাবে রেখে উপরে উঠে গেলো পাভেল। রেখে গেলো ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত মন ভাঙ্গা মেয়েটাকে। এই মানুষটা কি কখনো তাকে বুঝবেনা?

সায়রে গর্জন পর্ব ৩৪