Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৪

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৪

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৪
সুরভী আক্তার

বাইরের শান্ত ঠান্ডা পরিবেশে দীর্ঘ সময় হাঁটা হাঁটি মন মস্তিষ্ক ফুরফুরে সংগ্রাম আর অংকুরের । ওরা হাসতে হাসতে বাড়িতে ঢুকলো । আজ বেশ মন খুলে সংগ্রামের সাথে কথা বলেছে অংকুর ‌। সে বয়সে সংগ্রামের ছোট ‌। তবে ভাব গতিকে সংগ্রামের অনুরূপ । বেশ জমেছে দুজনের ।
সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে প্রথমেই সংগ্রামের ঘর । সংগ্রাম থামলো নিজের ঘরের সামনে । হাসি সমেত অংকুর কে বললো…

” ঘরে যাও ,, শুভ রাত্রি ।
অংকুর বালার ঘরের দিকে পা বাড়ালো । সংগ্রাম ওর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে দরজায় টোকা মারলো । ভেতর থেকে দরজা লাগানো বুঝে নিদারুণ কন্ঠে শীতল আবেশে ডাকলো…
” বেগম ??
“….
” বেগম ,, শুনছেন ? আমাকে ছেড়ে ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি ? খুলুন দরজা টা । নাকি বাহিরেই রাখবেন আমায় আজ ?
সংগ্রাম মৃদু ডাকটা অংকুরের কানে পৌঁছেছে । ও একটু থেমে মৃদু হাসলো পিছু ফিরে । অতঃপর বালার ঘরে ঢুকলো । অংকুরের অপেক্ষায় ছিলো বালা । অপেক্ষা করতে চায় নি , কেনো অপেক্ষা করলো কে জানে । বালার ঘরে শোয়ার মতো আলাদা বড় কোনো সোফা নেই । আছে একটা , ছোট । আজ অংকুর কোথায় শোবে ? বালা মনে মনে চিন্তা করে ফেলেছে । ছোট সোফাটায় ওর ছোট্ট শরীরের অকুলান হবে না । ও বেশ রয়ে সয়ে ঘুমাতে পারবে সেখানে । অংকুর না হয় খাটে শোবে । অংকুর ঘরে ঢুকতেই বালা তড়িতে বিছানা থেকে নামলো । হাতে চাদর নিয়ে সোফার দিকে এগোতে এগোতে বললো…

” আপনি শুয়ে পড়ুন ।
” আর তুমি ?
তৎক্ষণাৎ পাল্টা প্রশ্ন অংকুরের । বালা সাথে সাথে উত্তর না করে সোফায় শুতে শুতে বললো ধীরে সুস্থে….
” আমি এখানে শোবো !
” ওখানে আরাম পাবে না । তুমি খাটে শোও !
” আপনিও আরাম পাবেন না এখানে । যে শরীর আপনার ! এখানে একটা আস্ত হাতির জায়গা হবে , তবুও আপনার হবে না ।
অংকুর চোখ সরু করে ভ্রু গুটিয়ে তীক্ষ্ণ করলো । এই মেয়ে টা খোঁটা দিলো ওকে ।
” এই , তুমি কি আমাকে খোঁটা দিলে ?
” সত্যি টা বললাম শুধু । কাউকে খোঁটা দেওয়ার অভ্যেস নেই আমার । যে চেহারা আপনার , একটা হাঁটুর জায়গাও হবে না সোফায় ।

” আমার চেহারা নিয়ে কথা বলছো ! ফিট আমি , ওকে ? খেয়ে না খেয়ে, কসরত করে এই চেহারা বানিয়েছি । তোমার মতো চুনো পুঁটি মাছ নোই আমি । নিজের চেহারা দেখেছো , একটু জোরে বাতাস আসলেই তো উড়ে যাবে ।
” বাপরে , না খেয়েই এই চেহারা , খেলে যে আরো কি হতো !
” সুরবালা !!
” জ্বি মহাশয়,, বলুন !!
শোয়া থেকে মাথা তুলে নাটকীয় ভঙ্গিতে উত্তর করলো মেয়েটা । বুঝে শুনে কথাটা বলেছে কি না সন্দেহ । অংকুরের তীক্ষ্ণ ভ্রু যুগল শিথিল হলো । কন্ঠ স্বর নরম হয়ে আসলো….
” খাটে এসে শোও ।
” উঁহু ,, আপনি শোন । আমার শশুর বাড়িতে আমি আরামে থাকবো । আর আপনার শশুর বাড়িতে আপনি । চুপ চাপ শুয়ে পড়ুন তো , আপনার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না আমার ।

” কিন্তু তোমার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে আমার ।
কথাটা ধীর কন্ঠে বলল অংকুর । বালা আজ বেশ প্রফুল্ল হয়ে কথা বললো ওর সাথে । এই অনেক । ও চাদর মুড়িয়ে শুয়ে পড়েছে জড়ো সড়ো হয়ে ।
অংকুর ঠাঁয় দাঁড়িয়ে চেয়ে রইলো ওর দিকে ।
এদিকে বাইরে সংগ্রাম সেই তখন থেকেই ডেকে যাচ্ছে শ‌্যামা কে । নরম কন্ঠ স্বর , ধীরে ধীরে গাঢ় প্রগাঢ় হচ্ছে ওর । স্নিগ্ধ কোমল কন্ঠ বিচলিত হয়ে পড়ছে । এই মেয়ে টাকে কখন থেকে ডাকছে ও । অথচ কোনো সাড়া নেই ওর । সংগ্রাম এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ‌। শেষ মেষ গলার আওয়াজ বাড়ালো ও । উচালো কন্ঠ স্বর ‌ । দরজা ধাক্কালো জোরে । ডাকলো উচ্চ বিচলিত কন্ঠে…
” শ্যামা,, বেগম ? কি হয়েছে , দরজা খোলো । ঘুমিয়েছো তুমি ? বেগম, শুনছো আমায় ? খোলো দরজাটা !
” …….
” এই মেয়ে ,, শ্যামা ? শুনছো তুমি ? বেগম ,, দরজা খোলো । এসেছি আমি । দেখো ,, খোলো দরজাটা ….

ওপাশের কোনো হুঁশ জ্ঞান, সাঁড়া শব্দ নেই । সংগ্রামের হৃদয় কেঁপে উঠলো । কি হয়েছে তার বেগমের ! এতোক্ষণ তো লাগার কথা নয় । আর শ্যামা তো ও না আসা পর্যন্ত ঘুমাবে না ,জানে সংগ্রাম ! তাহলে ? ঠিক আছে তো শ্যামা ? মনে অযাচিত আশঙ্কা জাগতেই ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো সংগ্রামের কঠিন চিত্ত । ভিজে আসলো কন্ঠস্বর । দরজায় জোরে জোরে বাড়ি মেরে ডাকতে লাগলো নিজের বেগমকে । রাতের নির্জন নিস্তব্ধতায় ওর গলার আওয়াজ , আর দরজায় বাড়ি মারার শব্দ আশেপাশে প্রকম্পিত হয়ে ঝংকার তুলছে চার দেয়ালের মাঝে ।
সংগ্রামের উচ্চ বাক্য কম্পিত হয়ে ফিরে আসছে ওর কাছেই ।

অংকুর তপ্ত শ্বাস ফেলে খাটের দিকে এগিয়েছিল , সংগ্রামের চিৎকারে কপাল কুঁচকালো সে । তড়িঘড়ি করে শোয়া থেকে উঠলো বালা । দুজনে সর্বপ্রথম চাওয়া চাওয়ি করলো একে অপরের দিকে । কেউই কিছু বুঝলো না । অংকুর দেখার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরোলো । দরজা মারিয়ে , বাইরে একই অবস্থায়, বিচলিতের ন্যায় সংগ্রাম কে দেখে অবাক হলো সে । পিছু পিছু সুরবালা বেরিয়েছে । দু’জনেই সংগ্রাম কে দেখে পুনরায় নিজেদের মধ্যে চাওয়া চাওয়ি করলো । তড়িঘড়ি করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসলো ওরা । অংকুর শুধালো সঙ্কিত স্বরে…

” কিন্তু হয়েছে ? আপনি এখনো এখানে দাঁড়িয়ে কেনো ? আপনার বেগম দরজা খোলো নি এখনো ?
এলোমেলো দৃষ্টিতে ওদের দুজনের দিকে তাকালো সংগ্রাম । বললো অধিক উত্তেজিত হয়ে…
” দেখো না , সেই কখন থেকে ডাকছি ‌। কিছুতেই সাড়া দিচ্ছে না ।
বালা,, একটু ডাক না শ্যামা কে । দেখনা ও দরজা খুলছে না কেনো ?
বলতে বলতে উদ্বিগ্ন হয়ে ফের ডাকতে লাগলো সংগ্রাম‌ । বাড়ির সবার ঘুম ছুটে গেছে । সবাই বেরিয়ে আসলো যে যার ঘর থেকে ‌। আতিয়া বেগম চোখ ডলতে ডলতে এগিয়ে এসে হাই তুলে প্রশ্ন করলেন…
” দাদু ভাই ,, কি হইছে ? এই রাইতের বেলা এমনে হাঁক ডাক পাড়তাছিস ক্যান ?
তার প্রশ্নের উত্তর করার সময় বা সুযোগ কোনোটাই হলো না সংগ্রামের । এবার আর সহ্য হলো না । দাঁত খিচলো সে । এভাবে হবে না । তার বেগমের নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে ।
সংগ্রাম কাঠ স্বরে হুংকার ছাড়লো…

” সরে দাঁড়াও সবাই…
কথা শেষ হওয়া মাত্রই শাল কাঠের ভারী দরজার উপর সজোরে একটা তীব্র লাথি আঁচড়ে পড়লো সংগ্রামের দ্বারা । চমকে উঠে পিছিয়ে দাঁড়ালো সবাই । প্রথম বার দরজায় বাতাস ও লাগলো না বোধহয় । কিছুই হলো না । আকস্মিক পরিস্থিতি বুঝে অংকুর ও নড়েচড়ে উঠলো । সংগ্রামের সাথে যোগ হলো ও নিজেও । দ্বিতীয় বার দরজার উপর দুটো সুঠাম পুরুষের দৃঢ় ধাক্কা ঝেড়ে পড়লো । দরজার ছিটকিনি আলগা করে লাগানো ছিল । ভয়ে জড়িত শ্যামা কম্পিত হাতে ঠিকঠাক ভাবে লাগায় নি । জোরে ধাক্কা পেতেই ধাম করে খুলে গেলো দরজা টা । দুদিকে দুটো কপাট হাট করে খুলে গেলো । স্বস্তি জাগলো সংগ্রামের মনে । হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো সে । চেঁচিয়ে ডাকলো ভড়কানো গলায়….

” বেগম ..?
ঘরের বাইরে তব্দা মেরে আছে সবাই । শবনম এতক্ষণে আসলো । উদ্বিগ্ন হয়ে আতিয়া বেগমের সাথে ঘরে ঢুকলো সে । সুরবালা ঢুকেছে সংগ্রামের পিছু পিছু । অংকুর দাঁড়িয়ে । এভাবে ভেতরে যাওয়া টা ঠিক দেখায় না । সংকোচে দাঁড়িয়ে রইল সে । লতিফ জোয়ার্দার ও ঢুকে পড়েছেন । সালেহা কটমট করলেন সংগ্রামের ঐ মেয়েটার প্রতি বিচলিত হাবভাব দেখে । দায় সারা ভাবে অংকুরের সামনে তাকে দেখিয়ে ভেতরে ঢুকলেন তিনিও । লতিফা বোধহয় ঘুমিয়ে । জুনাইদ ও বেরোয় নি ।
সংগ্রাম বেসামাল সত্ত্বাকে সামলাতে পারলো না । ধড়ফড়িয়ে ঘরে ঢুকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখলো শ্যামা কে । এলোমেলো অবস্থায় ঠান্ডা মেঝেতে কাত হয়ে পড়ে আছে তার বেগম । আঁতকে উঠলো সংগ্রাম । সঙ্কিত হলো অক্ষি যুগল‌‌‌ । পুনরায় চিৎকার করে উঠলো সে….

” বেগম !
হুমড়ি খেয়ে পড়ল শ্যামার সম্মুখে । তৎক্ষণাৎ শ্যামা কে নিজের দখলে নিলো । বক্ষ স্পন্দন বেগতিক । ধড়ফড় করছে সে । শ্যামা কে ঝাঁকিয়ে আতঙ্কিত স্বরে ডাকতে লাগলো সংগ্রাম‌….
” বেগম ,, এই শ্যামা ?
কি হয়েছে তোমার ? ওঠো বেগম..
সুরবালা সংগ্রামের অপর দিকে শ্যামার কাছে বসলো । উদ্বিগ্ন হয়ে ডাকলো সেও..
” শ্যামা ? কি হয়েছে তোমার ? এই শ্যামা , ওঠো..
” বালাহ ,, পানি নিয়ে আয়…
সংগ্রামের কম্পিত কন্ঠে আদেশ । সালেহা বাদে বিচলিত সবাই । অংকুর দরজার বাইরে থেকে উঁকি দিলো একটু । বালা ওঠার আগেই শবনম তড়িঘড়ি করে এগিয়ে দিলো পানির গ্লাস । ঝট করে গ্লাস হাতে নিয়ে শ্যামার মুখে পুরো পানি টুকু উপুড় করে ঠেলে দিলো সংগ্রাম । পানির ঝটকায় আঁতকে উঠলো শ্যামা । ছটফট করে দ্রুত নড়ে চড়ে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো । কাঁচের গ্লাস মেঝেতে ঠক করে রেখে শ্যামার দিকে পুরো মনযোগ দিলো সংগ্রাম । শ্যামা কে ঝেকে উঠতে দেখে আতিয়া বেগম ডাকলেন….

” নাত বৌ ,, ঐ মাইয়া ? এ্যামনে পইড়া আছোস ক্যান ? আবার কি হইলো তোর ?
সংগ্রাম শ্যামার ভেজা মুখশ্রী দুহাতে মুছিয়ে দিলো । নরম হয়ে ডাকলো ওকে….
” বেগম,,কি হয়েছে ? বলো আমায় ,, এভাবে পড়ে আছো কেনো তুমি ?
পরিস্থিতি বুঝতে সময় লাগলো শ্যামার । সুক্ষ্ম ভেজা নেত্রে আশপাশ অবলোকন করতেই আঁতকে উঠলো । ভুত পূর্ব কিছু মনে পড়তেই ছ্যাঁত করে উঠলো শ্যামা । চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেই কালো মূর্তি । সংগ্রাম যে ওকে নিজের বাহুডোরে আগলে রেখেছে সেদিকে খেয়াল নেই শ্যামার । শ্যামা ছটফট করে উঠলো । প্রগাঢ় শক্তিতে নিজেকে ছাড়িয়ে গর্জে উঠলো ক্ষুব্ধ হয়ে….

” ছাড়েন আমারে !!
কেউ কাছে আইবেন না আমার ! কে আপনি , ক্যান আইছেন আমার কাছে ? আম্মা কই আমার , আমি আম্মার কাছে যামু । ঐহানে কেউ আছিলো , আম্মারে ডাকেন । আম্মা তাড়াই দিবো হেরে । নাইলে হেয় মাইরা ফেলাইবো আমারে…. ডাকেন আমার আম্মারে….
আরো বেশি কন্ঠ তুলে চিৎকার করে উঠলো শ্যামা । সংগ্রাম জিভে অধর ভেজালো । চোখ গোল গোল ওর । বালা সহ বাকিরা কপাল কুঁচকালো । সালেহা আর লতিফ জোয়ার্দারের মুখ খানাও কুঁচকে এলো । সংগ্রাম পরিস্থিতি বুঝে শ্যামা কে নিজের দিকে টেনে আনলো । ওর মুখখানা নিজের আজলে শক্ত করে চেপে ধরে বললো হিমশীতল বিচলিত কন্ঠে…

” বেগম ,, এইযে আমি ! দেখো ! আমি , তোমার ছোট জমিদার সাহেব । আমি আছি তো তোমার কাছে । এই দেখো , তোমার কাছেই । শান্ত হও তুমি ।
শ্যামা নিজেকে ছাড়াতে চোখ মুখ খিচে ছটফট করে উঠলো । এই মুহূর্তে ওর শক্তি দূর্বল নেই , হাত পা, পুরো শরীর টনটনে হয়ে গেছে । শক্ত হয়ে গেছে নরম নারী দেহ খানা । শক্তি বোধহয় বেরেছে দ্বিগুন । সে সংগ্রাম কে ঠেলে দূরে সরাতে চাইলো । সংগ্রামের উপর উদ্যত হলো কঠোর শক্তি ।
” ছুঁইবেন না আমারে । একদম মাইরা ফেলমু কইয়া দিলাম । ছাড়েন আমারে । আমার আম্মা কোই ? ভয় লাগতাছে আমার । ও কাছে আইতাছে আমার । ঐ খানে আছে কেউ…. দূরে সরান ওরে..
কেঁপে উঠলো শ্যামা । বলতে বলতে কম্পিত হয়ে আসলো কন্ঠস্বর । সংগ্রাম শ্যামার ইশারা অনুযায়ী বারান্দার দিকে তাকালো ‌। সাথে সাথে বাকিরা । একবার তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলে স্থান ত্যাগ করলেন লতিফ জোয়ার্দার । সংগ্রাম বারান্দা থেকে চোখ ফিরিয়ে তার বেগমের পানে তাকালো । শ্যামা কে পুনরায় টেনে আনলো নিজের কাছে । ওর কম্পিত শরীর খানা শক্ত করে চেপে ধরলো নিজের বুকের মাঝে । একদম সেপ্টে নিলো । একহাতে শ্যামা কে জড়িয়ে অন্য হাত শ্যামা চুলের ভাঁজে চেপে ধরল । বললো..

” কেউ নেই ওখানে । ওদিকে দেখতে হবে না তোমায় । আমি আছি দেখো । ভয় কিসের বলো ? আমি সাথে থাকলে তো ভয় লাগে না তোমার । আমি আছি বেগম । আর কেউ কাছে আসবে না তোমার । আমি তো কাছে আছি । দেখো আমায় , অনুভব করো , বেগম….
শ্যামা কাঁপতে কাঁপতে ধীরে ধীরে স্থির হয়ে আসলো । চোখ বুজলো । বুজেই রইলো অনেক টা মুহূর্ত । বালা বিমূর্ত হয়ে চেয়ে সংগ্রামের পানে । ও চোখ ফিরিয়ে সংগ্রামের বুকে গুটিয়ে থাকা শ্যামার পানে তাকালো ‌। ভীষণ শূন্য লাগলো নিজেকে ।
শ্যামা শান্ত হতেই কন্ঠ চড়া করে বলে উঠলো সংগ্রাম…
” বাইরে যাও সবাই….

বালা এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলো না । ঝট করে উঠে এক প্রকার ছুটলো বাইরের দিকে । শবনম আর আতিয়া বেগম চিন্তিত মুখে কপাল কুঁচকে চেয়ে ছিল । সম্পূর্ণ টা বোধগম্য হয় নি তাদের । সংগ্রামের আদেশ তামিল করলো তারা । দরজার সম্মুখে সুরবালা মুখোমুখি হলো অংকুরের । এক ঝলক চোখ তুলে চেয়ে রিনিঝিনি শব্দ তুলে ছুটলো নিজের ঘরে । ওর ছোটার পানে তাকিয়ে কপাল গুটালো অংকুর । পরমুহূর্তে শবনম আর আতিয়া বেগম কে ঘর‌ থেকে বেরোতে দেখে অংকুর আর দাঁড়ালো না সেখানে । সে দৃঢ় পায়ে এগোলো বালার ঘরের দিকে ।
সবার শেষে ঘর থেকে বেরোলেন সালেহা । মুখ বাঁকিয়ে ঝামটা মেরে । কটমট করে বিড়বিড় করতে করতে বেরোলেন তিনি । কার পাল্লায় পড়েছে তার ছেলে ?
ঘরে এসে গ্লাস ভর্তি পুরো পানি টুকু ঢকঢক করে খেয়ে শেষ করলো বালা । ঝাপসা চোখ আজ পানি ঝড়াবে না কিছুতেই । সুরবালা জোরে জোরে শ্বাস টানলো । ঘরে ঢুকে দরজা চাপিয়ে দিলো অংকুর । বালা কে অবলোকন করে পেছনে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে ডাকলো…

” সুরবালা ???
চকিতে পিছন ফিরলো মেয়েটা । সজল দৃষ্টি পড়লো অংকুরের চোখে । আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো না মেয়েটা । আচমকা জড়িয়ে ধরলো অংকুর কে । আকস্মিক বালার কান্ডে ভড়কালো অংকুর , তব্দা খেলো সে । কেঁপে উঠলো বোধহয় পুরুষালি সত্ত্বা । বিশ্বাস হলো না । চোখের আকৃতি গোল গোল হয়ে আসলো । সুরবালা অংকুরের সুঠাম শরীরের তুলনায় অতি ক্ষুদ্র । লম্বাতেও অংকুরের কাঁধ পর্যন্ত । ওর মাথা টা ঠেকেছে অংকুরের প্রশস্ত বুকে । ঢোক গিললো অংকুর । কিংকর্তব্য বিমূঢ় রইলো । ডাকলো বাঁধ ঠেলে….

” সুরবালা..
” হুম !!
” আমি কিন্তু ছুঁই নি তোমায় !
” আমি ছুঁয়েছি !
বালা হাতের বাঁধন আরো শক্ত করলো । অংকুর কে জড়াতে চাইলো আরো শক্ত করে । অংকুরের তীব্র হৃৎস্পন্দন স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে সে । ধক্ ধক্ শব্দ কানে ঠেকছে । বালা এই সুঠাম দেহি পুরুষ টাকে ঠিকঠাক জড়াতে পারছে না । অংকুর ও হাত তুলে জড়াচ্ছে না ওকে । বালা চোখ বুজে শীতল কন্ঠে আবদার করলো….
” এভাবে কাঠকাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো ? আমাকে একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরুন তো , যাতে আপনাকে খুব করে অনুভব করতে পারি…
ভিমড়ি খেলো অংকুর । সময় নিয়ে নিজেকে সামলে আলতো করে জড়ালো সুরবালা কে । তৃপ্তাকাঙ্ক্ষা কে তৃপ্ত করলো ।
এদিকে সংগ্রাম তার বেগম কে একই ভাবে জড়িয়ে অনেকটা সময় বসে বসে রইলো একই ভঙ্গিতে । সময় দিলো শ্যামা কে ।
নীরবতা পুরো ঘরে । সংগ্রাম নীরবতা ভেঙে নরম ক্ষিণ স্বরে ডাকলো..

” ডালিয়া..?
” হু…
তৎক্ষণাৎ ছোট্ট জবাব তার বেগমের । হাঁফ ছাড়ল সংগ্রাম । চোখ বুজে শ্যামার সিঁথিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো…
” ওঠো তো…
সংগ্রামের বুক থেকে আলগা হলো শ্যামা । মাথা তুলে পিটপিট করে তাকালো তার ছোট জমিদার সাহেবের দিকে । চোখ কুঁচকে সন্দিহান হয়ে বললো…
” কি হয়েছে ?
আশপাশ তাকালো এবার । নিজেকে দেখলো পুরোপুরি । নিজের অবস্থা দেখে ছলকে উঠলো সে । ও মেঝেতে এভাবে কি করছে ?
সংগ্রাম ওর তাৎক্ষণিক হাবভাব দেখে নিজে উঠে দাঁড়ালো । শ্যামা কে কোলে তুললো একটানে । অপ্রস্তুত হয়েও বেশি প্রভাব পড়লো না শ্যামার উপর । সংগ্রাম ওকে খাটে বসাতেই চোখ গোল গোল করলো শ্যামা । তখনকার ঘটনা চোখের সামনে ভাসতেই ভয়ে জড়িয়ে গেলো আবার । খামচে ধরলো সংগ্রামের পাঞ্জাবির অংশ ।
সংগ্রাম ওর সম্মুখে বসলো । প্রশ্ন করলো শীতল কন্ঠে….

” বেগম ,, কি হয়েছিল ? বলো !!
অনবরত ঢোক গিলছে শ্যামা । আলতো ভেজা মুখশ্রীতে ঘাম জমছে । চোখ লাল হয়ে আসছে । জিভে অধর ভেজালো শ্যামা । কেঁপে কেঁপে সংগ্রামের কাছ ঘেঁষে অতি নিকটে বসলো । বারান্দার দিকে কম্পিত হাত তুলে ইশারা করে বললো থেমে থেমে….
” ছো.. ছোট জমিদার সাহেব…
কেউ ছিল ওখানে !
” কে ছিলো ?
” আমি জানি না । কিন্তু কেউ ছিল । বিশ্বাস করুন । আমি মিথ্যে বলছি না । আমি একদিন ও মিথ্যে বলি নি । আমি আজও সেই ঘুঙুরের শব্দ শুনেছি । আপনি কেনো বিশ্বাস করেন না আমায় ? শুনুন আমার কথা , আমি একদম সত্যি বলছি । ওখানে , বারান্দায় ছিলো কেউ । পুরো কালো , সবটা কালো । আমি স্পষ্ট দেখেছি , দয়া করে বিশ্বাস করুন আমায় ….
বিচলিত শ্যামা । মুখে কথা আসছে না । গলায় বোধহয় কোনো কিছু আটকে আছে , এমন মনে হচ্ছে । হাঁসফাঁস অবস্থা ওর । সংগ্রাম ওকে সামলাতে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করল । শীতল কন্ঠে বলল…

” আমি তো বিশ্বাস করি তোমায় ! কোনো দিন অবিশ্বাস করি নি । শুনছি তো তোমার কথা । বলো তুমি….
” শুনুন তাহলে , ওখানে কেউ ছিল । ব.. বাতাস ছিলো অনেক । উড়ছিল সব । ঐ কালো লোকটা ঐ পর্দার আড়ালে ছিলো । আমি দেখেছি ওকে । প..পা দেখেছি আমি । ওর পুরো শরীর কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল ।
” তুমি দেখেছো কে ছিলো ?
” নাহহ ,, অল্প দেখেছি , কিন্তু স্পষ্ট ।
” আমাদের ঘর দোতলায় বেগম । বারান্দায় এখানে কেউ উঠবে কি করে ? দরজাও তো ভেতর থেকে বন্ধ ছিলো ?
” তার মানে, আপনি বিশ্বাস করছেন না আমায় ? সত্যি বলছি আমি , কেনো বুঝতে চাইছেন না । আমি বারবার দেখেছি , শুনেছি বারবার । আমি ভুল নোই , আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে ‌ । সরে যান আমার কাছ থেকে….
সংগ্রাম কে দুরে ঠেলে গুটিয়ে গেল শ্যামা । দুই হাঁটু জড়িয়ে ভীতের ন্যায় গুটিয়ে নিলো নিজেকে । কেঁদে উঠলো ফিকড়ে ।
সংগ্রাম ওকে আবারো টেনে মেশালো নিজের সাথে । বুকে জড়িয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো । নিজেকে ছাড়াতে ছটফট করলো শ্যামা । আজ সে অস্থির । সংগ্রাম কে বুঝে অনুভব করার অনুভুতি নেই আজ ।

” ছাড়ুন আমাকে । আমাকে একা থাকতে দিন । আপনি বিশ্বাস করেন না আমায় …
” বিশ্বাস করি তো …
” আমি মিথ্যে বলছি না ।
” আমি জানি ।
” তাহলে আশ্বাস দিন আমায় , আমি সত্যিই বলছি ।
” আশ্বাস দিতেই তো বুকে জড়ালাম ।
” আমি সত্যি বলছি ছোট জমিদার সাহেব , আমি বারবার ঐ শব্দটা শুনি । আমার মাথা ফেটে যায় । আমি বারান্দাতেও দেখেছি কাউকে । আমি পাগল হয়ে যাবো ,, আপনি আমাকে ছেড়ে কোথায় যাবেন না দয়া করে । আমার ভয় লাগে ভীষণ ।

সংগ্রাম কথা বললো না আর । শ্যামা কে আরো শক্ত করে জড়ালো । নিজের মাঝে বিড়বিড় করতে ব্যাস্ত শ্যামা ।
ও বিড়বিড় করতে করতেই ধরে আসলো কন্ঠস্বর । নিস্তেজ হয়ে আসলো খানিক । সংগ্রাম জানতো এমনটাই হবে । এখন ঘুমাবে শ্যামা । আর সেটাই হলো । মুহুর্তেই ঘুমে ঢলে পড়ল শ্যামা । ওর ঘুম গাঢ় হওয়া পর্যন্ত চুপচাপ চোখ বুজে অপেক্ষা করলো সংগ্রাম । শ্যামা ঘুমে বিভোর হতেই চোখ জোড়া খুললো । আলতো মাথা তুলে তার ঘুমন্ত বেগমের চেহারা খানা দেখলো । অতঃপর দাঁতে দাঁত পিষলো শক্ত করে । চোয়াল শক্ত করে হাত মুঠো করলো । শ্যামা কে নিজের বুকের উপর থেকে নামিয়ে বালিশের উপর ওর মাথাটা রাখলো । গায়ে চাদর জড়িয়ে দিয়ে শ্যামার মুখখানা দুহাতে মুছিয়ে দিলো । কপালে চুমু খেয়ে অতি সন্তর্পণে সাবধানতার সহিত নেমে পড়লো খাট থেকে । শক্ত চোয়াল শক্ত থেকে শক্ততর হচ্ছে । মুখো ভঙ্গিমা বিভৎস । সংগ্রাম দৃঢ় গটগট পায়ে ঘর থেকে বেরোলো । দরজা খুলেই রাখলো । সোজা এগোলো করিডোরের শেষ বরাবর । সেখানে তো একটাই ঘর । সংগ্রাম ভনিতা বিহীন শক্ত হাতে জোরছে দরজায় বাড়ি মারলো । শব্দ হলো বিকট । সংগ্রাম বিরতি হীন পরপরই বাড়ি মারতে লাগলো দরজায় । চোখের নিরেট দৃষ্টি মেঝেতে ।

অবশেষে দরজা খুললো । সামনে শবনম কে দেখে উপেক্ষা করলো সংগ্রাম । ওকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকলো সোজা । জুনাইদ শুয়ে । সংগ্রাম কে দেখে উঠে বসলো সে । ঘুমের ভান ধরতে চেয়েছিল বোধহয় । তবে সংগ্রামের সামনে ওর ভনিতা কতটা কার্যকর হবে তা ওর অজানা নয় । জুনাইদ মুখ খোলার আগে সংগ্রাম ওর কলার টেনে হিড়হিড়য়ে খাট থেকে নামালো । ভড়কালো শবনম । জুনাইদ বিরক্তি প্রকাশ করলো চেঁচিয়ে….
” আরে কি করছিস ? আমার কলার ধরার সাহস কি করে হলো তোর ?
থামলো সংগ্রাম । ক্ষিপ্ত দৃষ্টি ফেলে হিসহিসিয়ে উঠলো….
” শুধু তো এখন কলার ধরেছি , আর কি কি ধরবো , করবো না করবো , কি কি করতে পারি না পারি,তা দেখার জন্য প্রস্তুত হ । আমার সাহস সম্পর্কে জানিস তুই ।
বলেই ফের টেনে নিয়ে যেতে লাগলো ওকে । সংগ্রামের শক্তিতে এগোতে বাধ্য জুনাইদ । কান টানলেই মাথা আসে , আর কলার টানলে পুরো শরীর । শবনম ভীত হয়ে সামনে দাঁড়ালো…

” ওনাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো , ভাই !
” যেখানে যাওয়ার কথা সেখানে নয় । নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন ।
বলেই বেরিয়ে গেল ওকে নিয়ে । দরজা পর্যন্ত বেরোলো শবনম । ছলকানো আত্মা কাতর । এটারই বাকি ছিল ।
লতিফার ঘরের দরজা বন্ধ থাকে না কখনো । ঘুমানোর সময় ও না । সংগ্রাম সোজা হামলে পড়লো ওর ঘরে । চাপানো দরজায় লাথি মেরে ধাম করে খুললো দরজা টা । বিকট শব্দে শোয়া থেকে ঝটকা মেরে উঠলো মধ্য বয়স্ক কুচুটে নারী ।
ঘুমিয়ে পড়েছিল লতিফা । আচমকা চমকে ঘুম ভাঙ্গতেই চারদিক কেমন ভুমিকম্পের ন্যায় দুলে উঠলো । ঘুমের ঘোরে ভুমিকম্পই ভাবলেন তিনি । বাঁচার তাগিদে খাট থেকে ধড়ফড়িয়ে নামতে নামতে হাঁক ছাড়লেন….

” ওরে ভুমিকম্প রে…
কে কোথায় আছিস , বাঁচা আমায়..।
বলতে বলতে পরিস্থিতি না বুঝেই দরজার দিকে ছুটলেন । খাটের উপর সৈকত শোয়া । দরজার সামনে নিজের ছেলে আর সংগ্রাম জোয়ার্দার কে দেখে থেমে গেলেন মুহুর্তেই । মুখ ফাঁক করে ঘন পলক ফেললেন চোখে । ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগলো না তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক সম্পন্ন মহিলা টার ।
ছেলের কলারে সংগ্রামের শক্তি দেখে কপাল গুটালেন তিনি ।
নিজেকে ধাতস্থ করে বললেন বাজখাঁই গলায়…
” রাতের বেলা এটা কি ধরনের অভদ্রতা সংগ্রাম ? আমার ঘরে এতো রাতে এমন হুটপাট করে আসার মানে কি ? আর জুনাইদ কে ওভাবে ধরে আছিস কেন ? ও বড় ভাই তোর…
সংগ্রাম হাসলো । ছাড়লো জুনাইদ কে । বাহু টেনে টেনে শিরদাঁড়া সোজা করে দিলো ওর । বললো….

” বড় ভাই ! ওও , আমি তো ভুলেই গেছিলাম । তুই তো আমার বড় । আমার থেকে সম্মান পাওনা আছে তোর । কিন্তু কি বলতো , না তুই বল , তুই কি আদৌ সম্মানের যোগ্য ? কোন দিক দিয়ে সম্মান করবো তোকে ? দেখিয়ে দে…
জুনাইদ বরাবরের ন্যায় চোখ নামিয়ে চুপ । তবে ভেতরে ভেতরে আগুন জ্বলছে ওর । অপমান বোধ আছে কিনা সন্দেহ ?
সংগ্রাম ওকে ওভাবে দেখে কটমট করলো । মস্তিষ্কে দপ করে আগুন জ্বলে উঠলো ওর । কপালের শিরা উপশিরা ফুলে উঠেছে । পুনরায় ক্ষিপ্ত তায় গর্জে উঠলো সংগ্রাম । ঠাসা মেরে খাবলে ধরলো জুনাইদ কে ।
” এইইই ,, মুখে কথা আসছে না ? মাথায় কি চলছে তোর , হ্যাঁ ? কি কু বুদ্ধি আটছিস আবার ? আমার বেগম কে ভয় দেখিয়েছিস তুই , না ? বল , আবার ভয় দেখিয়েছিস ওকে ? ভুলে গেছিস শাস্তি । কম হয়ে গেছিল দন্ড , তাই না ? মরতে চাস আমার হাতে ? মেরে ফেলি একদম ? মেরে দেই ? মানুষ মারতে আমার হাত কাঁচা নয় তুই খুব ভালো করেই জানিস । এই পোক্ত হাত তোকে মারতে , কবরে শোয়াতে এক মুহুর্তের জন্যেও কাঁপবে না কিন্তু ।

” সংগ্রাম ,, কিসব বলছিস ? ভাই ও তোর !
” আরে রাখ তোর ভাই ,,,
উচ্চ স্বরে তুই সম্বোধনে কেঁপে উঠলো লতিফা । সংগ্রাম ফের জুনাইদের দিকে ফিরলো । রক্ত চক্ষু ওর । ফর্সা চেহারা রক্তিম বর্ন ধারন করেছে ।
”কে তুই ? তোর কোনো গুরুত্ব আছে আমার কাছে ? আমার বেগমের গুরুত্ব আছে আমার কাছে,বুঝলি ? আর আমার সেই গুরুত্বের দিকেই হাত বাড়িয়েছিস তুই ? তোর ঐ বাড়ানো হাত একদম কেটে ফেলবো….
জুনাইদ ও এবার খোলস ছাড়ালো । বেরোলো আসল রুপে । সংগ্রাম কে ঝটকা মেরে সরিয়ে দিলো নিজের থেকে । রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বললো….
” আরে কি সব বলছিস তখন থেকে ? মাথা খারাপ হয়ে গেছে ? তোর বউয়ের দিকে কেনো হাত বাড়াতে যাবো আমি ? ভুলে যাস না তোর বউ পাগল ! মাথা খারাপ ওর ।

” এইইইই ,, চুপ !! একদম চুপ ! গলা কেটে ফেলবো ওর নামে কিছু বললে ! ও বেগম আমার !
” বেগম নয় সেটা তো বলি নি । পাগল বলেছি ওকে । সত্যি টা মানতে অসুবিধা হয় কেন তোর ! তুই তো বলেছিলি ওর সম্পর্কে । আমি কি যেচে জেনেছি ওর পাগলামো সম্পর্কে । তুই তো বলেছিস মাথা খারাপ ওর , মাথায় সমস্যা আছে…
” চুপপপপ…
হুসস… । আর একটা কথা বলবি না । ওর মানসিক রোগের সুযোগ নিচ্ছিস । আমার বেগম না ঠিকি বলে , কাউকে তার নিজের দূর্বলতার কথা বলতে নেই । তোদের তো বলেছিলাম আমার বেগম সম্পর্কে । ও ভয় পায় , বুঝলি । ও পাগল নয় । বিচ্ছিন্নতা জনিত মানসিক ব্যাধি বলে এটাকে , মাথা খারাপ বলে না । ওর এই অসুখের,ভয়টারই সুযোগ নিস তুই ? তুই আর তোর মা ? ওকে ঝুনঝুন আওয়াজ শুনিয়ে ভয় দেখাস ? আমি কাছে না থাকার সুযোগে ভয় দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি করিস ওর উপরে !
বলেছিলাম না , আর এমনটা করবি না । আবার করলি ? আজও ভয় দেখিয়েছিস তো ওকে ? হ্যাঁ ? শিক্ষা হয় নি ?

” সংগ্রাম,, মুখ সামলে কথা বল ! আমরা কেনো ভয় দেখাতে যাবো তোর পাগল বউকে ? ওর ভয় পাওয়ার রোগ আছে ভুলে যাস না..?
লতিফার তালেগোলে ক্যাটক্যাটে স্বর । সংগ্রাম ক্ষুব্ধ হয়ে তীর্যক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ।
” চুপপপ…
বলেছি না চুপ থাকতে । আমি ওর সাথে কথা বলছি । মাঝে আসবি না….
” আবার তুই , তুই তুকারি করছিস আমার সাথে ?
আমতা আমতা স্বর লতিফার ।

” তুই তুকারি কখন করি তোর অজানা নয় । ছাড় দেই তোদের, কিছু ছেড়ে দেই না । ছেড়ে দেওয়ার মানুষ সংগ্রাম জোয়ার্দার নয় । সংগ্রাম জোয়ার্দার বেঁধে রাখা মানুষ , আর নয়তো কেটে ফেলা । দ্বিতীয় টা চাইছিস তোরা ?
কেটে ফেলবো তোদের ? মা ছেলেকে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেই ? কি ভেবেছিস , এতো দিন সবদিক থেকে ছাড় দিয়ে এসেছি দেখে আমার বেগমের দিক থেকেও ছাড় দেবো ? ও আমার বেগম….
শবনম বা সৈকত নয় ! শবনম আর সৈকতের কথা ভেবে এই কটা বছর বাঁচিয়ে রেখেছি তোর ছেলে কে ।
নয়তো ওর স্থান কোথায় হতো তোর অজানা নয় । ওর কুকর্ম অজানা নয় তোর ? শবনম আর সৈকতের জন্য যদি ওকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি,, তাহলে আমার বেগমের জন্য ওকে মারতেও পারি ।

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৩

লতিফা মুখ নামিয়ে চুপ হয়ে গেলেন । ঢোক গিললেন শুকনো । জুনাইদ হাত মুঠো করে থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । পারলে এই মুহূর্তে সংগ্রামের উপর ঔদ্ধত্য জারি করতো ! কিন্তু পারছে না । সংগ্রামের উপর হাত তোলাটা কাঁচা কাজ হবে । যদিও সে কাঁচা খেলোয়াড়ই । পাকা পোক্ত কাজ ওর দাঁড়ায় হয় না । যা হয় সব চুনোপুঁটির মস্তিষ্কের চিন্তা ধারনার ব্যবহারিক প্রয়োগ । সংগ্রামের চোখ থেকে এড়ায় না কিছুই ।
সংগ্রাম জুনাইদ কে ফুঁসতে দেখে গলা পিষে ফুঁসে উঠলো নিজেও….
” রাগ হচ্ছে ভীষণ ?
একটা কথা তো ভুলেই গেছিলাম , ভাবি কে মেরেছিস আজ আবার ? হ্যাঁ ? হাত তুলেছিস গায়ে ?

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৫