প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৬০
নওরিন কবির তিশা
নিস্তব্ধ রজনী;ঘুমন্ত চারিধার। কাল সকালে পূর্ণতা পাবে এক উন্মাদ প্রেমিকের প্রণয়। সকল বাধা বিপত্তি পেরিয়ে পরিণয় লগ্নের অতি কাছে তারা। কমিউনিটি সেন্টারের ছাদটা বিস্তর। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যেতে বোধ হয় মিনিট দশেক লাগবে।
বর্তমানে ছাদটির পূর্ব প্রান্তের কার্নিশ ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে এক জোড়া কপত-কপতি।পূর্ণিমার উজ্জ্বল আলো সরাসরি এসে পড়ছে তাদের মুখশ্রী বরাবর।দাঁড়িয়ে আছে নীল-তিহু।তিহুর হাতে এখনো মেহেদির গাঢ় লাল আভা লেগে আছে, যার ওষধি সুঘ্রাণ এই শীতল বাতাসে এক মায়াবী মা’দ’ক’তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। নীলের পরনের স্লিভলেস শার্টের হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো।
তিহু আলতো করে নিজের মেহেদি রাঙা হাত দুটো কার্নিশের ওপর রাখল। নীল একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তিহুর সেই কাজলরাঙা চোখের দিকে, যেখানে আজ চাঁদের আলোর চেয়েও বেশি উজ্জ্বলতা। নীল কিছুটা এগিয়ে এসে তিহুর খুব কাছে দাঁড়াল। তার গলার স্বর আজ বড্ড শান্ত, বড্ড ভারী,,
— ‘জানো নুর?
তিহু প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকালো নীল বলতে আরম্ভ করলো,,
—‘ আমাদের বিয়ের সব আয়োজন নব্বই দশকের মতো কেনো জানো?
তিহু তখনও জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে।নীল পুনর্বার বলল,,,
—-‘ কেননা নব্বই দশকে ভালোবাসা মানে ছিল অপেক্ষা। সেই সময়ে প্রেম আজকের মতো মুঠোফোনের স্ক্রিনে বন্দী ছিল না, বরং ছিল চিঠির ভাঁজে জমানো এক বুক আকুলতা। একটা মানুষকে পাওয়ার জন্য তখন বছরের পর বছর সবুর করতে হতো, ঠিক যেমনটা আমি করেছি তোমার জন্য।
সব শুনে আনমনে তিহু হুট করে বলল,, —‘আপনি আমাকে কতটা ভালোবেসেছেন!আমি তো কখনওই তাতে আপনার সমান হতে পারব না!
নীল আলগোছে হাত রাখলো তিহুর হাতে। চাঁদের আলোয় মেহেদী রঙ্গা সেই হাতখানা নিজের হাতে নিয়ে তালু বরাবর চেয়ে বলল,,
—-‘এইযে বহু আকাঙ্খিত হাতে আমার নামটা জ্বলজ্বল করছে এর চেয়ে বেশি আর কিছু চাই না ম্যাডাম।
তিহু মুগ্ধ হাসলো।মানুষটাকে সে যত দেখে ততো অবাক হয়। উপলব্ধি করে পুরুষের ভালোবাসা আসলেও মা’রা’ত্ম’ক সুন্দর!তবে নারী তোমার ভাগ্যে থাকতে হবে তা!
অতিবাহিত হয়েছে বেশ অনেক্ষণ। তিহুর এবার যাওয়ার পালা।বলা চলে এক প্রকার লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করছে তারা।কেননা প্রবীণদের থেকে কড়া নির্দেশ আছে বিয়ের আগে কোনো মতেই বর কনে দেখা করা যাবেনা।তবুও শুধু নীলের জোড়াজুড়িতেই একপ্রকার বাধ্য হয়ে তিহু পাশে ঘুমানো মা আর কাকিমনিকে ফাঁকি দিয়ে এসেছে।
তিহু ভাবলো ব্যাপারটা বলবে নীল কে ।যদিও সে ভালো করেই জানে নীল রাজি হবে না।বলবে আরও কিছুক্ষণ থাকতে কিন্তু সেটা আর সম্ভব নয়।কেউ তাদের কিছু বলবে না এটা নিশ্চিত;কিন্তু শুধু শুধু লজ্জা পেতে হবে তিহুকে।তাই সে নীলকে বলতেই যাচ্ছিলো প্রস্থানের কথা।
কিন্তু তার আগেই হঠাৎ নীরবতার বুখ চিরে তার কর্ণগোচর হলো দূর হতে ভেসে আসা কারো ফিসফিসানির আওয়াজ।তিহু চট করে ব্যস্ত হাতে নীলের মুখ আঁকড়ে ধরে সতর্ক কণ্ঠে বলল,,
—‘কিছু শুনতে পাচ্ছেন?
নীল ভ্রু যুগল জোড়িয়ে বলল,,—‘কি শুনব?
তিহু খরগোশের ন্যায় কান জোড়া আগত শব্দের উৎসের দিকে খাড়া করে বলল,,—‘মনে হচ্ছে কেউ খুব ফিসফিস এ কথা বলছে। ভালো করে শুনুন।
তিহু সন্দিহান দৃষ্টিতে ছাদের অপর প্রান্তে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেই নীল হাত আঁকড়ে ধরল তার। তিহু চোখ কুঁচকে তাকাতেই নীল বলল,,
—-‘ওখানে মাহা আর রাওফিন।যেও না।
তিহু বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো নীলের মুখে মাহা-রাওফিনের নাম একত্রে শুনতেই।নীল বলল,,
—‘আচ্ছা যাও, রুমে যাও। আন্টিরা খুঁজবে।
তিহু ভালো করেই বুঝলো নীল কথা ঘোরানোর চেষ্টা করছে। তবে সেও নাছোড়বান্দা,,
—‘মিস্টার পলিটিশিয়ান?
—-‘ইয়েস অর্কিড?
—-‘আপনি মাহা-রাওফিনের ব্যাপারে আগে থেকেই জানতেন তাই না?
‘হুম!’—নীলের অকপটে বলা স্বীকারোক্তিতে তিহু বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালো।
—‘মানে?
—‘মানে আর কি নুর? রাওফিন তো মাহাকে খুঁজে পেয়েই বিডি ব্যাক করেছিলো। না হলে ও এই জন্মে বিডি ব্যাক করত না।
—’ব্রাদারকে মাহার খোঁজ আপনি দিয়েছিলেন?
—-‘হ্যাঁ!
—-‘আপনি মাহার সম্পর্কে জানলেন কিভাবে?
—-‘তোমার দিকের দিনে কে কয়বার তাকাচ্ছে সেটাও আমার জানা ছিল আর মাহা তো তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড!
তিহু বাকরুদ্ধ। কিছু বলার ভাষাই হারিয়ে ফেলেছে সে।নীল তার তাজ্জব বনে যাওয়া মুখটির দিকে চেয়ে মুচকি হাসলো। অতঃপর তার ললাটে উষ্ণ প্রেম পরশ এঁকে বলল,,
—‘এ ব্যাপারে এত চিন্তা না করলেও পারবেন ম্যাডাম। যান ঘুমান।
তিহু সামান্য আড়ষ্ট হয়ে আসলো নীলের স্পর্শে। পরক্ষণে নিজেকে স্বাভাবিক করে নেমে গেল নিচের দিকে। তবে দু সিঁড়ি নামতেই পেছন থেকে ভেসে আসলো নীলের উচ্ছ্বাসিত কন্ঠস্বর,
—-‘মোবারক ম্যাডাম, আর কয়েক ঘণ্টার মাঝেই এমপি ওয়াহাজ খান নীলের পার্মানেন্ট সহধর্মিনী হচ্ছেন আপনি। কেউ আর আলাদা পারবে না আপনাকে আমার থেকে।
—‘আমি কিন্তু এখনও আপনার পার্মানেন্ট সহধর্মিনীই জনাব!
—-‘হুম, কিছুদিন পর আপনি আমার নৌমির আম্মু হবেন ম্যাডাম।
তিহুর চঞ্চল পা জোড়া থেমে গেল মুহূর্তেই। বিস্মিত দৃষ্টিতে সে চেয়ে বলল,,–‘নৌমি কে?
—’ওয়াজিফা খান নৌমি! আপনার আর আমার ফিউচার প্রিন্সেস!
শরতের এক স্নিগ্ধ প্রভাত। ভোরের শিশিরভেজা ঘাসে সূর্যের প্রথম রশ্মিটা পড়তেই যেন চারিদিকের প্রকৃতি এক অন্যরকম সজীবতায় জেগে উঠেছে। ভৈরব নদের বুক চিরে আসা মৃদু শীতল হাওয়া আজ আনন্দবার্তা বয়ে আনছে। আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—শুভ পরিণয়।কমিউনিটি সেন্টারের আঙিনায় আজ উৎসবের রঙ আরও গাঢ়। গেট থেকে শুরু করে মূল মঞ্চ পর্যন্ত সাদা আর বাসন্তী রঙের কাপড়ে মোড়ানো।
নব্বই দশকের সেই চিরায়ত আমেজে আজ সজ্জিত কমিউনিটি সেন্টার। প্রনয়ের এক মায়াবী সুরের মূর্ছনা প্রতিটি হৃদয়ে যেন এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে দিচ্ছে। বর্তমান যুগের ৯০ দশকের ন্যায় বৈবাহিক উৎসব দেখায় ইচ্ছুক জনগণের ভিড় জমেছে আঙ্গিনায় । উপস্থিত জনকয়েক হয়েছে জন কয়েক সাংবাদিকও।
বাড়ির প্রবীণ মহিলারা ব্যস্ত বরণডালা সাজাতে। রুপার বাটিতে ধান-দুর্বার ছোঁয়ায় প্রতিটি ডালা যেন একেকটি শিল্পকর্ম। মাহা, ফারিন, শিশির, আনায়া আর কিশোরী বাহিনী লাল পেড়ে সাদা শাড়িতে প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। প্রত্যেকের হাতেই কাঁচের চুড়ির রিনঝিন শব্দ।
তিহুর ঘরে তখন সাজসজ্জার ধুম। আয়নার সামনে বসে থাকা সেই মায়াবিনীকে আজ চেনা দায়। তার পরনে আজ সেই বহু প্রতীক্ষিত লাল বেনারসি, যা সোনালি সুতোর কারুকার্যে ঝলমল করছে। কপালে সোনার টিকলি আর নাকে বড় নথ—তিহুকে আজ ৯০ দশকের কোনে গুলোর মতই লাগছে। তার দু চোখে উপচে পড়ছে আজ রাজ্যের অপেক্ষা আর লাজুক সুখ।
অন্যদিকে, বর সাজে নীল আজ যেন আক্ষরিক অর্থেই এক রাজকুমার। ধবধবে সাদা গরদের আচকান আর মাথায় মেরুন রঙের শিরস্ত্রাণে তাকে পৌরুষদীপ্ত দেখাচ্ছে। তার ব্যক্তিত্বের সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য আজ এক অদ্ভুত কোমলতায় ঢাকা পড়েছে। সবার মাঝে উপস্থিত থাকলেও নীলের মন পড়ে আছে ওই নির্দিষ্ট কক্ষটির দিকে, যেখানে তার ‘নুর’ আজ নিজেকে সাজিয়ে তুলছে তার অর্ধাঙ্গিনী হওয়ার নেশায়।
আকাশের মেঘমুক্ত নীলিমা যেন দোয়া হয়ে নেমে এসেছে মর্ত্যে। আজ আর কোনো বাধা নেই, নেই কোনো দূরত্ব। কেবল অপেক্ষার প্রহর গোনা—কখন উচ্চারিত হবে সেই পবিত্র তিনটি শব্দ।
বেলা গড়াতেই শোনা গেল কলরব।তিহু তখন লাল টুক টুক বউ সেজে অপেক্ষমান। তখনই কেউ যেন একজন এসে বলল বর এসেছে। যদিও বরের অবস্থান ছিল পাশেই তবুও উচ্ছ্বাসের শেষ নেই তাদের। এদিকে বর আসার খবরেই তিহুর মস্তিষ্কে হঠাৎই কি জানি দোলা দিয়ে গেল।
আচ্ছা তার নেতা সাহেবকে আজকে বর সাজে কেমন লাগছে? এমন চিন্তাধারা মাথায় চাড়া দিতেই হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে গেল সে। বড় দেখতে উৎসব জনতার পিছু পিছু ছুট্টে গেল সেও। মুহূর্তের মাঝে সামনেই দৃশ্যমান হলো তিহুর নেতা সাহেব। ৯০ দশকের বরের সাজে;তবে হঠাৎ বাধলো মহা বিপত্তি।
সকলে যখন বর কে বিমোহিত নয়নে দেখছে ঠিক তখনই কেউ একজন বলে উঠলো,,
—–’এই কোনে পড়ে গেছে!
ব্যাস সকলের দৃষ্টিকাড়লো তিহু। নীলকে রেখে সকলে তাকালো মেঝেতে পড়ে যাওয়া তিহুর দিকে। হো হো করে হেসে উঠলো অনেকে।একে তো লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে এখানে এসেছে তিহু। তার উপর কিনা সবার সামনে পড়ে গেল! সকলে যখন মিটি মিটি হাসছে নীল তখন সবার সামনে মুখে হাত দিয়ে লাজুক হাসলো।
ঘড়ি তখন সকাল দশটার কাঁটায় স্থির হয়েছে। কমিউনিটি সেন্টার এর বিশাল আঙ্গিনায় বর কনের আসনে আসীন হয়েছে নীল-তিহু। কিছুক্ষণের মাঝেই দ্বিতীয়বারের মতো তিন কবুলের পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হবে তারা। এদিকে রুমে দরজা বন্ধ করে বসে আছে মুন্নি। প্রতিটা ক্ষণ মৃ”ত্যু যন্ত্রণা থেকেও দ্বিগুণ মনে হচ্ছে তার। এর থেকে আল্লাহ তাকে ডেকে নিতে পারত নিজের কাছে। অন্তত বেঁচে থেকে ম’র’ন যন্ত্রণা উপলব্ধি করতে হতো না! নিঃশ্বাসের পাল্লা ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে।
মনে হচ্ছে হৃদপিন্ডটা এক্ষুনি ছিঁ’ড়ে বের হয়ে আসবে গলা দিয়ে। ক্রমাগত বক্ষদেশ বরাবর নিজের সর্বশক্তিতে থাপ্পর দিতে দিতে নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করলে মুন্নি। বোঝানোর চেষ্টা করল তার নীল ভাই বহু আগে থেকে নিজের নূরের হয়ে আছে। শত চেষ্টা করলেও সে কখনো নিজেকে আর ফিরে পাবে না। শুধু ব্যর্থ চেষ্টা করবে!
নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে মুন্নি। আধারাচ্ছন্ন ঘরের মাঝে একাকী সে। হুটহাট দরজাটা খুলে গেল। এক উদ্দীপ্ত আলোক শিখার ন্যায় আগমন ঘটল কোন এক যুবকের। মুন্নি অবাক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলো তাকে, পরক্ষণেই চমকে উঠলো অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করলো,,
—-‘শেহেতাজ?
শেহেতাজ মুচকি হাসলো, মুন্নির পাশে এসে বসে বরলো,,—‘কষ্ট হচ্ছে ম্যাডাম?
মুন্নি, ছিটকে দূরে সরে গিয়ে বসলো,—‘আপনি এখানে কি করছেন?
শেহেতাজ প্রসরিত হেসে বলল,,—‘আমাকে যতই দূরে সরানোর চেষ্টা করো প্রিয়তমা; তোমার অস্তিত্বের মিশেলে আবদ্ধ হয়ে আছি আমি। আমাকে নিজের থেকে এত সহজে দূরে সরাতে পারবেনা। কক্ষনো না।
মুন্নি কিছু একটা বলার আগেই;শেহেতাজ মুচকি হাসল। মুন্নির খুব কাছে এসে ধীরস্থিরভাবে বসে সে আবার বলতে শুরু করল,
—‘জানি, আজ তোমার নীলিমা আজ অন্য কারো মেঘে ঢাকা পড়েছে। কিন্তু ম্যাডাম, ভুল নক্ষত্রের পেছনে ছুটে নিজের রাতটাকে কেন আঁধারে ডুবিয়ে দিচ্ছে? তাকান আমার দিকে, দেখবেন আপনার অপেক্ষায় কেউ একজন পূর্ণিমা সাজিয়ে বসে আছে।
মুন্নি স্তব্ধ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। শেহেতাজের কণ্ঠস্বরে আজ এক অদ্ভুত মায়া, যা আগে কখনও খেয়াল করেনি সে। বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে আসা কান্নাটা যেন এই প্রথম কারো সামনে হালকা হতে চাইল। মুন্নি ধরা গলায় বলতে গেল,,
—‘আপনি… আপনি কি করে বুঝলেন আমি এখানে? আর এসব কথা কেন বলছেন? আমার ভালো লাগছে না, প্লিজ চলে যান।
শেহেতাজ একটুও বিচলিত হলো না। বরং পকেট থেকে একটা ছোট্ট রুমাল বের করে মুন্নির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,,
—“যাব বলেই তো এসেছিলাম, কিন্তু আপনার এই বিষণ্ণ চোখ দুটো আমায় আটকে দিল। আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো, যে ফুল অন্য কারো খোঁপায় জায়গা করে নিয়েছে, তার জন্য কেন মিছেই ডাল আঁকড়ে চোখের জল ফেলছেন? তার চেয়ে কি ভালো নয় এমন কারো হাত ধরা, যে আপনাকে নিজের বাগান করে রাখবে?
মুন্নি অবাক হয়ে শেহেতাজের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো উপহাস নেই, আছে এক গভীর আশ্বাস। মুহূর্তের জন্য মুন্নির মনে হলো, হয়তো এই মানুষটাই তার নিঃসঙ্গতার সঙ্গী হতে পারে। সে কিছু একটা বলতে চাইল, ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল তার,
—‘আপনি কি সত্যি বলছেন? নাকি এটাও আপনার কোনো রসিকতা?
শেহেতাজ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই বাইরের কোলাহলের প্রতিধ্বনি ভেসে এল ঘরের ভেতর। মুন্নি চমকে উঠল। হৃদপিণ্ডের ধুকপুকুনিটা যেন এক নিমেষেই থেমে গেল। সে ঝট করে চোখ মেলল।চারপাশটা ঝাপসা। শেহেতাজ কোথাও নেই।
ঘরের জানালা দিয়ে দুপুরের কড়া রোদ এসে পড়ছে তার মুখের ওপর। মুন্নি বুঝতে পারল, সে এতক্ষণ ঘোরের মধ্যে ছিল। শেহেতাজের সাথে কাটানো সেই মুহূর্তগুলো, সেই সান্ত্বনার বাণী—সবই ছিল তার অবচেতন মনের এক মায়া। দীর্ঘক্ষণ কান্নার পর ক্লান্তিতে সে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল, নিজেও জানে না।
চোখ মুছে জানালার বাইরে তাকাল মুন্নি। দূরে প্যান্ডেলের রঙিন কাপড় বাতাসে উড়ছে। আজ নীল ভাইয়ের বিয়ে। যে স্বপ্নটা সে দিনের পর দিন লালন করেছিল, সেটা আজ এক নিমিষেই ধুলোয় মিশে গেছে। অথচ কিছুক্ষণ আগের সেই ভ্রমটা তাকে এক অদ্ভুত শক্তি দিয়ে গেল। মুন্নি বিড়বিড় করে বলল,,
—‘আমার মত মানুষের জন্যেও কেউ অপেক্ষা করে?
সে উঠে দাঁড়াল। আয়নার সামনে গিয়ে নিজের বি’ধ্বস্ত মুখটা দেখল। আজ আর সে কাঁদবে না। নীল ভাই যদি তার নুরকে নিয়ে সুখী হতে পারে, তবে মুন্নিও কেন নিজের জন্য এক নতুন সকাল খুঁজে নেবে না? মনের কোণে অদ্ভুতভাবে উঁকি দিয়ে গেল শেহেতাজের সেই হাস্যোজ্জ্বল মুখটা। সত্যিই কি তবে সেই মানুষটা তার অপেক্ষায় কোথাও আছে?
—-‘আমি নুরকে কবুল করছি, কথা দিচ্ছি জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি ওকে আগলে রাখবো! মৃ’ত্যু’র পরও ওর আদেশ ব্যতীত আমার লা’শ যেন দা’ফ’ন না হতে পারে সেই অধিকারও ওকে দিচ্ছি আমি।
বিয়ে তো সবাই দেখেছে কিন্তু এমন অদ্ভুত করে কবুল বলাটা সকলের কাছে নতুন। অবাক দৃষ্টি মেলে চেয়ে আছে সকলে। রীতিমতো বাকরুদ্ধ তারা।তিহুর আসনের পাশ থেকে একজন মুরুব্বী তার কানে কানে বলল,,
—’তুমি বড্ড ভাগ্যবতী নুরাইন, এমন একজন মানুষকে নিজের করে পাচ্ছ। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করবা সব সময়। যে তিনি এমন একটা মানুষকে তোমার করেছেন।
তিহু লাজুক হেসে বলল,,—‘সব সময় করি চাচীআম্মু!
সবাই যখন নীলের কবুল বলার প্রশংসা করছে তখন নাহিয়ান নীলের পাঞ্জাবী সামান্য টেনে পিছন থেকে বলল,,
—’আমি কিন্তু আমায় কপি করছিস!
—‘মানে?
—‘মানে আর কি? আমিও আমার প্রাণনাশিনীকে কিডন্যাপারের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে জোর করে বিয়ে করেছিলাম তুইও তাই করেছিস। তারপর কিডন্যাপিং এরপর আমি আর আমার প্রাণনাশিনী মিলে সুইজারল্যান্ডে অনেক সুইট মোমেন্ট স্পেন্ড করছি তুইও করেছিস! যদিও সেটা নিউইয়র্কে! তারপর আমিও বিয়েতে সরাসরি কবুল বলিনি অন্যরকম করে বলেছিলাম, তুই সেটাও কপি করলি!
নাহিয়ানের কথায় ঠোঁট চেপে হাসলো নীল, পরক্ষণে এক ঝলক চারিদিকে তাকিয়ে সকলের অগোচরে বলল,,
—-’কিন্তু একটা জিনিসে আমি তোর এক ধাপ এগিয়ে আছি!
—-‘আবার কিসে?
—-‘ইউ নো?আমি আমাদের আনুষ্ঠানিক বিয়ের আগে বাসর করেছি! তুই করতে পেরেছিলি?
নাহিয়ান বিস্ফোরিত নয়নে তাকালো।নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে নীলের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
— ‘তোর সাহস তো কম না রে নীল! বিয়ের আগেই বাসর? তুই কি চাস আমি তোর এই খবর ভাইরাল করে; আজই তোর পলিটিক্যাল ক্যারিয়ার শেষ করে দি?
নীল নির্বিকার ভঙ্গিতে পাঞ্জাবির কলারটা একটু ঠিক করে মুচকি হাসল। চোখ টিপে বলল,,
— ‘আরে বাবা, এটাকে বলে ডাইনামিক লিডারশিপ। পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া। তুই তো ছিলি ব্যাকডেটেড হিরো, আর আমি হলাম মডার্ন পলিটিশিয়ান। স্ট্র্যাটেজি বুঝতে হয় মিস্টার নাহিয়ান!
নাহিয়ান এবার একটু খ্যাপাটে হেসে বলল,,
— ‘বেশি ডাইনামিক হতে যাস না। আজ রাতে যদি বাসর ঘরের দরজায় চাচী আম্মু পাহারা বসায়, তখন বুঝবি ডাইনামিক লিডারশিপ কোথায় যায়! তুই কি ভাবছিস, বিয়ের পর তোকে এত সহজে ছাড়বে?
নীল এবার সোজা হয়ে বসে গম্ভীর গলায় ঘোষণা করল,,
— ‘শোন, এমপি ওয়াহাজ খান নীল একবার যেটা ডিসিশন নেয়, সেটা বাস্তবায়ন করেই ছাড়ে। তোদের ওই সেকেলে নিয়ম মানার ধৈর্য আমার নেই। আজকের বাসর আজকেই হবে, আর সেটা এই কমিউনিটি সেন্টারের এই হইচইয়ের মধ্যেই আমি আমার নিজের মতো করে গুছিয়ে নেব। দরকার হলে কার্ফু জারি করব!
নাহিয়ান হোহো করে হেসে উঠল। নীলের কাঁধে থাপ্পড় দিয়ে বলল,,
— ‘কার্ফু দিবি? নিজের বিয়েতে? তুই তো দেখি আস্ত একটা পাগল! তা ম্যাডামকে কি বলেছিস? নাকি তাকেও ড্রাফট বিলের মতো সই করিয়ে নিয়েছিস?
নীল আড়চোখে লাল বেনারসি পরা তিহুর দিকে তাকালো। তিহু তখন পাশে বসে থাকা মাহার সাথে কথা বলতে বলতে লাজুক হাসছে। নীল নিচু স্বরে বলল,,
— ‘ম্যাডামকে বলতে হয় না, ম্যাডাম বুঝে গেছেন তার কপালে আজ অশেষ কষ্ট আছে। তোরা বরং রাতে ডিনারটা তাড়াতাড়ি শেষ করার ব্যবস্থা করিস। আমার হাতে সময় খুব কম!
নাহিয়ান মাথা নেড়ে বলতে লাগল,,
— ‘আল্লাহ রে! এই ছেলের পাল্লায় পড়ে তিহু মেয়েটার জীবনটাই তেজপাতা হয়ে যাবে। ছোটবেলার লিডারগিরি এখন বিয়ের আসরেও ঝাড়ছিস! যা বাবা, যা। তোর নৌমির আম্মুকে নিয়ে তুই আজই বাসর কর, আমি বরং গেটে গিয়ে পাহারা দেই যাতে তোর আব্বু লাঠি নিয়ে না আসে!
নীল হাসতে হাসতে বলল,,
— ‘দ্যাটস লাইক আ ব্রাদার! মনে রাখিস, বাসর ঘরের আশেপাশেও যেন কোনো মিডিয়া পারসন বা সাংবাদিকের উঁকিঝুঁকি না দেখি। নইলে কালকের হেডলাইন হবে—নেতা সাহেবের দ্রুতগামী বাসর!
নাহিয়ান চলে যাচ্ছিল কিন্তু যাওয়ার আগেই হো হো করে হেসে নিজের দিকে চেয়ে ঠোঁট উল্টে বলল,,
—-‘তাহলে তোর জন্য এক বালতি সমবেদনা! কেননা আজকেই তোরা ঢাকা ব্যাক করছিস তো কমিউনিটি সেন্টারে আর বাসর হলো না রে তোদের!উসসস..!
এদিকে নীলের কন্ঠে ‘কবুল’ ধ্বনি শোনা মাত্র তিহুর বুক কাঁপছে দুরুদুরু। লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে আসছে শরীর। দ্বিতীয়বারের বিয়ে তবুও এমন অনুভূতির কারণ অজানা তিহুর।মাহা বসে আছে তার খুব কাছ ঘেঁষে।কাজী সাহেব তাকে ’কবুল’ বলতে বলায় আড়ষ্ঠ দেহটাকে সামান্য নাড়িয়ে মাহার কানে কানে তিনবার ফিসফিসিয়ে সে বললো,,
—‘কবুল,বলে দে ওদের মিস্টার পলিশিয়ানকে কবুল,তাঁর রাগ, তাঁর ওই একরোখা শাসন, তাঁর অঢেল ভালোবাসা—সবই কবুল।
মাহা মুচকি হেসে কাজী সাহেবের দিকে তাকিয়ে তিহুর সম্মতির কথা জানিয়ে দিল। পুরো কমিউনিটি সেন্টার জুড়ে তখন খুশির জোয়ার। নীল দূর থেকেই তিহুর কম্পিত ওষ্টাধর আর নতজানু চোখের ভাষা পড়ে নিল এক লহমায়।ঠোঁটের কোণে সেই বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে চোখ টিপলো।
এদিকে তিহুর কবুল বলার পরই মাহা উঠে অপর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কেননা মুরব্বিরা তিহুকে ঘিরে ধরে আছেন। তবে মাহা সরে আসতেই কোত্থেকে জানি তার পাশে উদয় হলো রাওফিন। পরনে শ্বেত শুভ্র আদ্দির পাঞ্জাবি গলায় জড়ানো লাল রঙা দোপাট্টা। মাহা তাকে দেখে ভ্রু কোঁচকালো; রাওফিন তার কাছে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল,,
—-‘দেখো লাভ লাইন আমাদের আগে বাচ্চাগুলোর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে! এটা কি ঠিক বলো? আমাদেরও বিয়ে করে নেওয়া উচিৎ এবার! না হলে নাতি নাতনিদের সাথে ফুটবল খেলার বয়সে বাচ্চাকে ফিডার খাওয়ানো লাগবে!
মাহা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,,—-‘নিজেকে খুব জোয়ান ভাবো?
রাওফিন একটু ভাব নিয়ে বলল,,—‘অফকোর্স!এখনো থার্টি বছর যেহেতু কামপ্লিট হয়নি তো আমি ইয়ং ই!
মাহা মুখ বাঁকিয়ে বলল,,—‘কচু তুমি!
রাওফিন তাকে সবার অগচরে কাছাকাছি টেনে বললো,,—‘ তাহলে প্রুফ করি?
এমনিতেই রাওফিনের শরীর থেকে ভেসে আসা পারফিউম এর মাতাল গন্ধে মস্তিষ্ক শূন্য মাহার।তার উপর এমন কাছাকাছি অবস্থায় লজ্জায় আড়ষ্ট সে।বোকা কণ্ঠে সে বলল,,
—‘মানে?
মাহার এমন দশায় বাকা হাসলো রাওফিন, বন্ধন সামান্য শিথিল করে বলল,,—-‘কিছুদিন পর টের পাবে সুইটহার্ট!
রাফা শাড়ির আঁচল উঁচিয়ে দৌড়ে যাচ্ছিলো কোনো একদিকে। হঠাৎ মুখোমুখি সংঘর্ষ কারো সঙ্গে, পড়ে যেতেই ঠাহর হলো কোনো বলিষ্ঠ হাতজোড়া শক্ত করে ধরেছে তাকে। মুখ উঁচিয়ে সম্মুখে তাকাতে সামনের ব্যক্তিটাকে দেখে ভ্রু এমনিতেই কুচকে আসলো তার,,
—–‘তুমি?
—-‘চোখ এমন আসমানে তুলে দৌড়াইলে যেকোনো সময় তুই নিজেও আসমানে পৌঁছে যাবি।
রাফা নিজেকে ছাড়িয়ে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়িয়ে বলল —–‘তাহলে তো ভালোই হবে আসমান ভাইয়ের কাছে যাব!
নিহিত শান্ত ভঙ্গিমা এই অপরদিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল কিন্তু হঠাৎই রাফার মুখে আসমানের নাম শুনে কত জোড়া থেমে গেল তার। রাগী কন্ঠে শুধালো,,
—-‘আসমান ভাই এর কাছে যাবি মানে?
রাফা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে শাড়ির কুঁচিটা ঠিক করতে করতে বেশ ভাব নিয়ে বলল,,
— ‘কেন? আসমান ভাইয়ার কাছে গেলে সমস্যা কী? উনার নাম শুনলেই তোমার এমন পিত্তি জ্বলে ওঠে কেন বলো তো? একে তো সুদর্শন, তার ওপর অমায়িক ব্যবহার। আমার তো রীতিমতো ক্রাশ উনি!
‘ক্রাশ’ শব্দটা শোনামাত্র নিহিতের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। শান্ত নিহিতের ভেতরে যেন হঠাৎ এক কালবৈশাখী ঝড়ের আভাস পাওয়া গেল। সে এক পা এগিয়ে আসতেই রাফা দু পা পিছিয়ে গেল। কিন্তু নিহিত তাকে পালানোর সুযোগ দিল না। ঝট করে রাফার সেই নরম, তুলতুলে বাহুটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় পুরে নিল সে।
রাফা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে বলল,,
— ‘আহ! ছাড়ো নিহিত ভাই, লাগছে তো!
নিহিত রাফার খুব কাছে ঝুঁকে এল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস রাফার কপালে আছড়ে পড়ছে। নিচু কিন্তু অসম্ভব গম্ভীর গলায় নিহিত বলল,
— ‘শোন রাফা, আজ শেষবারের মতো সাবধান করে দিচ্ছি। ওই আসমান না কি জমিন—কারো নাম যদি আর একবার তোর মুখে শুনেছি, তবে ফল ভালো হবে না। তোর এই ক্রাশ-ফাস আমি এক মিনিটে ঘুচিয়ে দিতে পারি, সেটা নিশ্চয়ই জানিস?
রাফা থতমত খেয়ে গেল। নিহিতের চোখে আজ শাসন নয়, এক অদ্ভুত অধিকারবোধের আগুন জ্বলছে। সে আমতা আমতা করে বলল,
— ‘তুমি… তুমি আমার হাত এভাবে ধরছো কেন? মানুষ দেখলে কী ভাববে?
নিহিত বাঁকা হাসল। মুঠোটা আরও একটু শক্ত করে ধরে বলল,,,
— ‘মানুষ কী ভাববে তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। শুধু মনে রাখিস, এই বাহুটা ধরার অধিকার যেমন আমি রাখি, তেমনি শাসন করার অধিকারটাও আমারই। অন্য কেউ যদি তোর আশেপাশে উঁকিঝুঁকি মারে, তবে তাকে আসমান থেকে সরাসরি জমিনে আছাড় মারব। বুঝেছিস?
রাফা বড় বড় চোখ করে চেয়ে রইল। নিহিতের এমন রুদ্রমূর্তি সে আগে কখনও দেখেনি। লোকটা যে তাকে নিয়ে এতটা পজেসিভ, সেটা আজ তার হাড়কাঁপানো চাহনিতেই স্পষ্ট। নিহিত হাতটা ছেড়ে দিয়ে পকেটে হাত গুঁজে শান্তভাবে প্রস্থান করল, আর রাফা সেখানে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নিজের স্পন্দিত হৃৎপিণ্ডের শব্দ শুনতে শুনতে।
—-‘তুমি নীরা না?
পরিচিত কন্ঠস্বরটা পিছন থেকে ভেসে আসতেই কিছুটা আঁতকে উঠলো নীরা। চঞ্চল পদজোড়া থামিয়ে পিছন ঘুরে তাকিয়েই দেখল রিশাদের অবস্থান। স্নিগ্ধ হেসে বলল,,
—-’জ্বী আসসালামু আলাইকুম।
রিশাদ এগিয়ে আসতে আসতে বলল,,–‘ওয়ালাইকুম আসসালাম! কোথায় যাচ্ছিলে?
—’এইতো একটু উপরে যাচ্ছি।
—‘ডিস্টার্ব করলাম তাই না? আচ্ছা যাও!
—-‘না না ডিস্টার্ব কেন? এমনিতেও এমনিই যাচ্ছিলাম।
—‘আচ্ছা যাও তবে আমিও দেখি ওদিকটায়!
—‘হু!
রিশাদের কথা শুনে নীরা সামনের দিকে পা বাড়াতেই রিশাদ হুট করে ডাকল ফের,,
— ‘শোনো নীরা!
নীরা থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকাল। তার চোখেমুখে কিছুটা বিস্ময়। রিশাদ দ্রুত চারপাশটা একবার দেখে নিল। ধারেকাছে মাহা বা অন্য কোনো মেয়েদের দেখা যাচ্ছে না। রিশাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে দ্রুত পা চালিয়ে নীরার একদম পেছনে এসে দাঁড়াল। নীরার পিঠের দিকের ব্লাউজের হুকটা কোনোভাবে আলগা হয়ে খুলে গেছে, যার ফলে শুভ্র পিঠের অনেকটা অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। ভিড়ের মাঝে কেউ খেয়াল করার আগেই রিশাদ নিজের অবস্থান দিয়ে নীরাকে আড়াল করে ফেলল।
রিশাদ বেশ নিচু স্বরে, প্রায় নীরার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
— ‘একদম নড়বে না নীরা। যেদিকে আছো সেদিকেই মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকো।
রিশাদের এমন আচরণে নীরা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তার হৃদপিণ্ড যেন দৌড়াতে শুরু করেছে। সে আমতা আমতা করে বলল,
— ‘কী… কী হয়েছে রিশাদ ভাই? আপনি এভাবে…
রিশাদ গম্ভীর স্বরে বলল,
— ‘তোমার ব্লাউজের হুক খুলে গেছে নীরা। একদম পেছনে ফিরবে না। আমার সাথে সাথে চলো।
নীরার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। লজ্জায় তার ফর্সা মুখটা মুহূর্তেই টকটকে লাল হয়ে গেল। সে দুই হাত দিয়ে নিজেকে আড়াল করার বৃথা চেষ্টা করতে করতেই হঠাৎ লজ্জায় কেঁপে উঠল।
রিশাদ নীরাকে একটুও দ্বিধাগ্রস্থ সুযোগ দিল না। সে নীরাকে আড়াল করে ধরে বারান্দার এক কোণের দিকে নিয়ে এল, যেখানে মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে। তীব্র বিব্রত বোধে ঠক ঠক কাঁপছে নীরার ক্ষীণ কায়া। সে হুকটা লাগানোর চেষ্টা করতে গিয়েও পারছে না।
রিশাদ নীরার সেই কাঁপাকাঁপি দেখে শান্ত গলায় বলল,,
— ‘হেজিটেট হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই নীরা। এখানে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। তুমি জাস্ট শান্ত হয়ে দাঁড়াও, আমি ঠিক করে দিচ্ছি।
রিশাদের বলিষ্ঠ হাত জোড়া নীরার পিঠের কাছে আসতেই
আসতেই নীরা শিউরে উঠল। রিশাদ খুব সাবধানে আর নিপুণ হাতে হুকটা লাগিয়ে দিল। স্পর্শের সেই শিহরণে নীরা চোখ বুজে ফেলল। হুক লাগানো শেষ করে রিশাদ একটু সরে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসল,
— ‘হয়ে গেছে। এবার যেতে এবার যেতে পারো। আর সাবধানে থেকো ম্যাডাম.!
নীরা এক পলক রিশাদের চোখের দিকে তাকিয়েই আবার চোখ নামিয়ে নিল। তার সারা শরীর তখন এক অজানা আবেশে থরথর করে কাঁপছে। কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষাটুকুও যেন হারিয়ে গেছে তার। সে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করল, আর রিশাদ পকেটে হাত দিয়ে সেই লাজুক মেয়েটার চলে যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে রইল।
নিস্তব্ধ নিশুতি।কমিউনিটি সেন্টারের বিশাল ডুপ্লেক্স স্যুটের চারপাশটা এখন নিঝুম। বাইরে শরতের হিমেল হাওয়া বইলেও ঘরের ভেতরটা এক তপ্ত অপেক্ষায় ম ম করছে। নীল সবাইকে একপ্রকার জোর করেই রেখেছে এখানে। নতুবা সবার ইচ্ছা ছিল ঢাকা ব্যাক করার।
বাসর ঘরটা সাজানো হয়েছে একেবারে নব্বই দশকের জমিদারী কায়দায়। রজনীগন্ধার লম্বা লম্বা স্টিকগুলো ঘরের কোণায় কোণায় মাটির ফুলদানিতে সাজানো, যার তীব্র মিষ্টি সুবাস ঘরের প্রতিটি অণু-পরমাণুতে মিশে আছে। বিছানা সাজানো গোলাপের পাপড়িতে। র’ক্ত লাল গোলাপের মাঝে এসে শুভ্র কিছু পাপড়ি দিয়ে লেখা নীল-তিহুর নাম। ছাদের ঝাড়বাতিটা নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে; তার বদলে ঘরের চারকোণে জ্বলছে হালকা নীলচে আলো আর কিছু সুগন্ধি মোমবাতি, আর লণ্ঠনের নিয়ন আলো যা এক মায়াবী ছায়ার খেলা তৈরি করেছে দেয়ালজুড়ে।
তিহু বিছানার মাঝখানে বসে আছে। পরনের সেই লাল বেনারসিটা যেন এখন আরও বেশি উজ্জ্বল লাগছে। মাথার ঘোমটাটা টেনে দিলেও তার নিচ দিয়ে দেখা যাচ্ছে কম্পিত ওষ্ঠাধর। ঠিক তখনই দরজায় মৃদু আওয়াজ হলো। নীল ঘরে প্রবেশ করল। তবে তার চোখেমুখে এখন গাম্ভীর্যের লেশ মাত্র অবশিষ্ট নেই যা আছে তা কেবলই এক বিজয়ী প্রেমিকের তৃপ্তি।
নীল ধীরপায়ে এগিয়ে এসে বিছানার একদম কিনারে বসল। বলা চলে দীর্ঘ এক সংগ্রাম শেষে প্রিয়তমা কে আপন কারাগারে বদ্ধ করতে এসেছে সে। তবে আসার পথটা এতটাও মসৃণ ছিল না। কিছুক্ষণ আগেই বিচ্ছুবাহিনীর তীব্র আ’ক্র’ম’ণের শিকার হয়েছিল সে। বাঁদর গুলো তার কাছ থেকে লুটে নিয়েছে তিন লক্ষ টাকা। আর তাদের লিডারশিপে ছিল রাওফিন নিজেই। বেলাজটা নিজের ছোট ভাই এর বাসর ঘরেও বাগড়া দিতে এসেছিল।
তার ভাষ্যমতে নীল মাত্রাতিরিক্ত বেপরোয়া আর অধৈর্য। এটা কখনো তার প্রথম ভাষা হতেই পারেনা এর আগে নিশ্চিত কোন একটা কুকর্ম করেছে সে হয়তো পার্টি অফিসেই! যদিও কথাটা সত্যি কিন্তু সবার সামনে রাওফিনকে বেশ ভালই ঝাড় দিয়েছে নীল। যার দরুন টাকার অংকটা পাঁচ লক্ষ থেকে কিছুটা কমে তিন লক্ষে এসে থেমেছে।
যাই হোক, নীল বর্তমান সেসব চিন্তাভাবনা ডাস্টবিনে ফেলে মুগ্ধ আঁখি জোড়া ভরে তিহুকে দেখছে, এদিকে তিহু আড়ষ্ট হয়ে আরও একটু কুঁকড়ে আসলো নীলের উপস্থিতিতে। নীল আলতো হাতে এগিয়ে এসে ঘোমটাটা তুলে তিহুর প্রশস্ত ললাটে একে দিল তীব্র প্রেমময় চুম্বন। অজানা আবেশ আর শিহরণে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ন্যায় কেঁপে উঠল তিহুর ক্ষীন কায়া। আর এমন আড়ষ্টতায় নীল মুচকি হেসে বলল,
—-‘এখনো এত লজ্জা ম্যাডাম?
তিহুর কথাগুলো গলার মাঝে দলা পাকিয়ে আসছে। কিছু বলতে পারছে না সে কিছু না। এক অজানা নীরবতা ঘিরে ধরেছে তাকে।নীল হঠাৎ বেশ শব্দ করে হাসলো।তিহু বাকরুদ্ধ হয়ে শুনছে কি সুমধুর সে সুর।আচ্ছা একটা পুরুষ কেনো এত সুন্দর করে হাসবে এমন হাসার অধিকার তো শুধুই মেয়েদের তাই না? এদিকে তিহুকে এমন মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে নীল থামল।
হুটহাট পাশ থেকে লন্ঠনটা হাতে তুলে তিহুর লাবণ্যময়ী মুখশ্রীর সম্মুখে ধরে বলল,,
—–‘স্বামীকে দ্রুত হারাতে না চাইলে এভাবে তাকাবেন না ম্যাডাম; আপনার এমন দৃষ্টিতে হৃদস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে যায় আমার।
তিহু নীলের এমন কথায় হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল তার। নীল হেসে বলল,,
—-‘একটু অপেক্ষা করুন ম্যাডাম, জিনিস আছে আপনার জন্য।
তিহু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই নীল বিছানা থেকে নেমে কোথাও জানি বেরিয়ে গেল। ফিরে আসলো মিনিট পাঁচেক পর।তার হাতে একটা মাঝারি আকারের লাগেজ। সে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে সেটা তিহুর একদম সামনে রাখল। তিহু অবাক চোখে চেয়ে রইল; এই নিশুতি রাতে এমন উপহারের মানে সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।
নীল মুচকি হেসে লাগেজের চেইনটা টেনে খুলে দিল। ভেতরটা কোনো সাধারণ পোশাকে ঠাসা নয়, বরং থরে থরে সাজানো অজস্র নথিপত্র আর আইনি দলিল। তিহু বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে একবার সেই কাগজগুলোর দিকে আর একবার নীলের চোখের দিকে তাকাচ্ছে।
নীল একটি ফাইল হাতে তুলে নিয়ে অত্যন্ত শান্ত স্বরে বলল,,
—‘অবাক হচ্ছো? এখানে আমার তিল তিল করে গড়ে তোলা ব্যবসা, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি—এক কথায় আমার জাগতিক যা কিছু অর্জন, তার সবটুকুর মালিকানা আজ থেকে তোমার নামে লিখে দেওয়া হয়েছে। এই যে দেখ, সবখানে কেবল তোমার নাম।
তিহু বাকরুদ্ধ। যে ঋণে সে নীলকে বেঁধেছে, তার প্রতিদান নীল এভাবে দেবে তা সে কল্পনাও করেনি। তার চোখের কোণে অজান্তেই এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল। সে অস্ফুট স্বরে বলতে চাইল,,
—-‘এসব কেন মিস্টার পলিটিশিয়ান?
নীল তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে তিহুর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। গভীর কন্ঠে বলল,,
—‘যেখানে গোটা জীবনটাই তোমার নামে লিখে দিয়েছি সেখানে এগুলো তো মূল্যহীন জঞ্জাল।
তিহু অনুভবে বুঝতে পারল, নীল তাকে কেবল তার প্রাসাদের রানী করেনি, বরং নিজের হৃদয়ের সিংহাসনে বসিয়ে আজ সে নিজেই নিঃস্ব হয়ে ধন্য হতে চাইছে। তবুও সে মাথা নাড়িয়ে বলল,,
—-‘আপনাকে পেয়েছি এই আলহামদুলিল্লাহ জীবনে আর কোন চাওয়া পাওয়া কিছু নেই আমার।
—-‘সবকিছু সহ এই নেতা সাহেব যদি তোমার থাকে তাহলে কোন আপত্তি আছে?
তিহু তু পাশে মাথা নাঁড়ালো চোখ জোড়া ছল ছল। নীল তৎক্ষণাৎ বুকপকেট থেকে কিছু একটা বের করে হাতে নিলো অতঃপর বলল,,
—-‘মোস্ট ইম্পোর্টেন্টলি এটা আমার কাছে থেকে গিয়েছে কিন্তু এটা আমি আপনাকে দিতে চাই না।
তিহু কিছুটা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে চাইলে ও নীলের হাতের তালু বরাবর।হাতের তালুর ওপর রাখা সেই অতি পরিচিত একজোড়া ঝুমকা।ঝালরগুলো লণ্ঠনের মায়াবী আলোয় চিকচিক করে উঠছে। তিহু অস্ফুট বিস্ময়ে চেয়ে রইল। এটা তো সেই ঝুমকাটা, যা সে ভার্সিটির বসন্ত বরণের দিন হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে গিয়ে হারিয়ে ফেলেছিল!
স্মৃতিগুলো চোখের সামনে স্বচ্ছ কাঁচের ন্যায় ভেসে উঠল। ভিড়ের মাঝে একজনের সাথে ভীষণ এক ধাক্কা, কান থেকে খসে পড়া ঝুমকাটা খোঁজার সময়টুকুও সেদিন ছিল না। তিহু কাঁপা গলায় বলল,,
— ‘এটা… এটা আপনার কাছে কীভাবে?
নীল সেই ঝুমকা জোড়ার ওপর আঙুল বুলিয়ে মৃদু হাসল। বলল,,
— ‘সেদিন তোমার সাথে আমার ধাক্কা লাগেনি তিহু, ধাক্কা লেগেছিল আমার হৃদপিণ্ডের সাথে। ঝুমকাটা পড়ে ছিল ধুলোয়, আমি ওটাকে ধুলো থেকে তুলে নিজের বুকের বাঁ-পকেটে আগলে রেখেছিলাম। সেদিন থেকে এটাই ছিল আমার বিগত ১৫ বছরের অদেখা ভালোবাসার একজোড়া জীবন্ত চিহ্ন। ঝুমকাই ছিল আমার কাছে তোমার অস্তিত্ব।
নীল থামল। তিহুর চোখের পলক পড়ছে না।
—-‘এতটা ভালোবাসেন?
—‘হয়তো এর থেকেও যার বর্ণনা দেওয়ার মতো ভাষা গোটা পৃথিবীর শব্দভাণ্ডার খুজেও পাওয়া যাবে না।
তিহু মুগ্ধতায় বিমূঢ় হয়ে আছে,,—‘আমি তো কখনোই আপনার ভালোবাসায় সমান হতে পারব না জনাব!
—‘পারবে!
—-‘কিভাবে?
দীর্ঘক্ষণের নীরবতা শেষ হঠাৎ নীল বললো,,—‘আজ যদি তোমার থেকে কিছু চাই দেবে আমায়?
তিহু বিমূঢ় হয়ে আছে কোনো বিচার-বুদ্ধি না খাটিয়েই মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। অস্ফুট স্বরে বলল,,
— ‘হ্যাঁ, দেব। আপনি যা চাইবেন তাই দেব।
নীল ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমি আর এক সমুদ্র প্রেম নিয়ে ঝুঁকে এল তিহুর খুব কাছে। ফিসফিস করে বলল,
প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৯
— ‘একটি দীর্ঘ চুমু… এই জয়ী প্রেমিকে কি একবিন্দু ভালোবাসার চিহ্ন ভিক্ষা দিবেন, ম্যাডাম? প্লিজ!
তিহু হকচকিয়ে গেল। কিন্তু নীলের চোখের সেই আকুলতা তাকে ফেরানোর শক্তি কেড়ে নিয়েছে। লজ্জায় তার গাল দুটো লাল গোলাপের পাপড়িকেও হার মানাল। সে ধীরলয়ে চোখ দুটো বন্ধ করল। কোনো দ্বিধা ছাড়াই সে সামনে এগিয়ে এল এবং নীলের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের তালুতে আলতো করে এঁকে দিল এক গভীর অনুরাগমাখা চুম্বন।
ঘরের কোণে রাখা রজনীগন্ধার সুবাস যেন এক লহমায় আরও তীব্র হয়ে উঠল। লণ্ঠনের আলোয় কাঁপতে থাকা ছায়াগুলো সাক্ষী রইল এক অসম্পূর্ণ গল্পের পূর্ণতা পাওয়ার।
