Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ৪৬

সায়রে গর্জন পর্ব ৪৬

সায়রে গর্জন পর্ব ৪৬
নীতি জাহিদ

ছোট্ট পা ফেলে টিপে টিপে চিলেকোঠার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উঁকি দিচ্ছে। ভেতর থেকে বড়দের গলার আওয়াজ। নরম ডান হাতটা তুলে আলতো টোকা দিলো। কয়েকবার টোকা দিতেই দরজা খুলে গেলো। পাভেল বেরিয়ে এসে খুশি হয়ে খুব সুন্দর একটা হাসি দিয়ে কোলে তুলে নিলো আবিরকে। বলে উঠলো,
– আমার মামাটা।
চেপে ধরে আদর করে ভেতরে নিয়ে গেলো। নোমান কি যেন একটা কাগজ দেখছিলো। পাভেলকে স্বর উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো কাগজের দিকে তাকিয়েই,

– কিরে কে এলো?…
পাভেলের দিকে তাকিয়ে হাতের কাগজটা রেখেই উঠে দাঁড়ায়। দুহাত মেলে দেয় সামনে। বুক কেঁপে উঠে ছেলেকে কোলে নিয়ে। আবির দুহাতে জড়িয়ে ধরে বাবার গলা। নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। ছেলেটা ফুফিয়ে কাঁদছে। বাবা আসবে জানতো। ম্যাডাম এসে পড়িয়েছে ছোট খাম্মার রুমে। তাই তখন মা বেরুতে দেয় নি। ম্যাডাম যাওয়ার পর ছুটে বেরিয়ে এসেছে। বাবাকে পেয়ে মনে হচ্ছে সব পাওনা হয়েছে। ছেলেকে নিয়ে খাটে বসে নোমান ছেলের পুরো বদনে আদর দিতে দিতে বললো,
– আমার বাবাটা। পাপাকে মিস করেছো তুমি?
কেঁদে কেঁদে ফুফিয়ে বলছে,
– হুউউমমম, অন্নেক। এত্তগুলা। কিন্তু কেউ আমাকে নিয়ে যায়নি।
নোমান পুনরায় ছেলেকে বুকে নিয়ে বলে,
– এখন আর কেউ বাঁধা দিবেনা জান বাচ্চাটা। আমিও আমার জানটাকে অনেক মিস করেছি। তাই তো দেখতে চলে এসেছি।
বাবা ছেলের আবেগঘন মুহুর্ত দেখে হাসছে পাভেল। নোমান চোখ মুছে পাভেলের দিকে তাকিয়ে বলে,

– এমন হাসছিস কেনো? তোর তো লজ্জ্বা হওয়া উচিৎ। আমার বাচ্চাটা স্কুলে পড়ে, শাহীন ও হয়তো যখন তখন বাচ্চার বাপ ও হবে আর তুই কিনা নতুন বাচ্চা পালার প্ল্যান করছিস? বাচ্চা পালার বয়সে বাচ্চার পুচকি মাকে পালবি। ছিঃ। শেম অন ইউ।
– আরেকটা কথা বললে ঘু*ষিতে নাক ফা টা বো।
এই কথা শুনে আবির পুনরায় কেঁদে দিলো। পাভেলের দিকে তাকিয়ে নাক টেনে বলে,
– এই মামা প্লিজ মে*রোনা আমার পাপাকে।
– বাচ্চাটার জন্য বেঁচে গেলি। শা*লা ***।
দাঁত খিচিয়ে বললো পাভেল।
নোমান অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো বন্ধুর অসহায় অবস্থা দেখে। আহারে কি করুণ দশা। একটা টিস্যু দিয়ে ছেলের নাক মুছে দিলো। দুহাতে গাল মুছে বললো,

– কি খেয়েছো বাবা?
– রোস্ট আর পোলাও। মাম্মা খাইয়ে দিয়েছে। পাপা তুমি নিচে চলো। মাম্মা অপেক্ষা করছে।
পাভেল এবং নোমান দুজনই অবাক হলো। পাভেল ভ্রু কুঁচকে বুঝার চেষ্টা করছে। পাভেল ইশারা দিয়ে বললো থাম। নোমানের কাছে এসে আবিরকে কোলে নিয়ে বললো,
– বাবা মাম্মা কেনো অপেক্ষা করছে?
– আমি তো জানিনা মামা, মাম্মা বলেছে তোমার পাপাকে নিয়ে এসো।
পাভেল কিছু একটা ভেবে শেফালীকে ফোন দিয়ে উপরে আসতে বললো। নোমান বার বার বারণ করাতেও শুনেনি। শেষমেষ ধমকে বললো,
– বেশি বুঝিস সব কিছু। মেয়েটা কি বলতে চায় শুন।

“ডুবেছি আমি তোমার চোখের অনন্ত মায়ায়,
বুঝিনি আমি সেই মায়াতো আমার তরে নয়।
ভুল গুলো জমিয়ে রেখে বুকের মণিকোঠায়
আপন মনের আড়াল থেকে ভালোবাসবো তোমায়।”
শিফা ও তাহি নওরীনের রুমে যাচ্ছিলো সন্ধ্যার নাস্তা নিয়ে। দরজার বাইরে এমন গান শুনে তাহি থমকে গেলো। শিফার হাতে ট্রে থাকায় বললো,
– আমি যাই তুমি গানো শুনো লিমন ভাইয়ার। খুব সুন্দর গান গায়। আমিও আসছি।
তাহি রুমে প্রবেশ করলো। শুয়ে আছে লিমন। কপালে হাত, চোখ বন্ধ। ল্যাম্পশেডটা জ্বলছে টিমটিমে আলো ছড়িয়ে। পায়ের আওয়াজ শুনে লিমন নড়ে চড়ে উঠলো। তাহিকে একদিন পর দেখলো আজ। ডাক্তার বলেছে ড্রেসিং সাতদিন দিন পর করে দিবে। এখন অনেকটাই ভালোর দিকে। ডান পা মাটিতে ফেলতে অনেক কষ্ট হয়। যাবতীয় প্রয়োজনীয় সব কাজ পা খুড়িয়ে করতে হয়। কাব্য আসে মাঝে মাঝে। এসে কিছুক্ষন আড্ডা দিয়ে যায়। সাহায্য করে কাজে। তাহিকে রুমে ঢুকতে দেখে সালাম দিলো। অসুস্থ হবার পর থেকেই কেমন চুপচাপ হয়ে গিয়েছে লিমন। এখন আর তাহিকে আগের মত জ্বালাতন করেনা। সালামের প্রতিউত্তর করে তাহি শুধায়,

– কেমন আছো?
– জ্বি আলহামদুলিল্লাহ আপনি।
– আলহামদুলিল্লাহ। শরীর কেমন? সেলাইয়ে ব্যাথা করে? আর ডান পা কি একটু মুভ করতে পারছো?
– সেলাই ব্যাথা করে যখন উঠে বসি। আর পা মুভ করলে ব্যাথা করে। মাঝে মাঝে রগে টান লাগে।
– একটু লাগবে সুস্থ হওয়ার পর্যন্ত।
– আচ্ছা।
একটি বাড়তি কথাও বলেনি। তাহি খুশী হয়ে উঠে দাঁড়ায়। হেসে বললো,
– ঠিক আছে থাকো তাহলে। তোমার গানের গলা চমৎকার।
– ধন্যবাদ।
বেরিয়ে গেলো তাহি। আটকে রাখা দম ছেড়ে লিমন বিড়বিড় করে বললো,

– আর কখনো গান গাইবোনা,আজকেই শেষ ছিলো। যদি জানতাম আপনি শুনেছেন তাহলে সেখানেই থেমে যেতাম।
অশ্রু গড়িয়ে পড়ে দু চোখ বেয়ে। কাউকে জানতেও দিলোনা এক্সিডেন্ট স্পটের হাতাহাতির প্রকৃত রহস্য। কেনো সেদিন লিমন আবদুল্লাহপুর থেকে সোজা রুট ধরে না গিয়ে এভার কেয়ার হাসপাতাল ঘুরে উত্তরা গিয়েছিলো। জ্ঞান ফেরার পূর্ব পর্যন্ত ফোন আগলে রেখেছিলো বুকের কাছে। বুকে, পেটে প্রতিটি কোপই ছিলো সেদিন ফোনের জন্য। ভাইজানের দেয়া স্যামসাং গ্যালাক্সি এ-সেভেনটি ওয়ান চূর্ণ বিচূর্ণ করলেও ওরা জানতে পারেনি বুক পকেটে ছিলো নোকিয়ার বাটন ফোন। সেখানেই সংরক্ষিত ছিলো প্রিয় নারীর সম্মান। সেদিন ইনফরমেশন কালেক্ট করে অনেক আগেই বেরিয়ে আসতে পারতো স্পট থেকে।

দেরি হয়েছিলো এই ভিডিওর জন্য। কোনো একটি ভিডিও লিক করার প্ল্যান ছিলো মনির। প্রায় ছ মাস আগের ভিডিও। রেদোয়ানের ডেরা থেকে সব ইনফরমেশন নিয়ে যখন ফিরে আসবে তখনই শুনেছিলো সেই ভিডিও লিক করে দেয়ার কথা ভাড়াটে গুন্ডাদের মুখে। এতেই যেন মনি সুখ খুঁজে পাবে। মেমোরি কার্ড ছিলো হাসপাতালে। মনির কেবিনের ড্রয়ারে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভেবে লিমন চলে গেলো নতুন তথ্যের সন্ধানে। সেখান থেকেই সংগ্রহ করেছিলো সেই মেমোরি কার্ড। বাসায় বসেই নিজের পারসোনাল সিসিটিভি ফুটেজে মনি দেখতে পায়। লিমন সেই মেমোরি কার্ড মনির ড্রয়ার থেকে সরিয়ে ফেলেছে। জিপিএস লক দেয়া ছিলো মনির ড্রয়ারে। কারো সংস্পর্শেই ইনফরমেশন চলে যেত ইউজারের কাছে। পরে অবশ্য ওই ছেলেগুলার মুখ থেকেই পাভেল সব উগলে বের করেছে। ভিডিওতে কি ছিলো তা অজানা ছিলো সকলের। লিমন ভিডিও ওপেন করেই যা বুঝার বুঝে নিয়েছিলো সেদিন। ভেবেছিলো মেমোরি কার্ড লাগিয়ে সেভ করে পুনরায় সেখানে রেখে দিবে। কিন্তু ভিডিওতে ছিলো তাহির ড্রেসিং রুমে চেঞ্জিং ভিডিও। গতকাল রাতে ওয়াশরুমে গিয়ে মেমোরি কার্ড চূর্ণ বিচূর্ণ করে ফ্ল্যাশ করেছিলো কমোডে।
বালিশের কাছে রাখা ফোন কেঁপে উঠলো। ভাইজানের ফোন দেখেই রিসিভ করে সালাম দিতেই প্রথম প্রশ্ন,

– মেমোরি কার্ড টা ডেস্ট্রয় করেছিস?
ঢোক গিলে ভীত গলায় উত্তর দিলো,
– জ্বি ভাইজান।
এই মানুষটার কাছে কথা লুকানো যাবেনা সঠিক বুঝতে পেরেছিলো।
– শরীর কেমন?
– আগের চেয়ে আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
– তাহি কোথায়?
– বাসায় আছে।
– কথা হয়েছে তোর সাথে?
– জ্বি ভাইজান।
– কি বলেছিলাম সব মনে আছে?
– জ্বি ভাইজান।
– গুড, বিশ্রাম নে।
– ভাইজান…
– হুম।
– রেজাল্ট দিয়েছে।
– দেখেছি আমি। সুস্থ হয়ে নে৷ উপহার পেয়ে যাবি। তবে সাবধান উপহারে যেন চাওয়াটা বেশি হয়ে না যায়? ঠিক আছে?
– জ্বি ভাইজান।
সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো। খাট ধরে উঠে বসলো। পেটে আর বুকে টান লাগছে। দরজার কাছে গিয়ে দরজাটা আটকে দিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কাব্যকে ফোন দিলো। ফোন দিতেই কাব্য ও পাশ থেকে বললো,

– কিরে কি অবস্থা?
– কাব্য আমার মনে হচ্ছে কেউ আমার বুকের পাশটা ছু*রি দিয়ে এফোঁড় ওফোঁড় করছে। আমি পারছিনা আর। বিশ্বাস কর আমার ডক্টর তাহি লাগবে বাঁচার জন্য। কিন্তু উনি আমাকে চায় না, অন্যদিকে ভাইজানের ইঙ্গিতপূর্ণ ধমক। আমি বাঁচতে চাই কাব্য৷ রেজাল্ট দিয়েছে আমার। ভাইজান আমার মনের কথা টুকু ধরে ফেলেছে। সরাসরি বলেছে যেন এমন কিছু না চাই। আমি তো ডক্টর তাহিকে চাইতাম…
কাব্যকে ফোন দিয়ে কেঁদে যাচ্ছে এই ছেলে। ভালোবাসা এত কাঁদায় কেনো? কাব্য শান্ত করার জন্য বললো,
– আমি গিয়ে ভাইজানকে বলতাম,প্রয়োজনে সব রকমের চেষ্টা সবাই মিলে চালাতাম। কিন্তু তোকে বুঝতে হবে আমরা প্রত্যেকে নিরুপায়। কারণ তাহি আপা নিজেই তোকে চায়না।

– কেনো চায়না?
– কারণ উনি রাশেদ ভাইয়ের? তোকে এখন ভাইজান জোর করে একটা মেয়ে ধরে এনে বিয়ে দিলে ভালোবাসতে পারবি? তোর কাছে ওই মেয়েকে অযাচিত বোঝা লাগবে না জীবনে? ঠিক তেমনি তুই ও তাহি আপার কাছে একটা অযাচিত কাঁটা। বিরক্তিকর কিন্তু বলে না কষ্ট পাবি দেখে।
– কাব্য…
– হ্যাঁ বল।
– আমি ফোনটা রাখি রে…
– রাখিস না। কথা শোন।
– বুকে ব্যাথা লাগছে। নিতে পারছিনা।
– উলটা পালটা কিছু করে বসিস না?
– করলে যদি ডক্তর তাহির দু ফোঁটা চোখের পানি ঝরতো আমার জন্য ভেবে দেখতাম। করবোনা। আমার মা টা আমি ছাড়া অসহায়। বড় ভাইজান আর যাই বলুক, বকা দিক আমি উনার কাছে কি আমি জানি। হাসপাতালের দুটো দিন আমার হাত ধরে বসে ছিলো। নামাজ আদায় করেছে আমার বেডের পাশে। সত্যি কথা বলতে নামাজে আমি তাকে আমার জন্য কাঁদতে দেখেছি। সেই মানুষটাকে কষ্ট দিতে পারবোনা। রাখছি। স্বাভাবিক হতে দেয়। বাস্তবতা মেনে নিতে দেয়। আল্লাহ হাফেজ।
– আল্লাহ হাফেজ।

মুখোমুখি দুজন। তবে দুজনের দৃষ্টি অপরিচিত। শেফালী নিরবতা ভেঙ্গে বললো,
– কেমন আছো?
– আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
– জিজ্ঞেস করবে না কেমন আছি?
– ভাইজানের কাছে যেহেতু আছো,ভালোই আছো।
– হুম। সুরাইয়া কেমন আছে? নিয়ে এলেনা কেনো?
– পিকনিক করতে আসিনি এখানে। সুরাইয়ার লাইফ, ক্যারিয়ার আছে।
– রাগার মত কিছু হয়নি। কিছু প্রশ্ন ছিলো?
নোমান নিশব্দ। তবুও শেফালী বললো,
– আবিরের কাস্টডি আমি নেব।
– আচ্ছা।
– তোমার আগ্রহ নেই ছেলের জন্য?
– ছেলেটা দুজনের। মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত করতে চাইনা।
– আর বাবার?
– ছেলের মুখ থেকে বাবা শব্দ বের হওয়ার দেরি, তার বাবার ছুটে আসতে দেরি হবেনা। এছাড়া ছেলের মাথা উপর বিশ্বাসযোগ্য মানুষ তার বড় মামা, ছোট মামা আছে।
– আমি না হয় খারাপ ছিলাম তুমি কি করে আরেকটা বিয়ে করলে? শুনেছি সুরাইয়াকে ভালোবেসে বিয়ে করেছো? ভালোবাসলে কখন?
মৃদু হেসে নোমান বললো,

– শিউলি…
সবই স্বাভাবিক ছিলো কিন্তু নোমানের এই ডাক শেফালীর ভেতর টা নাড়িয়ে দিলো। কই আগেও তো কত ডেকেছে কখনো তো এমন ভাবে অনুভূতি জাগে নি। তবে কি মানুষটা তার নেই বলে এমন মনে হলো। পুনরায় নোমান বললো,

– আমি ভালোবেসে ঠকেছি। ছেলেকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখে তিলে তিলে আ ঘাত করা হয়েছে। যাকে ভালোবেসেছি সেই মানুষটা আমাকে মা*রার জন্য ভাড়াটে গুন্ডা নিযুক্ত করেছিলো। যার হাসিতে আমি ম*রতে রাজি ছিলাম সে আমার অন্তর পুড়িয়ে খাঁক করে দিয়েছে। সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম ভেঙ্গে পড়বোনা। আজকের দিনটার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া। এই দিনের মুখোমুখি হতে হতো কখনো না কখনো। আমি সুরাইয়াকে ভালোবাসিনি,মেয়েটা আমাকে আপন করে নিয়েছে। তোমার চোখের বালি ছিলো সুরাইয়া, আজ আমি তাকে নিয়ে সংসার করি। অথচ তুমি এখন দূরে। এটাই আমার প্রতিশোধ,তোমার শা স্তি। সুরাইয়া আমাকে ঠিক যতখানি ভালোবাসে বিয়ের পর থেকে আমি তাকে এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভালোবাসা দেয়াতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। একা কেনো থাকিনি জানো? তুমি শাহাদ ইমরোজ এর বোন। তিনি তোমাকে পা/প থেকে ফিরিয়ে আনবেই যদি জানতে পারে তোমার পা/পের পরিমাণ। কিন্তু আমি কোনো অপশন রাখিনি আমার কাছে তুমি ফিরে আসার। বিয়ে না করলে তোমার চোখের মায়ায় পড়ে তোমাকে ঠিক বুকে টেনে নিতাম। তুমি এখন নোমানের জন্য পরনারী।
পুরো কথা শেষ করে নোমান চিলেকোঠার দিকে ফিরে গেলো। শেফালী শব্দ হারিয়ে নির্বাক। দুহাতে অশ্রু মুছে নিচে নেমে এসেছে। সত্যিই মেনে নিতে পারছেনা সুরাইয়াকে। ঠিকই বলেছে নোমান,এটাই শাস্তি। প্রাক্তন স্বামীর বর্তমান স্ত্রীকে মেনে নিতে পারছে না, তবে স্বীয় স্ত্রীর সাথে পরপুরুষ খালেদ পারভেজকে কিভাবে মেনে নিতো নোমান! শা স্তি হয়েছে শেফালীর। পা*পের শা স্তি।

গা ছমছম করা পরিবেশ এখন খামার বাড়িতে। রাত নেমেছে। কল্পনা,রাখি এবং সালিফ ফিরে গিয়েছে। বাড়ির মালি এবং পাহারাদার আছে বাইরে। শাহাদ চৌকিতে বসে দিয়ার গল্প শুনছে সামনের ঘরে। কোলে আছে মেয়ে শেহজা। হাত পা নাড়িয়ে গল্প জুড়ে দিয়েছে ছোটবেলার। শাহাদকে খাওয়াবে বলে গাছ থেকে ফলমূল পাড়িয়েছে। শাহাদের সামনে একটা বাটিতে কদবেল মাখা, অন্য বাড়িতে আমড়া মাখা এনে সাজিয়ে দিয়েছে। নিজে একটু মুখে দিয়ে জিহবায় টাক মে*রে বলে,
– শেহজার বাবা, খুব মজা হয়েছে। খেয়ে দেখুন।
শাহাদ মুচকি মুচকি হাসছে। এক চামচ কদবেল মুখে দিয়েই চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো। মনে হলো শরীর ঝিরঝির করে উঠেছে। দিয়া এবং ছোট বোন দুটো এই জিনিস প্রায় বানিয়ে খেত। কখনো চেখে দেখা হয়নি। এই খাবার কিভাবে মে*য়েরা এত মজা করে খায়? শেহজা হাত বাড়াচ্ছে খাওয়ার জন্য। দিয়া মুখে দিতে যাবে শাহাদ মৃদু ধমক দিয়ে বলে,

– কি দিচ্ছো এটা? কিভাবে খাও এই খাবার তোমরা? আমার জিহবা বিস্বাদ হয়ে গিয়েছে। এত টক কেনো?
– সরুন তো আপনি। আমার মেয়ে এটা খাবে। তাই না মা?
দিয়া জোর করে মেয়ের মুখে পুরে দিতেই মেয়ে চোখ মুখ কুচকে ফেলেছে। তা দেখে শাহাদের মেজাজ
খা/রাপ হলো। পরের বার মেয়েকে দিতেই এবার মেয়ে স্বাভাবিক। মজা করেই খাচ্ছে। দিয়ার মুখে মিষ্টি হাসি। জিহবা বের করে শাহাদকে ভেঙচি দিয়ে বলে,
– দেখেছেন এটা আমারো মেয়ে, শুধু যে আপনার তিতা করলা খাবে এমন নয়? আমার পছন্দের খাবারো খেতে হবে ওকে।
দুষ্টুমি খেললো শাহাদের মাথায়। মুখে হাসি রেখেই টেনে ঢং করে বললো,

– তাইইইইইই…
– হুম তাই।
– আচ্ছা…
– কি আচ্ছা?
– সব আচ্ছা।
– না সব আচ্ছা না।
– তাই তো! ওকে সব আচ্ছা না।
– কি শুরু করলেন?
– কি শুরু করলাম?
– এভাবে কথা বলছেন কেনো?
– কিভাবে কথা বলছি?
– কমান্ডার সাহেব?
– জ্বি শাহাদ বধূ।
– আপনি থামবেন?
– অবশ্যই।
দিয়া চ টে গিয়ে চেয়ার টেনে মুখে তর্জনি চেপে বসে আছে। শাহাদ ভীষণ মজা পেয়েছে বউকে রা*গিয়ে। মিটমিটিয়ে হাসছে। দুজনের চোখাচোখি হতেই দিয়া মুখ ঘুরিয়ে বলে,

– হুহ, আবার আমার দিয়ে তাকায়।
– তো কার দিকে তাকাবো?
– অন্য দিকে তাকান।
– আচ্ছা।
– আবার আচ্ছা?
– অন্য মেয়ের দিকে তাকাবো।
দিয়া ছুটে এসে শার্টের কলার চেপে ধরে বলে,
– খু*ন করে ফেলবো।
– পারবে?
রাগে ফুসছে মেয়েটা। মেয়েকে কোল থেকে নামিয়ে উরুর উপর দিয়াকে বসিয়ে ডান গাল টেনে বলে,
– রোমান্টিক বর ভালো লাগছেনা তাই না?
– হুহ।
– এই হুহ কে শিখিয়েছে? কেমন পেত্নী লাগে দেখতে।
– ভালো হয়েছে।
– না ভালো হয়নি।
দুজনের খুনশুটির মাঝখানে টিনের দরজায় ধাক্কা। দিয়া ভেতর থেকেই জিজ্ঞেস করলো,
– কে?
– আপা আমি বিলকিস।

দিয়া ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিলো। এই মেয়েটা দিয়াদের বাড়িতে আগে কাজ করতো। দিয়া বিলকিসকে দেখেই জড়িয়ে ধরলো। ভেতরে এনে বসালো। বিলকিস হাত বাড়িয়ে এক বাটি খাবার দিয়ে বললো,
– বিহালে হুনছি আপনি আইছেন। তয় সময় পাই নাই আইবার। এইডা আপনার লাইগা আনছি।
শাহাদকে দেখে মেয়েটি সালাম দিলো। অন্যদিকে দিয়া বাটি উলটে দেখে শিমের বিচি দিয়ে কচু পাতার তরকারি। মুরাদের সবচেয়ে পছন্দের খাবার। বিলকিস রাত হয়েছে দেখে চলে গেলো। দিয়া বাটি হাতে দাঁড়িয়ে আছে আগের মতো। টুপটুপ করে চোখের পানি পড়ছে। শাহাদ কাছে এসে জিজ্ঞেস করতেই বললো,
– বাবাজানের প্রিয় ছিলো এই খাবার।
দিলো তো এই বিলকিস এসে সব ঘেটে! যাও একটু স্বাভাবিক হয়েছিলো এখন আবার? শাহাদ মেকি হেসে বললো,
– চমৎকার ব্যাপার। তার মানে বাবাজান এই খাবার পছন্দ করতেন। তিনি নেই তুমি কাঁদছো। আমি তিতা করলা পছন্দ করি। আমি না থাকলে শেহজা কাঁদবে। আমরা বাবারা কত সৌভাগ্যবান দেখেছো। কিন্তু আমার আফসোস তোমার জন্য মনে হয় শেহজা কাঁদবেনা?
বাটিটা টেবিলে রেখে দিয়া ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে নাক ফুলিয়ে বললো,

– কেনো কাঁদবেনা? আমি তো আম্মিজানের জন্য কাঁদি। ও কেনো কাঁদবেনা?
– আম্মি জান তো আর তোমাকে এসব অসুন্দর, বেমজা কদর্য বেল খাওয়ায় নি। তুমি তো খাওয়ালে মেয়েটাকে। অবলা মেয়ে না বুঝে গিলেছে। হুহ।
– খবরদার, নকল করবেন না আমায়। আপনি কেনো হুহ বলছেন?
দিয়া আঙ্গুল তুলে ঝগড়ার তালে হা/রিয়েছে। এদিকে শাহাদের মুখে হাসি। উদ্দেশ্য তার সফল। প্রেয়সীর ঠোঁট নাড়িয়ে ঝগড়া করার ভঙ্গি আজ তাকে মুগ্ধ করেছে। খুশি মনে গাইতে গাইতে কাঠের চেয়ারে বসলো,
– যত তারা জলে রাতে, যত ফুল পৃথিবিতে
তার চেয়ে বেশি. ভালবাসি তোমায়
সাদা মেঘে ভেসে নিলে কত ঢেউ নদীর জলে
তার চেয়ে বেশি ভালোবেসো আমায়।।
থেমে গেলো দিয়া। স্তব্ধ হয়ে বললো,

সায়রে গর্জন পর্ব ৪৫

– কোথায় শিখেছেন এই গান?
লজ্জ্বা পেয়ে শাহাদ বললো,
– ভালো হয়নি?
– হ্যাঁ কিন্তু কোথায় শিখেছেন?
মাথা চুলকে বলে,
– লিমন সারাক্ষন এই গান বিড়বিড় করে।
দিয়া অট্টহাসিতে ফে*টে পড়ে। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেয়ে বলে,
– শেষমেষ ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে প্রেমের গান শিখেছেন?
ওর হাসি দেখে শেহজা ও হাসে ছোট্ট হাত মুখে দিয়ে। মা- মেয়ে হেসে কুটি কুটি। এদের হাসতে দেখে শাহাদ ও হেসে দিলো। খামার বাড়ির রাতের আকাশের চাঁদ,তারা, টিনের চাল আজ সাক্ষী হলো বিস্ময়কর, অপরূপ মুহুর্তের।

সায়রে গর্জন পর্ব ৪৭