মন পিঞ্জিরা পর্ব ১৬
শ্যামলী রহমান
আজ শনিবার। দিনটা অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশিই সুন্দর।অলিন্দ নীড়ের গেইটে বাগান বিলাসী ফুলের বাহারী রঙে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। সকাল থেকে আজকের দিনটা কেমন কোমল।রোদ নেই,বৃষ্টিও নেই।একটি শীতল,শুষ্ক দিন।পিয়াস নয়টার দিকে স্কুলে গিয়েছে।মিথি,শার্লিন,রিতি আর রিদিতা মিলে প্ল্যান করেছে আজ পুকুরে গোসল করবে। গ্রামে বেশিরভাগ মানুষ পুকুরে গোসল করে।এই পুকুরেও গোসল করতে আসে। এজন্য মোহনিয়া বেগম পুকুরে নামতে দিতে চায় না মানুষ থাকে বলে। আজ ও রাজি হয়নি।কিন্তু তারা তো পুকুরে নামবেই।মিথি সহ চারজনে বসে ভাবছে কি করবে?মানিক সাহেব থাকলে না হয় বলতো কেউ যেন এখন পুকুরের দিকে না আসে কিন্তু তিনি তো কাজে গেছেন।মিথির মাথায় বুদ্ধি আসলো। রিতিকে জিজ্ঞেস করলো,
“রুহেল ভাই কোথায় রে?
“কিজানি মাঠে গেছে হয়তো।আব্বা বলেছিলো ধানক্ষেতে নাকি পোকা ধরেছে তা দেখে ঔষুধ আনতে।
“ওহ। তাহলে এখন কি করা যায়?তখনই শার্লিন মিথিকে টেনে দূরে দেখালো। প্রহর আসছে এদিকেই।মিথি আগেভাগে বলল আমি কিছু বলতে পারবো না। রিদিতা খুব একটা কথা বলে না তাই সে তো বলবে নাই।প্রহর একটু কাছে আসতেই শার্লিন ডাকলো।
“প্রহর ভাই আমরা একটু পুকুরে গোসল করবো।
প্রহর ভ্রু কুঁচকে তাকালো। সকলে তারই দিকে চেয়ে আছে।
“আমাকে কি করতে হবে?
সবাই কে একটু বলুন উঠতে আর কেউ যেন না নামে।
প্রহরের চোখ মিথির দিকে পড়লো।সে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের সঙ্গে চোখের মেলবন্ধন জলো।প্রহর নিজের চোখ সরিয়ে নিলো।
“ কাজল বিহীন চোখেও তীব্র নেশা থাকে,
যে নেশায় আসক্ত হতে মন কে বাঁধ্য করে।”
আবারো দীর্ঘ শ্বাস ফেলে চোখ বুজলো। অনুভূতিরা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে তার মুখশ্রীতে নজর পড়লেই। ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়?দেখলেই বুকের মাঝে কম্পন সৃষ্টি হয়?
“আসক্তি বড় খারাপ জিনিস।
ধরলে ছাড়া যায় না।হোক সেটা মানুষ কিংবা নেশা।”
নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই পেলো। ভেতরে দুটো সত্তা আছে।এক সত্তা আছে অনুভূতিতে নুয়ে পড়ে,আরেক সত্তা বাস্তবতা তুলে ধরে।
নিজ মনে বলা শব্দ গুলো ঠোঁট থেকে উচ্চারিত হলো না।মনের অন্তরালে রয়ে গেলো।শার্লিন প্রহরের ভাবমূর্তি দেখছে।সে উত্তরের আশায় চেয়ে আছে।প্রহর অপেক্ষায় অবসান ঘটিয়ে উত্তর দিলো।
“ঠিক আছে যা। সময় বিশ মিনিট।
“আরেকটু বেশি হলে ভালো হতো প্রহর ভাই।
প্রহর আবার তাকালো। সেই চাহনি দেখে মিথি চুপ হয়ে গেলো।নিভে গেলো চোখের উচ্ছাস। শার্লিন ওকে টেনি নিয়ে গেলো। প্রহর ও পিছু নিলো।
কয়েকটা ছোট বাচ্চা আর একটা বড় মানুষ গোসল করছিলো। প্রহর তাদের উঠতে বলতেই উঠে গেলো। ওরা চারজনে খুশিতে নেমে পড়লো।
প্রহর যাওয়ার আগে বলে গেলো,
“আমি ওপাশে আছি।কেউ আসবে না তোরা তাড়াতাড়ি উঠবি।
আজ দুপুর হতেই পিয়াস স্কুল থেকে আসলো।
যেখানে তার স্কুল সেই গ্রামের পাটক্ষেতে আজ একটা বাচ্চার লা*স পাওয়া গেছে। গ*লা কেঁটে কে যেন রেখে এসেছে।রাতে বাচ্চা কে নিয়ে বাবা মা ঘুমিয়েছিলো সকালে উঠে দেখে ছেলে নেই। পরে খোঁজাখুঁজি করেও যখন পায়নি। সকাল গড়িয়ে যেতে এক কৃষক দেখতে পেয়ে মানুষ ডাকেছে।বয়স হয়তো চার পাঁচ বছর হবে।পুলিশ এসেছে।চারদিকে হইহোল্লড় উঠে গেছে এই খবরে।অনেকে বলছে সৎ বোন দুটো মিলে মে*রে ফেলেছে।তারা দুজনে বড়। মা নেই বাবা বিয়ে করে আনলে তাকে মা ডাকতো না এবং পছন্দ করতো না।ছেলে সন্তান হওয়ার পর তো আরো চোখের বিষ হয়ে গেছে।
পিয়াসের মুখে এমন ঘটনা শুনে সকলে স্তব্ধ। ওর ফোনে বাচ্চাটার ছবি দেখালো। মিথি পাটক্ষেতে লা*সের ছবি দেখে আতকে উঠলো। মানুষ কিভাবে পারে এতো র্নিদয় হতে?কত সুন্দর ফুঁটফুটে একটা বাচ্চা।
“ কে মেরেছে?ওই সৎ বোন দুটোই?
“জানিনা আম্মা। সবাই সন্দেহ করছে কিন্তু এখনো সঠিকটা জানা যায়নি।সত্যি কখনো চাপা থাকে না একদিন ঠিকই বাহির হবে। তবে মেয়েটাকে দেখে খারাপ লাগছে।প্রাইমারি স্কুলে শিশু শ্রেণীতে এবার ভর্তি হয়েছিলো। মাঝে মধ্যে দেখতাম কি যে মিষ্টি হাঁসি। ওর বাবার সাথে আসতো স্কুলে। বাড়িও স্কুলে পাশে। প্রাইমেরি হাইস্কুল ও এক জায়গায়।
মোহনিয়া বেগম ও আফসোস করছে।
যে এমন করেছে আল্লাহ তাকে কঠিন শাস্তি দিক।
গ্রামের অনেকে ছুটে হেলো সেই বাচ্চাটাকে দেখতে। সুচরিতা বেগম কে পিয়াস ডেকে নিয়ে গেলো খাবার খাবে বলে।মোহনিয়া বেগম মিথিকে বলল,
“আমার সাথে আয় তো।
মিথির মায়ের পিছুপিছু ছুঁটলো।বাড়ির ভেতরে যেতেই মোহনিয়া বেগম তার হাতে একটা বাটি দিলো।লাউ দিয়ে মাংসের তরকারি।
“এগুলো কি করবো আম্মা?
“পিয়াস খেতে গেলো ওকে দিয়ে আয়। সকালে বলে গেছিলো তার জন্য যেন রাখি। লাউ দিয়ে মাংস নাকি তার ভালো লাগে তোর আব্বা শুনে বলেছে যেন দিয়ে আসি।
মিথি বাটি হাতে বাড়ি থেকে বেরোলো। পথে রুহেলের সঙ্গে দেখা হলো। মিথিকে দেখে ওর খোঁচা মারা কথা শুরু হলো।
“কি রে কচ্ছপ হাতে কি?
“তোমারে বলতে হবে?সরো আমি যাই আমার তাড়া আছে।
“বাপরে কি ব্যস্ত কচ্ছপ।সারাদিন তো চলিস ঠেলেঠুলে।এখন আবার তাড়াতাড়ি।
মিথি একহাত কোমরে দিয়ে রেগে তাকালো।বলল,
“আজ অনিমা আসবে শুধু আমাদের বাড়ি যাইয়ো তখন খবর করবো।
রুহেল অনিমার নাম শুনতেই খুশি হলো। খেপানো যাবে না। ভালো ব্যবহার করতে হবে।
“দুঃখীত বোন আমার আর খেপামু না। অনিমা আসলে আম্মার কাছে নিয়ে গিয়ে একটু বলিস তার বউমা নিয়ে এসেছিস।
মিথি মুখ বাঁকালো। যেতে যেতে বলল,
“ হয়।আমি এমন বলি আর চাচির ঝাড়ুর বাড়ি তোমার বদলে আমার পিঠে পড়ুক। তোমার ইচ্ছে থাকলে বলো গা। ঝাড়ুর বারি খাবে অনিমা দেখবে কি মজা হবে।
শেষ কথাটা বলতে গিয়ে মিথি মুখ চেপে হাঁসলো।
রুহেল মাথা চুলকাতে চুলকাতে চেলে গেলো আর বলল,
“সালার জীবনটা ঝাড়ুর বারিময়।
ছোট বড় সবগুলো অপমান করে, এক পয়সা দাম দেয় না। প্রেমিকা কিংবা বউ দূর কপালে ঝাড়ুর বারি ছাড়া কিছু জুটবে না।
পিয়াস সবে খেতে বসেছে। সকলের দুপুরের খাওয়া শেষ। এখন বাজে প্রায় তিনটে। টেবিল ফাঁকা শুধু পিয়াস আর সুচরিতা বেগম খাবার বেড়ে দিচ্ছে। তখন মিথি আসলো হাতের বাটিটা পিয়াসের সামনে রাখলো।
“আম্মা আপনার জন্য পাঠালো।আপনি নাকি পছন্দ করেন। নেন খেয়ে বলেন কেমন হয়েছে আম্মার রান্না।
পিয়াস বাটি থেকে তরকারি ঢেলে নিলো।বলল,
“তুই রান্না করলে বলতাম কেমন হয়েছে। চাচি আম্মার রান্না বরাবরের মতোই মজাদার হবে।
“আমি তো তেমন রান্না পারিনা। টুকটাক পারি আব্বা ছাড়া কেউই প্রশংসা করে না।
পিয়াস হাঁসলো।সুচরিতা মিথির কথা শুনে বলল,
“সমস্যা নেই আমি শিখিয়ে দিবো।
মিথি সে কথা স্বাভাবিক ভাবে নিলো। শেখাবে এ আর এমন কি?সুচরিতা বেগম অন্য কাজে চলে গেলো। রয়ে গেলো মিথি আর পিয়াস। সে খাওয়ার মাঝে মিথির দিকে তাকাচ্ছে আর ভাবছে কিছু।
এই টেবিলে তারই পাশে নিজের হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে সে।নিজ হাতে ভাত বেড়ে দিবে,তার পছন্দ অপছন্দের খোঁজ রাখবে। এসব ভাবতেই ঠোঁটের কোনো হাঁসির রেখা ফুটে উঠলো।
দুইতলা থেকে এতক্ষণ ধরে প্রহর সবকিছু দেখলো,শুনলো। তার দৃষ্টি এখনো নিচেই।চেহারা দেখে বুঝা মুসকিল তার মধ্যে কি চলছে।
পাশ থেকে পাভেল আসিফ কে ফিসফিস করে বলছে,
“জ্বলছে নাকি স্বাভাবিক?
“পুড়ছে কিন্তু দেখাচ্ছে না।
“এই প্রহর কিছু পুড়ছে নাকি?
আসিফের কথায় প্রহর তার দিকে তাকালো।
তার ঠোঁটের ঠাড্ডা হাঁসি স্পষ্ট। বুঝতে সনয় নিলো না কেন এমন বলছে।
“কোথাই কি পুড়ছে?
ওরা তিনজনে পিছনে ঘুরলো। নবনী দাঁড়িয়ে আছে। সে প্রশ্ন করেছে। আসিফ পড়লো দ্বিধায় এখন কি বলবে?
“পুড়ছে মানে এই যে ফোনে নিউজ দেখছি একজায়গায় আগুন লেগেছে।
পাভেল ফোন সামনে ধরে দেখিয়ে উত্তর দিলো।
নবীন ভ্রু কুঁচকে চোখ ছোট করে তাকালো। আসিফ পাভেল কে ইশারায় কি যেন বলছে পাভেল বুঝতে পারছে না।
“বাটন ফোনেও নিউজ দেখা যায়?
নবনীর উত্তর শুনে পাভেল হাতের দিকে তাকালো। এই রে ভুল করে বাটন ফোন বাহির করেছে।আসিফ কে বাঁচাতে গিয়ে ঝামেলা বাড়ালাম।
আসিফ হাঁসছে ঠোঁট চেপে।পাভেল ও হাঁসার চেষ্টা করছে। নবনী তাদের দিকে সন্দেহ ভাজন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
“কারো মন পুড়ছে এটাই বলেছে।আর কিছু শুনবি?
প্রহরের এমন উত্তর পাভেল আসিফ আশা করেনি। নবনী মাথা নাড়ালো। অরুনা ঘর থেকে বেরিয়ে প্রহরের সাথে কথা বলতে দেখেই বলল
“ওখানে কি?ঘরে আয় তাড়াতাড়ি।
নবনী চলে গেলো। প্রহর ওদের দুজনের দিকে কড়া নজরে তাকালো।
আসিফ হিহি করে হেঁসে উঠলো। বলল,
“দোস্ত সকালে যে দেখে আসলাম গ্রামের পাশে মাঠের ওখানে বড় পুকুটায় নৌকা আছে ওটায় চড়বো।শাপলা ফুল আছে দেখলাম তুলবো।
প্রহর কিছু একটা ভেবে রাজি হলো। শার্লিন কে ডাকলো।
শার্লিন ডাক শুনে ছুটে বসলো। পাভেল আর আসিফ কে দেখে প্রহরের সামনে ভদ্র ভূমিকা পালন করলো।
“ধিঙ্গী রানীকে বল নৌকায় চড়বে কিনা। একটু পর যানো রিদিতা, রিতিকেও সাথে নিতে পারিস।
শার্লিন ঠিক আছে বলেই ছুটলো। মিথি নিচেই ছিলো। শাহানার সাথে কি যেন হল্প করছিলো।পিয়াস খাচ্ছেই। শার্লিন গিয়ে বলতেই মিথি রাজি হলো। ওই পুকুরে শাপলা আছে আগে কত যেত শাপলা তুলে আনতো। কিন্তু এখন মোহনিয়া বেগম যেতে দেয় না। সকলে বলে ওখানে ভূত পেতের বাস।জোয়ান মাইয়া যাওয়া ঠিক না এমন অনেক কথা। অথচ কত মানুষ সেখানে যায় মাছ চাষ হয়, আশে পাশে ধানক্ষেত ও আছে।
পিয়াস ও শুনলো।
“আমিও যাবো একটু অপেক্ষা কর আসছি।
পিয়াসের খাওয়া শেষ উঠে পড়লো। হাত ধুয়ে উপরে নিজের ঘরের দিকে যেতে লাগলো। সিঁড়ির ওখানে প্রহর ও দুজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,
“আমি গেলে সমস্যা?
“না ভাই তুমি আসো।
মন পিঞ্জিরা পর্ব ১৫
প্রহরের জবাবে সে হাঁসলো। হুট করে প্রহর কে জড়িয়ে ধরলো।প্রহর নিজেও জড়িয়ে নিলো।হঠাৎ জড়িয়ে ধরায় প্রহর চমকালেও আবার স্বাভাবিক হলো। আগে কত একসাথে গ্রাম ঘুরেছে, পুকুরে দৌঁড় ঝাপ করেছে।বড় হয়ে জীবনটা কেমন বিষাদে পরিনত হলো।পিয়াস একজন বড় ভাই, বন্ধু দুটোই।তার মতো মানুষ ও কম হয়।মানুষটাকে দেখলেই প্রহরের নিজের ভালোর কথা ভুলে যায়।
“থাক না কিছু অনুভূতি আড়ালে,তার পরিবর্তে যদি সবার মুখে হাঁসি ফুটে তবে ক্ষতি কি?”
