Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৩

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৩

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৩
ইনান হাওলাদার

রাতের আকাশ যেন মখমলের মতো ছড়িয়ে আছে, তাতে জ্বলজ্বল করছে অসংখ্য তারা। দূরে পাহাড়ের কালো ছায়া নেমে এসেছে, চারপাশে নীরবতা, শুধু হালকা হাওয়ার শব্দ আর কখনো সখনো কোনো গাড়ির হর্ন ভেসে আসছে। মৃদু শীতল পরশ নিয়ে হাওয়া বইছে।
তূর্য আর নাবিল ব্যতীত বাকিরা হোটেলের ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। ছাদের এক কোণে রাখা ছোট ছোট আলো চারপাশে নরম আভা ছড়াচ্ছে, আর সেই আলোয় তাদের মুখে ফুটে উঠছে হাসি-ঠাট্টার ঝলক। কোত্থেকে নাবিল ছুটে এসে সাবধানতার সহিত বলল,

” এই তূর্য কই? ”
” রুমে মে বি ”
” বা’ড়া, বা’ড়া, বা’ড়া, বা’ড়া, বা’ড়া, বা’ড়া, বা’ড়া, বা’ড়া, বা’ড়া।
বা’ড়াডার জন্য এতক্ষণ বা’ড়া না কইতে পাইরা মনে হইতাছিল দম ব’ন্ধ হইয়া মই’রা যাইবো বা’ড়া।”
“হোয়ায় ডিড ইউ স্টপ দ্যা ট্রেইন? কয়েকবার কম বলা হয়ে গেলো না?” গম্ভীর কন্ঠস্বর শুনে নাবিল পিছনে ফিরে তাঁকালো।তূর্যকে দেখে একটা হাসি দিয়ে বলল,
” ওয়াশরুম থাইকাই শ’ খানেকবার কইয়া আইছি তো, তাই তোর ধারে কম মনে হইতাছে।”
নাবিলের কথা শুনে সবাই হাসিতে মেতে থাকলেও তাসিন খুব ভালো করে পরখ করলো তূর্যকে।তাকে কেমন যেন দেখাচ্ছে।এলোমেলো চুল,ট্রাউজারটার নিচের দিকের কিছু অংশ পায়ের নিচে গড়াগড়ি খাচ্ছে,টি – শার্টের অবস্থাও বেশি ভালো না।মুখটা তো সবসময় গম্ভীর থাকেই।এখন যেন আরো বেশি গম্ভীর দেখাচ্ছে।বিষয়টা লক্ষ্য করে সে বলল,

” কী হয়েছে ভাই?তোকে এত বি”ধ্বস্থ দেখাচ্ছে কেনো ?”
” নাথিং ” কোনো রকমে মুখ থেকে কথাটা বের করলো তূর্য
” ওকেই ,কিছু না হলেই ভালো। চল আমরা কিছু খেলি। বাট কী খেলব?” সবাইকে তাঁড়া দিয়ে বলল আলিয়া।
পিংকি মন ম’রা হয়ে বলল,
” আমাদের মতো বুইড়া, ধাম’ড়ারা ট্রুথ অর ডেয়ার ছাড়া কিই বা খেলতে পারবো ”
” ওকে চল।সেটাই খেলি ” বলে আলিয়াসহ বাকিরা ছাদের মেঝেতে গোল করে বসে পড়লো।তবে তূর্য তাদের অতিক্রম করে ধীর পায়ে হেঁটে ছাদের রেলিং ঘেষে দাঁড়িয়ে আকাশের পানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।তারপর পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে তার ঈষৎ বাদামি রঙ্গা ঠোঁটে ধরলো।
তাসিন বিষয়টা খেয়াল করে বাকিদের ফিসফিস করে
বলল,

” আমি স্যিউর ওই শা’লার কিছু হয়েছে। দেখ প্রতি’বন্ধী এক পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে “কথাটা বলে শেষ করতেই নাবিল অবাকের চরম পর্যায়ে গিয়ে বলল,
” অয় সিগারেট টানতাছে বা’ ড়া ”
” তূর্য খুব বেশি টেনশনে না থাকলে স্মোকিং করে না “কথাটা বলার সময় খুবই চিন্তিত দেখলো পিংকিকে।
” আমাদের থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে প্রেম টেম করেছে মনে হয়।এখন ছ্যাঁকা খেয়ে ব্যাঁকা হয়ে স্মোকিং করছে।”খুব সাবধানতার সহিত বলল আলিয়া।
“ও করবে প্রেম ? আর লোক পেলি না তুই?চল ওর কাছে ”
পিংকির কথা মতো সবাই তূর্যের কাছে গেল। চারিপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে খুব ভালো করে পরখ করলে লাগলো তাকে।নাবিল মাথা নিচু করে তূর্যের বুক বরাবর করে তার মুখের দিকে তাঁকিয়ে আছে।সেটা দেখে তূর্য ঠোঁ’টের ভাঁজ থেকে সিগারেটটা নামিয়ে দাঁতে দাঁত পি’ষে বলল,

” হোয়াট হ্যাপেন্ড ,ইডিয়েট? জীবনে দেখিসনি আমাকে ?”
” তুই সিগারেট খাচ্ছিস?”
“তো?জীবনে খাসনি? নাকি কাউকে খেতে দেখিসনি?”
” কী হয়েছে ভাই? খুলে বল প্লীজ ” কথাটা বলে তূর্যের কাঁধে হাত রাখলো তাসিন।
” কত বার বলবো ?কিচ্ছু হয়নি! ওকে, ফাইন।তোদের সাথে জয়েন করলে তো মেনে নিবি?”
বলে তূর্য হাতের সিগারেটটা ফেলে দিলো।পায়ের নিচে পিষে আগুনটা নিভিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হলো।বন্ধু মহলকে ভালো করে চেনা আছে তার।যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের সাথে জয়েন করবে ততক্ষণ ছাড়বে না।অ’গত্যা এদের সাথে ত’র্কা’ত’র্কি করে কোনো ফায়দা নেয়।অযথা সময় ন’ষ্ট বৈকি আর কিছু নাহ।

আহি মোবাইল দেখে নতুন একটা হ্যান্ড ক্রাফট শিখেছে।টি – শার্টে রঙের আঁকিবুঁকি।বাবাকে বলে রঙের ব্যবস্থাও করেছে ।কিন্তু টি – শার্টের ব্যবস্থা কিছুতেই হচ্ছে না।তার বাবা চাচারা তো টি – শার্ট পরেন না।আর শান্ত – প্রান্তও তাদের গেঞ্জি নষ্ট করতে নারাজ।আহি এত করে বলল নষ্ট হবে না তাও দিল না।আকবর চৌধুরী বারবার করে বললেন তার একটা পাঞ্জাবিতে করতে।কিন্তু সে করবে না।মোবাইলে দেখেছে টি – শার্টে করতে।তাই সেও টি – শার্টেই করবে।একটু চিন্তা ভাবনা করে পারভিন বেগমের রুমে গেল সে।বড় মাকে কোরআন তেলাওয়াত করতে দেখে সে পাশে গিয়ে বসলো।পারভিন বেগম আহির উপস্থিতি লক্ষ্য করে একটা আয়াতে গিয়ে থামলেন।আলতো হাতে কোরআন শরীফটি বন্ধ করে আহির পানে প্রশ্ন ছুঁড়লেন,

” কী হয়েছে, মা? কিছু বলবি?”
আহি আহ্লাদী কন্ঠে বলল,
” বড় মা,তূর্য ভাইয়ের রুমের চাবিটা একটু দিবেন?”
” কেন? কী করবি ?”
” একটা টি – শার্ট নিবো।”
তূর্য চাবি দেওয়ার সময় পারভিন বেগমকে কড়া করে বলে রেখেছে বাড়িতে ডাকাত পড়লে তাকে চাবি দিয়ে দিতে কিন্তু আহির কাছে যেন মোটেই চাবি দেওয়া না হয়।অবশ্য না করার যথাযথ কারণও রয়েছে।গিয়ে একটা গেঞ্জি নিয়ে ক্ষান্ত হলে তো হতো।আলমারিতে যতগুলো গেঞ্জি আছে সবগুলো লণ্ড – ভন্ড করবে।তারপর সেখান থেকে একটা আনবে।

পারভিন বেগম একটু ভাবনা চিন্তা করে বললেন,
” তূর্যকে কল করে বল।”
“উনি তো নিষেধ করে দিবেন আর ব’কা’ব’কি করবেন।”মন খা’রাপ করে বললো আহি।
” আগে কল করে বলে তো দেখ ”

গভীর রাত।শহরের আলো নিভে গিয়ে আকাশটা যেন বেশিই উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।সেখানে লক্ষ তারার মেলা।
বোতলটা ঘুরে ফিরে সবার দিকে মুখ করে পড়লেও তূর্যের দিকে যেন একটু বেশিই পড়ছে।
কয়েকবার উঠতে চাইলেও পারেনি সে।রীতিমতো ব্ল্যা’কমেইল করে যাচ্ছে তার বন্ধুরা। আসলে লাইফের কোনো সিক্রেট এদের মতো বেত্ত’মিজ বন্ধুদের জানানো উচিত নয়।সেটা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে তূর্য।এইতো এক্ষনি বোতলটা ঘুরে ফিরে তার সামনে মুখ করে পড়ল।অসহ্য! সাথে সাথে আলিয়া চেঁচিয়ে উঠলো,
” ট্রুথ নাকি ডেয়ার।বল,বল ”
” ডেয়ার ”
” আবার ডেয়ার নিলি তুই?একটু আগেরটা ফুলফিল করিসনি ”
” জেনে শুনে এমন ডেয়ার দিস কেনো ? জানিসই তো পসিবল নয়।”
” আচ্ছা তোর নতুন ডেয়ার হলো,একটু আগে যেটা ফুলফিল করতে পারলি না তাকে ডেডিকেট করে একটা গান গা ”

” আই ক্যা’ন্ট! “তাসিনের কথা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই কট’মট করে বলল তূর্য।
“কেনো পারবি না? আগেরবার সেকেন্ড সুযোগ দিয়েছি বলে ভাবিস না এইবারও পাবি। নে গান শুরু কর।”বলে একটা পানির পট এগিয়ে দিলো পিংকি।
” ডিস’গাস্টিং !”তূর্য পানির পট হাতে নিতে নিতে বি’রক্তির সহিত আওড়ালো।
ছোট বেলা থেকেই তূর্যের গানের গলা বেশ ভালো।তবে সচরাচর গাইতে শোনা যায় না।একান্ত নিরিবিলি যখন থাকে তখন মাঝে মাঝে গাইতে শোনা যায়। লোকচক্ষুর আড়ালে!মাঝে মধ্যে বন্ধুদের জোরাজোরিতে গাওয়া হয়।
তূর্য গলাটা একটু ভিজিয়ে চোখ বন্ধ করে গান আরম্ভ করলো।তবে গানের শুরু থেকে নয়,মাঝ থেকে।এই প্রথমবার গিটার ছাড়া গান শুরু করলো সে।গম্ভীর কন্ঠস্বর যেন হঠাৎ পাল্টে গেল।

“ আমি তোমার দ্বিধায় বাঁচি
তোমার দ্বিধায় পুড়ে যাই!
এমন দ্বিধার পৃথিবীতে
তোমায় চেয়েছি পুরোটাই!
আমি তোমার স্বপ্নে বাঁচি
তোমার স্বপ্নে পুড়ে যাই !
এমন সাধের পৃথিবীতে
তোমায় চেয়েছি পুরোটাই !
পুরোটাই……”

গানটা শেষ করে তূর্য আর একমুহুর্ত দেরি করলো না। কেননা এখন এই বদ’মাশের দল কী কী প্রশ্ন করবে সেটা তার ভালো করে জানা আছে।বলা যায় এক প্রকার পালিয়ে গেলো সে।যাওয়ার সময় নাবিলকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে ।আর বলে গেছে ” ফার্স্ট ডেয়ার কমপ্লিট করে আসছি ”
তূর্য যাওয়ার দুই মিনিট পর তার ফোন বেজে উঠলো।বোধ হয় ভুল করে ছাদে ফেলেই চলে গেছে।বারবার বাজছে দেখে আলিয়া ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরলো।সে সালাম দেওয়ার আগেই ওপাশ থেকে রিনরিনিয়ে আওয়াজ আসলো,
” তূর্য ভাই?”
মোবাইলের স্ক্রিনে ইংরেজি বড় অক্ষরের লেখা AMMU দেখে সে ভেবেছিল পারভিন বেগম কল করেছেন ।কিন্তু ভিন্ন কন্ঠ শুনলেও সকলে বুঝতে পারল এটা তূর্যের কাজিন আহি।তাই তাসিন মোবাইলটা আলিয়ার থেকে টেনে নিয়ে বলল,

” তোমার তূর্য ভাই নেয়।”
আহি কথাটা ঠিক করে শুনতে পারলো না।নেটওয়ার্কে সমস্যা মনে হয়।তবে বুঝতে পেরেছে ।তাই বলল,
” তূর্য ভাই কোথায় গিয়েছেন?”
” কোল্ড ড্রিঙ্কস কিনতে ”
নেটওয়ার্কের সমস্যার দরুন সে শুনতে পেলো ” ড্রিংস কিনতে ” কথাটার ভিন্ন অর্থ বুঝে আহির মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো।তাহলে তূর্য ভাই এসব ছায়পাস খাওয়ার জন্য তাকে সঙ্গে নেননি? ডাক্তার হয়েও শরীরের জন্য ক্ষ’তিকর জিনিস খেয়ে বেড়ায়! শুধু শুধু কী আর মে’জাজ সবসময় চাঙ্গে উঠে থাকে!
বাইরে থেকে এসব খেয়ে আসবে আর বাড়ি ফিরে তাকে ব’কা’ব’কি করবে।সে একটু দু’ষ্টুমি করে সেটা ঠিক।তাই বলে এতটাও করে না যে ,ধেয়ে ধেয়ে মারতে আসতে হবে।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১২

” মানে লাল পানি ?” ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্কতায় বলে ফেললো আহি।
ওমনি তাসিন চটপট উত্তর দিলো,
” হ্যাঁ,হ্যাঁ! লাল,হলুদ,সাদা, কালা সব পানি,আপু।”
এসব সম্পর্কে ধারণা নেয় আহির।মনে হয় বিদেশি মা’ল। টাকা তো আর কম নেয়,বিদেশি জিনিস খাবে না তো করবে কী? এসব গিলে টাকা ন’ষ্ট করতে কোনো স’মস্যা নেয়।শুধু সে কিছু কিনে দিতে বললে যত স’মস্যা !
” আচ্ছা,ভাইয়া।তূর্য ভাই এলে কল করতে বলবেন ”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৩ (২)