জাহানারা পর্ব ৩০
জান্নাত মুন
বাইরে থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে।গত এক ঘন্টা ধরে রুমে নিরবতা বিরাজ করছে। আমি এখনো ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছি দেয়াল ঘেঁষে। হাত দুটো পেছনের দেয়ালে, দৃষ্টি মেঝেতে সীমাবদ্ধ।এখনো একবারও আমি ইফানের দিকে তাকায় নি।ইফানও কিছু বলছে না।শুধু শুনতে পারছি তার ঘনঘন শ্বাসপ্রশ্বাসের আওয়াজ যা দেয়ালের সাথে বারি খেয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।মনের কোণে সেই কখন থেকে একটা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে,
–আচ্ছা ইফান কেন কিছু বলছে না?এখনো কি ওর বুক থেকে অর্গল রক্তধারা বইছে?ও কি ঠিক আছে?
নিজের মনের দোয়ারে হানা দেওয়া প্রশ্নগুলোকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিলাম।মনে মনে আবার ভেবে নিলাম, যা খুশি তাই হোক,” আমার কি?আমি কি না করেছিলাম না আমার জীবনে আসতে।তবুও কেন আসলো।এখন তো তার শাস্তি পেতেই হবে।” তবে নিজের মন কে শান্ত রাখতে পারলাম না।বারবার ইচ্ছে হচ্ছে একবার লোকটার দিকে তাকাতে।কিন্তু কেন সাহসে কুলচ্ছে না?আমি ঘনঘন কয়েকবার শ্বাস নিলাম।অতঃপর অস্থির মনটাকে কিছুটা শান্ত করে ধীরে ধীরে ইফানের দিকে তাকালাম।ইফান বেডের সাথে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে আছে।একটা পা সোজা করে আরকটা পায়ে ভর দিয়ে রেখেছে, তার উপর একটা হাত রাখা।আরেক হাত বেডের উপর, মাথা কিছুটা উপর দিকে হেলিয়ে রেখেছে ।আমি ইফানের শরীরের দিকে তাকাতেই বুকের ভিতর মুচড়ে উঠলো।নগ্ন শরীর বর্তমানে তাজা রক্তে রঞ্জিত।কাঠি ব্যান্ডটির দুই ইঞ্চি বুকের ভিতর এখনো গেঁথে আছে।আমার মন বারবার বলে উঠছে,”কেন বুক থেকে ওটা সরাচ্ছ না ইফান, কেন?”
আমি খুব কষ্ট করে একটা শুকনো ঢুক গিললাম।তারপর ওর চোখের দিকে তাকালাম। ইফান সেই তখন থেকে এক ধ্যানে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।আমি তাকাতেই ওর সাথে চোখাচোখি হয়।মূহুর্তের মধ্যে ওর ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। কিন্তু এখনের এই হাসিটা আমার ভীষণ রকম অপরিচিত। আমি প্রথম থেকেই ওর ঠোঁটের কোণে পৈশাচিক হাসি দেখেছি।কিন্তু আজকের হাসিটা ব্যথাতুর কেন মনে হচ্ছে।আর ওর চোখ দু’টো আজ এতটা শীতল কেন?আমি পারলাম না,পারলাম না সেই চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে।আমি অন্যদিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলাম।ইফানকে এমন বিধস্ত অবস্থায় দেখার পর থেকেই দম কেমন যেন বন্ধ হয়ে আসছে।আমি যখন চোখ বন্ধ করে ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছি তখনই অতিপরিচিত পুরুষালীর মাদকীয় হাস্কি স্বর কানে এসে বারি খায়,
❝বুলবুলি__❞
তরাগ গতিতে আমি চোখ মেলে তাকাই।আমি ইফানের দিকে তাকানোর আগেই আবার তার মাদকীয় কন্ঠ কানে আসে,
❝রাগ কমেছে জান।❞
আমি হালকা মাথাটা তুলে ওর চোখের দিকে তাকালাম।এখনো আমার দিকে নিষ্প্রভ ভাবে তাকিয়ে।ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি যা আমার কাছে একদমই নতুন।আমি ধীরে ধীরে ইফানের কাছে গিয়ে বসলাম।ইফান তার হাঁটুর উপর রাখা রক্ত মাখা হাতটা আমার গালে রাখলো।তারপর আমার মুখ তার আরও কাছে এনে হিসহিসিয়ে বললো,
–কষ্ট হচ্ছে?
–হওয়ার কথা ছিলো?
আমি স্বাভাবিক ভাবে প্রতিত্তোর করলাম।ইফান মৃদু হাসলো।তারপর গালে রাখা হাতের এক আঙ্গুল দিয়ে আমার ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো।আমি ইফানের চোখের দিকে তাকিয়ে। ইফান আমার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে থেকেই আবার বললো,
–কথা তো ছিলো না।তাহলে কষ্ট পাচ্ছ কেন?
–কে বললো আমার কষ্ট হচ্ছে?
–তাহলে সত্যিই হচ্ছে না?
–হচ্ছে, ভিষণ কষ্ট হচ্ছে। কারণ এখনো আপনি বেঁচে আছেন।আর আপনি যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন আমার কষ্টের পরিমাণ বিন্দু মাত্রও কমবে না।
আমার কথা শেষ হতে না হতেই ইফান আমাকে তার বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো।তারপর বেডের উপর রাখা হাতটা দিয়ে আমার এলোমেলো হয়ে মুখের উপর পরে থাকা চুলগুলো কানে গুজে দিতে দিতে হাস্কি স্বরে বললো,
–তাহলে এ জীবনে তোমার কষ্ট শেষ হবে না বুলবুলি,,,,
আমি শান্ত চোখে ইফানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।কিছুদিন আগেই এত বড় একটা এক্সিডেন্ট হলো।এখনো মাথায় বেন্ডেজ করা।তার সাথে আমার করে দেওয়া সদ্য ক্ষত।লোকটা কি আসলেই মানুষ? অন্তত আমার মনে হচ্ছে না।
কেটে গেছে আরও কিছুটা সময়। ইফান তার বুকের সাথে আমাকে চেপে ধরে রেখেছে। এদিকে ওর তাজা লাল রক্তে আমার নীল শাড়িও রঞ্জিত।আচমকা আমার চোখ আটকায় ওর বুকে গেঁথে থাকা কাঠি ব্যান্ডটার উপর। আমি হাত বাড়িয়ে সেটাতে স্পর্শ করতেই ইফান আমার হাতটা ধরে কাঠিটার উপর আরেকটু চাপ বাসায়।ফলে কাঠিটা বুকে আরেকটু ডেবে যায়।ইফানের এমন কাজে আমি তৎক্ষনাৎ ঝাড়া মেরে আমার হাতটা ওর বুক থেকে সরিয়ে নিলাম।ও এখনো চোখ বন্ধ করে আছে।এমন মনে হচ্ছে ওর বুকে যে এত গভীর একটা ক্ষত তা সে অনুভই করতে পাচ্ছে না।আমি অবাক হয়ে ওর দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বললাম,
–কাঠিটা বুকের ভিতর গেঁথে আছে একটুও কষ্ট হচ্ছে না?
আমার কথায় ইফান চোখ খুললো। অতঃপর তার মাথাটা হালকা ঝুঁকিয়ে আমার কপালের সাথে তার কপাল মিলিয়ে হিসহিসিয়ে বললো,
–যেখানে আস্ত তুমিটাই গেঁথে আছ সেখানে এটা আর এমন কি!!!
আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে। ইফান ঠোঁট বাকালো।আমি চোখমুখ শক্ত করে উত্তর দিলাম,
–তাহলে আমাকেই উপড়ে ফেলে দিন,,,
ইফান শান্ত নয়নে আমার মুখশ্রীতে নজর বুলিয়ে__আমার ঠোঁটে ঠোঁট ছুইয়ে দিলো।তারপর মাদকীয় কন্ঠে ফিসফিস করে বললো,
–তুমি সেই আত্মঘাতী বিষ,যাকে আমি স্বেচ্ছাই গ্রহণ করেছি।নাও টোটালি তুমি আমার দেহের সর্বত্র মিশে গেছ।তাই চেইলেও আমার থেকে তোমাকে আলাদা করা অসম্ভব।
ইফানের কথা শেষ হতে না হতেই তার বুকে গেঁথে থাকা কাঠিটা টান মেরে বের করে দিলাম।আমার আচমকা পদক্ষেপে ইফান এক মূহুর্তের জন্য থমকে যায়।পর মুহূর্তেই এক নজর নিজের বুকের বাম পাশে দৃষ্টি বুলিয়ে দেখলো রক্তের ধারা। তারপর আমার চোখে চোখ রাখে।আমিও ওর দিকে তাকিয়ে। তখনই ওর চোখের সামনে রক্ত মাখা কাঠিটা ধরলাম।ইফান সেটাতেও এক ঝলক তাকালো।আমি ইফানের মুখের কিছুটা কাছে গিয়ে ঠোঁট বাকিয়ে হিসহিসিয়ে বললাম,
–ঠিক এইভাবেই আলাদা করে দিবো__চাইলেও আটকে রাখতে পারবেন না,,,
সকাল ছয়টা বাজে।র*ক্ত মাখা শরীর নিয়ে লিভিং রুমে বসে আছি।আমার সামনের সোফায় দাদি,কাকিয়া,পলি আর ইতি বসে আছে।গতকাল অতিরিক্ত র*ক্ত ক্ষরনে ইফান জ্ঞান হারিয়ে আমার বুকে ঢেলে পরে।তখনো আমি নিস্প্রভ ভাবে ইফানের দিকে তাকিয়ে।আমি রাগারাগি করে বিকেলে রুমে আসার পর নিচে যায় নি তা দেখে দাদি ইতি কে পাঠায় আমাকে ডেকে আনতে। ইতি দরজার কাছে এসে আমাদের এমন র*ক্ত মাখা অবস্থায় দেখে এক চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারায়।তারপর নিচ থেকে সকলে ছুটে এসে আমাদের এই অবস্থায় দেখে।তৎক্ষনাৎ ইফানকে ইমরান আর মাহিন ধরে হাসপাতালে নিয়ে যায়।নাবিলা চৌধুরী আদরের সন্তানের এমন অবস্থা দেখে আমাকে মারতে আসলে ইকবাল চৌধুরী আর দাদি আটকায়।এরপর থেকে আমার সাথে কেউ কথা বলছে না।
দাদি আল্লাহ মাবুদ বলে এখনো কেঁদে ভাসাচ্ছে।ইতি পলির কাঁধে মাথা রেখে শরীর ছেড়ে দিয়েছে।পলি নিঃশব্দে কাঁদছে।কাকিয়া আচল দিয়ে চোখের জল মুছে সকলকে একবার দেখে নিলো।তারপর নিজেকে আরেকটু সামলানোর চেষ্টা করলো।এখন তিনি ছাড়া কেউ নেই সবাইকে সামলানোর।তিনি পলিকে বললো ইতিকে রুমে দিয়ে আসতে। পলি ইতিকে ধরে রুমে নিয়ে যাচ্ছে। কাকিয়া আমাকে আড় চোখে একবার দেখে দাদিকে ঘরে দিয়ে আসতে গেলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কাকিয়া ফিরে আসেন।আমাকে এমন চুপচাপ দেখে তপ্ত শ্বাস ছাড়লো।তারপর আমার পাশে বসে কাঁধে হাত রাখে।আমি উনার দিকে তাকালাম না।আমার এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে মায়া হলো উনার।তিনি আমার র*ক্তমাখা মুখে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সুন্দর করে কানে গুঁজে দিলো।তারপর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বললো,
–জাহানারা মা এমন পাগলামি কেউ করে রে মা।স্বামী ছাড়া স্ত্রী’র আপন বলতে কে আর আছে। তুমি যে এমন পাগলামি করতেছ ছেলেটার কিছু হয়ে গেলে কি করবে।পারবে নিজেকে ক্ষমা করতে?
আমি নিজের কোলের দিকে তাকিয়ে থেকেই উত্তর দিলাম__পারবো না।ও বেঁচে থাকলে নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবো না।আর ও মরে গেলেও নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবো না।তাই তো ওকে প্রতিনিয়ত এমন যন্ত্রণা দিবো যে মৃত্যুর থেকেও ভয়ংকর।
কাকিয়া একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললো,”সারারাত কিছু খাওনি, এভাবে থাকলে তো অসুস্থ হয়ে যাবে।যাও মনা ভালো করে ফ্রেশ হয়ে আস।”
আমি কাকিয়ার দিকে একবার তাকালাম। তিনি ইশারায় বললেন সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। যাও ফ্রেশ হয়ে আস।আমি আর কিছু নিয়ে ভাবলাম না।সত্যিই আমার ফ্রেশ হওয়া দরকার।কারণ ইকবাল চৌধুরী মাঝরাতে হাসপাতাল থেকে ফোন করে বলেছেন, “আমার মনে হয় আম্মু তোমার একটু স্পেইস দরকার। আমি তোমার পরিবারের সাথে কথা বলেছি।আগামীকাল তোমার ভাই দেখা করতে আসবে।তুমি চাইলে কিছুদিনের জন্য ঐ বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে পার।”
আমি ধীরে ধীরে নিজের রুমের দিকে চলে যায়।কাকিয়া সিঁড়ির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজের কাজে চলে যায়।
বালিশের সাথে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে পঙ্কজ। তার বেন্ডেজ করা এক হাত গলার সাথে স্লিং এ ঝুলে আছে।ভাঙা পা টা বালিশের উপর তোলা।তার পাশেই নোহা টিস্যু বক্স নিয়ে বসে আছে।নোহা নেকামি করে কাঁদতে কাঁদতে পঙ্কজ কে বললো,
–ব্রো ইফান বেইবির কিছু হলে আমার কি হবে,এ্যা এ্যা এ্যা।
পঙ্কজ নোহার কাজে বেশ বিরক্ত। সারারাত চৌধুরী বাড়ির কেউ ঘুমাতে পারে নি।এদিকে নোহা সারারাত মরার মতো ঘুমিয়ে সকালে তার কাছে এসে পেনপেন শুরু করেছে।নোহা সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে প্রথমে আমার কাছে এসেছিলো।আমি তখন ওর এসব আদিখ্যেতা দেখার মতো অবস্থায় ছিলাম না।তাই রাগে ওর পাচায় শরীরের জোরে থাপ্পড় মেরে দিয়েছিলাম।তখন এক ছুটে পঙ্কির রুমে এসে বসেছে।মূলত তার কাঁদার কারণ আমার হাতের থাপ্পড়। পাছা জ্বালা করায় এখন কাঁদছে। পঙ্কজ নোহার ভে ভে করে কাঁদায় বেশ বিরক্ত। সেভাবেই চোয়াল শক্ত করে বললো,
–ঐ শালা মরে গেলে তোর কি রে।ওর বউ আছে এখন তোর দরকার নেই। ভাগ এখান থেকে।
নোহা হাতের টিস্যু টা ফেলে আরেকটা টিস্যু নিয়ে নাক মুচতে মুচতে বললো,
–আমি ইফান বেবির জন্য কাঁদছি না তো।আমি তো কাঁদছি মাহিন বেবির জন্য।ইফান বেবি সুস্থ না হলে মাহিন বেবিও বাড়িতে আসবে না।রাতে কখন যে চলে গেলো দেখতেও পেলাম না।একটু আর্লি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তো তাই ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে।
নোহার কথা শুনে পঙ্কজের বিরক্তি আরও বেড়ে গেলো।তবে তা প্রকাশ করার আগেই নোহা আরেক কাজ করে বসলো।মনের দুঃখে পঙ্কজের প্লাস্টার বাঁধা ভাঙা পা’টাকে কোলবালিশের মতো জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে গান ধরলো,
__সন্ধ্যা বেলায় বেগুন ক্ষেতে করতে গেলাম চুরি
বেগুন ওয়ালাই ওমনি আমার হাতটা নিলো ধরি,,,,,
পঙ্কজ ব্যথায় চিৎকার দিয়ে উঠলো__ওরে মা ছাড় আমাকে ছাড় আমাকে ছাড়।নোহা সেসব কানে নিলো না। মনের দুঃখে আমার সাজেস্ট করা গানটা গাইছে।ইদানীং এটা ওর প্রিয় সেড সং হয়ে দাঁড়িয়েছে।এদিকে রাগে দুঃখে কাঁদতে ইচ্ছে করছে পঙ্কির।তখনই হঠাৎ কি একটা মনে পরে গেল।তৎক্ষনাৎ বললো,
–আমার কাছে একটা ছেলের খোঁজ আছে,,,
নোহার কান অব্ধি পৌঁছাতেই লাফিয়ে দাঁড়ালো।পঙ্কজ পা ছাড়া পেয়ে যেন বাঁচল।এদিকে নোহা হা করে পঙ্কজের দিকে তাকিয়ে আছে জানার জন্য।পঙ্কজ পা ঠিক করে বালিশে রাখতে রাখতে বললো,
–ইফানের ব্রো’র বউয়ের ভাই আজ এই বাড়িতে আসবে,,
পঙ্কজের কথা শেষ হওয়ার আগেই নোহা খুশিতে গদগদ করে করতে করতে বলতে লাগলো,
–ইয়াহু,প্রিটি গার্লের ব্রো মেবি ওর মতোই ইয়াম্মি হবে,হুররে,,,,,,
পলি এসে খবর দিয়ে গেছে রাত থেকে এখন পর্যন্ত তিন ব্যাগ ব্লাড দেওয়া হয়েছে ইফানকে।আমি হা না কিছুই বললাম না।এরপর কাকিয়া এসে আমাকে জোর করে খাইয়ে দিয়ে গেছে।আমি আস্তে ধীরে নিজের লাগেজ গুছাচ্ছি।এগারোটার দিকে ভাইয়া আসার কথা।এখন বাজে দশটা পয়তাল্লিশ। আমি যখন শাড়ি ভাজ করছি তখনই কোথা থেকে নোহা ছুটে আসলো। আমি ব্রু কুচকে ওর দিকে তাকালাম। নোহা এসব পরোয়া করলো না বরং আমার হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। আমি খালি ওর সাহস দেখছি আর লজ্জা তো ওর কোনো কালে ছিলো না।সকালে যে আমার হাতে মার খেলো তবুও আমার সাথেই ডলাডলি করতে এসেছে।মনে মনে এটাও ভেবে নিলাম এতো দেখছি ইফানের থেকে কোনো অংশই কম না।হোক চরিত্রের দিক কিংবা ছেচরামির দিক দিয়ে। আমি যাচ্ছি না দেখে নোহা হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
—প্রিটি গার্ল, প্রিটি গার্ল, তাড়াতাড়ি আমার সাথে এসো।
আমি চোয়াল শক্ত করে__দাঁত কিরমির করে কারণ জিজ্ঞেস করলাম,
–কেন কি হয়েছে?
নোহা তৎক্ষনাৎ উত্তর দিলো,
–আমি নিজের চোখে দেখে এসেছি, রাস্তায় দুটো ডগি বাম ফাইটিং করছে,
–মানে?
আমি নোহার কথার মানে বুঝতে না পেরে চোখ সরু করে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম।আমি ওর কথা বুঝতে পারছি না বিষয়টা বুঝতে পেরে ঝটপট উত্তর দিলো,
–OMG,তুমি বাম ফাইটিং বুঝো না__বাম মানে পু*টকি, ফাইটিং মানে মারামারি,,,
–নোহাআআআআআআ,,,,
নোহাকে বাকি কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বারি কাঁপিয়ে চেচিয়ে উঠলাম।পরিবেশ গরম বুঝতে পরে আবার মার খাওয়ার আগেই চোখের পলকেই নোহা উধাও। আমি কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে, কোমরে দু হাত ধরে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকলাম।আমার মাথা কেমন যেন ঝিম ঝিম করছে।ভেবে পাচ্ছি না এই মেয়ে কি লেভেলের বে*হায়াচু*দা।
চৌধুরী বাড়ির গেইটের সামনে এসে থামলো একটি ব্ল্যাক মার্সিডিজ।গাড়ির ডোর ওপেন করে বেরিয়ে আসলো একজন বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী যুবক।পড়েন সফেদা রংয়ের শার্ট কালো প্যান্ট।শার্ট টি লোকটার দেহের সাথে আষ্টেপৃষ্টে লেগে আছে।এতে স্পর্শ দৃশ্যমান তার জিম করা ফিগার।লোকটার হাতে কালো ফিতার ব্র্যান্ডের ঘড়ি।লোকটা আস্তে আস্তে শার্টের হাতা গুটিয়ে কনুই অব্দি তুললো। দৃষ্টি বিশাল এরিয়া জোরে অবস্থিত চৌধুরী মেনশনে।লোকটা চোখের রৌদ চশমা’টা খুলে উষ্কখুষ্ক চুলগুলো কে আরও এলোমেলো করে দিলো।হঠাৎই নিজের মেইন পয়েন্টে কিছুর নাড়াচাড়া অনুভব হতেই কপাল কুচকালো।অতঃপর আস্তে আস্তে সেদিকে তাকাতেই চোখ কুঠর থেকে বেড়িয়ে আসার উপক্রম।
❝হোয়াট দ্যা হেল❞
আচমকা চিৎকার দিয়ে দূরে সরে গেলো লোকটা।নোহা এখনো তার সামনে বসে থাকা কুকুরের মতো জিহ্বার কিছুটা অংশ বের করে__লোকটার মেইন পয়েন্টের দিকে তাকিয়ে আছে।লোকটার চিৎকার শুনে কুকুর গুলো দৌড়ে সেখান থেকে চলে গেলো।তবুও নোহার হুশ নেই। সে বাচ্চাদের মতো হামাগুড়ি দিয়ে আবার লোকটার পায়ের কাছে এসে থামলো।আবার হাত বাড়িয়ে লোকটার প্যান্টের চেইনে হাত লাগাতেই, লোকটা এক টান মেরে নোহাকে দাঁড় করিয়ে দিলো।এতক্ষণে নোহার হুশ যেন আসলো।সে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে পরপর দুটো ঢুক গিললো।
❝আর ইউ ম্যাড? ❞
লোকটা কপাল কুঁচকে গম্ভীর গলায় নোহার উদ্দেশ্য বাক্য ছাড়লো।
তখন নোহা আমাকে তার সাথে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হয়ে নিজেই একা-একা গেইটের সামনে আসে।সেখানে দু’টো কুকুর মিট করছিলো।নোহা মাটিতে বসে সেটাই মনযোগ দিয়ে দেখছিলো।আচমকা এমন সুদর্শন বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী পুরুষ দেখে জিহ্বে জল চলে আসে।আরকি যা হওয়ার তাই হলো।
এদিকে লোকটা চোখ সরু করে তাকিয়ে আছে নোহার দিকে। লোকটার কথা নোহা কি শুনলো নাকি শুনলো না লোকটা বুঝে উঠতে পারলো না।কারণ নোহার নজর লোকটার পেশিবহুল ফোলা ফোলা বুকে।সে আবার ঠোঁট ভিজিয়ে লোকটার বুকে হাত দিতে নিলে লোকটা এক পা পিছিয়ে নোহার উদ্দেশ্য অশ্রাব্য গালি ছাড়লো,
❝হোয়াট দ্যা ফা*ক, বিচ!❞
নোহা এসবে কান দিলো না। বরং অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
❝হেই হ্যান্ডু, তোমার মন্টুটা এত বড় কিভাবে হলো?❞
লোকটার চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো।তারপর কিছু বলবে তখনই নোহা আরেক কাজ করে বসলো।আবার লোকটার পেন্টের চেইনে হাত দিয়ে দিলো।এবার লোকটা নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে ঠাস করে নোহার গালে চর বসিয়ে দিলো।চরটা এতটা জোরদার ছিলো যে নোহা ছিটকে পাঁচ হাত ধুরে গিয়ে পড়লো।লোকটা পকেট থেকে একটা টিস্যু নিয়ে চর দেওয়া হাতটা ভালো করে মুচতে থাকলো।তক্ষুনি কানে আসে একটি মেয়েলী কন্ঠ স্বর,
❝নোহাপু নোহাপু, তুমি মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছ কেন?❞
মুহূর্তের মধ্যে লোকটার হাত থেমে যায়।লোকটা সেদিকে তাকানোর আগেই ইতি দৌড়ে নোহার কাছে বসে পড়ে।নোহা গালে হাত ধরে নাক টানছে।গাল প্রচুর ব্যাথা করছে। কিন্তু এত সুন্দর পুরুষের সামনে সে কখনো কাঁদবে না এতে তার প্রেস্টিজের থাকবে না। তাই সে কান্না গিলার চেষ্টা করছে।
❝নোহাপু মাটিতে পড়ে আছ কেন?❞
বাসায় নোহাকে না পেয়ে কাকিয়া ইতিকে পাঠায় ওকে খুঁজে আনতে।ইতি যখন এদিকে আসছিল তখনই চোখ পড়ে নোহা মাটিতে উল্টে পড়ে আছে।
ইতির সাহায্যে নোহা দাঁড়াতে দাঁড়াতে নেকামি করে বললো,
–লিটিন গার্ল আমি পড়ে যাই নি তো।উনি ফেলে দিয়েছে নটি বয় হুম।
ইতি নোহার আঙ্গুলের ইশারা অনুযায়ী সেদিকে তাকালো। সাথে সাথে লোকটার সাথে চোখাচোখি হলো।লোকটা তখন থেকে ইতির দিকে তাকিয়ে। সপ্তদশী রমনীকে তৎক্ষনাৎ লজ্জায় ঘিরে ধরলো।ইতি বাইরের মানুষের সামনে খুব একটা যায় না।গেলেও পরিবারের কেউ একজন থাকে।মেয়েটা যেমন ভিতু তেমনই লাজুক স্বভাবের। এমন একজন অপরিচিত লোককে দেখে ইতি আস্তে আস্তে গেইটের ভিতরে প্রবেশ করতে নিলে পিছনে গম্ভীর পুরুষালী কন্ঠ কানে আসে,
❝স্কিউজ মি মিস,জাহানারা কে একবার ডেকে দেওয়া যাবে?❞
ইতির পা থেমে গেলো। সে হালকা ঘার ঘুরিয়ে লোকটার দিকে পিটপিট করে তাকালো।লোকটা গম্ভীর ভাবেই উত্তর দিলো,
–আ’ম মিস্টার জিতু।জাহানারা শেখ জারা’র বড় ভাই।
মুহূর্তেই ইতির চোখ বড়বড় হয়ে গেলো।সে গলার স্বর নিচু করে মিনমিনিয়ে উত্তর দিলো,
–জি বড় ভাবি বাসায় আছে,ভেতরে আসেন।
লোকটা পেন্টের পকেটে দু হাত ঢুকিয়ে উত্তর দিলো,
–নো থ্যাংকস।আপনি জাস্ট ওকে গিয়ে বলেন তার বড় ভাই এসেছে।
ইতি মাথা নাড়িয়ে আস্তে আস্তে কিছুটা হেঁটে তারপর দৌড়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।লোকটা তখনও সে দিকে তাকিয়ে আছে।এদিকে লোকটার ভয়ে নোহা গেইটের আড়াল থেকে দেখছে।আচমকা লোকটার চোখ পড়ে তার দিকে।তখনই দাঁত বের করে হেসে দেয় নোহা।লোকটা বিরক্তিতে বিরবির করে,
❝ ডিজগাস্টিং ওমেন।❞
আমার লাগেজ গোছানো শেষ করে লাল রঙের একটা শাড়ি পড়ে চুল গুলো খোপা করে নিলাম।আমি যখন আয়নাতে নিজেকে দেখতে ব্যাস্ত তখনই ইতি দৌড়ে আমার রুমে ঢুকলো।আমি ইতি কে কিছু বলার আগেই সে বলতে লাগলো,
–ও ভাবি ভাবি গো তোমার বড় ভাই আসছে।গেইটের সামনে দাড়িয়ে আছে। আমাকে বললো তোমাকে খবর দিতে।
ইতি র কথা শুনে আমার ঠোঁটে হাসি ফোটে উঠেছে।আমি ইতিকে বললাম,
–ভাইয়াকে বলোনি ভেতরে আসতে,এখনো বাইরে দাঁড়িয়ে আছে?
–বলেছি ভেতরে আসতে।কিন্তু উনি বললো আসবে না।তুমি গিয়ে দেখা করতে।
মুহূর্তেই ঠোঁটের কোণে উঁকি দেওয়া হাসিটা নিভে গেল।আমি জানতাম এমনটাই হবে।ইফান চৌধুরীর মতো এমন নিচু মানুষ যেখানে থাকবে সেখানে কোনো ভদ্রলোক আসবে না।তাই তো এই প্রথম বোনের শ্বশুর বাড়িতে এসেও ভেতরে আসলো না।আমি একটা ঢুক গিলে ইতিকে বললাম,
–হুম যাচ্ছি।
আমি শাড়ির কুচি ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে এক একটা সিঁড়ি ডিঙ্গাতে লাগলাম।পলি সোফায় নতুন কভার লাগাচ্ছে, লতা ফ্লোর মুছতেছে,কাকিয়া রান্নাঘরে।আমাকে এমন দৌড়াতে দেখে সকলেই তাকিয়ে রইলো।কাকিয়া চেচিয়ে বলতেছে,
–আরে বউমা কি করছ,এভাবে দৌড়ঝাপ করো না পরে ব্যথা পাবে,,,,,
কাকিয়া পিছন থেকে আরও অনেক কিছু বলছে আমি কোনো কিছু কানি তুলি নি তার আগেই সদর দরজা ক্রস করে বাইরে চলে এসেছি।দৌড়ে গেইটের সামনে আসতেই চোখে পড়ে আমার একমাত্র বড় ভাই আরমান শেখ জিতু’কে।ভাইয়া গাড়িতে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে।এক হাত পকেটে আরেক হাত চোখের সামনে ধরে ঘড়িতে টাইম দেখছে।আমি আনন্দে চিৎকার দিয়ে ডেকে উঠলাম,
❝ভাইয়াআআআআআ❞
এতদিন পর আমার কন্ঠ শুনে ভাইয়া থমকে গেল।তৎক্ষনাৎ চোখের সানগ্লাসটা গাড়ির উপর রেখে আমার দিকে তাকালো।আমি হেসে দিলাম। আমার আনন্দিত চেহারা দেখে ভাইয়াও হেসে দিলো।তারপর দু’হাত মেলে ধরল।আমি আর এক মূহুর্ত দাঁড়ালাম না। এক ছুটে ভাইয়ার বুকে ঝাপিয়ে পড়লাম।ভাইয়া আমাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।তারপর মাথায় একটা স্নেহের চুমু একে দিলো।
–কেমন আছিস সোনা বনু?
মূহুর্তেই বাস্তবতা ঘিরে ধরলো।তবে নিজের কষ্ট কিছুটা লুকিয়ে মৃদু হেসে উত্তর দিলাম,
–আলহামদুলিল্লাহ ভালো।তুমি কেমন আছ আর বাড়ির সবাই কেমন আছে?
ভাইয়া মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে উত্তর করলো,
–বাড়ির প্রাণ ছাড়া যে ভাবে থাকা যায় সেরকম আছে সবাই।
ভাইয়ার কথায় মনটা আরও বিষিয়ে উঠলো।তবে মন খারাপ করে থাকতে পারলাম না। ভাইয়া আজ আমাকে নিতে এসেছে এতেই আমি খুশি।বাড়ির গেইটের সামনেই বেশ কিছু সময় কথা বলি।পড়ে ভাইয়া বললো লাগেজ নিয়ে আসতে।আমি হ্যা জানিয়ে গেইটের দিকে এগোতেই পেছন থেকে একজন পুরুষের কন্ঠ কানে আসে,
–আপনি আজ যেতে পারবেন না ভাবি।
আমি পিছনে তাকাতেই দেখি ইফানের পিএ ইনান খন্দকার দাঁড়িয়ে। আমি তাকাতেই হেসে বললো,
–ভাবি ভাইয়ের জ্ঞান ফিরে এসেছে। আর আমাকে পাঠিয়েছে আপনাকে দেখে রাখতে।
–জাহানের ভাই থাকতে অন্যকারো দেখে রাখার প্রশ্ন আসলো কোথা থেকে,,,
ভাইয়ার কথা শুনে সেদিকে তাকালো ইনান।জিতু ভাইকে সালাম দিয়ে বললো,
–সেটা জানি ভাইয়া। তবে ভাই স্পষ্ট বলে দিয়েছে ভাবি যাতে বাড়ির চৌকাঠ না মাড়ায়।
–ও এখনো বেঁচে আছে?
আমি ব্যাঙ্গার্থক ভাবে কথাটা বলি।ইনান সাথে সাথে উত্তর দিলো,
–আস্তাগফিরুল্লা। ভাবি এসব কি বলছেন?
পরপরই আমার সাথে ইনানের কথার পাছে কথা শুরু হয়।এক পর্যায়ে আমি চেচামেচি শুরু করি।তখনই ভাইয়া আমাকে থামিয়ে দিলো,
–স্টপ দ্যা ননসেন্স।বনু ভেতরে যাও,তোমার হাসবেন্ড বাসায় আসার পর নিজের বাড়ি যাওয়া নিয়ে কথা বলবে।যদি রাজি হয় আমাকে জাস্ট একটা কল করবে।তোমার ভাইয়া তৎক্ষনাৎ হাজির হবে।
ভাইয়ার সিদ্ধান্ত টা আমার একটুও পছন্দ হয় নি।তাই নাকচ করে কিছু বলবো তখনই ভাইয়া ইশারা দিলেন ভেতরে যাওয়ার জন্য। আর কোনো কথা না বাড়াতে। আমি চোখ বন্ধ করে একটা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বললাম,
–তুমি ভেতরে যাবে না?
–না,,,
ভাইয়ার কাটকাট কথা।তখুনি ইনান হেসে বলে,
–ইয়ে জিতু ভাইয়া, ভাই বলে দিয়েছে আপনার ভালো করে যত্ন নিতে।
ইনানের কথা পাত্তা দিলো না ভাইয়া।বরং শেষ বার আমাকে ইশারা করলো ভেতরে যেতে। আমি কোনো কিছু আর বললাম না।সোজা ভেতরে চলে গেলাম।এদিকে ভাইয়াও কোনো শব্দ ব্যায় না করে সেখান থেকে প্রস্থান করে।
ঘড়ির কাটা দশটার ঘরে।লিভিং রুমে হইচই শুরু হয়েছে।নিশ্চয়ই হসপিটাল থেকে ইফান কে নিয়ে আসা হয়েছে।আমি শুনেও না শুনার মতো ভাব নিয়ে ঘরে বসে রইলাম।সারারাত অঘুমে থাকায় চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। তাই ভাবলাম ওয়াশরুম থেকে পড়নের প্যাড টা চেঞ্জ করে আসি।তাহলে সারারাত নিশ্চিন্তে কাটাতে পারবো।যেই ভাবা সেই কাজ, চলে গেলাম ওয়াশরুমে।
ইফান দু মিনিট লিভিং রুমে বসে রেস্ট নিলো।যদিও নিচে এক সেকেন্ড বসার ইন্টারেস্টও ছিলো না।তবে মহিলাদের ঘ্যান ঘ্যান শুনার জন্য বাধ্য হয়ে বসতে হলো।দাদি বিলাপ জুড়েছে শেষ হওয়ার নামই নেই। ইফান আসছে থেকেই নজর দোতলার দিকে।সে আর মহিলাদের কেচাল শুনতে চাইলো না।তাই কোনো কথাবার্তা ছাড়াই উঠে যাওয়া ধরলো।ওর এমন আরচণে সকলেই পরিচিত তাই অবাক হলো না।
ইফান দরজা ঠেলে ঢুকতেই দেখলো পুরো রুম ফাঁকা। ইফান আমাকে রুমে দেখতে না পেয়ে বিরক্তিতে কপালে আঙ্গুল ঘষলো।তক্ষুনি তার কানে আসে ট্যাপ থেকে পানি পড়ার আওয়াজ। তার বুঝতে বাকি রইলো না তার ঝাঁঝওয়ালি ওয়াশরুমে।মূহুর্তের মধ্যে তার ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা হাসিটা ফুটে উঠলো। অতঃপর জিহ্বার ডগা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে শার্টের বোতামে হাত চালালো।সকল বোতাম খুলতেই গা থেকে টেনে শার্ট টা অবহেলায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঘারে হাত বুলাতে বুলাতে ওয়াশরুমের দিকে এগোলো।
এদিকে ইফানের ছুড়ে ফেলে দেওয়া শার্ট টা সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে দোল খাচ্ছে।
আমি ইউজ করা প্যাডটি ফেলে নিজেকে ক্লিন করে নিলাম।মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলাম।উফফ কি যে ফুরফুরে লাগছে এখন।না আর সময় নষ্ট করলে চলবে না।রুমে গিয়ে আরেকটি নতুন প্যাড পড়তে হবে।আমি পিছনে ফিরতেই কিছু একটার সাথে ধাক্কা খায়।আমি বিরক্তি তে উচ্চারণ করলাম,
❝উফফ❞
তৎক্ষনাৎ নাকে আসে অতি পরিচিত ক্লোনের গন্ধ।মূহুর্তেই মস্তিষ্ক জানান দিলো এটা কার উপস্থিতি হতে পারে।তার উপস্থিতি ভেবেই বুকের ভিতর তোলপাড় শুরু হয়েছে।মনকে শান্ত করে আস্তে আস্তে চোখ তুলবো তখনই কানের কাছে আগুন্তকঃ জানান দেই এটা আসলেই সে।
❝বুলবুলি❞
বুকের ভিতর ধকধক করছে।কারণ আমি খুব ভালো করে জানি আজ ইফান আমাকে ছাড়বে না। তবুও নিজেকে শান্ত করে তার দিকে তাকালাম।দু’জনের চোখাচোখি হতেই ইফান মাদকীয় পুরুষালী কন্ঠে বলে উঠলো,
❝উফফ কি চাউনি মাইরি,দেখেই ছোট ভাই কেঁপে উঠলো।❞
ইফানের কথা শুনে মূহুর্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো।আমি বাড়তি কথা না বাড়িয়ে সাইড কেটে সরে পড়তে নিলেই ইফান হাতে টান মেরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে।আমি দাঁতে দাঁত চেপে ঝাঁঝালো কন্ঠে চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম,
–লজ্জা করে না তোর,একটুও লজ্জা করে না,,,,
মুখের কথা কেড়ে নিলো লোকটা।আমার বাক্য সম্পূর্ণ করার আগেই বলে উঠলো,
–তোমারও তো করে না, সারারাত লেং*টু হয়ে আমার সাথে শুতে,,,
–ইফাআআআন,,
আমি চেচিয়ে উঠলাম এসবে ধার ধারলো না লোকটা।বরং চুক চুক চুক শব্দ করে হেয়ালি করে বললো,
–এভাবে চেচিও না ঝাঁঝওয়ালি,অন্য কোথাও লাগে।
রাগে শরীরে আগুন জ্বলছে। আমি ঘনঘন শ্বাস নিলাম।তখনই অনুভব করলাম এই মূহুর্তে প্যাড পরা অত্যন্ত জরুরি। আমি নিজেকে শান্ত করে মৃদু স্বরে বললাম,
–আমাকে যেতে দাও,,,
–কোথায়?
ইতোমধ্যে ইফান আমার গলায় মুখ ডুবিয়ে দিয়েছে।সেভাবেই উত্তর করলো।আমি চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললাম,
–আমাকে ছাড় রুমে যেতে হবে,,
–আমার তো এখানেই করতে ইচ্ছে করছে।
আমি ঝটপট চোখ খোললাম। এই লোক এসব কি বলছে।আজ তিন ব্যাগ রক্ত ভরে এসেছে।মাথায় ব্যান্ডেজ, বুকের বাম পাশে বেন্ডেজ তাহলে এসব কি বলে।আমি অবাক নয়নে ইফানের দিকে তাকিয়ে। ইফান গলার সবটা জুড়ে শব্দ করে চুমু এঁকে দিতে দিতে ঠোঁটের কাছে এসে থামলো।তারপর আমার অবাক হওয়া চাউনি দেখে ঠোঁট বাকালো।ইফান আমার কারনে কাছে হিসহিসিয়ে বললো,
–কি হলো বুলবুলি, এভাবে ফিল আসছে না।শুইয়ে ফিল নিতে চাইছ,,,
আমি সত্যি বাক হারা হয়ে পড়েছি।এ কি আসলে মানুষ।আমি অবাক হয়ে বললাম,
–আপনার মাথা ঠিক আছে।সবে হাসপাতাল থেকে ট্রিটমেন্ট নিয়ে আসলেন।আর এখনই এসব কথা__
বাকি কথা বলার আগেই আমার ঠোঁটে আঙ্গুল ধরে থামিয়ে দিলো।তারপর গালে আচমকা একটা কামড় বসিয়ে হাস্কি টোনে বললো,
–প্লেয়াররা খেলার জন্য অলওয়েজ রেডি থাকে বলবুলি।
–শু শুনুন আপনার শরীর ঠিক নেই,,,
আবার থামিয়ে দিলো।তারপর কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বললো,
–ডোন্ট ওরি, আই উইল ম্যানেজ।ট্রাস্ট মি বেইব গোল একটাও আউট হবে না__
কথা বলতে বলতেই ও আমার শাড়ির কুচিতে হাত দিয়ে দিয়েছে।আমি ভালো করেই বুঝতে পারছি আজ ও আমাকে ছাড়বে না।তাই শেষ চেষ্টা করে বললাম,
❝দে দেখ ইফান আমার পি*রিয়ড চলছে। ❞
আমার কথা শেষ হতে না হতেই বাথটবে ছুঁড়ে ফেলে দিলো।অতঃপর আমার উপর ঝুঁকে প্যান্টে হাত চালাতে চালাতে হিসহিসিয়ে বললো,
❝সো হোয়াট? আই হেভ নো প্রবলেম।❞
ব্যস, এটুকু বলেই ঝাপিয়ে পড়লো আমার উপর।ইফানের অধিক উত্তেজনার ফলে বুকের বেন্ডেজ করা অংশ আবার রক্তে ভিজে উঠেছে।ওর স্পর্শগুলো বেসামাল রুপ ধারণ করেছে।আমার কাছে এই মূহুর্তে ওকে জানো*য়ারের চেয়েও আধম মনে হচ্ছে।সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে নিঃশ্বাসের শব্দ আরও বাড়তে থাকে।শুধু ওয়াশরুমের চার দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আমাদের শ্বাস প্রশ্বাসের বেসামাল আওয়াজ।
জাহানারা পর্ব ২৯
ঘড়ির কাটা ঘুরতে ঘুরতে রাত সারে তিনটায় এসে থেমেছে।আমার উপর ইফান নিজের পুরুষত্ব ফলিয়ে এখন ঠোঁটে সিগারেট জ্বালিয়ে বেলকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে।শরীরে তেমন কিছু নেই, নিচের অংশে সাদা টাওয়াল জড়ানো।ইফান সিগারেটে টান দিয়ে মুখ ভরে ধোঁয়ার কুন্ডলী ছাড়লো।তক্ষুনি হাতের ফোনটা বেজে উঠলো।এতক্ষণ হয়তো এই ফোন কলের অপেক্ষায় ছিলো।ইফান ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরলো।তারপর গম্ভীর গলায় শীতল কন্ঠে বললো,
❝খবর নিয়েছিস কোন বাই*নচু*দ আমার কলিজার বুলবুলিকে হার্ট করেছে?❞
