প্রেমের বাজিমাত পর্ব ১৪
রোজ ও রুশা
কে বা কারা তা বুঝার আগে, মুখে স্প্রে করে দেয়, তখন ভয়ে হেরা নাভানকে জড়িয়ে ধরেছিলো। ওই জড়িয়ে ধরা অবস্থায় দুজনে পড়ে আছে অবহেলায়, গাড়ির ব্যাগ সিটে। দুজন যদি এখন সজ্ঞানে থাকতো তাহলে কুরুক্ষেত্র বানিয়ে ফেলতো। দুজন দুজনকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরায়, তাদের মধ্যে বিন্দু পরিমাণ ফাঁকা নেই। গাড়িতে বসে বলটু নামের ছেলেটা একজনকে ফোন দেয়!
“স্যার কাম হইয়া গেছে, কইছি না ঢাকার কিং না কোবরা আমি বলটুর কাছে সব হারবো।
ফোনের ওপাশের লোকটা বাহবা দিয়ে ফোন কেটে দেয়। গাড়ি চলতে থাকে আপন গতিতে। এদিকে সময় তার নিজ গতিতে চলছে। ঘড়ির কাঁটা বিকেল ছেড়ে সন্ধ্যা হতে চলছে। শহরের বুক চিরে গাড়ি অদূর গ্রামে চিকন সরু পথ দিয়ে ঢুকছে। মাটির এবড়ো থেবড়ো রাস্তার কারণে ঝাঁকি লেগে নাভানের চোখ খুলে যায়। প্রায় ৫/৬ ঘণ্টা পর বুকে ভারি কিছুর অনুভব হতেই ভালো করে তাকায়, কিন্তু চোখের সামনে কালো নিখুঁত অন্ধকার ছাড়া আর কিছু দেখতে পায় না। এক হাতে কারো পেট জড়িয়ে ধরে রেখেছে সে শক্ত করে, তা বুঝতে পারছে। মাথা খাটাতে মনে পড়ে তাদের কিডন্যাপ করা হয়েছে, আর হেরা তার সাথে রয়েছে।
তাদের হাত তো এখনো জোড়া লাগানো। এবার কি করবে? ফোনটাও তখন পড়ে গিয়েছে ওই হাসপাতালের সামনে, যখন কিডন্যাপাররা তাদের তুলে এনেছে। মনে মনে নিজেই বকতে থাকে। কে বা কারা এই কাজ করেছে তা বুঝতে পারছে না। তার এমন শত্রু হয় নি যে তাকে তুলে আনবে। হ্যাঁ, তার মায়ের সূত্র ধরে হয়তো এনেছে। এখন কিভাবে কি করবে? হাত আটকানো আবার হেরাও সাথে আছে। একা থাকলে একেকটাকে জীবন্ত পুঁতে ফেলতো বা বুড়িগঙ্গা নদীতে কেটে ভাসিয়ে দিতো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। হেরাকে নিজের থেকে সরাতে চাইলে নরম কিছুতে হাত লাগে। এই রে ভুলে কি ওই জায়গায় হাত দিয়ে ফেলেছে? বুঝার জন্য আবার হাত দিয়ে বুঝে এটা হেরার পেট। ফট করে হাত সরিয়ে আনে। মনে মনে মেয়েটাকে গালি দিতে ভুলে না।
“মিসাইল তো এমনি এমনি বলি না, মন তো চাচ্ছে তুলে এক আছাড় মারি, ইডিয়েট কোথাকার।
কাঁপা হাতে নাভান হেরার টি-শার্টটা নিচে নামিয়ে দেয়। অনেক কষ্টে চোখের পর্দা খুলে বুঝতে পারে তারা গাড়ির ব্যাক সিটে আছে। সামনে দুইজন আর তার সামনে একজন। সবগুলো মরার মতো ঘুমাচ্ছে ড্রাইভার ছাড়া। গাড়ির ভিতর লাইট অফ। মাথা উঁচু করতেই গ্লাস ভেতর দিয়ে দেখতে পায় সরু জঙ্গলের ভিতর দিয়ে গাড়ি চলছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোতে ভালোই বোঝা যাচ্ছে। নাভান বুঝতে পারে তারা ভালোই বিপদে পড়তে যাচ্ছে। জায়গায় জায়গায় ল্যাম্পপোস্টের আলোতে ভালোই আলো আসছে গাড়ির ভিতর। নাভান মাথা উঁচু করতে দেখে হেরার স্কার্ট পায়ের খানিক উপরে। দেখেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।
“অসভ্য মিসাইল গার্ল।
নিজের পা দিয়ে স্কার্ট ঠিক করে দেয়। পায়ের ঘষা পেতেই হেরা লাফ দিয়ে উঠতে যাবে তার আগে নাভান তাকে জাপটিয়ে ধরে কানে কানে বলে—
“হিসসস, চুপ, একদম চুপ, সামনে ডাকাত বসে আছে। কথা বললেই শেষ আমরা।
হেরা ভয়ে ঢোক গিলে। সে তো ভুলে গেছে তারা কিডন্যাপ হয়েছে। কিন্তু এখন অসভ্য গিটারওয়ালার কাছে শুনছে ডাকাত। আল্লাহ এবার কি হবে। এসেছিলো প্রতিশোধ নিতে কিন্তু এখন তো সেই ওই লোকের সাথে মরতে যাচ্ছে। আচ্ছা কিডন্যাপাররা কি তাকে মেরে ফেলবে? আর কি কারো সাথে দেখা হবে না? ভয়ে ভয়ে ফিসফিস করে বলে—
“অসভ্য গিটারওয়ালা, এখন উপায়?
নাভান বলল—
“ওয়েট, আমার বাম পকেটে একটা ঘড়ি আছে, ওইটা বের করো।
সাথে সাথে হেরা বলে উঠে—
“আহাম্মক এখানে ঘড়ি দিয়ে কি করবেন? থাকলে ছুরি পিস্তল থাকলে বলেন তা বের করি।
উত্তরে নাভান বলে—
এখন এসবের কাজ নেই, তোমায় যা বলছি তাই করো।
হেরা—“
আপনি না ঢাকার কিং, পকেটে পিস্তল ছুরি না নিয়ে ঘড়ি নিয়ে ঘুরেন ছে নিম্নবিত্ত নেতাফেতা, হুদাই আপনারে ঢাকার কিং বলে মানুষ।
বেশ রাগ হয় নাভানের মেয়েটার উপর। নাভান বলে উঠলো—
“হ্যাঁ তোমার মতো ভার্সিটিতে ছুরি পিস্তল নিয়ে যেতাম মিসাইল গার্ল। তোমায় যা বলছি তাই করো। এটম বোমের মতো মুখটা অফ করো।
হেরা কাঁপা হাতে পকেট হাতড়ে ফোনটা বের করে নাভানের দিকে বাড়িয়ে দেয়…
চারপাশে অন্ধকার আর চাপা উত্তেজনা—যেন সামান্য শব্দও বিপদ ডেকে আনবে। নাভান এক ঝটকায় হেরাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিচে বসিয়ে দেয়। হাতের ঘড়িটা আড়াল করে রাখে যেন তার ক্ষীণ আলো কারো চোখে না পড়ে। মুহূর্তটা এত কাছে, এত নিঃশ্বাসের ভেতর বন্দী—হেরা বুঝতেই পারে না কখন তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।
নিচে পড়ে থাকতে থাকতে হেরার দম যেন আটকে আসে। নাভানের বুকের কাছাকাছি থাকা, তার শরীরের উষ্ণ গন্ধ—অচেনা এক ঘোরের মতো চারপাশ ঢেকে ফেলে। হেরা চোখ শক্ত করে বন্ধ করে রাখে, যেন চোখ খুললেই এই অদ্ভুত অনুভূতিটা ভেঙে যাবে। তার বুকের ধড়ফড়ানি নিজেই শুনতে পাচ্ছিল সে।
নাভান দ্রুত মোবাইল ঘড়িটা আড়ালে লুকিয়ে ঝিনুককে কল দেয়। কণ্ঠ নিচু, কিন্তু তাড়াহুড়ো স্পষ্ট। ঠিক তখনই নীরবতা চিরে ফোনের লাইন ঢুকে যায়, আর সেই সঙ্গে নিচ থেকে বলটু নামের লোকটা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো!
“এই কাজচোরের দল, পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিস নাকি? দেখ তো, ছেলে-মেয়ে দু’টার জ্ঞান ফিরেছে কি না!”
একজন উঁকি দিয়ে দেখে বলল,
“না বস, দু’জনই এখনো বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে।”
আরেকজন বিরক্ত স্বরে বলে উঠল—
“বস, এখন আমরা কোথায় যাব? আর এদের নিয়ে কী করবেন বলেন তো? দুইটা বুলেট ছুড়লেই তো কাজ শেষ। এত ঝামেলা করছেন কেন?”
বস দাঁত চেপে নিচু গলায় বলল,
“আরে হারামজাদার দল, এই ছেলেটাকে মারা যাবে না। শুধু জিম্মি করে রাখতে বলা হয়েছে। এদের কিছু হলে আমাদের সারাজীবন জেলের ভাত খেতে হবে। বুঝছিস না? দুই পক্ষই এখন বারুদের ওপর বসে আছে—একটুখানি ভুল হলেই সব উড়িয়ে দেবে আমাদেরসহ।”
বলটুর সঙ্গে থাকা ছেলেটা প্রথম দেখাতেই বুঝে গিয়েছিল—এখানে শুধু একটা দুর্ঘটনা নয়, এর ভেতরে জমে আছে অদৃশ্য কোনো গল্প, না বলা অনুভূতির ভার। এদিকে ৭২ কেজি ওজনের মানুষটার নিচে চাপা পড়ে হেরার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে আটকে আসছিল। বুকটা যেন পাথর হয়ে যাচ্ছে, চোখে অন্ধকার নামছিল। শেষ চেষ্টা হিসেবে সে দাঁত বসিয়ে দেয় নাভানের শক্ত বুকে।
নাভান ব্যথায় কেঁপে উঠেছিল, তবু একটাও শব্দ করেনি। যেন তার কাছে নিজের ব্যথার কোনো মূল্যই নেই—হেরা ঠিক আছে, এটুকুই যথেষ্ট। সেই মুহূর্তে তাদের মাঝে না বলা এক অনুভূতি নিঃশব্দে জন্ম নিচ্ছিল, যাকে কেউ নাম দিতে পারছিল না।
ফোনের ওপাশে সব শুনছিল তাদের বন্ধুরা। সারা বিকেল ধরে তারা ঢাকা শহরের ভিড়ের মাঝে পাগলের মতো খুঁজে বেড়িয়েছে। রোজ আর রুশা—দু’জনেই নতুন শহরে, অচেনা রাস্তায় দাঁড়িয়ে অসহায় হয়ে পড়েছিল। কোথায় যাবে, কাকে বলবে—কিছুই বুঝতে না পেরে একসময় দু’জনেই কান্নায় ভেঙে পড়ে। সেই কান্নায় ছিল ভয়, হারিয়ে ফেলার আতঙ্ক, আর প্রিয় বোনের মতো বান্ধবীকে না পাওয়ার অসহায়তা।
ঠিক তখনই ঝিনুক এসে তাদের জড়িয়ে ধরে, যেন ভাঙা মনগুলোকে আবার ধরে রাখে। তার পাশে তুষার—শান্ত, নির্ভরযোগ্য একজন মানুষ। ডাক্তার হওয়ার কারণে পরিস্থিতি সামলে নিতে তার সময় লাগে না। কেমিক্যাল ব্যবহার করে সহজেই তাদের মুক্ত করে। কিন্তু টানাটানির কারণে রোজের পা থেকে অনেকটা চামড়া উঠে গেছে। ব্যথায় তার মুখ ফ্যাকাশে, তবু সে কাঁদছে না—শুধু চুপ করে সহ্য করছিল।
আর সেই চুপ করে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে সৃজনের ভেতরে অদ্ভুত এক অনুভূতি জন্ম নেয়। ভালোবাসা কি এমনই? না চেনা, না জানা—তবু হঠাৎ কারও ব্যথা নিজের মনে গেঁথে যায়? কেন তার মনে হলো, এই মেয়েটার কষ্ট যদি নিজের করে নিতে পারত! কেন সেই মায়াভরা মুখটা দেখলে বুকের ভেতর অকারণে হাহাকার জেগে ওঠেছিল তখন?
আমরা অনেকেই তো এমন মানুষকে জীবনসঙ্গী করি, যাকে প্রথমে একেবারেই চিনতাম না। তবু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে-ই হয়ে ওঠে শ্বাস নেওয়ার কারণ। হয়তো ভালোবাসা শুরুই হয় এমন অচেনা মায়া থেকে—যেখানে যুক্তি কাজ করে না, শুধু মন নীরবে হার মেনে নেয়।
ফোনের আলাপ শুনে সবার মাথা ঝিম ধরে যায়। অধীর নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু রুশার কান্না দেখে তার চোখও ভিজে ওঠে। কলিজার বোন কিডন্যাপ হয়েছে—রুশা কীভাবে স্থির থাকবে? কান্না করতে করতে তার গাল লাল হয়ে গেছে, কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে বারবার।
আর ঝিনুক… সে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। চোখে ভয়, মনে হাজার চিন্তা, তবু সে ভাঙছে না। কারণ এই মুহূর্তে কেউ একজন তো শক্ত হয়ে দাঁড়াতেই হবে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেও জানে—আজকের এই রাতের পর তাদের সবার জীবনই হয়তো একটু বদলে যাবে। কারণ ভয়, ব্যথা আর ভালোবাসা—এই তিনটা জিনিস মানুষকে খুব দ্রুত একে অপরের কাছে এনে দেয়।
ডঃ তুষার ঝিনুকের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো—
ঝিনুক, তোমরা সবাই যদি এভাবে ভেঙে পড়ো, তাহলে হবে কী করে? এখন কান্নার সময় না… এখন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সময়। ভাইকে বাঁচাতে হবে। তাদের কথাবার্তা শুনে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে—ওরা আন্টির শত্রু হতে পারে । এখন আন্টি, নাভান, হেরা—সবাই বিপদের মুখে। যা করার, আমাদেরই করতে হবে। প্লিজ… নিজেকে শক্ত করো। তুমি না আমার স্ট্রং কুইন?
ভালোবাসার মানুষের সামনে মানুষ বড় অদ্ভুত হয়ে যায়। যত শক্তই হোক, বুকের ভেতরটা হঠাৎ নরম হয়ে যায়। ঝিনুকও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে হঠাৎ করেই ঝাঁপিয়ে পড়ে তুষারের বুকে। তার আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরে তুষারের শার্ট, যেন ভয় পাচ্ছে তুষারের বলা ভরসাটাও হারিয়ে ফেলছে যেন।
কাঁপা কণ্ঠে বলে,
— কীভাবে শান্ত হবো তুষার? সে শুধু আমার বন্ধু না… সে আমার ভাই। রক্তের না হলেও, সম্পর্কের চেয়েও গভীর। আমি কখনো তাকে বন্ধুর চোখে দেখিনি। সে বিপদে, আমি কীভাবে ঠিক থাকি বলো? আমার নিঃশ্বাসটাই যেন বন্ধ হয়ে আসছে…
তুষার চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত নিজেকে শক্ত করে নেয়। তারপর নরম অথচ দৃঢ় গলায় বলে,
— তুমি যদি এভাবে ভেঙে পড়ো, তাহলে রোজ আর রুশা কী করবে? ওদেরও তো বন্ধু বিপদে। অধীর আর সৃজনকে দেখছো? ওরা ভেতরে ভেতরে কতটা ভেঙে গেছে, তবুও নিজেদের সামলাচ্ছে। এখন আমাদের মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে।
তুষার এমন ছেলে, যে ঝড়ের মধ্যেও দিক চিনতে পারে। ভয় তাকে ছুঁয়ে যায়, কিন্তু ভেঙে দিতে পারে না। তার দৃঢ়তা যেন সবার ভরসা হয়ে দাঁড়ায়।
ঝিনুক চোখের পানি মুছে গভীর শ্বাস নেয়। বুকের ভেতরটা এখনও কাঁপছে, তবু সে নিজেকে শক্ত করে।
তুষার আবার বলে উঠলো—
— ওয়েট… আমার এক পুলিশ ফ্রেন্ড আছে। আমি এখনই ফোন দিচ্ছি। লোকেশন ট্র্যাক করা যাবে। কিছু হবে না… কিছু হতে দেবো না আমরা। তোমরা কেউ ভয় পেও না।
সঙ্গে সঙ্গে সবাই বলে ওঠে,
— আমরাও যাবো!
তুষার শান্ত মেজাজে বলে উঠলো—
— না। তোমরা মেয়েরা যাবে না। ওখানে বিপদ থাকতে পারে। আমরা ছেলেরা যাবো।
ঝিনুক চোখ মুছে দৃঢ়ভাবে বলে,
— না তুষার, আমি যাবো।
তুষার তার দু’কাঁধ ধরে বলে,
— তোমাকে শক্ত থাকতে হবে এখানেই। রোজ আর রুশাকে দেখবে কে? যদি এখানে কিছু হয়? তুমি তাদের ভরসা। প্লিজ, আমাকে বিশ্বাস করো।
শেষ পর্যন্ত তুষার তিনজন মেয়েকে বাসায় পৌঁছে দেয়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঝিনুকের হাতটা একবার চেপে ধরে বলে,
— আমি কথা দিচ্ছি… ওদের নিয়ে ফিরবো।
গাড়ি দূরে মিলিয়ে যেতে থাকে। ঝিনুক বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে, যতক্ষণ না হেডলাইটের আলো অন্ধকারে হারিয়ে যায়। তার ঠোঁট নড়ে—নীরব প্রার্থনা।
এদিকে তুষারের পুলিশ বন্ধু লোকেশন পাঠিয়ে দেয়। সৃজন পুলিশকে ইনফর্ম করে। সব প্রস্তুত… তবুও জায়গাটা এত দূরের গ্রামে যে পুলিশের পৌঁছাতে তিন-চার ঘণ্টা লাগবে। তাদেরও পৌঁছাতে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা।
সময় যেন নিষ্ঠুর হয়ে ধীরে ধীরে এগোয়। প্রতিটি মিনিট যেন একটি বছর। ঝিনুক চুপচাপ বসে থাকে, কিন্তু তার বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যায়। সে বারবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকায়—কোনো কল, কোনো মেসেজ… কোনো খবর।
কারণ আজ শুধু বন্ধুকে নয়, নিজের একটা অংশকে ফিরে পাওয়ার লড়াই চলছে।
আর সেই লড়াইয়ে ভরসা একটাই—ভালোবাসা, সাহস, আর অপেক্ষা।
“ভাইজান আমার ভাই এদের হাতে না হাতে ধরছে খারাপ কাম করছে এইগুলা, ভাই আগেও দেখছে, এদের ছাড়লে এই মাজারপুর গ্রামের ইজ্জত নষ্ট হইবো, ছাড়া পাইলে এরা আবার খারাপ কাজ করবো। আমার ভাই আজ ইচ্ছেমতো মারছে। তাইতো গায়ে রক্ত।” (গ্রামের একটি লোক)
গ্রামের একটি লোক চেয়ারম্যান সাহেব ও খাদেম বাবার উদ্দেশ্যে বললো।
“কি করবা এহন বাবা ছেলে-মেয়েডার উপর, আরো মারবা? তাইলে তো মইরা যাইবো, পোলাডার অবস্থা অনেক খারাপ আর মাইয়াডারও।”
চেয়ারম্যান সাহেব গম্ভীর গলায় আদেশ দেন।
“তা খাদেম সাব, এদের আগে বিয়া পড়ান তারপর চিকিৎসা দিবেন। বিয়া দিলে যা মনচায় করুক আর পাপ হইবো না। এই মাজারপুর পবিত্র। এহানে কোনো খারাপ কাম করলে অলি-আউলিয়ারা বদদোয়া দিবো!!”
বিয়ের কথা শুনে হেরার দুর্বল শরীরটা নড়েচড়ে উঠে। এক হাত এখনো জোড়া লাগানো। নাভান রক্তাক্ত অবস্থায় আধখোলা চোখে অচেতন হয়ে পড়ে আছে মাজারের পবিত্র মাটিতে। হেরাও কোনো মতে মাথা সোজা রেখেছে, কখন জানি সেও পড়ে যায় নাভানের বুকে। হেরা ওই অবস্থায় চেঁচিয়ে উঠে—
“না এটা হয় না, এ বিয়ে আমরা করবো না।”
“ভাই এরা তো বিয়ে করতে নাকচ করতাছে?”
গ্রামের একটি লোক আবারো বললো। চেয়ারম্যান সাহেব যেন এবার বেশ ক্ষিপ্ত হয় নাভান আর হেরার উপর। খারাপ কাজ করে আবার তেড়ামি করছে। তাইতো তিনিও আদেশ করেন—
“যদি না করে বিয়া তয় এগুলারে এখন এই গর্তে পুতে পাথর নিক্ষেপ করে মাইরা ফেলা হোক।”
চেয়ারম্যান সাহেবের কথায় অর্ধগ্রামবাসী হয় হয় করতে থাকে। এত মানুষের আওয়াজ, কথাবার্তা কোনোটাই হেরা ও নাভানের কানের অগোচরে হচ্ছে না। অধিক মাত্রায় দুর্বল দুজন, কিন্তু কান দুজনেরই খাড়া।
এবার হেরা নাভানের কাছে ঢুলু ঢুলু অবস্থায় বলে—
“বিয়ে না করলে মেরে ফেলবে আমাদের!”
হেরার আহত সুর নাভানের মস্তিষ্কের ভিতর বারবার বাজছে। শুকনো কণ্ঠে হেরাকে খুব কষ্টে বলে উঠলো—
“আমরা বিয়ে করবো!!”
নাভানের কথায় হেরা একটু আওয়াজ করেই বলে-
“মানে!”
নাভান আবার বলে-
“হ্যাঁ এ ছাড়া আর বিপরীত রাস্তা নেই। এখন আপাতত রাজি হয়ে যাও।”
“না আমি মরে গেলেও, আপনার মতো অহংকারী গিটারওয়ালাকে বিয়ে করবো না।”(হেরা)
“ওকে তাহলে মরো।”(নাভান)
“মানে?”(হেরা)
নাভান ফিসফিস করে বলে—
“মানে কি এখন একটা-দু’টা ইট মারছে, কতক্ষণ পর পাথর মারবে তার প্রস্তুতি নাও। আর আমি বলবো এই মেয়ে খারাপ কাজ করে এখন বিয়ে করতে চায় না আমায়। আমি বেঁচে যাবো আর তুমি পাথরের নিচে চাপা পড়ে মরো।”
উত্তরে হেরা বলে—
“মানে কি? আমরা কি খারাপ কাজ করেছি নাকি মিথ্যাবাদী লোক?”
“সেটা তুমি আর আমি জানি আর কেউ জানে না। আমি তোমার জন্য মরতে পারবো না মিসাইল গার্ল।”(নাভান)
বেচারি হেরা উপস্থিত মানুষদের ঢুলু ঢুলু চোখে দেখে ভয় পেয়ে যায়। হঠাৎ একটা ইট তার হাতে লাগে। ভয়ে সে না চাইতেও নাভানের জোড়া লাগা হাতটা আরো শক্ত করে ধরে। নিরুপায় হয়ে রাজি হয় হেরা।
মধ্যরাত। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু দূরের আজানের মতো ভেসে আসছিল বাতাসের শব্দ। সেই রাতেই, কোনো কাগজ-কলমের স্বাক্ষর নয়, কোনো উকিল বা রেজিস্ট্রারের উপস্থিতি নয়—অর্ধেক গ্রামের মানুষকে সাক্ষী রেখে মাজারের নিঃশব্দ আঙিনায় এক অদ্ভুত বিয়ের সাক্ষী হলো সময়।
হেরা আর নাভান—দু’জনই তখন আহত, ক্লান্ত, ভাগ্যের অদৃশ্য আঘাতে প্রায় ভেঙে পড়া। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিও ছিল না ঠিকমতো।
রাত ১২টা ২ মিনিট। পুরো গ্রাম ঘুমে ঢুলছে, কিন্তু মাজারের সামনে যেন হঠাৎ সিনেমার শুটিং শুরু! 😄
হেরা আর নাভান—দু’জনই অর্ধশোয়া অবস্থায়। ঠিকমতো বসতেও পারছে না। আর এই অবস্থাতেই নাকি বিয়ে হবে! পরনে টকটকে লাল লুঙ্গি—যেন ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে বিশেষ কালেকশন! তার ওপর মাথায় বাঁধা লাল মাজারের কাপড়। দেখতে একদম “রক্তাক্ত রোমান্টিক হিরো”! পাশে হেরা, আধা শোয়া, আধা বসা—মনে হচ্ছে কেউ জোর করে বলেছে, “এই যে, ওঠো ওঠো, এখনই বিয়ে!”
খাদেম বাবা লাল লুঙ্গি পরে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু আশেপাশের অর্ধেক গ্রামবাসী এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন লাইভ ম্যাচ চলছে। কেউ ফিসফিস করছে—
“এই অবস্থায়ও বিয়ে হয় নাকি?”
১৪ ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। অন্যরা ফুল দিচ্ছে, চকলেট দিচ্ছে—আর এরা দিচ্ছে রক্তমাখা লাল লুঙ্গি আর মাজারের কাপড় বেঁধে ইতিহাসের সবচেয়ে “অর্ধশোয়া বিয়ে”!
এক বিপদ থেকে বাঁচতে গিয়ে এমন ফাঁদে পড়লো যে বসে বিয়ে করার সময়ও পেল না—শুয়ে শুয়েই জীবনসঙ্গী হয়ে গেল! দুই মেরুর ব্যক্তি।
গ্রামের মানুষ পরে নাকি এই বিয়েকে নাম দিলো— “লাল লুঙ্গির অর্ধশোয়া বিয়ে”
সত্যি বলতে কি, এমন বিয়ে না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করতো না যে এভাবেও বিয়ে হয়।
ফ্ল্যাশব্যাক
তখন নাভান অনেক বার বলেছে হেরাকে চুপ থাকতে, কিন্তু মেয়েটা অতিরিক্ত ভয়ে বার বার এটা ওটা জিজ্ঞেস করে, নাভানের না করা সত্ত্বেও যা তাদের কাল হয়ে দাঁড়ায়। নির্জন ঘন জঙ্গলের পথ দিয়ে যখন গাড়িটি যাচ্ছে, তখন হেরা নাভান অজ্ঞান হওয়ার নাটক করে পড়েছিল সিটে। বল্টু তখন গাড়ি থামাতে বলে।
“ওই কাইশসা গাড়ি থামা, যা বাট্টু গিয়ে একড়া বিড়ি নিয়া আয়।
বাট্টু নামের কিডন্যাপারটা তখন বল্টুকে বলে—
“বস, বিড়ি কন কে? অইডা সিগারেট হইবো!
“অই একই কথা, দুইডাই তো কলিজা কালা করার যন্ত্রপাতি।
“বস, বিড়ির দাম কম আর সিগারেটের দাম বেশি। আপনি সিগারেটের মান-ইজ্জত শেষ কইরা দিতাছেন।
“হপ বেটা, বেশি বুঝোস। দুইডাই যেহেতু এক রোগের লক্ষণ, মৃত্যুর দিকে নিয়া যায়, তাইলে দুইডা সমান দোষে দূষিত। তাইলে একটারে এক নামে ডাহার কি দরকার! ঘুইরা ফিরা একই। বরোলোকদের লাইগা সিগারেট আর আমগো লাইগা বিড়ি।
বাট্টু নামের ছেলেটা মাথা চুলকিয়ে সিগারেট আনতে যায়, সাথে আরেকজন যায়। এদিকে ড্রাইভারের খুব দুই নাম্বার পেয়েছে, তাই তো সেও চলে যায়। এতক্ষণ নাভান আর হেরা সব দেখছিল, সব জেতেই তারা ধীরে উঠে। বল্টু তার বসের সাথে কথা বলছে। হেরা আর নাভান গাড়ি থেকে বের হতেই দুজন ছুটে জঙ্গলের ভিতর। বাট্টু নামের ছেলেটা তখন তাদের দেখে চেঁচিয়ে উঠে।
“বস, মাইয়া আর ছেলে দুইডা পলাইছে।
মুহূর্তে বল্টু তাদের পিছন ছুটে। এদিকে বে-কায়দায় দৌড়াতে পারছে না হেরা। তারা এক গাছের নিচে গিয়ে হাঁপাতে থাকে। তখন পিছন থেকে শিয়ালের চোখ পড়ে হেরার চোখে। এমন চিল্লানোর শব্দে নাভান হকচকিয়ে যায়।
“চুপ মিসাইল গার্ল, তোমার উপস্থিতি কি তাদের জানান দিচ্ছো!
“এই অসভ্য গিটার ওয়ালা, বাজে কথা বলবেন না। পিছনে আপনার মামা দাঁড়িয়ে আছে।
“মানে?”
দে দে, খুন না কেমন করে তাকিয়ে আছে!
পিছন ফিরতে নাভান দেখে শিয়ালের চোখ তাদের দিকে নিক্ষিপ্ত। পায়ের কাছে কিছু একটা লাঠির মতো লাগে তা তুলে নেয় হাতে। নাভান হুস হুস করতেই তেড়ে আসে শিয়ালটা। এদিকে হেরা আরো চেঁচিয়ে উঠে।
“আহহহহ গিটার ওয়ালা, আমাদের দিকে আসছে। আমার ভয় করছে।
নাভান কটমট চোখে তাকাতেই বলটু কিডন্যাপার তাদের কাছে আসে হাপাতে হাপাতে ।
“কি মামা, ভালা চালাক তো দেহি ঢাকার কিং।
“তোর সাহস দেখে অবাক হচ্ছি।
কিং বলছিস আবার তাকেই কিডন্যাপ করে নিয়ে এসেছিস। ভালই তো মনে সাহস আছে। আই লাইক দিস ।
“তা কে তোদের পাঠিয়েছে, নাম বল।(নাভান)
“আমি আর যাই হই, নিমুক হারাম না।(বল্টু)
নাভান বলল —
“বাহ, বেশ মনে ধরেছে। তা বাঁচতে চাস না মরতে?
“আমি আপাতত কোনোটা চাই না। বারন আছে, তাই চলেন । সঠিক সময় আইলে ছাড় পাইয়া যাইবেন।
নাভান দাঁতে দাঁত চেপে বলে—
জাস্ট একটা সুযোগ পাই, সব কটাকে এমন কেলানি কেলাবো না, সারাজীবন পঙ্গু হয়ে কাটাতে হবে। মেয়ে মানুষ সাথে আছে দেখে ছাড় পেয়েছিস।
“আমি সুযোগসন্ধানী লোক, যোগ বুঝে কুপ মারি। জানি আপনি এখন কিছু করতে পারবেন না। আপনার মায়েরে কথা শুনাইতে এই কাহিনি। যাই হোক গা, আপনি যে বাঘের বাচ্চা এইডা জানি, মায়ের মতো তেজে ভরা। আপনার মায়েরে দমাতে আপনেই খুব লাগবো। কাজ হইয়া গেলে সম্মানে ফুলের মালা গলায় দিয়া বাড়িতে পৌঁছাই দিমু, চিন্তা কইরেন না।
বলেই হেরার হাত ধরে টান দেয়। মুহূর্তে হাতের রগ ফুলে যায় নাভানের। তার মাকে যে ব্ল্যাকমেল করবে আর সেটা যে বড় কিছু, তা আর বুঝতে বাকি নেই। পায়ের কাছে যে শুকনো ডালটা ছিল, তা পা দিয়ে উঠিয়ে বল্টু কিডন্যাপারের ঘাড়ে দেয় এক বাড়ি। বাড়ি খেয়ে হাতের বাধন আলগা হয় বলটুর। তার পিছনে আরো তিনজন আসে
—বাট্টু, কাইসা আর জইল্লা।
“হেরা, তুমি আমায় জড়িয়ে ধরো প্লিজ। এভাবে পারবো না লড়াই করতে।
“আমি আপনাকে কেন জড়িয়ে ধরবো?
“প্লিজ, আমার গলা পেঁচিয়ে ধরো। তাহলে তোমায় নিয়ে আমি লড়াই করতে পারবো। কিন্তু দূরে থাকলে পারবো না। তুমি হাতে ব্যথা পাবে। আর ওরা আমাকে আঘাত করবে না, আমাকে দমাতে তোমায় আঘাত করবে।
“না, জীবনেও ধরবো না। দরকার পড়লে আমি এই কিডন্যাপারের হাতে ১০ দিন বন্দী থাকবো, মার খাবো, তাও আপনার মতো অসভ্য লোককে জড়িয়ে ধরবো না।
বোকা হেরা বুঝতে পারলো না কেন নাভান তাকে জড়িয়ে ধরার কথা বলছে। হলো সত্যিই, নাভানের সাথে না পেরে হেরাকে আঘাত করেছে বল্টু। হেরা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে নিচে। এদিকে আরেকজন আঘাত করতে এলে নাভান হেরাকে সরিয়ে আনে, যা নাভানের মাথায় লাগে। মুহূর্তে নাভানের চারিদিক অন্ধকার লাগে। কিন্তু না, এই মুহূর্তে তাকে দুর্বল হলে হবে না। তা না হলে মায়ের যে বিপদ হবে! তার মা তার আর অধীরের জন্য সব করতে পারবে। মাকে বাঁচাতে হবে। এদের হাত থেকে পালাতে হবে। এক হাতে মাথা চেপে বল্টুর পকেট থেকে আচমকা পিস্তল টান দিয়ে সবগুলারে এলোমেলো শুট করে। মুহূর্তে সব কটা মাটিতে লুটিয়ে জ্ঞান হারায়। কেউ হাত, কেউ পা—এমনভাবে শুট করে যাতে না মারা যায়। কিছুক্ষণের জন্য তারা জ্ঞান হারিয়েছে। এই সুযোগে তাদের পালাতে হবে। হেরাকে সাথে নিয়ে এলোমেলো পায়ে ছুটে। নাভানের থেকে হেরার আঘাতটা অনেক বেশি। অনেক জায়গা থেকে রক্ত পড়ছে। হেরাকে বাঁচাতে গিয়ে।
ছুটতে ছুটতে তারা এক মাজারের সামনে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। মাজারের খাদেম তখন গভীর দোয়ায় মশগুল। চারিদিক মোমবাতি জ্বালানো, লাল লাল নিশানা টাঙানো। সাইনবোর্ডে লেখা—পাক-পবিত্র হয়ে প্রবেশ করুন। হঠাৎ ধপাস শব্দে খাদেম তাকাতেই দেখে এক জোড়া ছেলে-মেয়ে মাটিতে একজন আরেকজনের উপর উবু হয়ে পড়ে আছে। হাতে মোমবাতি নিয়ে আগাতেই তার চোখে জ্বলে উঠে রক্তাক্ত দুইখানা মুখ। খাদেম চিন্তায় পড়ে যায় কি করবে সে। এই নিরব জঙ্গলে সে ছাড়া তো কেউ থাকে না। গ্রাম বহু দূর। কিন্তু তার মনে প্রশ্ন জাগে—এই গভীর রাতে এই ছেলে-মেয়ে এইখানে আইলো কেমনে?
খাদেম সাহেব এগিয়ে গিয়ে ডাকে—
“কেডা তোমরা ছাওয়াল? তোমাগো শরীর এমন রক্তে ভেজা কে?
দুইজনেরই ভারী নিশ্বাস শোনা যাচ্ছে। হেরা আমতা আমতা করে বলে—
“আ… আ… আমাদের তারা করেছে ওই লোকগুলো।
নাভান বলে উঠে—
“আমাদের একটু সেভ করুন। ওরা আমাদের—
না, আর বলতে পারলো না। শরীরের আঘাতে মানুষ সহজে দুর্বল হয় না, কিন্তু মাথায় আঘাত পেলে মানুষ অতি তারাতারি দুর্বল হয়ে যায়। খাদেম পড়েছে বিপাকে। তার গরুদের কথা—
“বিপদকারী যেই হোক না কেন, আগে তাদের রক্ষা করবে।
হ্যাঁ, তারাও তো বিপদে পড়েছে। খাদেম পানি এনে আগে পানি খাওয়ায় দুজনকে। পানি পেয়ে একটু গলা ঠান্ডা হয় দুজনের। খাদেম বুড়ো লোক, তাদের উঠানোর সাধ্য নেই। তাই ওই অবস্থায় সেবা করতে থাকে। নাভানের প্যান্ট ছিঁড়ে গেছে অনেকটা, হাঁটু থেকে রক্ত পড়ছে। তখন ছুটে আসার সময় শক্ত কিছুই সাথে লেগে হয়তো ছিঁড়ে গিয়েছে। খাদেম বাবা তার কুটুরিতে গিয়ে এক কালারের লাল লুঙ্গি নিয়ে আসে, যার নিচের পারটা শাড়ির মতো দেখতে। অনেক কষ্টে লুঙ্গি পরিয়ে ক্ষতস্থানে পাতা-লতা বেটে লাগায়। হেরার মাথায় ছাড়া আর আঘাত লাগে নি।
তাদের সেবার মধ্যে অর্ধ গ্রামবাসী আসে। এত গ্রামের লোক দেখে খাদেম বাবা ভড়কে যায়, কারণ এমন কখনো হয় নি। এখানে সবাই চুপচাপ আসে, দোয়া-মানত করে চলে যায়। এই মাজারের নাম ডাক রয়েছে—যে যা মানত করে তাই পূরণ হয়। তাই তো গ্রামবাসীর পবিত্র স্থান হলো এই ছাওয়াল পীরের মাজার।
তাদের মাজারপুর গ্রামে গত এক মাস ধরে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে প্রায় সময় ধরা খাচ্ছে, তাও বাজে অবস্থায়, খুব আপত্তিকর অবস্থায়। তারা কি আদৌ এই গ্রামের নাকি তাও চেনে না তারা। কিন্তু এই গ্রাম যে পবিত্র, এখানে কেউ খারাপ কাজ কইরা চলে যাবে তা গ্রামবাসী মানবে না। তাই তো দুইটাকে পেয়ে একত্র ইচ্ছে মতো মারে। কিন্তু ছেলে-মেয়ে দুটো বিচ্ছুর মতো ছুটে চলে আসে। তাদের ধরতে গ্রামবাসী লোকেরা ছুটে আসে। রাতের অন্ধকারে মুখটা অতো বুঝা যাচ্ছে না, রক্তে মুখ মাখামাখি। আর যারা ভালো করে চেনে তারাও জঙ্গলের ভিতর তাদের খুঁজছে দল ভাগ হয়ে। এদিকে একদল এসে দেখে খাদেম তাদের সেবা দিচ্ছে, তারপর তো সবাই জানেন।
“কবুল” — এই তিন অক্ষরের শব্দটা দুনিয়ার সবচেয়ে বৈধতার পরিচয় দেয়। তাই তো তাদের পবিত্র সম্পর্কটা অপবিত্র নাম দিয়ে পবিত্র করে দিল সমাজ। এতে দুইজনের মনোভাব কি তা একটু পরেই বুঝা যাবে। কি আশ্চর্য, কি থেকে কি হলো! যেখানে হাতের জোড়া লাগার কারণে বিরক্ত হয়ে তা ছুটাতে এত হুলুস্থুল, সেখানে সারাজীবনের নাম জোড়া হয়ে গেছে। ভাগ্য কখন কাকে কোথায় দাঁড় করায় তা আমরা কেউ জানি না। তাই আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন, তিনি শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী।
লাইফের এই প্রথম, যেখানে মাজারে অর্ধ শোয়া অবস্থায় লাল লুঙ্গি আর সাদা-কালো কম্বিনেশনে টি-শার্ট পরিহিত, হাতে হাত জোড়া লাগা অবস্থায় বিয়ে হলো, তাও অর্ধ গ্রামবাসীকে সাক্ষী রেখে। সবাই চলে যেতে খাদেম তাদের আবার সেবা দিতে থাকে। ভোরের আজান কানে আসতেই নাভানের জ্ঞান সম্পূর্ণ ফিরে। হেরার দিকে তাকাতে দেখে মুখ হাঁটুতে ঠেকিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে মেয়েটা, তার খুব কাছে বসে। খাদেম বাবা কি পাতার রস জানি দিয়ে হাতের বাধন আলগা করেছে।
নিজের হাতের বাধন আলগা হতে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে নাভান। বিরক্ত চোখে উঠে বসে—
“এই মিসাইল, ফেস ফেস করছো কেন?
“তো কি বিয়ে হওয়ার খুশিতে লুঙ্গি ডান্স দিবো?
“হ্যাঁ দাও, লুঙ্গি আছে তো। খাদেম বাবার থেকে নিয়ে দিবো নাকি?
“অসভ্য লোক! আমি এই বিয়ে মানি না, বুঝেছেন।
“না, আমি জেলায় জেলায় জানাবো যে এক মিসাইল গার্ল আমার কপালে জুটেছে।
“এই, একদম আমাকে মিসাইল গার্ল বলবেন না। আপনার জন্য সব হয়েছে।
“একদম বাজে মিথ্যা কথা বলবে না। তোমার মিসাইল মুখটা তখন চুপ রাখলে ওই কিডন্যাপারগুলো আমাদের খুঁজে পেত না।
“তো আমি কি ইচ্ছে করে চিল্লিয়েছি নাকি আজব? ভয় পেয়েছি।
“আচ্ছা, তাহলে তখন যে জড়িয়ে ধরতে বলেছিলাম, তখন করলে না কেন? তখন জড়িয়ে ধরলে এখন বিয়ে নামক বেড়াজালে জড়িয়ে পড়তাম না।
“নিজেকে কি মনে করেন হিরো? ওরা আপনাকেই কেলানি দিতো।
“না, তারা আমার কিছু করতো না। আর তার জন্যই আমি তোমাকে বলেছিলাম আমায় জড়িয়ে ধরতে, যাতে কেউ তোমাকে আঘাত না করতে পারে। আমি কি বা কে সেটা তুমি না বুঝলেও তারা ঠিকই বুঝেছে। তোমাকে বাঁচাতে আজ এই বিয়ে করতে হয়েছে, মিসাইল গার্ল।
হেরা উঠে চলে যায়। তার এই মুহূর্তে বাবার কথা মনে পড়ছে। আর নিলয়ের কথাও মনে পড়ছে। আচ্ছা, রুশা আর রোজ তাকে কোথায় কোথায় খুঁজে বেড়াচ্ছে? মেয়ে দুটো যে কিছু চেনে না তেমন। হেরা ফিরে এসে নাভানকে উদ্দেশ্য করে বলে—
“আমি চলে যাচ্ছি গ্রামের লোক আসার আগে। আপনি থাকলে থাকুন।
নাভান হেরার কথায় সহমত পোষণ করে। যদি গ্রামের লোক আসে তো ব্যাপারটা খারাপ দেখাবে। কেউ জানার আগে তাদের এখান থেকে চলে যেতে হবে। খাদেম লোকটার কাছে যায় নাভান। লোকটা এখনো জিকিরে মশগুল। নাভান গিয়ে বলে—
“চাচা, আমরা চলে যাচ্ছি।
খাদেম বাবা জিকির বন্ধ করে নাভানের দিকে তাকিয়ে বলে—
কবুল শব্দটা খুব ছোট, কিন্তু এর ওজন আকাশসমান। এটা আল্লাহর সামনে নিজেদের দেওয়া ওয়াদা! কবুল বলা মানে একটা মেয়ের সম্মান নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া। তার সুখ-দুঃখ, ইজ্জত-নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়া। এই এক শব্দে দু’টা জীবন এক পথে হাঁটার শপথ নেয়। এখানে অভিনয় চলে না, হালকা ভাবার সুযোগ নাই। কারণ কবুলের সময় মানুষ নয়, আল্লাহ নিজেই সাক্ষী থাকেন। এই শব্দ ভাঙলে শুধু সম্পর্ক ভাঙে না, ভাঙে আমানত, ভাঙে বিশ্বাস, আর জবাবদিহি শুরু হয় আখিরাতে। (খাদেম বাবা)
থেমে আবার বলে—
“আমি তোমার চোখে-মুখে অন্য কিছু দেখেছি। সেই মনোভাবে বলবো বাবা, বউ হয় তোমার। এখন যে পরিস্থিতিতে বিয়ে হোক না কেন, এটা অস্বীকার করতে পারবে না। আমার বিশ্বাস তোমরা সেই খারাপ ছেলে-মেয়ে না। তোমাদের চোখ দেখেই বুঝেছি আমি। যাও বাবা, তুমি ওখানটায় গিয়া কিছু চাও। এই ছাওয়াল বাবার দরবারে আইলে কেউ খালি হাতে ফিরে না।
নাভান যদিও এসব বিশ্বাস করে না, কিন্তু কেন জানি আজ যেতে ইচ্ছে করছে। যেখানে গিয়ে কোনো প্রকার সিজদা না দিয়ে দোয়া করে চলে আসে।
বি: দ্র: (এখানে কোনো মাজারকে উল্লেখ করে কিছু নিয়ম বলা হয় নি। আমার দেখা কিছু শেয়ার করেছি। এটাকে গল্প বলে চালাবেন। দয়া করে কেউ বাস্তবের সাথে মিলাতে যাবেন না।)
নাভান যেতে হেরাকে কাছে ডাকে খাদেম বাবা। একইভাবে তাকেও বুঝায়। দুইজনের হাতে কিছু মাটি, সুতো আর লাল দুইটা রুমাল দেয়—
প্রেমের বাজিমাত পর্ব ১৩
“নাও, এগুলো পবিত্র জিনিস। এগুলো নিজের কাছে রাখো। সবাই এগুলো পায় না। তোমাদের বিয়ের উপহার হিসেবে এইগুলো দিলাম। স্বয়ং ছাওয়াল তোমাদের বিয়ের সাক্ষী হইছে, তাই তার মূল্যবান কিছু জিনিস দিলাম। বিপদে পড়লে এগুলো নিজের কাছে রাখবে। দেখবে আল্লাহ ছাওয়ালের উসিলায় পথ দেখাইবো।
দুজনেই চুপ, কিন্তু তাদের মধ্যে তখন নীরব যুদ্ধ চলছিল…
