প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৯
ইনান হাওলাদার
প্রায় মাস দুয়েক পর আবার একত্রিত হয়েছে তূর্যের বন্ধুমহল। এই দুই মাসে যে কেউ কারো সাথে দেখা করেনি এমন না। দেখা হয়েছে, তবে পাঁচজনের একসাথে না।কখনো দুইজন,কখনো তিনজন ,কখনো বা চারজন। কেউই একসাথে সময় করে উঠতে পারেনি। আপাততো তূর্য,তাসিন আর নাবিল বসে কথাবার্তা বলছে।
পিংকি আর আলিয়া এখনো এসে পৌঁছায়নি।তারা দুই জন একসাথে কোথাও গিয়েছে ।মিনিট পাঁচেকের মধ্যে পৌঁছাবে বলে জানিয়েছে। তাসিন আর নাবিল এটা – ওটা নিয়ে গল্প করছে আর হাসাহাসি করছে।তূর্য তাদের মধ্যে উপস্থিত থাকলেও মন অন্য কোথাও।
তাদের সকল কথাই তূর্যের কানে পৌঁছাচ্ছে তবে তার কিছু মস্তিষ্কে সাড়া ফেলছে না।
সে একপর্যায়ে আনমনা হয়ে বলল,
“তাসিন, তুই অনার্স – মাস্টার্স ক্যামিস্ট্রি নিয়ে কমপ্লিট করেছিস না?একটা কোচিং সেন্টার খুলতে পারবি?”
এসে ধরেই তারা লক্ষ্য করেছে তূর্য গভীরভাবে কিছু একটা চিন্তা করছে। কয়েকবার কারণ জিজ্ঞেসও করেছে বটে।কিন্তু তূর্য বারবার বলেছে,” নাথিং ” ।তারাও ব্যর্থ হয়ে থেমে গিয়েছে। তূর্য যখন ‘ নাথিং ‘ বলেছে মানে ‘ নাথিং ‘ ই সেটা আর’ সামথিং ‘ হবে না।সে সম্পূর্ণ আলাদা টপিক তুলে কথা বলায় নাবিল বললো,
” কিসের মধ্যে কি পান্তা ভাতে ঘি। ”
এর মধ্যে আলিয়া আর পিংকিও চলে এসেছে। তাসিন নাবিলকে দেখিয়ে বললো,
” আমি না ভাই,নাবিল ক্যামিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে ছিল ”
” আহিকে পড়াতে পারবি?” নাবিলের উদ্দেশ্যে বললো তূর্য।সবাই অবাক নয়নে তূর্যের দিকে তাকালো।
আলিয়া আকাশ থেকে পড়ার ভান করে বলল,
” পাগল তুই? ক্যামিস্ট্রি না শিখিয়ে ‘ বা’ড়া ‘ বলা শিখিয়ে চলে আসবে ”
” বা’ড়ার কথা কস না আলিয়া । বা’ড়া বলা কত কমায় দিছি তুই জানোস? বা’ড়া !” রা’গ দেখিয়ে বলল নাবিল।অথচ এই কথার মধ্যেই কতগুলো বা’ড়া বলে দিয়েছে হুশ নেই তার।তাসিন নাবিলের পিঠে একটা চা’পড় মে’রে বাহবা দেওয়ার কায়দায় বলল,
” হ ভাই,তার প্রমাণ তো পাচ্ছিই। মাত্রও পেলাম!”
তাসিনের খোঁ’চা মা’রা কথাও বুঝলো না নাবিল সে এবারেও খি’টখিটে মে’জাজে বলল,
” বুঝা ওই আলিয়া ভাটকে ! ” তবে এবারে সে একবারো বা’ড়া বলেনি দেখে পিংকি আশ্চর্য হওয়ার ঢং করে বলল,
” নাবিল ভাই সেন্টেন্স কমপ্লিট করেছে উইথ – আউট বা’ড়া।হাত তালি দে সবাই ”
পিংকি তাকে ভাই বলায় নাবিল রে’গে মেগে কিছু বলবে মাত্র হা করেছে তার আগেই তূর্য বি’রক্তি নিয়ে বললো,
” পড়াতে পারবি কিনা বল ”
” ক্যান?জগতে আর কোনো পা’পি নাই? আমারেই ক্যান পড়াইতে হইবো বা’ড়া ”
” ইয়েস অর নো ”
” ধুর,বা’ড়া।আমি ওসব পারবো না।আমার হবু অ’সুরমশায় কইছে সরকারি চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত ওনার মাইয়া দিতো না।আমি চাকরি খুজতাছি,বা’ড়া। ”
একটু চি’ন্তায় পড়ে গেল তূর্য। আহির বিয়ের জন্যেও কি তার বাবা – চাচারা সরকারি চাকরি খুঁজবে? সরকারি চাকরির চেয়ে ডাক্তারি নিশ্চয়ই খারাপ না ! তবুও যদি মেয়ে না দেওয়ার জন্য ছুতো খুঁজে বলে সরকারি চাকরি ছাড়া মেয়ে দিবে না!তখন?
পিংকি বললো,
” আমার বাপ অ’ সুর ? তুই অ’সুর! ”
” রা’গ করস ক্যা? তোর আব্বা তো অ’সুরই। ক্যামনে জে’রা করতাছিল ভাইরে ভাই……মন চাইতাছিল যদি কইতে পারতাম,’ আপ্নেরে বিয়ে করতাম না অ’সুরাব্বা ,আপ্নের মাইয়ারে করতাম। সো,বা’ড়ার প্যা’চাল বাদ দ্যান ‘ কিন্তু কইতে হইলো ‘ জ্বি আংকেল ‘ , ‘ হ্যাঁ ‘ , ‘ অবশ্যই ‘ ‘ চেষ্টা করবো ‘ বা’ড়ারে…. বা’ড়া…! মন চাইতাছিল মাথায় একটা বাড়ি দিয়ে ইন্না লিল্লাহ কইরা দেই ”
” না’পিতের বা’চ্চাআআআআআআ ” নাবিলের ঘাড় ঠেসে চি’ৎকার করে বলে উঠলো পিংকি। নাবিল দুই হাতে কান চেপে ধরে তাড়াহুড়ো করে বললো,
” শ্বশুর আব্বা বা’ড়া,শ্বশুর আব্বা!”
” প্লিজ, স্টপ দিস । ননসেন্স ! ” তূর্যের ঝাঁ’ঝালো কণ্ঠের ধ’মকে পরিবেশ পুরো শীতল হয়ে গেল। যেন এদের মতো ভদ্র – সভ্য মানুষজন পৃথিবীতে আর নেই।
চাল কুমড়ার মোরব্বা তৈরির প্রোসেসিং চলছে চৌধুরী বাড়ির অন্দরমহলে। কুমড়া গুলো তাদের নিজেদের হাতের।বাড়ির ছাদে হয়েছে।
মাগরিবের নামাজ পড়েই তিন গিন্নি সেই কাজে লেগেছেন।সাথে আহিও আছে। পারভিন বেগম আর মারুফা বেগম কুমড়া গুলোর খোসা ছাড়িয়ে নির্দিষ্ট সাইজ করে দিচ্ছেন ,আহি আর লতা বেগম সেগুলো কা’টা চামচ দ্বারা চারিপাশ ছিদ্র করছে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরিমাণটাও একটু বেশি। কুমড়ার পিচ গুলো ছিদ্র করে আজ সারা রাত ধরে চুনের পানির মধ্যে ভিজিয়ে রাখবে।এতে করে কুমড়া গুলো শ’ক্ত হবে।তারপর চিনি দিয়ে আশানোর সময় আর ভে’ঙে যাবে না।
কুমড়া খোসা ছাড়িয়ে রাখার পর পারভিন বেগমের মনে হলো এতে সবার হবে না । তাই তিনি লতা বেগমকে ছাদ থেকে আরেকটা কুমড়া নিয়ে আসার জন্য বললেন। লতা বেগম ছাদ থেকে হাঁক ডাক ছাড়লেন,বাকি দুই জা এর মধ্যে একজনকে যেতে বললেন।তার ডাক শুনে মারুফা বেগম গেলেন । তিনি গিয়ে পারভিন বেগমকে ডাকলেন ।তারপর পারভিন বেগমও চলে গেলেন।আপাতত আহি কুমড়া গুলো একাই ছিদ্র করছে। আগ বাড়িয়ে কাজ করতে এসেই মহা বি’পদে পড়েছে সে।দুই হাতের উপরিয়ংশ লেগে এসেছে তাও কুমড়া যেন কমছে না।শুধু বাড়ছে।এর উপর তার মা – চাচিরা আবার আনতে গিয়েছেন। এগুলো সব ছিদ্র করতে করতে পুরো রাত কভার হয়ে যাবে মনে হচ্ছে।
এর মধ্যে সদর দরজা পেরিয়ে তূর্য প্রবেশ করলো।তাকে দেখে আহি মাত্র বলতে নিচ্ছিল,” তূর্য ভাই,কফি লাগবে?” তারপর কাল সন্ধ্যার কথা মাথায় আসতেই সে তূর্যকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল,
” মানুষ হয়তো এই আশায় ঘুম কামাই করছে যে আমি তার সাথে সেধে কথা বলবো। ম’রে গেলেও না ! কেউ চাইলে আগ বাড়িয়ে বলতে পারে।আমি কিছু মনে করবো না ”
” আমিও”
সিঁড়ি ভেঙে উঠতে উঠতে নির্বিকার চিত্তে বলল তূর্য।
আহি তার কথার আগা মাথা না বুঝে গলা উঁচিয়ে প্রশ্ন করলো,
” কী ‘ আমিও ‘ ?”
তূর্য আহির কথা রিপিট করে বললো,
” মানুষ হয়তো এই আশায় ঘুম কামাই করছে যে আমি তার সাথে সেধে কথা বলবো। ম’রে গেলেও না ! কেউ চাইলে আগ বাড়িয়ে বলতে পারে।আমি কিছু মনে করবো না ”
আহি পুনরায় কাজে মন দিলো। এবারে কুমড়ার উপর চামচের আ’ঘাতটা বেশি জোরে জোরে পড়ছে। রা’গে রা’গে কাজ করতে আরম্ভ করেছে। আর মনে মনে এতো এতো কথা শোনাচ্ছে তূর্যকে। কত বড় অ’হংকারী মানুষ। অ’হংকারে যেন মাটিতেই পা পড়ে না। এদিকে সেও সেধে কথা বলার পজিশনে নেয়।কঠিন শপথ নিয়েছে। যদিও এরকম কঠিন শপথ সে অবশ্য আগেও নিয়েছে ,তবে কখনো সফল হয়ে উঠতে পারেনি। আর শপথটা হলো ,এইবার মনে মনে বলেছে,
” এবারও যদি আমি সেধে তূর্য ভাইয়ের সাথে কথা বলি তাহলে আমার আর তূর্য ভাইয়ের বিয়ে জীবনেও হবে না ”
তাই এবারে মন চাইলেও আর কথা বলতে পারবে না। যদি এমন হয়?তূর্য সেধে কথা বললো না,আর সেও তার কঠিন শপথ রক্ষায় কথা বলতে পারলো না।তখন কি হবে?
একুল – ওকুল দুই কুলই যাবে। আল্লাহ যদি কথাটা সিরিয়াসলি নিয়ে নেন তাহলে তো কথা বললে বিয়ে হবে না।আর না বললে তো হবেই না। কথা না বললে আবার বিয়ে কিভাবে হবে?
তূর্য ভেবেছিল বরাবরের মতো আহি তার পিছুপিছু রুমে আসবে।ব’কবক করে মনের ক্ষো’ভ প্রকাশ করবে।তারপর নিজেই বলবে,
” কি হলো তূর্য ভাই? সেধে কথা বললেন না তো? থাক, বলাও লাগতো না। আমিই বললাম!যে সে’ধে কথা বলে তাকে আল্লাহ ভালোবাসেন । আর তিন দিনের বেশি কথা না বলে থাকাও হা’রাম।ওসব হা’রাম কাজবাজের মধ্যে ভাই আমি নেই।”
পুরোনো কথা মনে করে মুচকি হাসলো তূর্য। এইবারে হয়তো রা’গটা বেশি হয়েছে তাই এখনো রুমে আসেনি।একটুপর নিশ্চয়ই আসবে।এই আশায় ফ্রেশ না হয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষাও করলো সে। বারবার দরজায় নজর দিল।কিন্তু আহি আসছে না দেখে ফ্রেশ হতে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে বের হলো।ভেবেছিল বের হয়ে দেখবে খাটের উপর বসে আহি হাতের নখ খোঁচাচ্ছে আর পা দোলাচ্ছে।কিন্তু তেমনটা দেখতে পেল না।একবার বেলকনিতেও উঁকি মে’রে দেখে এলো,হয়তো সেখানে ঘা’পটি মে’রে বসে আছে এই ভেবে। কিন্তু এমনটাও হলো না।
তূর্য এবার অ’ধৈর্য হয়ে বারান্দায় গেল।ড্রয়িং রুমে উঁকি দিতেই দেখলো আহি এখনো সেখানে বসে আছে। রা’গ হলো তূর্যের। সে রুমে এসে হাতের তোয়ালেটা ডিভানে ছুঁড়ে মা’রলো।
কাল সন্ধ্যা থেকে আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো একটা দিন কেটে গেল আহিকে দেখে না সে।একটু আগে ভাব দেখিয়ে একবারো তাকায়নি আহির দিকে। কারণ,সে ভেবেছিল আহি তার পিছন পিছন আসবে তখন মন ভরে দেখে নিবে। এভাবে আসবে না কে জানে? জানলে চো’রা চোখে একটু দেখে নিতে তো পারতো! কথা বলা না বলা পরের কথা।
আর ড্রয়িং রুমে বসেও আছে এমন ভাবে শুধু ব্যাক সাইডই দেখা যাচ্ছে। মাত্র একটা দিন দেখে না,অথচ মনে হচ্ছে যেন বছরের পর বছর দেখে না। মনের মধ্যটা ছ’টফট করছে শুধু। এতটা আ’সক্তি জড়াতে তো সে চায়নি। মস্তিষ্ক হাতিয়েও কোনো বুদ্ধি বের করতে পারছে না যে কোনো একটা অজুহাতে তাকে রুমে ডাকবে।এসব শয়তানি কারবার করা তো আহির কাজ।তার মাথায় আসবেই বা কি করে।তূর্য কিছুক্ষণ দম মে’রে বসে থেকে রুম থেকে চেঁ’চিয়ে বলল,
” আম্মু? কফি দেও ”
লতা বেগম এসে কফি দিয়ে গেলেন।ছোট চাচিকে দেখে হ’তাশ হলো তূর্য । ভেবেছিল আহি আসবে। সে কোনো রকমে কফিটা শেষ করলো। তারপর আবার ডাক ছাড়লো ,
” আম্মু,আরেকটা কফি দেও ” এবারে তাহি আসলো। সে সেই কাপটাও শেষ করে আবার কফির জন্য মাকে ডাকলো।এবার পারভিন বেগম আসলেন।কফি দিতে দিতে বললেন,
” কফি খেয়েই পেট ভরবি? রাতে খাওয়া লাগবে না ?কি হয়েছে তোর?”
তূর্য মায়ের হাত থেকে কফির মগটা নিতে নিতে থমথমে গলায় বলল,
” কিছু না ”
পারভিন বেগমও আর কথা বাড়ালেন না।নিচে প্রচুর কাজ।সেসব সেরে আবার রাতের রান্না চড়াতে হবে।
তূর্য পিছু ডেকে দ্বি’ধাগ্রস্থ গলায় বললো,
” আহি কী করছে ?”
এতক্ষণে পুরো কাহিনী ঠাওর করতে পারলেন পারভিন বেগম। ছেলের কীর্তিকলাপ দেখে হাসি আটকাতে পারলেন না তিনি। কিছু একটা হয়েছে আহির হাবভাবে ধারণা করতে পেরেছিলেন তিনি। নাহলে যেই মেয়ে তূর্যকে এটা ওঠা এগিয়ে দেওয়ার জন্য পাগল তাকে কিনা সেধেও পাঠানো যাচ্ছিলো না। মনে মনে পুরো হিসাব ক’ষে তিনি ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন,
” সেটা তুমি গিয়েই দেখে এসো বাবা ”
” আচ্ছা,যাও তুমি।আহ্লাদে মাথায় চড়ে গেছে ”
” আবার ব’কেছিস মেয়েটাকে তাই না?”
” ব’কা খাওয়া কাজ করে কেনো তোমাদের মেয়ে ?”
” কী করেছে?”
” ব্যাচের টিচারের বার্থডেতে পায়েস রান্না করে খাওয়ায় ,দেখো না তোমরা? কোথায় থাকো ?” কিছুক্ষণ দম মে’রে থেকে মে’জাজ দেখিয়ে বলল তূর্য।
ব’কার কারণ শুনে পারভিন বেগম কিছুক্ষণ হ’তভম্ব হয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
” এইজন্যে তুই মেয়েটাকে ব’কবি ? ”
” এভাবে ধার দেখিয়ে থাকার মতোও কিছু বলিনি। ”
” আত্মীয়ই তো হয় । ”
” আত্মীয় হয় মানে কি আম্মু? ওই ছেলেটা মেহেদী।তুমি ভুলে গেলে সব?” রা’গে চাপা চিৎ’কার দিয়ে বলল তূর্য।
” আমার ছেলেটা যে এত হিং’সুটে সেটা তো আমার জানা ছিল না ”
” এতে জে’লাসির কী দেখছো তুমি? ইউ অল আর দ্যা সেইম, আম্মু।পারলে তোমাদের মেয়েকে পাঠাও আর ….. “শেষ কথাটা নরম কন্ঠে বললো তূর্য।
” যার দরকার সে ডেকে নিক ।আমার বাপু অনেক কাজ আছে ” তূর্যকে থামিয়ে মাঝপথে কথাটা বলে চলে গেলেন পারভিন বেগম।
কিছু মাস আগেই নিজেদের বিলাস বহুল বাড়ি ছেড়ে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে মেহেদী। সেখানে সে একাই থাকে। রান্নার জন্য একটা খালাকে রেখেছে তিনি এসে রান্না – বান্না করে দিয়ে চলে যান।
বাবার সাথে রাগারাগি করেই মূলত বাড়ি ছেড়েছিল সে। এরপর বাবাও যেতে বলেননি আর সেও যায়নি।বড় ভাইয়ের দেওয়া টাকায় চলছে আর ভেঙে ভেঙে খাচ্ছে। একটা ব্যাচ করিয়ে যে টাকা আসে তাতে কোনরকমে ফ্ল্যাট ভাড়া চলে যায়।নেহাত ব্যাচ করানোর পিছনে অন্য কারণ আছে।নাহলে ফ্ল্যাট ভাড়াটাও ভাইয়ের টাকা থেকেই দিতো। তার মা নাজমা বেগম প্রতি নিয়ত কান্না – কাটি করে বাড়ি ফেরার জন্য। বলতে গেলে একটাই ছেলে তার। বড় জন বিদেশে সেটেল বছরে একবার আসে । কাছে ছিল এই একটা মাত্র ছেলে সেও এখন নেই। রাস্তার দূরত্ব খুব বেশি নাহলেও যাবার কোনো পরিস্থিতি নেই। তার স্বামি মতিউর রহমান বলেছেন ছেলের কাছে যেতে হলে তার সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করে যেতে হবে।
এতসব কাহিনীর মূলে চৌধুরি বাড়ির বড় কন্যা। তাকে কেন্দ্র করেই বাবা – ছেলের মধ্যে এত বি’বাদ।যদিও এতে তার কোনো হাত নেয়।
মেহেদীর ধারণা সেদিন তার মা আহিদের ফ্যামিলির কাছে কোনো প্রস্তাব রাখেনি।তাকে মি’থ্যা বলেছে ! কিন্তু সে জানেনা ,তার মা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে কতবার চৌধুরীদের কাছে তাদের মেয়ে আনার কথা তুলেছে। চৌধুরীরাও বুদ্ধিমান ! সরাসরি ‘ না ‘ বললেও কথার ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে তারা মেয়ে দিতে ইচ্ছুক নয়। কিন্তু,মেহেদীর এক কথা তারা তো ‘ না ‘ বলেননি।
মতিউর রহমানেরও একই কথা , ‘ তাদের কিসের কম আছে ? চৌধুরীদের থেকে তারাও কোনো অংশে কম নয়।তাদের ছেলেরও কোনো খারাপ রেকর্ড নেই।দেখতে শুনতেও কম না।তাহলে কেন বারবার ছোট হতে যাবে? ‘ কিন্তু ছেলে তার কিছুতেই মানবে না।
এখন ছেলেকে ফোন দিয়ে অঝোরে কা’ন্না করছেন নাজমা বেগম।মেহেদী কানে ফোন ধরে বসে আছে। মাকে কত বোঝাচ্ছে ,কান্না করতে বারন করছে ,কিন্তু কোনো কথাতেই কাজ হচ্ছে না। তার ধারণা ছেলে তার ঠিকমতো খায় না,শরীরের যত্ন নেয় না, শুকিয়ে আচা হয়ে গিয়েছে। আসলে এমন কিছুই হয়নি। মেহেদীর ধারণা সে আরো মোটা হয়েছে। কিন্তু তার মা সেটা কিছুতেই মানবেন না। তারও কিছু করার নেই। বসে বসে মায়ের কান্না শুনছে। নাজমা বেগম সুর তুলে কান্না করতে করতে বললেন,
” বাড়িতে ফিরে আয় মনা। তোর বাবাকে আমি বুঝিয়ে বলবো।চৌধুরী বাড়িতে আমি আবার সম্বন্ধ নিয়ে যাবো। তুই বাড়িতে আয় ”
” এতো কান্না করো না তো মা। বাড়িতে আমি ফিরব তবে একা না তোমার পুত্রবধূ সাথে নিয়ে ফিরবো। তুমি কান্না – কাটি করে শ’রীর খারাপ করো না।শুধু দোয়া কর,আমি যেন আমার কাজে সফল হতে পারি ”
নাজমা বেগমের মুখে একই কথা।তিনি ফের বললেন,
” বাড়িতে ফিরে আয় পরান। ”
” কান্না থামাও আম্মু। প্লিজ, মা। তুমি এভাবে কান্না করলে আমার ভালো লাগে বলো? আর এভাবে কেঁদে – কে’টে ,ঠিক মতো শ’রীরের যত্ন না নিয়ে অ’সুস্থ হয়ে পড়ে থাকলে কিন্তু আমার বউ দেখবে না,আগেই বলে দিলাম । রো’গী টানতে বিয়ে করবো না আমি। তোমার বড় ছেলের বউকে দেশে এনে নিজের সেবা করিও। ”
চোখের কোনে পানি থাকা সত্ত্বেও ছেলের কথায় হেসে ফেললেন নাজমা বেগম।তিনি হাসি – কান্না মিশ্রিত গলায় বললেন,
” বিয়ের আগেই বউয়ের জন্যে এত দরদ।বিয়ে করলে তো মাকে ভুলে যাবি ”
” সেটা না হয় গেলাম।তোমাকে মনে রাখার জন্য তোমার স্বামী আছে,আমার বউকে মনে রাখার জন্য কে থাকবে? নিশ্চয়ই তার স্বামী থাকবে।হিসাব বরাবর ”
আরো নানান কথা বলে মায়ের মন ভালো করতে শুরু করলো মেহেদী।বাড়ি ছাড়ার পর থেকে এটা তার রোজকার কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।প্রতিদিন রাতে মা কল করে কান্না – কাটি করবে আর সে এটা ওটা বলে হাসানোর চেষ্টা করে যাবে।
” আবার তোমার ছেলেকে কল করেছো? বলেছি না ওই ছেলেকে ভুলে যেতে। যে নিজের বাবা মায়ের সম্মানের কথা ভাবে না তার সাথে এত কিসের কথা ? ”
ক্ষি’প্ত গলায় বললেন মতিউর রহমান।
মাত্রই বাড়ি ফিরেছেন তিনি।এসে স্ত্রীর চোখের কোনে শুকনো পানি দেখেই বুঝেছেন সে ছোট ছেলের সাথে কথা বলছে। মেহেদী চলে যাবার পর অফিসের সব কাজ এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। দিন রাত খেটে সবটা পুনরায় গুছিয়েছেন তিনি।ব্যবসায় কতটা লস হয়েছে ওই ছেলের কোনো ধারণা আছে? এখন আবার বাড়ি ফিরে সেই ছেলের সাথে কথা বলতে দেখে মে’জাজ অটোমেটিক্যালি বি’গড়ে গিয়েছে তেনার।
মেহেদী বাবার কথা স্পষ্ট শুনেও কোনো প্রতিত্তর করলো না। দাঁত চেপে সবটা শুনে মাকে বললো,
” রাখছি ! আবার পরে কথা বলবো ”
নাজমা বেগম কল কেটে কান্না মিশ্রিত গলায় স্বামীকে বললেন,
” মেহেদী একা আমার সন্তান না । ”
” ওকে জন্ম দেওয়াই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পা’প ”
চোয়াল শক্ত করে বসে আছে তূর্য। দুই হাত শ’ক্ত করে মুঠ করে রেখেছে । যার দরুন হাতের ভাসমান শি’রাগুলো আরো তিনগুণ ভেসে উঠেছে।রা’গে মাথা দ’পদপ করে জ্ব’লছে। কত সা’হস বেড়েছে স্টু’পিডটার।ডিনার পর্যন্ত করতে আসেনি। আগে ভাগে খেয়ে রুমে বসে আছে।
সে তো কখনোও বলেনি কথা বলবে না। যদি মুখদর্শনই বন্ধ করে দেয় তাহলে সে কথা কিভাবে বলবে? এখন কি রুম বয়ে গিয়ে পা ধরে কথা বলবে? হাতের কাছে পেলে আগে চ’ড়িয়ে চাপা লাল করবে ,তারপর বাকি কাজ। কিভাবে নিজেকে ও?
এত নাটকই বা কবে থেকে শুরু করলো ! এই মেহেদীর কাছে গিয়ে ক্যামিস্ট্রি শিখছে নাকি ড্রামা শিখছে কে জানে! কী কী কান পড়া দিচ্ছে আল্লাহ ভালো জানেন।
আজগুবি সব ভাবনার মাঝে তূর্য হঠাৎ লক্ষ্য করলো দরজার পাশের পর্দা নড়ছে। নিশ্চয়ই কেউ এসেছে। আর এখন আহি ছাড়া আসার মতো আর কেউই নেই,এই ভেবে তি’র্যক হাসলো সে।এতক্ষণ ধরে মস্তিষ্কে ওঠা রা’গ আস্তে আস্তে ঠান্ডা হতে শুরু করেছে।তবুও মুখে কপট গা’ম্ভীর্যতা টেনে একই কায়দায় বসে রইলো যেন দরজার ওপারে সে কাউকেই দেখেনি।
এখন সে বোঝাবে কত ধানে কত চাল। খুব বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে আজকে। নাকের পানি – চোখের পানি এক করে দ্যান ছাড়বে। এভাবে ঢং করে থাকার ঝা’ল সুধে – আসলে মেটাবে। জাস্ট একবার রুমে আসুক।তারপর দেখাবে খেলা।
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৮
” ভাইয়া,এই অংকটা করে দেও ” তার সকল ভাবনার ইতি ঘটলো এই কথায়।তাহির কন্ঠ শুনে আবারো আশাহত হলো তূর্য।তাহলে ওটা তাহি ছিল। বুক চি’রে একটা দীর্ঘ’শ্বাস বেরিয়ে আসলো। বিড়বিড় করে আউড়ালো ,
” আর কত জ্বা’লাবি আহি?” আর বোনকে বললো,
” ভাইয়া একটু টে’ন্সড আছি।আহি আপু বা শান্ত – প্রান্ত ভাইয়ার কাছে যাও ”
