Home আনহেলদি অবসেশন আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৬

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৬

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৬
কায়নাত খান কবিতা

—-নিজের থেকে নয় বছরের ছোটো মেয়ের জন্য এতো পাগলামি করতে বিন্দু মাত্র লজ্জাবোধ হয় না তোর কিং?
হসপিটালের করিডোরে দাড়িয়ে কিংশুককে উদ্দেশ্য করে খুব রাগান্বিত হয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় আতিয়া বেগম। দু-টো প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ে, অবিবাহিত। বিয়ে ঠিক করা হয়েছে তাদের, কিন্তু হয়নি এখনো ও। তার আগেই কিংশুক অরিনের প্রতি যতটা অধিকার ফলায় ততটা হয়তো আপন স্বামী ও ফলায় না। এই কয়মাসে কিংশুক অরিনের জীবন এতোটাই অস্বাভাবিক করে তুলেছে, যতটা জেল বন্দী কয়েদিদের ও হয় না।

–লজ্জা? হুমমম।
বেঞ্চে বসা থেকে উঠে দাড়ায় কিংশুক। ধরতে গেলে গত তিন ঘন্টা যাবৎ সে অরিনের কেবিনের বাইরে বসে রয়েছে। পুরো হসপিটালের সব ডাক্তারদের শান্তি হারাম করে দিয়ে নিজে খুব শান্ত ভঙ্গিতে বসে থাকে কিংশুক। কারণ কিংশুক জানে, অরিনের কিছু হবে না। নিজের হাতের উপরে ভরসা রয়েছে তার। যেই হাত ভালোবাসার জন্য উঠেছে, সেই হাত কখনোই তার প্রাণ ভোমরার ক্ষতি করতে পারবে না।তার আগেই অসার হয়ে পরবে কিংশুকের হাত।
–যখনই ওই রূপ স্মরণ হয়, থাকে না লোক ও লজ্জার ভয়।’

কিংশুকের এমন খাপছাড়া কথা গুলো শুনে বড্ড রাগ হয় আতিয়া বেগমের।সে নিজ হাতে যেখানে অরিনের জীবন ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে সেখানে ভালো বাসা কী আদোও রয়েছে? আর যদি থাকে ও তবে এটা কেমন ভালোবাসা? যেই ভালো বাসাতে অপর প্রান্তের ব্যক্তি মন খুলে নিঃশ্বাস ও নিতে পারবে না? এটা ও ভালো বাসার কাতারে পরে? আতিয়া বেগমের বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে আজ, কি চাইছে কিংশুক?
–একটা কথা বলবি কিং?একদম সত্যি করে! ”
কিংশুক জিজ্ঞেসা বোধ দৃষ্টিতে তাকায় আতিয়া বেগমের পানে। এমন কোন বিষয় রয়েছে যেটা আতিয়া বেগমের অজানা?

— তুই কি সত্যি অরিনকে পছন্দ করিস?
–নাহ।
কিংশুকের এই বাক্যই ছিলো আতিয়া বেগমের পায়ের নিচ থেকে জায়গা কেড়ে নেওয়া জন্য। যদি পছন্দই না করে তাহলে এতো আয়োজন কীসের? তবে কেন এতো পাগলামি?
‘–তাহলে এতো আয়োজনের কীসের? বিয়েটা কেন করছিস?”
–ভালোবাসি মনি। তুমি পছন্দের কথা বলেছো। আমি ওকে কোনো কালেই পছন্দ করিনি। সব সময় ভালো বেসেছি৷”

— কিন্তু ও যদি তোকে না ভালো বাসে তখন?
— সময় আছে। বাসতে বলো। না বেসে যাবে কোথায়।
কিছু কিছু মানুষ থাকে না? যাদের নিজেদের ইচ্ছে হচ্ছে প্রথম প্রায়োরিটি, কিংশুক ছিল ঠিক সে-রকমই। তার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে অরিনকে ভালো বাসে। অরিন তাকে ভালো বাসলো কি-না এটা তার দেখার বিষয় না। যেহেতু সে বাসে অরিন ও বাসতে বাধ্য।
— ও তোকে ঘৃণা করে কিং।
— এন্ড আই ইউয়েল ট্রান হার হেট ইন্টু লাভ”
–হাউ? বাই হার্টিং হার?”
আতিয়া বেগমের কথার কোনো উত্তর ছিলো না কিংশুকের কাছে। এটা তো সত্যি যে, সে বার বার না চাইতে ও অরিনকে কষ্ট দিয়ে ফেলছে। কিন্তু তার মনে বিন্দু মাত্র অনুশোচনা নেই। কিংশুকের ভাবমূর্তি দেখে মনে হচ্ছিল সে যেনো জন্ম থেকেই অরিনকে কষ্ঠ দেওয়ার অধিকার নিয়ে এসেছে।

—- প্রায় চার ঘন্টা পর আস্তে আস্তে চোখ খুলতে থাকে অরিন! গলাটা বেশ ব্যাথা। চোখ খুলে ধীরে ঢোক গিলে। বেশ সমস্যা হচ্ছে। ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ফেলে বাম হাতের দিকে তাকায়, স্যালাইন চলছে। নিজের এই করুন দশা দেখে খুব আফসোস হচ্ছে তার। অজান্তেই চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পরে। ঢোক গিলতে গিয়ে অরিনের ব্যাথার পরিমাণ আরে দ্বিগুণ বেড়ে যায়। গলা দিয়ে কোনো প্রতিধ্বনি বের না হলে ও রুহ থেকে একটা আর্তনাদ ঠিকই বের হয়। যেখানে ঢোক গিলতে ও এতো কষ্ট হচ্ছে, সেখানে কথা কবে বলতে পারবে সেটা ও খুব ভাবাচ্ছে অরিনকে।
” ওয়েক আপ জান?”
কিংশুকের কন্ঠস্বর কানে ভেসে আসতেই তড়িৎ গতিতে ডান পাশে ফেরে অরিন। সোফাতে গা এলিয়ে বসে রয়েছে কিংশুক। খুব জোড়ে জোড়ে নিঃশ্বাস ফেলতে থাকে অরিন। প্রথম গোলাপের পাপড়ি খাওয়ানো তারপর গলা টি পে ধরা, আজকে সে কিংশুকের এতো এতো রূপ দেখেছে, যে তার ছায়াকে দেখলে ও অরিনের রুহ অব্দি কেঁপে উঠছে।

–রিল্যাক্স বেবি গার্ল। আম হেয়ার ইউথ ইউ। ওয়াই সো প্যানিক? ”
কিংশুক এসে সোজা অরিনের পাশে এসে দাড়ায়। তারপর ইশারা করে অরিনকে তাকে জায়গা দেওয়ার জন্য। কিংশুকের ইশারা বুঝতে পেরে অরিন বেশ অনেকটাই সরে যায়। অরিন সরে যাওয়ার সাথে সাথে কিংশুক কিংশুক তার পাশে শুয়ে পরে তার পেটে হাত দিয়ে।
— দেখো জান, তোমার তো আমি ছাড়া স্পেশাল কেউ নেই! নেই তো?
বাম পাশের ভ্রু কুঁচকে কিংশুক আধশোয়া হয়ে অরিনের মুখ বরাবর তাকায়।
কিংশুক তাকানোর সাথে সাথে অরিন মাথা নেড়ে না বোঝায়। কিংশুক ছাড়া তার জীবনে স্পেশাল কেউ নেই।
–আই নিউ ইট। ইউ হ্যাভ অনলি মি। ”
অরিনের ললাট হতে চুল গুলো কানে গুঁজে দিতে থাকে কিংশুক। বেশ অস্বস্তি লাগে অরিনের। বিয়ের আগে বার বার এভাবে কিংশুকের এতো কাছে আসা অরিনের বিরক্তির কারণ। কিংশুক এতো কিছু বুঝে কিন্তু হালাল আর হারামের তফাৎ বুঝে না?

–আমার সাথে কথা বলা ছাড়া তো তোমার কোনো কাজ নেই। সো, যেই গলা দিয়ে আমার জন্য শব্দ বের হয় না, সেই গলা না থাকলেই কি বা আসে যায় জান? ”
কিংশুকের ঠান্ডা কন্ঠের ভয়ংকর হুমকি বেশ ভালো মতোই টের পায় অরিন। সোজাসাজি কিংশুক তাকে কি বোঝাতে চাচ্ছে এটা ও অরিন ভালো মতোই বুঝেছে।
— যদি সারাজীবনের জন্য বো’বা না হতে চাও, তবে শুধু আমার সাথেই কথা বলবে। না-হলে!!! ”
মাথা নেড়ে কিংশুককে ঠান্ডা হতে বলে অরিন। সে এখন থেকে শুধু মাত্র কিংশুকের সাথে কথা বলবে বলপ প্রতিশ্রুতি দেয়।
অরিনের এতো সহজে মেনে নেওয়াতে খুব খুশি হয়ে যায় কিংশুক। সে অরিনের কপালে শব্দ করে চু’মু খায়।

— কথা ছিলো তোমার সাথে পাশা খেলবো, সেখানে সাপলুডু খেলছি। প্লিজ জান, আর রাগিও না আমাকে।
অরিন চুপচাপ কিংশুকের কথা গুলো শুনতে থাকে। এমনিতেই গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে, তার উপরে যদি ধ্যান ও অন্য দিকে দেয়, কিংশুক অরিনের চোখ না খু লে মার্বেল খেলে।
–তিন দিন পর আমাদের বিয়ে। চলো বাড়ি যায়। প্রিপারেশন নিতে হবে তো।”।
কিংশুক উঠে অরিনের হাতে থাকা ক্যানোলাটি এক টান দিয়ে খুলে ফেলে। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে অরিন। হাত ধরে প্রচন্ড কান্নায় ভেঙে পরে। সে তো এতোক্ষণ চুপচাপ কিংশুকের সব কথায় শুনছিল, তাহলে হঠাৎ এমন করার কারণ কী?
–কষ্ট হচ্ছে না?
অরিন মাথা নেড়ে হ্যা বোঝায়। তার খুব কষ্ট হচ্ছে। সব থেকে বেশি কষ্ট হচ্ছে কিংশুকের উপস্থিতি নিজের জীবনে দেখে।
— আমার ও হয়েছিল, যখন তোমার ধোঁকার কথা জানতে পারি। ”

চোখ বড় বড় করে তাকায় অরিন কিংশুকের দিকে। তার মনে যদি এখন ও সেগুলোই থাকে তাহলে ভবিষ্যতে তারা সুখি হবে কীভাবে? এতো শা স্তি, এতো কঠোরতা, তারপর ও কি কিংশুকের মন গলেনি? এতোটাই শক্ত সে?
কিংশুক অরিনকে কোলে তুলে নেয়। অরিনের ঠিক কতটা লাগলো সেদিকে ধ্যান নেই বললেই চলে। অরিন ও চুপ হয়ে যায়। যেখানে ঘৃণার পরিমাণ বেশি সেখানে কান্নার ভাগ পরিমাণ কমে যাওয়ায় ভালো। কিন্তু অরিন এটা ঠিকই বুঝেছিল যে, কিংশুকের মনে তাকে নিয়ে রয়েছে শুধু ঘৃণা। এই ঘৃণার পারদ এতোটাই বেশি যে অরিনের অস্বিত্ব ও দেবে যাবে। নাগাল পাওয়া যাবে না বিন্দু মাত্র সুখ।
কিংশুক অরিনকে নিয়ে বাইরে বের হতেই সব গার্ডরা চোখ নিচে নামিয়ে ফেলে। আতিয়া বেগম এবং ক্যাটরিনা পাশে থেকে কিছু করতে পারছে না। চুপ হয়ে রয়েছে।

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৫

— ওজন কত তোমার?”
জিজ্ঞেসার দৃষ্টিতে কিংশুক অরিনের পানে তাকায়। কিন্তু অরিন তো কথা বলতে পারছে না। সেটা ও কিংশুকের কৃপায়।তাই চুপ হয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তার।
–হুমম। লেমমি গেস। ৪৮?”
মাথা নেড়ে কিংশুকের কথায় সম্মতি জানায় অরিন। তার ওজন ৪৮।
–আমাকে সামলাতে পারবে?”

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৭