Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৭

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৭

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৭
রাফিয়া জান্নাত রিফা

সারা রাতটাই হাসপাতালের নিস্তব্ধ করিডোরে কেটে গেল নাঈম তালুকদারের। ভোরের আলো ফুটতেই তার জ্ঞান ফিরে আসে, আর সেই সঙ্গেই ফিরে আসে চিরচেনা একরোখা জেদ তিনি আর কোনোভাবেই এই হাসপাতালের চার দেয়ালের মধ্যে থাকতে রাজি নন। চিকিৎসকদের বহু অনুরোধ উপেক্ষা করে শেষমেশ সিদ্ধান্ত হয়, সকাল দশটার মধ্যেই তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হবে।

এদিকে তালুকদার বাড়ির ড্রয়িং রুমে এক অদ্ভুত উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষার ভার জমে উঠেছে। নাঈম তালুকদারের জন্যই সবাই সেখানে অধীর হয়ে বসে আছে। গতকাল দুপুরে ঘটনাটি শোনামাত্রই তিন গিন্নি ছুটে যেতে চেয়েছিলেন হাসপাতালে, কিন্তু আলবান আর আর্দ্র দৃঢ় কণ্ঠে সে ইচ্ছা রুখে দেয়। শুধু তাই নয়, ইতি আর নিধিকেও যেতে দেওয়া হয়নি। পরিস্থিতির গুরুত্ব তারা বোঝে, তবু ভেতরে ভেতরে উদ্বেগের ঢেউ কাউকেই শান্ত থাকতে দেয়নি।
কাল রাত থেকে কারও চোখে ঠিকমতো ঘুম নেই, মুখে রুচি নেই খাবারের। আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা মিলেমিশে পুরো বাড়িটাকে যেন ভারী করে রেখেছে। হাসপাতালেই নাঈম তালুকদারের পাশে থাকতে চেয়েছিল বিথী, কিন্তু বহু জোরাজুরির পর তাকে রাতেই বাড়ি পাঠানো হয়। কারণ সামনে বড় দায়িত্ব ইতি, বিথী, নিধি আর সুহানার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা।

তালুকদার বাড়ির বাতাসে তাই আজ সকালটা কেবল অপেক্ষার নয়, আশারও। সবাই জানে, নাঈম তালুকদার ফিরছেন শরীর দুর্বল হলেও মন এখনো দৃঢ়।
এখন ইতি বিথী নীধি মতে বাবাকে এ অবস্থায় রেখে কিছুতেই তারা পরিক্ষা দিতে যাবে না।
নাঈম তালুকদারকে বাড়িতে আনা হলো,তার কানে কথা খানা গেলো যে ইতি, বিথী, নীধি পরিক্ষা দিবে না,তখন তিনি তাদের বুঝালেন এবং পরিক্ষা দেওয়ার জন্য রাজি করালেন।

নাঈম তালুকদারের এই করুণ অবস্থায় দির্শকের অন্তরে বিন্দুমাত্র অনুশোচনার ছায়া পড়েনি। বরং সময়ের নিরিখে এক নির্মম সত্যই ধরা দিয়েছে ঠিক সেই মুহূর্তে দির্শক যদি রক্ত না দিত, তবে হয়তো নাঈম তালুকদারকে বাঁচানোই সম্ভব হতো না। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দির্শকের সেই সিদ্ধান্তই হয়ে উঠেছে নিয়তির মোড় ঘোরানো অধ্যায়।
এই কথা যখন নাঈম তালুকদারের কানে পৌঁছাল দির্শকই তাকে রক্ত দিয়েছে তখন থেকেই তার দৃষ্টিভঙ্গিতে এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা দিল। কণ্ঠে না বললেও, চোখে-মুখে দির্শকের প্রতি এক গভীর কৃতজ্ঞতা আর নরম মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠল। যে মানুষটিকে হয়তো তিনি এতদিন অন্যভাবে দেখেছেন, আজ তার অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর এই পরিবর্তনটাই দির্শক চেয়েছিল নিঃশব্দে, বিনিময়হীন এক কর্তৃত্ব।
এদিকে সিদ্দিকী বেগমের মুখের দিকে তাকানোই কষ্টকর। স্বামীর চিন্তায় তার মুখ শুকিয়ে কাঠ, অতিরিক্ত কান্নায় চোখ দু’টো লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। নিধি আর ইতিকে জড়িয়ে ধরে তিনি কতবার যে কেঁদেছেন, তার হিসেব নেই। বুকভরা উৎকণ্ঠা আর ভাঙা সাহস নিয়ে তিনি এখন নিঃশব্দ। কোনো অভিযোগ নেই, কোনো উচ্চারণ নেই শুধু স্বামীর পাশে বসে তার সেবা করে যাচ্ছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা শেষ হলো। দীর্ঘ অপেক্ষা আর মানসিক চাপে ভরা সেই দিন শেষে ইতি, বিথী, নিধি ও সুহানা ফিরেছে বাড়ি। ক্লান্ত শরীর, অবসন্ন মন সব মিলিয়ে ঘরে পা রেখেই যেন শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসে। ইতি, বিথী ও নিধি শুয়ে পড়ে চোখ বুজলেই পরীক্ষার খাতা, প্রশ্নের ধাঁধা আর সময়ের তাড়া ভেসে ওঠে।
ইতি আর নিধিকে প্রায়ই বলা হয়,,
“তোরা তোদের স্বামীর ঘরে যা।”

কিন্তু আশ্চর্য, কথাটা তাদের কানে গিয়েও মন ছুঁয়ে যায় না। যেন বিয়ে হয়েছে এই বাস্তবতাই স্মৃতির গহ্বরে হারিয়ে গেছে। পড়াশোনা, স্বপ্ন আর নিজের অস্তিত্বের লড়াইয়ের ভিড়ে সংসারের পরিচয়টা আজও তাদের কাছে অস্পষ্ট, অনির্দিষ্ট।ইতি আলবানের ঘরে চুপচাপ যাবে গিয়ে ঘরের কোন জিনিস ফেলে দিয়ে ভৌ দৌড় লাগাবে।
আজ সুহানা ও হরলিক্স গ্রামের বাড়ির পথে রওনা দেবে।
হরলিক্সের সঙ্গে সুহানার বারবার চোখাচোখি হয়ে যায়। মুহূর্তের সেই মিলনেই সুহানার বুকের ভেতর কেমন যেন ঢেউ ওঠে। বেচারি সুহানা লজ্জায় পড়ে যায় চোখ নামিয়ে নেয়, ঠোঁট কামড়ে ধরে। অথচ চোখ নামালেও মন তো আর নামতে চায় না।

হরলিক্স আর সুহানা দুজনেই দুজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েই ইতস্তত বোধ করে। কত কথা জমে আছে মনে, অথচ মুখ খুললেই শব্দেরা যেন এলোমেলো হয়ে যায়। ইদানীং সুহানা খুব লজ্জায় থাকে হরলিক্সের সামনে পড়লেই তার গা কাঁপতে শুরু করে, বুকের ভেতর অকারণ ধুকপুকানি। নিজের এই অস্থিরতায় সে নিজেই অবাক হয়।
বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে থাকা নিধির হঠাৎই মনে পড়ে গেল সে তো আর আগের মতো মেয়ে নেই, সে এই বাড়ির বউ। এই বোধটা বিদ্যুৎচমকের মতো তার চেতনায় আঘাত করল। মুহূর্তেই শরীরের অলসতা উবে গেল, ঘুমের ভার সরে গেল চোখ থেকে।

“আমি এভাবে পড়ে আছি কেন?”নিজেকেই প্রশ্ন করে নিধি। বুকের ভেতর কেমন এক অজানা অস্বস্তি জন্ম নেয়, লজ্জা আর দায়িত্ববোধ মিলেমিশে তাকে অস্থির করে তোলে।
এক লাফে সে শোয়া থেকে উঠে বসে, তারপর আর এক মুহূর্ত দেরি না করে তড়িৎ বেগে দৌড় দেয় আলিফা বেগমের ঘরের দিকে।
উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা বিথীর ফোনে হঠাৎ টুং করে মেসেজ আসল। বিথী অলস ভঙ্গিতে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ছোট্ট এক লাইনের বার্তা,,
“বাগানে আসো।”
এক মুহূর্তে তার বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। কে পাঠাল, কেন পাঠাল এই প্রশ্নগুলো মাথায় আসার আগেই মনে অজানা এক আলোড়ন। আঙুলের ডগা কেঁপে উঠল, চোখ দুটো স্থির হয়ে রইল শব্দগুলোর ওপর।সে ও বাগানে চলে গেল।

এবার হঠাৎ করেই আলবানের কর্কশ কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ইতির কানে। রাগে কাঁপা সেই ডাক সরাসরি তাকেই উদ্দেশ করে। ইতির বিরক্তি হলো এতে,,
সে কি ইচ্ছে করেই ওনার ঘরে গিয়ে ভুলভাল কাজ করে? নাকি যা হয়, তা অজান্তেই হয়ে যায়? তার জন্য এত বকাঝকারই বা কেন?
অসহায় মুখ করে বিছানা ছেড়ে উঠল ইতি। পা দুটো যেন ভারী হয়ে এসেছে, তবু টুলতে টুলতে আলবানের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল সে।ঘরের ভেতরে পা রাখামাত্রই আচমকাএকটা জোরে থাপ্পড়।আঘাতে ইতির মাথা একপাশে ঘুরে গেল। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে এসে মুখ ঢেকে ফেলল। মুহূর্তের জন্য তার চোখে অন্ধকার নেমে এলো, কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ।
চুল সরিয়ে রাগে জ্বলতে থাকা চোখ তুলে তাকাল ইতি। কাঁপা ঠোঁটে, চাপা গলায় সে রাগ দেখিয়ে বলল,,,,

__ বাল মারছেন কেন?
কর্কশ কন্ঠে আলবান বলে,,
__ চিরুনিতে এসব কি?
ইতি আলবানের হাতে থাকা কার্বন ফাইবার কম্বর দিকে তাকিয়ে মুখ আমুট চুমুট করে বলে,,
__ ও ওটা দিয়ে দাদির মাথার চুল চিরুনি করে দিয়েছি তাই চিরুনিতেই চুল গুলো রয়ে গেছে,তা তাতে ক কি হয়েছে?এতে ষাঁড়ের মতো চিল্লানোর কি আছে?
আলবান আবার মারতে যায় ইতিকে,ইতি এবার অন্য দিকে দৌড়ে পালালো, আলবান দাঁত কটমট করে বলে,,,
__ এটা ছেলেদের চিরুনি,তুই দাদিমার মাথা চিরুনি করতে গেলি কেন, ইডিয়ট?
__ বালের চিরুনি ওটা,ওই চিরুনির কারণে দাদির মেলা চুল উপড়েছে,এই কারণে দাদি মেলা কান্না করলো ও দাদুকে বিচার দিল, সাথে বললো আমি নাকি স্বামী সংসার করতে পাবো না।
বিরক্তির দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আলবান বলে,,

__ ধর পরিষ্কার করে দে?
ইতি ভয় ভয় করে বলে,,
__ মারবেন না তো?
__ না।
ইতি পা টিপে টিপে এলো আলবানের নিকটে,খপ করে আলবান ইতির হাত দুটো ইতির পিছনে চেপে ধরে তাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলে,,,
__ মেয়েলি প্রলেপ আমার মুখে লাগিয়ে দিয়েছিলি কেন?
ইতি শুকনো ঢোঁক গিলে বলে,,,

__ এ এমনি।
__ এমনি??
__ হ্যাঁ।
__ এখন শাস্তি হিসেবে কি দিবো?
কাঁপা কাঁপা স্বরে ইতি বলে,,
__ ক কি দিবেন মানে।
আলবান হেস্কি স্বরে বলে,,
__ এই শীতের সকালে গোসল করবি?
ইতি নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে বলে,,
__ মা মানে।
আলবান ইতির কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে, হিসহিসিয়ে বলে,,,
__ রোমান্টিক বাথ with হাজবেন্ড ওয়াইফ…

পরের কথা উচ্চারণের আগেই আলবান নীরবে ইতির ঠোঁটের ওপর নিজের হাত রেখে দিল। সেই মুহূর্তে ইতির বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কাঁপুনি উঠল হৃদস্পন্দন যেন ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ছে। শরীরের শিহরণ থামাতে পারছিল না সে। আলবান তা বুঝতে পারল ঠিকই, কিন্তু তার দৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা দেখা গেল না। ধীরে ধীরে তার স্পর্শ জামার আড়াল ভেদ করে ইতির কোমল কোমড়ে দিকে এগিয়ে এলো। ইতি আচমকা কেঁপে উঠল, শিরদাঁড়া বেয়ে কাঁটার মতো শিহরণ ছুটে গেল। ভীত আর অস্থির নিশ্বাস গিলে নিতে নিতে সে যেন নিজের মধ্যেই সঙ্কুচিত হয়ে পড়ল। এই স্পর্শে কোনো মিষ্টি কাতুকুতু নয়, বরং অজানা আশঙ্কা আর অনিশ্চয়তার ছায়া এসে বাসা বাঁধল ইতির মনে।

__ আ আমার কাজ আছে দাবানল ভাই,আমায় যেতে দিন?
__ স্বামীর সেবা ছাড়া আর কি কাজ থাকতে পারে তোর?
__ আ আ ছাড়ুন আমায়,বাবা অসুস্থ বাবার কাছে যাবো আর আমার পেটে কাতুকুতু লাগছে।
__ তোর বাপকে দেখার জন্য তোর মা আছে?
ইতি কিছু বলতে গেলে আলবান ফের হিসহিসিয়ে বললো,,
__ হুসসসস,আজ তোর কোন কথা চলবে না।
এই বলে ইতিকে কোলে তুলে বিছানায় আস্তে ধীরে শুয়ে দিলো, উদ্বিগ্ন হলো হতে লাগলো ইতির নিকটে,ইতি ছটফট করতে লাগলো কিন্তু পারলো না কারণ তার হাতের আঙ্গুল আলবান নিজের আঙ্গুলের ভাঁজে চেপে রেখেছে শক্ত করে,আলবানের ঘনঘন নিশ্বাস চোখে মুখে আঁচড়ে পড়ছে ইতির, ইতির মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না, মেয়েটা আঁতকে উঠছে বারংবার,ইতি বোধহয় আলবানের পরবর্তী পদক্ষেপ আঁচ করতে পেরেছে, কিন্তু বাঁধা দিতে পারছে না?কেন পারছে না?

জামা উন্মুক্ত করে আলবান হাত ইতির মূর্সণ কোমড় আঁকড়ে ধরে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো নাভির আশে পাশে,আলবান ঘোর লাগা দৃষ্টি দিয়ে দেখতে লাগলো ইতির ফর্সা উদার,ইতি চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে রেখেছে ‌। আলবান আস্তে ধীরে আসলো ইতির মুখের কাছে,ইতির ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে,,
__ শীতের সকালটা আমার নামে লিখে দে, প্রমিস কষ্ট দিবো না।
কান গরম হয়ে এলো ইতি,চোখ জোরা আরো খিচে নিলো,আলবান এবার পড়নের শার্ট খুলে ফেলে দিলো,নিজ কাজে আবার মনোনিবেশ করলো,ঠিক তখনি হলো আর এক বিপত্তি।
আছিয়া বেশ জোরে জোরে ইতি ইতি বলে ডেকে এই রুমেই আসছে,দরজা খোলা মাথায় আসতেই ইতি তড়াৎ করে চোখ জোড়া খুলল,ভ্রম থেকে বেড়িয়ে আসলো, আলবানকে নিজের উপর থেকে উঠানো বৃথা চেষ্টা করলো, হকচকিয়ে ইতি বলতে লাগলো,,

__ ছাড়ুন, ছাড়ুন দাদিমা আসছে।
আলবানের সেসবে তেমন কোন জায় আসলো না,,
__ আসুক।
ইতি এবার রাগ দেখিয়ে বলে,,
__ ছাড়ুন বলছি,।
__ ছাড়বো না, শরীরে আগুন ধরেছে।
__ ছাড়ুন, পানি আনছি?
__ উঁহু ওভাবে এই আগুন নিভবে না।
ইতি তাড়া দিয়ে ফের বলে,,
__ এই দাদি এলো বলে।
__ বললাম না আসুক।
ইতি এবার হাত জোর করে কান্নারত ভঙ্গিমায় বলে,,
__ দয়া করে ছাড়ুন প্লিজ।
আলবান কিছু একটা ভেবে বলে,,
__ ছাড়বো কিন্তু একটা শর্তে ‌
__ কি শর্তে।
__ আজ রাতে স্বেচ্ছায় আমার কাছে আসবি বাসর করতে?
ইতি আগপাছ কিছু না ভেবে বলে,,
__ আচ্ছা, আচ্ছা, এখন ছাড়ুন।
আলবান ইতির উপর থেকে উঠে মেঝে থেকে শার্টটা তুলে পড়ে নিলো,এই সুযোগে ইতি ভৌ দৌড়, দরজার সামনে আসতে দাদিমার সাথে দেখা হলো ইতি,ইতির জোরে জোরে শ্বাস ফেলা দেখে দাদিমা বলে,,

__ কি রে এতো জোরে শ্বাস নিচ্ছিস কেন?
__ তোমার নাতির শরীরে আগুন ধরেছে তাই,আমি গেলাম পানি আনতে।
দাদিমা আবাক হয়ে বলেন,,
__ কি বললি?
ইতি খিলখিল করে হাসতে হাসতে মার দৌড়।
দাদিমা হকচকিয়ে আলবানের ঘরে প্রবেশ করে আলবান কে বলে,,,
__ দাদু ভাই তোর কি হয়েছে, কোথায় আগুন লেগেছে তোর ?
এক ভ্রু উঁচিয়ে আলবান বলে,,
__ আই অ্যাম ফাইন।
দাদিমা মুখ খানাকে অসহায় করে বলে,,
__ রাগ করেছি, আমার সাথে।
আলবান এবার মাথা চাড়া দিয়ে বলতে লাগলো,,
__ করবো না তো কি? বুঝতে পারছো সেদিন আমার কি অবস্থা করেছিলে,বউ চুমু দেওয়ার আগে তুমি চুমুতে মুখ গলা ও পুরো শরীর ভরিয়ে দিয়েছিলে।
__ আমি কি ইচ্ছে করে করেছি নাকি?
__ সে যেভাবেই করো,এখন আসি দাদিমা বেশ তাড়ায় আছি,পরে কথা হবে, আল্লাহ হাফেজ।

পার্কের ছোট পুকুরটির ধারে ঘাসে পা ছড়িয়ে পাশাপাশি বসে আছে দির্শক আর বিথী। কারও মুখে কোনো কথা নেই দুজনেই নীরবে পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে আছে, । বিথীর বুকের ভেতর জমে আছে অজস্র কথা বারবার মনে হচ্ছে, এবার বলবে,কিন্তু বলার মুহূর্তে গিয়েই শব্দগুলো গলায় এসে আটকে যাচ্ছে।
অথচ দির্শকের কথামতো আজ থেকেই নাকি তাদের প্রেম শুরু। বিথী নিজেও বুঝে উঠতে পারে না, দির্শকের সেই কথায় সে কেন রাজি হয়ে গেল। কোনো স্পষ্ট যুক্তি ছিল না, ছিল না কোনো প্রস্তুতি,তবু সে না বলতে পারেনি। কাল নাঈম তালুকদারকে রক্ত দেওয়ার পর এসব ভাবনা আর মাথায় ঘোরেনি বরং মানুষটাকে তখন তার বেশ ভালোই লেগেছিল। দির্শকের উপস্থিতি, তার নীরবতা,সব মিলিয়ে এক ধরনের বিশ্বাস জন্ম নিয়েছিল অজান্তেই।
কিন্তু বিথীকে কে বোঝাবে,এই সম্পর্কের পেছনে দির্শকের নিজের স্বার্থ লুকিয়ে আছে? কে তাকে বলবে, সব ভালো লাগা সব সময় নিঃস্বার্থ হয় না, আর সব নীরবতা গভীরতা নয় কখনো কখনো তা হিসাবেরও নাম?
বিথী বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ শুধু ভেবেই যাচ্ছে, বিথী হাঁটু মুড়ে বসে ঘাস খুঁটতে খুঁটতে বলে,,

__ আমার বাবাকে বাঁচানোর জন্য ধন্যবাদ স্যার।
দির্শক ফেচেল হেসে বলে,,
__ তুমি প্রেমিককে ধন্যবাদ বলছো?
বিথী দির্শকের চোখে তাকিয়ে ফের চোখ নামিয়ে নিলো,তা দেখে দির্শক বলে,,,
__ চোখে চোখ রেখে কথা বলো?
দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বিথী বলে,,
__আপনার চোখে জটিল সমীকরণে,আমি ব্যর্থ এক ক্যালকুলেটর।
__ সে জন্যই তো চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হবে,তবেই সঠিক ক্যালকুলেশন মিলবে। বুঝলে?
বিথী আর কিছু বললো না দির্শক ফের বলে,,,
__ পরিক্ষা কেমন হলো?
__ আলহামদুলিল্লাহ ভালোই?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে দির্শক ফের বলে,,,

__ আই ক্যান হোল্ড ইয়ু্র হ্যান্ড।
বিথী চমকে উঠলো, জ্বলজ্বল করা আখিপল্লবে দির্শকের পানে তাকালো,হুট করে বিথী বুকটা ধুকপুক ধুকপুক করতে লাগলো,এই প্রতুত্তরে কি বলা উচিত বিথীর ভেবে পেল না, মূহুর্তের মস্তিষ্কে সব কেমন এলোমেলো হতে লাগলো।
দির্শক বুঝলো, বিথীর নিরবতাই তাকে সায় জানালো,তাই আস্তে ধীরে হাত ছুঁয়ে দিলো বিথী হাতে, আঙ্গুলের ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দিলো পুরুষালী শীতল আঙ্গুল গুলো। বিথী ধরফরিয়ে উঠলো তবে সেটা নিরবে,শীতল শিহরণ বয়ে গেল বিথী শরীর বয়ে এতে শান্তি লাগলো বেশ,তখন আশেপাশের কোন এক দোকানের বক্সে গান বেজে উঠলো,,,

__ Main teri thi main teri hoon
Main teri hi rahungi
Duniya kahe pagal mujhe
Itni mohabbat tumse karungi
দির্শকের মনে ভাবনা এলো “গানকার অর্থ কি আদৌও তাদের সাথে যায়।”নিজের মধ্যেই সে প্রশ্ন রয়ে গেল।
একটু সামনে তাকাতেই বিথীর চোখে পড়ল একটি তরুণ যুগল। ছেলেটির কাঁধে নিশ্চিন্ত ভর দিয়ে আছে মেয়েটি, আর ছেলেটা শক্ত করে ধরে রেখেছে তার হাত। মেয়েটি মিটমিট করে হাসছে সেই হাসিতে লুকোনো আছে নির্ভরতা আর প্রশান্তি। দেখলেই বোঝা যায়, এই মুহূর্তে মেয়েটি ভীষণ খুশি, গভীর এক শান্তিতে ডুবে আছে।
দৃশ্যটা দেখে বিথীর মনে হঠাৎই প্রশ্ন জাগল তবে কি সত্যিই কারও কাঁধে মাথা রেখে এমন শান্তি পাওয়া যায়? অজান্তেই তার ইচ্ছে হলো দির্শকের কাঁধে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিতে। কিন্তু সে আর পারল না। সাহস কুলালো না । এমন উদ্ভট চিন্তা মাথায় আসায় মনে মনে নিজেকেই অশ্লীল কিছু গালি দিয়ে বসল।
একটার পর একটা শুকনো ঢোঁক গিলতে লাগল বিথী। বুকের ভেতর অদ্ভুত অস্থিরতা জমে উঠল। আড়চোখে দির্শকের দিকে তাকাতে লাগল সে।

গানটা শুনে বিথীর ভীষণ ভালো লাগছিল। মনে হচ্ছিল, গানের কথাগুলোর সঙ্গে নিজের জীবনের কোথাও যেন অদ্ভুত মিল খুঁজে পাচ্ছে সে। সুরের ঢেউয়ে মনটা হালকা হয়ে এল। দির্শক ধীরে ধীরে আরও একটু বিথীর পাশে ঘেঁষে বসল। কাঁপা কাঁপা হাতে সে আলতো করে বিথীর কাঁধে হাত রাখল। বিথী কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না,না সরে গেল, না তাকাল।
কিন্তু এই নীরবতার মধ্যেই বিথী আরেকটা কাজ করে ফেলল। মুহূর্তেই কী যে হলো, নিজেই বুঝে উঠতে পারল না মাথাটা এলিয়ে দিল দির্শকের কাঁধে। এবার আর লজ্জাবোধ হলো না তার,বরং এক গভীর শান্তি বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল, যেন বহুদিনের ক্লান্তি হঠাৎ থেমে গেছে।
তাদের এই অদৃশ্য, শব্দহীন প্রেমের নীরব সাক্ষী হয়ে রইল ছোট্ট থৈ থৈ করা পুকুরটা। আর দির্শকের শরীরের হালকা পারফিউমের ঘ্রাণ নাকে আসতেই বিথীর শরীর শিহরিত হয়ে উঠছিল বারবার, নিঃশব্দে।
দির্শকের চোখ বন্ধ করে কিছু একটা অনুভব করতে ব্যস্ত মনে সাথে মিল দিতে ব্যস্ত,মনে মধ্যখানে বন্ধ করে রাখছে এই সুন্দর অনুভূতি গুলোকে,তা দেখে বিথী বলে,,

__ আপনার যা করছেন ভেবে চিন্তে করছেন তো?
দির্শক চোখ খুলে বিথী চোখে চোখ রেখে, বিথীর মুখে আঁচড়ে পড়া কিছু চুল কানের পিছনে গুজে দিতেই বিথী আরও একবার কেঁপে উঠল তা অনুভব করলো দির্শক,,
__ আমি যা অনুভব করছি তুমিও কি তাই অনুভব করছো বিথী?
দুই ভ্রু উঁচিয়ে বিথী বলে,,
__ কি অনুভব করছি তা জানি না দুষ্শমন স্যার, কিন্তু আমার এই শান্তিটাকে লাগবে এটাই বেশ ভালো ভাবেই অনুভব করলাম।
দির্শক হো হো করে হেসে বলে,,
__ ফেঁসে যাচ্ছো না তো উজ্জ্বল নারী।
বিথী মাথা নিচু করে নিলো এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছেও নেই।দির্শক বিথীর হাত ধরে উঠে দাঁড়াল,,

__ চলো ওই দিকে যাই।
বিথী উঠে দাড়ালো,দির্শক বিথী হাত ছাড়লো না বরং আঙ্গুলের ভাঁজে আরো শক্ত করে চেপে হাঁটতে লাগলো, বিথী কিছু একটা ভেবে বলে,,
__ এভাবে যে ধরেছেন যদি চেনা পরিচিত কেউ দেখে ফেলে তখন?
__ বড় জোর বিয়ে দিয়ে দিবে,যা সম্ভব ও না। এমনিতেও তোমার বাবাকে আমার পোটানো আছেই,তো সমস্যা কোথায়,বলো?
অবুঝের মতো মুচকি হেসেই গেল বিথী পথের ধারে দির্শক দেখলো বকুল ফুলের মালা, বিথীকে সেদিকে নিয়ে গেলো,বকুল ফুলের মালা খানা নিয়ে খুব যন্তের সহিত বাম হাতে পড়িয়ে দিলো, বিথী হাতটা নাকের সংস্পর্শে এনে গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,,

__ নাউ পারফেক্ট, এবার তোমার পালা।
বিথীও মুচকি হেসে নিজের হাতখানা নাকের কাছে তুলে এনে গভীর শ্বাস নিল। এক অদ্ভুত শান্তি তার ভেতর জেগে উঠল মুহূর্তটুকু তাকে ছুঁয়ে রইল নিঃশব্দে। সে দির্শকের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল সেই হাসিটা দির্শক খুব সূক্ষ্মভাবে পরখ করল।
পরক্ষণেই দির্শক এক হাত বুকের বাম পাশে রাখল। হালকা চিনচিনে ব্যথা উঠল বুকে, কিন্তু দির্শক তাতে কোনো গুরুত্ব দিল না। অনুভূতিটাকে উপেক্ষা করে আবার বিথীর হাত শক্ত করে ধরে নিল, আর দুজনেই নীরবে হাঁটা ধরল পথের মতোই তাদের মনের ভেতরেও তখন এক অজানা টান কাজ করছিল।
দুজন পাশাপাশি হাঁটছিল, অথচ কারও মুখে কোনো কথা নেই। পথে বিথীর হাতে তুলে দিল ঝালমুড়ির ঠোঙা বিথী বেশ মনোযোগ দিয়ে খেল। দির্শক খেল না ঝালে তার এলার্জি, সে কথা বিথী জানে। এভাবেই সময় গড়িয়ে গেল ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকানোর অবকাশ তাদের কারোরই হলো না, বরং সময় নিজেই থেমে আছে তাদের সঙ্গে।
হঠাৎ দির্শকের ফোন বেজে উঠল। নিথেক্সের সঙ্গে দু-এক কথা বলেই কি যেন সে সিদ্ধান্ত নিল। ফোন নামিয়ে বিথীর দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,,

__ যেতে হবে।
তারপর দুজনেই রওনা হলো তালুকদার বাড়ির দিকে।
তালুকদার বাড়ির গেটে,দাঁড়িয়ে দির্শক বলল,,
__ তুমি যাও তবে, আমি আসছি?
বিথী মাথা নাড়িয়ে চলে গেল, ড্রয়িং রুমে দেখা হলো নিধির সাথে, শুধু এক ঝলক বিথীকে দেখলো নিধি তারপর ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল এবং সুন্দর করে বিথী কে বলল,,

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৬

__ ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি খেতে আয়??
সত্যি বলতে কী, নিধি কোনো কাজই করছে না দৌড়াদৌড়ি ছাড়া। এই তো একটু আগেই তাড়াহুড়ো করে তেলে মাছ ছাড়তে গিয়ে হাতে গরম তেল পড়ল। সেই হাত আর কাউকে ধরতে দিল না চোখের পানি মুছতে মুছতে আর্দ্র ঘরের দিকে পা বাড়াল। বিথী হাঁ হয়ে সেই দৃশ্য দেখল তার চোখে বিস্ময় জমে রইল। মনে মনে সে বুঝে নিল, এখনই আর্দ্র ভাইয়ের কাছে গিয়ে নিধির বাচ্চামো শুরু হবে। বিথী নিরবে হাসল, ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক চিলতে হাসি। ইতির খোঁজে সেও ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল পায়ের শব্দে যেন বাড়ির নীরবতা আরও গভীর হয়ে উঠল।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৮