প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৩
ইনান হাওলাদার
তোমারে দেখিবার মনে চায়
দেখা দাও আমায়
তোমারে দেখিবার মনে চায়
দেখা দিয়া শান্ত কর,নইলে আমার প্রাণ যায়
দেখা দিয়া শান্ত কর,নইলে আমার প্রাণ যায়
তোমারে দেখিবার মনে চায়
দেখা দাও আমায়
তোমারে দেখিবার মনে চায়
একদিন !দুইদিন!তিনদিন করতে করতে সাত, সাতটা দিন পার হলে গেলেও আহি – তূর্যের কথা হয়নি। এক বাড়ি ,এক ছাদের নিচে থেকেও কতটা দূরত্ব!এই অবধি নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি পর্যন্ত হয়নি। দুই জন দুজনার মতো একে অপরের দেখেছে।তবে সেটা গোপনে।হাঁটতে চলতে কয়েকবার মুখোমুখি হলেও কেউ কারো দিকে চেয়ে পর্যন্ত দেখেনি।প্রথম চার-পাঁচদিন তূর্যও রা’গ বেঁধে ছিল।কিন্তু শেষ দুই – তিন দিন একটা বার আহির সাথে কথা বলার জন্যে পাগলের মতো ছ’টফট করেছে।বুকের মধ্যে অ’সহ্য রকমের য’ন্ত্রণা হচ্ছে। আহিকে ছাড়া সেটা মিটবে না। একটা বার শ’ক্ত করে বুকের মধ্যে চেপে ধরতে পারলে হয়তো পা’গল মনটা শান্ত হতো। কিন্তু ওই পা’ষাণী তো সেটা করবে না। এখনো রা’গ বেঁধে বসে আছে। না নিজে থেকে কিছু ঠিক করছে আর না তাকে সুযোগ দিচ্ছে। এইযে আহিকে ডেকে এসে প্রায় আধ ঘন্টা ধরে ছাদে অপেক্ষা করছে তূর্য ।কিন্তু,ও এলো না।এই নিয়ে না হলেও পনেরো বার অপেক্ষা করে করে হ’তাশ হলো সে। কিন্তু আজ কিছু একটা করতে হবে না হলে সে ম’রে যাবে। অ’স্থির ভাবে ছাদে পায়চারি করছে সে। এই বি’শ্রী অনুভূতি থেকে মুক্তি চায় সে।
ছটফট করতে করতে ফের নিচে নামলো তূর্য। ড্রয়িং রুম আপাতত ফাঁকা।শুধু আহি আর আসলাম চৌধুরী বসে আছেন । টিভিতে কি নিউজ দেখছেন।আহির হাতে রিমোট কখন বাবা উঠবে আর সে চ্যানেল পরিবর্তন করবে।
ভিতরের এক পাহাড় অস্থিরতা ভিতরে রেখে সে ঠাঁট বজায় রেখে বলল,
” তোকে আমি ডেকেছিলাম আহি ”
আহি এক ধ্যানে টিভির স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে যেন তার পছন্দের কোনো সিরিজ চলছে।অথচ,এখানে আসার সময়ও তূর্য দেখেছে আহি কতটা অ’মনোযোগী ছিল।রিমোট হাতে পায়ের নখ খোটাখুটি করছিল।
তূর্য ফের ডাকলো।তবে এবার নরম সুরে।
” আহি? ”
আসলাম চৌধুরী টিভি হতে মনোযোগ সরিয়ে বললেন,
” ভাইয়া ডাকছে না ? টিভির ভিতর ঢুকে গেলি নাকি?”
আহি ফিরেও তাঁকালো না। কেন জানি এখন আর তূর্যের রা’গ হচ্ছে না।নিজেকে শুধু অসহায় মনে হচ্ছে। পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় ব্যক্তি এখন মনে হয় সে।
সে আবারো বলল,
” একটু উপরে আসবি? জাস্ট ফাইভ মিনিটস এর জন্যে ” খুব অসহায় শোনালো তার কন্ঠ। আসলাম চৌধুরী মূল ফটক দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন,
” ভাইয়া কি বলে শুনে আয়।টিভি পরে দেখিস ”
তিনি যদি একটাবার তূর্যের মুখের দিকে চাইতেন তাহলে হয়তো আজ কিছুটা হলেও আ’ন্দাজ করতে পারতেন।
এদিকে আহি যেন পুরো টিভির মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। তূর্য নিষ্প্রভ চোখে এখনো আহির দিকে তাঁকিয়ে আছে। চোখে এক রাশ আশা ,হয়তো এইবার আহি তার কথা শুনবে। উঠে বলবে ,
” আগে আমার রা’গ ভা’ঙান তূর্য ভাই। তারপর আপনার সাথে যাবো ”
আহির কি খারাপ লাগছে না? হয়তো লাগছে না। কিন্তু তূর্য আর নিজেকে সামলাতে পারলো না ।অদ্ভুত কান্ড করে বসলো। কোনো কিছুর পরোয়া না করে আহির হাত ধরে উঠিকে বুকের ভিতর জাপটে ধরলো।এই অদ্ভুদ দ’হন না নিভালেই নয়! চোখ বন্ধ করে প্রেয়সীর অস্তিত্ব অনুভব করতে লাগলো।কিন্তু আহির বোধ হয় সেটা পছন্দ হলো না।সে তুর্যের হতে নিজেকে ছড়ানোর জন্য ছ’টফট করতে লাগলো।হাত দিয়ে বুকে ধাক্কা দিলে তূর্য আরো জোরে জাপটে ধরলো। পারলে বুকের ভিতর ঢুকিয়ে নেয়। এদিকে আহির মনে হচ্ছে তার দম ব’ন্ধ হয়ে মা’রা যাবে। তার এরকম ছটফটানি দেখে তূর্য আকুল গলায় বলল,
” কথা বলিস না, থাক!বলার দরকারও নেই। যেদিন রা’গ অভিমানের পালা শেষ হয় সেদিন কথা বলিস । অ্যাট লিস্ট একটা মিনিট…জাস্ট ওয়ান মিনিট একটু শান্ত থাক।আমার হৃদয়টাকে একটু ঠান্ডা কর । নাহলে….নাহলে.. আমি ম’রে যাবো। জাস্ট একটু শান্ত থাক,জা’ন। প্লিজ!”
আহি শুনলো তূর্যের কথা কিন্তু মানলো না। মিনিট দুয়েকের মাথায় তূর্য নিজ থেকে ছেড়ে দিলো তাকে। তাঁকালো প্রিয়সীর মুখ পানে। আহি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবসময় নাকি সে বাড়াবাড়ি করে।এখন তাহলে কে করছে? বড় বড় পায়ে ড্রয়িং রুম ত্যাগ করলো সে। উপরে উঠতে গিয়ে দেখলো মারুফা বেগম সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে তার একটু পিছনে লতা বেগম।তূর্য তাঁকাতেই মারুফ বেগম চোখ নামালেন।সে কিছু একটা বলতে গিয়েও বললো না। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে সোজা নিজ কক্ষে চলে গেল।
” তোদের এসব ইউজলেস কথাবার্তা জাস্ট ডি’জগাস্টিং লাগে। অন্য টপিকে কথা বল ”
” না,ভাই! টপিক এই দুইটাই আমাদের । হয় এই টপিকে কথা চলবে নাহলে ওইটা ” বলে বুকে হাত বাঁধলো তাসিন।
তূর্য বুঝলো চুপচাপ বসে থাকলে এরা এসব কথাবার্তাই বলবে। সে প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলল,
” পিংকি আসেনি কেন ?”
” তোর লগে কথা বলবে না তাই ” থমথমে গলায় বলল নাবিল।
” ওওও ”
” জাস্ট ‘ ওওও ‘ ? তোর আর আর কিচ্ছু বলার নেই? লাস্ট মোমেন্টে এসে তুই এমন করবি আমরা ভাবতেও পারিনি তূর্য। একটাবার কলে কথা অন্তত বলতে পারতিস । তোর কি প্রবলেম হচ্ছিল সেটা অন্তত বলতে পারতিস। তুই কলটা রিসিভ পর্যন্ত করতে পারলি না।কেন?
আমি আগে কখনো পিংকিকে ওতটা ই’মোশনাল হতে দেখিনি ” তি’ক্ত গলায় কথাগুলো বলে থামলো আলিয়া। নাবিল দুঃখীমুখ করে বলল,
” এসবের চক্করে আমার তিনদিন পর বা’সর করতে হইছে, বা’ড়া”
” সবার সব কথা কানার দুই চোখের কথা!”
তূর্যের কথার বিপরীতে মুখ বাঁকিয়ে কনফিডেন্ট নিয়ে নাবিল বললো,
” তুমি কয়দিন পর কর দেখবনি ! আমার বা’ড়া!”
” তোরে দেখিয়ে করবে, হা করে বসে থাকিস ” বলল তাসিন।
একের পর এক আরো ঠাট্টা – দুষ্টুমি করতে লাগলো নাবিল আর তাসিন। সাথে হাতাহাতি তো আছেই। তূর্য বির’ক্ত মুখে বসে এদের কাণ্ড দেখছে শুধু। বরাবরের মতো এদের, না ধ’মক দিচ্ছে আর না থামতে বলছে। আলিয়া খেয়াল করলো বিষয়টা। সে ওদের থামিয়ে চি’ন্তিত গলায় বলল,
” কি হয়েছে তোর তূর্য? সবসময় এমন সিরিয়াস মুডে থাকিস কেন ?নিজের ই’মোশন কিছুটাও হলেও প্রকাশ করতে শেখ। ”
” আমি উঠছি ! তোরা আড্ডা দে ”
” মানুষের লাইফে বন্ধু নামের এই ছোট্ট শব্দটার গুরত্ব কি? কেন মানুষের জীবনে মিনিমাম একটা হলেও বন্ধু রাখে?
দেখবি প্রত্যেকটা মানুষ ফ্যামিলির মধ্যে একরকম আর ফ্রেন্ডদের কাছে অন্যরকম। কিন্তু তুই নিজেকে দেখ! তুই কি আদেও স্বাভাবিক ? নিজেকে সমসময় কেন শ’ক্ত খোলসে মুড়ে রাখিস ? তুই আমাদের কিছু না-ই বলতে পারিস।আমরা তোকে বুঝি তূর্য। দুই-চার বছরের ফ্রেন্ডশিপ আমাদের নয়! ”
তূর্য উঠতে গিয়েও উঠলো না।কা’ট’কা’ট গলায় বলল,
” আমার লাইফে একটাই প্র’বলেম ,সেটা তোরা সবাই জানিস।আর এই প্র’বলেমের সলিউশনও তোদের কাছে নেই।তাহলে তোদের বলে কি লাভ ? ”
” এটা লাভ – লসের কোনো বিষয় নয়।এইযে সারাক্ষণ গ’ম্ভীর হয়ে পড়ে থাকিস ,কেন জানিস ? নিজের মধ্যে কথা চাপিয়ে রাখতে রাখতে এমন হয়েছিস তুই। মনের মধ্যে যা আছে প্রকাশ করে দেখ,হালকা লাগবে । ”
” এখন এসব কথা বলে তুই আমাকে ই’মোশনাল করতে চাইছিস?”
” অবুঝের মতো কেন করছিস তূর্য? আমি কেন কথাটা বলছি তুই ভালো করেই বুঝেছিস ”
” কি বলছিস তুই? আমি ফ্যামিলিকে জানিয়ে দেই সেইটা? কি জানাবো আমি? যেখানে আহি-ই ঠিক নয়!আরে কার জন্যে আমি ফা’ইট করবো? আজ সেভেন ডেইজ হয়ে গেল ও আমার সাথে কথা বলে না।অথচ,সবার সাথে হেসে-খেলে কথা বলছে,কাজ করছে।ও ঠিকই স্বাভাবিক ভাবে দিন পার করে যাচ্ছে। বাট আমার ভিতরে কি হচ্ছে শুধু আমি জানি। ” একটু থামলো তূর্য।তারপর ফের বলল,
” এইযে এসব কথা তোদের বললাম এতে কি লাভ হলো আমার? আহি এসে কথা বলবে আমার সাথে?বাড়ি ফিরলে ‘ তূর্য ভাই ‘ বলে ডাক দিবে? আমার কি লাগবে ,না লাগবে জিজ্ঞেস করবে? কফির মগ হাতে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে আসবে? ”
” এসব কিছু হোক বা না হোক।বুকে হাত দিয়ে বল তো,এখন তোর কিছুটা হলেও হালকা লাগছে কিনা !”
আলিয়ার এ প্রশ্নের উত্তর করলো না তূর্য।সে যেতে যেতে বলল,
” নাবিল তোর সাথে আমার ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে।কলে বলবো ”
আলিয়া চেঁ’চিয়ে উঠে বলল,
” ঠিক এটাই তোর প্র’বলেম তূর্য।নিজেকে ভে’ঙে – চু’রে আহির সামনে তুলে ধর,দেখবি সবটা ঠিক হয়ে গিয়েছে। ”
তূর্যের কান পর্যন্ত পৌঁছালো আলিয়ার কথা ।কিন্তু সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না।গ’টগট পায়ে চলে গেল।তাসিন আর নাবিল এতক্ষণে হা করে আলিয়ার কথা গিলছিল।দুজনেই একসাথে বিস্ময় নিয়ে বলে উঠলো,
” এই আলিয়া? এইডা তুই তো বন্ধু ?”
আলিয়া রা’গ দেখিয়ে বলল,
” সব সময় ফাইজলামি করবি না। সিরিয়াস মুডটাকেই নষ্ট করে দিস তোরা ”
তাসিন এবার সত্যিই সিরিয়াস হলো। বলল,
” হলাম সিরিয়াস! এত সবকিছু বুঝিস,তাহলে নিজেরটা বুঝিস না কেন?”
” নিজেরটাও বুঝি! কিন্তু করার কিছুই নেই। ”
” একটা কথা বলবি আলিয়া? আমরা সবাই জানতাম নাবিল ,পিংকিকে ভালোবাসে।আর পিংকিও! কিন্তু তুই? তোর তো এমন কেউ লাইফে নেই।তাহলে বিয়ে করছিস না কেন?”
” হ বা’ড়া! সেইদিন বিয়েতে আইসাও আন্টি আমারে বলতাছিল তোরে বোঝাইতে,যেন বিয়া করতে রাজি হইস ”
হুট করে অন্যমনস্ক হলো আলিয়া।যেন কতকিছু ভাবনা – চিন্তা করলো। তারপর ঠোঁটে হালকা হাসি এঁটে উ’দাসী গলায় বলল,
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪২
” এই জন্মে আর আমি বিয়ে করবো না। জানি,পরবর্তি জন্ম বলে কিছুই নেই।যদি থেকেও থাকে সেই জন্মে তাকে চাইবো ।যদি পাই করলাম বিয়ে,না পেলে আবারো একটা জীবন এভাবেই কাটিয়ে দিলাম। ”
