Home শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২২

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২২

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২২
রুহানিয়া ইমরোজ

ভোর চারটা চল্লিশ মিনিট। কুয়াশার ধোঁয়াটে চাদরে ঢেকে আছে পৃথিবী। ইয়টের ভেতরকার কেবিনে একে অপরের সাথে লেপ্টে শুয়ে আছে আরশিয়ান আর প্রিমা। সারাটা রাত প্রেম তরঙ্গে ভেসে বেড়িয়ে ঘন্টা খানেক আগে ঘুমিয়েছে। এরমধ্যে হুট করে বিকট শব্দে বেজে ওঠে ইয়টের সাইরেন৷
আরশিয়ান ধড়ফড়িয়ে উঠে। বুকের সাথে লেপ্টে থাকা অনাবৃত প্রিমাকে জড়িয়ে ধরে আতঙ্কিত চোখে তাকায় চারপাশে। বোঝার চেষ্টা করে কাহিনী কী?
মস্তিষ্ক চাপ দিতেই মনে পড়ে যায়, একান্ত মুহূর্তে ঝামেলা এড়াতে ফোন বন্ধ রেখেছিল। আবির্ভাবকে বলে এসেছিল,

-” যদি কোনো সমস্যা হয় তাহলে ইয়টে ইমার্জেন্সি বার্তা পাঠাবে। সাইরেন এর শব্দে বুঝে যাব কোনো সমস্যা হয়েছে। ”
সাইরেনের শব্দ শুনে সবটা বুঝে যায় আরশিয়ান।
খানিকটা ধাতস্থ হয়ে চটপট উঠে বসে। প্রিমা হালকা নড়েচড়ে পাশ ফিরে। তীব্র শব্দেও ঘুম ভাঙেনি তার কারণ ঘন্টাখানেক পূর্বেই পেইন কিলারের সাথে মিডিয়াম ডোজের ঘুমের ঔষধ খাইয়েছে শান৷
কম্বল পেঁচিয়ে বেঘোরে ঘুমিয়ে থাকা প্রিমার পানে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরশিয়ান। আজকের ভোরটা সুন্দর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা তো নসিবে নেই।ঘুমন্ত প্রিমার উন্মুক্ত পিঠে আলতো করে কয়েকটা চুমু দিয়ে চটজলদি তার জামাকাপড় খুঁজে আনে। এর পর নিজ হাতে সেগুলো পরিয়ে দিয়ে অচেতন প্রিমা কে কোলে তুলে হাঁটতে থাকে রিসোর্টের দিকে।
রিসোর্টের সামনে আসতেই দেখে মেইন ডোরের সামনে অধৈর্য হয়ে পায়চারি করছে আবির্ভাব। শানের ভ্রু কুঁচকে যায়। জোর কদম ফেলে এগিয়ে এসে দারাজ গলায় শুধায়,

–” কী হয়েছে? কী সমস্যা?
আবির্ভাব থমকে দাঁড়িয়ে বড় বড় চোখে তাকায়। আরশিয়ানের কোলে অচেতন প্রিমাকে দেখে ফাঁকা ঢোক গিলে বলে,
–” সর্বনাশ হয়ে গেছে স্যার…
নির্ঘুম আরশিয়ানের মেজাজ বিগড়ায় ওমন রহস্য জনক কথা শুনে। দাঁতে দাঁত চেপে শুধায়,
–” সেটাই তো জিজ্ঞেস করছি। তুমি এত ভণিতা করছ কেনো?
আবির্ভাব ইতিউতি চেয়ে সাহস জোগাড় করার চেষ্টা করে। মিনমিনিয়ে বলে,
–” তাজরিয়ান স্যার বিয়ে করেছেন।
আরশিয়ান চওড়া মেজাজে জবাব দেয়,

–” তো? কী… ক্ কী বললে তুমি?
শেষের কথাটুকু চরম বিস্ময় নিয়ে বলে। শানের হাব ভাব দেখে আবির্ভাব কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
–” জ্বি স্যার। গতকাল রাত নয়টার দিকে শ্রীমঙ্গলে বিয়ে করেছেন তাজরিয়ান স্যার।
আরশিয়ান বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে কোনমতে শুধায়,
–” নিজের সম্মতিতে নাকি কেউ জোর…
কথাটা শেষ হওয়ার পূর্বেই একবুক সাহস জুটিয়ে আবির্ভাব বলে বসে,
–” নিজের সম্মতিতে এবং পরিকল্পিত ভাবে ম্যামের ছোটো বোন মারজান আইরিন মেহরিমাকে গতকাল বিয়ে করেছেন তাজরিয়ান স্যার।
বিস্ময়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায় আরশিয়ান। থম মেরে চেয়ে থাকে আবির্ভাবের দিকে। চোখের পলক ফেলতেও ভুলে যায় যেনো। খানিক্ষণ পর থেমে থেমে বলে,

–” কাল জানানো হয়নি কেনো আমাকে? এখন ওরা কোথায় ?
আবির্ভাব চমকে ওঠে শানের ঠান্ডা ভঙ্গিমা দেখে। বহু বছর পর তাকে পুনরায় এত শান্ত হতে দেখল। আগে ভয় পাচ্ছিল প্রিমার কথা ভেবে। এখন শানের ভাবমূর্তি আতঙ্ক ধরিয়ে দিচ্ছে বুকে। ভয়ে শুষ্ক ঢোক গিলে আবির্ভাব বলে,
–” আমরা আধা ঘন্টা আগে জেনেছি স্যার। এর পরপরই ইয়টে জরুরি বার্তা পাঠিয়েছি৷ উনারা এখনো শ্রীমঙ্গলেই আছেন।
পরের প্রশ্নটা করতে খানিকটা বিবেকে বাঁধল শানের তবুও শুধাল,
–” এক কামরায়? ”
আবির্ভাব বুঝল স্যারের দুশ্চিন্তা কিন্তু তার হাতে তো কিছুই নেই। আরশিয়ানকে হতাশ করে দিয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল,
–” জ্বি স্যার। রুমে যাওয়ার পূর্বে তাজ স্যার নিজের পছন্দের নেশাদ্রব্য নিয়ে..
বাকিটা বলতে গিয়ে আঁটকে গেল আবির্ভাব। শান বুঝে নিল যা বোঝার। অনুভূতিহীন চোখে একবার প্রিমার ফ্যাকাশে মুখের দিকে চেয়ে শুধাল,

–” মেয়েটা বেঁচে আছে?
আবির্ভাব অপ্রস্তুত গলায় জবাব দিল,
–” গতকাল রাতে বেশ চেঁচামেচির শব্দ পাওয়া গেছে কিন্তু ঘন্টাখানেক পর থেকে কারও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। ভয়ের চোটে কেউ ডাকতেও পারেনি…
আরশিয়ান চোখ বুঁজে লম্বা একটা শ্বাস ফেলল। এর পর কঠিন গলায় বলল,
–” পুলিশ ফোর্স কে ইনফর্ম করো আর ড্রাইভারকে বলো গাড়ি বের করতে। এখুনি শ্রীমঙ্গল যাব আমরা।

ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা দশটা। সূর্যের ঝলকানি চোখমুখে পড়ায় ক্লান্ত শরীরটা টেনে উঠে বসে মেহু৷ সারারাত কন্নার ফলে মাথা ভার লাগছে, চোখ দু’টো টনটন করছে ব্যথায়। শ্বাস টানতেও কষ্ট হচ্ছে। বুকে হাত রেখে মুখ খুলে বার কয়েক শ্বাস টেনে হৃদয়ের যন্ত্রণা গিলে ফেলার চেষ্টা করল বেচারি।
এছাড়া আর কিইবা করার আছে? জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে তিনটা বিধাতার হাতে। তিনি চেয়েছেন বলেই ওমন পাপিষ্ঠ জল্লাদের হাতে পড়েছে মেহু। এসব নিয়ে তার বিশেষ হেলদোল নেই। তবে.. মেহু আর কিছু ভাবতে যাবে তার আগেই কেউ শব্দ করে হামি তুলল।

তৎক্ষনাৎ পাশ ফিরে চাইল মেহু। দেখল দুনিয়ার সব থেকে অসহনীয় চিত্র। ফ্লোরিং বেডে চিৎপটাং হয়ে হাত পা মেলে শুয়ে আছে তাজরিয়ান। তার পরনে রয়েছে কুঁচকে জড়োসড়ো হয়ে যাওয়া শার্ট। যার বুকের কাছটা পুরো উন্মুক্ত। শার্টের ফাঁক গলিয়ে উঁকি দিচ্ছে পুরুষালি বুকটা।
মেহরিমা অনুভূতিহীন চোখে তাকিয়ে থাকে তাজের দিকে। কী মায়াময়ী একটা চেহারা। ঘুমালে একদম শান্ত বাচ্চা লাগে। অথচ এই লোক জাগ্রত অবস্থায় পুরোপুরি একটা হায়না।
তাজরিয়ানের কথা ভাবতে গিয়ে গতকাল রাতের কথা স্মরণে আসে মেহরিমার। গ্রামবাসী বেরিয়ে যাওয়ার পর তাজরিয়ানের বডিগার্ডেরা তার ফ্রেন্ডদেরও বের করে দেয়। ভাঙাচোরা ঘরটা পুরোপুরি ক্লিন করে ফ্লোরিং বেড বিছিয়ে অল্পবিস্তর সাজিয়ে দেয়।
পুরোটা সময় তারা দু’জন ঘরে ছিল। মেহরিমা স্তব্ধ হয়ে বসেছিল বেডে আর তাজরিয়ান সোফায় বসে মনের সুখে সিগারেট টানতে টানতে সবার কাহিনী দেখছিল। ওদের গোছগাছ শেষ হতেই তাজরিয়ান বিরক্তির সুরে বলে,

–” সুন্নত ছেড়ে ফরজ পালন করো আগে। বিবাহ স্পেশাল শরবত নিয়ে এসো । মাথায় বিকার চড়ে আছে। একটু ঠান্ডা হওয়া দরকার এখন।
কথাখানা শুনে তার মাথার পাশে দাঁড়ান তামজিদ ঘাবড়ে যায়। কারণ সজ্ঞানে থাকা তাজরিয়ান যতটা বন্য, নেশায় উন্মাদ তাজরিয়ান তার থেকেও বেশি হিংস্র এবং উগ্র। তামজিদের বড্ড মায়া লাগে মেহুর জন্য। তাইতো মনে মনে নিয়ে ফেলে কঠিন সিদ্ধান্ত। তাজরিয়ানের হুকুম শুনে বলে,
–” ম্যাকালান এইটিন নিয়ে আসি স্যার?
মেহরিমাকে আগা গোড়া স্ক্যান করতে করতে তাজ আনমনে বলে,

–” হুঁ..
তামজিদ তাই করে। তবে বোতলে থাকা তরলে পরিমাণ মতো ঘুমের মেডিসিন মিশিয়ে দেয়। যেনো তাজরিয়ান হাজার চেয়েও কোনোরূপ পাশবিক নির্যাতন না চালাতে পারে মেহরিমার উপর। মদের বোতলটা হাতে পেতেই বুভুক্ষের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে তাজ।
বোতলে মুখ লাগিয়ে ঢকঢক করে গিলতে শুরু করে কলিজা ঠান্ডা রাখার ঔষধ৷ এই মেয়ের তেজ দেখলে আপাদমস্তক জ্বলে ওঠে তার। হাফ বেতাল মদ সাবাড় হতেই হাতের ইশারায় চলে যেতে বলে সবাইকে। মেহু তখনও নির্বিকার। নিশ্চুপ ভঙ্গিতে চেয়েছিল সিলিং এর পানে৷
সত্যের আঘাত আর জীবনের নির্মমতা পুরোপুরি স্তব্ধ করে দিয়েছিল বেচারিকে। তবে তার এই শান্ত ভাব সহ্য হলো না তাজের। এক তৃতীয়াংশ মদ গিলে ধীর গতিতে টলমল পায়ে এগিয়ে এলো মেহরিমার দিকে। তার মুখোমুখি হয়ে মাতাল গলায় শুধাল ,

–” তোমার ঠোঁটে কী চম্বুক আছে বেবিগার্ল ?
মেহরিমা খেপাতে চাইল না তাজকে। তাই নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল,
–” না..
কথা বলার সময় কিঞ্চিৎ নড়ে উঠে মেহরিমার অধর যুগল। এতেই হার্টবিট মিস করে তাজরিয়ান। বুকে হাত রেখে এলোমেলো ভাবে বলে,
–” তাহলে আমার কঠিন সংযমী দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তোমার ঠোঁটে গিয়েই কেনো আঁটকায়?
মেহরিমা দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দেয়,

–” কারণ আপনি চরিত্রহীন।
তাজরিয়ান রাগে না। উল্টো টলমল পায়ে মেহরিমার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ওর ওড়না টেনে ধরে বলে,
–” শুনেছি বউকে ভালোবাসলে চরিত্র ঠিক হয়ে যায়। চলো পরীক্ষা করে দেখি, তুমি আমায় কতটুকু চরিত্রবান বানাতে পারো।
ওড়না টেনে ধরায় মেহরিমার ক্ষোভ বেরিয়ে আসে। রাগে খেই হারিয়ে সজোরে ওড়না ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,
–” গায়ে হাত দিলে খুন করে ফেলব একদম।
কথাটা শুনে চোখ ছোটো ছোটো করে তাকায় তাজ। হুঁশ নাই তাল নাই কিন্তু ইগো তো আছে। মেহরিমার কথায় সেটা টনটনিয়ে ওঠে৷ মিছে মেজাজ নিয়ে বলে,

–” সওয়াবের কাজে বাঁধা দেওয়া শয়তানের বৈশিষ্ট্য বউজান। বি আ লিটল বিট ফেরেশতা..
বলেই সজোরে হাত টেনে ধরে মেহরিমার। ফলে দু’জনে ধপাস করে আছড়ে পড়ে ফ্লোরিং বেডের উপর। মেহরিমা নিজেকে সামলে উঠে সরে আসার আগে তাজরিয়ান ঝাপটে ধরে এলোপাথাড়ি চুমু খেতে থাকে তাকে।
মেহরিমা হাজার চেয়েও সরাতে পারে না তাজকে। তাইতো রাগে দুঃখে চিল্লিয়ে কেঁদে উঠে। তাজ যখন অবাক হয়ে কাজ থামিয়ে ঢুলুঢুলু চোখে তাকায় মেহুর পানে তখন সেটার সুযোগ নিয়ে ঠাস করে চড় মেরে বসে মেহরিমা। ব্যস এক আঘাতেই কুপোকাত তাজরিয়ান। দিনে দুপুরে মানুষ খুন করা গ্যাংস্টার বাসর রাতে বউয়ের এক চড়েই জ্ঞান হারায়৷
চড় খেয়ে কয়েক সেকেন্ড ঝিম মেরে তাকিয়ে থেকে ধপ করে জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়ে মেহরিমার উপর৷ মেহরিমা চোখবুঁজে ব্যথাটুকু হজম করে নিয়ে শক্তি খাঁটিয়ে ধাক্কা দিয়ে তাজকে সরিয়ে দেয় এরপর উঠে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে। তার আহাজারির সাক্ষী থাকে প্রাণহীন বস্তুরা।

ঢাকা শহরের জ্যাম ঠেলে সাত ঘন্টা পর শ্রীমঙ্গলে গিয়ে উপস্থিত হয় আরশিয়ানেরা৷ পুরোটা সময় শানের বুকে মুখ লুকিয়ে ঘুমিয়েছে প্রিমা। প্রিয়তমার ঘুমন্ত মাথা বুকে চেপে ধরে নিজেকে সামলেছে শান৷ কতশত আশ্বাস দিয়েছে নিজেকে। তাতে কী আর হয়?
প্রিমা যখন জানবে তার আদরের বোনের সর্বনাশের মূল কারিগর তাজরিয়ান। তখন আরশিয়ানের সাথে সহজ হতে পারবে? মনের ভেতরকার সত্তা চিল্লিয়ে বলল,
–” কখনোই না।
সাথে সাথে চোখ বুঁজে ফেলল আরশিয়ান। প্রিমার মুখের দিকে চেয়ে হুট করে চুমু খেল তার উষ্ণ কপাল সহ গাল নাক এবং গলায়। এরপর প্রিমার কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে ধীর গলায় বলল,
–” মাফ করে দিয়েন আমায়…

তার কন্ঠ কেঁপে উঠল কিঞ্চিৎ। তবে কেউ টের পেল না। ফ্রন্ট সিটে বসে স্যারের পাগলামি দেখছিল আবির্ভাব। মানুষটার জন্য ভীষণ খারাপ লাগে তার। এক কালে বাপের করা পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছে। এখন আবার ভাইয়ের করা ভুলের শাস্তি ভোগ করতে হবে। কিছু মানুষ বোধহয় অন্যের পাপের ভাগীদার হতেই জন্মায়।
গাড়ি রাস্তা ছেড়ে মেঠোপথে আসতেই সজোরে ধাক্কা খায় সবাই। ঘুমন্ত প্রিমা নড়েচড়ে উঠে চোখ মেলে তাকায়। লম্বা একটা হামি তুলে পিটপিটিয়ে চোখ মেলে তাকিয়ে বাচ্চাদের মতো বলে,
–” আমরা কী মাঝ সমুদ্রে?
আরশিয়ান বুঝল, এখনো ঘোর থেকে বেরোয়নি প্রিমা। তাই তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ধীর গলায় বলল,
–” না ওয়াইফি। আমরা শ্রীমঙ্গলে।
প্রথমে কথাটা প্রসেস করতে পারেনি প্রিমা। পরক্ষনে কথাটা বুঝতেই বড়বড় চোখে চেয়ে ছোটোখাটো আর্তনাদ করে বলে ওঠে,

–” কীহ্?
আরশিয়ান আরেকটু শক্ত করে প্রিমাকে জড়িয়ে নিয়ে বলে,
–” জ্বি। সো, আর ইয়্যু ওকে নাও?
গম্ভীর গলার প্রশ্নে থতমত খায় প্রিমা। স্মরণে আসে গতকাল রাতের কথা। ইশ্,.. মুহূর্তের মাঝে লজ্জার আভায় ছেয়ে যায় গাল দুটোতে। আরশিয়ানের বুকে মুখ লুকিয়ে অস্পষ্ট গলায় বলে,
–” হুঁ।
জবাব শুনে মলিন হাসি দেয় আরশিয়ান। ততক্ষনে গাড়ি গিয়ে পৌঁছায় রিসোর্টের সামনে। আবির্ভাব এবং ড্রাইভার নেমে দাঁড়ায়। আরশিয়ান বুক ভরে শ্বাস টেনে প্রিমাকে পাশের সিটে বসিয়ে দিয়ে বলে,
–” কিছু কথা বলব৷ মনোযোগ দিয়ে শুনুন।
আরশিয়ানের সিরিয়াস গলার টোনে সমস্ত লাজ লজ্জা জানালা দিয়ে পালায়। প্রিমা সটান হয়ে বসে কৌতুহলী চোখে চায়। আরশিয়ান তার চোখের দিকে চেয়ে নিভু নিভু গলায় বলে,

–” আপনার ছোটো বোন মেহরিমাকে জোরপূর্বক বিয়ে করেছে তাজরিয়ান। গতকাল রাতে একসাথেই ছিল ওরা….
বাকি কথা বলতে গিয়ে আঁটকে যায় আরশিয়ান৷ প্রিমা অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে আছে। তার দৃষ্টি জোড়া প্রশ্ন করছে,
–” আপনি না আমার পরিবারের সেইফটি সুনিশ্চিত করেছিলেন? তাহলে আমার বোনের গায়ে হায়েনার থাবা পড়ল কীভাবে?
আরশিয়ান মাথা নুইয়ে প্রিমার হাত ধরে বলল,
–” আ আমার কথাটা বোঝার চেষ্টা করুন..
প্রিমা ঠাস করে হাত সরিয়ে নিয়ে আতঙ্কিত গলায় বলল,
–” আমার বাচ্চা কই? কোথায় আঁটকে রেখেছেন আমার কলিজাকে?
প্রিমার কন্ঠে স্পষ্ট আর্তনাদ। শরীর কাঁপছে তার। চোখ দুটো ভরে উঠেছে বেদনার অশ্রুতে। শান পারল না সেই চোখে চোখ রাখতে। নজর ফিরিয়ে প্রিমাকে নিয়ে নেমে দাঁড়াল। বেচারি শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারছে না বিধায় এক হাতে আগলে নিল তাকে।
প্রিমা আপত্তি করল না। বুকে পাথর চেপে হন্য হয়ে চোখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খুঁজতে থাকল নিজের বোনকে৷ আবির্ভাব এগিয়ে এসে বলল,

–” দরজার লক ভাঙা হয়ে গেছে স্যার। দু’জন মহিলা অফিসার গিয়েছেন ভেতরে। সেখানকার অবস্থা দেখে…
বাকি কথা বলতে গিয়ে আঁটকে গেল আবির্ভাব। প্রিমা আতঙ্কিত চোখে চেয়ে আছে তার দিকে। শান বাধ্য হয়ে তাকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে নিল। যা অবস্থা দেখছে তাতে তো তার বউই আগে স্ট্রোক করবে।
উপরওয়ালার বোধহয় কিঞ্চিৎ দয়া হলো । মহিলা অফিসার দু’জন গ্রিন সিগনাল দিল। সাথে সাথে পুলিশ অফিসারেরা ঢুকে পড়ল রুমের ভেতর। আরশিয়ান আর প্রিমাও গেল ধীরেসুস্থে।
ঘরের চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। ফ্লোরিং বেডের উপর বসে আছে তাজরিয়ান। তার চোখমুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে একটু আগে ঘুম থেকে উঠেছে। এখনো নেশার ঝোঁক যায়নি। আর মেহরিমা? সে বসে আছে বিছানার কার্ণিশে ; সম্পূর্ণ সুস্থ এবং অক্ষত অবস্থায়।
মেহরিমাকে দেখে শরীরে কিঞ্চিৎ বল ফিরে পায় প্রিমা। এলোমেলো পা ফেলে দৌড়ে এসে বোনকে বুকে জড়িয়ে নেয়। মেহুকে স্বাভাবিক দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেলে ভাইয়ের দিকে এগিয়ে যায় আরশিয়ান।
জীবনেও যে কাজ করেনি সেটাই করে বসে আজ। তাজরিয়ানের কলার চেপে ধরে তাকে দাঁড় করিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে শুধায়,

–” নিষেধ করেছিলাম না? তাহলে কেনো করলি এসব?
তাজরিয়ান নির্লজ্জের মতো বলে বসল,
–” ওর থেকে যেটা চাই সেটা বিয়ে ছাড়া আদায় করা সম্ভব নয় বলেই করেছি এসব৷
উত্তর শুনে কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠে উপস্থিত সকলের। আরশিয়ান ভেবে পায় না কী করবে। প্রিমা ক্ষোভের দৃষ্টিতে তাকায়। ওদিকে তাজরিয়ান বিরক্ত হয় তার ভাবীর প্রতি।
তার তুলার মতো বউটাকে ওভাবে জড়িয়ে ধরছে কেনো? সে কী অনুমতি দিয়েছে নাকি? আশ্চর্য! গায়ে পড়া মেয়েমানুষ একদমই দেখতে পারে না তাজরিয়ান। আর এই ভদ্রমহিলা তো মা শা আল্লাহ তিন দু গুণে ছয় ধাপ এগিয়ে। সবসময় তার প্রিয় জিনিসগুলোর উপরই নজর দেয়।
তাজরিয়ানের ঘোর কাটে ভাইয়ের দেওয়া নির্দেশে। আরশিয়ান ঠান্ডা গলায় অফিসারকে উদ্দেশ্য করে বলে,

–” এরেস্ট হিম।
তাজরিয়ান হতভম্ব হয়ে যায়। নেশার ঘোরে উল্টা পাল্টা সপ্ন দেখছে ভেবে মাথা ঝাঁকায় কিন্তু নাহ্। তার ভুল হচ্ছে না। বাস্তবেই তার ভাই তাকে পুলিশে দেওয়ার কথা বলেছে। মানুষ খুন করে আসলেও যে ভাই টু শব্দ করেনি সেই ভাই কি-না পুন্যের কাজ করায় তাকে জেলে দিতে চাইছে? তাজরিয়ান টাস্কি খেয়ে বলে,
–” সাধু হওয়াও বিপজ্জনক। পাবলিক হজম করতে পারে নাহ্…
অফিসার সাহস পাচ্ছিলেন না সামনে এগোতে। এর মতো ভয়ংকর গ্যাংস্টারকে ঘন্টা খানেল জেলে রাখার চিন্তাভাবনা করা বিলাসিতা বৈ কিছু না। তাকে এগোতে না দেখে পাশে থাকা কনস্টেবল বলল,
–” স্যার? যাচ্ছেন না কেনো? এমপি সাহেব আদেশ দিচ্ছেন তো…
অফিসার দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

–” যাকে মহান সাধু ভাবছ সে নিজেই শ খানেক খুনের আসামি। জাউরা লেভেলের ঘাউড়া এরা দুই ভাই। হাজার খানেক পাপ করেও নির্বিকারে জনসম্মুখে ঘুরে বেড়ানো পাবলিককে বিয়ে করার দায়ে গ্রেফতার করা হাস্যকর নয়?
কনস্টেবল হতভম্ব মুখে চেয়ে থাকে। আরশিয়ান অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে পুনরায় বলে,
–” ইয়্যু ক্যান টেক হিম আওয়ে অফিসার..
এপর্যায়ে এসে টনক নড়ে তাজরিয়ানের। ভাইয়ের ভারিক্কি গলার স্বর শুনে চট করে তকায়। এরপর যা দেখে তাতে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে তার। প্রথমবারের মতো ভাইকে আলাদা অনুভূত হয়। সে জানতো শান রিয়েক্ট করবে। তাই বলে এমন করবে সেটা বোঝেনি
নিজের হয়ে সাফাই গাইতে তাজরিয়ান বলল,

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২১

–” তুমি কিন্তু ওয়াদা দিয়েছিলে, আমার করা একটা ভুল ক্ষমা করবে তুমি।
আরশিয়ান অনুভূতিহীন চোখে চেয়ে জবাব দেয়,
–” ভুলের ক্ষমা হয় ; অন্যায়ের নয়। আমার দৃষ্টিতে তুমি সেই অন্যায়কারী যেটা আমার দেওয়া শিক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তাজরিয়ান গভীর ভাবে থমকায়। দু ভাইয়ের দ্বন্দ্বের ফাঁকে হাতকড়া নিয়ে এগিয়ে যায় অফিসার। তাজের হাতে পরাতে নিবে এমন সময় মেহরিমা বলে উঠে,
–” ডোন্ট এরেস্ট হিম অফিসার। পারস্পরিক সম্মতিতেই বিয়ে হয়েছে আমাদের৷

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২৩