তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৬
রাফিয়া জান্নাত রিফা
সোফায় বসে আলিফা বেগম নিজ হাতে ডাল‑ভাত খাইয়ে দিলেন দির্শককে। অদ্ভুত তৃপ্তি নিয়ে সে খেতে লাগলো যেন এই সামান্য খাবারই তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। প্রতিটি লোকমা সে গভীর শান্তিতে গিলছিল।
ভাত খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে দির্শক বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছিল বিথীর দিকে। মেয়েটা আরও আরও নুয়ে পড়ছে। চোখে ছিল শূন্যতা, মুখে অব্যক্ত যন্ত্রণা।
কিন্তু এই দৃশ্য দির্শকের একটুও খারাপ লাগলো না।
একবারের জন্যও তার মনে হলো না বিথীর এই অবস্থার জন্য সে দায়ী।বরং তার ভেতরে জন্ম নিচ্ছিল এক অদ্ভুত, ঠান্ডা শান্তি।এই জায়গাটায় এসে সত্যিই কি দির্শককে পাষান বলা যায়?
হ্যাঁ, বলা যায়।
কারণ আজ দির্শকের জন্য মানুষ কাঁদছে।সে না থাকলে তাকে মনে রাখা হবে।মোনাজাতে তার নাম উচ্চারিত হবে এই ভাবনাতেই সে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠছিল।
তার জীবনে সবচেয়ে বড় অভাবটা ছিল মা।
আজ সে মাকেও পেয়েছে।একটা পরিবার চেয়েছিল সেটাও পেয়েছে।আর তার গোপনতম মনবাসনা?কেউ তাকে পাগলের মতো ভালোবাসবে বিথীর চোখে, নিঃশ্বাসে, নিঃশব্দ ভাঙনে সে ভালোবাসাও আজ স্পষ্ট।
তাহলে আর কী চাই তার?আর কিছুই না।
এসব ভাবনা ভাবতেও ভালো লাগছে তার।
খাওয়া শেষ হতেই দির্শক আলিফা বেগমের দিকে তাকিয়ে ধীরস্বরে বললো,,
“মা, আমার আর একটা কথা রাখবে?”
আলিফা বেগম কাঁপা গলায় বললেন,,
“কী কথা?”
“তোমার বউমাকে… দেখে রাখবে তো?”
এই কথা শুনেই আলিফা বেগম ডুকরে কেঁদে উঠলেন। কী বলবেন, বুঝে উঠতে পারলেন না। দির্শকের চোখের দিকে তাকানোর সাহসটুকুও যেন হারিয়ে ফেললেন। আর দির্শক মায়ের এই ভাঙন দেখে আর কিছু বললো না। নীরবতাই তখন সবচেয়ে বড় কথা হয়ে রইলো।
সে এবার এগিয়ে গেল আর্দ্র আর আলবানের দিকে।
আলবান নিজের শার্টের কলার ঠিক করতে করতে বললো,,
“আমার উপর রাগ করেছিস?”
তারপর নিজেই হেসে উঠলো,,
“তুই বেঈমান, দির্শক।”
দির্শকও হালকা হাসলো,,
“হ্যাঁ, জানি।”
হঠাৎ কী হলো কে জানে আলবান দির্শককে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ,,
“প্রতিশোধের জন্য যদি বন্ধুত্ব করতিস, তখনই বলতি। তাহলে ভাইয়ের জায়গায় না রেখে তোকে শুধু বন্ধুর জায়গায় রাখতাম।”
দির্শক ধীরে বললো,,
“কে বলেছে প্রতিশোধে বন্ধুত্ব?হ্যাঁ, এমন ভাবনা শুরুতে ছিল।কিন্তু তোদের সঙ্গে মিশে সেটা কবে উবে গেছে নিজেও জানি না।তোদের অবদান কী করে ভুলবো?”
আলবান অবুঝের মতো বললো,,
“তাহলে পুলিশ এলো কেন?ওরা কেন বলছে তুই পাঁচটা খুন করেছিস?”
“তোরা তো জানতিস আমার মা মারা গেছে।
আর তার প্রতিশোধও নিচ্ছি।”
“কিন্তু খুন করছিস এটা তো কখনো বলিসনি।”
“কখনো তো শুনতে চাসনি।”
দির্শক এবার আর্দ্রের দিকে তাকালো। আর্দ্র অসহায় চোখে ওদের দিকেই তাকিয়ে ছিল। দির্শক ইশারায় ডাকলো। আর্দ্র এগিয়ে এলো।
ঠিক আলবানের মতোই হঠাৎ সে দির্শককে জড়িয়ে ধরলো। নিঃশব্দে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো দির্শকের শার্টে।
কান্না চেপে আর্দ্র বললো,,
“কেন এত খুন করলি, দির্শক?”
“কি করতাম, বল?”
“আমাদের বলতি। আমরা শাস্তি দিতাম।”
দির্শকের কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠলো,,
“পারতি নিজের বাবাকে শাস্তি দিতে?
পারতি না।”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আর্দ্র বললো,,
“তাই বলে এমন করবি?”
দির্শক নাজিম তালুকদারের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ তীব্র কণ্ঠে বললো,,
“কই… আর পারলাম?”
ওদিক থেকে পুলিশ ইন্সপেক্টর গলা খাঁকারি দিয়ে কর্তৃত্বপূর্ণ স্বরে ঘোষণা করলেন,,
“আর এক মুহূর্তও সময় দেওয়া সম্ভব নয়। এখনই আমাদের রওনা হতে হবে।”
কথার মাঝেই রাগ চেপে রাখতে না পেরে তিনি জোর করে দির্শকের হাতে হ্যান্ডকাফ পরাতে পরাতে বললেন,,,
“এইসব নাটক দেখার সময় আমাদের নেই। আপনি একজন নয় পাঁচ পাঁচটি খুনের আসামি, দির্শক প্রধান। কী ভয়ংকর অপরাধ করেছেন, তা জানেন? এর শাস্তি হয় ফাঁসি, নয়তো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।”
ঠিক সেই মুহূর্তে বাতাস ছিঁড়ে ভেসে এলো এক তীক্ষ্ণ, মেয়েলি কণ্ঠ,,
“কি বললি তুই?”
বিথীর কণ্ঠ তালুকদার বাড়ির দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে সবার কানে বাজতে লাগল। চোখের পলক ফেলার আগেই তার হাতে থাকা রামদাটি গিয়ে ঠেকল পুলিশের গলায়। গলায় শক্ত, ধারালো কিছু অনুভব করতেই ইন্সপেক্টর আতঙ্কে তাকালেন আর আঁতকে উঠলেন।
দাঁতে দাঁত চেপে, জ্বলন্ত দৃষ্টিতে বিথী বলল,,,
“আর একবার বল। বল তো আবার!
ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়লেন। পরিবারের কেউই কল্পনাও করেনি বিথী হঠাৎ এমন ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নেবে। একে একে সবাই তাকে রামদা নামাতে অনুরোধ করতে লাগল, কিন্তু সে কথায় বিথীর কোনো সাড়া নেই। অগ্নিঝরা চোখে সে শুধু পুলিশের দিকেই তাকিয়ে আছে।
আবারও গর্জে উঠল বিথীর কণ্ঠ,,,
“তোদের চোখে সে পাঁচটা খুনের আসামি হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে সে এখন আমার স্বামী।”
হঠাৎই বিথী ইতির দিকে তাকিয়ে বলল,,,
“ইতি, কাগজ আর কলম নিয়ে আয়।”
ইতি দ্রুত সেগুলো এনে বিথীর সামনে ধরল।
“কাগজটা মেলে ধর,”নির্দেশ দিল বিথী।
রামদাটি পুলিশের গলায় আরও চেপে ধরে সে আশপাশের পুলিশদের হুঁশিয়ারি দিল,,,
“এক পা কেউ সামনে বাড়ালে, এই পুলিশবাবুর মাথা এখানেই পড়ে যাবে।”
ভয়ে কেউ আর নড়ল না।বিথী এবার ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমানের দিকে তাকিয়ে কঠোর কণ্ঠে বলল,,,
“এখানে সাইন কর।”
কাঁপা গলায় ইন্সপেক্টর প্রশ্ন করলেন,,
“এটা… এটা কী?”
“সাইন কর বলছি!”বিথীর গলা আরও কঠিন হয়ে উঠল।
আর কোনো প্রশ্ন না করে, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতেই ইন্সপেক্টর রেজিস্ট্রির কাগজে সই করে দিলেন।
বিথী ঠান্ডা স্বরে বলল,,,
“আজ থেকে তুই আমার আর দির্শক স্যারের বিয়ের চার নম্বর সাক্ষী। বুঝলি?”
“এ্যা ”
ইতি সঙ্গে সঙ্গে শুধরে দিল,,,
“‘এ্যা’ নয়, ‘হ্যাঁ’।”
ইন্সপেক্টর ভীত কণ্ঠে বললেন,,,,
“আপনি মারাত্মক ভুল করছেন। একজন ইন্সপেক্টরের গলায় দা ধরে রাখা গুরুতর অপরাধ। এর শাস্তি আপনাকে পেতেই হবে।”
বিয়ের চতুর্থ সাক্ষী ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান।
বিথী হঠাৎ করেই তাঁর হাত থেকে কাগজ কলম ছিনিয়ে নিল, আর গলা থেকে রামদাটিও টেনে সরিয়ে নিল।
ঠিক তখনই পুলিশ রাগে বিথীর দিকে আঙুল তুলে কিছু বলতে যাবে,
এর আগেই দির্শক ঝট করে সেই আঙুল চেপে ধরে, দৃঢ় ভঙ্গিতে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“রিল্যাক্স।”
পুলিশ দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল,
“পুলিশের সঙ্গে এ কেমন আচরণ?”
দির্শক ধীরে পুলিশের কানের কাছে ঝুঁকে, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি এঁকে ফিসফিস করে বলল,,
“বিয়ের সাক্ষী তো হলেনই, এবার আমাকে বাসরটাও করতে দিন।”
পুলিশের চোখ রক্তিম হয়ে উঠল, রাগে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে কিছু বলতে যাবে,কিন্তু দির্শক আবারও ঠাণ্ডা গলায় থামিয়ে দিল,,
“বাসর করতে যাচ্ছি। আপনারা এখানে আমার জন্য অপেক্ষা করবেন। কাজ শেষ করেই ফিরে আসব।
আর একটা কথা বাধা দিতে আসবেন না।
নইলে সাত নম্বর খুনের তালিকায়… আপনার নামটা থাকবে। নিশ্চয়ই আমি কি? কেমন?তা চিনতে আর বাকি নেই।তাই যা বলছি তাই শুনুন।”
পুলিশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। কী যেন গভীরভাবে ভাবছিল চোখেমুখে তার ছাপ স্পষ্ট।
এই ফাঁকে দির্শক ঘুরে দাঁড়াল বিথীর দিকে। হাত বাড়িয়ে বিথীর হাত ধরতে যেতেই বিথী হাতটা সরিয়ে নিল।
বিথীর চোখ তখন মেঝের দিকে স্থির নিস্তব্ধ, ভাবনায় ডুবে থাকা এক অদ্ভুত দৃষ্টি।
দির্শক আবার অন্য হাতটা ধরতে চাইলে, এবারও বিথী দৃঢ়ভাবে হাত সরিয়ে নিল।
দির্শক বিথীর মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল তার মনে ঠিক কী চলছে। কিন্তু কিছুই ধরতে পারল না।
হঠাৎ বিথী চোখ নামিয়ে রাখা অবস্থা থেকে সরাসরি দির্শকের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আপনার সঙ্গে আমার কথা আছে। চলুন।”
দির্শক খানিকটা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কোথায়?”
কোনো উত্তর না দিয়ে বিথী ইতি ও নিধির দিকে একবার তাকাল। তারপর দির্শকের হাত শক্ত করে ধরে সিঁড়ি বেয়ে ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
দির্শক নিঃশব্দে, নিস্পলক দৃষ্টিতে চারপাশের সবকিছু দেখতে থাকল।
পরিবারের সদস্যরা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল সেই দিকেই।
নাঈম তালুকদার রাগে ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন।
আলবান ধীরে বাবার কাছে এগিয়ে গিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“বাবা, দির্শক এসব কী বলছে? তাড়াতাড়ি সব ক্লিয়ার করো। তুমি দির্শকের বাবা হও,মানে এসব কি,?”
নাজিম তালুকদার ভয়ে আমতা আমতা করে বললেন,
“আমি জানি না এসব। এ..সব মিথ্যা কথা।”
আর্দ্র গম্ভীর স্বরে বলল,
“ঠিক আছে, মেনে নিলাম। তাহলে আমি কে? আমার পরিচয় কী?”
নাজিম তালুকদার অসহায়ভাবে বলে উঠলেন,
“তুমি কে আমি জানি না।”
এবার আলবান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। রাগে কণ্ঠ চড়িয়ে বলল,
“বাবা, এখনো সময় আছে। সব সত্য বলে দাও। স্বীকার করো সব।”
আর্দ্র ঠাণ্ডা, তীক্ষ্ণ স্বরে যোগ করল,,
“তোমার এই আমতা আমতা কথাই প্রমাণ করছে তুমি মিথ্যা বলছো, আর অনেক কিছু লুকাচ্ছো।”
নাজিম তালুকদার ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন,
“আমি কিছু জানি না! কিছুই জানি না!”
চিৎকার করতে করতেই তিনি আবার সোফায় ঢলে পড়লেন।
দির্শককে নিজের ঘরে নিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দিল।
দির্শককে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে সে হিটারে পানি গরম করতে দিল। টেবিল থেকে ফার্স্ট এইড বক্স এনে একটি পাত্রে কুসুম গরম পানি নিল, তাতে এক ফোঁটা স্যাভলন মিশিয়ে নিল।
দির্শক নিঃশব্দে সব দেখে যাচ্ছিল।
বিথী আবার দির্শকের কাছে এসে তার শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করল।
দির্শক কিছু বলতে চাইতেই বিথী সতর্ক কণ্ঠে থামিয়ে দিল,
“শশশ… একটা কথাও না। একদম চুপ।”
দির্শক শুধু হালকা করে হাসল।
বিথী স্যাভলন মেশানো পানিতে তুলো ভিজিয়ে দির্শকের ক্ষতস্থানে লাগিয়ে পরিষ্কার করতে লাগল। জ্বালায় দির্শক চোখ বন্ধ করে নিল।
গুলিটা বাহুর মাংস ছিঁড়ে বেরিয়ে গেছে লাল মাংসগুলো ফ্যাকাশে হয়ে আছে। দৃশ্যটা দেখে বিথীর গা শিউরে উঠল, তবু নিজেকে শক্ত করে চারপাশটা ভালো করে পরিষ্কার করতে লাগল।
প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। রক্ত এখনো গড়াচ্ছে, চামড়ার সঙ্গে লেগে আছে।বিথীর অজান্তেই চোখ বেয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল। ব্যাকুল হয়ে সে ক্ষতস্থানে একের পর এক ফুঁ দিতে দিতে পরিষ্কার করল। তারপর প্রয়োজনীয় সব ওষুধ লাগিয়ে মনোযোগ দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিল।
বিথী জানে না এই ব্যান্ডেজে আদৌ রক্তক্ষরণ পুরোপুরি বন্ধ হবে কিনা।
তবু এই মুহূর্তে, নিজের সব ভয় আর দ্বিধা চাপা দিয়ে, সে শুধু দির্শককে বাঁচিয়ে রাখতেই চায়।
দির্শক অপলক দৃষ্টিতে বিথীর পানসে মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে বলল,,
“কবে থেকে আমাকে এভাবে পাগলের মতো ভালোবাসলে, বিথী?”
বিথী কাজ করতে করতেই উত্তর দিল,,
“যেদিন জানলাম, আমি ছাড়া আপনার এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই।”
দির্শক নিঃশব্দে তাকিয়ে থেকে বলল,,
“ আমার প্রতি কি তোমার একফোঁটা ঘৃণাও জন্মায় নি?”
বিথী থেমে গিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,,,
“আপনার প্রতি জন্ম নেওয়া একবিন্দু ঘৃণাকেও আমি ঘৃণা করি।”
এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে দির্শক বলল,,,
“সত্যিই বিথী, আজকের দিনটা আমার জীবনের সবচেয়ে বিশেষ দিন। এত সুন্দর একটা দিন আমার জীবনে আসবে কখনো কল্পনাও করিনি।”
বিথী হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু হাসি আর এলো না। ব্যান্ডেজ করা শেষ হতেই সে অন্যদিকে ফিরতে উদ্যত হলে, দির্শক হঠাৎ তার হাত ধরে নিজের উরুর ওপর বসিয়ে নিল। বিথীর বুক ধক করে উঠল। এভাবে সে কখনোই দির্শকের কাছে আসেনি আজই প্রথম। অথচ তখন তার সমস্ত প্রতিরোধ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
দির্শক বিথীকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে থুতনি রেখে বলল,,,
“আমাকে যেতে হবে, বিথী। নিজের খেয়াল রেখো। আমাকে মনে রেখো। পাঁচটা খুনের দায়ে আদালত আমাকে ফাঁসির রায়ই দেবে, তোমাকে আর দেখতে পাবো না এটা ভাবলেই বুকটা ব্যাথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে।”
ভয়ে আঁতকে উঠল বিথী। মুহূর্তেই সে দির্শকের বুকে মুখ গুঁজে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল,,,
“আমাকে ছেড়ে যাবেন না। আপনি না থাকলে আমার বাঁচাই অসম্ভব হয়ে যাবে।”
দির্শকও তাকে শক্ত করে ধরে, বিথীর গলায় মুখ গুঁজে অসহায় কণ্ঠে বলল,,,
“তুমি না থাকলে আমিও শেষ হয়ে যাব, সে আমি যেখানেই থাকি না কেন।”
বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বিথী বলল
“আমি ইতি-নিধির মতো আপনার সাথে সংসার করতে চাই।”
এই কথায় দির্শকের চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। চাপা স্বরে বলল,,,
“হয়তো সেটা আর হলো না।”
বিথী কিছু বলতে পারল না। কাঁদতেই থাকল। হঠাৎ যেন মনে পড়ে গেল কিছু। সে দির্শকের বুক থেকে মুখ তুলে তার চোখের দিকে তাকাল। দির্শক বিথীর গালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো কানের পেছনে সরিয়ে দিল, চোখের জল মুছে দিয়ে গালে শব্দ করে চুমু খেল।
ঠিক তখনই বিথী হঠাৎ বলে উঠল,,,
“চলুন, দুষ্শমন স্যার।”
দির্শক বিস্মিত হয়ে বলল,,
“কোথায়?”
“আমরা পালিয়ে যাব। অনেক দূরে যেখানে পুলিশ কখনো আমাদের খুঁজে পাবে না।”
দির্শক আরও অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,,
“ভেবে বলছো? এমন হলে তুমি সত্যিই খুশি থাকবে তো?”
তখন বিথীর চোখের সামনে ভেসে উঠল ইতি আর নিধি তাদের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত। বুক ফেটে কান্না এলো। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,,,
“আমি ইতি-নিধিকে ছাড়া থাকতে পারব না।”
দির্শক সামান্য হাসল।বিথী আবার বলল,,,
“কিন্তু আপনাকে ছাড়া আমি বাঁচবও না।”
চোখ বন্ধ করল বিথী। ভেসে উঠল ইতি আর নিধির হাস্যোজ্জ্বল মুখ। যেন তারা বারবার বলছে,,
“দির্শক স্যারকে নিয়ে পালিয়ে যা, বিথী। পালিয়ে যা।”
হঠাৎ চোখ খুলল বিথীর। সে বুঝে গেছে সবকিছু। উঠে দাঁড়াল। আলমারির বইয়ের ফাঁকে লুকিয়ে রাখা টাকাগুলো বের করল। আলমারি থেকে শাড়িগুলো নামিয়ে একটার সঙ্গে আরেকটা শক্ত করে বেঁধে নিল।
তারপর দির্শককে একটি নতুন শার্ট পরিয়ে দিয়ে তার হাত ধরে বলল,,,
“চলুন।”
আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বিথী হঠাৎ দির্শকের হাত চেপে ধরে তাকে টেনে নিয়ে গেল বেলকনির দিকে। কী বলবে বুঝে ওঠার আগেই দির্শক দেখল বিথী বেলকনির রেলিংয়ে নিজের শাড়ি শক্ত করে বেঁধে নিচের বাগানের দিকে নামিয়ে দিল। এক মুহূর্তের মধ্যেই সে নামতে শুরু করল।
অদ্ভুতভাবে, তার চোখেমুখে বিন্দুমাত্র ভয় নেই না হোঁচটের, না পড়ে যাওয়ার। দির্শক বুক ধকধক করতে থাকা সত্ত্বেও নিজেকে সামলে শুধু এটুকুই বলল,,
“সাবধানে…”
বিথী ধীরে, স্থির হাতে নেমে গেল। নিচে পৌঁছে বাগান থেকে হাত নেড়ে ইশারা করল দির্শককে নামার জন্য। দির্শক দীর্ঘ এক শ্বাস ফেলে নামতে শুরু করল। শেষমেশ ঝাঁপ দিয়ে বাগানে নামতেই বিথীর মুখে ফুটে উঠল বিজয়ের হাসি।
সেই হাসির দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দির্শক বুকের ওপর হাত রেখে আবেগে বলে উঠল,,
“হায়ইইইই! এই হাসির জন্য দির্শক প্রধান সবকিছু করতে রাজি।”
বিথী শুধু মুচকি হাসল।
দির্শক সযত্নে বিথীর ওড়নাটা ঠিক করে তার মাথায় তুলে দিল, যেন রাতের অন্ধকারেও সে নিরাপদ থাকে। তারপর বিথীর হাতের আঙুলের ফাঁকে নিজের আঙুল গলিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল,,
“চলো তবে… দেখি তোমার পালানোর ইচ্ছা কতটা কার্যকর হয়, চলুন ম্যাডাম।”
বিথী ভ্রু কুঁচকে, গাল ফুলিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,,,
“আজীবনের জন্য কার্যকর।”
এরপর আর দির্শককে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তার হাত ধরে দৌড়াতে শুরু করল বিথী। তালুকদার বাড়ির গেট পেরিয়েই ডানদিকে পুলিশের গাড়ি আর কয়েকজন পুলিশ চোখে পড়ল। মুহূর্তের সিদ্ধান্তে তারা বামদিকে ঘুরে প্রথমে ধীরে, তারপর পূর্ণ গতিতে দৌড়াতে লাগল। দৌড়াতে দৌড়াতে কুয়াশার আড়ালে মিলিয়ে গেল দু’টি ছায়া দু’টি সাহসী মন।
এদিকে দীর্ঘ সময় ধরে দির্শকের কোনো হদিস না পেয়ে পুলিশের অবস্থা তখন ঘাম আর রাগে একাকার। ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান তপ্ত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে সেই ঘরের দিকে এগোলেন। তার পেছনে পেছনে ইতি আর নিধি হাসতে হাসতে চলল, একে অপরের দিকে তাকিয়ে চাপা হাসিতে ফেটে পড়ল।নিধি,ইতি ভালো করেই বুঝলো যে বিথী ও দির্শক পালিয়েছে।
দরজার সামনে এসে ইন্সপেক্টর একের পর এক জোরে কড়া নাড়লেন। ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে অবশেষে দরজায় ধাক্কা দিয়ে ভেঙে ঢুকে পড়লেন। ঘরের ভেতর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কাউকে পেলেন না।
শেষে বেলকনিতে এসে রেলিংয়ে ঝুলতে থাকা শাড়িটা দেখে মুহূর্তেই সব বুঝে গেলেন। হতবাক কণ্ঠে বললেন ,,,,
“তাড়াতাড়ি বাইরের ফোর্সকে জানাও আসামি পালিয়ে গেছে!”
এরপর ঘরের সবার দিকে তাকিয়ে কঠোর স্বরে যোগ করলেন,,
“দির্শক প্রধান আপনাদের মেয়েকে নিয়ে পালিয়েছে। এটা মোটেও ভালো কাজ নয়। এর ফল তাকে কঠিনভাবে ভুগতে হবে। এই বাড়ির ওপর আমাদের নজর থাকবে সবসময়। সাবধানে থাকবেন।”
নিধি ফিক করে হেসে ফট করে বলল,,,
“তার আগে প্যান্টটা তুলুন স্যার। টেনশনে টেনশনে কত নিচে নেমে গেছে!”
ইতি সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,,
“আমরা আপনার সিনারি দেখতে আগ্রহী নই।”
ইন্সপেক্টর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন,,
“মুখ সামলে কথা বলুন!”
ইতি নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিল,,
“ভুড়িওয়ালা লোক, আপনিও প্যান্ট সামলে কথা বলুন।”
এই বলেই ইতি আর নিধি একে অপরের গায়ে পড়ে হেসে উঠল। ইন্সপেক্টর দাঁতে দাঁত চেপে গালি দিতে দিতে হনহন করে বেরিয়ে যেতে লাগলেন।
ঠিক তখনই দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন আছিয়া বেগম।
“সামন থেকে সরুন,” রুক্ষ স্বরে বললেন ইন্সপেক্টর।
কিন্তু আছিয়া বেগম নড়লেন না। বরং হঠাৎ তিনি ঠোঁট দুটো চুমুর ভঙ্গিতে গোল করে ইন্সপেক্টরের দিকে এগোতে লাগলেন। অপ্রস্তুত ইন্সপেক্টর কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন, কিন্তু আছিয়া বেগম থামলেন না।
আসলে, আছিয়া বেগম সেই রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। রাত তখন এগারোটা। তার ঘুমে হাঁটার পুরনো অভ্যাস আছে। ভুলবশত সেদিন তার ঘরের দরজাটাও খোলা ছিল। যে দরজাই খোলা পেয়েছেন, সেদিকেই হেঁটে চলে এসেছেন তিনি।
এইভাবে এগোতে এগোতে হঠাৎই তড়িৎ বেগে আছিয়া বেগম ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমানের গলা জড়িয়ে তার কোলে উঠে পড়লেন।
মাহফুজুর রহমানের চোখ তখন বিস্ফারিত ভাষাহীন, হতভম্ব।
পুলিশ দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল,,,
“ইনি এমন করছেন কেন? কোল থেকে নামুন। এখনই নামুন!”
আছিয়া বেগম কথাগুলো শুনলেন কি না, তা বলা মুশকিল। চোখ বন্ধ করে তিনি গভীর শ্বাস নিচ্ছিলেন, যেন এখনো ঘুমের ভেতরেই আছেন।
মুহিন খিলখিল করে হেসে বলল,,,
“আমাদের দাদিমার ঘুমে হাঁটার অভ্যাস আছে।
পুলিশ প্রায় চিৎকার করে উঠল,,
“এনাকে তাড়াতাড়ি নামতে বলুন আমার কোল থেকে!”
ইতি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,,,
“আমরা এসবে নেই, বাবা।”
ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান রাগে দাঁত কটমট করতে করতে জোর করেই আছিয়া বেগমকে নামিয়ে দিলেন। তারপর আর একটি কথাও না বলে হনহন করে বেরিয়ে গেলেন।
পেছন থেকে নিধি গলা উঁচিয়ে বলে উঠল,,,
“প্যান্টটা হাত দিয়ে ধরবেন স্যার, না হলে পড়ে যেতে পারে!”
এই কথা শুনে দুই বোনই হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগলো। আবার বিথীর কথা মতে হতেই চোখ দুটো ভিজে এলো তাদের।
রাস্তার ধারে একটি বড় আম গাছে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে দির্শক ও বিথী, পুলিশের ধাওয়ায় কোনদিকে যাবে না যাবে করে আম গাছে উঠে পরছে দুজনেই,দির্শক ও বিথী দুজন দুজনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে, বিথী ভয়ে রিতিমত কাঁপছে এই হাড় কাঁপানো শীতের তোড়েও কাঁপছে মেয়েটা, দির্শকের মধ্য বিন্দু পরিমাণ ও ভয় দেখা গেল না।
দির্শকের নজর এখন বিথী কম্পিত ঠোঁটজোড়া , সেদিক থেকে চোখ সড়ছেই না তার, দির্শকের মধ্য এক অবাধ্য চাওয়া সৃষ্টি হলো,একটা শুকনো ঢোঁক গিললো দির্শক বিথীর মুখ খানা আদলে নিয়ে নিজের দিকে ফেরালো সে, বিথী বুঝলো না দির্শকের পরবর্তী পদক্ষেপ, ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল শুধু দির্শকের পানে,দির্শক আলগোছে বিথীর গাল বেয়ে পড়া পানিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো বিথী কেঁপে উঠলো, লজ্জায় দির্শকের চোখ থেকে চোখ সড়িয়ে নিলো,দির্শক একই ভাবে অপর গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে গেলো,দির্শক সেখানেই থামলো না এবার তার অবাধ্য ঠোঁট জোড়া বিথী গলায় স্থান নিলো সেখানেও এঁকের পর চুমু দিতে লাগল, বিথী বুক ধকধক করছে, দির্শকের প্রত্যেক ছোঁয়ায় বিথী শিহরিত হতে লাগলো বারবার, বিথী অনেক বার চাইলো দির্শক এই ছোঁয়া কে বাঁধা দিতে কিন্তু কিছুতেই তা পারছে না, বিথী শ্বাস পড়ছে জোরে জোরে।
দির্শক এই মুহূর্তে এক ঘোরের মধ্যে আছে, বিথীকে নিজের করে নেওয়ায় মরিয়া হয়ে উঠেছে সে, দির্শকের স্পর্শ গুলো আস্তে ধীরে বাড়তে লাগলো, দির্শকের হাতের বিচরণ ঘটলো জামা ভেদ করে উন্মুক্ত পিঠে।
পিঠ থেকে একহাত সড়িয়ে সেই হাত বিথী ঠোঁটের আশেপাশে ছুঁয়ে দিতে লাগলো, বিথী কাঁপা কণ্ঠে বলার চেষ্টা করে,,,
“আমরা… আমরা তো এখন গাছে উঠে আছি…আপনি কি করছেন?”
দির্শকের কানে সে কথা পৌঁছালো কিন তা বলা বাহুল্য,শুনলেও সে কথার পাত্তা না দিয়ে বিথীর ঠোঁট জোড়া আঁকড়ে নিলো, বিথীর চোখ কোটা থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো, অতঃপর চোখ খিচে বন্ধ করে দির্শকের শার্ট খামচে ধরলো।
এদিকে দির্শকের হাত জোরাও অবাধ্যর মতো বিচরণ করছে সারা শরীর, বিথী একবার ছেড়ে পুনরায় আবার আকড়ে ধরলো, দির্শকের পরবর্তী পদক্ষেপ আঁচ করতে পেরে বিথী দির্শকে আটকানোর চেষ্টায় কাইকুই শব্দ করতে লাগলো, কিন্তু দির্শক নিজ কাজে অটল।
এভাবে চললো বেশ কিছুক্ষণ, দির্শকে আটকানো দরকার তাই বিথী জোর করে নিজেকে সাড়িয়ে নিয়ে বললো চোখ নামিয়ে বললো,,,
“আ আমরা..”
কথা শেষ করতে দিলো দির্শক ফের সে বিথীর ঠোঁট জোড়া আঁকড়ে ধরলো, বিথী চেয়েও আর বাঁধা দিতে পেলো, আস্তে আস্তে দির্শক নিজের সাথে আরো মিশিয়ে নিলো বিথীকে।প্রকট ভাবে পুরুষত্ব জেগে উঠেছে দির্শকে, হাতে বিচরণ চলতে লাগলো অনিয়ন্ত্রিত ভাবে।
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৫
দূরের রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের নিভু আলো কুয়াশার ভেতর ঝাপসা হয়ে জ্বলে ওঠে। রাতটা ধীরে ধীরে আরও ঘন হয়েছে কিন্তু তারা ডুবে যেতে লাগলো স্বর্গীয় সুখের খোঁজে। দু’টি হৃদয়ের ধুকপুক শব্দ ও ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ প্রকৃতির সাথে মিলে মিশে একাকার।
পালানোর উত্তেজনা, অচেনা রাত আর কাছাকাছি থাকার সেই মুহূর্ত সব মিলিয়েথে এই মুহূর্তে,দাঁড়িয়ে থাকা গাছটা সাক্ষী হয়ে থাকে এক রোমাঞ্চকর, অস্থির, মুধুর্য রাতের।
