অসমাপ্ত তুমি পর্ব ৭+৮
sanara
রিদ্র বাসায় এসে এক নিমিষে সবকিছু ভাঙচুর শুরু করে দিলো। চেয়ার, টেবিল, বই—যা সামনে পেল, ভাঙতে লাগল।
হঠাৎ দরজায় নক পড়ল। বাবার গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
— “রিদ্র, দরজা খুলো। এমন করছো কেনো?”
রিদ্র রাগে গর্জে উঠল,
— “বাবা, আমাকে একা থাকতে দিন। প্লিজ, আমি এখন একা থাকতে চাই।”
রিদ্রর বাবা কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। তিনি জানেন, রিদ্র খুব জেদি আর রাগী। এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বললেন, — “মা-হারা ছেলেটাকে কোনোদিন বুঝাইনি মায়ের অভাব। আজ সে পুরো মায়ের মতোই জেদি হয়ে উঠেছে।”চোখ ভিজে উঠল তাঁর।
অন্যদিকে, সামিরা, সানিয়া আর ইফতি ক্যান্টিন থেকে খাওয়া শেষে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
বাসায় ফিরে সামিরা ফ্রেশ হয়ে মাকে বলল,
— “মা, আমি খেয়ে এসেছি ক্যান্টিন থেকে। এখন ঘুমাচ্ছি।”
আলেয়া বেগম রাগে বললেন,
— “তোকেতো বারবার বলি ক্যান্টিনের উল্টাপাল্টা খাবার খেতে মানা! শোনিস না কেনো?”
সামিরা হেসে বলল,
— “আরে মা…”
আলেয়া বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন, — “আচ্ছা, ঘুমা এখন।” বলেই চলে গেলেন।
সামিরা রুমের দরজা লাগিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
মনে হঠাৎ রিদ্রর কথা ভেসে এলো। (“এই লোকটা কি আমার ওপর রেগে আছে? অথচ রাগ তো আমার করার কথা। উনিই কেনো রাগ করবেন?… থাক, এসব ভেবে লাভ নেই। ঘুমাই বরং।”)
সন্ধ্যায় সামিরা উঠে পড়তে বসল। ফিজিক্স আর ইংলিশের বই খুলেছে। হঠাৎ মুখে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
— আচ্ছা, আমি কি লোকটাকে একবার কল দিব? না না… পরে আবার ভাববে আমি ছ্যাচড়া!
অন্যদিকে রিদ্রর মাথায় তখন শুধু রাগ—কিন্তু সামিরার ওপর নয়, সিমির ওপর। (“ও আমাকে জড়িয়ে ধরলো না হলে আজকে এসব হতো?”)
রাতে সামিরা ডিনার সেরে ঘুমিয়ে পড়ল।
রাত ২টায় হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। সামিরা বারবার কল কেটে দিলো। তবুও আবার বাজল।
ঘুম-জড়ানো কণ্ঠে সামিরা ধরল,
— “হ্যালো… কে?” -(……………….)
— “হ্যালো? উফ, কে?” -(……………….)
সামিরা এবার রেগে উঠল, — “এই, কোন বজ্জাত? শালা! আবার কল করেছিস? কানের নিচে এমন থাপ্পড় মারবো, কান ভি টিভির মতো ঝিরঝির করবে!” বলেই কল কেটে আবার ঘুমিয়ে গেল।
সকাল। সামিরা ব্রেকফাস্ট সেরে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।
গেটে দাঁড়িয়ে সানিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। ঠিক তখনই ইফতি এসে সামনে দাঁড়াল। আর বলল,
— “কখন এলে?”
— “এখনই”। সামিরা উত্তর দিল।
ঠিক তখন রিদ্রও কলেজে ঢুকছিল। সামিরার পাশে ইফতিকে দেখে রিদ্রর মাথায় রক্ত চড়ে গেল। চোখ লাল হয়ে উঠল। এক মুহূর্ত দাঁড়াল না—সোজা অফিস রুমে চলে গেল।
এদিকে সানিয়া দৌড়ে এসে সামিরাকে বলল,
— “সরি, ইচ্ছে করে লেট করিনি। ব্রেকফাস্ট করতে একটু দেরি হয়ে গেল, তার ওপর রাস্তায় জ্যাম।”
সামিরা মুচকি হেসে বলল, — “আচ্ছা বাদ দে, আমিও এখনই এসেছি।”বলেই তিনজন একসাথে ভেতরে ঢুকে গেল।
আজ ফার্স্ট ক্লাস রিদ্রর। সবাই ইংলিশ বই নিয়ে বসে আছে।
রিদ্র ক্লাসে ঢুকে দেখল—সামিরা তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল।
সামিরা মনে মনে বলল, (“উনি কি এখনো আমার ওপর রেগে আছেন?”)
ক্লাস শেষে রিদ্র হঠাৎ সবার সামনে বলল,
— “অফিস রুমে আসুন।”
বলেই বেরিয়ে গেল। সামিরার মনে হচ্ছিল—এই কথাটারই অপেক্ষায় ছিল। তাই দেরি না করে পেছন পেছন গেল।
অফিস রুমে ঢুকতেই রিদ্র হঠাৎ সামিরার হাত দেয়ালে চেপে ধরল। গভীর চোখে তাকিয়ে বলল,
— “ইফতি ছেলেটার সাথে তোর কী? এত মিশিস কেনো?”
ব্যথায় সামিরার চোখে জল চলে এলো। এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সামিরা কাঁপা গলায় বলল,
— “আমি আর ইফতি শুধু ফ্রেন্ড। আর কিছু না।”
রিদ্র চোখে সেই অশ্রু দেখে হাত ছেড়ে দিল। গম্ভীর স্বরে বলল,
— “আর কখনো যেনো ইফতির সাথে বেশি মিশতে না দেখি।”
সামিরাও রাগী চোখে তাকিয়ে বলল,
— “আমিও যেনো আর না দেখি সিমির সাথে বেশি মিশতে।”
বলেই দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেল সামিরা। রিদ্র একা দাঁড়িয়ে রইল। ক্লাসে ফিরে সামিরার মনে হলো—আকাশ ভেঙে মাথার ওপর নেমে পড়েছে।
ক্লাসে ঢুকেই সামিরার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। কারণ—আজ নতুন বাংলা লেকচারার হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে সিমি।
সিমি কড়া গলায় বলল, — “এই মেয়ে, এত লেটে এলে কেন?”
সামিরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে উত্তর দিল,
— “আসলে ম্যাম, আমি ইনচার্জ স্যারের সাথে জরুরি কথা বলতে গিয়েছিলাম।” (মিথ্যে বলল সামিরা)
সিমি ভুরু কুঁচকে তাকালেও আর কিছু বলল না।
— “আচ্ছা, ভেতরে এসো।”
সামিরা ভেতরে গিয়ে সানিয়ার পাশে বসল।
সানিয়া ফিসফিস করে বলল,
— “আজকের বাংলা ম্যাডামকে কেমন যেন লাগছে, বুঝলি? সুবিধার মনে হচ্ছে না।”
সামিরা ঠোঁট কামড়ে বিড়বিড় করে বলল,
— “সুবিধার কেমন হবে? ছেলেদের পেছনে ঘুরলে তো এ রকমই হয়।”
— “কি বললি?” সানিয়া কানে হাত দিল।
— “কিছু না, পড়।” সামিরা বইয়ে চোখ রাখল।
সেদিন ক্যান্টিন থেকেই খেয়ে নিল সামিরা। কারণ তার মা–বাবা দুজনেই দাদুর অসুস্থতার কারণে গ্রামে গিয়েছেন।
বাসায় ফিরে সামিরা শুয়ে পড়ল।
সন্ধ্যায় পড়তে বসেছে বটে, কিন্তু মাথায় কিছু ঢুকছে না। পেটের ভেতর একেবারে খালি। বাসায় কিছু খাওয়ারও নেই।
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল। রিদ্র কল দিয়েছে।
সামিরা ধরতেই বলল,
— “হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম।”
— “ওয়ালাইকুম আসসালাম। কি করছো?” রিদ্রর কণ্ঠ ভেসে এলো।
সামিরা বিরক্ত হয়ে বলল, — “মাটি কাটতে বসেছি।”
— “এই মেয়ে, ঠিক করে বলতে পারো না?”
— “এই সময়ে তো স্টুডেন্টরা পড়তে বসে, জানেন না?”
— “তোমার মতো ফাঁকিবাজ স্টুডেন্টরা বসে না।”
— “এই! আপনি আমাকে অপমান করছেন? সামনে পেলে গুলি করে উড়িয়ে দিবো।”
রিদ্র হাসল,আর বলল,
— অপমান করার জন্য মান প্রয়োজন! তোমার তোহ মান ও নেই!আচ্ছা বাদ দেও, কি করছো আসলে এখন?”
সামিরা এবার আসল কথা বলল, কাঁপা গলায়, — “পড়তে বসেছি। কিন্তু মাথায় ঢুকছে না। খুব খিদে পেয়েছে…”
রিদ্র চুপ করে গেল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, — “আচ্ছা, পরে কথা হবে।”কল কেটে দিল।
কিছুক্ষণ পর দরজায় কলিং বেল।
সামিরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, — “এ সময় আবার কে এলো? মা–বাবা তো পরশু ফিরবে…”
বেল আবার বাজল।
দরজা খুলে হতবাক হয়ে গেল সামিরা। দাঁড়িয়ে আছে রিদ্র, হাতে খাবারের প্যাকেট।
— “তোমার জন্য এনেছি।”রিদ্র শান্তভাবে বলল।
সামিরা কিছু না বলে ভেতরে ঢুকতে দিল।
রিদ্র টেবিলে রাখল কোরিয়ান স্পাইসি রামেন—সামিরার সবচেয়ে পছন্দের।
সামিরা খুশিতে রান্না করে আনল, খেতে বসল। তাড়াহুড়োতে এমন শব্দ হচ্ছিল যে রিদ্র বিরক্ত হয়ে বলল,
— “এত শব্দ করে খাচ্ছো কেন?”
অসমাপ্ত তুমি পর্ব ৫+৬
সামিরা চোখ ঘুরিয়ে উত্তর দিল, — “কুত্তার কান নাকি আপনার?”
রিদ্র কিছু বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ সামিরা এক চামচ রামেন তার মুখে পুরে দিল।
মুহূর্তে রিদ্রর চোখ–মুখ লাল হয়ে উঠল। সে তো ঝাল খেতে পারে না, তার ওপর আবার এলার্জি!
তিন গ্লাস পানি খেলেও কিছুতেই ঝাল কমছে না।
রিদ্রর এই অবস্থা দেখে সামিরার বুক ধকধক করতে লাগল। এক মুহূর্ত ভেবে কিছু না বুঝেই সামিরা… রিদ্রর ঠোঁটে ঠোঁট চেপে দিল।
