প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫১
ইনান হাওলাদার
নিস্তেজ দেহটাকে পাজকোলা করে নিয়ে পাগলের মতো ছুটছে তূর্য। পায়ে একজোড়া জুতা পর্যন্ত নেই। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মেয়েটার মুখের ওপর ঝুলে আছে, ঠোঁট জোড়া ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, চোখ দুটো আধখোলা করে রেখেছে।মুখ দেখে মনে হচ্ছে এই যেন সারাজীবনের জন্যে অচেনা এক ঘুমের দেশে তলিয়ে যাবে। তূর্য চতুর্থ তলার সিঁড়ি ভা’ঙতে ভা’ঙতে একবার আহির মুখের দিকে তাঁকালো। ফ্যাকাশে মুখটা দেখে সহ্য করতে পারলো না।বুকের ভিতরটা দু’মড়ে-মু’চড়ে উঠলো । মেয়েটাকে আরও শক্ত করে বুকের চেপে ধরলো। অজানা আ’তঙ্কে শরীর কাঁপছে। এ কি করে ফেললো স্টু’পিডটা। ও যখন এই মি’থ্যা কথাটা জানতে পেরেছিল, কই ? সে তো একবারের জন্যেও এভাবে জীবন দেওয়ার কথা ভাবেনি। মনে হয়েছে এই মেয়েটা ছাড়া তার বেঁচে থাকা ন’রক য’ন্ত্রণা হবে।কিন্তু,একবারের জন্যেও এভাবে নিজের জীবন ত্যাগ করার কথা সে মাথাতে আনেনি। আহিটা কবে থেকে এসব ভালোবাসা বুঝতে আরম্ভ করলো? কে বলেছে ওকে এসব ভালোবাসা বুঝতে, পাগলামি করতে!জীবন দিলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়?
পাঁচ তলায় এসে থামে তূর্য। চিৎ’কার করে ওঠে,
” ডক্টর? ইজ এনিওয়ান হেয়ার? ডক্টর……”
সাথে সাথে একটা ওয়ার্ড বয় স্ট্রেচার নিয়ে ছুটে এলো। তূর্য সেখানে আহিকে শুইয়ে দিতে দিতে পুনরায় ডাক্তারকে ডাকলো। ইতোমধ্যে একজন ডাক্তার ছুটে এসেছেন। তিনি চিনতে পারলেন তূর্যকে। এই জগতে বেশ পরিচিত মুখ ও।লোকটা কিছু বলতে চাইছিলেন হয়তো।তার আগেই তূর্য পুনরায় বলে ওঠে,
” ডক্টর ইমারজেন্সি …..”
ডক্টর আর কিছু বলেন না।বুঝতে পারলেন হয়তো খুব কাছের কেউ।তিনি চলে যান আহিকে নিয়ে। তূর্য ক্লান্ত ভঙ্গিতে করিডোরে থাকা বেঞ্চের একপ্রান্তে বসে পড়লো। ঊরুর উপর কনুই ঠেকিয়ে দুই হাতের তালুতে মাথা রাখলো। কিছুসময় চোখ বন্ধ করে পড়ে রইলো। আনমনে বিড়বিড় করলো,
” নিজের জা’নের মায়া না করিস।আমারটা একটু করতে পারতিস। তোকে আমি কোনো দিন ক্ষমা করবো না ,আহি ।কোনোদিন না!”
খুব অসহায় এবং ভ’ঙ্গুর শোনালো কন্ঠস্বর।দুই হাতে মাথার চুল খাঁমচে ধরলো । এসব কিছুর জন্য নিজেকে দায়ী করলো । ওর’ই ভুল সবটা।মেয়েটা তো ওর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল । কখন চলে গেল একটু বুঝতে পারল না ।এত বড় একটা কথা জানার পর সে নিজেই যখন ওভাবে ভে’ঙে পড়েছিল সেখানে ও তো একটা বাচ্চা মস্তিষ্কের মেয়ে। পুনরায় বিড়বিড় করলো,
” এত আবেগী কেন তুই জা’ন! এত ভালোবাসা তো আমি চাইনি।যার জন্যে জীবনটাই দিয়ে দিবি।”
মিনিট কয়েক পর পুরো চৌধুরী বাড়ি হাজির হলো হাসপাতালে। আকবর চৌধুরী এগিয়ে গেলেন বি’ধ্বস্ত ছেলের পানে। আলতো করে কাঁধে হাত রাখলেন । ভরসার হাতের স্পর্শ পেয়ে আস্তে করে মাথা তুললো তূর্য । র’ক্তিম হয়ে থাকা চোখ জোড়া নিয়ে সামনের ব্যক্তির দিকে তাঁকালো। বাবাকে দেখে হুট করেই আবেগী হয়ে পড়লো ও। মনের জোর যেন হারিয়ে ফেললো।উঠে দাঁড়িয়ে ভেজা কন্ঠে ডাকলো,
” আ..আব্বু ”
আকবর চৌধুরী ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। তূর্যও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো বাবাকে। কিছুক্ষণ পর কাধ ভেজা অনুভূত হলো ওর। নিজেকে সামলে বাবাকে সা’ন্ত্বনা দিলো তূর্য,
” এভরিথিং উইল বি ওকে । টে’নশন করবেন না ”
তারপর সামনে তাকিয়ে বাড়িশুদ্ধু সবাইকে দেখে বলল,
” সবাইকে কেন নিয়ে এসেছেন ? মেজো মা ….”
আকবর চৌধুরী ছেলেকে ছেড়ে দিলেন। তার কথা শেষ করতে না দিয়ে বললেন,
” মেজো বউ জ্ঞান হারিয়েছে। ছোট বউ আছে ওর কাছে ”
” ওহ ” ছোট্ট করে বলল তূর্য।
তারপর আরো বেশ কিছুক্ষন সময় অতিবাহিত হলো। ডক্টর সেই যে ঢুকেছেন আর বেরোনোর নাম নেই। চৌধুরী বাড়ির প্রতিটি সদস্য নীরব ভঙ্গিতে হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ বা চিন্তিত ভঙ্গিতে পায়চারি করছে।ডাক্তারের আসার অপেক্ষায় সবাই। সকলের ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়ে বের হলেন ডাক্তার সাহেব। সকলে যে যার অবস্থান থেকে তাড়াহুড়ো এগিয়ে গেল।কিন্তু তূর্য নড়লো না জায়গা থেকে। সবাইকে অতিক্রম করে ডক্টর নিজেই এগিয়ে এলেন ওর কাছে।
কাঁধে হাত রেখে বললেন,
” শ্বাস নালীতে অনেকটা আঘাত পেয়েছে।এখনো জ্ঞান ফেরাতে পারিনি। ২৪ ঘণ্টা মনিটরিংয়ে রাখবো এর পরেও যদি জ্ঞান না ফেরে আইসিইউ’তে রাখতে হবে। ”
তূর্য বি’ধ্বস্ত নয়নে ডাক্তারের দিকে তাঁকালো। ডাক্তার হয়তো ওর মন পড়তে পারলেন।নিজে থেকে পুনরায় বললেন,
” তুমি নিজেও একজন ডক্টর আশা করি সবটা বুঝবে ”
” বাট,ডক্টর এত ক্রি’টিকাল অবস্থা ! ”
” রশ্মি হিসাবে যা ইউজ করেছে সেটাতে সূচালো কিছু ছিল হয়তো।সেটা শ্বাসনালীতে আঘাত করেছে ”
বলে চলে গেলেন ডাক্তার। আকবর চৌধুরী এগিয়ে এলেন।তূর্য ওনার উদ্দেশ্যে বলল,
” আপনি আম্মু আর ছোটদের নিয়ে চলে যান।আমি আর ছোট চাচ্চু আছি এখানে ”
তারপর এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আসলাম চৌধুরীর
দিকে তাঁকালো সে। মাথা নুইয়ে রেখেছেন ,এদিকে তাঁকানোর সাহস পর্যন্ত পাচ্ছেন না। এতক্ষণ ধরে কারো সাথে একটা কথা পর্যন্ত বলেননি।তখন থেকে নীরবে চোখের পানি ফেলছেন শুধু। আকবর চৌধুরী,পারভিন বেগম ,আসিফ চৌধুরী সান্ত্বনা দিয়েছেন,বুঝিয়েছেন ওনাকে। তবুও সবার সামনে আসতে পারছেন না। আ’ত্মগ্লানিতে কারো চোখে চোখ রাখতে পারছেন না। কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াবেন সবার সামনে? এ সবকিছুর পিছনের মূল কারিগর তো তিনি নিজেই । একটা ভুল ধারণা আর একটা ভুল সিদ্ধান্তে সবটা এখন শেষ হয়ে যাওয়ার পথে।তার ছোট্ট মেয়েটা আজ মৃ’ত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। কিছু একটা অঘটন ঘটে গেলে তিনি কিছুতেই নিজেকে ক্ষ’মা করতে পারবেন না। বুকটা ধূ ধূ করে উঠলো ওনার। এসব অলক্ষুণে চিন্তা কেন মাথায় আসছে ! কিচ্ছু হবে না ওনার মেয়ের।
তিনি চোখ মুছতে মুছতে চলে যেতে লাগলেন।তূর্য এগিয়ে গেল চাচার কাছে।আটকালো ওনাকে ,
” চাচ্চু ? ”
পা থামিয়ে পিছু ফিরলেন আসলাম চৌধুরী। তূর্যের কাঁধে হাত রাখলেন। কিছু বলতে চাইলেন হয়তো। কিন্তু গলা দিয়ে কথা বের করতে পারলেন না। তূর্য জড়িয়ে ধরলো চাচাকে। শান্ত কন্ঠে বললো,
” শুধু শুধু নিজেকে অপরাধী ভাববেন না। উপরওয়ালার কাছ থেকে যা চেয়ে নিয়ে এসেছি তাই পাচ্ছি। আল্লাহর কাছে দোয়া করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই চাচ্চু। কিচ্ছু হবে না ওর। বি স্ট্রং ! ”
পাঞ্জাবির হাতা টেনে চোখের জল মুছলেন আসলাম চৌধুরী।ভ’ঙ্গুর কন্ঠস্বরে বললেন,
” দুনিয়ার সব থেকে নি’কৃষ্ট বাবা আমি।যার কারণে তার মেয়ে এখন মৃত্যুশয্যায়।আমার মতো বাবা আর কোনো মেয়ের না হোক”
” এভাবে নিজেকে দো’ষী সাব্যস্ত করবেন না চাচ্চু, প্লিজ।এ সবকিছু আমাদের ভাগ্য। ”
এরমধ্যে ফোন বেজে উঠলো তূর্যের। আসলাম চৌধুরীকে ছেড়ে পকেট হতে মোবাইল বের করলো সে।ওর পিএ – তারেকের কল । অসময়ে কল দেখে টনক নড়লো তার। বিকাল সাড়ে চারটায় চেম্বার আছে। এখন বাজে সোয়া চারটা। হাতে সময়ও খুব কম। এখান থেকে ওর চেম্বারের দূরত্ব কম হলেও এক ঘণ্টার। এইটুকু সময়ের মধ্যে কিভাবে কি করবে। এমতাবস্থায় ও কিছুতেই কাজে কনসেন্ট্রেশন দিতে পারবে না। ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেললো । তারপর কল রিসিভ করলো ।সাথে সাথে ওপাশের উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর,
” স্যার ,কোথায় আপনি ? রোগীরা অপেক্ষা করছে।”
” আজ আসতে পারবো না।ওনাদের চলে যেতে বলো ”
” কিন্তু স্যার…. ” বাকি কথা শোনে না তূর্য।কল কেঁটে মোবাইল পকেটে গুজলো।
বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। এখনো কোনো ভালো খবর পাওয়া যায়নি। দু’শ্চিন্তায় মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে তূর্যের। ছেলেটা এখনো সেই সকালের পোশাক পরে আছে। সকাল বললেও ভুল হবে । গতকাল মাঝ রাতে বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে বাড়িতে ফিরে কোনো রকমে চেইঞ্জ করে এই টিশার্ট আর ট্রাউজার পড়েছিল।পারভিন বেগম শত চেষ্টা করেও এক চুল সরাতে পারেনি ছেলেকে। একজন নার্স এসে কপাল আর কনুইয়ের ক্ষ’ত জায়গায় ড্রেসিং করে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে গেছেন। শরীরে অনেক জ্বর দেখে কিছু ওষুধও দিয়ে গেছেন। খাবার খেয়ে ওষুধ গুলো খেতে বলে গিয়েছেন। সেই ওষুধ গুলো এখনো অবহেলায় ওর পাশে পড়ে আছে।
আপাতত হাসপাতালে তূর্য ছাড়া আর কেউ নেই । আসলাম চৌধুরী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আহির পাশের কেবিনে আছেন তিনি। কিছু মেডিসিনের দরকার ছিল সেগুলো এনে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বেঞ্চে মাথা হেলিয়ে দিয়েছে তূর্য। আকবর চৌধুরী কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে ফ্যাক্টরিতে গিয়েছেন। একটু আগেও তূর্য আর আসিফ চৌধুরী ছিলেন ।একটা জরুরী কল আসায় তিনি মোবাইলে রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা করতে করতে বাইরে গেলেন।
মিনিট খানেক পর কোথা থেকে ছুটতে ছুটতে নাবিল,তাসিন আর আলিয়া এলো।পিংকি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা তাই আসতে পারেনি। ওরা এসেই একসাথে উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করলো,
” আর ইউ ওকে,বন্ধু ? ”
” হুম ” ছোট করে উত্তর দিলো তূর্য।ওদের দেখে অবাক হলো সে।এদের আবার খবর কে দিলো।
আলিয়া বলল,
” এত কিছু হয়ে গেল একটাবার আমাদের ইনফর্ম করার প্রয়োজন মনে করলি না ? ”
পরপর তাসিন প্রশ্ন করলো,
” এসব কিভাবে হলো ভাই? তোরা …বাড়ির সবাই কোথায় ছিলি?কিভাবে মেয়েটা এতো বড় একটা কান্ড ঘটিয়ে ফেললো? ”
” থামলি ক্যান ? আর কয়ডা প্রশ্ন কর। বা’ড়ার মেন্টাল গুলোরে নিয়ে হাজির হইছি ”
নাবিলের কথায় আজ আর ক্ষে’পলো না তাসিন। পাশ ফিরে নাবিলের দিকে তাঁকিয়ে নরম কন্ঠে বলল,
” টেনশন হচ্ছে তাই এত অধৈর্য হয়ে পড়েছি ভাই ” তারপর তূর্যের দিকে তাঁকিয়ে পুনরায় বলল,
” আহির এখন কী অবস্থা ? ”
এতক্ষণে উত্তর এলো তূর্যের। আস্তে করে বলল,
” জানি না ! ”
ওর এমন উত্তরে সবাই অবাক হলো। একসাথে বলে উঠলো,
” মানে ? ”
” ডক্টর এখনো কিছু জানায়নি। বাসায় যা তোরা ” শান্ত গলায় বলল তূর্য।
এতক্ষণে আলিয়ার খেয়াল এলো তূর্যের দিকে।ও গিয়ে বসলো ছেলেটার পাশে। কপাল ছুঁয়ে আ’র্তনাদ করে বলল,
” তোর কপাল কিভাবে কাটলো তূর্য? ”
বাকিরাও মাত্রই খেয়াল করলো।তূর্য বলল,
” এ্যা’ক্সিডেন্ট করেছিলাম ।”
ওর শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে নাবিল বললো,
” কিছু খাইছস? ”
” ক্ষুধা নেই। ”
” আমরা খাবার নিয়ে এসেছি । খেয়ে না ” বলে খাবার বের করলো তাসিন।তূর্য বি’রক্ত ভঙ্গিতে বলল,
” এত কথা বলিস না প্লিজ।তোদের ইনফর্ম কে করেছে?”
” আন্টি করছে।একটু কিছু খেয়ে নে তারপর আর কথা বলবো না ” বলে তাসিনের হাত থেকে খাবারের বক্স নিলো আলিয়া।তারপর এক টুকরো রুটি ছিঁড়ে তূর্যের মুখের সামনে ধরলো। কিছুক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পরেও তূর্য মুখ খুলছে না দেখে তাসিন বলল,
” হেলদি খাবার ভাই,খা। ওয়েলি কিছু নেই এরমধ্যে ”
বিরক্তির সাথে সাথে এবার রা’গ উঠলো তূর্যের।ক্ষুধা নেই তাই খাচ্ছে না। এতে হেলদি – আনহেলদি কি আছে।
নাবিলও অনুরোধ করলো,
” একটু খা ”
তূর্য একবার ওদের সবার দিকে তাঁকালো। সকলের চোখ ছলছল করছে। আলিয়ার হাত থেকে খাবার নিতে নিতে বলল,
” আমি খেয়ে নিতে পারবো ”
তারপর এক টুকরো রুটি ছিঁড়ে মুখে পুরলো। চিবোতে পারছে না , গাল লেগে আসছে। আলিয়া পানি এগিয়ে দিলো। কয়েক ঢোক পানি গিলে স্রেফ তিনবার তিন টুকরো রুটি মুখে নিলো। তারপর রেখে দিলো।বাকিরাও আর জোর করলো না। তূর্য উঠে গিয়ে একবার আসলাম চৌধুরীর কেবিন থেকে ঘুরে এলো। প্রেসার বেড়ে গিয়েছিল।এখন স্যালাইন চলছে। আপাতত ওষুধের প্রকোপে ঘুমাচ্ছেন। ও চাইলেই একবার গিয়ে আহিকে দেখে আসতে পারে। কিন্তু ও দেখতে চায় না । সারাক্ষণ ছুটে বেড়ানো পাগলটাকে এভাবে নিরিবিলি শুয়ে থাকতে কিভাবে দেখবে? স্টু’পিডটা বুঝছে না ওকে এভাবে শুয়ে থাকা মানায় না ? উঠে গেলেও তো পারে।
ইদানিং তো আবার সবকিছু বুঝেও না বোঝার ভান ধরে। কিভাবে তাকে ক’ষ্ট দেওয়া যায় ,কি করলে সে ক’ষ্ট পাবে সেই ধান্দায় ঘুরে। নিজেকে কি ভাবে ও ? এভাবে ম’রার মতো পড়ে থাকবে আর এই তাশরীক চৌধুরী তূর্য ওর শিয়রে বসে কাঁদবে? এইজন্যেই তো এত নাটক ! কর , যত খুশি নাটক করে নে।তবুও কার্য হাসিল করতে পারবি না। শুধু একবার কোনো রকমে সুস্থ্য হয়ে বাড়ি ফিরুক তারপর ও বুঝাবে এই তাশরীক চৌধুরী তূর্য কি জিনিস।সু’ইসাইডের সাধ হাঁড়ে হাঁড়ে মেটাবে ।
টানা ৩৬ ঘন্টা অবজার্ভেশনে রেখেও জ্ঞান ফেরাতে ব্যর্থ ডক্টর । আহির অবস্থা খুব একটা ভালো নয়।কন্ঠনালী ফুলে উঠেছে।শরীরে অক্সিজেনের মাত্রাও কমে গিয়েছে।ফলস্বরূপ আইসিইউ’তে রেখেছেন ডাক্তার। এতক্ষণে অবস্থার উন্নতি হওয়ার কথা থাকলেও অবনতি ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। পেশেন্ট নিজেই ফাইট করতে চাইছে না। সন্ধ্যা নাগাদ সকলে একটু বাড়ির দিকে গিয়েছিল। তূর্যেরও গোসল নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ঘণ্টা খানেক পার হওয়ার পূর্বেই ডাক্তার জরুরি ভিত্তিতে সবাইকে আসতে বলেছেন । পুনরায় হাসপাতালে পুরো চৌধুরী বাড়ি হাজির হয়েছে । ডাক্তার এগিয়ে এসে বললেন,
” পেশেন্টের মা-বাবা চাইলে ওনাকে দেখে আসতে পারেন।একেকজন করে যাবেন ।আর বেশিক্ষণ টাইম নিবেন না। ”
তূর্যের দিকে তাঁকিয়ে আবারো বললেন,
” ডক্টর.চৌধুরী তুমি তো এসব রুলস্ সম্পর্কে অবগত ।ফ্যামিলির লোককে বুঝিয়ে পাঠাও।” তারপর একটা নার্সকে ডেকে পিপিই এর ব্যবস্থা করতে বললেন। তূর্য ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
” ইজ এভরিথিং অলরাইট ,ডক্টর ? ও ঠিক আছে তো? ”
” নাউ সী ইজ ফাইন। বাট….” বলে থামলেন তিনি ।মাথা নিচু করে ফেললেন। তূর্য অধৈর্য হয়ে পড়ল। জিজ্ঞেস করল,
” কিন্তু কি ডক্টর? ”
” কিন্তু কতক্ষন থাকবে বলতে পারছি না। তোমরা নিজেদের শক্ত রাখো। যখন – তখন যেকোনো খবর কানে আসতে পারে তার জন্যে নিজেদের প্রস্তুত রাখো। ”
তূর্য যেন ধ্যানে পড়লো। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো । ডক্টর যেতে গিয়েও পুনরায় প্রশ্ন করলেন,
“বাই দ্যা ওয়ে, পেশেন্ট তোমার কি হয়? ”
বেশ খানিকক্ষণ নিশ্চুপ রইলো ও।তারপর উত্তর এলো,
” সী ইজ মাই লাইফ, মাই হোল ওয়ার্ল্ড , মাই এভরিথিং ” কথাগুলো বলার সময় নিজের মধ্যে ছিল না তূর্য। আনমনে বলল কথাগুলো। ডাক্তার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেলেন।মারুফা বেগম হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলেন।বললেন,
” বুবু ডাক্তার সাহেব তূর্যকে কী কী বললেন? আমার মেয়েটা আর বাঁচবে না তাই? এইজন্যে আমাদের সবাইকে ডেকেছে? আরে গলায় ফাঁস নিলে কেউ ম’রে নাকি? ওই ডাক্তার শ’য়তানি করে মে’রে ফেলছে আমার মেয়েকে।ওকে আমি পুলিশে দিবো। ভাইজান পুলিশে কল করুন আপনি। ওরা মে’রে ফেলবে আমার মেয়েটাকে ”
পারভিন বেগম আর লতা বেগম সামলাতে পারছেন না ওনাকে। তূর্য এগিয়ে গেল মারুফা বেগমের কাছে । শান্ত গলায় বলল,
” এসব কিছু না,মেজো মা। ডক্টর বললেন ,আহি ভালো আছে। ওর জ্ঞান ফিরেছিল তখন আপনাদের দেখতে চেয়েছিল।যান ,দেখে আসুন ”
” তোরা পাগল পেয়েছিস আমাকে? জ্ঞান ফিরলে মানুষকে আইসিইউ’তে রাখে ? আমার মেয়েটা আর বাঁচবে না তূর্য। তুই আমাকে মিথ্যা বলছিস কেন আব্বা?”
তূর্য চাচির মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বলল,
” এখানে আরো অনেক পেশেন্ট আছে না? আপনি এভাবে কান্না করলে তাদের সমস্যা হবে না,বলুন? ওকে একটু দেখে এসে নামাজ পড়ে দোয়া করুন, হ্যাঁ ? কিচ্ছু হবে না আপনার মেয়ের।আমি আছি না?”
বুঝিয়ে-শুনিয়ে কিছুটা শান্ত করা গেল মারুফা বেগমকে।মেজো মা’কে তো কিছু একটা বুঝিয়ে দিতে পারল নিজেকে কি বলে বোঝাবে !
বিশেষ পারমিশনে একে একে ছোট থেকে বড় বাড়ির প্রতিটি সদস্য গিয়ে দেখে এলো আহিকে। শেষে এসে আসলাম চৌধুরী তূর্যকে যেতে বললে ও গেল না। প্রসঙ্গ পাল্টে ওনাদের বাড়ি ফিরে যেতে বলল। বেশ অনেকটা রাত হয়েছে । জোর করে সবাইকে পাঠালো ও।যাওয়ার আগে তাহি দৌঁড়ে একবার তূর্যের কাছে এলো। ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে বলল,
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫০
” তুমি তো সুপার ডক্টর ভাইয়া।সবাইকে সুস্থ্য করে দেও। টিভিতেও দেখায় তোমাকে।তাহলে আহি আপুকে সুস্থ্য করে দিচ্ছ না কেন? ঐটা পঁচা ডক্টর।ট্রিটমেন্ট করতে জানে না। কিভাবে শুইয়ে রেখেছে আপুকে।তুমি দেখলে ওদের ধরে মা’রতে। এভাবে রাখলে তো আপু মারা যা…..”
তূর্য ঠোঁ’টে আঙুল ঠেকিয়ে আটকালো বোনকে।বলল,
” হুশ…! পঁচা কথা বলতে নেই,ভাইয়া। তুমি বাড়ি গিয়ে আপুর জন্যে প্রে করো।আপু সুস্থ্য হয়ে যাবে ,ওকেই ? যাও ”
