Home প্রিয় রাগিনী প্রিয় রাগিনী ভ্যালেন্টাইন স্পেশাল

প্রিয় রাগিনী ভ্যালেন্টাইন স্পেশাল

প্রিয় রাগিনী ভ্যালেন্টাইন স্পেশাল
লামিয়া ইসলাম শাম্মী

” বাতাসে বহিছে প্রেম,
নয়নে লাগিল নেশা,
কারা যে ডাকিল পিছে,
বসন্ত এসে গেছে!
মধুর অমৃতবাণী,
বেলা গেল সহজেই,
মরমে উঠিল বাজি,
বসন্ত এসে গেছে!

কাপড় ভাঁজ করতে করতে গুনগুন করে গেয়ে উঠলো লামহা। অফিস থেকে ফিরে রুমের দরজায় টোকা দেওয়ার আগে লামহার গান শুনে থমকে গেলো আবির। তাঁর বউয়ের যে এতো সুন্দর গানের গলা আগে তো জানতো না সে। উহুহহ জানবেই বা কেমন করে কখনো কী গান গিয়ে শুনিয়েছে নাকি যে শুনবে। ভেবেই মুখ বাকালো আবির। তারপর আবার লামহার দিকে তাকালো লামহা গুনগুন করতে করতে কাজ করছে, পিছনে যে তাঁর প্রাণের স্বামী দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে তাঁর খেয়াল নেই। আবির রুমের দরজা আর নক না করে ধীর পায়ে রুমে এগিয়ে গিয়ে লামহার পিছনে দাঁড়ালো।
লামহার তবুও সেদিকে খেয়াল নেই সে কাজে ডুবে আছে। আবির হাত বাড়িয়ে লামহাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো । হঠাৎ পিছন থেকে কেউ জড়িয়ে ধরায় লামহা একটু চমকে উঠলো কিন্তু দূরে সরলো না। কারণ সে জানে এই স্পর্শ তাঁর স্বামীর । লামহা ঠোঁটের কোণে হাঁসি নিয়ে পিছনে ঘুরে আবিরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শান্ত কন্ঠে বললো

” কখন আসলেন?”
আবির লামহার সামনে থাকা বেবি হেয়ার গুলো ফুঁ দিয়ে সরিয়ে বললো
” যখন আপনি গান গাইছিলেন তখন।”
” এতোক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন কেনো, কোনো কথা না বলে??”
” যদি কথা বলতাম তাহলে কী জানতে পারতাম আমার ঘরের বউ এতো সুন্দর গান গাইতে পারে??”
” আপনি আমার গান ও শুনে ফেলছেন??”
” ইয়েস।”
” আচ্ছা…! বুঝলাম।”
অবির লামহার দিকে তাকিয়ে দেখলো লামহা হাসছে। তাঁকে আজ ভীষণ খুশি দেখাচ্ছে। তাই আবির লামহা কে আরো নিজের কাছে টেনে নিয়ে এসে প্রশ্ন করলো

” তোকে আজ একটু বেশি খুশি মনে হচ্ছে না..?”
” আমি তো সবসময়ই খুশি থাকি।”
” হুমম তবে আজ একটু বেশিই খুশি লাগছে তোকে।”
” তাই..?”
” হুম ”
” তাহলে তাই সই। এখন ফ্রেশ হয়ে আসুন আমি খাবার আনছি।”
“খাবার পরে খাবো আগে একটা চুমু খাবো তোর ঠোঁটে।”
” একদম না।” বলেই চোখ পাকালো লামহা।
” একটা বেশি না এমন করিস কেনো??” বেশ অসহায় কন্ঠে বললো আবির।
” বলেছি তো একদমই না।”
” আমি বলেছি তো একটা।” বলতে বলতে লামহার ঠোঁটের কোণে টুপ করে একটা চুমু খেয়ে বসলো আবির।
” এটা কী হলো?”
” কী হবে?”
” আপনাকে অনুমতি দিয়েছিলাম চুমু খাওয়ার??”
” তোর কাছ থেকে চুমু খেতে অনুমতি লাগে না আমার।” বলেই লামহা কে ছেঁড়ে দিয়ে শার্টের বোতাম খুলতে লাগলো।
লামহা রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আবিরের দিকে। আবির তা দেখে ভ্রু নাচিয়ে বললো
” এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো??”
লামহা রেগে কিছু বলতে যাবে তাঁর আগ নিচ থেকে তাঁর ডাক পরলো। লামহা আবিরের দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে চলে গেলো নিচের দিকে। আবির লামহার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হেঁসে গামছা নিয়ে চলে গেলো বাথরুমে।

” আজ ভ্যালেন্টাইন ডে রাশেদ ভাই।”
” তো কী হয়েছে?”
” আমাকে তো একটা ফুল দিয়ে ভালোবাসি বলতে পারতেন।”
” শুধু শুধু ফুল কিনে টাকা নষ্ট করে ভালোবাসি বলার মানে আছে?”
” আপনি একটা আনরোমান্টিক রাশেদ ভাই।”
” আজকে জানলি?”
” হ্যাঁ..!”
” যাক ভালো আগে ভাগে জেনে রাখা ভালো।”
” আপনার সাথে আর কথা বলবো না।”
” ওকে।”
রাশেদ এর মেসেজ এর উত্তর দেখে শারমিন রেগে ফোন বিছানায় ছুঁড়ে বালিশে মুখ গুঁজলো।
একটা নিরামিষ পুরুষ ই জুটতে হলো তাঁর কপালে। আজ কি সুন্দর একটা ভালো মুড টা নষ্ট করে দিলো এই লোক। কথা বলবে না সে এই নিরামিষ পুরুষের সাথে। একদমই কথা বলবে না। ভেবেই অভিমানে মুখ ফুলালো শারমিন।

” ভালোবাসি ।”
” এই নিয়ে কতো বার বললেন?”
” জানি না..! তুই বল।”
” সকাল থেকে এই নিয়ে একশো বার বদলে এই কথা।”
সাফওয়ান হামিদার গালে টুপ করে চুমু খেয়ে বললো
” একশো বার কম হয়ে গিয়েছে বউ। কোটি বার তোকে ভালোবাসি বললেও কম হয়ে যাবে।”
” শেষ হয়েছে আপনার নাটক??”
” নাটক মানে?? এই তোর কাছে আমার ভালোবাসা নাটক মনে হয়??” বেশ অবাক হয়ে বললো সাফওয়ান।
হামিদা সাফওয়ান এর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে শোয়া থেকে উঠে অগোছালো চুলগুলো খোঁপা করতে করতে বললো

” জ্বী..! নাটক ই মনে হচ্ছে। এখন উঠুন, উঠে ফ্রেশ হয়ে আসুন। অফিস থেকে এসেই শুয়ে পরেছেন। গাঁয়ের জামা ও এখনো খুলেন নি। যান দ্রুত ফ্রেশ হয়ে আসুন।” বলেই শাড়ি ঠিক করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে যেতেই পিছন থেকে শাড়ির আঁচলে টান অনুভব করতেই হামিদা পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো সাফওয়ান হামিদার শাড়ির আঁচল টেনে ধরে আছে। হামিদা ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে বললো
” কী..?”
সাফওয়ান দুষ্টু হেঁসে হামিদার আঁচল এবার জোরে টান দিলো। হামিদা তাল সামলাতে না পেরে বিছানায় পরতেই সাফওয়ান হামিদা কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো। হামিদা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বললো

” কী করছেন?? ছাড়ুন আমাকে।”
” ছাড়ার জন্য কী বিয়ে করেছি তোকে?”
” উফফ সবসময় ফাজলামি করবেন না। ছাড়ুন নিচে কাজ আছে আমার।”
” সব কাজ পরে আমার কাজ আগে কর।”
হামিদা ভ্রু কুঁচকে সাফওয়ান এর দিকে তাকিয়ে বললো
” আপনার কী কাজ করবো এখন আবার??”
সাফওয়ান হামিদার দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাঁসি দিতেই হামিদা চোখ বড় বড় করে ছটফট করতে লাগলো নিজেকে ছাড়ানোর। তা দেখে সাফওয়ান বিরক্ত হয়ে বললো
” উফফ এভাবে নড়াচড়া করছিস কেনো?? একটু স্থির থাক।”
” ছাড়ুন আপনি আমাকে।”

সাফওয়ান শীতল দৃষ্টিতে হামিদার দিকে তাকিয়ে দেখলো হামিদা তাঁর কাছ থেকে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। তা দেখে সাফওয়ান বিরক্ত হয়ে হামিদার গাঁয়ে থেকে শাড়ির আঁচল টেনে ফেলে দিয়ে হামিদার হাত বেঁধে দিলো। হামিদা কিছু বলতে যাবে তার আগেই সাফওয়ান বিরক্ত হয়ে বললো
” মুখ থেকে আর একটা শব্দ বের করলে তোর খবর করে ছাড়বো আজ।”
সাফওয়ান এর কথা শুনে হামিদা ভয়ে চুপসে গেলো। সাফওয়ান তা দেখে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে এবার আদুরে গলায় বলল
” জান একটু ভালোবাসবো বেশি না। আজ ভালোবাসার দিনে যদি একটু ভালো না বাসি, তোকে যদি একটু ভালোবাসা না দেই তাহলে কেমন দেখায় না বিষয়টা বল তুই।”
বলতে বলতে হামিদার একদম সামনে নিজের মুখ নিলো। হামিদা কিছু বলার জন্য প্রস্তুত হতেই সাফওয়ান তাঁকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে হামিদার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো।

” শাড়ি? কার জন্য শাড়ি এনেছো?”
বেশ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো আয়না।
আরিফ গামছা দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে বিরক্ত হয়ে উত্তর দিলো
” প্রেমিকার জন্য।”
আয়না আরিফের কথা শুনে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে উঠলো
” প্রেমিকা মানে? আরিফ আমি থাকতেও তুমি পরকিয়া করছো?”
আরিফ বিরক্ত শ্বাস ফেলে পা ফেলে এগিয়ে গেলো আয়নর দিকে। আয়না রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। তা দেখে আরিফ বললো
” আমার চরিত্র সম্পর্কে তুমি খুব ভালো করেই জানো আয়না। তারপর ও এসব কেনো বলছো? আমি তো শাড়ি টা তোমার জন্য এনেছি। তুমি ছাড়া আমার তো কেউ নেই। শাড়িটা যদি তোমার পছন্দ না হয় তাহলে ফেলে দিও।” বলেই গম্ভীর মুখ করে বেলকনিতে চলে গেলো আরিফ।
আয়না অপরাধী চোখে তাকিয়ে থাকলো আরিফের যাওয়ার দিকে। এই রে তাঁর প্রাণের স্বামী ভালোই রেগেছে বোধ হয়। ভেবেই বিছানা থেকে নেমে পা টিপে টিপে বেলকনিতে গিয়ে পিছন থেকে আরিফ কে জড়িয়ে ধরে নিচু স্বরে বললো

” সরি।”
আরিফ কোনো কথা বললো না। তা দেখে আয়না আরিফের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আরিফ তা দেখে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিতেই আয়না আরিফের গলা জড়িয়ে ধরে বললো
” আমার ভুল হয়েছে প্লিজ ক্ষমা করে দাও। আর কখনো বলবো না। এই কান ধরছি। তবুও রাগ করে থেকো না।” বলেই আরিফের গলা ছেড়ে দিয়ে কানে হাত দিয়ে ছলছল চোখে তাকালো আয়না আরিফের দিকে। আরিফ আয়নার দিকে না তাকিয়ে বললো

” আমি রাগ করলেই কী মানুষ কী আর আমার রাগ ভাঙাতে আসবে নাকি??”
আয়না আরিফের কথায় ঝটপট বলে উঠলো
” কী করলে রাগ ভাঙবে যদি বলো তাহলে অবশ্যই সেই কাজটা করবো।”
আরিফ এবার আয়নার দিকে তাকিয়ে বললো
” সত্যি..?”
” হুমম।”
” ঠিক আছে, শাড়িটা এখন ই পরে আমাকে দেখাতে হবে, পারবে??”
আরিফের কথা শুনে আয়নার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো।
” আরেহহ এইটুকু কাজ পারবো না কেনো?? স্বামী যেহেতু বলেছে তাহলে অবশ্যই শাড়িটা পড়তে হবে। তুমি ৫ মিনিট অপেক্ষা করো আমি দশ মিনিটে আসছি।”
বলেই রুমের দিকে এগিয়ে আসতেই আরিফ আয়নার হাত ধরলো।
” কী?? আর কিছু বলবে??” পিছনে ঘুরে বললো আয়না।
” হুম..! একটু জড়িয়ে ধরবো।”
বলেই আয়নাকে হেঁচকা টান দিয়ে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু এঁকে দিলো। আয়নাও ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকলো আরিফের বুকে।

” আমার ভাইয়ে যখন বউ লইয়া
আমার চোখের সামনে দিয়া
রোমান্স কইরা হাইট্টা রুমে যায়
ফাইট্টা যায়য়য়য় ওওওও বুকটা ফাইট্টা যায়য়য়য়।”
” এই এই বাল অফ যা, তোর ফাটা গালা বন্ধ কর নয়তো লাথি মেরে নিচে ফেলে দিবো।”
লামিয়ার ধমক খেয়ে তায়েব মুখ চুপসে বসে থাকলো গাছের ডালে।
” এই তায়েবা কোথায় রে??” বরই খেতে খেতে প্রশ্ন করলো মাহির।
” জলে ডুবে গেছে মনে হয়।” মাহিরের কথায় বলে উঠলো তায়েব।
” তুই ভুল, কারণ প্রেমে মরা জলে ডুবে না।” হাতঘড়ি দেখতে দেখতে বললো লামিয়া।
তখনই গাছের নিচ থেকে তায়েবার গালা শোনা গেলো।
” এইইইই লামিয়া, মাহির, তায়েব নিচে নেমে আয়। অনেক জরুরী কথা আছে।”
লামিয়া, মাহির, তায়েব একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে ধীর ধীরে এক এক করে গাছ থেকে নিচে নেমে আসলো। লামিয়া কোমড় থেকে উড়না খুলে গাঁয়ে জড়াতে জড়াতে বললো

” কী জরুরী কথা বল ফেল।”
তায়েবা ভীষণ এক্সাইটেড হয়ে বলে উঠলো
” দ্রুত রেডি হ একটু পর সবাই ঘুরতে বের হবে।”
লামিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো ” কোন খুশিতে??”
” আরেহহ আজকে ভালোবাসা দিবস না তাই সবাই বলেছে ঘুরতে যাবে।”
” তুই যা আমি যাবো না।”
লামিয়ার কথা শুনে তায়েব বললো
” কেন রে যাবি না কেন?”
” দূর বাল এইসব ভ্যালেন্টাইন ডে আমাদের সিঙ্গেলদের জন্য না। ওদের সাথে গিয়ে আমরা কাবাবে হাড্ডি হবো কেন?”
” হুমম ঠি বলেছিস। তার চেয়ে আমরা বাড়িতে বসে থাকবো তাও ভালো।” লামিয়ার কথায় বলে উঠলো মাহির।
তায়েবা তাদের কথা থামিয়ে দিয়ে বললো ” আরেহহ ভাই থাম তো আমার কাছে ভালো প্ল্যান আছে।”
বলেই সয়তানি হাঁসি দিলো।
লামিয়া, মাহির, তায়েব তায়েবার দিকে তাকাতেই তায়েবা তাদের কে কিছু বলতেই তিনজন একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে একসাথে সব হেঁসে উঠলো। তারপর বাড়ির ভিতরে চলে গেলো।

আজ বাড়ির সব ছেলেরা গাঁয়ে জড়িয়েছে বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবি। দেখতে মন্দ লাগছে না তাদের। আর মেয়েরা সবাই পড়েছে বাসন্তী রঙের শাড়ি। আজ তাঁরা সেজেছে তাদের স্বামীদের পছন্দে। বাড়ির সবাই দাঁড়িয়ে আছে চার বিচ্ছু দের জন্য। সবাই তৈরি হয়ে নিচে নেমে গিয়েছে শুধু তাঁরাই নেই।
লাবিব ছবির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেই কখন থেকে। ছবি একটু পর পর আড়চোখে তাকাচ্ছে লাবিব এর দিকে। আশেপাশে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা নিয়ে লাবিব এর মাথা ব্যথা নেই। সে তাকিয়ে আছে সামনে থাকা বাসন্তী রঙের শাড়ি পড়া ছবির দিকে।
এর মধ্যেই লামিয়া, তায়েব, তায়েবা, মাহির এসে উপস্থিত হলো তাদের সামনে। শুভ্র চোখ তুলে লামিয়ার দিকে তাকাতেই তাঁর কপাল কুঁচকে গেলো।

বাসন্তী রঙের সুতির আনাড়কলি পরে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। কিন্তু এই মেয়েটা কে আজ শুভ্র দেখতে চেয়েছিলো শাড়িতে। কিন্তু মুখ ফুটে বলে নি। হয়তো ভেবেছিলো নিজ থেকে শাড়ি পড়বে কিন্তু পড়লো না। বেয়াদব একটা। ভেবেই মুখ কালো করে পাশে তাকাতেই দেখলো জাহিদ ও মুখ কালো করে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। শুভ্র আর জাহিদ একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে দুজন সামনের দিকে লামিয়া আর তায়েবার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কারণ তাঁরা দুজনে মিলিয়েই একরম ড্রেস পড়েছে আজ। এই দুইজনে কে কিছু বলার নেই। এদের কে শাড়িতে মনে হয় না আর কখনো দেখতে পাবে তাঁরা। ভেবেই মনে মনে দুঃখ প্রকাশ করলো।
লামিয়া শুভ্রর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো।
রাশেদ সবাই কে তারা দিলো গাড়িতে উঠার।
সবাই গড়ির দিকে পা বাড়াতেই লামিয়া বলে উঠলো

” আজ কোনো গাড়িতে যাবো না।”
লামিয়ার কথা শুনে লাবিব বিরক্ত হয়ে বললো ” তাহলে কী তোর ঘারে করে যাবে সবাই??”
লামিয়া তা পাত্তা না দিয়ে বললো
” আজ সবাই রিকশায় যাবো। রাতের শহর উপভোগ করবো, রিকশায় চড়ে। আর বাতাসে প্রেম বহিছে, এই প্রেম যদি উপভোগ না করতে পারি তাহলে কীসের ভালোবাসা দিবস??”
লামিয়ার কথা শেষ হতে না হতেই তায়েব, তায়েবা, মাহির এক সাথে বলে উঠলো “ঠিক,ঠিক ঠিক”
তাদের কথা শুনে আবির বলে উঠলো ” ভাই এতোক্ষণ বাতাসে ঠিকই প্রেমের ঘ্রাণ পাইছিলাম, কিন্তু আমার নাকে এখন গন্ডগোলের ঘ্রাণ আসছে।”
আবিরের কথা শুনে লামহা চোখ গরম করে তাকালো আবিরের দিকে।
লামিয়া শুভ্রর দিকে তাকাতেই দেখলো শুভ্র পাঞ্জাবীর পকেটে হাত ঢুকিয়ে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। লামিয়া তাকাতেই শুভ্র পকেট থেকে হাত বের করে ঘাড়ে হাত বোলাতে বোলাতে বললো

” আজকে রিকশাতেই চড়ে ঘোরা হবে।”
শুভ্রর কথা শুনে লামিয়া হাসলো। সবাই তাকালো শুভ্রর দিকে। শুভ্র তা পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে এসে ফট করে লামিয়ার হাত ধরে বললো
” তবে তুই আমার পাশের সিটে বসবি। চল রিকশায় ঠিক করি। ” বলেই লামিয়া কে টানতে টানতে নিয়ে গেলো গেটের বাহিরে।
এইদিকে শুভ্রর সাথে বসতে হবে ভেবেই লামিয়া বেশ বিরক্ত হলো। তাই হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলো কিন্তু শুভ্রর শক্তির কাছে পারলো না।
কিছুক্ষণ পর কয়েকটা রিকশায় ঠিক করতেই সবাই উঠে পড়লো রিকশায়। আজকে সবাই জোড়া ধরে বসেছে। সবাই বসতেই রিকশায় চলতে লাগলো গন্তব্যের দিকে।
শেষের রিকশায় পাশাপাশি বসে আছে লামিয়া আর শুভ্র। বাতাসের কারণে লামিয়ার সামনে থাকা চুলগুলো উড়ছে, সেদিকে লামিয়ার খেয়াল নেই সে দিব্যি চোখ ঘুরিয়ে চারপাশে চোখ বুলাচ্ছে। শুভ্র হাত বাড়িয়ে লামিয়ার চুল গুলো কানের পিঠে গুঁজে দিতেই লামিয়ার হুঁশ ফিরল। ভয়ে ছিটকে দূরে সরতেই শুভ্র দ্রুত লামিয়ার কোমড় চেপে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে রাগি কন্ঠে বললো ” থাপ্পড়ে গাল ফাটিয়ে ফেলবো, এখন ই তো পরে যেতি।”
লামিয়া শুভ্রর কথা শুনে বিরক্ত চোখে তাকালো তাঁর দিকে। শুভ্র ঠিক রাগি চোখে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। তা দেখে লামিয়া ফিক করে হেঁসে উঠলো। লামিয়ার হাঁসি দেখে শুভ্র ভ্রু কুঁচকে বললো

” হাসছিস কেনো?”
” আপনাকে দেখে।”
” আমাকে দেখে হাসার কী হলো?”
” আপনি এভাবে রাগলে আপনার নাক লাল টমেটোর মতো লাল হয়ে যায়। এটা কী জানেন আপনি?”
” না জানি না।”
” তা জানবেন কেনো? আচ্ছা যাই হোক এখন কোমড় ছাড়ুন।”
” ছাড়বো না। আচ্ছা আজকে সবাই শাড়ি পড়লো তুই পরিস নি কেনো?”
” ভালো লাগে না। আর শাড়ি তো আমি সামলাতে পারি না।”
শুভ্র দীর্ঘ শ্বাস ফেলে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে কোমড় ছেঁড়ে দিয়ে চুপচাপ বসলো।
তা দেখে লামিয়া আর কিছু বললো না। রিকশা এসে থামলো একটা পার্কের সামনে। লামিয়া ঝটপট রিকশা থেকে নেমে দ্রুত পা ফেলে তায়েব, তায়েবা মাহির এর সাথে গিয়ে দাঁড়ালো। রিকশার ভাড়া মিটিয়ে সবাই প্রবেশ করলো পার্কের মধ্যে। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রেমিক প্রেমিকারা। তা দেখে চারজন বাঁকা হাসলো। তারপর একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে কেটে পড়লো আস্তে করে। সামনে কথা বলতে বলতে হাঁটছে সবাই। শুভ্র কিছু টের পেয়ে পিছন ঘুরে তাকাতেই দেখলো চারজনের একজন ও কেউ নেই। তা দেখে সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে গেলো তাঁর।

” ওরা কোথায় গেলো??”
শুভ্রর কথা শুনে সবাই পিছন ফিরে তাকালো লামিয়া দের না দেখতে পেয়ে আবির বলে উঠলো ‌
” দেখ কোন গন্ডগোল পাকাতে গিয়েছে।”
আবিরের কথা শুনে লামহা বিরক্ত হয়ে বললো ” সবসময় ওদের পিছনে লেগে থাকেন কেনো?? হয়তো ঘুরতাছে এসে পড়বে এখন ই।”
লামহার কথায় রাশেদ বললো ” হ্যাঁ আর ওদের কাছে তো ফোন আছেই হাঁটতে হাঁটতে কল করছি চল সবাই।” বলেই হাঁটতে হাঁটতে পকেট থেকে মোবাইল বের করে কল করতেই মাহির জানালো তাঁরা এমনে হাঁটছে আশেপাশে একটু পর চলে আসবে। রাশেদ সবাই কে তা জানাতেই সবাই ঘুরতে লাগলো নিজেদের মতো।

” দেখ দেখ ভাই জায়গায় জায়গায় জোড়া। কিছু কী করবি না??”
” করবো একটু ওয়েট কর।”
বলেই সামনে তাকালো তায়েবা।
তখনই দেখতে পেলো একটা মেয়ে আর একটা ছেলে হাতে হাত রেখে হাঁটছে। তা দেখে চারজন বাঁকা হেঁসে আশেপাশে তাকিয়ে কিছু খুঁজতে লাগলো। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর একটা শক্ত মোটা লাঠি পেতেই চারজন হিহি করে হাসলো।

” বাবু আজকের দিনটা কতো সুন্দর তাই না??”
” হুমম বাবু তুমি সাথে থাকতে রাত দিন সব ই সুন্দর লাগে।”
দুষ্টু মিষ্টি কথা বলতে বলতে হাত ধরে হাঁটছে প্রেমিক প্রেমিকা।
“আআআআআআআআআআআআআআআআঅ”
শব্দ পেতেই মেয়েটি ছেলেটিকে বলে উঠলো
” বাবু কোথা থেকে আআআ শব্দ আসছে?”
” আমিও জানি না বাবু কোথা থেকে আসছে। তবে মনে হচ্ছে আমাদের পিছন থেকে। দাঁড়ালো দেখি তো।” বলতে বলতে পিছনে ঘুরতে না ঘুরতেই কেউ ছেলেটার পশ্চাৎদ্দেশে একটা শক্ত পোক্ত লাঠি দিয়ে একটা খোঁচা মেরে ফেলে দিলো।
ছেলেটি লাফাতে লাফাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই, মেয়েটি কিছু বলতে যাবে তাঁর আগেই দেখলো তাঁর দিকে দুজন লোক লাঠি নিয়ে তেড়ে আসছে। তা দেখে মেয়েটি ভয়ে দৌড় দিলো সামনের দিকে।
মেয়েটির দৌড় দেখে তায়েবা আর লামিয়া দৌড় থামিয়ে হেঁসে উঠলো। তাঁর পাশেই মাহির আর তায়েব, তারাও হাসছে।
আজকে পার্কে এসে সব প্রেমিক প্রেমিকাদের প্রেমে বাঁধা সৃষ্টি করবে তা তাঁরা পণ করে এসেছে বাড়ি থেকে।
” একটার প্রেমে তো বাগড়া দিলাম আর গুলো কে কী করবো??”
মাহিরের কথায় লামিয়া কিছু ভাবতে লাগলো। আশেপাশে তাকিয়ে চারপাশ দেখে নিলো একবার।
হঠাৎ চোখ পড়লো একটা পাগলের উপর যে কি না একা একা বিড়বিড় করতে করতে এগিয়ে আসছে। তা দেখে লামিয়া সয়তানি হেঁসে বললো
” পেয়েছি সামনে তাকা।”
তাঁর কথা শুনে তিনজন সামনে তাকাতেই দাঁত কেলালো।

” এতোক্ষণ লাগে ওদের আসতে??”
” আরে এসে পড়বে চিন্তা করিস না।”
শুভ্র বিরক্ত হয়ে বসলো বেঞ্চে। তখনই হঠাৎ চিল্লাচিল্লি শব্দ শুনে পাশে ফিরে তাকাতেই দেখলো চারজন মানুষ জান হাতে নিয়ে দৌড়াচ্ছে আর তাদের পিছনে একটা পাগল হাতে মোটা লাঠি নিয়ে দৌড়াচ্ছে তাদের। তা দেখে শুভ্র বসা থেকে লাফিয়ে উঠতেই সবাই শুভ্রর দিকে তাকালো। তারপর শুভ্রর চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকাতেই চোখ বড় বড় হয়ে গেলো সবার।

” আগেই বলেছিলাম ওরা সুবিধার ছেলেমেয়ে না আমার কথা কেউ শুনলো না এখন বুঝো।” বলে উঠলো আবির।
লামিয়া,তায়েব, তায়েবা, মাহির চেঁচাতে চেঁচাতে দৌড়ে তাদের দিকে আসছে। তা দেখে সাফওয়ান হামিদার হাত ধরে বললো ” বউ তুই শাড়ি সামলা আমি তোকে সামলে নিবো।” বলেই এক দৌড় লাগলো হামিদার দিকে।
তাদের দেখে সবাই যে যেভাবে পারছে দৌড়াচ্ছে। লামিয়া দৌড়ে শুভ্রর কাছে না গিয়ে সোজা লাবিব এর পিছনে দাঁড়ালো লাবিবের পাঞ্জাবি আঁকড়ে ধরে। লাবিব ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলো ” লামিয়ার বাচ্চা ছাড় আমাকে নয়তো এই পাগল আমাকে ওই লাঠি দিয়ে বারি মেরে দিবে।”
” না না লাবিব ভাই ছাড়বো না প্লিজ এমন করবেন না। একটা দুটো বারি খেলে কিছু হবে না।”
লাবিব লামিয়ার থেকে নিজের পাঞ্জাবি ছাড়াতে চাইলো কিন্তু নাছোড়বান্দা লবিব এর পাঞ্জাবী ছাড়ছে না। হঠাৎ পিঠে শক্ত পোক্ত লাঠির বারি পড়তেই লাবিব চেঁচিয়ে উঠলো। তা দেখে লামিয়া ভয়ে এবার অন্যদিকে দৌড় দিতেই শুভ্র লামিয়ার হাত টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসলো।
লাবিব একটা বারি খেয়ে ভৌ দৌড় দিলো সামনের দিকে। তার পিছন পিছন পাগল টা তাড়া করতে লাগলো।

” ওও আল্লাহ এবারের মতো বাঁচিয়ে নাও প্লিজ। আমি কান ধরছি খোদা ওই কুখাদ্য দের সাথে আমি আর কোথাও যাবো না। ” দৌড়াতে দৌড়াতে বলতে লাগলো লাবিব।
সবাই লাবিব এর কান্ড দেখে হাসছে। লামিয়া হাসতে হাসতে শুভ্রর কাঁধে দু – তিনটে থাপ্পড় দিয়ে পাশে তাকাতেই থতমত খেয়ে গেলো। ভয়ে তার কলিজা শুকিয়ে আসলো। শুভ্রর চোখ জোড়া রাগে লাল টুকটুকে হয়ে গেছে।
তা দেখে লামিয়া একটু দূরে সরে দাঁড়িয়ে বললো ” আমার কোনো দোষ নাই বিশ্বাস করুন আমি তো ওই পাগল কে একটু ক্ষেপিয়ে দিয়েছিলাম, জানি এই গফ – বফ ভ্যালেন্টাইন ডে জানি নষ্ট হয়। আমি শুধু মজা করতে চেয়ে ছিলাম বেশি কিছু না। কিন্তু ওও যে আমার উপর রেগে যাবে কে জানতো?”
লামিয়ার কথা শুনে আবির বিরক্ত হয়ে বললো ” এটাকেই বলে অন্যের জন্য গর্ত খুঁড়তে গেলে সেই গর্তে নিজের ই পড়তে হয়।”

লামিয়া আবির কে কিছু বলতে যাবে তাঁর আগেই শুভ্র লামিয়ার হাত ধরে টানতে টানতে কোথাও নিয়ে যেতে লাগলো। শুভ্র ভীষণ রেগে আছে, তা লামিয়ার বুঝতে বাকি নেই।
তায়েব, তায়েবা, মাহির লামিয়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে স্যালুট জানিয়ে বললো ” বেঁচে থাকলে দেখা হবে পিও।”
লামিয়া তা দেখে তিনজন কে বকতে লাগলো।
এইদিকে পাগলের ভয়ে লাবিব একটা গাছে উঠার জন্য পা বাড়াতেই পাগল টা দৌড়ে লাবিবের পাঞ্জাবী টেনে ধরলো। লাবিব নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলো।
তা দেখে সাফওয়ান, রাশেদ,আরিফ, জাহিদ এবার এগিয়ে এসে পাগল টা কে লাবিবের থেকে ছাড়িয়ে নিলো বহু কষ্টে।

তারপর পাগল টা কে শান্ত করতেই পাগল টা আবার নিজ গন্তব্যের দিকে হাঁটতে লাগলো।
লাবিবের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে এখন ই কান্না করে দিবে দিবে এমন একটা অবস্থা।
ছবি এগিয়ে এসে বললো ” বেশি ব্যাথা পেয়েছেন আপনি??”
লাবিব ছবির কথার উত্তর না দিয়ে রেগে বললো ” ওই বান্দরটা কোথায়?? ওকে বের করো দ্রুত। আজকে ওকে আমি ছাড়বো না।”
আবির হামি তুলতে তুলতে বললো
” তোর আর ধরতে হবে না। ওকে যে ধরার সে ধরে নিয়ে গিয়েছে। শুভ্রর চেহারা দেখে যা বুঝলাম ছাড়বে না আজ সহজে ওকে।”

” আর করবো না শুভ্র ভাই ছেঁড়ে দিন।”
শুভ্র কোনো কথা না বলে টানতে টানতে সিঁড়ি বেয়ে রুমের দিকে নিয়ে যাচ্ছে লামিয়া কে।
” আহহ হাতে ব্যাথা পাচ্ছি আস্তে ধরুন।”
শুভ্র তারপর ও একটু ও দয়া দেখালো না। লামিয়া কে টানতে টানতে রুমে এনে সোজা বাথরুমে নিয়ে গিয়ে
শাওয়ার এর নিচে দাঁড় করিয়ে দিয়ে, শাওয়ার ছেড়ে দিলো। ঠান্ডা পানি শরীরে পড়তেই লামিয়া কেঁপে উঠলো। প্রায় আধঘন্টা মতো শুভ্র লামিয়াকে ইচ্ছামতো সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে গোসল করালো। এইদিকে লামিয়া কাঁপতে কাঁপতে অবস্থা যায় যায় তার। সেদিকে শুভ্রর কোনো খেয়াল নেই। গোসল শেষ করে লামিয়া কে টাওয়াল দিয়ে চলে গেলো রুমের দিকে। লামিয়া টাওয়াল হাতে নিয়ে তব্দা খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
শুভ্র এতো রেগে কেনো আছে বুঝতে পারছে না সে। তখনই বাথরুমের দরজায় নক পড়তেই লামিয়া দরজা খুলে মাথা বের করে কিছু বলতে যাবে আর আগেই শুভ্র বাহির থেকে একটা টি শার্ট আর ট্রাউজার লামিয়ার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে চলে গেলো বেলকনিতে।

লামিয়া অবাক চোখে শুভ্রর যাওয়ার দিকে তাকালো তারপর বিরক্ত হয়ে দরজা লাগিয়ে দিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে বেরিয়ে এলো।
বেলকনিতে দাঁড়িয়ে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে শুভ্র। গাঁয়ের পাঞ্জাবী খুলে সাদা টি শার্ট পড়েছে। লামিয়া টিপ টিপ পায়ে শুভ্রর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। শুভ্র বাঁকা চোখে তা দেখলো। শুভ্র কে কিছু বলতে না দেখে লামিয়া বিরক্ত হলো, তবুও কিছু না বসে ওমন করেই দাঁড়িয়ে থাকলো। শুভ্র নিজ থেকে কথা না বললে সেও কথা বলবে না মনে মনে পণ করলো লামিয়া। নিরবতায় কেটে গেলো বিশ মিনিট। তবুও তাদের নিরবতা কাটছে না।
হঠাৎ হালকা দমকা বাতাস লামিয়ার গা ছুঁয়ে যেতেই লামিয়া কেঁপে উঠলো।
শুভ্র তা দেখে কিছু না বলে বেলকনি থেকে রুমে চলে গেলো। লামিয়া ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে তাকালো শুভ্রর যাওয়ার দিকে।

এমন কী করেছে যে এই লোক রেগে আছে। রাগলে রাগ করুক তার কি?? ভেবেই মুখ বাঁকিয়ে রেলিংয়ে উঠে বসে থাকলো। বেশ কিছুক্ষণ সেভাবে বসে থাকতেই পিঠে ভেজা অনুভব করতেই বিরক্ত হয়ে চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো।
ভেজা চুল থেকে পানি পরে পিঠ ভিজে চুপচুপে হয়ে গিয়েছে। এখন আর জামা পাবে কোথায়?? ভেবেই রাগ লাগছে তাঁর। রেলিং থেকে নেমে ধীর পায়ে এগিয়ে রুমে প্রবেশ করতেই দেখলো শুভ্র খাটে ল্যাপটপ নিয়ে বসে কাজ করছে।
লামিয়া তা দেখে আস্তে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই পিছন থেকে কেউ হেঁচকা টান দিলো। লামিয়া পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো শুভ্র হাত হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তা দেখে লামিয়া শুকনো ঢোক গিলে কিছু বলতে যাবে তার আগেই শুভ্র গম্ভীর গলায় বলে উঠলো

” কোথায় যাচ্ছিস??”
লামিয়া আমতা আমতা করে বলল
” বাড়িতে।”
” আমি কী একবারও বলছি তোকে যেতে?”
লামিয়া মাথা নাড়িয়ে বললো ” না।”
” তাহলে যাচ্ছিস কেনো??”
লামিয়া চুপ কিছু বললো না। তা দেখে শুভ্র লামিয়ার হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে একটা গামছা এনে চুল গুলো ভীষণ যত্ন নিয়ে মুছে দিতে লাগলো।

” আ…আপনি কী রেগে আছেন??”
কাঁপা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলো লামিয়া।
” রাগ করার মতো কোনো কাজ করেছিস??”
” আ..আমি তো জানি না।”
” তা জনবি কেনো?? কার পিছনে বাঁশ দিবি, কার প্রেম নষ্ট করবি। শুধু এটা জানিস। অন্য কারোর মনের খবর রাখার চেষ্টা করিস কখনো??”
শুভ্রর কথা শুনে লামিয়া তাজ্জব হয়ে পিছনে ফিরে শুভ্রর দিকে তাকালো। এই লোক বলে কী??
লোকটা কী বোঝাতে চাইছে তাঁর মনের খবর জানি আমি রাখি?? এটা বোঝাতে চাইছে?
লামিয়া কে এভাবে চুপ থাকতে দেখে শুভ্র দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। চুল গুলো মুছে সোজা আলমারির দিকে এগিয়ে গেলো। লামিয়া চুপচাপ বসে দেখছে শুভ্র কে।
শুভ্র আলমারি খুলে একটা কালো শাড়ি বের করে লামিয়ার হাতে দিয়ে বললো ” ফটাফট পড়ে আয়।”
লামিয়া চোখ বড় বড় করে বললো

” শাড়ি??”
” হুমম।”
” আমার জন্য??”
” হুমম।”
” সুন্দর হইছে।”
” জানি।”
” কিন্তু আমি পড়বো না।”
” কেনো পড়বি না?”
” কারণ আমি শাড়ি পড়তে পারি না।”
” একটা থাপ্পড় দিয়ে গাল ফাটিয়ে ফেলবো বেয়াদব। তুই আমার সাথে ফাজলামি করছিস?? তুই শাড়ি পড়তে পারিস সেটা আমি জানি।”
” কীভাবে জানলেন?” বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো লামিয়া।
” যেভাবেই হোক জানি। এখন কথা না বলে দ্রুত শাড়ি পড়ে আয় আমি অপেক্ষা করছি।” বলেই দরজা খুলে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো শুভ্র।
লামিয়া সেদিকে তাকিয়ে আবার হাতে থাকা কালো শাড়ির দিকে তাকালো। শাড়ির উপর হাত বুলিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সোজা বাথরুমে চলে গেলো।

বেশ কিছুক্ষণ পর
সাদা রঙের পাঞ্জাবী গাঁয়ে জড়িয়ে, রুমে প্রবেশ করে ড্রেসিং টেবিলের দিকে তাকাতেই চোখ আটকে যায় শুভ্রর।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে কালো শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াছিলো লামিয়া। হঠাৎ শুভ্র রুমে প্রবেশ করায় পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো শুভ্র এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
লামিয়া এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে নিচু কন্ঠে বললো
” কী হয়েছে?? এইভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো?? কালো শাড়িতে কী আমাকে মানায় নি??”
শুভ্র লামিয়ার কথার উত্তর না দিয়ে পা ফেলে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো লামিয়ার মুখোমুখি। লামিয়া একটু নড়েচড়ে পিছনে যেতেই শুভ্র লামিয়ার কোমড় ধরে নিজের কাছে টেনে এনে সামনে থাকা চুল গুলো কানের পিঠে গুঁজে দিতে দিতে বললো

” মারাত্মক মানিয়েছে।”
” সত্যি??”
” হুমম..!” বলেই শুভ্র পাঞ্জাবীর পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে লামিয়ার চোখ বেঁধে দিতেই লামিয়া উচ্চ স্বরে বলে উঠলো
” আরে চোখ বাঁধছেন কেনো??”
” কারণ আছে তাই।” বলেই লামিয়া কে কোলে তুলে নিয়ে হাঁটা ধরলো ছাদের দিকে।
ছাদে এসে লামিয়া কে কোল থেকে নামিয়ে দাঁড় করিয়ে চোখের বাঁধন খুলে দিলো। লামিয়া পিটপিট করে চোখ খুলতেই রসগোল্লার মতো গোল গোল চোখ করে ফেললো।
ছাদের চারপাশে মোমবাতি আর গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে রাখা হয়েছে।
” এই অল্প সময়ে এইটুকুই সাজাতে পেরেছি কেমন হয়েছে??”
শুভ্রর কথা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে শুভ্রর দিকে তাকালো লামিয়া। তারপর হালকা হেঁসে বলল

” সুন্দর হয়েছে।”
” সত্যি..?”
” হ্যাঁ।”
শুভ্র তা দেখে মাথা দুলিয়ে একটু পিছিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলো লামিয়ার সামনে। লামিয়া এক দৃষ্টিতে তাকালো শুভ্রর দিকে।
শুভ্র এক গুচ্ছ লাল টুকটুকে গোলাপ ফুলের তোড়া সামনে ধরে লামিয়ার উদ্দেশ্য বলে উঠলো
” আজ ভালোবাসার দিনে জানিয়ে দিলাম তোমায়, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভালোবাসা আজ তোমার তরে।”
লামিয়া মুচকি হেসে শুভ্রর হাত থেকে গোলাপের তোড়া এক হাতে নিয়ে অন্য হাত দিয়ে শুভ্রর পরিপাটি চুল গুলো এলোমেলো করে দিয়ে হালকা হেঁসে বললো
” আমার অগোছালো জীবনটাকে ভালোবাসার রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। সারাজীবন এভাবেই পাশে থাকবেন।”
শুভ্র লামিয়ার কথা শুনে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কপালে চুমু এঁকে দিয়ে ফিসফিস করে বললো ” তুমি আমার বর্তমান, তুমিই আমার ভবিষ্যৎ। আমাদের এই পথচলা যেন কখনো শেষ না হয়।”

” হবে না।”
শুভ্র লামিয়া কে বুকে জড়িয়ে ধরতেই লামিয়া ধীর গলায় বলে উঠলো
” জানেন শুভ্র ভাই পৃথিবীর সব সুখ একদিকে, আর আপনার বুকে মাথা রেখে কাটানো মুহূর্তগুলো অন্যদিকে।”
” তাই..?”
“হুমম..!”
” ভালোবাসি ভ্রমর।”
” হুমমম।”
” হুম কী..? তুই কী আমাকে ভালোবাসিস না??”
” হুমম।”
” তাহলে বল..!”
” কী বলবো??”
” ভালোবাসি।”
” হুমম বাসি।”
” হুমম বাসি মানে??”
” বাসি মানে বাসি। বললাম তো।”
” এভাবে বলতে বলি নি।”
” তাহলে কীভাবে??”
” বল আমি তোমাকে ভালোবাসি।”

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫৬

লামিয়া শুভ্রর বুকে থেকে মাথা তুলে শুভ্রর চোখের দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দুজনের। লামিয়া মুচকি হেসে হঠাৎ শুভ্রর পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে শুভ্রর গলা জড়িয়ে ঠোঁটে কোণে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে বললো
” ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি। মিস্টার শাহরিয়ার শুভ্র আমি তোমাকে ভীষণ ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি।”

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫৬ (২)