Home আমির হাওলাদার আমির হাওলাদার পর্ব ৪

আমির হাওলাদার পর্ব ৪

আমির হাওলাদার পর্ব ৪
ইলমা বেহরোজ

পদ্মজা পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে গোসলখানার পিঁড়িতে বসে রইল। তার ভেজা শাড়ির আঁচলটা অযত্নে মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে, সেদিকে তার খেয়াল নেই। এক বুক হাহাকার নিয়ে সে ভাবল, এমন একান্ত মুহূর্তে উনি কী করে ওই কুৎসিত ইঙ্গিতটা দিতে পারলেন? কেন মাঝখানে অন্য এক পুরুষকে টেনে এনে সব তছনছ করে দিলেন? তার গলার কাছে এক দলা কষ্ট দলা পাকিয়ে এলো। যে মানুষটাকে সে নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসে, সেই মানুষটার সামান্যতম অবহেলা বা অবিশ্বাসের খোঁচা সইবার ক্ষমতাও তার নেই।
কোনমতে দ্রুত গোসল শেষ করে বেরিয়ে এসে দেখল, আমির নিচতলার গোসলখানা থেকে গোসল সেরে ঘরে ঢুকছে। তার চেহারাটা থমথমে হয়ে আছে।

পদ্মজা অভিমানী গলায় প্রশ্ন করল, ‘এমন করছেন কেন আপনি?’
আমির আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রুক্ষ তোয়ালে দিয়ে ভিজে চুল মুছছিল। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়েই নির্বিকার কণ্ঠে বলল,‘কেমন করছি?’
পদ্মজার কণ্ঠস্বর ক্ষোভে কেঁপে উঠল, ‘আপনার কি মনে হয়? আমি ওই ভদ্রলোককে ভালোবাসতাম?’
‘কোন ভদ্রলোকের কথা বলছ?’
পদ্মজা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ থেকে সে অস্ফুট স্বরে বলল, ‘আপনি সত্যিই জানেন না আমি কার কথা বলছি?’
আমির রূক্ষ স্বরে বলল, ‘না, জানি না। তুমিই বলো!’

পদ্মজা আর কথা বাড়ানোর রুচি পেল না। অভিমানে বুক ফেটে যাচ্ছিল তার। সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হতেই পেছন থেকে আমিরের ভারী গলা শোনা গেল, ‘আজ ভার্সিটিতে কাউকে চড় মেরেছ?’
পদ্মজা ঘাড় ঘুরিয়ে আমিরের দিকে তাকাল। শত বারণ সত্ত্বেও আমির যে ছায়ার মতো তার পিছে গুপ্তচর লেলিয়ে রাখে, সে খবর পদ্মজার নখদর্পণে। বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস দমনে রেখে শান্ত স্বরে সে স্বীকারোক্তি দিল, ‘মেরেছি।’
‘ওখানে লিখন শাহও ছিল।’ বলতে বলতে আমির সরাসরি পদ্মজার চোখের মণি বরাবর তাকাল। পদ্মজা মুহূর্তের জন্য বিদ্যুস্পৃষ্ট হলো। আমিরের চোখের শান্ত শীতলতা ছাপিয়ে সেখানে ধিকিধিকি আগুন জ্বলছে। হিংসে আর আদিম অধিকারবোধে সে ভেতর ভেতর পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে।

অফিসে থাকাকালীন কবির যখন জানাল, পদ্মজার রুদ্রমূর্তি দেখে দূর থেকে লিখন শাহ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছিল, মুচকি মুচকি হেসেছিল তখন থেকেই আমিরের মস্তিষ্কের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রক্ত চড়ে আছে। কুত্তার বাচ্চার এত বড় স্পর্ধা পদ্মজার সাহসিকতার সুধা পান করে! তার উপর আবিষ্কার করল পদ্মজার স্মৃতির পাতায় লিখন শাহের ভাগ… আমির উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে। যদি হাতের নাগালে পেত, তবে আজই ঐ লিখন শাহের মাথার খুলিটা গুলি করে উড়িয়ে দিত।
পদ্মজা কৈফিয়তের সুরে বলল, ‘আমি জানতাম না উনি ওখানে আছেন। তাছাড়া আমি তো আপাদমস্তক বোরকা নিকাবে ঢাকা ছিলাম; উনি আমাকে চিনলেন কী করে?’
‘ভালোবাসার চোখে চিনেছে।’
বলতে বলতে আমিরের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। থমথমে মুখে আলমারি থেকে একটা শার্ট বের করে গায়ে চড়াতে লাগল।

পদ্মজা বুকফাটা কষ্ট নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন? আপনার কি মনে হয় আমি আগে থেকেই জানতাম উনি ওখানে আসবেন?’
পদ্মজাকে সন্দেহ করার মতো দুঃসাহস বা স্পর্ধা তার ধাতে নেই। পদ্মজার সতীত্বে কালিমা লেপন করার আগে সে হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করে নেবে। কিন্তু তার বুকের গহীনে আজ হীনম্মন্যতা বিষাক্ত সাপের মতো দংশন করছে। লিখন শাহ ঠিক পদ্মজার মতোই আভিজাত্যে ভরা অসম্ভব সুদর্শন এক পুরুষ, আর সে নিজে তামাটে গায়ের রঙের এক মানুষ। সমাজ তো আড়ালে কত কথাই বলে, ভুবনমোহিনী পদ্মজার স্বামী যদি আরেকটু রূপবান হতো!
তাইতো দোর্দণ্ড প্রতাপশালী আমিরও আজ হিংসের কানাগলিতে দিশেহারা, যেখানে নিজের গায়ের রং নিয়েও সে হীনম্মন্যতায় বিদ্ধ। বিধাতার কি অদ্ভুত রসিকতা! প্রেম কত প্রতাপশালী পুরুষকেও এক লহমায় নিদারুণ অসহায় করে তুলতে পারে!

আমির পদ্মজার পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় জানাল, ‘রাতে আমাকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে বেরোতে হবে।’
পদ্মজা কিছুটা থতমত খেয়ে শুধাল, ‘হঠাৎ চট্টগ্রামে কেন?’
‘সকালেই খবরটা এলো। জরুরি তলব পড়েছে।’
পদ্মজা আমিরের পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘এমন কী হলো যে রাতেই যেতে হবে?’
‘জাপানি বায়াররা খবর না দিয়েই পরিদর্শনে আসছে। আমাদের যে তিন শিপমেন্ট চিংড়ি বন্দরে জাহাজে ওঠার অপেক্ষায় আছে, সেগুলোর নমুনা নাকি ওরা ল্যাবে পাঠাবে।’
‘তা পাঠাক না, আমাদের মাছ তো ভালোই।’

‘এই ভ্যাপসা গরমে বন্দরে মাল পড়ে আছে। ল্যাবে পাঠানোর নামে যদি ওরা দুই দিন দেরি করে, তবে সব মাছ পচে গন্ধ হয়ে যাবে। আর একবার যদি ওরা রিপোর্টে লেখে যে মাছে ব্যাকটেরিয়া বা সমস্যা আছে, তবে সারাজীবনের জন্য ব্লকলিস্টেড হয়ে যাব। জাপানিরা খুব কড়া। চিন্তা করো না৷ চট্টগ্রামের কাস্টমস কমিশনার আমার চেনা। আমাকে কাল ভোরেই ওর সাথে বসতে হবে। ফাইলটা সই করিয়ে মালগুলো জাহাজে তুলে না দেওয়া পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। কয়েক লাখ টাকার মাল, ব্যাপারটা কেবল ব্যবসা না, আমার ইজ্জতের প্রশ্ন।’
‘তাহলে আর দেরি করবেন না। রাতেই রওনা দিন। আপনার সুটকেসটা গুছিয়ে দিচ্ছি। দুইদিনের জন্য যাবেন তো?’
আমির জুতা পরতে পরতে উত্তর দিল, ‘পাঁচ-ছয়দিন।’
শুনে পদ্মজার বুকটা ধক করে উঠল। বিস্ময় নিয়ে বলল, ‘এতদিন!’
আমির দ্রুতপদে বেরিয়ে যেতেই পদ্মজা পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েকটা দিন আমিরকে ছাড়া কাটানোর কথা ভাবতেই শূন্যতা তাকে গ্রাস করে নিল। এর আগেও সে আমিরকে ছাড়া থেকেছে, কিন্তু সেই বিচ্ছেদগুলোতে আমিরের মন খারাপটাই ছিল প্রকট; যাওয়ার অন্তত দুই দিন আগে থেকে সে ঘরকুনো হয়ে পদ্মজার আশেপাশে ছায়ার মতো লেগে থাকত।

রাতে দীর্ঘ যাত্রায় বেরোবে, হাতে বিন্দুমাত্র সময় নেই, তবুও মানুষটা এমন অস্থিরভাবে বেরিয়ে গেল! তাছাড়া চট্টগ্রাম যেতে তো এখন ট্রেনের সুগম পথ রয়েছে, তবে কেন এই পাঁচ-ছয় দিনের দীর্ঘ সফর?
একরাশ বিষণ্ণতা সঙ্গী করে পদ্মজা ক্ষিপ্র হাতে রান্না শেষ করল। আসন্ন পাঁচ দিনের জন্য সুটকেস গুছিয়ে রাখল। গুছাতে গিয়েই তার নজর কাড়ল খাটের এক কোণে পড়ে থাকা তিনটি শুভ্র জুঁইফুল। দুপুরে আমির এগুলো নিয়ে এসেছিল, কিন্তু পরিস্থিতির জটিলতায় হয়তো তা আর দেয়া হয়নি। ফুলগুলো হাতে নিয়ে পদ্মজা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। যাবার সময় নিশ্চয়ই উনি অনুতপ্ত হবেন, নরম স্বরে কথা বলবেন, জড়িয়ে ধরতে চাইবেন, কিন্তু সে তখন কিছুতেই ধরা দেবে না, অনড় থাকবে নিজের অভিমানে।

কিন্তু বাস্তব চিত্রটা ভিন্ন হয়ে ধরা দিল। আমির ফিরে এসে চুপচাপ পোশাক পাল্টাল। পদ্মজা তাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করলেও মুখে কুলুপ এঁটে রইল। কেনই বা সে আগে কথা বলবে? এত ভক্তি, এত ভালোবাসার পরও যখন বিনা কারণে সন্দেহের তীরে বিদ্ধ হতে হয়, তখন চুপ থাকাই শ্রেষ্ঠ প্রতিবাদ।
অন্যদিকে আমিরের হৃদয়ে চলছিল আরেক দহন। সে ভাবছিল, বিদায়ের মুহূর্তে দাঁড়িয়েও পদ্মজা একবার এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল না? একবারও কি বলা যেত না, “আমি কেবল আপনারই, আমার সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে শুধু আপনারই বাস?”
সামান্য দুটি প্রেমের কথা কি সবটুকু তিক্ততা ধুয়ে দিতে পারত না? কিন্তু না, পদ্মজার দুর্ভেদ্য জেদ তাকে চুপ করে রেখেছে।

লিখন শাহর নাম শুনলেই কেন পদ্মজার মুখচ্ছবিতে অস্বস্তির রং ফুটে ওঠে? হোক তা কেবলই স্মৃতি, তবুও কেন অন্য কোনো পুরুষের ছায়া তার প্রেয়সীর মানসপটে ছাইচাপা আগুনের মতো জেগে থাকবে?
আমিরের খারাপ লাগা কিছুতেই কমল না। সে চলে যেতে উদ্যত হলো।
না পেরে পদ্মজা শেষমেশ ভাঙা গলায় বলেই ফেলল, ‘একটা তুচ্ছ কুকুরও যদি পাশে মিনিট দুয়েক বসে থাকে, তাকে আজীবন মনে রাখা যায়; ওটা তো ছিল আমার জীবনে পাওয়া প্রথম চিঠি৷ সেই স্মৃতিটুকু মনের কোণে ভেসে ওঠা কি খুব বড় অপরাধ হয়ে গেল?’
আমির কোনো প্রতি উত্তর করল না। বিষণ্ণ ভরা গাম্ভীর্য নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মুহূর্তেই পদ্মজার দুচোখ ছাপিয়ে তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। মনে হলো, এক নিমিষেই সাজানো ঘরটা মরুভূমির মতো শূন্য হয়ে গেল, থমকে গেল পৃথিবীর সমস্ত স্পন্দন। বুকের ভেতরটা হু হু করে হাহাকার করে উঠল। মানুষটা এভাবে কিছু না বলে চলে যেতে পারল?

গাড়িতে বসার পর থেকেই আমির থম মেরে বসে রইল। ইঞ্জিন সচল হতেই চাকা গড়াতে লাগল রেলস্টেশনের অভিমুখে, যেখান থেকে নিশুতি রাতের ট্রেন তাকে নিয়ে যাবে নেত্রকোনার অলন্দপুরে।
যাত্রাপথে তার খেয়াল নেই, তার মস্তিস্ক জুড়ে, চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে পদ্মজার জল ছলছল চোখ দুটি। একটা অপরাধবোধ কুরে কুরে খাচ্ছে। বড্ড বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলল মেয়েটাকে!
অভিমানী পদ্মজা হয়তো সারা রাত কেঁদেই কাটাবে। এমনিতেই দুদিন বাদেই রমজান শুরু; উপোসের দিনগুলোতে মেয়েটা একা থাকবে, পাশে কেউ নেই৷ এটাই তো বড় কষ্টের। তার ওপর যাওয়ার আগে এমন রুক্ষ ব্যবহার কি খুব দরকার ছিল?
পাশে বসা নবাব লক্ষ্য করছিল আমিরের বিমর্ষতা। আমিরের দীর্ঘ সফরের সঙ্গী সে৷ প্রশ্ন করবে করবে ভেবেও আমিরের গাম্ভীর্য দেখে কথা বলার সাহস পাচ্ছিল না। হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে আমির আদেশের সুরে বলে উঠল, ‘গাড়ি থামাও।’

গাড়িটি তখন এক সংকীর্ণ গলির গোলকধাঁধায়। সেখানে গাড়ি ঘোরানোর ন্যূনতম জায়গা নেই; পুরো গলি পার করে তবেই আবার ঘোরানো যাবে। গাড়ি থামতেই আমির দ্রুত নেমে গেল৷ ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘সামনে গিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করো, যতক্ষণ না আমি ফিরছি।’
আকাশে তখন চাঁদের লেশমাত্র নেই, কেবল অগুনতি নক্ষত্রের মেলা। সেই তারার আলোয় আমির দ্রুতপায়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াল।
নবাব ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, ‘টাইটান ফজরের আগে ফিরবে বলে মনে হয় না। যখন ফিরবে, চুল ভেজা থাকবে। সকালের ট্রেন ধরতে হবে, অযথা এখানে সময় নষ্ট না করে চলুন বাড়ির সামনেই গিয়ে দাঁড়াই। ওখানেই কিছুক্ষণ চোখ বুজে নিই।’

কথা শেষ করেই সে আয়েশ করে সিটে গা এলিয়ে দিল।
আমির তখন হাঁটা রেখে প্রায় দৌড়াতে শুরু করেছে। ঝোড়ো বাতাস সাঁসাঁ শব্দে তার পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। বাড়ির সদর দরজায় পৌঁছে সে ব্যাকুল হয়ে কলিং বেল টিপল। ভেতর থেকে মনা দরজার ছিদ্রে চোখ রেখে আগন্তুককে পরখ করে পরমুহূর্তেই কপাট খুলে দিল।
আমির দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলো। পদ্মজা তখন আলমারিতে এক হাত রেখে ঝুঁকে কাঁদছিল। তার এলোমেলো বেণিতে দুপুরের তিনটে জুঁইফুল অভিমানে নুইয়ে পড়েছে। পায়ের শব্দ শুনে চমকে তাকাল। আমিরকে দেখামাত্রই তার হৃদস্পন্দন থমকে গেল। তপ্ত মরুভূমিতে হঠাৎ আসমান ছিঁড়ে বৃষ্টি নামলে যেমন অনুভূত হয় তেমনই এক অনুভূতি হলো তার। কিন্তু সেই ভালোলাগা মুহূর্তেই রূপ নিল তপ্ত অভিমানে।
পদ্মজার টলটলে চোখের জল আমিরের বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে নিজেকেই অপরাধী সাব্যস্ত করল৷ কেমন পুরুষ সে, যে তার প্রিয়তমার চোখের জলের কারণ হয়?

এগিয়ে যেতে চাইলেই পদ্মজা অভিমানে দ্রুত দরজা বন্ধ করে দিতে চাইল, আমির আটকে ফেলল। আকুল হয়ে বলল, ‘ভুল হয়ে গেছে, ভুল হয়ে গেছে আমার।’ বলতে বলতে দুহাত বাড়িয়ে পদ্মজাকে আগলে নিতে চাইল, কিন্তু পদ্মজা এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিল। বুক চিরে আসা দীর্ঘশ্বাস আর নোনা জল বাঁধ মানছে না।
রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, ‘বলতে হবে না কথা। কোথায় যাচ্ছিলেন চলে যান!’
আমির হার মানল না। সে জোর করে পদ্মজাকে নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে নিল। পদ্মজা ছটফট করে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল, ‘সরুন! খারাপ লোক! আমাকে ছুঁবেন না।’
আমির তার হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে পদ্মজার কপালে মাথা ঠেকিয়ে ফিসফিস করল, ‘তোমাকে সন্দেহ করার এক মুহূর্ত আগেই আমার মরণ হবে। বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে সন্দেহ করিনি।’
‘আপনার যা ইচ্ছে তাই করবেন?’ পদ্মজা আমিরের বুকে এলোপাতাড়ি কিল-থাপ্পড় বসাতে বসাতে চিৎকার করে উঠল, ‘যখন ইচ্ছে দূরে ঠেলে দেবেন, উপেক্ষা করবেন, আবার যখন ইচ্ছে অধিকার ফলাবেন? আমি কি মাটির পুতুল? সরুন বলছি!’

আমির বিচলিত হলো না। বরং পদ্মজার অবুঝ আঘাতগুলো নিজের বুকে সঁপে নিল। হাত রাখল পদ্মজার দুগালে। জোর করে কপালে আর চোখের পাতায় উষ্ণ চুমু এঁকে দিয়ে ব্যাকুল গলায় বলল, ‘খুব হিংসে হচ্ছিল। অসহ্য হিংসে! কেউ দূর থেকে তোমাকে পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করে। কেউ একজন আমার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে তোমার প্রথম প্রেম, প্রথম লজ্জা আর প্রথম অনুরাগের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছে, আমি সইব কী করে? আমি বড় বেশি স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছিলাম… মনে ভয় কাজ করছিল, যদি কোনোদিন আমি না থাকি, তবে অন্য কারো ভালোবাসার জোয়ারে তুমি ভিজে যাবে না তো?’

আমির বলতে বলতে থেমে গেল। লিখন শাহের একরোখা মরনপণ ভালোবাসার শক্তিকে সে মনে মনে ভয় পায়। তার অনুপস্থিতিতে লিখন শাহের সাধনা ফল দিবে না তো?
পদ্মজা আমিরের চোখের দিকে তাকিয়ে কান্নারত স্বরেই প্রতিউত্তর দিল, ‘আমার ভালোবাসা কি আপনার চোখে পড়ে না? আমি কার প্রেমে মরছি সেটা বড় হলো না? আপনার কী করে মনে হলো, আপনার অনুপস্থিতিতে আমি অন্য কারো ভালোবাসার কাছে আত্মসমর্পণ করব? শুধু আপনিই ভালোবাসতে জানেন? আর কেউ পারে না? আমার ভালোবাসার গভীরতা মাপার সাধ্য কি আপনার আছে?’
অভিমানে কাঁপতে থাকা পদ্মজাকে নিজের বুকের পাঁজরের সাথে পিষে ফেলল আমির। অন্য হাতটা পদ্মজার পিঠে রেখে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘পারো, হাজারবার পারো। ক্ষমা করে দাও… খুব বড় ভুল হয়ে গেছে আমার। তুমি আমার দুই চোখের আলো, আমার অবুঝ তোতা পাখি। আর কেঁদো না।’
পদ্মজা দুহাতে আমিরকে সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘সরুন! আপনি আমাকে কোনোদিনই বুঝবেন না। একবারও আপনার মাথায় এলো না, যে মেয়ে একজনের প্রেমে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, সেই ছাইয়ে কি অন্য কেউ আর কোনোদিন প্রেমের আগুন ধরাতে পারবে?’

বলতে বলতে পদ্মজা এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পালঙ্কের এক কোণে গিয়ে বসল। আমিরও হার মানার পাত্র নয়; সে ধীর পায়ে গিয়ে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসল। অধিকার নিয়ে পদ্মজার কোলে মাথা রাখল। বলল, ‘আমি বোকা, গাধা৷ তাই বুঝিনি। আর ভুল হবে না।’
এক প্রভুভক্ত তৃষ্ণার্ত প্রাণীর মতো সে পদ্মজার কোমর জড়িয়ে বসে রইল। পদ্মজা কয়েকবার আমিরের মাথাটা ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইল, পারল না। মাথাটা আরও জমে গেল কোলে।
বারংবার চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হলো, তখন পদ্মজার সব প্রতিরোধ ভেঙে জল হয়ে গেল। আমিরের আকুল আত্মসমর্পণ তাকে ভেতরে ভেতরে গলিয়ে দিল। সে অশ্রু মুছতে গিয়ে নিজের অজান্তেই খানিকটা নাক টানল। শব্দটা কানে যেতেই আমিরের বাঁধন কিছুটা আলগা হলো। সেই সুযোগে পদ্মজা দ্রুত পায়ে দরজার কাছে চলে গেল। আমিরের দিকে পিঠ ফিরিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়াল।

দুপুর থেকে যে মানুষটা তাকে অকারণ সন্দেহের অবহেলায় পুড়িয়ে খাক করেছে, এখন কোন সাহসে সে এমন সোহাগী মায়ার জাল বুনে তাকে নতুন করে দগ্ধ করতে এসেছে?
আমির ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। এতো অভিমান ওর! সহজে ভাঙতেই চায় না৷ সে এগিয়ে গেল। পদ্মজার চিবুকের নিচে নিজের দুই হাতের তালু মেলে ধরল। টলটলে দুই ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ল তার তালুতে। আমির সেই অশ্রুটুকু নিজের সারামুখে মেখে নিল আতরের মতো। তারপর দেয়ালে হেলান দিয়ে তাকিয়ে রইল পদ্মজার অভিমানী মুখটার দিকে।
পদ্মজার নিচের ঠোঁটটা আবেগে থরথর করে কাঁপতে লাগল, তবুও সে নিজেকে শান্ত রাখার ব্যর্থ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তার আজন্ম লালিত জেদটা কিছুতেই ভাঙতে চাইছে না।

আমির এক পা পিছিয়ে গিয়ে শুধাল, ‘চলে যাব?’’
পদ্মজা মুখ না ফিরিয়েই উত্তর দিল, ‘চলে যান।’
আমির আরও এক পা পিছিয়ে গেল। কণ্ঠস্বর আরও আকুল হলো, ‘চলে যাব?’
পদ্মজা এবারও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘যান।’
আমির আবারও এক পা পিছিয়ে গিয়ে শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করল, ‘চলে যাব?’
তার তৃষ্ণার্ত চোখ দুটি পদ্মজার দিকে নিবদ্ধ। পদ্মজা নিজের শাড়ির আঁচলটা আঙুলে জড়িয়ে পেঁচাচ্ছে, মাথা নিচু করে আড়চোখে দেখছে আমিরের পিছু হটা। এবার সে আর কোনো শব্দ উচ্চারণ করল না। পাছে যদি সত্যি চলে যায়!
আমির এবার দরজার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে শেষ ঘোষণাটি দিল, ‘তবে চলে গেলাম।’
মুহূর্তের ব্যবধানে পেছন থেকে দুটো হাত ঝড়ের বেগে এসে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল তাকে। হাতের মালিক তার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে চিৎকার করে বলতে চাইল, ‘যাবেন না, আমায় ফেলে কোথাও যাবেন না!’
সেই আর্তি আর মুখে আনা হলো না। সবাই তো আর মুখ ফুটে ভালোবাসার দাবি জানাতে পারে না। কিন্তু আমির ঠিকই বুঝে নিল। পড়ে নিল পদ্মজার না বলা কথাগুলো। ঠোঁটে ফুটে উঠল বিশ্বজয়ের হাসি।

নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর ধারের পুরনো গুদামঘরটিতে ভ্যাপসা গরম আর পচা পাটের গন্ধ। আলমগীর গাড়িটা দূরে রেখে পায়ে হেঁটে গুদামের পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকল। তার মুখে একটা কালো রুমাল বাঁধা, মাথায় মাঙ্কি টুপি। শুধু চোখ দুটো বের করা। ভেতরে টিমটিমে একটা লণ্ঠন জ্বলছে। লোহার বড় খাঁচাটার সামনে যেতেই আলমগীরের বুকটা ধক করে উঠল। ভেতরে দুটো মেয়ে। তারমধ্যে নীল শাড়ি পরা মেয়েটা গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে। ধুলো আর বালিতে ফর্সা হাত-পা মাখামাখি। আলমগীর পকেট থেকে টর্চ বের করে আলোটা ফেলতেই মেয়েটি হাত দিয়ে চোখ আড়াল করার চেষ্টা করল। আলোর তীব্রতায় মেয়েটি যখন মুখ সরালো, আলমগীর পাথর হয়ে গেল। তীক্ষ্ণ খাড়া নাক, আর ঠিক তার ডগায় বিন্দুসম কালো তিল। এ তো সত্যি নিলুফার!
পদ্মজার সঙ্গে এই মেয়েকে কতবার দেখেছে সে! কত হাসি, কত কথা!

নিলুফার বড় বড় চোখে সামনে দাঁড়ানো মুখোশধারী লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটো জলে ভেজা। আলমগীর চলে যেতে নিলে অবিশ্বাসে মাথা নাড়তে নাড়তে নিলুফার বলল, ‘চেহারা ঢাকবেন না আলমগীর সাহেব।’
আলমগীরের পা দুটো যেন মাটিতে গেঁথে গেল। দুই-তিন দিন আগে যখন আমির এই গোডাউনে এসেছিল, আলমগীর সাথে ছিল। লোহার ছিদ্র দিয়ে সম্ভবত নিলুফার তাদের অবয়ব চিনে নিয়েছে।
আলমগীর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। নিলুফারের চোখের মণি লণ্ঠনের আলোয় ঝিলিক দিচ্ছে। সে ঘৃণা মাখা গলায় বলল, ‘আপনাদের এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট ব্যবসার আড়ালে যে এই কারবার চলে, সেটা কি পদ্মজা জানে?’
তার শান্ত কণ্ঠস্বর বলে দিচ্ছিল, বিগত দিনগুলোর ভয়াবহতা, দুইদিন আগের সত্য সে নিভৃতে হজম করে নিয়েছে। তার ভেতরে আর কোনো ভয়ার্ত তরুণী নেই, বরং এক আহত বাঘিনী রাজ করছে।

আলমগীর হিমশীতল স্বরে জবাব দিল, ‘না জানে না। আর জানানোর জন্য তুমিও এ দেশে থাকবে না।’
নিলুফারের বুকটা যন্ত্রণায় ডুকরে উঠলেও সেটা সে প্রকাশ করল না। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তার স্বভাবসুলভ তেজ অটল রইল। সে সরাসরি আলমগীরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী চান আমার কাছে? কী চান আপনি? আর আপনার মুখোশধারী আমির হাওলাদার?’
‘তুমি দাসী হতে চলেছো নিলুফার। নিজেকে জাহান্নামের জন্য প্রস্তুত করে নাও।’

আমির হাওলাদার পর্ব ৩

আলমগীর দ্রুত পায়ে অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে যেতে লাগল। নিলুফার চিৎকার করে বলল, ‘আমি ওই জাহান্নামের গারদ ভেঙেই বেরিয়ে আসব! আসবই।’
আলমগীরের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই এতক্ষণ পাথরের মতো শক্ত হয়ে থাকা নিলুফার ভেঙে পড়ল। যে তেজস্বী কণ্ঠস্বর একটু আগে গুদাম কাঁপিয়ে দিচ্ছিল, তা এক লহমায় অবরুদ্ধ কান্নায় পরিণত হলো। খাঁচার স্যাঁতসেঁতে কোণে হাঁটুতে মুখ গুঁজে সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

আমির হাওলাদার পর্ব ৫