Home মেঘের ওপারে আলো মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৯

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৯

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৯
Tahmina Akhter

— মি. অশান্ত আপনি কি পণ করেছেন আমাকে শান্তিতে থাকতে দেবেন না?
আলোর কথাটি শেষ হবা মাত্রই শান্ত সামান্য ঝুঁকে পড়ে আলোর সামনে। আলো পিছিয়ে যায়। আলোর পিছিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে শান্ত বলল,
— ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন আমি মি. শাহনেওয়াজ শান্ত নট অশান্ত।
— তাহলে আপনিও জেনে রাখুন আমি তামান্না ইসলাম আলো নট কালোভ্রমর।
আলো কথাগুলো বলে দরজা খুলে ওদের ফ্ল্যাটে প্রবেশ করলো।
আলো চলে যাওয়ার পর শান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপাল সামান্য চুলকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

— তুমি যেন এক কালো ভ্রমর গভীর, রহস্যময়। নিজের মতো করে উড়ে বেড়াও। তোমার ডানায় বিষ আছে, সেটা আমি জানি; তোমার উপেক্ষা, তোমার নীরবতা আমার ভেতর ধীরে ধীরে দহন বাড়ায়। তবুও আশ্চর্যজনকভাবে আমি সেই দহনেই বাঁচতে শিখে গেছি। তুমি কখনো বুঝতে পারো না, তোমার একটুখানি হাসি আমার সারাদিনের বেঁচে থাকার খোরাক হয়ে ওঠে, আর তোমার একটুখানি দূরত্ব আমাকে শূন্য করে দেয়। আমি জানি তুমি আমার জন্য থামবে না, আমার বাগানে স্থির হয়ে বসবে না; তবু প্রতিদিন পথ চেয়ে থাকি, যদি হঠাৎ একবার উড়ে এসে আমার হৃদয়ের ভেতর গুঞ্জন তোলো। আমার একতরফা ভালোবাসায় দাবি নেই, অধিকার নেই, শুধু অপেক্ষা আছে; আছে বিষের স্বাদ আছে জেনেও সেই আশায় আমার বেঁচে থাকা।
কথাগুলো বলতে বলতে শান্ত গিয়ে আলোদের ফ্ল্যাটের কলিংবেল বেল বাটন চাপলো। আলো তখন ওয়াশরুমে ছিল। সিতারা বেগম রান্নাবান্নার দিকটা দেখছিলেন। এমন সময় কলিংবেলের শব্দ শুনে তিনি হাত মুছে দরজার দিকে গিয়ে গেলেন। দরজা খুলতেই দেখতে পেলেন বাড়িওয়ালার ছোট ছেলেকে। শান্ত মুচকি হেসে সিতারা বেগমকে “আসসালামুয়ালাইকুম” বলল। সিতারা বেগম “ওয়ালাইকুম আসসালাম” বলেই জিজ্ঞেস করলো,

—তা বাবা কেমন আছো? অনেকদিন পর এলে আমাদের বাসায়!
—শহরে ছিলাম না আন্টি। মামার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম।
—ওমা বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এসো ঘরে এসো।
___না না আন্টি ভেতরে যাব না। ডাক্তার ম্যামকে একটু কষ্ট করে বলবেন আমাদের বাসায় যেতে। বাবা নাকি কথা বলবে ম্যামের সাথে।
—আচ্ছা ঠিক আছে বাবা। বলব আমি।
— তাহলে আসছি আমি।
কথাটি বলেই শান্ত পিছিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনি সিতারা বেগম অনুরোধের সুরে বলল,
–এক কাপ চা খেয়ে যাও অন্তত?
শান্ত সিতারা বেগমের অনুরোধ ফেলতে পারল না। অগত্যা তাকে ভেতরে যেতেই হলো। আলো ফ্রেশ হবার আগে সোজা রান্মাঘরে ঢুকেছিল চা বানানোর জন্য। প্রচন্ড মাথা ধরেছে। মাথা ধরা নিয়ে কোনো কাজই করতে ভালো লাগে না। চুলা থেকে মাত্রই চায়ের লিকার নামিয়ে কাপে ঢালছে ঠিক তখনি সিতারা বেগম এসে আলোর পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

— আমি তোর চা বানিয়ে দিচ্ছি। তুই আপাতত ড্রইংরুমে চায়ের কাপ নিয়ে চলে যা। মেহমান এসেছে ঘরে।
— মেহমান এলো কোত্থেকে আবার? সুজন এসেছে নাকি?
— তোর মামার শরীর ভালো না। সুজন তোর মামার দেখাশোনা করছে। এখানে আসার সময় কই ওর কাছে? বেশী প্রশ্ন না করে যা তো মা।
সিতারা বেগম রেগে যাচ্ছিল প্রায়। তাই আলো আর ঘাটালো না। চায়ের কাপ একটা ট্রেতে রাখল। তারপর, অন্য আরেকটা ছোট প্লেটে বিস্কিট, আরেকটা প্লেটে আপেল, আরেকটা প্লেটে মাল্টা কেটে সাজিয়ে রাখল। সবশেষে এক গ্লাস পানি ট্রেতে রেখে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে ড্রইংরুমে যাওয়ার পর শান্তকে তাদের সোফায় বসে থাকতে দেখে বলল,

— এত কষ্ট করে এতকিছু কেন করতে গেলেন আন্ট……
শান্ত বাকি কথা সম্পূর্ণ করার আগেই আলো হতভম্ব হয়ে বলল,
— আপনি?????
— হ্যা আমি। আপনার আম্মা বলল এক কাপ চা খেয়ে যেতে। তাই……
আলো দীর্ঘশ্বাস ফেলে ট্রে টি-টেবিলের ওপরে রাখল। শান্ত’র দিকে না তাকিয়ে বলল,
— আচ্ছা এক কাপ চা খেয়ে নিন।
কথাগুলো বলেই আলো চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় কিন্তু শান্ত’র ডাক শুনে থেমে যেতে হয় আলোকে। আলো পেছনে ফিরে তাকাতেই শান্ত বলল,

— আপনিও বসুন না? আমার একা একা বসে খাওয়ার অভ্যেস নেই।
শান্ত’র কথা আলোর মান্য করার কারণ নেই। ঘরের বাইরে হলে সে শান্ত’র সঙ্গে মোটেও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলে না। কিন্তু, আজ শান্ত তাদের ঘরে মেহমান হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। মেহমান এর সঙ্গে খারাপ আচরণ করাটা মোটেও ঠিক না। এটা আলোর প্রয়াত বাবা আফসার সাহেবের কথা। আফসার সাহেবের প্রয়ানের পর আলো এই ব্যাপারটা মেনে চলার চেষ্টা করছে।
আলো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর, শান্ত’র অপজিট সোফায় বসল। শান্ত ডানহাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ হাতে নিলো। বাম হাতে পিরিচ হাতে নিয়ে পিরিচ-এ চা ঢেলে বাকি অবিশিষ্ট চায়ের কাপ বাড়িয়ে ধরল আলোর সামনে। আলো ভ্রু কুঁচকে বলল,

— আমি চা খাব না। আপনি খান।
— আপনি যদি এখন আমার সামনে বসে চা না খান তাহলে আমি ধরে নেব আপনি আমার উপস্থিতি সহ্য করতে পারছেন না।
— আমার অনেক কিছু সহ্য করার ধারণক্ষমতা আছে। আপনার আমার ব্যাপারে অনেক অনেক ভুল ধারণা আছে।
আলো চায়ের কাপ হাতে নিয়ে কথাগুলো বলল। আলোকে চায়ের কাপ হাতে নিতে দেখেই শান্ত’র হৃদয়ে প্রশান্তির হাওয়া বইছে। শান্ত চায়ে চুমুক দিয়ে বলল,
— আপনার ব্যাপারে আমার ধারণা সবসময় ঠিকই আছে। ৯৯% জানি আপনার ব্যাপারে। আপনি এখন ভদ্রতার খাতিরে আমার হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়েছেন। কিন্তু চায়ে চুমুকও দেবেন না। এম আই রাইট?
শান্ত’র কথা শুনে মোটেও অবাক হয় না আলো৷ শান্ত’র মুখের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। শান্ত মুচকি হাসি দিয়ে বলল,

— আপনি গত ছয়মাস ধরে আমার কলিগ। আপনার আর আমার প্রফেশন একই। একই ডিপার্টমেন্টে আমরা রোজ উঠাবসা করছি। আপনার আর আমার কাজ হচ্ছে অন্যর মাইন্ডকে তাদের শারীরিক অঙ্গি ভঙ্গির মাধ্যমে জানতে পারার চেষ্টা করা।
আলো সামান্য বিরক্তবোধ করল না। উল্টো চায়ের কাপ টেবিলের ওপরে রেখে বলল,
— আপনি কি জানেন, আমি বিবাহিত?
— জানি। কিন্তু আপনারা দুজনেই সেপারেশনে আছেন গত আটবছর ধরে।
শান্ত’র জবাব শুনে আলো হতভম্ব হয়ে বলল,
— এতকিছু জানারও পর কেন আমার পেছনে আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করছেন?
— আপনাকে পাওয়ার আশায় আমি আপনার পেছনে ছুটছি না। আমি আমাকে ভালো রাখার আশায় ছুটছি। আমার রোগ হচ্ছে হৃদয় জনিত রোগ। আপনাকে দেখার রোগ, আপনার কাছে সেঁধে গিয়ে অপমানিত হবার রোগ। এই রোগের কোনো ঔষুধ নেই, পথ্য নেই। আছে কেবল যন্ত্রণা সহ্য করার সাজেশন। আমি আপনাকে বিরক্ত করতে চাই না, ট্রাস্ট মি। আপনি আমার উপস্থিতি সহ্য করতে পারেন না। তাই আপনার সঙ্গে আমার বাক-বিতন্ডার সৃষ্টি হয়।
কথাগুলো শেষ করে শান্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো। আলোর কাছে এই ব্যাপারটা বিস্ময়কর লাগছে।

— আপনি যতদিন আমার চোখের সামনে আছেন আমি আপনাকে বিরক্ত করব। আমি জানি, ডাক্তার সাহেবের প্রতি আপনার ভালোবাসার সামনে আমার ভালোবাসা অতি তুচ্ছ। আমার সামান্য ভালোবাসার সামনে নিশ্চয়ই আপনি ভেঙে পরবেন না?
শান্ত কথাগুলো শেষ করতে না করতেই আলো উঠে দাঁড়ালো। তারপর, শান্তর সামনাসামনি এসে দাঁড়ায়। শান্ত’র চোখে চোখ রেখে বলল,

— আমার সঙ্গে আপনি নোংরা গেম খেলার চেষ্টা করবেন না, মি. শান্ত! “আপনাকে আমি চাই না” এই বাক্য কি যথেষ্ট নয় আপনার পেছনে চলে যাওয়ার? আপনার এই বৃথা প্রচেষ্টা চালানো একপ্রকার চতুরতার বহিঃপ্রকাশ। আপনি সাব-কনশাস মাইন্ড ধরে নিয়েছে, আপনার এই পাগলামিকে একদিন না একদিন আমি প্রশয় দেব। আপনি আপনার মাইন্ড গেম নিয়ে আমার থেকে কয়েক হাজার ক্রোশ দূরে থাকবেন।
আলো শান্ত’র সামনে থেকে সোজা চলে গেলো তার ঘরে। আলোর ঘরের দরজা বন্ধ করা শব্দ শুনে শান্ত ক্লেশিত হেসে ধীরপায়ে হেঁটে বেরিয়ে আসে আলোদের ফ্ল্যাট থেকে।
জার্নির ধকল কাটাতে আলো দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর ঘুমাতে চলে গেল। ঘুমের ঘোরে আলো স্বপ্ন দেখছে, আলো লন্ডনে গিয়েছে। এবং আলোর সঙ্গে মেঘালয়ের খুব চমৎকার সময় কাটছে না । মেঘালয় আলোকে আগের মতো ভালোবাসছে না। সে অন্য কাউকে ভালোবাসে….
আচমকা আসর ওয়াক্তের আযান শুনে আলোর ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভাঙার পরও স্বপ্নের রেশ রয়ে যায়। আলো খানিকটা বিচলিতবোধ করে। আদৌও কি তার সঙ্গে মেঘালয়ের সবকিছু ঠিক হবে না? নাকি স্বপ্নের মতই…
আলো তার এলোমেলো চুলগুলো খোঁপায় বেঁধে। জানালার ওপারে থাকা ঝকঝকে আকাশের ভাসমান সাদা মেঘমালার দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়ে বলল,

—আমি অনেক হিংসুটে মেয়েলোক, ডাক্তার সাহেব। আমার ভালোবাসা কেবল আমারই। আমার ভালোবাসায় অন্যকারো উপস্থিতি, হস্তক্ষেপ আমি পছন্দ করি না। যা আমার কেবল আমার। যা আমার হবার কথা নয় আমি সেই বস্তুর প্রতি ইন্টারেস্ট হারিয়ে ফেলি। অতীতে আপনি কখনোই আমার ছিলেন না। বর্তমানেও আপনি নেই। ভবিষ্যতে আপনাকে পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা নেই। তাহলে আমার আপনার প্রতি ইন্টারেস্ট বহাল তবিয়তে ধরে রাখা উচিত কি?

কথাটি বলতে বলতে আলো পেছনে ফিরে তাকালো। পেছনের দেয়ালে ফ্রেমবন্দি মেঘালয়ের ছবিটা ঝুলে আছে। আলো মেঘালয়ের ছবির দিকে তাকিয়ে ভাবছে, মানুষটা তার স্বপ্নজগতের একমাত্র অধিপতি। মানুষ নাকি রোজ রোজ একই মানুষকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারে না। কিন্তু এই একটা মানুষ রোজই তার স্বপ্ন জগতে বিচরণ করে। এর পেছনে সাইন্টিফিক ব্যাখা কি? বিজ্ঞান কি এই ব্যাপারটা নিয়ে গবেষণা করেছে? জানা দরকার। একই মানুষ রোজ রোজ স্বপ্নে এসে ধরা দেবে কেন?
আলো বিছানা থেকে নামল। তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে ওযু করে এসে নামাজ আদায় করলো। নামাজ আদায় করে কম্পিউটার ডেস্কের সামনে গিয়ে বসল। ৫৭০ শব্দসংখ্যার একটা ই-মেইল লিখে সেন্ড করল কারো ই-মেইলে। স্বস্তির এক নিঃশ্বাস ফেলে নিজের ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৮

মেঘালয় সবেমাত্র লাইব্রেরি থেকে বাসায় ফিরেছে। খাওয়াদাওয়া শেষ করে ল্যাপটপ হাতে নিয়ে ইমেইল চেক করছিল। ঠিক তখনি একটা ইমেইল এর ওপর নজর আঁটকে গেল মেঘালয়ের। সে ইমেইল খুলে দেখল….

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫০