Home প্রেয়সীর অনুরাগ প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১৮

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১৮

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১৮
Sadiya Jahan Simi

কিছুক্ষণ পর পুনরায় কলিং বেল বেজে উঠল। রোহান এইবার চোখ মুখ কুঁচকে তাকালো। কোন বেকুব এসে ওকে এমন করে জ্বালাচ্ছে। উঠবে না বলে গো ধরে বসেই রইল। তবে বাইরে থাকা ব্যক্তির বোধ হয় আর সহ্য হলো না অনবরত কলিং বেল দিয়েই যাচ্ছে।রান্নাঘর থেকে জোহরা মির্জা হাঁক ছেড়ে ডাকলো, “রোহান বাবা দেখতো, কে এসেছে। মাহিন এসেছে বোধহয়। একটু দেখ বাবা কষ্ট করে।”
রোহান বকতে বকতে উঠে গেল। দরজা খুলে লামিয়াকে দেখে রাগটা যেন দিগুন বেড়ে উঠলো। এত বড় মেয়ে,দেখলে মনে হয় যেন ভাজা মাছটা উল্টিয়ে খেতে পারে না। লামিয়া কাচুমাচু হয়ে বলল, “ইয়ে মানে ভাইয়া,বলছিলাম যে তখন আপনি বললেন, আপনার আর আমার নাকি পারফেক্ট ম্যাচ খেয়েছে। কিভাবে খেয়েছে একটু যদি বলতেন ভালো হতো।”

রোহান হতভম্ব গলায় বলল, “তুমি কি এতক্ষণ যাবৎ এখানে দাঁড়িয়ে ছিলে এটা শোনার জন্য!” লামিয়া মাথা নাড়লো, যে এতক্ষণ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। রোহান চোখ ছোট ছোট করে বলে, “কেন জানতে চাও?”
“আমার রাতে ঘুম হবে না।” সংক্ষিপ্ত উত্তর লামিয়ার।
রোহান ভাবলো এত সহজ সরল মেয়ে এ কথাটার জন্য নাকি রাতে ঘুম হবে না। হায়রে মেয়ে মানুষ। রোহান এবার বেশ ভাব নিয়ে দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দুহাত বুকে বাজ করে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল লামিয়ার পানে দায়সারা কন্ঠে বলল, “এমনি এমনি তো বলব না। আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও তারপর বলবো নে।”
লামিয়া ভ্রু কুঁচকে বলে , “কি প্রশ্নের উত্তর!”
“ছলনা করার জন্য কি তোমার কোন গাধা আছে ললনা? যদি থেকেও থাকে তাহলে ব্রেকআপ করে দাও। আমি পরে জানতে পারলে খারাপ হবে ।”

“গাধা, গাধা আবার কি! আর ললনায় বা কে? আমার নাম লামিয়া, ললনা না ভাইয়া।”
আবারো ভাইয়া ডাক শুনে চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে রোহান। মন চাইছে এই মেয়েকে মাথায় তুলে এক আছাড় মারতে। মেয়ে মানুষের এক জ্বালা, যদি জানতে পারে এক ছেলে পছন্দ করে তারপর থেকে শুরু হয় ভাইয়া ভাইয়া।
“দেখো ললনা, গাধা মানে বয়ফ্রেন্ড। যদি তোমার বয়ফ্রেন্ড নামক গাধা থেকে থাকে, তাহলে তাড়িয়ে দাও। নয়তো আমি উষ্টা মেরে উগান্ডায় পাঠাবো। আর ললনা, আমি তোমায় ভালোবেসে ডাকি।”
“আপনার মাথায় কি সমস্যা আছে! না মানে একটা অপরিচিত মেয়েকে ভালোবাসি বলছেন!আপনার লজ্জা শরম বলতে কিছু নেই?”

“ছেলে মানুষের লজ্জা থাকতে নেই ললনা। লজ্জা থাকলে আদমশুমারি বাড়বে না যে। আদমশুমারি বোঝো তো ললনা, আচ্ছা তুমি কিসে পড়ো ?”
“গাছ থেকে লাফ দিয়ে লাফ দিয়ে পড়ি।”
কথাটা বলেই ওমনি জিভ কাটে লামিয়া। এটা ওর অভ্যাস; কেউ যদি জিজ্ঞেস করে তুমি কিসে পড়ো, তাহলে ওর মুখ থেকে এই উত্তরটা ব্যতীত আর কোন উত্তর বের হয় না। রোহান ধমকে ওঠে, “বেওমিজ ললনা, আদব কায়দা জানো না! তুমি কি এখনো ফিটার খাও নাকি?”
“এই ভাই আমাকে কোন দিক দিয়ে দেখে মনে হয়, ফিটার খাই? ফিটার তো খান আপনি।লামিয়া নামটা ডাকতে পারেন না? কি উল্টাপাল্টা ললনা ছলনা নামে ডাকছেন! একদম এসব নামে ডাকবেন না।”
“লে হালুয়া এতো দেখছি নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী। আমি তো ভেবেছিলাম আমাদের জয়েন্টে জয়েন্টে, পয়েন্টে পয়েন্টে খাপ খাবে । জীবনসঙ্গী হতে হবে আব্বাস মির্জার মতো, নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী তো আমি নিজেই। তোমায় দেখে আব্বাস মির্জায় ভেবেছিলাম। এখন তো দেখি, তুমি নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর ফিমেল ভার্সন। উল্টো আমাকে ধমকাচ্ছে। কত বড় যকৃত তোমার!”

লামিয়া ভ্রু কুঁচকে বলে, “যকৃত! যকৃত আবার কি?কত বড় যকৃত মানে কি?”
“অ্যাই বলদি, তুমি কোন ডিপার্টমেন্ট এর স্টুডেন্ট? যকৃত মানে জানো না?”
লামিয়া ফুঁসে উঠলো। নাকের পাটা ফুলিয়ে বলল, “অ্যাই মিয়া বলদি বলছেন কাকে? চিনেন আপনি আমাকে?”
“হুঁ চিনি তো। ওই যে বলদি।” ভাবলেশহীন উওর রোহানের।
“আমি বলদি হলে, আপনি বলদা।” চটপটে স্বরে বলল লামিয়া।
“কিহহ! তোমার তো দেখি যকৃত কম বড় না, আমাকে বলদা বলছো?এত বড় সাহস তোমার!”
“ওই মিয়া, সে কখন থেকে যকৃত যুকৃত জিকির করছেন। যকৃত মানেটা কি !”
“আবার ধমকাচ্ছে লিলিপুট কোথাকার। শোনো ললনা, তুমি বোধহয় সাইন্সের স্টুডেন্ট না, তাই জানো না। না হলেও তো জানার কথা! তুমি কোন গ্রহে বাস কর? সামান্য যকৃত মানো কি সেটাই জানো না!”
“দেখেন ভাই আগে খুলে বলুন।”
রোহান চোখ বড় বড় করে মৃদু চেচিয়ে বললো, “আস্তাগফিরুল্লাহ তওবা তওবা,কি খোলার কথা বলছো! ছিঃ ললনা তোমায় তো আমি ভালো ভেবেছিলাম। তুমি তো দেখি আস্ত পাপী মহিলা হয়ে বের হলে,দুষ্টু কোথাকার! আর যকৃত মানে হচ্ছে কলিজা।”

“যকৃত মানে কলিজা, সেটা কে বলল আপনাকে?”
রোহান বেশ ভাব নিয়ে তাকালো। শার্টের কলার নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, “ও মা কে বলবে মানে! আমাদের বাড়িতে দুই দুইটা ডাক্তার। একজন হার্ট সার্জন,আর একজন ফিউচার ডাক্তার ।কি মনে হয় তোমার?”
“যে ভাব নিয়ে বলেছেন, যেন হার্ট সার্জেন আপনি নিজেই।”
“আমি বা আমার ভাই যেই হই না কেন, ওই একই হলো।”
লামিয়া ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনার কোন ভাই হার্ট সার্জন?”
“কাল দেখেছিলে না, ড্রয়িং রুমে সোফায় বসা ছিল।”
লামিয়া চটপটে ভঙ্গিতে বলল, “কালো শার্ট পরা হাতে ফোন ছিল।গম্ভীর ব্যক্তি খুব।”
“তার এত বর্ণনা তুমি কি করে দিলে!”
লামিয়া মৃদু হাসলো এদিক এদিক দৃষ্টি ফেলে মিনমিন করে বলল, “ইয়ে মানে, তাকে আমার মনে ধরেছে!”
ব্যাস বাকিটাও রাগিয়ে দিল রোহানকে। হাতজোড়া মুষ্টিমদ্ধ হলো চোখ রাঙিয়ে বলল, “এই যা তো ললনা ছলনা কোথাকার। শালী তোর নজর খারাপ, যা ভাগ।
পুনরায় মুখের উপর দরজা বন্ধ হল।লামিয়া বুঝলো না এটা কি হলো, হতভম্বের স্বরে বলল, “এই আবুল পাগল নাকি!”

ফিহাজ ম্যান্ডেলা—নামের আড়ালে ঢাকা এক অদৃশ্য রাজ্য। বাইরে থেকে দেখলে এটি কেবল একটি ঝকঝকে ভবন; ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এখানে শব্দ নয়,চলছে হিসাব। সন্ধ্যা নামতেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা একে একে জড়ো হয়। কারও কণ্ঠে হাসি, কারও চোখে সন্দেহ।সবাই জানে, এখানে বলা কথাগুলো বাইরে গেলে জীবন বদলে যেতে পারে।
লাউঞ্জের এক কোণে দু’জন নেতা ফিসফিসিয়ে কথা বলছে—আগামী আন্দোলনের রূপরেখা, কারা মাঠে নামবে, কারা নীরব থাকবে। পাশে বসা আরেকজন মোটা খামে কালো টাকার হিসাব মিলিয়ে নিচ্ছে, ঠোঁটে অদ্ভুত আত্মতৃপ্তির হাসি। নারীব্যবসা নিয়ে কথাও আসে।সংখ্যা, রুট, কমিশন,সবই ঠান্ডা মাথায়। রাজনীতির উত্তাল অবস্থা এই ঘরে কেবল আরেকটি ভেরিয়েবল, যার দাম ঠিক করা যায়।
অন্য প্রান্তে মদের গ্লাসে বরফ টুংটাং শব্দ করে। কেউ ড্রিংক করছে, কেউ সিগার জ্বালিয়ে নাচের ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে আছে। আলো-আঁধারিতে নাচছে ছায়ারা—হাসি, সুর, আর লোভের মিশেল। এখানেই চুক্তি পাকা হয়, এখানেই প্রতিশ্রুতি ভাঙে। কেউ কেউ নারী সঙ্গ নিয়ে ফিহাজ মেহেল্ডের দিকে এগিয়ে যায় একেকটি দরজা খুললেই ভিন্ন জগত, ভিন্ন দাম।

এটা গুপ্ত খানা,যেখানে সত্য কথা বলা হয় না, কেবল ব্যবহার করা হয়। হাজার হাজার দেহের কেনাবেচা এখানে সংখ্যায় নেমে আসে, মানুষের নাম বদলে হয় ফাইল। নৈতিকতা এখানে বহিরাগত; ক্ষমতাই একমাত্র মুদ্রা। রাত গভীর হলে কথোপকথন আরও গাঢ় হয়—কে কাকে ফাঁদে ফেলবে, কোন সংবাদ চাপা পড়বে, কোন নেতা আগামীকাল নায়ক হবে।
ফিহাজ ম্যান্ডেলা ভোর পর্যন্ত জেগে থাকে। বাইরে শহর ঘুমায়, ভেতরে জেগে থাকে অদৃশ্য চুক্তি। আর সূর্য ওঠার আগেই সবাই ছড়িয়ে পড়ে।পরিচ্ছন্ন মুখোশ পরে দিনের রাজনীতিতে নামতে। কিন্তু এই দেয়ালগুলো জানে, রাতের হিসাব কখনো ভুলে যাওয়া যায় না।
“স্যার আপনি যাবেন, ফিহাজ মেহেল্ডে এ?”
আন অনাবেগ চোখে তাকালো। চিবুক শক্ত করে বলল,
“Never let these words leave your mouth again. I’m only warning my woman.”
একটু থেমে আবার যোগ করল,
“Are everyone’s passports and visas ready?”
“জ্বী স্যার,সব রেডি।”
“ওকে, আমি আসছি।”
বেরিয়ে পড়ে সেই রহস্যময় মানব। যে কিনা জালিয়াতি দুনিয়ার বাদশা।

সন্ধ্যার রাস্তা আজ অদ্ভুত রকমের নীরব। কোথাও যানজটের চাপ নেই, হর্নের কোলাহলও নেই। প্রশস্ত রাস্তার উপর ল্যাম্পপোস্টের আলো লম্বা ছায়া ফেলে এগিয়ে গেছে।যেন আলো আর অন্ধকারের মৃদু খেলা। শীতল বাতাস আলতো করে গায়ে লাগছে। দিনের ক্লান্তি ধুয়ে নিচ্ছে তার ছোঁয়ায়। দূরে গাছের পাতায় পাতায় সাঁঝের হালকা শব্দ, মাঝে মাঝে কোনো পথচারীর ধীর পায়ের আওয়াজ। আকাশে সন্ধ্যার নীলচে রঙ ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছে, আর রাস্তার বুক জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এক শান্ত, স্বস্তিদায়ক নিস্তব্ধতা।
সামনের দিকে সম্পূর্ণ দৃষ্টি উদ্যানের। অনেক রাস্তার মোড় পাল্টি খাচ্ছে।বাতাসে জেল দিয়ে সেট করা চুলগুলো নাজেহাল অবস্থা। প্রকৃতি আজ কিছুটা অশান্ত। আকাশে কালো মেঘ জমেছে। স্বাভাবিকের তুলনায় খুব ধীরে ড্রাইভ করছে উদ্যান। এক ঘন্টার পথ বোধহয় আজ দুই ঘন্টা লাগাবে। তাও যদি রাস্তায় যানজট থাকতো মেনে নেওয়া যেত।
রাফসা বিরক্ত হলো চোখ মুখ কুঁচকে বললো, “সমস্যা কি আপনার? জোরে ড্রাইভ করতে পারছেন না! নাকি ড্রাইভিং পারেন না ?”

“পারিনা, তুই শিখিয়ে দিয়ে যা।” সংক্ষিপ্ত উত্তর উদ্যানের।
রাফসা বিরক্ত হয়ে তাকালো উদ্যানের পানে। সে ব্যক্তি ভাবলেশহীন ভাবে সামনের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে ধীরে ধীরে ড্রাইভ করছে ।
“আমি ড্রাইভিং পারলে, আপনাকে সেই কখন গাড়ি থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে নিজেই ড্রাইভিং করে চলে যেতাম। পিঁপড়াও বোধ হয় এর চেয়েও জোরে চলে।”
উদ্যানের কপালে দৃঢ় ভাঁজ পরলো। গতি আগের চেয়েও খানিকটা কমে এলো। যেন বাংলা সাইকেল চালাচ্ছে। উদ্যান স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখে শক্ত করে। নিষ্প্রভ কন্ঠে বলল, “ওকে তাহলে পিঁপড়ার চেয়ে খানিকটা জোরেই চালাই।”

বলতে বলতেই গাড়ির গতি যেন দ্বিগুণের চেয়েও দ্বিগুণ বেড়ে গেল চোখের পলকে। রাফসা থতমত খেয়ে গেলম।চোখ উল্টে আসছে; জানালার ফাঁক গলে আসা বাতাসে চুলের নাজেহাল অবস্থা। ছাড়িয়ে দেওয়া চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উঠছে। রাফসার উড়ন্ত চুল গিয়ে ঠেকলো উদ্যানের নাকে মুখে। তবুও সে মানব শক্ত হয়ে ড্রাইভিং এ ব্যস্ত।ক্ষণে ক্ষণে যেন গতি বেড়েই চলছে। রাফসা ভয় পেল এত জোরে গাড়ি চলাতে। তবুও মুখ ফুটে একটু শব্দ করল না। বুকে পাথর বেঁধে আল্লাহ আল্লাহ করছে। প্রচন্ড বেগের কারণে মাথা ঘুরছে ভনভন করে। উদ্যান বুঝলো রাফসার অবস্থা।ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো; ভাঙবে তবু মচকাবে না। ধীরে ধীরে বেগ কিছুটা কমিয়ে আনলো। রাফসা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
উদ্যান ডান হাতে ড্রাইভিং করতে করতে বাম হাত বাড়িয়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করে আনে। ব্লুটুথ কানেক্ট করে আবহাওয়ার সাথে মিলিয়ে তার পছন্দের গান প্লে করে,

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১৭

আধি হ্যায় রহ গুজার,
আধা হ্যায় আসমান
আধি হ্যায় মাঞ্জিলেঁ
আধা জাহান….
তেরা হুঁ জান লে,
রুহ মুঝসে বাঁধ লে
বাহোঁ মে থাম লে,
কার দে জিন্দা…
হার শ্যায় মে তু,
চপ্পে-চপ্পে মে তু
খওয়াহিশ মে তু,
কিসসে – কিসসে মে তু
হার জিদ মে তু
ফিকরোঁ – জিকরোঁ মে তু….

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১৯