Home মোহশৃঙ্খল মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৫ (২)

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৫ (২)

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৫ (২)
মাহা আয়মাত

সন্ধ্যা ছয়টা। চারপাশে নরম আলো নামছে। ঠিক তখনি আরভিদ বাসায় আসে। লিভিং রুমে আভীর কারদার বসে ছিলেন। তিনি আরভিদের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু আরভিদ বাড়িতে ঢুকে একবারও লিভিং রুমে দাঁড়ায় না। কারও দিকে না তাকিয়ে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। ছেলের এমন আচরণে আভীর কারদারের ভ্রু কুঁচকে যায়। চোহরা দেখে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, তিনি বিরক্ত হয়েছেন।
তখনি মেইন ডোর দিয়ে ফারাবী আর তাফসির ভেতরে ঢোকে। আভীর কারদার সঙ্গে সঙ্গে ডাক দিলেন। ওরা এগিয়ে আসতেই তিনি জিজ্ঞেস করেন,

— কি হয়েছে? ওখানে সবকিছু ঠিক আছে তো?
ফারাবী ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে বলে,
— আর ঠিক থাকবে? আরভিদ স্যার গেলে কিছু ঠিক থাকে? সবগুলোকে মেরে প্যাকেট বিস্কুট বানিয়ে দিয়েছে!
আভীর কারদার কড়া গলায় বলেন,
— মেরেছে ওদের? তুমি কি করছিলে তখন? বলেছিলাম না ওকে আটকাতে?
ফারাবী বিরক্ত মুখে বলে,
— স্যার, আপনি তো আপনার ছেলেকে ভালোই চিনেন। রাগলে নিজের বাপকেও ছাড়ে না, সেই ছেলে ওদের ছেড়ে দেবে?
আভীর কারদার কটমট করে তাকাতেই ফারাবী একটু দমে গিয়ে তাড়াতাড়ি বলে,
— কথার কথা বলছিলাম! আরভিদ স্যার রাগলে উনার ধারে কাছে কেউ যেতে পারে? আর আমি গিয়েছিলাম আটকাতে! সেজন্য আমাকে নদীর পানিতে চুবিয়েছে, মেরে ফেলার জন্য!
আভীর কারদারের কপালে ভাঁজ পড়ে। তিনি চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করেন,

— বেশি মেরেছে?
ফারাবী বলে,
— বেশি মেরেছে মানে? রাব্বিকে এমন মার মেরেছে যে মারের চোটে হয়তো ওর কিডনি লক হয়ে গেছে!
ফারাবীর কথা শুনে তাফসির হেসে উঠে। আভীর কারদার কঠোর চোখে তাকাতেই তাফসির সঙ্গে সঙ্গে হাসি চেপে নেয়।
আভীর কারদার বলেন,
— আচ্ছা, যাও।
ওরা চলে গেল। মেহজা বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফোন দেখছে আর চিপস খাচ্ছে। হঠাৎই খেতে খেতে তার চোখ দরজার দিকে যায়। আরভিদ ঘরে ঢুকছে।
দেখামাত্রই মেহজা ফোনটা রেখে ঝড়ের গতিতে বিছানা থেকে নেমে সরাসরি আরভিদের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আচমকা সামনে কাউকে দেখে আরভিদ চমকে একটু পিছিয়ে যায়।
মেহজা জিজ্ঞেস করে,

— এই এতোক্ষণ কোথায় ছিলেন?
আরভিদ অবাক হয়ে বলে,
— সেলুনে ছিলাম। সেভ করেছি আর চুল কাটিয়েছি।
কথাটা শুনে মেহজা এবার আরভিদকে ভালো করে লক্ষ্য করে। সত্যিই আরভিদকে অন্যরকম লাগছে। চুল নতুন স্টাইলে কাটা। কিন্তু সেই স্টাইল মেহজার একদমই পছন্দ হয়নি।
মেহজা কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলে,
— পাতিদেব, ইউ আর লুক লাইক ছোলামুরগী!
আরভিদ থতমত খেয়ে নিজের চোয়াল আর চুলে হাত বুলিয়ে বলে,
— ভালো লাগছে না?
মেহজা বিরক্ত গলায় বলে,

— না। কেমন মনে হচ্ছে, চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়লে যেমন চুল কেটে দেয়, তেমন লাগছে। একদম চোরের মতো!
আরভিদ দ্রুত আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সেলুনে যখন দেখেছিল, তখন তো বেশ ভালোই লাগছিল। কিন্তু এখন যেন ঠিক সেরকম দেখাচ্ছে না। কেমন অদ্ভুত লাগছে। হয়তো মেহজা বলেছে বলেই এমন মনে হচ্ছে। আরভিদ কিছুই বুঝতে পারছে না। অসহায় চোখে মেহজার দিকে তাকায়। মেহজা নাক-মুখ কুঁচকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন খুব বিশ্রী কিছু দেখছে। মেহজা বলে,
— কোন জানোয়ার আপনাকে এই হেয়ার স্টাইল করতে বলেছে?
আরভিদ চোখে পড়ে, দরজার বাইরে তাফসির আর ফারাবী দাঁড়িয়ে আছে। আরভিদ দাঁতে দাঁত চেপে ওদের দিকে ইশারা করে বলে,
— ঐ যে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা জানোয়ার দুটো বলেছে!
আরভিদের কথা শুনে মেহজা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। ফারাবী আর তাফসির দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
ফারাবী আস্তে করে বিরবির করে বলে,
— বাবারেহ! জামাই-বউ দুইটার মুখই সিলপ্রাপ্ত খারাপ! দুইটার মুখের গালি শুনলেই বুঝা যায় মেইড ফর ইচ আদার।
ফারাবী নিচু স্বরে বললেও তাফসির ঠিকই শুনতে পায়, কারণ সে একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল।
মেহজা এবার সরাসরি ফারাবীকে বলে,

— এটা কি ধরনের হেয়ার কাট? আপনাকে কে বলেছে উনাকে এমন মগা স্টাইল দিয়ে দিতে?
মেহজার কথা শুনে তাফসিরের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। আরভিদকে কিনা ‘মগা’ বলছে! সে চুপচাপ আরভিদের দিকে তাকায়। আরভিদের মুখ ঝুলে আছে। চেহারা দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, মেহজার আরভিদের এই নতুন হেয়ার স্টাইল পছন্দ হয়নি। আর এটা নিয়েই আরভিদ চিন্তায় আছে। তাফসির মনে মনে ভাবে, এই লোককে দেখে কেউ বুঝবে, একটু আগেই সে কি কাণ্ড করে এসেছে? বাইরে একরকম, আর বউয়ের সামনে একেবারে ভাজা মাছ উল্টে খেতে না জানা মানুষ! অথচ এই মানুষটাই বাইরে কাটা চিবিয়ে খাওয়া পাবলিক!
ফারাবী আমতা আমতা করে বলে,
— ক..ই ম্যাম? সু..ন্দরই তো লাগছে!
মেহজা সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,
— সুন্দর লাগলে যান, নিয়ে যান উনাকে! কোলে তুলে নিয়ে আদর করেন! এমন ছোলা মুরগী আমার লাগবে না।
ফারাবী কাঁচুমাচু মুখে বোঝানোর চেষ্টা করে,
— ম্যাম, চুল আর সেভ করলে প্রথম দিন ছেলেদের একটু এমন অদ্ভুত লাগেই!
মেহজা বলে,

— মানুষকে অদ্ভুত লাগে! আর উনাকে মগা লাগছে! ছিহ! আমার এত সুন্দর জামাইটাকে মগা বানিয়ে দিলেন! আমার এমন মগা জামাই আমার লাগবে না।
ফারাবী আবার বলতে যায়,
— ম্যাম….
কিন্তু সে আর কথা শেষ করতে পারে না। আরভিদ তাকে থামিয়ে দেয়। শক্ত গলায় বলে,
— কালকে তোমাকে বেল বানাবো! মাথা ন্যাড়া করিয়ে পুরো ঢাকা শহর ঘুরাবো।
ফারাবী কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
— কিছু হলেই আমি ফেঁসে যাই কেন? ভালো লাগে না।
আরভিদ রাগী কণ্ঠে বলে,
— যাও সামনে থেকে! আর দুই মিনিট থাকলে খারাপ হয়ে যাবে বলে দিলাম।
ফারাবী আর তাফসির দ্রুত সরে পড়ে। ওরা চলে যেতেই আরভিদ মেহজার কাছে এগিয়ে আসে। কিন্তু মেহজা নাক সিটকিয়ে আরভিদের থেকে দূরে সরে যায় এবং ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে দাঁড়ায়।
মেহজা দরজার বাইরে গিয়ে বলে,

— ছিহ! এমন মগা জামাইয়ের সাথে একঘরে থাকলে নাক কাটা যাবে।
এ কথা বলেই মেহজা চলে যায়। মেহজা চলে যেতেই আরভিদ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,
— একটা পল্টিবাজ বউ পেয়েছি! কথায় কথায় রাগ দেখায়, অপমান করে। নির্ঘাত ভালোবাসি, নয়তো আমাকে মগা বলার জন্য তোকে যে কি করতাম!

চারদিক নিস্তব্ধ। গভীর অন্ধকারে ডুবে আছে রাস্তা। শুধু একটি ল্যাম্পপোস্টের আলোয় সামান্য জায়গা আলোকিত। রাত প্রায় নয়টা। অবশ্য পথটাই এমন জনমানবহীন হয়ে পড়ে একটু রাত হলেই। রাস্তার পাশে গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছে শায়রা। তার মুখভঙ্গিতে স্পষ্ট বিরক্তি। হঠাৎ তার চোখে পড়ে, বেশ দূরে একটা রিকশা এসে থামে। রিকশা থেকে একজন লোক নেমে হাঁটতে হাঁটতে শায়রার দিকে এগিয়ে আসছে। দুজনের মধ্যে দূরত্ব এতটাই ছিল যে লোকটির শায়রার কাছে আসতে প্রায় পাঁচ মিনিট লাগে।
লোকটি এসেই বলে,
— সরি মেডাম। রাস্তায় রিকশা পাচ্ছিলাম না। পরে অনেকটা পথ হেঁটে এসে রিকশা নিলাম। কিন্তু মাঝপথে আবার জ্যামের কারণে….
শায়রা তাকে থামিয়ে দেয়,
— হয়েছে, থামো রুবেল! এত কথা বলো না। আমি যা বলছি, তাই মনোযোগ দিয়ে শোনো।
রুবেল মাথা নেড়ে বলে,
— জি মেডাম, বলেন কেন ডেকেছেন! অনেকদিন পর ডেকেছেন!
শায়রা স্বাভাবিক গলায় বলে,
— এতদিন কোনো সাংবাদিকের প্রয়োজন ছিল না, তাই তোমায় ডাকিনি। কিন্তু আজকে পড়েছে।
রুবেল কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে,

— কি প্রয়োজন মেডাম?
শায়রা বলে,
— একটা নিউজ ছাপাতে হবে। কালকে যেন পুরো দেশবাসীর এই নিউজ পড়ে শুভ সকাল হয়।
— কি নিউজ?
শায়রা ফোন বের করে মোবাইলের ভেতর থাকা একটি ছবি রুবেলকে দেখায়। রুবেল ভ্রু কুঁচকে বলে,
— এটা কে?
শায়রা আগের মতোই বলে,
— অর্তিহা কারদার।
রুবেল অবাক হয়ে বলে,
— অর্তিহা কারদার? আইনমন্ত্রীর বোন?
শায়রা মাথা নেড়ে উত্তর দেয়,
— হ্যাঁ। কালকে প্রতিটা নিউজে একটাই টপিক চাই। বিয়ের এক সপ্তাহ হয়নি, অথচ অর্তিহা কারদার চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা!
রুবেল বিস্ময়ে বলে উঠে,
— বলেন কি! আইনমন্ত্রীর বোনের বিয়ে হয়ে গেছে? কবে? কার সাথে বিয়ে হয়েছে?
‘কার সাথে বিয়ে হয়েছে’—এই কথাটা শুনতেই শায়রার মুখ কঠোর হয়ে যায়। গলা শক্ত করে বলে,
— আদ্রিকের সাথে!
রুবেল শুধু বলে,

— ওহ।
শায়রার চোখে তীব্র ঘৃণা নিয়ে বলে,
— আমি চাই অর্তিহা এত অপমান আর অপদস্থ হোক, যাতে ওর মরণ ছাড়া উপায় না থাকে! সেজন্য যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে হেডলাইন দাও। কিন্তু মনে রেখো, অর্তিহা যেন চরিত্রহীন আর বেশ্যা প্রমাণিত হয়।
রুবেল সোজাসুজি বলে,
— মেডাম, এটা পারবো না। আমাকে মেরে ফেলবে ওই আরভিদ কারদার।
শায়রা গাড়ির ভেতর থেকে একটি স্যুটকেস বের করে রুবেলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— এখনো না? ভেতরে পঞ্চাশ লাখ আছে! সাথে ইউরোপে সেটেল্ড করে দিবো। তুমি শুধু এই নিউজটা ছেপে দাও। বাকি কাজ পাবলিক করে দিবে। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ! এসব নিউজ দেখলে এমনিতেই লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করে ভাইরাল করে দেয়। তার ওপর মন্ত্রী পরিবারের কাহিনি!
রুবেল স্যুটকেস খুলে ভেতরে থাকা টাকাগুলো দেখে। এত টাকা একসাথে সে কখনও দেখেনি। তার ওপর ইউরোপে সেটেল্ড হওয়ার লোভনীয় প্রস্তাব। মুহূর্তেই তার ভেতরে লোভ কাজ করতে শুরু করে। এত বড় সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়? কিন্তু তবুও একটু দ্বিধা রয়ে যায়। রুবেল বলে,
— কিন্তু প্রমাণ ছাড়া এত বড় একটা নিউজ কিভাবে প্রকাশ করবো?
শায়রা এবার গাড়ির ভেতর হাত বাড়িয়ে একটি ফাইল বের করে। ফাইলটা রুবেলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— এই হচ্ছে প্রমাণ! এখানে অর্তিহার দুই দিন আগের চেক-আপের রিপোর্ট আছে।

রুবেল ফাইলটা হাতে নিয়ে আবারও শঙ্কিত কণ্ঠে বলে,
— মেডাম, সত্যি বাঁচিয়ে নিবেন তো আমাকে?
শায়রা আশ্বাস দিয়ে বলে,
— সেসব নিয়ে চিন্তা করো না। তুমি কালকে কাজটা করার পর আমার লোকেরা তোমাকে দেশ থেকে সেইফ এক্সিট করিয়ে দেবে। তুমি শুধু সুন্দর করে কাজটা করো। যদি তোমার কাজ পারফেক্ট হয়, আরও টাকা পাবে। এটা জাস্ট এমনি দিলাম।
রুবেল মাথা নেড়ে বলে,
— আচ্ছা, মেডাম হয়ে যাবে। গেলাম এখন।
শায়রা সংক্ষেপে বলল,
— ঠিক আছে। কাজটা যেন সুন্দর ভাবে হয়।
রুবেল সালাম দিয়ে হেঁটে চলে যায়। শায়রা গাড়িতে উঠে বসে, ইঞ্জিন স্টার্ট করে। তারপর গাড়ি নিয়ে অন্ধকার রাস্তা পেরিয়ে চলে যায়। ওরা চলে যেতেই রাস্তার বাম পাশের গভীর অন্ধকার থেকে একটি ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এল। গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা মানুষটি ছিল সৌরভ। তার পরনে কালো হুডি, কালো মাস্ক আর কালো প্যান্ট। পুরো শরীরই অন্ধকারে ঢাকা।
সে পকেট থেকে ফোন বের করে দ্রুত একটি নম্বরে কল দিল। কল ধরতেই বলে,

— বস! আপনি ঠিকই বলেছিলেন। শায়রা এমনটাই করেছে! ওই সাংবাদিকের ফুল ডিটেইলস সেন্ড করছি আমি।
শায়রা গাড়ি চালাচ্ছে। হঠাৎ মাঝরাস্তায় গাড়িটা বন্ধ হয়ে যায়। শায়রা দুই তিনবার স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু ইঞ্জিন আর চালু হলো না। বিরক্ত হয়ে শেষমেশ গাড়ি থেকে নেমে ডিকি খুলে দেখে—পেট্রোল শেষ। আরও বিরক্ত হয়ে ডিকির ভেতর খুঁজে দেখে অতিরিক্ত পেট্রোল আছে কিনা। কিন্তু কিছুই নেই। রাগে শায়রা গাড়ির গায়ে জোরে একটা কিল মারে। তারপর আবার দরজা খুলে ভেতর থেকে ফোন নিয়ে সায়রকে কল দেয়। সায়রকে বলে এখানে এসে তাকে নিয়ে যেতে।
কল শেষ করে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফোন স্ক্রোল করতে করতে সায়রের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
এরই মাঝে দুই তিনটা গাড়ি থেমেছিলো। বেশ কয়েকজনই লিফট দেওয়ার কথা বলেছিলো। কিন্তু শায়রা রাজি হলো না। কারণ বোঝাই যাচ্ছিল, তারা সুন্দরী মেয়ে দেখে লিফট দিতে চেয়েছে। ফোন স্ক্রোল করতে করতে হঠাৎ শায়রা পাশে কারও উপস্থিতি টের পায়। চোখ তুলে সামনে তাকাতেই তার মুখের বিরক্তি আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে গেল।
শায়রা কড়া গলায় বলে,

— কি? তাকিয়ে আছো কেন? আর এখানে কেন?
সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইমাদ। সে শান্ত দৃষ্টিতে শায়রার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে যেন একরাশ তৃষ্ণা। অনেকদিন না দেখার তৃষ্ণা। মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে চোখ ভরে দেখে সব অভাব মিটিয়ে নিতে চায়। ইমাদ কোনো উত্তর দেয় না। তাকে চুপ থাকতে দেখে শায়রা আরও ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে,
— চোখ সরাও, নয়তো চোখদুটো খুলে রাস্তার কুকুরকে খাইয়ে দিবো!
এবার ইমাদ উত্তর দেয়। হালকা হেসে বলে,
— তুমি চাইলে আমি নিজেই খুলে দিতে পারি চোখগুলো! তোমাকে মানা করার সাধ্য আমার নেই।
শায়রা পাষাণ নারীর মতো হাসে।
— তোমার এসব কথায় আমার মন গলে না। না তোমার প্রতি আমার মায়া হয়।
ইমাদ আবারও মৃদু হেসে বলে,
— হবে না, জানি। কিন্তু আমি তো অসহায়। শুধু আমি না, পৃথিবীর প্রতিটা মানুষই কারও না কারও কাছে অসহায়। এই আমি তোমার কাছে অসহায়, তুমি আদ্রিকের কাছে, আবার আদ্রিক অর্তিহার কাছে!
শায়রা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ইমাদের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— আদ্রিক একদম অসহায় না অর্তিহার কাছে! আদ্রিক হচ্ছে সুপুরুষ!
ইমাদ হালকা বিদ্রুপের হেসে বলে,
— আদ্রিক অর্তিহাকে জয় করে নেওয়ায় সুপুরুষ? তাহলে আমি তোমাকে পেয়ে সুপুরুষ হতে চাই, শায়রা!
শায়রা ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,

— কি আছে কি তোমাদের?
ইমাদ এক পা এগিয়ে এসে বলে,
— তুমি আমার হয়ে দেখো! কোনো কিছুর কমতি দেই কিনা!
শায়রার তাচ্ছিল্য করে বলে,
— আমার কি কম আছে? যে কোনো কিছু পাওয়ার জন্য তোমার হতে হবে!
ইমাদ নরম সুরে বলে,
— তোমার একটু ভালোবাসার প্রয়োজন। যেটা আমার কাছে আছে। আমি তোমাকে আমার সবটুকুই ভালোবাসা দিচ্ছি। তুমি গ্রহণ করে নাও!
এই কথায় শায়রার ধৈর্য ভেঙে যায়। সে এগিয়ে এসে ইমাদের বুকে জোরে ধাক্কা দেয়। ইমাদ কয়েক পা পিছিয়ে যায়।
শায়রা রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

— চেয়েছি আমি তোর ভালোবাসা? জাস্ট দূরে থাক আমার থেকে! আমি আদ্রিক ছাড়া কাউকে চাই না। আমার শুধু আদ্রিক প্রয়োজন! নেক্সট টাইম আমার সামনে আসলে খুব খারাপ হবে!
বলেই শায়রা ঘুরে চলে যেতে উদ্যত হয়। ঠিক তখনি ইমাদ হাত বাড়িয়ে শায়রার হাত চেপে ধরে আটকে দেয়। মুহূর্তেই শায়রার মাথায় রক্ত চড়ে যায়। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে সজোরে ইমাদের মুখে ঘুষি মারে। অপ্রস্তুত ইমাদ আবারও পিছিয়ে যায়। এমন প্রতিক্রিয়া সে আশা করেনি। বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকে।
শায়রা এগিয়ে এসে ইমাদের কলার চেপে ধরে, রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,
— তোর সাহস কি করে হয় আমাকে টাচ করার? বাস্টার্ড! তোকে আজকে মেরে ফেলবো।
শায়রা আবার ঘুষি মারতে উদ্যত হলে হঠাৎ একটা হাত এসে শায়রার হাত থামিয়ে দেয়। শায়রা তাকিয়ে দেখে, সায়র।
সায়র শায়রাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলে,

— কি করছিস শায়রা? পাবলিক প্লেস এটা! কখন কে ভিডিও করে পোস্ট করে দেয়। সম্মান যাবে!
শায়রা রাগে ফেটে পড়ে।
— যাক সম্মান! এই বাস্টার্ডকে আজকে মেরেই ফেলবো! সাহস কি করে হয় আমাকে টাচ করার?
সায়র জোর করে শায়রাকে ছাড়িয়ে নেয়। ইমাদ নিজের কলার ঠিক করতে থাকে। সায়র শায়রাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলে,
— আচ্ছা, এবারের মতো ছেড়ে দে। চল, নিতে এসেছি তোকে!
শায়রা আঙুল তুলে ইমাদকে হুমকি দেয়,
— এবার ছেড়ে দিলাম। পরেরবার আমার কাছে ঘেসার চেষ্টা করলে গুলি করবো।
বলেই শায়রা সায়রের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে গাড়িতে গিয়ে বসে। সায়রও দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের গাড়িতে উঠে পড়ে। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সেখান থেকে চলে যায়। ইমাদ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের চলে যাওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে।
—–
রাত প্রায় একটা বাজতে চলেছে। ছোট্ট বাসার ভেতর নিস্তব্ধতা। রুবেল রকিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। পিঠে, কোমরে ব্যথা ধরেছে, পা প্রায় অবশ। টানা দুই ঘণ্টা ধরে কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করছে। আগামীকালের পত্রিকার জন্য অর্তিহাকে নিয়ে শায়রার কথা মতো নিউজ তৈরি করছে। প্রায় সবই প্রস্তুত। কম্পিউটারের স্ক্রিনে অর্তিহার ছবি খোলা, হেডলাইনও সাজানো শেষ। শুধু বাকি আর একটু কাজ। তবে সেসব পড়ে করবে। আগে রাতের খাবারটা খেয়ে নিবে। প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছে। তারপর বাকিটা শেষ করবে।
রুবেল উঠে দাঁড়ায়। তার বাসাটা খুবই ছোট। একটা রুম, একটা কিচেন আর একটা ওয়াশরুম। একা মানুষের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। রুবেল কিচেনে গিয়ে দুপুরের বাসি ভাত পাতিল থেকে কড়াইতে নিয়ে গরম করতে দেয়। তারপর একটা ডিম ভেজে প্লেটে ভাত তুলে নিচ্ছে, ঠিক তখনি রুমের দিকটা থেকে কিছু একটা পড়ার শব্দ শোনা যায়। রুবেল থমকে যায়। অবাক হয়ে ভাবে, বাসায় কি চোর ঢুকেছে? সে দ্রুত প্লেটটা রেখে দেয়। কিচেনের একপাশে রাখা ছুরির র‍্যাক থেকে একটি ছুরি হাতে নেয়।
তারপর খুব সতর্কতার সাথে নিজের রুমের দিকে এগোতে থাকে। রুমের সামনে এসে দেখে ভেতরে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে চারপাশ ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে চিপাচাপা, টেবিলের নিচে, বিছানার পাশে। কোথাও কেউ নেই। সে নিশ্চিত হয়, রুমে আর কেউ নেই। কিন্তু শব্দটা তাহলে এলো কিভাবে? এই ভাবনায় ডুবে পেছনে ঘুরতেই সামনে হঠাৎ একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে ভয় পেয়ে ধড়ফড়িয়ে পিছিয়ে যায়। তার সামনে কালো শার্ট আর সাদা প্যান্ট পরা এক যুবক দাঁড়িয়ে।
মুখটা স্পষ্ট দেখেই রুবেলের মুখ থেকে আপনাআপনি বেরিয়ে আসে,

— আদ্রিক কারদার।
আদ্রিক সম্পূর্ণ শান্ত। তার চোখদুটো ভয়ংকর শীতল। দুই হাত পকেটে গুঁজে সে স্থির দৃষ্টিতে রুবেলের দিকে তাকিয়ে আছে। এবার আদ্রিক দৃষ্টি সরিয়ে কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকায়। সেখানে অর্তিহার একটি ছবি খোলা। আদ্রিক পা ফেলে রুবেলকে পাশ কাটিয়ে কম্পিউটারের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
ছবির নিচে হেডলাইন লেখা,
— আইনমন্ত্রী আরভিদ কারদারের বোন অর্তিহা কারদার চার মাসের অন্তঃসত্তা অথচ তিনি এখনো অবিবাহিত। তাহলে এই সন্তানের বাবা কে?
শেষের লাইনটা পড়ে আদ্রিক হঠাৎ মাথা তুলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রুবেলের দিকে তাকায়। তারপর একেবারে স্বাভাবিক গলায় বলে,

— অবিবাহিত লিখেছো কেন? শায়রা বলেনি অর্তি বিবাহিত! আর ওর হাসবেন্ড আমি!
ভয়ে রুবেলের সারা শরীর ঘামে ভিজে যায়। তার গলা শুকিয়ে আসে। কথা বলতে চায়, কিন্তু মুখ দিয়ে শব্দ বের হয় না। সে বুঝতে পারে তার বিপদ এসেছে।
হঠাৎ সে দৌড় দেয়। কিন্তু রুম থেকে বের হওয়ার আগেই আদ্রিক কম্পিউটার টেবিলের ওপর রাখা পেপারওয়েট তুলে জোরে ছুড়ে মারে রুবেলের দিকে। পেপারওয়েট সোজা গিয়ে লাগে রুবেলের মাথায়।
সাথে সাথে রুবেল ব্যথায় ‘আহ’ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। মাথায় হাত দিয়ে সামনে আনতেই দেখে হাত রক্তে ভিজে গেছে। ভয়ে ও ব্যথায় কাঁপতে কাঁপতে রুবেল আদ্রিকের দিকে তাকায়।
আদ্রিক এগিয়ে আসে। তারপর এক হাঁটুতে ভর দিয়ে রুবেলের সামনে বসে পড়ে। নিচু হয়ে তার চোখে চোখ রেখে বলে,

— ভদ্রতা নেই? কেউ বাসায় আসলে পালিয়ে যায়?
রুবেল কাঁপতে কাঁপতে হাত জোড় করে বলে,
— স্যার আমাকে মাফ করে দেন। আমার ভুল হয়ে গেছে।
আদ্রিক একদম স্থির চোখে রুবেলের দিকে তাকিয়ে থাকে। মুখে কোনো রাগের প্রকাশ নেই, কিন্তু কণ্ঠটা বরফের মতো ঠান্ডা।
— মাফ জিনিসটা আমার দ্বারা হয় না। যদি কেউ আমাকে হার্ট করে আমি তাকে মাফ করতে পারি না। মাফ করলে মনে হয় আমার সাথে অন্যায় হচ্ছে! আর আমি নিজের সাথে অন্যায় করি না।
কথাটা শোনার পরও রুবেল আবারও বোকার মতো কাজ করে বসে। হঠাৎ করেই রুবেল আদ্রিককে ধাক্কা মেরে সরিয়ে উঠে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এবারও সে সফল হয় না। আদ্রিক দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়। কারণ সে জানতো রুবেল প্রাণ বাঁচাতে আবার পালানোর চেষ্টা করবে। আদ্রিক পকেট থেকে একটা পেন বের করে রুবেলের গলায় সজোরে ঢুকিয়ে দেয়। রুবেল চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
আদ্রিক কোনো তাড়াহুড়ো না করে রুবেলকে টেনে তুলে এনে চেয়ারে বসায়। মাথা আর গলার ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে। ব্যথায় রুবেলের অবস্থা খারাপ। সে চেয়ারে বসে কাতরাতে থাকে, তার ঠিকমতো হুঁশ নেই। আদ্রিক একটা সুটকেস এনে টেবিলের ওপর রাখে। সেটি খুলে। সুটকেস খুলতেই রুবেলের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। ভেতরে সাজানো আছে ছুরি, হাতুড়ি, লোহার পেরেক আর আরও নানা ধরনের যন্ত্রপাতি। আদ্রিক হাত বাড়িয়ে একটি হাতুড়ি তুলে নেয়। সাথে কয়েকটা লোহার পেরেক। সেটা দেখেই রুবেল আবার চেয়ার ছেড়ে পালাতে চায়।
কিন্তু এবার পেছন থেকে হঠাৎ একজন এসে তাকে শক্ত করে চেয়ারের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে। তার বুক চেয়ারের সাথে চেপে বাঁধা হয়ে যায়।
আদ্রিক পেছনের লোকটির দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলে,

— গুড জব সৌরভ! এই বাস্টার্ডটা আমাকে বিরক্ত করছে। বার বার ছুটাছুটি করছে।
সৌরভ শান্ত গলায় বলে,
— সমস্যা নেই বস। এবার আর ছোটাছুটি করতে পারবে না।
আদ্রিক সন্তুষ্ট ভঙ্গিতে বলে,
— ইয়াহ, এখন আমি শান্তিতে আমার কাজটা করি! অশান্ত পরিবেশ আমার ভালো লাগে না।
রুবেল অসহায়ের মতো কাঁদতে কাঁদতে বলে,
— স্যার একবারের জন্য মাফ করে দেন।
আদ্রিকের চোখ দুটো এখনও ঠান্ডা। সে শীতল ও ভারী কন্ঠে বলে,
— কিভাবে মাফ করবো? আজ পর্যন্ত কাউকে আমি মাফ করিনি। যে চোখ আমার অর্তির দিকে ভুলক্রমে পড়েছে সেই চোখও উপড়ে ফেলেছি! সেখানে তুই আমার বউয়ের ছবি তোর কম্পিউটারে সাজিয়ে রেখেছিস! আবার সেটা আরো মানুষকে দেখার সুযোগ করে দিচ্ছিস! শুধু তাই না, আমার বউকে নোংরা কথা বলার সুযোগ করে দিচ্ছিস! আমার সন্তানকে নাজায়েজ লিখেছিস! এতোগুলো ব্যাপার একসাথে কতটা এটাক করেছে আমাকে! ইউ নো, প্রচন্ড হার্ট হয়েছি!
আদ্রিক রুবেলের হাতটা চেয়ারের হাতলে চেপে ধরে, তারপর হাতের উপর পেরেক মারতে থাকে হাতুড়ি দিয়ে। রুবেল জোরে জোরে চিৎকার করতে থাকে। এই চিৎকারে যেন আদ্রিক তৃপ্তি পায়। বুকটা তার হিমশীতল হয়ে ওঠে। মনে হয়, এগুলো রুবেলের চিৎকার না বরং তার বুকটা শীতল করার বরফ।
আদ্রিক বলে,

— এই হাতগুলো দিয়েই তো আমার অর্তির ছবি ছাপিয়েছিস! আবার নোংরা ভেবে আমার অর্তি আর বেবিকে নিয়ে হেডলাইন লিখেছিস? নে, হাতের কষ্টের উপহার।
আদ্রিক এবার বাম হাতেও পেরেক মারতে থাকে হাতুড়ি দিয়ে। রুবেলের চিৎকার যেন থামছেই না।
রুবেল কাঁপতে কাঁপতে, চিৎকারের মধ্যে বলে,
— স্যার, আমাকে মাফ করে দেন স্যার। আমি গরিব মানুষ, টাকার লোভে এই কাজ করতে রাজি হয়েছি। নয়তো অর্তিহা মেডামকে তো আমি জীবনে দেখিইনি!
আদ্রিক পেরেক মারতে মারতেই ঠান্ডা হেসে বলে,
— দেখেছিস, আমি কত ভালো? তুই আমাকে হার্ট করেছিস, আর আমি তোর উপকার করছি। আর কতকাল বাচবি গরিবের মতো? এই গরিব হয়ে বেঁচে থাকাটা অনেক কষ্টের। তাই
কথা শেষ হতেই আদ্রিক হাতুড়িটা রেখে দেয়। সাথে সাথেই ছুড়ি তুলে রুবেলের একপাশের গাল দিয়ে ঢুকিয়ে অপর পাশ দিয়ে বের করে দেয় এবং তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে,

— মরে যা, বাস্টার্ড!
রুবেল গোঙাতে থাকে। মুখ দিয়ে ছুরি ঢুকে থাকার কারণে সে চিৎকারও করতে পারছে না। আদ্রিক ধীরে ধীরে রুবেলের সাথেও ঠিক একই রকম করতে থাকে, যেমনটা সে আগে তাহমিদ, আদনান এবং অন্যান্যদের সঙ্গে করেছিল। আরেকটি ছুরি দিয়ে রুবেলের চোখ উপড়ে ফেলে। এরপর সেই ছুরি দিয়ে আদ্রিক রুবেলের বুকে বারবার ছুড়ি মারছে। মনের সব ক্ষোভ ছুরির আঘাতে প্রকাশ হচ্ছে। প্রথম দুইবার ছুড়ি ঢুকিয়ে বের করতেই রুবেলের প্রাণটা দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। তবু আদ্রিক থামে না। সবসময়কার মতো, সে তৃপ্তির হাসি দিয়ে রুবেলের নিথর দেহটাকে ক্ষত-বিক্ষত করতে থাকে। সবশেষে আদ্রিক রুবেলের মাথায় হাতুড়ি ধরে জোরে বারি মেরে মগজটা বের করে ফেলে।
ছিটকে পড়ে থাকা মগজটা দেখে আদ্রিক হাসে। জোরে হাসে, যেন জয়ের হাসি। তারপর ছুড়িটা মাটিতে ফেলে সৌরভের দিকে তাকিয়ে বলে,

— এর ব্যবস্থা করো।
বলেই আদ্রিক উঠে রুবেলের বাসার কিচেনে এসে বেসিনে হাত ধুতে থাকে। আজকেও তার শার্টে কিছুটা রক্তের ছিটা আছে। আদ্রিক ভালোভাবে হাত ধুয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে। সেটা দিয়ে হাত মুছতে মুছতে রুবেলের রুমে এসে দেখে, সৌরভ প্রায় কাজ গুছিয়ে নিয়েছে। রুবেলের মৃত দেহটা একটা বড় সুটকেসে রেখে দিয়েছে। পুরো রুমে সৌরভ এক ধরনের স্প্রে করছে, একটা ক্যামিক্যাল যা রক্ত বা অন্যান্য চিহ্ন মুছে ফেলা যায়। তারপর সে একটা কাপড় দিয়ে সব মুছে নিচ্ছে। স্প্রে করে কাপড় দিয়ে মুছে নিচ্ছে যাতে কোনো দাগ বা প্রমাণ রুমে না থাকে।
আদ্রিক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে সৌরভের নিখুঁত কাজ। সব কিছু পরিষ্কার হয়ে গেলে, সৌরভ রুবেলের যাবতীয় ডকুমেন্ট এবং অন্যান্য জিনিসগুলো একটা ব্যাগে রেখে নেয়, যাতে কোনো রকম প্রমাণ না থাকে।
সব কাজ শেষ হলে, সৌরভ রুবেলের মৃত দেহ সুটকেসে ভরে, ব্যাগটা হাতে নিয়ে আদ্রিকের সঙ্গে বেরিয়ে আসে। সৌরভ আলাদা গাড়ি এনেছিলো। সে আদ্রিককে বিদায় জানিয়ে সেই গাড়িতে উঠে চলে যায়। আদ্রিকও নিজের গাড়ি চালিয়ে সেখান থেকে চলে আসে।

আদ্রিক বাসায় ফিরে রুমে ঢুকতেই দেখে অর্তিহা এখনো গভীর ঘুমে। বুঝতে পারে, হয়ত অর্তিহার আদ্রিক যাওয়ার পর আর ঘুম ভাঙেনি। আদ্রিক যখন বের হয়েছিলো, তখনো অর্তিহা ঘুমিয়েই ছিল। তাই আদ্রিক সরাসরি ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে শাওয়ার নিতে। যদিও শরীরে আর কোনো রক্ত নেই, তবু একটু ফ্রেশনেসের জন্য শাওয়ার নেওয়া দরকার। আদ্রিক বেশ সময় নিয়ে শাওয়ার নেয়। বের হয়ে সোফায় বসে চুল মুছতে থাকে। চুল মুছে শেষে আদ্রিকের তৃষ্ণা লাগে, কিন্তু পানির না সিগারেটের। মনে হয়, সিগারেটের দুটো টান আরাম দেবে।
আদ্রিক উঠে বেডের পাশে গিয়ে সাইড টেবিলের ড্রয়ার খুলে। ড্রয়ার খুলতে হালকা শব্দ হয়, আর তাতেই অর্তিহার ঘুম ছুটে যায়। অর্তিহা হালকা চোখ খুলে কুচকে আদ্রিকের দিকে তাকায়। আদ্রিক সিগারেটের প্যাকেট বের করে ড্রয়ার লাগিয়ে আবার সোফায় এসে বসে। তারপর সে আয়েশ করে সিগারেট টানতে থাকে। অর্তিহার ঘুম পুরোপুরি ভেঙে যায়। তার পানির তৃষ্ণা লাগে, তাই সে শোয়া থেকে উঠে বসে। বেড থেকে পা নামিয়ে বসে। তারপর একবার সোফায় বসে থাকা আদ্রিকের দিকে তাকায়।

আদ্রিক শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে সিগারেট টানছে। অর্তিহা চোখ সরিয়ে সাইড টেবিল থেকে পানি ঢেলে গ্লাসে নিয়ে ঢকঢক করে পানিটা খায়। গ্লাস রেখে মুখে লেগে থাকা পানিটা হাত উল্টে মুছে নেয়। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে আবার আদ্রিকের দিকে তাকায়।অন্ধকার রুমের হালকা আলোতে আদ্রিককে দেখতে অর্তিহার কাছে অনেক স্নিগ্ধ লাগে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। এতোক্ষণে বুঝতে পারে আদ্রিক শাওয়ার নিয়েছে। এইজন্যই এমন মাঝরাতে তাকে এতটা স্নিগ্ধ লাগছে। পরমুহূর্তেই অর্তিহার মনে মনে ভাবে, এই স্নিগ্ধতা কেবল বাহিরটায়। ভেতরটা কেবল অন্ধকার।

অর্তিহার পা জ্বালা করছে। প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর থেকে তার এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। পানি দিলে কিছুটা আরাম মেলে। তাই অর্তিহা উঠে ওয়াশরুমে যায় পায়ে পানি দেয়ার জন্য। পানি দেওয়ার পর তিন-চার মিনিট পরে সে বের হয়। দেখতে পায় আদ্রিকের সিগারেট এখনও জ্বলছে। বুঝতে পারে আদ্রিক আরেকটা সিগারেট ধরিয়েছে। কারণ অর্তিহা ওয়াশরুমে যাওয়ার সময় দেখেছিলো আদ্রিকের হাতের সিগারেটটা শেষের দিকে ছিলো।
অর্তিহা কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলে,

— এখন সিগারেট খাওয়ার সময়?
আদ্রিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দেয়,
— না, এখন তো রোমান্স করার সময়! করবি রোমান্স?
বলেই সিগারেটে টান দেয়। অর্তিহা আরও বিরক্ত হয়। মুখে স্পষ্ট বিরক্তি দেখা যায়,
— আপনার মুখে কি এসব ছাড়া কোনো কথা হয় না?
আদ্রিক সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে চেপে নিভিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর সে অর্তির দিকে তাকিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে থাকে। আদ্রিককে এভাবে নিজের দিকে আসতে দেখে অর্তিহার তার বুক ধড়ফড় করতে থাকে। সে স্বভাবতই দুপা পিছিয়ে যায়। কিন্তু ততক্ষণে আদ্রিক তার একেবারে কাছে। মাঝখানে শুধু এক হাত সমান দূরত্ব।
আদ্রিক জিজ্ঞেস করে,

— কি কথা শুনতে চাস তুই? মারামারি কাটাকাটির? তাহলে শোন, আজকে একজনকে কুপিয়ে…
অর্তিহা দ্রুত আদ্রিককে থামিয়ে বলে,
— থামুন! এসব কি ধরনের কথা? মানে, এই সময় এসব বলার?
আদ্রিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— তো বলবোটা কি?
অর্তিহা মুখ ঘুরিয়ে বিরক্ত কণ্ঠে বলে,
— কিছু বলতে হবে না। ঘুমিয়ে যান!
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে আদ্রিক হঠাৎ অর্তিহাকে ঠেস দিয়ে দেয়ালে ঠেসিয়ে দেয়। অর্তিহা আচমকা হওয়ায় ঘাবড়ে যায়, জড়োসড়ো হয়ে যায়। দুই হাত বুকে বেকে রাখে আর তাকায় আদ্রিকের দিকে।
আদ্রিক অর্তিহাকে দেয়ালে দাঁড় করিয়ে রাখে, দুই পাশে হাত রেখে আটকে দেয়। হালকা ঝুকে ঠোঁট বেকে হেসে, হালকা স্বরে বলে,

— রাতটা তো শুধু ঘুমানোর জন্যই দেয়নি।
অর্তিহা কণ্ঠ কুঁচকে বলে,
— রাতে মানুষ ঘুমায়! আপনিও ঘুমান!
আদ্রিক হেসে বলে,
— সেটাই! মানুষ ঘুমায়। আর তোর মতে তো আমি অমানুষ! আর সেজন্যই আমার ঘুম আসছে না।
অর্তিহা আদ্রিকের ভাবসাব সুবিধার লাগে না। কাঁপা কণ্ঠে বলে,
— ঘুম… ঘুমের ওষুধ খান! ঘুম এসে যাবে!
— ঘুমের ওষুধ ভালো না স্বাস্থ্যের জন্য!
অর্তিহা চোখ ছোট করে তাকায়,
— সিগারেট তো খুব ভালো স্বাস্থ্যের জন্য তাই না?
আদ্রিক অর্তিহার কপাল থেকে গালে আঙুল দিয়ে স্লাইড করতে করতে, চোখ ছোট করে বলে,
— সব ভালোও আবার ভালো লাগে না! মাঝে মাঝে একটু খারাপ জিনিস করতে মজা লাগে!
অর্তিহা আদ্রিকের হাত গালে লাগতেই কেঁপে উঠে, চোখ বন্ধ করে বলে,
— আল্লাহ! আপনার হাত ঠান্ডা বরফ হয়ে গেছে!
— ইয়াহ! কোল্ড ওয়াটার দিয়ে শাওয়ার নিয়েছি!
অর্তিহা চোখ খুলে তাকায়,

— কেন? গিজার নষ্ট হয়ে গেছে?
— তুই তো জানিস, আমি গরম পানি দিয়ে শাওয়ার নিতে পারি না।
অর্তিহা চাপা বিরক্তি নিয়ে বলে,
— এইজন্যই সারাক্ষণ ঠান্ডা ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে থাকেন! শরীরের এতো ঠান্ডা কোথাও না কোথাও দিয়ে তো বের হবেই!
আদ্রিক হেসে বলে,
— আজকে বেবিডলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে!
অর্তিহা ভ্রু কুঁচকে বলে,
— কেন? আমি কি করেছি?
— পাঁচ মিনিটের বেশি হয়ে গেছে, আর তুই এখনো আমার কাছে!
অর্তিহা ভ্রু কুঁচকে বলে,
— হুম। তো?
আদ্রিক ঠোঁট চেপে হেসে বলে,
— এখনো কান্না করিসনি তুই!
— তো আমি কি ইচ্ছে করে কান্না করি নাকি? আপনিই তো আমাকে কান্না করান!
আদ্রিক দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে,
— তুই কিন্তু ডার্টি কথা বলছিস অর্তি!
অর্তিহা থতমত খেয়ে বলে,
— ভয় দেখিয়ে কান্না করানোর কথা বলছি!
আদ্রিক ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে,

— সত্যি?
— হুম।
— ওহ! আমি আরও ভেবেছিলাম…
— কি?
— তুই যেটা ভেবেছিস, সেটাই!
বলেই আদ্রিক হেসে ওঠে, শরীর দুলিয়ে। অর্তিহা নাক ফুলিয়ে বলে,
— আমি ঐসব ভাবিনি! তাই হাসবেন না!
আদ্রিক হাসি থামালো না। তা দেখে অর্তিহার রাগ আরও বেড়ে গেল।
— আপনি অনেক খারাপ!
— আমি খারাপ এটা তো আমি নিজেই বলি! কিন্তু তুই যে স্বীকার করিস না যে তুই খারাপ!
— আমি খারাপ? কিভাবে? আমি কি করেছি?
— নয়তো কি! আমি যে ঐসবই ভেবেছি, তুই বুঝলি কিভাবে?
— আপনি এই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে কিন্তু আমাকে ঝালাচ্ছেন!
আদ্রিক চট করে অর্তিহার গালে কামড় মারে। অর্তিহা ব্যথা পেয়ে আহ করে উঠে। গালটা হাত দিয়ে ডলতে ডলতে বলে,
— কামড় দিলেন কেন?
— গাল ফুলিয়েছিস তাই!
— গাল ফুলালে প্রতিবারই আমাকে কামড় দিবেন?
— হুম, প্রতিবার যদি গাল ফুলালে এমন আদুরে লাগে, তাহলে অবশ্যই কামড় দিবো!
— আপনি কথায় কথায় কামড় মারেন! ব্যথা পাই না আমি?
— মাঝে মাঝে ব্যথা পাওয়া ভালো!
— তাহলে আপনাকে একটা কামড় দেই?
আদ্রিক গাল বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— দে।
অর্তিহা মুখ সামনে বাড়িয়ে কামড় দিতে গিয়ে থেমে মুখ সরিয়ে নেয়। হাত দিয়ে আদ্রিককে সরানোর চেষ্টা করে বলে,

— না, কামড় দিবো না। সরুন।
আদ্রিক আচমকা অর্তিহাকে কোলে তুলে নেয়। অর্তিহা এবার ভয় পেয়ে যায়। উল্টো কিছু করবে না তো? নাহলে কোলে নিলো কেন?
আদ্রিক অর্তিহাকে বেডে শুইয়ে বলে,
— ঘুমা! তোর তো ব্রেইন নেই-ই! এখন রাতে না ঘুমিয়ে আমার বেবির ব্রেইনটা ড্যামেজ করে দিবি!
অর্তিহা বিরক্ত হয়ে বলে,
— এখন আর ঘুম আসছে না।
আদ্রিকও বেডে শুয়ে পড়ে,
— ওকে, আমারও ঘুম আসছে না। অকারণে জেগে না থেকে, একটা কাজের কাজ করি দুজনে মিলে! এই রাত তো কাজের জন্যই!
অর্তিহা দ্রুত বলে উঠে,

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৫

— ঘুম এসে গেছে!
আদ্রিক হেসে বলে,
— হুম, ওষুধ পড়লে ঘুম তো আসবেই!

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৬