Home মোহশৃঙ্খল মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৫

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৫

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৫
মাহা আয়মাত

সকাল সকালই আরভিদ মেহজা খাগড়াছড়ি ছেড়ে ঢাকায় চলে আসে। ঢাকায় পৌঁছেই দুজনেই গভীর ঘুমে ঢলে পড়ে। দুপুর বারোটার দিকে মেহজার ঘুম ভাঙে। সে উঠে গোসল করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুল মুছতে থাকে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়েই মেহজা মুচকি মুচকি হাসে, আর আড়চোখে তাকায় আরভিদের দিকে। আরভিদ তখনো বিছানায় গভীর ঘুমে। কম্ফোর্টার মুড়িয়ে আরামে ঘুমাচ্ছে। সারারাত সে ঘুমায়নি, আর মেহজাকেও ঘুমাতে দেয়নি। রাতের কথা মনে পড়তেই নিলজ্জ মেহজাও লজ্জায় লাল হয়ে যায়।
ঘুমন্ত আরভিদকে দেখতে ভীষণ সুন্দর লাগছে। মেহজার চোখে আরভিদই পৃথিবীর সবচেয়ে সুদর্শন আর নজরকাড়া পুরুষ। আরভিদের বাম হাতটা কম্ফোর্টারের বাইরে বেরিয়ে আছে। মেহজা নিজের হাত বাড়িয়ে দূর থেকেই আরভিদের হাতের সাথে মিলিয়ে নেয়। আরভিদ যে তার থেকে অনেক বেশি ফর্সা, সেটা তখন স্পষ্ট বোঝা যায়। এরপর মেহজা আবার আয়নায় নিজের দিকে তাকায়।

বড়, গোল, পরিষ্কার গাঢ় বাদামি চোখ। ছোট, সোজা নাক, যার ডগাটা সামান্য গোল। মাঝারি আকারের ঠোঁট, স্বাভাবিকভাবেই লালচে— এই কারণেই আরভিদ তাকে ‘রেডলিপ’ বলে ডাকে। ঘন ভ্রু, যা সোজা থেকে হালকা আর্চের মতো। মসৃণ ওভাল আকৃতির মুখ। নিজেকে দেখতে তার খুব সাধারণই মনে হয়। তবু আরভিদ কেন তাকে এত অসাধারণের মতো চায়? আরভিদের ভালোবাসা দেখে মাঝেমধ্যে মনে হয়, সে যেন সত্যিই খুব বিশেষ কেউ। পরক্ষণেই মেহজা হেসে ওঠে— লোকটা তো তাকে তার সৌন্দর্যের জন্য ভালোবাসে না।
নয়তো তার থেকেও অনেক বেশি সুন্দরী মেয়েরা আরভিদকে বিয়ে করতে চেয়েছে। বড় বড় নেতা-মন্ত্রীরাও নিজেরা এসে আরভিদের জন্য বিয়ের প্রস্তাব এনেছে। কিন্তু আরভিদ সবসময়ই সেগুলো ফিরিয়ে দিয়েছে। আগে মেহজা ভাবত, লোকটা আসলে কী চায়? এত সুন্দর সুন্দর মেয়েদের কেন সে না বলে দেয়? এখন সে বুঝতে পারে— আরভিদ কেবল তাকেই চায়। এতগুলো অপশন থাকা সত্ত্বেও সে মেহজাকেই নিজের অগ্রাধিকার দিয়েছে। হঠাৎ মেহজার চিন্তার মাঝে ব্যাঘাত ঘটায় আরভিদের ফোনের রিংটোন।
মেহজা টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে কানে ধরে রিসিভ করে বলে,

— হ্যালো কে?
ওপাশ থেকে ভেসে আসে,
— ভাই কোথায় ভাবি?
মেহজা বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা আরভিদের দিকে তাকিয়ে বলে,
— নেতা এখন হেতা মুড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে।
ওপাশ থেকে আবার বলে,
— ভাবি একটু ডেকে দিবেন?
মেহজা শান্ত গলায় উত্তর দেয়,
— না। উনি ঘুম থেকে উঠলে কল দিতে বলবো।

বলেই মেহজা ফোন কেটে দেয়। টেবিলের উপর মোবাইলটা রাখতেই মেহজার মাথায় দুষ্টু একটা বুদ্ধি এসে যায়। সে টাওয়ালটা স্ট্যান্ডে রেখে ধীরে ধীরে আরভিদের দিকে এগিয়ে যায়। আরভিদের মুখের ওপর ঝুঁকে নিজের ভেজা চুলগুলো দিয়ে আলতো করে তার মুখে বাড়ি মারে। মুখে ভেজা কিছুর স্পর্শ লাগতেই আরভিদ বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলে। পিটপিট করে চোখ খুলে তাকায়। আর চোখের সামনে দেখতে পায় হাসোজ্জ্বল একটা মুখ। মুহূর্তেই আরভিদের মুখের বিরক্তি মিলিয়ে গিয়ে সেখানে মুগ্ধতা ভর করে।
আরভিদ চোখ খুলেছে দেখেই মেহজা সরে দাঁড়ায়। আবার আয়নার সামনে এসে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলে,
— আপনার দেখছি ঘুম শেষই হচ্ছে না।
আরভিদ আধশোয়া হয়ে বসে হেসে বলে,
— বুঝতে হবে নির্ঘুম রাত আর ক্লান্তির মিশ্রণে ঘুম বেশিই আসে।
মেহজা লজ্জা হেসে বলে,

— খাচ্চর একটা।
আরভিদ গা থেকে কম্ফোর্টার সরিয়ে বেড ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর মেহজার কাছে গিয়ে তাকে নিজের দিকে টেনে নেয়। কোমর পেঁচিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। দুজন কিছুক্ষণ একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ মেহজা চোখ সরিয়ে নিয়ে হেসে ওঠে।
আরভিদ হেসে জিজ্ঞেস করে,
— হাসছিস কেন?
মেহজা হাসতে হাসতে বলে,
— কালকে রাতে আমি আপনার সব দেখে ফেলেছি!
আরভিদ পাল্টা হেসে বলে,
— আমি দেখেছিও আর ছুয়েছিও!
— আমার বিরাট একটা লস হয়েছে!
আরভিদ ভ্রু কুচকে বলে,
— লস? কেন? কি হয়েছে?
— কালকে রাতে যদি আপনার ভিডিও করে ফেলতে পারতাম তাহলে আজকে আমি সেই লিংক বিক্রি করে বড়লোক হয়ে যেতাম! আইনমন্ত্রীর লিংক বলে কথা! কি বিরাট লসটাই না আমার হলো!

— ভন্ডামি ছাড়বি কবে মেহু?
মেহজা ভাব নিয়ে বলে,
— বেচে আছি যতদিন ভণ্ডামি চলবে ততদিন!
আরভিদ মুখ ঘুরিয়ে হেসে নেয়। তখন মেহজা আরভিদকে বলে,
— আচ্ছা, এখন রাব্বি ভাইকে কল দেন।
— কেন?
— কল দিয়েছিলো। ঘুমিয়ে ছিলেন আপনি। বলছিলো ডেকে তুলে দিতে আপনাকে।
আরভিদ মেহজাকে ছেড়ে দিয়ে বলে,
— আচ্ছা, কাভার্ড থেকে কাপড় বের করে দে। শাওয়ার নিবো।
— দিচ্ছি।
বলেই মেহজা হেঁটে কাভার্ডের দিকে চলে যায়। আরভিদ বেডে বসে মোবাইল হাতে নেয়। তারপর কল লাগায়। কল যেতেই ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ হলো। যেন আরভিদের কলের অপেক্ষাতেই ছিল।
আরভিদ ‘হ্যালো’ বলতেই ওপাশ থেকে রাব্বি দ্রুত ও অস্থির কণ্ঠে বলে,

— ভাই সমস্যা হয়ে গেছে একটা। বিপদে পড়ে গেছি।
কথাটা শুনে আরভিদ সতর্ক হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে মেহজার দিকে তাকায়। মেহজা তখন কাভার্ড খুলে আরভিদের কাপড় বের করছে।
আরভিদ গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে?
রাব্বি একটু থেমে বলে,
— ভাই গত পরশু একটা মেয়ের সাথে করে মেয়েটাকে ময়লার স্তুপে ফেলে এসেছিলাম।
এই সময় মেহজা কাপড়গুলো নিয়ে আরভিদের কাছে এগিয়ে এলো। সেটা দেখে আরভিদ রাব্বিকে বলে,
— এসে কথা বলছি!
বলেই আরভিদ ফোন কেটে দেয়। মেহজা আরভিদের হাতে পাঞ্জাবি-পায়জামা তুলে দিয়ে বলল,

— এই নিন কাপড় আপনার।
আরভিদ কাপড়গুলো হাতে নেয়, কিন্তু কিছু না বলে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। আরভিদ ওয়াশরুমে ঢুকে যাওয়ার পর মেহজা এসে বেডের ওপর বসে মোবাইলটা হাতে নেয়। ফেসবুকে ঢুকে স্ক্রোল করতে করতে প্রথমেই একটি হেডলাইন দেখে মেহজা থমকে যায়। হেডলাইন টা ছিলো : ১৭ বছর বয়সী তরুণীকে গণ ধর্ষণ। মৃত দেহ ফেলে গেছে চার যুবক।
মেহজা এবার নিউজ চ্যানেলের ভিডিওটা ছাড়ে। সংবাদ উপস্থাপিকা বলতে থাকেন,

— ১৭ বছর বয়সী তরুণীকে গণ ধর্ষণ। আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের ময়লার স্তুপে চার যুবক একটি মৃতদেহ ফেলে গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে আজ সকালে। ভোরবেলায় ময়লা সংগ্রহের কাজে আসা একজন শ্রমিক প্রথমে লাশটি দেখতে পান। পরে ধীরে ধীরে এলাকার বাসিন্দারা সেখানে জড়ো হতে থাকেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে। তদন্তের অংশ হিসেবে সেখানকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। ফুটেজে দেখা যায়, গত পরশু রাতের অন্ধকারে চারজন যুবক একটি মেয়ের লাশ সেখানে ফেলে রেখে যায়। এখনো পর্যন্ত সেই মৃত তরুণীর পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।

পুরো নিউজটা শোনার পরই মেহজার শরীর কাঁপতে শুরু করে। এসব ঘটনা মেহজাকে ভীষণভাবে ভয় পাইয়ে দেয়। খুব ছোটবেলায়, তখন মেহজার বয়স মাত্র আট বছর, তার বাড়ির পাশের একটি মেয়েকে কয়েকজন লোক ধর্ষণ করে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। সেই মেয়ের লাশ নিজের চোখে দেখেছিল মেহজা। সেই দৃশ্য তাকে গভীরভাবে আতঙ্কিত করে তোলে। এই ঘটনার পর থেকেই পুরুষদের প্রতি মেহজার মনে ঘৃণা জন্মায়। পুরুষদের ওপর তার বিশ্বাস ভেঙে যায়। তখনই সে সিদ্ধান্ত নেয়, কখনো বিয়ে করবে না।
সেই ঘটনার পর মেহজা আর কখনো কোনো মৃতদেহ দেখার সাহস পায়নি। এমনকি যখন তার চাচা মারা যায়, তখনও সে শেষবারের মতো চাচার মুখ দেখতেও পারেনি। এদিকে শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এসে আরভিদ দেখে, মেহজা বিছানায় বসে আছে। ভয়ে তার মুখ জমে গেছে, হাত কাঁপছে।
আরভিদ দ্রুত পায়ে মেহজার কাছে এসে তার গালে হাত রেখে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে,

— কি হয়েছে মেহু? এমন ভয় পেয়ে আছিস কেন?
মেহজা আরভিদকে দেখেই শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে। আরভিদের বুকে মাথা রেখে বসে থাকে চুপটি করে। আরভিদ আবার জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে মেহু? আমাকে একটা বার বল?
মেহজা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে আরভিদকে আঁকড়ে ধরে থাকে। তার শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত চলতে থাকে। আরভিদ এবার মেহজার পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে খুব কোমল কণ্ঠে বলে,
— মেহুফুল? কি হয়েছে জান? বল আমাকে? আমি আছি তো। মেহুজান বল আমাকে?
মেহজা এবার মাথা তুলে আরভিদের দিকে তাকায়। কাঁপা গলায় বলে,
— পুরুষ মানুষ এতো খারাপ কেন? আর মেয়েরা এতো নির্যাতিত হয় কেন?
মেহজার প্রশ্নে আরভিদ কিছুক্ষণ থেমে যায়। অবাক হয়ে হালকা কণ্ঠে বলে,
— হঠাৎ এমন কথা?
মেহজা বলে,

— সব পুরুষ কি একই? শুধু সময়ের সাথে নিজের রূপ দেখায়? আমি পুরুষ মানুষ ঘৃণা করতাম! এখন আরো বেশি করি! আপনি ব্যতিত বাকি সব পুরুষকে আমি ঘৃণা করি!
আরভিদের গলা শুকিয়ে যায়। ঠোঁট ভিজিয়ে আস্তে করে বলে,
— আবার কি হয়েছে মেহু?
মেহজা এবার একটু শান্ত হয়। ভয়ের তীব্রতা কিছুটা কমে আসে, যদিও পুরোপুরি যায় না। সে আরভিদকে ছেড়ে নিজের ফোনটা তুলে নেয় এবং আবার ভিডিওটা চালু করে। প্রথমে আরভিদের ভ্রু কুঁচকে থাকলেও ভিডিও দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ স্বাভাবিক হয়ে আসে। ভিডিও চলতে থাকে। উপস্থাপিকা আবার খবর পড়ছে। মেহজা আরভিদের ডান হাতটা শক্ত করে ধরে ভিডিও দেখতে থাকে। ভিডিওতে যখন গত পরশু রাতের সিসিটিভি ফুটেজ দেখানো হয়, তখন হঠাৎ মেহজা ভ্রু কুঁচকে ভিডিওটা বন্ধ করে দেয়। আরভিদ মেহজার দিকে তাকায়।
মেহজা মনোযোগ দিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলে,

— ভিডিও তে চারটা ছেলের মাঝে ঐ বাম দিকের ছেলেটার মুখটা কেমন চেনা চেনা লাগছে!
মেহজার কথা শুনে আরভিদ ভিডিওর দিকে তাকায়। সে দেখে, মেহজার দেখানো ছেলেটার চেহারা ঝাপসা। কিন্তু সেই ঝাপসা মুখটাও আরভিদের চিনতে কষ্ট হয় না। ছেলেটা তানভীর। তখনই আরভিদ বুঝে ফেলে, একটু আগে রাব্বি কেন ফোন করেছিল। তার মানে এই ঘটনাটাই ছিল সেই ‘মেয়ে-জনিত সমস্যা’। তানভীরকে চিনতেই আরভিদের কপাল কিছুটা ঘেমে উঠে। সে মেহজার দিকে তাকায়। দেখে, মেহজা এখনো ছেলেটার মুখ চিনতে চেষ্টা করছে। সঙ্গে সঙ্গে আরভিদ মোবাইলের স্ক্রিন বন্ধ করে মোবাইলটা বেডের ওপর ছুড়ে মারে।
মেহজা বিস্মিত হয়ে আরভিদের দিকে তাকায়।
— কি হয়েছে? আপনি মোবাইলটা ছুড়ে ফেললেন কেন?
আরভিদ গম্ভীর কণ্ঠে বলে,

— তুই ভয় পাস এসব দেখে! তাই ফেলে দিয়েছি! কোনো দরকার নেই এসব ভিডিও দেখার।
মেহজা মুখটা ফ্যাকাশে করে বলে,
— আমি দেখেই ভয়ে পাচ্ছি আর যার সাথে হয়েছে সে যে কি কষ্ট টাই না পেয়েছে!
আরভিদ গম্ভীর গলায় বলে,
— এসব ভেবে শুধু শুধু নিজেকে কষ্ট দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই!
মেহজা ভ্রু কুচকে বলে,
— তাহলে কি চুপ থাকবো? আর পুরুষরা আরো সাহস পেয়ে মেয়েদের খেলনার মতো ব্যবহার করবে?
আরভিদ কঠিন স্বরে বলে,
— একজন দুজন মিলে দেশ বদলাতে পারবে না মেহু! এই দেশ এমনই থাকবে! অকারণে প্রতিবাদ করে গলা ফাটানোর প্রয়োজন নেই! কেবলই নিজের ক্ষতি হবে।
মেহজা ক্ষোভভরা কন্ঠে বলে,

— ঠিকই বলেছেন, চিল্লালে কিছু হবে না। যদি না দেশের আইন ঠিক থাকে! যেখানে আইনই ঠিক নেই, সেখানে অপরাধী ভয় পাবে কেন? এই দেশে ধর্ষণের বিচার হলে তো ধর্ষণ রোধ হতো! এই দেশে ধর্ষক ঠিকই নিঃশ্বাস নেয়। অথচ ধর্ষিতার জন্য অক্সিজেন শেষ হয়ে যায়! প্রতিটা ধর্ষণের জন্য প্রশাসন দায়ী! এই যে দেখেন, আপনি যেমন বলছেন শুধু শুধু! আপনারা বুঝবেন কিভাবে একজন ধর্ষিতা নারীর কষ্ট?
মেহজার এই রাগী, ক্ষোভভরা কণ্ঠ শুনে আরভিদ থতমত খেয়ে যায়। বুঝতে পারে, তার এসব বলা ঠিক হয়নি। সে হালকা নরম হয়ে মেহজার গালে হাত রেখে বলে,

— আমি এভাবে বলতে চাইনি! আসলে তোকে ভয় পেতে দেখে কি থেকে কি বলে ফেলেছি, নিজেই জানি না। আচ্ছা, তুই যদি রাগ করে থাকিস, তাহলে এই যে…..
বলেই আরভিদ নিজের কানে ধরে বলে,
— আমি কানে ধরছি! সরি! এখন রাগ একটু কমা?
মেহজা আরভিদের কান ধরে দেখে হালকা হাসে আনমনে।
— এবারের জন্য মাফ করলাম! আমার সাথে আর কখনো এমনভাবে কথা বলবেন না! আমার ভালো লাগে না।
আরভিদ কান ছেড়ে মেহজার মুখোমুখি বসে বলে,
— আমি তো তোর সাথে এভাবে কথা বলি না কখনো। আজকে একটু কি যেন হয়ে গেছিলো!
মেহজা আরভিদের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে হালকা হাসি দিয়ে বলে,
— আচ্ছা, বুঝেছি!
আরভিদ মেহজার মাথায় হাত বুলিয়ে উঠে আয়নার সামনে গিয়ে রেডি হয়ে নেয়। আরভিদের রেডি হওয়ার মাঝেই দরজায় নক হয়। আরভিদ একবার দরজার দিকে তাকিয়ে, তারপর মেহজার দিকে।
মেহজা দরজা খোলার জন্য গিয়ে দেখে ফারাবী আর তাফসির দাঁড়িয়ে। ফারাবীর চেহারা চিন্তায় ভরা, বিচলিত। সে বলে,

— স্যার কোথায় ম্যাম? জরুরি দরকার।
মেহজা ফারাবীর এমন অস্থিরতা দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে ভাইয়া? আপনি এমন হয়ে কথা বলছেন কেন?
ফারাবী কিছু বলার চেষ্টা করলে, তখনি সেখানে আরভিদ এসে ফারাবীর দিকে চোখ রাঙিয়ে বলে,
— ওর সমস্যাই এটা! হুদাই অস্থির হয়ে যায়।
আরভিদের চোখ রাঙানো দেখে ফারাবী শান্ত হয়ে যায়। তারপর মাথা চুলকে হাসার চেষ্টা করে মেহজাকে বলে,
— ম্যাম, আসলে সিঁড়ি দিয়ে জলদি উঠে এসেছি, তাই হাপানি হয়ে গেছে!
মেহজা হালকা করে বলে,

— ওহ।
ফারাবী এবার আরভিদের দিকে তাকিয়ে বলে,
— স্যার, একটু কথা ছিলো…
আরভিদ গম্ভীর গলায় বলে,
— আসছি আমি! ড্রাইভারকে বলো গাড়ি বের করতে।
ফারাবী আর তাফসির চলে যায়। আরভিদ রেডি হয়ে মেহজাকে আদর করে রুম থেকে বের হয়ে মিশানের রুমের কাছে যায়। দরজা নক করতেই মিশান দরজা খুলে বলে,
— জিজু তুমি? কখন এসেছো তোমরা?
আরভিদ বলে,
— সকালেই এসেছি! আচ্ছা, শুনো মিশান, তুমি একটু তোমার বোনের সাথে বসে কথা বলো তো।
মিশান জিজ্ঞেস করে,

— কিছু হয়েছে?
আরভিদ বলে,
— না, এমনিতে কিছু হয়নি! একা একা বোর ফিল করবে তাই বলেছিলাম।
মিশান হেসে বলে,
— আচ্ছা, যাচ্ছি।
আরভিদ নিচে চলে আসে। নিচে আসতেই দেখে ফারাবী আভীর কারদারের সঙ্গে কথা বলছে। আরভিদ ফারাবীকে প্রশ্ন করে,
— কী হলো? গাড়ি বের করেছে ড্রাইভার?
ফারাবী আরভিদকে দেখে মাথা নেড়ে উত্তর দেয়,
— জি স্যার, বের করেছে!
আরভিদ বলে,
— তাহলে দাঁড়িয়ে আছো কেমন বলদের মতো?
বলেই আরভিদ এগিয়ে আভীর কারদারের পাশে
দিয়ে যেতে চাইলে আভীর কারদার বলেন,
— কী করেছে ওরা? ফারাবী থেকে কিছু শুনলাম।
আরভিদ থেমে দাড়িয়ে রাগে দাঁত পিষে বলে,
— আমি জানব কিভাবে শুয়োরের বাচ্চাগুলো কি করেছে! সেটার জন্যই তো যাচ্ছি!
আভীর কারদার মাথা নেড়ে বলে,

— কিছু বলার দরকার নেই ওদের। থাকুক। ছেলে মানুষ প্রয়োজন…
আরভিদ আর বলতে দেয় না। আরও রাগে ফুঁসে উঠে,
— সব কয়টাকে লাথি মেরে বের করবো যদি কোনো ঝামেলায় জড়ায়! শুয়োরের বাচ্চাগুলো দুইদিন পর পর মেয়ের ঝামেলায় জড়ায়! এবার জেল খেটে বের হোক! একবার ঢুকলে মজা বুঝবে! বার বার বাঁচিয়ে নেই, তাই শরীরে তেল জমে গেছে শুয়োরের বাচ্চাগুলোর!
বলেই আরভিদ গটগট পায়ে চলে যায়। আভীর কারদার কপালে ভাজ ফেলে ফারাবীকে বলে,
— এই ছেলের তো ধৈর্য কম, রাগ বেশি। সত্যিই মারবে ধরে। সামলে নিও নয়ত মেরে ফেলবে!
ফারাবী মাথা নেড়ে বলে,

— ঠিক আছে স্যার।
ফারাবী দ্রুত বাইরে এসে দেখে আরভিদ গাড়িতে বসে আছে। ফারাবী গিয়ে দরজা খুলে আরভিদের পাশে বসে। তাসফিরও সেখানে আছে। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেয়। ঘন্টা দুয়েক পরে গাড়ি বংশী নদীর কারখানার সামনে থামে। তিনটি গাড়ি। প্রথম ও শেষ গাড়ি থেকে ১০-১২ জন গার্ড বের হয়। মাঝের গাড়ি থেকে ফারাবী দ্রুত বের হয়ে আরভিদের জন্য বিপরীত দিকের দরজা খুলে দেয়। আরভিদ গাড়ি থেকে নামে এবং হেটে কারখানার দিকে এগোয়।
কারখানার দাড়োয়ান সালাম দেয় আরভিদকে। আরভিদ জবাব না দিয়ে ভেতরে ঢুকে যায়। বডিগার্ডরা বাহিরেই দাঁড়িয়ে থাকে।
কারখানার ভিতরে বিভিন্ন বস্তা রাখা। আরভিদ বড় বড় পা ফেলে নির্দিষ্ট বিশ্রাম রুমের দিকে চলে যায়। রুমে এসে দেখে সবাই মোবাইলে হাসছে। আরভিদকে দেখে সবাই সাথে সাথে দাঁড়িয়ে যায়। রাব্বি দ্রুত চেয়ার এনে দেয় আরভিদকে, বসানোর জন্য। আরভিদ চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসে। সবাই পেছনে দুই হাত নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তানভীর ইশারায় ফারাবীকে জিজ্ঞেস করে, আরভিদকে কিছু বলা হয়েছে কি না। ফারাবী মাথা নেড়ে না বোঝায়।
আরভিদ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে,

— কী সমস্যা হয়েছে?
সবাই মিজানকে বলার জন্য ইশারা করে। মিজান সাহস সঞ্চয় করে বলে,
— ভাই, দুইদিন আগে একটা মেয়ে বোর্ড থেকে মাল নামানোর সময় দেখে ফেলে। তারপর মেয়েটাকে আমরা ধরে কারখানায় বন্দি করে রাখি।
মিজান থামে। আরভিদ দৃঢ় গলায় বলে,
— তারপর কী হয়েছে? নিউজে যেটা দেখলাম?
মিজান আবার বলে,
— গত পরশু সবাই মদ খেয়ে কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলি! করে ফেলি কাজটা।
এই কথা শোনা মাত্রই আরভিদের মাথায় আগুন ধরে যায়। রাগে ফুঁসে ওঠে। উঠে দাঁড়িয়ে মিজানকে লাথি মারে। মিজান পড়ে যায়, কিন্তু আরভিদ থামে না। বেধোর লাথি মারতে থাকে মিজানকে।

— শুয়োরের বাচ্চা এতো কারেন্ট কেন শরীরে? এতই যদি কারেন্ট থাকে, তাহলে হোটেলে যেতে পারিস না। টাকা কম দেই? মেয়েকে জোর করে এনে রেপ করতে হবে?
সবাই আরভিদের মিজানকে এমনভাবে মারতে দেখে ভয় পেয়ে যায়। তারা কখনও ভাবেনি যে আরভিদ মারবে। তারা ভেবেছিল আগের কেসগুলো যেমন আরভিদ চাপা দিয়েছিল, এটাও চাপা দিয়ে দিবে। কিন্তু তারা বুঝতে পারছে না এবার আরভিদ এত রেগে গেলো কেন। এর আগে তো আরভিদ তাদের এমন কাজে মারেনি। হ্যা, গতবার মানা করেছিল যেন আর এমন ঝামেলায় না জড়ায়। হোটেলে যেতে বলেছিল, প্রয়োজনে টাকা বেশি লাগলে লাগুক।
সবাই ভয়ে হাত-পা কাপছে, এমনকি ফারাবীরও। সে আরভিদকে বাধা দিতে পারছে না। আরভিদ রাগে রক্তিম বর্ণ হয়ে গেছে। ফারাবী চোখের ইশারায় তাসফিরকে যেতে বলে আরভিদকে থামাতে। তাসফিরও ভয়ে কাপছে। সে মাথা নেড়ে না বোঝায়।

ফারাবী চোখের ইশারায় বোঝায় চাকরি খেয়ে দিয়ে। বাধ্য হয়ে তাসফির ভয়ে আরভিদের কাছে যেতে নিলে, হঠাৎ আরভিদ লাথি মারা থামিয়ে তাসফিরের দিকে তাকায়। তাসফির থম মেরে দাঁড়িয়ে চোখ বড় করে ফেলে। মাথা না নেড়ে বোঝায়।
আরভিদ চোখ সরিয়ে নিজেকে শান্ত করতে শ্বাস নেয়। তারপর ঘুরে বাকিদের দিকে তাকায়। সবাই ভয়ে কাপছে। অবশেষে আরভিদ আবার চেয়ারে বসে।
রাব্বি ভয়ে ভয়ে বলে,
— ভাই, আমি আপনাকে সেদিন মেয়েটার ব্যাপারে বলতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা আমাকে বলতে দেয়নি।
তানভীর সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,
— ভাই, ও এখন ভালো সাজতেছে! সেদিন কিন্তু রাব্বিও আমাদের সঙ্গে মিলে মেয়েটারে রেপ করছে।
রাব্বি উত্তেজিত হয়ে বলে,
— সেটা তো তোরা করছিস দেখে আমিও করেছি!
আরভিদ দাঁতে দাঁত চেপে রাব্বির দিকে তাকিয়ে বলে,
— পদ্মা সেতুর পিলারের দাম অনেক, নইলে তোর পাছা দিয়ে একটা ঢুকিয়ে দিতাম, শুয়োরের বাচ্চা!
তানভীর ভয়ে ভয়ে মিনমিনিয়ে বলে,
— ভাই, এবারের মতো মাফ করে দেন।
আরভিদ গর্জে ওঠে,

— এবার বাঁচাবো না, শুয়োরের বাচ্চা! জেলে পচে মর! মাত্র তিন মাস আগে এক কেস ধামাচাপা দিলাম, এর মধ্যেই আবার এটা! এখন না আবার পুরাতন কেসটা ওপরে উঠে যায়!
বলেই আরভিদ গভীর গভীর শ্বাস নিতে থাকে। সে রীতিমতো ফুঁসছে। তার রাগ কিছুতেই কমছে না।
এই সুযোগে ফারাবী একটু সাহস সঞ্চয় করে বলে,
— স্যার, এখন কী করবো?
আরভিদ ঠাণ্ডা কিন্তু ভয়ংকর গলায় বলে,
— শুয়োরের বাচ্চাগুলোর মেইন পয়েন্ট কেটে দাও। তাহলেই সব কারেন্ট বের হয়ে যাবে।
সবাই একসঙ্গে আতঙ্কিত হয়ে বলে ওঠে,
— না না না ভাই! এইবারের মতো মাফ করে দেন। আর জীবনে কখনো এই পথে যাবো না।
আরভিদ ওদের দিকে একবার তাকিয়ে তারপর ফারাবীকে বলে,
— আইজিপিকে কল লাগাও।
ফারাবী বলে,

— জ্বি স্যার, এক্ষুনি লাগাচ্ছি।
ফারাবী আইজিপিকে কল লাগিয়ে ফোনটা আরভিদের হাতে দেয়। আরভিদ ফোনটা ধরে। ওপাশ থেকে আইজিপি সালাম দেয়। আরভিদ সালামের জবাব দিয়ে বলে,
— রেপ কেসটা আছে না?
— জি স্যার।
— সেটার তদন্ত বন্ধ করে দাও। কেসটাকে ঘুরিয়ে ফেলো। বলো পোস্টমর্টেম করে জানা গেছে এটা আত্মহত্যা। এটা কোনো রেপ কেস না।
আইজিপি একটু থেমে বলে,
— কিন্তু স্যার, ইতিমধ্যেই পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাবলিক করা হয়েছে। মেয়েটার উপর ৬-৭ জনের ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। এখন কিভাবে বলবো এটা রেপ কেস না, সুইসাইড কেস?
আরভিদ চোখ রাঙিয়ে একবার তার দলের ছেলেগুলোর দিকে তাকায়। তারপর কঠোর গলায় বলে,
— দরকার পড়লে রিপোর্ট চেঞ্জ করে ফেলো। ডাক্তারের ওপর দোষ চাপিয়ে মেটারটা ক্লোজ করো।
আমি শুধু এতটুকু কনফার্ম হতে চাই, কেসটা ডিসমিস হচ্ছে।

— ঠিক আছে স্যার।
— রাখছি।
আরভিদ কল কেটে ফোনটা ফারাবীর হাতে দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তারপর ফারাবীকে বলে,
— দ্রুত সব প্ল্যাটফর্ম থেকে লিক হওয়া সিসিটিভি ফুটেজটা ডিলিট করো।
ফারাবী মাথা নেড়ে বলে,
— ঠিক আছে স্যার।
এরপর আরভিদ মাটিতে পড়ে থাকা মিজানের দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলে,
— জানে মেরে ফেলবো যদি এর কারণে পুরাতন কেসটা ওপরে ওঠে। সব কয়টা ভালো করে শুনে রাখ।
বলেই আরভিদ গটগট পায়ে হেটে চলে যায়। কারখানার মেইন দরজার সামনে আসতেই চোখে পড়ে—সামনের জায়গায় মানুষে ভরে গেছে। সবাই গ্রামের মানুষ। হয়ত এলাকায় মন্ত্রী এসেছে, তাই দেখতে এসেছে। বডিগার্ডরা যেন বেলিগেটের মতো দাঁড়িয়ে আছে, কেউ ভেতরে ঢুকতে পারছে না। কারখানার বড় গেইট আর সামনে পুরো এলাকা মানুষে ঠাসা। আরভিদ বিরক্ত হয়। মনে মনে ইচ্ছে করে, এই গ্রামের মানুষগুলোকে লাথি মেরে সরিয়ে দিতে। বডিগার্ডরা এসে ঘিরে ফেলে আরভিদকে, যেন কেউও কাছে যেতে না পারে। সবাই ঠেলাঠেলি করছে আরভিদের কাছে আসার জন্য। আরভিদের কিছু বলতেও পারছে না। নয়ত, আরভিদের রাগ এতোটুকু বেড়ে গেছে, এতোক্ষণে সবগুলো মারা শুরু করে দিতো। আরভিদ সামনে হেটে যেতে থাকে।
হঠাৎ সামনে একজন বয়স্ক লোক কন্ঠ আরভিদের কানে আসে,

— বাবা, কী উন্নয়ন করলা দেশের! একজনের ভোট আরেকজন দিয়ে দেয়! এটা কি উন্নয়ন?
আরভিদ হেটে এগোচ্ছিল, কিন্তু লোকটার কথা শুনে থেমে দাঁড়িয়ে পাশে তাকায়। বিরক্ত আর রাগ থাকলেও শান্ত কণ্ঠে বলে,
— যে দেশে এনগেজমেন্টের আংটি জামাইকে না দিয়ে মুরুব্বিরা পরিয়ে দেয়, সেই দেশে একজনের ভোট অন্যজন দিলে সেখানে আমি দোষের কিছু দেখছি না, চাচা!
কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠে। মুরুব্বি হতভম্ব হয়ে যায়। আরভিদ দাঁড়িয়ে না থেকে সামনে এগিয়ে যায়। গাড়ির কাছে আসতেই একদল মিডিয়া এসে আরভিদের ধরে। হাজারো প্রশ্ন ছুড়ে। মিডিয়ার কমতি নেই। আজ যেন সবাই মিলে আরভিদের ধৈর্য পরীক্ষা নিচ্ছে। সাংবাদিকরা একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
— স্যার, আজকের সকালের ধর্ষণ ঘটনাটা নিয়ে কি মতামত পোষণ করছেন? এবার কি অপরাধী শাস্তি পাবে? নাকি এবারও ধর্ষক বেচে যাবে?
সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতে করতে থাকে। ফারাবী আর বডিগার্ড দ্রুত এগিয়ে সাংবাদিকদের সরিয়ে আরভিদকে গাড়িতে বসায়।
ফারাবী মিডিয়ার সামনে বলতে শুরু করে,

— শুনুন স্যার, এই ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আজ সকালেই স্যার হানিমুন সেরে ঢাকা এসেছেন খাগড়াছড়ি থেকে। স্যার দুইদিন ধরে খাগড়াছড়িতে হানিমুনে ছিলেন বউয়ের সাথে।
আরভিদ গাড়িতে দাঁত চেপে বসে শুনতে থাকে ফারাবীর কথা। চেহারা শান্ত, কিন্তু ভেতরে দাবানলের মতো আগুন জ্বলছে। তাফসির লুকিং গ্লাসে আরভিদকে দেখছে, ভয়ে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। সে বুঝে গেছে—আরভিদ শান্ত হলেও ভেতরে রাগ জমে আছে, যা পরে ফারাবীর ওপর ছড়াবে। ফারাবী মিডিয়ার প্রশ্নের উত্তর শেষ করে গাড়িতে এসে বসে।
আরভিদ গম্ভীর হয়ে বসে আছে দেখে ফারাবী দাঁত বের করে হেসে বলে,

— সব সামলে নিয়েছি, স্যার।
আরভিদ গম্ভীর গলায় বলে,
— ধন্যবাদ তোমাকে! তবে শুধু ধন্যবাদই দিবো না, এটার জন্য পুরষ্কার আছে।
ফারাবী মাথা চুলকে বলে,
— কী যেন বলেন, স্যার। এটা আমার দায়িত্ব, তবে আপনি চাইলে উপহার দেব, আমি অবশ্যই নেব।
আরভিদ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
— তা তো তোমাকে নিতেই হবে।
বলেই আরভিদ ড্রাইভারকে বলে,
— সামনে দাঁড় করিও গাড়ি।
ফারাবী অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,
— সামনে কেন, স্যার?
— পুরষ্কার দিব!
— এখানে কিভাবে পুরষ্কার!
আরভিদ কিছু বলে না। ড্রাইভার গাড়ি থামায়।
আরভিদ ফারাবীকে বলে,
— নামো।
ফারাবী আরভিদের কথামতো নামে। তাফসির উঠে আরভিদের দরজা খুলে দেয়। আরভিদ নেমে নদীর ধারে গিয়ে বলে,

— দেখো তো ফারাবী, ঐ জায়গাটা সুন্দর না?
ফারাবী এগিয়ে আসে, দেখার জন্য,
— কোন জায়গাটা, স্যার?
ফারাবী আসতেই আরভিদ খপ করে ধরে ফেলে ফারাবীর ঘাড়। তারপর ফারাবীকে চেপে বসিয়ে নিজেও নদীর পানিতে বসে ফারাবীর মুখ ধরে রাখে। ফারাবীর হাত দিয়ে ফটফট করতে করতে বলছে,
— উমমম… উমমম!
আরভিদ ১৫-৩০ সেকেন্ড পর ফারাবীকে তুলে দেয়। ফারাবী পানি খেয়ে বমি করছে। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। আরভিদ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,
— এই নাও, পুরষ্কার! আর লাগবে?
ফারাবী কাঁপতে কাঁপতে বলে,
— না, না স্যার। কিন্তু আমি যা করেছি, তা কি?
তাফসির বলে,
— মিডিয়ার কাছে যা বলেছেন, সেটা কি কম? স্যারের ইজ্জতের দফারফা করেছেন!
ফারাবী হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
— আমি তো স্যারের ভালো করলাম।
আরভিদ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— তোমাকে বলেছিলাম, আমার হানিমুন পুরো রাষ্ট্রে ব্লাস্ট করতে।
ফারাবী বলে,

— স্যার, এটা হচ্ছে পলিটিক্স! এখন ঐ রেপ কেস চাপা পড়বে আপনার হানিমুনের নিচে।
আরভিদ বলে,
— তাফসির, আমার বন্ধুকটা দাও তো। একে মেরে আরেকটা পলিটিক্স দেখাই।
তাফসির মাথা নেড়ে বলে,
— জি, স্যার।
বলেই গাড়ি থেকে বন্দুক আনতে যায়। ফারাবী দ্রুত বলে,
— না, না স্যার। আর পলিটিক্স দেখতে চাই না। আমাকে মাফ করে দিন। আমি আর পলিটিক্স দেখাবো না।
আরভিদ বিরক্ত মুখে তাকিয়ে থাকে। তারপর আবার গাড়িতে বসে। সঙ্গে তাফসির আর ফারাবীও বসে।

একটা আলিশান এপার্টমেন্ট। বিশাল বিল্ডিং-এর ১১ নাম্বার ফ্লোরে। এই এপার্টমেন্টটি আদ্রিকের দাদার দেওয়া—জন্মদিনে তিনি আদ্রিককে গিফট করেছিলেন। এপার্টমেন্টটি গুছানো ও পরিষ্কার। আদ্রিক নিয়মিত আসা-যাওয়া এখানে। আদ্রিক দুই সিটের সোফায় এলিয়ে বসে সিগারেট খাচ্ছে, সামনে দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
সামনের ছেলেটা বিরতিহীনভাবে বলছে,
— আমরা হোস্টেলের সামনের চায়ের দোকানটায় বসে ছিলাম। ভেবেছিলাম মেয়েটা বুঝতে পারবে না। কিন্তু মেয়েটা হঠাৎ হোস্টেল থেকে বের হয়ে বুঝে ফেলল, আমরা ফলো করছি তাকে!
বলে থেমে যায়। আদ্রিক এখনও শান্ত। হঠাৎ সে উঠে দাঁড়ায়। ছেলেটার সামনে গিয়ে সিগারেটে টান দিয়ে বলে,
— কতদিন ধরে আছো?
ছেলে পাশে থাকা সৌরভের দিকে একবার তাকিয়ে তারপর আবার আদ্রিকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কোথায় বস?
আদ্রিক ছেলেটার গালে জোরে থাপ্পড় মেরে বলে,

— এই ধারণায় যে, তুমি বিশাল চালাক!
ছেলেটা তাল সামলাতে না পেরে সরে গিয়ে পড়ে। মাটিতে পড়ে থেকেই নিজেকে সামলে উঠে বলে,
— সরি বস। আর হবে না।
আদ্রিক ঠান্ডা চোখে একবার ছেলেটার দিকে তাকায়, তারপর চোখ ঘুরিয়ে বলে,
— গেট লস্ট!
ছেলেটা দ্বিধায় পড়ে। তার চলে যাওয়া উচিত নাকি আবার আদ্রিকের কাছে আবার ক্ষমা চাওয়া উচিত। সে সৌরভের দিকে তাকায়। সৌরভ চোখের ইশারায় তাকে যেতে বলে। ছেলেটা উঠে চলে যায়।
আদ্রিক পকেটে হাত ঢুকিয়ে সৌরভের দিকে তাকিয়ে বলে,
— তুমি কতটুকু ইনফরমেশন পেলে কলেজ থেকে?
সৌরভ বলে,
— কলেজের ইনফরমেশনে মা-বাবার নাম নেই। শুধু একটা আশ্রমের এড্রেস দেওয়া আছে।
আদ্রিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,

— কোন আশ্রম!
— চন্দ্রিমা আশ্রম।
— গিয়েছিলে সেখানে?
— জ্বি বস।
— কি জানতে পেরেছো সেখান থেকে?
— হানিন মেয়েটা এতিম। নামের আগে-পিছে কিছু নেই, যেমন লাইফে আগে-পিছে কেউ নেই। হানিন যখন তিন দিন বয়সী, আশ্রমের মাদার তাকে রাস্তায় পায়। এরপর তিনিই হানিনকে এতিমখানায় নিয়ে আসেন এবং সেখানেই বড় হয় হানিন।
আদ্রিক হেসে ফেলে। তা দেখে সৌরভ একটু অবাক হয়, হাসির কারণ বুঝতে পারে না। তাই জিজ্ঞেস করে,
— বস, হাসছেন?
আদ্রিক মাথা উপরে-নিচ করে হ্যাঁ বোঝায়, তারপর হেসে বলে,
— তোমার কি মনে হয়? ও আমার সঙ্গে কোনো রকম ব্যাকআপ ছাড়ায় সরাসরি শত্রুতায় লেগে পড়েছে? আর এতো সহজে আমাকে ওর আসল পরিচয় জানাবে?
সৌরভ অবাক হয়ে বলে,

— মানে?
— মানে সবকিছু মিথ্যা! এই ইনফরমেশনগুলো ও নিজেই দিয়েছে। ওর আগে-পিছে কেউ একজন আছে, যে ওকে শেল্টার দিচ্ছে।
— তাহলে কিভাবে ওর আসল পরিচয় জানবো?
— ওর মাধ্যমেই জানবো। জাস্ট এলার্ট থাকো। ও যতই খেলা শিখে আসুক না কেন, ওর প্রতিদ্বন্দ্বী আমি। আমাকে কনফিউজ করা সহজ না, অসম্ভব।
সৌরভ বলে,
— মেয়েটার সাহস আছে, মানতে হবে। আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে এতো নিখুঁত প্ল্যান করেছে। তাহলে তো এটাও জানে আপনি আপনার শত্রুদের সাথে কি করেন।
আদ্রিক প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,
— আরেকটা কাজ যে বলেছিলাম। ওর উপর ভালোভাবে নজর রাখছে তো?
সৌরভ বলে,
— জ্বি বস, কিন্তু কথা হচ্ছে, সে তো কিছু করছে না।
আদ্রিক শান্ত কন্ঠে বলে,
— করবে। যেহেতু খবরটা কানে গেছে, অর্তির ক্ষতি করার চেষ্টা করবেই। নজর যেন না সরে ওর থেকে।
— ওকে বস।
আদ্রিক হেটে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসে। বাইরে এসে লিফট চেপে একদম গ্রাউন্ড ফ্লোরে চলে আসে। তারপর লিফট থেকে নেমে গাড়িতে বসে ড্রাইভ করতে থাকে।

মেহজা, অর্তিহা আর মিশান—তিনজনেই আদ্রিকের রুমে বসে লুডু খেলছে। অর্তিহা খেলাটা বেশ উপভোগ করছে। অনেকদিন পর তার সবসময়কার বিষণ্ন মনটা খেলায় ডুবে গেছে। মনোযোগ দিয়ে লুডু খেলছে, আর মাঝে মাঝেই মেহজার ফাজলামি কথায় হেসে উঠছে। লুডু খেলা মাঝপথেই আটকে আছে। কারোরই জেতার কোনো লক্ষণ নেই। জিতবেই কিভাবে? মেহজার নিজের জেতা নিয়ে কোনো মাথাব্যথাই নেই। সে কখনো মিশানের গুটি, আবার কখনো অর্তিহার গুটি কেটে মজা পাচ্ছে। এবারও তাই হলো।
মিশানের গুটিটা ঠিক তার ঘরের ভেতর ঢুকে যেতে যাচ্ছিল, এমন সময় মেহজা গুটিটা কেটে দেয়। সেটা দেখে মিশান বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে,
— মেহু আপুর মতো শয়তান দুনিয়ায় দুইটা নেই। সে না নিজে জিতে, আর না কাউকে জিততে দেয়!
মেহজা হেসে বলে,
— লুডু খেলায় আমার জেতা নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। আগ্রহ শুধু সবার গুটি কাটতে! কি যে মজা লাগে গুটি কাটতে!
মিশান বলে,

— আচ্ছা সমস্যা নেই। আসো, গুটিটা নিয়ে আমার ঘরের সামনে দিয়ে তোমাকে বুঝাবো কত ধানে কত চাল!
ওদের কথার মাঝেই রুমে ঢুকে আদ্রিক। ঢুকেই দেখে, তার রুমের বেডে বসেই খেলার আসর জমে উঠেছে। আদ্রিক একবার সবার দিকে তাকায়, তারপর তার দৃষ্টি স্থির হয় মেহজার উপর। কারণ মেহজা আদ্রিকের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চোখে অসহ্য ঘৃণা আর চাওয়া—যেন চোখের চাহনিতেই আদ্রিককে মেরে ফেলতে চায়। তবে, আদ্রিকের শান্ত চোখের চাহনিও খুব আলাদা না। তার দৃষ্টিতেও লুকিয়ে আছে বিষাক্ত চাওয়া।
মিশান আদ্রিককে দেখে খেলা থামিয়ে ভদ্রভাবে ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু মেহজা একই জায়গায় বসে থাকে।
আদ্রিক শান্ত কণ্ঠে বলে,
— তোমার থেকে তোমার ছোটটার ম্যানার্স বেশি আছে!
মেহজা ব্যঙ্গ করে বলে,
— আসলে ছোটটা অবুঝ। অযোগ্য মানুষকেও সম্মান দিয়ে দেয়। বড়টা এমন না।
আদ্রিক বিরক্ত হলেও মুখে প্রকাশ করে না। শান্ত গলায় বলে,
— অনেক বলেছো। এখন বের হও রুম থেকে।
মেহজা সঙ্গে সঙ্গে বলে,

— রুমটা কি আপনার একার? এটা অর্তির রুমও। আমি অর্তির কাছে এসেছি।
আদ্রিক কঠিন স্বরে বলে,
— অর্তিটাও আমারই! বের হও!
মেহজা অর্তিহার দিকে তাকিয়ে বলে,
— দেখেছিস অর্তি? তোর সামনে আমার সাথে কিভাবে কথা বলছে?
অর্তিহা মেহজার কথার সুর মিলিয়ে বলে,
— মেহজার সাথে এমনভাবে কথা বলছেন কেন? ও থাকলে সমস্যা কোথায়?
এবার আদ্রিক অর্তিহার দিকে তাকায়। কপালে ভাঁজ পড়ে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— কিস করবো আমি তোকে! ওর সামনেই করবো? সমস্যা হবে না তো?
আদ্রিকের কথায় অর্তিহা আর মেহজা—দুজনেই থতমত খেয়ে যায়। একে অপরের দিকে তাকায়। এমন উত্তর কেউই আশা করেনি।
মেহজা চোখ-মুখ কুঁচকে বলে,

— লজ্জা-শরম যদি কাউকে দেওয়া যেত, তাহলে আপনাকে দিতাম!
আদ্রিক ঠোঁটে অভ্যাসগত হাসি এনে বলে,
— তোমার নিজের কাছে থাকলে তো আমাকে দিতে!
মেহজা ফুঁসে ওঠে,
— রাউডা করলেই দাউডার কাম! তাই কিছু বললাম না।
বলেই মেহজা রুম থেকে বেরিয়ে যায়। মেহজা চলে যেতেই আদ্রিক অর্তিহার দিকে তাকায়। তারপর এক পা এগিয়ে অর্তিহার দিকে আসতে নেয়। সেটা বুঝতে পেরে অর্তিহা দ্রুত বেড থেকে নেমে ঘরের বিপরীত পাশে চলে যায়। কিন্তু এই দিকটায় এসে অর্তিহা ভুলই করে। কারণ এখন উল্টো আদ্রিকের জন্য তাকে ধরা আরও সহজ। আদ্রিক নিজের পথ বদলে অর্তিহার দিকে এগিয়ে যায়। অর্তিহা পিছোতে পিছোতে দেয়ালে ঠেকে যায়।
আদ্রিক একদম কাছে এসে বলে,
— স্বামী ছেড়ে বান্ধবীর পক্ষ নেওয়া হচ্ছিলো?
অর্তিহা মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে উত্তর দেয়,
— উচিত কথা বলছিলাম। আপনি শুধু শুধু মেহুর সাথে ঝগড়া করেন!
— আমার সামনে এত উচিত কথা বলতে ভয় করে না?
— ভয় পাই দেখেই তো সব বলা হয় না!
— কি বলার আছে?
অর্তিহা আদ্রিকের দিকে তাকায়। তার চোখে চোখ রেখে বলে,
— জানেন? আমি কত একা?
আদ্রিক শান্ত কণ্ঠে বলে,
— সো কল্ড বয়ফ্রেন্ড যে নেই যে সাথে! তাই একা লাগে!
অর্তিহা কণ্ঠ শক্ত করে বলে,

— একটা কথা জানেন? কালকে সারাটাদিন আপনাকে নিয়ে ভাবলাম। ভাবলাম আপনাকে কি একটা সুযোগ দেওয়া যায়? ক্ষমা করা যায়? সন্তানের জন্য হলেও! কিন্তু বিশ্বাস করেন, আপনাকে ক্ষমা করে দিতে গেলে আমার ওই সো কল্ড বয়ফ্রেন্ডের মুখটা ভেসে উঠে। ওর রক্তাক্ত কলেজ শার্ট চোখের সামনে চলে আসে!
আদ্রিক ঠান্ডা কণ্ঠে বলে,
— ক্ষমা চেয়েছি আমি? আমি তো একটুও অনুতপ্ত না!
আদ্রিকের কথা শুনে অর্তিহা অবাক হয়ে যায়। চোখ ভরে আসে।
— একটুও না?
আদ্রিক অর্তিহার কাছ থেকে সরে হেঁটে বেডের দিকে যেতে যেতে বলে,
— না। হি ডিজার্ভ ইট!
অর্তিহা ঘৃণায় কেঁপে ওঠে। রাগ আর কান্না মিলিয়ে বলে,
— আপনি শুধু ঘৃণার যোগ্য!
আদ্রিক ঘাড় ঘুরিয়ে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলে,
— ভালোবাসার যোগ্য যখন ছিলাম, তখন ভালোবেসেছিলি? তাই আমি খারাপ হওয়াতে যদি ঘৃণা আসে, তাতে আই ডোন্ট কেয়ার!
অর্তিহা এবার পুরোপুরি কেঁদে ওঠে,

— আপনি আসলেই একটা অমানুষ! আপনি নিজে অভিশপ্ত, সাথে আমার জীবনটাকেও অভিশপ্ত বানিয়ে ফেলেছেন!
অর্তিহার কথা শুনে আদ্রিক হেসে ওঠে। যেন অর্তিহা কোনো মজার কথা বলেছে। আদ্রিকের এই হাসি দেখে অর্তিহা আবারও অবাক হয়।
— আমার চোখের জলে আপনি হাসেন?
আদ্রিক বেডে বসে ঠান্ডা গলায় বলে,

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৪

— যে চোখের জল আমার জন্য না, সেই চোখ দিয়ে যদি রক্তও বের হয়, তাতেও আমার কিছু যায় আসে না।
আদ্রিকের কথা শুনে অর্তিহা থমকে যায়। সে ভেবেছিল, হয়তো তার কান্না দেখে আদ্রিক একটু নরম হবে। কিন্তু না—আদ্রিক হাসছে। এই লোকটা সত্যিই পাষাণ। আর তার পাষণ্ডতা সবার জন্যই এক। কারোর কষ্টই তাকে গলাতে পারে না। অর্তিহার মনে হয়, তার জীবনটা এমন অভিশপ্ত হলো কেন? এই বাড়িতে জন্ম নিয়েই কি সে অভিশপ্ত হয়েছে? যদি এই বাড়িতে জন্ম না নিতো তাহলে তো আদ্রিকের সাথে তার দেখা হতো না। তার জীবনটাও হয়তো এমন হয়ে উঠত না।

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৫ (২)