Home মোহশৃঙ্খল মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৪

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৪

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৪
মাহা আয়মাত

ব্রেকফাস্ট টেবিলে অনেক রকম খাবার সাজানো ছিল। আয়োজন বড় হলেও টেবিলে বসে ছিল মাত্র তিনজন—সারফারাজ, অঞ্জনা আর সায়র। শায়রা আর সাইহান তারা দুজনের কেউই সেখানে ছিল না। তিন দিন ধরে তারা কেউই ব্রেকফাস্ট টেবিলে আসছে না। এমনকি রুম থেকেও বের হচ্ছে না। গতকাল রাতে অঞ্জনা রহমান সাইহানকে জোর করে বহু কষ্টে অল্প একটু খাইয়ে দিয়েছেন। কিন্তু শায়রা এই তিন দিনে একবারও দরজা খোলেনি। কারোর ডাকে সাড়াও দেয়নি, কিছু খায়ওনি। সায়র টেবিলে বসে খেতে খেতে মোবাইলে চ্যাট করছে।
সেটা দেখে সারফারাজ বিরক্ত হয়ে বলেন,

— সারাদিন কার সাথে এত চ্যাট করো? আবার কি ভাইয়ের মতো কোনো শত্রুর মেয়ের পেছনে পড়েছ?
বাবার রাগি কণ্ঠ শুনে সায়র ভয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফোনের স্ক্রিন অফ করে টেবিলের ওপর রেখে দেয় এবং খাওয়ায় মন দেয়।
এরপর সারফারাজ অঞ্জনার দিকে তাকিয়ে বলেন,
— তুমি খাচ্ছো না কেন?
অঞ্জনা শান্ত গলায় বলেন,
— এখন খেতে ইচ্ছে করছে না।
সারফারাজ বিরক্ত হয়ে বলেন,
— তোমার আর তোমার ছেলে-মেয়েদের কী হয়েছে বলো তো? কারোরই খেতে মন চায় না কেন? আমি কি একটুও শান্তি পাবো না?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

অঞ্জনা আর কিছু বলেন না। তিনি কোনো কথা বাড়াতে চান না তাই চুপচাপ খেতে বসে পড়েন। এই তিন দিনে বাড়িটা একেবারে নিরব হয়ে গেছে। এতোটাই নীরবতা, যা মৃত বাড়িতেও থাকে না। নিজের ছেলের কষ্ট আর কান্না তিনি যেমন সহ্য করতে পারছেন না, তেমনি শায়রার এই তিন দিন ধরে রুমবন্দি থাকাটা ওনাকে আরও বেশি ভেঙে দিচ্ছে।
অঞ্জনা রহমান প্লেটে ব্রেড নিতে যাবেন, তখনি কারোর হিল পড়ে হেঁটে আসার আওয়াজ শোনা যায়। সবাই একসাথে সেই দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে। ডাইনিং রুমে আসছে শায়রা। পরনে কালো শার্ট আর ফর্মাল প্যান্ট, চুলগুলো সুন্দর করে কার্ল করা। গত তিনের তুলনায় অনেকটাই ফিটফাট লাগছে। দেখে মনে হচ্ছে সে যেন আগের শায়রা।
শায়রাকে দেখে অঞ্জনা রহমান দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে যান। কাছে এসে ডান হাতে শায়রার বাম হাতের বাহু ধরে, বাম হাতে শায়রার গাল ছুঁয়ে আবেগভরা কণ্ঠে বলেন,

— তুমি এসেছো? এতদিন পর আজ তোমাকে দেখলাম! না খেয়ে তোমার চোখ-মুখ একদম শুকিয়ে গেছে!
কথা বলতে বলতে অঞ্জনা রহমানের চোখ ভিজে যায়। শায়রা শান্ত গলায় বলে,
— আমি ঠিক আছি মা।
অঞ্জনা বলেন,
— একদম ঠিক নেই তুমি। এসো, তাড়াতাড়ি খেতে বসো।
এই বলে শায়রার হাত ধরতে এগোতেই শায়রা আলতো করে থামিয়ে দেয়। অবাক চোখে মেয়ের দিকে তাকান অঞ্জনা রহমান। শায়রা মায়ের গালে হাত রেখে স্বাভাবিক গলায় বলে,

— খাবো মা। আমাকে নিয়ে অস্থির হয়ো না। শান্ত হও।
অঞ্জনা রহমান আর নিজেকে সামলাতে পারেন না। কেঁদে বলেন,
— সন্তানের কষ্ট দেখে কোন মা শান্ত থাকতে পারে? সন্তানের কষ্ট মায়ের বুকে লাগে। বুকটা অস্থির হয়ে যায়। কোনো মা সন্তানের কষ্ট সহ্য করতে পারে না।
শায়রা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অঞ্জনা রহমানের ভেজা মুছে বলে,
— তোমার মেয়ে দুর্বল না মা। আমি এখন ঠিক আছি।
অঞ্জনা রহমান হালকা হেসে বলেন,
— আজ তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। ভেঙে পড়া চেহারাটা আজ ভরে ওঠেছে। যে মেয়ে সবসময় গুছানো থাকে, তাকে এলোমেলো মানায় না।
শায়রা চুপ করে থাকে। তখন সায়র বলে,

— এখন দুজনেই খেতে এসো।
অঞ্জনা রহমান মাথা নেড়ে সম্মতি দেন। এরপর শায়রাকে নিয়ে চেয়ারে বসান এবং প্লেটে অনেকগুলো খাবার তুলে নেন। আজ তিনি নিজের হাতে মেয়েকে খাওয়াবেন। কতদিন ধরে মেয়েটা ঠিক করে খায় না।
এত খাবার দেখে শায়রা বলে ওঠে,
— মা, এতগুলো খাবার! এতগুলো…
কথা শেষ করতে পারে না। অঞ্জনা রহমান থামিয়ে দিয়ে বলেন,
— আজ তুমি কিছু বলবে না। মা খাইয়ে দেবে। চুপচাপ খাবে। আমি বেশি খাবার নিইনি।
সায়র হেসে শায়রার হাতে আলতো চাপ দিয়ে বলে,
— খেয়ে নে। না হলে আজ মা শান্তি পাবে না।
শায়রা আর কিছু বলে না। অঞ্জনা রহমান আদর করে নিজের হাতে মেয়েকে খাইয়ে দিতে থাকেন। এদিকে সারফারাজ গম্ভীর চোখে সবকিছু দেখছিলেন। মেয়েকে এমনভাবে দেখে ওনার মনটাও বেশ খুশি হয়। খেতে খেতে বলেন,

— ভালো লাগছে দেখে যে তুমি ওই ছেলেটাকে ভুলে সামনে এগোচ্ছ।
শায়রা সারফারাজের দিকে না তাকিয়েই খেতে খেতে বলে,
— কে বলেছে আমি আদ্রিককে ভুলে যাবো? আমি ওর দ্বিতীয় বউ হবো!
শুনে সারফারাজ হঠাৎ খাওয়া থামিয়ে দেন। শুধু সারফারাজই না, অঞ্জনা রহমানের হাতও থেমে যায় প্লেটের ওপর। আড়চোখে একবার দেখে নেন স্বামীকে। সায়র খাওয়া বন্ধ করে ভ্রু কুঁচকে শায়রার দিকে তাকিয়ে থাকে।
সারফারাজ থমথমে গলায় বলেন,

— মাথা খারাপ হয়ে গেছে? পাগল টাগল হয়ে যাওনি তো?
এবার শায়রা বাবার দিকে তাকায়। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— এমনভাবে রিয়েক্ট করছো যেন দ্বিতীয় বউ জিনিসটা আমার দ্বারাই আবিষ্কার হবে প্রথম!
সারফারাজ দাঁত চেপে বলেন,
— বাড়াবাড়ি করছো ভাইয়ের মতো!
শায়রা রাগে চোখ বড় করে চেঁচিয়ে ওঠে,
— শেট আপ বাবা! তোমার কাপুরুষ ছেলের তুলনা আমার সাথে করবে না! আমি মেয়ে হলেও নিজের ভালোবাসাকে নিজের করার ক্ষমতা আর জেদ সাহস তিনটাই আমার আছে!
সারফারাজ কঠিন স্বরে বলেন,

— এইসব করাকে ভালোবাসা বলে না!
শায়রা দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে জোর গলায় বলে,
— আমার ভালোবাসার ডেফিনেশন আলাদা বাবা! আমার ভালোবাসায় সব জায়েজ!
সায়র অবাক কণ্ঠে বলে,
— তাই বলে তুই সতিন নিয়ে সংসার করবি?
শায়রা সায়রের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— দরকার হলে করবো। আদ্রিক যেমন অর্তিহাকে ছাড়তে পারবে না, আমিও আদ্রিককে ছাড়তে পারবো না।
সারফারাজের মাথা গরম হয়ে যায়। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে টেবিলে জোরে হাত রেখে শব্দ করে বলেন,
— আমার সারাজীবনের উপার্জন করা সম্মান আমি তোমার জন্য নষ্ট করবো না, শায়রা!
শায়রা নির্লিপ্ত গলায় বলে,

— আমিও আমার সুখ তোমাদের জন্য নষ্ট করবো না, বাবা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে অঞ্জনা রহমান স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলেন,
— আচ্ছা, এসব কথা পড়ে হবে। আগে সবাই খেয়ে….
কথা শেষ হওয়ার আগেই সারফারাজ ধমকে ওঠেন,
— চুপ! একদম চুপ করো অঞ্জনা! আর আড়াল করো না মেয়েকে! বেশি বাড় বেড়ে গেছে তোমার ছেলে মেয়ে! এরা ভাই-বোন উঠে পড়ে লেগেছে আমাকে বদনাম করার জন্য! বাহিরের শত্রুর আর কি দরকার? ঘরেই আমার শত্রু বসে আছে!
অঞ্জনা রহমান শান্ত স্বরে বলেন,

— আচ্ছা, আপনি একটু শুনেন! পরে নাহয় এসব কথা….
সারফারাজ চেঁচিয়ে বলেন,
— তোমার মেয়েকে বোঝাও!
শায়রা চোখ গরম করে রাগি গলায় বলে,
— বুঝালেও বুঝবো না!
— বুঝবে না?
— না।
— তাহলে শিকল বেধে ঘরে ফেলে রাখবো!
— পারবে না!
সারফারাজ রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলেন,

— অনেক বার বেড়েছো! শায়রা তোমাকে আমি সাবধান করে দিচ্ছি! বাড়াবাড়ি করা বন্ধ করো নয়ত মেরে ফেলবো! এমন মেয়ের আমার কোনো দরকার নেই, যে মেয়ে বাবার সম্মানের কথা চিন্তা করে না একবারও!
শায়রা হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায়। টেবিলের ওপর থাকা একটি প্লেট ছুড়ে ফেলে চেঁচিয়ে বলে,
— আদ্রিক যতদিন আমার না হবে আমি থামবো না। এই বাড়াবাড়ি চলবে। আর তুমিও আমাকে থামাতে পারবে না। এসব শিকল টিকল, ফাকিং জিনিস কোনো কিছুই আমাকে আটকাতে পারবে না।
বলেই শায়রা অঞ্জনা রহমানকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। পেছন থেকে অঞ্জনা রহমান বারবার ডাকলেও শায়রা থামে না।
অঞ্জনা রহমান ক্লান্ত দৃষ্টিতে সারফারাজের দিকে তাকিয়ে বলেন,

— মেয়েটা আজকে এতোদিন পর খেতে এসেছি কিন্তু আপনার কারণে খেয়ে ওঠতে পারেনি! কি দরকার ছিলো…
সারফারাজ কথাটা শুনেই আগের তুলনায় দ্বিগুণ রেগে যায়। গর্জে ওঠেন,
— চুপ থাকো! চারদিন না খেলে মরে যাবে না! আর মরে গেলে গেছে! এমন সন্তানের বেঁচে থাকার কোনো দরকার নেই, যে বাবার সম্মানের কথা ভাবে না।
অঞ্জনা রহমান আবার বলেন,
— ছেলে মেয়ে গুলো সদ্য ভালোবাসা হারিয়েছে! ওদের মনের অবস্থা এমনিতেই ভালো নেই! তার ওপর আপনি সমান তালে ওদের সাথে এমন ব্যবহার করছেন! তাহলে ওরা জেদ দেখাবে না!
সারফারাজ রাগে ফুঁসে ওঠেন,

— ছেলে মেয়ের আর দোষ কি? মা-ই যদি এমন হয়! ছেলে মেয়েগুলো তোমার কারণে এমন হয়েছে! তোমার কারণে শাসন করা যায় না। তোমার অন্তর কেঁদে ওঠে ছেলে মেয়ের জন্য!
অঞ্জনা রহমানের এবার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। বুকের ভেতরের কষ্ট আর ক্ষোভ একসাথে বেরিয়ে এলো,
— হ্যা কাঁদবেই! আমি মা! আমি নয় মাস পেটে নিয়েছি! সেই ছেলে মেয়ের কষ্ট আমি কিভাবে সহ্য করবো? আপনি বাবা! আপনি বুঝবেন কিভাবে মায়ের কষ্ট? আর আপনি কি বলছেন? ছেলে মেয়ে আমার কারণে এমন হয়েছে? ছেলে মেয়েদের আশকারা আপনি দিয়েছে! আর এখন অন্যায়ের বেলায় সব মায়ের দোষ!
বলেই অঞ্জনা রহমান সেখান থেকে চলে যান। সায়র বিরক্ত আর ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে,
— কি শুরু করেছো তোমরা? এতোদিন শায়রা আর ভাইয়ার ব্যাপার নিয়ে আপসেট ছিলাম! এখন তোমরা আবার ঝগড়া লেগে গেছো! তুমি মায়ের সাথে এমন ব্যবহার কেন করলে?

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নীল রঙের থ্রি-পিস পরে চুল মুচছে অর্তিহা। প্রায় আধা ঘণ্টা আগেই গোসল নিয়েছে। কিন্তু এতক্ষণ টাওয়াল দিয়ে চুল পেঁচিয়ে রেখেছিল। চুল মুছে টাওয়ালটা টাওয়াল স্ট্যান্ডে রাখে অর্তিহা। তারপর চুল ভালো করে আঁচড়ে নেয়।

এখন ডাক্তার দেখাতে যেতে হবে, তাই রেডি হচ্ছে।আদ্রিক ওয়াশরুমে শাওয়ার নিচ্ছে। আয়নায় তাকিয়ে রেডি হতে হতে হঠাৎ অর্তিহার চোখে পড়ে গলায় থাকা দাগটা। সঙ্গে সঙ্গে অর্তিহার মনে পড়ে যায় গত রাতের কথা।
লজ্জায় তার গাল লাল হয়ে ওঠে। দাগটা আদ্রিকই দিয়েছিলো। শুধু গলায় না, শরীরের আরও কিছু জায়গায়ও চিহ্ন রয়ে গেছে, যেগুলোতে এখনো হালকা ব্যথা টের পাচ্ছে। অর্তিহা দ্রুত কনসিলার দিয়ে গলা আর বুকে থাকা দাগগুলো ঢেকে ফেলে। তারপর বিছানার ওপর রাখা ওড়নাটা নিয়ে শরীরে জড়িয়ে নেয়। রেডি হয়ে বেডে বসে আদ্রিকের অপেক্ষা করতে থাকে। প্রায় দশ মিনিট কেটে যায়।

অপেক্ষা করতে করতে অর্তিহা বিরক্ত হয়ে ওঠে। মনে মনে ভাবে, ছেলেদের শাওয়ার নিতে এত সময় লাগে কেন? তাদের তো মেয়েদের মতো লম্বা চুলও নেই! তাহলে আদ্রিকের এত দেরি কেন? এই বিরক্তির মধ্যেই ওয়াশরুম থেকে বের হয় আদ্রিক। সাদা প্যান্ট পরা, গায়ে কোনো শার্ট নেই। তার বুকে খামচির দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেগুলো অর্তিহারই করা। নিজেই ভাবতে অবাক লাগে, সে কীভাবে এসব করে ফেলল! ভীষণ লজ্জা লাগে তার। সে চোখ নামিয়ে নেয়।
আদ্রিক চুল মুছতে মুছতে বলে,

— বাহ রেডি হয়ে বসে আছিস।
অর্তিহা চোখ তোলে না, শুধু মাথা নেড়ে বলে,
— জি।
আদ্রিক টাওয়ালটা স্ট্যান্ডে রেখে কাভার্ডের কাছে গিয়ে শার্ট বের করতে থাকে। তখন অর্তিহার চোখ পড়ে আদ্রিকের পিঠে। সেখানেও দাগের চিহ্ন রয়েছে। অর্তিহা এবার নিজের নখগুলোর দিকে তাকায়। নখগুলো বেশ বড় হয়ে গেছে। মনে মনে ঠিক করে, ডাক্তার দেখিয়ে এসে নখগুলো ছোট করে কাটবে।
আদ্রিক কাভার্ড থেকে অর্তিহার ড্রেসের সঙ্গে ম্যাচ করে নীল শার্ট বের করে পরে নেয়।
আদ্রিক শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে আয়নার সামনে এসে বলে,

— আমি আদর করেছি পরে কত সুন্দর হয়ে গেছিস! চেহারায় আলাদাই গ্লো করছে!
অর্তিহা বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলে,
— আগে আমি সুন্দর ছিলাম না?
আদ্রিক চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলে,
— ছিলি! বাট তোর সৌন্দর্যে গ্লো টা আমার আদরে এসেছে। একটা মেয়েকে কোন মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগে জানিস?
অর্তিহা তাকিয়ে থাকে, উত্তর শোনার অপেক্ষায়। আদ্রিক হেসে বলে,
— স্বামীর আদর পাওয়ার পর মুহূর্তে!
আদ্রিকের চোখে চোখ পড়তেই অর্তিহা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয়। আদ্রিক হাতে ঘড়ি পরে নেয়, শরীরে হালকা পারফিউম দেয়। তারপর অর্তিহার সামনে এসে দাঁড়ায়। আদ্রিককে পুরো রেডি দেখে অর্তিহাও উঠে দাঁড়ায়। তখনি আদ্রিক হঠাৎ অর্তিহার চোয়াল চেপে ধরে। অর্তিহা চোখ বড় বড় করে তাকায়। আদ্রিক অর্তিহার বাম গালে হালকা করে কামড় দেয়।
অর্তিহা ব্যথায় বলে ওঠে,

— আহ!
আদ্রিক হেসে বলে,
— তোর কিউট কিউট গালদুটো দেখে দাঁতগুলো শিরশির করে উঠলো কামড় দেওয়ার জন্য।
অর্তিহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কী বলবে, কিছুই বুঝে ওঠে না। আদ্রিক অর্তিহার হাত ধরে বলে,
— চল।
তারপর দুজন একসঙ্গে রুম থেকে বের হয়। নিচে নেমে ডাইনিং রুমে আসে। ডাইনিং টেবিলে মেহজা আরভিদ আর তালুকদার পরিবার ছাড়া সবাই উপস্থিত।
আদ্রিক আর অর্তিহাকে দেখে তাহিয়া কারদার জিজ্ঞেস করেন,
— কোথাও যাচ্ছো তোমরা?
আদ্রিক চেয়ার বের করে অর্তিহাকে বসতে ইশারা করে বলে,

— হ্যা, মিমি।
— ওহ।
তাপর সবাই খেতে শুরু করে। খাওয়ার মাঝেই আভীর কারদার আদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলেন,
— তোমাদের বিয়েটা তো হঠাৎ করেই হয়েছে। মানুষ জানে না তেমন এই বিয়ে সম্পর্কে।
আদ্রিক শান্ত চোখে আভীর কারদারের দিকে তাকিয়ে থাকে। আভীর কারদার আবার বলেন,
— এখন আমি চাচ্ছিলাম, ছোট করে একটা পার্টির এরেঞ্জকরে সকলকে জানিয়ে দিতে।
কথা শেষ করেই তিনি আদ্রিকের দিকে তাকিয়ে থাকেন উত্তরের অপেক্ষায়। শুধু আভীর কারদার না, টেবিলে থাকা সবাই তাকিয়ে থাকে। অর্তিহাও আদ্রিকের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর আদ্রিক শান্ত গলায় বলে,
— আপাতত প্রয়োজন নেই। পরে ইচ্ছে হলে জানাবো।
এবার আফির কারদার ভ্রু কুঁচকে বলেন,

— এটা কেমন কথা? বিয়ে করেছো অথচ এখন জানানোর প্রয়োজন নেই মানে? এখন না জানালে পরে মানুষ তোমাদের একসাথে দেখলে নানা রকম কথা বানাবে। একটার পর একটা বাজে হেডলাইন ওঠবে!
আদ্রিক ঠান্ডা গলায় বলে,
— বললাম তো এখন প্রয়োজন নেই। আর মানুষের মুখ আর মিডিয়া বন্ধ করা কোনো ব্যাপার না। এটা যেন জানো না তোমরা।
আভীর কারদার কপালে ভাঁজ ফেলে আদ্রিকের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আফির কারদার রেগে কিছু বলতে যাবেন, ঠিক তখনি আভীর কারদার ওনার হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে আদ্রিককে বলেন,
— ঠিক আছে। তুমি যেটা বলছো সেটাই হবে।
খাওয়ার টেবিলে আর কোনো কথা হয় না। ব্রেকফাস্ট শেষ করে আদ্রিক অর্তিহাকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। ওরা চলে যেতেই আফির কারদার বিরক্ত গলায় আভীর কারদারকে বলেন,

— আমাকে থামালে কেন ঐ সময়? দেখেছো আমার কথার দাম দিচ্ছে না।
আভীর কারদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
— কারণ আমি চাচ্ছি না আদ্রিকও আমাদের বিরুদ্ধে চলে যাক। আমারটাকে তো দেখেছিসই, বাপের মাথায় বন্ধুক ঠেকাতেও দুবার ভাবে না।
আফির কারদার বলে,
— তাই বলে আমাদের কথা শুনবে না?
আভীর কারদার গম্ভীর গলায় বলেন,

— বললাম তো আপাতত আদ্রিককে বিগড়ানোর দরকার নেই। নয়ত এটাও আরভিদের মতো হয়ে যাবে। পরে দেখা যাবে বাড়ির দুই ছেলেই যদি আমাদের হাত ফসকে গেছে।
আফির কারদার আবার কিছু বলতে যাবেন, তখনি আভীর কারদার কঠোর গলায় বলেন,
— চুপচাপ খা। এই ব্যাপারে আর কথা শুনতে চাই না।
আফির কারদার আর কিছু না বলে খাওয়ায় মনোযোগ দেয়। আভীর কারদার খাওয়ার মাঝেই তাহিয়া কারদারের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন,

— আস্মিতা, মিশান আর মাসরিফ এলো না কেন ব্রেকফাস্ট করতে?
তাহিয়া কারদার একটু ইতস্তত করে বলেন,
— আপনি একটু মাসরিফ ভাইয়ের সাথে কথা বলবেন।
আভীর কারদার ভ্রু কুচকে বলেন,
— কেন কি হয়েছে?
তাহিয়া নিচু কন্ঠে বলেন,
— মাসরিফ ভাই হয়ত গতকাল সকালে আপনার মেহজাকে নিয়ে বলা কথাটায় রাগ করেছেন। গতকাল দুপুর আর রাতেও খেতে আসেননি। পরে আমি দুপুরে আর রাতে রুমেই খাবার দিয়ে জোর করে খাইয়ে এসেছি, আস্মিতা আর মিশানকে। মাসরিফ ভাই অল্প একটু খেয়েছেন।
আভীর কারদার বিরক্ত হয়ে বলেন,

— সব দোষ ঐ বেয়াদব মেয়েটার জন্য। আমাকে আমার ছেলের কাছে শত্রু বানিয়েছে। এখন আমার বোন আর বোনের জামাইয়ের সাথে সম্পর্কটাও খারাপ করছে। আস্ত ফাজিল।
তাহিয়া দ্রুত বলেন,
— থামুন। আরভিদ এসে শুনলে আবার রেগে যাবে। আর ঝামেলা চাই না বাসায়।
আদ্রিক ডান হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে ড্রাইভ করছে আর অন্য হাতে অর্তিহার ডান হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে। মাঝে মাঝেই অর্তিহার হাতটায় চুমু খাচ্ছে। অর্তিহার ভেতরে ভেতরে ভীষণ অস্বস্তি আর বিরক্তি কাজ করছে। বারবার মনে হচ্ছে হাতটা সরিয়ে নেবে, কিন্তু সেই সাহস তার হচ্ছে না। তাই আগের মতোই মুখ বন্ধ করে সব সহ্য করে যাচ্ছে।
প্রায় আধা ঘণ্টা পর গাড়িটি এসে হাসপাতালের সামনে থামে। আদ্রিক অর্তিহার দিকে তাকিয়ে বলে,

— মাথায় কাপড় দে আর মাস্ক পড়।
অর্তিহা চুপচাপ আদ্রিকের কথা মতো মাথায় কাপড় দেয় এবং মাস্ক পরে নেয়। তারপর আদ্রিক গাড়ি থেকে নেমে ওপাশের দরজা খুলে ধরে দাড়ায় অর্তিহাকে নামার জন্য। অর্তিহা গাড়ি থেকে নামলে দুজন একসঙ্গে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
ভেতরে ঢুকে আদ্রিক অর্তিহাকে একটা বেঞ্চে বসতে বলে, নিজে রিসেপশনিস্টের কাছে চলে যায়। সেখানে কথা বলে আবার অর্তিহার কাছে ফিরে এসে বলে,
— চল।
তারপর দুজনে মিলে ডাক্তারের কেবিনে ঢুকে পড়ে। চেয়ারে বসে থাকা ডক্টর ফাতেমা সুলতানা তাদের দেখে বসতে বলেন।

— বসুন মিস্টার এন্ড মিসেস আদ্রিক কারদার।
ওরা গিয়ে চেয়ারে বসে। ডক্টর হেসে আবার বলে,
— কেমন আছেন মিসেস আদ্রিক কারদার?
অর্তিহা একটু ইতস্তত করে বলে,
— ভালো।
ডাক্তার আবার জিজ্ঞেস করে,
— কয় মাস চলছে বেবির?
এবার অর্তিহা কিছু না বলে আদ্রিকের দিকে তাকায়। তখন আদ্রিক বলে,
— আই থিংক তিন মাসের ওপরে।
— ওকে।
আদ্রিক বলে,

— অর্তির বয়স আঠারো বছর। প্রেগ্ন্যাসির জন্য ওর লাইফ রিস্ক হবে না তো?
ডক্টর গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
— বয়সটা যেহেতু কম, একটু কম্পলিকেট হবেই। তবে চিন্তার কারণ নেই। নিয়মিত চেক-আপ আর ওষুধ নিলে ইনশাআল্লাহ সব ঠিকঠাকভাবেই হবে। আমি কিছু টেস্ট লিখে দিচ্ছি, সেগুলো দেখে তারপর প্রেগ্ন্যাসির পুরো পসেসিংটা ঠিক করবো।
— ওকে।

ডাক্তার প্রেসক্রিপশনে কয়েকটা টেস্ট লিখে দেন। তাপর আদ্রিক অর্তিহাকে নিয়ে ডাক্তারের কেবিন থেকে বের হয়ে আসে। তারপর তারা রিসেপশনিস্টের কাছে গেলে রিসেপশনিস্ট তাদের ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দিকে পাঠায়। প্রথমেই আল্ট্রাসনোগ্রাফি করার জন্য অর্তিহাকে আল্ট্রাসনোগ্রাফি রুমে ঢোকানো হয়। ভেতরে একজন নার্স এসে অর্তিহাকে বেডে শুইয়ে দেয়।
অর্তিহা শুয়ে আছে আলট্রাসাউন্ড বেডে। আলট্রা ডাক্তার অর্তিহার পেটের ওপরের কাপড় সরিয়ে কাপলিং জেল লাগাতে লাগাতে প্রশ্ন করেন,

— কি নাম?
অর্তিহা শান্ত গলায় বলে,
— অর্তিহা।
ডাক্তার হেসে বলেন,
— বেশ সুন্দর নাম তো। বিয়ের কয় বছর?
অর্তিহা উত্তর দেয়,
— বিয়ের এক বছর হয়েছে কিছু দিন আগে।
— আচ্ছা।
তারপর ডাক্তার অর্তিহার পেটে প্রোব ঘুরাতে ঘুরাতে আবার বলেন,
— আপনার কিসের শখ? ছেলে সন্তান নাকি মেয়ে সন্তান? কোনটাই বেশি খুশি? যদিও আলহামদুলিল্লাহ সন্তানেই খুশি হওয়ার কথা।

এই প্রশ্নে অর্তিহা হঠাৎ থমকে যায়। সন্তান নিয়ে সে কখনো তেমন করে ভাবেনি। ছেলে হবে না মেয়ে হবে—এটা নিয়েও না। আদ্রিক তার জীবনের আনন্দগুলো এমনভাবে কেড়ে নিয়েছে যে এখন আর কোনো কিছুতেই সে খুশি খুঁজে পায় না। এমনকি নিজের সন্তানের ক্ষেত্রেও না। কিন্তু এক মুহুর্তে সে ভাবে তার ছেলে সন্তান চাই নাকি মেয়ে। তখনি মন থেকে আপনাআপনি উত্তর আসে তার সন্তানেই খুশি, সে হোক ছেলে কিংবা মেয়ে।
ভাবনার ভেতর থেকে বের হয়ে অর্তিহা ধীরে বলে,
— আল্লাহ যাকে দিবে তাকেই পেয়েই খুশি হবো।
ডাক্তার হেসে বলেন,
— অনেক ভেবে উত্তর দিয়েছেন!
অর্তিহা মিষ্টি হেসে বলে,
— মন থেকে উত্তর দিয়েছি।
ডাক্তার এবার মনিটরের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে, অর্তিহার পেটের ভেতরে থাকা ছোট্ট শিশুটিকে দেখতে দেখতে বলেন,

— দেখবেন নাকি সন্তানকে একবার?
অর্তিহার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। সে দ্রুত মাথা নেড়ে বলে হ্যাঁ। ডাক্তার ইশারায় একটু উঠে বসতে বলেন। অর্তিহা উঠে মনিটরের স্ক্রিনের দিকে তাকায়। সাদা-কালো সেই ছবির ভেতরে ছোট্ট একটা বেবি। খুবই ছোট। দৃশ্যটা দেখেই অর্তিহার বুকটা যেন ঠান্ডা হয়ে যায়। হঠাৎ করেই সে অসম্ভব খুশি অনুভব করে। মুহূর্তের মধ্যেই তার মনমরা ভাব কেটে গিয়ে মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। চোখে আনন্দের জল চিকচিক করে।
নিজের অজান্তেই অর্তিহা ডাক্তারকে প্রশ্ন করে ফেলে,
— আমার ছেলে হবে নাকি মেয়ে?
ডাক্তার হেসে বলেন,

— ১৪ সপ্তাহে ছেলে নাকি মেয়ে সঠিক বলা যায় না। তবে ধারণা করছি ছেলে হবে।
অর্তিহা বিস্ময়ে বলে,
— হুম? ছেলে হবে আমার?
ডাক্তার বলেন,
— জি, স্ক্রিনে দেখে যতটুকু বুঝলাম।
অর্তিহার আনন্দের আর বাধ থাকে না। আলট্রাসাউন্ড শেষ হলে অর্তিহা রুম থেকে বের হয়ে আসে। বাইরে আদ্রিক দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। অর্তিহা আদ্রিকের কাছে গিয়েই হঠাৎ শক্ত করে আদ্রিককে জড়িয়ে ধরে। অর্তিহার হঠাৎ এমন কাজে আদ্রিক একটু চমকে গেলেও সেটা প্রকাশ করে না। সেও অর্তিহাকে জড়িয়ে ধরে তার চুলে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করে,

— কি হয়েছে লিটলহার্ট?
অর্তিহা হালকা ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করে,
— আপনার ছেলে সন্তান চাই না মেয়ে সন্তান চাই? কোনটা হলে আপনি বেশি খুশি হবেন?
আদ্রিক অর্তিহাকে নিজের বুক থেকে উঠিয়ে অর্তিহার মুখের দিকে তাকায়। অর্তিহা কাঁদছে। আদ্রিক কোমল চোখে তাকিয়ে অর্তিহার দুই গালে হাত রেখে বলে,
— আমার সন্তানেই আমি খুশি। ছেলে হলেও আমি খুশি, মেয়ে হলেও আমি খুশি। আমার প্রথম সন্তান ছেলে, মেয়ে যেটাই হোক আমি খুশি।
অর্তিহা কান্না থামিয়ে অবাক চোখে জিজ্ঞেস করে,
— আপনার কোনো ইচ্ছে নেই বেবিকে নিয়ে? অনেকের ছেলের শখ, অনেকের মেয়ের।
আদ্রিক মাথা নেড়ে শান্ত কণ্ঠে বলে,

— না, আমি এমন কিছু ভাবিনি।
এই কথায় অর্তিহার মনটা একটু খারাপ হয়ে যায়। তার মনে হয়, হয়তো আদ্রিক বেবিকে তেমন ভালোবাসে না। না হলে তো বেশিরভাগ বাবারই একটা ইচ্ছা থাকে, সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে হবে। অর্তিহা আদ্রিককে ছেড়ে একটু দূরে সরে দাঁড়ায়।
আদ্রিক অর্তিহার মনের কথাগুলো বুঝে ফেলে। সে হাত বাড়িয়ে আবার অর্তিহাকে নিজের কাছে টেনে নেয়।
আদ্রিক অর্তিহার চোখে চোখ রেখে বলে,

— আগে থেকে যদি ভেবে রাখি মেয়ে বেবির কথা, পরে যদি ছেলে বেবি হয়, তাহলে মনটা কিছুটা খারাপ হবে। আবার একই জিনিসটা যদি ছেলের ক্ষেত্রে হয়? তাই আমি এসব ভেবে রাখতে চাই না। মনে একটা রেখে যদি আরেকটা পাওয়া হয়, তাহলে পাওয়া জিনিসটাতে তেমন খুশি থাকা যায় না। আর আমি চাই, আমার বেবি যেন তার বাবা থেকে সব খুশি পায়। বুঝেছিস?
অর্তিহা মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দেয়, হ্যাঁ। মনে মনে সে হালকা হাসে। সত্যিই, বিষয়টা এভাবে ভাবেনি আগে।
আদ্রিক এবার অর্তিহার চোখ মুছে বলে,

— কাঁদছিলি কেন?
অর্তিহা হালকা হাসি দিয়ে বলে,
— খুশিতে। ডাক্তার ধারণা করেছে ছেলে সন্তান হবে আমাদের।
আদ্রিক ভ্রু তুলে অবাক হয়ে বলে,
— সত্যিই?
অর্তিহা আস্তে করে মাথা নেড়ে বলে,
— হুম।
আদ্রিক হেসে অর্তিহার বাম গালে চুমু দেয়। অর্তিহা লজ্জায় সরে আসতে চায়,

— কি করছেন! হসপিটালে আমরা! কতগুলো মানুষ।
কিন্তু আদ্রিক তাকে সরতে দেয় না।
— তো কি হয়েছে? দেখুক মানুষ বেবির মাম্মাকে কত আদর দেই!
অর্তিহা আর কিছু বলে না। মনে মনে বেশ লজ্জূ পায় আদ্রিকের কাজে আর কথায়। আদ্রিক আবার জিজ্ঞেস করে,
— দেখেছিস বেবিকে?
অর্তিহা আদ্রিকের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলে,
— হুম। একদম ছোট।
আদ্রিক ডান হাত দিয়ে অর্তিহার থুতনি ধরে আদর করে বলে,
— আমার ছোট বেবিডলের পেটে ছোট বেবিই তো থাকবে।
অর্তিহা বলে,

— আচ্ছা, চলেন। বাকি টেস্ট গুলো করি।
তারা ডাক্তারের দেওয়া সব টেস্ট করাতে থাকে। টেস্টগুলো করতে প্রায় ১০-১৫ মিনিট সময় লাগে। তারপর রিপোর্টের জন্য আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। রিপোর্ট হাতে পেয়ে আবার ডাক্তারের কাছে যায়।
ডাক্তার রিপোর্ট দেখে বলে,

— বেবির ১৪ সপ্তাহ। আর মাশাল্লাহ বেবি ভালো স্টেজেই আছে। প্রেগ্ন্যাসিতে তেমন কমপ্লিকেশনস নেই।
বলেই ডাক্তার হেসে আদ্রিককে আলট্রাসনোর ছবিটা দেখায়। ছবিটা সাদা-কালো। সেটাই ছোট আদ্রিকের সন্তান। আদ্রিক ছবিটা দেখে হেসে অর্তিহার দিকে তাকায়। অর্তিহাও তাকিয়ে আছে হাসিমুখে। ডাক্তার তারপর অর্তিহার রিপোর্ট দেখে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রেগন্যান্সির যাবতীয় প্রসেসিং বুঝিয়ে দেন। ডাক্তারের কেবিনের দরজার সামনে আসতেই ওদের লাম্মির সামনে পড়ে। লাম্মি প্রথমে আদ্রিকের হাতে থাকা ফাইলের দিকে তাকায়, তারপর অর্তিহার দিকে। তার চোখে সন্দেহ। সে বুঝার চেষ্টা করছে আদ্রিক অর্তিহা এখানে কেন এসেছে।
লাম্মি এবার ঠোঁটে মিথ্যে হাসি ঝুলিয়ে আদ্রিককে বলে,

— আদ্রিক ভাইয়া? কেমন আছেন?
আদ্রিক শান্ত কণ্ঠে উত্তর দেয়,
— ভালো।
লাম্মি এবার অর্তিহার দিকে তাকিয়ে বলে,
— অর্তিহা কেমন আছো?
লাম্মিকে দেখে অর্তিহার ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। যদি লাম্মি জিজ্ঞেস করে কেন এসেছে? যদি সে বুঝে ফেলে? তাহলে তো সবাই জেনে যাবে! অর্তিহা কোনোভাবে বলে,
— ভালো।
আদ্রিক অর্তিহার হাত ধরে বলে,

— চল।
তাপর তারা কেবিন থেকে বের হয়ে আসে। হসপিটাল থেকে বের হয়ে আদ্রিক গাড়ির দরজা খুলে অর্তিহাকে বসায়। তারপর জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে? ভয় পাচ্ছিস কেন?
অর্তিহা ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে,
— লাম্মি আপু যদি জেনে ফেলে আমি প্রেগন্যান্ট তাহলে তো সবাইকে বলে দিবে।
আদ্রিক অর্তিহার গালে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বলে,
— শান্ত হ। আমি আছি। কেউ কিছু জানবে না। বস আমি আসছি।
বলেই অর্তিহাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই গাড়ির দরজা বন্ধ করে আদ্রিক আবার হসপিটালের দিকে চলে যায়।
অন্যদিকে, লাম্মি ডাক্তারের কাছে এসেছিল কিছুটা মেয়ে-জনিত সমস্যার কারণে। ডাক্তার দেখিয়ে বের হওয়ার সময় সে ডাক্তারের কাছে বলে,

— বাই দা ওয়ে ডক্টর আদ্রিক অর্তিহা কেন এসেছে?
ডক্টর গম্ভীর গলায় বলেন,
— সরি আমি কারো পার্সোনাল ইনফরমেশন বলতে পারি না।
লাম্মি হেসে উত্তর দেয়,
— ওরা আমার কাজিন। দেখলেন না আমি কথা বললাম।
ডক্টর একটু সন্দেহ নিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
— সত্যি বলছেন?
লাম্মি একইভাবে হেসে বলে,
— জি।
ডক্টর এবার বলেন,

— মিসেস আদ্রিক কারদার প্রেগন্যান্ট।
হঠাৎ খবরটা শুনে লাম্মি ভেতরে ভেতরে অবাক হয়ে গেলেও সেটা প্রকাশ না করে হেসে বলে,
— ওহ তাহলে এটারই সারপ্রাইজের কথা বলছিলো!
ডক্টর হালকা হাসি দিয়ে বলেন,
— হয়ত আপনাদের সারপ্রাইজ দিবে।
লাম্মি খুশিতে আত্মহারা হওয়ার ভান করে বলে,
— আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না আমি খালামনি হবো! ডক্টর প্লিজ মাইন্ড না করলে বলবেন, অর্তিহা কয় মাসের প্রেগন্যান্ট? আসলে আমি খুব এক্সাইটেড, প্রথমবার খালামনি হচ্ছি।
ডক্টর বলেন,

— ১৪ সপ্তাহের।
লাম্মি বলে,
— থ্যাংকস ডক্টর আসছি।
ডক্টরের কেবিন থেকে বের হয়েই লাম্মি দ্রুত নিজের পার্স খুলে ফোন বের করে শায়রাকে কল দেয়। দুবার কল বাজার পর শায়রা কল রিসিভ করে।
লাম্মি একনাগাড়ে বলতে থাকে,
— কল ধরছিস মা কেন? এতোগুলো কল দিচ্ছি!
শায়রা বিরক্ত হয়ে বলে,
— যেটা বলার জন্য কল দিয়েছিস সেটা বল! নয়ত কল কাটছি!
লাম্মি হেসে বলে,

— কেটে দে! কাটলে তোরই ক্ষতি!
শায়রা রেগে গিয়ে বলে,
— বললে বল না বললে কল কাটছি। লাম্মি বিরক্ত লাগছে আমার!
লাম্মি শয়তানি ঠোঁটে হাসি রেখে বলে,
— যার জন্য তোমার বিরক্ত লাগছে সে খুশি তো আত্নহারা, বাপ হয়ে।
শায়রা ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে,
— কি বলতে চাইছিস?
লাম্মি এবার সিরিয়াস হয়ে বলে,
— অর্তিহা প্রেগন্যান্ট তাও ১৪ সপ্তাহের! দেট মিন্স তিন মাসের ওপরে। বাট ওদের তো বিয়ে হয়েছে তিনদিন হলো!
শায়রা হতভম্ব হয়ে বলে,

— মাথা খারাপ হয়েছে? সকাল সকাল নেশা করেছিস নাকি?
লাম্মি ঠান্ডা মাথায় বলে,
— নেশা এখন তুই বসে বসে শখের পুরুষের বাপ হওয়ার খুশিতে! আমি ডক্টরের কেবিনের বাহিরে আছি। এখন মাত্র অর্তিহা আর আদ্রিক ভাইয়া ডক্টরের কেবিন থেকে বের হয়েছে।
শায়রা বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ায়। শরীর কাঁপতে থাকে, চোখে জল জমে ওঠে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে,
— তোর কথা যদি মিথ্যে হয়, তাহলে তোকে জানে মেরে ফেলবো। কসম লাম্মি।
লাম্মি ছোট করে বলে,
— ঠিক আছে।

শায়রা ফোন কেটে দেয়। লাম্মি কান থেকে ফোন সরিয়ে ব্যাগে রেখে রিসেপশনের দিকে এগিয়ে যায়। আড়ালে লুকিয়ে থাকা আদ্রিক হালকা হাসে। সে আগেই বুঝে গিয়েছিল, লাম্মি শায়রাকে সব বলবে।
অন্যদিকে, ফোন কাটার সঙ্গে সঙ্গেই শায়রা ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে কেঁদে ওঠে। নিজের চুল খামচে ধরে অসহায়ের মতো বলে,
— আর কত কষ্ট দিবে আদ্রিক তুমি আমাকে? তোমাকে ভলোবাসার শাস্তি বুঝি এতো কষ্টের? এতো কষ্টে নিজেকে সামলালাম, তুমি আবার ভেঙে দিলে আমাকে! এটা যেন মিথ্যে হয় আদ্রিক! তোমার সন্তান অন্য কারোর গর্ভে এটা আমি মানতে পারছি না।
এসব ভাবতে ভাবতেই শায়রা থেমে যায়। মনে প্রশ্ন জাগে, বিয়ের মাত্র তিন দিনের মাথায় কীভাবে তিন মাসের প্রেগন্যান্ট হওয়া সম্ভব? হয়তো লাম্মি ভুল শুনেছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার মনটা আবার হুহু করে ওঠে। আদ্রিকের পক্ষে অসম্ভব কিছু না। তাহলে কি অর্তিহা বিয়ের আগেই প্রেগন্যান্ট ছিল?

অর্তিহা গাড়িতে বসে প্রায় পাঁচ মিনিটের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছে, কিন্তু আদ্রিকের আসার কোনো খবর নেই। অর্তিহা এবার বিরক্ত হচ্ছে। না বলে কোথায় গিয়েছে? আবার এতোক্ষণ সময় লাগাচ্ছে।
হঠাৎ অর্তিহা দেখতে পায়, আদ্রিক হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসছে। আদ্রিক এসে গাড়ির ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে ভেতরে বসে পড়ে।
অর্তিহা জিজ্ঞেস করে,
— কোথায় গিয়েছিলেন?
আদ্রিক সংক্ষেপে উত্তর দেয়,
— কাজ ছিল।

এরপর আর কেউ কিছু বলে না। আদ্রিক গাড়ি চালাতে শুরু করে। বাকি পথ আর কেউ কিছু বলে না। প্রায় এক ঘণ্টা পর তারা বাসায় পৌঁছায়। সকালে বের হয়েছিল এগারোটার দিকে আর এখন সময় আড়াইটা। বাসায় ঢুকেই অর্তিহা দ্রুত পায়ে রুমে আসে। আলমারি থেকে কাপড় বের করে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। শাওয়ার নেওয়া দরকার। পেটে জেল লাগানোর কারণে অস্বস্তি লাগছে, তার ওপর হাসপাতাল থেকে এসে শরীরও ক্লান্ত। অর্তিহা বেশি সময় নেয় না। দশ মিনিটের মধ্যেই শাওয়ার শেষ করে বেরিয়ে আসে। অর্তিহা বের হতেই আদ্রিক ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে চেঞ্জ করতে। আদ্রিক চেঞ্জ করে বের হলে দুজনে একসাথে নিচে নেমে যায় লাঞ্চ করার জন্য।

মেহজা শুয়ে শুয়ে মোবাইল টিপছে। আরভিদ বাসায় নেই, বাইরে গেছে—বারোটা দিকে। হঠাৎ মেহজার রুমের দরজায় নক হলো। মেহজা দরজা খুলতেই দেখে তাহিয়া কারদার।
মেহজা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— শাউড়ী আম্মু, তুমি?
তাহিয়া কারদার বলেন,
— হুম, খেতে এসো।
— খেতে ইচ্ছে করছে না।
— আমি খাইয়ে দেবো, আসো।
— পেটে জায়গা নেই, বারোটার দিকে সকালের নাস্তা করেছি, ওনি খাইয়ে দিয়েছে।
— দুই ঘন্টা হয়ে গেছে, এখন তাড়াতাড়ি আসো। মামনী খাইয়ে দিচ্ছি।

মেহজার সত্যিই পেটে জায়গা নেই, কিন্তু সে আর কথা বাড়ায়নি। এতবার বলার পরও ফিরিয়ে দিলে বেয়াদবি করা হবে। তাই মেহজা তাহিয়া কারদারের সঙ্গে নিচে যায়। নিচে গিয়ে দেখে সবাই বসে আছে। মেহজার মা, বাবা, বোনও। মাসরিফ তালুকদার দুদিন ধরে আভীর কারদারের ওপর রাগ করছিল। কিন্তু আভীর সকালে এটা শুনে জোর করে মাসরিফকে খাওয়াতে ডেকে আনে। মেহজা তাহিয়া কারদারের পাশে বসে। তাহিয়া তাকে খাইয়ে দিতে থাকে।
এটা দেখে আস্মিতা তালুকদার মাসরিফকে চোখে ইশারা করে বুঝায়, মেয়ে ওনার কোনো খারাপ জায়গায় নেই। সবাই মেহজাকে আদর করে। মাসরিফ তালুকদার শুধু শুধু মন খারাপ করে থাকে মেয়ের চিন্তায়। এসব বলতে থাকে চোখের ইশারায়। মাসরিফ তালুকদার কিছু বলেন না। তবে মনে মনে খুশিই হন মেয়েকে শাশুড়ির আদর পেতে দেখে। মেহজা বেশি খায় না, অল্প একটু খেয়ে আবার রুমে এসে শুয়ে পড়ে। তারপর মোবাইল চালাতে লাগে।
সারাদিন তার একটাই কাজ, সেটা হচ্ছে মোবাইল দেখা। মেহজা রিলস দেখছে হঠাৎ তার সামনে খাগড়াছড়ির একটা রিলস আসে। সে পুরো ভিডিওটা দেখে। তারপর থেকেই তার ফেসবুক ফিড পুরো ভরে গেছে খাগড়াছড়ির রিলসে। এসব রিলস দেখতে দেখতে মেহজার ইচ্ছে হয় খাগড়াছড়ি যাওয়ার। পাহাড় দেখার, ঝর্ণা দেখার। মোবাইল স্ক্রিনে সময় দেখে, তিনটা পনেরো মিনিট। মেহজা আরভিদের ফোনে কল করে।
মেহজা জিজ্ঞেস করে,

— আসবেন কখন?
আরভিদ বলে,
— এই তো একটু পরেই। কিছু লাগবে?
— না, কিছু লাগবে না। তাড়াতাড়ি আসুন।
— আচ্ছা, কাজ শেষ করে আসছি।
মেহজা ফোন কেটে দেয়। তারপর মেহজা তাড়াতাড়ি ওঠে কাভার্ড থেকে লাগেজ বের করে লাগেজ খুলে। নিজের কয়েকটা ড্রেস বের করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ট্রাই করতে লাগে কোনটা সুন্দর লাগছে। শেষমেষ ছয়-সাতটা ড্রেস পছন্দ হয়। সেগুলো লাগেজে ভরে নেয়। তারপর আরভিদের কাপড় বের করতে থাকে। প্রথমে ভেবেছিল আরভিদের কোনো পাঞ্জাবি নিবে না, সাদা রঙ তো একদমই না। কিন্তু পরে ভাবে, আরভিদকে সাদা পাঞ্জাবি বেশ লাগে।
তাই শেষমেষ আরভিদের জন্য সাদা পাঞ্জাবি পায়জামাই নেয়। সেগুলোও লাগেজে ভরে নেয়। সাথে পাঞ্জাবির সাথে পড়ার জন্য বিভিন্ন রঙের শালও নেয়। তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে কাপড় পাল্টে পড়ে সাদা আর কালো রঙের টু-পিছ পরে নেয়। তারপর আয়নার সামনে বসে সাজতে শুরু করে।

সময়টা বিকেল চারটা। হানিন হোস্টেলের গেইট থেকে বের হতেই চোখে পড়ে দুজন ব্যক্তিকে, যারা হানিনকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে লুকিয়ে যায়। হানিন তাদের বুঝতে দেয় না, সে তাদের দেখেছে। হানিন রিকশা ডাকে। রিকশা আসতেই উঠে হুট তুলে বসে। হাতের পার্স থেকে ফোন বের করে একটি নাম্বারে কল দেয়। কল রিসিভ হতেই হেসে বলে,

— কাজ হয়ে গেছে! আজকেও লোকগুলো আমার পিছু করছে।
—…
— না, তারা বুঝতে পারেনি যে আমি বুঝে গেছি।
—…
— আমি এখন সেখানেই যাচ্ছি।
— …
— আচ্ছা, রাখছি।
কল কেটে মোবাইল ব্যাগে রেখে হানিন রহস্যময় হাসি দিয়ে বলে,
— যতই লোক লাগাও না কেন, আদ্রিক কারদার, যতদিন না আমরা চাইছি আমাদের সম্পর্কে কিছু জানবে না।
রিকশা থামে একটা আশ্রমের সামনে। হানিন ভাড়া মিটিয়ে আশ্রমের ভিতরে ঢোকে। আশ্রমের এক সেবিকাকে দেখে বলে,

— আম্মিকে বলো আমি তার রুমে অপেক্ষা করছি।
মেয়েটি মাথা নেড়ে বলে,
— ঠিক আছে, আপু।
হানিন আশ্রমমাতার কক্ষের সামনে এসে দাঁড়ায়। হানিন রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে। রুমটা ছোট, আসবাবপত্র খুব বেশি নেই। একটি চৌকিখাট আর দুটো বেতের চেয়ার। হানিন বেডে বসে অপেক্ষা করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর রুমে প্রবেশ করে একজন লম্বা, চিকন গঠনের নারী। বয়স আনুমানিক ৫০-এর ওপরে। খ্রিস্টান নারী, নাম মার্থা লিবিডিয়া। বয়স ৫০-এর ওপরে হলেও শরীরের গঠন বেশ মজবুত, শক্ত ধাঁচের।
মার্থা হানিনকে দেখে বলেন,

— আর বলো না, আশ্রমে কিছু নতুন বাচ্চা এসেছে। তাদের সঙ্গে কথা বলছিলাম, তাই দেরি হলো।
হানিন উঠে দাঁড়িয়ে মার্থার কাছে গিয়ে বলে,
— আম্মি, কোনো সমস্যা নেই। আমি দুমিনিট বসছি দেখে, কোনো ক্ষতি হয়নি।
মার্থা হেসে বলেন,
— আচ্ছা, বলো, কী খাবে?
— আম্মি, আমি কিছু খাবো না।
— আমার কাছে এসেছো আর কিছু না খেয়েই চলে যাবে? বসো, কাউকে পাঠিয়ে কিছু নাস্তা আনাচ্ছি।
হানিন কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে বলে,

— না, আম্মি, আমার তাড়া আছে। এখন তুমি বলো, কেউ এসেছিলো কি?
— বসে কথা বলি।
হানিন আর মার্থা দুই চেয়ারে বসে যায়। হানিন বলে,
— এখন বলো, আম্মি।
মার্থা গম্ভীর গলায় বলেন,
— হ্যা, একটা ছেলে এসেছিলো খোঁজ করতে। কিন্তু ছেলেটা অনেক চালাক! সরাসরি তোমার পরিচয় জানতে আসেনি। একটা ফান্ডের কথা বলে জানতে এসেছে।
— চালাক তো হবেই, আদ্রিক কারদারের লোক! এখন পুরোটা খুলে বলো, সব জানতে চাই আমি।
মার্থা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেন,

— সে বলছিল, তাদের নাকি একটা এনজিও আছে। তারা আশ্রমের ২২ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের তালিকা চাইছে। এরপর তাদের মধ্য থেকে কিছুজনকে বেছে নিয়ে চাকরি দেবে।
— তুমি তালিকা দিয়েছো?
— হ্যা। তুমি যেভাবে বলতে বলেছিলে, ঠিক সেভাবেই বলেছি।
— ভালো করেছো।
মার্থা একটু চিন্তিত গলায় বলেন,
— তোমাদের কাছে আদ্রিক কারদার সম্পর্কে যা শুনেছি, তাতে মনে হয় না সে আমার কথা বিশ্বাস করবে। সে খুবই ধূর্ত ছেলে।
হানিন শান্তভাবে বলে,

— আমিও জানি সে বিশ্বাস করবে না। বুঝে যাবে এসব ফেক।
মার্থা অবাক হয়ে বলেন,
— তাহলে এসব বলতে বললে কেন?
হানিন হেসে বলে,
— তাকে বিভ্রান্ত করতে। একটু জ্বালাতন করতে।
মার্থা কৌতূহলী হয়ে বলেন,
— হানিন, ভেঙে বোঝাও তো আম্মিকে।
হানিন বলতে শুরু করে,

— আমার পরিচয় জানার একমাত্র উপায় আশ্রম। কলেজ থেকেও জানতে পারবে না, কারণ সেখানে আশ্রমের নাম দেওয়া আছে। এখন যদি আশ্রম থেকেও সঠিক তথ্য না পায়, তাহলে আর কোনো রাস্তা থাকবে না। আদ্রিক কারদার পুরোপুরি বিভ্রান্ত হবে। আর আমরা সেটাই চাই।
মার্থা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। সবসময় কঠোর থাকা এই নারী নরম গলায় বলেন,
— এই আশ্রমের সব বাচ্চার মধ্যে তোমাকে আর তোমার ভাইকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। এটা ঠিক, আমি তোমাদের জন্ম দেইনি, কিন্তু তোমরা আমার সন্তান। তোমাদের কিছু হলে এই শক্ত মহিলা ভেঙে পড়বে। তোমরাই আমার প্রাণ। ঐ ছেলেটার থেকে সাবধানে থেকো। ছেলেটা যে ভয়ংকর।
— চিন্তা করো না আম্মি। এখন আর আদ্রিক কারদার আমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। যা ক্ষতি হবে, তা কারদার বাড়িরই হবে। নিশ্চিন্ত থাকো।
মার্থার ভেজা কন্ঠে বলেন,

— কতদিন হয়ে গেল তোমার ভাইয়ের মুখে ‘আম্মি’ ডাকটা শুনি না। কতদিন তাকে দেখি না! এতদিন ধরে সে আমাদের থেকে দূরে। তাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে।
হানিন নরম গলায় বলে,
— আসবে তোমার কাছে আম্মি। কিন্তু এখন না। এখন প্রকাশ্যে আসা বিপজ্জনক।
— জানি। কিন্তু তুমি তো প্রকাশ্যে আছো। তাই সাবধানে থেকো। আদ্রিক কারদার যদি তোমার পরিচয় জানতে পারে, তাহলে তোমাকে মেরে ফেলবে।
হানিন আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে,
— জানতে পারবে না। সেই পথ নেই আদ্রিক কারদারের কাছে যেটা ধরে আমাকে জানতে পারবে!

সন্ধ্যা ছয়টা বাজে আরভিদ বাসায় আসে। রুমে ঢুকতেই চোখ পড়ে মেহজার উপরে। সে সোফায় বসে আছে, পুরো সেজেগুজে। মেহজা আরভিদকে দেখে উঠে দাঁড়ায়।
আরভিদ মেহজার কাছে এসে মেহজার কোমর জড়িয়ে ধরে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে,
— ওহ, তাহলে এইজন্যই বাসায় আসতে বলছিলি? বাসরটা সেরে ফেলার জন্য।
মেহজা বিরক্তি নিয়ে বলে,
— এসেই শুরু হয়ে গেছে।
— না না, এখানে শুরু করবো না। চল, বাসরটা ইউনিকভাবে করি।
মেহজা চোখ-কুঁচকে বলে,
— থাক! ঐ দিন ইউনিকের যে লিলা দেখিয়েছেন! আর ইউনিক চোখে সইবে না।
আরভিদ হেসে বলে,
— আরেহ এসব কিছু না!
— তাহলে?
আরভিদ চোখ টিপে বলে,

— চল, পার্লামেন্টের শেখ হাসিনার বেডরুমে বাসরটা সেরে ফেলি।
মেহজা নাক ছিটকে বলে,
— ছিহ! সেখানে তো ছাত্ররা হিসু করে দিয়েছে!
আরভিদ হেসে ফেলে। মেহজা এবার নরম হয়ে আসে। আহ্লাদী হয়ে আরভিদের গালে হাত রেখে আদুরে গলায় বলে,
— শুনেন।
আরভিদও মেহজার মতো আদুরে সুরে বলে,
— জি, বলেন।
— এক কথা বলবো, রাখবেন?
— ডিম পারতে হবে, এটা ছাড়া যেটা বলো সেটাই রাখবো।
— না এসব না। আমি না ঘুরতে যেতে চাই।
— কোথায়?
— খাগড়াছড়িতে!
আরভিদ হেসে বলে,
— আচ্ছা, নিয়ে যাবো।
মেহজা খুশিতে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলে,

— সত্যিই?
— হুম।
— আচ্ছা, তাহলে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আসুন।
আরভিদ অবাক হয়ে বলে,
— এখন রেডি হবো কেন?
মেহজা হাসি দিয়ে বলে,
— আমরা এখনই যাচ্ছি।
আরভিদ হতবাক হয়ে বলে,
— কি! এখন যাবো মানে? এখন কিভাবে যাবো!
মেহজা কান্না করে দিবে এমন চেহারা করে বলে,
— আমি জানি না, আমি এখনি যাবো। সব গুছিয়ে রেখেছি। ঐ যে, লাগেজ।
বলেই ইশারায় লাগেজটা দেখায়। আরভিদ তাকিয়ে দেখে। সত্যিই একদম লাহেজ রেডি করে রাখা। আরভিদ বলে,

— তাই বলে এখন?
মেহজা কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলে,
— হ্যাঁ। নাহলে আমি রাগ করবো। অনেক কষ্ট পাবো।
আরভিদ মেহজার কাদো-মুখ দেখে হেসে বলে,
— আচ্ছা, আচ্ছা। কাদতে হবে না। যাচ্ছি আমরা।
মেহজা খুশিতে চেচিয়ে উঠে,
— ইয়ে! আমরা খাগড়াছড়ি যাচ্ছি!
আরভিদ মেহজাকে জড়িয়ে ধরে পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোন বের করে ফারাবীকে কল দেয়। ফারাবী কল রিসিভ করতেই আরভিদ বলে,

— আধা ঘণ্টার মধ্যে হেলিকপ্টার রেডি করো। খাগড়াছড়ি যাচ্ছি।
ফারাবী অবাক হয়ে বলে,
— কিন্তু স্যার, কেন? কি হয়েছে? কোনো সমস্যা হয়েছে স্যার?
আরভিদ চাপা রাগ নিয়ে বলে,
— যেটা বলেছি সেটা করো দ্রুত।
ফারাবী বলে,
— আচ্ছা, স্যার।
আরভিদ আবার বলে,
— আর হ্যাঁ, খাগড়াছড়ির বেস্ট হোটেল রুম বুক করো।
— আচ্ছা স্যার, সব ব্যবস্থা করছি।
আরভিদ ফোনটা সোফায় রেখে মেহজার দিকে তাকিয়ে বলে,
— হয়ে গেছে ম্যাম। এবার খুশি?
মেহজা হেসে বলে,

— হেব্বি লেভেলের।
আরভিদ পকেট থেকে পাঁচটা কিটক্যাট বের করে মেহজাকে দিয়ে বলে,
— এই নেন। আপনার খুশি দ্বিগুণ।
মেহজা কিটক্যাট নিয়ে হেসে আরভিদের থেকে সরে এসে বলে,
— ঠিক আছে, এখন যান। তাড়াতাড়ি রেডি হন।
আরভিদ বলে,
— আমার গিফট কোথায়? এতোকিছু দিলাম।
বলেই মেহজার ঠোঁটের দিকে ইশারা করে। মেহজা হেসে বলে,
— সেটা খাগড়াছড়ি গিয়ে দিবো।
আরভিদ মুচকি হেসে বলে,

— খাগড়াছড়ি তুই কই? তাড়াতাড়ি আয়, তোর জন্য কিস পাওয়া থেকে বঞ্চিত হলাম।
মেহজা জোরে হাসতে শুরু করে আরভিদের কথায়। হাসতে হাসতে সোফায় বসে যায়। আরভিদ কাভার্ড থেকে সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা বের করে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে ফ্রেশ হওয়ার জন্য। ১০ মিনিট পর আরভিদ বের হয় ওয়াশরুম থেকে। তারপর কাভার্ড থেকে শাল বের করে সেটা পড়ে নেয়।
তখনি পেছন থেকে মেহজা বলে,
— আমাকেও আপনার একটা শাল দিয়েন, আমি পড়বো।
আরভিদ নিজের জন্য সাদা শাল এবং মেহজাকে কালো শাল দেয়। তারপর মেহজাকে জিজ্ঞেস করে,
— জামেলা, লাগেজে কতগুলো কাপড় নিয়েছিস?
— সাতটা।
আরভিদ বিস্মিত হয়ে বলে,
— কিহ! একদিনের জন্য এতোগুলো?
মেহজা ভ্রু কুচকে বলে,
— কে বলছে আমরা একদিনের জন্য যাচ্ছি?
আরভিদ শান্ত কন্ঠে বলে,

— জামেলা, এখন একদিনের জন্যই যাই। পরে আবার নিয়ে যাবো।
— আচ্ছা।
আরভিদ রুম থেকে মেইডকে ডাক দেয়। মেইড আসলে তাকে বলে,
— ড্রাইভারকে বলো গাড়ি বের করতে। আর এই লাগেজটা গাড়িতে রাখো।
মেইড লাগেজ নিয়ে চলে যায়। এরপর আরভিদ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ে একেবারে রেডি হয়ে নেয়। তারপর মেহজাকে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে নিচে আসতেই দেখে সবাই বসে আছে — আভীর, তাহিয়া, নাজনীন, আফির, মাসরিফ, আস্মিতা।
তাহিয়া কারদার ওদের দেখে জিজ্ঞেস করেন,

— কোথায় যাচ্ছো তোমরা? আর লাগেজ কিসের? ড্রাইভার নিয়ে গেলো এখন?
আরভিদ স্বাভাবিক কন্ঠে বলে,
— আমরা খাগড়াছড়িতে যাচ্ছি একদিনের জন্য। সকালে এসে পড়বো।
আভীর কারদার অবাক হয়ে বলে,
— হঠাৎ খাগড়াছড়ি?
আরভিদ আগের মতোই বলে,
— এমনিই যাচ্ছি ঘুরতে।
মেহজা আরভিদের হাত ছড়িয়ে আস্মিতা, মাসরিফ ওদের সবার গালে চুমু দিয়ে বাই করে। বিপরীতে ওরাও মেহজার গালে চুমু দেয়। এবার মেহজা তাহিয়া কারদারের কাছে গিয়ে কিছুটা দ্বিধা নিয়ে চুমু দেয়। কারণ তাহিয়া কারদার যদি রাগ করে। কিন্তু মেহজাকে অবাক করে দিয়ে তাহিয়া কারদারও পাল্টা চুমু দেয়। তা দেখে মেহজা হাসে।
মেহজা এবার নাজনীন কারদারের কাছে গিয়ে বলে,

— দিবো ছোট মামানী চুমু?
নাজনীন কারদার একবার আরভিদের দিকে তাকান। না করলে তিনি আরভিদের সামনে খারাপ হয়ে যাবে। আর তিনি চান না আরভিদ ওনাকে ঘৃণা করুক কিংবা দূরে যাক। তিনিও আরভিদকে ছেলের মতো ভালোবাসেন। তাই আরভিদের যাতে মন না ভাঙে সেজন্য মেহজাকে বলে,
— দাও।

মেহজা সবার থেকে জোরে চুমু দেয় নাজনীন কারদারকে। ইচ্ছে করেই চুমুটা জোরে দেয় নাজনীন কারদারকে জ্বালাতে। নাজনীন কারদার বুঝতে পারে মেহজা ইচ্ছে করেই জ্বালানোর জন্য এমন করেছে কিন্তু কিছু বলে না আরভিদ সামনে থাকায়। মেহজা এবার আফির কারদার আর আভীর কারদারকে ‘বাই’ বলে। আফির হেসে ‘বাই’ বলে, কিন্তু আভীর কিছু বলে না। মেহজা আবার আরভিদের পাশে এসে দাঁড়ায়। আরভিদ সবাইকে ‘বাই’ বলে মেহজাকে নিয়ে চলে যায়। আরভিদ মেহজাকে সাথে নিয়ে গাড়িতে বসে।
ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেয় এবং তারা এয়ারপোর্টের দিকে রওনা হয়। আধা ঘণ্টার মধ্যে গাড়ি প্রাইভেট টার্মিনালের সামনের ঢালুতে থামে। সেখানে ফারাবী, তাসফির এবং ১৫-২০ জন গার্ড আগে থেকে অপেক্ষা করছে। ফারাবী এগিয়ে এসে গাড়ির দরজা খুলে দেয়। আরভিদ ও মেহজা গাড়ি থেকে নেমে সিকিউরিটি চেকপয়েন্টের দিকে চলে যায়। আরভিদের গার্ডরা চারপাশ থেকে তাদের ঘিরে সুরক্ষা দিচ্ছে। ছোটখাটো চেক শেষে তারা হেলিপ্যাডের দিকে এগিয়ে যায়।

হেলিপ্যাডে পৌঁছতেই দেখতে পায় পাইলট হেলিকপ্টারের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে অপেক্ষা করছে। আরভিদ পাইলটকে ইশারা করে। তা দেখে পাইলট হেলিকপ্টারের ইঞ্জিন চালু করে। আরভিদ মেহজাকে নিয়ে হেলিকপ্টারে বসে। ফারাবী আর তাসফির মেহজা ও আরভিদকে সালাম দেয়। তারা দুজনে সালামের উত্তর দেয়। হেলিকপ্টারের ব্লেড ঘুরতে শুরু করে আর তারা ধীরে ধীরে আকাশের দিকে ওঠে। হেলিকপ্টার তখন পুরোপুরি আকাশে উড়ছে।
মেহজা আরভিদের কাঁধে মাথা রেখে জিজ্ঞেস করে,
— আমরা খাগড়াছড়ি পৌঁছাবো কখন?
আরভিদ মেহজার মাথা হাত বুলিয়ে বলে,
— এই তো ৪০-৪৫ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাবো, জান।

মেহজা কাঁধে মাথা রেখে হাজারটা কথা বলতে থাকে। আরভিদ সব মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকে আর উত্তর দেয়। কথা বলতে বলতে ৪৫ মিনিট পার হয়ে যায়। তারা খাগড়াছড়িতে পৌঁছায়। হেলিকপ্টার সাজেক হেলিপ্যাডে ল্যান্ড করে। প্রথমে আরভিদ নামে, তারপর মেহজা। হোটেল ‘দা গ্রিন ভ্যালি’ থেকে পাঠানো গাড়ি সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছে। কার্গো হ্যান্ডলার হেলিকপ্টার থেকে লাগেজ নামায়। এরপর আরভিদ মেহজা হোটেল থেকে পাঠানো গাড়িতে ওঠে বসে। গাড়ি হোটেলের পথে যেতে থাকে।

প্রায় আধা ঘণ্টা গাড়ি চলার পর তারা হোটেলের সামনে পৌঁছায়। তখন রাত প্রায় ৯টা। হোটেলের স্টাফ এবং ম্যানেজার ফুল নিয়ে অপেক্ষা করছে। গাড়ি থেকে বের হতেই ম্যানেজার আর স্টাফরা স্বাগত জানায় আরভিদ মেহজাকে। ওদের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। লিফটে ওঠে দুই তলায় চলে আসে। তারপর তাদের রুমের এসে দিয়ে যায় ম্যানেজার নিজে। রুমে ঢুকতেই মেহজা দেখতে পায় বেডের মাঝখানে গোলাপের পাপড়ি দিয়ে লাভ শেপ তৈরি করা হয়েছে। পাশে রাখা আছে কেক। মেহজা সেদিকে দিকে পাত্তা না দিয়ে ধপ করে বেডে শুয়ে পড়ে।
আরভিদ অবাক হয়ে বলে,

— একি বেডের মধ্যে থাকা লাভ শেপটা নষ্ট করে দিলি?
মেহজা শুয়ে থেকেই বিরক্ত কন্ঠে বলে,
— তা নয়ত কি জাদুঘরে তুলে রাখতাম?
আরভিদ চোখ টিপ মেরে বলে,
— না, দুজনে মিলে একসাথে নষ্ট করতাম।
মেহজা শুয়ে থেকেই বলে,
— হুহ্! আসছে জালেম! আগে রেস্ট নিন, তারপর ঘুরতে বের হবো।
— ওকে, জান। তার আগে আয় কেকটা কেটে নেই!
মেহজা উঠে এসে বলে,

— আসেন, তাড়াতাড়ি কেকটা কেটে খাই। অনেক ক্ষিদে পেয়েছি।
আরভিদ জিজ্ঞেস করে,
— খাবার অর্ডার করবো?
— না না। বাইরে গিয়েই খাবো। আপাতত কেকটাই খাই।
দুজন মিলে কেক কাটে। আরভিদ একটা পিস তুলে মেহজাকে খাইয়ে দেয়। মেহজাও আরভিদকে খাইয়ে দেয়। তারপর মেহজা বসে কেক খেতে থাকে। এবং আরভিদকে খাইয়ে দিতে থাকে কারণ আরভিদ বাইরে থেকে আসার পর কিছুই খাইনি। কেক খাওয়া শেষ হলে মেহজা ওয়াশরুম থেকে হাত ধুয়ে এসে বেডের ওপর ছড়িয়ে থাকা সব গোলাপের পাপড়ি ফেলে দিয়ে বলে,

— এগুলো থাকলে কুটকুট করবে। শুয়ে আমার পাবো না।
তারপর মেহজা বেডে আয়েশ করে শুয়ে পড়ে। একাধারে সন্ধ্যা থেকে বসে থাকায় এখন একটু শুতে পেরে ভীষণ আরাম লাগছে। আরভিদ মেহজার পাশে শুয়ে মেহজাকে নিজের হাতে শুইয়ে বুকে জরিয়ে নেয়। তারপর মেহজাকে বলে,
— খুশি তো?
মেহজা হেসে মাথা নেড়ে বলে,
— অনেক খুশি। আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না, আমি দুই ঘণ্টার মধ্যে প্ল্যান করে খাগড়াছড়ি এসে পড়েছি ঘুরতে।
আরভিদ কোমল চোখে তাকিয়ে বলে,

— তোর সব স্বপ্ন আমি এভাবেই পূরণ করবো। তুই শুধু আমার হয়ে থাকবি। এতোটুকুই হবে। আর অল্প একটু ভালোবাসা দিবি। বেশি দিতে হবে না কিন্তু অল্প দিস। তোর ভালোবাসা না পেলে আমার সব কিছু বিরক্ত লাগে।
মেহজা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সে আরভিদের ভালোবাসায় প্রতিটা মুহুর্ত মুগ্ধ হয়। কিছুক্ষণ পরে মেহজা চোখ সরিয়ে ফেলে, তারপর জিজ্ঞেস করে,

— আমরা কাল কখন চলে যাবো?
— সকালের দিকে।
— কেন? বিকেলে যাই?
— বিকেলে মিটিং আছে জান।
— আচ্ছা, চলেন বাহিরে ঘুরতে বের হই। সময় বেশি নেই।
— আরেকটু রেস্ট নিয়ে তারপর যা।
মেহজা ওঠে বসে বলে,
— আর রেস্ট নিলে ১২ বেজে যাবে। এমনিতেই এখন ১০টা বাজে।
আরভিদও ওঠে বসে বলে,
— আচ্ছা, চল। ইকো পার্কে যাই।
— আচ্ছা।

বলেই মেহজা লাগেজ খুলে নিজের জন্য কাপড় আর আরভিদের জন্য কাপড় বের করতে নেয়। তারপর আরভিদকে চেঞ্জ করতে বলে এবং নিজে ওয়াশরুমে চলে গেল। মেহজা চেঞ্জ করে বের হয়ে দেখে আরভিদও চেঞ্জ করে ফেলেছে। মেহজা লাগেজ থেকে মেক-আপের জিনিসপত্র বের করে হালকা করে সেজে নেয়। তারপর দুজন হোটেল থেকে বের হয়ে হোটেলের গাড়ি নিয়েই বেড়িয়ে পড়ে ইকো পার্কের উদ্দেশ্যে।
হোটেল থেকে ইকো পার্ক খুব দূরে না, ৩০ মিনিটের রাস্তা। ত্রিশ মিনিট পর তারা ইকো পার্কে পৌঁছায়। পার্কে ঘুরে ঘুরে ঝর্ণা, গাছপালা সবকিছু দেখতে থাকে এবং সাথে সমানতালে ছবি তুলতে থাকে। আর ফটোগ্রাফারটা হচ্ছে আরভিদ। আরভিদ মেহজা
হাঁটতে হাঁটতে ইকো পার্ক থেকে দূরে অন্ধকার জঙ্গলের মতো জায়গায় চলে আসে।
আরভিদ থেমে সতর্ক করে বলে,

— চল, এবার যাই। ঐদিকটা বেশ অন্ধকার, যাওয়াটা সেইফ হবে না।
— আর একটু ঐদিকটায় চলুন। তারপর চলে আসবো।
আরভিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার হাঁটতে শুরু করে। হঠাৎ মেহজা থেমে যায়। আরভিদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কি হলো? থামলি কেন?
মেহজা আঙুল দিয়ে ইশারা করে দেখিয়ে বলে,
— ঐ দেখেন, কত সুন্দর প্রজাপতি।
আরভিদ তাকিয়ে দেখে, সত্যিই ১০-১৫টি অনেক সুন্দর সুন্দর প্রজাপতি উড়ছে। মেহজা প্রজাপতির দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,

— আমাকে কয়েকটা ছবি তুলে দিন প্রজাপতিগুলোর সঙ্গে।
বলেই মেহজা ঘুরে দাঁড়ায়, পেছন দিক থেকে ছবি তুলতে। আরভিদ পকেট থেকে ফোন বের করে মেহজার ছবি তুলতে শুরু করে। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ চেচিয়ে বলে,
— এই তোমরা কারা? এখানে কি করছো?
মেহজা আরভিদ দুজনেই ঘুরে তাকায়। চারজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, শার্ট আর লুঙ্গি পরে। বুঝতে পারলেন, তারা এখানকার মানুষ। মেহজা দ্রুত আরভিদের কাছে এসে পড়ে।
আরভিদ মেহজার হাত ধরে লোকগুলোকে বলে,
— আমরা টুরিস্ট। হাটতে হাটতে এদিকটায় এসেছি।
লোকদের মধ্যে একজন বয়স্ক বলে,

— এতো রাতে হাটতে হাটতে এদিকটায় এলে নাকি অন্য কোনো মতলব? মাইয়া মানুষ নিয়ে জঙ্গলের দিকে কেন?
আরভিদ বুঝতে পারে কথার ইশারা। মুখটা থমথমে হয়ে যায়, তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— আমরা স্বামী-স্ত্রী! এখানে ঘুরতে এসেছি। হাটতে হাটতে এই জঙ্গলে এসে পড়েছি!
তখন আরেকজন অল্প বয়সী লোক বলে,
— দুই-তিন দিন আগে এমন একজোড়া স্বামী-স্ত্রী ধরেছি! স্বামী-স্ত্রী হইলে এই চিপায় কেন?
আরভিদ রেগে বলে,
— বলছিলো তো, সে আমার বউ হয়! আর আপনারা জানেন আমি কে?
বয়স্ক লোকটি জিজ্ঞেস করে,

— কে তুমি?
আরভিদ গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
— আমি আইনমন্ত্রী আরভিদ কারদার।
অল্প বয়সী লোকটি হেসে বলে,
— ধরা পড়লে সবাইই এমন মন্ত্রী-মিনিস্টার হয়ে যায়।
তখন তৃতীয় ব্যক্তি এসে বলে,
— ভাই, কল দিছি। সবাই আইতাছে সর্দার নিয়ে।
আরভিদ চমকে বলে,

— সবাই সর্দার নিয়ে কেন আসছে? অদ্ভুত তো! মেজাজ গরম হচ্ছে!
মেহজা সবকিছু শান্তভাবে দেখছে। না ভয়, না চিন্তা, না রাগ, কোনো কিছুই হচ্ছে না। উল্টো আনন্দ লাগছে। এটা তার কাছে এক অ্যাডভেঞ্চার মনে হচ্ছে। ততক্ষণে সেখানে আরো একদল মানুষ এসে জড়ো হয়। তাদের হাতে লাঠি। তারা প্রায় ১৫-২০ জন। তাদের মধ্যে মেয়েরাও আছে।
বয়স্ক লোকটি একজন সাদা পাগড়ি পড়া লোককে বলে,
— সর্দার, এরা এখানে কুকাম করতে এসেছিলো, আমরা ধরে ফেলেছি। এদের জন্যই আমাদের গ্রামের বদনাম হচ্ছে।
আরভিদ শান্ত কণ্ঠে বলে,

— আপনি কি বলছেন? আমরা এখানে ছবি তুলছিলাম। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমরা বিবাহিত! ও আমার স্ত্রী!
সর্দার তখন বলে,
— যদি তোমার স্ত্রীই হয়, তাহলে আমাদের সামনে আবার বিয়ে করো।
মেহজার চোখ জ্বলে ওঠে আনন্দে। আবার বিয়ে? সে ভীষণ খুশি।
আরভিদ বিরক্ত কণ্ঠে বলে,
— কি আশ্চর্য! বললাম তো, আমরা বিবাহিত!
বয়স্ক লোকটি বলে,
— তাহলে বিয়ে করতে সমস্যা কি?
আরভিদ সরাসরি বলে,
— আমার ইচ্ছে আমি করবো না।
তারপর মেহজার দিকে তাকিয়ে বলে,
— চল মেহু।

তখনি গ্রামের সব লোক চিৎকার করে লাঠি নিয়ে এগিয়ে আসে। মুহূর্তেই মেহজা আরভিদকে ঘিরে ফেলে।
— বিয়ে না করলে আজ এখান থেকে তোদের দুজনের লাশ বের হবে!
আরভিদ-মেহজা দুজনই হতবাক। তখন সর্দার ধমক দিয়ে থামায় লোকগুলোকে।
— চুপ! সব থাম। আমি কথা বলছি তো।
সর্দার আরভিদের দিকে তাকিয়ে বলেন,
— শুনো, এখান থেকে বিয়ে ছাড়া যেতে পারবে না। অনেকদিন ধরেই এখানে অবিবাহিত ছেলে-মেয়ে এসে উল্টো কাজ করে চলে যাচ্ছে আর আমাদের গ্রামের বদনাম হচ্ছে। তাই হয় বিয়ে করবে নয়ত মরবে।
সর্দার মেহজার দিকে তাকিয়ে বলেন,
— এই মেয়ে তোমরা বিবাহিত?
আরভিদ বিরক্ত দৃষ্টিতে সর্দারের দিকে তাকিয়ে থাকে। মেহজা এবার আরভিদের দিকে তাকিয়ে, তারপর সর্দারের দিকে তাকিয়ে বলে,

— না, আমরা বিবাহিত না। এই লোক আমাকে এখানে কুকাম করতে নিয়ে এসেছে!
আরভিদ ভুত দেখার মতো চমকে মেহজার দিকে তাকিয়ে বলে,
— কিহ! মিথ্যে বলছিস কেন?
মেহজা মুখ বাকিয়ে সবাইকে বলে,
— আমি একদম মিথ্যে বলছি না! সত্যিই আমাকে এখানে কুকাম করার জন্য এনেছে।
এবার সবাই চিল্লিয়ে উঠে,
— শুনেছো? এই ছেলে বাটপার! মিথ্যে বলে চেচাচ্ছিলো। এখন আমাদের এক কথা, এদের বিয়ে দিতে হবে। নয়তো এরা জীবিত যেতে পারবে না।
সর্দার এবার আরভিদের দিকে তাকিয়ে বলেন,

— হয়ত তুমি এখন এই মেয়েকে বিয়ে করবে, নয়তো এরা তোমাদের মেরে ফেলবে।
আরভিদ বাধ্য হয়ে রাজি হয়। কারণ বিয়ে ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সে বিরক্তি নিয়ে বলে,
— ঠিক আছে, আমি রাজি, আবার বিয়ে করতে।
সর্দার বলেন,
— চলো।
আরভিদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কোথায়?
সর্দার বলেন,
— আমাদের গ্রামে। সেখানেই কাজি ডেকে বিয়ে পড়ানো হবে।
মেহজা খুশি হয়ে বলে,
— হ্যা, চলেন চলেন।

আরভিদ ভ্রু কুচকে তাকায় মেহজাকে এমন খুশিতে আত্মহারা হতে দেখে। সে বুঝতে পারছে না মেহজা মিথ্যে বললো কেন? তার রাগ হচ্ছে, ইচ্ছে হচ্ছে মেহজাকে একটা থাপ্পড় দিতে। কিন্তু সে দিতে পারবে না। তার অনেক আদরের বউ। সেই বউকে মারবে কিভাবে?
আরভিদ রাজি হয় তাদের সাথে যেতে। তারপর আরভিদ মেহজা গ্রামের লোকদের অনুসরণ করে হাটতে থাকে। প্রায় ১০ মিনিট হাটার পর তারা গ্রামের একটা এলাকায় পৌঁছায়। সেখানে টিনের অনেকগুলো বসতবাড়ি। আরভিদ মেহজা দুজনকেই একটি রুমে বসিয়ে বাইরে তালা দিয়ে দেয়, যাতে কেউ পালাতে না পারে।
ওরা চলে যেতেই আরভিদ মেহজার দিকে তাকিয়ে বলে,
— তুই মিথ্যে কেন বললি মেহু? আমরা বিবাহিত না বললি কেন?
মেহজা বলে,

— কারণ আমি আবার বিয়ে করব।
আরভিদ বিস্ময় দৃষ্টিতে বলে,
— তুই আবার বিয়ে করার জন্য মিথ্যে বলেছিস!
মেহজা হাসি দিয়ে বলে,
— হ্যাঁ, এমন এডভেঞ্চারের বিয়ে কজনের কপালে জুটে! আমাদের কপালে জুটছে, সুন্দর করে, নিয়ে নেন!
আরভিদ হতাশ কন্ঠে বলে,
— তাই বলে এমন বিয়ে?
মেহজা সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— আপনি আমাকে বিয়ে করতে চান না? তার মানে আপনি আমাকে ভালোবাসেন না!
আরভিদ অবাক হয়ে বলে,

— ভালোবাসবো না কেন?
— তাহলে বিয়ে করতে আপত্তি করছেন কেন?
— মানুষ যদি শুনতে পারে আমাকে গ্রামের লোকেরা ধরে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে তাহলে ইজ্জত থাকবে না। আমি একজন আইনমন্ত্রী! আমার একটা সম্মান আছে না।
মেহজা এবার চোখ রাঙিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— তোর সম্মানের নানীরে কিলাই মারি! তুই কবুল বলবি! নয়ত বাহিরে একটা বড় পাথর দেখছি! সেটা দিয়ে তোকে থেঁতলাই ফেলবো!
আরভিদ নরম হয়ে অসহায় চোখে তাকিয়ে বলে,

— এমন করতাছোস কেন জান?
— চুপ করে সুন্দর করে কবুল বলবি আমার নামে! নয়তো তোকে এখন হিজরার সঙ্গে ধরিয়ে বিয়ে দিয়ে দেব।
আরভিদ থতমত খেয়ে চুপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর রুমের দরজা খুলে লোকগুলো ঢুকে, সাথে কাজিও। সর্দার কাজিকে বলে বিয়ে পড়াতে। কাজি জিজ্ঞেস করে,
— কাবিন কত দিবো?
সর্দার বলেন,
— ১০ লাখ লেখেন। যাতে ভবিষ্যতে মেয়েটাকে ছাড়তে না পারে।
আরভিদ কাজিকে বলেন,
— কাবিন ৫০ লাখ টাকা লিখেন।

সবাই অবাক হয়ে আরভিদের দিকে তাকায়। কিন্তু আরভিদ তাদের পাত্তা দেয় না। কাজি বিয়ে পড়ানো শুরু করেন। প্রথমে কাজি মেহজাকে কবুল বলতে বলে। মেহজা খুশিতে ঝটপট তিনবার কবুল বলে ফেলে। তারপর কাজি আরভিদকে কবুল বলতে বলে। মেহজা চোখ রাঙিয়ে আরভিদকে ইশারা করেন সুন্দরভাবে কবুল বলার জন্য। আরভিদ সেটা দেখে জোর করে হাসি দিয়ে কবুল বলে তিন বার। সবাই একসাথে আলহামদুলিল্লাহ পড়ে। তারপর সবাই মিলে দোয়া ধরে।
দোয়া শেষে কাজি বলেন,

— এই মুহূর্ত থেকে তোমরা স্বামী-স্ত্রী।
আরভিদ বিরক্ত কণ্ঠে বলে,
— আমরা একটু আগেও স্বামী-স্ত্রী ছিলাম।
তখন সেই বয়স্ক লোকটা বলেন,
— সেই কখন থেকে বলছো বিবাহিত তোমরা! তাহলে তোমার কাছে কোনো প্রমাণ আছে বিয়ে হয়েছে আগে? এই মেয়ে তো অস্বীকার করেছে!
প্রমাণের কথা বলতেই মনে পড়ে আরভিদের, তার মোবাইলে থাকা একটি ভিডিও আছে যেটা তাদের বিয়ের সময়ের। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, মেহজা আর আরভিদ যখন কবুল বলছে। আরভিদ পকেট থেকে ফোন বের করে ভিডিও চালিয়ে বলে,

— এই যে প্রমাণ।
সবাই ভিডিও দেখতে থাকে মনোযোগ সহকারে। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা এবং শোনা যাচ্ছে মেহজা আর আরভিদ কবুল বলছে। সবাই একে অপরের দিকে তাকায়।
এবার আরভিদ রেগে বলে,
— এখন বিশ্বাস হয়েছে? আমি মিথ্যে বলছিলাম না।
সর্দার বললেন,
— আমাদের কি দোষ? তোমার বউও তো বলছিলো তোমরা অবিবাহিত।
আরভিদ একবার মেহজার দিকে তাকিয়ে বলে,
— আমার বউ এভাবে বিয়ে করে এডভেঞ্চার নিতে মিথ্যে বলেছে।
সবাই মেহজার দিকে তাকায়। মেহজা দাঁত বের করে হাসে।
সর্দার বলেন,

— আচ্ছা থাক, বাবা। আমাদেরও ভুল হয়েছে, তোমাদেরও ভুল হয়েছে। যেহেতু তোমরা আগে থেকেই বিবাহিত, তাই নতুন করে বিয়ে করাতে কোনো সমস্যা নেই!
আরভিদ কিছু বললেন না। সর্দার আবার বলেন,
— আচ্ছা, এখন যাও। বেশি রাত হয়ে যাচ্ছে, তোমাদের আটকাবো না।
আরভিদ মেহজার দিকে তাকিয়ে বলে,
— বউ, এডভেঞ্চার নেওয়া শেষ? এখন আসেন।
মেহজা মাথা নেড়ে সবাইকে হাত নাড়িয়ে বলে,
— টাটা।

তারা বাসা থেকে বের হয়ে হাটতে শুরু করে। তারা হাটতে হাটতে সেই এলাকা থেকে অনেকটা দূরেই এসে পড়ে। আরভিদ মোবাইলে আলো জ্বালিয়ে মেহজার হাত ধরে হাটতে হাটতে বলে,
— সালারা ধরে বেধে বিয়ে দিয়ে বের করে দিয়েছে! বাসরের ব্যবস্থাও করলো না! এখান থেকে বাড়ি গেলে সব কয়টাকে ধরে পেছন দিক দিয়ে সিদ্ধ কোয়েল পাখির ডিম ভরবো!
মেহজা ভ্রু কুচকে বলে,
— বাসর করবেন মানে?
আরভিদ বাকা হেসে বলে,
— বিয়ে করেছি, বাসর করবো না?
মেহজা জিজ্ঞেস করে,
— এখানে আপনার বাসর করতে ইচ্ছে করছে?
আরভিদ বলে,

— বিয়ে যেহেতু এই খাগড়াছড়িতে করেছি, বাসরও এখানেই কমপ্লিট করবো ইনশাআল্লাহ।
হাটতে হাটতে তারা একটা ব্রিজের সামনে এসে দাড়ায়। আরভিদ মোবাইলের আলোয় দেখে সামনে একটা বিশাল গুহা। আরভিদ হেসে মেহজাকে নিয়ে গুহার দিকে এগোতে থাকে।
মেহজা থেমে বলে,
— ঐদিকে কোথায় যাচ্ছে? এটা তো গুহা!
আরভিদ বাকা হেসে বলে,
— গুহায় চল, ডিস্টিং ডিস্টিং করবো!
বলেই মেহজাকে নিয়ে গুহার মধ্যে প্রবেশ করে্ গুহাটা অনেক গভীর এবং একদম অন্ধকার। মোবাইলের আলোয় সামান্য দেখা যাচ্ছে।
মেহজা বলে,

— এখানে কেন নিয়ে এসেছেন!
আরভিদ বললেন,
— এই খাগড়াছড়ির মাটিতেই বাসর সারবো! চল লেগে পড়।
মেহজা বললেন,
— পাগল নাকি! এখানে মাটিতে! এখানে কিছু হবে না। আমি পারবো না।
আরভিদ নিজের শরীরের শালটা মাটিতে বিছিয়ে বলে,
— এখন ফটাফট শুয়ে পড়।
মেহজা মুখ বাকিয়ে বলে,
— নাহ!
আরভিদ মেহজাকে পাজকোলা করে শালের ওপর শুইয়ে দেয়। তারপর নিজেও মেহজার ওপর শুয়ে মেহজার মুখের কাছে নিজের মুখটা নেয়।
মেহজা লজ্জা পেয়ে বলে,
— তাই বলে এখানে?
আরভিদ মেহজার নাকে নাক ঘষে বলে,
— হ্যাঁ, জালেমা।

মেহজা আর কিছু বলে না। আরভিদ মেহজার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। মেহজাও নিজেকে গুটিয়ে রাখে না বরং আরভিদের পিঠ খামচে ধরে সাড়া দিতে থাকে। আরভিদ গভীর ভাবে চুমু খেতে থাকে। ধীরে ধীরে আরভিদ মেহজার ঠোঁট থেকে সরে মেহজার সারা শরীরে নিজের ঠোঁটের স্পর্শ দিতে থাকে। সেই স্পর্শে মেহজার ভেতর এক অজানা শিহরণ জাগতে থাকে। আরভিদের ছোঁয়ায় অস্থির হয়ে ওঠে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে মেহজার জন্য।
অবশ্য আজ মেহজা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলো না। আজ তার একটু নিলজ্জ হতে ইচ্ছে করলো। নিজের সব অনুভূতি আরভিদের জানিয়ে দিতে চাচ্ছে। স্বামীর স্পর্শে মিশে যেতে চাইলো, তার আদর অনুভব করতে চাইলো। মেহজা চোখ বন্ধ করে, আরভিদের ঘাড়ে হাত রেখে আবেশে ছটফট করতে থাকে। এই মানুষটাকে সে চায়। প্রচন্ড রকম ভাবে চায়।

হঠাৎ আরভিদ মেহজারের শরীরে চুমু দেওয়া বন্ধ করে মেহজারের দিকে তাকিয়ে হালকা কণ্ঠে বলে,
— ব্যথা পেলে চিৎকার করিস না জালেমা, নইলে গ্রামবাসীরা এবার বাসর থেকে তুলে আবার বিয়ে দিবে।
মেহজার লজ্জায় গাল লাল হয়ে আছে। সে দুই বার গভীর শ্বাস নিয়ে ঠোঁট চেপে হেসে বলে,
— আপনি ব্যথা দেবেন না, তাহলেই তো হয়।
আরভিদ মেহজারের গলায় আবার মুখ ডুবিয়ে বলে,
— সেটা আমি পারব না। দুবার বিয়ে করার পর এই প্রথম বাসর কপালে জুটলো। মাফ করে দিস, কিন্তু চিৎকার দিস না।

বলেই আরভিদ জামা খুলে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে মেহজা হালকা করে উঠে লজ্জায় আরভিদকে জড়িয়ে ধরে, শরীর ঢাকতে। আরভিদ আবার মেহজাকে শুইয়ে দেয় এবং মেহজার শরীরে বেপরোয়া হয়ে কিস করতে থাকে। আরভিদ কিস করতে করতে এসে মেহজার পেটের ওপর থামে। আরভিদ দুই হাত দিয়ে মেহজার কোমর জরিয়ে ধরে মেহজার নাভিতে একনাগাড়ে কিস করতে। এদিকে মেহজা মাটিতে বিছিয়ে রাখা শাল খামচে ধরে আবেশে ছটফট করতে থাকে। হঠাৎ আরভিদ নাভি কামড় মারে।
মেহজা ব্যথা পেয়ে খুবই আস্তে শব্দ করে, নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে আরভিদকে বলে,
— কামড় দিয়েন না।

কিন্তু আরভিদ শুনে না, সে ব্যস্ত আদরে। আরভিদ এবার পেটের সাইড দিকটাতে কামড় মারে। এবারও মেহজা ব্যথা পায়। তবে কিছু না বলে, হাত বাড়িয়ে আরভিদের মাথাটা তুলে বুকের কাছে এনে আরভিদের ঠোঁটে আলতো চুমু দিয়ে, থেমে থেমে নিভু কন্ঠে বলে,
— কামড় দিয়েন জান। ব্যাথা পায়।
মেহজার মুখে জান ঢাকটা শুনে আরভিদ আরও বেসামাল হয়ে যায়। নেশালো চোখে তাকিয়ে কেবল ইশারায় আচ্ছা সূচক মাথা নাড়ে। কিন্তু আরভিদ কথা রাখে না, গলায় ছোট ছোট কামড় দিয়ে ডীপলি কিস করে, জায়গা জায়গা রক্ত জমাট বাধিয়ে ফেলে। গলায়, বুকে, পেটে কোনো জায়গা বাদ রাখে না রক্ত জমাট বাধাতে। কিন্তু এবার আর মেহজা কিছু বলে না। বরং মেহজা আরও বেশি পাগল হয়ে যাচ্ছে।
মেহজা চোখ বন্ধ করে বিরবির করে বলে,

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৩ (৩)

— আপনার স্পর্শ এমন মধুমিশ্রিত বিষ কেন? না পেলে বাঁচা অসম্ভব, আর পেলে নিজেকে সামলানো দায়।
আরভিদ শুনে মেহজার কথা তবে কিছু বলে না। সে গভীরভাবে ডুবে আছে মেহজায়। এভাবেই রাতের অন্ধকারে দুজন একে-অপরের ভালোবাসা মিশে একাকার হয়ে যায়। এমনভাবে মিশে আছে যেন আর কারোর আলাদা করার শক্তি নেই। রাত গভীর হয়, সময় গড়ায় কিন্তু তারা আলাদা হয় না একে-অপরের কাছ থেকে।

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৫