Home The Silent Manor The Silent Manor part 67

The Silent Manor part 67

The Silent Manor part 67
Dayna Imrose lucky

আহির ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে গৌরীর হাহা’কার দেখে।তবে শব্দে তা প্রকাশ করছে না। নীরবে দু ফোঁটা চোখের জল পড়েছিল। তাৎক্ষণিক মুছে ফেলে। রাফিদ বাবার আদেশ পালন করছে। মসজিদ এর মুয়াজ্জিন কে খবর দিয়েছে। তিনি আসছেন জানাযা সম্পন্ন করতে।ক’জন লোক বাঁশ কাঁটা শুরু করেছে। মহিলারা মিলে গৌরীর মায়ের শেষ গোসলের ব্যবস্থা করছে।

বাড়ির ভীর কমতে শুরু করল।আমজাদ চৌধুরী রাফিদ কে সব বুঝিয়ে দিয়ে ফিরে গেছেন বাড়িতে। সাথে শালুক, জয়ন্তন তাঁরাও ফিরে গেছেন।
মায়া যায়নি।গৌরীর সাথে বারান্দায় বসে আছে। চোখের সবটুকু জমা জল বিসর্জন দিচ্ছে গৌরী। তাঁর মা এখনো জমিনে।একটু পর তাঁকে চিরতরে মাটির ঘরে শায়িত করা হবে।আর চাইলেও তাঁকে একটি নজর দেখা যাবে না।মায়া বেশ কিছুক্ষণ বুঝিয়েছে গৌরী কে।কাজ হচ্ছে না।দুনিয়ার সব ব্যথার সমাপ্তি ঘটলেও প্রিয় মানুষ হারানোর ব্যথা যেন কখনো সমাপ্তি মিলে না।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আহির উঠোনে পায়চারি করছে। ঘুরে ঘুরে গৌরীর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করছে। তাঁর অসহায় মুখখানি এতটুকু ভালো লাগছে না।কথা বলতে চাইছে তাঁর সাথে।একটু শান্তনা দিতে পারলে নিজের মনকে অন্তত বুঝ দিতে পারত। আহির কে উদ্বিগ্ন দেখে মীর এগিয়ে গেল তাঁর দিকে। জিজ্ঞেস করল “কি ভাবছিস?
“গৌরীর সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম।”
“যা’বল।”
“আশেপাশে গ্রামের কিছু মুরুব্বিরা। তাঁদের সামনে বলব!”

“অপেক্ষা কর,আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।” বলে মীর মায়া ও গৌরীর দিকে এগিয়ে গেল। মায়াকে আলাদা পাশে ডাকল।বলল “আহির গৌরীর সাথে কথা বলবে, তুমি ওকে একটু ঘরের পেছনের পুকুর পাড়ের দিকে নিয়ে যাবে?”
মায়া প্রথমে কিছুটা আপত্তিকর দৃষ্টিতে ভ্রুকটি করল। এরপর ভেবে জবাব দিল “আচ্ছা।”
মায়া গৌরী কে নিয়ে পুকুর পাড়ের দিকে হাঁটল।আহির ও মীর গেল কিছু পিছু।পুকুরপাড়টি শান্ত স্নিগ্ধ। চারপাশে সবুজ ঘাস, নারকেল গাছ,কদম গাছের ছায়া জলে পড়ে ঢেউ খেলাচ্ছিল। হালকা বাতাসে জলের ওপর ছোট ছোট ঢেউ উঠছে।দূরে পাখির ডাকে পরিবেশটাকে আরও মধুর করে তুলছে সকালটা। কিন্তু স্নিগ্ধ সকালটাও যেন বিষিয়ে রাখছে গৌরীর মনকে। রাখারই কথা।

গৌরী পুকুরের অপরপ্রান্তে দৃষ্টি ফেলে দাঁড়াল।মায়া পেছন থেকে সরে গেল।আহির এসে দাঁড়াল গৌরীর পাশে। গৌরী অজানা কারো উপস্থিতি পেয়ে সাবধান হল। চোখের জল মুছে মাথায় কাপড় টানল।আহির গলা পরিষ্কার করল খ্যাক খ্যাক করে। গৌরী মানুষটির গলার স্বর চিনতে পারল।ঘুরে আর তাঁকে দেখার প্রয়োজন বোধ করল না।
আহির নিজেই আগ বাড়িয়ে বলল “তোমাকে শান্তনা দেয়ার মত ভাষা পাচ্ছি না আমি। তোমার জায়গায় আমি থাকলেও হয়ত দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলতাম।মা হারানোর যন্ত্র’নায় শেষ হয়ে যেতাম। দুনিয়াতে মা ব্যতীত আপন কেউ হয় না। তোমারও এখন আপন বলতে কেউ নেই।” এতটুকু বলে থামে আহির।চোখ তুলে গৌরী কে দেখল। তাঁর কোন প্রতিক্রিয়া নেই।

চুপচাপ সামনের দৃশ্য দেখছে।মানুষটি উপস্থিত এখানে হলেও মনটা নিশ্চয়ই তাঁর মায়ের কাছে।আহির পুনরায় বলল “আমি তোমাকে ভালোবাসি।হয়ত তোমার মায়ের থেকে বেশি নয়,তবে তাঁর মত করে তোমাকে আগলে রাখার চেষ্টা করব। তোমাকে যত্নে রাখব।যত ঝড়ঝাপটা আসুক না কেন, তোমাকে কখনো ছেড়ে যাব না।এতটুকু ভরসা করে দেখো আমাকে।’ গৌরী এবারও নিশ্চুপ।আহির তাঁর গিয়ে কিছুটা এগিয়ে দাঁড়াল।বলল “তুমি এখন পুরোপুরি একা। তবু তোমাকে একা বলতে ইচ্ছে করছে না।কারণ, আমি আছি তোমার জন্য।একটু একটু করে তোমার ব্যথাটা দূর করার চেষ্টা করব। তোমাকে মিলন কুনজরে দেখেছিল। তোমার সর্ব’নাশ করতে চেয়েছিল। পারেনি। শুধু তোমার বুদ্ধিমত্তা আর সাহস এর জন্য। এরপর যে আর এরকমটি হবে না, তার কোন নিশ্চয়তা নেই। তোমাকে এই গ্রামে একা ফেলে রেখে যেতে পারব না। যদি যাই, তবে শান্তিতে থাকতে পারব না। আমার ধারণা কখনো ভুল হয় না।আমি জানি,তুমিও আমাকে ভালবাসো,তবে বলছো না।যদি আমার ধারণা সঠিক হয়েই থাকে, তবে আমার ডাকে সাড়া দিও। আগামীকাল মায়ার বিয়ে। এরপর হয়ত চলে যাব।” বিরতি নিল আহির। কণ্ঠে স্পষ্ট কান্না।ফের বলল “তোমার সিদ্ধান্ত এর জন্য অপেক্ষা করব।”

আহির চলে গেল। গৌরী ঘুরে তাকাল আহির এর দিকে। তার যাওয়ার পানে চেয়ে থাকল কিছুক্ষণ।মায়া দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল। তাঁর কাছে এসে বলল “ভাইয়ার যাওয়ার পানে দেখছিস,তুই ও নিশ্চয়ই তাঁকে পছন্দ করিস। সে কিন্তু খুবই ভালো মানুষ। অন্তত মীর এর মত বা’জে না। একাধিক মেয়ের পেছনে ছোটাছুটি নেই।তোর এখন কেউ নেই, গ্রামে একা থাকাটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। তাঁকে বলে বিয়ের আয়োজন করি। তাঁর মা বাবা আসুক, তোকে এক দেখাতেই আশাকরি পছন্দ করে ফেলবে। এরপর তাঁর সাথে শহরে চলে যাবি।আর আজকে তুই আমার সাথে যাবি।একা একা থাকলে কেঁদে ম’রবি।”

গৌরীর মায়ের জানাযা সম্পন্ন হয়। তাঁর মাকে কবরে শায়িত করা হয়। পুরুষেরা তাঁদের কাজ শেষ করে যার যার পথে ফিরে যায়। গৌরী দূর থেকে দাঁড়িয়ে মায়ের কব’রটি দেখছে। চিরনিদ্রায় আজ তাঁর মা।ডাকলেও আর সাড়া পাবেনা তাঁর। দুনিয়ার সব অভাব পূরণ হলেও মায়ের অভাব যেন কোনদিন পূর্ণ হওয়ার নয়।এই শূন্যতা ধীরে ধীরে শেষ করে এক অসহায় সন্তান কে।

দেখতে দেখতে পার হয় একটি দিন। গতকাল মায়ার গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। তখনই খবর আসে গৌরীর মা মা’রা গেছেন।তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন নিজের ঘর ভেবে চৌধুরী বাড়িতে। আমজাদ চৌধুরী উনাকে যথেষ্ট ভালো জানতেন। অসহায় বলে শালুক কে দিয়ে বলাতেন উনাদের সাহায্য করতে চান, কিন্তু গৌরী ও তাঁর মা বড্ড আত্মসম্মানবোধ প্রখর মানুষ ছিলেন।অন্যর দেয়া সাহায্য কখনো গ্রহণ করতেন না।

আমজাদ তাঁকে ভেবে এবং গৌরীর মনের অবস্থা ভেবে গতকাল গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান বাতিল করে আজ করেছে। ইতিমধ্যে শুরু হয় আয়োজন।মায়া সকাল থেকে বেঘোরে ঘুমাচ্ছিল। তাঁর আজ গায়ে হলুদ সে ভুলেই গিয়েছিল। গৌরী ও তৃষ্ণা মিলে তাঁর ঘুম ভাঙ্গায়।মায়া ঘুম থেকে চটজলদি উঠে গায়ে হলুদের শাড়ি পড়ে নিল। হলুদ শাড়িতে যেন তাঁকে হলদেপরীর মত লাগছে। শেফালী আসে তাঁর ঘরে।জরুরী ভিত্তিতে জানালো তাঁদের এখুনি গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে বলেছেন শালুক।বেলা বেজে এগারোটা।সূর্য সবেই দেখা দিয়েছে।শালুক চান এখুনি গায়ে হলুদের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে। শীতের সময়ে যেন দিন খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়।

শেফালী বলে চলে যায়।তৃষ্ণা গৌরী সহ সবাই মিলে মায়াকে নিয়ে উঠোনে উপস্থিত হল। উঠোনের এক পাশে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে গায়ে হলুদের জন্য কলাগাছের ছাদনাতলা। মাটিতে রেখেছে পাটা,কলসি ভর্তি জল।কারো হাতে হলুদের বাটি,কারো হাতে রং জল। গায়ে হলুদ শেষে ওঁরা রং জল দিয়ে একে অন্যের গায়ে দিবে। শর্ত আছে। শর্ত হচ্ছে, যাকে রং জল দিতে লক্ষ্য করবে তাঁর পালাতে হবে।রং জল তাঁর শরীরে দিলেই তাঁকে মোটা অংকের টাকা দিতে হবে।সবাই আনন্দের সাথে অপেক্ষা করছে কখন শুরু হবে গায়ে হলুদ।

বাড়ির ছেলেরা উঠোনে ছিল। বাদবাকি অতিথিবৃন্দ।সকলে আনন্দ করছে। মায়াকে দেখে সবাই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।বিয়ের সময় বোধহয় বিয়ের কণের সৌন্দর্য দ্বিগুণ বেড়ে যায়।আজ মায়ার বেড়ে গেছে।
শালুক হাসলেন মেয়েকে দেখে। জয়ন্তন মায়াকে পা ছুঁয়ে সালাম করতে বলল মাকে।মায়া নুয়ে সালাম করতেই শালুক তাঁকে ধরে বুকে টেনে নিল। নিজের চোখের কাজল আঙ্গুল টেনে নিয়ে মায়ার গলায় দিল নজর ফোঁটা।বললে “কারো নজর না লাগুক।”

মায়াকে নিয়ে যাওয়া হল কলাগাছের ছাদনাতলায়।সবাই গোল হয়ে ভীর করে দাঁড়াল হলুদ লাগাবে বলে।মায়া সবাইকে রেখে দূরে তাকাল, সেদিকে দাঁড়িয়ে আছে মীর। সাদা রঙের শার্ট পরনে।হাত দিয়ে চুলগুলো ঠিক করছিল।কথা বলছে আহির এর সাথে।মায়ার দিকে ঘুরেও দেখছে না।মায়ার মন খারাপের জন্য আর মীর কে দায়ী করতে চাইল না। নিজেকে অল্প অল্প করে বোঝাচ্ছে, ভাগ্যকে মেনে নিচ্ছে। গতকাল মীর মাস্টার এর বড় ছেলেকে মে’রেছে। সে-ই সংবাদ তাঁর কাছে পৌঁছেছে।কেন মে’রেছে সে পুরোপুরি আন্দাজ করতে পারছে না। তাঁকে মীর ভালবাসে না,হয়ত বোন ভেবেই ওকে মে’রেছে। তাঁর আকার ইঙ্গিতে বোঝা যায় না তাঁকে ভালোবাসে কি-না।আজ একবার ও মীর তাঁকে বিরক্ত করেনি।হয়ত আর করবেও না ভেবে চোখ নামিয়ে ফেলল।

জয়ন্তন থেকে শুরু করে সবাই একে একে হলুদ দিতে শুরু করে।মায়া তখন কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল তৃষ্ণা কে “বিয়েতে তো ছেলের গায়ে দেয়া হলুদ দেয়া হয় মেয়েকে।এটা কি আদ্রিয়ান এর ?”
“হুম। কিছুক্ষণ আগেই হলুদ নিয়ে হাজির হয়েছে ছেলেপক্ষ থেকে দু’জন।ঐ যে চাচার সাথে কথা বলছে।” মায়া আমজাদ এর দিকে ঘুরে তাকাল। একজন মুরুব্বি সাথে একজন যুবক বসে আছে। আমজাদ তাঁদের সাথে কথা বলছেন। তাঁদের সামনে বেশ ক’পদ এর নাস্তার থালা।

একে একে সবার হলুদ দেয়া শেষ হলে উপস্থিত হল মীর।সে বিদ্যুৎগতিতে সবাইকে ঠেলেঠুলে অগ্রসর হয় যায়ার সামনে।মায়া হঠাৎ মীর এর আগমনে কাচুমাচু হয়ে গেল। অন্যদিকে ঠাণ্ডায় তাঁর দুই ঠোঁট থরথর করে কাঁপছে। তাঁর উপর মীর কে দেখে যেন কাঁপুনি আর একটু বেড়ে গেল।মীর মায়াকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখল।দেখা শেষে এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল “সবাই হলুদ দিয়েছে আমিও একটু দেই।” জয়ন্তন বেগম বললেন “বেডারা হলুদ দেয় না বিয়ার কণের গায়ে।অমঙ্গল হয়।”

“ধুর বুইড়া বেড়ি। সবখানে ব্যাঘড়া দেয়।আজ তোমাকে আগে হলুদ মাখব।” মীর এর কথা শুনে সবাই হাঁসি শুরু করল। মীর সবার উদ্দেশ্যে বলল “সবাই হাঁসি থামাও।আজ আমি বেয়াদব মেয়ের গায়ে হলুদ দেব।”
“আমাকে আপনি ছুঁবেন না।” বলল মায়া।
“আহহ, আপনাকে ছুঁতে আমার বয়েই গেছে।অন্যর জিনিসে আমি হাত দেই না। কিন্তু বোনের গায়ে হাত দেয়াই যায়।” বলে হলুদের বাটি থেকে হলুদ তুলে নিল হাতে।মায়ার দু গালে আলতো হাতে লাগিয়ে দিল। জয়ন্তন বলল “আয়,তোর গালেও একটু দেই।”

“না বুড়ি। আমার সাদা রঙের শার্টে দাগ লেগে যাবে।এই শার্টটা আমাকে ছোট মা উপহার দিয়েছে।”
মায়া তাঁদের কথা এড়িয়ে বলল “এখন আর কি করার বাকি? আমার প্রচণ্ড ঠাণ্ডা লাগছে।”
“অহন তোরে কলসির জল দিয়েই গোসল করাইবো।” জয়ন্তন বললেন।
“আমি এত ঠাণ্ডা জলে গোসল করব না।”
“এই শীতে কতদিন গোসল করো না কেন জানে, এইজন্যই তোমার শরীর থেকে গন্ধ আসে।”

বলল মীর। তাঁর পাশে বুলবুল উপস্থিত হল।মীর কে বলল “শুনুন কানে কানে, জরুরী কথা আছে।” মীর কান পাতল। বুলবুল বলল “মেয়েরা রং মাখিয়ে দিবে।পালান এইখান থেকে। আশেপাশে চেয়ে দেখেন কেউ নেই ছেলেরা।সবাই পালিয়েছে।” মীর ঘাড় উঁচিয়ে দেখল।কেউ নেই।আহির, রাফিদ কোথাও লুকিয়ে পড়েছে।মীর খুব আত্মবিশ্বাস এর সাথে বলল ‘শোন, আমি মীর। আমাকে রং মাখানো এত সোজা না।”

“আপনি মীর বলেই আমার ভয়।” বলে বুলবুল দ্রুত পায়ে চলে গেল।মীর এর পরবর্তী জবাবের অপেক্ষা করল না।
মীর মায়ার দিকে তাকাল। তাঁকে গোসল করাতে চাইছে,সে নাকোচ করছে বারবার।মীর সবার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে রং এর জলটা মায়ার শরীরে ঠেলে দেয়। আকস্মিক ঠাণ্ডা জল মায়ার শরীরে পড়তেই সে হাঁ হয়ে উঠল। নিজের শরীরের দিকে নিজেই দেখছে। গোলাপি রঙে ভরপুর।মীর বলল “আমার সামনে কেউ অপরিষ্কার ভাবে চলবে তা মানতে পারব না।তাই তোমাকে রঙিন জলে গোসল করিয়ে দিলাম।” পাশে থাকা তৃষ্ণা বাকি মেয়েদের উদ্দেশ্য বলল “মীর কে রং লাগাও।” শুনে মীর দৌড় শুরু করে।

মেয়েরা পিছু পিছু ছুটছে রংজল ভরা ছোট পাত্র নিয়ে।মীর নিজেকে ওঁদের হাত থেকে বাঁচাতে দৌড়ে বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে বাইরে চলে গেল।সেখান থেকে মেয়েদের চক্ষুরালে গিয়ে বাড়ির পেছনের প্রাচীর টপকে পুনরায় ভেতরে এল।বেশ হাঁপিয়ে গেছে মীর।দম ছেড়ে উঠোনের চারদিকে দেখল।রং হাতে সৈন্যদল নেই। বোধহয় বাড়ির বাইরে খুঁজছে তাঁকে।মায়া এখনো দাঁড়িয়ে আছে কলাগাছের ছাদনাতলায়।একা একা দাঁড়িয়ে আছে।মীর ধীরস্থির পায়ে হেঁটে তাঁর কাছে পৌঁছাল।মীর হাসছে মায়ার ভেজা রঙিন রুপ থেকে।মায়া আভ করে দাঁড়িয়ে আছে।দু হাতের জল মুছছে।মীর হাঁসি থামিয়ে বলল “বলেছিলাম না, আমি মীর, আমাকে রং মাখানো এত সহজ নয়” বলে পুনরায় হাঁসি শুরু করতেই মায়া পাশে থাকা রং জলের পাত্রটা চটজলদি হাতে তুলে মীর এর গায়ে ঠেলে দিল।মীর হকচকিয়ে গেল। বিমোহিত মুখে নিজেকে দেখে,মায়ার দিকে তাকায়।

মায়া সশব্দে হেসে উঠল। তাঁর হাঁসির সময় দীর্ঘায়িত হল।মায়া হাসি মাখা মুখে মীর কে মুখ বাঁকিয়ে বলল “আমি মীর,আমাকে রং মাখানো এত সহজ নয়।কত দেমাগ।” বলে সে থামতেই বুলবুল এর হাসির শব্দ পাওয়া গেল। বুলবুল মীর কে লাল রঙে রাঙা হতে দেখে হেসে গলে পড়ছে।মীর এর প্রচন্ড রাগ উঠছে।মায়ার কাছে এবং বুলবুল এর কাছে হেরে গেছে বলে।দূর থেকে আমজাদ,শালুক,আহির, রাফিদ সহ বড়রা তাঁদের দেখে হাসছে। এভাবেই যেন আজকের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান আনন্দে মেতে উঠল।

দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসল ধরণীতে। বিয়ের জমজমাট মূল আয়োজন যেন এখন শুরু। দিনের আলোতে বিয়ের বাকি কাজ সম্পন্ন করতে চেয়েছিলেন আমজাদ। পারেননি শহরের আত্মীয়-স্বজন’দের জন্য। তারা চেয়েছে রাতের আলোতে বিয়ে হবে। চারদিক বাল্ব,দূর দূরে জ্বলবে মশাল, হারিকেন দিয়ে ফুলের মত তৈরি করা হবে আলোর ভাণ্ডার।
অবশেষে তাঁদের কথামত আমজাদ তাই করলেন। অতিথিরা সেজেগুজে হাজির হচ্ছে।পাড়ার মেয়েরা রংবেরং এর শাড়ি, ঘাগড়া, বিভিন্ন ধরনের পোশাক পড়ে হাজির হচ্ছে।

মায়া নিজ ঘরের বারান্দায় দাঁড়ানো।ঘরের ভেতরে সবাই তাঁর বিয়ের সাজসজ্জার জিনিসপত্র দেখছে।বিয়ের শাড়ি বেশ চমৎকার।দামি।লালা রঙের পাথরের দ্বারা ঘোমটাখানা তৈরি। সন্ধ্যার পরপর সময়ে বিয়ের শাড়ি কাপড় দিয়ে গেছে বুলবুল। গায়ে হলুদের সাথে বিয়ের সমস্ত জিনিসপত্রও তখন দিয়ে যায়।সবাই ঘরে বসে হইহুল্লোড় করলেও মায়ার ভেতরটা বি’ষাক্ত হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে।হয়ত আর কিছুক্ষণ, এরপর জীবন ম’রনের শেষ ধাপে পা রাখবে। তারপর আর চাইলেও মীর কে সে পাবে না। কেবল তাঁর একমুঠো স্মৃতি ব্যতীত।
মায়া’ ডাক পড়ল ঘর থেকে।মায়া নিজের অভিব্যক্তি পরিবর্তন করে ঘরের ভেতরে চলে আসল। তৃষ্ণা বলল “সবে কাজি এসে হাজির হয়েছে। জলদি তৈরি হয়ে নে।”

মায়াকে সবাই মিলে বউ সাজাতে শুরু করে। আয়নার সামনে বসা সে।আগে শাড়ি পরিয়েছে। চুলগুলো খোঁপা করে গোলাপ ফুলের মালা গেঁথে দেওয়া হয়েছে।হাতে চুড়ি,গলায় স্বর্ণের হাঢ়।
মায়া বউ সেজে নিজেকে দেখছে।সবাই তাঁর রুপের প্রশংসা করছে।সেও মিথ্যা হাঁসি আঁকে। ধীর পায়ে হেঁটে জানালার পাশে গেল।বাড়ির পেছনের দিকটা জানালার পাশ থেকে স্পষ্ট। পেছনের দিকে কারো আনাগোনা নেই। তাঁর চোখ পড়ে প্রাচীরের দিকে। মুহূর্তে চোখ নামিয়ে ফেলতেই মনে হল কেউ ওপাশটায় দাঁড়িয়ে আছে।সে আবার চাইল তীক্ষ্ণ কঠিন দৃষ্টিতে। অস্পষ্ট ভাবে দেখল একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে কারো সাথে কথা বলছে। নিশ্চয়ই সামনে কোন পুরুষ লোক উপস্থিত।মায়া কিঞ্চিত বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। কারা এভাবে চুপিসারে কথা বলছে?লোকটির শরীর গড়ন দেখা গেল। বয়স্ক হবেন নিশ্চিত মায়া।

মায়া তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে বের হতে চাইল। তাৎক্ষণিক তাঁর সামনে পড়ল বুলবুল,হাতে সন্ধ্যার নাস্তা নিয়ে। মায়াকে ঘর থেকে বের হতে দেখে বুলবুল বলল “কোথায় যাচ্ছেন এই সাজে?”
মায়া দৃষ্টি এলোমেলো করে বলল “রাফিদ ভাইয়ের কাছে!”
বুলবুল গম্ভীর মুখে আস্তে ধীরে ফিসফিসিয়ে জবাব দিল “রাফিদ দাদা সে-ই দুপুরের পর বের হয়েছে,আর ঘরে ফিরেনি। মালকিন প্রচণ্ড রেগে আছেন।সরদার চিন্তিত বেশ।সে-ই সাথে মীর দাদা বাবুও গা’য়েব।”

The Silent Manor part 66

“গায়ে’ব মানে?
“গা’য়েব মানে গা’য়েব।উনারা কোথাও গেছেন নয়ত কিছু হয়েছে। মালকিন সরদার,দাদী, শাহানারা মালকিন,সবাই কোন একটা বিষয় দেখলাম কানা ফিসফিসি করছে।” বুলবুল থেমে আবার বলল “আমি আরো একটা কথা শুনেছি।”
“কি শুনেছিস?
বুলবুল এবার আরো কিছুটা সতর্কতার সাথে বলল “মালকিন কাউকে মা’রার নির্দেশনা দিয়েছে।”

The Silent Manor part 68