Home The Silent Manor The Silent Manor part 66

The Silent Manor part 66

The Silent Manor part 66
Dayna Imrose lucky

সকাল ঠিক আটটা বাজে। সূর্যের দেখা তখনো মিলেনি। কিছুক্ষণ আগে একবার দেখা মিলেছিল ওর। মেঘের আড়াল থেকে কয়েক সেকেন্ড এর জন্য উঁকি দিয়ে আবার লুকিয়ে যায়। চারদিক কুয়াশায় মুড়িয়ে আছে।দূরে দৃষ্টি ফেললে স্পষ্ট কিছু দেখা যায় না। কিন্তু যতটা কুয়াশার দেমাগ ততটা শীতের তেজ নেই।
অতিথি’রা আসছেন।শহর থেকে। আগামীকাল মায়ার বিয়ে।বাড়ির ভেতরে এবং বাইরে, দুজায়গায়ই রান্নার আয়োজন চলছে।এত এত অতিথি সাথে সমস্ত অনুচরগন।বিয়ে উপলক্ষে অনুচর আরো বাড়িয়েছেন আমজাদ চৌধুরী।গ্রাম এবং শহরের তাঁর কিছু পরিচিত প্রশাসন এর লোকদের নিমন্ত্রণ করেছেন।উনারা আগামীকাল আসবেন।কেউ কেউ আজই এসেছে।

আমজাদ চৌধুরী মায়ার বিয়ের আয়োজনে এতটুকু ত্রুটি রাখতে চাননা।বাড়ি সাজানো থেকে শুরু করে মেয়েকে সাজানো অবধি। তাঁর একমাত্র কন্যা মায়া।তাঁকে এমন ভাবে বিয়ে দিচ্ছেন, গ্রামের সমস্ত লোক শুধু তাকিয়ে আছে। গ্রামবাসীদের দেখা এই প্রথম রাজকীয় ভাবে বিয়ের আয়োজন চলছে আলিমনগর জুড়ে। তাঁরা এর আগে এমন আয়োজন দেখেনি।কেউ কেউ বলে এরকম উৎসব ও দেখিনি।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

উঠোনের হইচই শব্দে ঘুম ভাঙ্গে মীর এর।ভোর ছ’টার দিকে ছাদ থেকে ফিরে এসে চোখ বুঝেছিল। মাত্র ঘুম ভাঙ্গাতে তাঁর রাগ উঠল।ঘরের দরজাটা হাট করে খোলা থাকায় বাইরের শব্দ যেন বাতাসে উড়ে এসে তাঁর কানেই বিঁধছে।চোখ টিপটিপ করে মেলে চারদিকে তাকাল।আহির একটা বই হাতে পায়চারি করছে।মীর তাঁর দিকে বিরক্ত নিয়ে তাকায়। গতকাল থেকে আধমরা মানুষের মতন আচরণ করছে।যা মীর এর মোটেই ভালো লাগছে না।সে কম্বলের উম ছেড়ে উঠে পড়ল।পরনে শুধু স্যান্ডো গেঞ্জি। বালিশের পাশে রাখা শার্ট। শার্ট পড়ে নিল। তীব্র শীত থাকলেও তাঁকে যেন খুব সহজে শীত ছুঁতে পারে না।

খাট থেকে নেমে আহির কে লক্ষ্য করে বলল “আমরা একটু পর বের হব”
“কোথায়?’ আহির বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই প্রশ্ন করল।
“যেতে যেতে বলব।এখন চল নাস্তা করে আসি।”
“আমি পড়ে খাব,তুই যা।”

মীর আহির কে জোর করল না।সে হাতমুখ ধুয়ে বৈঠকখানায় আসে। বৈঠকখানায় বসে আছেন আমজাদ, থমাস, গ্রামের কিছু মুরুব্বিরা। সাথে প্রসাশনের লোক।আমজাদ উনাদের সাথে কথা বলছেন।মীর গিয়ে অপরপাশের সোফায় বসে।বসার ধরণ এমন যেন সে বৈঠকের মূল বক্তব্য রাখবে।ঘাড় ঘুরিয়ে একবার রান্না ঘরের দিকে তাকাল। শালুক সহ অনেকে কাজ করছে। শালুক হাতে চা সাথে শেফালী কয়েক পদ এর তৈরি নাস্তা নিয়ে হাজির হয় বৈঠকখানায়। অতিথি সহ আমজাদ থমাস, উনাদের নাস্তা দিলেন। শালুক একটা নাস্তার প্লেট,এক কাপ চা নিয়ে মীর এর কাছে এল। তাঁর পাশে বসে।মীর এর চোখ দুটো মাত্রারিক্ত লাল।তা দেখে শালুক বললেন “চোখ লাল কেন!রাতে নিশ্চয়ই ঘুমোসনি! কতবার বারণ করেছি,রাত জাগবি না।” বলে শালুক নিজ হাতে মীর কে খাইয়ে দিতে শুরু করে।মীর কিছু বলল না।ভাবছে গতকাল রাতের কাণ্ডের কথা। জয়ন্তন বোধহয় এখনো শালুক কে কিছু বলেনি।বললে মীর ভীষণ লজ্জায় পড়বে।মীর যেকোনো কারনেই শালুক এর সামনে লজ্জাবোধ করে।
শালুক লোকমা মীর এর দিকে দিচ্ছে।সে বাচ্চাদের মতন কোন প্রতিক্রিয়া না করে হা করে নিচ্ছে। একটু পরপর সিঁড়ির দিকে দেখছে। জয়ন্তন বেগম এলো বলে। গতকাল রাতে তাঁকে সতর্ক করতে পারেনি।এখন একটু আধটু ভয় হচ্ছে শালুক এর জন্য।বলতে গেলে ভয়ের মাত্রাটা বেশিই।
শালুক মীর এর হাবভাব দেখে বললেন “তোর কি গলায় সমস্যা হল ?

“কেন ছোট মা?
“কথা বলছিস না কেন?”
“খাচ্ছিলাম যে।”
“বাবা, আমার ছেলে ভদ্র হল কবে!”
“অভদ্র কবে ছিলাম! তোমার মেয়েও আমাকে অভদ্র বলে।”
শালুক হাসলেন।তিনি যত্ন করে মীর কে খাওয়াচ্ছেন। দৃশ্যটি দেখছেন থমাস শন।তিনি শালুক এবং মীর কে দেখে হাসেন।মীর শালুক কে পেয়ে যেন তাঁর বাবাকে ভুলেই গেছে।তবে এতে তাঁর আক্ষেপ হচ্ছে না।বরং খুশিই হচ্ছেন তিনি। তার ছেলেটা ছোট বেলা থেকেই মায়ের আদর স্নেহ থেকে বঞ্চিত যেন।আজ তাঁর মায়ের প্রতিচ্ছবি হিসেবে যেন শালুক কে পেয়েছে।উনি আড়ালে হেঁসে চোখ সরালেন।
মীর থমাসের চাহনি লক্ষ্য করেছিল এতক্ষণ। মুখে তোলা খাবারটা গিলে শালুকের দিকে চেয়ে নত চোখে বলল “ছোট মা একটা কথা বলব?
“বল” শালুক এর চোখ প্লেটে।

মীর গলা পরিষ্কার করে ঢোক গিলে বলল “আমার বাবা,ঐ যে মি.থমাস শন বসে আছেন,উনার স্ত্রী নেই। মানে আমার মা নেই। তুমিই আমার মা,তাই না!”
“এটা নতুন কি!তোর মা চলে যাওয়ার পর তো তোকে আমিই কোলেপিঠে মানুষ করেছি। হঠাৎ এই কথা কেন?”
“আসলে ছোট মা, তুমি অনেক সুন্দরী নারী। আমার বাবা তো একাকী আছেন।উনার ছেলেকে তুমি তোমার করেই নিয়েছো,বলছি এখন যদি উনার ছেলের বাবাকেও যদি তুমি আপন করে নিতে” বলে মীর পুনরায় ঢোক গিলল। এরপর সামনে থাকা গ্লাসের জলটা পুরোটা ঢকঢক করে খেয়ে নেয়।শালুক হাত থামিয়ে চোখ স্থির করে মীর এর দিকে তাকাল কঠিন দৃষ্টিতে।মীর বলল “ওভাবে কি দেখছো? ভালো কথাই তো বলেছি।থমাস শন বেশ হ্যান্ডসাম। তোমার সাথে মানাবে।”

শালুক বললেন “আজকাল তুই বড্ড পেকে গেছিস”
“কাঁচা থেকে লাভ কি?কাঁচা জিনিস মানুষ পছন্দ করে না।”
“যা আমার চোখের সামনে থেকে।আর আমাকে ছোট মা বলে ডাকবি না।”
“তবে ছোট খালা বলে ডাকব!”
“বেয়াদব ছেলে।”
“তোমার মেয়েও তাই বলে।”
“বলবেই তো! বুদ্ধিসুদ্ধি সব গেছে। মুখে কিছু আটকায় না।”
মীর অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।তখন চোখ পড়ে সিঁড়ির দিকে। জয়ন্তন বেগম নিচে আসছেন।উনি নিশ্চয়ই এখন শালুক কে গতকাল এর ঘটনা বলে দিবেন। বিনিময়ে মীর কানডলা খাবে নিশ্চিত।সাথে লজ্জাবোধ বিনামূল্যে।মীর এদিক ওদিক তাকাল। জয়ন্তন এর চোখের সামনে থেকে পালাতে চাইল। কিন্তু চেষ্টা বৃথা গেল।মীর কোথাও না গিয়ে শালুক এর আঁচল এর নিচে মাথা লুকায়। শালুক বললেন “কি করছিস? আঁচলের আড়ালে লুকালি কেন?”

“দাদুকে বলো না আমি এখানে!”
“কেন?
“বলছি বলো না ব্যস। জিজ্ঞেস করলে রাফিদ এর নাম বলবে।”
“আমার রান্নাঘরে যেতে হবে। অনেক কাজ পড়ে আছে।” বলে শালুক মীর এর মুখে থেকে আঁচল সরিয়ে নিলেন। জয়ন্তন বেগম এসে বসেন তাঁদের পাশে। জয়ন্তন শালুক কে লক্ষ্য করে বললেন “ বৌমা, তোমার লগে কথা আছে!”
“তুমি যাও ছোট মা,কোন কথা নেই।” বলে মীর আলগোছে হাতে ছুঁয়ে শালুক কে রান্নাঘর এর দিকে নিয়ে যায়।
ফিরে আসে জয়ন্তন এর কাছে। তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল “শোনো বুড়ি, গতকাল রাতের ঘটনা তুমি ছোট মায়ের কাছে বললে তোমার অবস্থা করুণ করে ফেলব। মানে যেটা তোমার নাতনির সঙ্গে করতে চেয়েছি,ওটা তোমার সাথে করব।”

আহির ও মীর চৌধুরী বাড়ি ছেড়ে পুব দিকের রাস্তার দিকে হাঁটছে। তাঁদের নির্দিষ্ট কোন গন্তব্য নেই।তবু যেন হাঁটছে অজানা পথে।আহির বিরক্ত হচ্ছে পথে বা বাড়াতে।সে এখন ঘর থেকে বের হতে চায়নি।মীর জোর করেছে বলে বের হয়েছে।মীর কোথায় যাবে জিজ্ঞেস করলে বলেনি।
আহির ও মীর গৌরী-দের বাড়ি অতিক্রম করে হাঁটছে।আহির জিজ্ঞেস করল মীর কে “আচ্ছা, কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
“মাস্টার এর বাড়ি।”
“আবার ওই বাড়ি কেন?”
“মাস্টার এর বড় ছেলের সাথে দেখা করতে।”
“কেন?
“ও নাকি মায়াকে পছন্দ করে।ওর হাত পর্যন্ত ধরেছে।”
“তাঁতে তোর কি?মায়ার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে,ওর জন্য তুই একটা ছেলের সাথে ঝা’মেলা বাঁধাতে এসেছিস।”
“হ্যাঁ, অনেকদিন হয় কাউকে মার’ধর করি না।আজ করতে ইচ্ছে করছে।”
“মীর!”
“চলনা ভাই।”

বলে তাঁরা এগোয় মাস্টার এর বাড়ির পথে।যেতে যেতে দেখা হয় রাফিদ এর সাথে। কারখানার কিছু অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করে জলদি বাড়ি ফিরছিল অশ্বে পৃষ্ঠায় চেপে।আহির- মীরকে দেখে দাঁড়াল।বলল “তোরা কোথায় যাচ্ছিস?
“মাস্টার এর বড় ছেলে কে? ওর সাথে দেখা করতে এসেছি।”
“ওকে দিয়ে তুই কি করবি?”
“আমার দরকার আছে!বলবি ও কোথায়?নয় ওঁর বাড়ি গিয়ে জিজ্ঞেস করছি।”
রাফিদ জবাবে কিছু না বলে শুধু ভ্রু উঁচিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।মীর পুনরায় বলল “তুই তাকিয়ে থাক।আমি আসছি।” বলে মীর ব্যস্ত পায়ে হেঁটে যায় মাস্টার বাড়ির দিকে।
বাড়িতে কাউকে দেখা যাচ্ছে না।বিয়ে বাড়িতে হয়ত।মীর ধারণা করল। পরপর দুটো ঘর।একটা ঘরের দরজা খোলা।মীর গলা উঁচিয়ে ডাকতে শুরু করল।কেউ আছেন কি না বলে। সেকেন্ড কয়েক পার হওয়ার পর একজন ছেলে বেড়িয়ে এল। দেখতে রোগাপাতলা। গায়ের রং ফর্সা। মুখমণ্ডল আকৃতি খুব একটা অসুন্দর নয়।মীর ওর সামনে গিয়ে বলল “মাস্টার এর বড় ছেলে কে?”

“আমি।” ছেলেটা আমি’ বলতে না বলতেই ওঁর গালে কষিয়ে থা’প্পড় দিল মীর। হঠাৎ থাপ্প’ড়ে ছেলেটা থ’হয়ে গেল।বা হাতটা গালে ছুঁইয়ে ধরল।চোখ দুটো বড় করে বলল “আপনি আমায় মা’রলেন কেন?”
“তুই মায়াকে পছন্দ করিস, ওকে ছুঁয়ে দেখেছিস, তোকে তো আজ জানে মে’রে ফেলব।” বলে ওঁর কলার চেপে ধরতেই রাফিদ ও আহির এসে মীর কে থামায়। রাফিদ বলল “ভাই তুই পা’গল হয়ে গেছিস! ওকে কেন মারছিস!”
মীর আহির ও রাফিদ কে সরিয়ে দিল ছিটকে। পুনরায় ছেলেটার কলার চেপে ধরে বলল “যে হাত দিয়ে মায়াকে ছুঁয়েছিস ওই হাত জোড় করে ওঁর কাছে মাফ চাইবি।আর ওকে মা ডেকে আসবি।কারণ মেয়েরা মায়ের জাত।”
মাস্টার এর ছেলে এই কথায় জবাব দিল ‘সবাই মা হয় কি করে!” বলতেই মীর আবার ওকে থা’প্পড় দিল। “সব মেয়ে মা না হলেও ও তোর মা!বুঝেছিস?”

“বুঝেছি। কিন্তু আমি কখনো তাঁকে ছুইনি। পছন্দও করি না।এই সংবাদ আপনাকে কে দিল জানি না।তবু আমি তাঁকে মা ডেকে মাফ চেয়ে আসব।” বলল ও কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে।
মীর এর কর্মকাণ্ডে রাফিদ ও আহির অসন্তোষ হল।তবু যেন মীর এর কিছু যায় আসে না। তাঁরা হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে এগোতেই দেখল গৌরীদের বাড়িতে মানুষের ভীর। আশেপাশের মানুষ দৌড়ে দৌড়ে যাচ্ছে গৌরিদের বাড়ি।
মীর -তারা আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে যায়।যত এগোচ্ছে গৌরীর কান্নার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। কান্নার শব্দে তাঁদের পা চলা আরো দ্রুত গতিতে বেড়ে গেল।গিয়ে দেখল, উঠোনে খাটিয়ায় কারো মৃ’তদেহ রাখা।সাদা চাদরে মুড়িয়ে কাউকে চির নিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে। গৌরী পাশে বসে কাঁদছে। তাঁর পাশে মায়া। এবং উপস্থিত চৌধুরী বাড়ির অনেকে।
গৌরীর কান্নায় চারপাশ হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। আশেপাশের সবার চোখেই জল।এখন থেকে ঠিক কয়েক ঘন্টা আগেও গৌরীর মা জীবিত ছিলেন।তার পাশেই শুয়ে ছিল রাতে।গত কিছুদিন ধরে তাঁর পেটটা চরম ভাবে ফুলে গিয়েছিল। একজন হাকিম বলেছিল ‘শরীরে অনেক রোগ। শেষমেশ লিভার নষ্ট হয়ে গেছে।ফলে পেট ফুলে গিয়েছে।”

গত রাতে গৌরী কে তাঁর মা বলেছিল “আমি মনে হয় আর বেশিদিন বাঁচমু না। কিছুতো খাইতে পারি না।খাইলে হজম হয় না। আমার কষ্ট হয় রে মা।আমি দুনিয়া দিয়া চইলা যামু, আমার মৃ’ত্যুর কথা ভাইবা আমার কষ্ট হয়না রে। কষ্ট হয় যখন ভাবি আমি মইরা গেলে তোর আপন বলতে কেউ থাকবে না।” গৌরী শুধু নিঃশব্দে অঝোরে কান্না করেছিল। কিন্তু তাঁর মাকে কিছু বুঝতে দেয়নি। প্রতিক্রিয়ায় তাঁর মাকে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে বলে। তাঁর মা-ও ঘুমিয়ে যান।কে জানত!এটাই তাঁর মায়ের শেষ ঘুম।

গৌরী সকালে উঠে নাস্তা তৈরি করেছিল। এরপর তাঁর মাকে ডাকতে গেলে আর তাঁর সাড়া পাওয়া গেল না। গৌরী চিৎকার করে উঠেছিল তখন। কোথায় যাবে, কোনদিকে যাবে বুঝে উঠতে পারছিল না।মনে হয়েছিল গোটা দুনিয়াটার চাপ তাঁর মাথার উপর এসে পড়েছে। তাঁর চিৎকারে পথের মানুষ ছুটে আসে। তাঁরা দেখল সর্বহারা গৌরী কে। তাঁদের মধ্যে একজন গিয়ে চৌধুরী বাড়িতে খবর দিল তাৎক্ষণিক।
গৌরী কাঁদছে। তাঁর কান্না যেন আজ থেকে শুরু। বেঁচে থাকবে কিনা নিশ্চিত নয় সে। তীব্র ব্যথা জমছে বুকে। দুনিয়ার বুকে মা ব্যতীত আপন যেন কেহ নয়।কতই না ভালোবাসত তাঁকে। গৌরী যখন ছোট্ট বেলায় স্কুলে যেত , তাঁর মা দীর্ঘ পথ চেয়ে থাকত তাঁর অপেক্ষায়।তার ফেরার সময় হলে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। গৌরী কোথাও বের হলে বারবার সাবধান করত,মা’রে সাবধানে যাইস,তোর কিছু হইলে আমার কি হইবো।নিজে না খেয়ে তাকে খাওয়াত।শহরে থাকতে যখন অন্যর বাসায় কাজ করতেন, তখন তাঁর বাসা হতে যেখানে কাজ করত, সে-ই বাড়ির দূরত্ব ছিল বেশ অনেকটা।তিনি গাড়ি ভারা বাঁচিয়ে সে-ই টাকা দিয়ে গৌরীর জন্য খাবার কিনতেন।নিজে ঔষধ না খেয়ে গৌরীর স্কুলের ফী দিতেন।

গৌরীর এখনো মনে পড়ে সেই দিনের কথা,সে বেশিক্ষন ঘুমিয়ে থাকলে তাঁর মা এসে নিঃশ্বাস পর্যবেক্ষণ করত।আর সে একা একা হাসত।
আজ মনে পড়ছে সে-ই দিনগুলো। তাঁর মায়ের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে। তাঁর মায়ের কণ্ঠের স্বর ভেসে উঠছে কানের কাছে। তাঁর চোখের সামনে তাঁর মা নিথর দেহটা নিয়ে কত শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে।অথচ তাঁর বুকটা যেন জ্ব’লেপু’ড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। মায়ের মত আর কে হবে?কাকে মা বলে ডাকবে?কে তাঁর ভালোমন্দের খোঁজ নিবে!জিজ্ঞেস করবে!আর যে তাঁর কেউই রইল না!
গৌরীর মা চলে গেছে তাঁকে ছেড়ে। তাঁর থেকেও কষ্ট হচ্ছে তাঁর মা বেঁচে থাকাকালীন সময়ের কথা ভেবে। মানুষটি রোগে ভুগে কতটা ছটফট করেছে। মাঝেসাঝে বলত গৌরীরে আমার পেটটার মধ্যে অনেক যন্ত্রনা হইতাছে। অনেক ব্যথা হয়।পেট কখনো ফুলে যেত তীব্র পরিমাণে। ঔষধ খেলে কিছুটা কমত। আবার ফুলে যেত। এভাবেই তিলে তিলে শেষ হলেন তিনি। হারিয়ে গেছেন প্রাণপ্রিয় মেয়ের থেকে।আর যে চাইলেও তার অদুরের কন্যার খোঁজ নিতে পারবেন না। ফিরে আসবেন না সে।

ভেবেই বাঁধ ভাঙার মতন কান্নার অথৈই জ্বলে হারিয়ে যাচ্ছে গৌরী।
আশেপাশের কিছু মহিলারা বলাবলি করছে “মায়ের মতন কেউ হয় না।আজ গৌরীর মা নাই,ও কেমনে ছ’টফট করতেছে।আর কেউ থাকতেও মূল্য বোঝে না।তাইতো লোকে কয়,মায়রে মূল্য দাও।মা একবার গেলে আর এই মায়ের মত কাউরে পাইবা না। একবার চইলা গেলে আফসোস ছাড়া আর কিছু থাকবো না।”
আফসোস! শব্দটি গেল গৌরীর কানে।আজ তাঁর আফসোস হচ্ছে, তাঁর মায়ের জন্য কিছু করতে পারেনি। চোখের সামনে শুধু ঠুকরে ঠুকরে ম’রতে দেখেছে তার মা’কে।

গৌরী ফিসফিসিয়ে বলল “মা’রে।চলে গেলে আমায় ছেড়ে,আমায় এত বড় শা’স্তি দিতে পারলে। পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করার আগে একটাবার আমায় সংবাদ দেয়া যেত না?তবে আমিও দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করতাম।ও মা, স্বার্থপর এর মত আমায় রেখে না গেলেও পারতে।আমি আজকে দুনিয়ার বুকে চিরতরে একা হয়ে গেলাম। আমার নতুন এক পরিচয় তৈরি হয়েছে। আমি এতিম। গতকালও আমি এতিম ছিলাম।তবু যেন এতিমের মতন অনূভুতি হত না।একটা শক্তি,তেজ ছিল আমার মধ্যে।আজ যেন সবকিছু বিসর্জন দিয়ে দিতে হচ্ছে না চাইতেও। আমার ভেতরে আর কোন শক্তি রইল না মা।হয়ত দুনিয়ার বুকে আমিও আর থাকতে পারব না।

The Silent Manor part 65

চলে আসছি শীঘ্রই তোমার কাছে।” গৌরীর চোখের জলে ডুবে যাচ্ছে যেন সবকিছু।মায়া গৌরী কে জড়িয়ে ধরে রেখেছে।তার মায়ের শেষ বিদায়ের আয়োজন করার জন্য আমজাদ চৌধুরী ব্যতীত কেউ নেই।উনি রাফিদ কে লক্ষ্য করে বললেন “গৌরীর মায়ের শেষ বিদায়ের ব্যবস্থা করো।” বলে থেমে তিনি একবার জয়ন্তন এর দিকে তাকালেন। হৃদয়টা যেন ভার হয়ে গেছে তাঁর।একই সাথে রাফিদ ঘুরে তাকাল শালুক বেগমের দিকে। তাঁর চোখের কোণে জল।
আহির থমকে দাঁড়িয়ে আছে। কিচ্ছুটি বলতে পারছে না যেন। মীর ঘুরে আহির এর দিকে তাকিয়ে তাঁর কাঁধে হাত রাখে।মীর গৌরীর মায়ের লা’শটির দিকে তাকিয়ে বলল
“মা ব্যতীত গোটা পৃথিবীটা আস্ত একটা অন্ধকার বন্দিশালার মতন।

The Silent Manor part 67