Home প্রেমের নীলকাব্য প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৫

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৫

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৫
নওরিন কবির তিশা

আকাশটা আজ বড্ড বিষন্ন।একরাশ ‌জেদী মেঘ যেন আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করে রেখেছে তার সমগ্র উজ্জ্বলতা। আকাশের ন্যায় ভারাক্রান্ত তিহুর হৃদয় খানাও।মেঘাচ্ছন্নতা জমাট বেঁধে আছে হৃদয়ের আকাশে।
নীল এমপি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে সময় যেন তার হাত থেকে বালির মতো ফসকে যাচ্ছে। নতুন দায়িত্ব, নতুন দায়বদ্ধতা—অফিস আর পার্টি অফিসের সেই গোলকধাঁধায় সে এখন এতটাই মগ্ন যে, চাইলেও আর আগের মতো করে সময় দিতে পারছে না তিহুকে। তবে প্রতিদিন রাতে ঠিকই প্রিয়তমার শিওরে বসে; রাত্রি যাপন করে সে।

প্রতিদিন ফেরার সময়;গুচ্ছ গোলাপের তোড়া বেলির গাঁজরা ‌‌আর প্রিয়তমার পছন্দের কখনো আইসক্রিম কখনো চকলেট আনা নিত্য স্বভাবের পরিণত হয়েছে তার। তবে এসবের মাঝেও নিজেকে বড্ড একা লাগে তিহুর।তার প্রতিদিনের রুটিন এখন শুধুই ভার্সিটি আর বাড়ি—এই দুই মেরুর মাঝে ঘুরপাক খাওয়া। দিনগুলো কাটছে ভীষণ একঘেয়েমিতে।
প্রায় পাঁচটি দিন অতিবাহিত হল আজ।নীলের সঙ্গে দেখা হয় না তার। নীল রাতে কখন ফেরে জানা নেই। অপেক্ষা করতে করতে এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পরে সে। পাখির কিচিরমিচির শব্দে রোদেলা‌ ভোরে ঘুম ভাঙ্গতেই অনুভূত হয় মাথার কাছে থাকা কিছুটা শুকিয়ে যাওয়া বেলিফুলের মিষ্টি সুবাস।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সূর্যটা মধ্যগগনে।মহলটা প্রায় জনমানবহীন।নবীনগুলো স্কুলে নয়তো ভার্সিটিতে;তবে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস না থাকার দরুন, আজ ভার্সিটিতে যায় নি তিহু।ভাল লাগছে না কিছু তার। তার ওপর নীলের শূন্যতা একটু বেশি অনুভূত হচ্ছে আজ। ভাবতে ভাবতে এক পর্যায়ে সে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলল; আজ নীলের অফিসে যাবে সে।
সিদ্ধান্তটা এক মুহূর্তের হলেও, তৈরি হতে নিয়েছে বেশ অনেকটা সময়। ঘড়ির কাঁটায় একটা বেজে ৩০ মিনিট। নীলের পছন্দের নীল রঙা স্লিভলেস লং গাউন পড়েছে সে আজ। নীলাভ স্রোতস্বীনির ন্যায় স্নিগ্ধ লাগছে তাকে। শেষবারের মতো আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখেই, বেরোলো সে। পা বাড়াল মির্জা সূচনার কক্ষের দিকে।
মির্জা সূচনার কক্ষটা নিচতলার উত্তর পার্শ্বে।বিশাল আয়তনের এই ঘরটিতে আধুনিক বিলাসিতার চেয়েও আভিজাত্যের বনেদি ছাপই বেশি স্পষ্ট।তিহু কক্ষের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো।দেখল মির্জা সূচনা জানলার পার্শ্ববর্তী সোফাটায় বসে কিছু একটা পড়ছেন। তিহু কিছুটা দ্বিধা নিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়াল;মৃদু স্বরে বলল,,

—’আম্মু?
মির্জা সূচনা চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন।তিহু তৎক্ষণাৎ বলল,,—’আমি একটু বেরোচ্ছি।
স্মিত হাসলেন মির্জা সূচনা।তিহুর সাজগোজ আর চোখের অস্থিরতা দেখে অভিজ্ঞ নারীর বুঝতে বাকি রইল না গন্তব্য কোথায়। তাই তিনি আর কিছু জিজ্ঞাসা না করে স্নেহের সুরে বললেন,
—’আচ্ছা যা।
তার সলজ্জ অনুমতি পেয়ে তিহু খুশিমনে বেরিয়ে যেতে নিতেই মির্জা সূচনা তাকে আবারো ডেকে বললেন,,
—’নুরাইন?
তিহু পিছু ঘুরতেই মির্জা সূচনা হেসে বললেন,,—’সাবধানে যাস, আর আমি ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি গাড়ি বের করতে।
তিহুও বিনিময়ে সামান্য হেসে প্রস্থান করল সেখান থেকে।তিহু বেরিয়ে যেতেই মির্জা সূচনা পাশে থাকা সেল ফোনটা দিয়ে ড্রাইভার রহিম মিয়াকে ফোন করে অবগত করলেন।

বুকের ভেতরটা এক অজানা উত্তেজনায় ঢিপঢিপ করছে। ড্রাইভওয়েতে আসতেই তিহু দেখল রূপালি রঙের মার্সিডিজটা প্রস্তুত। ড্রাইভার রহিম চাচা দরজা খুলে দাঁড়াতেই তিহু ধীরপায়ে ভেতরে গিয়ে বসল।সে বসতেই গাড়িটা ছাড়লেন রহিম মিয়া।মহলের বিশাল ফটক পেরিয়ে গাড়িটা মেইন রোডে উঠল, ধীরে ধীরে শহরের ব্যস্ত রাজপথ ছাড়িয়ে সেটি এগোতে লাগল বনানীর অভিজাত বাণিজ্যিক এলাকার দিকে।
অতিবাহিত হয়েছে মিনিট ত্রিশেক। হঠাৎ শহরের অভিজাত এলাকায় সুউচ্চ এক দালানের সামনে এসে থামল গাড়িটা।তিহু এতক্ষণ ধ্যানে মগ্ন থাকার দরুন, হঠাৎ এমন স্তব্ধতায় হচকিত নয়নে চাইলো। প্রশ্ন করতে গিয়েও এক ঝলক সম্মুখ পানে চেয়ে থমকালো সে।

সুউচ্চ সেই ভবনটির ঊর্ধ্বদেশ বরাবর জ্বলজ্বল করছে। সোনালী অক্ষরে খোদাইকৃত ‘খান এম্পায়ার’নামটা।ধীরস্থে গাড়ি থেকে নামলো তিহু। রহিম চাচাকে ইশারায় প্রস্থানের নির্দেশনা দিয়েই ফের তাকালো সম্মূখপানে।
বাইরে থেকেই দৃশ্যমান বিল্ডিংটার স্থাপত্যশৈলীতে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট।পুরো ভবনটাই আবৃত নীলচে কাঁচের আবরণ ,দুপুরের রোদে যা ঠিকরে পড়ছে এক মায়াবীনি দীপ্তির ন্যায়। বিশাল ফটকের সামনে নিরাপত্তার কড়াকড়ি দেখলেই বোঝা যায় এখানে সাধারণের প্রবেশাধিকার কতটা নিয়ন্ত্রিত। তবে বাইরের পৃথিবী থেকে ভেতরের কর্মব্যস্ততা বোঝার উপায় নেই, এক নিস্তব্ধ গাম্ভীর্য বেষ্টন করে রেখেছে চারিপাশ।

তিহু ধীর পায়ে সিঁড়ি ভেঙে মেইন এন্ট্রান্সের স্বয়ংক্রিয় কাঁচের দরজাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজাটা নিঃশব্দে খুলে যেতেই ভেতরের সেন্ট্রাল এসি-র হিমেল হাওয়া তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানাল।
অভ্যর্থনা কক্ষটা বিশাল। চারপাশটা একদম শান্ত, শুধু কোথাও একটা ঘড়ির টিকটিক শব্দ আর দূর থেকে আসা টাইপিংয়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তিহু নিজের পরিধানরত গাউনটা একবার ঠিক করে নিল। তার উপস্থিতিতেই যেন পুরো অফিসের গাম্ভীর্য খানিকটা থমকে গেল। রিসেপশনে থাকা তরুণীটি তিহুর এমন স্নিগ্ধ সাজে মুগ্ধ-বিস্মিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল ক্ষণকাল।

হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে আসলো এক অজ্ঞাত কন্ঠস্বর,-—’নুরাইন ম্যাডাম?
হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে আসা নিজের নাম শুনে তিহু চমকে পেছন ফিরল। দেখল মার্জিত পোশাক পরিহিত এক যুবক তার দিকে সস্মিত মুখে এগিয়ে আসছে। তিহু কিছুটা অবাক হয়ে নিজের বিস্ময় গোপন না করেই প্রশ্ন ছুঁড়ল,
​—’আপনি আমাকে চিনলেন কী করে? আমি তো আগে কখনো এখানে আসিনি।
​যুবকটি বিনয়ের সাথে স্মিত হেসে উত্তর দিল,
—’ম্যাডাম, খান এম্পায়ারে আপনাকে চেনে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। স্যার আপনার ছবি আমাদের দেখাননি ঠিকই, কিন্তু তাঁর ডেস্কে রাখা ফ্রেমে তো আপনারই হাসিমুখের রাজত্ব। তাছাড়া স্যারের ব্যক্তিগত নির্দেশে আপনার প্রতিটি পছন্দ-অপছন্দ আমাদের নখদর্পণে।তাই আমাদের কাছে আপনি অপরিচিত নন, বরং অনেক প্রতীক্ষিত এক অতিথি।

​তিহু স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নীল যে তার অগোচরে অফিসের এই যান্ত্রিক পরিবেশেও তাকে এভাবে জড়িয়ে রেখেছে, তা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। এক অদ্ভুত ভালো লাগার আবেশে তার হৃদয়ে জমে থাকা মেঘগুলো যেন মুহূর্তেই কেটে গেল।
যুবকটি আবারও সৌজন্য দেখিয়ে বলল, —’ম্যাডাম, আসুন আমার সাথে। স্যার একটি জরুরি মিটিংয়ে আছেন; খুব সম্ভবত অতি শীঘ্রই শেষ হবে সেটা।
​অফিসের কর্মচারীদের কৌতূহলী ও শ্রদ্ধামিশ্রিত দৃষ্টির আর ‌প্রত্যেকে শ্রদ্ধা মিশ্রিত সম্ভাষণের মাঝখান দিয়ে তিহু ধীর পায়ে এগিয়ে চলল।করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় সে অনুভব করল, এ যেন কোনো অফিস নয়, বরং নীলের তৈরি করা এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য—যেখানে সে অনাহুত নয়, বরং একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞী। অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দরজার সামনে এসে যুবকটি থামল। দরজায় খোদাই করা ‘ওয়াহাজ খান নীল’।

দরজাটা নিঃশব্দে খুলে যেতেই তিহু ভেতরে পা রাখল। ভেতরে পা রাখতেই এক স্নিগ্ধ আভিজাত্যের ঘ্রাণ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। বিশাল এই কেবিনটি যেন ছোটখাটো একটা ‌আস্ত রাজ্য। কেবিনের উত্তর দিকের পুরোটাই স্বচ্ছ কাঁচের দেওয়াল, যেখান থেকে বাইরের তিলোত্তমা ঢাকা শহরটাকে ছবির মতো দেখাচ্ছে।
​তিহু ধীরপায়ে ভেতরে এগিয়ে গেল। বিশাল আয়তনের কেবিনটা আধুনিক আসবাবপত্রে সজ্জিত হলেও সেখানে নীলের রুচির এক অনন্য ছাপ স্পষ্ট। ঘরের ঠিক মাঝখানে বিশাল এক মেহগনি কাঠের ডেস্কে স্তূপীকৃত ফাইলপত্র। সেই ডেস্কের এক কোণে রাখা একটি মাঝারি সাইজের রুপালি ফ্রেম। তিহু আলতো হাতে সেটা তুলে নিল। দেখল, তার একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবি সেখানে জ্বলজ্বল করছে। ছবিটার দিকে তাকিয়ে তিহুর অজান্তেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।

সে ‌ফ্রেমটা সযত্নে যথাস্থানে রেখে পুরো কেবিনটার ওপর একবার নজর বুলাল। বিশালাকার এই কক্ষের এক কোণে চার্ট আর গ্রাফ সম্বলিত একটি ডিজিটাল প্রেজেন্টেশন বোর্ড রয়েছে, যেখানে খান এম্পায়ারের ভবিষ্যৎ প্রকল্পের রূপরেখা ঝকঝক করছে। কক্ষের মাঝখানে দামী লেদারের রিভলভিং চেয়ার।

​ডেস্কের একপাশে সাজানো রয়েছে অত্যাধুনিক ম্যাকবুক, একটি স্টাইলিশ ল্যাম্প শেড আর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফাইল সাজিয়ে রাখার অর্গানাইজার। ঘরের একদিকের দেওয়ালে সুন্দর কাঁচের আলমারিতে নীলের ব্যবসায়িক সাফল্যের বেশ কিছু গোল্ডেন ট্রফি আর সম্মাননা স্মারক সারিবদ্ধভাবে সাজানো। কক্ষের গাম্ভীর্য ধরে রাখতে এক কোণে রাখা হয়েছে একটি ইনডোর প্ল্যান্ট, যার সতেজতা এই যান্ত্রিক পরিবেশেও এক চিলতে প্রাণস্পন্দন যোগ করেছে।
তিহু যখন কেবিনের সৌন্দর্য বিশ্লেষণে মগ্ন ঠিক তক্ষুনি;‌দরজার লক খোলার মৃদু শব্দ হলো। সে চট করে পেছন ফিরতেই দেখলো নীল ঢুকছে। পরনে তার নেভি ব্লু শার্ট, স্লিভগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো।কপালে ক্লান্তির রেখা স্পষ্ট হলেও তিহুকে দেখামাত্রই তার চোখের মণি দুটো বিস্ময়ে আর প্রশান্তিতে চিকচিক করে উঠল। নীল হাতে থাকা ফাইলটা পাশের ছোট টেবিলে রেখেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।

তিহু চোখ কুঁচকে তাকাতেই নীল তার দিকে এগিয়ে এসে; তাকে স্পর্শ করে বলল,,—’নো,এটা রিয়েল।
তিহু অভিমানী চোখে তাকাল। তার ঠোঁট দুটো সামান্য ফুলে উঠেছে। সে কোনো কথা না বলে জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। নীল আলতো পায়ে তার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল। তিহুর গায়ের সেই প্রিয় পারফিউমের ঘ্রাণে নীলের সব ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উবে গেল তার;সামান্য মুচকি হেসে ফিসফিসিয়ে সে বলল,
—’এতটা সাজগোজ করে এসেছ,অথচ যার জন্য তার সঙ্গেই কথা বলবে না?
তিহু এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে নীলের চোখের দিকে তাকাল। নীলাভ সেই চোখে রাজ্যের ক্লান্তি থাকলেও তার জন্য আছে সীমাহীন ভালোবাসা। তিহু আলতো করে নীলের শার্টের কলার টেনে বলল,,

—’ঢং করেন কেন এত হ্যাঁ? যখন নিজে থেকে আমার সঙ্গে দেখা করেন না তখন বোঝেন আমার কেমন লাগে? আজ পাঁচ পাঁচটা দিন হয়ে গেল আপনার দেখা নেই। এতটা ব্যস্ত আপনি?
নীল হাসল খানিক;এক হাত বাড়িয়ে তিহুর গালের ওপর এসে পড়া অবাধ্য চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিল। তার স্পর্শে তিহুর শরীরের ভেতরে যেন এক মৃদু বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বয়ে গেল। নীল নরম স্বরে বলল,
—’স্যরি অর্কিড‌।
তিহু তার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে গিয়ে বলল,,—’ছাড়ুন আমায় লাগবে না আপনার ঢংয়ের স্যরি।
সে যত নিজেকে নিজের থেকে ছাড়াতে গেল নীল তত তাকে নিজের সঙ্গে ‌আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিল। তাকে নিজের বক্ষদেশে লুকিয়ে বলল,,

—’আ’ম রিয়েলি স্যরি অর্কিড।
তিহু নীলের বুকের স্পন্দন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। তার অভিমানের বরফগুলো যেন নীলের শরীরের উষ্ণতায় একটু একটু করে গলতে শুরু করেছে। তবুও গলার স্বর কিছুটা ভারী করে সে বলল,,
—’সরুন আর ছাড়ুন আমায়।
নীল প্রেয়সীর অভিমানে সামান্য মুচকি হাসলো অতঃপর তাকে আরেকটু কাছে টেনে ললাটে উষ্ণ প্রেম পরশ এঁকে বলল,,

—’ছাড়তে তো ধরিনি প্রিয়তমা।
নীলের প্রতিটি কথায় তিহু আচ্ছন্ন হয়ে আসছে। ধোঁয়াশা ভরা চারিপাশ। নীল হয়ত বুঝলো প্রিয়তমার এমন নাজুক অবস্থা।সে ধীরে ধীরে তিহুর থেকে নিজের থেকে কিঞ্চিৎ দূরত্বে সরালো। পরমুহূর্তেই কোলে তুলে নিলো তাকে।তিহু বিষ্ময়ের চূড়ান্তে পৌঁছে থ’ মেরে আছে। হঠাৎ বিস্ময়তা ছাপিয়ে সে বলল,,
—’ক-কি করছেন? নামান বলছি!
নীল তাকে নিয়ে সম্মুখপানে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,,—’ডোন্ট মুভ।

তিহু ভ্রু কুঁচকে তাকালে; নীল সামান্য হেসে এগিয়ে চলল কেবিনটার পূর্ব পার্শ্বে।তিহু অবাক হয়ে দেখল, নীল দেয়ালে হাত দিয়ে একটি বিশেষ নকশা স্পর্শ করতেই নিঃশব্দে দেয়ালের একটা অংশ সরে গেল। ভেতরে যাওয়ার ছোট একটি পথ উন্মোচিত হলো। তিহুকে কোলে নিয়েই নীল সেই রহস্যময় অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে প্রবেশ করল।
কিছুক্ষণের মাঝেই নিজেকে ‌এক আশ্চর্য মায়াবী আলোয় আচ্ছন্ন পরিবেশে আবিষ্কার করল তিহু।তার মনে হলো সে যেন এক লহমায় বর্তমানের এই যান্ত্রিক ঢাকা শহর থেকে শতবর্ষ আগের কোনো মায়াপু্রীতে এসে উপস্থিত হয়েছে।তিহু বিমূঢ় হয়ে দেখল, চারদিকের দেয়াল জুড়ে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে অজস্র ক্যানভাস। যেথায় শোভিত ‌নিভৃতচারী শিল্পীর হৃদয়ের নিপুণ কারুকাজ।

নীল তাকে নিজের থেকে মুক্ত করতেই তিহু বিস্মিত পদক্ষেপে এগিয়ে গেল ক্যানভাস গুলোর দিকে। মুগ্ধ-পুলকিত দৃষ্টিতে মুহূর্তেই একরাশ বিষ্ময়ে জমা হল। সে দেখল ‌ছবিগুলো কোনো নির্দিষ্ট চেহারার নয়, বরং এক অলীক ছায়া-রমনীর।যার অস্তিত্ব প্রতিটা ক্যানভাসে দীপ্যমান। কোথাও রমনীটি গ্রীবা বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও আবার খোলা চুলের অরণ্যে ঢাকা পড়েছে কোনো তার ‌স্নিগ্ধ মুখশ্রী।
তবে সর্বোচ্চ বিস্ময়াপন্ন ব্যাপারটা হচ্ছে প্রতিটি ছবির সেই ছায়াময়ীর কানে অতি যত্ন করে আঁকা রয়েছে একটি করে নীলচে-বেগুনি অর্কিড।মনে হচ্ছে,এই শিল্পীটা যেন সহস্র বছর ধরে কেবল এই একটি ফুলের খোঁজেই তুলি চালিয়েছেন। তিহুর হৃদস্পন্দন যেন থমকে গেল। সে বুঝতে পারল, এই নির্জন ঘরে নীল নীরবে-নিভৃতে তার হৃদয়ের অর্ঘ্য সাজিয়ে রাখে।
তবে কে এই ছায়া মানবী? এই স্নিগ্ধ রমণীর পরিচয় কি? যাকে নীল এতটা যত্নের সহিত লালন করে আসছে! তিহু অস্ফুট স্বরে বলল,,

—’এটা কে নেতা সাহেব?
তিহু আনমনা বিচলিত ভঙ্গিমায় অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসল নীল।পেছন থেকেই খুব মৃদু স্বরে বলল,
​—’আমার হৃদয়ের বাগানে প্রস্ফুটিত; গভীর প্রেমে লালিত একমাত্র অর্কিড।
তিহু চোখ কুঁচকে তাকাতেই নীল হেসে বলতে শুরু করল,,
—’আমার দীর্ঘ সাধনার ফল; আমার অর্কিড। তুমি জানো না ‌তোমাকে পাওয়ার আগে কি ‌নিদারুণভাবে পুড়েছি আমি তোমার বিরহ অনলে।তোমাকে পাওয়ার জন্য এই আমিটাও‌ অপেক্ষা প্রহর গুনেছি প্রতিক্ষনে।আর তোমাকে দেখার আগ অব্দি এগুলো ছিল আমার অলীক কল্পনায় জাগ্রত তুমি।

​তিহু নির্বাক।ভেতরটা এতক্ষণ যে সংশয়ের মেঘে আচ্ছন্ন ছিল, নীলের সেই গভীর স্বীকারোক্তিতে মুহূর্তেই তা যেন আনন্দ-অশ্রুর শ্রাবণ হয়ে ঝরে পড়ল। অভিমানে যে বুকটা ভার হয়ে ছিল, তা এখন এক অপার্থিব সুখে ভরে গেল।সে অনুভব করল, নীল তাকে শুধু ভালোই বাসেনি, তাকে আরাধনা করেছে এই নির্জন শিল্পালয়ে।
নিজেকে আর সামলাতে না পেরে সে এক নিমেষে সমস্ত দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়ে ঝড়ের বেগে গিয়ে নীলকে জাপটে ধরল। দু-হাত নীলের গলার চারপাশে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে;তার বক্ষদেশে মুখ লুকিয়ে ‌ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
তবে এই কান্না দুঃখের নয়, এ যেন এক পরম প্রাপ্তির তৃপ্তি। নীলও যেন এই মুহূর্তটির জন্যই তৃষিত হয়ে ছিল। সে অতি সাবধানে তিহুকে তার বাহুবন্ধনে আগলে নিল। কেবিনের সেই নিস্তব্ধতার মাঝে শুধু শোনা যাচ্ছিল দুজনের হৃৎপিণ্ডের দ্রুত লয়। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে তিহু বলে উঠলো,,

—’ভালোবাসি মিস্টার পলিটিশিয়ান;খুব খুব খুব ভালোবাসি আপনাকে।
হৃদয়ের অব্যক্ত অনুরক্তি আজ নিঃসংকোচে ব্যক্ত করল সে।আর তার কথাগুলো যেন ‌তপ্ত মরুবালুচরে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নেমে আসা প্রথম শ্রাবণধারা,নীলের কাছে। শ্রাবণ ধারাগুলো যেমন তৃষ্ণার্ত মাটিকে সিক্ত করে এক লহমায় জাগিয়ে তোলে সজীবতার স্পন্দন তেমনি তিহুর বলা কথাগুলোতে নীলের হৃদয়ে যেন তখন এক বসন্তের মাতাল সমীরণ বয়ে গেল। তার সেই সিক্ত কণ্ঠের স্বীকারোক্তি নীলের তপ্ত মরূদ্যানের বুকে এক পশলা বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ল।

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৪

সে তিহুর চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। দেখল, প্রিয়তমার পদ্মফুলের মতো দুটি চোখে জল আর হাসির এক অদ্ভুত লুকোচুরি খেলা।নীল পরম আবেশে ওর ললাটে নিজের ওষ্ঠাধর ঠেঁকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,,
—’তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা ওই মহাকাশের মতো বিশাল, যার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই।অনন্ত অসীম ভালোবাসার পরিণতি পরকাল অব্দি বিস্তৃত।ওই হাশরেও আমি তোমাকে পাশে চাই। কেননা তোমার প্রতি আমি এতটাই মোহগ্রস্ত যা এক জীবনে কাটিয়ে উঠা অসম্ভব।

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৬