Home মোহশৃঙ্খল মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৩ (৩)

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৩ (৩)

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৩ (৩)
মাহা আয়মাত

কারদার ম্যানরের ছাদের এক পাশটা খুব যত্ন করে সাজানো। মূলত এটা বাড়ির দুই ছেলের আড্ডার জায়গা। সেখানে দুটি দুই-সিটের আউটডোর সোফা, একটি আর্মচেয়ার আর মাঝখানে একটি গোলাকার টেবিল রাখা আছে। ছাদের বেশিরভাগ মেঝে কৃত্রিম ঘাস, অর্থাৎ অ্যাস্ট্রোটার্ফ দিয়ে ঢাকা। আদ্রিক, সামির আর ফারিদ অনেকক্ষণ ধরে সেখানে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। এখন তারা ছাদের রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে। সামির আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ ধোঁয়া ছাড়ছে, আর ফারিদ তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে।
ফারিদ বলে,

— ভাই, মুভ অন কর। এভাবে জীবন থামিয়ে রাখলে তো চলবে না।
সামির ফারিদের দিকে তাকিয়ে ব্যাথাতুর কন্ঠে বলে,
— কারোর মায়ায় আটকে গেলে সারাজীবনের কারাদণ্ড! মুভ অন করা যায় না!
তখনি পেছন থেকে কারও পায়ের শব্দ শোনা যায়। কেউ এদিকেই আসছে। তিনজনই ঘুরে তাকিয়ে দেখে আরভিদ তাদের দিকে আসছে।
ফারিদ আরভিদকে দেখে বলে,
— কী অবস্থা আরভিদ? কেমন আছিস?
আরভিদ এসে আদ্রিকের ডান পাশে দাড়িয়ে বলে,
— ভালো। তোর কী অবস্থা?
ফারিদ হেসে বলে,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

— ভালোই।
আদ্রিক বাম হাতে সিগারেট ধরে টানছে আর ডান দিয়ে পকেট থেকে একটা সিগারেট আর লাইটার বের করে আরভিদের দিকে বাড়িয়ে দেয়। আরভিদ সিগারেট ধরিয়ে লাইটারটা আবার আদ্রিককে ফেরত দেয়। সিগারেটে টান দিয়ে সে সামিরের দিকে তাকায়।
সামিরকে এমন মনমরা দেখে ফারিদকে জিজ্ঞেস করে,
— ওর কী হয়েছে? এমন হয়ে আছে কেন?
ফারিদ দুঃখের সুরে বলে,
— সামির একটা মেয়েকে খুব ভালোবেসে ফেলেছে। সমস্যা হলো, মেয়েটা বিবাহিত।
আরভিদ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে,

— বিবাহিত তো কী হয়েছে? ছেলে পাঠিয়ে তুলে আনব! কাকে ভালোবাসিস? নাম বল!
আদ্রিক একদম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে ওঠে,
— তোর বউকে।
আরভিদের সঙ্গে সঙ্গে সামিরের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,
— মাদারবোর্ড!
ফারিদ তাড়াতাড়ি বলে,
— আরে থাক, ছেড়ে দে!
আরভিদ রেগে বলে,

— ছেড়ে দেবো মানে? আমার বউয়ের দিকে তাকায়, আবার বলে ভালোবাসে!
সামির এবার আরভিদের দিকে তাকায়। শান্ত গলায় বলে,
— জানতাম নাকি ওটা তোর বউ? জানার পর চোখ তুলেও তাকাইনি!
আরভিদ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,
— তাকাবিও না! না হলে তোর চোখ দিয়ে মার্বেল খেলব!
সামির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
— নতুন করে তাকাচ্ছি না ঠিকই, কিন্তু মনে যে ছবিটা ছাপা পড়ে গেছে, সেটার কী হবে?
আরভিদ দাঁত খিচিয়ে বলে,
— তোর মনটা খুলে ওয়াশিং পাউডার দিয়ে ধুয়ে দেবো, তাহলে চলবে?
আদ্রিক নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে,
— রিলাক্স আরভিদ! এত হাইপার হচ্ছিস কেন?
আরভিদ আরও চটে যায়।
— আমার বেলায় বলছিস রিলাক্স হতে? নিজের বেলায় মানুষ মারিস!
আদ্রিক ঠান্ডা গলায় বলে,

— তোকে কি আমি মারতে মানা করেছি নাকি? রিলাক্স থেকেও মানুষ মারা যায়। চিলেকোঠার রুমটাতে নিয়ে কিমা বানিয়ে ফেল।
সামির আর ফারিদ বিরক্ত দৃষ্টিতে আদ্রিকের দিকে তাকায়। ওরা ভেবেছিল আদ্রিক বন্ধুত্বের খাতিরে আরভিদকে শান্ত হতে বলছে অথচ সে উল্টো কথা বলছে। আদ্রিকের কাছ থেকে ‘ছেড়ে দেওয়া’ জিনিসটা আশা করাই তাদের সবচেয়ে বড় ভুল। যে ছেলে নিজের বউয়ের দিকে কেউ ভুলক্রমে তাকালেও সহ্য করতে পারে না, তার কাছ থেকে ছেড়ে দেওয়া জিনিসটা আশা করাই অপরাধ।
দুজনেই আবার আরভিদের দিকে তাকায়। আরভিদ তখনও রাগে ফুঁসছে।
ফারিদ আরভিদের কাছে এগিয়ে এসে আরভিদের কাঁধে হাত রেখে বলে,

— মামা, শান্ত হ। তোর বউ তো তোরই আছে। বেচারা শুধু বলেছে, পছন্দ হয়েছে।
আরভিদ কড়া গলায় বলে,
— পছন্দ হয়েছে, এই কথাটাও বলতে পারবে না। আমার বউয়ের দিকে কেউ তাকাবে সেটা আমি সহ্য করব না।
ফারিদ বোঝানোর চেষ্টা করে,
— আচ্ছা ঠিক আছে। সামির আর তাকাবে না। এমনিতেও পরশু ও ইংল্যান্ড চলে যাচ্ছে। তাকাতাকির সুযোগই থাকবে না।
আরভিদ সঙ্গে সঙ্গে বলে,

— যাওয়ার আগে ও আমার বউকে মামি ডেকে যাবে।
সামির স্তব্ধ হয়ে আরভিদের দিকে তাকিয়ে থাকে। আরভিদের কথাটা যেন মাথার ওপর দিয়ে যায়। নিজের ভালোবাসার মানুষকে শেষমেশ ‘মামি’ ডাকতে হবে!
ফারিদ অবাক হয়ে বলে,
— ভাই, এসব কী বলছিস? তোর ওই পুচকে বউকে মামি ডাকবে কীভাবে?
আরভিদ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
— অবশ্যই মুখ দিয়েই ডাকবে। পেছন দিক দিয়ে তো আর ডাকা যায় না!
ফারিদ একটু বিরক্ত হয়ে বলে,
— মুখ দিয়ে ডাকবে সেটা বুঝলাম, কিন্তু ‘মামি’ ডাকাটা একটু অকোয়ার্ড না?
আরভিদ কটমট করে সামিরের দিকে তাকিয়ে বলে,
— বন্ধুর বউয়ের দিকে নজর দেওয়াটা কি অকোয়ার্ড না?

ফারিদ হতাশ চোখে আরভিদের দিকে তাকিয়ে থাকে। বোঝাই যাচ্ছে, আরভিদ একচুলও নড়বে না কথা থেকে। এবার ফারিদ আদ্রিকের দিকে তাকায়। আদ্রিক নির্লিপ্তভাবে সিগারেটে টান দিচ্ছে, যেন কোনো মুভি দেখছে। দুনিয়াতে এমন শান্ত মানুষ যে হতে পারে, সেটা আদ্রিককে না দেখলে বিশ্বাসই করা যেত না। ফারিদ চোখের ইশারায় আদ্রিককে আরভিদকে বোঝাতে বলল। আদ্রিক কাঁধ ঝাঁকিয়ে বুঝায়, সে কিছু জানে না।
তখনি সেখানে মেহজা এসে হাজির। তাকে দেখেই আরভিদ মুহূর্তেই শান্ত হয়ে যায়। মুখের রাগ মিলিয়ে যায়, ভেতরের উত্তেজনাও দমে যায়। হাতে থাকা সিগারেটটা মাটিতে ফেলে দেয়। ফারিদ আর সামিরও সঙ্গে সঙ্গে সিগারেট ফেলে দেয়। মেহজার সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাওয়া মানায় না। শুধু আদ্রিকই সিগারেট ফালায় না।
মেহজা আরভিদের পাশে এসে জিজ্ঞেস করে,

— ছাদে কী করছেন?
আরভিদ সামিরের দিকে তাকিয়ে দেখে, সামির মেহজার দিকেই তাকিয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে কটমট করে তাকিয়ে ইশারা করে চোখ সরাতে। সামির সেটা দেখে চোখ নামিয়ে নেয়।
আরভিদ এবার মেহজার বাহু জড়িয়ে কাছে টেনে হেসে বলে,
— কথা বলছিলাম, জান।
মেহজা কৌতূহলী হয়ে বলে,
— কী নিয়ে? আমিও একটু শুনি।
ফারিদ হেসে বলে,
— বলো না বোন, আমাদের সামির একটা বিবাহিত মেয়ের প্রেমে পড়েছে। আমরা সবাই মিলে ওকে মুভ অন করানোর চেষ্টা করছি।
সামির বিরক্ত হয়ে ফারিদের দিকে তাকায়। তার ইচ্ছে করছে এক লাথিতে ফারিদকে ছাদ থেকে ফেলে দিতে। পেটে কোনো কথা রাখতে পারে না। যাকে সামনে পাচ্ছে, সব বলে দিচ্ছে।
মেহজা সামিরের দিকে তাকিয়ে বলে,

— শুনেন ভাই, আশা নাই যেখানে,
আগুন লাগুক সেখানে!
ফারিদ সঙ্গে সঙ্গে সায় দেয়,
— একদম ঠিক কথা, বোন।
তারপর আরভিদের দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে বলে,
— বুঝলি? আগুন লাগুক সেখানে!
আরভিদ রেগে চেঁচিয়ে ওঠে,
— ওই সালা! কী আগুন লাগুক? একদম ওপরে পাঠিয়ে দেব! সংসার নিয়ে কথা বললে!
আরভিদকে আচমকা রেগে যেতে দেখে মেহজা অবাক হয়ে বলে,
— আপনি এত রেগে যাচ্ছেন কেন?
মেহজার কথায় আরভিদের হুস হয়। আরভিদ রাগ লুকিয়ে হাসার চেষ্টা করে বলে,
— মানে, একটা ভালো সংসারে কেন আগুন লাগবে?
মেহজা বলে,

— আমি তো মোটিভ করছিলাম!
আরভিদ কপালে হাত চাপড়ে বিড়বিড় করে বলে,
— অন্যকে মোটিভ করতে গিয়ে আমাদের সংসারটাই খেয়ে ফেলবি জান!
মেহজা বিভ্রান্ত হয়ে বলে,
— কী বলছেন? শুনতে পাচ্ছি না তো!
আরভিদ মেহজার দিকে তাকিয়ে বলে,
— কিছু না। তুই নিচে যা।
তারপর সামিরের দিকে তাকিয়ে বলে,
— ছাদে বেশি থাকার দরকার নেই। খারাপ নজর লাগবে।
মেহজা বলে,

— আচ্ছা।
আরভিদ হঠাৎ সামিরকে বলে,
— বাই বল মামিকে!
মেহজা চমকে ওঠে,
— মামি? মামি কে?
ফারিদ হেসে বলে,
— তুমি। সামিরের মামি!
মেহজা ভ্রু কুঁচকে বলে,
— কোন এঙ্গেল থেকে আমাকে মামি লাগে? আমার মতো জুয়ান মেয়ে এমন দামড়া ব্যাটার মামি কীভাবে হয়?
আরভিদ বলে,

— এটা ফ্রেন্ডদের ভাষা। আমরা একে অপরকে মামা ডাকি। তুই আমার বউ, তাই ওদের মামি।
মেহজা বুঝতে পেরে বলে,
— ওহ।
— হুম। এখন সামির, আমার বউকে মামি ডেকে গুড বাই দে।
সামির অসহায় চোখে একবার আদ্রিকের দিকে তাকায়। আদ্রিক আগের মতোই চিল মুডে। এতে সামিরের রাগ আরও বেড়ে যায়।
আরভিদ তাড়া দিয়ে বলে,
— তাড়াতাড়ি বল! আমার বউ নিচে যাবে!
সামির বুঝতে পারে না বলে উপায় নেই। সে আস্তে করে বলে,
— বাই মামি।
আরভিদ চোখ সরু করে বলে,
— শুনিনি! জোরে বল! বোবা নাকি?
সামির দাঁতে দাঁত চেপে জোরে বলে,
— বাই মামি!

মেহজা সৌজন্যমূলক একটা হাসি দেয়। তারপর আদ্রিকের দিকে তাকায়। সে প্রথমেই এসে খেয়াল করেছে সবাই তাকে দেখে সিগারেট ফেলে দিলেও আদ্রিক ফালায়নি।
মেহজা চোখ সরু করে বলে,
— সহবত নেই? বড় ভাবির সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছেন?
আদ্রিক সিগারেট ঠোঁট থেকে সরিয়ে মেকি হাসি দিয়ে বলে,
— তাহলে সোফায় গিয়ে বসে খাবো, ভাবি?
মেহজা রাগে ফুঁসে ওঠে,
— দুনিয়ার কয়েক হাজার শয়তান মরার পর আপনার জন্ম হয়েছে!
আদ্রিক হেসে বলে,
— আমার জন্মের পর তোমার জন্ম হয়েছে, তাহলে ভাবো তুমি কত বড় শয়তান!
— ফালতু লোক!
তারপর আরভিদের দিকে তাকিয়ে বলে,

— তাড়াতাড়ি নিচে আসবেন। আমি যাচ্ছি।
আরভিদ মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। মেহজা চলে যায়।
আদ্রিকের সিগারেট শেষ হয়ে আসায় সেটা মাটিতে ফেলে সামিরকে বলে,
— আয়, সোফায় গিয়ে বসি।
সামির রেগে বলে,
— বস তুইই! এতক্ষণ চুপ ছিলি, এখন কথা বলছিস কেন? আমি থাকব না তোর বাড়িতে। ডেকে এনে ক্রাশকে মামি ডাকিয়েছিস!
বলেই চলে যেতে নেয় তখনি আরভিদ তাকে আটকায়।
সামির অভিমান করে বলে,
— ভাই, আটকাস না। যা করেছিস!
আরভিদ শান্ত গলায় বলে,
— তোকে থাকার জন্য আটকাচ্ছি না। দুই মিনিট পরে যা।
সামির বুঝতে না পেরে বলে,

— কেন?
— মেহু রুমে পৌঁছাক তারপর যাবি। না হলে সিঁড়িতে ওকে দেখে ফেলবি।
সামির বিরক্ত হয়ে বলে,
— সালা, কী যে প্যারা দিচ্ছিস! আল্লাহ তোদের দুই ভাইয়ের বিচার করবে!
আরভিদ বলে,
— এখন যা।
সামির চলে যায়। ফারিদ বলে,
— কাজটা ঠিক করিসনি। ছেলেটা এখন মায়ের আঁচলে গিয়ে কাঁদবে মুখ লুকিয়ে। জীবনের প্রথম ভালোবাসাকে কিনা মামি ডাকিয়েছিস!
আরভিদ ঠান্ডা গলায় বলে,
— আরেকটা কথা বললে তোর গার্লফ্রেন্ড তৃণার বিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর ছেলের সাথে দিয়ে দেব!
ফারিদ সঙ্গে সঙ্গে বলে,

— ভাই, আমিও যাই। গাড়ি আনিনি, সামিরের গাড়িতেই এসেছি!
ফারিদ চলে যেতেই আদ্রিক গিয়ে সোফায় বসে, ঠাট্টার সুরে বলে,
— তুই দেখি শিক্ষামন্ত্রীকে খুব মিস করছিস? ব্যাপার কি?
কথাটা শোনামাত্র আরভিদ এগিয়ে গিয়ে আদ্রিকের নাক বরাবর ঘুষি মারতে নেয়। কিন্তু আদ্রিক ঝট করে আরভিদের মুঠোবদ্ধ হাতটা ধরে ফেলে। আদ্রিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— হোয়াট দা ফাচ আরভিদ! লেগে গেলে নাকটা ভেঙে যেতো!
আরভিদ জোরে নিজের হাতটা টান দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,
— তোর নাক না! তোর শরীরের ২০৬ টা ভেঙে ফেলবো জানোয়ার!
আদ্রিক সোফায় হেলান দিয়ে বলে,
— সালা বসে কথা বল! এমন হাইপার হচ্ছিস কেন?
আরভিদ পাশের আর্মচেয়ারে বসে রাগে গজগজ করতে থাকে।

— জানোয়ার তুই কি শান্ত থাকার মতো কাজ করেছিস!
— কি করেছি আমি?
— নাটক করবি না জানোয়ার! তুই ব্রেকফাস্ট টেবিলে কিসব বলেছিস? নিলজ্জ একটা!
আদ্রিক ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
— বাহ! রাতে হার্ডওয়ার্ক করেছিস তুই আর নিলজ্জ আমি?
— তুই যা ভাবছিস রাতে এমন কিছুই হয়নি!
আদ্রিক মেকি হাসি দিয়ে বলে,
— হুম তুই বললি আর বিশ্বাস করলাম!
আরভিদ অধৈর্য কন্ঠে বলে,
— বিশ্বাস না করলে মর গিয়ে! কিন্তু তার আগে বলে যা তুই জানলি কিভাবে বেডে…
কথাটা শেষ করতে পারে না আরভিদ, থেমে যায়। এসব কথা কি বলা যায় নাকি? সে তো আট আদ্রিকের মতো নিলজ্জ না।
আদ্রিক চওড়া হাসি দিয়ে বলে,

— রাতে তোকে ওমন লাথি খেয়ে রুম থেকে বের হতে দেখে খুব কষ্ট হচ্ছিলো। সারারাত ঘুমাতে পারিনি তোর চিন্তায়! সকালে ওঠে তোর রুম গিয়ে দেখি রুম খালি আর বেড রেড হয়ে আছে!
আরভিদ রাগ আর বিরক্তি মিশ্রিত কন্ঠে বলে,
— আর কত মিথ্যে বলবি জানোয়ার? আমার চিন্তায় তুই ঘুমাস নাই?
আদ্রিক নির্বিকারভাবে বলে,
— সত্যি ঘুম আসেনি চোখে তোর টেনশনে! তাই সারাটা রাত তোর বোনকে আদর করেছি!
আরভিদ দাঁত খিচিয়ে বলে,
— আদ্রিক তুই কিন্তু মরবি এসব নিলজ্জ কথার কারণে!
আদ্রিক হেসে বলে,
— তুই বউকে আদর করলে ভালোবাসা আর আমি করলেই নিলজ্জ! মে কারো তো সালা ক্যারেক্টার ঢিলা হে!
আরভিদ বিরক্ত স্বরে বলে,

— বললাম তো কালকে কিছু হয়নি। আর আমি তোর মতো নিলজ্জের মতো বলে বেড়ায় না এসব!
আদ্রিক চওড়া হাসি দিয়ে বলে,
— একটুখানি হাসলাম তোর কষ্টের কথা শুনে!
আরভিদ ক্ষোভে ফেটে পড়ে,
— হাসবিই তো জানোয়ার! সকলের সামনে আমাকে অকোওয়ার্ড করতে তোর তো ভালোই লাগে! তারপর জানোয়ার এগুলো বলেই থামিসনি! তৃণার সাথে আমি হেসে হেসে কথা বলেছি এসব বললি কেন? জানোয়ার কোথাকার! তোর জন্য কি প্যারাটাই না খেতে হয়েছে!
আদ্রিক চোখ টিপে বলে,
— মেরেছে নাকি আবার? অবশ্য মারলেও সমস্যা নেই তোর বউ মলম লাগাতে পারে! দেয়নি মলম লাগিয়ে?
আরভিদ দাঁত চেপে বলে,

— জানোয়ার তোকে যত গালি দিবো তত কম!
— আচ্ছা আয় চেস খেলি! অনেকদিন ধরে খেলা হয় না!
আরভিদ কিছু বলে না। না বারণ করে আর না সম্মতি দেয়। চুপ থাকাকেই আদ্রিক রাজি হওয়া ধরে নেয়।
আদ্রিক পাশ থেকে দাবার বক্স নিয়ে টেবিলের ওপর রাখে। বক্স খুলে সাদা গুটিগুলো একদিকে আর কালো গুটিগুলো আরেকদিকে সাজাতে থাকে। সব গুছিয়ে নিয়ে বলে,
— খেলা স্টার্ট।

আদ্রিক নেয় সাদা গুটি, আরভিদ কালো। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম চালটা দেয় আদ্রিক। সে নিজের দিকের ভোড়েকে দুই ঘর সোজা সামনে এগিয়ে দেয়। আরভিদও নিজের ভোড়েকে দুই ঘর সামনে আনে।
আদ্রিক এবার নিজের ঘোড়াকে বের করে আনে, এক ঘর সামনে, এক ঘর পাশ দিয়ে লাফ। আরভিদ নিজের ঘোড়াকে লাফিয়ে এমন জায়গায় রাখে, যেখান থেকে মাঝখান আর রাজা, দুটোই নজরে থাকে। আদ্রিক নিজের হাতিটাকে তির্যকভাবে লম্বা পথে চাল দেয়। আরভিদের রাজপক্ষ সরাসরি লক্ষ্যবস্তু। আরভিদ পাল্টা নিজের হাতি নামায়, আদ্রিকের কেন্দ্রীয় ভোড়ের উপর চোখ রেখে।

আদ্রিক নিজের রানিকে সামনে আনে, রানি সোজা ও তির্যক দুই দিকেই চাপ সৃষ্টি করে। আদ্রিক ঠোঁটের কোনে সূক্ষ্ম হাসি টেনে তাকায় আরভিদের দিকে। আরভিদ গম্ভীর চোখে খেলায় তাকিয়ে ছিলো। এবার খেলা থেকে চোখ সরিয়ে আদ্রিকের দিকে তাকায়। আরভিদ আবার বোর্ডে তাকিয়ে নিজের ঘোড়াকে পিছন থেকে সামনে এনে রাজাকে ঢেকে দেয়।
একটার পর একটা গুটি বোর্ড থেকে সরে থাকল। খেলায় টান টান উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আদ্রিক তার নৌকাকে সোজা পথে খোলা লাইনে তোলে।আরভিদও নিজের নৌকাকে ঠিক তার সামনে এনে দাঁড় করায়। খেলা এখন পুরোপুরি মুখোমুখি লড়াই।

নিরব রুমটাও যেন চিন্তার ভারে অস্থির হয়ে আছে। এসির ঠান্ডা বাতাস, যা স্বস্তি দেওয়ার কথা, তা আজ সবার কাছে বিষের মতো লাগছে। ঠান্ডা বাতাসের মাঝেও রুমে থাকা প্রত্যেকের ভেতরে অস্বস্তি আর দুশ্চিন্তা জমে আছে। রুমের ভেতরে বেডে আধশোয়া হয়ে বসে আছেন ওসমান ফারুকী। ওনার মাথার পাশে একজন দাঁড়িয়ে মাথা টিপছে, আরেকজন পায়ের কাছে বসে পা টিপছে। চোখ বন্ধ করে রেখেছেন তিনি, কিন্তু মাথার ভেতর দুশ্চিন্তার পাহাড়।
নিজের গুপ্তচর যদি শত্রুর হাতে পড়ে যায়, তাহলে কারই বা শান্তি থাকে? তার ওপর শত্রুর বিরুদ্ধে জোগাড় করা শক্ত প্রমাণগুলো যদি হাতছাড়া হয়ে যায়, তাহলে অস্থির না হয়ে উপায় কী? হঠাৎ পিনপিনে নিরবতা ভেঙে দরজায় নক করার শব্দ হয়। তবুও ওসমান ফারুকী চোখ খোলেন না। দরজা খুলে এক যুবক ভেতরে ঢোকে। সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই পা টিপতে থাকা লোকটি তাকে নিচু স্বরে কথা বলতে ইশারা করে।
ছেলেটা ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে,

— স্যার, নিচে ঝামেলা হয়েছে! ইমাদ স্যার রেগে নিচের সবকিছু ভাঙচুর করছেন!
ওসমান ফারুকী বিরক্ত হয়ে চোখ খুলে রাগমিশ্রিত কণ্ঠে বলেন,
— কেন, কী হয়েছে আবার?
ছেলেটা বলে,
— স্যার, ঐ আইনমন্ত্রী আরভিদ কারদার…
‘আরভিদ’ নামটা শুনেই ওসমান ফারুকীর মুখের বিরক্তি মিলিয়ে যায়। চোখে কৌতূহল ভর করে। কিন্তু ছেলেটা মাঝপথে থেমে যাওয়ায় তিনি রেগে চেচিয়ে ওঠেন,
— অর্ধেক বলে থেমে গেছিস কেন? বাকিটা গিয়ে কবরে বলার ইচ্ছে আছে?
ছেলেটা তাড়াতাড়ি বলে,
— না না স্যার। আরভিদ কারদার সায়েমকে মেরে ফেলেছে, সাথে একটা পার্সেলও পাঠিয়েছে! যেটা দেখেই ইমাদ স্যার রেগে আছেন।
ওসমান ফারুকী অবাক হয়ে বলেন,

— কি পার্সেল?
এই কথা বলেই তিনি আর বসে থাকেন না। মাথা আর পায়ের কাছে থাকা দুজনকে ঝাড়ি মেরে সরিয়ে বেড থেকে নেমে স্যান্ডেল পরে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে পড়েন। লিভিং রুমে ঢুকতেই বড় ছেলের চিৎকার আর ভাঙচুরের শব্দ শুনতে পান।
সোফায় বসে আছে ইমাদ ওসমান ফারুকী। হিংস্র বাঘের মতো ফুঁসছে। তার চোখ আটকে আছে সামনে টেবিলের ওপর রাখা একটি বক্সের দিকে। প্রশস্ত শ্যামলা বুকটা রাগে ওঠানামা করছে। সোফার হাতলে রাখা বাম হাতের আঙুলগুলো অস্থিরভাবে নড়ছে। মধ্যমা আঙুলে সিংহের গর্জনের মতো আংটি।

ওসমান ফারুকী লিভিং রুমে ঢুকেই টেবিলের ওপর রাখা গিফট বক্স দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলেন। তারপর ছেলের দিকে তাকান। ইমাদকে বক্সের দিকে তাকিয়ে ফুঁসতে দেখে কৌতূহল জাগে। এগিয়ে গিয়ে বক্সের ভেতরে তাকাতেই তিনি বিস্ময়ে থমকে যান।
বক্সের ভেতরে রক্তমাখা একটি কাটা আঙুল। আঙুলে পরা কালো পাথরের আংটি দেখে সঙ্গে সঙ্গে বুঝে যান, এটা সায়েমের আঙুল। কারণ আংটিটা সায়েমেরই। রাগে ওসমান ফারুকীর মাথা গরম হয়ে যায়।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সুভাষের দিকে তাকিয়ে বলেন,

— এটা কে পাঠিয়েছে?
সুভাষ কিছু বলার আগেই ইমাদ গর্জে ওঠে,
— বুঝো না কে পাঠিয়েছে? ঐ সালা আইনমন্ত্রী কুত্তার বাচ্চা পাঠিয়েছে!
ওসমান ফারুকী একবার ইমাদের দিকে তাকিয়ে সিঙ্গেল সোফায় বসেন। সামনে দাঁড়িয়ে আছে সুভাষ, তার পেছনে আরও কয়েকজন সদস্য।
ওসমনা ফারুকী আবার জিজ্ঞেস করেন,
— কে দিয়ে গেছে এই পার্সেল?
সুভাষ বলে,

— ঐ রাব্বি দিয়ে গেছে।
ওসমান ফারুকী কাউকে পাঠান ওনার ফোন আনতে। ফোন আসার পর তিনি কল দেন। কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর কল রিসিভ হয়।
ওসমান ফারুকী রাগ চেপে শক্ত কণ্ঠে বলেন,
— এটা কি পাঠিয়েছো?
ওপাশ থেকে আরভিদের কৌতুকমিশ্রিত কণ্ঠ ভেসে আসে,
— পছন্দ হয়নি আপনার? আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন? ওরা আঙুলই তো পাঠিয়েছে? নাকি মাথা পাঠিয়েছে? আপনি বললে আরেকটা আঙুল…
ওসমান ফারুকী আরভিদকে থামিয়ে চাপা ক্ষোভে বলেন,
— চুপ! আজকে তুই যে কাজটা করেছিস, এর পরিণাম খারাপ হবে! মনে রাখিস!
আরভিদ হেসে বলে,

— বুকে আগুন জ্বলছে তাই না? ফায়ার সার্ভিসকে ফোন দিবো?
— তুই এটা করে কি ভাবছিস, তুই বিশাল কিছু কইরা ফেলছিস?
আরভিদ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে,
— সামান্য একটা মাছি মেরে আমি কেন ভাববো বিশাল কিছু করেছি?
ওসমান ফারুকী যেন রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন।
— সালা কুত্তা…
আরভিদ কর্কশ গলায় বলে,
— তোর জ্বিহা টেনে ছিঁড়ে ফেলবো, শুয়োরের বাচ্চা!
হঠাৎ ইমাদ এসে ওসমান ফারুকীর হাত থেকে ফোনটা ছোঁ মেরে নেয়। গর্জে বলে,
— এই আরভিদ, জীবনে যেদিন সুযোগ পাবো, সালা তোকে আমি সহ আমার দলের প্রত্যেকটা মানুষ একটা করে কোপ দিবো! শুনে রাখ!
ওপাশ থেকে আরভিদ বাজখাঁই কন্ঠে বলে,,

— তুইও মাথায় রাখিস, তুই সুযোগের জন্য অপেক্ষা করা লাগলেও আমি চাইলে দু মিনিটে তোকে তুলে এনে কুপিয়ে ফেলবো! আর আজকের গিফট দেখলি না?
ইমাদ রাগে জোরে বলে,
— তাতে আমার বাল ছেঁড়া গেছে!
আরভিদ ঠান্ডা স্বরে বলে,
— জাস্ট চিন্তা কর, আমি তেমন কিছু করলামই না, তাতেই তোর বাল ছিঁড়ে গেছে। এখন আমি যদি কিছু করি, তাহলে তোর চুলের অবস্থা কী হবে? ভাবার বিষয় কিন্তু! তোরা বাপ ছেলে ভাব বসে বসে!
বলেই আরভিদ ফোন কেটে দেয়। ইমাদ রাগে ফোনটা ছুড়ে মারে। ফোনটা আছড়ে পড়ে দূরে গিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
ইমাদ সায়েমের কাটা আঙুলের দিকে তাকিয়ে দাঁত চেপে বলে,

— এই বাই*চো*কে মেরে ফেলেছে, ভালো কাজ করেছে! বাই*চো* বালপাকনা! প্রমাণগুলো জোগাড় করে আমাদের পাঠায় নাই কেন সাথে সাথে? কী সলিড প্রমাণ ছিল! ঐ আরভিদের থেকে আইনমন্ত্রী পদটাই চলে যেত! তখন দেখতাম ঐ সালার পাওয়ার! সালা শুধু পাওয়ার দেখায়!
কয়েকবার গভীর শ্বাস নিয়ে আবার বলে,
— এইবার বেঁচে গেছিস কপালের জোরে, আরভিদ! তোকে পদ থেকে সরাতে না পারলেও দুনিয়া থেকে ঠিকই সরাবো! এটা ইমাদ ওসমান ফারুকীর ওয়াদা!

আরভিদ কান থেকে ফোনটা নামিয়ে সামনের টেবিলে রেখে দেয়। তারপর আবার দাবার বোর্ডের দিকে মন দেয়। ঘোড়া দিয়ে চাল দেয়। আদ্রিক নিজের হাতিটাকে তির্যক পথে এগিয়ে নেয়। চাল দেওয়ার পর শান্ত চোখে আরভিদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— ইমাদ ছিলো নাকি?
আরভিদ নিজের রাজাকে এক ঘর পাশে সরিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দেয়,
— হুম।
আদ্রিক ভ্রু কুঁচকে বলে,
— ষাঁড়ের মতো চেচাচ্ছিলো কেন?
আরভিদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলে,

— চেচাবে না? ওদের প্রিয় গুপ্তচরের আঙুল কেটে গিফট করেছি! সেটা দেখেই বাপ-ছেলে খুশিতে পাগল হয়ে গেছে!
আদ্রিক নিজের রানিকে সোজা এক ঘর সামনে এগিয়ে নেয়। আদ্রিক আরভিদের রাজাকে পাশ থেকে নৌকা আর হাতি, দুজনেই পথ আটকে দেয়। আদ্রিক হালকা হেসে আরভিদের দিকে তাকায়। ঠোঁটে অভ্যাসগত হাসিটা ঝুলিয়ে বলে,
— চেকমেট ব্রো!
আরভিদ তাকিয়ে দেখে, তার রাজা আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। খেলা শেষ। আদ্রিক জিতে গেছে। আরভিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর্মচেয়ারে হেলান দিয়ে বলে,

— নিচে যাবি না?
— আরেকটু পরে যাবো!
— আচ্ছা, তুই থাক। আমি যাই।
আরভিদ উঠে দাঁড়িয়ে ছাদ থেকে নেমে করিডোরে আসতেই তাহিয়া কারদারের সঙ্গে দেখা হয়। ছেলেকে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করেন,
— কখন এসেছো বাসায়?
আরভিদ অন্যদিকে তাকিয়ে ভারী গলায় বলে,
— সন্ধ্যা হওয়ার কিছুক্ষণ আগে।
আরভিদকে এমনভাবে কথা বলতে দেখে তাহিয়া কারদারের কাছে ঠিক লাগে না। বুঝতে পারেন, ছেলের কিছু একটা হয়েছে। তিনি ফের প্রশ্ন করেন,

— কখন এসেছো তুমি? খেয়েছো দুপুরে?
আরভিদ এবার তাহিয়া কারদারের দিকে তাকায় তীব্র দৃষ্টিতে।
— আমার খাওয়া নিয়ে এতো চিন্তা?
তাহিয়া কারদার অবাক হয়ে বলেন,
— আমার ছেলে তুমি! তোমার খাওয়া নিয়ে চিন্তা হবে না আমার?
আরভিদ তিক্ত কন্ঠে বলে ওঠে,
— আমি তোমার ছেলে দেখে আমার খাওয়ার চিন্তা হয় তোমার! অথচ আমার বউটা যে না খেয়ে রুমে পড়ে থাকলো, একটাবার খোঁজও নাওনি!
তাহিয়া কারদার বুঝতে পারেন, ছেলের এমন ব্যবহারের কারণ। তিনি বলেন,

— আমি পাঠিয়েছিলাম মেইডকে মেহজার কাছে! মেহজা মেহেদী দিচ্ছিলো!
— শুনেছো মম, মেহেদী দিচ্ছে, তারপরও এসে খাইয়ে দাওনি! মেয়েটা বিকেল পর্যন্ত না খেয়ে ছিলো!
তাহিয়া কারদার বিরক্ত হয়ে বলেন,
— আশ্চর্য আরভিদ! তোমার বউ ছোট বাচ্চা না! যে তাকে খাইয়ে না দিলে সে খেতে পারবে না! কিংবা তার ক্ষিদে লাগলে বলতে পারবে না!
আরভিদ দৃঢ় কন্ঠে বলে,
— তাহলে আমার বেলা অস্থিরতা কেন? আমিও ক্ষিদে লাগলে খাবো!
তাহিয়া কারদার জিজ্ঞেস করেন,

— তোমার কাছেই কি তোমার বউই সব? মা-বাবা কিছু না? আমাদের ভালোবাসা চোখে পড়ে না? সারাক্ষণ বউয়ের হয়ে মা-বাবার সাথে রাগ দেখাও! বিয়ের পর থেকে তোমার মুখে বউ ছাড়া আর কোনো কথাই ওঠে না!
আরভিদ চাপা কষ্ট নিয়ে বলে,
— চোখে পড়বে কিভাবে মম? ভালোবাসা তো নিচে চাপা পড়ে যায়, আমার বউয়ের প্রতি তোমাদের বিরক্তি, রাগ, অবহেলা এগুলোর নিচে! সেদিন এতো করে বুঝালাম, যে আমার বউটাকে একটু ভালোবাসো! কিন্তু কি হলো আমার বুঝানোর? এই যে আমি ছিলাম না! আমার বউটার খোঁজ নেওয়ার জন্য কেউ ছিলো না! এতোগুলো মানুষ বাসায়, অথচ আমার বউয়ের জন্য কেউ নেই!
তাহিয়া কারদার রেগে যান।

— তোমার ড্যাড ঠিকই বলে, তুমি বউ ছাড়া কিছু বুঝো না!
আরভিদ তাচ্ছিল্যের কন্ঠে বলে,
— বউ ছাড়া কিছু না বুঝে উপায় আছে? আর কেউ তো আমার বউয়ের খোঁজ নেয় না! আমি বুঝতে পারি না, আমার বউ কী এমন করেছে যে সবার চোখের কাটা হয়ে গেলো? ঠিক আছে, বলবো না আর আমার বউকে ভালোবাসতে! আমার বউয়ের জন্য আমি আছি!
এই কথা বলে আরভিদ তাহিয়া কারদারের দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তখনি হঠাৎ জোরে একটা উদ্ভট গান ভেসে আসে। তাহিয়া কারদার আর আরভিদ, দুজনেই চমকে ওঠে। একে অপরের দিকে তাকিয়ে তারপর শব্দের উৎসের দিকে তাকায়। বুঝতে দেরি হয় না, গানের আওয়াজ আরভিদের রুম থেকে আসছে। এই সময় ছাদ থেকে আদ্রিকও নেমে আসে। গানের শব্দ শুনে সে প্রথমে আরভিদের রুমের দিকে, তারপর আরভিদের দিকে তাকায়।
তাহিয়া কারদার বলেন,

— গানটার শব্দ তোমার রুম থেকে আসছে।
আরভিদ কোনো কথা না বলে তাহিয়া কারদারের দিকে তাকায়, তারপর নিজের রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করে। পেছনে পেছনে তাহিয়া কারদার আর আদ্রিকও যায়। রুমের কাছে আসতেই গানের আওয়াজ আরও দ্বিগুণ হয়ে যায়। এবার আরো নিশ্চিত হয়, গানটা তার রুম থেকেই আসছে।
আরভিদ একবার তাহিয়া কারদার আর আদ্রিকের দিকে তাকায়। ওরাও আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে।
আরভিদ ধীরে দরজাটা খুলে ভেতরে তাকাতেই দেখে, বেডের ওপর মেহজা আর মিশান উড়াধুরা নাচছে।
আরভিদ হতভম্ব হয়ে যায়। তাহিয়া কারদারও তাই।

আদ্রিক অবশ্য অবাক হয় না। সে আন্দাজ করেছিল, এই কাণ্ড মেহজারই হবে। এমন চিপ গান, তাও আবার এমন জোরে, মেহজা ছাড়া আর কেউ বাজাতে পারে না। আরভিদ আড়চোখে একবার তাহিয়া কারদারের দিকে তাকায়। তিনি এখনো বিস্ময়ে স্থির হয়ে আছেন। ওদের হতভম্ব হওয়ার কারণ নাচ না। কারণটা গান।
মেহজা আর মিশান যে গানে নাচছে, সেটাই তাদের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে। ‘যদি কেউ রাজমিস্ত্রীর কাম করতে চান বারোশো টাকা হাজিরা পাইবেন।’ — এই গানে তারা নাচছে। আরভিদের দৃষ্টি ধীরে ধীরে হতভম্বতা থেকে হতাশায় বদলে যায়।
মেহজা বেডের ওপর নাচতে নাচতে গলা ফাটিয়ে গান গাইছে,

— যদি কেউ রাজমিস্ত্রীর কাম করতে চান বারোশো টাকা হাজিরা পাইবেন। কাজটা হইলো বিজয়পাড়া। যদি কেউ এই কাজটা করতে চান যোগাযোগ করবান।
আরভিদ ডাক দেয়,
— মেহু?
কিন্তু মেহজা শোনে না। আরভিদ এগিয়ে গিয়ে টেবিলের ওপর রাখা ছোট সাউন্ড বক্সটায় চাপ দেয়। সঙ্গে সঙ্গে গান বন্ধ হয়ে যায়। গান বন্ধ হতেই মেহজা আর মিশান নাচ থামিয়ে তাকায়। এবার ওরাও হতভম্ব হয়ে যায়। সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরভিদ, আদ্রিক আর তাহিয়া কারদার। মিশান অস্বস্তি আর লজ্জায় দ্রুত বেড থেকে নেমে দাঁড়ায়।
মেহজা পরিস্থিতি সামলাতে ভ্যাবলা টাইপ একটা হাসি দিয়ে বলে,

— হেহেহেহে! সবাই এখানে?
আদ্রিক হেসে বলে,
— সম্মানিত ভাবি, আপনার সহবতপূর্ণ নৃত্য দেখতে এসেছি! এখন আমাদের কাছে এই অমূল্যবান নৃত্য কেমন লেগেছে এটা জিজ্ঞেস করে লজ্জা পাবেন না।
মেহজা কটমট করে আদ্রিকের দিকে তাকায়। তারপর হতভম্ব হয়ে থাকা তাহিয়া কারদারের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
— আসলে গান ছেড়ে নাচার তালে একটু ব্যায়াম করছিলাম। প্রতিদিন ব্যায়াম করলে শরীর ভালো থাকে।
তাহিয়া কারদার এখনো বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারেননি। কোনোমতে ধীরে বলেন,
— ওহ!

মেহজা চিন্তায় পড়ে যায়। তাহিয়া কারদার কি এখন রেগে যাবেন? বাড়িতে আবার ঝামেলা হবে তার নাচ নিয়ে? মেহজা বেড থেকে নেমে তাহিয়া কারদারের কাছে এসে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে,
— আপনি কি রাগ করেছেন, শাউড়ী আম্মু?
তাহিয়া কারদার একবার আরভিদের দিকে তাকান। আরভিদও ওনার দিকেই তাকিয়ে আছে। আরভিদও তাহিয়া কারদারের উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে।
তাহিয়া কারদার মেহজার দিকে ফিরে নরম গলায় বলেন,
— সারাদিন না খেয়ে নাচানাচি করলে অসুস্থ হয়ে পড়বে না? খেয়ে তারপর যা করার কর। আমি রুমে খাবার পাঠাচ্ছি।
মেহজা বলে,

— একটু আগে খেলাম তো। ওনি খাইয়ে দিয়েছে!
তাহিয়া কারদার আরভিদের দিকে একবার তাকিয়ে তারপর বলেন,
— ওহ। আচ্ছা, আমি আসছি! নিচে কাজ আছে আমার।
বলেই তাহিয়া কারদার চলে গেলেন। তাহিয়া কারদার চলে যেতেই আদ্রিক হাসি দিয়ে বলে,
— বাই দা ওয়ে ভাবি, মুখের কথা আপনার জঘন্য হলেও, গলার স্বর সত্যিই ধন্য!
মেহজা মেকি হাসি দিয়ে লম্বা সুর টেনে বলে,
— তাই? দেবর জিইইইইইইইই?
আদ্রিক মাথা নেড়ে একই ভঙ্গিতে লম্বা সুরে বলে,
— হুমমমমম। ভাবিইইইইইই!
মেহজা হেসে বলে,
— তাহলে এই গানটা স্পেশালি আপনার জন্য!
এই কথা বলেই মেহজা মুখে হাসি দিয়ে বেহুলা গানের সুরে গেয়ে ওঠে,
— ভাগ্য আপনাকে ছোবল মারে না কেন? রক্তে আপনার কেবল উত্তেজনা! আপনি আমার আধার রাতের ছাড়পোকা! আপনার আমার এই শত্রুতা মাস দুয়েক ধরে! শত্রুতামির গান শুনাবো বাংলা গালির সুরে। আমি বেহুলা, আপনি মরলে আপনাকে নিয়ে ভাসাবো ভেলা!
আদ্রিক বিষমাখা হাসি দিয়ে বলে,

— এতো সুন্দর গান আমার জন্য?
— হুমম, দেবর জি!
— আপনার জন্য রিটার্ন গিফট, সং রেপিস্ট ভাবি!
বলেই আদ্রিকও গাইতে শুরু করে,
— ফুলো কা কাটা মেরি ভাবি হে,
এক হাজারো মে সাবছে ঘাটিয়া হে,
সারি ওমার হামে দূর রেহনা হে,
ফুলো কা কাটা মেরি ভাবি হে!
মেহজা মুখ বাকিয়ে বলে,
— মরণ দশা!
আদ্রিক আগের মতোই হেসে বলে,
— সেই দশায় পড়ে মরে যান, নয়েজ হালকা ভাবি!

বলেই আদ্রিক ঘুরে চলে যায়। আরভিদ এতোক্ষণ হতাশ দৃষ্টিতে দুজনের দিকে তাকিয়ে ছিল। গানের তালে তালে তাদের ঝগড় চুপচাপ দেখছিল। কেউ কারোর থেকে একটুও কম না। সারাদিনই দুজন লেগে থাকে সাপেনেউলের মতো। এবার মেহজা কিছুটা চিন্তিত হয়ে আরভিদের দিকে তাকায়। সেদিনের মতো আরভিদ আবারও রেগে আছে কিনা, সেটাই বুঝার চেষ্টা করে। কিন্তু আরভিদ শান্তভাবেই মেহজার দিকে তাকিয়ে আছে। দুজনের মাঝে থাকতে মিশানের অস্বস্তি হচ্ছে। তাই সে অজুহাত দেখিয়ে সেখান থেকে চলে যায়।
মিশান চলে যেতেই মেহজা জিজ্ঞেস করে,

— আপনি কি রাগ করেছেন?
আরভিদ শান্ত গলায় বলে,
— কেন? রাগ করবো কেন?
— আমি নেচেছি তাই! সেদিনও তো নেচেছিলাম পরে রাগ করেছিলেন!
আরভিদ এগিয়ে এসে মেহজাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে,
— সেদিন রাগ করেছি তুই নাচার কারণে না! সবার সামনে নাচার কারণে! তুই আমার বউ! সবাই কেন তোর নাচ দেখবে? তোর নাচতে ইচ্ছে করলে তুই নাচবি! কিন্তু বাহিরের মানুষের সামনে না। শুধু আমার সামনেই!
মেহজা তার বুকে মাথা রেখেই আস্তে করে বলে,
— সত্যিই রাগ করেননি?
— না।
একটু থেমে আবার আরভিদ বলে,
— মেহু আমি কখনো তোর কোনো শখ কিন্তু ইচ্ছে অপূর্ণ রাখতে চাই না কিংবা রাখবো না। কিন্তু যেই শখে তোর সম্মান নষ্ট হবে সেটা পূরণ করবো না। তুই অনেক মূল্যবান আমার জন্য। সেই মূল্যবান জিনিসটা কে অন্যকারোর সামনে সস্তা হতে দিবো না আমি। এতে আমি কঠোর হলে কঠোরই!

আদ্রিক রুমে ঢুকেই দেখে রুম ফাঁকা। অর্তিহা নেই।
সে বেলকনিতে গিয়ে দেখে, সেখানেও অর্তিহা নেই।
বেলকনি থেকে রুমে ফিরতেই দেখে, অর্তিহা রুমে ঢুকছে।
আদ্রিক জিজ্ঞেস করে,
— কোথায় গিয়েছিলি?
— ড্যাডের কাছে।
বলেই অর্তিহা গিয়ে বেডের বাম পাশটায় বসে, মাটিতে পা ঝুলিয়ে।
আদ্রিক আবার প্রশ্ন করে,
— কেন?
অর্তিহা নরম স্বরে বলে,

— কেন আবার কি? আমি আমার ড্যাডের কাছে যাওয়ার জন্য কোনো কারণ লাগবে?
আদ্রিক গিয়ে বেডের ডান পাশটায় আধশোয়া হয়ে বসে বলে,
— না! জিজ্ঞেস করেছি কোনো কাজে গিয়েছিলি কিনা!
অর্তিহা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বলে,
— না এমনিই গিয়েছিলাম।
বলেই আবার মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
— তা কি কথা হলো?
অর্তিহা অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে,
— আপনি এমন মেয়েদের মতো এতো কৈফিয়ত চাইছেন কেন?
আদ্রিক ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বলে,
— তার মানে বলছিস মেয়েরা বেশি কৈফিয়ত চায়?
অর্তিহা আদ্রিকের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে হালকা গলায় বলে,
— হ্যা অন্য মেয়েরা চায়! কিন্তু আমি চাই না!
আদ্রিক অর্তিহার চোখে চোখ রেখে হেসে বলে,

— তুই মাঝে মাঝে অধিকার দেখাবি আমার ওপর! অধিকার নিয়ে কৈফিয়ত চাইবি। প্রচন্ড ভালো লাগবে আমার!
অর্তিহা কিছুটা তাচ্ছিল্য করে বলে,
— মেয়েরা কৈফিয়ত শখের পুরুষের কাছে চায়!
আদ্রিক ঠোঁট বাকিয়ে বলে,
— ওহ! আমি তো পুরুষ হলেও তোর শখের না! কিন্তু তোর ঐ আশিক তোর শখের হলেও সে কিন্তু পুরুষ ছিলো না!
অর্তিহা হতবাক হয়ে কিছুটা জোরেই বলে ফেলে,
— কিহ!
আদ্রিক এক চিলতে দুষ্ট হাসি ঠোঁটের কোনে টেনে বলে,
— দুইদিন আগে মুসলমানি করা ছেলে দুইদিন পরেই পুরুষ হয়ে যায় না। আমার মুসলমানি হয়েছে বহু বছর আগে! আমি কিন্তু পাক্কা পুরুষ! সেই প্রমাণ বেডেও দিয়েছি আর তোর পেটেও আছে!
মাওলিদকে নিয়ে এমন কথা শুনে অর্তিহার প্রচণ্ড রাগ হয়। সে চাপা রাগী গলায় বলে,
— বুঝেছি পৃথিবীতে একমাত্র পাক্কা পুরুষ আপনিই! আর কোনো পুরুষ নেই! তাই না?
আদ্রিক ভ্রু উঁচিয়ে বলে,

— বিশ্বাস হচ্ছে না তোর? প্যান্টের চেইন খুলে আবার প্রমাণ দিবো?
অর্তিহা তড়িৎগতিতে বলে,
— না না না!
আদ্রিক চোখ টিপে বলে,
— একটু দেখেই নে। ভালো লাগবে!
অর্তিহা চরম অস্বস্তিতে পড়ে যায়। বুঝে যায়, আদ্রিক ইচ্ছে করেই তাকে জ্বালাচ্ছে। সে কথা ঘুরিয়ে বলে,
— আপনি কি আর দুবাই যাবেন না?
আদ্রিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,

— না।
— কেন? একেবারে চাকরি ছেড়ে এসেছেন নাকি?
— হুম।
অর্তিহা বিস্মিত হয়ে বলে,
— হুম? সত্যিই?
আদ্রিক হেসে বলে,
— ইয়াহ বেবিডল।
— কিন্তু কেন?
— ইচ্ছে হয়েছে।
— এখন কি তাহলে আপনি দেশেই থাকবেন?
— না। আমেরিকার এয়ারলাইন্সে জব নিয়েছি!
অর্তিহা বুঝতে পেরে আস্তে বলে,
— ওহ।
বলেই অন্যদিকে তাকায়। আদ্রিক তার দিকে তাকিয়ে বলে,

— মন খারাপ করেছিস?
— মন খারাপ করবো কেন?
— আমি কাছে থাকবো না বলে! তবে চিন্তা নেই লিটলহার্ট, তোকে কিছুদিন পরে নিজের কাছে নিয়ে যাবো!
অর্তিহা আপত্তি করে বলে,
— আমি মোটেও মন খারাপ করছি না! আর আমি যেতেও চাই না বাসার সবাইকে ছেড়ে!
আদ্রিক ব্যঙ্গ করে বলে,
— কি আদর্শ বৌয়ের মতো কথ বলেছিস! স্বামিকে ছেড়ে এখানে থাকতে পারবি কিন্তু পরিবারকে ছেড়ে থাকতে পারবি না!
অর্তিহা বিরক্ত হয়ে বলে,

— সে আমি যেমনই হই না কেন! কিন্তু আমি আপনার সাথে থাকতে চাই না।
আদ্রিক গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— এতো সাহস কোথায় পাস তুই অর্তি? মুখে মুখে বলছিস আমার সাথে থাকতে চাস না?
অর্তিহা ভয়ে থেমে গিয়ে আদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
— আমি কোথায় বলেছি থাকতে চাই না আপনার সাথে? আমি বলেছি আমি সেখানে যাবো না। বাড়ি মানুষের থেকে এতো দূরে আমি থাকতে পারবো না।
আদ্রিক ঠান্ডা কণ্ঠে বলে,

— আমার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করলে দুনিয়া থেকে দূরে পাঠিয়ে দিবো!
অর্তিহা খুব ভয় পেয়ে যায়। ভয়ে সে সঙ্গে সঙ্গে কেঁদে ওঠে। আদ্রিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই জিজ্ঞেস করে,
— কাঁদছিস কেন?
অর্তিহা কোনো উত্তর দেয় না। এবার আদ্রিক আগের চেয়ে একটু বেশি ঠান্ডা গলায় বলে,
— আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি!
অর্তিহা ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
— আপনিই তো বলেছেন আপনি আমাকে মেরে ফেলবেন!
আদ্রিক সরু, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— তারমানে তুই আমার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করবি?
অর্তিহা ভয়ে মাথা নেড়ে অর্তিহা কাঁদতে কাঁদতে বলে,

— না।
— কোথায়? তুই তো দূরে বসে আছিস আমার থেকে!
কথাটা শোনামাত্রই অর্তিহা আর বসে থাকে না। সে ঝড়ের গতিতে ওঠে এসে আদ্রিকের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে আদ্রিককে।আদ্রিকের ঠান্ডা আর কঠিন মুখটা মুহূর্তেই বদলে যায়। সে হেসে ফেলে। সে অর্তিহাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নেয়। মিশিয়ে নেয় অর্তিহাকে নিজের মাঝে। ভয়ে অর্তিহার শরীর এখনও কাঁপছে।
আদ্রিক অর্তিহার পিঠে ধীরে হাত বুলিয়ে, নরম সুরে বলে,

— ইজি অর্তি! শান্ত হ। এতো কাপছিস কেন? আমি তো পুরোপুরি তোকে ফিল করতে পারছি না।
অর্তিহা জমে যায়। কান্নাও থেমে আসে। অর্তিহার কোনো সাড়া না পেয়ে আদ্রিক অর্তিহাকে আলতো করে সরিয়ে বালিশে শুইয়ে দেয়। তারপর নিজেও অর্তিহার ওপর শুয়ে পড়ে, তবে পুরোপুরি শরীরের ভর দেয় না। অর্তিহা ভেজা চোখে তাকিয়ে থাকে আদ্রিকের দিকে। আদ্রিকও তাকিয়ে থাকে। আদ্রিকের চোখে এক অদ্ভুত নেশা। হঠাৎ করেই আদ্রিক অর্তিহার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। অর্তিহা চোখ বন্ধ করে নেয়।
আদ্রিক অর্তিহার গালে হাত রেখে চুমু খেতে থাকে। প্রথমে চুমু রূঢ় থাকলেও ধীরে ধীরে স্ফট হয়ে আসে। অর্তিহা বেডের চাদর শক্ত করে খামচে ধরে আছে। কিছুক্ষণ পর আদ্রিক অর্তিহার ঠোঁট ছেড়ে চোখ খুলে তাকায়। অর্তিহাও চোখ খোলে। দুজনের চোখে চোখ পড়ে। আদ্রিক অর্তিহার শরীরে থাকা ওড়নাটা সরিয়ে বেডের পাশে রাখে। তারপর গলা ও বুকে একের পর এক আলতো চুমু দিতে থাকে। অর্তিহা চোখ বন্ধ করে থাকে অজানা এক আবেশ তাকে ঘিরে ধরে।

আগে আদ্রিকের স্পর্শে সে একদম পাথরের মতো হয়ে যেত। কোনো অনুভূতি ছিল না কিন্তু এখন আর তা না। পেটে বাচ্চা আসার পর থেকে আদ্রিকের স্পর্শে তার ভেতরে এক অচেনা ছটফটানি জন্ম নিয়েছে। সুখও না আবার অস্বস্তিও না, কেবল এক নতুন অনুভব। হঠাৎ আদ্রিক থেমে উঠে বসে নিজের টি-শার্ট খুলে ফেলে। অর্তিহা আদ্রিকের উন্মুক্ত প্রশস্ত বুক দেখে লজ্জায় সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নেয়।
আদ্রিক আবার অর্তিহার কাছে এসে ঠোঁটে আলতো চুমু দিয়ে বলে,
— আমাদের সেকেন্ড বিয়ের পর ফাস্ট টাইম এটা!
অর্তিহা কোনো উত্তর দেয় না। লজ্জায় তার গাল লাল হয়ে ওঠে। আদ্রিক অর্তিহার পিঠের নিচে হাত ঢুকিয়ে জামার চেইন খুলতে যাবে, তখনি অর্তিহা আঁতকে উঠে। নিভু নিভু গলায় বলে,

— লাইট অফ করেন!
আদ্রিক শান্ত স্বরে বলে,
— আজকে যা হবে লাইট অন করেই হবে।
কথাটা শুনে অর্তিহার বুকের ভেতর অস্বস্তি জমে ওঠে। লজ্জায় তার পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। অর্তিহার লজ্জা আদ্রিক ধরে ফেলে। আদ্রিক বাঁকা হেসে ওঠে বসে বলে,
— যা, আজকে তোর ওপর মায়া করলাম। কিন্তু আজকের পর থেকে যা হবে সব লাইট অন করেই।
আদ্রিক বেড থেকে নেমে লাইট অফ করে আসে। ফিরে এসে আবার অর্তিহার কাছে ঝুঁকে অর্তিহার গালে কামড় দেয়।
অর্তিহা ব্যথায় বলে ওঠে,
— কামড় দিলেন কেন?
আদ্রিক দুষ্টু হেসে বলে,
— দুপুরে জি বলেছিলাম, ভুলে গেছিস? আমি কামড়, তুই টুকনি। খেলবো রাতে?
অর্তিহা বিরক্ত স্বরে বলে,
— আপনি অনেক খারাপ!
আদ্রিক কামড়ের জায়গায় একটা গভীর চুমু দিয়ে নেশালো কন্ঠে বলে,
— মাঝে মাঝে এমন চুমুও দিবো! তবে কামড়াবো বেশি। সারা শরীরে কামড়াবো!
এমন কথা আর স্পর্শে অর্তিহা কেঁপে ওঠে। শরীরের ভেতর শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। আদ্রিক অর্তিহার দুই হাত ধরে বালিশে চেপে রেখে অর্তিহার ঠোঁটে আবার গভীরভাবে চুমু খেতে থাকে। অনেকক্ষণ পর আদ্রিক থামে। অর্তিহা জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে।
আদ্রিক তার গালে নাক ঘষে বেসামাল কণ্ঠে বলে,

— রেসপন্স দে বেবিডল!
থেমে অর্তিহার চোখে চোখ রেখে বলে,
— আই ওয়ানা ড্রাইভ ইউ ক্রেইজি।
এই কথা শুনে অর্তিহা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে ফেলে। তারপর অনুনয়ের সুরে বলে,
— হাত ছাড়েন।
আদ্রিক আদর করতে করতে ফিসফিস করে বলে,
— ডিস্টার্ব করবি না তো?
অর্তিহা চোখ বন্ধ রেখেই আবেশে ভেজা স্বরে বলে,
— করবো না।
— প্রমিজ, বেবি?
অর্তিহা হালকা করে মাথা নেড়ে ফিসফিসিয়ে বলে,

— প্রমিজ।
আদ্রিক অর্তিহার হাত ছেড়ে দেয়, কিন্তু ছাড়ে না অর্তিহাকে। আরও গভীর মনোযোগে ডুবে যায় অর্তিহাকে আদর করায়। যে মানুষটা সবার সামনে এত শান্ত, সংযত— সে মানুষটাই এই মুহুর্তে ভীষণ বেপরোয়া হয়ে আছে। ছোট্ট অর্তিহার পক্ষে এই বেপরোয়া আদ্রিককে সামলানো ভীষণ কঠিন।অর্তিহার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। আদ্রিকের বেপরোয়া আদরে সে কখনো আদ্রিকের পিঠ জড়িয়ে ধরে, আবার কখনো আবেশে ভেসে গিয়ে শক্ত করে খামচে ধরছে।

মাঝরাতের গভীর অন্ধকারে বংশী নদীর ধারের নিস্তব্ধতা পুরো গ্রামটাকে ঢেকে রেখেছে। নয়া গ্রামের ঘরগুলো ঘুমিয়ে আছে। শুধু নদীর জলে হালকা ঢেউয়ের শব্দ শোনা যায়, যেন নীরবতার ভেতর এক অজানা হাহাকার ভাসছে। নদী থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল কারখানা। বাইরে চারদিক অন্ধকার, কিন্তু ভেতরে আলো ঝলমল করছে। কারখানার ভেতরে সারি সারি প্যাকেট করা মাল রাখা। এক পাশে একটি বড় কাঠের টেবিল, তার চারপাশে কয়েকটা চেয়ার। সেখানে রাব্বি, শুভ আর মিজান, রকি, তানভীর বসে তাস খেলছে।
খেলার মাঝেই শুভ বিরক্ত গলায় বলে ওঠে,

— অনেক খেলেছি তাস! এবার চল, মালটাকে নিয়ে একটু খেলি!
মিরাজ সঙ্গে সঙ্গে সায় দেয়,
— ঠিক বলেছিস মামা! একটু ফ্রেশ ফিল করবো।
রাব্বি হাসি দিয়ে বলে,
— আগে কিন্তু আমি যাবো!
শুভ তাকিয়ে বলে,
— তুই না প্রথমে ভাইকে বলে দিচ্ছিলি?
মিরাজ ঠাট্টার সুরে বলে,
— ঠিক বলেছিস! সালায় মতলবের বেলায় ঠিকই আছে!
শুভ উঠে দাঁড়িয়ে বলে,

— আচ্ছা, চল যাই, মালটার কাছে!
ছয়জন একসঙ্গে উঠে কারখানার ভেতরের দিকে হাঁটতে থাকে। কারখানার এক পাশে ছোট একটা রুম রাখা হয়েছে, তাদের রেস্টের জন্য। তারা এসে ঘরটার সামনে দাঁড়ায়। দরজায় বাইরে থেকে তালা দেওয়া। শুভ চাবি বের করে তালা খুলে দেয়। তারপর সবাই ভেতরে ঢোকে। ঘরের ভেতরে একটি মেয়ে বিছানার ওপর পড়ে আছে। তার হাত-পা দড়ি দিয়ে বাঁধা, মুখ ওড়না দিয়ে আটকানো। এতক্ষণ ধরে কাঁদতে কাঁদতে সে ক্লান্ত। তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে আতঙ্কে মেয়েটার শরীর কেঁপে ওঠে। সে ভয়ে বিছানার এক কোণে সরে গিয়ে ঠেসে বসে।
রকি বিশ্রী হেসে বলে,

— কি মাল? একা একা বোর ফিল করছিলা? চিন্তা নাই! আমরা এসে পড়েছি তোমার সাথে এনজয় করতে।
শুভ নিজের পরনের টি-শার্ট খুলতে খুলতে বলে,
— আগে আমি যাই। তারপর বাকিরা একেক করে যাবি। আর মোবাইল অন করে ভিডিও করিস কিন্তু! পরে ভিডিওটা দেখলে মজা পাবো।
মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বারবার মাথা নাড়তে থাকে, যেন অনুনয় করছে। মিরাজ মোবাইল বের করে ভিডিও চালু করে। শুভ এগিয়ে গিয়ে জোর করে মেয়েটাকে বিছানার মাঝখানে নিয়ে আসে এবং মুখের বাঁধন খুলে দেয়। মুখ খুলতেই মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে অসহায় গলায় বলে,
— আমাকে ছেড়ে দিন! আমি আপনাদের পায়ে পড়ি! আমি আপনাদের বোনের মতো! আমার ওপর দয়া করেন।
তার কথা শুনে ঘরে থাকা সবাই জোরে হেসে ওঠে। মিরাজ ভিডিও করতে করতে ঠাট্টা করে বলে,

— এসব বলে কোনো লাভ নাই, সোনা! আমরা গলবো না।
তারপর শুভর দিকে তাকিয়ে বলে,
— এই ব্যাডা, তাড়াতাড়ি কর! সিরিয়ালে দাঁড়ায় আছি!
মেয়েটা কাঁপা গলায় আবার বলে,
— না না! আমাকে দয়া করে ছেড়ে দিন!
কিন্তু শুভ তার কোনো কথাই শোনে না। মেয়েটা নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করতে থাকে, কিন্তু বাঁধা হাত-পা তাকে অসহায় করে রেখেছে। কান্নার ভেতর সে আর্তনাদ করে বলে,
— দয়া করুন! এমন সর্বনাশ করবেন না আমার! আল্লাহ সহ্য করবে না। এই পাপ কাজ করবেন না!
কথাটা শুনে শুভ জোরে একটা থাপ্পড় মারে মেয়েটাকে। মেয়েটা পড়ে যায় বেডের ওপর। মেয়েটার ঠোঁট কেটে গেছে। শুভ মেয়েটার চুলের মুঠি ধরে বলে,

— সালি বেশি কথা বলবি না। মেজাজ খারাপ হয়।
বলেই শুভ ঝাপিয়ে পড়ে মেয়েটার ওপর। মেয়েটি কষ্টে ছটফট করতে থাকে, তার চিৎকার করতে থাকে। বুক চিরে আর্তনাদ বেড়িয়ে আসে কিন্তু তার কণ্ঠস্বর কারোরই মন গলে না। উল্টো সবাই হাসতে থাকে। তারা যেন বিশাল কোনো কিছু জয় করছে। মেয়েটার ওপর এমন পাষবিক নির্যাতনকে তারা খেলা মনে করছে। মহা আনন্দের সাথে মোবাইলে ধারণ করছে মেয়েটার ওপর হওয়া জুলুম। শুভর চাহিদা শেষ হলে ক্লান্ত হয়ে মেয়েটার থেকে সরে আসে। তারপর মিরাজ যায়।
মেয়েটা বিছানায় ছটফট করছে এবং কাঁদছে নিজের হওয়া সর্বনাশে। এভাবেই চলতে থাকে ছয়জনের নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড। একে একে সবাই নিজেদের সাময়িক চাহিদার জন্য মেয়েটার ওপর নির্যাতন চালায়। তাদের কাজ শেষ হলে সবাই নিস্তেজ হয়ে মাটিতে বসে পড়ে। বিছানায় মেয়েটা কষ্টে কাতরাতে থাকে, সারা শরীর জখম, মুখ দিয়ে চাপা গোঙানি বের হচ্ছে। মিরাজ রাব্বিকে বলে,

— যা রডটা নিয়ে আয়। এর ব্যবস্থা করি!
মেয়েটার কানে কথাগুলো যেতেই সে দ্রুত মাথা নাড়ে। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার, কথা বলার শক্তিটুকুও নেই। তবু কোনোমতে বলে ওঠে,
— না, না… আমাকে ছেড়ে দিন। আপনারা যা চেয়েছিলেন, সব তো পেয়েছেন। এবার আমাকে বাঁচতে দিন। আমার বাবা-মায়ের আমি ছাড়া আর কেউ নেই। আমি কাউকে কিছু বলব না। সব ভুলে যাব।
শুভ শয়তানি হেসে বলে,
— তুমি বেঁচে ফিরলে আমাদেরই ক্ষতি, সোনা। গিয়ে কেস করবে, অযথা ঝামেলা করবে।
বলেই সে হাত দিয়ে তাকে ধাক্কা দেয় এবং উঠে রড আনতে চলে যায়। শুভকে চলে যেতে দেখে মেয়েটা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলে,

— না, না… আমরা খুব গরিব। আমার বাবা দিনমজুর। মামলা করার ক্ষমতা আমাদের নেই। দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন।
বলেই মেয়েটা কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। আবার পড়ে যায় বেডে। সারা শরীর জুড়ে অসহ্য ব্যথা। ১৭ বছরের এই ছোট্ট শরীরটি ৬ জনের নির্যাতন সহ্য করেছে। সেই শরীরে ওঠে বসার শক্তি রবে কিভাবে? শুভ রড হাতে নিয়ে হাজির হয়। শুভর হাতে রড দেখে মেয়েটির অন্তর কাঁপতে থাকে। জমের মতো ভয় করতে থাকে সে সেই রডটাকে! এক মুহূর্ত তার ইচ্ছে হয়, যেন তার শরীরে প্রচন্ড শক্তি আসে। তাহলে সে ছুটে পালিয়ে যেতে পারবে। সে মরতে চায় না। তার বাঁচার অনেক ইচ্ছে। মেয়েটি জোরে কেঁদে ওঠে।
শুভের হাতে রড দেখে মাটিতে বসে থাকা সবাই দাঁড়ায়। মিজান তানভীর ও মাহিনকে বলে হাতগুলো শক্ত করে ধরতে, আর রাব্বি ও রকিকে বলে পা দুটো শক্ত করে ধরতে। তারপর শুভকে বলে সবটা ভিডিও করার জন্য।
মেয়েটা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলে,

— না, না, না! আমাকে ছেড়ে দিন। আমাকে মারবেন না। আমার জীবনটা ভিক্ষা দিন! আমি জীবনেও মুখ খুলবো না। তাও আমাকে ছেড়ে দিন।
মিজান বলে,
— তোমার মুখ চিরতরে বন্ধ করার জন্যই তো এইসব, সোনা।
সবাই মিজানের কথামতো মেয়েটাকে চেপে ধরে। শুভ দাঁড়িয়ে সব ভিডিও করা শুরু করে। মিজান রড নিয়ে বিশ্রী হাসি দিয়ে মেয়েটার দিকে এগোতে থাকে।
মেয়েটা ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে,

— না, না, আমার দিকে আসবেন না! দোহাই লাগি। আমার জীবনটা ভিক্ষা দিয়ে দিন।
মিজান মেয়েটার অসহায় কান্না উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যায়। হাতে থাকা রডটা নিয়ে মেয়েটার যৌনাঙ্গের মধ্যে রডটা অনেক জোরে ঢুকিয়ে দেয়। মুহূর্তেই মেয়েটা অসহনীয় যন্ত্রণায় আর্তচিৎকার করে ওঠে। সেই যন্ত্রণা মৃত্যুর থেকেও কঠিন বলে মনে হয় মেয়েটার কাছে। শরীরটা যেন ভেঙে পড়তে থাকে, ব্যথায় সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। তার শরীর থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। এমনভাবে রক্ত বের হলে অল্প সময়ের মধ্যেই রক্তশূন্য হয়ে মারা যাবে।
মেয়েটা ছটফট করতে থাকে। শরীরে শক্তি না থাকলেও ছেলেগুলোর থেকে নিজের হাত পা ছাড়ানোর বহু চেষ্টা করে। নিজেকে মুক্ত করতে, এই যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে। মেয়েটার কাতরানো দেখে উপস্থিত সবাই অদ্ভুত আনন্দ পায়। তারা হাসে, মজা নেয়। এই পৈশাচিক নির্যাতন করেই তারা তৃপ্তি খুঁজে পাচ্ছে, এটাকেই তারা ভুলভাবে শক্তি আর পুরুষত্ব মনে করছে।
মেয়েটা অসহ্য যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ে কাঁপা কণ্ঠে বলে,

— আমাকে একবারে শেষ করে দিন, তবুও এভাবে কষ্ট দিয়ে মারবেন না। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
শুভ ভিডিও করতে করতে হেসে বলে,
— কিন্তু আমাদের অনেক ভালো লাগছে।
মেয়েটা কষ্টে ভাঙা কণ্ঠে বলে,
— তোমরা আমাকে যে যন্ত্রণা দিচ্ছো, এর শাস্তি তোমরা পাবে। আল্লাহ তোমাদের সেই শাস্তি দেবেন।
কথাটা শুনে মিজানের মাথা গরম হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আগের থেকে দ্বিগুণ জোরে চেপে ঢুকিয়ে দেয়। মেয়েটা আবার অসহনীয় যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠে, তারপর ধীরে ধীরে কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে আসে। কাঁপতে কাঁপতে বলে,
— লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।
বলেই নিঃশ্বাস ছাড়ে। মাথাটা এক পাশে ঢলে পড়ে যায়। সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে যায়। মেয়েটার আর্তনাদ, চিৎকার আর শোনা যায় না। নিথর হয়ে পড়ে আছে।
তানভীর মিজানের দিকে তাকিয়ে বলে,

— কী রে, মনে হয় মরে গেছে।
মিজান তানভীরকে বলে,
— চেক কর।
তানভীর নাকের কাছে আঙুল নিয়ে পরীক্ষা করে বুঝতে পারে শ্বাস চলছে না। মিজানকে ইশারায় বলে।
মিজান রডটা বের করে নেয়। রাব্বি জিজ্ঞেস করে, — এখন এটাকে কি করবে?
মিজান বলে,
— আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের ময়লার স্তুপে ফেলে আসবো। চল, যাই।
রাব্বি আবার বলে,

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৩

— তোমরা চারজন, আমি আর রকি এখানে থাকি।
মিজান সম্মতি দেয়। তারপর মেয়েটার নিথর দেহটাকে একটা বস্তার ভেতর ভরে সেটা নিয়ে বেড়িয়ে চারজন কারখানা থেকে। বাহিরে একটা অটো তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তারা মেয়েটিকে অটোতে রেখে তারপর সবাই অটোতে বসে রওনা দেয় আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের উদ্দেশ্যে। প্রায় ৪০-৪৫ মিনিট পর তারা আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে পৌঁছায়। জায়গায়টা অনেক দুর্গন্ধ। আশেপাশের সব ময়লা এখানেই ফেলা হয়। ওরা চারজন দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে নাকে রুমাল বেধে তারপর অটো থেকে বস্তটা৷ নিয়ে গিয়ে ময়লার বিশাল স্তুপে ওপর ফেলে দেয়। তারপর সবাই আবার সেই অটোতে করে চলে যায়।

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৫