প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫০ (২)
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
চোখ মুখ শক্ত করে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে রাবেয়া বেগম। তাঁর সামনেই মাথা নিচু করে বসে আছে মিরা। রাবেয়া বেগম মিরার দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলে উঠলো ” সকালের ঘটনার জন্য আমি তোমার উপর ভীষণ রেগে আছি এটা কী তুমি জানো??”
রাবেয়া বেগম এর কথায় মিরা মাথা তুলে তাকালো তাঁর দিকে। তারপর শান্ত গলায় বললো ” আমি জানি মণি। কিন্তু কি করবো বলো তো নিজের রাগটা তখন ধরে রাখতে পারি নি। আর ওই মেয়েটা দেখলে না কীভাবে শুভ্রর গাঁয়ে গরম পানি ছুঁড়ে দিলো।”
” আর কেনো আবরার এর গাঁয়ে গরম পানি ছুঁড়ে দিয়েছে তা তুমি অবশ্যই জানো..?”
” জড়িয়ে ধরেছি তো আমি শুভ্র কে তাহলে ওই মেয়ের গায়ে লাগলো কেনো?”
” গাঁয়ে লাগার মতো কাজ করেছো তাই ওর গাঁয়ে লেগেছে।”
মিরা দাঁতে দাঁত চেপে মাথা নিচু করে বসে রইল। মিরা কে চুপ থাকতে দেখে রাবেয়া বেগম আবারো শক্ত গলায় বলে উঠলো ” আর কখনো যেনো আমি এসব না দেখি। আর আবরার কে তো তুমি চেনোই। আজকে তুমি ওই মেয়েটার গাঁয়ে হাত তুলতে গিয়েছিলে আবরার কিছু বলে নি কিন্তু দ্বিতীয় বার হাত বাড়ালে আবরার তোমাকে ছাড়বে না, কথাটা মনে রেখো।” বলেই বড় বড় পা ফেলে চলে গেলো নিজের কক্ষে।
মিরা রাবেয়া বেগম এর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো। তারপর পায়ের উপর পা তুলে দু হাত সোফার উপর মেলে ঘাড় পিছন দিকে এলিয়ে দিয়ে কিছু ভাবতে লাগলো।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আনমনে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবতে ভাবতে সুখটান দিচ্ছে শুভ্র। মুখ দেখে মনে হচ্ছে বেশ চিন্তিত সে। গাঁয়ে পরনে এখনো সকালের সেই শার্ট । এখনো চেন্জ করে নি সে তাঁর গাঁয়ের পোষাক। সিগারেটের ধোঁয়া শূন্যে উড়িয়ে দিতেই রাস্তার দিকে চোখ যেতেই দেখলো কেউ চুপিচুপি তার বাড়ির গেটের ভেতরে প্রবেশ করলো। শুভ্র তা দেখে হালকা হেসে সুখটান দিতে লাগলো।
হল রুমে প্রবেশ করতেই লামিয়া বিরক্ত হয়ে চোখ মুখ কুঁচকে নিলো। তাঁর সামনেই বসে আছে মিরা। মিরা সোফায় গা এলিয়ে চোখ বুজে ছিলো। কারোর উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ খুলে তাকাতেই লামিয়া কে দেখে তাঁর ভ্রু জোড়া কুঁচকে এলো। বসা থেকে উঠে এগিয়ে দাঁড়ালো লামিয়ার সামনে। লামিয়া তা দেখে আরো বিরক্ত হলো। এই মেয়েকে দেখলেই শরীরে রাগ ধরে যায় তার। এই মেয়েটার জন্য আজ তার প্রিয় মানুষের বুকে গরম পানি ছুঁড়ে দিয়েছিলো। শুধুমাত্র এই মেয়েটার উপর রাগ করে। ভেবেই রাগ লাগছে লামিয়ার।
” এতো রাতে এখানে কী চাই..?” ভ্রু কুঁচকে বললো মিরা।
মিরার কথা শুনে লামিয়া নিজেকে শান্ত করে এক ভ্রু উঁচিয়ে মিরার দিকে তাকিয়ে বললো ” সেটা তো আমার ও প্রশ্ন। এতো রাতে এখানে কী চাই..? আর আপনাকে এই বাড়িতে থাকার অনুমতি কে দিয়েছে.?”
” এইটা শুভ্রর বাড়ি। শুভ্রর বাড়িতে থাকতে হলে অনুমতি নিতে হবে..?”
” হ্যাঁ নিতে হবে..!”
মিরা বাঁকা হেঁসে বললো ” ওওহ তাই নাকি..? যদি অনুমতি নিয়ে থাকতেই হয় তাহলে শুনো এই বাড়ির মালিক ই আমাকে এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে এমনকি মালিকের পাশের রুম টা কিন্তু আমার জন্য সাজিয়ে রেখেছে।”
মিরার কথায় লামিয়া শীতল দৃষ্টিতে তাকালো মিরার দিকে। মিরা লামিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসছে। মিরার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে লামিয়া কে জ্বালাতে পেরে মিরার ভীষণ খুশি লাগছে। মিরার এতো খুশি দেখে লামিয়া ফিক করে হেঁসে কোনো কথা না বলে হাঁটা ধরলো কিচেনের দিকে।
লামিয়ার হাঁসির দেখে মিরার হাঁসি থেমে গেলো। মেয়েটা পাগল নাকি এইভাবে হাসছে কেনো? আর কোথায় যাচ্ছে এই মেয়ে ভেবেই মিরা ভ্রু কুঁচকে লামিয়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে পিছন পিছন যেতে যেতে বলে উঠলো ” এই মেয়ে কোথায় যাচ্ছো..? এইটা তোমার বাড়ি না বুঝতে পারছো তুমি। এই মেয়ে দাঁড়াও বলছি। অনুমতি ছাড়া শুভ্রর কোনো কিছু কেউ ধরলে শুভ্র ভীষণ রেগে যায়। দাঁড়াও বলছি।”
বলতে বলতে লামিয়ার পিছু যেতে লাগলো। লামিয়া হুডির পকেটে হাত রেখে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে গুন গুন করতে করতে হাঁটতে লাগলো। কিচেনে এসে ফ্রিজ খুলে বরফ বের করে বাটি তে নিয়ে পিছন ঘুরতেই দেখলো মিরা তাঁর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।
লামিয়া মিরার দিকে এগিয়ে গিয়ে বাঁকা হেঁসে বললো
” আপনার ভিতরে যে অনেক কুড়কুড়ি আছে তা আপনার কথাতেই প্রকাশ পাওয়া যায়। তবে আমার সাথে এমন কুড়কুড়ি দেখাতে আসবেন না । আমি আপনাকে চিপরিয়ে আপনার কুড়কুড়ির রস বের করে দিবো। আর আমাকে জ্বালাতে তো ভুল করেও আসবেন না নয়তো আপনার পশ্চাৎদেশে আগুন লাগিয়ে দিবো। পরে না উঠতে পারবেন আর না বসতে আর না কাউকে দেখাতে। আমি কিন্তু মেয়ে বেশি সুবিধার না। মেহমান আসছেন থাকুন,ঘুরে বেড়ান, শীতের পিঠা খান প্রকৃতি দেখুন কাজে লাগবে। আর বললেন না আপনার রুমে সাথে শুভ্রর রুম ..? উমম ওই তো ওই রুমের বাহিরে পর্যন্ত আপনার ঠাই ভেতরে নয়। আর হ্যাঁ আমি থাকার অনুমতি দিয়েছি বলেই আপনি এখানে থাকতে পারছেন শুভ্রের কথায় না। আর বাড়ির মালিক আমি শুভ্র না। উল্টো পাল্টা দেখলেই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবো, তাই ভালো ভাবে থাকুন। আসছি।” বলেই বাটি নিয়ে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে গেলো। মিরা রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। রাগে তাঁর শরীর কাঁপছে। আর ওর অনুমতি তে থাকছে মানে?? এই বাড়ি কী তাহলে শুভ্রর নয়। ভেবেই রাগ আরো বাড়ছে মিরার।
শুভ্র রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দরজা হালকা ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেলো। লামিয়া ঘরে উঁকি দিতেই দেখলো রুমে কেউ নেই। লামিয়া কপালে ভাঁজ ফেলে রুমে প্রবেশ করে আশেপাশে তাকিয়ে শুভ্র কে খুঁজলো। পা টিপে টিপে বেলকনির দিকে পা বাড়াতেই দেখলো শুভ্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে । লামিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো শুভ্রর দিকে তাকিয়ে। কোনো কথা বললো না।
” কী চাই…?” পিছনে না ঘুরেই বলে উঠলো শুভ্র।
” সিগারেট খান কেনো ..?”
” তৃষ্ণা মেটাতে।”
” হুম পানির,চা,শরবত এর তৃষ্ণা পায় জানি কিন্তু সিগারেটের তৃষ্ণা ও পায় তা আজকে আপনার থেকে শুনলাম।” বলতে বলতে শুভ্রর পাশে এসে দাঁড়ালো লামিয়া।
লামিয়া পাশে এসে দাড়াতেই শুভ্র আড়চোখে তাকালো লামিয়ার দিকে।
” সিগারেটের তৃষ্ণা তো বলিনি।”
” তাহলে..?”
শুভ্র দু ঠোঁটের ভাঁজে সিগারেট গুঁজে লামিয়ার দিকে ঘুরে তাকালো এবার। লামিয়া তা দেখে একটু সরে যেতে চাইলো কিন্তু শুভ্র লামিয়ার হুডির ফিতা টেনে ধরায় লামিয়া সরে দাঁড়াতে পারলো না। তবে বেশ বিরক্ত হলো লামিয়া।
” এই এই ছাড়ুন আমার হুডির ফিতা। সবসময় ধরাধরি না করলে ভালো লাগেনা..?”
শুভ্র লামিয়ার কথা শুনে ঠোঁট কামড়ে হাসলো। তারপর বাম হাত দিয়ে কোমড় টেনে নিজের কাছে এনে ডান হাত দিয়ে সিগারেট মুখ থেকে বের করে সিগারেটের সমস্ত ধোঁয়া লামিয়ার মুখে ছেঁড়ে দিতেই লামিয়া কেঁশে উঠলো। কাঁশতে কাঁশতে শুভ্রর দিকে তাকাতেই শুভ্র লামিয়ার কোমড় ধরে উঁচু করে রেলিংয়ে বসিয়ে দিয়ে মাথা নিচু করে লামিয়ার কপালে কপাল ঠেকিয়ে নাক দিয়ে নাক ঘষে শান্ত গলায় বলল ” ধরাধরি করার সুযোগ দিয়েছেন আপনি হুমম..?”
শুভ্রর কথায় লামিয়া একটু নড়েচড়ে উঠতেই শুভ্র শক্ত করে কোমড় চেপে ধরে বিরক্ত গলায় বলল ” এতো নড়াচড়া কেনো করিস..? শান্ত ভাবে থাকা যায় না।”
” আ…আপনি দূ…..রে সরুন প্লিজ।” বেশ কাঁপা কন্ঠে বললো লামিয়া।
শুভ্র তা শুনে ভ্রু কুঁচকে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো “কেনো..?”
লামিয়ার শুকনো ঢোক গিলে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল ” সরতে বলছি সরে দাঁড়ান।”
শুভ্র তবুও সরে দাঁড়ালো না। শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। শুভ্র কে সরতে না দেখে লামিয়া শুভ্রর বুকে ধাক্কা দিতেই শুভ্র মৃদু স্বরে চেঁচিয়ে একটু সরে গেলো। চেঁচানোর শব্দ শুনে লামিয়া ভরকে গিয়ে তাকালো শুভ্রর পানে। শুভ্র কেমন অভিমান দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। লামিয়া তো ভুলেই গিয়েছিলো লোকটার বুক ঝলসে গিয়েছে। লামিয়া আমতা আমতা করে বললো ” আপনার বেশি লাগে নি তো..?”
শুভ্র লামিয়ার কথা শুনে এক পলক তাঁর দিকে তাকিয়ে গটগট পায়ে চলে গেলো রুমে। শুভ্রর রাগ দেখে লামিয়া ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে ভেংচি কেটে রেলিং থেকে নেমে রুমের গিয়ে দেখলো শুভ্র কপালে হাত রেখে শুয়ে আছে। তা দেখে লামিয়া দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। এই লোক যে তাঁর উপর রেগে গিয়েছে তা সে বেশ বুঝতে পেরেছে। তবে এই লোকটার রাগ সে ভাঙাবে না। করুক যতো পারুক রাগ করুক।
লামিয়া এগিয়ে গিয়ে বরফের বাটি হাতে নিয়ে বিছানায় উঠে শুভ্রর পাশে বসলো। হাত বাড়িয়ে শুভ্রর শার্টের বোতাম খুলতে নিতেই শুভ্র খপ করে হাত ধরে ফেলে।
” কী সমস্যা শরীরে হাত দিচ্ছেন কেনো..?” বেশ ঝাঁঝালো কন্ঠে বললো শুভ্র।
শুভ্রর ঝাঁঝালো কন্ঠ শুনে লামিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো
” দরকার আছে তাই দিচ্ছি। হাত ছাড়ুন বুকে বরফ লাগাতে দিন। ফোস্কা পড়ে যাবে।”
” সকাল বেলা গরম পানি ছুঁড়ে এখন রাতের বেলা বরফ দিতে এসে বলছেন ফোস্কা পড়ে যাবে..?”
” আরেহহ সকালে রেগে ছিলাম তো তাই আসি নি । আর আপনি ই বা কেনো দেন নি..?”
” ইচ্ছে করে নি তাই দেই ও নি।”
” ঠিক আছে এখন আমার কাজ আমাকে করতে দিন।”
” দরকার নেই। বের হন রুম থেকে নয়তো…!”
শুভ্রর কথায় লামিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো ” নয়তো কী..? মেয়েদের মতো চেঁচামেচি করবেন..? লামিয়া আপনার ইজ্জতের উপর হাত দিয়েছে..? হ্যাঁ তা করতেই পারেন কারণ আপনার সাথে ঠিক এইটাই যা…!”
কথাটুকু আর বলতে পারলো না তাঁর আগেই শুভ্র লামিয়ার ঠোঁট চেপে ধরলো। দশ সেকেন্ড পর ঠোঁট ছেঁড়ে দিয়ে লামিয়ার ভেজা ঠোঁট বৃদ্ধা আংগুল দিয়ে মুছতে মুছতে বললো ” নয়তো ঠিক এমন হবে, আশা করি বুঝতে পেরেছিস স্টুপিড।”
লামিয়া চোখ বড় বড় করে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে দ্রুত ছিটকে দূরে সরলো। হুডির হাতায় ঠোঁট মুছতে মুছতে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো
” অসভ্য, ফালতু লোক। কথায় কথায় শুধু ভাঁওতাবাজি করা। আপনার নামে আমি মামলা দিবো।”
শুভ্র ঠোঁট কামড়ে হাসতে হাসতে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলল ” আমার নামে মামলা দিবে জ্যাকি, ব্ল্যাকির আম্মু..? আমার নামে মামলা দিলে তো আমার ছেলে মেয়ে দুটো এতিম হয়ে যাবে। আমার বউ টা একা হয়ে যাবে। এমনেই আমার কালো বউ নিয়ে টানাটানি করে সবাই, তার উপর হাজতে বন্দি হলে তো বউ নিয়ে দৌড় দিবে সবাই। তখন আমার কী হবে কালো ভ্রমর..?” বলতে বলতে এগিয়ে গেলো লামিয়ার দিকে।
” কী সমস্যা এভাবে এগোচ্ছেন কেনো..? আ…আর শার্টের বোতাম খুলছেন কেনো…?” এক পা দু পা পিছিয়ে যেতে যেতে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো লামিয়া। তা দেখে শুভ্র হেঁসে উঠলো ।
” ইসলাম বাড়ির ডাকাত কন্যা ভয় পাচ্ছে আমাকে,এটা কী মানা যায় বলুন তো ..। ”
শুভ্রর কথা শুনে লামিয়া ঠোঁট ভিজিয়ে শুকনো ঢোক গিলে বললো ” এসব কি বলছেন..? আমি কেনো ভয় পাবো আপনাকে..??”
” তাহলে পিছিয়ে যাচ্ছেন কেনো..?”
” আপনি এই অর্ধ নগ্ন হয়ে আমারা দিকে এগোচ্ছেন কেনো..?”
” আমি যেতে চাইছি না কিন্তু আমার শরীর তোর দিকে শুধু টানছে।”
” দেখুন রাগাবেন না আমাকে এগোবেন না আর।”
বলতে বলতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলো লামিয়ার। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শুভ্রর দিকে।
শুভ্র তা দেখে হেঁসে একদম লামিয়ার সামনে এসে দাঁড়িয়ে মাথায় গাট্টা মেরে বললো ” বরফ না দিতে এসেছিস তাহলে এখন এতো ভয় পাচ্ছিস কেনো..? দে বরফ লাগিয়ে।”
” আ… আপনি দূরে সরে দাঁড়ান আমি দিচ্ছি।”
লামিয়ার কথা শুনে শুভ্র মনে মনে হেঁসে আবার বিছানায় গিয়ে বসলো। শুভ্র কে সামনে থেকে সরতে দেখে লামিয়া দীর্ঘ শ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলো বিছানার দিকে।
” এতো রাতে আমার ঘরে কেনো এসেছেন আপনি..?”
” দেখ একদম নাটক করবি না। এতো রাতে কেনো এসেছি জানিস না তুই..?”
” দেখুন লাবিব ভাই বাড়াবাড়ি করবেন না। এখন ই নিজের বাড়ি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন।”
” না আজকে আমি এখানে থাকবো তোর সাথে, এক ঘরে, এক বিছানায়।”
” উফফ ফাজলামি না করে চুপচাপ বাড়ি যান। ”
ছবির কথায় লাবিব তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো।
” আমি ফাজলামি করছি…আমি?? এই মেয়ে বিয়ে হয়ে গিয়েছে আমাদের কবে আর আমি এখনো বাসর করতে পারিনি। ”
” আপনি এতো নির্লজ্জ কেনো..?”
” হ্যাঁ আমি নির্লজ্জ, তোকে যদি আমার করে পেতে হলে নির্লজ্জ হতে হয় তাহলে আমি তাই হবো।”
” লাবিব ভাই যান না প্লিজ।”
” আমি যাবো না আজকে রাতটা তোর সাথে থাকবো।”
” এটা সম্ভব নয়..!”
” কেনো সম্ভব নয়..? বিয়ে করেছি কী বউ ছেঁড়ে থাকার জন্য..?”
” আমার কিন্তু রাগ লাগছে।”
” লাগুক তোর রাগ আমি যাবো না মানে যাবো না।”
বলেই তেজ দেখিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো লাবিব। ছবি তা দেখে কপাল কুঁচকে এগিয়ে গিয়ে লাবিব এর পাশে বসলো। তারপর শান্ত গলায় বললো
” আমরা লুকিয়ে বিয়ে করেছি। ভাই বোন রা ছাড়া আর বাড়ির বড় রা কেউ জানে না। আর শুভ্র ভাই বলেছে যতোদিন পর্যন্ত বড়রা না জানে ততদিন পর্যন্ত আমাদের এক সাথে থাকতে মানা করেছে। শুভ্র ভাইয়ের চোখ কান সবসময় খোলা থাকে যদি জানে আপনার সাথে ছিলাম তাহলে কেলেংকারি ঘটাবে। তাই প্লিজ বোঝার চেষ্টা করুন। ”
লাবিব অসহায় চোখে তাকালো ছবির দিকে। তারপর কিছু ভেবে মুখ ফুলিয়ে বললো ” শালা ওর জন্য আমার বাসর আটকে আছে ওকে আমি ছাড়বো না। লামিয়া কে দিয়ে উচিত শিক্ষা যদি না দেই তাহলে আমার নাম লাবিব না।” বলেই ছবির মুখের দিকে তাকিয়ে বললো
” বাসর তো করতে দিবি না ঠিক আছে চলে যাবো। কিন্তু যাওয়ার আগে একটু তোর পিংক লিপ এর স্বাদ নিতে চাই আমি। ” বলেই ছবি কে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ছবির গ্রীবা ধরে কাছে টেনে এনে ঠোঁট চেপে ধরলো। লাবিব যখন ছবির ঠোঁটে মগ্ন তখনই বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে গানের গলা ভেসে আসলো
Mujhe aadhi raat ko sataane lage
Mujhe apne saath tadpaane lage
Tu aaja paas, ye bulaane lage
Tujhe chhoona chaahe
Mere ye, mere ye, mere
Pink lips, pink lips, pink lips
Pink lips, pink lips, pink lips
Pal-pal tujhko karte miss
গানের গলা শুনে লাবিব আর ছবি চমকে উঠলো। দুজনেই দুজনের সামনে থেকে ছিটকে দূরে সরে গেলো। লাবিব বসা থেকে উঠে আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজতে লাগলো কে গান গাইছে। তখনই আবারো কারোর কন্ঠ ভেসে আসলো ” বাসর তো করতে দিবি না ঠিক আছে চলে যাবো কিন্তু যাওয়ার আগে একটু তোর পিংক লিপ এর স্বাদ নিতে চাই আমি।” বলেই হো হো করে হেঁসে উঠলো তায়েব।
তায়েব এর কথার শব্দ শুনে লাবিব আর ছবি চোখ বড় বড় করে ফেললো। এই বিচ্ছু গুলো আবার কোথা থেকে এসে শুনে ফেললো তাদের কথা। লাবিব কপাল চাপড়াচ্ছে। তাঁদের ভাবনার মাঝেই দরজার ওপাশ থেকে মাহিরের কথা শোনা গেলো।
” পিংক লিপ এর স্বাদ নিতে এতো কষ্ট করে এসেছে একটু আপ্যায়ন এর ব্যাবস্থা করবো নাকি লাবিব ভাই..?”
লাবিব বিরক্ত হয়ে ছবির দিকে তাকালো। তারপর গটগট পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে তেজি স্বরে বললো ” তোদের খেয়ে কী আর কোনো কাজ নেই..? অন্যের রোমান্স এর সময় বা হাত ঢুকাস। ”
মাহির লাবিব এর কথায় বত্রিশ পাটি বের করে বললো ” ভাই বিশ্বাস করো আমি কিছু করি না, সবসময় আমি বা হাত ঢুকাই না। কাহিনী টা তায়েব হা* গা করে হাত ধৌয় না তাই সবসময় মানুষের রোমান্সে বা হাত ঢুকিয়ে দেয়, সাথে আমাকে নিয় এটা কী আমার দোষ বলো..?”
লাবিব বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে রইলো মাহির আর তায়েব এর দিকে। এদের সাথে কথা বলাই বৃথা। পিছন ফিরে ছবির দিকে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে বললো ” তোর এই জল্লাদ ভাই বোন দের জন্য আমার সন্তান আসবে না এই দুনিয়াতে দেখিস। তোদের বাড়িতে সব কয়টা ছেলে-মেয়ে মিরজাফর আর ঘষেটি বেগম। ” বলেই রেগে হাঁটা ধরলো খান বাড়ির দিকে। তা দেখে মাহির আর তায়েব হেঁসে উঠলো। ছবি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে নিজের রুমে চলে গেলো।
” এইভাবে গরম পানি ছুঁড়ে দিয়েছিলি কেনো..?”
” মন চেয়েছিলো তাই।”
” তোর মন কী একটু বেশি বেশি সব কিছু চায় না..?”
” বেশি চাইলে ক্ষতি কী..?”
” আচ্ছা..! তো বেশি বেশি আর কী কী চায়..?”
” মানে..”
” মানে তোর মনে আমার রুমে আসতে চায়, আমার গাঁয়ে গরম পানি ছুঁড়তে চায়, এটা চায় ওইটা চায় আর কিছু চায় না..?”
” হুমম আরো একটা জিনিস চায় তো..!”
” কী চায়..?”
” আপনাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে।”
” আমি মরে গেলে খুশি হবি..?”
” ভীষণ..!”
” তাহলে মেরে ফেল।”
” সাধ্যের মধ্যে থাকলে ঠিক মেরে দিতাম।”
” কেনো এটা কী তোর সাধ্যের মধ্যে নেই..?”
” না..!”
” কেনো..?”
শুভ্রর কথায় লামিয়া চুপ হয়ে গেলো। কোনো কথা না বলে ফোস্কা পড়ে যাওয়া জায়গায় মলম মালিশ করতে লাগলো। লামিয়া কে চুপ থাকতে দেখে শুভ্র ভ্রু কুঁচকে বললো
” কী হলো..? কথা বলছিস না কেনো..?”
” ইচ্ছে করছে না তাই।”
” বাহ্ এখন আবার কথা বলতে ও ইচ্ছে করছে না..? তোর মতো বাঁচাল মেয়ের কথা বলতে ইচ্ছে করছে না এইটাও মানতে হবে আমাকে??”
লামিয়া আবারো চুপ করে রইলো। শুভ্র এবার গম্ভীর গলায় বললো ” ভালোবাসিস…?”
” না..!”
” তাহলে আমার জন্য এতো বছর অপেক্ষা করেছিস কেনো..?”
” কে বলেছে অপেক্ষা করেছি আপনার জন্য..?”
” তাহলে কার জন্য করেছিস অপেক্ষা..?”
লামিয়া এবার শুভ্রর দিকে চোখ তুলে তাকালো। তারপর সুক্ষ্ম হেঁসে বলল
” আমার ভালোবাসার জন্য অপেক্ষা করেছি। আপনার জন্য নয়।”
” আচ্ছা..! কিন্তু তুই তো জানতি তোর ভালোবাসা ওই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে।
তোর ভালোবাসা তোর কাছে আর ফিরবে না, তাহলে কেনো এতো অপেক্ষা..?”
লামিয়া হালকা হাসলো হেঁসে বললো
” ভালোবাসলে আপনাকে ফিরতেই হবে, এটা সত্য মৃত্যুর মতোই অনিবার্য। তাই অপেক্ষা করেছি। কিন্তু আপনি তো আমাকে ছেঁড়ে চলে গিয়েছিলেন।” শেষের কথা টা বেশ গম্ভীর কন্ঠে বললো লামিয়া।
শুভ্র লামিয়ার চোখের দিকে তাকালো। মেয়েটার চোখে পানি চিকচিক করছে তবুও নিজেকে শক্ত রেখেছে তাঁর সামনে। তাঁকে জড়িয়ে ধরে কান্না করলে কী এই মেয়ের ক্ষতি হয়ে যাবে নাকি বুঝতে পারে না শুভ্র। হাত বাড়িয়ে লামিয়ার গাল স্পর্শ করে বললো
” তোকে ফেলে যাবো কোথায়..? চিনি তো কেবল তোর হৃদয়!এই হৃদয় ছেঁড়ে কী আর কোথাও যাওয়ার জায়গা আছে আমার…?”
লামিয়া নিজের গাল থেকে শুভ্রর হাত টা ছাড়িয়ে নিয়ে কান্না টুকু ঢোঁক গিলে বললো
” কেনো যাওয়ার জায়গা থাকবে না। আপনাকে তো ভালোবাসার মানুষের অভাব নেই। মিরা,মিলি আরো কতো জন আছে হিসেব আছে নাকি..?”
শুভ্র এবার লামিয়ার হাত নিজের হাতের মুঠোয় এনে হাতের উল্টো পিঠে চুমু এঁকে লামিয়া দিকে তাকিয়ে মৃদু কন্ঠে বললো
প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫০
” যেখানে যত্ন থাকে, সেখানে থেকে যাওয়া যায়। ভালো তো সবাই বাসতে পারে, তবে তোর মতো যত্ন করে আগলে রাখতে পারে কয়জন?”
” কিন্তু আমি আপনাকে ঘৃণা করি। এই দুনিয়াতে যদি কাউকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে থাকি তাহলে সেটা আপনি। আপনার দেওয়া কষ্ট আমি ভুলি নি। আর না ভুলতে পারবো। ”
বলেই উঠে চলে গেলো লামিয়া। শুভ্র লামিয়ার যাওয়ার দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো।
