হাওয়াই মিঠাই পর্ব ২২
তামান্না ইসলাম শিমলা
“কি হয়েছিল তখন তোর? কাঁদছিলি কেন?”
তনয়ার প্রশ্নে হায় তুলতে তুলতে তানহা বলে,
“তার আগে তুই বল, তুই তেহরাব ভাইয়ের সাথে প্রেম কবে থেকে করছিস? “
তনয়া স্বাভাবিক ভাবেই জবাব দেয়,
“আমি কোন প্রেম ট্রেম করিনি, তেহরাব ভাই আমাকে ভালোবাসত। আর তার পাগলামিতে আমিও ডুবে গিয়েছি!”
“তাই তো বলি তেহরাব ভাই এত আমাদের বাড়ির আশে পাশে কেন আসতো, তোর দ্বারা যে প্রেম হবে না তা আমি জানি। বাই দ্যা শশুড় বাড়ির রাস্তা, আম্মুকে বলেছিস আমি বিয়ে করব?”
তনয়া তানহার হাতে থাপ্পড় মেরে বলে,
“একটা মারব, তুই বিয়ের জন্য কাঁদছিলি? এত বিয়ে করার সখ বাবারে বাবা!”
তানহা ধপ করে বিছানায় শুয়ে পরে,
“তুই বুঝবি না, আমি বিয়ে করব। বিয়ে করায় আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য!”
তনয়া বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে, কি নির্লজ্জ বেহায়া মেয়ে। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তাহলে আম্মুকে বলি শিহাব ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দিতে?”
তানহা লাফ দিয়ে উঠে বসল, তনয়া হাত ধরল, চোখ দুটো চকচক করছে তার!
“সত্যি? ওই বালটা আমার সেকেন্ড ক্রাশ ছিল, কিন্তু যখন বুঝলাম শ্লাই তোকে পছন্দ করে তখন থেকে ওকে মগা মগা বলে নিজেকে শান্তনা দিয়েছি। ফাস্ট ক্রাশ তো গেলো, সেকেন্ডটাকে এনে দে!”
তনয়া হতবাক, এ মেয়ে কি বলে এসব? মাথা ঘুরছে তনয়ার, তানহা আবার বলে,
“শ্লার আমার কপালে প্রেমই নাই, সবাই খালি তোর পিছে ঘুরে। আজ সুন্দর না বলে!”
তনয়া বিছানা থেকে নামতে নামতে বলে,
“সুন্দর তো তুই আমার থেকে বেশি, কিন্তু মাথার তার সব ছেঁড়া। তোর জন্য শিহাব ভাই ঠিক আছে!”
তানহা দাঁত বের করে হাসে,
“আরেহ বেহেনা, বিয়ে হলো আমার প্রথম ভালোবাসা, এটা হলেই চলবে। আর হ্যান্ডসাম হলে তো কথায় নেই, বাকিটা আমি সামলে নেব!”
তনয়া ফোনটা নিয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায় রুম থেকে, তানহা আসলেই একটা পাগল।
উঠোনের এক কোণে এসে দাঁড়াল তনয়া, তেহরাব কল করেছে। কিছুক্ষন সময় নিয়ে কলটা রিসিভ করল, কেন যেন কথা বলতেও লজ্জা লাগছে তার। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে তেহরাবের হাস্কি কন্ঠস্বর,
“জান সময় ফুরাচ্ছে না কেন?”
তনয়া হাসে, লোকটা আসলেই পাগল। তনয়াকে কিছু বলতে না দেখে তেহরাব নিজেই বলে উঠে,
“আমি আসি? একটু দেখা করি? দেখতে ইচ্ছে করছে খুব!”
তনয়া ঠোঁট টিপে হাসে, এবারও কিছু বলে না। তেহরাব ভ্রু কুঁচকেমায়, আজকেও আবার তার শাশুড়ী কল ধরেনিতো? বিরক্ত নিয়ে কিছু একটা বিড়বিড় করে, অতঃপর বলে,
“ফোনের ওপাশে যেই হোন না কেন, নিজ দায়িত্বে আমার বউয়ের কাছে ফোনটা দিন। আমি তার একমাত্র জামাই বলছি!”
তনয়া এবার শব্দ করেই হেসে উঠে, হাসতে হাসতে বলে,
“মাথাটা কি সত্যি গেছে?”
“হুম জান, সত্যি গেছে। তোকে পাওয়ার আনন্দে আমি সত্যি নিজের তাল তবা হারিয়ে ফেলছি!”
তেহরাবের গভীর কন্ঠে তনয়ার মন শীতল করল,
“তাল হারালে তো চলবে না, পথ হারিয়ে গেলে তখন কি হবে?”
তেহরাব শীতল কন্ঠে বলে,
“তুই আছিস তো, খুঁজে আনবি, দেখাবি সঠিক পথ!”
তনয়া থেমে যায়, লোকটার সাধারন কথাগুলোও তার হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়!
“জান তোকে চুমু খেতে ইচ্ছে করছে, আসি আমি? পাগল পাগল লাগছে, এক্ষুনি আসছি!”
“এই না, শুনুন!”
তেহরাব কি শুনল? নাহ, সেতো সাথে সাথে কল কেটে দিয়েছে। তনয়া স্ক্রিনের দিকে হ্যাবলা কান্তের মতো তাকিয়ে আছে, লোকটা কি সত্যি পাগল? এই রাত বিরাতে চলে আসছে, তাও আবার.. ছিহ।
“অসভ্য লোক, যাচ্ছি না আমি!”
তনয়া দ্রুত নিজের ঘরে এসে পরে, তানহা ঘুমিয়ে গিয়েছে, মেয়েটা ঘুম কাতুরে। মা বাবাও ঘুমিয়ে গেছে, নিজের ঘরের লাইট বন্ধ করে নিজেও বিছানায় শুয়ে পরল, তবে ঘুম আসছে না তার। সত্যি কি তেহরাব আসছে? ইশ লোকটার একটুও সবুর নেই, এভাবেই এপাশ ওপাশ হয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছে তনয়া।
হঠাৎ জানালায় টোকা মারার শব্দ কানে আসে তনয়ার, জানালায় কে টোকা দিচ্ছে? গেট তো বন্ধ, তাহলে? কিছু একটা ভেবে জানালা কাছে গিয়ে দাঁড়াল,আলতো করে জানালা খুলতেই বারান্দার মৃদু আলোতে দেখতে পেল তেহরাবের গম্ভীর মুখশ্রী। লোকটা বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে, তনয়া চোক নামিয়ে নেই। তাই বলে সত্যি সত্যি চলে আসবে, এটা কোনো কথা?
“বাইরে আয়!”
তেহরাবের গম্ভীর থমথমে গলা শুনে শুঁকনো ঢোক গিলে তনয়া, কেন যে ফোন বন্ধ করতে গিয়েছিল। নিশ্চয় ফোনে পায়নি বলে দেয়াল টপকে এসেছে,
“কানে যায় নি কথা?”
তনয়া দ্রুত মাথা নাড়ে,
“আমি বাইরে যাব না, কেন এসেছেন এত রাতে?”
তেহরাবকে দরজার দিকে যেতে দেখে তনয়া চিল্লান দিয়ে বলে,
“আরে আরে, আসছি আমি!”
তেহরাব থেমে যায়, তনয়া দরজা খুলে পা টিপেটিপে বাইরে আসে। লোকটাকে দিয়ে ভরসা নেই, বুকের ভেতর কেউ একজন হাতুড়ি পেটাচ্ছে তার। ভয়ে ভয়ে সামনে এসে দাঁড়াল তেহরাবের, তেহরাব একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তা দেখে তনয়ার আরো বেশি ভয় লাগছে,
“তোর মায়ের সাধের লাল গরুটা আমার পছন্দ হয়েছে,গেট খুলেদে ওটা আমি নিয়ে যাব!”
তনয়া কিংকর্তব্যবিমুড়ের ন্যায় তেহরাবের মুখের দিকে তাকায়, কি বলল সে?
“কিহ?”
শব্দ করে উঠল তনয়া, তেহরাব আগের ন্যায় সিরিয়াস ভঙ্গিতে গম্ভীর গলায় বলে,
“তোর মায়ের রেড কালার হাম্বাটা পছন্দ হয়েছে, ওটা নিয়ে যাব। বাইরে বন্ধুরা অপেক্ষা করছে, তারাতারি গেট খুল।!”
এই মুহূর্তে তেহরাবকে পাগল ছাড়া কিছুই মনে হচ্ছে না তনয়ার কাছে, রাত করে এসব কি মশকরা শুরু করেছে?
“আপনি ফাইজলামি করতে এখানে এসেছেন, যান তো আমি গেলাম!”
তনয়া যেতে নিলে তেহরাব খপ করে তনয়ার হাত ধরে ফেলে, ধমক দিয়ে বলে,
“আমাকে দেখে তোর মনে হচ্ছে আমি ফাইজলামি করছি? গরুটা দিবি কিনা বল? “
তনয়া দাঁত কটমট করে তাকাল তেহরাবের দিকে,
“গরু নিয়ে আপনি কি করবেন? গরুর ঘাস কাটবেন? “
“ধ্যাত ঘাস কাটতে যাব কেন, ওইটা জবাই করে রান্না করে খাব এখন। দে তাড়াতাড়ি!”
তেহরাবেন সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলা কথা গুলো শুনে তনয়া হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারছে না, ইচ্ছে করছে নিজের কপাল নিজে চাপরাতে। এ কোন পাগলের চক্করে পরলো সে?
হঠাৎ কিছু একটা ভেবে তেহরাব বলল,
“আচ্ছা গরু রাখ, মানুষ আমরা তেরো জন। এক কাজ কর একটা ছাগল দে, গরু বিয়ের দিন নিয়ে যাব!”
তনয়ার এবার মেজাজ খারাপ হলো,
“মাথা খারাপ আপনার? যান তো বাল!”
তেহরাব এক টানে তনয়াকে নিজের কাছে টেনে আনে,তনয়ার কপালে ছোট করে একটু চুমু খেয়ে শয়তানী হাসি দেয়!
“শাশুড়ী আম্মাকে বলিস না আমি ছাগল নিয়েছি, কি না কি ভাববে। সকালে না পেলে বলে দিস বাঘ এসে নিয়ে গেছে, চাইলে সিংহও বলতে পারিস।”
তেহরাব তনয়াকে ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে গোয়ালে ঢুকে, বেছে বেছে ভালো একটা ছাগল নিয়ে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে দৌড়ে চলে যায়। তনয়া হা করে তেহরাবের কার্যকলাপ দেখল, সব কিছু বুঝে উঠতেই নিজেও বাড়ির পেছনের গেটের কাছে আসল। গেটের তালা ভাঙা, রাস্তা দিয়ে তেহরাব আর তার বন্ধুরা দৌড়ে চলে যাচ্ছে।
“আল্লাহ এটা কোনো কথা? এ কোন পাগলের পাল্লায় পরলাম, শেষ মেশ শশুড় বাড়ি থেকে ছাগল চুরি! আহহহ!”
তনয়া নিজের কপালে নিজে থাপ্পড় মারে, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না তনয়া। মানে লোকটা কি সত্যি সুস্থ?
“ সকালে দ্বিতীয় দফায় মায়ের গৃহযুদ্ধ শুরু হবে, আবার নাকি গরুও নেবে। কি হচ্ছে এসব??”
মধ্যরাত, ক্ষেতের মাঝ বরাবর আগুন জ্বলছে, চারপাশে বসেছে গানের আসর। মাঝখানে রান্না হচ্ছে কাচ্চি, যা রান্না করছে সয়ং তেহরাব সরকার।
বিয়ের জন্য আজ সবাইকে ট্রিট দিচ্ছে সে, তাও আবার শাশুড়ীর যত্নে পালা ছাগল দিয়ে, ভাবা যায়।
বাকিরা এই নিয়েই মজা করছে, হাসাহাসি করছে। তা নিয়ে যায় আসে না তেহরাবের, এখন তার শান্তি লাগছে। শাশুড়ীর প্রতি আর বিদ্বেষ নেয় তার, ছাগলের মাধ্যমে উঠিয়ে নিয়েছে।
কাচ্চির সুন্দর ঘ্রাণ আসছে, নিজেকে নিজে বাহবা দিচ্ছে তেহরাব। এই নাহলে তেহরাব সরকার, রান্না শেষের দিকে।
আজ রাত ভরে বন্ধুরা কাচ্চি পার্টি করবে, কেউ সালাদ কাটছে, কেউ প্লেট ধুচ্ছে। সবাই যারযার মতো আনন্দ করছে,
তেহরাব বাঁকা হাসে,
“ধন্যবাদ শাশুড়ী আম্মা, ছাগলটাকে যত্ন করে বড় করার জন্য। আর সরি, আপনাকে কাচ্চির ভাগ দিতে পারলাম না বলে!”
মায়ের চিল্লাচিল্লিতে ঘুম ভাঙে তনয়ার, মাথাটা বার হয়ে আছে! বিরক্ত লাগছে মায়ের উপর, সাধ সকালে চিল্লাচিল্লি কেন করছে?
দরজা খুলে বাইরে আসতেই দেখে তানিয়া বারান্দায় বসে নিজের কপাল চাপরাচ্ছে,
“আমার সাধের ছাগলটা কোন গুলামের পুতে চুরি করছে, হাইরে আমার কি সুন্দর ছাগল।”
তনয়ার টনক নড়ে, মনে পরে গত রাতের কথা। নিজের মুখে হাত দিয়ে নিজের ঠোঁট কামরে ধরে, তার মা যে বকাবকি শুরু করেছে, তনয়ার হাসিও পাচ্ছে কান্নাও পাচ্ছে। আগ বারিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করল না, না হলে দেখা যাবে আরো ঘ্যানঘ্যান শুরু করেছে.।
“যা হওয়ার হয়েছ, ছোট জিনিসের উপর দিয়ে গিয়েছে। যদি গরুটা নিত তখন কি করতে? সবুর করে, শুকরিয়া আদায় করো। হয়ত এর মধ্য দিয়ে কোনো ফারা কাটল!”
বাবার কথা শুনে তনয়া মনে মনে বিড়বিড়াল,
“তোমাদের জামাই এই গরুটাও রাখবে না, আবার ফারা!”
শফিকের কথা শুনে তানিয়া নাক টানতে টানতে উঠে দাঁড়াল, শফিক বলল,
“এখন আহাজারি করে লাভ নেয়, আজ বিকেলে বিয়ের তত্ত্ব নিয়ে ওবাড়ি থেকে কযেকজন আসবে। আমি বাজারে যাচ্ছি, তুমি এসব নিয়ে আর ভেবো না, আর তনয়া।”
তনয়া বাবার দিকে তাকায়,
“হুম আব্বু?”
“তেহরাবের কাছে পাঞ্জাবীর সাইজটা জেনে বলতো, তোর মামাকে আসতে বলেছি। সে সাভার থেকে কিনে আনবে নি!”
তনয়া মাথা নাড়ায়, শফিক বেরিয়ে যায়। তানিয়া এখনো বকে যাচ্ছে অজানা চোরকে, তনয়া না পারছি শুনতে না পারছি তার মাকে থামাতে। কিছু না বলে চুপচাপ হাতমুখ ধুতে চলে গেল, ফিরে এসে ফোনটা নিয়ে তেহরাবের নাম্বারে কল করলো। তনয়ার তো কথাই বলতে ইচ্ছে করছে না, কালকের ঘটনা মনে পরতেই মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে।
কি আর করার, দুবার রিং হতেই তেহরাব কল রিসিভ করল। ওপাশ থেকে ভেসে আসলো তার ঘুম জড়ানো কণ্ঠস্বর,
“জান, তুই কল করেছিস? বাহ বাহ, আমার জানটার দেখি উন্নতি হয়ে গেছে?”
তনয়া ভেংচি কাটলো, গাল ফুলিয়ে ভার গলায় বলল,
“,আব্বু আপনার পাঞ্জাবির মাপ চেয়েছে!”
“বলব না!”
তনয়া ভ্রু কুঁচকায়,
“বলবেন না কেন?”
তেহরাব আগের ন্যায় ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলে,
“তোর ব্লাউজের সািজ বল, কিনতে যাব!”
“কিহ?”
তনয়া চেঁচিয়ে উঠল, তেহরাব গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“চিল্লাচ্ছিস কেন? সাইজ বল, পরে তো পরতে পারবি না। আর আব্বাকে বলিস পাঞ্জাবী কিনতে হবে না আমার জন্য, আমি নিজেই কিনব!”
তনয়া চুপ করে আছে, তার যে লজ্জা করছে!
“কি হলো? বল তারাতারি, ঘুমাব আমি। সারারাত ঘুমায়নি!”
তনয়া আমতা আমতা করে বলে,
“ চ চৌত্রিশ!”
বলেই কল কেটে দেয় তনয়া, তেহরাব ভ্রু কুঁচকে কান থেকে ফোনটা মুখের সামনে আনে। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
হাওয়াই মিঠাই পর্ব ২১
“কল কেটে দিল কেন?ওর মায়ের ছাগল নিয়েছি বলে রাগ করেছে? নাহ এটাতো মানা যায় না।”
বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠে বসে তেহরাব, নিজের ঘাড় পর্যন্ত চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলে দিল।
“একটা ছাগল নিয়েছি, দুটো ছাগল দেব। একটা ছাগলের জন্য আমার বউ আমার উপর রেগে থাকবে, এটা তো মানা যায় না। আমার একটা মাত্র বউ, দাঁড়া তোকে একটা ছাগলের ফ্রাম খুলে দেব।”
