শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৩
সুরভী আক্তার
দীর্ঘ শ্বাস ফেললো সংগ্রাম । কথা বলতে আলসেমি লাগছে । ও তড়িঘড়ি করে বললো…
” আচ্ছা । তোমার সাথে কথা বলার শক্তি নেই আমার । শ্যামা, ঘরে চলো ।
” ঘরে যাইবো মানে ? হেরে কোন ঘরে লইয়া যাইবি তুই ?
” কেনো ? ওর সোয়ামির ঘরে !
” কেডায় ওর সোয়ামি ?
” তোমার সামনে আস্ত দাঁড়িয়ে আছে , দেখতে পারছো না ?
” মশকরা বাদ দিয়া যাইবি এইখান থাইকা ? হেয় যাইবো না কোথাও । তিন দিন পর বিয়া , একেবারে বিয়ার রাইতে ঐ ঘরে যাইবো !
আকাশ থেকে পড়ল সংগ্রাম । মুখ থমথমে করে বললো তড়িতে….
” মানে কি ? আমার বউ আমার ঘরে যাবে না ? কোথায় থাকবে ও ?
” ক্যান, আমার লগে আমার ঘরে !
” তুমি কি ওর সোয়ামি ? জানো না , বিয়ের পর মেয়েদের সোয়ামির লগে, সোয়ামির ঘরে থাকা লাগে ।
সোজাসুজি তাৎক্ষণিক কথার আক্রমণ সংগ্রামের । আতিয়া বেগম ভ্রু গুটিয়ে তীক্ষ্ণ করলেন । সুক্ষ্ম করলেন চাহনি । শবনম ঠোঁট চেপে হাসছে । শ্যামা পড়েছে মহা বিপাকে । এই লোকটার ঠোঁটে লাগাম নেই । কেমন কথায় কথায় কিসব বলে ফেলছে !
খচখচ করছে শ্যামা । আতিয়া বেগম ওকে ধরে বেঁধে এই ঘরে নিয়ে এসেছেন সেই সংগ্রাম সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর পরই । শ্যামার শাড়ি কাপড় সব এই ঘরে নিয়ে এসেছেন তিনি । বিয়ে তিন দিন পর । অন্য পরিস্থিতি হলে তো , শ্যামা বাপের বাড়িতে থাকতো । সে বাড়ি থেকেই বিয়ে হতো । এখন যেহেতু পরিস্থিতি ভিন্ন , শ্যামা বাপের বাড়ি যেতে পারবে না , বিয়ে টা হবে এই বাড়ি থেকেই । তাই আতিয়া বেগম পরিকল্পনা করেছেন শ্যামা কে দূরে রাখার । বিয়ের আগে বর বউয়ের কোনো প্রকার সাক্ষাৎ হবে না । শ্যামা যদি ওর বাড়িতে থাকতো,তাহলে কি সাক্ষাৎ – এমন দেখা শুনা হতো নাকি ?
এখনো হবে না তাই ! বিয়ে দ্বিতীয় হলেও প্রথম নিয়মেই হবে । আতিয়া বেগম গুরুত্বর ভঙ্গিতে কড়া কন্ঠে বললেন…
” আমি মাইয়া পক্ষ , বিয়া এক বাড়িতে হইলেও পক্ষ দুইটা হইবো । তোর পক্ষে তোর মা বাপ আছে । আর কারে পক্ষে টানবি,এইটা তোর ব্যাপার । তয় আমি আর শবনম শ্যামার পক্ষে । শ্যামা বউ , আর তুই বর । বউ আর বর আলাদা ঘরে থাকবো বিয়া না হওয়া পর্যন্ত । কোনো দিন দেখছোস , বিয়ার আগে বউ জামাইয়ের লগে এক ঘরে থাহে ?
” আরে দাদি জান , মজা করো না তো । ক্লান্ত লাগছে আমার । শ্যামা , তুমি বসে আছো কেনো ? ঘরে চলো…
আতিয়া বেগম খপ করে শ্যামার হাত চেপে ধরলেন । কন্ঠ আরো গাঢ় করে বললেন…
” খবরদার , কোথাও যাইবো না শ্যামা । তোর ক্লান্ত লাগতাছে তো হেয় কি করবো ?
” হেয় আমার ক্লান্তি দূর করবো ! আমার বউয়ের হাত ধরছো ক্যান বুড়ি , ছাড়ো ! আমার বউকে ধরার অধিকার শুধু আমার । আমার বউরে টানাটানি করবা না ! বউ আমার , বউ ছাড়া ভালো লাগেনা আমার ।
থতমত খেলো শ্যামা । সংগ্রাম অন্য হাত খপ করে ধরতেই বিষম খেয়ে কেশে উঠলো । শবনম অস্বস্তিতে পড়লো । বললো আমতা করে…
” দাদি জান , ছাড়ো না শ্যামা কে ! ভাই এসেছে , সারাদিন বাড়িতে ফেরে নি । যদি কিছু প্রয়োজন হয় !!
” হইলে হইবো ! বাড়িত মাইনষের অভাব নাই । শ্যামা যাইবো না । কইছি না , বিয়ার আগ পর্যন্ত হেয় ঐ ঘরে যাইবো না । দাদু ভাই , ঘর থাইকা বের হ কইতাছি ।
” দাদি জান !!
আহত স্বর সংগ্রামের । আতিয়া বেগম একটুও গললেন না । বরং খাট থেকে নেমে সংগ্রাম কে ঠেলে দরজা পর্যন্ত নিয়ে যেতে যেতে বললেন আবার….
” তিন টা দিন খালি ! এই তিনটা একলা থাকতে পারবি না ? ঊনত্রিশ বছর একলা থাকলি , আর এই ক’মাসেই বউ ছাড়া ভালো লাগেনা ? যা এইখান থাইকা,যা ! বউ পাইবি না আইজ ? খালি আইজ ক্যান , আগামী দুই রাইত পাইবি না বউরে । বউয়ের মুখ দেখতে দিছি এইটাই মেলা । বউরে দিমু না….
দরজা ঠেলে বাইরে বের করে দিলো সংগ্রাম কে । সংগ্রাম দাঁড়িয়ে অসহায় চোখে শ্যামার দিকে তাকিয়ে ডাকলো…
” বেগম ??
শ্যামা স্নিগ্ধ চোখে তাকিয়ে কিছু বোঝালো । আতিয়া বেগম ফের বললেন…
” কিয়ের বেগম ? বেগম হুনবো না তোর কথা ! সংযম নাই ছেড়ার ! বউ পাগল হইয়া গেছে একদম !
কথা শেষ করেই মুখের উপর ঠাস করে দরজা টা লাগিয়ে দিলেন আতিয়া বেগম । সংগ্রাম বাচ্চাদের ন্যায় ঠোঁট উল্টালো । কি মুশকিল ! এটা আবার কেমন নীতি ? বিয়ে তিন পর , এই তিন দিন কিনা ও শ্যামা কে ছাড়া থাকবে ? অসম্ভব ! এমনটা হবে জানলে তো , ও এই বিয়েই করতো না । ধুর , ভাল্লাগে না !
দরজার কাছে নির্লজ্জের ন্যায় তবুও খানিক দাঁড়িয়ে থাকলো সংগ্রাম । অতঃপর নিজের মাঝে বকবক করতে করতে এগোলো নিজের ঘরের দিকে ।
আতিয়া বেগম গজগজ করে ফের আগের অবস্থানে বসতে বসতে বললেন শ্যামার উদ্দেশ্যে…
” দাদু ভাই টা তো এমন আছিলো না , কি জাদু করছোস লো নাত বৌ ? তোরে ছাড়া বাঁচে না দেখি হেয় !
শ্যামা অস্বস্তিতে উত্তর করলো বাহানা দিয়ে…
” দাদি জান , তুমিও না !
ওনার কাপড় বের করে রাখা হয় নি । গোসল সেরে কাপড় পড়বেন , এই জন্য ডাকতে এসেছিল আমায় !
” ও মা ,, কাপড় বাইর করতে আবার বউ লাগে ? হের হাতে কি হইছে ?
” আহহ্ , দাদি জান ! বোঝো না ! বয়স বেড়ে চুল কি এমনি এমনি পেকেছে নাকি তোমার ? সংসার তো করেছো , এইটুকু বোঝো না ? শ্যামা কে ছাড়া চোখে আঁধার দেখে আমার ভাইটা , তাই বউকে ডাকতে এসেছিল ।
আতিয়া বেগম গা দুলিয়ে হেসে উঠলেন ।
সাথে শবনম । শ্যামা খচখচ করতে করতে সৈকতের চুলে হাত বোলাচ্ছে । ঠোঁটের কোণের লাজুক হাসি টুকু ঠেলে রেখেছে বহু কষ্টে ।
আতিয়া বেগম হাসি থামিয়ে শ্যামা কে দেখে বললেন…
” এই ভালোবাসা টা ধোইরা রাখোস নাত বৌ । কমতে দেইস না । জলদি কইরা একখান ছাওয়াল লইবি , তাইলে দাদু ভাইয়ের ঝোঁক আরো বাড়বো । তোর সাথে সাথে ছাওয়ালের উপর ও মায়া বাড়বো । সংসার টা আরো সুন্দর হইবো তোগো ।
এই বার বিয়ার পর একখান ছাওয়াল লওনের ব্যবস্থা করিস আগে । দেরি করলে পরে ঝঞ্ঝাট হইবো ।
শ্যামা কথা গুলো মনযোগী হয়ে শুনলো । বাচ্চার প্রতি সংগ্রামের আকুলতা মনে পড়লো আবার । নীরবে হাসলো শ্যামা ।
জমিদার বাড়িতে রাতের খাবার খেতে নিচে নেমেছে সবাই । টেবিলে পিনপতন নীরবতা । চুপচাপ খাচ্ছে সকলে । শ্যামা আর শবনম বাদে সবাই বসেছে খেতে । ওরা দুজন দাঁড়িয়ে নিজেদের স্বামীর পাশে । মাথা নামিয়ে খাচ্ছে সংগ্রাম । লতিফ জোয়ার্দার ডেকে বললেন…
” গ্রামে ইতিমধ্যে তোমার জমিদার হওয়ার ঘোষণা পড়ে গেছে । বেরিয়েছিলে তো আজ , কি বুঝলে পরিস্থিতি ?
সংগ্রাম খানিক মাথা তুলে উত্তর করলো…
” যেটা বোঝার কথা ছিলো , সেটাই বুঝেছি । আর এমনিতেও আজ বেশিক্ষণ বাইরে থাকতে পারি নি !
” সে কি , সারাদিন তো বাড়িতে দেখি নি , ফেরো নি সারাদিন । বাইরে ছিলে না তো কোথায় ছিলে ?
সংগ্রাম মুখের খাবার টুকু গিললো । এক গ্লাস পানি খেয়ে গলা পরিষ্কার করে বললো…
” মুকুন্দপুরে গেছিলাম , সুখের নীড়ে !
আঁতকে চাইলো শ্যামা । হঠাৎ করেই বুক খানা কেমন মুচড়ে ধক্ করে উঠলো । শ্যামার থেকে কম উদ্বিগ্নতা নিয়ে সকলেই চাইলো সংগ্রামের দিকে । সালেহা শুধালেন লতিফ জোয়ার্দারের আগে….
” সেখানে কেনো ?
” দৌলত গাজি অসুস্থ । খবর পেয়ে গেছিলাম দেখতে !
বিলম্ব হলো না উত্তর আসতে । লতিফা চোখ সরু করে শ্যামার দিকে চাইলেন । বাঁকা হেসে বললেন তিনি…
” দৌলত গাজি কেই দেখতে গেছিলি ? নাকি অন্য কোন কারনে ?
বিরক্তি নিয়ে চায় সংগ্রাম । লতিফার প্রশ্নের মানে বোঝার চেষ্টা করলো না । উত্তর করা তো দূর । উত্তর করলো না সংগ্রাম ।
শ্যামা বোধহয় খানিক অপেক্ষায় রইলো উত্তরের । উত্তর টুকু আশা করেছিল সে । কিন্তু আশাহত হলো । সংগ্রামের মুখে উক্ত প্রশ্নের উত্তর শোনার জন্য ছটফট করলো হৃদয় । পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিলো চোখ বুজে ।
লতিফা বাঁকা হাসলেন । দীর্ঘ শ্বাস ফেলে কটাক্ষ করলেন…
” সুখের নীড়ে আজকাল যাওয়াই হয় না । দৌলত গাজির সাথেও দেখা হয় না অনেক দিন । তা সংগ্রাম, দাওয়াত টাওয়াত দিয়ে এসেছিস তো বিয়ের ? আসবে দৌলত গাজি তোর বিয়েতে ? ওনার মেয়ে বউকে নিয়ে ? যদি না আসে , তাহলে না হয় একদিন গিয়ে দেখা করে আশা যাবে । অসুস্থ মানুষ , দেখতে যাওয়া উচিত !
সংগ্রামের খাওয়া শেষ । ও এসব শুনতে নারাজ । লতিফার যেকোনো কথাই অসহ্য লাগে ওর কাছে । কানের কাছে বাজে ভীষণ । ও মুখ শক্ত করে টেবিল ছেড়ে উঠলো । অন্য একটা প্লেটে ভাত বেড়ে শ্যামার উদ্দেশ্যে বললো…
” ঘরে এসো বেগম ।
অমনি ফের তেতে উঠল আতিয়া বেগম ।
” ঘরে যাইবো মানে ? কইছি না , ওয় তোর ঘরে যাইবো না । সুযোগ খুঁজতাছোস ?
সংগ্রাম থামলো । পিছু ফিরে বললো…
” আরে বুড়ি , তোমার ঘরে যেতে বলেছি । আমার ঘরে নয় । ওর আমার ঘরে আসা বারন, আমার তো আর তোমার ঘরে যাওয়া বারন নয় ! চুপচাপ খাও তো…..
আতিয়া বেগম ফুঁসলেন । এখানে লতিফ জোয়ার্দার আছে বিধায় বেঁচে গেলো । নয়তো আরো কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিতো । আবার সংগ্রাম কে দেখে একটু মায়াও লাগলো , বেচারা বউকে চোখে হারাচ্ছে । সকাল থেকে কাছে পায় নি । একটু সময় কাটাতে দেওয়াই যায় ওদের । আতিয়া বেগম গলা নামিয়ে বললেন…
” যা নাত বৌ , আমার ঘরে গিয়া খাইয়া ল । ঐ পাশের ঘরের জমিদারের ঘরে যাইস না আবার !
সংগ্রাম ফিচেল হাসলো । মোক্ষম সুযোগ পেয়েছে সে । ও তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে উঠলো । পিছু পিছু ধীরে উঠলো শ্যামা ।
সংগ্রাম কথার খেলাপ করে নি । আতিয়া বেগমের ঘরেই গেছে সে । শ্যামা পিছু পিছু ঢুকতেই খট করে দরজা লাগিয়ে দিলো সে । চমকালো শ্যামা । নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই হুট করে পিছন থেকে সংগ্রাম জড়িয়ে ধরলো ওকে । সংগ্রামের দীর্ঘ শ্বাসের শব্দ কানে আসলো । চোখ বুজে পরপর কয়েকবার দীর্ঘ শ্বাস ফেললো সংগ্রাম । শ্যামা অনুভবে মুচকি হাসলো । সংগ্রাম তার বেগমের মসৃণ কাঁধে একখানা চুম্বন এঁকে বললো….
” অবশেষে শান্তি মিললো বেগম । পুরো দিন কাছে পাই নি । এবার আর ছাড়ছি না !
শ্যামা সংগ্রাম কে নিজের থেকে সরিয়ে কপাল কুঁচকে বললো….
” পাশের ঘরের ছোট জমিদার সাহেব , ছাড়তে তো হবে । ঘরে যান এখন !
” ঘরে যাবো মানে ? ঘরেই তো আছি , এ ঘর থেকে আর নড়ছি না আমি !
বলতে বলতে দায়সারা ভাবে খাটে গিয়ে বসলো । ক্লান্তির শ্বাস ফেলে টান টান হয়ে আধশোয়া হলো । শ্যামা এগিয়ে বললো…
” নড়ছেন না মানে ?
” নড়ছি না মানে,নড়ছি না ? যতদিন তুমি এ ঘরে, ততদিন আমিও এ ঘরে । যদি তুমি পাশের ঘরের জমিদারের কামরায় যাও , তাহলে এই জমিদার ও তোমার পিছু পিছু সেই কামরায় গিয়ে উপস্থিত হবে । নয়তো নয় । তুমি যেখানে আমিও সেখানে…
বিশাল হতভম্ব হলো শ্যামা । কি বলে এই লোক ? শ্যামা তাড়া দিলো …
” দাদি জান এক্ষুনি এসে যাবে । ঘরে যান তো , আমি খেয়ে দেয়ে ঘুমাবো । রাত হয়েছে অনেক ।
” তোমার ঘুমের সুবিধা দিতেই তো এলাম ! আর তুমি এভাবে তাড়িয়ে দিচ্ছো আমায় ? তুমি তো ভারি পাষন্ড..
শ্যামা কোমরে হাত গুজে ভ্রু নাচিয়ে শুধালো…
” আমার কি সুবিধা ?
” আমার বুক ছাড়া ঘুম আসবে তোমার ? ঘুমাতে পারবে ? বালিশে মাথা দাও নি কতদিন হিসেব আছে ?
শ্যামা স্বাভাবিক হলো । আলতো চোখে চাইলো । সংগ্রাম মাথা দুলিয়ে আবার বললো ভাবুক হয়ে….
” তোমার সুবিধা কতটুকু জানি না । তবে আমার সুবিধা অনেক । তোমার মাথার বালিশ হতে হতে অভ্যাস হয়ে গেছে । তোমার ভর বুকে না আসলে , তৃপ্ততায় দুচোখ বন্ধ হয় না আমার । মানছি বুকটা শক্ত , তাই বলে কি আরামদায়ক নয় ?
” ভীষণ আরাম দায়ক । অভ্যেস তো আপনি হয়ে গেছেন আমার ! কিন্তু দাদি জান যেহেতু এতো করে বলছে , তার কথার খেলাপ করা উচিত হবে না ।
” খেলাপ তো করলাম না । সে বলেছে তোমাকে আমার ঘরে যেতে দেবে না । আমার কাছে যেতে দেবে না । তো না দিক । আমিই আসবো তোমার কাছে । দেখি কজনে বাঁধা দেয় !
” তার মানে আপনি আমার কথা শুনবেন না ?
” শুনছি তো , তবে মানবো না ! বিবাহিত পুরুষের বউ ছাড়া ঘুমাতে নেই । পরীর নজর লাগে । এমনিতেও আমি খুব সুন্দর , যদি কোনো পরী টরী নজর দিয়ে দেয় ? আমার বাবা কারোর নজরের প্রয়োজন নেই । আমার বেগম হলেই চলবে আমার । কিন্তু বেগম কে ছাড়া একেবারেই চলবে না ।
কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও তো , ঘুম পাচ্ছে আমার ।
বড় শ্বাস ফেললো শ্যামা । ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির রেখা দেখা দিলেও শ্যামা সেটাকে ঠেলে দূরে সরালো । এই লোকের সাথে কথা বলে লাভ নেই । দাদি জান আসুক , তিনিই যা করার করবেন ।
শ্যামা হাত ধুয়ে খেয়ে নিলো । সংগ্রাম এক পায়ের উপর অন্য পা তুলে পা নাচাচ্ছে শুয়ে শুয়ে । চেয়ে আছে উপরের দিকে । আবার পলকে পলকে দেখছে শ্যামা কে । শ্যামার খাওয়া হতে না হতেই দরজায় কড়া নাড়লো আতিয়া বেগম । উচ্চ স্বরে ডাকলেন তিনি….
” নাত বৌ ! দরজা আটকায় দিছোস ক্যান ? খোল দরজা … দরজা আটকায় খাইতে হইবো তোরে ?
শ্যামা হেসে ফেললো । সংগ্রামের ভাবমূর্তি বদলে গেছে । এক ঝটকায় উঠে বসল সে । শ্যামা হেসে বলল…
” এসে গেছে দাদি জান ! দাঁড়ান দরজা টা খুলে দিয়ে আসি !!
সংগ্রাম খপ করে চেপে ধরলো শ্যামা কে । বসা থেকে আর উঠতেই পারলো না শ্যামা । এদিকে আতিয়া বেগম ডেকেই যাচ্ছেন । সংগ্রাম গলা উঁচালো…
” আজকে এ ঘরে তোমার জায়গা নেই দাদি জান ! তুমি আমার বউকে দখল করতে চেয়েছিলে , আমি আমার বউকে নিয়ে তোমার ঘর দখল করে ফেলেছি । এই দরজা আজ আর খুলবে না । তুমি বরং পাশের ঘরের জমিদারের কামরায় গিয়ে নিজের জায়গা করে নাও ।
আতিয়া বেগম চমকালেন দরজার ওপারে । সঙ্কিত হয়ে বললেন…
” দাদু ভাই , তুই এহনো ঘরের ভিতরে আছোস ? একনা সুযোগ দিছি দেইখা , সুযোগের লুটপাট শুরু কইরা দিছোস ? বাইর হ আমার ঘর থাইকা ! আমি ঘুমামু , ঘুম পাইতাছে আমার…
” ঘুমাও বুড়ি । পাশের ঘরে গিয়ে ঘুমাও । জামাই নাই তোমার ! একলা মানুষ , ঝামেলা হবে না । আমার বউয়ের জামাই আছে । জামাই ছাড়া থাকতে ঝামেলা হবে ওর ! আর ডাকবা না তো আমাদের !
” ওরে নির্লজ্জ, বেহায়া , বাইর হ আমার ঘর থাইকা ! তোর বউরে তিন দিন পর দিমু তো । আইজ দরজা খোল দাদু ভাই ! মাইয়াটার সর্বনাশ করিস না এমনে ?
সংগ্রাম চোখ কপালে তুললো । শ্যামা না চাইতেও হেসে উঠলো ফিক করে । ওর সর্বনাশ করবে সংগ্রাম ? যেমন দাদি তার তেমন নাতি ! শ্যামা ছোটার চেষ্টা করছে , সংগ্রাম চেপে ধরে আছে ওকে , তাই পারছে না উঠতে ! সংগ্রাম আবার গলা বাড়িয়ে বললো…
” মাইয়াটার সর্বনাশ বহু কাল আগেই করছি বুড়ি । তুমি এখন আমাদের মাঝে এসে সর্বনাশ করো না । যাও তো এখান থেকে ! দরজা খুলবে না আজ ! আমরা ঘুমাবো এখন…
শুভ রাত্রি বুড়ি , তোমার মরা জামাইয়ের সাথে পাশের ঘরে গিয়ে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ো । আর চেঁচিয়ে লাভ হবে না ।
শ্যামা মুখ খুলতে চাইলে ওর মুখ চেপে ধরলো সংগ্রাম । খানিক ছটফট করতে লাগলো শ্যামা । বাইরে আতিয়া বেগম আহাজারি করে ডেকেই যাচ্ছেন । এই বাড়ির লোক জড়ো হলো বলে । কিন্তু না , সংগ্রামের ভাবান্তর নেই , হেলদোল নেই ওর । দরজা খুলবে না আজ , এটা ভালো করেই বুঝে গেছেন আতিয়া বেগম । তিনি তবুও কয়েকবার হাঁক ডাক পাড়লেন । শেষমেষ চাপা গলায় বললেন হুতাশ হয়ে….
” এতো সোহাগ ? তোরে তোর সোহাগী বউ পাত্তা দিবো না দেখিস ! আমারে ঘর ছাড়াইলি তো , কাইল ওঠ আগে , তারপর দেইখা নিমু তোরে ।
বলতে বলতে দরজা থেকে সরে আসলেন । অবশ্য নিজের ইচ্ছেতেই । এদিকে একটু সরে এসে ফিক করে হাসলেন নিজেও । দুদিকে মাথা নাড়িয়ে নিজের মাঝে বিড়বিড় করলেন কিছু ।
বাইরেটা চুপ হতেই শ্যামার মুখ ছাড়লো সংগ্রাম । হাঁসফাঁস করে দম টানলো শ্যামা ।
” উফফফ , কি করছেন আপনি ? দাদি জান ডাকছে তো … ছাড়ুন খুলে দিয়ে আসি দরজা টা !
” চলে গেছে দাদি জান ! তোমাকে আর ভাবতে হবে না । চুপচাপ ঘুমাও বেগম । এবার শান্তিতে ঘুমাবো আমি । এসো , বুকে এসো !
শ্যামা খানিক নিগুড় স্থির চোখে চেয়ে রইল । সংগ্রামের সাথে আসলেই একেবারেই যায় না এই হাবভাব গুলো । কি পায় সংগ্রাম এসব করে ? শ্যামার মাথায় আচমকা একটা প্রশ্ন জাগলো । তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করে ফেললো সে…
” সুখের নীড়ে কেনো গেছিলেন ?
” দৌলত গাজি কে দেখতে !
” সত্যিই ?
” তোমাকে মিথ্যে বলেছি কখনো ?
আলগোছে আলতো মাথা নাড়ায় শ্যামা । চাহনি প্রগাঢ় হয়ে আসে আরো ।
রাতের খাবার শেষে পড়ার টেবিলে বসেছিল ময়না । পোড়া স্থানে কালসিটে দাগ পড়েছে । ছুলে গিয়ে ফুলে গেছে গাল । আফতাব সচরাচর বাড়ির সবার সাথে খায় না । আজ ও খায় নি । সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে বেরোলে , একেবারে রাত করে ফিরে খেয়ে দেয়ে তারপর ঘুমায় সে । আজ ও তাই । বেরিয়েছিল সেই সন্ধ্যায় । ফিরলো কেবল । ঘরে ঢুকতেই টেবিলের উপর মাথা এলিয়ে চোখ বুজে থাকতে দেখলো ময়না কে । ওকে পড়তে বসার কথা বলতে হয় নি আর । নিজে থেকেই বসেছে । পড়তে পড়তে চোখ লেগে এসেছিল । মাথা এলিয়ে দিয়েছে টেবিলে মেলে রাখা বইয়ের উপর । অমনি ঘুম এসে পড়েছে ।
আফতাবের খাবার বেড়ে রাখা থাকে টেবিলের উপর । সে এসে একা একা খেয়ে নেয় । আজ ও বেড়ে রাখাই আছে । ময়না কে না ডেকে প্রথমে খেয়ে নিল সে । অতঃপর খাওয়া শেষে দরজা লাগিয়ে ময়নার দিকে এগোলো । হারিকেনের হলদে তপ্ত আলোতে দেখলো মেয়েটার মুখ । পোড়া ক্ষতস্থান স্পষ্ট । ঝলসে গেছে পুরো । মেয়েটার নিখুঁত চেহারায় মানাচ্ছে না একদম । আফতাব দাঁত চেপে ধরলো । অতঃপর ক্ষনিকেই সংযত করলো নিজেকে । দূর থেকে ডাকলো নাম ধরে…
” ময়না !!
উচ্চ স্বরের প্রথম ডাকেই ভড়কে সবে লেগে আসা চোখ দুটো তড়িতে খুললো মেয়েটা । আফতাব বললো সামাল দিতে…
” আমিই !
চোখ ডলে নিভু চোখে তাকালো ময়না । চোখে রাজ্যের ঘুম । চোখ মেলে রাখা দায় । গা উষ্ণ গরম । মাথা টাও ধরেছে ঝিমঝিম করে । আফতাব অবস্থা বুঝে বললো নিচু স্বরে…
” পড়তে হবে না , ঘুমাও !
ঘাড় কাত করলো মেয়েটা । কোনো কথা না বলে বই বন্ধ করে উঠলো । প্রত্যেক রাতের ন্যায় নিঃশব্দে মেঝেতে পাটি বিছিয়ে নিলো ওর শোয়ার জায়গায় । উপরে একটা মোটা কাঁথা বেছালো । ঠান্ডা লাগছে । শরীর ও গরম , জ্বর আসবে । আসবে নয় , এসে গেছে । শুকনো মলিন মুখ মেয়েটার । আফতাব ঠায় দাঁড়িয়ে সুক্ষ্ম নেত্রে ওর কর্মকান্ড দেখলো । বিছানা থেকে বালিশ নিতে গেলে , আফতাব ওর হাত থেকে বালিশ টা কেড়ে নিলো । চকিতে তাকালো ময়না । তৎক্ষণাৎ বললো আফতাব…
” মেঝেতে শুতে হবে না । তুমি খাটে শোও !
কোনো কথা বললো না ময়না । আফতাব একটু বিরতি নিয়ে আবার বললো….
” আমি মেঝেতে শুয়ে পড়ছি ।
” দরকার হইবো না , আমি শুইতাছি ! মেঝেতে শোয়ার অভ্যাস আছে আমার । আপনার ভাই তো আর আমারে হের খাটে জায়গা দেয় নাই সবসময় !
আচমকা ময়নার ভ্যঙ্গানো কথাটা মোটেও পছন্দ হলো না আফতাবের । নরম শিথিল মুখশ্রী শক্ত হয়ে আসলো নিমিষেই । চোয়াল শক্ত করে দাঁত পিষলো আফতাব । ময়না আফতাবের হাত থেকে বালিশ টা নিতে গেলে ঝাড়া মেরে ধমকে উঠলো আফতাব…
” একটা থাপ্পর মারবো । কথা বলতে বলেছি তোমায় ? বলেছি না খাটে শুতে ! আমার কথার উপর কথা বাড়ানোর সাহস হয় কি করে তোমার ?
চমকালো না ময়না । ভড়কালো না একটুও । আহত দৃষ্টি পাত করলো শুধু । আফতাবের ধমকে বরাবরের ন্যায় নগন্য ক্ষতের সৃষ্টি হলো বুকে । খানিক তাকিয়ে থেকে আফতাব কে টপকে খাটে উঠে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো সে । মুখ আড়াল করে চোখ বুজলো । অবাধ্য চোখ দুটো জ্বলছে ভীষণ । নিঃশব্দে গাঢ় শ্বাস ফেললো ময়না । আফতাব ও অবাকই হলো খানিক । কথা তুললো গলা নামিয়ে…
” ঔষধ এনে দিয়েছিলাম , খেয়েছো ?
” হুঁ…
ছোট্ট উত্তর । আফতাব খচখচ করলো । মনে হলো এভাবে ধমকানো উচিত হয় নি হয়তো ।
সকাল হতেই আজ হুটোপাটি পড়ে গেছে । বালা রান্না ঘরে ঢুকেছে আজ । রান্না বান্না করা হয়ে ওঠেনি কোনো দিন । তাই বলে যে পারে না তা নয় । চেষ্টা করলে টুকটাক রান্না সম্ভব ওর দ্বারা । যদিও আগে কখনো করেনি । আজই প্রথম । রুটি বানিয়েছে নিজে । সবজি ও রেঁধেছে । আবার দুপুরের রান্নার জন্য প্রস্তুতও করে রেখেছে সব । সকালের নাস্তা এখনো হয় নি । অংকুরের উঠতে উঠতে দেরি হয় । চঞ্চলা উৎসুক মেয়েটা টেবিলে সব একে একে এনে সাজিয়েছে । শায়লা সোফায় বসে দেখছেন ওর কান্ড । একবার রান্না ঘরে ঢুকেছিলেন তিনি । সুরবালা ঠেলে ঠুলে বের করে দিয়েছে । জাহানারা কে রেখেছে নিজের কাছে । তবে কোনো কিছুতে হাত লাগাতে দেয় নি । যেটা পারে নি সেটা শুনে নিয়েছে জাহানারার কাছ থেকে । শায়লা সুরবালার উৎফুল্ল চিত্ত দেখে শিথিল হাসলেন । এর মধ্যেই চোখ ডলে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে দেখা গেলো অংকুর কে । শায়লা ওকে দেখে কন্ঠ উঁচিয়ে বললেন…
” কেশবতীর ঘুম ভাঙ্গলো তবে ?
নামতে নামতে কপাল গুটিয়ে ফেললো অংকুর । শরীরটাকে টেনে নিয়ে এসে সোফায় বসলো । শুয়ে পড়লো ঝট করে । শায়লার কোলে মাথা রেখে তড়িতে বললো ঘুম জড়ানো কন্ঠে…
” মা , চুল গুলো টেনে দাও তো একটু ! মাথা ধরেছে…
” ধরবে না ! এতো বড় বড় চুল থাকলে মাথা ধরবে না তো কি হবে ? ছেলেদের এতো বড় বড় চুল থাকে , কোথাও দেখেছিস ?
” আমার চুলের পিছে সবসময় পড়ে থাকো কেনো বলতো ?
” আর কোনো খুঁত খুঁজে পাই না,তাই ! তোর মাঝে দুটো খুঁত, একটা তুই গোমড়া মুখো , আর একটা তুই কেশবতী ? গোমড়া মুখো টা মানা যায় , কিন্তু কেশবতী হতে যাবি ক্যান ? কত করে বলি , চুলগুলো একটু কেটে ফেল । শুনিস আমার কথা ?
ছেলের চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন শায়লা । অংকুর শ্বাস ফেলে বললো…
” সব কথাই তো শুনি , এটা শুনতে পারবো না তা খুব ভালো করেই জানো ! আমার কাছে আমার চুল খুব সখের , সবার আগে এটার গুরুত্ব বেশি ?
” আমার আগেও ?
” তোমার থেকে একটু কম !
” আর সুরবালা’র থেকে ?
ঝট করে অক্ষি মেলে অংকুর । খানিক চুপ থেকে ভনিতা হীন উত্তর করে….
” ওর থেকে অনেকটা কম !
হেসে ফেললো শায়লা । কথা বলতে ভনিতা নেই অংকুরের । শায়লার সামনে তো আরো নেই ।
সুরবালা রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে চেঁচিয়ে ডাকলো…
” মা ,, তাড়াতাড়ি এসো , সব তৈরি ।
চকিতে চায় শায়লা , সাথে অংকুর । কোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে পাকা গিন্নির ন্যায় রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো বালা । মুখে হাসি । চুলের এলোমেলো ঢিলে ঢালা খোঁপা টা কাঁধে এসে পড়েছে । অংকুর কপাল গুটিয়ে উঠে বসলো । শায়লা উঠে হাঁটা লাগিয়ে বললেন…
” খেতে চাইলে আয় , সুরবালা রেঁধেছে আজ !
সুরবালা প্লেটে প্লেটে খাবার বেড়ে দিয়েছে । জাহানারা কেও বসিয়েছে নিজেদের সাথে । সবশেষে ও নিজে একটা চেয়ার টেনে বসে বললো…
” আমার দিকে তাকিয়ে সবাই কি দেখছো ? খেয়ে বলো কেমন হয়েছে !
খারাপ হয় নি । প্রথম রান্না । স্বাদের তুলনায় একটু বেশি প্রসংশা পেলো সে ! খাওয়া শেষ করার আগেই অংকুর রাশভারী কন্ঠে বলল…
” কাল একবার গ্রামে যেতে হবে !
চকিতে চেয়ে প্রশ্ন করলো শায়লা…
” কোন গ্রাম ?
” সুরবালার ! জমিদার গ্রামে !
কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণ হয়ে আসলো বালার । শায়লা ওর আগে প্রশ্ন করলেন…
” আসলিই তো সেদিন ! আবার যাবি ?
” হুম । তুমি ও যাবে । সবাই যাবো আমরা !
” সবাই কেনো ?
খাওয়া থামিয়েছে সকলে । বালা সঙ্কিত বিব্রত নয়নে চেয়ে । অংকুর একবার মাথা তুলে চাইলো । বালার সাথে চোখাচোখি হয়ে কিয়ৎ কাল পেরোলো । গলা নামিয়ে সময় নিয়ে বললো অংকুর…
” সংগ্রাম জোয়ার্দার খবর দিয়েছে , তার আর তার বেগমের আগামী পরশু আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ে হবে আবার । আমরা আমন্ত্রিত…
ধক্ করে উঠলো সুরবালা । প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো তৎক্ষণাৎ । মুখের খাবার টুকু গলায় আটকালো । গিলতে পারলো না সে । চোখের চাহনি ক্ষিণ হয়ে কম্পিত হলো ।
শায়লা কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন…
” সংগ্রাম জোয়ার্দারের তো বিয়ে হয়েছে !
” হুম । একক ভাবে বিয়ে হয়েছিল । আনুষ্ঠানিকতা হয় নি । শুনলাম সংগ্রাম জোয়ার্দার জমিদার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন এখন । সুরবালার মামি চান , ছেলের আবার অনুষ্ঠান করে বিয়ে দিতে । তাই অনুষ্ঠান হবে এবার । পরশু বিয়ে , আমাদের কাল যেতে বলেছে ।
থমকালো বালা । গলায় খাবার আটকাতেই হেঁচকি তুললো । শায়লা তড়িঘড়ি করে ওর দিকে পূর্ণ মনযোগ দিয়ে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো । এক ঢোকে সম্পুর্ন গ্লাস খালি করলো মেয়েটা । হাঁসফাঁস করে দম ছাড়লো পরে ।
অংকুর স্থায়ী সুক্ষ্ম নেত্রে চেয়ে ।
শায়লা সুরবালার পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন…
” ঠিক আছিস সুরবালা ? বাপের বাড়ির কথা উঠতেই বিষম খেলি যে ? নিশ্চয়ই বিয়ে বাড়িতে তোর কথা মনে করছে সবাই ।
খানিক হাসলেন শায়লা । তার ধারনাতে এটাই ধরা দিলো । বালা ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়ালো । কোনো রকমে বুলি ফুটালো রুদ্ধ কন্ঠে…
” আর খাবো না মা । আমি ঘরে গেলাম ।
বলেই এক ছুট । শায়লা বুঝলেন না । ভাবলেন হয়তো বাপের বাড়ি যাওয়ার খুশিতে চিকচিক করছে মেয়েটা ।
অংকুর আর খেলো না । পারলো না খেতে । সেও একই ভাবে তড়িঘড়ি করে ধাওয়া করলো বালা কে । ঘরে এসে বিছানার উল্টো দিকে মেঝেতে এক কোণায় গুটিয়ে বসেছে সুরবালা । কান চেপে ধরে হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়েছে । অংকুর ঘরে ঢুকে প্রথমে নজর ঘুরিয়ে বালা কে খুঁজলো । খুঁজে পেতেই ধীরে এগোলো ওর দিকে । খানিক দাঁড়িয়ে থেকে নিঃশব্দে এক হাঁটু মুড়ে বসে ধীরে ডাকলো….
” সুরবালা..!
ধক্ করে ওঠে সুরবালা । ভেঁজা দৃষ্টি তুলে চায় তড়িতে । আঁতকে ওঠে অংকুর । ওর কিছু বুঝে ওঠার আগেই আচমকাই হুমড়ি খেয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলো বালা…
ভাঙ্গা গলায় বললো আটকে আটকে….
” আমি যাবো না ! আর যাবো না ও বাড়িতে । দয়া করে আর আমাকে নিয়ে যাবেন না ও বাড়িতে । আমি আর পারবো না, আর পারবো না দেখতে ! ওনাকে চোখে সহ্য হয় না আমার ! সেদিন রাতে যখন উনি শ্যামা কে কোলে করে নিয়ে এসেছিলেন , আমি দেখেছি সেদিন । আমার খুব কষ্ট হয়েছে বিশ্বাস করুন ! আমি আর কষ্ট পেতে চাই না । এবার আর ওনাকে কারোর সাথে দেখতে পারবো না আমি , দয়া করে নিয়ে যাবেন না আমায় । আমি যাবো না ।
অংকুর প্রতিক্রিয়া হীন । হাত দুটো অচল । ওর জড়ালো না সুরবালা কে । শান্তনা দিয়ে আগলে নিলো না ওকে । বরং বললো….
” শান্ত হও …
” নাহ , আগে বলুন আমায় নিয়ে যাবেন না । বলুন না , আমি যাবো না…
” আচ্ছা নিয়ে যাবো না ! তুমি শান্ত হও !
” জড়িয়ে ধরুন আমায় !
” সুরবালা !
” যা বলছি তাই করুন ।
তাই করলো অংকুর । আলগা হাতে জড়ালো । একটু সময় পেরোলে ধীরে শুধালো….
” সংগ্রাম জোয়ার্দার কে এখনো ভালোবাসো ?
বালা চোখ বুজে ছিল । অংকুরের প্রশ্নে ভেজা পাপড়ি মেলে চোখ খুললো । মুচড়ে উঠলো ভেতরটা । কান্না আটকালো কোনো রকমে । বললো ভাঙ্গা গলায়….
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪২
” নাহ ,, যে আমার নয় , তাকে কেনো এখনো ভালোবাসবো আমি ?
” সত্যিই ভালোবাসো না ?
” নাহ…
” তাহলে যে তোমার , তাকে ভালোবাসতে দ্বিধা কিসে ?
