Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৭

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৭

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৭
অরাত্রিকা রহমান

“আমার একমাত্র ছেলের বিয়ে হয়ে গেছে?! বাহ্! তা বাবা, নিজের মা বাবা কে দাওয়াত না দেওয়ার কারণ কি?”
সোরায়া পরপর মাহির আর সীমা খানের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে দেখলো। পুরো আকাশটা ভেঙে তার মাথায় পড়েছে এমনি অবস্থা। সোরায়া সাথে সাথে মাহিরের হাত ছেঁড়ে দিল লজ্জায় আর কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে ঠায় নিল মাহিরের পিছনে। মাহির সোরায়া কে খেয়াল করে নিজের ভ্রু কুঁচকে নিল। সেও নিজে থেকে সোরায়ার হাত আবার নিজের হাতে নিয়ে বলল-

“ওই..হাত ছাড়তে বলেছি তোমাকে? ধরেছ যখন চুপ করে ধরে থাকো।”
সোরায়া মাহিরের কথায় সাথে সাথে সীমা খানের দৃষ্টি খেয়াল করল। তিনি ওদের হাতের বাঁধনের দিকেই তাকিয়ে আছেন। সোরায়া ভয়ে মাহিরের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল-
“স্যার প্লিজ ছেঁড়ে দিন। আম্মু দেখছে। আমি আর ধরবো না আপনার হাত। ভুল হয়ে গেছে।”
মাহির সোরায়াকে ধমক দিয়ে বলল-
“ধরবে না মানে? কে ধরবে তাহলে? আম্মু দেখছে তো কি! দেখাতেই তো ধরেছিলে। তাই না?”
সোরায়া হয়তো লজ্জা আর ভয়ে কেঁদেই ফেলবে এখন। বেচারি মিনতি করে মাহিরকে বলল-
“আমি কি জানতাম উনি আম্মু? ভুল হয়ে গেছে ছেঁড়ে দিন না।”
সোরায়ার সীমা খানকে আম্মু সম্বোধন করাটা সীমা খান খেয়াল করলেন। মাহির কোনো শর্তেই সোরায়ার হাত ছাড়তে রাজি নয়। সোরায়া সীমা খানের দিকে একবার দেখে নিজের নজর নিচে করে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল-

“I.. I am sorry..amm..না sorry Anty..আসলে আমি বুঝতে পারি নি…”
-“মাহির…বউমাকে বাড়ি নিয়ে আয়। আমি আমার বউমার সাথে এখানে পরিচিত হতে চাই না।”
সোরায়ার কথা শেষ হওয়ার আগে সীমা খান আদেশ মূলক কন্ঠে এই নির্দেশ দিয়ে ওই স্থান ত্যাগ করেন। সোরায়ার বুক কেঁপে উঠলো বউমা ডাকে। ও তো মাহিরের বউ নয়..তাহলে! মাহির মায়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে সোরায়াকে বলল-
“চলো।”
-“কোথায়?!”
-“তোমার শশুর বাড়িতে।”
-“আমি যাবো না কোথাও..! আপনি আপনার বাড়ি যান। আমি আমার বাড়ি চললাম।”
সোরায়া দৌড়ে পালাতে চাইলে মাহির পিছন পিছন দৌড়ে সোরায়াকে ধরে ফেলে। সোরায়া করুন সুরে মাহির কে বলল-

“স্যার, আমি যাবো না। আম্মু কি না কি ভাবলেন কে জানে। আমি যাবো না। আমার ভয় করছে।”
মাহির সোরায়া কে নিজের কোলে তুলে নিয়ে বুঝিয়ে বলল-
“আমার জান বাচ্চা না তুমি? এমন বলে না…আমার মানসম্মান কিছু থাকবে না যদি এখন বাড়ির বউকে বাড়িতে না নিয়ে যাই। আমার জন্য চলো, প্লিজ।”
সোরায়া মাহিরের গলা জড়িয়ে ধরে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল-
“আপনার মাথা ঠিক নেই। কি সব বলছেন? আমি কবে ওই বাড়ির বউ হলাম আবার। আজকের মতো ছেঁড়ে দিন অন্যদিন যাবো।”
-“ছাড়া যাবে না, জান। বউ ছাড়া বাড়ি ফিরলে আম্মু আমাকে বাড়িতে ঢুকতেই দেবে না এখন। আম্মু কে কি আমি বলেছি আমি তোমার হাসবেন্ড?”
-“আরে আমি ভেবেছি কে না কে! বয়ফ্রেন্ড বলতে লজ্জা লাগছিল তাই হাসবেন্ড বলেছি। ওইটা যে আম্মু তা কে জানতো?”
মাহির সোরায়াকে কোলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে বলল-
“বেশ করেছ, হাসবেন্ড কে তো হাসবেন্ডই বলবা। এখন শশুরবাড়ি চলো।”
সোরায়া আপত্তি করলেও মাহির তা শুনার প্রয়োজন বোধ করলো না। সীমা খান গাড়ি দিয়ে আগেই বেড়িয়ে গেছেন। এখন মাহির আর সোরায়া ও বাইকে খান বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

ভোর রাতের তীব্রতা পেরিয়ে সকাল হতেই রায়ান আর মিরা একসাথে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে। শরীরে তীব্র ব্যাথা ছিল বলে রায়ান মিরাকে ব্যাথা কমানোর জন্য একটা পেইন কিলার খাইয়ে ঘুম পারিয়েছে। রাতের ঘুম পুরো হয় নি বলে মিরাও সাথে সাথে রায়ানকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছে। মিরা ক্লান্ত শরীরে যখন রায়ান কে জড়িয়ে ধরে ঘুমায় তখন রায়ান কখনোই ঘুমায় না। সম্পূর্ণ সময় টা মিরাকে দেখে কাঁটায়। বলা চলে অর্ধাঙ্গিনীর এই রাত জাগা ক্লান্ত মুখটা তার খুব প্রিয় যা দেখা সে কোনো ভাবে এড়াতে চায় না। লুকিয়ে লুকিয়ে নিজের বউয়ের আদুরে চেহারাটা দেখতে তার বেশ ভালো লাগে। অবাককর হলেও বিষয়টা খুব দৃষ্টি নন্দন।
রায়ান মিরার মুখে এসে পড়া এলোমেলো চুলের গুচ্ছ আলতো হাতে সরিয়ে দিয়ে কানের পেছনে গুজে দিল। মিরার কপালে স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে মিরার মাথা হাত বুলিয়ে নিজে থেকে মিরাকে বলল-

“আমি জানি আমার পাগলামি সহ্য করতে তোমার জন্য খুব চাপের হয়ে যায়। কিন্তু তোমার বর যে সামলাতে পারে না নিজেকে। কি করবে বলো পাখি। একটু শক্ত হতে হবে তোমাকে।”
মিরা রায়ানের কোনো কথা শুনছে কিনা তার সন্দেহ আছে কিন্তু সে ঘুমের মাঝেই রায়ানের কোমর আরো আবেশে জড়িয়ে ধরলো ঘুমানোর জন্য। রায়ান নিজের কোমরে জড়ানো মিরার হাত গুলো দেখলো। হাতে এখনো বেল্টের বাঁধনের ছাপ স্পষ্ট। রায়ান মিরার হাত নিজের হাতে নিয়ে হাতের লাল দাগ টার উপর বেশ কয়েকটা চুমু দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-
“বউ ফর্সা হলে এই এক জ্বালা। যেখানেই ধরি ওইখানেই রক্ত জমে লাল হয়ে যায়। শরীরে একটু কামড়ে দিলেই দাগ হয়ে যায়। এটা কোনো কথা! এক রাতের জন্য কয়েক ঘণ্টা শুধু হাতটা বাঁধা ছিল- আর এতেই কি হাল হয়ে গেছে। ধুর…!”
মিরা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে দেখে রায়ান তার উপর বিরক্ত হয়ে বলল-

“যখন বলি বাঁধা দিও না কথা শুনলে কি হয় তোমার? এতো চঞ্চল কেন? হাত বেঁধেছি বলে এতো ছটফট করতে হবে? হাতটায় কেমন দাগ পড়ে গেছে দেখেছ?”
রায়ান গতকাল রাতের জন্য অনুতপ্ত। মনে মনে নিজেকে বেশ বকাঝকা করেছে। ঠিক করে নিয়েছে ওইসব বইয়ে পড়া ফেন্টাসি আর বউয়ের উপর প্রয়োগ করার চেষ্টা করবে না। মিরার ঘুম হালকা হয়ে আসলো রায়ানের ফোনের শব্দে। হঠাৎ ফোন বাজারে রায়ান বিরক্ত হলো‌। মিরা মিটিমিটি ঘুম ঘুম চোখ খুললে রায়ান মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল-
“তুমি ঘুমাও সোনা। উঠতে হবে না এখন।”
মিরা কে সে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো তার মা কল করেছেন। রায়ান ফোনটা রিসিভ করে কানে দিতেই রামিলা চৌধুরী অপর পাশ থেকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলের রায়ানের উদ্দেশ্যে-
“এই… মিরা কোথায়? বাড়িতে নেই কেন ও?”
রায়ান অবাক হলো মায়ের হাইপার গলার আওয়াজ শুনে। সে নিজের মাথায় আসা প্রথম কথাটাই বলল-
“মিরা বাড়িতে নেই খেয়াল করেছ তা আমি কি বাড়িতে? আমিও তো বাড়িতে নেই। আমাকে জিজ্ঞেস করছ না কেন আমি কোথায়?”

রামিলা চৌধুরী রায়ানের কথা তুচ্ছ জ্ঞান করে বললেন-
“তুই জাহান্নামে যা, আমার তা জানার প্রয়োজন নেই। আমার বউমা কোথায় আছে সেটা বল।”
রায়ান আড় চোখে মিরার দিকে তাকালো। মায়ের ভালোবাসা নিজের প্রাণ প্রিয় বউয়ের সাথে শেয়ার করতে হচ্ছে তার। শেয়ার না বলা চলে, এখন সবই বউয়ের। নিজের বুকে ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটার সাথেই মায়ের আদরের ভাগের রেশারেশি, এইটা ভেবেও বেচারার বড্ড আত্মা জ্বলছে। রায়ান রামিলা চৌধুরীকে তাদের কাল রাতে নতুন বাড়িতে উঠার কথাটা জানায়। রামিলা চৌধুরী তাদের তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরতে বলেন তার কি নিয়ে যেন কথা আছে। রায়ান মায়ের সাথে কথা শেষ করে মিরাকে ডাকলো-
‍”হৃদপাখি..! এখন উঠে পড়ো কেমন? পরে বাড়ি গিয়ে ঘুমিও আবার। আম্মু ফোন দিয়েছিল। যেতে হবে আমাদের।”

মিরা নিজের চোখটা একটু খুলে হাতের তালুর সাহায্য কচলে নিয়ে ঘুম জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“মামণি কি রাগ করেছে? আমরা না বলে চলে এসেছি বলে!”
রায়ান মুচকি হেঁসে বলল-
“রাগ করবে কেন? সকাল হয়েছে আমরা বাড়িতে নেই তাই চিন্তা করছিল আর কি। তাই কল দিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরতে বলল। কি যেন বলবে।”
মিরা রায়ানের কথায় বিছানায় উঠে বসলো। চোখে মুখে তার এখনো ক্লান্তি। রায়ান ও উঠে। বিছানায় হেলান দিয়ে বসে মিরাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“এখন কেমন লাগছে পাখি? শরীরের ব্যাথা কমেছে? বাইকে যেতে হবে কিন্তু। পারবে? না গাড়ি আনাব?”
মিরা রায়ানের বুকে থুতনি ঠেকিয়ে মুখটা উঁচু করে বলল-
“উহু, পারবো।”
-“আচ্ছা, তাহলে চল। উঠো।”
মিরা রায়ানের হাত ধরে আবদারের সুরে বলল-
“বাইক আমি চালাই?”
রায়ান একটু রাগি রাগি মুখ করে মিরা কে ধমক দিয়ে বলল-
“রাতে চালাতে দিয়েছি না? এখন আবার এই আবদার কেন? এখন এই অবস্থায় তোমার বাইকের পিছনে বসতেও কষ্ট হবে বলে টেনশন হচ্ছে আমার।”

মিরা রায়ানের থেকে দূরে সরে গিয়ে মুখ ফুলিয়ে মাথা টা নিচু করে নিল। রায়ান মিরাকে আদেশ মূলক কন্ঠে বলল-
“এখন হাজার বায়না করলেও বাইকের চাবি আমি দিচ্ছি না। আমার কথা শুনো- উঠো এবার। Be good girl..”
মিরা নিজের ম্যাচিউরিটি কে তেল আনতে পাঠিয়ে নিজের নেকামি তোল্লাই দিয়ে রাগ দেখায়ে বলল-
“আপনিই যান আমি যাবো না। ব্যাথা করছে শরীর। ঘুমাবো আমি।”
রায়ান হাল ছেঁড়ে দেওয়া ভাব নিয়ে বলল-
“আচ্ছা বাবা, এই নেও বাইকের চাবি।”
মিরা ফট করে রায়ানের দিকে উৎফুল্ল নজরে তাকিয়ে নিজের হাত পাতলো। কিন্তু রায়ান তো তাকে পরীক্ষা করছিল। রায়ান বুকে আড়াআড়ি করে হাত বেঁধে বলল-
“এখন শরীর ব্যাথা কই গেছে শুনি?”

মিরা রায়ানের উপর আরো রেগে গেল। রায়ান মিরাকে জব্দ করার অন্য উপায় ভেবে মিরাকে বলল-
“আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি বাইক চালাতে পারবে তবে একটা কথা পুরো করতে হবে এখন।”
মিরা আগ্রহ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো-“কোন কথা পুরো করতে হবে?”
রায়ান মিরার কোমর জড়িয়ে নিজের কাছে টেনে বলল-
“রাতের শর্ত মনে আছে? বাইকের স্পিড যেন কত ছিল? 100+..right? শর্ত অনুযায়ী আমি ১০০+ চুমু পাওনা আছি এখনো। শোধ করো তাহলে চাবি পাবে।”
মিরার ছোট ছোট চোখ গুলো মূহুর্তে বড় বড় হয়ে গেল। সে তৎক্ষণাৎ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলল-
“কিসের চুমু পাওনা আপনি? রাতে কতগুলো দিয়েছি হিসেব আছে?”
রায়ান মিরার দিকে ঝুঁকে এসে বলল-

“দাওনি… আমি নিয়েছি। তাও জোর করতে হয়েছে। ধৈর্য ধরতে হয়েছে আমার। রাতের হিসেব সম্পূর্ণ আলাদা ওয়াইফি। A deal is a deal..you have to pay..”
রায়ান আবার উল্টো পাল্টা কিছু করতে পারে এই সন্দেহে মিরা সাথে সাথে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে গিল। হঠাৎ দাঁড়ানোতে দুই পায়ের ঊরুতে ব্যাথা অনুভব হতেই আবার ধপাস করে বসে পড়লো বিছানায় উপর। রায়ান নিজের মুখে হাত দিয়ে মিটিমিটি হেসে মিরাকে খোচা দিয়ে বলল-
“আরে, কি হলো বেইবি? দাঁড়াতে পারছো না? বাইক কিভাবে চালাবে তাহলে?”
মিরা রায়ানের দিকে আগুন চোখে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বকাঝকা করে নিজের মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে নিল। রায়ান একটু ঘেঁষে ঘেঁষে মিরার কাছে এসে মিরার কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে বলল-
“আচ্ছা, শর্ত বাদ দাও। এতো না, বাস কয়েকটা চুমু দাও। একটু চার্জের দরকার। মিরা সাথে নিজের কাঁধ বাঁকা করে সরিয়ে নিয়ে বিছানা থেকে জেদ ধরে উঠে গেল। এখন ব্যাথায় পাত্তা পেল না মিরার কাছে। মিরা হঠাৎ উঠে গেল বলে রায়ান করুন মুখ করে মিরা কে ডাকলো-

“ওওওও বউ…! দাও না চুমু…!”
মিরার নিজের চোখ দুটো ছোট ছোট করে নিল। একটা মানুষ এতো চুমু পাগল কিভাবে হয়! তার মাথায় ঢুকে না। মিরা রায়ানের দিকে মুখ বাঁকিয়ে বানোয়াট হেঁসে হাতের তালুর দ্বারা একটা উড়ন্ত চুমু হুঁ দিয়ে উড়িয়ে রায়ানের দিকে দিল।
রায়ান বিরক্ত কণ্ঠে বলল-“কই চুমু দিলা এটা? উড়ে কি চলে গেল। লাগলোই তো না।”
মিরা অন্য দিকে ঘুরে গিয়ে নিজের পড়নের জামা ওড়না ঠিক করতে করতে কবিতার সুরে বলল-
“আম গাছে আম ধরে,
কুমড়ো ফলে চালে,
দূর থেকে কিস দিলাম তুলে নেও গালে…!”
রায়ান শেষ মেষ বউয়ের জেদের কাছে হারলো। তবে অনেক মিনতি করে একটা চুমু নিয়েই ছেড়েছে সে। দিনের শুরুতে সে সম্পূর্ণ হেড়েছে তাও বলা ঠিক হবে না। অতঃপর দুজন চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। রায়ান মিরার কথা চিন্তা করে বেশ সাবধানে ধীরে সুস্থে বাইক রাইড করছিল।

খান বাড়ি~
বড় প্রসস্থ ড্রয়িং রুমের সোফার এক কোণায় সোরায়ার পা গুটিয়ে বসে আছে। উপর নিচে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে। আর সোফার অন্য কোণে সীমা খান ও সিঙ্গেল একটা সোফায় খান বাড়ির কর্তা (মাহিরের বাবা)- জনাব, মাহিদ খান বসে আছেন। আর মাহির ঠিক সোরায়ার পিছনেই ভাল স্বরুপ দাড়িয়ে। সীমা খান এবং মাহিদ খান দুজনেই ঘুরে ঘুরে সোরায়াকে দেখছেন। সোরায়া নিজের হাতের নখ খুঁটছে ভয়ে টেনশনে। নিজের উপর দুজন মানুষের নজর সে আর নিতে পারছে না। মনে মনে চাইছে যেন কোনো ভাবে মাটিটা ফাকা হয়ে যায় আর সে ওখানে ঢুকে যেতে পারে। অন্যদিকে মাহির পুরো শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে- মাঝে মাঝেই বাবা মারা সামনেই সোরায়ার কাঁধে ট্যাপ করে সাহস দিচ্ছে, আভায় মাথায় চুলে হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে যা সোরায়াকে আরো লজ্জায় ফেলে দিচ্ছে। বেচারি কিছু বলতেও পারছে না- মাহিরের হাত বার বার মাথা থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু তাতে মাহিরের আচরণে কোনো পার্থক্য নেই। ছেলের কান্ড দেখে সীমা খান এবং মাহিদ খান দুজনেই অবাক। তাদের কখনো মাহির কে এভাবে দেখেন নি। ঘরের নীরবতা বৃদ্ধি পেলে মাহিদ খান হালকা কেশে গলা পরিষ্কার করে সোরায়াকে প্রশ্ন করলেন-

“তা মা, তোমার নাম কি যেন?”
সোরায়া প্রথম প্রশ্নে কেঁপে উঠলো। মাহির সোরায়াকে ভয় পেতে দেখে নিজে উত্তর করল-
“ওর নাম জান্নাতুল রহমান সোরায়া।”
সীমা খান এবং মাহিদ খান দুজনেই একসাথে মাহফিলের দিকে তাকালেন। মাহিদ খান আবারো সোরায়ার জন্য প্রশ্ন রাখলেন-
“তোমার বাড়িতে কে কে আছেন মা? কিসের পড়াশোনা করছো?”
সোরায়া এবার নিজে উত্তর করতে চেয়েও পারলো না। মাহির আগ বাড়িয়ে সব কিছুর জবাব দিতে শুরু করলো-
“ও চাচা-চাচি আর ওর বড় বোনের কাছেই মানুষ। রায়ানের আত্মীয়- সম্পর্কে শালি হয় রায়ানের। আমার কলেজেই পড়াশোনা করছে সেকেন্ড ইয়ারে। এই বছর এইচএসসি দিবে।”
মাহিদ খান একটু বিরক্ত হলেন মাহিরের আচরণে। তিনি ধৈর্য ধরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সীমা খানকে বললেন-
“সীমা তোমার গুনধর ছেলেকে বলো নিজের ঘরে যেতে। আমি সোরায়া মায়ের সাথে কিছু কথা বলবো।”
মাহির ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল-
“একা কি কথা বলবে ওকে। যা বলার আমার সামনে বলল। আমি কোথাও যাচ্ছি না ওকে এখানে একা রেখে।”
সীমা খান মাহিরকে ধমক দিয়ে বললেন-

“মাহির..নিজের ঘরে যা তুই। আমরা ওকে খেয়ে ফেলবো না। শুধু কথাই বলবো।”
মাহির পাল্টা জবাবে কিছু বলতে নিলেই সোরায়া মাহিরের শার্টের এক কোণা আঁকড়ে ধরে থামিয়ে দেয়।সোরায়া পরিবেশের গরম ভাব বুঝতে পেরে মাহিরের দিকে মাথা উঁচু করে তাকিয়ে নিজেকে ঠিক দেখানোর চেষ্টা করে বলল-
“আমি ঠিক আছি। আপনি যান।”
মাহির সোরায়ার দিকে তাকালো। সোরায়া মাহির কে ইশারা করে তার ঘরে চলে যেতে বলল। এতক্ষণ যা বাবা বলছিল- তা না শুনলেও সোরায়ার একবার বলাতে মাহির বাধ্য ছেলের মতো ড্রয়িং রুম থেকে নিজের ঘরে দিকে চলে যেতে নিলে সীমা চৌধুরী মনের ঠাওড়ে বলে উঠলেন-
“ওরে, ছেলে আমার এখন কথাও শোনে দেখছি। আগুন তাহলে সত্যি লেগেছে। সন্দেহ তো তখন থেকেই আছে যখন দেখিছি ছেলে আমার হঠাৎ করেই রাত জাগতে শুরু করেছে।”

মাহির ও মায়ের সন্দেহেরং মাত্রা পরিপূর্ণ করে দিয়ে নিজের ঘরে যেতে যেতে বলল-
“রাতে ঘুম আসবে কি করে? ঘুমের ওষুধ টাই তো শ্বশুর বাড়ির দখলে।”
সীমা খান এবং মাহিদ খান দুজনেই ফিরে মাহিরের দিকে তাকালেন আর সোরায়ার কানে এই কথা পৌঁছাতেই কান দুটো গরম হয়ে গেল। গাল গুলো ও অতিরিক্ত লাল হয়ে আছে লজ্জায়। মাহিরের চলে গেলে সীমা খান এবং মাহিদ খান দুজনেই একসাথে খুব উৎসাহ নিয়ে সোরায়ার আরো কাছে এসে বসলেন। সোরায়া ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দুজনকে পরপর দেখে যাচ্ছে। সীমা খান খুব আনন্দিত কণ্ঠে সোরায়ার হাত ধরে সাবাশী দিয়ে বললেন-
“উফ্, অবশেষে একটা মেয়ে আমার ছেলেটাকে হাত করতে পেরেছে। মা তুমি এই অসাধ্য সাধন কিভাবে করলে?”
সোরায়া ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না সীমা খান কি বললেন। সোরায়া অবাক হয়ে প্রশ্ন করে বসলো-
“জি, মানে?”

মাহিদ খান উল্টো নিজের প্রশ্ন রাখলেন সোরায়ার সামনে-
“মা তোমাদের কত দিনের সম্পর্ক? তোমরা কি বিয়ে করেছ? ভয় পেয় না, বিয়ে করে থাকলেও সমস্যা নাই। আমরা পুরাই চিল। ছেলে আমার একটু সাংসারিক হয়েছে দেখেই শান্তি লাগছে। আমরা পারিবারিক ভাবে নাহয় আবার বিয়ের আয়োজন করবো।”
সীমা খান স্বামীর কথায় সম্মতি দিয়ে মাথা নাড়ালেন।সোরায়া হতভম্ব হয়ে এসব শুনে। সীমা খান সোরায়াকে জড়িয়ে ধরে খুব আবেগি হয়ে এক প্রকার কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন-
“আজকে যে আমি কি খুশি। আল্লাহ..! তোমার হাজার হাজার শুকরিয়া। আমার একমাত্র ছেলে আজকে আমাকে এতো বড় খুশি এনে দিল।”
সোরায়া কিচ্ছু বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে তার সাথে। মাহিরের বাবা-মা মাহিরের বিয়ের জন্য এতো অপেক্ষা করেছে যে তাদের কাছে সোরায়ার বিষয়টা অমাবস্যার চাঁদের মতো। সোরায়া একটু শ্বাস নিয়ে সীমা খান কে শান্ত করে বলল-

“আ..আম্মু..আপনি কাঁদবেন না প্লিজ।”
সীমা খান সোরায়ার মুখে একই ডাক শুনে আরো আবেগে গা ভাসিয়ে দিয়ে মাহিদ খান কে উদ্দেশ্য করে বললেন-
“এই তুমি শুনলা..? ও আমাকে আম্মু ডাকলো..! আহা, একটা মেয়ের মুখে আম্মু ডাক শুনার ইচ্ছায় আমি বুড়ি হয়ে যাচ্ছিলাম। আজকে সেই ইচ্ছাও পুরোন হয়ে গেল। আরেকবার আম্মু ডাকো তো মা..!‌ ”
সোরায়া আমতা আমতা করে আরেকবার আম্মু ডেকে কথা বলল-
“আ.. আম্মু..আপনি কাঁদবেন না প্লিজ। আমি আসলে বুঝতে পারছি না কিছু।”
সীমা খান নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না। মাহিদ খান নিজেও বেশ লোভী মন নিয়ে সোরায়াকে বললেন-
“ওরে আমার ছোট্ট আম্মু জান, আমাকেও একবার আব্বু ডাকো তো।”
সোরায়ার হঠাৎ মনে কেমন যেন মনে হলো। হঠাৎ করেই নিজের বাবা মার কথা খুব মনে পরলো। এতো আদর করে কেউ কখনো আম্মু আব্বু ডাকতে বলে নি তাকে তার নিজের বাবা মা ছাড়া। কিন্তু সেসব তো তার মনেও নেই। সোরায়ার চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। সে মুচকি হেঁসে খুব আনন্দিত মনে মাহিদ খান কে ডাকলো-
“আসসালামুয়ালাইকুম আব্বু।”

-“ওয়ালাইকুমু আসসালাম আম্মু জান।”
মাহিদ খান খুশি মনে নিজের পকেট থেকে কয়েক টা হাজার টাকার নোট বের করে সোরায়ার মাথা থেকে পা অব্দি বড়ে নিয়ে তার হাতে দিয়ে বললেন-
“আল্লাহ যেন আমার মেয়েটাকে সব বালা মছিবত থেকে রক্ষা করেন।”
সোরায়া হা হয়ে শুধু তার সামনের দুজন মানুষ কে দেখছে। কি অদ্ভুত! এই মানুষ গুলো তাকে কেবল আজই দেখেছে, অথচ তার মনেই হচ্ছে না এমন কিছু। মাহিরের জন্মের পর সীমা খানের অসুস্থ তার দরুন তাদের আর দ্বিতীয় সন্তান প্রাপ্তীর সম্ভাবনা ছিল না। তাই সীমা খান একমাত্র ছেলেকে বিয়ে জন্য তাড়া দিতেন শুধু একটা মেয়ের আশায়। আজ সীমা খান নিজেও তার স্বামীকে দেখে অবাক – এর আগে কখনো তিনি তার স্বামীকে একটা মেয়ের পিতা হওয়ার আশা ব্যক্ত করতে দেখেন নি। এমন কি সীমা খান এই নিয়ে যখন তাকে বলতেন তিনি বিষয়টা এড়ি যেতেন বা ধামা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। যেন তার কোনো ইচ্ছেই নেই দ্বিতীয় সন্তানের প্রতি। সীমা খান সন্তুষ্ট মনে মাহিদ খান ও সোরায়াকে একসাথে দেখলেন- চার কাছে বাপ মেয়ের জুটি খুব ভালো ঠেকলো। এই দিকে, সোরায়া এক ঝলকে নিজের বাবা মাকে সীমা খান এবং মাহিদ খানের মাঝে দেখতে পেল বলে মনে হলো তার।
খোদা তায়ালার কি সুন্দর রহমত!

জীবনে সব পাওয়া না পাওয়ার হিসেব কোনা কোনো জায়গায় এসে আসলে মিলে যায়। আজ এক দম্পতি তাদের কাঙ্ক্ষিত কণ্যা পেল অন্যদিকে এক অনাথ মেয়ে বাবা মা পেল। মাহিরের কথা তো কারো মাথাতেও এলো না। সোরায়া নিজের আবেগ সামলে নিয়ে সীমা খান এবং মাহিদ খানের আবেগ ও নিজের কথার দ্বারা সামলে নিল। বেশ অনেকক্ষণ কথা হলো তাদের- পরিবার নিয়ে, পড়াশোনা নিয়ে, ভবিষ্যতের প্লেন নিয়ে। আলোচনার এক পর্যায়ে সোরায়া নির্দ্বিধায় বলে বসলো- তার খিদে পেয়েছে। যা শুনা মাত্রই সীমা খান রান্নাঘরে ছুটলেন। সোরায়া খুব আনন্দিত আজ। সেও দৌড়ে সীমা খানের পিছন পিছন গেল। মাহিদ খান ও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। ছেলের কথা ভুলে গিয়ে মেয়ের প্রতি তাদের যত্ন এখন চূড়ান্ত সীমায়।
নাস্তা তৈরি হয়ে গেলে সীমা খান সোরায়া কে মাহির কে ডাকে আনতে বললেন। সোরায়া প্রথমে মাহিরের ঘরে না যেতে চাইলেও পরবর্তীতে কৌতুহল বসত রাজি হলো- সে ও মাহিরের ঘরটা দেখতে চায়। যেটা ভবিষ্যতে তারও হবে।

সোরায়া ঘরে না করতেই দেখলো দরজা তো খোলাই ছিল। শুধু চাপিয়ে রাখা। হয়তো মাহির ইচ্ছে করেই খুলে রেখেছে যেন সোরায়া প্রয়োজনে সেখানে যেতে পারে। সোরায়া দরজাটা খুশি আগে নিজের মাথা মাহিরের ঘরে ঢুকিয়ে ঘরের ভেতরটা পরখ করে দেখার চেষ্টা করলো। তারপর সম্পূর্ণ শরীর ঘরের ভিতর প্রবেশ করে দেখলো ঘরে মাহির নেই। সোরায়া ঘরটায় একটু চোখ বুলিয়ে দেখলো- একজন আদর্শ প্রফেসরের রুম যেমন হওয়ার কথা মাহিরের রুম একদমই তার ব্যাতিক্রম নয়।
সোরায়া ওয়াশ রুমের শাওয়ার অন থাকার আওয়াজে বুঝল মাহির শাওয়ার নিচ্ছে। বিছানার উপর মাহিরের স্কাই ব্লু কালারের শার্ট রাখা সাথে বাকি সব পরিধানের জিনিস ও। সোরায়া বিছানার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে মাহিরে্য শার্ট টা নিজের হাতে তুলে নিল। সে আগ্রহী হয়ে শার্টটা নিজের নাকের কাছে নিয়ে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিলো- শার্টের ঘ্রাণেও বোঝা সম্ভব এটা মাহিরেরই। সোরায়া একই কাজে মত্ত হয়ে রইল। তার ভীষণ ভালো লাগছিল মাহিরের উপস্থিতি অনুভব করতে।

হঠাৎ কেউ একজন পিছন থেকে এসে তার হাত থেকে শার্ট টা কেড়ে নিল। সোরায়া বিরক্তি ভরা মুখে পিছন ফিরতেই দেখলো মাহির কেবল কোমরে টাওয়াল পেঁচিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে। সোরায়া মাহফিলের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল- পুরো নিজের উপন্যাসে পড়া নায়কদের মতো ফিজিক মাহিরের। মাহির সোরায়ার মাথা টোকা দিয়ে তার ধ্যান ছোটালো। সোরায়া তার পেটের সুবিন্যস্ত অ্যাবস দেখছিল। সোরায়া নিজের মাথায় হাত ঘষতে ঘষতে অন্য দিকে নজর ঘুরালো। আর না চাইতেও নিজের হয়ে সাফাই দিতে চাইলো-
“আসলে..আমি..ওই..!”
মাহির সাথে সাথে সোরায়ার হাত ধরে টেনে নিজের সামনে এনে দাঁড়া করিয়ে বলল-
“আসলে তুমি কি? আমাকে কাছে পেতে চাইছো?”
সোরায়া বড় বড় চোখ করে মাহিরের দিকে তাকিয়ে অস্বীকার করে বলল-
“না না, তা নয়..!”

মাহির সোরায়ার কোমরে নিজের হাত রেখে সেখানে নিজের হাতের স্পর্শ দৃঢ় করে বলল-
“Excuse me? না মানে? তুমি বলতে চাইছ তুমি আমাকে কাছে চাও না?”
সোরায়া নিজের কোমরে মাহিরের হাতের উপর হাত রেখে আমতা আমতা করে বলল –
“আ..আমি..তো শুধু ডাকতে এসেছিলাম। কোমর থেকে হাতটা সরান প্লিজ। আমার সুরসুরি আছে ওখানে।”
মাহার ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল-
“হায়রে গাধি, দূর্বলতা কখনো বলতে আছে? তাও আবার তার কাছেই যে এই দূর্বলতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারবে।”
সোরায়া নিজের আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে রইল মাহিরের হাতের উপর হাত রেখে। মাহির নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে শার্ট টা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে সোরায়ার হাত টেনে শার্টের উপর রেখে বলল-

“বোতাম গুলো লাগিয়ে দাও।”
সোরায়া লাজুক মুখে নিজের নজর সরিয়ে নিল মাহিরের উন্মুক্ত বুক থেকে। কাঁপা কাঁপা হাতে শার্টের বোতাম গুলো লাগাতে শুরু করলো। মাত্র ৭টার মতো বোতাম লাগাতে প্রায় দশ মিনিট লাগলো তার হাত কাঁপছিল বলে। কিন্তু মাহির চুপ করে দাঁড়িয়ে তার জানবাচ্চাকে ওই বোতাম গুলো নিয়ে স্ট্রাগেল করতে দেখছিল কোনো প্রকার বিরক্তি বোধ ছাড়া। মাহিরের তাকানো যে সোরায়া আরো ঘাবড়ে গেছিল। সব গুলো বোতাম লাগিয়ে দিয়ে সোরায়া মাহফিলের দিকে তাকাতেই দেখলো মাহির তার দিকে নজর স্থির করে রেখেছে এখনো। মেয়েটা লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে। সোরায়া নিচের দিকে তাকিয়ে বলল-
“বোমাত লাগানো শেষ তো আর কি দেখছেন?”
মাহির সোরায়ার উচ্চতায় ঝুঁকে গিয়ে কানে কানে বলল-

“আমার বাচ্চা বউটা আমাকে বেশ ভয় পায় দেখছি, শার্টের বোতাম লাগানো আর খোলা দুটোতেই পটু হতে হবে যে ফিউচার ওয়াইফি। আমি বিয়ের পর বড্ড নির্ভরশীল হয়ে যাব। সহ্য করতে হবে সব কিছু মুখ বুজে। ২৮ বছরের জীবনে আর নিজে নিজে শার্টের বোতাম খুলতে আর লাগাতে ভালো লাগে না।”
সোরায়ার কান দিয়ে গরম ধোয়া বের হবে মাহির কথায় যদি সে কান দেয়। সোরায়া মাহির কে সোজা ভাবে বলল-
“খেতে আসুন। আম্মু আব্বু অপেক্ষা করছে।”
সোরায়া ঘর থেকে বের হতে নিলে মিহির নিজের থেকে প্রশ্ন করলো-
“আম্মু আব্বু তোমাকে খুব বিরক্ত করছে না তো?”
-“কই না তো। এমন কেন বললেন!?”
-“ছোট্ট থেকে আম্মুকে মেয়ে বেবিদের প্রতি খুব সহানুভূতিশীল দেখে আমার রাগ হতো। বড় হয়েও শুধু বিয়ে বিয়ে করতো একটা মেয়েকে বাড়িতে আনবে বলে। আর আমি এটা একদম নিতে পারতাম না। আব্বু যদিও বলে না তবু আমি জানি আব্বু ও একটা মেয়ে চাইতো। আমার সব মেয়ে কাজিন গুলোকে আমার থেকে বেশি চকলেট কিনে দিতো।”

সোরায়ার মাহিরের মুখে এমন হিংসায় ভরা কথা গুলো শুনে বেশ হাসি পেল। মাহির সোরায়ার সামনে এসে দাঁড়িয়ে সোরায়ার মুখটা নিজের দুই হাতের মাঝে নিয়ে বলল-
“কখনো ভাবি নি নিজের আদরের ভাগ দিতে কাউকে নিজ ইচ্ছায় বাড়িতে আনবো আমি। হাহ্! তাও এনেছি আস্ত একটা পুতুলকে। আম্মু আব্বু যে তোমাকে পেলে খুশিতে কি কি করবে এই নিয়ে ভয় কাজ করছিল।”
সোরায়া মাহিরের কথা শব্দ করে হেঁসে উঠে প্রশ্ন করলো-
“আপনি এর জন্য ভয় পাচ্ছিলেন যে আম্মু আব্বু আমাকে পেয়ে বেশি উৎসাহিত হয়ে যাবে?”
-“হুম…!”
সোরায়া খিলখিলিয়ে হেসে বলল-

“তা নিজের বাবা মার আদরের মালিকানা যে আমাকে দিয়ে দিলেন এখন কি করবেন আপনি?”
মাহির সোরায়ার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা দেখে তৃপ্তি নিয়ে বলল-
“কি আর হবে, ভাবছি আমার আদর টুকু ও তোমাকে দিয়ে দেব। পরে এই অতি ক্ষুদ্র জীবনে তোমার থেকে সব আদর ধীরে ধীরে উশুল করবো। সবার আদর একজনের থেকে নিয়ে নেওয়া বেশি সহজ।”
সোরায়া মাহিরের উত্তরে মিষ্টি হাসলো। মাহির শার্টের কলার টা আঁকড়ে ধরে নিজের পায়ের পাতায় ভোর দিয়ে দাঁড়িয়ে টুপ করে মাহিরের গালে একটা চুমু দিয়ে ঘর থেকে দৌড়ে পালিয়ে যেতে যেতে বলল-

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৬ (২)

“আপু বলেছে উল্টো পাল্টা কিছু করতে না। আর এই টা এখন থেকে আপনাকে মানতে হবে আমাকে না। খেতে আসুন।”
মাহির সোরায়ার দৌড়ে পালানোর দিকে তাকিয়ে থেকে ঠোঁট কামড়ে হেসে নিজের গালে হাত ছোয়াল আর পরে হাত টা নিজের ঠোঁটে স্পর্শ করলো।

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৮