পৌষপার্বণ পর্ব ১২
Irfa Mahnaj
বেলা বাড়ে আর সেই সাথে পৌষের অবস্থাও খারাপ হতে থাকে। মেয়েটার ব্যথায় জর এসে গেছে।
অনেকের আছে না কিছু হলেই অসুখ বাঁধে। সেরকমই পৌষ। ওর সব কিছুই একটু বেশি সেনসিটিভ।
আর গত কাল রাতে ওর সাথে যা হলো তাতে জর আসবে স্বাভাবিক। সেই সাথে সারারাত কান্না আর চিৎকারে গলা বসে গেছে ওর।
ওর শিয়রে এখন চৈত্র বসে আছে। পৌষের মাথায় জল পট্টি দিচ্ছে আর কিছুক্ষণ পর পর ভাইয়ের দিকে কটমট করে তাকাচ্ছে।
সকালে পার্বণ যখন দেখলো পৌষের গা গরম তখনই বুঝে গেছে এই মেয়ের জর আসবে। তাই সময় ব্যয় না করে দ্রুত ছুটে ভাদ্রের রুমের দিকে।
দরজায় জোরে জোরে বাড়ি দিয়ে ধাক্কায়। মনে হয় পারলে ও দরজা ভেঙ্গেই ভিতরে ঢুকে যেতো।
পার্বণের জ্বালায় খেক খেক করতে করতে এসে দরজা খুলে ভাদ্র। গত রাতের কথা মনে হতেই একই সাথে রাগ আবার অস্বস্তি ও হতে লাগে।
সেই কারণেই একটু খেঁকিয়ে উঠে ভাদ্র,
— এই কি হয়েছে? এভাবে ধাক্কাছিস কেনো। দরজা কি তোর বাপের?
— দরজা আমার বাপের না হলেও তোমার ঘরে থাকা নারীটি আমার বাপেরই তাই সাইড দেও তাকে নিয়ে যেতে হবে।
কথাটা বলতে বলতে ভাদ্রকে ঠেলে ঠুলে ভিতরে গিয়ে ঘুমন্ত চৈত্রকে ঘুম থেকে তুলে টেনেটুনে নিয়ে যেতে নেয় পার্বণ।
বউকে এভাবে টানা হেচড়া করতে দেখে চেঁচিয়ে উঠে ভাদ্র,
— এই এই করছিস কি? আমার বউ নিয়ে যাচ্ছিস কোথায়?
— আমার বউয়ের কাছে।
ব্যস এটুকু বলেই চৈত্রকে নিয়ে পার্বণ সেখান থেকে চলে যায়।পরে ভাদ্র ও সাথে যায়।
পার্বণের ঘরে ডুকে তো ভাদ্র ও চৈত্র দুজনের মাথাই বাজ পড়ে। খাট ভেঙ্গে আছে। আর সেই ভাঙ্গা খাটের উপর পৌষ কাতরাচ্ছে।
চৈত্র তো এই অবস্থা দেখে কথাই বলে গেছে কি বলবে। তারপরই পার্বণের পিঠে একটা কিল বসিয়ে বলে,
— ওই বজ্জাতের হাড্ডি এই কি করেছিস মেয়েটার!
অতপর হায় হায় করতে করতে গিয়ে পৌষের কাছে যায়। পার্বণকে শাসিয়ে পৌষকে নিজের ঘরে মানে চৈত্ররা যেই ঘরে ছিলো সেখানে দিয়ে আসতে বলে।
বউয়ের অবস্থা আসলেই ভালো না তাই বোনের কথা চুপচাপ শুনে সুরসুর করে পৌষকে কোলে তুলে নিয়ে গিয়ে রেখে আসে চৈত্রদের ঘরে।
বর্তমানে ~
ভাদ্র রুম জুড়ে পায়চারি করছে। ও কি বলবে সেটাই বুঝছে না। ভাষা হারিয়ে ফেলেছে জাস্ট।
সবাইর এহেন দশা হলেও নির্বিকার পার্বণ। রুমের এক কোনায় রাখা চেয়ারে দুই পা ছড়িয়ে বসে আছে।
— দেখ বেয়াদব কি করেছিস? মেয়েটার জর বাঁধিয়ে দিলি?
চৈত্রের কথা শেষ হতে না হতেই পার্বণের জবাব,
— বাসর তো ভাই আমারও ফার্স্ট টাইম ছিলো। আমার কিছু হয়নি আর তোর বোন ফিট পরে গেলো! এ থেকে প্রমাণিত হয় তোর বোনের ইমিউনিটি কম। আমার কোনো দোষ নেই।
— না তোর দোষ কীভাবে থাকবে। পৌষ তো নিজেই নিজের এই অবস্থা করেছে। আর তোর লজ্জা করে না এভাবে বড় বোন আর ভাইয়ের সামনে বাসরের কথা বলছিস?
— আশ্চর্য করার সময়ই লজ্জা করলো না আর বলার সময় কেনো করবে!
কাশি উঠে গেলো ভাদ্রের। চৈত্র নিজের নজর লুকাচ্ছে।
— এতো কাশা কাশি করছো কেনো ? বাসরের কথা তো আগে তোমরাই উঠালে।
এবার মুখ খুলে ভাদ্র। পার্বণকে বলে,
— বেয়াদব আমার বোনের কী দশা করে দিয়েছিস তুই তোকে আমি কি যে করবো।
— আমি তোমার বোনের এই অবস্থা করেছি তুমিও আমার বোনের এমন অবস্থা করে দেও। ব্যস শোধবোধ।
চেঁচিয়ে উঠলো চৈত্র। বলল,
— বেরো এখনই আমার রুম থেকে বেরিয়ে যা দুটোতে।
— বউ ছাড়া যাবো না আমি।
পার্বণের কথা বলতে দেরি ওর মুখে চপ্পল মারতে দেরি হয়না। হাতের কাছে কিছু না পেয়ে ফ্লোর থেকে চপ্পলই ছুঁড়ে মারে চৈত্র।
— আহ! আর পারছি না আমি মেঘ ভাই। ব্যথা করছে আমার।
পূর্ণার কথা শুনে কালমেঘ বলে উঠে,
— আস্তাগফিরুল্লাহ! এই তুই আহ করছিস কেন? আর ব্যথা করছে মানে! আমি তো তোকে ধরলামই না।
কালমেঘের কথাটা যে কোন মিনিং বুঝিয়েছে তা আর বুঝতে বাকি থাকে না পূর্ণার। ও ভোঁতা মুখ করে বলে,
— ছি কি অশ্লীল আপনি মেঘ ভাই! আমি হাতের কথা বলেছি। আপনার পিঠ চুলকাতে চুলকাতে আমার হাত ব্যথা হয়ে গেছে।
— তো আমি কোন সময় এসব বললাম! আমি তো তোকে ধরে মারার কথা বলেছি। তুই যে আদর বুঝবি সেটা কে জানতো। আসলে তোর মাইন্ডই খারাপ।
কলমেঘের কথা শেষ হতেই ওর পিঠে ধুপ করে একটা কিল বসিয়ে দিলো পূর্ণা। রাগে গজরাতে গজরাতে চলে যেতে নিলেই কালমেঘ বলে উঠে,
— এই এই আমার পিঠ এখনো চুলকানো বাকি আছে। তুই যাস কই?
না দাঁড়িয়েই পূর্ণা জবাব দেয়,
— হরেক রকমের জিনিসের ভ্যানগাড়ি গুলো যখন আসবে তখন একটা পিঠ চুলকানি কিনে নিবেন। আমি আর আপনার পিঠ চুলকে দিতে পারবো না।
বলেই সেখানে আর এক মুহুর্তও দাঁড়ালো না পূর্ণা। ওর যাওযার পানে তাঁকিয়ে দোলনায় বসা কালমেঘ শব্দ করে হেসে উঠে।
নিচু গলায় আওরায়,
— ভবিষ্যত বউ আমার ভীষণ ক্ষেপেছে। ইশ আজকে ভবিষ্যত না হয়ে বর্তমান বউ হলে চেপে ধরে এখন ওই ফুলো গালে ঠোঁট দাবিয়ে চুমু খাওয়া যেতো।
আফসোস হতে লাগে কালমেঘের। তবে আফসোস করে কি হবে এখন।
দুই হাত উপরে তুলে আড়মোড়া দেয় কালমেঘ। গাল চুলকে পায়ে স্লিপার পড়ে হাটা দেয়।
যার জন্য এতক্ষণ ছাদে ছিলো সেইই এখন নেই । তো কালমেঘ থেকে কি করবে। তাই কালমেঘ ও নেমে যায়।
তখন পূর্ণার নিকট এগোতে এগোতে ওকে ছাদের রেলিংয়ের সাথে আটকে দেয় কালমেঘ।
অতপর মুখ নামিয়ে নেয় ওর ঘাড়ের কাছে। ঘাড়ে শুধু নিজের গরম নিঃশ্বাস গুলোই ফেলে কালমেঘ। এছাড়া কিছুই করে না।
তবে পূর্ণা এতেই জমে যায়।ও কাপতে কাপতে বলে,
— ক… কি করছেন কি মেঘ ভাই?
কালমেঘ সেভাবে থেকেই বলে,
— জানতে চাস?
পূর্ণা জামার দুই প্রান্ত খাঁমচে ধরে মাথা ঝাঁকায়। মৃদু হাসে কালমেঘ ওর মাথা ঝাকানো দেখে।
তারপর ওর কানের সাথে ঠোঁট ছুঁই ছুঁই করে বলে,
— পিঠ টা চুলকে দে তো।
ব্যস সব অনুভূতির রফাদফা করে দেয় কালমেঘ। মানে এই ছেলেকে কি বলবে তাই ভেবে পায়না পূর্ণা।
চপ্পলের বাড়ি খেয়ে তৎক্ষণাৎই রুম থেকে বেরিয়ে যায় পার্বণ। ভাদ্র ও আর রিস্ক নেয় না।
বউ যেই পরিমাণে রেগে গেছে। ভাদ্রকে মেরে হসপিটাল ভর্তি করে দিতে পারে!
ভয়ে বুকে থু থু ও ছিটায় ভাদ্র। ওর কার্যকলাপ পাশে দাড়ানো পার্বণ দেখে আর হেসে কুটি কুটি হয়।
পার্বণের হাসি গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দিলো ভাদ্রের। দিলো এক রাম ধমক।
ভাদ্রের ধমকে সুতা পরিমাণ ও কিছু হয়নি। তবুও একটু অভিনয় করলো। মুখে আঙুল দিয়ে বুঝলো ও আর হাসবে না।
পার্বণ যে ভণ্ডামি করছে তাতে একটুও সন্দেহ নেই। ভাদ্র নিজের কপাল চাপড়ে বলতে থাকে,
— তোরে বিয়ের কথাটা বলাই আমার সবচেয়ে ভূল হয়েছে।
— ভূল কথা বললে ভাই।
— কি বলতে চাইছিস কি তুই?
— পৌষ আর আমার বিয়ে হয়েছে এটা না বলেই ভূল করেছো তোমরা। বাড়ি ফিরি আগে তারপর তোমাদের রাজাকার পরিবারের কি করি দেখো।
হতাশ হয় ভাদ্র। তারপর কিছুর একটা ভেবে বলে,
— খাট ভাঙ্গলো কীভাবে?
— কাল রাতে তো দরজার ওপারে দাড়িয়ে আওয়াজ গুলো শুনলেই তারপরও জিজ্ঞেস করছো?
ভাদ্রের কপালে ভাঁজ পড়লো। ও চোখ ছোট ছোট করে পার্বণের দিকে আঙ্গুল তাক করে জিজ্ঞেস করে,
— তার মানে তুই?
— হ্যাঁ ঐভাবে দরজা ধাক্কালে আমি কেনো যে কেউ জেনে যাবে দরজার ওপারে মানুষ আছে।
— তাহলে দরজা খুললি না কেনো?
বিরক্ত হলো পার্বণ। বলল,
পৌষপার্বণ পর্ব ১১
— আশ্চর্য আমি বউকে আদর করছি। এরকম একটা টাইমে আমি দরজা খুলবো? হাউ ফানি। তাছাড়া জানো না স্বামী স্ত্রী দরজা আটকে রাখলে ডিস্টার্ব করতে হয় না? তুমি তো পুরো ডিস্টার্ব এর উপরে চলে গেছো। জানোনা এগুলো ব্যাড ম্যানার্স।
তব্দা খেয়ে গেলো ভাদ্র। ছোট ভাই বড় ভাইকে ম্যানার্স শিখাচ্ছে তাও কিনা এসব ব্যাপারে!
পার্বণ ওর এই চেহারা দেখে আড়ালে মুচকি হাসলো। বলে,
— খাটের মান ভালো না হলে খাট তো ভাঙ্গবেই। লোড নিতে পারেনি তাই ঠুস করে ভেঙ্গে গেছে।
