Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৩

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৩

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৩
নওরিন কবির তিশা

নৈশ ভোজের আয়োজনে সকলের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ সুখনীড়ের ডাইনিং টেবিল। ওপরে ঝুলে থাকা ঝাড়লণ্ঠনের হলদেটে আলোয় চারপাশটা বেশ মোহনীয় দেখাচ্ছে। ডাইনিংয়ে ইলিশের ঝোল আর গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের গন্ধে ম ম করছে। অন্যান্য দিন তৃষা সবাইকে খাবার বেড়ে দেয় তবে আজকে অসুস্থতার কারণে হামিদা বেগমই সে দিকটা সামলাচ্ছেন।মেহেসানা আর আদ্রিয়ান সামনাসামনি বসা। মেহেসানার পাশেই বসেছে টুইংকেল। যেহেতু তৃষা আজ ওকে খাওয়াতে পারবে না ‌ তাই সেই দায়িত্বটা মেহেসানাই নিয়েছে।
আদ্রিয়ান এক মনে ডাল বাটি থেকে পাতে নিচ্ছিল, আর মেহসানা ব্যস্ত টুইংকেলকে মাছের কাঁটা বেছে খাওয়াতে। টুইংকেল মাঝে মাঝেই মেহসানার কানের কাছে মুখ নিয়ে আদ্রিয়ানের দিকে ইশারা করে ফিসফিস করছে, আর মেহসানা মিটিমিটি হাসছে।
ঠিক তখনই আর্য ড্রয়িং রুম থেকে সোজা ডাইনিংয়ে প্রবেশ করল। চোখেমুখে ক্লান্তি থাকলেও তার ব্যক্তিত্বের সেই তীক্ষ্ণতা কমেনি। সে এসে তৃষার ঠিক পাশের চেয়ারটা টেনে বসল। আর্যর উপস্থিতিতে মুহূর্তেই যেন টেবিলের কোলাহল একটু স্তিমিত হয়ে এল।
আর্য বসতে বসতেই হামিদা বেগমের দিকে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর স্বরে বলল,,

—‘চাচিমা,তৃষার পাতে শুধু ভাত আর ডাল দিলে হবে না। ওকে একটু বেশি করে প্রোটিন দিন।আর হ্যাঁ, ডক্টর বলেছে বেশি ঝাল বা রিচ ফুড যেন ও আজ না খায়। আপনি ওর জন্য আলাদা করে কিছু সবজি বা হালকা মাছের কিছু রেখেছিলেন তো?
হামিদা বেগম হেসে বললেন,,
—‘হ্যাঁ রে বাবা, রেখেছি। তোমার হুকুম মানতে মানতে তো আমার নাজেহাল দশা। এই যে তৃষা মা, এই হালকা মসলার মাছের ঝোলটা খাও, আর্য বাজার থেকে এটা তোমার জন্যই খুঁজে এনেছে।
তৃষা আর্যর দিকে তাকাতেই দেখল আর্য অত্যন্ত নির্লিপ্ত মুখে নিজের গ্লাসে জল ঢালছে। আদ্রিয়ান এবার সুযোগ পেয়ে ফোড়ন কাটল,,

—‘শোনো মাদার ইন্ডিয়া, আর্য ভাইয়ের এই ডায়েট কন্ট্রোল শুধু তৃষা ভাবির জন্যই। আমরা তো এখানে স্রেফ সাইড ক্যারেক্টার। আর্য ভাই, তুমি কি আইল অব সি-তে থাকতেও এমন ক্যালরি মেপে খাবার খেতে নাকি আজই প্রথম এই পুষ্টিবিজ্ঞানী ড্রেসটা পরলে?
আর্য আড়চোখে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,,
—‘যাদের ব্রেইন এবং হাত ঠিকভাবে কাজ করে না, তাদের একটু হেলদি খাবারই লাগে আদ্রিয়ান। তুই বরং নিজের মাছের কাঁটা বাছায় ফোকাস কর।
তৃষা বাম হাতে চামচ নাড়াচাড়া করতে করতে মৃদু স্বরে বলল,,

—‘চাচিমা, এত কিছু লাগবে না। আমি ডাল দিয়েই খেতে পারব।
আর্য এবার সরাসরি তৃষার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল,,
—‘চুপচাপ মাছটা শেষ করুন। আপনার এই ল্যাকিং অফ প্রোটিন শরীর নিয়ে আমি আর কোনো এক্সিডেন্টাল স্টান্ট দেখতে চাই না। হাতটা সারানো দরকার, স্টাইল মারা পরে হবে।
তৃষা মনে মনে গাল ফুলিয়ে ভাবল,,
—‘মানুষটা কি একটু মিষ্টি করে কথা বলতে পারে না?
মৃত্তিকা আর সাবরিনা এক কোণে বসে হাসাহাসি করছিল। সাবরিনা বলল,
—‘ভাইয়া, তুমি কি তৃষা ভাবির পার্সোনাল নার্স হিসেবেও জয়েন করেছো? আমরা তো জানতাম ক্যাপ্টেনরা শুধু জাহাজে ইনস্ট্রাকশন দেয়, এখন দেখছি তারা ডায়েট চার্টও বানায়!
আর্য গম্ভীর মুখে খাওয়ার এক লোকমা মুখে তুলে বলল,,

—‘পরিবারের কেউ যদি অতিমাত্রায় কেয়ারলেস হয়, তবে কাউকে না কাউকে দায়িত্ব নিতেই হয়। আর তোমরা এত বেশি কথা না বলে খাওয়ার দিকে মন দে।
খাওয়ার মাঝখানে টুইংকেল হঠাৎ বলে উঠল,
—‘পাপা! তুমি তো কাল রাতে বানিকে খাইয়ে দিয়েছিলে, এখন কেন খাইয়ে দিচ্ছ না? দেখো বানি বাঁ হাতে খেতে পারছে না!
পুরো টেবিলে মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এল। আদ্রিয়ান মুখ চেপে হেসে উঠল। মেহসানা তৃষার অস্বস্তি দেখে টুইংকেলকে থামানোর চেষ্টা করল, কিন্তু টুইংকেল তো অবুঝ, ও তো শুধু যা দেখেছে তাই বারবার বলছে।আদ্রিয়ান বাঁকা হেসে বলল,

—‘কি আর্য ভাই?
আর্য একটুও বিচলিত না হয়ে তৃষার থালার দিকে তাকাল। দেখল তৃষা সত্যিই বাম হাত দিয়ে মাছের কাঁটা বাছতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। সে নিজের খাওয়া থামিয়ে, অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তৃষার থালাটা নিজের দিকে টেনে নিল। পুরো টেবিলের সবার দৃষ্টি এখন আর্যর ওপর।
সে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মাছের কাঁটাগুলো আলাদা করে ভাতের সাথে মেখে আবার তৃষার সামনে এগিয়ে দিল। এরপর শান্ত গলায় বলল,
—‘অসুস্থ হাত নিয়ে সার্কাস দেখানোর প্রয়োজন নেই। এটা খেয়ে নিন।
তৃষা আর্যর এই অপ্রকাশিত যত্নের ধরন দেখে অবাক হলো। মানুষটা মুখে রুক্ষতা দেখালেও কাজে যে কতটা কেয়ারিং সেটা আজ আবার অনুভব করলো তৃষ, সে নিচু স্বরে বলল,
—‘থ্যাঙ্ক ইউ।
আর্য সংক্ষেপে উত্তর দিল, —‘ থ্যাংক ইউ বলার প্রয়োজন নেই। খাবারটা ফার্স্ট শেষ করুন ওষুধ খাওয়ার সময় হয়েছে।
মেহসানা আড়ালে তৃষার পায়ে পা দিয়ে খোঁচা মারল। তৃষা ব্যস্ত কণ্ঠে তাকাতেই সে ফিসফিস করে বলল,,
—‘তোর বরটা কিন্তু হেব্বি মাইরি। কি কেয়ারিং!
তৃষা কটমটিয়ে তাকাতেই মেহেসানা তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি ঘুরিয়ে টুইংকেলের সাথে গল্পে লিপ্ত হলো।

সুখনীড়ের ড্রয়িংরুম এখন হাসির ফোয়ারায় টইটম্বুর।আড্ডার পারদ তখন তুঙ্গে। ড্রয়িংরুমের ঝাড়লণ্ঠনের আলো মেহসানার উত্তেজিত মুখের ওপর পড়ে ঝিকমিক করছে। আদ্রিয়ান একটা ডালিমের দানা মুখে ফেলে বেশ আয়েশ করে চিবিয়ে মেহসানার দিকে তাকাল।
—‘মিস মিমি, আপনার কথা বলার স্পিড তো দেখছি ট্রেনের চেয়েও বেশি।
মেহসানা ভ্রু কুঁচকে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“মিস্টার সার্জেন্ট, আপনার ডিকশনারিতে কি খোঁচা দেওয়া ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই? আমি আমার ফ্রেন্ডের সাথে গল্প করছি, তাতে আপনার কি পেট ব্যাথা করছে? আজাইরা কোথাকার!
আদ্রিয়ান সোফায় আরও একটু হেলান দিয়ে বসল,,
—‘ব্যথা পেটে নয় মিস, কানে। আপনার হাই-পিচ ভয়েস শুনলে মনে হয় কোনো অপেরা সিঙ্গারের রিহার্সাল চলছে।
তৃষা হেসে ফেলল। ব্যান্ডেজ করা হাতটা সাবধানে বালিশের ওপর রেখে বলল,

—“আদ্রিয়ান ভাইয়া, মেহু কিন্তু রাগলে খুব ভয়ংকর। ওর হাই-পিচ ভয়েস তখন থান্ডারে কনভার্ট হয়ে যায়, সাবধান!
টুইংকেল মেহসানার কোলে বসে আদ্রিয়ানের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল,
—“চাচ্চু! তুমি মিমিকে পচা বলছো কেন? মিমি তো আমাকে কত সুন্দর গল্প শোনাল। তুমি কি জানো মিমি বলেছে বানি যখন ছোট ছিল, তখন সে ইঁদুর দেখে ভয় পেত?
পুরো ঘরে হাসির রোল পড়ে গেল। তৃষা চোখ বড় বড় করে মেহসানার দিকে তাকাল। মেহসানা জিব কেটে বলল,
—“স্যরি দোস্ত, মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে!
আদ্রিয়ান এবার অট্টহাসি দিয়ে উঠতেই তৃষা তাকালো ওর দিকে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলিয়ে ও বলল,,—“স্যরি,স্যরি বাট ইঁদুর? সিরিয়াসলি ভাবি? যে মেয়ে সুপারওম্যান হয়ে রাস্তায় গাড়ি থামাতে যায়, সে কি না ইঁদুর দেখে ভয় পায়? আর্য ভাইকে বলতে হবে, নেক্সট টাইম আপনাকে শাসন করার জন্য গাদা গাদা লজেন্স নয়, জাস্ট একটা প্লাস্টিকের ইঁদুর যথেষ্ট!
হাসাহাসি যখন চরমে, ঠিক তখনই সিঁড়িতে ভারী পদশব্দ পাওয়া গেল। আর্য নেমে আসছে। গায়ে এখন একটা হালকা ধোঁয়াটে রঙের টি-শার্ট আর ট্রাউজার। চুলগুলো এলোমেলো, চোখে সেই চিরাচরিত রাশভারী চাউনি। ঘরের ভেতর ঢুকতেই হাসির শব্দটা একটু স্তিমিত হয়ে এল। আর্য সরাসরি তৃষার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

—“হাসাহাসিটা একটু কমান। অতিরিক্ত হাসলে আপনার ব্লাড প্রেশার ফ্লাকচুয়েট করতে পারে, যা আপনার ইনজুরির হিলিং প্রসেসে বাধা দেবে।
মেহসানা ফিসফিস করে তৃষার কানে বলল,,
—“তোর এই লর্ড কার্জন তো দেখি রোবটের মতো কথা বলে! হাসতেও নিষেধ করছে!
আর্য মেহসানার দিকে একবার তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। তারপর টিপয়ের ওপর রাখা ওষুধের ব্যাগের দিকে ইশারা করে তৃষাকে বলল,
—“নয়টা বেজে দশ মিনিট। আপনার ওষুধের টাইম পাঁচ মিনিট ওভার হয়ে গেছে। আদ্রিয়ান, তোকে বলেছিলাম না খেয়াল রাখতে? তুই তো দেখছি ডালিম আর আড্ডায় মশগুল!
আদ্রিয়ান তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে জিব কামড়ে বলল,
—“সরি আর্য ভাই! মিস মিমির রেডিও শুনতে শুনতে সময়টা খেয়াল করিনি।
আর্য নিজে এগিয়ে এসে ওষুধের স্ট্রিপ থেকে একটা বড় নীল রঙের ট্যাবলেট আর একটা ক্যাপসুল বের করল। এক গ্লাস পানি নিয়ে তৃষার হাতে দিয়ে বলল,
—“নিন। কোনো ওজর-আপত্তি শুনব না। আর ওষুধটা গিলে আমাকে জানাবেন।
তৃষা মুখটা তিতকুটে হওয়ার ভয়ে কুঁচকে বলল,,

—“এত বড় ওষুধ! একটু পরে খেলে হয় না?
আর্য ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল,
—“আমি কি অপশন দিয়েছি? ইট ইজ এন অর্ডার। চটপট খেয়ে নিন।
তৃষা অগত্যা আর্যর চোখের শাসনের কাছে হার মানল। ওষুধটা গিলে যখন সে মুখ বিকৃত করছিল, তখন আর্য ব্যাগের কোণ থেকে সেই লজেন্সের প্যাকেটটা বের করে একটা লজেন্স তৃষার সুস্থ হাতের তালুতে রাখল।আদ্রিয়ান পাশ থেকে মিটিমিটি হেসে বলল,,
—“আর্য ভাই, ডালিমটা কিন্তু দারুণ ছিল। কিন্তু তোমার এই কড়া পাহারা দেখে মনে হচ্ছে তৃষা ভাবি কোনো পেশেন্ট না, বরং তোমার ইউনিটের কোনো নতুন রিক্রুট!
আর্য ওর কথার উত্তর না দিয়ে ‌করিডোর দিয়ে গটগট করে চলে গেল। ও চলে যেতেই আদ্রিয়ানমেহসানার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,,
—“মিস মিমি, আপনি চাইলে আজ রাতে এখানেই থেকে যেতে পারেন। তৃষার সাথে কথা বলার মানুষ থাকলে ও হয়তো একটু বেটার ফিল করবে। তবে শর্ত একটাই—রাত বারোটার পর সুখনীড়ে শব্দদূষণ আইনত দণ্ডনীয়।
মেহসানা মুখ লুকিয়ে ঝগড়াটে কন্ঠে আদ্রিয়ান কে দু একটা ধমক দিতে গেল। সে কিছু বলার আগেই আর্যর কণ্ঠস্বরে থামল তারা,,
—‘তৃষা? আজকে আর বেশি রাত জাগবেন না ঘুমিয়ে পড়ুন।
তৃষা হচকিত নয়নে উপরে তাকালো ততক্ষণে উত্তর দিকের করিডোরে পাড়ি জমিয়েছে চলে গিয়েছে। এদিকে সবাই নিজেদের কথোপকথন বাদ দিয়ে মশগুল হয়েছে তৃষা আর আর্য কে নিয়ে দুষ্টুমিতে।

—‘সে কি? আর্যর অতবড় রুম থাকতে তৃষা এখনো অন্য রুমে ঘুমায় মানে? আর তাছাড়া ওটা তো সচরাচর গেস্ট রুম হিসেবে ইউজ হয়। ওখানে তো আজ মেহেসানা মা আর সাবরিনা মৃত্তিকাদের থাকতে দিব।
এতক্ষণ সব ঠিকই চলছিল হঠাৎ হামিদা বেগমের এমন কথায় ‌ল্যাপটপ থেকে দৃষ্টি তুলে ভ্রু কুঁচকে তাকালো আর্য। হামিদা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,,
—‘আমি ইউসিয়ালি একা একা থাকতে অভ্যস্ত। আর তাছাড়াও বাড়িতে তো আরো অনেক রুম আছে। ওখানেই তো ঘুমিয়ে পড়লে হয়।
হামিদা বেগম এবার হাত নেড়ে আর্যকে থামিয়ে মাতৃত্বসুলভ শাসনে বললেন,,
—‘আরে রাখো তোমার ফাইল! মেয়েটার ডান হাতটা পুরো অকেজো হয়ে আছে। রাতে পাশ ফিরতে গেলেও কারও সাহায্য লাগবে। মেহসানা আর মৃত্তিকা-সাবরিনারা তো পাশের রুমে হুল্লোড় করবে, ওর ঘুমের ব্যাঘাত হবে। আর্য, তুমি কি এতটাই কাণ্ডজ্ঞানহীন যে নিজের স্ত্রীকে এই অবস্থায় একা ছাড়বে?
তৃষা পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল।তার হৃদপিণ্ডটা তখন গলার কাছে এসে ধুকপুক করছে। আর্যর ওই গম্ভীর আর পারফেক্টলি সাজানো রুমে সে থাকবে? ভাবতেই তার হাত-পা হিম হয়ে আসছে। সে আমতা আমতা করে বলল,

—‘চাচিমা, আমি ঠিক আছি। মেহু তো আছেই, ও আমাকে হেল্প করবে…!
ঠিক তখনই টুইংকেল ওদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই কোমরে হাত দিয়ে বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ল। সে আর্যর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে বলল,
—‘পাপা! তুমি মিছামিছি বাহানা দিচ্ছ কেন? আমি তো কতবার বলেছি আমি পাপা আর বানির মাঝখানে ঘুমাবো, কিন্তু তোমরা তো একসাথেই ঘুমাও না! আজ বানি অসুস্থ, পাপা তুমি বানিকে স্টোরি শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেবে। আর হ্যাঁ, বানি কিন্তু রাতে ভয় পায়, তুমি ওর হাত শক্ত করে ধরে রেখো!
টুইংকেলের এই বিস্ফোরক মন্তব্যে আর্য আর তৃষা দুজনেই যেন মাটির সাথে মিশে গেল। আদ্রিয়ান এক কোণে বসে মুখ চেপে হাসতে হাসতে লাল হয়ে গেছে। হামিদা বেগম এবার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করলেন,,
—‘ব্যাস! টুইংকেল যখন বলেছে তখন আর কথা নেই। আদ্রিয়ান, যা তো বাবা, তৃষার টুকটাক দরকারি জিনিসগুলো আর্যর রুমে রেখে আয়। আর আর্য, তুমি মুখ কালো করে থেকো না। নিজের দায়িত্ব পালন করা শেখো।
আর্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে ল্যাপটপটা বন্ধ করল।সে বুঝল চাচিমার জেদ আর টুইংকেলের আবদারের সামনে তার পেশাদারী গাম্ভীর্য আজ অচল। সে চেয়ার ছেড়ে ওঠার সময় তৃষার দিকে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাইলো,

—‘ঠিক আছে। তবে রুমে গিয়ে যেন আবার সারারাত বকবক শুরু না হয়।
করিডোর দিয়ে আর্যর পিছু পিছু হাঁটাটা তৃষার কাছে আজ মনে হচ্ছে যেন কোনো এক অজানা দ্বীপের অভয়ারণ্যের দিকে যাত্রা। হামিদা বেগম অত্যন্ত যত্ন করে তৃষার প্রয়োজনীয় সব কিছু আদ্রিয়ানের হাতে আর্যর রুমে পাঠিয়ে দিয়েছেন। যাবার আগে তৃষার চিবুক ছুঁয়ে ইশারে অভয় দিয়ে গেছেন তিনি। কিন্তু তৃষার ভেতরে তখন প্রশান্ত মহাসাগরের চেয়েও উত্তাল ঢেউ। সে মনে মনে আর্যকে লক্ষ্য করে অজস্র বাক্যবাণ ছুড়ছে,,
—‘নিজে তো একটা আস্ত পাথরের খাম্বো! সবার সামনে এমনভাবে বললেন যেন আমি সারারাত রেডিওর মতো বাজি! ডিক্টেটর কোথাকার! একটা দিনও কি শান্তি নেই? এখন উনার ওই পারফেক্টলি গুছিয়ে রাখা মিউজিয়ামের মতো রুমে আমাকে কাটাতে হবে!
আর্যর রুমের দরজাটা যখন মৃদু শব্দে খুলে গেল, তৃষা থমকে দাঁড়াল। পুরো রুমটা ঠিক আর্যর ব্যক্তিত্বের মতোই,আভিজাত্যপূর্ণ, ছিমছাম এবং কিছুটা শীতল। অফ-হোয়াইট দেয়াল, একপাশে বিশাল বইয়ের তাক আর অন্যপাশে কাঁচের জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকার আকাশটা দেখা যাচ্ছে। বিছানায় ধবধবে সাদা চাদর পাতা।
আর্য ল্যাপটপের ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে নির্লিপ্ত গলায় বলল,

—‘দাঁড়িয়ে কেন? বিছানায় গিয়ে বসুন। আপনার ওষুধের ড্রাউজিনেস শুরু হতে বেশি সময় লাগবে না।
তৃষা মুখ কুঁচকে বিছানার এক কোণে বসল। আর্য তখন আলমারি থেকে একটা পাতলা কম্বল বের করছিল।তার প্রতিটি কাজ এত নিখুঁত যে তৃষার নিজের অগোছালো স্বভাবের কথা মনে করে আরও বেশি আড়ষ্টতা বোধ হলো। সে বাম হাত দিয়ে নিজের ওড়নাটা বারবার ঠিক করছিল। এক বিছানায়, এই গাম্ভীর্যের মূর্তির সাথে রাত কাটানো! ভাবতেই তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ আর্য তার সামনে এসে দাঁড়াল। হাতে সেই আদার মোরব্বা আর জলের গ্লাস। সে টিপয়ের ওপর গ্লাসটা রেখে তৃষার ব্যান্ডেজ করা হাতটার দিকে একবার তাকাল।
—‘ব্যথা কি এখন বেশি টনটন করছে? যদি করে তবে বরফ দিতে পারি। অযথা চেপে রাখবেন না।
তৃষা মাথা নিচু করে বলল,,

—‘না, এখন ঠিক আছে। আপনি… আপনি ঘুমান। আমি একপাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকব। ডোন্ট ওয়্যারি, রাতে বিছানায় ফুটবল খেলার অভ্যেস আছে আমার তবে নিজেকে সামলে নেব।
তৃষার মুখে বিছানায় ফুটবল খেলার কথা শুনে আর্যর কুঞ্চিত ভ্রুদ্বয় যেন আরও খানিকটা কুঁচকে গেল। সে হাতের জলের গ্লাসটা টিপয়ের ওপর রাখতে রাখতে আড়চোখে তৃষার দিকে তাকাল। লোকটার চাহনিতে আজ এক বিচিত্র মিশ্রণ—বিরক্তি নাকি প্রচ্ছন্ন কৌতুক, তা বোঝা দায়।ও গম্ভীর গলায় বলল,,
—‘ফুটবল খেলার শখ থাকলে কাল সকালে মাঠে নিয়ে যাব। আপাতত এই অকেজো হাতটা নিয়ে শান্ত হয়ে একপাশে পড়ে থাকুন। আর হ্যাঁ, মাঝরাতে যদি অভ্যাসবশত লাথি মেরে আমাকে বিছানা থেকে ফেলার চেষ্টা করেন, তবে কিন্তু পরদিন সকালে আপনার ওই ফুটবল রিটায়ারমেন্ট ঘোষণা করতে বাধ্য হবো। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?
তৃষা মনে মনে ভেংচি কাটল। মুখে বিনয়ের অবতার সেজে বললেও মনে মনে বিড়বিড়িয়ে উঠল,,
—‘উফ! মানুষটা কি রসকষহীন এক তাল পাথর! একটু রসিকতাও বোঝে না। সারাক্ষণ যেন প্যারেড গ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে হুকুম ঝাড়ছে।
তবে তাকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আর্য ফের বলল,,—‘গুটিসুটি মারার প্রয়োজন নেই। বিছানাটা যথেষ্ট বড়। আর হ্যাঁ, টুইংকেল আজ জেদ করেছিল আমাদের মাঝখানে শোয়ার, কিন্তু ওর ঘুমের ঘোরে হাত-পা ছোঁড়ার অভ্যাস আছে। আপনার ইনজুরিতে লেগে যেতে পারত বলেই আমি ওকে চাচিমার কাছে পাঠিয়েছি। সো, ডোন্ট ওয়ারি।

নিশুতি নিস্তব্ধতায় মোড়া। দূর হতে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা আওয়াজ।আর্য করিডোরের পার্শ্ববর্তী একটা কাউচে শুয়েছে, ও একপাশের ল্যাম্পপোস্ট জ্বালিয়ে নিবিষ্ট মনে একটা ইংরেজি সাহিত্যিক পড়ায় ব্যস্ত, আর তৃষা বিছানার এক প্রান্তে বালিশে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ল।
জানালার ভারী পর্দার ফাঁক দিয়ে গলিয়ে আসা চাঁদের ম্লান আলো ঘরের আসবাবপত্রের ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে।তৃষা এপাশ-ওপাশ করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার ব্যান্ডেজ করা হাতটি যেন এক অবাধ্য বোঝা। ওষুধের ঘোরে তার দুচোখ ভেঙে ঘুম আসার কথা থাকলেও, এক অজানা অস্বস্তি আর ভয়ের চোরাবালি তাকে গ্রাস করছে। আর্যর রুমের এই হাড়হিম করা শৃঙ্খলার মাঝে সে নিজেকে খুব বেমানান অনুভব করছে।
হঠাৎ করেই বাতাসের ঝাপটায় জানালার পাল্লাটা সশব্দে নড়ে উঠল। সেই আকস্মিক শব্দে তৃষার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। তার মনে হলো অন্ধকার কোণ থেকে কেউ যেন তাকে দেখছে। ছোটবেলার সেই ভূতের গল্পের স্মৃতিগুলো একে একে ভিড়ল মস্তিষ্কে। সে কুঁকড়ে গিয়ে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,,

—‘উফ! রুমটা এত অন্ধকার কেন?
ঠিক তখনই ল্যাম্পের আলোটা হুট করে নিভে গেল। সম্ভবত বাল্বটা ফিউজ হয়েছে কিংবা আর্য নিজেই নিভিয়ে দিয়েছে। ঘোর অন্ধকারে তৃষার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। সে কাঁপা কাঁপা গলায় ডাকল,,
—‘মিস্টার….?
সে কোন সম্বোধন খুঁজে পেল না। তবুও ভয়ে ভয়ে বলল,,
—‘আপনি কি জেগে আছেন?
তৃষার গলার সেই অসহায়ত্ব আর্যর কান এড়ালো না। সে মুহূর্তেই কাউচ ছেড়ে উঠে এল। অন্ধকারেই সে নিখুঁত আন্দাজে দেয়ালের মেইন সুইচে চাপ দিল। মুহূর্তেই প্রজ্জ্বলিত হলেও তীব্র পাওয়ারের রড লাইট। আঁধারাচ্ছন্ন পরিবেশ মুহূর্তেই স্বচ্ছ আলোয় আলোকিত হলে।আর্য দ্রুত পায়ে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। তৃষার ফ্যাকাসে মুখ আর কপালে জমে ঘামবিন্দু দৃষ্টিগত হতেই ও ভ্রু কুঁচকে উদ্বেগ মিশ্রিত কন্ঠে বলল,
—‘কী হয়েছে তৃষা? হাতটা কি খুব বেশি পেইন করছে? না কি জ্বরের মতো কোনো সেনসেশন ফিল করছেন?
তৃষা আর্যর সেই সুগভীর দৃষ্টির পানে চাইতেই নিজের ভয়ের কথা বলতে গিয়ে লজ্জা পেল। সে আমতা আমতা করে বলল,

—‘না… হাত ঠিক আছে। আসলে অন্ধকারটা একটু বেশি ছিল তো, তাই ভয় পাচ্ছিলাম। আপনি কি সারা রাত ওই কাউচেই থাকবেন?
আর্য কিছুক্ষণ স্থির চোখে তৃষার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বালিশের পাশে রাখা পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে বলল,,
—‘আগে পানি খেয়ে নিজেকে শান্ত করুন। আপনার হার্টবিট আমি এখান থেকেই শুনতে পাচ্ছি। আর শশশ… ভয়ের কিছু নেই। সুখনীড়ে কোনো ইনট্রুডার ঢোকার সাহস পাবে না, আর ভূত-প্রেতদের জন্য আমার এই রুমের ডিসিপ্লিন সহ্য করা কঠিন হবে।
তৃষা এক চুমুক পানি খেয়ে নিজেকে কিছুটা গুছিয়ে নিল। আর্যর এই কাঠখোট্টা রসিকতায় তার ভয়ের রেশটা কিছুটা কাটল। সে মৃদু হেসে বলল,
—‘আপনার ডিসিপ্লিন তো জ্যা’ন্ত মানুষই সইতে পারে না, ভূত তো কোন ছার! কিন্তু আপনি কি সত্যিই ওই কাউচে ঘুমাবেন? আপনার কষ্ট হবে না?

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১২

—‘আমার ট্রেনিং পিরিয়ডে আমি পাথরের ওপর ঘুমিয়েছি তৃষা, এই কাউচ তো বিলাসিতা। তবে আপনি যদি খুব বেশি ইনসিকিউর ফিল করেন, তবে আমি লাইটটা জ্বালিয়েই রাখছি। অথবা…
তৃষা প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি মেলে বলল,,—‘অথবা…?
আর্য ততক্ষণাৎ দৃষ্টি ঘুরিয়ে বলল,,—‘নাথিং। ঘুমিয়ে পড়ুন।
তৃষাও আর কথা বাড়ালো না। জোরপূর্বক চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করল। আজও এবার লাইট জ্বালিয়ে রেখেই পা বাড়ালো কাউচের দিকে। অতিবাহিত হলো কিছুক্ষণ কক্ষের পিছনের বাগান থেকে ভেসে আসছে রজনীগন্ধার মিষ্টি সুবাস।ধীরে ধীরে তৃষা পাড়ি জমালো ঘুমের রাজ্যে।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৪