হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৩
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
তপ্ত দুপুর, ভার্সিটির প্রাঙ্গণে দলবল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কৃশান। এই অব্দি কটা সিগারেট খেয়ে শেষ করেছে তার কোনো হিসেব নেই। এখনো নিকোটিনের ধোঁয়া উড়িয়ে চলছে সে। নীরবতা ভেঙে তন্মধ্যে রবি নামক ছেলেটি কৃশানের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,
“ কিরে তুই নূপুরকে রিজেক্ট করলি কেন? ও তো বলেছে ও নিজে তোকে চাকরি করে খাওয়াবে। তাহলে আর কী সমস্যা? ”
“ ধুর, এসব মেয়ে মানুষের প্যারা জীবনে আনলে তার মজাই শেষ। দুদিন আসতে না আসতেই বলবে; এটা করবে না, ওটা করবে, এই, সেই- বিরক্তিকর। বাপের টাকায় ফুর্তি করমু আর চিল মুডে বিন্দাস লাইফ কাটামু। এসব প্যারায় আমি নাই। ”
গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল কৃশান। তার এমন ভাব দেখে পাশে থাকা আরেকটি ছেলে বলল,
“ তাহলে কী তুই কখনোই বিয়ে করবি না? ”
সবার অগোচরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল কৃশান। বলল,
“ জানিনা এসব বাদ দে তো। আমি বাড়ি যাই, বিকেলে দেখা হবে। ”
বলেই হাঁটা ধরলো সে। পিছন থেকে রবি বলে উঠল,
“ আজ এতো তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যাবি? ”
“ তাড়াতাড়ি কোথায় দেখলি তুই? তিনটা বেজে গেছে প্রায়। ”
ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে বলল। সময় শুনে কেউই আর কথা বাঁড়ালো না। উল্টো সবায়ই কৃশানের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটা ধরলো। এক একজন হাতে একটা করে সিগারেট নিয়ে ফুর্তি করে খেতে খেতেই রাস্তা কভার করলো। রাস্তায় কোনো মেয়ে দেখলেও পাত্তা দিলো না। তাদের গ্রুপটা এভাবে যতই খারাপ হোক। মেয়েঘটিত দিক দিয়ে একেবারে পিউর। উল্টো মেয়েদের কেউ টিচ করলে সেগুলোকে মেরে তুন্দরী বানিয়ে দেয়। তাদের সবারই নিজস্ব গার্লফ্রেন্ড আছে। প্রেমীকা আর মাদক সেবনের মধ্য দিয়েই দিন পার করে তারা। তবে কৃশানের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। সে মেয়ে মানুষ দেখতেই পারে না, প্রেম তো দূর। বন্ধুর গার্লফ্রেন্ডরা যখন তাদের এটা ওটা করতে নিষেধ করে- এগুলো দেখলেই মাথা গরম হয়ে যার তার। বন্ধুরা তো সেই নিষেধাজ্ঞা মানেই না শুধু শুধু ন্যাকামি করে- অসহ্য ব্যাপার স্যাপার ছাড়া আর কিছুই না এই প্রেম ভালোবাসা।
বরাবরের মতোই নিঃশব্দে নিজের রুমে এসে ঢুকলো কৃশান। এমন সময়ে বাড়ির সকলে ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে। তাই পথে কারো সাথেই সাক্ষাৎ হয়নি। রুমে প্রবেশ করতেই ৪৮০ ভোল্টেজের ঝটকা খেলো ছেলেটা। সিগারেটের কৌটা আর ছাঁই এ ভরপুর রুম টা উজ্জ্বলতায় ঝকঝক করছে। একটা কোনায়ও একটু ময়লার দেখা মিলল না। এলেমেলো কাপড় গুলো স্বযত্নে ভাঁজিয়ে রাখা হয়েছে। রুম তো নয় যেন গণ্যমান্য কোনো হোস্টেলে এসেছে সে। আকা বাঁকা বিছানার চাদরটা একদম মসৃন হয়ে আছে। সেখানে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে এক স্নিগ্ধ রমনী। সবসময়ের মতোই মাথায় দু’ঘোমটা পেঁচানো তার। কালো হিজাবের মধ্যে গোলগাল মুখ খানয়া যেন নূরের অন্ত নেই, কেমন ঝলঝল করছে তা!। চন্দন রঙ্গা মুখে গোলাপি রঙা উষ্ঠযুগল যেন সদ্য ফোটা টিউলিপ। তার নির্মিলিত চোখের ঘন পাঁপড়ির দিক তাকিয়ে কৃশান অজান্তেই বলে উঠল,
“ হুজুরনী তো দেখি ডেঞ্জারাস মায়াবী। চেহারা এক খানা পুরো নূরের ডিব্বা। এক কথায় যাকে বলে গর্জিয়াস ফেইস কাটিং! হুদাই কী আর মির্জার গুষ্টি এই মেয়ের জন্য পাগল হইছে? ”
পরক্ষনেই সচেতন মস্তিষ্কে চোখ ফিরালো সে। নিজেকেই নিজে শাসাতে লাগলো, মাথার ঘিলু কী নষ্ট হয়ে গেলো নাকি তোর! এসব কী বলছিস? নাহ, এই মেয়ের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। নয়তো কবে কী হয়ে আল্লাহ মালুম। পরে আমার বিন্দাস লাইফ ড্রেনের পানিতে ডুবে মরবে- ভাবতেই ভাবতেই ওয়াশরুমে ফ্রেশ হতে চলে গেলো।
ওয়াশরুমের দরজা লক করার শব্দে ঘুম ছুটে গেলো হুমায়রার। পিটপিট করে চোখ খুলে তাকালো। আশপাশ দেখে কৃশানের উপস্থিতি ঠাহর করতে বেগ পোহাতে হলো না। চট জলদি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল সে। রুমের বাইরে একটু হাঁটাহাঁটি করে বুঝতে চাইলো সবাই জেগেছে কিনা। কিন্তু তাকে হতাশ করে দিয়ে সবাই যেমন তেমন ইকরাও ঘুমে বিভোর হয়ে আছে। উপায় না পেয়ে আবারও রুমে ফিরে আসলো মেয়েটা। ধীরপায়ে হাঁটা ধরলো বারান্দার দিকে। সেখানে গ্রিলে হেলান দিয়েই কিছুক্ষণ প্রকৃতি দেখলো। এরপর অলস ভঙ্গিতে পিছনে ফিরতেই সামনে থাকা প্রাণীটিকে দেখে আঁতকে উঠলো মেয়েটা। মৃদু চিৎকারে স্থান ত্যাগ করে দৌঁড় লাগালো ঘরের উদ্দেশ্যে। ওমনিই মাঝপথে ধাক্কা খেলো কৃশানের শক্তপোক্ত চওড়া বুকের সাথে। ভয়ে কোনোকিছু না ভেবেই একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল সামনে থাকা পুরুষটিকে। ঘটনার আকস্মিকায় ভরকে গেলো কৃশান। হুমায়রার ছোট্ট শরীরের মৃদু কম্পন অনুভব করতেই ভ্রু কুঁচকে গেলো তার। ভয় পাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করতে নিবে এর আগেই করিডোর থেকে উকি দিলো লম্বা লম্বা সতর্ক দুটি কর্ণযুক্ত একটি সাদা মসৃন খরগোশ। এতেই যা বুঝার বুঝে নিলো সে। প্রাণীটির উদ্দেশ্যে হাঁক ছাড়ল,
“ মিঠু, এদিক আয়। ”
কৃশানের কন্ঠে কিছুটা ধাতস্ত হলো হিমি। খিচে রাখা চোখ গুলো খুলে নিজের অবস্থান ঠাহর করতেই ছিটকে দূরে সরে গেলো মেয়েটা। কৃশানকে এতক্ষন এভাবে জড়িয়ে ছিলো ভাবতেই- লজ্জায়, ভয়ে গাল দুটো রক্তিম বর্ণ ধারণ করলো। কৃশানের থেকে দূরত্ব বাড়াতে গিয়েও পারলো না। পিছনের প্রাণীটিকে দেখে একটু গিয়েই পা থেমে গেলো। এইদিকে মাহাজনের ডাক শুনে গুটিগুটি পায়ে কৃশানের দিক এগিয়ে আসতে লাগল মিঠু। পুরোটা সময় হুমায়ার দিকেই অপলক চেয়ে রইল। যেন বুঝতে চাইল তার অভিব্যাক্তি। জানতে চাইছে, এই নতুন সদস্য আবার কে? মিঠু কাছে আসতেই তার তুলতুলে নরম দেহটা নিজের হাতের আজলায় নিয়ে নিলো কৃশান। বলল,
“ কী করেছিস তুই? ”
প্রাণীটি ফ্যালফ্যাল করে নিজের মাহাজনের দিক তাকিয়ে রইল। নিজের নিশ্পাপ মুখশ্রীর প্রমাণ দিচ্ছে বোধ হয়। এর মাঝেই হুমায়রা বলল,
“ এটা কিছুই করেনি, আমিই হঠাৎ দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ”
মিঠুর দিক মায়া মায়া দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল হুমায়রা। অনুতপ্ত কন্ঠ তার। অথচ বেজায় বিরক্ত হলো কৃশান। বলল,
“ কানি মহিলা, জলজ্যান্ত খরগোশটা তোর চোখে লাগে না? আরেকবার এমন করলে বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ফেলবো তোকে। ”
বলেই উঠে দাঁড়ালো সে। মিঠুকে তার নির্ধারিত জায়গায় রেখে এসে গায়ে কাপড় জড়াতে লাগলো। কোনোমতে শার্টটা গায়ে জড়িয়ে, হাত দিয়ে চুলগুলো একটু ঠিক করে আবারও বাইরের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলো। তা দেখে হুমায়রা পিছন ডেকে বলল,
“ এখনো খেয়ে যাবেন না? ”
চোখ ছোটো ছোটো করে ঘুরে তাকালো কৃশান। বলল,
“ তোরে না বলছি আমার থেকে তিন মাইল দূরে থাকতে? আর তুই তো দেখছি আমার বিন্দাস লাইফের মধ্যেই ঢুকে পড়ছিস! ”
“ দুপুরের খাবারটা অন্তত খেয়ে যান। ”
মিহি স্বরে বলল মেয়েটা। কৃশানের কর্কশ কন্ঠে মুখটা চুপসে গেলো ওমনিই,
“ তুই কিন্তু মাইর খাবি বলে দিলাম। ”
বলতে বলতেই রুম ছেড়ে চলে গেলো সে। দরজার কাছে গিয়ে কী যেন একটা ভেবে থেমে গেলো। এই মেয়ে খেয়েছে কী? বড়ো আম্মু তো বলেছিলো, “ সে না খেলে ওঁকেও খেতে দিবে না। ” যদিও মির্জা পরিবারের মানুষ এমন না। তবে কেন যেন শান্ত হলো না তার মন। চোখ ঘুরিয়ে হুমায়রার দিক এক পল তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো,
“ তুই কী এখন অব্দি না খেয়ে বসে আছিস? ”
মলিন মুখে চাইলো হুমায়রা। তার চেহারার মধ্যেই উত্তর খুঁজে পেলো কৃশান। বলল,
“ না খেয়েই মর তুই! ”
ধুপধাপ পায়ে চোখের আড়াল হয়ে গেলো সে। সেই যাওয়ার পানে অপলক চেয়ে রইল হুমায়রা। চোখ জোড়া ভিজে উঠলো অজান্তেই।
আসরের নামাজ আদায় করে বাগানের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করছে হুমায়রা ও ইকরা। দুজনেই নিশ্চুপ, হুমায়রার কোলে মিঠু। তার দিকেই মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে হুমায়রা।মাদ্রাসা ব্যতিত পুরো বাইরের জগৎ অচেনা হুমায়রার কাছে। মাদ্রাসার চার দেয়ালের ভিতরে অব্দিই পরিচিত সে। বাইরের জগতের সাথে তার পরিচয় খুবই নগণ্য। যার দরুণ খরগোশটিকে প্রথম দেখে তুলনামূলক বেশিই ভয় পেয়েছে মেয়েটা। তবে এইটুকু সময়ের মধ্যেই এই নিশ্পাপ প্রাণীটিকে বড্ডো আদুরে লাগছে তার কাছে। মন চাচ্ছে নিজের কাছেই এটাকে রেখে দিতে সর্বক্ষণ। প্রাণীটিও বোধ হয় পছন্দ করেছে হুমায়রাকে। সেটিও চুপচাপ তার কোলে অনড় হয়ে বসে আছে। সহসা নীরবতা ভেঙে ইকরা বলে উঠলো,
“ এইবার অন্তত কিছু খেয়ে নে। ভাইয়া কখনো তোর বিষয়ে ভাববে না হুমায়রা। ”
“ দেখি তিনি কতক্ষণ না ভেবে থাকতে পারেন। ”
শান্ত স্বর হুমায়রার। কিন্তু মেজাজ চওড়া হলো ইকরার। বলল,
“ আর কতো দেখবি! এই অব্দি যে না খেয়ে আছিস ভাইয়া একবারও জিজ্ঞেস করেছে তোকে খেয়েছিস কিনা? ”
“ দুপুরে করেছে। আর আমার বিশ্বাস তিন কবুলের জোরে হলেও ইনশাআল্লাহ আমার না খেয়ে থাকার প্রভাব উনার উপর পড়বে। ”
বিস্ময়ে হা হয়ে গেলো ইকরা। কিছুক্ষণ ড্যাবড্যাব করে হুমায়রার দিক তাকিয়ে থেকে বলল,
“ ও যে রাত করে বাসায় আসে। মদ খেয়ে এসে মোটেও তোর খবর নিবে না দেখিস। শুধু শুধু ভাইয়ার সাথে জেদ ধরে তুই নিজের ক্ষতি করছিস। ”
উত্তরে চুপ রইলো হুমায়রা। তা দেখে ইকরা আবারও বলল,
“ দয়া করে খেয়ে নে সখি আমার। ভাইয়া খবর নিলে তা পরে তুই আগে খেয়ে নে। ভাইয়া তো আর জানবে না তুই খেয়েছিস। ”
“ ইকরা কিসব বলছিস এসব? মিথ্যে বলতে বলছিস? ”
“ দেখ আমার এবার রাগ হচ্ছে। তুই ভাইয়ার জন্যে আর কতক্ষন না খেয়ে থাকবি? ”
“ নিজেকে শান্ত কর। ”
“ সব জায়গায় তোর এতো শান্ত স্বভাব ভালো লাগে না আমার। ”
“ ………… ”
“ সমসময় কেন চুপ থাকিস তুই? সবকিছু কেন মুখ বুজে সহ্য করিস? বিয়ের আগেও এমনি করে এসেছিস। তোর মামা- মামির সব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করেছিস। ”
ইকরার এতগুলো কথার পৃষ্ঠে একটা কথাও বলল না হুমায়রা। প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
“ মিঠু, কী কী খায় রে? ”
“ কষ্ট হয় না তোর? অভিযোগ করতে মন চায়না? ”
এইবার কিছুটা শান্ত স্বরেই জিজ্ঞেস করল ইকরা। উত্তরে মুচকি হাসলো হুমায়রা। বলল,
“ যিনি এ দেহে হৃদয় দিয়েছেন,
হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২
তার নামে এ হৃদয় থেকে অভিযোগ বাণী নিসৃত হয় কী করে বল? মাঝে মাঝে আমি বড্ডো বাজে ভাবে ভেঙে পড়ি। মনে হয়, আমার রব আমার সাথে এমন না করলেও পারতেন। পরক্ষনেই মনে হয়, এই সুবিশাল পৃথিবীতে তিনি ছাড়া এই অধমের তো আর কেউই নেই। আশ্রয়হিন আমিটাকে আশ্রয় দিয়ে ক্ষতিকর দুনিয়া থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনি। নাহলে ভাব, আমার ঠিকানা আজ কোথায় হতে পারতো? যাদের মা- বাবা নেই তাদের জন্য দুনিয়া ভীষন পাষাণ। সেই তুলনায় আমি অনেক সুখী। আমার রব আমায় যথেষ্ট দিয়েছেন। তাই নিজের সকল হতাশাকে আমি “ কষ্টের পরেই আছে স্বস্তি ” বাক্যের মধ্যে সপে দিয়েছি।
