হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৪৭
তামান্না ইসলাম শিমলা
বিয়ে বাড়ির লোক সমাগমে তনয়াকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল,পেলেই বা কি? ও মেয়ে কি আসবে তার কথা মতো? ওদিকে শিহাব আর তানহার বিয়ে পড়ানো হচ্ছে, আর তেহরাব বাড়ির পেছনের ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। গত রাতের কথা মনে পরতেই আরো বিরক্ত লাগছে তার,ফাহিম তাকে যেতে বলেছিল ক্লাবে। গিয়ে জানতে পারে মাহিমকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, অথচ এসবের কিছুই সে জানত না। অতঃপর ইউসুফের সাথে দেখা করতে গেলে ইউসুফের থেকে ঝারি খেতে হয়েছে তাকে। কারন হলো রিমুর মামা, ইউসুফ জান এসব তেহরাবের কাজ কিন্তু কারনটা তো জানে না। আর তেহরাবও বলবে না, এই নিয়েই ঝামেলা।
ফোনের রিংটোনে ভাবনা থেকে বের হয় তেহরাব, সিগারেটটাও শেষের পথে। শেষ অংশ টুকু ফেলে দিয়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করে, তনয়ার নাম্বার। কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তনয়ার কন্ঠস্বর ভেসে আসে,
“কোথায় আপনি? সবাই চলে যাবে এখন, আব্বু আর বাবা আপনাকে খুঁজছে।”
তেহরাব হাঁটা ধরে, যেতে যেতেই বলে,
“বিদায় দিয়ে দে, আমি গিয়ে কি করব?”
তনয়ার গম্ভীর ও রুক্ষ কন্ঠস্বরে বলে উঠল,
“আপনি কি করবেন মানে? সবাই আপনাকে খুঁজছে, সাহিল ভাইয়া আর ইরা আপু আপনাকে না পেয়েই চলে গেল।”
তেহরাব লম্বা শ্বাস টানে,
“আসছি।”
এটুকু বলেই কল কেটে দেয় তেহরাব, অতঃপর দ্রুত বাড়িতে আসে। রাফা তার মাকে জড়িয়ে কাঁদছে, অথচ তার পাশেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে তানহা। মেয়েটা কাঁদছে না, উল্টো কান্নাকাটি দেখে সে যেন বিরক্ত।
শিহাব তানহার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে, আর প্রত্যয় রাফাকে শান্ত করার চেষ্টায় ব্যস্ত। তেহরাব এসে তনয়ার পেছনে দাঁড়া দল, নিজের পেছনে চেনা কারো অস্তিত্ব অনুভব করতেই পিছনে ফিরে তাকায় তনয়া। মাথা উচু করে তেহরাবকে দেখতে পায়,
“কই ছিলেন?”
তেহরাব আড়ালে তনয়ার কোমরে হাত রাখে, তনয়া সড়ে যেতে চাইলে আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। ফিসফিস করে বলে,
“নড়াচড়া করবি না একদম, দাঁড়িয়ে থাক।”
তনয়া সামনের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে, তবে তেহরাবের হাতের স্পর্শ তাকে স্বাভাবিক হতে দিচ্ছে না। না পেরে নিজের পেটের উপরে থাকা তেহরাবের হাতের উপর হাত রাখে তনয়া, তেহরাব আড়ালে বাঁকা হাসে।
কিছু সময়ের ব্যবধানে শিহাব তানহা ও প্রত্যয় রাফাকে বিদায় দেওয়া হয়, বাড়িতে সবার কান্নাকাটি চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে হতে রাত প্রায় দশটা, আশে পাশের আত্মীয়রা বিদায় নিচ্ছে ধীরে ধীরে। তাসলিমা আর ইউসুফও চলে যাবে এখন, তারা শফিক ও তানিয়ার কাছে আসে।
“বিয়াই সাহেব আজ তাহলে আসি, বেশি রাত হয়ে যাচ্ছে।”
ইউসুফের কথা শুনে শফিক উঠে দাঁড়াল,
“আজ থেকে যান ভাই, একটা রাতেরই তো বিষয়।”
ইউসুফ সৌজন্যমূলক হাসে,
“না ভাই, আজ আসি। কালতো দেখা হচ্ছেই।”
শফিক আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই তেহরাব এসে হাজির হয়, গম্ভীর থমথমে কন্ঠে বলে উঠে,
“আমিও চলে যাব, সাথে তনয়াও।”
তেহরাবের মুখে এহেন কথা শুনে বিস্মিত নয়নে তাকায় তনয়া, কি বলছে কি। সে কেন যাবে? কাল বৌভাত আজ চলে যাবে মানে। তনয়া এগিয়ে আসতে নিলে তেহরাব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়, থেমে যায় তনয়া।
“এ কি করে হয়, কাল বৌভাত। চলে যাবে কেন?”
“কাল সকালেই চলে আসবো, বাসায় একটু কাজ আছে।”
তেহরাবের সহজসরল জবাব, শফিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“তনয়া থাকুক তবে।”
“নাহ, তনয়াও যাবে। আমি আর আপনার মেয়ে চলে আসবো বললাম তো, সকালেই চলে আসবো। আজ আসি বাবা।”
শফিক এক নজর তনয়ার দিকে তাকাল, তনয়া মন খারাপ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিকে তাকিয়ে তেহরাব বলল,
“ এডমিশন টেস্টের তারিখ দিয়েছে, এতদিন তো বইয়ের সাথে কোনো যোগাযোগই ছিল না। আজ গিয়ে সারারাত পড়বি, কোনো বাহানা চলবে না।”
হঠাৎ শফিকের ঠোঁটে হাসি ফুটল, যাক তার মেয়ের সব দিকেই খেয়াল রাখছে তেহরাব। শফিক এবার আর না করল না, বরং নিজেই বলল,
“ হ্যাঁ, তনয়া যা। সকালে এসে পড়িস।”
তনয়া মলিন মুখে তার বাবার দিকে তাকায়, শফিক তনয়ার মাথায় হাত রেখে হাসে। অতঃপর বিদায় নিয়ে সকলেই বেরিয়ে পরে, তেহরাব তনয়া বাইকে করে যাচ্ছে আর ইউসুফ আর তাসলিমা গাড়িতে।
“হুটহাট আপনার কি হয় বলুন তো? কালকে আসলে কি হতো? একদিনে কি এমন ক্ষতি হয়ে যেত?”
তেহরাব হাত থেকে ঘড়িটা খুলে ওয়ারড্রবের উপরে রাখতে রাখতে বলে,
“অনেক ক্ষতি হতো, বলেছি না মেডিকেলে চান্স না পেলে বের করে দিব।”
তনয়া মুখ ভেঙায়, এত রাতে পড়াশোনা করার জন্য বাড়িতে এনেছে নাকি অন্য কারনে তা ভালো মতোই জানা আছে তার। মনে মনে ভেবে নিল আজ কিছুতেই তেহরাবের কাছে যাবে না সে, লোকটা ভারি অসভ্য। তনয়া কথা ঘুরিয়ে বলে,
“বিয়ে বাড়ি, কত মানুষ দেখেছেন? সবসময় এভাবে লেগে থাকেন কেন বলুন তো?”
তনয়ার কথায় অবাক হল তেহরাব, চেহারায় সেই রেশ টেনেই বলল,
“আজব, আমার বউ আমি লেগে থাকব না তো কে থাকবে?”
তনয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল, এই লোককে বোঝানো তার দ্বারা সম্ভব নয়। শরীর থেকে গয়না গুলো খুলতে খুলতে বলে,
“পৃথিবীতে কি আর কেউ বিয়ে করেনি? নাকি আপনি একাই করেছেন?”
তেহরাব ধপ করে বিছানায় শুয়ে পরল, অসহায় ভঙ্গিতে বলল,
“সবাই তো আর তেহরাবের মতো জামাই না, আমি কি বিয়ে করতে চেয়েছিলাম নাকি? রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, আব্বা ধরে বেঁধে বিবাহ করিয়ে দিল। নাহলে তেহরাবেরও কোনো শখ ছিল না বিয়ের।”
তনয়া হতভম্বের ন্যায় তেহরাবের দিকে ফিরে তাকাল,
“বাজে কথা বলার জায়গা পান না?”
“নাহ রে, ঘরে বউ আছে তবে সেও বাজে কথা বলতে দেয় না। কত বড় বৈষম্য দেখ, এটা কি মানা যায়। আমার মতো ভদ্র শান্ত শিষ্ট ছেলেকে কতই না অত্যাচার করে।”
তনয়া চোখ মুখ খিঁচে তাকিয়ে থাকে, তেহরাব হা-হুতাশ করতে ব্যস্ত। গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“কি অত্যাচার করে শুনি?”
তেহরাব চোখ মুখ ভ্যাটকিয়ে তনয়ার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে বলে,
“বলব না, বউ মারবে।”
তনয়া রাগী চোখে এক পলক তাকিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়, তেহরাব হাসে। ফ্রেশ হয়ে বাইরে আসতেই দেখে তেহরাব ঘরে নেই, গেল কোথায়? বিছানার উপর পরে থাকা ফোনটা বাজছে, হাতে নিয়ে দেখল তেহরাবের নাম্বার। রিসিভ করল তনয়া,
“স্টাডিরুমে আয়।”
বলেই কল কেটে দেয় তেহরাব, তনয়া শুকনো ঢোক গিলে, আজ না জানি আবার কি করে। যাবে কিনা যাবে না সেটাই ভাবতে থাকে, আবারো ফোন বেজে উঠে। এবার আর কিছু না ভেবে হাঁটা ধরে স্টাডিরুমের উদ্দেশ্যে।
চেয়ার টেনে বসে আছে তেহরাব, মনোযোগ দিয়ে বই গুলো পর্যবেক্ষণ করছে। তেহরাবকে সিরিয়াস দেখাল, তবে তনয়ার মনে তো অন্য কিছু চলছে। সত্য বলতে ভয় হচ্ছে তার।।
“দাঁড়িয়ে আছিস কেন? জলদি আয়।”
তনয়া চমকায়, লোকটা বুঝল কি করে সে এসেছে? তেহরাব তো পেছনেও তাকায় নি,
“দ্রুত।”
তনয়া লম্বা শ্বাস টানে, এসে বসে তেহরাবের পাশে। তেহরাব কয়েকটা প্রশ্ন বের করে তনয়ার দিকে এগিয়ে দেয়,
“এগুলো দেখ, গত চারবছরের মেডিকেলের প্রশ্ন। প্রশ্ন কেমন টাইপের হবে কিছুটা হলেও বুঝতে পারবি, আর অবশ্যই বায়োলজিতে ফোকাসটা বেশি করতে হবে।”
তনয়া প্রশ্ন গুলো দেখল, সব কিছুই তার চেনা জানা প্রশ্ন। তবে কিছু কিছু প্রশ্ন একটু ঘুরিয়ে করা, যার দরুণ কনফিউশান কাজ করে।
“কালকে রুটির তৈরি করে দিব, কোন সময় কোন সাবজেক্ট পড়বি সবটা সময় মাফিক বলে দিব। আর তনয়া শোন, এটা আমার জন্য বা অন্যদের কথা ভেবে না তোর নিজের জন্য কর। তোর সপ্ন এটা, নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা কর, ইনশাআল্লাহ ভালো কিছু হবে।”
তনয়া মুগ্ধ নয়নে তেহরাবের দিকে তাকায়, লোকটা কতটা অসাধারণ সেটা কি সে জানে? মানুষ এতটা ভালো হতে পারে?
তেহরাব বইয়ের দিকে থেকে চোখ সড়িয়ে তনয়ার দিকে তাকাল, ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কি হলো? প্রশ্ন গুলো দেখ, আর উত্তর গুলোও লেখ। আপাতত তোর প্রিপারেশন কতটুকু সেটাও যাচাই করা যাবে।”
তনয়ার কানে বোধহয় সে কথা গেল না, সে ভাবনায় মগ্ন। তেহরাব এবার সোজা হয়ে বসল, তনয়ার হাত ধরে স্মিত হেসে বলল,
“চিন্তা করিস না, শুধু চেষ্টা কর। একদম ভয়ের কিছুই নেই, তুই ভালো ছাত্রী। একটু চেষ্টা কর, মনোযোগী হয়ে পড়াশোনা কর দেখবি আল্লাহ নিরাশ করবে না।”
তনয়ার চোখ ছলছল করছে,জোরপূর্বক হেসে মাথা নাড়ল সে। তেহরাব তনয়ার কপালে চুমু খেল,
“এবার শুরু কর।”
তনয়া চোখ বন্ধ করে বড় করে শ্বাস নেয়, তারপর শুরু করে লেখা। তার ভাবনার মতো কিছুই হয়নি রাতে, বরং তেহরাবের কথা মতোই পড়তে বসতে হলো। ফাঁকিবাজি করার কোনো সুযোগও মেলেনি, তনয়া একটা জিনিস খেয়াল করেছে। তেহরাব কোনো দায়িত্ব নিলে তা কঠোর ভাবে পালন করে, সেই সময়টাতে সে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে ভাবে না।
এই যেমন তনয়াকে পড়ানো ও গাইড করার সময়, গোটা সময়টা তেহরাব ছিল গম্ভীর ও সিনিয়াস। গল্পের রাগী শিক্ষকদের মতো, তনয়া এই ভেবে দুয়েক বার হেসেছিল বটে। তবে এ নিয়েও ধমক খেতে হয়েছে,তেহরাবের ভাষ্যমতে,
“পড়াশোনা হোক বা কোনো কাজ, সেই সময়টাতে সম্পুর্ণ মনোযোগ এক দিকেই রাখা উচিত, মনোযোগ ভঙ্গ হলে সেই কাজ আর সম্পন্ন হয় না।”
অতঃপর তনয়াও মনোযোগ দিয়ে পড়তে থাকে, আর তেহরাবও কম্পিউটার নিয়ে বসে কাজে। এভাবেই দেখতে দেখতে অতিবাহিত হয় সময়, রাত দুটো বাজে পড়াশোনা শেষ করে ঘরে আসে তনয়া। তেহরাব গিয়েছে খাবার আনতে, খিদে পেয়েছে দুজনেরই।
হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৪৬
বেকারির কেক আর জুস নিয়ে ঘরে আসে তেহরাব, আর কিছু পায়নি ফ্রিজে। তনয়ার ঘুম পাচ্ছে, চোখ লেগে আসছে বারবার। তবে তেহরাবের জোরাজোরিতে অল্পএকটু মুখে দিতে হয়েছে তাকে, অতঃপর একে অপরকে জড়িয়ে ধরে দুজনেই পাড়ি জমায় গভীর ঘুমে। দুটো ক্লান্ত দেহ একে অপরকে জড়িয়ে শান্তির খোঁজে!
